ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক কোটার শূন্য পদ মেধা তালিকা থেকে পুরণ করার প্রস্তাব মন্ত্রীসভায় অনুমোদন

Cabinet

স্টাফ রিপোর্টার:

৩৪ ও ৩৫তম বিসিএসে কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারে শূন্যপদে কোটা শিথিলের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। এর ফলে মুক্তিযোদ্ধা, নারী কিংবা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক কোটায় কাউকে না পাওয়া গেলে মেধা তালিকা থেকে শূন্যস্থান পূরণ করা হবে।

সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে এ অনুমোদন দেওয়া হয়।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, নিয়োগ হয়ে যাওয়া ৩৪তম বিসিএসে কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারে কোটার বিপরীতে ৬৭২টি শূন্যপদ রয়েছে। এই পদগুলো ৩৫তম বিসিএসের মেধা তালিকা থেকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পূরণ করা হবে। অন্যদিকে লিখিত পরীক্ষা হয়ে যাওয়া ৩৫তম বিসিএসে মোট ১ হাজার ৮০৩টি পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। এই বিসিএসেও কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারে কোটার বিপরীতে যোগ্য লোক না পাওয়া গেলে সেগুলোও এই বিসিএসের মেধা তালিকা থেকে পূরণ করা হবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মুক্তিযোদ্ধা, নারী, নৃতাত্ত্বিক ইত্যাদি কোটার বিপরীতে যোগ্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না। এই কারণে পদ শূন্য থেকে যাচ্ছে। এতে সংকট তৈরি হয়েছে। এ সব পদ পূরণে মন্ত্রিসভা থেকে অনুমোদন নেওয়া হলো।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, সরকার সংরক্ষিত কোটা পূরণে বেশ আন্তরিক; কিন্তু সংরক্ষিত কোটায় জনবল না পাওয়া গেলে তা পূরণে বিকল্প ব্যবস্থা থাকা উচিত। কারণ শূন্য পদের বিপরীতে জনবল নিয়োগ দিতেই সরকারি কর্ম কমিশন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে থাকে।

যদি কাঙ্ক্ষিত জনবল নিয়োগ দেয়া সম্ভব না হয়, তাহলে ওই পদগুলো শূন্য থেকে যায়। তখন সরকারি কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। জনসাধারণ স্বাভাবিক সেবা থেকে বঞ্চিত হয়।

সেক্ষেত্রে সংরক্ষিত কোটায় জনবল না পাওয়া গেলে বিকল্প পদ্ধতিতে জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করতে মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। যদি প্রস্তাবটি অনুমোদন দেয়া হয়, তাহলে শূন্য পদগুলো সহজেই পূরণ সম্ভব হবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছর ১০ সেপ্টেম্বর পিএসসি থেকে কোটার শর্ত শিথিল করার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে। ওই অনুরোধপত্রে পিএসসি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে জানায়, মুক্তিযোদ্ধা, মহিলা ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য পদ সংরক্ষণের বিধিনিষেধ থাকায় ৬৭২ পদে কোনো জনবল নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি।

পিএসসি আরও জানায়, ২০১০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংরক্ষণে বিধিনিষেধ আরোপ করে যে আদেশ জারি করা হয়েছে, তা শিথিল করতে হবে। অর্থাৎ কোটা সংরক্ষণের যে বিধিনিষেধ রয়েছে তা শিথিলের অনুরোধ জানায় পিএসসি।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মহিলা ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য কোটা সংরক্ষণের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে কোনো আদেশ-নির্দেশ জারি করা হয়নি। শুধু মুক্তিযোদ্ধা কোটায় পদ সংরক্ষণের জন্য নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। এর আগে ৩৩তম বিসিএসে জনবল নিয়োগের সময় সংরক্ষিত কোটার যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় সরকারি কর্ম কমিশন কোটার শর্ত শিথিল করে শূন্য পদগুলো পূরণ করছে।

এরই মধ্যে সরকারি কর্ম কমিশন থেকে ৩৫তম বিসিএসে ১ হাজার ৮০৩টি শূন্য পদে জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। তার মধ্যে কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারের পদের সংখ্যা ১ হাজার ৩৪৮।

পিএসসির হিসাব মতে, শুধু ৩৫তম বিসিএসে যোগ্য প্রার্থীর অভাবে ৬০৬টি পদ শূন্য থাকছে। এর আগে ৩৪তম বিসিএসেও একই সমস্যার কারণে ৬৭২ পদে কোনো জনবল নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি।

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

মেহেদী হাসান পলাশ, Mehadi Hassan Palash
 
মেহেদী হাসান পলাশ :
বান্দরবানে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে এনজিও ব্যুরো। নির্দেশ পাওয়ার পরপরই ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম গুটিয়ে ও কার্যালয়ের আসবাবপত্র সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি। বান্দরবান ওয়ার্ল্ড ভিশন কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়স্থ এনজিও ব্যুরোর কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত পরিপত্রে বলা হয়, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের পর থেকে বান্দরবান জেলায় ওয়ার্ল্ড ভিশন আর কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। সে পত্র মোতাবেক বান্দরবান শহরের বাস স্টেশন এলাকায় অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ভিশন কার্যালয়ের যাবতীয় কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলা হচ্ছে। ঠিক কি কারণে বান্দরবানে তার কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে সে বিষয়ে কোনো পক্ষই মুখ খুলছে না।
ওয়ার্ল্ড ভিশন নামক এই এনজিওটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্রিশ্চিয়ানাইজেশন, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতায় উসকানী প্রদান, পক্ষপাতদুষ্টু কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ করে আসছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালী অধিবাসীরা। বিভিন্ন সরকারি ও গোয়েন্দা তদন্তে এর প্রমাণও মিলেছে। এ ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিও ও মিশনারী সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করা হয়েছে সেসব রিপোর্টে। সে কারণে পার্বত্য বাঙালীরা দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামের এ ধরনের এনজিওর কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার দাবি করে আসছিলো। ওয়ার্ল্ড ভিশনের বান্দরবানে ডাইরেক্ট একশন (ডাক) বা সরাসরি কর্মকাণ্ড বন্ধের নির্দেশ তারই অংশ বলে নাম না প্রকাশ করার শর্তে একটি সূত্র উল্লেখ করেছে। শুধু ওয়ার্ল্ড ভিশন নয় পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রবিরোধী কিংবা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে যুক্ত সব এনজিও ও মিশনারী সংস্থাকেই সরকার একে একে নিয়ন্ত্রেণে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে দাবি করেছে সূত্রটি।
 
ওয়ার্ল্ড ভিশনের বান্দরবান এডিপি ম্যানেজার টিমথি উজ্জ্বল কান্তি সরকার জানান, আশির দশকের আগে থেকে ওয়ার্ল্ড ভিশন বান্দরবান জেলায় জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সম্প্রতি তার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সরকার ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম নবায়ন না করে বরং  কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংস্থাটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এর ফলে ওই মেয়াদের (৩০ সেপ্টেম্বর) মধ্যেই আমরা বান্দরবানে ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলার কাজ শুরু করেছি। তিনি আরো জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিরোধিতায় সরকার ওয়ার্ল্ড ভিশনের নবায়ন বন্ধ করে দিয়েছে। সরকার বলেছে, ওয়ার্ল্ড ভিশন আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, তাই বাংলাদেশে সরাসরি সংস্থাটি কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। তবে ওয়ার্ল্ড ভিশন স্থানীয় এনজিওর সাথে পার্টনারশীপে জনহিতকর কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। জানা গেছে, ওয়ার্ল্ড ভিশনে ৮ জন কর্মকর্তা ও ৮০ জন স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে সীমিত আকারে বান্দরবান সদর উপজেলার সদর, কুহালং ও সুয়ালক এই তিনটি ইউনিয়ন ও বান্দরবান পৌরএলাকায় কৃষি বিষয়ক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিশু কল্যাণ ও দুর্যোগকালীন সেবামূলক কার্যক্রম পরিচলনা করে আসছিল। এছাড়া বিভিন্ন এলাকার ১ হাজার ২৮০ জন ওয়ার্ল্ড ভিশনের স্পন্সর ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের অর্থিক ও শিক্ষা উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করে আসছিল।
গত মঙ্গলবার সরেজমিনে বাস স্টেশন এলাকায় অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ভিশন কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তত্ত্বাবধানে সংস্থাটির আসবাবপত্র অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এসময় দেখা যায়, ওই মাঠে প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ার্ল্ড ভিশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মোতাবেক নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে অপ্রয়োজনীয় কাগজ পুড়িয়ে ফেলা হয়। তাই এসব কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে।
এদিকে ওয়ার্ল্ড ভিশনের সরাসরি কর্মকাণ্ড বান্দরবানে বন্ধ করায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে বান্দরবানের বাঙালি জনগোষ্ঠী। একই সাথে তারা কর্মকাণ্ডে লিপ্ত অন্যসব এনজিও, দাতা সংস্থা ও মিশনারী প্রতিষ্ঠানের সরাসরি কার্যক্রম শুধু বান্দরবান নয়, তিন পার্বত্য জেলাতেই বন্ধের দাবি জানিয়েছে। এ খবরে আলোচ্য বিষয় হলো, ওয়ার্ল্ড ভিশনের মতো একটি আন্তর্জাতিক এনজিও’র কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বলা সরকারি আদেশ, বড় মাপের একটি সিদ্ধান্ত। বর্তমান সরকার বলিষ্ঠতার পরিচয় দিয়ে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে। জাতীয় স্বার্থে এটি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক সিদ্ধান্ত।
 
২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উপজাতিদের ‘আদিবাসী’ বলে অভিহিত না করার জন্য একটি প্রজ্ঞাপণ জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপণের ভাষার বলিষ্ঠতা ছিল লক্ষণীয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার নানা ষড়যন্ত্রের কথা সুস্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের উপজাতিদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে আখ্যা দেয়ার অন্তর্নিহিত কারণ সেখানে চিহ্নিত করে দেশবাসী বিশেষ করে গণমাধ্যমের সাথে সংশ্লিষ্টদের ‘আদিবাসী’ শব্দ পরিহার করার জন্য অনুরোধ করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বর্তমান সরকারের এ দুটি বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত দেশব্যাপী প্রশংসিত হয়েছিল। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাঙালিরা সরাসরি সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। কিন্তু এর সুফল ঘরে তুলতে পারেনি সরকার। এর কারণ সরকারের কিছু উপদেষ্টা, মন্ত্রী, এমপি, আমলা, মহাজোটের শরীক কিছু নেতার বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড। সরকারের দায়িত্বশীল এসব ব্যক্তিবর্গ এমন কিছু বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন, যাতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারের ভাবমর্যাদা উন্নত হওয়ার পরিবর্তে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
 
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক দশমাংশ ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত। জনসংখ্যা সীমিত হলেও জনবৈচিত্র্য বাংলাদেশের অন্য যে কোনো অংশের থেকে আলাদা। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ভূ-রাজনীতিতে বিশ্বে এ অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। সমৃদ্ধ সম্পদে সে আপনা মাংসে হরিণা বৈরী। পার্বত্য চট্টগ্রাম সন্নিহিত কক্সবাজার ও এর পদচুমে বঙ্গোপসাগরের অবস্থান বিশ্বের দৃষ্টিতে লোভনীয়। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে বিশ্বশক্তির রয়েছে অনেক ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও লোলুপ দৃষ্টি। তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে সেনসেটিভ ভূখণ্ড এই পার্বত্য চট্টগ্রাম। সেকারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের কাছে, বাংলাদেশের জনগণের কাছে, সরকারের কাছে আলাদা গুরুত্বের দাবি রাখে। সঙ্গত কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যে কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত ও কর্মপরিকল্পনা হতে হবে সুচিন্তিত, সুপরিকল্পিত ও সুদুরপ্রসারী।
 
ooo 
 
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিচালিত হচ্ছে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত, এডহক নীতি ও অনেকক্ষেত্রে খামখেয়ালীপনার ভিত্তিতে। প্রেসিডেন্ট এরশাদ গুচ্ছগ্রাম সৃষ্টির সময় যেমন পুনর্বাসনের কথা চিন্তা করেননি, ঠিক তেমনি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন তৈরির সময় ১৯০০ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রণীত একটি মৃত আইন- হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়ালকে জীবিত করেছেন। এমনকি এ আইন সৃষ্টিতে রাষ্ট্রিয় সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, কর্তৃত্ব ও সংবিধানকে সুবিবেচনা করা হয়নি। সে কারণেই শান্তিচুক্তির বিরুদ্ধে দায়ের করা রিটে উচ্চ আদালত জেলা পরিষদ আইনের বেশ কিছু ধারাকে “রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র’ আখ্যা দিয়ে অসাংবিধানিক ও রাষ্ট্রবিরোধী বলে বাতিল করে দিয়েছেন। এরশাদের পর বিএনপি ক্ষমতায় এসে শান্তিচুক্তি করার জন্য কর্নেল অলি আহমদ ও রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করে জেএসএস’র সাথে আলোচনা চালিয়ে গেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে যখন সেই শান্তিচুক্তি করেছে বিএনপি তাকে ‘দেশ বিক্রির কালো চুক্তি’ বলে আখ্যা দিয়ে তারা ক্ষমতায় গেলে তা বাতিল করার ঘোষণা দিয়ে প্রবল আন্দোলন করেছে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, আওয়ামী লীগ নিজেও যখন শান্তিচুক্তি করেছে তখন সংবিধান ও সার্বভৌমত্বের চেয়ে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তিকেই হয়ত বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। ফলে আদালতের স্টে অর্ডারের স্যালাইন দিয়ে শান্তিচুক্তিকে এখন আইসিইউতে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এদিকে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় এসে কিন্তু ‘দেশ বিক্রির কালো চুক্তি’ বাতিল করেনি, বরং তারাই এচুক্তি সবচেয়ে বেশি বাস্তবায়ন করেছে।
 
‘আদিবাসী’ বিষয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে নিম্নস্তরে এক ধরনের সমর্থন ছিল সবসময়। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারেও এই ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে ‘আদিবাসী’ কনসেপ্টের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্ত অবস্থান নিয়েছে আওয়ামী লীগই। এ বিষয়ে ভারতীয় সমর্থন পাওয়ার ফলেই সরকারের পক্ষে এমন শক্ত অবস্থান নেয়া সম্ভব হয়েছে। আমাদের পার্বত্য নীতি স্পষ্ট হলে এমন অনেক আন্তর্জাতিক বন্ধু পাওয়া সম্ভব।(যদিও সিএইচটি নিয়ে ভারতের সব নীতিই আমাদের স্বার্থানুকূল হবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই)।  কিন্তু শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের নামে বিভিন্ন স্থান থেকে ঢালাওভাবে বহু নিরাপত্তা ক্যাম্প সরিয়ে নেয়ার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন কার্যত পাহাড়ী চাঁদাবাজ, অপহরণকারী ও সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি। সেকারণে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পদটি পাহাড়ীদের দখলে থাকলেও সচিব পদটিতে বাঙালি আমলার পদায়ন হয়েছে সব সময়। ফলে সরকারী কার্যক্রম ও নীতিতে এক ধরণের ভারসাম্য ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে মন্ত্রীর পাশাপাশি সচিব পদেও পাহাড়ী পদায়ন করায় পার্বত্য মন্ত্রণালয় কার্যত, একটি ভারসাম্যহীন একপেশে সাম্প্রদায়িক মন্ত্রণালয়ে পরিণত হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় রাজনীতি, সমাজব্যবস্থা, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানে।
 
এভাবেই সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারী নীতি পরিবর্তন হয়। শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, সরকারি কর্মকর্তা পরিবর্তনের সাথে সাথেও সেখানে নীতির পরিবর্তন ঘটে। এক কর্মকর্তা পার্বত্য চট্টগ্রামে ২-৩ বছরের দায়িত্ব পালনকালে যে নীতি অনুসরণ করেন পরবর্তী কর্মকর্তা এসে তা সম্পূর্ণ উল্টে দেন। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অগ্রগতি ও সহাবস্থান চরমভাবে ব্যাহত হয়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন নিয়ে সাম্প্রতিক অস্থিরতা। আদালত শান্তিচুক্তির মৌলিক ধারাগুলোর বেশিরভাগই অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দেয়ার পর ভূমি কমিশনও অসাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাতিল হয়ে যাবে, এমনটাই মতামত ছিল দেশের প্রাজ্ঞ আইনজীবীদের। বর্তমান সরকারের কতিপয় ব্যক্তির অতি আগ্রহে যখন ভূমি কমিশন একতরফাভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হয়, তখন স্বভাবতই বাঙালিরা ভূমি কমিশন বাতিলের দাবিতে তীব্র আন্দালন গড়ে তোলে। সেসময় কোনো কোনো কর্মকর্তা মনে করলেন, সরকারেরও মুখ রক্ষা করা দরকার। ব্যাস, বাঙালিদের একটি অংশের হাতে ভূমি কমিশন সংস্কার প্রস্তাবের একটি ড্রাফট তুলে দিয়ে সরকারী কর্তৃপক্ষের সাথে বৈঠকে বসিয়ে দিলেন। ফলে দেশের সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রিয় অখণ্ডতা, সংবিধান, সরকারি কর্তৃত্ব, আদালতের এখতিয়ার বিরোধী একটি প্রতিষ্ঠান বাতিল না হয়ে টিকে থাকার পথ তৈরি হলো। এ নিয়ে ইতোমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক নৈরাজ্য, বিভেদ ও দ্বন্দ্ব। এমনও দেখা গেছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্বপালনকালে কোনো এক সরকারী কর্মকর্তা পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভালবেসে এর উপর দুটি বই লিখে ফেলেন ছদ্মনামে। তথ্যবহুল ও গবেষণামূলক এই বইটি প্রচারে তখন সরকারীভাবে ব্যাপক প্রমোট করা হয়। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে এ বইটিই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। এ বইটিই অত্যন্ত মেধাবী এ কর্মকর্তার চাকুরী অবসানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণায় প্রায় সকল সরকারী অফিসেই বইটি অনুসৃত হয়। এরপর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ভালবেসে কিছু করার ক্ষেত্রে সরকারী কর্মকর্তাদের মধ্যেও এক ধরণের দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে থাকে। একটি স্থায়ী পার্বত্য নীতি না থাকার কুফল এটি।
 
সিএইচটি নিয়ে যে পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্র ভারতের সেভেন সিস্টার্সও তার অন্তর্ভূক্ত। সেটা বুঝতে পেরেই ভারত সরকার সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোতে পাশ্চাত্যের আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার সরাসরি কার্যক্রম বা ডাইরেক্ট একশন (ডাক) বন্ধ করে দিয়েছে।  সেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়নে কার্যক্রম পরিচালনা করে ভারত সরকার বা ভারতীয় এনজিও। কিন্তু বাংলাদেশে এসব আন্তর্জাতিক এনজিও, দাতা সংস্থা ও মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি কার্যক্রম পরিচালনা করে। তাদের কার্যক্রম ও অর্থ পরিচালনার কোনো হিসেব বাংলাদেশ সরকারকে দেয় না। এমনকি তাদের মিটিংগুলোতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদের ঢুকতে দেয় না। কেউ ঢুকলেও পরিচয় পেলে অপমান করে বের করে দেয়। সে ক্ষেত্রে বান্দরবানে ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ ইতিবাচক। অন্যান্য এনজিও ও দাতা সংস্থার ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা কাম্য। অথচ একই সময়ে সরকারের কোনো কোনা মন্ত্রী ইউএনডিপির মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে বহুল বিতর্কিত দাতা সংস্থার কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধির জন্য ডিও লেটার পাঠাচ্ছে তাদের আবাসিক কার্যালয়ে এবং তা সাথে সাথে গৃহীতও হয়েছে। একটি স্থায়ী পার্বত্য নীতির অভাবেই এমনটি ঘটছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী-বাঙালি বিভেদের কথাই কেবল দেশবাসী জেনে আসছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আট লক্ষাধিক উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বড়জোর হাজার দশেক লোক এই বিভেদের সাথে জড়িত। এরা ইউপিডিএফ, জেএসএস’র সন্ত্রাসী ও মতলববাজ এনজিও কর্মী। বাকি সকল উপজাতি সদস্য কিন্তু শান্তিপ্রিয়, পাহাড়ী বাঙালি সহাবস্থানে বিশ্বাসী ও দেশপ্রেমিক। কিন্তু মুষ্টিমেয় সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের মুখে তারা বাধ্য হয় সন্ত্রাসীদের সেখানো বুলি প্রচার করতে, তাদের গাইডেড পথে চলতে। অথচ এই সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্র বিশেষে তারা বাঙালীদের থেকেও বেশি ঘৃণা করে। কারণ বাঙালিদের থেকে তারা আরো বেশি সন্ত্রাসের/ চাঁদাবাজির শিকার। সিএইচটিতে কর্মরত এনজিও কর্মীরা নানা কায়দার বিভেদ ছড়িয়ে দিয়ে একটি বাঙালী বিদ্বেষী প্রজন্ম সৃষ্টি করতে অপচেষ্ট। অথচ এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শান্তিপ্রিয় দেশপ্রেমিক উপজাতিদের নিরাপত্তা দিয়ে, ভালবেসে কাছে টানা হয়নি কখনো।বরং উপজাতি বলে সন্ত্রাসীদের পাল্লায় তুলে কেবল দূরেই ঠেলে দেয়া হয়েছে। সেখানে বিভেদের দশভূজা জাগ্রত কিন্তু শান্তির বীণাপাণি নিদ্রা যায়। কোনো কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে সরকারী পৃষ্টপোষকতায় সম্প্রীতি মিছিল চোখে পড়লেও সরকারী লোকেরা যেভাবে সে মিছিল চারপাশ থেকে ঘিরে রাখে তাতে সম্প্রীতির থেকে সংশয় চোখে পড়ে বেশী।
 
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বিভ্রান্তি দেশের বুদ্ধিজীবী মহলের মধ্যে বেশি। এদের বেশিরভাগই মনে করেন বাঙালি ও সেনাবাহিনী সেখানে যত সমস্যার মূল। সন্দেহ নেই, তাদের বিভ্রান্তি ভিত্তিহীন। কিন্তু সে বিভ্রান্তি অপনোদনের চেষ্টা রাষ্ট্রিয় পর্যায় থেকে কি যথাযথভাবে নেয়া হয়েছে? ঘটনার প্রেক্ষিতে মাঝে মাঝে সেখানে মিডিয়া টিম পাঠানো হয়, বুদ্ধিজীবীদের কাউকে অনুরোধ করে লেখানো হয়। কিন্তু এ দেশের কতজন মানুষ জানে পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন প্রেক্ষাপটে বাঙালিদের পাঠানো হয়েছে? কতজন জানে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি অবস্থানের গুরুত্ব? কতজন জানে সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে আসলে কি করে? তাদের সেবা, ত্যাগ, কমিটমেন্টের কথা কতো জনের মাঝে তুলে ধরা হয়েছে? কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবদান নিয়ে বলিউডে অনেক সিনেমা হয়েছে, হলিউডের কথা বললে তো একটি বই লেখা হয়ে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগের অনেক ঘটনা গল্প ও ছবিকে হার মানায়। কিন্তু তার কথা দেশের কতজন মানুষ জানে। একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি না থাকার কারণেই তা সম্ভব হয়নি।
 
কাজেই বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থির পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনো এডহক সিদ্ধান্তে সমাধান না খুঁজে একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি প্রণয়নের দিকে বেশি জোর দিতে হবে। সেখানে বসবাসকারী সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ,  সিভিল ও সামরিক প্রশাসন, বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিটির মাধ্যমে এ পার্বত্যনীতি প্রণয়ন করতে হবে- যা সব সরকার ও সব ব্যক্তির জন্য অনুসরণযোগ্য ক্ষেত্র বিশেষে বাধ্যতামূলক করতে হবে। এখনই সময়। কারণ লেটার ইজ বেটার দ্যান নেভার।  
Email:palash74@gmail.com, সৌজন্যে- দৈনিক ইনকিলাব। (ইষৎ পরিবর্তিত)

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

 

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

মেহেদী হাসান পলাশ, Mehadi Hassan Palash

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক-২

মেহেদী হাসান পলাশ

আদিবাসী বিষয়ে আভিধানিক সংজ্ঞার বাইরে জাতিসংঘের তরফ থেকে একটি সংজ্ঞা আমরা পেয়ে থাকি। এ বিষয়ে জাতিসংঘ ও এর অধিভূক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে এ পর্যন্ত প্রধানত: তিনটি চার্টারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এগুলো হলো: ১৯৫৭ সালের ৫ জুন অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের অধিভূক্ত প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ৪০তম অধিবেশনে প্রদত্ত-  Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107),  আইএলও’র ১৯৮৯ সালের ৭ জুন অনুষ্ঠিত ৭৬তম অধিবেশনে প্রদত্ত-Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169) ,  এবং ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে  The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples.
এখানে আইএলও’র প্রথম চার্টার দুটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। চার্টার দুটির শিরোনাম হচ্ছে- Indigenous and Tribal Populations Convention . অর্থাৎ আদিবাসী ও উপজাতি জনগোষ্ঠী  বিষয়ক কনভেনশন। অর্থাৎ এই কনভেনশনটি আদিবাসী ও উপজাতি বিষয়ক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। কনভেনশনে পাস হওয়া ধারাগুলো একই সাথে আদিবাসী ও উপজাতি  নির্ধারণ ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। শুধু আদিবাসীদের নয়। অথচ বাংলাদেশে এই চার্টারকে আদিবাসীদের জন্য এক্সক্লুসিভ করে উপস্থাপন করা হয়।

এখানে উপজাতি ও আদিবাসীদের জন্য আলাদা সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে।-  Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)–  এর আর্টিকল ১ এর (a)তে ট্রাইবাল বা উপজাতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘tribal peoples in independent countries whose social, cultural and economic conditions distinguish them from other sections of the national community, and whose status is regulated wholly or partially by their own customs or traditions or by special laws or regulations’’. অর্থাৎ  একটি দেশের মূল জনগোষ্ঠী থেকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্নতর যারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও আইন দ্বারা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে পরিচলিত তাদেরকে উপজাতি বলা হয়। এখন আইএলও’র এই সংজ্ঞাটি যদি আমরা বাংলাদেশের চাকমা, মারমা, সাঁওতাল ও অন্যান্য সাবস্পেসিসসমূহের সাথে বিচার করি তাহলে পরিষ্কার বোঝা যায় এরা উপজাতি। কিন্তু বাংলাদেশের মতলববাজ বুদ্ধিজীবীরা আইএলও কনভেনশনের আর্টিকল ১-এ্র উপস্থাপিত ট্রাইবাল ডেফিনেশনটি সম্পূর্ণ চেপে গিয়ে শুধু ইনডিজিন্যাসের সংজ্ঞাটি উপস্থাপন করে।

এখন আমরা ইনডিজিন্যাসের সংজ্ঞাটি বিশ্লেষণ করবো।  Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)– এর আর্টিকল ১-এর (b)তে ইনডিডজিন্যাস বা আদিবাসীর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, `peoples in independent countries who are regarded as indigenous on account of their descent from the populations which inhabited the country, or a geographical region to which the country belongs, at the time of conquest or colonization or the establishment of present state boundaries and who, irrespective of their legal status, retain some or all of their own social, economic, cultural and political institutions’.
অর্থাৎ আদিবাসী তারা যারা একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস করছে বা অধিকৃত হওয়া ও উপনিবেশ সৃষ্টির পূর্ব থেকে বসবাস করছে। এবং যারা তাদের কিছু বা সকল নিজস্ব সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত অধিকার ও প্রতিষ্ঠানসমূহ ধরে রাখে।
আইএলও কর্তৃক উপজাতি ও আদিবাসী সংজ্ঞার মূল পার্থক্য হচ্ছে নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস বা অধিকৃত হওয়ার বা উপনিবেশ সৃষ্টি পূর্ব থেকে বসবাস। বাকি শর্তগুলো মোটামুটি এক। অর্থাৎ একজন উপজাতি আদিবাসী হবেন বা হবেন না উপরোক্ত শর্তের ভিত্তিতে। এছাড়াও রয়েছে ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples চার্টার। এটি এক্সক্লুসিভলি আদিবাসীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট, উপজাতিদের নয়।

Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107)-  ১৯৫৭ সালে পাস হলেও এ পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২৭টি দেশ এই কনভেশন র‌্যাটিফাই করেছে। ১৯৭২ সালের ২২ জুন বাংলাদেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। বাংলাদেশের বাইরে উপমহাদেশের পাকিস্তান ও ভারত এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। যদিও এরই মধ্যে ৮টি দেশ এই কনভেনশকে নিন্দা করে তা থেকে বেরিয়ে গেছে। অন্য দিকে  Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)- – ১৯৮৯ পাস হলেও এখন পর্যন্ত বিশ্বের  মাত্র ২২টি দেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। এরমধ্যে কনভেনশন-১০৭ থেকে বেরিয়ে আসা ৮টি দেশও রয়েছে। উপমাহদেশের একমাত্র নেপাল ছাড়া আর কোনো দেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেনি। কনভেনশন- ১৬৯ অবশ্য ১০৭-এর মডিফিকেশন, তবুও তা আলাদা করে র‌্যাটিফিকেশন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক চার্টার কোনো দেশ র‌্যাটিফাই না করলে তা তার জন্য প্রযোজ্য নয়। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, আইএলও কনভেনশন ১০৭ ও ১৬৯ যে দেশগুলো র‌্যাটিফাই করেছে তাদের বেশিরভাগই আফ্রিকান ও দক্ষিণ আমেরিকান দেশ যাদের প্রধান বা অন্যতম প্রধান জনগোষ্ঠী বা গোষ্ঠীগুলো আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃত।
অন্যদিকে ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক একটি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এ ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করলে ১৪৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪টি দেশ বিপক্ষে, ১১টি দেশ ভোট দানে বিরত এবং ৩৪টি দেশ অনুপস্থিত থাকে। ভোট দানে বিরত থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিরুদ্ধে ভোট দেয়া দেশগুলো হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যাণ্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় খুব সোচ্চার ও পৃষ্টপোষক দেশগুলোর বেশিরভাগই কিন্তু নিজ দেশের জন্য আইএলও কনভেনশন ১০৭, ১৬৯ ও জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক চার্টারের সিগনেটরি বা ভোটদানকারী নয়। এ থেকেই নিজ দেশের আদিবাসীদের জন্য তাদের নিজেদের অবস্থান এবং অন্যদেশের ‘আদিবাসীদের’ জন্য কুম্ভিরাশ্রু বর্ষণের কারণ ও মতলব পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। উল্লিখিত চারটি দেশ শুধু ইউএন চার্টারের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে তাই নয় বরং অধিবেশনে তাদের প্রতিনিধিরা এই চার্টারের প্রবল সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছে।

এখন বিবেচনা করা যাক, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীসমূহ বাংলাদেশের বর্তমান ভূখণ্ড অধিকৃত হওয়ার পূর্ব থেকে বা প্রি-কলোনিয়াল কি-না? তবে এ আলোচনার পূর্বে একটি বিষয় নির্ধারণ করা জরুরি যে, বিবেচনাটি কি সম্পূর্ণ বাংলাদেশ ভূখণ্ডের উপর হবে, না বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ভিত্তিক হবে। কারণ অঞ্চলভিত্তিক হলে সেন্টমার্টিন দ্বীপে যিনি প্রথম বসতিস্থাপন করেছেন তিনিও বাংলাদেশের আদিবাসী। এবং আগামীতে যদি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে নতুন কোনো দ্বীপ সৃষ্টি হয় আর সেই দ্বীপে যারা বা যিনি নতুন বসতি গড়বেন তিনিও আদিবাসী হবেন। একইভাবে ঢাকার আদি বাসিন্দা যারা তারাও বাংলাদেশের আদিবাসী এবং যেসকল উপজাতি ঢাকায় নানাভাবে স্যাটেল করেছেন তারা স্যাটেলার। কারণ এই সংজ্ঞার উপাদানগুলো ইংলিশ OR  শব্দদ্বারা বা অথবা শব্দ দ্বারা বিভক্ত।
আর যদি সমগ্র বাংলাদেশ ভূখ- ধরা হয়, তবে বাংলাদেশের প্রথম উপনিবেশকারী হচ্ছে আর্যজাতি। আর্যরা উত্তর বঙ্গ দিয়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে। তখন বাংলাদেশ ভূখণ্ডে চাকমা, মারামা, গারো, হাজং, সাঁওতাল কারো অস্তিÍত্ব ছিল না। অর্থাৎ আর্যদের আগমনের পূর্বে এখানে যে অনার্য জনগোষ্ঠী বসবাস করতো তারা প্রি-কলোনিয়াল। আর্যদের আগমণের পূর্বে এখানকার অনার্য বাসিন্দারা প্রাকৃত ধর্মে বিশ্বাসী ছিল। আর্যদের প্রভাবে তারা সনাতন ধর্ম গ্রহণ করে। পরবর্তীতে হিন্দু রাজাদের নিকট থেকে বাংলা বৌদ্ধ রাজাদের দখলে যায়। বাংলাদেশে বৌদ্ধদের ইতিহাস সমৃদ্ধির ও গৌরবের ইতিহাস। বাংলা সাহিত্যের আদি কিতাব চর্যাপদ তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। পাল রাজারা বাঙালি ছিলেন, যেমন ছিলেন মহামতি অতীশ দীপঙ্কর। বাংলায় বৌদ্ধদের ইতিহাস আর চাকমাদের ইতিহাস এক নয়।

অন্যদিকে উয়ারী বটেশ্বরের সমৃদ্ধ নাগরিক সভ্যতার কথা কিম্বা মেগাস্থিনিস ও টলেমির কিতাবে গ্রীক বীর আলেকজাণ্ডরের মনে ভীতি ছড়ানো গঙ্গরিড়ঢ়ী সভ্যতার কথা যারা জানেন তারা কখনোই চাকমা মারমা সাঁওতালদের প্রি-কলোনিয়াল বলতে পারেন না। চাকমাদের আলোচনায় অনেকে বৌদ্ধ-মুসলিম ইতিহাস টানেন যা অপ্রয়োজনীয় কুতর্ক। সেন রাজাদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে বাংলায় মুসলিম আগমন বৌদ্ধ সম্প্রদায় কর্তৃক স্বাগত হয়েছিল। এক কথায় বাংলাদেশের প্রি কলোনিয়াল জনগোষ্ঠী হচ্ছে এখানকার অনার্য জনগোষ্ঠী, ইতিহাসবিদরা যাকে প্রাকৃতজন বা প্রাকৃত জনগোষ্ঠী বলে আখ্যা দিয়েছেন। শত শত বছর ধরে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিস্টান নানা ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যদিয়ে পরিবর্তিত হয়ে নানা ধর্মে বিভক্ত হয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি পরিচয়ে টিকে থাকা মূল জনগোষ্ঠী।

এখন খুব সংক্ষেপে আইএলও কনভেনশনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্য, আইন ও রাজনৈতিক বিষয়ের দিকে আলোকপাত করা যাক। বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীগুলো শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক ও আইনি কাঠামো মেনে চলছে না। একই সাথে পরির্বতন এসেছে ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ধারাতেও। রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের রাজনৈতিক অবস্থানেরও পরিবর্তন হয়েছে। শুরুতেই চাকমাদের নিয়ে কথা বলা যায়। চাকমাদের নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক কাঠামো কোনো কালে ছিল বলে ইতিহাসে প্রমাণিত নয়। বর্তমানে চাকমারা প্রাচীনকালের বিভিন্ন চাকমা রাজার নানা বীরত্বগাথার কথা বলে থাকেন। চাকমাদের লেখা বইতেই বলা হচ্ছে, এগুলো কিংবদন্তী। কিংবদন্তী ইতিহাসের উপাদান হিসেবে গণ্য হতে পারে কিন্তু ইতিহাস হিসেবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত নয়। মোগল আমলে বিভিন্ন মুসলিম নামধারী চাকমা রাজার ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু তারা মোগল সুবাদার, চাকমা নয়। চাকমারা তাদের রাজা মেনে নিয়েছিল ও মানতে বাধ্য হয়েছিল। আজকের চাকমা রাজার কাঠামোটি ব্রিটিশদের দেয়া। এর প্রকৃত নাম সার্কেল চিফ। কার্যত তা কালেক্টর বা প্রধান খাজনা আদায়কারী। মোগল বা ব্রিটিশরা তাদের রাজা বলে কোনো সনদ দেয়নি। ব্রিটিশ সরকার সমতলের জমিদারদের জমিদারী দিলেও সার্কেল চিফদের জমির মলিক ছিল ডিস্ট্রিক্ট সুপরিন্টেন্ড তথা সরকার। কিন্তু খাজনা আদায়ের দায়িত্ব পেয়ে চাকমা সার্কেল চিফ নিজেকে সামন্ত রাজায় পরিণত করেন খাজনা আদায়ের নানা আচার যোগ করে। সাম্যবাদী এমএন লারমা শুরুতে এই সামন্ততন্ত্রের শোষণ থেকে উপজাতীয় জনগণকে মুক্তি দিতে সমাজতান্ত্রিক (বামধারা) আন্দোলন শুরু করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু সাংবিধানিক ভুল না করলে এমএন লারমাকে বিশ্ব হয়তো সাম্যবাদী নেতা হিসেবেই চিনতো। কিন্তু ’৭২-এর সংবিধান ইতিহাসের গতি পাল্টে দিলেও সন্তু লারমা ও দেবশীষ রায়ের সেই দূরত্ব এখনো বিদ্যমান ভেতরে ভেতরে। কিন্তু এমএন লারমার প্রতিষ্ঠিত জেএসএস বা পরবর্তীকালের ইউপিডিএফ কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর রাজনৈতিক কাঠামো নয়, এটি অঞ্চলভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামো। তাছাড়া সকল উপজাতি সম্প্রদায়ের লোকেরাই এখন বিএনপি, আওয়ামী লীগের মতো বাংলাদেশের মূল ধারার রাজনীতির সাথে জড়িত। এভাবেই চাকমা সমাজদেহেও নানা পরিবর্তন এসেছে।

অন্যদিকে উপজাতীয় সংস্কৃতি প্রধানত ধর্ম থেকে উৎসারিত। কিন্তু বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা বাদে অন্যান্য উপজাতীয় জনগোষ্ঠী গড়ে ৯০ ভাগ ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে। মারমা ও ত্রিপুরাদের মধ্যেও প্রায় ৫০ ভাগ খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে। চাকমাদের ক্ষেত্রে এই হার কিছুটা কম। কিন্তু চাকমাদের আদি ধর্ম বৌদ্ধ নয়। ব্রিটিশ আমলে রানী কালিন্দী রায়ের বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করার আগে চাকমা রাজারা মুসলমান ছিল। মোগল আমলের পূর্বে তাদের নিজস্ব ধর্ম পালন করতো। এভাবে ধর্ম পরিবর্তনের সাথে সাথে উপজাতি জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচার, রীতিতে পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষা, অর্থনীতি ও প্রযুক্তির প্রভাবেও পাল্টে গেছে জীবনযাপনও। কয়েকটি অনুষ্ঠান ছাড়া নাগরিক ও সচ্ছল উপজাতিদের নিজস্ব পোশাকের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায় না। সেখানকার মিশনারীরাও ধর্মান্তরিত উপজাতিদের পূজা আর্চায় বাধা দেয় না ‘আদিবাসী’ তকমা ধরে রাখার জন্য।

মাইকেল সঞ্জীব দ্রং আদিবাসী নেতা হতে পারেন কিন্তু কোনো উপজাতি যদি ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেন তাহলে তিনি আদিবাসী হওয়ায় যোগ্যতা হারান। যদিও খ্রিস্ট ও বৌদ্ধ ধর্ম সংখ্যাতাত্তিক বিচারে ইসলামের থেকে বৃহৎ ধর্ম। একইভাবে নিজস্ব বর্ণমালার কথা বলে বাংলা বর্ণমালা বর্জন করলেও ইউরোপীয় বর্ণমালাতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। যদি আদিম পদ্ধতিতে জীবনযাপনের কথা বলা হয়, তাহলে পৃথিবীর আদিম পেশা হচ্ছে কৃষি ও শিকার। সে বিচারে বাংলার কৃষক ও জেলেদের আদিবাসী বলতে হয়। এককথায় সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিচারেও বাংলাদেশের উপজাতিরা আদিবাসী নয়।

এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি জনগোষ্ঠীর একটা বিপুল অংশ নিজেদের আদিবাসী মনে করেন না। পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফ এই আদিবাসী তত্ত্বে বিশ্বাসী নয়। তারা আদিবাসী দিবস পালনও করে না। ইউপিডিএফ’র অন্যতম শীর্ষ নেতা উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা এক সাক্ষাৎকারে আমাকে একথা পরিষ্কার করে বলেছিলেন তারা আদিবাসী কনসেপ্টে বিশ্বাসী নন। তবে উপজাতি শব্দের প্রতিও তাদের আপত্তি আছে। তাদের মতে বাংলাদেশে অনেক জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে। যেমন বাঙালি একটি জাতি তেমনি চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা প্রভৃতিও এক একটি জাতি। সন্তু লারমার ঘনিষ্ঠদের সাথে কথা বলে জেনেছি, তিনিও শুরুতে এই আদিবাসী কনসেপ্টের সাথে একমত ছিলেন না। এখনও তার কাছে এটি মুফতে পাওয়ার মতো একটি বিষয়। আদিবাসী বিষয়টি একান্তভাবে সার্কেল চীফ দেবাশীষ রায়ের কনসেপ্ট।

কাজেই জাতিসংঘ ও আইএলওর সংজ্ঞার অপব্যাখ্যা বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীদের আদিবাসী বানানোর কোনো সুযোগ নেই। বরং ওইসব কনভেনশন ও চার্টার অনুযায়ী ট্রাইবাল বা উপজাতির যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা বিচার করেই নিশ্চিতভাবে বলা যায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো উপজাতি। একই কারণে আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘ চাটার বাংলাদেশের উপজাতিদের জন্য প্রযোজ্য নয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের উপজাতিদের আদিবাসী হিসেবে মেনে নিলে সমস্যা কোথায়? কিম্বা এই আদিবাসী বিতর্কের সমাধানই বা কিভাবে সম্ভব? সেটা এক বিস্তর আলোচনা হবে অন্য কোনো দিন।

সৌজন্যে- দৈনিক ইনকিলাব।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

 

 

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

মেহেদী হাসান পলাশ, Mehadi Hassan Palash

মেহেদী হাসান পলাশ

আগামীকাল ৩ আগস্ট এ বছরের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের মূল অনুষ্ঠান পালিত হবে বাংলাদেশে। ঈদের ছুটির কারণে কেন্দ্রীয়ভাবে ৯ আগস্টের বদলে আদিবাসী দিবসের কর্মসূচি কিছুটা এগিয়ে এনে পালন হচ্ছে। জাতিসংঘ ঘোষিত আদিবাসী দিবসে এবারের শ্লোগান হচ্ছে, “আদিবাসী জাতিসমূহের অধিকার সংক্রান্ত সকল চুক্তি ও অঙ্গীকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন!”

ঢাকা রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে দিবসের কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন রাশেদ খান মেনন, এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন আদিবাসী ফোরামের সভাপতি ও পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা।

বিশ্ব আদিবাসী দিবসকে সামনে রেখে আবার নতুন করে আলোচিত হচ্ছে বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্কটি। বাংলাদেশে আদিবাসী কারা- এই বিতর্কটি খুব প্রাচীন নয়, বড়ো জোর এক দশকের। ইস্যুটি পুরাতন না হলেও তা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাস, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বকে নাড়া দিয়েছে। জাতীয় সংহতির প্রশ্নে তাই এ বিতর্কের আশু সমাধান জরুরি।

বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর যে অংশটি নিজেদের হঠাৎ আদিবাসী বলে দাবী করতে শুরু করছে তারা কিন্তু বছর দশেক আগেও নিজেদের এ পরিচয়ে পরিচিত করাতে চায়নি। উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা বা নিজ জাতির পরিচয়েই তারা পরিচিত হতে চেয়ে দাবী করে আসছিল দীর্ঘ দিন ধরে। এরকম হঠাৎ করে আদিবাসী হয়ে যাওয়ার নজির বিশ্বে আর নেই। আদিবাসী জনগোষ্ঠী হিসাবে বিশ্বে যারা সুপরিচিত, যেমন, অস্ট্রেলিয়ার এবরিজিন, যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ান, নিউজিল্যান্ডের মাউরি, দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা প্রভৃতি সুপ্রাচীন কাল থেকেই আদিবাসী হিসেবে বিশ্বে সুপরিচিত। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কিছু অংশ যারা ১৯৯৭ সালেও নিজেদের উপজাতি বলে জাতীয়ভাবে পরিচিত করিয়েছে তারা হঠাৎ করে সেলফ প্রমোশন নিয়ে একবিংশ শতকের শুরু থেকে নিজেদের আদিবাসী বলে দাবী করতে শুরু করে। এমনকি দেশের মধ্যে বসবাসকারী যাযাবর ও তফসিলী সম্প্রদায়গুলোকেও তারা আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত করে নিয়েছে। আর এভাবে দাবী করা হচ্ছে বাংলাদেশে ৭৫টি (মতান্তরে ৪৫টি) আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে।

বাংলাদেশের  আত্মঘাতী মিডিয়া ও সুশীল সমাজের একটি অংশের জোরালো সমর্থন ও আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে তারা এরই মধ্যে সরকারের উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে একক বাঙালী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী সরকারও তাদের দাবীর কাছে আংশিক নতি স্বীকার করে সংবিধানে তাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আর এই সুযোগে তফসিলী সম্প্রদায়ভুক্ত জনগোষ্ঠী (উপজাতি বা ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা হবার বৈশিষ্ট্যধারী নয়) নিজেদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা হিসেবে স্বীকৃতি মুফতে পেয়ে গেছে। অথচ একই জনগোষ্ঠীগুলো মূল অংশ ভারতে এখনো সাংবিধানিকভাবে তফসিলী সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত ও সুবিধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।

আদিবাসী বিতর্কের সমাধানে প্রথমেই আমাদের আদিবাসীর সংজ্ঞা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। আদিবাসী বিষয়ে দুধরণের সংজ্ঞা পাওয়া যায়। একটি আভিধানিক সংজ্ঞা এবং অন্যটি জাতিসংঘের অধীনস্ত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত সংজ্ঞা- যা জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত। প্রথমেই আমরা আভিধানিক সংজ্ঞা নিয়ে আলোচনা করতে পারি।

 আদিবাসীর সংজ্ঞা কী?

আদিবাসী শব্দের ইংলিশ প্রতিশব্দ Indigenous people.  অনেকে আদিবাসী শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে Aborigine ব্যবহার করেন। কিন্তু Aborigine বলতে সার্বজনীনভাবে আদিবাসী বোঝায় না। Aborigine বলতে সুনির্দিষ্টভাবে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের বোঝায়। অক্সফোর্ড ডিকশনারীতে Aborigine  শব্দের অর্থ বলা হয়েছে Ôa member of a race of people who were the original living in a country, especially AustraliaÕ. একইভাবে Red Indian বলতে মার্কিন আদিবাসীদের বোঝায়, অস্ট্রেলীয় Aborigine বা আদিবাসীদের বোঝায় না। এ ছাড়াও বিভিন্ন ডিকশনারীতে আদিবাসী বিষয়ে যে সংজ্ঞা ও প্রতিশব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা নিম্নরূপ:

Aborigine: noun. a member of a race of people who were the original living in a country, especially Australia. Indigenous: belonging to a particular place rather than coming to it from some where else. Native. The indigenous people/ indigenous area. Aborigine: earliest. Primitive. Indigenous. Indigenous: adj. Native born or produced naturally in a country, not imported (opposite to exotic).

 অন্যদিকে বাংলা একাডেমীর অভিধানে Indigenous শব্দের অর্থ বলা হয়েছে: দেশী, দৈশিক, স্বদেশীয়, স্বদেশজাত। কোলকাতা থেকে প্রকাশিত সংসদ অভিধানে Indigenous শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে, স্বদেশজাত, দেশীয়। আবার চেম্বার্স ডিকশনারীতে Indigenous শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে, native born, originating or produced naturaly in a country, not imported. একই ডিকশনারীতে Indigenous শব্দের বিপরীত শব্দ হিসেবে exotic শব্দটিকে ব্যবহার করা হয়েছেÑ যার অর্থ বহিরাগত। অর্থাৎ অভিধানিকভাবে আদিবাসী শব্দের অর্থ দেশী, স্বদেশজাত বা ভূমিপুত্র।

 এখন ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার বাংলাদেশে যারা নিজেদের আদিবাসী বলে দাবী করছেন তারা কতোটা ‘স্বদেশজাত’ বা ‘ভূমিপুত্র’।

ইতিহাসের এই বিশ্লেষণে দেশী বিদেশী অনেক পুস্তকের রেফরেন্স নেওয়া যায়, কিন্তু এ আলোচনায় মাত্র দুটি পুস্তককে রেফরেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হলো। এর একটি হলো বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রণীত বাংলা পিডিয়া এবং বাংলাদেশ আদিবাসী অধিকার আন্দোলন কর্তৃক প্রণীত বাংলাদেশের আদিবাসীঃ এথনোগ্রাফীয় গবেষণা।

এ বই দুটি নির্বাচনের কারণটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাপিডিয়াতে এ সংক্রান্ত এন্ট্রির শিরোনাম ‘আদিবাসী’- রচয়িতা বাংলাদেশের আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক, আদিবাসী বিষয়ক জাতীয় কোয়ালিশনের মুখপাত্র, আন্তর্জাতিক সিএইচটি কমিশনের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল। অন্যদিকে দাতা সংস্থা অক্সফামের সহায়তায় বাংলাদেশের আদিবাসী অধিকার আন্দোলন কর্তৃক প্রকাশিত তিন খণ্ডের বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা বইটির প্রথম খণ্ডের গবেষণা ও সম্পাদনা করার কাজটি করেছেন, মঙ্গল কুমার চাকমা, জেমস ওয়ার্ড খকশী, পল্লব চাকমা, মংসিংঞো মারমা, হেলেনা বাবলি তালাং। পুস্তকটির ৫ সদস্যের রিভিউ কমিটির মধ্যে আছেন বাংলাদেশে আদিবাসী আন্দোলনের প্রবর্তক ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায় এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিব দ্রং। লেখার পরিসর চিন্তা করে এ লেখায় শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠিগুলোর ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হলো।

 চাকমা

1356_487607401320978_1904084497_n

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ভিন্ন ভাষাভাষী আদিবাসী দাবীদার জুম্ম জনগোষ্ঠীর অন্যতম চাকমা জনগোষ্ঠী।  তিন পার্বত্য জেলাতেই চাকমাদের বসবাস রয়েছে। চাকমারা বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী উপজাতীয় জনগোষ্ঠী। তবে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় সবচেয়ে অধিক চাকমা বসবাস করে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিন পার্বত্য জেলায় চাকমাদের  মোট জনসংখ্যা ২,৩৯,৪১৭ জন । ঐ সময় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ভারতের  ত্রিপুরা  রাজ্যে প্রায় ৬০ হাজার চাকমা শরণার্থী হিসেবে অবস্থান করছিল বলে অভিযোগ করা হয়ে থাকে- যাদের গণনায় অর্ন্তভুক্ত করা হয়নি। বাংলাপিডিয়া মতে, আনুমানিক ১৫৫০ খ্রিষ্টব্দের দিকে পর্তুগিজ মানচিত্র প্রণেতা লাভানহা অঙ্কিত বাংলার সর্বাপেক্ষা পুরাতন ও এ পর্যন্ত অস্তিত্বশীল মানচিত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই চাকমাদের সম্পর্কে উল্লেখ পাওয়া যায়। কর্ণফুলীর নদীর তীর বরাবর চাকমাদের বসতি ছিল। চাকমাদের আরো আগের ইতিহাস সম্পর্কে দুটি তাত্ত্বিক অভিমত প্রচলিত। উভয় অভিমতে মনে করা হয়, চাকমারা বাইরে থেকে এসে তাদের বর্তমান আবাসভূমিতে বসতি স্থাপন করে। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তাত্ত্বিক অভিমত অনুযায়ী, চাকমারা মূলত ছিল মধ্য মায়ানমারের আরাকান এলাকার অধিবাসী। তবে বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে, কিংবদন্তী অনুযায়ী অতীতে চাকমারা চম্পকনগর নামে একটি রাজ্যে বাস করত। চম্পক নগর ত্রিপুরা রাজ্যেরই কাছাকাছি কোন জায়গায় অবস্থিত ছিল।  এ ব্যাপারে নানা সাক্ষ্যও পাওয়া যায়। অশোক কুমার দেওয়ানের অনুমানে উত্তর ত্রিপুরার কোন স্থানে বসবাসকারী চাকমারা সেখানে আনুমানিক দুশ থেকে আড়াইশ বছর কাল অতিবাহিত করার পর পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে উত্তর ত্রিপুরা থেকে দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পূর্বদিকে সরে আসতে থাকে এবং পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকেই পার্বত্য চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এবং তার উপনদীসমূহের উপত্যকা ভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে। এই হিসাব অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমাদের আগমন ৫০০ বছরের বেশি নয়।

চাকমা রাজবংশের ইতিহাস অনুযায়ী বিজয়গিরিকে ১ম রাজা ধরলে ৩২/৩৩ তম রাজা হচ্ছেন অরুণযুগ (ইয়াংজ )। তার শাসনকাল আনুমানিক ১৩১৬ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১৩৩৩ খ্রিষ্টাব্দ। চাকমা ঐতিহাসিকদের মতে অরুণ যুগের পতনের পরপরই অর্থাৎ ১৩৩৩ খ্রিষ্টাব্দে চাকমারা বার্মা থেকে চট্টগ্রামে বা পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমন করেন ।

খুমি

পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি এই তিন উপজেলায় খুমীরা বসবাস করে। ২০০৬ সালে সিঅং খুমী ( একজন সাংস্কৃতিক কর্মী) এর নেতৃত্বে এক জরিপ পরিচালনা হয়েছিল। সে জরিপ অনুযায়ী খুমী জনসংখ্যা  ছিল ২০৯৪ জন ।

বাংলাপিডিয়া মতে, সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিকে খুমিরা আরাকান থেকে বাংলাদেশে আসে। খ্যাং উপজাতি তাদেরকে আরাকান থেকে বিতাড়ন করে। তবে এখনো কিছু খুমি আরাকানের কোলাদাইন নদীর তীরে বসবাস করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে, খুমি আদিবাসীরা মূলত মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীভুক্ত একটি দল। তারা তিব্বতি বার্মিজ-কুকি-চীন ভাষায় কথা বলে। বাংলাদেশে খুমি নৃ-গোষ্ঠীর আগমন বার্মার চীন প্রদেশ থেকে। এই চীন হিলস প্রদেশ ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭ সালে আরাকান প্রদেশ থেকে আলাদা হয়ে নামকরণ করা হয় চায়না হিলস। অনেকের মতে, সতের শতকের মাঝামাঝি সময়ে খুমীরা চায়না হিল (তৎকালীন সময়ে আরাকান প্রদেশ নামে পরিচিত) থেকে এসে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করে। খুমি আদিবাসীরা সার্মথাং(Samthang) গোত্রের পূর্ব-পুরুষদের মৌখিক (অলিখিত) ইতিহাস থেকে জানা যায় যে খুমিরা বাংলাদেশে আট পুরুষ(বংশধর) ধরে বসবাস করছে ।

চাক

বান্দরবান পার্বত্য জেলার ৭টি উপজেলার মধ্যে সর্বদক্ষিণ প্রান্তে মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশের সীমানা বরাবর অবস্থিত নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় চাকদের আবাসস্থল। ১৯৯১ সালের আদমশুমারী প্রতিবেদন অনুসারে চাকদের লোকসংখ্যা ২০০০ জন । বাংলাপিডিয়া মতে, কয়েক শতাব্দি আগে মায়ানমারের ইরাবতী নদীর উজান অঞ্চল থেকে এরা আরাকান দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে। অন্যদিকে বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে, বাংলাদেশের বাইরেও বিভিন্ন দেশে যেমন: ভারতের মনিপুর ও অরুণাচল, মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশ, মধ্য বার্মা (রোহমা পর্বতের পাদদেশে ), উত্তর ও দক্ষিণ বার্মা এবং লাওসে বিচ্ছিন্নভাবে চাক জনগোষ্ঠীর বংশভুক্ত প্রাচীন আদিবাসী আছে। ইতিহাসে জানা যায়, হিমালয়ের দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলের পামির মালভূমি চাকদের উৎপত্তিস্থল । ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে চাকরা বংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চলে বসতি গড়ে তোলে। প্রায় তিনশত বছর আগে (সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ্বে) ক্যউ বলী নামে এক পরাক্রমশালী চাক ব্যক্তির নেতৃত্বে গুটিকয়েক পরিবার নিয়ে বর্তমান বাইশারীতে চাষাবাদ ও ক্ষেত খামার শুরু করে। পরবর্তীতে  ম্রাসাঅং রোয়াজা, ধুংরী মহাজন, ক্যজরী মহাজন, থোয়াইঅং মহাজন, অংগাইজাই চাক প্রমুখ ব্যক্তিগণ ও বাইশারীতে এসে ক্যউ বলীর সাথে একত্রিত হয় এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্ম আজ পর্যন্ত ঐ খানে বাস করছে।

ত্রিপুরা

বাংলাদেশের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস করে। তিন পার্বত্য জেলা ছাড়াও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী সমতল এলাকার কুমিল্লা, সিলেট, বৃহত্তর চট্টগামের বিভিন্ন উপজেলা, রাজবাড়ি, চাঁদপুর, ফরিদপুর ইত্যাদি অঞ্চলেও বর্তমানে বসবাস করে। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে একসময় ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী যে সবর্ত্র ছিল ১৮৭২ ও ১৮৮১ সালের আদমশুমারী প্রতিবেদন পরীক্ষা করলে তার প্রমাণ মেলে। ১৮৭২ সালে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মোট সংখ্যা ছিল ১৫,৬৩২ জন যা ১৮৮১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৮,৫০৯ জনে। বর্তমানে বাংলাদেশে ত্রিপুরাদের জনসংখ্যা অনেকেই মনে করেন দুই লক্ষের কাছাকাছি। তার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে ত্রিপুরাদের জনসংখ্যা দেড় লক্ষাধিক। বাংলাপিডিয়া মতে, এরা ছিল বর্তমান বারীয় রাজ্য ত্রিপুরার পার্বত্য এলাকার অধিবাসী। পরবর্তীতে এরা নিজ এলাকা ছেড়ে বাংলাদেশের মূলত কুমিল্লা, সিলেট এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বসতি স্থাপন করে। অনেকের মতে, টিপরারা আসাম, বার্মা এবং থাইল্যাণ্ডের অধিবাসী সাধারণ এক উপজাতির পূর্বপুরুষ বডো জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে, এ জাতির মূল অংশ বাস করছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে। ত্রিপুরা রাজ্য ছাড়াও ভারতের মিজোরাম , আসাম প্রভৃতি প্রদেশেও অনেক ত্রিপুরা বাস করে। মিয়ানমারেও ত্রিপুরাদের জনবসতি আছে বলে জানা যায়। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ইতিহাস থেকে জানা যায় আনুমানিক ৬৫ খ্রিস্টাব্দে সুই বংশের সময়কালে পশ্চিম চীনের ইয়াংসি ও হোয়াংহো নদীর উপত্যাকা হচ্ছে এদের প্রাচীন আবাসস্থল। পরবর্তীতে এই জনগোষ্ঠী ভারতের আসাম হয়ে বর্তমান বসতি অঞ্চলে বসতি গড়ে তোলে এবং রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে  বলে ইতিহাস সূত্রে জানা যায়।

 পাঙ্খো

 সাধারণত পাঙ্খোয়ারা উঁচু পাহাড়ের উপরে বসবাস করতে পছন্দ এবং সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় বিলাইছড়ি ইউনিয়নে পাঙ্খোয়া পাড়া এবং বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলার সাইজাম পাড়া ও নানখারপাড়া (বড়থুলী) প্রভৃতি স্থানে পাংখোয়াদের বসবাস রয়েছে। রাঙ্গামাটি সদর থানার কর্ণফুলী নদীর পূর্ব পাড়ে ১৬১০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট বসন্তমোন- এ অবস্থিত পাংখোয়া পাড়াটি সবচেয়ে পুরোনো। ২০০ বছরেরও আগে তারা এখানে বসতি স্থাপন করে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী পাংখোয়া জনসংখ্যা ৩২২৭ জন। তবে বর্তমানে পাংখোয়াদের মোট জনসংখ্যা ৪০০০ জন হতে পারে  বলে পাংখোয়ারা মনে করে। 

বাংলাপিডিয়া মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের এই উপজাতিকে মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর একটি উপশাখা বলে মনে করা হয়। এদের আদি নিবাস সম্ভবত ব্রহ্মদেশ(মায়ানমার)। সেখান থেকে কোনো কারণে বিতাড়িত হয়ে কয়েকশ’ বছর আগে তারা এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছে। বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে, পাংখোয়াদের বিশ্বাস অতীতে তারা লুসাই পাহাড়ের পাংখোয়া নামক কোন গ্রাম থেকে এসেছিল। মিজোরাম প্রাদেশিক দলিলপত্র ও মানচিত্রে ৫৬১১ নং পাংখোয়া গ্রামটির চিহ্ন উল্লেখ পাওয়া  যায়।  তারা বিশ্বাস করে যে, তারা বার্মার শান জাতির অংশ এবং দক্ষিণ দিক থেকে তারা এসেছিল।  তাদের মূল আবাসভূমি বর্তমান মিয়ানমারের চীন প্রদেশ। পণ্ডিতদের মতে, পাংখোয়ারা সেই অঞ্চল থেকে সরে এসে ক্রমান্বয়ে আরাকান ওলুসাই হিলসে বসতি স্থাপন করে এবং কালক্রমে ধীরে ধীরে  জীবন জীবিকার সন্ধানে পাংখোয়াদের একটি অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে।

 মগ

মারমা সম্প্রদায়ের অনেকের মতে মগ কোনো সতন্ত্র উপজাতি নয়, আরাকানবাসীর একটি উচ্ছৃঙ্খল দল মাত্র। ১৭৮৪ সালে বার্মা কর্তৃক স্বাধীন আরাকান রাজ্যের পতনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে মগদের বসতি গড়ে ওঠে। বার্মার সাথে আরাকানের সংযুক্তির পর বার্মার রাজা বোদাওপা এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। এর ফলে আরাকানের জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশ বাংলার দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে দেশান্তরিত হয়। ব্রিটিশ সরকার তাদের পুনর্বাসনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বার্মার এক সাবেক নৌ অফিসার ক্যাপ্টেন এইচ কক্সকে মগ বসতির জন্য তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করা হয়। তার নামানুসারে বাংলাদেশের সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের নামকরণ করা হয়। মগদের এরূপ আশ্রয় দান, ও তাদের লুটতরাজের ফলে ১৯২৪-১৯২৫ সালে প্রথম ইঙ্গ বার্মিজ যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যাতে বার্মা পরাজিত হয় এবং ১৮২৬ সালের ইয়ানদাবু চুক্তির ফলে আরাকান ও তেনাসারিম অঞ্চল ব্রিটিশ শাসনভুক্ত হয়। এর ফল স্বরূপ, আরাকান থেকে দ্বিতীয় দফায় মগদের দেশত্যাগ আরম্ভ হয়, আরাকান থেকে দ্বিতীয় দফায় মগদের দেশত্যাগ আরম্ভ হয়, আরাকান থেকে আগত শরণার্থীরা চট্টগ্রাম জেলার দক্ষিণ অঞ্চলে একটা স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে নেয়। ক্রমে মাতামুহুরী উপত্যকার মধ্য দিয়ে তারা বান্দরবানে ছড়িয়ে পড়ে। তৃতীয় দলটি সীতাকুণ্ডু অঞ্চল থেকে খাগড়াছড়িতে প্রবেশ করে। চতুর্থ দলটি বঙ্গোপসাগর অতিক্রম করে বৃহত্তর পটুয়াখালীর দক্ষিণ অঞ্চলে পৌছে এবং সেখানে বসতি গড়ে তোলে।

 মারমা

 তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে মারমাদের সবচেয়ে বেশি লোক বান্দরবান জেলায় বাস করে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারী অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত মারমা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হচ্ছে ১,৪২,৩৩৪ জন।  বাংলাপিডিয়া মতে, মারমা শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে বার্মিজ শব্দ ‘মায়ানমা’ থেকে, যার অর্থ বার্মার অধিবাসী। মারমা জনগণের পূর্ব পুরুষগণ বার্মার পেগু নগরে বসবাস করতেন। আরাকান রাজার সেনাবাহিনীর অধিনায়ক মহাপিন্নাগি ১৫৯৯ সালে বার্মায় একটি আগ্রাসন পরিচালনা করেন। তখন তারা বঙ্গীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে, ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে আরাকানের রাজা শ্রী সুধাম্মার ( শ্রীসুধর্ম ) মৃত্যুর পর তার এক অমাত্য নরপতি আরাকানের সিংহাসন দখল করে রাজপরিবারের সদস্য ও পণ্ডিতদেরকে মৃতুদণ্ড দিতে থাকলে অনেকেই দেশ ছেড়ে পালাতে থাকে। দেশের এই রাজনৈতিক দুর্যোগের সময় রাজার পুত্র নাগাথোয়াইখিন রাজপরিবারের সদস্যবর্গ ও পণ্ডিতদের নিয়ে রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যান। এসময় তিনি চট্টগ্রামের কাইসাঁ জায়গায় আশ্রয় নেন। প্রায় ৫০০০০ সৈন্য তাকে অনুসরন করে। কাইসাঁ  বা কর্ণফুলী নদীর তীরে বাস করতে থাকে।  নাগাথোয়াইখিন কাইঁসা অঞ্চলের শাসক  হিসেবে  বা  ম্রাইমাগ্রি মাঙঃ বা ম্রাইমাগ্রিদের রাজা  হিসেবে পরিচিতি পান। আরাকানের নতুন রাজা নাগাথোয়াইখিন এর অবস্থান জানার পর শত্রুতার পথে না গিয়ে তাকে কাইসাঁ অঞ্চলের শাসক হিসেবে স্বীকিৃতি দেন।১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকা থেকে আরাকানি শাসনের পতন হলে মোগল শাসণাধীনে মারমাদের পেলেংসা: গোত্র মোগলদের কর প্রদানের  মাধ্যমে নিজেদের স্থায়ী আবাসভূমি গড়ে তুলেছিল। ১৭৮২  সালের দিকে তারা পেলেংসা: রাজবংশের পূর্বসূরী ম্রাচাই ধাবইং এর নেতৃত্বে সীতাকুন্ড এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ধাবইং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে কার্পাস মহলের কর আদায়ের চুক্তি অনুসারে ঐ এলাকার চিফ পদ লাভ করেন।

 মুরং

তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে ম্রোরা শুধু বান্দরবান জেলায় বাস করে। মুরংরা ছিল আরাকানের একটি সুপরিচিত জনগোষ্ঠী। দুই মুরং রাজা আ-মিয়া-থু(৯৫৭)এবং পাই ফ্যু(৯৬৪) দশম শতাব্দিতে আরাকান শাসন করেন। সে সময় আরাকানের রাজধানী ছিল ওয়াথালি। কোলাদাইন নদীর তীরে খুমি উপজাতির সঙ্গে মুরংদের এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছিল। যুদ্ধে খুমিরা মুরংদের পরাজিত করে আরাকান থেকে বিতাড়ন করে। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে মুরংরা পার্বত্য চট্টগ্রামে চলে আসে। আরাকন রাজাদের ধারা বিবরণী রাজওয়াং-এ বলা হয়েছে দ্বাদশ শতাব্দিতে আরাকানের রাজা দা থা রাজাকে(১১৫৩-১১৬৫) ‘মহামুণি মূর্তির’ অবস্থান খুঁজে বের করতে দু’জন ম্রো সাহায্য করেছিলেন। চতুর্দশ শতকে খুমি নামে একটি শক্তিশালী উপজাতি ম্রোদের আরাকান থেকে বিতাড়িত করলে তারা বান্দরবানের পার্বত্য অঞ্চলে চলে আসে এবং মাতামুহুরী নদীর তীর বরাবর সাঙ্গু উপত্যকার পশ্চিমে বসতি স্থাপন শুরু করে। তৎকালীন বার্মা রাজা কর্তৃক চট্টগ্রামের জেলা প্রধানের কাছে লিখিত এক চিঠিতে এর সমর্থন পাওয়া যায়। বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে,  ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের মতে, ম্রো (মুরং) নামে একটি জনজাতি যারা পূর্বে আরাকান হিলস-এ বাস করত তারা প্রধানত এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের সাঙ্গু নদীর পশ্চিমে এবং মাতামুহুরী নদী বরাবর বাস করে। তারা নিশ্চিত করে খুমিরা তাদের আরাকান থেকে বের করে দেয়।  মুরংরা বর্তমানে বোমাং রাজার প্রজা। বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক স্যার আর্থার ফেইরি তার বিখ্যাত  ‘বার্মার ইতিহাস’ গ্রন্থে জানান যে, এটা একটি জনজাতি বর্তমানে তাদের প্রাচীন রাজ্য থেকে কমে গেছে। তারা এক সময় কোলদান নদী ও এর উপনদীতে বাস করত। কিন্তু খুমি জনজাতি কর্তৃক ধীরে ধীরে বিতাড়িত হয়ে তারা পশ্চিমে স্থানান্তর হয়েছিল এবং আরাকান  ও চট্টগ্রাম সীমান্তবর্তী এলাকায় বসতি গড়ে তোলে।

 লুসাই

লুসাইগণ বর্তমানে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার বাঘাইছড়ি থানার সাজেক উপত্যাকায় বাস করে। তবে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলায়ও খুব অল্প সংখ্যক লুসাই বাস করে। সিলেট জেলাতে ও লুসাইদের বসবাস রয়েছে। বাংলাদেশের লুসাইদের সংখ্যা আনুমানিক ১০০০-এর মত। বাংলাপিডিয়া মতে, লুসাইদের পূর্বপুরুষরা মিজোরামে তাদের আধিপত্য বিস্তার করে, সেখান থেকেই তাদের কোনো কোনো দল বিভিন্ন সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছিল। একই সময়ে তাদের স্বগোত্রীয় লোকজন বার্মায়ও গিয়ে পৌঁছে। বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকে লুসাইদের বিষয়ে বলা হয়েছে, লুসাই হিল লুসাই জনগোষ্ঠীর মূল আবাস ভূমি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এককালে লুসাই হিল বর্তমানে মিজোরাম নামে পরিচিত । লুসাইদের পূর্বপুরুষেরা চিনলুং থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয় এবং নিজেদেরকে তারা মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর বংশধর বলেই পরিচয় দেন।

অহমিয়া

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলা যথাক্রমে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় অরণ্যময় পরিবেশে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর লোকজন সুদীর্ঘকাল ধরে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছে। এই অহমিয়া জনগোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে আসাম হিসেবে বলা হয়ে থাকে। অহমিয়া বা অসমদের মূল জনগোষ্ঠী ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চল আসাম রাজ্যে বাস করছে। মূলত অহমিয়া জনগোষ্ঠীর নামে ভারতের উক্ত প্রদেশের নাম আসাম নামকরণ হয়েছে। ব্রিটিশ কর্তৃক আসাম দখলের পর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তার শাসনকার্য পারচালনা এবং আরো বেশি বেশি পার্বত্যাঞ্চলে দুর্ধষ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোকে আয়ত্তে আনার লক্ষ্যে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর  অংশ হিসেবে অধীনস্থ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর লোক নিয়ে বিভিন্ন রেজিমেন্ট গঠন করে। তার মধ্যে আসাম রেজিমেন্ট ছিল অন্যতম । এই আসাম রেজিমেন্টের সৈনিক হিসেবে বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী অহমিয়া জনগোষ্ঠীর পূর্বসুরিরা এ অঞ্চলে আগমন করে ।

 খিয়াং

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার রাজস্থলি, কাপ্তাই এবং বান্দরবান জেলার সদর, রুমা, থানচি ও রোয়াংছড়ি উপজেলায় খিয়াং জনগোষ্ঠীর বসবাস। ১৯৮১ এবং ১৯৯১ সালের আদমশুমারী অনুসারে খিয়াং জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা যথাক্রমে ৫৪৫৩ এবং ১৯৫০। দক্ষিণের টেম- চিন  বা উত্তরের ওয়াইল্ড চিন নামে অবহিত আরাকান ইয়োমা উপত্যাকার অববাহিকায় খিয়াংদের আদি নিবাস ছিল বলে অনেকে অভিমত ব্যক্ত করেন। প্রথম মতবাদে খিয়াংরা আরাকানের উত্তর ও দক্ষিণের ইয়োমা পর্বত হতে জীবন জীবিকা আরম্ভ করে। বার্মার (বর্তমান মিয়ানমারে) আকিয়াব, ক্যকপু এবং সানডোওয়ে জেলার পশ্চিমে তাদের বসবাস রয়েছে বলে জানা যায়। অন্য মতবাদে জানা যায়, বার্মার চীন হিলসের অধিবাসীদের খিয়াং বলা হয়। বার্মিজরা এদের চিনস আর আরাকানিরা  খিয়াং বলে ডাকে।

গুর্খা

গুর্খা জনগোষ্ঠীর লোকেরা রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার অর্ন্তগত মাঝের বস্তি, আসাম বস্তি, জেল রোড , কন্ট্রাক্টর পাড়া প্রভৃতি এলাকায় বাস করে। বান্দরবান জেলায় ও ৪/৫ টি গুর্খা পরিবার রয়েছে। সরকারি আদমশুমারীতে গুর্খা জনগোষ্ঠীর লোকসংখ্যা আলাদাভাবে উল্লেখ নেই। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে গুর্খাদের সম্ভাব্য জনসংখ্যা ৩০০ থেকে ৫০০ এর মধ্যে হতে পারে বলে ধারণা করা হয় । পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও বাংলাদেশের ঢাকা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, সিলেট,  খুলনা, পটুয়াখালী প্রভৃতি  জেলায় অনেক গুর্খা বাস করে। গুর্খারা  তাদের  নাম গ্রহণ করে  ৮ম শতাব্দীর আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ গুরু গোরকনাথ থেকে। অতীতে দুর্গম পাহাড়-পর্বতময় জনপদের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্রিটিশরা ছিল অসহায়। এমন অবস্থায় কৌশল হিসেবে তখন বাধ্য হয়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নেপাল ও ভারত থেকে ২য় গুর্খা রেজিমেন্টকে লুসাই বিদ্রোহ দমনের জন্য এই এলাকায় নিয়ে আসে। প্রশিক্ষিত গুর্খাদের অসীম সাহস, দুধর্ষ তৎপরতা ও যুদ্ধ কৌশলের সামনে লুসাইরা তাদের অসহায়ত্ব বুঝতে পারে ও বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য হয়। আর ব্রিটিশরাও পরবর্তীতে গুর্খাদের পার্বত্য এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে দেয়।

 তঞ্চঙ্গ্যা

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলায় তঞ্চঙ্গ্যাদের প্রধান বসতিগুলো রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া থানার উত্তর পূর্বাংশে এবং  কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বসতি রয়েছে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ কর্তৃক প্রদর্শিত তঞ্চঙ্গ্যা জনসংখ্যা ১৯,২১৭ জন।

 তঞ্চঙ্গ্যাদের বর্তমান বসতি স্থানসমূহের দিকে লক্ষ্য করলে অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে তারা দীর্ঘকাল আগে থেকে তাদের মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। বার্মার ইতিহাস, দান্যাওয়াদি আরে তবুং বা আরাকান ইতিহাস (অনেকে লেখেন দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদ ফুং) অনুসারে এবং নৃতাত্ত্বিকদের গবেষণা থেকে এই সিদ্ধান্ত পাওয়া গিয়েছে যে, তঞ্চঙ্গ্যারা দাইনাক পরিচয়ে দান্যাওয়াদির (আরাকান) মূল অধিবাসী ছিল। তারা প্রথমে মাতামুহুরী নদীর উপনদী তৈনছং এ (তৈনছড়ি-মারমাদের  তৈনছং ) প্রথম বসতি স্থাপন করে। সেখান থেকে তারা কালক্রমে মাতামুহুরী অববাহিকা ধরে পশ্চিম দিকে সরে গিয়ে কিছু দক্ষিণে এবং কিছু পশ্চিমে চট্টগ্রামের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে উত্তর পূর্বদিকে স্থানান্তরিত হয়ে রাঙ্গুনিয়া অঞ্চলে এবং অবশেষে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে স্থায়ী হয়ে যায়।

 বম

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এবং মিয়ানমারের চীন প্রদেশে বম জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান পার্বত্য জেলার রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি ও বান্দরবান সদর উপজেলায় এবং রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় ৭০টি গ্রামে বমরা বাস করে। ২০০৩ সালের বম সোশাল কাউন্সিল বাংলাদেশ কর্তৃক পরিচালিত জরিপ অনুসারে বম আদিবাসীদের মোট সংখ্যা ৯৫০০ জন।

উনবিংশ শতকের পূর্বে এবং বিংশ শতকের বিভিন্ন লেখালেখিসমূহে বমদেরকে চীন জাতির উপশাখা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফায়েব, লুইন, বার্বি মিলস হাচিনসন গ্রীয়ারসনও অন্যান্য লেখকগণও একই মত পোষণ করেন। বমদের আদি নিবাস নিয়ে নানা কাহিনী প্রচলিত আছে। বলা হয় চীনের চিনলুং এলাকার এক গুহা থেকে তারা এসেছে। বর্তমান স্থানে বমদের আগমন সপ্তদম শতকে। সবচেয়ে বড় কথা বছর দুয়েক আগে, সাবেক বোমাং রাজা চ্যানেল আই-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, বাংলাদেশে তারা আদিবাসী নন, তাদের পূর্ব পুরুষ আরাকান থেকে এসেছে।

 একইভাবে ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, সমতলের উপজাতীয় সম্প্রদায় যেমন, সাঁওতাল, গারো, হাজং, মনিপুরী প্রভৃতির বাংলাদেশে আগমনের ইতিহাস তিন-চারশত বছরের বেশি নয়। উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন বিভিন্ন ইতিহাস থেকে জানা যায়, সাঁওতাল সম্প্রদায় রেল সম্প্রসারণের কাজে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ভারতের উড়িষ্যা ও বিহার অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে আগমন ঘটে। কাজেই উপর্যুক্ত আলোচনায় প্রমাণিত হয় আভিধানিকভাবে বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী কোনোভাবেই এখানকার স্বদেশজাত বা ভূমিপুত্র বা আদিবাসী নয়।

 এখন আদিবাসীর আরেকটি সংজ্ঞা, আইএলও কনভেনশন ১০৭ ও ১৬৯ অনুসারে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহ আদিবাসী হিসাবে পরিচিত হতে পারে কিনা তার বিবেচনা বাকি রইল। আগামী পর্বে ইনশাল্লাহ সে আলোচনা করা হবে।

Email: palash74@gmail.com

 সৌজন্যে: দৈনিক ইনকিলাব(পরিবর্ধিত আকারে)

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

মেহেদী হাসান পলাশ, Mehadi Hassan Palash

মে হে দী  হা সা ন  প লা শ

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গেলেই সমতলের অনেক বিজ্ঞজনকে বলতে শোনা যায়, ওটা তো পাহাড়িদের এলাকা। ওখানে বাঙালি নেয়া হলো কেন? বাঙালিরাই ওখানে যত সমস্যা সৃষ্টি করছে এবং এ কারণে তারা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকেও দায়ী করে থাকেন। কিন্তু আসলেই কি তাই? পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সমস্যার মূলে কি বাঙালিরা? প্রেসিডেন্ট জিয়াই কি একা বাঙালি পুনর্বাসনের ‘অপরাধ’ করেছেন?

আলোচনার প্রথমেই একটি কথা বলা প্রয়োজন, বাঙালিরা ‘তাড়া খেয়ে’, ‘পালিয়ে’, ‘যাযাবর হয়ে’ বা কারো ‘দয়ায়’ পার্বত্য চট্টগ্রামে যায়নি। কারণ, বাঙালিদের জীবনধারণের উপযোগী স্থান সেটি নয়। কাজেই স্বেচ্ছায় তাদের সেখানে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। তা সত্ত্বেও আদিকাল থেকে সেখানে বাঙালীদের যাতায়াত ও বসবাস ছিল। অত:পর বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে নেয়া হয়েছে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে। রাষ্ট্রের প্রয়োজন মেটাতেই বাঙালিরা সেখানে বসবাস করতে গিয়েছে। গিয়ে মশা, ম্যালেরিয়া ও সাপের কামড়ে, শান্তিবাহিনীর আক্রমণে অনেকেই জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। পাহাড়কে আবাদ করেছে, মানুষের বাসযোগ্য করেছে, পর্যটকদের কাছে আকর্ষনীয় করেছে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করেছে। বাঙালিরা যদি এই ত্যাগ স্বীকার করে সেখানে না যেতো, না থাকতো তা হলে কি হতো?

সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল নুরউদ্দীন সংসদে পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, বাংলাদেশের এই অংশ বহু পূর্বেই হাতছাড়া হয়ে যেত। শুধু এরা দু’জনই নন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকের আরো অনেকে এ কথা বলেছেন। কাজেই এ কথা পরিষ্কার যে, বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে গমন, অবস্থান ও আত্মদান রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, রাষ্ট্রিয় সার্বভৌমত্বের স্বার্থে।

ইতিহাস থেকে আমরা দেখতে পাই, পার্বত্য চট্টগ্রামের যে প্রাচীন মানচিত্র সেখানে বাঙালিরা সুপ্রাচীন কাল থেকেই বসবাস করতো। এর বাইরেও মোগল আমলে, ব্রিটিশ আমলে বাঙালিদের সেখানে গমনের ইতিহাস পাওয়া যায়। তবে ১৯০০ সালের শাসন বিধি পাস হওয়ার পর বাঙালিদের আর সেখানে গিয়ে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ ছিল না। পাকিস্তান আমলে উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালনা বিশেষ করে কাপ্তাই বাঁধের কাজ করার জন্য প্রচুর সংখ্যক সেনা সদস্যও বাঙালিকে সেখানে পুনর্বাসন করা হয়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তো মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার মুখের উপর তাদের দাবিনামা ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘লারমা বেশি বাড়াবাড়ি করিস না। তোরা কি মনে করেছিস, তোদের সংখ্যা ৪-৫ লাখ। প্রয়োজনে পনেরো, বিশ লাখ বাঙালি পাঠিয়ে তোদের উচ্ছেদ করে দেবো। …তোরা সব বাঙালি হয়ে যা।’ দলিলপত্র ঘাটলে দেখা যায়, পাকিস্তান আমলের মতো করে সেসময়ও বাঙালি ও সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়েছিল।

কিন্তু পার্থক্য এই যে, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় তা ব্যাপকভাবে হয়েছিল এবং জিয়াউর রহমানকেও সেটা করতে হয়েছিল রাষ্ট্রের বিশেষ প্রয়োজনে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর ইন্দিরা গান্ধী ভারতের অভ্যন্তরে শান্তিবাহিনীর প্রশ্রয় ও মদদ বৃদ্ধি করেন। নতুন পৃষ্ঠপোষকতায় শক্তিশালী হয়ে শান্তিবাহিনী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জেরালো যুদ্ধ শুরু করে। তাছাড়া ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট যখন ভারত ভাগ হয় তখন পার্বত্য প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী রাঙামাটিতে ভারতীয় পতাকা ও বান্দরবানে বার্মার পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সে পতাকা বেশ কিছুদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে উড়েছিল। ১৭ আগস্ট র‌্যাডক্লিফ রেয়োদাদ রায় প্রকাশিত হবার পর ২১ আগস্ট পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেই পতাকা নামিয়ে ফেলে। ১৭ আগস্ট র‌্যাডক্লিফের রায়ের পরও পাহাড়িরা প্রতিবাদ জানিয়েছিল রায়ের বিরুদ্ধে। সেই বিশেষ প্রেক্ষাপটে সেনাপ্রধান ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে জিয়াউর রহমানের পক্ষে ইতিহাসের এ ঘটনাবলী বিবেচনায় না নিয়ে উপায় ছিল না। এ প্রেক্ষাপটে বাধ্য হয়েই জিয়াউর রহমানকে অতিরিক্ত সৈন্য ও বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রেরণ করতে হয়েছিল।

এছাড়াও জিয়াউর রহমান এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংকের সহায়তায় ১৯৭৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড গঠন করে সেখানে যোগাযোগসহ বিভিন্ন সেক্টরে বিপুল উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালনা করেন। কিন্তু পাহাড়িরা এই কাজে অভ্যস্ত বা অভিজ্ঞ ছিল না। ফলে উন্নয়ন কাজ সমাধা করার জন্য বাঙালি প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও শ্রমিক প্রয়োজন হয়। শ্রমিকদের পক্ষে গহীন পাহাড় অরণ্যে কাজ করে দিনে দিনে ফিরে আসা সম্ভব ছিলনা। ফলে নিকটবর্তী স্থানে তাদের বসতি গড়তে হয়। কোনো পাহাড়ি শ্রমিক সরকারের কাজে সহায়তা করতে চাইলেও পারতো না শান্তিবাহিনীর হুমকির মুখে। কারণ পাহাড়িরা সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন বিরোধী ছিল।

অনেক ক্ষেত্রেই সে পরিস্থিতি আজো বদলায়নি। সন্তু লারমা এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশকিছু উন্নয়ন কর্মকা-ের বিরোধিতা করছেন। বাঙালি ছাত্র ও শিক্ষকরা পড়তে যাবে এই ভয়েই তার এ বাধা। এখনো সরকারি উন্নয়ন কর্মকা-ে কিছু পাহাড়ি ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার পাওয়া গেলেও শ্রমিকদের অধিকাংশই বাঙালি। বাঙালি শ্রমিক ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্ভব ছিল না। কাজেই আজকে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের সৌন্দর্য দেখে দেশি বিদেশি পর্যটকরা মুগ্ধ হন তার পেছনে রয়েছে বাঙালির শ্রম, ঘাম, রক্ত ও আত্মদান। এখানেই শেষ নয়; শিক্ষা, বৃক্ষরোপণ, উন্নত চাষাবাদ ও নাগরিক জীবনের অভিজ্ঞতাও পাহাড়িরা পেয়েছে বাঙালির কাছ থেকেই।

সরকার যদি বাঙালিদের সেখান থেকে ফিরিয়ে আনে তাতে বাঙালিদের ক্ষতি সামান্যই। কারণ সরকারকেই তাদের সকল সুবিধা ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে সমতলে পুনর্বাসন করতে হবে। কিন্তু পাহাড় থেকে যদি বাঙালিরা চলে আসে, তাহলে সেখানে সরকারের সকল উন্নয়ন কর্মকা- থেমে যাবে। পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে ‘জুম্ম’ নামক স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিদার সন্ত্রাসীদের হাতে। কাজেই বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থান তাদের নিজেদের স্বার্থে ও প্রয়োজনে নয়, রাষ্ট্রের প্রয়োজনেÑ একথা যারা বুঝতে চান না তাদের দেশপ্রেমিক বলার খুব বেশি সুযোগ নেই।

যাইহোক, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও চেষ্টা করেছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার শান্তিপূর্ণ ও রাজনৈতিক সমাধান করতে। ১৯৭৭ সালে তিনি ট্রাইবাল কনভেনশন গঠন করেছিলেন। তিনি এমএন লারমা ও সন্তু লারমার ভগ্নীপতি ও সংসদ সদস্য উপেন্দ্রলাল চাকমাকে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করেছিলেন জনসংহতির সাথে আলোচনার জন্য। তিনি রাঙামাটিতে এ নিয়ে রুদ্ধদ্বার আলোচনাও করেছিলেন। শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরূপ অনেকের আপত্তি সত্ত্বেও বন্দি সন্তু লারমাকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন ১৯৮০ সালে। কিন্তু মুক্ত সন্তু লারমা শান্তির পথে না গিয়ে মুক্তি পেয়েই ভারতে পালিয়ে যান এবং সেনাবাহিনী ও বাঙালিদের উপর আক্রমণ শুরু করেন। ফলে জিয়াউর রহমানের আমলে শান্তির সুবর্ণ সুযোগটি নষ্ট হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দেয়াই যথেষ্ট। জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে শহীদ হন আর পরের মাসে ২০ হাজার পাহাড়ি ভারতে চলে যায় বলে অভিযোগ করা হয়। অর্থাৎ সাধারণ পাহাড়িদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও তিনি সতর্ক ছিলেন।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর ভারত পার্বত্য সমস্যাটির আন্তর্জাতিককীকরণের প্রক্রিয়া শুরু করে। ফলে প্রয়োজন হয় শরণার্থীর। ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায় শান্তিবাহিনী আরো আক্রমণ শুরু করে পাহাড়ি ও বাঙালি গ্রামগুলোতে। শান্তিবাহিনী পাহাড়িদের ভারতে শরণার্থী হয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। যারা যেতে রাজি হয়নি তাদের পার্শবর্তী গ্রামগুলোতে এমনভাবে হামলা করে যাতে বাঙালিরা পাল্টা আঘাত দিতে পাহাড়ি গ্রামগুলোতে হামলা চালাতে বাধ্য হয়। এভাবেই শান্তিবাহিনী নিরীহ পাহাড়িদের ভারতে শরণার্থী হতে বাধ্য করে।

শান্তিবাহিনীর এ প্রক্রিয়া রোধ করতেই এরশাদ সরকার গুচ্ছগ্রাম সৃষ্টি করে নিরাপত্তার আওতায় বাঙালি ও পাহাড়িদের নিয়ে আসে। এ প্রক্রিয়ায় বাঙালিদের জন্য ১০৯টি গুচ্ছগ্রামে ৩১ হাজার ৬২০ পরিবারের এক লাখ ৩৬ হাজার ২৫৭ ব্যক্তিকে জায়গা-জমি দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়। এতে বাঙালিরা নিরাপত্তা পেলেও সরকার প্রদত্ত তাদের বসত ভিটা ও চাষের জমি হারাতে হয়। সেই আশির দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বাঙালিরা আর তাদের সেই বসত ভিটা ও আবাদী জমি ফেরত পায়নি। প্রতিবছর খাজনা দিয়ে ডিসি অফিসের খাতায় জমির দখল সত্ত্ব বহাল রাখলেও তাতে বসত করা, আবাদ করা সম্ভব হয় না। কারণ জমিতে চাষাবাদে গেলেই পাহাড়িরা তাদের উপর হামলা করে। পাহাড়ীদের মতে, পাহাড়ের সকল জমিই তাদের। বাঙালীদের অনেক জমি পাহাড়িরা দখল করে নিয়েছে। কোনো জমি দখল করে উঠেছে বৌদ্ধদের কিয়াং- যা সরানোর ক্ষমতা বাঙালি তো দূরের কথা রাষ্ট্রের পক্ষে দুঃসাধ্য। কারণ সে দিকে চোখ দিলেই ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, চীন, থাইল্যা-, বার্মা, ই-িয়াতে মিছিল শুরু হয়ে যাবে সাথে সাথে। বাঙালিদের ভূমিহীন করার কৌশল হিসাবে তাদের জমির খাজনা আবার পাহাড়ি হেডম্যানরা নেয় না, ডিসি অফিসে দিতে হয়।

এরশাদ সরকার শান্তিবাহিনীর হাত থেকে রক্ষাকল্পে গুচ্ছগ্রামের আদলে চাকমাদের জন্য ১৬টি শান্তিগ্রাম ও মারমা, ত্রিপুরাদের জন্য ৮০টি বড়গ্রাম স্থাপন করেছিল। কিন্তু শান্তিবাহিনীর অব্যাহত হুমকির মুখে সেসব গ্রামের উপজাতীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ ভারতে শরণার্থী হয়ে যেতে বাধ্য হয়, অন্যদের কেউ অন্যত্র, কেউ নিজ জমিতে ফিরে বসতি স্থাপন করে। তবে রেশন দেবার দিন এসে রেশন গ্রহণ করতো বহুদিন। ১৯৫০-৬০ সালের মধ্যে ব্রিটিশরা মালয়ে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিল। সেই মডেল থেকেই এরশাদ সরকার গুচ্ছগ্রামের ধারণা নিয়েছিল বলে মনে করা হয়।

গুচ্ছগ্রামে সরকার পরিবার প্রতি একটি ২০ ফুট বাই ২০ ফুট ঘর, মাসিক ৮৫ কেজি চাল বরাদ্দ দিয়েছিল ১৯৮৮ সালে। তারপর থেকে সেই পরিবার ভেঙে পুত্র ও নাতির পরিবার হয়েছে। ঘর ও রেশন সেই একই রয়ে গেছে। এখন ৮৫ কেজি চালের পরিবর্তে ৩০ কেজি চাল ও ৫৫ কেজি গম দেয়া হয়। তাও আবার ৩ মাস পরপর। গুচ্ছগ্রামের ২০ ফিট বাই ২০ ফিট ঘরের মধ্যে বাবা, মা, ছেলে, মেয়ে, পুত্রবধূ, জামাই, নাতিদের নিয়ে একসাথে জেলখানার ‘ইলিশ ফাইলের’ মতো করে বসবাস করে বাঙালিরা। এরমধ্যে আবার বাঁধা থাকে গবাদি পশু। বাইরে রাখলে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের দ্বারা চুরি হবার ভয়ে ঐ ছোট্ট ঘরের মধ্যেই রাখতে হয় তাদের।

gussagram 1

বসতবাড়ি ও ভিটার জমিতে খাজনা দিয়েও তাদের এই মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। পরিবার যতোই আলাদা হোক ৮৫ কেজি চাল/গমের বরাদ্দ ও কার্ড সংখ্যা এখনো শুরুর দিনের মতোই। জরুরি প্রয়োজনে গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা কারো কাছে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কার্ড বন্ধকি রেখে টাকা নেয়। ফলে ঐ সময় কার্ডের রেশন সুবিধা গ্রহণ করে কার্ড বহনকারী। সেই দিনগুলো ঐ পরিবারের কাটে অমানবিক কষ্টে। শিক্ষা, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য- জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলোর নূন্যতম উপস্থিতি নেই গুচ্ছগ্রামে।

প্রতি মাসেই একাধিক আন্তর্জাতিক টিম পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিদর্শন করে কিন্তু গুচ্ছগ্রামের বাঙালিদের কথা শোনার কোনো আগ্রহ নেই তাদের। এমনকি সক্রিয় আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও মিশনারী সংস্থাগুলোরও গুচ্ছগ্রামের বাঙালিদের দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। পাহাড়িদের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, ও অর্থ নিয়ে ঘুরছে ইউএনডিপি, এমএসএফ, ড্যানিডা, ডিএফএইডি প্রভৃতি। কিন্তু গুচ্ছ গ্রামের বাঙালিদের নিয়ে কোনো প্রকল্প করলে অর্থ দেয় না কোনো দাতা সংস্থা বা এনজিও। অর্থ পেলেও এমন এনজিও’র রেজিস্ট্রেশন দেয় না আঞ্চলিক পরিষদ। এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্টে পাতার পর পাতা ভরে পাহাড়িদের দুঃখ কষ্টের কথা লেখা হলেও তার একটি শব্দও খরচ হয় না গুচ্ছগ্রামের বাঙালিদের জন্য। তারা যেন মানুষ নয়, তাদের যেন কোনো মানবাধিকার থাকতে নেই। তবে হ্যাঁ, যদি তাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে পুনর্বাসনের কথা বলা হয়, তাহলে প্রচুর টাকা মিলবে সে ঘোষণাও দিয়ে রেখেছে এইসব মতলববাজ, একচোখা ও চক্রান্তকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। কারণ তাতে তাদের আসল উদ্দেশ্য সফল হবে।

শুধু বিদেশিদের দোষ দিয়ে কি লাভ! পার্বত্য বাঙালিদের জন্য বিমাতাসুলভ আচরণে পিছিয়ে নেই সরকারও। যে সরকার নিজের প্রয়োজনে একদিন সমতল থকে বাঙালিদের নিয়ে পাহাড়ে পুনর্বাসন করেছিল, আজ সেই সরকারই তাদের সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ করছে।
সমতলের বাঙালীরা খুব খুশী মনে সেখানে যায়নি। কারণ পাহাড়ের জলবায়ু, ভূমিরূপ ও ফুড চেইন তাদের বসবাসের জন্য উপযোগী নয়। পাহাড়ীদের খাবার তাদের বাসস্থানের পাশের পাহাড়ের জঙ্গলের লতা পাতা, পশুপাখি, পোকামাকড়ে চলে যায়। কিন্তু বাঙালীরা তো এমন খাবারে অভ্যস্ত নয়। কাজেই সমতলের বাঙালীদের পূনর্বাসনের পর প্রথমদিকে পাহাড়ে বসবাস কতোটা কষ্টষাধ্য ছিল তা বিবেকবান মানুষমাত্রই অনুধাবন করবেন। তবু রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তারা সেখানে থেকে গেছে। কিন্তু সেই রাষ্ট্রই যখন তাদের জাতীয় পরিচিতি কেড়ে নিল, তখন পাহাড়ের বাঙালীরা প্রকৃতপক্ষে নিজভূমে পরবাসী হয়ে পড়ল। শান্তিচুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র তাদের ‘বাঙালী’ পরিচয় মুছে দিয়ে অদ্ভুত নতুন এক পরিচয়ে লিখল ‘অউপজাতীয়’।  এ পরিচয়ে পাহাড়ে তারা অচ্ছুৎ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। আরো বিস্ময়ের কথা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২৪ বছর সংগ্রাম করে যে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যে বঙ্গবন্ধু পাহাড়িদের বাঙালি হতে বলেছিলেন, তার কন্যা শেখ হাসিনার হাতে পার্বত্য বাঙালিদের ‘বাঙালি’ পরিচয়ের অপমৃত্যু ঘটেছে। বঙ্গবন্ধু পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীগুলো থেকে তাদের পরিচয় কেড়ে নিতে চেয়েছিলেন এই অজুহাতে ৪২ বছর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে হাজার দশেক পাহাড়ি সন্ত্রাসী। কিন্তু বাঙালিত্ব হারিয়ে বাঙালিরা বেদনায় মূহ্যমান হলেও পাহাড়িদের মতো অস্ত্র হাতে তুলে নেয়নি। তারপরও বাঙালিদের প্রতি সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণ এতোটুকু কমেনি।

পাহাড়ে ব্যবসা করতে গেলে বাঙালিদের কর দিতে হয়, উপজাতিদের দিতে হয় না। উপজাতিদের ব্যাংকের সুদ ৫%, বাঙালিদের ১৬%। দুই লাখ টাকার নিচের ঠিকাদারী ব্যবসা একচেটিয়া পাহাড়িদের, তার উপরের কাজগুলোরও ১০% পাহাড়িদের জন্য নির্ধারিত। বাকি ৯০ ভাগ ওপেন টেন্ডারে করা হয়। পাহাড়ে এসআই পর্যন্ত পুলিশের সকল চাকরির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। জাতীয়ভাবেও চাকুরীতে ৫% কোটা তাদের জন্য। বিসিএসসহ অন্যান্য সরকারি চাকরিতে একই অবস্থা। বাংলাদেশের খ্যাতনামা এনজিও ও বিদেশি দূতাবাসগুলোতে চাকরির ক্ষেত্রে তাদের রয়েছে অগ্রাধিকার। একজন পার্বত্য বাঙালি ছাত্র ডাবল জিপিএ ফাইভ পেয়েও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে না। অন্যদিকে এ বা তার নিচের গ্রেড পেয়ে পাহাড়িরা বুয়েট-মেডিক্যালে চান্স পাচ্ছে। নানা সুবিধায় ওদের জন্য বিদেশে শিক্ষা ও চাকরির দ্বার অবারিত। কিন্তু গুচ্ছগ্রামের বাঙালি শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে অর্ধেক বই পড়ে, বাকি অর্ধেক বইয়ের সরকারি বরাদ্দ নেই। মাদ্রাসা/স্কুলের বেতন দিতে হয় রেশনের চাল/গম থেকে। পাহাড়ের সরকারি চাকরি পাহাড়িদের একচেটিয়া অধিকার। পার্বত্য বাঙালিদের বঞ্চনার কথা লিখতে গেলে একটা বই হয়ে যাবে।

আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারের মুখে পাহাড়িদের পুনর্বাসনে নানা উদ্যোগ ও পরিকল্পনার কথা শোনা যায়, কিন্তু গুচ্ছগ্রামের বাঙালিদের পুনর্বাসনে কোনো কথা শোনা যায় না কারো মুখে। সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীর স্বার্থ দেখভালের জন্য একটা মন্ত্রণালয় করেছে। তারাও দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী পাহাড়িদের পুনর্বাসনে গলদঘর্ম। কিন্তু দেশের স্বার্থে আত্মদানকারী বাঙালিদের পুনর্বাসনে কোনো উদ্যোগ নেই সেখানে। উল্টো ভূমি কমিশনের নামে এমন এক ব্যবস্থা চালু করেছে যাতে বাঙালিরা পাহাড় ছেড়ে একবারে চলে আসতে বাধ্য হয়। গত ২৫ বছরে গুচ্ছগ্রামের বাঙালিদের আবাদী জমি, বসতভিটা ফিরিয়ে দেয়ার কোনো উদ্যোগ সরকারকে নিতে দেখা যায়নি। এমনকি তাদের মানবিক ও মৌলিক জীবন যাপনের সুবিধা নিশ্চিত করতেও কেউ এগিয়ে আসেনি।

পার্বত্য বাঙালিদের এই বঞ্চনার কথা সমতলের বাঙালি তথা দেশবাসী খুব সামান্যই জানে। ফলে জাতীয় ইস্যুতে, জাতীয় রাজনীতিতে তাদের বঞ্চনার কথা বলা হয় না। জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে পার্বত্য বাঙালিদের ঠাঁই হয় না। এমনকি স্থানীয় কমিটির উচ্চপদে তার ঠাঁই খুব বেশী হয়না। এমনকি যে জিয়াউর রহমানের আহ্বানে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি গড়েছিল বাঙালিরা, সেই জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে তিন পার্বত্য জেলার ৫ জন নেতা ঠাঁই পেলেও তার একজনও বাঙালি নয়। ফলে বাঙালির স্বার্থে অন্যদলগুলোতো বটেই বিএনপির বাঙালি নেতারাও কথা বলতে পারে না সিনিয়রদের চাপে। ঢাকায় পার্বত্য বাঙালিদের সেমিনারে কোনো বিএনপি নেতা আসতে ভয় পান এজন্য যে, পাহাড়ি নেতারা এসে যদি তার বিরুদ্ধে নেত্রীর কাছে নালিশ করে। যদিও খুব সামান্য পাহাড়িরাই বিএনপিতে ভোট দেয়।

সমতলের ‘রাজাকারদের’ গাড়িতে পতাকা তোলা নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে অনেক কথা বলা হয়। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের আমৃত্যু রাজাকারের পুত্রের গাড়িতে পতাকা উঠেছে, এমনকি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী, বাঙালি ও সেনাবাহিনী হত্যাকারী সন্ত্রাসীদের গাড়িতে পতাকা উড়েছে, তা নিয়ে কোনো কথা বলা হয় না।
 দু’একটি গণমাধ্যম ছাড়া দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যম বাঙালীদেরকে পার্বত্যাঞ্চলের আপদ বলেই ভাবে। বুদ্ধিজীবীদের বেশিরভাগ অংশই বিদেশ সফর, ‘সুশীল’ খাতায় নাম তোলার প্রয়োজনে ও টুয়েসডে, থার্সডে পার্টিতে নিমন্ত্রণ হারানোর ভয়ে বাঙালির পক্ষে কথা বলতে নারাজ। বাংলাদেশের খুব বিখ্যাত একজন রাজনীতিক ও কলামিস্ট আমাকে একবার বলেছিলেন, একটি জাতীয় সেমিনারে পার্বত্য বাঙালিদের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে বাসায় ফেরার সাথে সাথে একটি প্রভাবশালী পাশ্চাত্য দেশের দূতাবাস থেকে তার কাছে ফোন করে জানতে চাওয়া হয় তিনি বাঙালিদের পক্ষে ঐ সেমিনারে কোনো কথা বলেছিলেন কিনা?

বাঙালিদের বিরুদ্ধে লিখলে সাংবাদিকদের বিদেশ সফরসহ নানা সুবিধা মেলে সেখানে, পক্ষে লিখলে ততোটাই অবহেলা ও ঝুঁকির শিকার হতে হয়। সেখানে দায়িত্বরত সরকারি কর্মকর্তাদের প্রমোশন ও বিদেশে পোস্টিং মেলে না বাঙালি ঘেঁষা হলে। এক কথায় যে রাষ্ট্রের স্বার্থে বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থান সেই রাষ্ট্র তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

পার্বত্য বাঙালিরা শুধু রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন নয়, এখনো নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর অবস্থানের জন্য। অনেকে প্রকাশ্যে স্বীকার করতে না চাইলেও এ কথা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি ও সেনাবাহিনী একে অন্যের সম্পূরক ও পরিপূরক। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী না থাকলে যেমন বাঙালির অবস্থান অনিশ্চিত, ঠিক তেমনি বাঙালি না থাকলে সেনাবাহিনীর অবস্থান কষ্টসাধ্য। বাঙালিরা সেখানে সেনাবাহিনীর জন্য অতিরিক্ত একটি ডিফেন্স লাইন তৈরি করেছে- যার গুরুত্ব অপরিসীম। বিগত জোট সরকারের আমলে বাঙালী নেতা ওয়াদুদ ভুঁইয়া উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালে প্রতিরক্ষা কৌশলের অংশ হিসেবে কিছু বাঙালিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে, বিশেষ করে প্রধান সড়কের বিশেষ বিশেষ স্থানে বসতির অনুমতি দেয়া হয়। এতে করে পার্বত্য অধিবাসী, সরকারি কর্মকর্তা, সেনাবাহিনী ও পর্যটকদের উপর অতর্কিত হামলা (এমবুশ), অপহরণ অনেকাংশে হ্রাস পায়।

তবে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী কিছু বাঙালি আমাকে বহুবার এ কথা বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী না থাকলে ‘সন্তুবাহিনী’ হয় আমাদের কাছে অস্ত্র সারেন্ডার করে মিলে মিশে থাকবে, না হয় ভারতে পালাবে। সম্প্রতিকালে ক্রমাগত সরকার, দাতা সংস্থা ও এনজিওগুলোর বৈষম্য ও বিদ্বেষমূলক কর্মকা-ের কারণে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি জনগোষ্ঠী। উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের অত্যাচার, উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের বাঙালি বিদ্বেষমূলক কর্মকা- এবং সেই সাথে সরকার, এনজিও ও দাতা সংস্থারগুলোর একপেশে নীতির কারণে পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব সমাজের মূল স্রোতধারা থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। ফলে তাদের মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ সহিংস প্রতিবাদের দিকে এগুচ্ছে। উল্লিখিত উক্তিটি তাদের সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।

email: palash74@gmail.com

সৌজন্যে: দৈনিক ইনকিলাব

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

মেহেদী হাসান পলাশ, mehadi Hassan Palash

মেহেদী হাসান পলাশ
গত ১৬ জুন পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধনী-২০১৩ জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা। বিলটি উপস্থাপনের আগে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য জাফরুল ইসলাম চৌধুরী বিলের উপর আপত্তি দিয়ে বিলটি সংসদে উপস্থাপন না করার জন্য স্পিকারকে অনুরোধ করেন। সংসদ সদস্যের আপত্তির মুখে স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী বিলটি কণ্ঠ ভোটে দেন। বিলটিতে সরকার দলীয় সংসদীয় সদস্যরা হ্যাঁ ভোট ও বিরোধী দলীয় জোট সদস্যরা না ভোট দিলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতায় হ্যাঁ ভোট জয়যুক্ত হলে বিলটি সংসদে উপস্থাপন করেন ভূমিমন্ত্রী।

বিলটি উপস্থাপনের পর বিলটি পরীক্ষা নীরিক্ষা করে ৭দিন পর সংসদে উপস্থাপনের জন্য  ভূমি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রেরনের জন্য স্পিকার কণ্ঠভোটে দেন। বিরোধী দলীয় সদস্যরা না ভোট দিলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিলটি ভূমি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিতে প্রেরিত হয়। সে হিসাবে আগামী ২৩ জুন সংসদে পরীক্ষিত বিলটি চুড়ান্তভাবে পাশের জন্য উপস্থাপিত হওয়ার কথা।

১৭৫৭ সালের এই ২৩ জুনে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার ভাগ্য বিপর্যয় ঘটেছিল। ২৫৫ বছর পর আরেক ২৩ জুনে পার্বত্য বাঙালীর ভাগ্য নির্ধারিত হতে পারে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে। শুধু বাঙালীর নয় বাংলাদেশের ভাগ্যও হয়তো এ দিনেই লেখা হতে পারে। কারণ এই সংশোধনী প্রস্তাবে এমন কিছু ধারা রয়েছে যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

পার্বত্য চুক্তির ঘ খন্ডের ৪ নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল চলিবেনা’। অন্যদিকে ভূমি কমিশন আইনের ১৬ নং ধারায় বলা হয়েছে,‘ উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন আদালত বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষের নিকট আপীল বা রিভিশন দায়ের বা উহার বৈধতা সম্পর্কে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’ এখানে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের কর্তৃত্ব, ক্ষমতা ও এখতিয়ারকে খর্ব করা হয়েছে এবং একই সাথে তা সংবিধান বিরোধী। কারণ বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার খণ্ডে ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী।’ কিন্তু পার্বত্য চুক্তি ও ভূমি কমিশন আইনের ফলে সেখানকার অধিবাসীরা কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপীল করতে পারবেন না। কমিশন ও এর আইন উপজাতি ঘেঁষা হওয়ায় সেখানে বৈষম্যের শিকার হবেন পার্বত্য বাঙালীরা।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী ও পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেনা।’ কিন্তু কমিশনে সদস্য, সচিব ও কর্মচারী নিয়োগের বেলায় এই বৈষম্য প্রকটাকারে পরিদৃষ্ট।

এখানে কেউ কেউ হয়তো সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদ, ২৯(৩)(ক) ধারা উল্লেখ করে ‘নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের’ জন্য সংবিধানের উল্লিখিত ধারার বিশেষ রেয়াতের সুবিধা নিতে চাইবেন। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘নাগরিকদের যে কোনো অনগ্রসর অংশের’ মধ্যে ৮৭% শিক্ষিত চাকমারা পড়েন কিনা তা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ভেবে দেখতে হবে। একই সাথে যুগ যুগ ধরে বৈষম্যের শিকার পার্বত্য বাঙালীরা কোন বিবেচনায় ‘অগ্রসর’ জনগোষ্ঠীভুক্ত হলেন তাও রাষ্ট্রকে তদন্ত করে দেখতে হবে। কারণ, শিক্ষাদীক্ষা, চাকুরী ও অবস্থানগত সুবিধার কারণে শুধু বাঙালী নয় উপজাতীয় অন্যসকল গোত্র শোষিত হচ্ছে চাকমাদের দ্বারা। পার্বত্যাঞ্চলের জন্য রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাকিতভাবে বরাদ্দকৃত কোটাসহ সকল প্রদত্ত সুবিধা ভোগ করছে চাকমা জনগোষ্ঠী। পারফেক্টলি বললে বলতে হয়, চাকমা সমাজের কয়েকটি গোত্র মাত্র। অন্যসকল উপজাতি এ সুবিধার সামান্যই ভোগ করতে পারে।

একইভাবে পার্বত্য চুক্তি ও ভূমি কমিশনের উল্লিখিত ধারা বাংলাদেশ হাইকোর্ট ও সুপ্রীম কোর্টের এখতিয়ারকে খর্ব করে। সংবিধানের ১০১, ১০২(২) এর উপধারা (অ), (আ), ও ১০৯ ধারার সাথে তা সরাসরি সাংঘর্ষিক।

শান্তিচুক্তির ঘ খণ্ডে ৪ নং ধারায় কেবলমাত্র ‘ পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমিজমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি’র কথা বলা হয়েছে। একইভাবে ভূমি কমিশন আইনের ৬(ক) ধারায়ও ‘পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা’র কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ চুক্তি ও আইন অনুযায়ী কেবল পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করাই এ কমিশনের দায়িত্ব। এখানে পার্বত্য অঞ্চলের বৃহৎ জনগোষ্ঠী বাঙালীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ নেই। কাজেই বাঙালীদের কোনো কোনো সংগঠন তাদের দাবীতে ভূমি কমিশনে সমানুপাতিক হারে বাঙালী সদস্য রাখার যে দাবী তুলছে তা, হয় আইন না জানা কিংবা না বোঝার ফল অথবা আপসকামিতার দৃষ্টান্ত। ভূমি কমিশনে সমানুপাতিক হারে কেন, সকল সদস্যই বাঙালী হলেও তাতে বাঙালীদের উল্লসিত হওয়ার কিছু নেই যদি বিদ্যমান আইন বহাল থাকে। অর্থাৎ কমিশন সদস্যরা বিচার করবেন যে আইনে, সে আইন যতক্ষণ পর্যন্ত বাঙালী ও দেশের স্বার্থের অনুকূল না হবে, সে পর্যন্ত এই কমিশন বাঙালীর স্বার্থ বিরোধী হয়েই থাকবে। অন্য কথায় ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন’ উপজাতীয়দের ‘ঐতিহ্য’ ‘রীতি’ ও ‘পদ্ধতি’ অনুযায়ী বিচার পরিচালিত হলে কমিশনের সদস্য বাঙালী হলেও তাদের কিছুই করার থাকবে না। কারণ বিচার আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে।  

চুক্তির ৬(খ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কমিশন ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন’, ‘রীতি’ ও ‘পদ্ধতি’ অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি করিবেন’। আবার কমিশন আইনের ৬(গ) ধারায় বলা হয়েছে,  ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন বহির্ভুতভাবে কোন ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান করা হইয়া থাকিলে উহা বাতিলকরণ এবং উক্ত বন্দোবস্তজনিত কারণে কোন বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল।’ সংশোধনীর ধারা ৬(১)(গ) তে বলা হয়েছে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি বহির্ভুতভাবে ফ্রীঞ্জল্যান্ড (জলেভাসা জমি)সহ কোন ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান এবং বন্দোবস্তজনিত কারণে কোন বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল শব্দাবলী প্রতিস্থাপন করা’।

অর্থাৎ এই ভূমি কমিশন কাজ করবে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন অনুযায়ী। বাংলাদেশর আইন অনুযায়ী নয়। এর সাথে স্থানীয় ‘রীতি’ ও ‘পদ্ধতি’ শব্দটিও যুক্ত করা হয়েছে। এখানে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন’, ‘রীতি’ ও ‘পদ্ধতি’ শব্দগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের অখণ্ডতা, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, সংবিধান, সরকারের কৃর্তৃত্ব ও বাঙালীর অস্তিত্বের স্বার্থে খুবই গুরুত্বপুর্ণ।
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন বলতে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের ২(ছ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রচলিত আইন বলিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে এই আইন বলবৎ হইবার পূর্বে যে সমস্ত আইন, ঐতিহ্য, বিধি, প্রজ্ঞাপন প্রচলিত ছিল কেবলমাত্র সেইগুলিকে বুঝাইবে।’অর্থাৎ ২০০১ সালের পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন বোঝাবে।

এখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন বলতে আমরা কয়েকটি আইনের অস্তিত্ব দেখতে পাই। এর মধ্যে ১৯০০ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রণীত পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি- পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বপ্রথম আইন। দুটি বিশেষ কারণে ব্রিটিশ সরকার এই আইন করেছিল বলে মনে করা হয়। ১. পার্বত্য জনগোষ্ঠীর বিশেষ প্রবণতার প্রতি লক্ষ্য করে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও ২. কর আদায়।
প্রথম কারণে বিট্রিশ সরকার এ আইনে বিপুল ক্ষমতা দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সুপারিন্টেন্ডেট নামে একটি পদ সৃষ্টি করে-যা পরে ডেপুটি কমিশনার নামে পরিচিত হয়। দ্বিতীয় কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনটি সার্কেল প্রধান বা রাজার অস্তিত্ব স্বীকার করে নেয়া হয়। যদিও সুপারিন্টেন্ডেন্ট পদটি  এসেছে ১৮৬০ সালের আইন থেকে, ১৮৮১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্ত পুলিশ বিধি প্রণয়েনের মাধ্যমে পাহাড়ীদের মধ্য থেকে একটি পুলিশ বাহিনী গঠনের ক্ষমতা দেয়া হয়।
এ সব মিলেই ১৯০০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি প্রণয়ন করা হয। মূলত কর আদায়ের সুবিধার্থে সেখানে রাষ্ট্রিয় কাঠামোর মধ্যে কারবারী আদালত, হেডম্যান আদালত ও সার্কেল চীফ আদালত গঠন করা হয়। কর, ভূমি ও সামাজিক সমস্যা নিরসনে পার্বত্য বাসিন্দারা প্রথম কারবারী আদালতে বিচার প্রার্থনা করবে, কারবারী আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হেডম্যান আদালতে এবং হেডম্যান আদালতের বিরুদ্ধে সার্কেল চীফের আদালতে আপীল করার ব্যবস্থা রয়েছে। আবার সার্কেল চীফের রায়ের বিরুদ্ধে ডেপুটি কমিশনারের কাছে আপীল করা যাবে। তবে ডেপুটি কমিশনারকে পার্বত্য রীতি, ঐতিহ্য ও পদ্ধতি সম্পর্কে সার্কেল চীফের পরামর্শ গ্রহণ করার বিধান রাখা হয়। তবে ব্রিটিশদের এই আইনে পার্বত্য চট্টগ্রামে হেডম্যানের অনুমতি ছাড়া অস্থানীয় কাউকে ভূমি বরাদ্দ বা ভূমি অধিগ্রহণ করার সুযোগ রাখা হয়নি।

ব্রিটিশদের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল একটি বহির্ভূত রাজ্য এলাকা। কর আদায়ই ছিল তাদের মূখ্য উদ্দেশ্য। ফলে ১৯০০ সালে প্রণীত পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রবিধানে তার প্রভাব পড়ে। ব্রিটিশ আইনটি পাহাড়ী জনগোষ্ঠী জন্য কোনো অনুকূল আইন ছিলনা। কারণ এই আইনের মাধ্যমেই পাহাড়ের ভূমি পাহাড়ীদের হাত থেকে দলিল ও বন্দোবস্তির নামে সরকারের হাতে চলে যায়। অর্থাৎ পাহাড়ের মালিকানা পাহাড়িদের পরিবর্তে সরকারের হাতে চলে যায়। কিন্তু রাজা হিসাবে সার্কেল চীফরা বহাল থাকায় তারা এই আইনের প্রতিবাদ করেনি। এটি ছিল ব্রিটিশের ডিভাইড এ- রুল পলিসির অংশ বিশেষ। 

প্রতিকূল আইন হওয়া সত্ত্বেও আজ পাহাড়ীরা ১৯০০ সালের ব্রিটিশ প্রবিধানকে ধন্য ধন্য করছেন তার একমাত্র কারণ এই আইনে পাহাড়ে বাইরের লোকদের পাহাড়ে পুনর্বাসন ও জমির বন্দোবস্তি পাহাড়ীদের হাতে ছিল বলে। এ ছাড়া এই আইনে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন স্বীকার করে নেয়া হয়।
অন্যদিকে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এটি যখন রাষ্ট্রের অন্তর্ভূক্ত হয় তখন এই আইন তাদের পক্ষে আত্মিকরণ করা সম্ভব ছিলনা। বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট যখন ভারত ভাগ হয় এবং পার্বত্য প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী রাঙামাটিতে ভারতীয় পতাকা ও  বান্দরবানে বার্মার পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সে পতাকা বেশ কিছুদিন যাবত পাকিস্তানে উড়েছিল।

১৭ আগস্ট র‌্যাডক্লিফ রায় প্রকাশিত হবার পর ২১ আগস্ট পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেই পতাকা নামিয়ে ফেলে। ১৭ আগস্ট রায়ের পরও পাহাড়ীরা প্রতিবাদ জানিয়েছিল রায়ের বিরুদ্ধে। এ প্রেক্ষিতে পাকিস্তান সরকার ১৯০০ সালে প্রণীত পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রবিধানমালা- পাকিস্তানের রাষ্ট্রিয় কাঠামোতে অনুমোদন দেননি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্বশাসনকে মেনে নেননি। বরং ১৯৫৮ সালে ভূমি অধিগ্রহণের নিমিত্তে আরেকটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারী করেন। এই প্রজ্ঞাপনের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণ করে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরী করা হয়। এটিও পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন।   

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বেশ কিছু উপজাতীয় সদস্য অংশগ্রহণ করলেও বর্তমান চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়ের পিতা ত্রিদিব রায় ও বোমাং রাজার এক ভাই পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন। ত্রিদিব রায় আজীবন পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য পোষণ করে গত বছর পাকিস্তানেই মারা গেছেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানেও পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্বশাসন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি- ১৯০০ কে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। তবে এরশাদ সরকারের শাসনামলে ১৯৮৯ সালে ব্রিটিশ বিধি অনুসরণে জেলা পরিষদ আইন সৃষ্টি করা হয়। এ আইনে জমি বন্দোবস্তি হেডম্যানদের হাত থেকে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের হাতে অপর্ণ করা হয়। তবে আইন অনুযায়ী জেলা পরিষদ চেয়াম্যান অবশ্যই একজন উপজাতীয় হবেন।

তবে অনেকেই  এখন ১৯০০ সালে প্রণীত পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন বলে প্রচার করতে চাইছেন। কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোতে এই বিধি গ্রহণের সুযোগ নেই। প্রথমত, এই বিধি একটি উপনিবেশিক ধারণা সঞ্জাত আইন। দ্বিতীয়ত, এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্বশাসনকে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। সেকারণে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোতে এই বিধিকে গ্রহণ করা হয়নি। এখন যদি এই বিধি অনুসরণ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধান করা হয় তাহলে আইনগতভাবেই পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বায়ত্বশাসনের পথে এগিয়ে যাবে। কারণ এ বিধির উৎস ও পরিণতি সন্ধান করলেই এ কথা পরিস্কার বোঝা যাবে। এ বিষয়ে তথ্য প্রমাণ আমাদের হাতে রয়েছে। তবে এ লেখায় সেই দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ নেই।

এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত ‘রীতি’, ‘পদ্ধতি’ ও ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত ‘রীতি’, ‘পদ্ধতি’ ও ‘ঐতিহ্য’ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও লিখিত কোনো দলিল পাওয়া যায়না। মূলত এটি কতকগুলো ধারণা ও আচারের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত রীতি, পদ্ধতি ও ‘ঐতিহ্য’ বলতে উপজাতীয়দের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতি, পদ্ধতি ও ঐতিহ্যকে বোঝায়। ভূমির ক্ষেত্রে এই রীতি, ঐতিহ্য ও পদ্ধতি হচ্ছে: পাহাড়ীরা ভূমির ক্ষেত্রে ব্যক্তি মালিকানা, দলিল দস্তাবেজে বিশ্বাসী নয়। তাদের কাছে ভূমি সামষ্টিক অধিকার। পাহাড়ের জমি হচ্ছে সর্বসাধারণের সম্পত্তি। যার মালিক হচ্ছে জনগোষ্ঠী, জ্ঞাতিগোষ্ঠী এমনকি তাদের প্রেত লোকের সদস্যরাও। একক পরিবারগুলো জমি ব্যবহারের অধিকার ভোগ করে থাকে মাত্র। ফলে পাহাড়ীরা মনে করে জমি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এর মালিক তারাই।

জুম চাষের জন্য তারা প্রত্যেক বছর এক স্থান থেকে অন্য স্থনে বসতি স্থানান্তর করে থাকে। কাজেই বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন স্থানে যেখানে তারা জুম চাষ করেছে, বসতি গড়েছে সে জমি তাদের, আগামীতেও যে সকল জমি তাদের চাষের আওতায় আসতে পারে সে সকল জমিও তাদের। পাহাড়ের রীতি অনুযায়ী যে জমিতে তারা চাষাবাদ করেছে/করবে, যে জমি/পাহাড়/বন থেকে তারা আহার সংগ্রহ করেছে, করে বা করবে। যে জমিতে তারা বসতি স্থাপন করেছিল/করেছে/করতে পারে, যে জমি দিয়ে তারা চলাচলের জন্য ব্যবহার করে থাকে, যে জমি থেকে তাদের পোষা প্রাণী খাবার সংগ্রহ করে থাকে, যে জমি তার দৃষ্টি সীমায়, স্বপ্ন ও কল্পনায় তা তাদের সকলের। এখানে নির্দিষ্ট মালিকানা বা দলিলের অস্তিত্ব নেই।
কাজেই এই রীতি বা ঐতিহ্য বা পদ্ধতি অনুযায়ী যদি ভূমি কমিশন বিচার করে সে ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালীর অস্তিত্ব ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে বাধ্য।

আইনের ১৬ নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘বর্ণিত কোন বিষয়ে দাখিলকৃত আবেদনের উপর কমিশন প্রদত্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ানী আদালতের ডিক্রী বলিয়া গণ্য হইবে।’ দেওয়ানী আদালত একটি সাংবিধানিক আদালত। এর বিচারপতিগণ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধান রক্ষায় শপথবদ্ধ থাকেন। অন্যদিকে কমিশনের প্রধান ও অন্যান্য সদস্যরা কেউই শপথবদ্ধ নন। চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি হওয়ায় তিনিও শপথবদ্ধ নন, আবার বাকি সদস্যরা সাধারণ উপজাতীয় যারা হয়তো চুক্তির আগে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন এমন কেউ হতে পারে। বিশেষ করে জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ থেকে যাদের নাম আসবে তাদের ক্ষেত্রে সাবেক শান্তিবাহিনীর সদস্য আসা স্বাভাবিক অথচ তারা শপথবদ্ধ নন। হতে পারে তারা ইউপিডিএফ ও জেএসএস এর সামরিক শাখার গোপন সদস্য।

এছাড়াও অতীতে কোনো মামলা যদি দেওয়ানী আদালতে নিষ্পত্তি হয়ে থাকে, বা দেওয়ানী আদালতে চলমান কোনো মামলা যদি এই কমিশনের দৃষ্টিগোচর হয় তাহলে কমিশনের ভূমিকা কি হবে তা স্পষ্ট নয়। কিম্বা একই মামলা একপক্ষ কমিশনে এবং অন্যপক্ষ দেওয়ানী আদালতে বিচার প্রার্থনা করলে কমিশনের ভূমিকা কি হবে তাও স্পষ্ট নয়। দেওয়ানী আদালত ও কমিশনের মধ্যে কার অবস্থান ঊর্ধ্বে তাও পরিষ্কার নয়। সাংবিধানিক আদালতকে অসাংবিধানিক চুক্তির আওতায় গঠিত কমিশনের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া যায় কিনা সে প্রশ্নটিও বিশাল।
 
তাহলে সরকার কি করবে? শান্তিচুক্তির মধ্যে কিছু অসাংবিধানিক ধারা যে বিদ্যমান তা উচ্চ আদালতের রায় দ্বারা স্বীকৃত। যদিও সে রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত অবস্থায় রয়েছে। তবে উপরিউক্ত আলোচনায় এ কথা প্রমাণিত যে, ভূমি কমিশন তেমনি একটি ধারা বা আইন। বিষয়টি উচ্চ আদালতের দৃষ্টিতে নিলে তা বাতিল হতে বাধ্য বলে অনেক আইনজ্ঞ মনে করেন। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা মোকাবেলায় সরকারের করণীয় হলো, শান্তিচুক্তির ভূমি কমিশন সংক্রান্ত ধারা ও ভূমি কমিশন আইন বাতিল করে দেশের প্রচলিত দেওয়ানী আদালতে এ সমস্যার সমাধান করা। মামলা দ্রুততর করা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে সরকার একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ঘোষণা করতে পারে। তবে তার আগে অবশ্যই ভূমি জরীপের মাধ্যমে ভূমির সীমানা ও মালিকানা নির্ধারণ করতে হবে। নিরাপত্তার অজুহাতে যদি ভূমি জরীপ না করা হয়, বা করা সম্ভব না হয় তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তার জন্য বিশাল আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

মনে রাখা প্রয়োজন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অংশ। এখানে যা কিছু করা হবে তা দেশের প্রচলিত সংবিধান ও আইন মেনেই করতে হবে।

♦ Email: palash74@gmail.com

সৌজন্যে: দৈনিক ইনকিলাব

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

মেহেদী হাসান পলাশ, Mehadi Hassan Palash

মেহেদী হাসান পলাশ
সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় ‘সার্বভৌমত্ব বিরোধী’ পার্বত্য চুক্তি করে আওয়ামী লীগ সরকার পার্বত্য বাঙালীর মনে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল ‘আদিবাসী’ বিষয়ে সরকারের কঠোর ও সঠিক অবস্থান সেই ক্ষতে প্রলেপ লাগিয়েছিল অনেকখানি। কিন্তু গত ৩ জুন হঠাৎ করেই আওয়ামী লীগ সরকার জেএসএস নেতা সন্তু লারমার দাবী পার্বত্য ভ’মি কমিশনের সংশোধনী প্রস্তাব পাশ করে ক্ষতটি খুচিয়ে আবার রক্তাক্ত করে দিল। ফলে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালীরা। ইতোমধ্যে তারা ৫ দিন নজিরবিহীন সফল হরতাল পালন করছে। সামনে আরো কঠিন কর্মসূচী আসছে।

এদিকে বাঙালীদের এই কর্মসূচীর বিরুদ্ধে প্রথমে চুপচাপ থাকলেও ধীরে ধীরে মাঠে নামতে শুরু  করেছে পাহাড়ী বিভিন্ন সংগঠন। ফলে আগামী দিনে ভয়াবহ জাতিগত দাঙ্গা ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের দিকে পরিস্থিতি ধাবিত হচ্ছে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়।
প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষমতার শেষ দিকে এসে হঠাৎ করে সরকার কেন এই ধরনের একটি বিতর্কিত ও সংবেদনশীল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিল? পাহাড় সংশ্লিষ্টদের ধারণা, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে ও এর  আওতায় ভূমি কমিশন আইন সংশোধনী অনুমোদন বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় বিভিন্ন পাশ্চাত্যের দেশ, দাতা সংস্থা ও খ্রিস্টান মিশনারীদের প্রবল চাপ ছিল। ড. ইউনূস, পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে কোণঠাসা সরকার পাশ্চাত্যে তার আন্তর্জাতিক ভাবমর্যাদা উদ্ধার করতেই ক্ষমতার শেষদিকে এসে এ ধরণের একটি সংবেদনশীল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার মধ্যে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তি স্বাক্ষরের সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চুক্তির ঘ খণ্ডের ৪ নং ধারায় প্রত্যাবাসিত উপজাতীয়দের পুনর্বাসনের সহায়তায় তাদের ভূমির মালিকানা ফিরিয়ে দিতে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি ভূমি কমিশন গঠনের প্রস্তাব করা হয় এবং ২ নং ধারায় ‘যথাশীঘ্র সম্ভব ভূমি জরীপ কাজ শুরু’ করার কথা বলা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় এই চুক্তি ও আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাপাঠ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আলোচনার সুবিধার্থে এই আইনের সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ধারা উল্লেখ করা হলো:
শান্তিচুক্তির ঘ খণ্ডের ৪ নং ধারায় বলা হয়েছে,
‘জায়গা-জমি বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তিকল্পে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিশন(ল্যান্ডকমিশন) গঠিত হইবে। পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমি জমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও এ যাবত যেইসব জায়গা জমি ও পাহাড় অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হইয়াছে সেই সমস্ত জমি ও পাহাড়ের মালিকানা স্বত্ব বাতিলকরণের পূর্ণ ক্ষমতা এই কমিশনের থাকিবে। এই কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে কোনো আপীল চলিবে না এবং এই কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া বিবেচিত হইবে। ফ্রীঞ্জল্যান্ডের(জলে ভাসা জমি) ক্ষেত্রে ইহা প্রযোজ্য হইবে।’
৬(খ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি করিবেন।’
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভূমির বৈশিষ্ট বিবেচনায় ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির আগে ভূমি জরীপ সম্পন্ন হওয়া জরুরী ছিল। ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে একাধিকবার এ বিষয়ে সরকারকে তাগিদ দেয়া হয়েছিল। তাদের যুক্তি ছিল আগে ভূমি জরীপ করে ভূমির সীমানা ও মালিকানা নির্ধারণ করার পর বিরোধিত জমির সিদ্ধান্ত ভূমি কমিশনের কাছে হস্তান্তর করা হোক। কিন্তু উপজাতীয় সংগঠনগুলোর প্রবল বিরোধিতার কারণে ভূমি জরীপ নিষ্পন্ন করা যায়নি। এভাবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলে সরকার বিভিন্ন পক্ষের চাপের মুখে ভূমি জরীপ ছাড়াই ২০০১ সালের ১৭ জুলাই ভূমি কমিশন আইন পাস করে। এরপরও ভূমি জরীপ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে কিন্তু নিরাপত্তার কারণে বা অজুহাতে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

এখানে পরবর্তী আলোচনার সুবিধার্থে ভূমি কমিশন আইনের কয়েকটি ধারা উল্লেখ করা হলো:

‘৩। কমিশনের গঠন : (১) এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন নামে একটি কমিশন থাকিবে।
(২) নিম্নবর্ণিত সদস্যগণ সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হইবে, যথা :
(ক) বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, যিনি উহার চেয়ারম্যানও হইবেন,
(খ) সার্কেল চীফ (সংশ্লিষ্ট),
(গ) আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান বা তাহার প্রতিনিধি হিসেবে তৎকর্তৃক মনোনীত উক্ত পরিষদের একজন সদস্য,
(ঘ) সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পদাধিকারবলে,
(ঙ) চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কশিনার বা তৎকর্তৃক মনোনীত একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার।
ব্যাখ্যা : দফা (গ) এবং (ঘ)-এর উদ্দেশ্য পূরণকল্পে ‘সংশ্লিষ্ট’ অর্থ বিরোধীয় ভূমি যথাক্রমে যে পার্বত্য জেলা এবং যে সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত সেই পার্বত্য জেলা এবং সেই সার্কেল।
৬। কমিশনের কার্যাবলী ও ক্ষমতা : (১) কমিশনের কার্যাবলী নিম্নরূপ হইবে, যথা :
(ক) পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা,
(খ) আবেদনে উল্লিখিত ভূমিতে আবেদনকারী বা ক্ষেত্রমত সংশ্লিষ্ট প্রতিপক্ষের স্বত্ব বা অন্যবিধ অধিকার পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নির্ধারণ এবং প্রয়োজনবোধে দখল পুনর্বহাল,
(গ) পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন-বহির্ভূতভাবে কোনো ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান করা হইয়া থাকিলে উহা বাতিলকরণ এবং উক্ত বন্দোবস্তজনিত কারণে কোনো বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল :
তবে শর্ত থাকে যে, প্রযোজ্য আইনের অধীনে অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং রক্ষিত (Reserved) বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন শিল্প কারখানা ও সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমির ক্ষেত্রে এই উপ-ধারা প্রযোজ্য হইবে না।
১৬। কমিশনের সিদ্ধান্তের আইনগত প্রকৃতি এবং চূড়ান্ত।                                                                    ধারা ৬(১)-এ বর্ণিত কোনো বিষয়ে দাখিলকৃত আবেদনের উপর কমিশন প্রদত্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ানী আদালতের ডিক্রি বলিয়া গণ্য হইবে, তবে উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আদালত বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের নিকট আপিল বা রিভিশন দায়ের বা উহার বৈধতা সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।
১৭। কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন।- (১) অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন কমিশনের সিদ্ধান্ত দেওয়ানী আদালতের ডিক্রি বা ক্ষেত্রমতো আদেশের ন্যায় উহার কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মাধ্যমে বা প্রয়োজনবোধে সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করিতে বা করাইতে পারিবে।’

কিন্তু শুরু থেকেই এই আইনের বিরোধিতা করে আসছিলেন জেএসএস নেতা সন্তু লারমাসহ কিছু উপজাতীয় নেতা। তাদের বিরোধিতার কারণেই সরকার গঠিত চারটি ভূমি কমিশন কার্যকর হতে পারেনি। সন্তু লারমার দাবী, শান্তি চুক্তির একটি লিখিত ফর্ম ও একটি অলিখিত ফর্ম(সাধারণ সমঝোতা) ছিল। তিনি সেভাবেই ভূমি কমিশন সংস্কারের লক্ষ্যে ২৩ দফা সংস্কার প্রস্তাব করেন। অনেক আলাপ আলোচনার পর ২০১২ সালের ৩০ জুলাই সরকার এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এর ১৩টি প্রস্তাব গ্রহণ করে।
কিন্তু সে সময় পার্বত্য বাঙালীরা এর বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন গড়ে তুললে সরকার সে সংশোধনী অনুমোদন করা থেকে বিরত থাকে। এ ঘটনার প্রায় ৯ মাস পর পার্বত্য সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে নতুন করে এ সংশোধনী অনুমোদনের উদ্যোগ নেয়। ফলে ২৭ মে মন্ত্রী সভায় সংশোধনীর খসড়া প্রস্তাব ও ৩ জুন চূড়ান্ত প্রস্তাব পাশ করা হয়।

উল্লেখযোগ্য সংশোধনীসমূহ:
ধারা ৬(১)ক : “পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমি-জমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হওয়া জায়গা জমি ও পাহাড়ের মালিকানাস্বত্ত্ব বাতিলকরণসহ সমস্ত ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা।”
 ধারা ৬(১)(গ) : “পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে ফ্রীঞ্জল্যান্ড (জলেভাসা জমি)সহ কোন ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান এবং বন্দোবস্তজনিত কারণে কোন বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল:” শব্দাবলী প্রতিস্থাপন করা।
ধারা ৭ এর (৫) : “চেয়ারম্যান উপস্থিত অন্যান্য সদস্যদের সহিত আলোচনার ভিত্তিতে ৬(১)-এ বর্ণিত বিষয়টিসহ উহার এখতিয়ারভুক্ত অন্যান্য বিষয়ে সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত  গ্রহণ করিবেন, তবে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত সম্ভব না হইলে চেয়ারম্যানসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের গৃহীত সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলিয়া গণ্য হইবে;।”
১৩(২) ধারার পরে নতুন উপধারা সংযোজন : “(৩) এই ধারার অধীন কমিশনের সচিব এবং অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে পার্বত্য জেলার উপজাতীয়দের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদান করা হইবে।”

এ সংশোধনী পাশের পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালীরা হরতাল অবোরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে আসছে। তাদের দাবী, এই প্রস্তাব পাশ করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালীর অবস্থান ও অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। এসকল কর্মসূচী সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে যে বিপূল স্বতস্ফুতর্তার সাথে পালিত হয়েছে তাতে প্রমাণ করে দলমত নির্বিশেষে পার্বত্য বাঙালীরা কিভাবে দেখছে এই আইনকে।

এখানে উল্লেখ্য যে, ইতোমধ্যে বাংলাদেশের হাইকোর্টে শান্তিচুক্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি রীট দায়ের করা হয়েছিল। দীর্ঘ শুনানীর পর ২০০৯ সালে আদালত সম্পূর্ণ চুক্তিকে বাতিল না করে এর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ধারাকে বাংলাদেশের সংবিধান, ও সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রিয় অখণ্ডতা বিরোধী বলে তা বাতিল ঘোষণা করে। কিন্তু সরকার এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রীমকোর্টে আপীল করলে সুপ্রীমকোর্ট আপীল গ্রহণ করে রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত ঘোষণা করে। সংবাদপত্রের রিপোর্ট সূত্রে জানা গিয়েছিল, সেই রীটের শুনানীতে আদালতে ভূমি কমিশন প্রসঙ্গ এলে সরকার পক্ষ থেকে বলা হয়ছিল, এখনো সরকার ভূমি কমিশন বাস্তবায়ন করছেনা বরং ভূমি জরিপের পর কমিশন কাজ করবে। কাজেই এটা নিয়ে এখনই আলোচনার কিছু নেই। এ কথার প্রেক্ষিতে আদালতও যখন ভূমি কমিশন বাস্তবায়ন হবে তখন এ বিষয় নিয়ে ভাবা যাবে বলে মন্তব্য।

পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধনী বিশ্লেষণের আগে  শান্তি চুক্তি ও ভুমি কমিশন আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।
১.    শান্তিচুক্তিতে ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসাবে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির কথা বলা হলেও ভূমি কমিশন আইনে বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির কথা বলা হয়।
২.    শান্তিচুক্তির ঘ খণ্ডের ৪ নং ধারায় কেবলমাত্র ‘ পুনর্বাসিত শরণার্থিদের জমি জমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি’র কথা বলা হয়েছে। একইভাবে ভূমি কমিশন আইনের ৬(ক) ধারায়ও ‘পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা’র কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ আইন অনুযায়ী কেবল পুনর্বাসিত শরণার্থিদের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এর দায়িত্ব। এখানে পার্বত্য অঞ্চলের বৃহৎ জনগোষ্ঠী বাঙালীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ নেই।
৩. শান্তিচুক্তির ৬(খ). ধারায় বলা হয়েছে, কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি করিবেন। আবার আইনের ৬(গ) ধারায় বলা হয়েছে,  পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন বহির্ভুতভাবে কোন ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান করা হইয়া থাকিলে উহা বাতিলকরণ এবং উক্ত বন্দোবস্তজনিত কারণে কোন বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল। সংশোধনীতে তা বলা হয়েছে, ধারা ৬(১)(গ) : “পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি বহির্ভুতভাবে ফ্রীঞ্জল্যান্ড (জলেভাসা জমি)সহ কোন ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান এবং বন্দোবস্তজনিত কারণে কোন বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল:” শব্দাবলী প্রতিস্থাপন করা।
অর্থাৎ এই ভূমি কমিশন কাজ করবে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন অনুযায়ী। বাংলাদেশর আইন অনুযায়ী নয়। এর সাথে স্থানীয় ‘রীতি’ ও ‘পদ্ধতি’ শব্দটিও যুক্ত করা হয়েছে। এখানে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন’, ‘রীতি’ ও ‘পদ্ধতি’ শব্দগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের অখণ্ডতা, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, সংবিধান, সরকারের কৃর্তৃত্ব ও বাঙালীর অস্তিত্বের স্বার্থে খুবই গুরুত্বপুর্ণ।
৪. চুক্তির ঘ খন্ডের ৪ নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল চলিবেনা’। অন্যদিকে ভূমি কমিশন আইনের ১৬ নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘ উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন আদালত বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষের নিকট আপীল বা রিভিশন দায়ের বা উহার বৈধতা সম্পর্কে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’ এখানে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের কর্তৃত্ব, ক্ষমতা ও এখতিয়ারকে খর্ব করা হয়েছে।
৫. আইনের ১৬ নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘বর্ণিত কোন বিষয়ে দাখিলকৃত আবেদনের উপর কমিশন প্রদত্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ানী আদালতের ডিক্রী বলিয়া গণ্য হইবে।’ দেওয়ানী আদালত একটি সাংবিধানিক আদালত। এর বিচারপতিগণ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধান রক্ষায় শপথবদ্ধ থাকেন। অন্যদিকে কমিশনের প্রধান ও অন্যান্য সদস্যরা কেউই শপথবদ্ধ নন। চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি হওয়ায় তিনি শপথবদ্ধ নন, আবার বাকি সদস্যরা সাধারণ উপজাতীয়, যারা হয়তো চুক্তির আগে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন এমন কেউ হতে পারেন, অথচ তারা শপথবদ্ধ নন। প্রকৃতপক্ষে আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদ থেকে যে নামগুলো আসবে তাদের জেএসএস ও ইউপিডিএফ’র  বর্তমান বা সাবেক ও প্রকাশ্য বা গোপন সদস্য হবার সম্ভাবনাই বেশী।

Email: palash74@gmail.com

সৌজন্যে: দৈনিক ইনকিলাব

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩