বাঙ্গালী বসতি স্থাপন ও প্রতিরক্ষা

gussagram 1
আ তি কু র  র হ মা ন:

বাংলাদেশ রাষ্ট্র বাঙ্গালী সংখ্যাগরিষ্ঠতার ফসল। পার্বত্য চট্টগ্রাম তারই ভৌগোলিক অঞ্চল। পার্বত্য চট্টগ্রামের অমুসলিম প্রধান অঞ্চল হওয়া মৌলিক নয়, কৃত্রিম। এ কারণেই ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগকালে এটি ভারতের প্রাপ্য বা স্বতন্ত্র অঞ্চলরূপে স্বীকৃতি লাভ করেনি।

ভারত বিভাগকালে সীমান্তবর্তী অঞ্চলসমূহের ভাগ্যে অনেক ওলট-পালট হয়েছে। পূর্ব পাঞ্জাবের অধীন গুরুদাসপুর জেলা সীমান্তবর্তী মুসলিম প্রধান অঞ্চলরূপে পাকিস্তানের প্রাপ্য ছিলো। কিন্তু কাশ্মীরের পক্ষে ভারতের সাথে যোগদানের সুযোগ বজায় রাখার প্রয়োজনে ভূমি সংযোগরূপে গুরুদাসপুরকে ভারতভুক্ত করে দেয়া হয়। ঠিক একই কারণে আসাম ও ত্রিপুরার সাথে ভারতের ভূমি সংযোগ রক্ষার প্রয়োজনে, পশ্চিম দিনাজপুর ও করিমগঞ্জ অঞ্চলকে ভারতের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এই দুই সংযোগ ঘটান না হলে কাশ্মীর হতো পাকিস্তানের বাধ্য অঞ্চল, এবং আসাম ও ত্রিপুরা হতো বাংলাদেশের দ্বারা বিচ্ছিন্ন বাধ্য এলাকা। পার্বত্য চট্টগ্রামের পক্ষে অনুরূপ ভূমি সংযোগ হওয়ার কোনরূপ ভৌগোলিক ও জাতিগত আনুকুল্য ছিলো না। এর উত্তরে অবস্থিত ত্রিপুরা ও পূর্বে অবস্থিত মিজোরাম দুর্গম পর্বতসংকুল সীমান্ত। এ পথে আসামের সাথে সংযোগ সাধন দুরুহ। জাতিগতভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামবাসী উপজাতীয়রা হলো বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত ও স্বতন্ত্র। স্থল যোগাযোগের দুরুহতা ও জাতিগত ভিন্নতা হেতু, এতদাঞ্চলের ভারতভুক্তি বিচ্ছিন্নতারই সহায়ক হবে বলে বিবেচিত হয়। সুতরাং চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অখন্ডতা, অর্থনৈতিক অভিন্নতা ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে রক্ষার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামকে সঠিকভাবেই বাংলাদেশভুক্ত রাখা হয়, যার কোন বিকল্প ছিলো না।

ভৌগোলিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম, মুল চট্টগ্রামেরই অংশ এবং লোক হিসেবে স্থানীয় উপজাতীয়রা জেলা ভাগের সুযোগে আকস্মিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মাত্র। তারা আদি চট্টগ্রামী মূলের লোক নয়। অভিবাসনের মাধ্যমে তারা হালে স্থানীয় অধিবাসী রূপে স্বীকৃত। মাত্র শত বছর আগে পার্বত্য অঞ্চল শাসন আইন ধারা নং ৫২ তথা পর্বতে অভিবাসন নামক আইন বলে তারা স্থানীয় অধিবাসী। তারা চট্টগ্রামী মৌলিকত্ব সম্পন্ন স্থানীয় আদি ও স্থায়ী অধিবাসীর মর্যাদা সম্পন্ন লোক নয়। এই বিচারে তাদের অগ্রাধিকার, বিশেষাধিকার, স্বায়ত্তশাসন বা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের দাবী অযৌক্তিক। তদুপরি এই প্রশ্নে তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ সংঘটন, একটি অমার্জনীয় রাজনৈতিক বাড়াবাড়ি।

সুতরাং তাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী বিবেচিত হয়। এই ব্যবস্থারই অংশ হলো এতদাঞ্চলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারকরণ ও রাষ্ট্রের স্বপক্ষ জনশক্তি বাঙ্গালীদের সংখ্যাগত প্রাধান্য রচনা। বাঙ্গালী বসতি স্থাপনকে তাই অবাঙ্গালী বিদ্রোহের বিকল্প ভাবাই সঙ্গত। এতে কারো বিরোধিতা ও আপত্তি উত্থাপন যৌক্তিক নয়। স্থানীয়ভাবে সেনাবাহিনীর অবস্থান প্রতিরক্ষামূলক। স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনযাপন তাদের হস্তক্ষেপের বিষয়বস্তু নয়। তাদের হস্তক্ষেপকে ঠেকাতে, সশস্ত্র উপজাতি বিদ্রোহের বিপক্ষে শান্তিস্থাপক সপক্ষীয় জনশক্তির উপস্থিতি প্রয়োজন। বাঙ্গালী বসতি সেই প্রয়োজনেরই সম্পূরক। এটা উপজাতীয় বৈরীতা নয়।

সেনাবাহিনীর দায়িত্বপালন সংক্রান্ত কঠোরতা তাতে হালকা হয়েছে। উপজাতীয় বিদ্রোহ দমাতে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বেসামরিক বাঙ্গালী জনশক্তি মোতায়েন নমনীয় ব্যবস্থা। যখন বাঙ্গালী বসতি স্থাপনের সূচনা হয়নি, বাংলাদেশের সেই শিশুকালে, উপজাতীয় বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়েছে। তখন দেশের অখন্ডতা রক্ষার প্রয়োজনে এতদাঞ্চলে সেনা মোতায়েন ছাড়া উপায় ছিলো না। তৎপর বিদ্রোহী পক্ষের সাথে আপোষ-রফামূলক আলোচনা ও বৈঠক হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। তাই সরকারী পর্যায়েই সিদ্ধান্ত হয় যে, সেনাবাহিনী কেবল সশস্ত্র দুষ্কর্মই ঠেকাবে। বিদ্রোহী জনশক্তির মোকাবেলায় স্বপক্ষ বাঙ্গালী জনশক্তিকে সংখ্যা ও সামর্থে জোরদার করে তুলতে হবে। সুতরাং উপজাতীয় বিদ্রোহেরই ফল সেনা মোতায়েন ও বাঙ্গারী বসতি স্থাপন। এই দুই শক্তির বিরুদ্ধে উপজাতীয় পক্ষের আপত্তি ও আন্দোলন এই প্রেক্ষাপটে যৌক্তিক নয়।

এখনো উপজাতীয় পক্ষ উগ্রতা, হিংসা, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি আর অরাজকতা ত্যাগ করে স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের ধারায় ফিরে এলে সেনাবাহিনীর পক্ষে তার ক্যাম্পে ফিরে যাবার পরিবেশ সৃষ্টি হবে এবং বাঙ্গালী জনস্রোতও থেমে যাবে। বাঙ্গালী পাহাড়ী শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সমঅধিকার নীতি প্রতিষ্ঠিত হলে, এতদাঞ্চলে শান্তি ও উন্নয়নের ধারা অবশ্যই জোরদার হবে। কেবল স্বপক্ষীয় সুযোগ-সুবিধা আর বিপক্ষ বৈরীতা, পার্বত্য অঞ্চলকে সংঘাতমুখর ও বিক্ষুব্ধ করে রেখেছে। বাঙ্গালীরা মুহুর্তে সব উপজাতীয় বৈরীতা ভুলে যেতে প্রস্তুত, যদি উপজাতীয় পক্ষ সকলের সমঅধিকার ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিকে তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্য রূপে গ্রহণ করে। সুতরাং পার্বত্য রাজনীতি খেলার ট্রাম কার্ড তাদের হাতেই নিহিত। অযথা সেনাবাহিনী আর বাঙ্গালী পক্ষকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।

অরাজক ও বিক্ষুব্ধ পার্বত্য অঞ্চল থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহৃত হলে, এতদাঞ্চলের শান্তি-শৃঙ্খলা আর অখন্ডতা রক্ষার দায়িত্ব কে পালন করবে? উপজাতীয় কোন জনসংগঠন সে দায়িত্ব পালনের উপযোগী আস্থা এখনো অর্জন করতে পারেনি। তারা নিজেরাও ঐক্যবদ্ধ নয়। বরং পরস্পর সংঘাত ও বৈরীতায় লিপ্ত। এটা ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের ধারক নয়। উপজাতীয়রা পরস্পর রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত ও সংঘাতে লিপ্ত। তারা গঠনমূলক রাজনীতির কোন উদাহরণ স্থাপন করতে পারেনি। দেশ ও জাতি তাদের প্রতি আস্থাশীল নয়। জাতীয় সন্দেহপ্রবণতাকে কাটাতে তাদের কোন রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মসূচী নেই।

উপজাতীয় দাবিও সংখ্যালঘু স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতেই বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ গৃহীত হয়েছে। এখন তারা তাতে স্থির নেই, বিকল্প জুম্ম জাতীয়তাবাদেই অনড়। তাদের আগ্রহেই উপজাতীয় সুবিধাবাদ গৃহীত হয়েছিলো। কিন্তু এখন তাদের লক্ষ্য জাতিসংঘ ঘোষিত আদিবাসী পরিচয় গ্রহণ। দেশ ও জাতি থেকে তারা কেবল গ্রহণেই অভ্যস্ত, কিছু দিতে নয়। তারা দেশ ও জাতির বিপক্ষে বৈরী শক্তিরূপে প্রতিভাত। এই বৈরী ভাবমূর্তি কাটাবার দায়িত্ব তাদের নিজেদেরই। এমনটা ঘটলেই তাদের পক্ষে জাতীয় আস্থা গড়ে ওঠা সম্ভব। কেবল উত্যক্ত করা, দাবী-দাওয়ার বহর বৃদ্ধি, আর নিজেদের স্বার্থকেই বড় করে দেখা, এই প্রবণতা, জাতীয় আস্থা ও সহানুভুতি গড়ে ওঠার অনুকূল নয়।

পার্বত্য বাঙ্গালীরা ঐ বাঙ্গালীদেরই অংশ, যারা গোটা দেশের শাসক শক্তি এবং তারা সংখ্যায় বাংলাদেশী জাতি সত্তার ৯৯%। সুতরাং পার্বত্য বাঙ্গালীদের সাথে সদ্ভাব সৃষ্টি, গোটা জাতিকে প্রভাবিত করারই সূত্র। এই বোধোদয় না ঘটা, উপজাতীয়দের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। বাঙ্গালীপ্রেমী সাধারণ উপজাতীয় লোক অবশ্যই আছেন, এবং এমন উদার মনোভাব সম্পন্ন সাধারণ উপজাতীয় লোকেরও অভাব নেই, যারা পাহাড়ী বাঙ্গালীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সম্প্রীতিকে গুরুত্ব দেন। কিন্তু এরা সংখ্যালঘু ও দুর্বল। এরা উপজাতীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন না। সমাজে এদের অবস্থান নিরীহ।

দেশ ও জাতি অনির্দিষ্ট দীর্ঘকাল অনুকূল উপজাতীয় বোধোদয়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারে না। ধ্বংসাত্মক উপজাতীয় শক্তিকে নিস্ক্রিয় ও নির্মূল করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। তজ্জন্য গৃহীত রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপকে শিথিল বা পরিত্যাগ করা যথার্থ নয়। সেনাশক্তি ও জনশক্তি মোতায়েনের অতীত নীতিকে পরিহারের কোন অবকাশ নেই। ইতিমধ্যে গৃহীত কোন শৈথিল্য ফলপ্রসু প্রমাণিত হয়নি। নতুবা এতোদিনে উপজাতীয় বিদ্রোহী শক্তি এক ক্ষুদ্র অপশক্তিতে পরিণত হতো, এবং পর্বতাঞ্চলে বাঙ্গালীরাই হয়ে উঠতো সংখ্যাগরিষ্ঠ। এমনটি ঘটানো ছাড়া এতদাঞ্চলে বাংলাদেশ নিরাপদ হবে সে আশা করা যায় না, আর একমাত্র তখনই উপজাতীয়রা হবে দেশ ও জাতির পক্ষে বাধ্য অনুগত। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রয়োজনে এমনটি ঘটান অন্যায় নয়। এমন শক্ত মনোভাব জাতীয় রাজনীতিতে থাকা আবশ্যক। তাই পার্বত্য নীতিতে বাঙ্গালী বসতি স্থাপন ও পূনর্বাসন পুনঃবিবেচিত হওয়া দরকার।

বাঙ্গালী বসতি স্থাপন ও পুনর্বাসন কাজ অসম্পন্ন আছে। তা বাস্তবায়ন না করা ক্ষতিকর। সরকারের এই দায় অপরিত্যজ্য। লক্ষ লক্ষ বাঙ্গালী সরকারী দায়িত্বহীনতার ফলে পর্বতের আনাচে-কানাচে ভূমিহীন, আশ্রয়হীন, বেকার। ভূমি দান ও পুনর্বাসনের অঙ্গীকারে তারা সরকারীভাবে এতদাঞ্চলে আনিত। এই অঙ্গীকার পালন করা সরকারের একটি দায়। নিরূপায় হয়ে ভূমি বঞ্চিত বাঙ্গালীদের অনেকেই সর্বোচ্চ আদালতে মামলা করেছে। কিন্তু ঐ মামলাগুলোর অগ্রগতি নেই। এমনি একটি মামলা হলো রীট নং-৬৩২৯/২০০১, যার শুনানীর দিন ধার্য্য ছিলো ২৫ আগস্ট ২০০৪ সে শুনানী অনুষ্ঠিত হয়নি। এছাড়াও আরো কয়েকটি রীট দায়ের করা আছে যেগুলোর মীমাংসা হচ্ছে না। তবে এই পথ ধরে একদিন বিষয়টির সুরাহা অবশ্যই হবে, সে আশায় নিঃস্ব পার্বত্য বাঙ্গালীরা আশান্বিত দিন যাপন করছে।

রাষ্ট্র কর্তৃক বাঙ্গালী পুনর্বাসন মানে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশী চরিত্র দান, উন্নয়নের অর্থ পশ্চাদপদতার অবসান ঘটান, সেনা নিয়ন্ত্রণের অর্থ অরাজকতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ, আর পার্বত্য চুক্তি হলো বিদ্রোহীদের গৃহবন্দি করার কৌশল। এগুলো রাষ্ট্র প্রবর্তিত কর্মসূচী। উপজাতীয়দের আনুগত্য প্রদর্শন ছাড়া এই কার্যক্রমের কোন ব্যতিক্রম হতে পারে না।

গত ১৬ জুন ২০০৪ তারিখে গৃহীত সরকারী সিদ্ধান্তটি পার্বত্য বাঙ্গালীদের অবশ্যই বিক্ষুব্ধ করবে। তারা সরকার কর্তৃক পুনর্বাসনের অঙ্গীকারে পার্বত্য চট্টগ্রামে আনিত, এবং নিরাপত্তার প্রয়োজনে আবাসত্যাগী ও গুচ্ছগ্রাম সমূহে পুনর্বাসিত। এই আনয়ন ও বসতি বন্ধকরণ ভুল হয়ে থাকলে, তার খেসারত ঐ বাঙ্গালীদের প্রাপ্য নয়। সরকারই নিজ ভুলের দায়িত্ব নিতে ও খেসারত দিতে বাধ্য। গুচ্ছগ্রামবাসী ও ভাসমান অন্যান্য পার্বত্য বাঙ্গালীরা স্বউদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি গড়েনি। তাদের কিছু সরকারীভাবে প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে, কিছু প্রেসিডেন্ট এরশাদের আমলে এবং বাদ বাকিরা বেসরকারীভাবে পাকিস্তান আমলে ও শেখ মুজিবের উৎসাহে বাংলাদেশ আমলের শুরুতে, এতদাঞ্চলে আনিত ও স্বউদ্যোগে বসতি স্থাপন করেছে। এরা রাষ্ট্রের স্বপক্ষীয় জনশক্তি। বিদ্রোহী উপজাতীয়দের বিপক্ষে এই সপক্ষীয় জনশক্তির প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রীয়ভাবে কাম্য।

১৯৮৬ সাল আমলে বিদ্রোহী শান্তিবাহিনীর মদদে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক আকার ধারণ করে। তাতে উপদ্রুত বাঙ্গালীরা মারমুখী হয়ে ওঠে এবং দাঙ্গা উপদ্রুত উপজাতীয়রাও বিপুল সংখ্যায় শরণার্থীরূপে ভারতমুখী হতে শুরু করে। এই বিরূপ পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বাঙ্গালীদের তাদের বাড়ি-ঘর ও জায়গা-জমি থেকে উঠিয়ে এনে সেনাক্যাম্প সমূহের আশপাশে গুচ্ছগ্রাম গড়ে বসবাস করতে দেন। বাড়ি-ঘর, জায়গা-জমি, ফল-ফসল ও রুজি-রোজগারচ্যুত এই গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙ্গালীরা হয়ে পড়ে সরকারী ত্রাণ নির্ভর। ঐ ২৬ হাজার গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙ্গালী পরিবারের দাবী হলো, তাদের পুরাতন বাড়ি-ঘর ও জায়গা-জমি ফেরত লাভ, নতুনভাবে পুনর্বাসন নয়। সরকারের দ্বারা প্রকৃত অবস্থার মূল্যায়ন হয়নি। তারা বাস্তবে আবাসিত ও পুনর্বাসিত পার্বত্য চট্টগ্রামবাসী লোক। তাদের স্থানীয় নাগরিকত্ব প্রশ্নাতীত। এদের প্রবীনরা এখানকার অর্ধ শতাব্দী ও তার আরো বেশি সময়ের বাসিন্দা এবং সন্তান-সন্ততিরা জন্মসূত্রে স্থানীয় অধিবাসী।

পর্বতবাসী এই বাঙ্গালীরা সরকার কর্তৃক বার বার বিভ্রান্ত হচ্ছে। এই বিভ্রান্তি সত্ত্বেও তারা স্বপক্ষীয় ভোট ব্যাংক বলে অনুমিত। তবে হালে তাদের ভুল ভাঙছে। একা বিএনপি নয় আওয়ামী লীগকেও তারা উপযুক্ত মূল্য দিতে এখন প্রস্তুত। তারা ভাবছে আওয়ামী লীগ তাদের চির শত্রু নয়। বহু সংখ্যক বাঙ্গালী মরহুম শেখ মুজিবের উৎসাহে এতদাঞ্চলে এসেছে ও বসতি গড়েছে। বিদ্রোহের বিরুদ্ধে প্রথম সেনা ছাউনীর প্রতিষ্ঠাতা হলেন শেখ মুজিব নিজে। আওয়ামী লীগ সরকার প্রধান শেখ হাসিনা, পার্বত্য চুক্তির বিরুদ্ধে বাঙ্গালীদের হরতাল পালনের দিন ঘোষণা করেছিলেন; একজন বাঙ্গালীকেও পার্বত্য অঞ্চল থেকে বিতাড়ন করা হবে না। তার সরকার সন্ত্রাস উপদ্রুত উদ্বাস্তু পাহাড়ী ও বাঙ্গালীদের সবাইকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছেন।

পুনর্বাসন তালিকায় গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙ্গালীরা অন্তর্ভুক্ত আছে। সরকার কর্তৃক সম্পাদিত পার্বত্য চুক্তিতে সাংবিধানিক ব্যবস্থার পক্ষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ায়, বাঙ্গালীদের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়েছে। সুতরাং পার্বত্য বাঙ্গালীদের একমাত্র মিত্র সংগঠন বিএনপি নয়, আওয়ামী লীগও তাদের মিত্রের মর্যাদা প্রাপ্ত দল।
এটা কৃতজ্ঞতার বিষয় যে, প্রেসিডেন্ট জিয়া, শেখ মুজিব ও এরশাদ বাঙ্গালীদের সরকারীভাবে পার্বত্য অঞ্চলে আবাস দান করেছেন। তবে এটাও প্রশংসনীয় কাজ নয় যে, ঐ সরকারগুলো জায়গা-জমি বন্দোবস্তি ও হস্তান্তর বন্ধ করে দিয়েছেন। তারা পার্বত্য চুক্তির আপত্তিজনক দফাগুলো বাস্তবায়নে আগ্রহী, গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙ্গালীদের সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার দানে নিষ্ক্রিয়, এবং বিদ্রোহী উপজাতীয় পক্ষের তোষামোদে লিপ্ত। এই পরিস্থিতিতে পার্বত্য বাঙ্গালীরা নতুন মিত্র খুঁজতে বাধ্য।

আবার বলি, বাংলাদেশ রাষ্ট্র বাঙ্গালী সংখ্যাগরিষ্ঠতার ফসল। পার্বত্য চট্টগ্রাম তারই ভৌগোলিক অঞ্চল। পার্বত্য চট্টগ্রামের অমুসলিম প্রধান অঞ্চল হওয়া মৌলিক নয়, কৃত্রিম। এ কারণেই ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগকালে এটি ভারতের প্রাপ্য বা স্বতন্ত্র অঞ্চলরূপে স্বীকৃতি লাভ করেনি।

♦ আতিকুর রহমান পার্বত্য বিষয়ক গবেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা এবং উপদেষ্টা, পার্বত্যনিউজ ডটকম।

বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ 

গত ৯ আগস্ট রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ সাড়ম্বরেই পালিত হলো বিশ্ব আদিবাসী দিবস। যদিও বিশ্ব আদিবাসী দিবস উদযাপনের দুই দিন আগে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার পরিহারের জন্য নির্দেশনা জারি করে সরকার।

 

৭ আগস্ট সরকারি এক তথ্য বিবরণীতে এ নির্দেশনা জারি করা হয়। তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী বর্তমানে দেশে আদিবাসীদের কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও বিভিন্ন সময় বিশেষ করে জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে ‘আদিবাসী’ শব্দটি বারবার ব্যবহার হয়ে থাকে। পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে উল্লেখ করে তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, “আগামী ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আলোচনা ও টকশোতে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার পরিহার করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে এবং সকল আলোচনা ও টকশোতে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ এবং সংবাদপত্রের সম্পাদকসহ সুশীল সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিবর্গকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আদিবাসী শব্দটির ব্যবহার পরিহারের জন্য পূর্বেই সচেতন থাকতে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।”

আদিবাসী দিবস উদযাপনে এই তথ্য বিবরণীর তেমন কোনো প্রভাব দেশের মধ্যে দৃশ্যমান হয়নি। বেশিরভাগ গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম ব্যক্তিগণকে পূর্ববৎ তাদের সংবাদ, ভাষ্য, মন্তব্য, টকশোতে আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করতে দেখা যায়। বিশেষ করে যে সরকার এই পরিপত্র জারি করে সেই সরকারেরই অনেক মন্ত্রী, এমপিসহ ঊর্ধ্বতন পদাধিকারিকগণ এই পরিপত্র অবজ্ঞা করে আদিবাসী দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে উপজাতি সম্প্রদায়গুলোকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতিদানের জন্য জোরালো দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে তারা সরকারি পরিপত্রের তীব্র সমালোচনা করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্কের পক্ষে-বিপক্ষে জোরালো অবস্থান রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও জাতীয় গণমাধ্যম বিশেষ করে পত্রিকার সম্পাদকীয়/প্রবন্ধ/মন্তব্য ও টিভি চ্যানেলের টকশোতে একপাক্ষিকভাবে অর্থাৎ আদিবাসীদের পক্ষেই প্রচারণা চালানো হয়। তাদের বেশিরভাগই বর্তমান সরকারের অতীতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, বক্তব্য, অবস্থান ও বাণীর রেফারেন্স দিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২৮ জানুয়ারি ২০১০ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত ‘উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলোকে আদিবাসী হিসেবে অভিহিত করার অপতৎপরতা প্রসঙ্গে’ শিরোনামের গোপনীয় প্রতিবেদনে (স্মারক : পাচবিম (সম-২)২৯/২০১০/২৫, তারিখ : ২৮/১/২০১০) বলা হয় : “বাংলাদেশে ৪৫টি উপজাতীয় জনগোষ্ঠী বসবাস করে। বাংলাদেশের সংবিধান, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ আইন, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ আইন এবং ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তিতে উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলোকে ‘উপজাতি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাদের কোথাও ‘আদিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়নি। তথাপি কতিপয় নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, পাহাড়ে বসবাসরত শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ, এমনকি সাংবাদিকরাও ইদানিং উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলোকে ‘উপজাতি’ না বলে ‘আদিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করতে দেখা যাচ্ছে। এতদ বিষয়ে বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান, বিদেশী সংবাদ মাধ্যম, জাতিসংঘের আড়ালে থাকা খ্রিস্টান রাষ্ট্রসমূহ এ সকল ব্যক্তিবর্গের সাহায্যে তাদের একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সহায়তায় অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বসবাসকারী অধিকাংশ উপজাতীয় সম্প্রদায় এখন নিজ নিজ ধর্ম, সংস্কৃতিতে অবস্থান না করে তাদের অনেকেই খ্রিস্টান হয়ে গেছে। বাংলাদেশীয় উপজাতীয়দেরকে ‘আদিবাসী’ উল্লেখ না করার বিষয়ে ইতিপূর্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে সে নির্দেশনার কোনো কার্যকারিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি উপজাতীয়দেরকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে চি‎হ্নিতকরণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে আদিবাসী মন্ত্রণালয় করার ব্যাপারে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উত্থাপিত হচ্ছে বলে জানা যায়। ইউএনডিপি, ডানিডা, এডিবিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ এবং উপজাতীয়দের ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই সাথে উপজাতীয়দের ‘আদিবাসী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তাছাড়া আমাদের দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও ওয়ার্কশপে এবং সাংবাদিকরা বিভিন্ন লেখায় উপজাতীয়দের ‘আদিবাসী’ হিসেবে চিহ্ণিত করছে। এরূপ কাজ অব্যাহত রাখলে উপজাতীয়দের ভবিষ্যতে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া আবশ্যক হয়ে পড়বে। বর্ণিত অবস্থায় বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন উপজাতীয় সম্প্রদায়কে কোনো অবস্থাতেই যেন ‘উপজাতি’ এর পরিবর্তে ‘আদিবাসী’ হিসেবে উল্লেখ না করা হয় এবং পার্বত্য অঞ্চলে যে সমস্ত এনজিও প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বৃদ্ধিকরণসহ সতর্কতামূলক কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।”

২০১১ সালের মে মাসে আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের (ইউএনপিএফআইআই) অধিবেশনের দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ বৈঠকে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর একটি প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে অধিবেশনে উপস্থাপন করা প্রতিবেদনে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক লার্স আন্দ্রেস বায়ের বলেন, সরকারের সদিচ্ছার অভাবে চুক্তি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে আদিবাসীদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি জাতিসংঘ শান্তি মিশনের কোনো দেশের সেনা সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার আগে তাদের মানবাধিকার রেকর্ড পরীক্ষা করে দেখারও সুপারিশ করেন বায়ের। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যান্য স্থানে বসবাসকারী আদিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাবি করে আসছে। তাদের এই দাবি পূরণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান ইউএনপিএফআইআইর অধিবেশনে যোগদানকারী বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠনের প্রতিনিধিরা। নিউইয়র্কে আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘের স্থায়ী ফোরামে (ইউএনপিএফআইআই) পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক দশম অধিবেশনের দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ বৈঠকে ফোরামের সাবেক সদস্য লার্স-অ্যান্ডার্সবায়ের এ সুপারিশ করেন বলে জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে জানানো হয়। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন তিনি। ১৯ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে ১১৯ বার আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করা ছাড়াও তাদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানানো হয়। কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, লারস এন্ডারস পার্বত্য চট্টগ্রাম (সিএইচটি) কমিশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ সফর করে প্রতিবেদন তৈরি করেন স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার হিসেবে। বিষয়টি প্রতারণা ও উদ্দেশ্যমূলক।
অবশ্য জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের ফার্স্ট সেক্রেটারি ইকবাল আহমেদ অভিযোগ অস্বীকার করার পাশাপাশি বায়েরের দেয়া প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই দাবি করে তিনি বলেন, এ কারণে শান্তি চুক্তি নিয়ে এই ফোরামে আলোচনার কোনো অবকাশও নেই।

ওই বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করে ঢাকায় বিদেশি মিশন প্রধানদের মাধ্যমে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি সারাবিশ্বকে জানান, এ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো আদিবাসী নয়। বাঙালি নৃগোষ্ঠীই এ ভূখ-ে ৪ হাজার বছর বা তারও বেশি সময় ধরে বসবাস করছে। আদিবাসী হিসেবে দাবি করা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো ১৬ শতকের আগে এ ভূখণ্ডে ছিল এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিদেশি মিশনগুলোর প্রধানদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দীপু মনি বলেন, “১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তিতে ‘উপজাতি’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছিল। এরপর স্বার্থান্বেষী কিছু মহল উপজাতি শব্দকে অপব্যাখ্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, পরিচয়কে চ্যালেঞ্জ করে জাতিসংঘ ফোরাম ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ সুবিধা আদায় করতে চাইছে।” পররাষ্ট্রমন্ত্রীর শক্ত অবস্থান আঁচ করতে পেরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিদেশী রাষ্ট্রদূত ও দাতাসংস্থার প্রতিনিধিগণ বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে আরো আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে মন্তব্য করলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপুমণি তাদের দৃঢ়তার সাথে বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ় ও সুস্পষ্ট। কাজেই ভবিষ্যতে এ নিয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ সরকার কখনোই বাংলাদেশের উপজাতীয় বাসিন্দাদের ‘আদিবাসী’ বলে সরকারিভাবে স্বীকার করেনি। তা সত্ত্বেও কোনো কোনো সরকারি মন্ত্রী-এমপিসহ সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে উপজাতিদের আদিবাসী বলে বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে আসছে। বর্তমান সরকারও শুরু থেকেই পার্বত্য উপজাতিদের দাফতরিকভাবে ‘আদিবাসী’ বলে স্বীকার করেনি। সে কারণেই ব্যাপক দাবি সত্ত্বেও মানবাধিকার কমিশনেও ‘নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনে’ ‘উপজাতি’ শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার না করে ‘নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী’ ব্যবহার করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানে উপজাতিদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সর্বপ্রথম সরকারিভাবে জানানো হয় যে, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই এবং একই সাথে বাংলাদেশে বসবাসকারী উপজাতি জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ না বলতে নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর কতিপয় নেতা জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে নিজেদের আদিবাসী বলে পরিচয় দিয়ে আর্থিক সহায়তাসহ তাদের নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও তৎসংলগ্ন ভারত এবং মিয়ানমারের বিশাল এলাকার বাসিন্দাদের জাতিসংঘের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের সহায়তায় ব্যাপকহারে খ্রিস্টানকরণ এবং ২০২০ সালের মধ্যে ইসরাইল বা পূর্ব তিমুরের মতো স্বতন্ত্র খ্রিস্টান ‘বাফার স্টেট’ তৈরির পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে গেলে বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট মহল সতর্ক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক চার্টারে আদিবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় জাতিসংঘ তার সদস্যভুক্ত কোনো দেশে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে এ মর্মে ক্লজ থাকায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সেই চার্টারে স্বাক্ষর দিতে আপত্তি জানায়। এরই প্রেক্ষিতে ২০০৮ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৫ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের permanent forum for indigenous people-এর ৭ম অধিবেশনে বাংলাদেশ পরিষ্কারভাবে জানায় :The country has some tribal population and there are no indigenous people.’ এরপর ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদের ৬৩তম অধিবেশনের আলোচ্যসূচিতে আদিবাসী প্রসঙ্গ থাকায় বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে জানতে চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র, সমাজকল্যাণ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়ে চিঠি লেখে। এর উত্তরে ২০০৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একই কথা জানায়। [(স্মারক নং : পাচবিম(সম-১)৩৭/৯৭-১১৭ তারিখ : ৯/৯/২০০৮) :The country has some tribal population and there are no indigenous people.’

বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে নীতিরও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু উপরোক্ত আলোচনায় দেখা যাচ্ছে, আদিবাসী বিষয়ে বাংলাদেশের পরপর তিনটি সরকারের নীতি অভিন্ন রয়েছে। নীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এ এক উজ্জ্বল ও ইতিবাচক ব্যতিক্রম। কিন্তু তা সত্ত্বেও ‘কতিপয় নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, পাহাড়ে বসবাসরত শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ, এমনকি সাংবাদিকরা বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান, বিদেশি সংবাদ মাধ্যম, জাতিসংঘের আড়ালে থাকা খ্রিস্টান রাষ্ট্রসমূহ এসকল ব্যক্তিবর্গের সাহায্যে’ বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে উঠেপড়ে লেগেছে। অবশ্য অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিও সরল মনে কখনো বলে থাকেন, “উপজাতি বললে যদি তারা আহত হয় তবে আদিবাসী বলেন, কী এমন সমস্যা তাতে?” বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল হলে উপজাতিদের আদিবাসী বলে মেনে নিতে এতটা আপত্তি হয়তো থাকত না ১৬ কোটি বাংলাদেশীর।

ঐতিহাসিক ভুল
আদিবাসী শব্দের ইংলিশ প্রতিশব্দ Indigenous people. অনেকে আদিবাসী শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে Aborigine ব্যবহার করেন। কিন্তু Aborigine বলতে সার্বজনীনভাবে আদিবাসী বোঝায় না। Aborigine বলতে সুনির্দিষ্টভাবে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের বোঝায়। অক্সফোর্ড ডিকশনারীতে Aborigine শব্দের অর্থ বলা হয়েছে ‘a member of a race of people who were the original living in a country, especially Australia’. একইভাবে Red Indian বলতে মার্কিন আদিবাসীদের বোঝায়, অস্ট্রেলীয় Aborigine বা আদিবাসীদের বোঝায় না। এ ছাড়াও বিভিন্ন ডিকশনারীতে আদিবাসী বিষয়ে যে সংজ্ঞা ও প্রতিশব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা নিম্নরূপ:
Aborigine : noun. a member of a race of people who were the original living in a country, especially Australia. Indigenous : belonging to a particular place rather than coming to it from some where else. Native. The indigenous people/indigenous area. Aborigine : earliest. Primitive. Indigenous. Indigenous : adj. Native born or produced naturally in a country, not imported (opposite to exotic).
অন্যদিকে বাংলা একাডেমির অভিধানে Indigenous শব্দের অর্থ বলা হয়েছে : দেশি, দৈশিক, স্বদেশীয়, স্বদেশজাত। কলকাতা থেকে প্রকাশিত সংসদ অভিধানে Indigenous শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে, স্বদেশজাত, দেশীয়। আবার চেম্বার্স ডিকশনারীতে Indigenous শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে, native born, originating or produced naturaly in a country, not imported. একই ডিকশনারীতে Indigenous শব্দের বিপরীত শব্দ হিসেবে exotic শব্দটিকে ব্যবহার করা হয়েছে- যার অর্থ বহিরাগত। নৃতত্ত্ববিদ লুই মর্গান (Louis Morgan) মনে করেন, “The aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial. They are the sons of the soil.\\\( Louis Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972.) অর্থাৎ অভিধানিকভাবে আদিবাসী শব্দের অর্থ দেশি, স্বদেশজাত বা ভূমিপুত্র। তাহলে প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশের যে উপজাতীয় জনগোষ্ঠী নিজেদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দাবি করছে তারা কী বাংলাদেশের ভূমিপুত্র বা স্বদেশজাত?
এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখা গত ১ আগস্ট ২০১৩ তারিখে পার্বত্যনিউজে প্রকাশিত হয়েছে যারা ওয়েবলিংক (বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক)| । প্রয়োজনে পাঠকগণ তা দেখে নিতে পারেন।

সংক্ষেপে এখানে শুধু একটি কথা বলা যায়, বাংলাদেশের কোনো উপজাতি ও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল গবেষকও এখন বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীগুলোকে ভূমিপুত্র বা স্বদেশজাত বলে দাবি করেন না। বরং তাদের রচিত ইতিহাসেই প্রমাণিত হয়েছে এরা বহিরাগত। বাংলাদেশের ভূমিপুত্র হচ্ছে এদেশের মূল জনগোষ্ঠী বাঙালি ও তাদের পূর্বপুরুষগণ। প্রাচীন বিভিন্ন ইতিহাসে সে কথা নানাভাবে এসেছে। বাংলাদেশে নৃবিজ্ঞানের আধুনিক আবিষ্কারগুলো সে ইতিহাসকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণ করছে। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভাল, অনেক বিশেষজ্ঞ আন্তর্জাতিক আইন তথা আইএলও সংজ্ঞা অনুযায়ী বাংলাদেশের উপজাতিদের আদিবাসী আখ্যা দিয়ে থাকেন। কিন্তু সেটাও যে সবৈর্ব ভুল ব্যাখা তা জানতে পার্বত্যনিউজে প্রকাশিত আমার আরো একটি লেখা দেখতে পারেন এই লিংক থেকে: (আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ).

অন্যদিকে বাংলাদেশের সকল উপজাতি সম্প্রদায় নিজেদের আদিবাসী দাবি করছে না। বরং বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্র অংশের যারা মূলত বিচ্ছিন্নতাবাদ, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা, সন্ত্রাসী কর্মকা- কিংবা এনজিও কার্যক্রমের সাথে জড়িত বা তাদের দ্বারা সুবিধাপ্রাপ্ত তারাই কেবল নিজেদের আদিবাসী বলে দাবি করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী উল্লিখিত শ্রেণীর জনগোষ্ঠীই এ দাবির মূল পরিচালক। তবে তাদের এ দাবিটি অতি অধুনা। অতীতে তারা নিজেদের উপজাতি পরিচয়ে পরিচিত করিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। এমনকি স্বাধীনতার পর যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার প্রথম শুরু হয় তখন তাদের সর্বজনগ্রাহ্য নেতা মানবেন্দ্র লারমা সংসদে জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি দাবি করেছিলেন, আদিবাসী পরিচয়ের নয়। ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের সময়ও বর্তমান নেতা নিজেকে উপজাতি পরিচয়েই পরিচিত করিয়েছিলেন। চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ক প্রচারণার কী পার্সন। জনসংহতি সমিতি ও সন্ত্রাসী সংগঠন শান্তি বাহিনীর নেতা সন্তু লারমাও শুরুতে আদিবাসী দাবির পক্ষে ছিলেন না। দেবাশীষ রায়ের দাবি বলে তিনি এর সাথে একমত ছিলেন না। কিন্তু পরবর্তীকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বিদেশী রাষ্ট্র ও দাতা সংস্থার সমর্থন এবং আর্থিক প্রলোভনে তিনি এই দাবিতে শরিক হন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি।

এ বিষয়ে রাঙ্গামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদার গত শনিবার জাতীয় শোক দিবসের আলোচনায় বলেছেন, আমি ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে যখন প্রথম আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন করেছিলাম, তখন সন্তু লারমা বলেছিলেন, এই দেশে কোনো আদিবাসী নেই। এখানে আমরা সবাই উপজাতি। জুম্ম জনগণের আন্দোলন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আদিবাসী দিবস পালন করা হচ্ছে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের সময়ে আমি সন্তু লারমাকে বলেছিলাম এ সময়ে উপজাতির পরিবর্তে আদিবাসী বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে ফেলি, তখনও সন্তু লারমা রাজি হননি। তখনও সন্তু লারমা বলেছিলেন আমরা আদিবাসী নই, আমরা উপজাতি। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তিতে প্রচলিত উপজাতি শব্দটি বহাল রাখা হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার আরো বলেন, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিশেষ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে চাকমা সার্কেল চিফ রাজা ব্যারিস্টার দেবাশিষ রায় রাষ্ট্রীয়ভাবে অফিসিয়ালি লিখেছেন, বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই। কিছু জনগোষ্ঠী আছে উপজাতি। তাহলে এখন কেন আদিবাসী দাবিতে সংগ্রাম-সংঘর্ষের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে? এটি কোন দেশের ষড়যন্ত্রের আলামত? সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার বলেছেন, এখানে আদিবাসী আছে কি নেই গবেষণার দরকার, গবেষণায় প্রমাণ হলে আদিবাসী হবে, না হলে নেই। কিন্তু এ নিয়ে সংঘর্ষ, মারামারি হবে কেন ?

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ নিজেদের আদিবাসী বলে মনে করে না। প্রকাশ্যতঃ পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ইউপিডিএফ নামক অনিবন্ধিত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ও সন্ত্রাসী সংগঠনের সমর্থকরা আদিবাসী দিবস পালনের ঘোর বিরোধী। তারা জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি চায়- যা এম এন লারমার দাবির কাছাকাছি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে, ৯ আগষ্ট “বিশ্ব আদিবাসী দিবস” উদযাপন নিয়ে পাহাড়ে ধুম্রজাল তৈরি হয়েছিল। বিগত বছরগুলোতে এ দিবসটি পালনে পাহাড়ের এনজিওগুলো অনেক আগ থেকেই তোড়জোড় শুরু করলেও এবার তেমনটি দেখা যায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ সমর্থিত “গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম” আদিবাসী দিবস পালনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়। শুধু তাই নয়, সংগঠনটির পক্ষ থেকে তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন এলাকায় আদিবাসী দিবস বিরোধী জনমত সংঘটিত করা হচ্ছে বলে সূত্রে জানা গেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, জনসংহতি সমিতির প্রধান সন্তু লারমার নেপথ্য সহযোগিতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি জাতি-গোষ্ঠী আদিবাসী দিবস পালনের নাম করে সরকার ও বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর কাছ থেকে ব্যাপক অর্থ পেয়ে থাকে এবং এ অর্থের সামান্য একটি অংশ দিয়ে র‌্যালি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হয়, বাকি অর্থ তারা নিজেরা ভাগ-বাটোয়ারা এবং সন্তু গ্রুপের জন্য অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে।
বান্দরবানের প্রয়াত বোমাং রাজা ২০১০ সালে চ্যানেল আইয়ের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তারা আদিবাসীও নয়, স্থানীয়ও নয়। তারা মিয়ানমার থেকে এখানে এসেছিলেন।

ঐতিহাসিক বিচারে বাংলাদেশে আদিবাসিন্দা বা ভূমিপুত্র বা স্বদেশজাত বলতে আমরা যাদের বুঝি তারা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর মূল স্রোতধারা বাঙালী ও তাদের পূর্বপুরুষগণ। নৃবিজ্ঞানের আধুনিক আবিষ্কারও সে কথা প্রমাণ করছে। পৃথিবীর প্রথম মানুষ হযরত আদম (আ.) জান্নাত থেকে দুনিয়াতে প্রথম পদার্পণ করেছিলেন শ্রীলঙ্কায়। ঐতিহাসিক ও গবেষক ড. মোহাম্মদ হান্নান লিখেছেন, “হযরত আদম (আ.) থেকে আমাদের এই মানব জাতির শুরু। কিন্তু হযরত নূহ (আ.)-এর সময়ে সমগ্র পৃথিবীতে এক মহাপ্লাবন ঘটেছিল। এই মহাপ্লাবনে দুনিয়ার সকল কিছু ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কেউ জীবিত ছিল না, শুধু নূহ (আ.)-এর নৌকায় আরোহণ করেছিলেন ৮০ জন নূহের ভক্ত; এই ৮০ জন থেকেই মানব জাতির আবার নতুন যাত্রা।”এই নতুন যাত্রায় বেঁচে যাওয়া ৮০ জনের মধ্যে ছিলেন হযরত নূহের এক পুত্র; নাম তার ‘হাম’। নূহ তার পুত্র হামকে বললেন, ‘তুমি মানব বসতি স্থাপনের জন্যে চলে যাও পৃথিবীর দক্ষিণ দিকে’। পিতার নির্দেশ পেয়ে হাম চলে এলেন আমাদের এশিয়া মহাদেশের কাছাকাছি। সেখানে এসে তিনি তার জ্যেষ্ঠ পুত্র হিন্দকে পাঠালেন ভারতের দিকে। অনেকে মনে করেন, হামের পুত্র হিন্দের নাম অনুসারেই ভারতের নাম হয়েছে হিন্দুস্তান। “হিন্দের দ্বিতীয় পুত্রের নাম ছিল ‘বঙ্গ’। এই ‘বঙ্গ’-এর সন্তানরাই বাঙালি বলে পরিচিতি লাভ করে। সে হিসাবে বাঙালির আদি পুরুষ হচ্ছেন ‘বঙ্গ’।” প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলার ইতিহাস (প্রথম খণ্ড) থেকে ছোট্ট আর একটি উদ্ধৃতি : ‘ঐতরেয় আরণ্যকে বঙ্গ শব্দের সর্বপ্রাচীন উল্লেখ পাওয়া গিয়াছে। … যে সময়ে ঐতরের ব্রাহ্মণে বা আরণ্যকে আমরা বঙ্গ অথবা পুণ্ড্রজাতির উল্লেখ দেখিতে পাই সে সময়ে অঙ্গে, বঙ্গে অথবা মগধে আর্য্য জাতির বাস ছিল না।’ পবিত্র ঋগ্বেদে একইভাবে এই অঞ্চলে বঙ্গ নামে জাতির উল্লেখ আছে এবং এইসব কম-বেশি তিন হাজার বছর আগের কথা।’ মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচিত “Bengal, Bengali’s, Their manners, customs and Literature ” নামক অপ্রকাশিত প্রবন্ধ থেকে একটি উদ্ধৃতি দেয়া যায় : ‘বাংলার ইতিহাস এখনও এত পরিষ্কার হয় নাই যে কেহ নিশ্চয় বলিতে পারেন বাংলা Egypt হইতে প্রাচীন অথবা নূতন। বাঙ্গালা Ninevah ও Babylon হইতেও প্রাচীন অথবা নূতন। বাঙ্গালা চীন হইতেও প্রাচীন অথবা নতুন। যখন আর্য্যগণ মধ্য এশিয়া হইতে পাঞ্জাবে আসিয়া উপনীত হন, তখনও বাংলা সভ্য ছিল। আর্য্যগণ আপনাদের বসতি বিস্তার করিয়া যখন এলাহাবাদ পর্যন্ত উপস্থিত হন, বাংলার সভ্যতায় ঈর্ষাপরবশ হইয়া তাহারা বাঙালিকে ধর্মজ্ঞানশূন্য পক্ষী বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন।’ মেগাস্থিনিস ও টলেমি প্রমুখ ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদদের বর্ণনায় ভারতবর্ষে শক্তিশালী গঙ্গরিড়হী রাজ্যের কথা বলা হয়েছে তার অবস্থান আজকের বাংলাদেশে। যার বিশাল হস্তিবাহিনীর কথা শুনে ভয় পেয়েছিলেন গ্রীক বীর আলেকজান্ডার। রামায়নে উল্লিখিত মহাবালী রাজাকে ঐতিহাসিকগণ প্রাচীন বাংলার কোনো পরাক্রমশালী রাজা বলে শনাক্ত করেছেন।

নৃবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের পলিমাটির বয়স ২০ হাজার বছরের প্রাচীন। পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজে সংরক্ষিত নৌকা দুটির আনুমানিক বয়স ৩ হাজার বছর বলে তারা মনে করেন। পঞ্চগড়ের ভিতরগড় দুর্গের বয়স প্রায় ২ হাজার বছর। তার চেয়েও প্রাচীন উয়ারী বটেশ্বরের সভ্যতাকে নৃবিজ্ঞানীগণ মহেঞ্জোদারো সভ্যতার সমসাময়িক বলে দাবি করেন। প্রাচীন বাংলার স্বীকৃত সভ্যতা বৌদ্ধ সভ্যতা। কিন্তু সে বৌদ্ধরা চাকমা ছিলেন না। ছিলেন বাঙালি। শক্তিশালী বৌদ্ধ রাজা ধর্মপাল বাঙালি ছিলেন। বাঙালী বৌদ্ধ ধর্মগুরুরা তাদের পাণ্ডিত্বে বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে সুদুর চীন পর্যন্ত আলো ছড়িয়েছিলেন। বাংলা ভাষার প্রাচীন পুস্তিকা চর্যাপদও আবিস্কৃত হযেছে নেপালের রাজসভায়। উল্লেখ্য, চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধগান।

অন্যদিকে লালমনিরহাটের মজদের আড়ায় ৬৯ হিজরীতে নির্মিত মসজিদের শিলালিপি পাওয়া গেছে। এমনকি খোদ পার্বত্য চট্টগ্রামও প্রাচীন বাংলার হরিকল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে সময় বাঙালিরা এ অঞ্চলে বসবাস করত। কিন্তু বৈরী ভূপ্রকৃতি, খাদ্যাভাস, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন প্রভৃতি কারণে বেশিরভাগ বাঙালি সেখানে বসবাস করতে না পেরে সমতলের দিকে সরে আসে। এ সকল ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক বর্ণনা প্রমাণ করে বাংলাদেশের ভূমিপুত্র বা আদিবাসিন্দা বা আদিবাসী কোনো চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, গারো, হাজং, ত্রিপুরা উপজাতি নয়,বরং বাঙালি।
Email: palash74@gmsil.com

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

পূর্ণাঙ্গ পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি

পার্বত্য শান্তিচুক্তি

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব-স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তরফ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নিম্নে বর্ণিত চারি খন্ড (ক, খ, গ, ঘ) সম্বলিত চুক্তিতে উপনীত হইলেন:

(ক) সাধারণ
১) উভয়পক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল হিসাবে বিবেচনা করিয়া এ অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ এবং এ অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন অর্জন করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করিয়াছেন;
২) উভয়পক্ষ এ চুক্তির আওতায় যথাশিগগির ইহার বিভিন্ন ধারায় বিবৃত ঐক্যমত্য ও পালনীয় দায়িত্ব অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইন, বিধানাবলী, রীতিসমূহ প্রণয়ন, পরিবর্তন, সংশোধন ও সংযোজন আইন মোতাবেক করা হইবে বলিয়া স্থিরীকৃত করিয়াছেন;
৩) এই চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পরিবীক্ষণ করিবার লক্ষ্যে নিম্নে বর্ণীত সদস্য সমন্বয়ে একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হইবে;
ক) প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মনোনীত একজন সদস্য : আহ্বায়ক
খ) এই চুক্তির আওতায় গঠিত টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান : সদস্য
গ) পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি : সদস্য
৪) এই চুক্তি উভয়পক্ষের তরফ হইতে সম্পাদিত ও সহি করার তারিখ হইতে বলবৎ হইবে। বলবৎ হইবার তারিখ হইতে এই চুক্তি অনুযায়ী উভয় পক্ষ হইতে সম্পাদনীয় সকল পদক্ষেপ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই চুক্তি বলবৎ থাকিবে।

(খ) পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ/পার্বত্য জেলা পরিষদ
উভয়পক্ষ এই চুক্তি বলবৎ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিদ্যমান পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯ (রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯, বান্দরবন পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯) এবং-এর বিভিন্ন ধারাসমূহের নিম্নে বর্ণীত পরিবর্তন, সংশোধন, সংযোজন ও অবলোপন করার বিষয়ে ও লক্ষ্যে একমত হইয়াছেন:
১) পরিষদের আইনে বিভিন্ন ধারায় ব্যবহৃত ‘উপজাতি’ শব্দটি বলবৎ থাকিবে।
২) ‘পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ’ এর নাম সংশোধন করিয়া তদপরিবর্তে এই পরিষদ ‘পার্বত্য জেলা পরিষদ’ নামে অভিহিত হইবে।
৩) ‘অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা’ বলিতে যিনি উপজাতীয় নহেন এবং যাহার পার্বত্য জেলায় বৈধ জায়গা-জমি আছে এবং যিনি পার্বত্য জেলায় সুনির্দিষ্ট ঠিকানায় সাধারণতঃ বসবাস করেন তাহাকে বুঝাইবে।
৪) (ক) প্রতিটি পার্বত্য জেলা পরিষদে মহিলাদের জন্যে ৩ (তিন) টি আসন থাকিবে। এসব আসনের এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) অ-উপজাতীয়দের জন্যে হইবে।
(খ) ৪ নম্বর ধারার উপ-ধারা ১, ২, ৩ ও ৪ মূল আইন মোতাবেক বলবৎ থাকিবে।
(গ) ৪ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৫)-এর দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘ডেপুটি কমিশনার’ এবং ‘ডেপুটি কমিশনারের’ শব্দগুলি পরিবর্তে যথাক্রমে ‘সার্কেল চীফ’ এবং ‘সার্কেল চীফের’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপিত হইবে।
(ঘ) ৪ নম্বর ধারার নিম্নোক্ত উপ-ধারা সংযোজন করা হইবে ‘কোন ব্যক্তি অ-উপজাতীয় কিনা এবং হইলে তিনি কোন সম্প্রদায়ের সদস্য তাহা সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান/ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান/পৌর সভার চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত সার্টিফিকেট দাখিল সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট সার্কেলের চীফ স্থির করিবেন এবং এতদসম্পর্কে সার্কেল চীফের নিকট হইতে প্রাপ্ত সার্টিফিকট ব্যতীত কোন ব্যক্তি অ-উপজাতীয় হিসাবে কোন অ-উপজাতীয় সদস্য পদের জন্যে প্রার্থী হইতে পারিবেন না।
৫) ৭ নম্বর ধারায় বর্ণীত আছে যে, চেয়ারম্যান বা কোন সদস্য পদে নির্বাচিত ব্যক্তি তাহার কার্যক্রম গ্রহণের পূর্বে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের সম্মুখে শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করিবেন। ইহা সংশোধন করিয়া ‘চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার’-এর পরিবর্তে ‘হাই কোর্ট ডিভিশনের কোন বিচারপতি’ কর্তৃক সদস্যরা শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করিবেন-অংশটুকু সন্নিবেশ করা হইবে।
৬) ৮ নম্বর ধারার চতুর্থ পংক্তিতে অবস্থিত ‘চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের নিকট’ শব্দগুলির পরিবর্তে ‘নির্বাচন বিধি অনুসারে’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
৭) ১০ নম্বর ধারার দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘তিন বৎসর’ শব্দগুলির পরিবর্তে ‘পাঁচ বৎসর’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
৮) ১৪ নম্বর ধারায় চেয়ারম্যানের পদ কোন কারণে শূন্য হইলে বা তাহার অনুপস্থিতিতে পরিষদের অন্যান্য সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত একজন উপজাতীয় সদস্য সভাপতিত্ব করিবেন এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালন করিবেন বলিয়া বিধান থাকিবে।
৯) বিদ্যমান ১৭নং ধারা নিম্নে উল্লেখিত বাক্যগুলি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হইবে: আইনের আওতায় কোন ব্যক্তি ভোটার তালিকাভুক্ত হওয়ার যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইতে পারিবেন, যদি তিনি- (১) বাংলাদেশের নাগরিক হন; (২) তাহার বয়স ১৮ বৎসরের কম না হয়; (৩) কোন উপযুক্ত আদালত তাহাকে মানসিকভাবে অসুস্থ ঘোষণা না করিয়া থাকেন; (৪) তিনি পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হন।
১০) ২০ নম্বর ধারার (২) উপ-ধারায় ‘নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ’ শব্দগুলি স্বতন্ত্রভাবে সংযোজন করা হইবে।
১১) ২৫ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২) এ পরিষদের সকল সভায় চেয়ারম্যান এবং তাহার অনুপস্থিতিতে অন্যান্য সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত একজন উপজাতীয় সদস্য সভাপতিত্ব করিবেন বলিয়া বিধান থাকিবে।
১২) যেহেতু খাগড়াছড়ি জেলার সমস্ত অঞ্চল মং সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত নহে, সেহেতু খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার আইনে ২৬ নম্বর ধারায় বর্ণিত ‘খাগড়াছড়ি মং চীফ’-এর পরিবর্তে ‘মং সার্কেলের চীফ এবং চাকমা সার্কেলের চীফ’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপন করা হইবে। অনুরূপভাবে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সভায় বোমাং সার্কেলের চীফেরও উপস্থিত থাকার সুযোগ রাখা হইবে। একইভাবে বান্দরবন জেলা পরিষদের সভায় বোমাং সার্কেলের চীফ ইচ্ছা করিলে বা আমন্ত্রিত হইলে পরিষদের সভায় যোগদান করিতে পারিবেন বলিয়া বিধান রাখা হইবে।
১৩) ৩১ নম্বর উপ-ধারা (১) ও উপ-ধারা (২) এ পরিষদে সরকারের উপ-সচিব সমতুল্য একজন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা সচিব হিসাবে থাকিবেন এবং এই পদে উপজাতীয় কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার প্রদান করা হইবে বলিয়া বিধান থাকিবে।
১৪) (ক) ৩২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) এ পরিষদের কার্যাদি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের নিমিত্ত পরিষদ সরকারের অনুমোদনক্রমে, বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মকর্তা ও কর্মচারির পদ সৃষ্টি করিতে পারিবে বলিয়া বিধান থাকিবে।
(খ) ৩২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২) সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে প্রণয়ন করা হইবে ঃ ‘পরিষদ প্রবিধান অনুযায়ী তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদে কর্মচারী নিয়োগ করিতে পারিবেন এবং তাহাদেরকে বদলি ও সাময়িক বরখাস্ত, বরখাস্ত, অপসারণ বা অন্য কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করিতে পারিবে। তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলার উপজাতীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার বজায় রাখিতে হইবে’।
(গ) ৩২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৩) এ পরিষদের অন্যান্য পদে সরকার পরিষদের পরামর্শক্রমে বিধি অনুযায়ী কর্মকর্তা নিয়োগ করিতে পারিবে এবং এই সকল কর্মকর্তাকে সরকার অন্যত্র বদলি, সাময়িক বরখাস্ত, বরখাস্ত, অপসারণ অথবা অন্য কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করিতে পারিবে বলিয়া বিধান থাকিবে।
১৫) ৩৩ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৩) এ বিধি অনুযায়ী হইবে বলিয়া উল্লেখ থাকিবে।
১৬) ৩৬ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) এর তৃতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘অথবা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোন প্রকার’ শব্দগুলি বিলুপ্ত করা হইবে।
১৭) (ক) ৩৭ নম্বর ধারার (১) উপ-ধারার চতুর্থতঃ এর মূল আইন বলবৎ থাকিবে।
(খ) ৩৭ নম্বর ধারার (২) উপ-ধারা (ঘ)-তে বিধি অনুযায়ী হইবে বলিয়া উল্লেখিত হইবে।
১৮) ৩৮ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৩) বাতিল করা হইবে এবং উপ-ধারা (৪) সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই উপ-ধারা প্রণয়ন করা হইবে ঃ কোন অর্থ-বৎসর শেষ হইবার পূর্বে যে কোন সময় সেই অর্থ-বৎসরের জন্যে, প্রয়োজন হইলে, একটি বাজেট প্রণয়ন ও অনুমোদন করা যাইবে।
১৯) ৪২ নম্বর ধারার নিম্নোক্ত উপ-ধারা সংযোজন করা হইবে: পরিষদ সরকার হইতে প্রাপ্য অর্থে হস্তান্তরিত বিষয়সমূহের উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করিতে পারিবে, এবং জাতীয় পর্যায়ে গৃহীত সকল উন্নয়ন কার্যক্রম পরিষদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ/প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করিবে।
২০) ৪৫ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২) এর দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘সরকার’ শব্দটির পরিবর্তে ‘পরিষদ’ শব্দটি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
২১) ৫০, ৫১ ও ৫২ নম্বর ধারাগুলি বাতিল করিয়া তদপরিবর্তে নিম্নোক্ত ধারা প্রণয়ন করা হইবে : এই আইনের উদ্দেশ্যের সহিত পরিষদের কার্যকলাপের সামঞ্জস্য সাধনের নিশ্চয়তা বিধানকল্পে সরকার প্রয়োজনে পরিষদকে পরামর্শ প্রদান বা অনুশাসন করিতে পারিবে। সরকার যদি নিশ্চিতভাবে এইরূপ প্রমাণ লাভ করিয়া থাকে যে, পরিষদ বা পরিষদের পক্ষে কৃত বা প্রস্তাবিত কোন কাজ-কর্ম আইনের সহিত সংগতিপূর্ণ নহে অথবা জনস্বার্থের পরিপন্থী তাহা হইলে সরকার লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরিষদের নিকট হইতে তথ্য ও ব্যাখ্যা চাহিতে পারিবে এবং পরামর্শ বা নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবে।
২২) ৫৩ ধারার (৩) উপ-ধারার ‘বাতিল থাকার মেয়াদ শেষ হইলে’ শব্দগুলি বাতিল করিয়া তদপরিবর্তে ‘এই আইন’ শব্দটির পূর্বে ‘পরিষদ বাতিল হইলে নব্বই দিনের মধ্যে’ শব্দগুলি সন্নিবেশ করা হইবে।
২৩) ৬১ নম্বর ধারার তৃতীয় ও চতুর্থ পংক্তিতে অবস্থিত ‘সরকারের’ শব্দটির পরিবর্তে ‘মন্ত্রণালয়ের’ শব্দটি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
২৪) (ক) ৬২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই উপ-ধারাটি প্রণয়ন করা হইবে : আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পার্বত্য জেলা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর ও তদনিম্ন স্তরের সকল সদস্য প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে পরিষদ কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন এবং পরিষদ তাহাদের বদলি ও প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে তাহাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিবে। তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলার উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার বজায় রাখিতে হইবে।
(খ) ৬২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৩) এর দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত আপাততঃ বলবৎ অন্য সকল আইনের বিধান সাপেক্ষে শব্দগুলি বাতিল করিয়া তদপরিবর্তে ‘যথা আইন ও বিধি অনুযায়ী’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করা হইবে।
২৫) ৬৩ নম্বর ধারার তৃতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘সহায়তা দান করা’ শব্দগুলি বলবৎ থাকিবে।
২৬) ৬৪ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারাটি প্রণয়ন করা হইবে :
(ক) আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পার্বত্য জেলার এলাকাধীন বন্দোবস্তযোগ্য খাসজমিসহ কোন জায়গা-জমি পরিষদের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে ইজারা প্রদানসহ বন্দোবস্ত, ক্রয়, বিক্রয় ও হস্তান্তর করা যাইবে না।
তবে শর্ত থাকে যে, রক্ষিত (Reserved বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় শিল্প কারখানা ও সরকারের নামে রেকর্ডকৃত ভূমির ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য হইবে না।
(খ) আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও আওতাধীন কোন প্রকারের জমি, পাহাড় ও বনাঞ্চল পরিষদের সাথে আলোচনা ও ইহার সম্মতি ব্যতিরেকে সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর করা যাইবে না।
(গ) পরিষদ হেডম্যান, চেইনম্যান, আমিন, সার্ভেয়ার, কানুনগো ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)দের কার্যাদি তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিবে।
(ঘ) কাপ্তাই হ্রদের জলে ভাষা (Fringe Land) জমি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জমির মূল মালিকদেরকে বন্দোবস্ত দেয়া হইবে।
২৭) ৬৫ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারা প্রণয়ন করা হইবে। আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, জেলার ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের দায়িত্ব পরিষদের হস্তে ন্যস্ত থাকিবে এবং জেলায় আদায়কৃত উক্ত কর পরিষদের তহবিলে থাকিবে।
২৮) ৬৭ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারা প্রণয়ন করা হইবে : পরিষদে এবং সরকারী কর্তৃপক্ষের কার্যাবলীর মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দিলে সরকার বা পরিষদ নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রস্তাব উত্থাপন করিবে এবং পরিষদ ও সরকারের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে কাজের সমন্বয় বিধান করা যাইবে।
২৯) ৬৮ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই উপ-ধারা প্রণয়ন করা হইবে : এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকার, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে বিধি প্রণয়ন করিতে পারিবে এবং কোন বিধি প্রণীত হওয়ার পরেও উক্ত বিধি পুনর্বিবেচনার্থে পরিষদ কর্তৃক সরকারের নিকট আবেদন করিবার বিশেষ অধিকার থাকিবে।
৩০) (ক) ৬৯ ধারার উপ-ধারা (১) এর প্রথম ও দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে’ শব্দগুলি বিলুপ্ত এবং তৃতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘করিতে পারিবে’ এই শব্দগুলির পরে নিম্নোক্ত অংশটুকু সন্নিবেশ করা হইবে ঃ তবে শর্ত থাকে যে, প্রণীত প্রবিধানের কোন অংশ সম্পর্কে সরকার যদি মতভিন্নতা পোষণ করে তাহা হইলে সরকার উক্ত প্রবিধান সংশোধনের জন্য পরামর্শ দিতে বা অনুশাসন করিতে পারিবে।
(খ) ৬৯ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২) এর (হ) এ উল্লেখিত ‘পরিষদের কোন কর্মকর্তাকে চেয়ারম্যানের ক্ষমতা অর্পণ’ এই শব্দগুলি বিলুপ্ত করা হইবে।
৩১) ৭০ নম্বর ধারা বিলুপ্ত করা হইবে।
৩২) ৭৯ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারা প্রণয়ন করা হইবে : পার্বত্য জেলায় প্রযোজ্য জাতীয় সংসদ বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষ গৃহীত কোন আইন পরিষদের বিবেচনায় উক্ত জেলার জন্য কষ্টকর হইলে বা উপজাতীয়দের জন্যে আপত্তিকর হইলে পরিষদ উহা কষ্টকর বা আপত্তিকর হওয়ার কারণ ব্যক্ত করিয়া আইনটির সংশোধন বা প্রয়োগ শিথিল করিবার জন্যে সরকারের নিকট লিখিত আবেদন পেশ করিতে পারিবে এবং সরকার এই আবেদন অনুযায়ী প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে পারিবে।
৩৩) (ক) প্রথম তফসিল বর্ণীত পরিষদের কার্যাবলীর ১ নম্বরে ‘শৃঙ্খলা’ শব্দটির পরে ‘তত্ত্বাবধান’ শব্দটি সন্নিবেশ করা হইবে।
(খ) পরিষদের কার্যাবলীর ৩ নম্বরে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ সংযোজন করা হইবে: (১) বৃত্তিমূলক শিক্ষা, (২) মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা, (৩) মাধ্যমিক শিক্ষা।
(গ) প্রথম তফসিলে পরিষদের কার্যাবলীর ৬(খ) উপ-ধারায় ‘সংরক্ষিত বা’ শব্দগুলি বিলুপ্ত করা হইবে।
৩৪) পার্বত্য জেলা পরিষদের কার্য ও দায়িত্বাদির মধ্যে নিম্নে উল্লেখিত বিষয়াবলী অন্তর্ভুক্ত হইবে ঃ
ক) ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা;
খ) পুলিশ (স্থানীয়);
গ) উপজাতীয় আইন ও সামাজিক বিচার;
ঘ) যুব কল্যাণ;
ঙ) পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন;
চ) স্থানীয় পর্যটন;
ছ) পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ ব্যতীত ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাষ্ট ও অন্যান্য স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান;
জ) স্থানীয় শিল্প-বাণিজ্যের লাইসেন্স প্রদান;
ঝ) কাপ্তাই হ্রদের জলসম্পদ ব্যতীত অন্যান্য নদী-নালা, খাল-বিলের সুষ্ঠু ব্যবহার ও সেচ ব্যবস্থা;
ঞ) জন্ম-মৃত্যু ও অন্যান্য পরিসংখ্যান সংরক্ষণ;
ট) মহাজনী কারবার;
ঠ) জুম চাষ।
৩৫) দ্বিতীয় তফসীলে বিবৃত পরিষদ আরোপনীয় কর, রেইট, টোল এবং ফিস-এর মধ্যে নিম্নে বর্ণীত ক্ষেত্র ও উৎসাদি অন্তর্ভুক্ত হইবে:
ক) অযান্ত্রিক যানবাহনের রেজিষ্ট্রেশন ফি;
খ) পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের উপর কর;
গ) ভূমি ও দালান-কোঠার উপর হোল্ডিং কর;
ঘ) গৃহপালিত পশু বিক্রয়ের উপর কর;
ঙ) সামাজিক বিচারের ফিস;
চ) সরকারী ও বেসরকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের উপর হোল্ডিং কর;
ছ) বনজ সম্পদের উপর রয়্যালিটির অংশ বিশেষ;
জ) সিনো, যাত্রা, সার্কাস ইত্যাদির উপর সম্পূরক কর;
ঝ) খনিজ সম্পদ অন্বেষণ বা নিষ্কর্ষণের উদ্দেশ্যে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অনুজ্ঞা পত্র বা পাট্টাসমূহ সূত্রে প্রাপ্ত রয়্যালটির অংশ বিশেষ;
ঞ) ব্যবসার উপর কর;
ট) লটারীর উপর কর;
ঠ) মৎস্য ধরার উপর কর।

(গ) পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ
১) পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহ অধিকতর শক্তিশালী ও কার্যকর করিবার লক্ষ্যে পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯ ইং (১৯৮৯ সনের ১৯, ২০ ও ২১নং আইন)-এর বিভিন্ন ধারা সংশোধন ও সংযোজন সাপেক্ষে তিন পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদের সমন্বয়ে একটি আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হইবে।
২) পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্যগণের দ্বারা পরোক্ষভাবে এই পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হইবেন যাহার পদমর্যাদা হইবে একজন প্রতিমন্ত্রীর সমকক্ষ এবং তিনি অবশ্যই উপজাতীয় হইবেন।
৩) চেয়ারম্যানসহ পরিষদ ২২ (বাইশ) জন সদস্য লইয়া গঠন করা হইবে। পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য উপজাতীয়দের মধ্য হইতে নির্বাচিত হইবে। পরিষদ ইহার কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করিবেন। পরিষদের গঠন নিম্নরূপ হইবে :
চেয়ারম্যান – ১ জন
সদস্য উপজাতীয় (পুরুষ)- ১২ জন
সদস্য উপজাতীয় মহিলা)- ­ ২ জন
সদস্য অ-উপজাতীয় (পুরুষ)- ৬ জন
সদস্য অ-উপজাতীয় (মহিলা)- ১ জন
উপজাতীয় পুরুষ সদস্যদের মধ্যে ৫ জন নির্বাচিত হইবেন চাকমা উপজাতি হইতে, ৩ জন মার্মা উপজাতি হইতে, ২ জন ত্রিপুরা উপজাতি হইতে, ১ জন মুরং ও তনচৈঙ্গ্যা উপজাতি হইতে এবং ১ জন লুসাই, বোম, পাংখো, খুমী, চাক ও খিয়াং উপজাতি হইতে।
অ-উপজাতি পুরুষ সদস্যদের মধ্যে হইতে প্রত্যেক জেলা হইতে ২ জন করিয়া নির্বাচিত হইবেন।
উপজাতীয় মহিলা সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে চাকমা উপজাতি হইতে ১ জন এবং অন্যান্য উপজাতি থেকে ১জন নির্বাচিত হইবেন।
৪) পরিষদের মহিলাদের জন্য ৩ (তিন) টি আসন সংরক্ষিত রাখা হইবে। এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) অ-উপজাতীয় হইবে।
৫) পরিষদের সদস্যগণ তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্যগণের দ্বারা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হইবেন। তিন পার্বত্য জেলার চেয়ারম্যানগণ পদাধিকারবলে পরিষদের সদস্য হইবেন এবং তাহাদের ভোটাধিকার থাকিবে। পরিষদের সদস্য প্রার্থীদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্যদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার অনুরূপ হইবে।
৬) পরিষদের মেয়াদ ৫ (পাঁচ) বৎসর হইবে। পরিষদের বাজেট প্রণয়ন ও অনুমোদন, পরিষদ বাতিলকরণ, পরিষদের বিধি প্রণয়ন, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট বিষয় ও পদ্ধতি পার্বত্য জেলা পরিষদের অনুকূলে প্রদত্ত ও প্রযোজ্য বিষয় ও পদ্ধতির অনুরূপ হইবে।
৭) পরিষদে সরকারের যুগ্মসচিব সমতুল্য একজন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা থাকিবেন এবং এই পদে নিযুক্তির জন্য উপজাতীয় প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হইবে।
৮) (ক) যদি পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হয় তাহা হইলে অন্তরবর্তীকালীন সময়ের জন্য পরিষদের অন্যান্য উপজাতীয় সদস্যগণের মধ্য হইতে একজন তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্যগণের দ্বারা পরোক্ষভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হইবেন।
(খ) পরিষদের কোন সদস্যপদ যদি কোন কারণে শূন্য হয় তবে উপ-নির্বাচনের মাধ্যমে তাহা পূরণ করা হইবে।
৯) (ক) পরিষদ তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে পরিচালিত সকল উন্নয়ন কর্মকান্ড সমন্বয় সাধন করাসহ তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদের আওতাধীন ও উহাদের উপর অর্পিত বিষয়াদি সার্বিক তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় করিবে। ইহা ছাড়া অর্পিত বিষয়াদির দায়িত্ব পালনে তিন জেলা পরিষদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব কিংবা কোনরূপ অসংগতি পরিলক্ষিত হইলে আঞ্চলিক পরিষদের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত বলিয়া পরিগণিত হইবে।
(খ) এই পরিষদ পৌরসভাসহ স্থানীয় পরিষদসমূহ তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় করিবে।
(গ) তিন পার্বত্য জেলার সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের ব্যাপারে আঞ্চলিক পরিষদ সমন্বয় সাধন ও তত্ত্বাবধান করিতে পারিবে।
(ঘ) পরিষদ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনাসহ এনজিও’দের কার্যাবলী সমন্বয় সাধন করিতে পারিবে।
(ঙ) উপজাতীয় আইন ও সামাজিক বিচার আঞ্চলিক পরিষদের আওতাভুক্ত থাকিবে।
(চ) পরিষদ ভারী শিল্পের লাইসেন্স প্রদান করিতে পারিবে।
১০) পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, পরিষদের সাধারণ ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে অর্পিত দায়িত্ব পালন করিবে। উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার যোগ্য উপজাতীয় প্রার্থীকে অগ্রাধিকার প্রদান করিবেন।
১১) ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইন, বিধি ও অধ্যাদেশের সাথে ১৯৮৯ সনের স্থানীয় সরকার পরিষদ আইনের যদি কোন অসংগতি পরিলক্ষিত হয় তবে আঞ্চলিক পরিষদের পরামর্শ ও সুপারিশক্রমে সেই অসংগতি আইনের মাধ্যমে দূর করা হইবে।
১২) পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ভিত্তিতে আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত সরকার অন্তরবর্তীকালীন আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করিয়া তাহার উপর পরিষদের প্রদেয় দায়িত্ব দিতে পারিবেন।
১৩) সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে আইন প্রণয়ন করিতে গেলে আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে ও ইহার পরামর্শক্রমে আইন প্রণয়ন করিবেন। তিনটি পার্বত্য জেলার উন্নয়ন ও উপজাতীয় জনগণের কল্যাণের পথে বিরূপ ফল হইতে পারে এইরূপ আইনের পরিবর্তন বা নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে পরিষদ সরকারের নিকট আবেদন অথবা সুপারিশমালা পেশ করিতে পারিবেন।
১৪) নিম্নোক্ত উৎস হইতে পরিষদের তহবিল গঠন হইবে:
(ক) জেলা পরিষদের তহবিল হইতে প্রাপ্ত অর্থ;
(খ) পরিষদের উপর ন্যস্ত এবং তৎকর্তৃক পরিচালিত সকল সম্পত্তি হইতে প্রাপ্ত অর্থ বা মুনাফা;
(গ) সরকার বা অন্যান্য কর্তৃৃপক্ষের ঋণ ও অনুদান;
(ঘ) কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি কর্তৃক প্রদত্ত অনুদান;
(ঙ) পরিষদের অর্থ বিনিয়োগ হইতে মুনাফা;
(চ) পরিষদ কর্তৃক প্রাপ্ত যে কোন অর্থ;
(ছ) সরকারের নির্দেশে পরিষদের উপর ন্যস্ত অন্যান্য আয়ের উৎস হইতে প্রাপ্ত অর্থ।

(ঘ) পুনর্বাসন, সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন ও অন্যান্য বিষয়াবলী
পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় স্বাভাবিক অবস্থা পুনঃস্থাপন এবং এই লক্ষ্যে পুনর্বাসন, সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন ও সংশ্লিষ্ট কার্য এবং বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ নিম্নে বর্ণীত অবস্থানে পৌঁছিয়াছেন এবং কার্যক্রম গ্রহণে একমত হইয়াছেন:
১) ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে অবস্থানরত উপজাতীয় শরণার্থীদের দেশে ফিরাইয়া আনার লক্ষ্যে সরকার ও উপজাতীয় শরণার্থী নেতৃবৃন্দের সাথে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় ৯ মার্চ ’৯৭ ইং তারিখে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী ২৮ মার্চ ’৯৭ ইং হইতে উপজাতীয় শরণার্থীগণ দেশে প্রত্যাবর্তন শুরু করেন। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকিবে এবং এই লক্ষ্যে জনসংহতি সমিতির পক্ষ হইতে সম্ভাব্য সব রকম সহযোগিতা প্রদান করা হইবে। তিন পার্বত্য জেলার আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের নির্দিষ্টকরণ করিয়া একটি টাস্কফোর্সের মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।
২) সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর ও বাস্তবায়ন এবং উপজাতীয় শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের পর সরকার এই চুক্তি অনুযায়ী গঠিতব্য আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে যথাশীঘ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ কাজ শুরু এবং যথাযথ যাচাইয়ের মাধ্যমে জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করতঃ উপজাতীয় জনগণের ভূমি মালিকানা চুড়ান্ত করিয়া তাহাদের ভূমি রেকর্ডভূক্ত ও ভূমির অধিকার নিশ্চিত করিবেন।
৩) সরকার ভূমিহীন বা দুই একরের কম জমির মালিক উপজাতীয় পরিবারের ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করিতে পরিবার প্রতি দুই একর জমি স্থানীয় এলাকায় জমির লভ্যতা সাপেক্ষে বন্দোবস্ত দেওয়া নিশ্চিত করিবেন। যদি প্রয়োজন মত জমি পাওয়া না যায় তাহা হইলে সেই ক্ষেত্রে টিলা জমির (গ্রোভল্যান্ড) ব্যবস্থা করা হইবে।
৪) জায়গা-জমি বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তিকল্পে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিশন (ল্যান্ড কমিশন) গঠিত হইবে। পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমি-জমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও এ যাবৎ যেইসব জায়গা-জমি ও পাহাড় অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হইয়াছে সেই সমস্ত জমি ও পাহাড়ের মালিকানা স্বত্ব বাতিলকরণের পূর্ণ ক্ষমতা এই কমিশনের থাকিবে। এই কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে কোন আপিল চলিবে না এবং এই কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া বিবেচিত হইবে। ফ্রীঞ্জল্যান্ড (জলে ভাসা জমি)-এর ক্ষেত্রে ইহা প্রযোজ্য হইবে।
৫) এই কমিশন নিম্নোক্ত সদস্যদের লইয়া গঠন করা হইবে :
(ক) অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি;
খ) সার্কেল চীফ (সংশ্লিষ্ট);
গ) আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি;
ঘ) বিভাগীয় কমিশনার/অতিরিক্ত কমিশনার;
ঙ) জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান (সংশ্লিষ্ট)।
৬) (ক) কমিশনের মেয়াদ তিন বছর হইবে। তবে আঞ্চলিক পরিষদের সাথে পরামর্শক্রমে উহার মেয়াদ বৃদ্ধি করা যাইবে।
(খ) কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি করিবেন।
৭) যে উপজাতীয় শরণার্থীরা সরকারের সংস্থা হইতে ঋণ গ্রহণ করিয়াছেন অথচ বিবদমান পরিস্থিতির কারণে ঋণকৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করিতে পারেন নাই সেই ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হইবে।
৮) রাবার চাষের ও অন্যান্য জমি বরাদ্ধ ঃ যে সকল অ-উপজাতীয় ও অ-স্থানীয় ব্যক্তিদের রাবার বা অন্যান্য প্লান্টেশনের জন্য জমি বরাদ্দ করা হইয়াছিল তাহাদের মধ্যে যাহারা গত দশ বছরের মধ্যে প্রকল্প গ্রহণ করেন নাই বা জমি সঠিক ব্যবহার করেন নাই সে সকল জমি বন্দোবস্ত বাতিল করা হইবে।
৯) সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের লক্ষ্যে অধিক সংখ্যক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করিবেন। এলাকার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করার লক্ষ্যে নতুন প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করিবেন। এবং সরকার এই উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন করিবেন। সরকার এই অঞ্চলের পরিবেশ বিবেচনায় রাখিয়া দেশী ও বিদেশী পর্যটকদের জন্য পর্যটন ব্যবস্থার উন্নয়নে উৎসাহ যোগাইবেন।
১০) কোটা সংরক্ষণ ও বৃত্তি প্রদান: চাকরি ও উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সমপর্যায়ে না পৌঁছা পর্যন্ত সরকার উপজাতীয়দের জন্যে সরকারী চাকরি ও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোটা ব্যবস্থা বহাল রাখিবেন। উপরোক্ত লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপজাতীয় ছাত্র/ছাত্রীদের জন্য সরকার অধিক সংখ্যক বৃত্তি প্রদান করিবেন। বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ ও গবেষণার জন্য সরকার প্রয়োজনীয় বৃত্তি প্রদান করিবেন।
১১) উপজাতীয় কৃষ্টি ও সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতা বজায় রাখার জন্য সরকার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ সচেষ্ট থাকিবেন। সরকার উপজাতীয় সংস্কৃতির কর্মকান্ডকে জাতীয় পর্যায়ে বিকশিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা করিবেন।
১২) জনসংহতি সমিতি ইহার সশস্ত্র সদস্যসহ সকল সদস্যের তালিকা এবং ইহার আওতাধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিবরণী এই চুক্তি স্বাক্ষরের ৪৫ দিনের মধ্যে সরকারের নিকট দাখিল করিবেন।
১৩) সরকার ও জনসংহতি সমিতি যৌথভাবে এই চুক্তি স্বাক্ষরের ৪৫ দিনের মধ্যে অস্ত্র জমাদানের জন্য দিন, তারিখ ও স্থান নির্ধারণ করিবেন। জনসংহতি সমিতির তালিকাভুক্ত সদস্যদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমাদানের জন্য দিন তারিখ ও স্থান নির্ধারণ করার জন্য তালিকা অনুযায়ী জনসংহতি সমিতির সদস্য ও তাহাদের পরিবারবর্গের স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের জন্যে সব রকমের নিরাপত্তা প্রদান করা হইবে।
১৪) নির্ধারিত তারিখে যে সকল সদস্য অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিবেন সরকার তাহাদের প্রতি ক্ষমা ঘোষণা করিবেন। যাহাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা আছে সরকার ঐ সকল মামলা প্রত্যাহার করিয়া নিবেন।
১৫) নির্দিষ্ট সময় সীমার মধ্যে কেহ অস্ত্র জমা দিতে ব্যর্থ হইলে সরকার তাহার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিবেন।
১৬) জনসংহতি সমিতির সকল সদস্য স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের পর তাহাদেরকে এবং জনসংহতি সমিতির কার্যকলাপের সাথে জড়িত স্থায়ী বাসিন্দাদেরকেও সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন করা হইবে।
(ক) জনসংহতি সমিতির প্রত্যাবর্তনকারী সকল সদস্যকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে পরিবার প্রতি এককালীন ৫০,০০০/- টাকা প্রদান করা হইবে।
(খ) জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র সদস্যসহ অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে যাহাদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতারী পরোয়ানা, হুলিয়া জারি অথবা অনুপস্থিতিকালীন সময়ে বিচারে শাস্তি প্রদান করা হইয়াছে, অস্ত্রসমর্পন ও স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের পর যথাশীঘ্র সম্ভব তাহাদের বিরুদ্ধে সকল মামলা, গ্রেফতারী পরোয়ানা, হুলিয়া প্রত্যাহার করা হইবে এবং অনুপস্থিতকালীন সময়ে প্রদত্ত সাজা মওকুফ করা হইবে। জনসংহতি সমিতির কোন সদস্য জেলে আটক থাকিলে তাহাকেও মুক্তি দেওয়া হইবে।
(গ) অনুরূপভাবে অস্ত্র সমর্পণ ও স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের পর কেবলমাত্র জনসংহতি সমিতির সদস্য ছিলেন কারণে কাহারো বিরুদ্ধে মামলা দায়ের বা শাস্তি প্রদান বা গ্রেফতার করা যাইবে না।
(ঘ) জনসংহতি সমিতির যে সকল সদস্য সরকারের বিভিন্ন ব্যাংক ও সংস্থা হইতে ঋণ গ্রহণ করিয়াছেন কিন্তু বিবদমান পরিস্থিতির জন্য গৃহীত ঋণ সঠিকভাবে ব্যবহার করিতে পারেন নাই তাহাদের উক্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হইবে।
(ঙ) প্রত্যাগত জনসংহতি সমিতির সদস্যদের মধ্যে যাহারা পূর্বে সরকার বা সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত ছিলেন তাহাদেরকে স্ব-স্ব পদে পুনর্বহাল করা হইবে এবং জনসংহতি সমিতির সদস্য ও তাহাদের পরিবারের সদস্যদের যোগ্যতা অনুসারে চাকরিতে নিয়োগ করা হইবে। এইক্ষেত্রে তাহাদের বয়স শিথিল সংক্রান্ত সরকারী নীতিমালা অনুসরণ করা হইবে।
(চ) জনসংহতি সমিতির সদস্যদের কুটির শিল্প ও ফলের বাগান প্রভৃতি আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজের সহায়তার জন্যে সহজশর্তে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের অগ্রাধিকার প্রদান করা হইবে।
(ছ) জনসংহতি সমিতির সদস্যগণের ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনার সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হইবে এবং তাহাদের বৈদেশিক বোর্ড ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হইতে প্রাপ্ত সার্টিফিকেট বৈধ বলিয়া গণ্য করা হইবে।
১৭) (ক) সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি সই ও সম্পাদনের পর এবং জনসংহতি সমিতির সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আসার সাথে সাথে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিডিআর) ও স্থায়ী সেনানিবাস (তিন জেলা সদরে তিনটি এবং আলী কদম, রুমা ও দীঘিনালা) ব্যতীত সামরিক বাহিনী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সকল অস্থায়ী ক্যাম্প পার্বত্য চট্টগ্রাম হইতে পর্যায়ক্রমে স্থায়ী নিবাসে ফেরত নেওয়া হইবে এবং এই লক্ষ্যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হইবে। আইন-শৃঙ্খলা অবনতির ক্ষেত্রে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে এবং এই জাতীয় অন্যান্য কাজে দেশের সকল এলাকার ন্যায় প্রয়োজনীয় যথাযথ আইন ও বিধি অনুসরণে বেসামরিক প্রশাসনের কর্তৃত্বাধীনে সেনাবাহিনীকে নিয়োগ করা যাইবে। এই ক্ষেত্রে প্রয়োজন বা সময় অনুযায়ী সহায়তা লাভের উদ্দেশ্যে আঞ্চলিক পরিষদ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করিতে পারিবেন।
(খ) সামরিক ও আধা-সামারিক বাহিনীর ক্যাম্প ও সেনানিবাস কর্তৃক পরিত্যক্ত জায়গা-জমি প্রকৃত মালিকের নিকট অথবা পার্বত্য জেলা পরিষদের নিকট হস্তান্তর করা হইবে।
১৮) পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সরকারী, আধা-সরকারী, পরিষদীয় ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরের কর্মকর্তা ও বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মচারী পদে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীদের নিয়োগ করা হইবে। তবে কোন পদে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীদের মধ্যে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি না থাকিলে সরকার হইতে প্রেষণে অথবা নির্দিষ্ট সময় মেয়াদে উক্ত পদে নিয়োগ করা যাইবে।
১৯) উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে। এই মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করিবার জন্য নিম্নে বর্ণিত উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হইবে।
(ক) পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী
(খ) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, আঞ্চলিক পরিষদ
(গ) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ
(ঘ) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ
(ঙ) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, বান্দরবন পার্বত্য জেলা পরিষদ
(চ) সাংসদ, রাঙ্গামাটি
(ছ) সাংসদ, খাগড়াছড়ি
(জ) সাংসদ, বান্দরবন
(ঝ) চাকমা রাজা
(ঞ) বোমাং রাজা
(ট) মং রাজা
(ঠ) তিন পার্বত্য জেলা হইতে সরকার কর্তৃক মনোনীত পার্বত্য এলাকার স্থায়ী অধিবাসী তিনজন অ-উপজাতীয় সদস্য।
এই চুক্তি উপরোক্তভাবে বাংলা ভাষায় প্রণীত এবং ঢাকায় ১৮ই অগ্রহায়ণ ১৪০৪ সাল মোতাবেক ২রা ডিসেম্বর ১৯৯৭ইং তারিখে সম্পাদিত ও সইকৃত।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে               পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসিদের পক্ষে
(আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্)                               (জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা)
আহ্বায়ক                                                            সভাপতি
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি                 পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।
বাংলাদেশ সরকার।

পাহাড়ে অপহরণ-মুক্তিপণ খেলা!

wadud bhuyan

ওয়াদুদ ভূইয়া

অবশেষে গতকাল ১৭ জুলাই ২০১৪ খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা থেকে অপহৃত চার শ্রমিক উদ্ধার। অপহরণের ১১ দিন পরে অপহরণকারীদের থেকে জেলার ব্যাঙমারা এলাকায় সেতু উন্নয়ন প্রকল্পের অপহৃত চার বাঙ্গালী শ্রমিককে উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী।

সিন্ধুকছড়ি জোনের আওতাধীন কংসীমুড়া প্রাক্তন সেনা ক্যাম্প এলাকা থেকে বৃহস্পতিবার রাত পৌন ৯টার দিকে তাদেরকে উদ্ধার করা হয় বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। উদ্ধারকৃতরা হলেন- বুলডোজার চালক রাজু মিয়া, বুলডোজারের হেলপার হাসান মিয়া, মো. ফারুক মিয়া ও লিয়াকত আলী।

এখানে পার্বত্য অঞ্চলের একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসাবে সংশ্লিষ্ট ও দায়িত্বযুক্ত মহলের কাছে আমার বিনীত প্রশ্ন:

. পাহাড়ের এই গরিব মানুষগুলো অপহরণ করলো কারা, করে আসছে কারা? তাদের সাংগঠনিক বা সামাজিক পরিচয় কি বের করা হয়েছে? সরকার/প্রশাসন তা প্রকাশ করেছে? তাদের নামে কি কোন মামলা নেয়া হয়েছে? যদি এসব না করা হয়ে থাকে, তাহলে কেন করা হয়নি? ভাসুরর নাম নিতে বাধা কোথায়? নাকি ভাসুরপোকে মাঝে মাঝে নিজের পো মনে হয়? নাকি নিজের পো’র মত করে লালন পালন করা হয়?

আজ সময় এসেছে পার্বত্যবাসী তা জানতে চায় এবং পার্বত্যবাসী তা সন্দেহের দৃষ্টিপথে ভাবছে! যা বিগত ৪০ বছরও ভাবার বা অনুভবযোগ্য মনে করেনি! কিন্তু আজ কেন করবে তাও দায়িত্ববানদের বিবেচনায় নেয়া দরকার। কারণ সংবাদে বলা হয়েছে অপহৃতদের উদ্ধার করা হয়েছে ঘেরাও দিয়ে, আবার কেউ কেউ বলছে এদের উদ্ধারের পেছনে স্থানীয় সরকারী দলের লালিত এক মেয়রের মাধ্যমে অপহৃতদের প্রকল্প কোম্পানি থেকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে অপহৃতদের মুক্তি দিয়েছে অপহরণকারীরা।

এখন প্রশ্ন হলো কোনটি সত্য? অন্যদিকে কেউ বলছে অপহরণকারীরা ইউপিডিএফ, আবার কেউ বলছে জেএসএস। আমি জানতে পেরেছি অপহরণকারীরা হচ্ছে ‘জেএসএস (সংস্কার)। পাহাড়ে আগে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, চাঁদা আদায়, হত্যাকারী ছিল শুধুমাত্র একটি আঞ্চলিক দল। আর এখন তা দাঁড়িয়েছে তিনগ্রুপে। এখন তিনগ্রুপই অপহরণ, চাঁদা আদায় ও সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। এই সন্ত্রাসের শিকার পাহাড়ের নিরীহ, নিরস্ত্র পাহাড়ি – বাঙ্গালী সবাই। জেএসএস-এর এক সময়ের ছাত্র সংগঠনের নেতার হাত ধরে, বর্তমানে ইউপিডিএফ শক্ত অবস্থান নিয়েছে। জেএসএস-এর শীর্ষ নেতাদের একসময়কার সহকর্মীরা ওয়ান-ইলেভেনে জাতীয় রাজনৈতিকদলগুলোর সংস্কারপন্থী গ্রুপের অনুকরণে এবং পার্বত্য অঞ্চলের ওই সময়কালের ক্ষমতাসীনদের অনুগ্রহবর্ষণে বা নির্দেশনায় জেএসএস (সংস্কার) নামে পাহাড়ে তৃতীয় আঞ্চলিক শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।

বর্তমানে এই তিনটি আঞ্চলিক অস্ত্রধারী দল পাহাড়ে, আবার দেশের বাহিরে নিজেদেরকে গ্রুপভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসাবে পরিচয় দিয়েও অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘমেয়াদে। এই তিনগ্রুপের নির্যাতনের লক্ষ্যই হলো নিরস্ত্র বাঙ্গালী -পাহাড়ি বিশাল জনগোষ্ঠী। মনে হয় যেন, রাষ্ট্র এই জনগোষ্ঠীর সাথে নাই, বরং অনেকটা সহানুভূতিশীল অস্ত্রধারী ক্ষুদ্র গ্রুপগুলোর পক্ষে।

17.07.2014_Matiranga Labour Recover Pic-03

. অপহৃত চারজনকে উদ্ধার করা হলো, খুবই খুশির খবর। কিন্তু অপহরণকারীদের মধ্যে থেকে একজনও ধরা পড়লো না! অতীতে কি উল্লেখযোগ্য কোন অপহরকারী আটক হয়েছিল? হয়ে থাকলে তাদেরকে কি বিচারের আওতাভুক্ত রাখা হয়েছে? আমার জানামতে তেমন উল্লেখযোগ্য কেউ নেই। তাহলে কি কারনে অপরাধীদেরকে তাদের অপকর্ম সহজতর করে দেয়া হচ্ছে? এতে কি এই অপহরণ, গুম, হত্যা ইত্যাদি দীর্ঘপথে নিয়ে যেতে রাষ্ট্র সহায়ক ভূমিকা রাখছে না? কেউ কেউ মনে করে, রাখছে। নিকট আগামীতে রাষ্ট্রকেই এ আঘাতজনিত ব্যথাহত হতে হবে। এটা আমাদের সবাইকে ভেবে দেখা জরুরি।

. আমাদের জানতে ইচ্ছে করে প্রায় ৫-৬ মাস আগে খাগড়াছড়ি সদরের ভূয়াছড়ি থেকে অপহৃত শিশু শহিদুলকে কেন আজও উদ্ধার করা হলো না? বা উদ্ধারকাজ চলছে কিনা? কিন্তু ওই শিশু অপহরণের পর মহালছড়ি-রাংগামাটি সড়কে অপহৃত রাংগামাটির বিশিষ্ট শিল্পী ও দেশের বড় আমলার মেয়ের পাহাড়ি জামাই হওয়াতে তাকে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হল। কিন্তু বাঙ্গালী শিশুটি কি গরিব ঘরের সন্তান বা সরকার দলের কোন মদদপুষ্ট মেয়রের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকার বিনিময় করতে পারেনি বলে শিশুটির ভাগ্যে কি ঘটেছে আজও তার মা-বাবা ও পার্বত্যবাসী জানতে পারছে না? তাহলে এখানে দায়িত্বশীলদের ভূমিকা কই? তাহলে কি শুধু অর্থ ও মুক্তিপনের বিনিময়েই আমাদের মুক্তি হবে,বছরের পর বছর?

. আজ পাহাড়ের সাধারণ নাগরিক তথা নিরস্ত্র পাহাড়ি -বাঙ্গালীরা জানতে চায়, কবে আর কতকাল পরে পাহাড়ে শান্তি স্থাপন হবে। হবে নাগরিকদের বসবাসযোগ্য একটু স্বাধীন ভূমি? আমার দীর্ঘদিন পাহাড়ে কাজ করে একটা বিষয়ে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, পাহাড়ের সাধারন নাগরিকরা সত্যিই শান্তিতে বসবাস করতে চায়, সমঝোতা ও সহাবস্থান চায়। চায় শান্তি ও উন্নয়ন এবং এই অস্ত্রহীন পাহাড়ি – বাঙ্গালীরা সত্যিকারভাবেই এই সন্ত্রাসী অস্ত্রধারী চাঁদাবাজদের পতন চায়। এখন দরকার সকল মহলের আন্তরিক ইচ্ছা, যা কিনা সাধারণ মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাবে, যা হলে এই চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে রুখে দেয়া খুব কঠিন নয়। এ অবস্থায় পাহাড়বাসীর পক্ষে এ বিষয়ে আমি সকলের শুভ ইচ্ছাময় ভূমিকা কামনা করছি।

লেখক: সাবেক সংসদ সদস্য, ও সাবেক চেয়ারম্যান, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড

সিএইচটি কমিশনের উপর হামলা কেন?

Rangamati pic-05-07-14-1

গাজী সালাউদ্দীন

গত ৪ ও ৫ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রামে সিএইচটি কমিশনকে সাধারণ জনতা কর্তৃক প্রতিরোধের ঘটনা বিভিন্ন মহল যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করুক না কেন, প্রকৃতপক্ষে এটি নিছক একটি হামলা কিংবা আকস্মিক কোন ঘটনা নয়। এটি ছিল শাসন ও শোষণের  বিরুদ্ধে খেটে খাওয়া মানুষের দীর্ঘ দিনের পূঞ্জিভুত  ক্ষোভ ও অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ। উপজাতীয় অত্যাচার, নির্যাতন, গণহত্যা এবং উক্ত কমিশনের একপেশে আচরণের বিরুদ্ধে বাঙ্গালীদের এক বজ্রদীপ্ত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ।

 

সিএইচটি কমিশন কি, কিংবা এর কার্যক্রম ও উদ্দেশ্যই বা কি- এ সর্ম্পকে দেশবাসী এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রামেরও অধিকাংশ মানুষের অজানা। যতদূর জানা যায়, সিএইচটি কমিশন বা পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক কমিশন হলো  আন্তর্জাতিক মহলের একটি বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে  গঠিত একটি কমিশন, যার কো চেয়ারম্যান হলেন বৃটিশ আইন সভার একজন লর্ড। যার কিনা সাম্প্রতিক সময়ে গঠিত পূর্ব  তিমুর এবং দক্ষিণ সুদান রাষ্ট্র গঠনে বিতর্কিত ভূমিকা রয়েছে। এমনকি এই কমিশনের বাংলাদেশ থেকে নিযুক্ত  অন্যান্য সদস্যরাও বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে বিতর্কিত।

এই কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য যাই থাকুক না কেন, অতীত ইতিহাস ও বিগত বছরগুলোতে এর কার্যক্রম ও আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম সর্ম্পকে তাদের ভুমিকা যে একপেশে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, রাষ্ট্রবিরোধী তা বুঝতে বড়মাপের কোন গবেষক অথবা বুদ্ধিজীবী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সচেতন লোক মাত্রেই এটিই উপলদ্ধি করতে পারবেন।

ইতিহাসের পাতা থেকে যতদূর জানা যায়, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলার অবিচ্ছদ্য অংশ ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকেই একটি গোষ্ঠির রাজনৈতিক উচ্চাভিলাসী মনোভাব এবং আমাদের সরকারগুলোর অদূরদর্শী পার্বত্যনীতির কারণে সেখানে অসংখ্য মানবতা বিরোধী অপরাধ সংগঠিত হয়েছে। বলাবাহুল্য, এর সবগুলোই পরিচালিত  হয়েছিল একটি  বিশেষ গোষ্ঠী কর্তৃক, যা সম্ভব হয়েছিল আমাদের  পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের প্রত্যাক্ষ সহযোগিতায়।

পার্বত্য এলাকার এই উত্তপ্ত  পরিস্থিতিতে কতগুলো গণহত্যা হয়েছিল অথবা কী পরিমাণ লোকজন নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তার সঠিক পরিসংখ্যন না থাকলেও ধারণা করা হয় প্রায় ৪০ হাজারের অধিক বাঙ্গালী (যাদের অধিকাংশই সরকার কর্তৃত পূনর্বাসিত) এবং অসংখ্য সেনা, বিডিআর, আনসার, পুলিশ শহিদ হয়েছিল। উপজাতীরা যে  ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এমনটি নয়। বিভিন্ন সময়ে সংগঠিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অসংখ্য পাহাড়িরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যাহোক, সবকিছু মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর জাতীয় ইস্যু। পার্বত্য চট্টগ্রামের এরূপ নাজুুক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে একটি বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে কাজ করে যাচ্ছে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় কুচক্রি  মহল। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, সিএইচটি কমিশন তাদেরই একটি। পার্বত্য চট্টগ্রামের ৪০ বছরের ইতিহাসে সেখানে বাঙ্গালীরাই বেশি আক্রান্ত জাতি। অথচ এ  ব্যাপারে কমিশনকে কখনো দুঃখ প্রকাশ করতে কেউ শোনেনি।

কিন্তু একজন উপজাতী কোনভাবে দুর্ঘটনার স্বীকার হলেই এরা বৈঠক, সেমিনার, প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে বর্হিঃবিশ্বে বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। যার ফলে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ও শান্তির মূর্ত প্রতীক সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হয়। ‘Life is not ours’ এর ধারাবাহিক প্রকাশ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সতরাং সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম যে সুদীর্ঘ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত এতে কোন সন্দেহ নাই।

এই সংগঠনের আরেকটি বিষয় খুবই উল্লেখযোগ্য- সেটি হলো ‘আদিবাসী’ শব্দের উদ্দেশ্যমূলক ব্যবহার। এরা কথায় কথায় এবং এদের অফিসিয়াল বিভিন্ন ডুকুমেন্টস-এ  পার্বত্য চট্টগ্রামে  বসবাসকারী  উপজাতি সম্প্রদায়গুলোকে আদিবাসী বলে উল্লেখ করে। যেখানে বাংলাদেশ সরকার আদিবাসী শব্দের ক্ষতিকর প্রভাব বুঝতে পেরে বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে শব্দটি ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে- সেখানে এই কমিশনের গায়ের জোরে আদিবাসীর শব্দের ব্যবহার রাষ্ট্রদ্রোহীতার শামিল। আদিবাসী ইস্যু একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের  জন্য কতটা হুমকি স্বরূপ তা সকলেরই জানা আছে।

যাহোক, সম্প্রতি যে বিষয়টি নিয়ে এই কমিশন গণমাধ্যমগুলোতে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে তা হলো  গত ৪ জুলাই খাগড়াছড়িতে ও রাঙ্গামাটিতে উদ্দেশ্ মূলক সফর এবং জনগণ কর্তৃক প্রতিরোধের চেষ্টা। এই কমিশনের পার্বত্য এলাকা সফরের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে বাঙ্গালী ভিত্তিক সংগঠনগুলো অবরোধের ডাক দিয়েছিল। কিন্তু অবরোধ উপেক্ষা করে কমিশন খাগড়াছড়ি সফরকালে বিতর্কিত কর্মকান্ডের জন্য  হাজার হাজার  বাঙ্গালীর জুতা নিক্ষেপের শিকার হয়। পরদিন  গোপনে রাঙ্গামটি সফরকালে সেখানেও সাধারণ বাঙ্গালীদের প্রতিরোধের মুখে পরতে হয় তাদের। সেখান থেকে ফিরে গিয়ে কমিশনের কো-চেয়ারম্যান একটি প্রশ্ন রেখেছিলেন, পার্বত্য এলাকায় বাঙ্গালীরাতো অনেক পিছিয়ে আছে। তাহলে তারা এত শক্তি পেল কোথায় ?

এর উত্তর হতে পারে মানুষের যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তখন সে বাঁচার জন্য সর্বশেষ চেষ্টাটাই করে। এক্ষেত্রেও  কাজটি  তেমনি  হয়েছে। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে মানুষ যুগযুগ ধরে দেখে এসেছে- এদের মুখ থেকে ঠিক এর উল্টোটা শোনা যায়।

পাহাড়ে  বসবাসকারী মোট জনসংখ্যা অর্ধেক বাঙ্গালী। অথচ বিভিন্ন  রাষ্ট্রিয়  সুবিধা দেওয়া ফলে শিক্ষা, চাকুরী সামাজিক, রাজনৈতিক  ইত্যাদি ক্ষেত্রে উপজাতীরা অনেক  অগ্রসর, পক্ষান্তরে চরম বৈষম্যর শিকার বাঙ্গালীরা রয়েছে প্রায়  শূন্যর কোঠায়।  বাঙ্গালীরা সেখানে দুমুঠো ভাত খাওয়া জন্য দিবা-রাত্রি সংগ্রাম করতে হচ্ছে। মোট কথা উপজাতি- বাঙ্গালীদের মধ্যে সেখানে রাজা-প্রজা  সর্ম্পক বিদ্যমান। সেখানে যদি উল্টো বাঙ্গালীদেরকেই  নির্যাতনকারী, জবর দখলকারী হিসেবে কেউ উল্লেখ করে সেক্ষেত্রে  বাঙ্গালীদের আবেগে  খোঁচা লাগতেই পারে। কাজেই এই ধরনের প্রতিরোধ অস্বাভাবিক  নয়।

এখানে বাঙ্গালীদের জেএসএস- ইউপিডিএফের মত  কোন সশস্ত্র সংগঠন নাই। তাদের অস্ত্রের  জোর নাই। চাঁদাবাজির অর্থ নাই যা দিয়ে কমিশনের লোকদের ম্যানেজ করতে  পারবে।  তাই বিক্ষোভ প্রদর্শন করে  জুতা  নিক্ষেপ করে  প্রতিবাদই  তাদের সবচেয়ে  বড় ও  চুড়ান্ত প্রতিবাদ। রাঙ্গামাটিতে গাড়ি বহরে হামলার কারণ অনুসন্ধান করতে  গিয়ে গণমাধ্যম কর্মিদের চোখে  সিএইচটি  কমিশনের পক্ষপাতমুলক আচরণ ও রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি  উঠে আসে। এই সম্পর্কে বিভিন্ন  প্রশ্নোত্তরে তারা সঠিক  জবাব দিতে পারেনি  এবং অনেক কিছুই কৌশলে  এড়িয়ে গেছে। এ সময় তারা  কিছুটা নরম স্বরে  বাঙ্গালীদের  সাথেও আলোচনা প্রস্তাব দিয়েছেন বলে দাবী করেন। কিন্তু  বাস্তবে এটিও ছিল একটি চরম মিথ্যাচার।

আদৌ এই কমিশনের জন্মলগ্ন থেকে অদ্যবদি পার্বত্য বিষয়ে কোন বাঙ্গালী নেতৃবৃন্দের  সাথে আলোচনার ইতিহাস  নাই। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেকেরও বেশি লোক বাঙ্গালী  (যাদেরকে কমিশন সেটেলার  সন্ত্রাসী বলে  আখ্যায়িত করেছেন)। এখানে  বসবাসরত দুইটি পক্ষের  মধ্যে একটি পক্ষ নিয়ে কাজ করতে  আসবেন  এবং  অপর  পক্ষটিকে ভিটেমাটি ছাড়া করতে  চাইবেন তখন  এ ধরণের ঘটনা অস্বাভাবিক নয়।

সুলতানা কামালের দল খাগড়াছড়ি ত্যাগ করার দুই দিন পর ৪ জন বাঙ্গালীকে  উপজাতী  সন্ত্রাসীরা অপহরণ করেছে। আজ এক সপ্তাহ পার হয়ে গেল,  কই এই ঘটনা নিয়ে তো  তাদের কেউ বিবৃতি  দিলো না। কোন কমিশন নিন্দা জানালো না। অথচ আবুুল  মকসুদের মত ব্যাক্তিরাও ঢাকায় বসে বাণী ছাড়ে-পার্বত্য অঞ্চলে কথা বলার  স্বাধীনতা নেই!  হ্যা, মকসুদ সাহেব ঠিকই বলেছেন, সেখানে কথাবলার  স্বাধীনতা নেই। তবে এই কথাটিই পাহাড়িদের  নয় বাঙ্গালীদের জন্য প্রজোয্য।

পরিশেষে  সিএইচটি কমিশনের উদ্দেশ্যে পার্বত্য  বাঙ্গালীদের পক্ষ থেকে একটি কথাই বলতে চাই, সত্যিকারার্থে  যদি পার্বত্য  এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চান তাহলে একটি  পক্ষের স্বার্থকে বাদ দিয়ে নয় বরং বসবাসকারী সকল মানুষের মানবিক অধিকারের দিকে  দৃষ্টি  দিয়ে কাজ করুন। তবেই স্থায়ী  শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। 

দীঘিনালার বাবুছড়ায় বিজিবি জোন সদরে উপজাতিদের হামলা: আহত ২০

Today's pic(1)

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

খাগড়াছড়ি’রর দীঘিনালায় নবগঠিত ৫১ বিজিবি’র জোন সদরে উপজাতিরা হামলা করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলিবষর্ণ ও টিয়ার শেল করেছে। এতে বিজিবি’র ৬ সদস্যসহ ২০ জন আহত হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, বিকেলে বিজিবি সদস্যরা ক্যাম্প স্থাপনের কাজ করার সময় স্থানীয় উপজাতিরা বাধা দেয়। এসময় কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় আশপাশ থেকে উপজিাতিরা এসে বিজিবি সদস্যদের উপর হামলা করে। খবর পেয়ে পুলিশ স্থানীয়দের ছত্রভঙ্গ করতে কয়েক রাউন্ড গুলি ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। বর্তমানে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)’র বাবুছড়া জোনের উপ-অধিনায়ক মেজর কামাল হোসেন পার্বত্যনিউজকে বলেন, অনুমানি ছয়টার দিকে ১৫০-১৮০ জনের একদল উপজাতী বিজিবি’র সদস্যদের উপর হামলা করে। এতে পুলিশের এক সদস্যসহ ৬ জন বিজিবি’র সদস্য আহত হয়।

এ ঘটনায় আহত বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা হলো, কনস্টেবল মাহাবুব আলম, সিগনাল ম্যান অশুক, ল্যান্স নায়েক উত্তম কুমার, দর্জি আসলাম হোসেন, ভাভার মনির হোসেন ও পুলিশ সদস্য এ বি সিদ্দিক।

উপজাতি আহতরা হলেন- সংঘ দেবী চাকমা(৪৫), স্বামী সুরজয় চাকমা, গ্রাম- যত্নমোহন কার্বারী পাড়া, অপসরি চাকমা (১৬), পিতা সুখময় চাকমা, গ্রাম- মধ্য বাঘাইছড়ি, সুরভি চাকমা (৪০), স্বামী- শুক্রমোহন চাকমা, গ্রাম যত্ন মোহন কার্বারী পাড়া, ফুলরাণী চাকমা (৪৫) স্বামী- স্নেহ কুমার চাকমা, গ্রাম- ঐ, ৫. মধুরিকা চাকমা (৩০), পিতা-নোয়ারাম চামা, গ্রাম-মধ্য বাঘইছড়ি, আনন্দ বালা চাকমা (৫৫), স্বামী মৃত. কমল কুমার চাকমা, সন্তোষ কুমার কার্বারী (৭৫) পিতা মৃত শশী মোহন কার্বারী, গ্রাম শশী মোহন কার্বারী পাড়া, সোনা দেবী চাকমা(৪০), স্বামী- সুরজয় চাকমা, গ্রাম যত্ন মোহন কার্বারী পাড়া, কমলা রঞ্জন চাকমা (৩২), পিতা- সুরজয় চাকমা, গ্রাম-ঐ,  চাহেলী চাকমা (২৫) ,স্বামী- কমলা রঞ্জন চাকমা,  প্রদীপ চাকমা (৬৫), পিতা মৃত ভগবান চন্দ্র চাকমা, গ্রাম- ঐ,  মায়া রাণী চাকমা(৫৫), স্বামী- প্রদীপ চাকমা, সাধন দেবী চাকমা (৬০), স্বামী- মঙ্গল চাকমা,  সুরর্ণা চাকমা(২৬), স্বামী- শ্যামল চাকমা, গ্রাম যত্ন মোহন কার্বারী পাড়া, শ্যামলিকা চাকমা (৩৫), স্বামী- বিনি মোহন চাকমা, গ্রাম-ঐ ও  গোপা চাকমা(৪০), স্বামী- শুভময় চাকমা। আহতদের দিঘীনালা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

দিঘিনালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাহাদাত হোসেন এ ঘটনা সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। সহকারী পুলিশ সুপার সরোয়ার হোসেন (সদর সার্কেল) জানান, বিকেলে ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সদস্যরা বাবুছড়িতে ক্যাম্প স্থাপনের কাজ করার সময় স্থানীয়রা বাধা দেয় এবং সীমানা ফ্লাগ তুলে নেয়। এরপর আরো বেশ কিছু স্থানীয় জনতা এসে বিজিবি সদস্যদের ওপর দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে হামলা ও ভাঙচুর করে। তাদের দায়ের কোপে বিজিবির দুটি চাইনিজ রাইফেল কেটে যায়।

উল্লেখ্য, দীঘিনালার নাড়াইছড়ি এলাকায় ভারতের সাথে বাংলাদেশের ১২৯ কিঃমিঃ সীমান্ত অরক্ষিত রয়েছে। তা বিজিবি’র নিয়ন্ত্রণে পাহারায় আনতে নতুন ব্যাটালিয়ন সৃষ্টি করেছে সরকার। ৩টি বাটালিয়ন ১২৯ কিঃ মিঃ সীমান্ত চৌকি পাহারা দেবে। এর মধ্যে বাবুছড়া ৫১ ব্যাটালিয়ন সীমান্ত এলাকায় বিওপি করে চৌকি দেবে ৪৭ কিঃ মিঃ সীমান্ত। গত মাসের ১৫ তারিখে বিজিবি সদর দফতরটি স্থাপন করা হয়। শুরু থেকে পাহাড়িদের একটি অংশ বিজিবি সদর দফরের কার্যক্রম বন্ধে মিছিল সমাবেশসহ আন্দোলন করে আসছিল। গতকাল এ বিষয়টি নিয়ে পাহাড়ী প্রতিনিধিদের সাথে বিজিবি কর্মকর্তাদের একটি সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।  বৈঠকে বিজিবি কর্মকর্তারা জানান, অধিগ্রহনের জন্য প্রস্তাবিত জায়গার যে অংশ নিয়ে আদালতে রীট আবেদন করেছে সে জায়গা বাদ দিয়ে জেলা প্রশাসন বিজিবিকে জায়গা হস্তান্তর করেছে।

 

ধর্ষণের অভিযোগে রোয়াংছড়িতে বাঙালীকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা (ভিডিওসহ)

      বব            

স্টাফ রিপোর্টার, বান্দরবান:

গত ৭ জুন রোয়াংছড়ি-বেঙছড়ি সড়কে মারমা এনজিওকর্মীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ মুসলেম মিয়া (৩৫) নামে এক কাঠুরিয়াকে তঞ্চগ্যা সম্প্রদায়ের ইন্ধনে মারমা সম্প্রদায়ের শতশত নারী-পুরুষ নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে।

 

মুসলিম মিয়াকে হত্যার আগে ধর্ষক হিসেবে দেবাং প্রকাশ বিজয় তঞ্চঙ্গ্যা (৩২)কে পুলিশ আটক করে। দেবাং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে স্বীকার করে সে ধর্ষণের সাথে জড়িত ছিল। মুসলেম মিয়া হত্যার পর সে আবার কৌশলে পুলিশের কাছে অস্বীকার করে। দেবাং সু কৌশলে জনপ্রতিনিধিদের তথ্য দেয় তার সাথে আরো দু’জন রোহিঙ্গা কাঠুরিয়া ধর্ষনের কাজে জড়িত ছিল।

দেবাংকে থানায় আনার পরে আইন শৃংখলা অবনতি ঘটতে পারে তার জন্য সেনাবাহিনী থানার আশেপাশে অবস্থান নেয়। কিন্তু স্থানীয় মারমা ও তঞ্চগ্যা সম্প্রদায়ের লোকজন একজন কাঠুরিয়াকে বেঙছড়ি এলাকা থেকে দীর্ঘ ৬ কিলোমিটার পথ ধরে পিটিয়ে পিটিয়ে রোয়াংছড়িতে আনে। রোয়াংছড়ি খালে পৌঁছলে পুলিশ প্রশাসনের টনক নড়ে। তখন থানার ওসি আবদুস সাত্তার কয়েকজন পুলিশ নিয়ে কাঠুরিয়াকে উদ্ধারের আইওয়াশ চেষ্টা চালায়। পুলিশের দাবী, শতশত নারী-পুরুষের বাঁধার মুখে নাকি পুলিশ তাকে উদ্ধার করতে পারেনি।

এ ব্যাপরে ওসি আবদুস সাত্তার জানান, ঘটনা শোনার পর পর তাকে উদ্ধারে রোয়াংছড়ি নদীর পাড়ে যাই। অনেক চেষ্টা করে মুসলিম উদ্দিনকে মুমর্ষ অবস্থায় উদ্ধার করি। তাকে উদ্দার করতে গিয়ে ক্ষুদ্ধ নারী-পুরুষের হামলায় কয়েকজন পুলিশ আহত হয়। সেনাবাহিনীর ভুমিকা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, সেনাবাহিনী নদীর পাড়ে সিড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা আমাদের কোন সহায়তা করেনি।

মুসলেম মিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করার একটি ভিডিও গত রবিবার সকালে পার্বত্যনিউজের হাতে আসে। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর সোমবার পার্বত্যনিউজে ভিডিওটি প্রকাশিত হলে সামাজিক গণমাধ্যমে আলোচনা সমালোচনার ঝড় ওঠে। তিন পার্বত্য জেলার বাঙালীরা এই ভিডিও দেখে পুলিশের দূর্বল ভূমিকার সমালোচনা করতে থাকে। কারণ ভিডিওটিতে দেখা গেছে, পুলিশ মুসলেম মিয়াকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে গেলে পাহাড়ীরা তাদের গলাধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। এবং পুলিশও সরে আসে। একটি জীবন বাঁচাতে এসময় লাঠিচার্জ কিম্বা ফাঁকা গুলিবর্ষণের সাহায্য নিলে মুসলেম মিয়াকে বাঁচানো যেত। 

এদিকে ভিডিওটিতে যে নির্মমভাবে মুসলেম মিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করতে দেখা গেছে তা দেখে মানুষ শিউরে উঠছে। হত্যার আগে তাকে নগ্ন করে তার দুই হাত বেঁধে ফেলা হয়। তারপর তাড়িয়ে তাড়িয়ে দীর্ঘপথে পিটিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। এ সময় উপজাতি মহিলাদের সবচেয়ে বেশী আক্রমণাত্মক ভূমিকায় দেখা গেছে। সাধারণত মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর বৌদ্ধদের হামলার যে চিত্র এতদিন ইউটিউবে দেখা গেছে এই ভিডিটিও তার অনুরূপ নৃসংশ বলে সামাজিক গণমাধ্যমে মন্তব্য করা হয়েছে।

তিনি আরো জানান, দেবাং আগে থেকেই ধর্ষণ, ডাকাতির মত ঘটনার ঘটিয়ে আসছিল। তার বিরুদ্ধে কোন মামলা না থাকায় তাকে আটক করা হয়নি। তিনি জানান, রোয়াংছড়ি থানায় এব্যাপরে দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এদিকে মুসলেম মিয়াকে হত্যার ঘটনায় ফুঁসে উঠছে জেলার বাঙালী জনসাধারণ। তারা ইতোমধ্যেই এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে মিছিল সমাবেশ করেছে।

উল্লেখ্য, বান্দরবান শহরের সবচেয়ে কাছের উপজেলা রোয়াংছড়ি। সড়ক পথে মাত্র ২০ কিলোমিটার দুরে রোয়াংছড়ি উপজেলা। শন্তুু লারমা বাহিনী (শান্তি বাহিনী) থাকা সময়ে বান্দরবান জেলাকে নিয়ন্ত্রন করত রোয়াংছড়ি থেকে। এলাকা ছিল সন্ত্রাসীদের অভারণ্য। যার কারণে রোয়াংছড়িতে বাঙালীদের বসবাস গড়ে উঠেনি। রোয়াংছড়িতে কিছু ভাসমান ব্যবসায়ী আর দিন মজুররা অস্থায়ী ভাবে বসবাস করে। ফলে এমন একটা উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় গিয়ে কোনো বাঙালীর পক্ষে উপজাতি মেয়েকে ধর্ষণ করে হত্যার অভিযোগ মানতে রাজি নয় বাঙালী সম্প্রদায়।

পাহাড়ে উপত্যকায় অসহায় বাঙালির কান্না

10155403_706022802772172_9049515200200666589_n

মনযূরুল হক ::

অসহায় বাঙালির কান্না পার্বত্য চট্টগ্রামের নৈসর্গিক পরিবেশ ভারী করে তুলেছে। প্রতিবছর হাজারো মানুষ নিজেদের সুন্দর সময়গুলো কাটাতে পাহাড়কেই বেছে নেয় পর্যটনের জন্য তাদের প্রথম পছন্দ হিসেবে। কিন্তু মানুষ যেখানে যায় বিনোদনের জন্য, সেখানকার সেই পর্যটন অঞ্চলখ্যাত এলাকার মানুষেরা আসলে কতটা ‘আনন্দে’ আছে, তা সব সময়ই রয়ে যায় পর্যটকদের দৃষ্টির আড়ালে। পাহাড়ের বাইরে সাধারণ সমতল অঞ্চলে যেমন সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষেরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসবাস করে, পার্বত্য অঞ্চলে সেটা সাদা চোখেই কেবল অনুমান করা যায়। নইলে ধর্মবর্ণ যাই হোক, শতবছরের ইতিহাসে নৈসর্গিক পাহাড় এমন এক বিভাজনের জন্ম দিয়েছে, যা কেবল ধর্মের দৃষ্টিতে নয়, মানবতার দৃষ্টিতেও অমার্জনীয় অপরাধ বলেই বিবেচিত হওয়ার কথা।

একই পাহাড়ের অলিন্দে বাস করলেও এবং কখনো কখনো একই বর্ণের দেখতে হলেও সেখানে রয়েছে অলঙ্ঘনীয় এক অন্তরায়, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘পাহাড়ি-বাঙালি’ বলেই চিহ্নিত করা হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। অথচ তা সংবিধানের ১৯ নং (সুযোগের সমতা), ২৭ নং (আইনের দৃষ্টিতে সমতা), ২৮ নং (ধর্ম প্রভৃতি কারণে বৈষম্য) অনুচ্ছেদের পরিষ্কার পরিপন্থি। এই বিভাজনই একই দেশের মানুষ হওয়ার পরও বছরের পর বছর একটার পর একটা সংঘর্ষের জন্ম দিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ে। একসময় সেটা ‘ভূমিবিরোধ’ বলে চালিয়ে দেয়া হলেও ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে, আসলে এই ভূমিবিরোধের পর্দায় ঢেকে রাখা হচ্ছে অন্য এক রহস্য।

পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এই মুসলিম অধ্যুষিত দেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে মুসলিম ওপর নির্যাতন চললেও পাহাড়ে চলছে সম্পূর্ণ অন্যরকম পরিস্থিতি। সেখানে শুধু যে মুসলিমরা অসহায় তাই নয়, বরং তাদের মানবেতর জীবনযাপন যুদ্ধবিধ্বস্ত মুসলিম দেশগুলোকেও হার মানাচ্ছে।

ভূমিবিরোধের কথা
পাহাড়ি নেতাদের বক্তব্যে ‘শান্তিচুক্তি বাস্তবায়িত হলে ভূমিহীনরা ভূমি ফিরে পাবে’ বলা হলেও ভূমিবিরোধ নিষ্পপত্তি আইনটি বাস্তবায়িত হলে পাহাড়ে বাঙালিদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা বাঙালি সংগঠনগুলোর নেতাদের। যদিও সরকার বলছে, ভূমি নিয়ে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে সংঘাত এড়াতেই ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১ করা হয়েছে।

বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ে সৃষ্ট সংঘাতে প্রতিবেশীদেশ ভারতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থী, দুর্গম পাহাড়ে চলে যাওয়া পাহাড়ি এবং নিজ ভূমিতে পুনর্বাসনের সুযোগবঞ্চিত বাঙালিদের ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি করতে পরপর চারটি কমিশন গঠন করা হয়, কিন্তু কোনো কমিশনই পাহাড়িদের বিরোধিতার কারণে কাজ শুরু করতে পারেনি। সর্বশেষ জুলাই ২০০৯ ভূমি কমিশন পুনর্গঠনের পর পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিবিরোধ মীমাংসার জন্য সরকার জরিপ চালানোর উদ্যোগ নেয়। তবে জনসংহতি সমিতিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংগঠন, সুশীল সমাজ, তিনটি সার্কেলের প্রধানরা (তিন রাজাসহ) এটার বিরোধিতা করেন। কিন্তু এবার পাহাড়িরা বিরোধিতা না করলেও প্রতিবাদ করছে বাঙালিরা, বিশেষ করে পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালি মুসলিমরা।
পার্বত্য অঞ্চলের ভূমিসমস্যা নিরসনে ২০০১ সালে প্রণীত আইনটি সংশোধনের জন্য ২৭ মে মন্ত্রিসভা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলে তিন পার্বত্য জেলায় অবরোধ ও হরতালের মতো কর্মসূচি পালন করে আসছে বাঙালি সংগঠনগুলো। তবে ৩ জুন মন্ত্রিসভার বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন (সংশোধন) ২০১৩ এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। ১৬ জুন কমিশনের ক্ষমতা বাড়িয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) বিল ২০১৩ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়। উত্থাপনের পর বিলটি সাত দিনের মধ্যে পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য ভূমিমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।

কী আছে কমিশনে?
সংশোধিত ভূমিনিষ্পত্তি আইনের ধারা ৬ (১) এর ক-তে আছে, পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমিজমা বিষয়ে বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও অবৈধভাবে বন্দোবস্তি ও বেদখল হওয়া সমস্ত ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে। বাঙালি নেতারা আশঙ্কা করছেন, সংশোধনী প্রস্তাবে ‘সমস্ত ভূমি’ শব্দসমূহ যুক্ত হওয়ার ফলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সরকারি ব্যবস্থাপনা অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এছাড়া সংশোধনীতে প্রচলিত আইন ও রীতির সঙ্গে ‘পদ্ধতি’ শব্দটি যুক্ত হওয়ায় ভূমির ওপর বাঙালিদের অধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে। ধারা ৬ (১) এর গ-তে আছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন রীতি ও পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে ফ্রিঞ্জল্যান্ডসহ (জলেভাসা জমি) কোনো ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান বা বেদখল হয়ে থাকলে এবং বন্দোবস্তজনিত কারণে কোনো বৈধ মালিক ভূমি হতে বেদখল হয়ে থাকলে তার দখল পুনর্বহাল।

এখানে আশঙ্কার বিষয় হলো, এটি বাস্তবায়িত হলে বাঙালিদের ফ্রিঞ্জল্যান্ডসহ (জলেভাসা জমি) অন্যান্য বন্দোবস্তে যেসব ভূমি দেয়া হয়েছে, তার মালিকানা হারাবে। এছাড়া পাঁচসদস্যবিশিষ্ট কমিশনের মধ্যে তিনটি সদস্যপদ পাহাড়িদের জন্য সংরক্ষিত এবং বাকি দুই সদস্যের মধ্যে একজন হলেন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে সুপ্রিমকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও অন্যজন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার বা তার মনোনীত একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার। এক্ষেত্রে বাঙালিদের যৌক্তিক আশঙ্কা হচ্ছে, কমিশনে পাহাড়িদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বিচারিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং সেইসঙ্গে প্রতিটি রায় বাঙালিদের বিপক্ষে যাবে। এছাড়া আইনে কমিশনের সচিব এবং অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগের বিধান থাকায় বাঙালিরা সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। ধারা ১০ এ আছে, কমিশন কর্তৃক আবেদন নিষ্পত্তির পূর্বে যেকোনো ন্যায্য বিচারের স্বার্থে আবেদনকারী তার আবেদন সংশোধন করতে পারবে। এর ফলে বিচারকাজ প্রভাবিত হওয়া ছাড়াও বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হবে।

গোড়ায় গলদ না আগায়?
১৯৭৫ সালের পরে পাহাড়ে গেরিলা গ্রুপ শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়। ওই সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার বিদ্রোহ দমনে ব্যবস্থা নেয়। পাশাপাশি পাহাড়ে পাহাড়ী ও বাঙালি জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। সে লক্ষে সমতলের অনেক ‘সেটেলার’ পরিবারকে দুই একর আবাদি জমি ও পাঁচ একর পাহাড়ি জমি দেয়ার কথা বলে সরকারি উদ্যোগে তিন পার্বত্য জেলায় পুনর্বাসন করা হয়। পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার উদ্দেশ্যে তিনি একটি পাহাড়ি একটি বাঙালি- এভাবে পুরো পার্বত্যাঞ্চলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিন্যাসের ব্যবস্থা করেছিলেন। তার সুদূরপ্রসারী ইচ্ছা ছিলো- এভাবে দীর্ঘসময় ধরে পাহাড়ি ও বাঙালি পরিবার পাশাপাশি বসবাস করার ফলে তাদের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচে যাবে, সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পাবে এবং একসময় চিরকালের মতো বিরোধ-মীমাংসা তারা নিজেরাই করে নিতে পারবে। সঙ্গত কারণেই পার্বত্যাঞ্চলে পাহাড়িদের পাশাপাশি বাঙালিদের উপস্থিতি একান্তই জরুরি ছিলো। কেননা কেবল সেনাবাহিনী দিয়ে পার্বত্য এলাকার সীমান্ত রক্ষা সম্ভব নয়।

অভিযোগ রয়েছে, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বন্দোবস্তীর নিয়ম ভেঙে সেটেলারদের জমির কবুলিয়ত দেয়। এ কারণেই নাকি ভূমিবিরোধ সৃষ্টি হয়। এরপর এরশাদ সরকার এসে বাঙালিদের জন্য পূর্বের সরকারের বরাদ্দকৃত জমির কবুলিয়ত প্রত্যাখ্যান করে বিরোধ-মীমাংসার উসিলায় বাঙালিদের পাহাড় থেকে সরিয়ে এনে ছোট ছোট গুচ্ছগ্রামে আবদ্ধ করে ফেলে। সেখানে বাঙালিদের জন্য বন্দোবস্ত দেয়া হয় মাত্র এক একর করে অনাবাদি জমি। মূলত ভূমির বিরোধটা শুরু হয় সে কারণেই। এরপর থেকে বাঙালিরা পাহাড়ে পড়ে থাকা তাদের ৫ একর জমি ফিরে পেতে চাইলেও কোনো সরকারই সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করেনি। খালেদা জিয়ার সরকার হয়ে শান্তিচুক্তির পর শেখ হাসিনা, তারপর খালেদা জিয়া হয়ে আবারো শেখ হাসিনার সরকার এলো। কিন্তু এখনো আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে সেই গুচ্ছগ্রামবন্দি ৮ লাখ বাঙালি মুসলিমদের।

১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সইয়ের পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখা বিলুপ্ত শান্তিবাহিনীর প্রায় দুই হাজার সদস্য। চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ইতোমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু এরমধ্যে পাহাড়ে ভূমির সমস্যা সমাধান এখনো হয়নি।

সেনাদের প্রতি বিষোদগার
‘পার্বত্য চট্টগ্রামে অশনি সংকেত! নামে ‘পাহাড়ি ব্যাটেলিয়ন’, আসল লক্ষ্য পাহাড়ি নিধন, সজাগ হোন সংগ্রামি জনতা’। সরেজমিনে দেখা গেছে, সম্প্রতি সেনাবাহিনীর নতুন ব্যাটেলিয়ন মোতায়েনকে কেন্দ্র করে পার্বত্য অঞ্চলের সবচে’ সংঘাতপ্রবণ অঞ্চল খাগড়াছড়ির মহালছড়ি দীঘিনালাসহ পুরো পাহাড়ি অঞ্চলে সাঁটা এ ধরণের অসংখ্য পোস্টার। পোস্টারের নিচে লেখা আছে ‘গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম’ ও ‘ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি’সহ আটটি সংগঠনের নাম। এর মধ্যে উল্লিখিত দুটি সংগঠনের নেপথ্যে নামে বেনামে রয়েছে বিভিন্ন বাম সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। বোঝা যায়, সেনা ক্যাম্প স্থাপনাকে নিয়ে কোন্দলে প্রকাশ্যই ঘৃতাহুতি দিচ্ছে বাম দলগুলো। পাহাড়ি অঞ্চলের সেনারা নিজেদের স্বার্থেই সবসময় পাহাড়িদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করলেও পাহাড়িরা সেনাদেরকে নিজেদের প্রতিপক্ষভাবে বরাবরই। পাহাড়ের পার্বত্য জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) বান্দরবান জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বা ক্যবা মার্মা বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণের জন্য সেনাবাহিনীর প্রয়োজন হবে কেন? অন্য কোনো জেলায় তো দরকার হয় না। সেনাবাহিনী কেন সমাধান হবে’? একই মনোভাব ব্যক্ত করেন রাঙামাটির শুভলং উপজেলার বাসিন্দা কলেজ ছাত্র সুপণ চাকমা। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আসলে তারাই ( সেনাবাহিনী) অশান্তির কারণ হয়ে ওঠেছে পাহাড়ে বারবার। যে বিরোধের শুরু হয় সামান্য বাকবিতণ্ডা দিয়ে, তার শেষে রক্ত গড়ায় কেন? অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে যারা ব্যর্থ, তারা কীভাবে সীমান্ত রক্ষা করবে’?

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ফেসবুক ও ব্লগেও বামঘেঁষা বিভিন্ন ব্যক্তি ও দলের পক্ষ থেকে পার্বত্য এলাকায় মোতায়েনকৃত সেনাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হচ্ছে। ‘বামপন্থা’ নামের একটি ওয়েবে দেখা গেছে, সেখানে ‘আদিবাসী’ নাম নিয়ে জনৈক ব্লগার লিখেছেন, এটি হচ্ছে সেনা কর্মকর্তাদের খুশি রেখে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার বা ক্ষমতায় যাওয়ার ভোটবাজির এক বিচিত্র রাজনীতি। গণতন্ত্রের খোলসে পাহাড়ে বন্দুকের শাসন টিকিয়ে রাখার চেষ্টা।

ভূমিবিরোধ নাকি মুসলিম বিরোধ?
বিরোধের ব্যাপারে সবসময় মিডিয়া ও সরকারের পক্ষ থেকে একই কথা বলা হয়ে থাকে যে, বিরোধ হয়েছে ভূমি নিয়ে। কিন্তু এই বিরোধ চলাকলীন সময়ে পাহাড়িদের হাতে যে অস্ত্র দেখা যায়, সেই অস্ত্র এলো কোত্থেকে- এমন প্রশ্ন সাধারণের মনে উঁকি দেয় হরহামেশাই। কেন বিরোধের পরে ধর্মীয় স্থাপনায় আঘাত করা হয়? আসলেই কি কেবল ভূমিবিরোধের ফলে সংঘর্ষের সৃষ্টি হচ্ছে, নাকি আরো কিছু জড়িয়ে আছে? সাপ্তাহিক লিখনীর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ কিছু তথ্য।

পার্বত্য এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ ছাড়াও বিভিন্ন অবৈধ সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, অত্যাচার-নিপীড়নে প্রতিনিয়তই সেখানকার বাঙালিদের জীবনযাত্রা কাটছে অত্যন্ত দুর্বিষহ অবস্থায়। অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র উপজাতীয় গোষ্ঠীর অনেকেই বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ ১১টি উপজাতীয় গোষ্ঠীর যে কেউ চাইলেই রাজধানী ঢাকার লাক্সারিয়াস জোন গুলশান, বারিধারা কিংবা বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামের খুলশি, নাসিরাবাদে জমি, প্লট, ফ্ল্যাট, এপার্টমেন্ট ইত্যাদির মালিক হতে পারছে অনায়াসেই। অথচ কোনো বাঙালি মুসলমান পার্বত্য চট্টগ্রামের কোথাও জমি কিনতে কিংবা বসতি স্থাপন করতে পারে না।

এর সাথে সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের যে কোনো উপজাতীয় নাগরিকের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার সকল স্তরে বিশেষ উপজাতীয় কোটার ব্যবস্থা রয়েছে। সেই সুবাদে বর্তমানে চাকমা উপজাতির মধ্যে শিক্ষার হার শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ। অন্যান্য উপজাতির শিক্ষার হার সমতল অঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠীর থেকেও অনেক বেশি। অথচ পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালি মুসলমানদের জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে তেমন কোটা কিংবা অন্য কোনো ধরনের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নেই। ফলে পার্বত্য অঞ্চলে বাঙালি মুসলিমদের শিক্ষার হার কমতে কমতে বর্তমানে ২০ শতাংশেরও নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও উপজাতি বিশেষ কোটায় চাকরি লাভের সুযোগ রয়েছে অবারিত। এতে করে চাকরিতে যথেষ্ট হারে উপজাতি গোষ্ঠীর লোক সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু বাঙালি মুসলমান নাগরিকরা এক্ষেত্রে সকল সুযোগ থেকে বঞ্চিত। শিক্ষিত এমনকি উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও বেড়েই চলেছে সাধারণ বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে। কেবল চাকরিক্ষেত্রে নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্য, ঠিকাদারি, কৃষি-খামার, পোলট্রি থেকে শুরু করে হ্রদে মাছ শিকারের মতো যে কোনো পেশা নিয়েও পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কেননা এ ধরনের যে কোনো কাজে নিয়োজিত থাকতে গিয়ে পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীদেরকে মোটা অঙ্কের চাঁদা বা ট্যাক্স দিতে হচ্ছে।

নির্যাতনের শিকার নওমুসলিমরা
পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে উপজাতি জাতিগোষ্ঠীর নওমুসলিমরা। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পরে নিজেদের সমাজ গ্রাম থেকে পালিয়ে এসেও রেহাই পাচ্ছে না তারা। জানা গেছে মুসলিম হওয়ার ফলে সামজের চাপের মুখে পড়ে অনেকেই পার্বত্য অঞ্চল ছেড়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন সমতল জেলাস্থ মসজিদ ও মাদরাসায় আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পুলিশ ও র‌্যাবে নিয়োজিত খ্রিস্টান কিংবা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী উপজাতীয় সদস্যরা তাদের ধরে নিয়ে অমানবিক নির্যাতনের পাশাপাশি থানায় সোপর্দ করে। পার্বত্যাঞ্চলের খ্রিস্টান মিশনারিদের দেয়া তালিকা অনুযায়ী রাজধানীর বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসা কমপ্লেক্সে হানা দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে থাকা উপজাতীয় সদস্যরা। সর্বশেষ গত ২ জানুয়ারি রাজধানীর বাসাবো এলাকার একটি মাদরাসায় হানা দিয়ে পুলিশ উপজাতি ৫ মুসলিম এবং তাদের ১১ সন্তানকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করার ঘটনা সেসময় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে কর্মরত কনস্টেবল লালমিয়া এ প্রতিবেদকের কাছে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।

এসব মুসলিম জানান, পাহাড়ে থাকলে চলে শান্তি বাহিনীর অত্যাচার আর নির্যাতন। অন্যকোথাও গেলেও আশ্রয় জোটে না আমাদের। কোনো মসজিদ কিংবা মাদরাসায় ঠাঁই নিলেও ভাগ্যে জোটে পুলিশ ও র‌্যাবের নির্যাতন। মুসলমান হিসেবে বাংলাদেশে আমাদের কি বাঁচার অধিকারও নেই? ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অন্তর্ভুক্ত রাজধানীর মিরপুরের একটি মসজিদ কমপ্লেক্সের পরিচালক আক্ষেপ করে বলেন, স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার দেশের প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে। পার্বত্য এলাকায় বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর হাজার হাজার সদস্য খ্রিস্টান বানানো হচ্ছে। অথচ উপজাতীয়দের মধ্যে কেউ স্বেচ্ছায় মুসলমান হলেই তার আর রক্ষা নেই। এদের রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া হলেও তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি বন্ধ হচ্ছে না।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ১ জানুয়ারি রাঙামাটির সাংড়াছড়ি এলাকার মো. করিম হোসেন (পূর্বনাম হামাজং ত্রিপুরা), মো. নূর ইসলাম (পূর্বনাম সুবামং ত্রিপুরা) সহ উপজাতীয় ৫ মুসলমান তাদের ১১ সন্তানকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত একটি মাদরাসায় ভর্তি করাতে ঢাকায় পাড়ি জমান। পরদিন বাসাবো আবুজর গিফারী কমপ্লেক্সে পৌঁছার কিছুক্ষণ পরই সবুজবাগ থানা পুলিশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানটি থেকে অভিভাবকসহ সব ছাত্রকে আটক করে নিয়ে আসে। পুলিশ জানায়, মুসলমান হওয়ার এফিডেভিটসহ যাবতীয় কাগজপত্র সঙ্গে না থাকায় তাদের বিষয়ে আদালতের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিন্তু নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ফাউন্ডেশনের এককর্মকর্তা জানান, এফিডেভিটসহ মুসলমান হওয়ার সব কাগজপত্র পুলিশকে দেখানোর পরও পুলিশ তাদের সন্তানদের মুক্তি দেয়নি। বরং ঢাকায় ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরামের সভাপতি উদয় ত্রিপুরাসহ ১০-১২ জন উপজাতীয় তরুণ থানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পৃথকভাবে দেনদরবার করে।

তিনি আরো জানান, ভিকটিম সেন্টারে আটক এসব ছাত্রছাত্রীকে খ্রিস্টানদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য একটি ক্যাথলিক চার্চ থেকে চিঠিও দেয়া হয়েছে। ঢাকায় আশ্রয় নেয়া উপজাতীয় তরুণ একজন মুসলমান আল-আমীনের সঙ্গে লিখনীর এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, আমাদের এলাকায় কোনো স্কুল কিংবা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। কেবল খ্রিস্টান মিশনারিদের একটি মিশনারি প্রাইমারি স্কুল রয়েছে। বাধ্য হয়েই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর এসব মুসলমান শিক্ষার্থীকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ অন্যান্য সংস্থা পরিচালিত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়। আমাদের গ্রামের কাছাকাছি পাহাড়ের উপরে বিজিবির একটি ক্যাম্প রয়েছে। ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যদের আজানের আওয়াজ ও নামাজ দেখে আমাদের খুবই ভালো লেগে যায়। পরে শহরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাত করার পর তারা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি ঢাকায় আবুজর গিফারী ট্রাস্টসহ আরও কিছু সরকার অনুমোদিত সংস্থার ঠিকানা দেন, যারা ভিন্নধর্মাবলম্বীদের ইসলামিক রীতিনীতি শেখাতে সহযোগিতা করে। আমাদের অনুসরণ করে গ্রামের হেডম্যানসহ অনেকেই ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেন।

এছাড়া অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্পূর্ণ ভিন্নরকম এক তথ্য। পাহাড়ে অনেকসময়ই বাঙালি ও পাহাড়ি ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রেমের ঘটনা ঘটে। যা কখনো কখনো বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু দেখা যায়, যেখানেই বাঙালি মেয়ে ও উপজাতি ছেলের বিয়ে হয়েছে, দু’একটি ব্যাতিক্রম ছাড়া প্রতিক্ষেত্রেই বিয়ের সময় উপজাতীয়রা ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হচ্ছে। তাদেরকে তাদের পরিবার আর মেনে না নিলেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা মুসলিমদের ধর্ম থেকে দূরে সরে যায় নি। এই আক্ষেপের ফলেও হয়তো সময়-অসময় বাঙালি মুসলিমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে- বলেছেন খাগড়া শহরের এক মাদরসা শিক্ষক। খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত উপজাতিদের বা চার্চের বিরুদ্ধে মুসলিমরা তেমন কোন অভিযোগ না করলেও মুসলিমরা হরহামেশাই নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে।

অভিযোগ আছে, মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত তিনটি পরিবারকে গত ২০১২ সালে ঢাকায় উপজাতি পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার ও হয়রানি করিয়েছে পুলিশের তৎকালীন এডিশনাল আইজি (বর্তমান সচিব ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়নবোর্ডের এর চেয়ারম্যান) নব বিক্রম ত্রিপুরা। একই সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক উপজাতি ছাত্রীকে অপহরণ করা হয়, সমতলের বাঙালি ছেলের সাথে প্রেম করার অপরাধে।

‘আদিবাসী’ তাই কদরের শেষ নেই
পার্বত্য এলাকায় বেড়াতে গিয়ে গভীরভাবে নজর করলেই একটি বিষয় প্রায় স্পষ্টভাবেই চোখে ধরা পড়ে। পাহাড়িরা একে তো অমুসলিম এবং দ্বিতীয়ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি হওয়ার সুবাদে সংখ্যালঘুতার দোহাই দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের করুণা পেয়ে আসছে সবসময়ই। সেক্ষেত্রে বাঙালি মুসলিমরা অনেকটাই অসহায়। মুসলিমদের জন্য একটা এনজিও তো দূরে থাক, মসজিদ করে দেয়ার মতো লোকবল পাওয়া যায় না বললেই চলে। এরই সাথে পাহাড়িরা সর্বত্রই প্রচার করে বেড়াচ্ছে যে, তারা বাংলাদেশের সবচে’ পুরাতন জাতি তথা ‘আদিবাসী’। চাকমাদের মতে, বাঙালিরা সেখানে ‘সেটেলার’। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্তিক বিভাগের এক গবেষণায় এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে যে, বিরান পাহাড়ি ভূমিতে প্রথমে চাকমা তথা অন্য পাহাড়িরা বসবাস করতে শুরু করলেও প্রায় একই সময় বাঙালিরাও সেখানে বসবাস করতে শুরু করে। তবে তারা সংখ্যায় কম ছিল।

গবেষণায় জানা যায়, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা লুসাই জনগোষ্ঠির কেউই আদিবাসী নয়।
সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি উপজাতির মাত্র ৬ লাখ মানুষ ‘আদিবাসী’ দাবি করে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিতে চাওয়াটা কিছুতেই যৌক্তিক হতে পারে না। অথচ সরকার যেনো এখানে নিজেই তাদেরকে পরোক্ষ শেল্টার দিয়ে যাচ্ছে। গত টার্মে আওয়ামী সরকারের আমলেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপুমনি এ প্রেস কনফারেন্সে ‘বাঙালিদেরকেই আদিবাসী’ বলে উপজাতীয়দের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি বললেই খোদ সরকারের ভেতর থেকে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সেসময় নানা মহলের চাপে বিষয়টি আমূল চেপে যায় সরকার।

পাহাড়ী নেতা হিসেবে কোনো ধরনের নির্বাচন কিংবা দায়বদ্ধতা ছাড়াই সন্তু লারমা ১৯৯৯ সালের ১২ মে থেকে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। অথচ একটানা দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর এ দেশের রাষ্ট্রপতিও ক্ষমতায় থাকতে পারেন না। সন্তু বাবু থাকছেন কোন আইন বলে? শান্তি চুক্তির পর থেকে ঢাকায় প্রায় ৭০ হাজার টাকা দিয়ে বাসা ভাড়া থাকছেন, যার ব্যয় বহন করছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্ট এইচ টি ইমাম বান্দরবানের এক মতবিনিময় সভায় যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। তিনি সেখানে বলেন, পাহাড়ে যেসকল পাহাড়িরা বসবাস করছেন, এখানে উন্নয়ন করেছেন, এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও স¤পদকে ব্যবহার করে এই জেলাকে উঁচিয়ে রেখেছেন তাদের কোনো ক্ষতি হোক এটি আমরা কখনও গ্রহণ করতে পারি না। জননেত্রী শেখ হাসিনাও এটি কামনা করেন না, তিনি আপনাদের সমস্যা সম্পর্কে অবহিত আছেন। এই ‘ক্ষতি’র মানে কি- সেটা এখন প্রায় স্পষ্ট।

পাহাড়ের বাঙালিদের ছাত্র সংগঠন পিবিসিপির খাগড়াছড়ি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা লিখনীকে বলেন, আমাদের এখানে সবসময়ই সরকার ও প্রশাসন পাহাড়িদের পক্ষ নিয়ে কথা বলে। আমাদের ওপর পাহাড়িরা আক্রমণ চালানোর পরে আমরা থানায় মামলা নিয়ে গেলেও দেখা যায় উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। সম্প্রতি বিচারপতি খাদেমুল ইসলামের নেতৃত্বে আমাদের অঞ্চলে ভূমি বিরোধ নিরসনের জন্য এলেও কেবল পাহাড়িদের বাধার কারণেই সেটা সম্পন্ন করতে পারেন নি। অথচ মিডিয়া বলছে কেবল আমাদের প্রতিবাদের কথা।

পাহাড়ে মুসলিম বাঙালিদের দুর্দশা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমরা দেখেছি, সেখানকার মুসলিমরা সবসময়ই যেনো একটা ভয়ের মধ্যে বাস করছেন। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েও অনেকেই তা প্রকাশও করেছেন। অনেকেই বলেছেন, কোনোক্রমইে যেনো পত্রিকায় তাদের নাম প্রকাশ করা না হয়, তাহলে যেকোনো সময় তারা নির্যাতনের শিকার হতে পারেন। একই দেশের মধ্যে, যে দেশকে আমরা মুসলিম দেশ বলে প্রচার করে থাকি, আসলেই কি মুসলিম হিসেবে পাহাড়ের বাঙালি মুসলিমরা বসবাস করতে পারছেন? যারা এখনো সকল নির্যাতনের পরেও টিকে আছেন, তারাই বা কতদিন টিকতে পারবেন, জানেন না সেখানকার মুসলিম জনগোষ্ঠি। মুসলিম হিসেবে না হোক অন্তত মানুষ হিসেবেও তারা যে মানবিক পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করছেন, এর দায় কার- সে প্রশ্ন এদেশের নাগরিকদের অভিভাবক সরকার ও সমাজপতিদের কাছে রইলো।

সূত্র: সাপ্তাহিক লিখনী

 

আরও প্রবন্ধ পড়ুন

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

কি ঘটবে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধন প্রস্তাব কার্যকর হলে?

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ : প্রেক্ষাপট ও শান্তির সম্ভাবনা

আদিবাসী বা নৃতাত্ত্বিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী বিতর্ক

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধ ধর্মের ভবিষ্যৎ-৩

বাংলাদেশে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ প্রচারণা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রশ্নসাপেক্ষ

পর্যটক ছদ্মবেশে মিশনারি কাজের অভিযোগে খাগড়াছড়ি ত্যাগ করতে বাধ্য হলো ১২ দেশি- বিদেশি নাগরিক

পার্বত্য চট্টগ্রামকে জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

 

আদিবাসী ইস্যুতে সরকারী নীতি অমান্য করলেন দুই সচিব

52b5c0722ae70-round-table

স্টাফ রির্পোটার, রাঙামাটি:
আদিবাসী ইস্যুতে সরকারী নীতি মানছে না সরকারেরই উর্দ্ধতন কোনো কোন কর্মকর্তা। এ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মহলে ও পাহাড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে আদিবাসী বিষয়ক বৈঠকে যোগ দিয়ে ধৃষ্টতা প্রদর্শন করছেন বলে মত প্রকাশ করেছে পাহাড়ের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। তারা বলেন,  বাংলাদেশে বিএনপি আওয়ামী লীগ দুই সরকারেরই প্রতিষ্ঠিত নীতি হচ্ছে, এ দেশে কোনো আদিবাসী নেই। দেশের মধ্যে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একাধিক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশে অবস্থিত আদিবাসী বিষয়ে কনসার্ন বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে সরকারী নীতি পুর্নবিবেচনার দাবী জানালে বাংলাদেশ সরকার তাদেরকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ আর কোনো আলোচনায় আগ্রহী নয়।

পরবর্তীকালে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের একাধিক মিটিংয়েও সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশ সরকার দেশের মধ্যে আদিবাসী বিষয়ক কোনো অনুষ্ঠানে সরকারের মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে গোপন প্রজ্ঞাপন জারী করেছে। এ ছাড়াও রাষ্ট্রীয় ও ব্যাক্তিগত মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোর জন্য আদিবাসী ব্যবহার বারিত করে গোপন সার্কুলার জারী করেছেন। এ ধরণের একাধিক সার্কুলার পার্বত্য নিউজের কাছে রয়েছে।

অথচ এতকিছুর পরও আদিবাসী ইস্যু নিয়ে এক শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তার অতিদরদ ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত মাখামাখিতে দেশে বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়ছে। মুলত সরকারের মাঝে ঘাপটি মেরে থাকা এক শ্রেণির বিদেশী মদদপুষ্ট এজেন্ট ইস্যুটি নিয়ে দেশ ও বিদেশে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করছে।

সূত্রমতে, গত ২১ ডিসেম্বর রাজধানীতে অনুষ্ঠিত আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ সংক্রান্ত এক সভায় সরকারের দুইজন সচিব ও এনসিটিবি’র চেয়ারম্যান যোগ দিয়ে আদিবাসী বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নীতির বাইরে গিয়ে কথা বলেন। অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ও পার্বত্য উন্নয়ন বোর্ডের নবদায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব কাজী আখতার হোসেন এবং এনসিটিবি’র চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান অংশ নেন। একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই গোলটেবিল বৈঠকে সরকারের দুজন সচিব ছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, উপজাতীয় নেতা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেভ দ্য চিলড্রেনের সহায়তায় এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

অথচ সরকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার বিষয়টি এখনও আইন আকারে পাশ করেনি। এমনকি বিষয়টি সম্প্রতি শিক্ষা বিষয়ে সরকারি খসড়া আইনেও আনা হয়নি। জাতীয় শিক্ষানীতিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার বিষয়ে ‘আদিবাসী’ শব্দটি চক্রান্তমূলকভাবে ব্যবহার করা হলেও সংবিধান ও আইনে এই শব্দ পরিহার করা হয়েছে।

তাছাড়া সরকার এ পর্যন্ত তিন তিনবার পরিপত্র জারি করে সরকারি কাগজপত্রে আদিবাসী শব্দবি পরিহার করার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের স্পষ্ট করে নির্দেশ দিয়েছে। তারপর কিভাবে সরকারি উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা আদিবাসী শব্দের ব্যবহার এবং আদিবাসী ই্স্যুতে আলোচনায় অংশ গ্রহণ করায় এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছে বিভিন্ন সংগঠনের একাধিক নেতৃবৃন্দ।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাদানের ব্যাপারে তাদের কোনো আপত্তি নেই। আপত্তি সেখানে আদিবাসী শব্দের ব্যবহারে।

মতপ্রকাশ কারীরা জানান, ইইউসহ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের কয়েকটি সম্প্রদায়কে আদিবাসী হিসেবে পরিচিত করানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। বাংলাদেশের কোথাও আদিবাসী নেই বলে একাধিকবার আন্তর্জাতিক মহলে প্রমাণিত হবার পরও এই মহলটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী ইস্যুতে কাজ করছে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। তারা গত প্রায় দেড়দশক ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে আদিবাসী শব্দের প্রয়োগের জন্য সাংবাদিক ও মিডিয়া কর্মীদের নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করে আসছে। এই মহলটি প্রথমে সরকারি কর্মকর্তাদের মাঝে আদিবাসী প্রীতি তৈরীর জন্য নিয়মিতভাবে তাদের নানা উপটৌকন দিয়ে হাত করে। পরে হঠাৎ করে মিডিয়ায় এই শব্দের প্রয়োগ শুরু করে।

এক পর্যায়ে সরকারের এ বিষয়ে বোধদয় হলে ২০০৫ সালে মন্ত্রণালয় থেকে এই শব্দ পরিহারের জন্য নির্দেশনা জারি করা হয়। পরে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে চাকমা রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায় স্পেশাল এসিস্ট্যান্স থাকার সময়, পার্বত্য মন্ত্রণালয় থেকে ২০০৮ সালে এই দ্বিতীয় প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। যদিও তিনি নিজেই বাংলাদেশে আদিবাসী আন্দোলনের প্রবক্তা। বর্তমান সরকারের প্রথম দিকে আবারো বিষয়টি নিয়ে একশ্রেণীর কর্মকর্তার অতিতৎপরতা দেখে ২০১১ সালে এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তারপরও কর্মকর্তাদের মাথা থেকে আদিবাসী ভূত সরে না যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে মহলটি।

 

চেয়ারম্যান নিয়োগে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন-২০১৩ পাশ

Untitled-1

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট :
(এক)

শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান হওয়ার পথ বাঙালীদের জন্য রুদ্ধ হয়ে যায়। যেমন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ প্রভৃতি। বাঙালীদের শেষ ভরসা ছিল প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সৃষ্ট পার্বত্য উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু সে প্রতিষ্ঠানের প্রধান হওযার পথও বাঙালীদের জন্য রহিত বা রুদ্ধ করা হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন-২০১৩ মন্ত্রীসভায় পাশ করার মাধ্যমে। এ আইনে উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে উপজাতীয় প্রার্থিকে আগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলা হয়েছে। আইনের ৫(৩) ধারায় পার্বত্য উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ‘চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার যোগ্য উপজাতীয় প্রার্থীকে অগ্রাধিকার প্রদান করিবেন।’ ফলে এ পদটিতে বাঙালীদের প্রবেশ রহিত হয়ে তা কার্যত উপজাতীয়দের জন্য সংরক্ষিত হয়ে গেল বলে মনে করছেন পার্বত্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা।

উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড অধ্যাদেশে এ ধরণের কোন বিধান ছিলনা। ফলে সরকার চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রামের যেকোন সম্প্রদায়ের যোগ্য ব্যাক্তিকেই চট্টগ্রাম উন্নয়ন উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দিতে পারতেন। কিন্তু বর্তমান আইনের ফলে এ পদটি কার্যত উপজাতীয়দের জন্য সংরক্ষিত করা হল।

জিয়াউর রহমানের আমল থেকে এ পদে চট্টগ্রামস্থ ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার অভ কমান্ডিংকে প্রধান করা হতো। ফলে সেসময় পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে পাহাড়ী বাঙালী সুষম বণ্টন বা ভারসাম্য পরিলক্ষিত হতো। বিগত চার দলীয় জোট সরকারের সময় খাগড়াছড়ি থেকে নির্বাচিত এমপি ওয়াদুদ ভুইয়াকে উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়। ফখরুদ্দীন- মইনউদ্দীন সরকারের সময় ওয়াদুদ ভুইয়া গ্রেফতার হলে এ পদটিতে আবারো প্রধান হিসাবে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি বসেন। বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বান্দরবান থেকে নির্বাচিত এমপি বীর বাহাদুর উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে পাহাড়ী-বাঙালী বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। কাজেই এ পদটি স্থায়ীভাবে উপজাতীয়দের কর্তৃত্বে চলে গেলে পার্বত্য বাঙালীরা আরো বৈষম্যের শিকার হবেন বলে মনে করছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা।

এমনিতেই শান্তিচুক্তির পর বিভিন্ন বৈষম্যমূলক বাঙালী বিদ্বেষী ধারার কারণে পার্বত্য বাঙালীরা নিজভূমে পারবাসী হয়ে পড়েছেন, নিজের দেশে উপজাতীয়দের মুখে স্যাটলার গালি শুনতে হয় প্রতিনিয়ত।

সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, ২০১১ (২০১১ সনের ১৪নং আইন) এবং বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত রায় অনুযায়ী সরকারের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ উক্ত সময়ের মধ্যে প্রণীত হওয়ায় অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়ায় মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৩ তারিখে মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ এর সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধনপূর্বক স্টেকহোল্ডারদের মতামত ও সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মতামতের ভিত্তিতে খসড়া আইনটিতে বিভিন্ন ধারা/উপধারা সংযোজন, সংশোধন ও পরিমার্জন করা হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন-২০১৩ তে।
The chittagong Hill Tracts Devolopment Board Ordinance, 1976 (Ordinance No LXXVII of 1976) অধ্যাদেশটি মুলত: আইনে পরিণত করার কথা বলা হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে নতুন ধারা-উপধারা সংযোজন/পরিমার্জন করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে The chittagong Hill Tracts Devolopment Board Ordinance, 1976 (Ordinance No LXXVII of 1976 অধ্যাদেশটি রহিত করা হয়েছে। যদিও মন্ত্রীসভার বৈঠকের জন্য যে সারসংক্ষেপ তৈরী করা হয় তাতে এই সংশোধিত ধারাগুলির কথা উল্লেখ করা হয়নি।

আইন প্রণয়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের মতামত চেয়ে মন্ত্রণালয় হতে পত্র দেয়া হলে আঞ্চলিক পরিষদ তাদের মতামত প্রদান করে।  আঞ্চলিক পরিষদের পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন,২০১৩ প্রণয়ন প্রক্রিয়া বন্ধ করা,  পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড অধ্যাদেশ,১৯৭৬ বাতিল করা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড অবলুপ্ত করার জন্য মন্ত্রণালয়ে তাদের সুপারিশ প্রেরণ করে।

কিন্তু তাদের সুপারিশ মন্ত্রিপরিষদের গৃহিত সিদ্ধান্তের পরিপন্থি হওয়ায় সে সকল সুপারিশ আমলে না নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে মন্ত্রিসভা বৈঠক অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিনত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

বর্তমান আ্ইনে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, আঞ্চলিক পরিষদের প্রতিনিধি, তিন পার্বত্য জেলা প্রশাসক, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ প্রতিনিধি, সরকার কর্তৃক নিযুক্ত উপসচিব পদমর্যাদার চারজন প্রতিনিধি- যাদের একজন সচিব হিসাবে দায়িত্বপালন করবেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিসহ এই বোর্ড গঠন করা হয়েছে। 

এদিকে নতুন এ আইনটি পাশের মাধমে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল শীর্ষপদ এখন পাহাড়ীদের কব্জায় সমর্পন করা হয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে সার্বিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডে কোন বাঙ্গালীর চেয়ারম্যান পদে আসার সকল পথ রূদ্ধ করা হয়েছে।