image_pdfimage_print

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা হত্যার বিচার দাবী উচ্চকিত নয় কেন?

পারভেজ হায়দার

১০ নভেম্বর ২০১৭ পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সন্তু লারমার ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের পরিক্রমা পরিবর্তনে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ওরফে এমএন লারমা একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র । উপজাতীদের একাংশ তাকে জুম্ম জাতির পিতার ন্যায় শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছে, অপর অংশ এমএন লারমা সংক্রান্ত বিষয়দি সব সময়ে এড়িয়ে যেতে চায় । এমএন লারমাকে উপজাতিদের বড় অংশ সব সময়ে আলোচনার বাহিরে রাখতে পারলেই প্রশান্তি বোধ করে, আর এটাও ঠিক বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এমএন লারমার হাত ধরেই “পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি” দলটি গড়ে উঠেছিল, আবার এমএন লারমার হাত ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংগঠন “শান্তি বাহিনী” গড়ে উঠেছিল ।

ব্যক্তি জীবনে এমএন লারমা উপজাতীদের অধিকার আদায়ে একজন প্রথম সারির নেতা ছিলেন, তিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন । তিনি কেন বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশ পূনর্গঠনে ব্যস্ত তৎকালীন সরকারকে তাদের দাবি দাওয়া সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট সময় না দিয়ে, সম্পূর্ণ অনিয়মতান্ত্রিক পথ অর্থাৎ সশস্ত্র দল গঠন করে স্বাধীন দেশের স্বাধীন সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী ও সাধারণ জনগনের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের সূচনা করেছিলেন সে বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্ত পরিস্থিতি সৃষ্টির পিছনে এমএন লারমার বির্তকিত ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনার আগে তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নেওয়া যাক । তার জন্ম ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে রাঙ্গামাটি’র চাকমা উপজাতির একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে । তিনি ১৯৫৬ সালে রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন । পরবর্তীতে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৬৩ সালে একই কলেজ থেকে তিনি বিএ পাশ করেন । তিনি ১৯৬৮ সালে কুমিল্লা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে থেকে বিএড ডিগ্রী অর্জন করেন ।

পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম আইন কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রী অর্জন করেন এবং চট্টগ্রাম জেলা বার এর একজন সদস্য আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন ।

পড়াশুনার পাশাপাশি ছাত্রজীবন থেকেই এমএন লারমা উপজাতিদের বিভিন্ন অধিকার সুরক্ষাজনিত আন্দোলনে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতেন । তিনি ১৯৫৬ সালে “জুমিয়া স্টুডেন্ট মুভমেন্ট” গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং পরবর্তিতে ১৯৬২ সালে পার্বত্য অঞ্চলের যুবকদের নিয়ে একটি সংগঠন “পাহাড়ি ছাত্র সমিতি” গঠন করেন ।

১৯৬০ সালে কাপ্তাই হাইড্রো ইলেকট্রিক প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হবার পর এমএন লারমার পরিবার রাঙ্গামাটি থেকে খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়িতে স্থানান্তরিত হয় । তাকে ১৯৬৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী তারিখে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তার বিতর্কিত ভূমিকার কারণে গ্রেফতার করে ।

পরবর্তীতে দুই বছর পর তিনি ৮ মার্চ ১৯৬৫ সালে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে উপজাতিদের অধিকার সমুন্নত রাখার আন্দোলনে রাজনৈতিকভাবে তার অনুসারীদের এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থানরত বিভিন্ন উপজাতি সম্প্রদায়কে একত্রিত করতে সচেষ্ট হন। নিয়মতান্ত্রিকভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে এমএন লারমা’র জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে । ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে তিনি নির্বাচনে জয়লাভ করেন ।

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে চাকমা সম্প্রদায়ের বিতর্কিত ভূমিকা সর্বজনবিদিত । তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে রাজাকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন । তিনি চাকমা সম্প্রদায়ের অধিবাসীদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।

সে প্রেক্ষিতে এমএন লারমা চাকমা জনগোষ্ঠীর একজন সদস্য হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে জানা যায়। এমনকি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চাকমা এলাকাগুলোতে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলিত হতে থাকে । পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের জানুয়ারীতে মুক্তিযোদ্ধাগণ সেখানে গিয়ে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে, বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিলেন ।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ১০ জানুয়ারী ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসেন । দেশে ফেরার পর যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে জনগনকে উদ্বুদ্ধ করে একযোগে কাজ করা শুরু করেন । পুরো জাতি যখন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনগঠনে ব্যস্ত তখন এমএন লারমা ১৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৭২ সালে “পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি” দল গঠন করেন ।

নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির এই পরিক্রমায় হঠাৎ করেই এমএন লারমা ১৯৭৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির একটি সশস্ত্র শাখা “শান্তিবাহিনী” গঠন করেন । বিষয়টি নিয়ে একটি জনশ্রুতি ছিল যে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক গঠিত পিস কমিটির কমিটির চিন্তাধারা থেকেই এর বাংলা প্রতিশব্দ “শান্তিবাহিনী” নামটির উৎপত্তি হতে পারে । “শান্তিবাহিনী” নামকরণের পিছনে অন্যান্য গ্রহণযোগ্য বেশকিছু মতামত রয়েছে । কোন কোন গবেষক মনে করেন এটি এমএন লারমার ছোট ভাই সন্তু লারমা’র নামের প্রথম অংশ ‘সন্তু’ তথা শান্তি থেকে এ নামকরণ করা হয়েছে । কবি ও লেখক আহমদ ছফা’র মতে “শান্তিবাহিনী” অনেকটা তৎকালীন চরমপন্থী তথা “সর্বহারা পার্টি” দ্বারা প্রভাবিত ।

তখন চীনাপন্থী বিভিন্ন চরমপন্থী দলের নেতাকর্মী পার্বত্য অঞ্চলে আত্মগোপন করে থাকতেন । পার্বত্য জনগোষ্ঠীর নেতারা তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন । সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ শিকদার তার “জনযুদ্ধের পটভূমি” নামক কবিতার বই এ পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসিদের গেরিলা সংগ্রামে নিয়ে আসার কথা উল্লেখ করেছিলেন ।

এমএন লারমা গোপনে “শান্তিবাহিনীর” সশস্ত্র দলের প্রস্তুতির পাশাপাশি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিও  চালিয়ে যাচ্ছিলেন । ১৯৭৩ সালে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এমনকি ১৯৭৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান কর্তৃক বাকশাল গঠন করা হলে এমএন লারমা বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন । অর্থাৎ তিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পাশাপাশি দেশ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন ।

এমএন লারমা চীনাপন্থী কমিউনিজমে বিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু তার সহযোদ্ধা ও অনুসারীরা সকলেই একই নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না । তাই ১৯৭৬ সালেই শান্তিবাহিনীর মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয় ।

শান্তিবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা প্রীতি কুমার চাকমা চীনাপন্থী কমিউনিজম এর সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন । ১৯৭৬ সালে সৃষ্ট শান্তিবাহিনীর মধ্যে বিভক্তি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ১৯৮১ সালের মধ্যে শান্তিবাহিনীর বিভক্তি চরম আকার ধারণ করে । সেপ্টেম্বর ১৯৮১, আগস্ট ১৯৮২, এবং জুলাই ১৯৮৩ সালে এমএন লারমা গ্রুপ এবং প্রীতি গ্রুপের মধ্যে বেশ কয়েকবার বড় ধরণের সংঘর্ষ হয় । ঐ সংঘর্ষসমূহে শতাধিক শান্তিবাহিনী সদস্য নিহত হয়েছিলেন ।

এরই মধ্যে  ১০ ডিসেম্বর ১৯৮৩ সালে সীমান্তের ওপারে ইমারা গ্রামের বাঘমারা নামক স্থানে শান্তিবাহিনীর কল্যাণপুর ক্যাম্পে প্রীতি গ্রুপের সদস্যদের হামলায় এমএন লারমা নিহত হন । এমএন লারমার সাথে সে সময়ে তার বড় ভাইয়ের শ্যালক মনি চাকমা, খাগড়াছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক অর্পণা চরণ চাকমা, কল্যাণময় চাকমা এবং লে. রিপনসহ শান্তিবাহিনীর ৮জন সদস্য ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান । একই সময়ে শান্তিবাহিনীর কেন্দ্রীয় পর্যায়ের ৬-৭ জন কেন্দ্রীয় নেতাও এ হামলায় আহত হয়েছিলেন ।

কল্যাণপুর ক্যাম্পের অপারেশন এর ঘটনা সম্পর্কে যতদূর জানা যায়, প্রীতি গ্রুপের ক্যাপ্টেন এলিন এর নেতৃত্বে ৮-১০ জনের একটি সশস্ত্র দল লারমা গ্রুপের ক্যাম্পে অতর্কিত সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে উক্ত ঘটনা ঘটায় । ঐ সময়কার ঘটনাবলী সম্পর্কে আরও জানা যায়, একই দিনে মতিবান পুলিশ ক্যাম্প হতে ১ মাইল পূর্বে প্রীতি গ্রুপ এমএন লারমার মামার বাড়িতে অবস্থানরত শান্তিবাহিনীর সদস্যদের উপরও আক্রমণ চালায়, যদিও এ আক্রমণে কেউ হতাহত হয়নি ।

এমএন লারমা হত্যাকাণ্ডে পর তার অনুজ সন্তু লারমা জন সংহতি সমিতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন । তবে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে আজ অবধি কোথাও কোন মামলা হয়নি অথবা লারমা গ্রুপ থেকেও উল্লেখযোগ্য কোন প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি । এমএন লারমাকে হত্যা করার বিষয়টির সত্যতা থাকার পরও এ বিষয়ে কোন আন্দোলন অথবা প্রতিবাদের ঘটনা ঘটেনি ।

অন্যদিকে কল্পনা চাকমার বিষয়টির প্রচারিত গল্পের কোন সত্যতা বা ভিত্তি না থাকলেও বিষয়টিকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর কল্পনা চাকমা অপহরণ দিবস ও বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচী পালন করা হচ্ছে যা উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর স্ববিরোধী ভূমিকারই বহিঃপ্রকাশ ।

তবে কি এমএন লারমার বিষয়ে উপজাতি নেতৃবৃন্দ তাদের নেতৃত্বের আন্তঃকলহকে দায়ী করছেন? নাকি এমএন লারমা’র হত্যার পর যেসকল উপজাতি ব্যক্তিবর্গ উচ্চ নেতৃত্বের স্বাদ পেয়েছেন, তাদেরও কিছুটা পরোক্ষ ইন্ধন ছিল? এ প্রশ্নের উত্তর পরবর্তী সময়ই বলে দিবে ।

এভাবেই এমএন লারমার মত একজন প্রতিভাবান উপজাতি নেতা হত্যাকাণ্ডের সাথে সাথে একটি বিতর্কিত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে । তবে তার মাধ্যমে সৃষ্ট শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র কার্যক্রম এবং এর ফলশ্রুতিতে অসংখ্য জীবনহানির ঘটনা ইতিহাসের কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত থাকবে ।

যে সময়টাতে এমএন লারমা “শান্তিবাহিনী” গঠন করে সশস্ত্র কার্যক্রম শুরু করেছিলেন সে সময়ে পার্বত্য অঞ্চলে তাদের ভাষায় তথাকথিত সেটেলার বাংগালীগণ অবস্থান করতে শুরু করেনি । “শান্তিবাহিনী”র ব্যনারে গেরিলা সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার পূর্বে এমএন লারমা এবং তার অনুসারীদের উচিত ছিলো নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের দাবি দাওয়া তুলে ধরা।

এমএন লারমা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের স্বার্থ বিরোধী কাজ করেলেও তিনি যেহেতু একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন, তার উচিত ছিলো সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের সরকারকে সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া । কিন্তু তিনি তা না করে, বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে নিজেকে সম্পৃক্ত করে নিজ দেশের জনগণ ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শুরু করেছিলেন যা তাকে “গ্রেট লিডার” বলাতো দুরের কথা তাকে ইতিহাসের একজন “খল নায়ক” হিসেবে পরিগণিত করাই সমীচীন হবে ।

উপজাতী ব্যক্তিবর্গের মধ্যেও তার মৃত্যু দিবস পালনে যথেষ্ট বিতর্ক ও বিভক্তি রয়েছে । তার আপন ভাই পার্বত্য জনসংহতি সমিতি এর সভাপতি সন্তু লারমাসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ এবং ইউপিডিএফ নেতৃবৃন্দদের মধ্যে কাউকে তার হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়া এবং তার সম্পর্কে আলোচনা করতে খুব একটা দেখা যায় না । শুধুমাত্র জেএসএস (সংস্কার) দলটি জেএসএস (এমএন লারমা) হিসাবে নিজেদের পরিচিত করে “এমএন লারমার” নামের ব্যানার ব্যবহার করে বিভিন্ন দিবসে কর্মসূচি দিয়ে থাকে এবং এ দিবস পালনের নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক চাঁদাবাজি করে থাকে।

এমএন লারমার জীবনের সার্বিক বিষয় মূল্যায়নে বলা যায় তিনি একজন বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব যিনি দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে একটি সশস্ত্র সংগ্রামের জন্ম দিয়েছেন, যার প্রতিফল হিসাবে ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশকে চরমভাবে মূল্য দিতে হয়েছে এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সৃষ্টিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে ।

এমএন লারমার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পাহাড়ে বেপরোয়া চাঁদাবাজী চলছে

সন্তোষ বড়ুয়া, রাঙামাটি থেকে:

পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা মানবেন্ত্র নারায়ন লারমার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় বেপরোয়া চাঁদাবাজী শুরু করেছে উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর একাংশ। তিন পার্বত্য জেলায় অনুসন্ধান চালিয়ে, সাধারণ মানুষ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে কথা বলে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

উল্লেখ্য, আগামী ১০ নভেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এম এন লারমা) এর ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮৩ সালের এই দিনে তিনি নিজ দলের বিদ্রোহী সশস্ত্র শাখার গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। এই দিনটিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি সশস্ত্র সংগঠনের একটি অংশ জুম্মজাতির শোক দিবস হিসেবে পালন করে ।

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সকল নাগরিকদের কাছে জাতির পিতা “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব” হলেও, উপজাতি সশস্ত্র সংগঠনের ঐ গ্রুপ দাবী করে এম এন লারমা তাদের  জাতির পিতা। কিন্তু, তারা যাকে তাদের জাতির পিতা বলে মান্য করে ৩৪ বছর পার হয়ে গেলেও তারা তাদের সেই জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচার চায়নি কখনও।

অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামে যে কোন উপজাতি ব্যক্তি খুন হলে অথবা ছোটখাট অনেক বিষয় নিয়ে তারা দেশে-বিদেশে সরকার, সেনাবাহিনী এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের ঘাড়ে মিথ্যা দোষ চাপিয়ে নানান ধরণের প্রচার প্রচারণা চালালেও নিজ জাতির পিতা বলে খ্যাত এত বড় একজন নেতার হত্যাকারী কারা, তিনি কেন মারা গিয়েছিলেন, হত্যাকারীরা এখন কোথায় কি অবস্থায় আছে এ সমস্ত বিষয়গুলি নিয়ে তারা কখনই দাবি বা আন্দোলন করেনি। উপজাতিদের এই নীরবতা জনমনে প্রশ্ন এবং সন্দেহের উদ্রেক সৃষ্টি করে।

ইতিহাসের ঘটনাবলী থেকে জানা যায় যে, এম এন লারমা পাহাড়ি ছাত্র সমিতির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষিত তরুণদের সংগঠিত করেন এবং ১৯৭২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। সাবেক সংসদ সদস্য মি. রোয়াজা ছিলেন উক্ত সংগঠনের সভাপতি এবং এম এন লারমা ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। ১৯৭০ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে এম এন লারমা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনেও এম এন লারমা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।

এম এন লারমা সংসদ সদস্য হিসাবে নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিচালনাকালে পাহাড়ি ছাত্র সমিতিসহ কতিপয় তরুণদের সাথে তার ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। ১৯৭৩ সালে এম এন লারমা জনসংহতি সমিতির একটি সশস্ত্র গ্রুপ গঠন করেন, পরে তা শান্তিবাহিনী রূপে পরিচিতি লাভ করে।

১৯৭৬ সালে ক্ষমতার লোভ, স্বার্থপরতা, দলীয় মতাদর্শসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শান্তিবাহিনীর মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। এ সময় এম এন লারমা চীনাপন্থী ও প্রীতি কুমার চাকমা ভারতপন্থী নীতি গ্রহণ করেন।

১৯৮১ সালে শান্তিবাহিনী সম্পূর্ণ রূপে দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই সময় দলীয় কোন্দল চরম আকার ধারণ করে যার ফলে নিজেদের মধ্যে মারামারি আর হানাহানিতে শান্তিবাহিনীর শতাধিক সদস্য নিহত হয়।

এই ঘটনার জের ধরেই ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর আন্তঃদলীয় কোন্দল আর ক্ষমতার লোভের বলি হিসেবে প্রতিপক্ষ প্রীতি গ্রুপের সশস্ত্র হামলায় নিহত হন এম এন লারমা।

এ প্রসংগে ১৮ নভেম্বর ১৯৮৩ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয় যে, “তথাকথিত শান্তিবাহিনীর প্রধান এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির চেয়ারম্যান মি: মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা নিহত হইয়াছেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়া গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাত্রে আমাদের রাংগামাটি সংবাদদাতা জানান, মি: লারমা গত ১০ই নভেম্বর সীমান্তের অপর পারে ভারতে ইমারা গ্রামে বাগমারা নামক স্থানে শান্তিবাহিনীর কল্যানপুর ক্যাম্পে প্রতিদ্বন্দ্বী শান্তিবাহিনীর ‘প্রীতি’ গ্রুপের সদস্যদের হামলায় নিহত হইয়াছেন”।

বিভিন্ন তথ্য বিবরণী এবং ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, শান্তিবাহিনীর ক্যাপ্টেন এলিনের নেতৃত্বে প্রীতিগ্রুপের আট-দশজনের একটি সুইসাইডাল স্কোয়াড এম এন লারমা গ্রুপের শিবিরে সশস্ত্র অভিযান চালায়। উক্ত হামলায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সাথে তার বড় ভাইয়ের শ্যালক মনি চাকমা, খাগড়াছড়ি হাই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক অপর্ণা চরম চাকমা, কল্যানময় চাকমা ও স্বঘোষিত লেফটেনেন্ট রিপনসহ শান্তিবাহিনীর মোট আটজন সদস্য ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান।

ঘটনার পরপর প্রীতি কুমার চাকমা তার দলবল নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় এম এন লারমা গ্রুপের অন্যান্য সদস্যদেরকেও হত্যা করার জন্য খুঁজে বেড়াতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১০ নভেম্বর ১৯৮৩ সালে একই দিনে প্রীতি গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা খাগড়াছড়ির তৎকালীন লতিবান পুলিশ ক্যাম্পের এক মাইল পূর্বে এম এন লারমার মামার বাড়িতে অবস্থানরত শান্তিবাহিনীর সদস্যদের উপরও আক্রমন চালায়। কিন্তু উক্ত আক্রমনে অবশ্য কেউ হতাহত হয়নি।

এম এন লারমার মৃত্যুর পর জনসংহতি সমিতির পূর্ণ নেতৃত্ব চলে যায় তার আপন ভাই সন্তু লারমার হাতে যিনি বর্তমানে জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান। সন্তু লারমার পাশাপাশি বর্তমানে উল্লেখযোগ্য উপজাতি নেতার মধ্যে আছেন সাবেক শান্তিবাহিনী কমান্ডার ঊষাতন তালুকদার যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে একজন নির্বাচিত সাংসদ এবং জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য। এম এন লারমার মৃত্যুর ৩৪ বছর হয়ে গেলেও জনসংহতি সমিতির নেতারা কখনই তাদের অবিসংবাদিত নেতা এম এন লারমার হত্যার বিচার চায়নি।

১০ নভেম্বর উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর একাংশ বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু তারা তাদের নতুন প্রজন্মের কাছে এই মৃত্যুর ইতিহাস চাপা দিয়ে রেখে শুধুমাত্র দিবসটিকে জুম্ম জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করে। কারণ এই ঘটনার মধ্যে তাদের জাতিগত হিংস্রতা আর বিভেদের চিত্র প্রকাশ পায়।

তাই এই ঘটনা নতুন প্রজন্মের কাছে তারা কৌশলে গোপন করে রাখে। প্রতি বছর এই দিবসকে সামনে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতি  সশস্ত্র সংগঠণগুলোর চাঁদাবাজির তৎপরতা বেপরোয়াভাবে বৃদ্ধি পায়। এতে করে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল শ্রেণী-পেশার সাধারণ উপজাতি ও বাঙালিরা ঐসব সশস্ত্র সংগঠনগুলোর হুমকির মুখে চাঁদা দিতে বাধ্য হয়। প্রাণভয়ে এ বিষয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।

চলতি বছরও ১০ নভেম্বরকে সামনে রেখে পাহাড়ে চলছে ব্যাপক চাঁদাবাজি। বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান, কাঠ ব্যবসায়ী সমিতি, যানবাহন মালিক সমিতি, ব্রিকফিল্ড সমিতি, জেলা পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড, ব্যাংক, এনজিও, সরকারি/বেসরকারি অফিস ইত্যাদি থেকে চিঠি দিয়ে রশিদের মাধ্যমে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।

পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের চাঁদা আদায়ের এরকম একটি রশিদ এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। মূলতঃ ১০ নভেম্বরকে পুঁজি করে উপজাতি সংগঠণগুলো ব্যাপক চাঁদাবাজি করে নিজেদেরকে আর্থিকভাবে হৃষ্টপুষ্ট করছে। ১০ নভেম্বর এখন আর জুম্ম জাতির শোক দিবস নয় বরং অবৈধ চাঁদা আদায়ের বাণিজ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে পাহাড়ের স্থাণীয় ভূক্তভোগীরা জানান।