বিএনপিতেও উপেক্ষিত পার্বত্য বাঙালী

বিএনপি

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

বিএনপি পার্বত্য বাঙালীদের দল বলে প্রচারণা থাকলেও সদস্য ঘোষিত বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে পার্বত্য বাঙালীরা উপেক্ষিত হয়েছে। গত ৬ আগস্ট ঘোষিত বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটিতে তিন পার্বত্য জেলা থেকে ৭ জন স্থান পেয়েছেন। এর মধ্যে ৬ জন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর হলেও মাত্র ১ জন রয়েছে পার্বত্য বাঙালীর।

এই বৈষম্য নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বেশিরভাগ বিএনপির বাঙালী নেতাকর্মীদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। ফলে বিষয়টি পার্বত্যনিউজ তিন পার্বত্য জেলার শীর্ষ বাঙালী তিন নেতার সাথে কথা বলে। তাদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে হতাশা পরিলক্ষিত হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালীদের কেউ প্রয়োজন মনে করছে না- ওয়াদুদ ভুঁইয়া

বিএনপির নতুন কমিটিতে স্থান পাওয়া সহ. কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক ও খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সভাপতি এবং সাবেক এমপি ওয়াদুদ ভুঁইয়া তার প্রতিক্রিয়ায় পার্বত্যনিউজকে বলেন, বিএনপির নতুন কমিটিতে অবশ্যই পার্বত্য বাঙালীদের উপেক্ষা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটিতে সদস্য পদে রবীন্দ্র লাল নামে যে স্থান পেয়েছে, সে তো আমাদের খাগড়াছড়ির ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা হওয়ারও যোগ্য নয়, আমরা তাকে খাগড়াছড়ির কোনো ইউপি কমিটির সভাপতিও করবো না। অবশ্যই এখানে বাঙালীদের উপেক্ষা করা হয়েছে। আমাকেও তো বাদ দিতো, গতবার তো বাদ দিয়েছিলো। গতবার আপনারা লেখালেখি করেছেন, সেসব পেপার কাটিং লিফলেট হয়ে পার্টি অফিসে ও বিভিন্ন জায়গায় বিতরণ করা হয়েছে- যার কারণে একটা আওয়াজ উঠেছিলো।

পার্বত্য বাঙালীদের শীর্ষ এই নেতা বলেন, আমি নিজেও্ একাধিকবার ম্যাডামকে বলেছি, ম্যাডাম ওখানে তো বাঙালীদের বাদ দেয়া হলো। তিনি জানতে চাইলেন, কিভাবে? আমি বলেছিলাম, আমাকেও তো রাখা হয়নি। তিনি বললেন, এটা আর এমনকি, বাদ পড়ে গেছে কোনোভাবে, আছো তো তোমরা, তোমরা তো জেলাতে আছো তো, এখানে থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই।

নিজের পদ নিয়ে অসন্তষ্ট ওয়াদুদ ভুঁইয়া আরো বলেন, আমার বক্তব্য হলো বাঙালীদের উপেক্ষা করা হয়েছে। কেননা, রবীন্দ্র লাল যে নেতা হলো, তার চেয়ে যোগ্য অনেক বাঙালী নেতা পার্বত্য চট্টগ্রামে আছে। সেখানে শুধু রবীন্দ্র লাল না তো, সেখানে ৭ জনকে রাখা হয়েছে। কিন্তু আমি ৮০ সাল থেকে বিএনপির পলিটিক্স করি, সেই হিসাবেও তো আমাকে এদের চেয়ে এক গ্রেড উপরে রাখা উচিত ছিলো। কিন্তু আমাকে তো ওদের গ্রেডেই রাখলো। ৬ জনের সাথে ১ জন, সেই হিসাবেও আমাকে তো ওদের চেয়ে উপরে রাখা দরকার ছিলো, কিন্তু তাতে করলো না। আমার রাজনৈতিক বয়স, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী আমার পদ আরো উপরে যাওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু আমার থেকে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ লোক অনেক ভাল পদ পেয়েছে।

শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত দলে এমন অবস্থা কেন হলো এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কেউ পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালীদেরকে প্রয়োজন মনে করছে না, ভাবছে বাঙালীদের প্রয়োজন নেই। বিদেশীদের পছন্দ পাহাড়ীরা, বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলগুলো পছন্দও পাহাড়ীরা। বিএনপি- আওয়ামী লীগ এখন আর সে ভিন্নতা নেই।

তিনি আরো বলেন, অবশ্য একটা ভিন্নতা আছে। বিএনপি তিন জেলার এক জেলায় সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক পদে বাঙালী রাখে, আওয়ামী লীগ এক জেলাতেও রাখে না। গতবার সমান ছিলো, এবার অবশ্য দুইটাতে আছে, আওয়ামী লীগ একটাতেও রাখেনি। এবার্ ট্রাডিশন ভেঙে রাঙামাটির সভাপতি পদে বাঙালী আমি ফাইট করে নিয়ে এসেছি। আবার বিএনপি এক জেলায় বাঙালী নমিনেশন দেয়, আওয়ামী লীগ তিন জেলায় পাহাড়ী নমিনেশন দেয়। লাস্ট ইলেকশনে বিএনপিও তিন জেলায় পাহাড়ী নমিনেশন দিয়েছিল। কাজেই এখন সেই পার্থক্য খুব একটা নেই। আস্তে আস্তে বিএনপিও আওয়ামী লীগের দিকে যাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় কমিটিতে সমতার ভিত্তিতে পদ বন্টিত না হওয়ায় নেতাকর্মীরা হতাশ- শাহ আলম

রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম পার্বত্যনিউজকে বলেন, বারবার আমরা ম্যাডামকে বলে এসেছি বিএনপির কমিটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অধিকহারে বাঙালী নেতাদের নেয়ার জন্য। ম্যাডাম আমাদের কমিটমেন্টও দিয়েছিলেন যে এবার তিনি সমতা রক্ষা করবেন। বিষয়টি আমাদের ওয়াদুদ ভাইও জানেন। কিন্তু কেন করলেন না সেটা তো বুঝতে পারছি না।

তিনি বলেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে অংশ নেয়ার মতো অনেক বাঙালী নেতা পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় রয়েছে। কিন্তু তাদের কমিটিতে স্থান না দেয়ায় তারা হতাশ। এর প্রভাব স্থানীয় বিএনপির কার্যক্রমে পড়বে বলেও তিনি ধারণা করছেন।

এথনিক মাইনোরিটিদের অধিক হারে কমিটিতে নেয়ার জন্য বিদেশীদের চাপ রয়েছে- ওসমান গণি

বান্দরবান জেলা বিএনপির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ওসমান গণি বলেন, আমাদের এখানে অর্ধেক পাহাড়ী, অর্ধেক বাঙালী। কাজেই আমি মনে করি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিও অর্ধেক পাহাড়ী ও অর্ধেক বাঙালী নিশ্চিত হওয়া উচিত। সে হিসাবে আরো অধিক বাঙালী বিএনপির কমিটিতে থাকা উচিত ছিলো।

তিনি বলেন, নিজেদের কে আমরা অভিভাবক শূন্য মনে করছি। পার্বত্য চট্টগ্রাম জিয়াউর রহমান ভূমিকা না রাখলে এতোদিন পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তো। তাই এখানকার বাঙালীরা বিএনপির অধিক সহানুভুতি সম্পন্ন। সেটা আমরা যখন উপরের লেভেলে আলাপ করি, তখন তারা বলে, এথনিক মাইনোরিটিদের অধিক হারে কমিটিতে নেয়ার জন্য বিদেশীদের চাপ রয়েছে।

ওসমান গণি বলেন, সর্বত্র প্রতিনিধি অর্ধেক পাহাড়ী, অর্ধেক বাঙালী নিশ্চিত হওয়া উচিত। আমরা চাই সকল রাজনৈতিক দলে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী-বাঙালী জনসংখ্যার অনুপাত অর্ধেক নিশ্চিত হওয়া উচিত। এই জনসংখ্যার অনুপাতকে অস্বীকার করা মানে, পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অস্বীকার করা।
উল্লেখ্য, সদ্য ঘোষিত বিএনপির ৫০২ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে তিন পার্বত্য জেলা থেকে মাত্র ৭ জনের ঠাঁই হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ৬ আগস্ট নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঘোষিত দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি এই তিন পার্বত্য জেলা থেকে ৭ জন মনোনীত হয়েছেন। এর মধ্যে বান্দরবানের ম্য ম্যাচিংকে উপজাতি বিষয়ক সম্পাদক, খাগড়াছড়ির আবদুল ওয়াদুদ ভুঁইয়াকে সহ কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক, রাঙ্গামাটির কর্ণেল (অব.) মনিষ দেওয়ানকে সহ উপজাতি বিষয়ক সম্পাদক, দীপেন দেওয়ানকে সহ ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে কমিটিতে রাখা হয়েছে।

এছাড়াও পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে বান্দরবানের সা চিং প্রু জেরী, খাগড়াছড়ির সমিরণ দেওয়ান, রাঙ্গামাটির রবীন্দ্র লাল চাকমাকে সদস্য করা হয়েছে। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

উপজাতি চাঁদাবাজদের স্বর্গরাজ্য পাহাড়ি জনপদ

চাঁদাবাজি

মমিনুল ইসলাম, পার্বত্য চট্রগ্রাম থেকে ফিরে:

চাঁদাবাজির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এক দশমাংশের পার্বত্য জনপদ। সরকারি কর বা ভ্যাটের ন্যায় এখানে প্রকাশ্যে চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি, এমনটিই জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্র। বাঙালি-পাহাড়ি যেই হোক না কেন, কিছু করতে হলেই গুণতে হয় চাঁদা। উপজাতিদের সশস্ত্র গ্রুপগুলো চাঁদাবাজির মাধ্যমে দিনে আদায় করে এক থেকে দেড় কোটি টাকা।

সামান্য কলার ছড়া থেকে শুরু করে, ব্যবসা-বাণিজ্য, জেলে, খামার, ঠিকাদারি, উন্নয়নমূলক কাজ সব কিছু থেকে আদায় করা হয় চাঁদা। আর তা না দিলে নির্যাতন, নিপীড়ন থেকে শুরু করে অপহরণ, খুন, ধর্ষণ হওয়ার শঙ্কা ভুক্তভোগীদের। প্রাণ ভয়ে মুখও খুলতে চান না তারা। স্বয়ং পুলিশ প্রশাসনও তাদের কাছে জিম্মি বলে অভিযোগ।

একটি গোয়েন্দা সূত্র বলছে, পুরো পার্বত্য অঞ্চলে (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) চাঁদা আদায়ে নিয়োজিত রয়েছে জেএসএস’র-ইউপিডিএফ’র পাঁচ হাজার সশস্ত্র প্রশিক্ষিত কর্মী। সরকারের করের ন্যায় বিভিন্ন জিনিসের ওপর মাসিক/বাৎসরিক নির্দিষ্ট হারে চাঁদা আদায় করা হয় এবং রসিদও দেয়া হয়। ক্যাডার পর্যায়ে নিয়োগপ্রাপ্ত এসব সশস্ত্র সদস্যের বেতন-ভাতাও দেয়া হয় বলে জানিয়েছে সূত্র।

চাঁদাবাজী

সম্প্রতি পাহাড়ে বিভিন্ন পণ্যের ওপর ‘শান্তি চুক্তি’ সমর্থক জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ’র আরোপ করা চাঁদার তালিকা করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এতে সাবেক ও বর্তমান রেটও উল্লেখ করা হয়েছে।

এ তালিকা মতে, গাছে প্রতি ঘনফুট ও বাঁশে প্রতি শ’ হিসেবে চাঁদা আদায় করা হয়। বর্তমানে প্রতি ঘনফুট সেগুন গোল গাছে জেএসএসকে চাঁদা দিতে হয় বছরে ৪০টাকা, ইউপিডিএফকে দিতে হয় ৫০টাকা। এভাবে সেগুন রদ্দা, গামারী গোল-রদ্দা, লালি গোল-রদ্দার ওপর আলাদা আলাদা হারে চাঁদা ধার্য করা হয়েছে।

বর্তমানে প্রতি শ’ বাঁশে বছরে জেএসএস-ইউপিডিএফ উভয়েই চাঁদা আদায় করে ৪০০ টাকা করে। এভাবে বাইজ্জা বাঁশের জন্য রয়েছে আলাদা রেট। প্রথম শ্রেণীর মাছ ব্যবসায়ীদের জেএসএসকে বছরে চাঁদা দিতে হয় ৪০ হাজার, ইউপিডিএফকে ৫০ হাজার। এভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির ব্যবসায়ীদের পৃথক হারে গুণতে হয় চাঁদা।

তালিকা থেকে আরও জানা যায়, বিভিন্ন ধরনের মাছ ধরার জালের ওপর আলাদা আলাদা হারে বাৎসরিক (নয় মাসে বছর) চাঁদা আদায় করা হয়। কেসকি জাল (১ হাজার বামের ওপর) থেকে জেএসএস আদায় করে ছয় হাজার টাকা, ইউপিডিএফ সাত হাজার। এভাবে ধর্ম জাল, টেংরা জাল, কুত্তা জলা, ভাসা জাল, টেইনা জাল, লুই জাল, নাইট জাল, বড়শির ওপর আলাদা হারে চাঁদা আদায় করে তারা। এছাড়া সব ধরনের জেলেদের বছরে চাঁদা দিতে হয় জেএসএসকে সাতশ, ইউপিডিএফকে পাঁচশ।

চাঁদাবাজী

পার্বত্য চট্রগ্রামে বসবাসরত উপজাতি বাসিন্দাদেরও দিতে হয় বাৎসরিক চাঁদা। প্রতি উচ্চবিত্ত পরিবারের জন্য জেএসএস- ইউপিডিএফ’র ধার্যকৃত চাঁদা আটশ টাকা। মধ্যবিত্ত পরিবার প্রতি জেএসএস আদায় করে পাঁচশ এবং ইউপিডিএফ ছয়শ’। নি¤œবিত্ত পরিবার প্রতি জেএসএস তিনশ, ইউপিডিএফ চারশ টাকা চাঁদা আদায় করে।

এ চাঁদার আওতায় বাদ পড়েনি কলার ছড়াও। প্রতি ছড়ার জন্য বর্তমানে জেএসএস’কে ছয় টাকা ও ইউপিডিএফ’কে দিতে হয় ১০ টাকা। এছাড়া গরু ও ছাগল বিক্রির ওপর যথাক্রমে জেএসএস ১২ ও ৬ শতাংশ এবং ইউপিডিএফ দুইশ ও একশ হারে চাঁদা আদায় করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো চাঁদার এ অর্থ দিয়ে দেশ-বিদেশে বাঙালি বিদ্বেষী প্রচারণা ও তাদের অস্ত্র ভা-ারকে সমৃদ্ধ করার কাজ করে থাকে।

বাৎসরিক এ চাঁদা আদায় ছাড়াও বিভিন্ন দিবসকে সামনে রেখে বেপরোয়া চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে ইউপিডিএফ-জেএসএস সহ আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে। প্রতি বছর ‘বৈসাবী’ উদযাপন কমিটির নামে ব্যক্তি বিশেষে দুই হাজার টাকা থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্তও চাঁদা আদায় হয়।

ইনকিলাব-এ প্রকাশিত খবরের তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে চাঁদাবাজির শীর্ষে রয়েছে শান্তিচুক্তি বিরোধী সংগঠন ইউনাইটেড পিপল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এরপরের অবস্থানে রয়েছে চুক্তির সমর্থক পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ক্যাডাররা। এদের অঙ্গ সংগঠন যেমন- পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইম্যান ফেডারেশন বিভিন্ন অপকৌশলে পাহাড়ে চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে।

চাঁদাবাজি

পাহাড়ের নিরীহ বাঙালিরাই মূলত সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির প্রধান টার্গেট। এর পরের অবস্থানে রয়েছে তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসরত ১৩টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। এর মধ্যে প্রায় সকলকে চাঁদা দিতে বাধ্য হতে হলেও চাকমাদের কাছ থেকে চাঁদা দাবির তেমন ঘটনা শোনা যায় না।

স্থানীয়রা জানান, বাঁশ, বেত, কাঠ, ছন সংগ্রহ, বেচাকেনা ও পরিবহন, কৃষি-খামার, ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসা-বাণিজ্য, সড়ক ও নৌপথে মালামাল পরিবহন থেকে শুরু করে ঠিকাদারি, অবকাঠামো নির্মাণ কাজ সবকিছুর ওপর থেকেই জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এমনকি কলা, আদা, হলুদ, আনারস, লেবু, কমলা, খাদ্যশস্য চাষাবাদ, গবাদিপশু-পাখি বেচাকেনা করতে গিয়েও চাঁদা পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছেন পার্বত্য এলাকার বাসিন্দারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা জানান, এখানে অস্ত্রধারী জেএসএসের এতটাই প্রভাব ক্ষমতাসীন দলের লোক হয়েও তাদের পক্ষে চাঁদাছাড়া বসবাস করা অসম্ভব। নিরুপায় হয়ে দোকান-পাটও গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। তাদের কাছে পুলিশও জিম্মি বলে অভিযোগ তার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পার্বত্য চট্রগ্রামের উত্তর বন বিভাগের বাঘাইহাট রেঞ্জের এক বন কর্মকর্তা জানান, রাঙামাটিতে সাধারণ সরকার ছাড়াও অন্য একটি ‘সরকার’ কাজ করে। যেটাকে তারা কখনই উপেক্ষা করতে পারেন না। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও অবহিত বলে জানান তিনি।

২২ জুন পার্বত্য চট্রগ্রামের সংরক্ষিত মহিলা এমপি ফিরোজা বেগম চিনু বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তি চুক্তি করে পাহাড়ে অনেক উন্নয়ন করেছেন। কিন্তু কিছু সশস্ত্র গ্রুপ চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ করে পাহাড়কে অস্থিতীশীল করার পাঁয়তারা করছে। তিনি এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বলে জানান।

জেএসএস’র মুখপাত্র ও সহপ্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, ‘জেএসএস’র বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উদ্দেশ্য প্রণোদিত। আমরা চাঁদাবাজিতে বিশ্বাসী নই। মানুষের সহযোগিতায় দল পরিচালিত হয়।’

অন্যদিকে, ইউপিডিএফ’র মুখপাত্র, প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান নিরন চাকমা চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করেন। বলেন, ‘এ অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। তিনিও জানান, মানুষের সহযোগিতায় তাদের দল পরিচালিত হয়।

খাগড়াছড়িতে আগ্নেয়াস্ত্র বহনের ৪৫টি সিলিং, সামরিক পোশাকসহ ৩ উপজাতীয় যুবক আটক

kkc

স্টাফ রিপোর্টার:

খাগড়াছড়িতে আগ্নেয়াস্ত্র বহনের ৪৫টি সিল, সামরিক পোশাকসহ ৩ উপজাতীয় যুবক আটক করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে জেলার বিজিতলা চেকপোস্টে নিরাপত্তা তল্লাসীকালে তাদের আটক করা হয়ে।

সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওঁত পেতে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বিজিতলা নিরাপত্তা বাহিনীর চেক পোস্টে তল্লাশী করে সন্দেহভাজন তিন উপজাতীয় যুবকের শরীর তল্লাশীকালে তাদের নিকট থেকে সামরিক আগ্নেয়াস্ত্র বহনকারী ৪৫টি সিলিং, আরাকান আর্মির ব্যবহৃত ১ সেট শীতের পোশাক ও একটি মোটর সাইকেল আটক করা হয়।

সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ বা ভারতে এ ধরনের সিলিং ব্যবহার করা হয় না। এগুলো মূলত আরাকান আর্মি বা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন অস্ত্রে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

খাগড়াছড়ি সদর থানার এসআই আরেফিন পার্বত্যনিউজকে বলেন, আটককৃত যুবকরা হলেন, বিবৃতি চাকমা(৩৪), পিতা উখিল প্রিয় চাকমা, ধনমনি চাকমা(৩৬) পিতা মহারুম চাকমা, কিরণ ত্রিপুরা(২৩), পিতা কৃষ্ণমোহন ত্রিপুরা। আটককৃতদের মধ্যে বিবৃতি চাকমার বাড়ি সদরের চম্পাঘাট এলাকায় এবং বাকি দুইজনের বাড়ি পানছড়ি।

সূত্রমতে, আটক সন্ত্রাসীরা স্থানীয় উপজাতীয় সংগঠনের নিযুক্ত চাঁদা আদায়কারী। এদের মধ্যে বিবৃতি চাকমা পেশায় হোন্ডা চালক হলেও মহালছড়িতে চাঁদা আদায়ের দায়িত্ব, কিরণ ত্রিপুরার চাঁদা আদায় এলাকা পানছড়ি হলেও সম্প্রতি তাকে রাঙামাটির ১৮ মাইল এলাকায় পোস্টিং দেয়া হযেছে।

জিজ্ঞাসাবাদে বিবৃতি চাকমা জানিয়েছে, রাঙামাটির নানিয়ার চরের ১৮ মাইলে জনি চাকমা নামের এক সন্ত্রাসীর কাছে এই সামরিক সরঞ্জামগুলো সরবরাহ করার জন্য রমেশ চাকমা নামে এক ব্যক্তি তাকে এই সরঞ্জামগুলো দিয়েছে। তিনি আরো জানান, আরো একটি কালো পালসার মটর সাইকেলে ৪৫ টি ম্যাগজিন ও বিপুল পরিমাণ গুলি নিয়ে আসছিলো আরেকটি সন্ত্রাসী গ্রুপ। যাদের সাথে কথা ছিলো তাদের মটর সাইকেল বিজিতলা নিরাপত্তা চৌকি বিনা বাধায় পার হতে পারলে তারা সংকেত দিলে সেটিও আসবে। কিন্তু তারা আটক হয়ে যাওয়ায় সংকেত না পেয়ে অপর মটরসাইকেলটি পালিয়ে যায়।

আটককৃতদের সদর থানা পুলিশের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শামসুদ্দীন ভুঁইয়া আটকের সত্যতা পার্বত্যনিউজকে নিশ্চিত করেছেন।

আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে সমস্যা কোথায়?

মেহেদী হাসান পলাশ 

মেহেদী হাসান পলাশ

আজ ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস। অন্যসব বছরের মতো এ বছরেও বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী সাড়ম্বরে দিনটি উৎযাপনের আয়োজন করেছে। এ বছর জাতিসংঘ দিনটির প্রতিপাদ্য ঠিক করেছে, Post : 2015 Agenda: Ensuring indigenous peoples’ health and well-being”. বিশ্ব আদিবাসী দিবসকে সামনে রেখে আবার নতুন করে আলোচিত হচ্ছে বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্কটি।

বাংলাদেশে আদিবাসী কারা- এই বিতর্কটি খুব প্রাচীন নয়, বড়ো জোর দেড় দশকের। ইস্যুটি পুরনো না হলেও তা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাস, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বকে নাড়া দিয়েছে। জাতীয় সংহতির প্রশ্নে তাই এ বিতর্কের আশু সমাধান জরুরি। ইতোপূর্বে দৈনিক ইনকিলাবে একই বিষয়ে বর্তমান লেখকের তিনটি উপ-সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছে। প্রবন্ধগুলো হচ্ছে, বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক, প্রকাশ, ২ আগস্ট ২০১৩; আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ, প্রকাশ ৩০ আগস্ট ২০১৩ এবং বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা, প্রকাশ, ১৫ আগস্ট ২০১৪। পঠনের পরম্পর্য রক্ষায় পাঠকগণ ইচ্ছে করলে উপরের হাইপার লিংক থেকে লেখাগুলো পড়ে নিতে পারবেন। বর্তমান লেখায় বাংলাদেশের সমতলে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সলুক সন্ধান ও তাদের আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে প্রতিবন্ধকতা কোথায় তা নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

আদিবাসী শব্দের ইংলিশ প্রতিশব্দ Indigenous people. . অনেকে আদিবাসী শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে Aborigine ব্যবহার করেন। কিন্তু Aborigine বলতে সার্বজনীনভাবে আদিবাসী বোঝায় না। Aborigine বলতে সুনির্দিষ্টভাবে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের বোঝায়। একইভাবে Red Indian বলতে মার্কিন আদিবাসীদের বোঝায়, অস্ট্রেলীয় Aborigine বা আদিবাসীদের বোঝায় না। প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী আদিবাসী হচ্ছে, ‘কোনো স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই।’ মর্গান বলেন, The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial … they are the true Sons of the soil…’ (Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972).

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে মোট ৪৫টি (কারো কারো মতে ৭৫) ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব রয়েছে। সাধারণভাবে এরা উপজাতি ও তফশিলী সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। তবে বিশেষ উদ্দেশ্যে কিছু মতলবাজগোষ্ঠী এ সম্প্রদায়গুলো আদিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের আদিবাসী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করা শুরু করেছে।  জাতি ও উপজাতি সংজ্ঞা এসব জনগোষ্ঠীর অনেকগুলোর জন্যই প্রযোজ্য নয়। তাই তাদের তফশিলী সম্প্রদায় বলা হয়। ভারতবর্ষেও সহস্রাধিক সম্প্রদায় ‘তফশিলী’ হিসেবেই রাষ্ট্রকাঠামোতে স্বীকৃত রয়েছে। বাংলাদেশের সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে সাঁওতাল, গারো, হাজং, কোচ, মনিপুরী, খাসিয়া, রাখাইন প্রধান। এখানে এসব জনগোষ্ঠীর আদি নিবাস ও বাংলাদেশে আগমন নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে।(পূর্বের ‘বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক’ শিরোনামের লেখায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাসিন্দাদের আদি নিবাস ও বাংলাদেশে আগমন নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। ইচ্ছে করলে পাঠকগণ উপরের হাইপার লিংকে ক্লিক করে সেসব তথ্য দেখে নিতে পারেন।)

ইতিহাসের এই বিশ্লেষণে সকল তথ্যের জন্য মাত্র তিনটি পুস্তককে রেফরেন্স ও তথ্যাগার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর একটি হলো বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রণীত `বাংলাপিডিয়া’, একই প্রতিষ্ঠানের `বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা’ এবং বাংলাদেশ আদিবাসী অধিকার আন্দোলন কর্তৃক প্রণীত `বাংলাদেশের আদিবাসী : এথনোগ্রাফীয় গবেষণা’। এই পুস্তক তিনটি নির্বাচনের প্রধান কারণ বাংলাদেশে আদিবাসী অধিকার ও স্বীকৃতির বিষয়ে অধিক সোচ্চার ব্যক্তিগণ এই বই তিনটির রচনা ও সম্পাদনার সাথে তারা জড়িত।

সাঁওতাল

ভারতবর্ষের প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাঁওতাল অন্যতম হলেও বাংলাদেশের তাদের আগমন মাত্র ব্রিটিশ আমলে। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, ব্রিটিশ সরকার রেল লাইন নির্মাণ কাজের জন্য ভারতের সাঁওতাল পরগণা থেকে সাঁওতালদের বাংলাদেশে নিয়ে আসে। এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রণীত বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালায় বাংলাদেশে সাঁওতালদের আগমন সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘দীর্ঘদিন ধরে সাঁওতালরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে বসবাস করছিলেন। ১৮৩৬ সালে ব্রিটিশ সরকার তাদেরকে নির্বিঘ্নে বসবাসের জন্য একটি স্থায়ী এলাকা নির্ধারণ করে দেয়। এ এলাকা সাঁওতাল পরগণা নামে খ্যাত হয়। সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর তাদের অনেকে সাঁওতাল পরগণায় থাকা নিরাপদ মনে না করে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। ড. পিয়ের বোসাইনেট উল্লেখ করেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) সাঁওতালদের অধিকাংশই সাঁওতাল পরগণা থেকে এখানে আগমন করেছেন।

গারো

নৃতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদদের মতে, গারোরা মঙ্গোলয়েড মহাজাতির টিবেটো-বার্মান দলের টিবেটো-চাইনিজ পরিবারের সদস্য। গারোদের ঐতিহ্যবাহী গানের মধ্যে তাদের এদেশে আগমনের সময়কাল সম্পর্কে বলা হয়েছে \’Do reng noktopgita, kilding jakbogita\’ অর্থাৎ ‘সে সময় চিলগুলো ছিল একটি ছোট্ট কুটিরের মতো, আর মাকড়সার জালের সুতা ছিল এক হাতের মতো বড়।’ গারোদের পূর্ব পুরুষদের ধারণা মতে, তাদের পূর্ব-পুরুষদের আদি বাসস্থান ছিল তিব্বত যা \’Torua\’ নামে পরিচিত ছিল। তিনটি পথ দিয়ে তিন দলে বিভক্ত হয়ে গারোদের পূর্ব-পুরুষরা এ উপমহাদেশে আসে। এর একটি দল দক্ষিণ দিকে সুরমা ও বরাক নদী হয়ে কাছাড় ও সিলেটে প্রবেশ করে। এই দলই পরবর্তীতে ‘বঙ্গে’ অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

হাজং

নৃবিজ্ঞানী মি. জে কে বোসের মতে, হাজং গরোদেরই একটি দল। বিভিন্ন লেখকের মতে, হাজংরা আসামের কামরূপ জেলার হাজো অঞ্চল থেকে ক্রমান্বয়ে এদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছে। প্রবীণ হাজংদের মতে, তাদের আদিনিবাস বিহারের অদূরে অবন্তিনগর (মালব) নামক স্থানে এবং নিজেদেরকে তারা সূর্যবংশীয় ক্ষত্রিয় বলে দাবি করে। হাজংরা সুদূর চীনের হোয়াংহো নদীর অববাহিকা থেকে তিব্বত, তিব্বত থেকে অবন্তিনগর (মালব), অবন্তিনগর থেকে প্রাগজ্যোতিষপুর (গৌহাটি) হাজোনগর এবং হাজোনগর থেকে গাড়ো পাহাড়ের কড়ইবাড়ি, বারহাজারী থেকে বাংলাদেশে বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করে।

কোচ

কোচেরা নিজেদের কুচবিহারের নৃপতি নরনারায়ণ এবং চিলারায়ের বংশধর হিসেবে পরিচয় দেয়। তাদের মতে, তাদের আদিনিবাস ছিল রাসান মৃকপ্রাক টারি (যে পাহাড়ে সূর্য প্রথম উদয় হয়) অথবা উদয়গিরি নামক স্থানে। সে আদিনিবাস ত্যাগ করে তারা প্রথমে কামরূপ অঞ্চলে বসতি গড়ে। কামরূপের পরে তারা হাজো অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। সেখান থেকে নানা পথ ঘুরে মেঘালয়ের পশ্চিম সমভূমি এলাকায় রাজ্য গড়ে তোলে যা কুচবিহার নামে পরিচিতি লাভ করে। এ কুচবিহার থেকেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে কোচেরা নানাদিকে দলে দলে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বর্তমানের বাংলাদেশেও সেরকম কয়েকটি দল প্রবেশ করে, যাদের উত্তর পুরুষরাই বর্তমানে একাধিক গোষ্ঠীর নামকরণপূর্বক এদেশের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করছে।

রাখাইন

নৃতাত্ত্বিক বিচারে এরা মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর লোক। রাখাইনদের আদিনিবাস ছিল আরাকান (বর্তমান মায়ানমারের অন্তর্ভুক্ত)। রাখাইনরা তাদের নিজ দেশকে ‘রক্ষইঙ্গি’ এবং নিজেদের ‘রাখাইন’ নামে পরিচয় দিত। রাখাইনদের অংশবিশেষ পনেরো শতক থেকে কক্সবাজারের রামু ও সংলগ্ন এলাকায় বসতি শুরু করলেও আঠারো শতকে আরকানের রাজনৈতিক দুর্যোগ তাদের অনেককেই স্বদেশ ভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য করে। ফলে তারা ক্রমান্বয়ে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় এবং বরগুনা ও পটুয়াখালীতে এসে বসবাস করতে থাকেন।

মণিপুরী

মণিপুরীরা উৎপত্তির ঊষালগ্নে ভারতের বৃহত্তর আসাম রাজ্যের পাদদেশে অবস্থিত বরাক নদীর অববাহিকায় পাতকায় উপত্যকাই অবস্থিত পার্বত্য রাজ্য, নৈসর্গিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ একদা স্বাধীন মণিপুর রাজ্যের অধিবাসী। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মণিপুরে প্রবেশ করে মণিপুরীদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ইংরেজগণ মণিপুরীদের পরাস্ত করে মণিপুরের রাজা বীরবিক্রম টিকেন্দ্রজিৎ সিংহকে পরাস্ত ও বন্দি করে। পরবর্তীকালে ১৯৪৯ সালে মণিপুরকে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের করদরাজ্য বিবেচনায় ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত করে। প্রাণরক্ষার তাগিদে বহু দিশেহারা মণিপুরী [১৭৫৮, ১৭৬৫, ১৮৯১ খ্রি.] নানা দলে বিভক্ত হয়ে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের সন্ধানে মণিপুর রাজ্য ছেড়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েন। তখন অনেক মণিপুরী লোক বাংলাদেশ ভূখণ্ডে এসে বসতি স্থাপন করে।

খাসিয়া

খাসিয়া বা খাসিমঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত উপজাতি। এদেশীয় খাসিয়ারা প্রায় ৫শ’ বছর পূর্বে আসাম থেকে এখানে এসে বসতি গড়েছে। তারা আসামে এসেছিল সম্ভবত তিব্বত থেকে। তাদের প্রধান আবাসস্থল উত্তরপূর্ব ভারত।

উপর্যুক্ত আলোচনায় দেখা যায়, ঐতিহাসিক বিচারে বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠীই বহিরাগত। এটা আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের নেতাকর্মী ও গবেষকগণ স্বীকার করে নিয়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় যেসব প্রত্নবস্তু, অবস্থান ও প্রমাণ পাওয়া গেছে তা খৃষ্টপূর্ব ১৬০০-৫০০ সালের পুরাতন। সেকারণে উপজাতিদের আদিবাসী আখ্যাদানকারী গবেষকগণ এখন ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) কনভেনশন-১৬৯’র আদিবাসী বিষয়ক সংজ্ঞার অপব্যাখ্যা করে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তফশিলী সম্প্রদায়কে আদিবাসী দাবি করছেন ও দাবি করতে উদ্বুদ্ধ করছেন। তবে এ কথা ভুললে চলবে না বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তফশিলী সম্প্রদায়ের অধিকাংশই এই ‘আদিবাসী’ দাবির সাথে সম্পৃক্ত নয়। দেশি-বিদেশি চিহ্নিত একটি মহলের ইন্ধন ও পৃষ্ঠপোষকতায় আঞ্চলিক ও সম্প্রদায়গত কিছু সংগঠন এবং এনজিওর সাথে জড়িত ব্যক্তিরা এই দাবির সাথে জড়িত। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) আদিবাসী কনসেপ্ট সমর্থন করে না। তারা সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে পছন্দ করে।

সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অনেক বিদগ্ধজনের মুখে শোনা যায়, উপজাতি বললে তারা যদি অপমানিত বোধ করে, হেয় বোধ করে এবং আদিবাসী বললে যদি খুশী হয় তাহলে তা বলতে দোষ কোথায়? ইতিহাসে যাই-ই থাক, শতকরা ৯৮ ভাগ একক বাঙালি জনগোষ্ঠীর দেশে আমরা আমাদের দেশের মুষ্টিমেয় উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি এইটুকু উদারতা কি দেখাতে পারি না? এই প্রশ্ন যেকোনো সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষের হৃদয় বিগলিত করতে বাধ্য।

প্রশ্নটি অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে। কিন্তু গোল বাঁধিয়েছে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র। ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক একটি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এ ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করলে ১৪৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪টি দেশ বিপক্ষে, ১১টি দেশ ভোট দানে বিরত এবং ৩৪টি দেশ অনুপস্থিত থাকে। ভোট দানে বিরত থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া দেশগুলো হচ্ছে- অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘোষণাপত্রে সর্বমোট ৪৬টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এসব অনুচ্ছেদের বেশ কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, অস্তিত্ব, কর্তৃত্ব, সংবিধান ও আত্মপরিচয়ের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

একথা নিশ্চিত করে বলা যায়, যেসব ব্যক্তিবর্গ খুব সরলভাবে বা অসেচতন-উদারতায় উপজাতিদের আদিবাসী বলতে ইচ্ছুক/আগ্রহী তাদের অনেকেই হয়তো এই ঘোষণাপত্র পড়ে দেখেননি অথবা তার মর্মার্থ অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন (অবশ্য তারা  মতলববাজদের কথা আলাদা)। নিম্নে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্রের কিছু অনুচ্ছেদ নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

অনুচ্ছেদ-৩ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার বলে তারা অবাধে তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করে এবং অবাধে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মপ্রয়াস অব্যাহত রাখে।

অনুচ্ছেদ-৪ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার উপভোগের বেলায়, তাদের অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ে তথা স্বশাসিত কার্যাবলীর অর্থায়নের পন্থা ও উৎস নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের স্বায়ত্তশাসন বা স্বশাসিত সরকারের অধিকার রয়েছে।

অনুচ্ছেদ-৫ : আদিবাসী জনগণ যদি পছন্দ করে তাহলে রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের পূর্ণ অধিকার রেখে তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক, আইনগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অক্ষুণ্ন রাখা ও শক্তিশালীকরণের অধিকার লাভ করবে।অনুচ্ছেদ-৬ : আদিবাসী ব্যক্তির জাতীয়তা লাভের অধিকার রয়েছে।

অনুচ্ছেদ-১৯ : রাষ্ট্র  আদিবাসীদের প্রভাবিত করতে পারে এমন আইন প্রণয়ন কিংবা প্রশাসনিক সংক্রান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পূর্বে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি নেয়ার জন্য তাদের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে আন্তরিকত্ব সদিচ্ছার সাথে আলোচনা ও সহযোগিতা করবে।

উপরের অনুচ্ছেদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে বাংলাদেশের ভেতর কমপক্ষে ৪৫টি স্বায়ত্তশাসিত বা স্বশাসিত অঞ্চল ও সরকার ব্যবস্থার সৃষ্টি হবে। এসব অঞ্চলে সরকার পরিচালনায় তারা নিজস্ব রাজনৈতিক কাঠামো, জাতীয়তা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আইনপ্রণয়ন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পাবে। এবং এসব অঞ্চলের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের অধিকার ও কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন হবে। লক্ষণীয়, প্রকাশ্যে বলা না হলেও এই আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বতন্ত্র জাতীয়তার মধ্যে লুকানো রয়েছে স্বাধীনতার বীজ।

এই ঘোষণাপত্রে আদিবাসীদের ভূমির উপর যে অধিকারের কথা বলা হয়েছে তা আরো ভয়ানক। যেমন :

অনুচ্ছেদ-১০ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের ভূমি কিংবা ভূখণ্ড থেকে জবরদস্তিমূলকভাবে উৎখাত করা যাবে না। আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের স্বাধীন ও পূর্ববহিত সম্মতি ছাড়া কোনভাবে অন্য এলাকায় স্থানান্তর করা যাবে না এবং ন্যায্য ও যথাযথ ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে সমঝোতা সাপেক্ষে স্থানান্তর করা হলেও, যদি কোন সুযোগ থাকে, পুনরায় তাদেরকে সাবেক এলাকায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

অনুচ্ছেদ-২৬ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তাদের ঐতিহ্যগতভাবে মালিকানাধীন, দখলীয় কিংবা অন্যথায় ব্যবহার্য কিংবা অধিগ্রহণকৃত জমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের অধিকার রয়েছে।

২৬: ৩. রাষ্ট্র এসব জমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের আইনগত স্বীকৃতি ও রক্ষার বিধান প্রদান করবে। সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রথা, ঐতিহ্য এবং ভূমি মালিকানা ব্যবস্থাপনা মেনে সেই স্বীকৃতি প্রদান করবে।

অনুচ্ছেদ-২৭ :  রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে যৌথভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আইন, ঐতিহ্য, প্রথা ও ভূমি মালিকানাধীন ব্যবস্থাপনার যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করবে।

অনুচ্ছেদ-২৮ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদ যা তাদের ঐতিহ্যগতভাবে মালিকানাধীন কিংবা অন্যথায় দখলকৃত বা ব্যবহারকৃত এবং তাদের স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি ছাড়া বেদখল, ছিনতাই, দখল বা ক্ষতিসাধন করা হয়েছে এসব যাতে ফিরে পায় কিংবা তা সম্ভব না হলে, একটা ন্যায্য, যথাযথ ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পায় তার প্রতিকার পাওয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রয়েছে।

২৮: ২. সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় অন্য কোন কিছু রাজি না হলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে গুণগত, পরিমাণগত ও আইনি মর্যাদার দিক দিয়ে সমান ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদ অথবা সমান আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে বা অন্য কোন যথাযথ প্রতিকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

অনুচ্ছেদ-৩০ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বেচ্ছায় সম্মতি জ্ঞাপন বা অনুরোধ ছাড়া ভূমি কিংবা ভূখ-ে সামরিক কার্যক্রম হাতে নেয়া যাবে না।

অনুচ্ছেদ-৩২ : ২. রাষ্ট্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের উপর প্রভাব বিস্তার করে এমন কোন প্রকল্প অনুমোদনের পূর্বে, বিশেষ করে তাদের খনিজ, জল কিংবা অন্য কোন সম্পদের উন্নয়ন, ব্যবহার বা আহরণের পূর্বে স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি গ্রহণের জন্য তাদের নিজস্ব প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে আলোচনা ও সহযোগিতা করবে।

উপরোক্ত অনুচ্ছেদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী আদিবাসী স্বীকৃতি পেলে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নিজস্ব আইনে নিজস্ব ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মুষ্টিমেয় চিহ্নিত উপজাতিরা দাবি করছে ঐতিহ্য ও প্রথাগত অধিকার বলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল ভূমির মালিক তারা। একই অধিকার বলে সমতলের উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকার সকল ভূমির মালিকানা সেখানকার উপজাতীয়রা দাবি করবে। সেখানে যেসব ভূমি সরকারি ও ব্যক্তিগত মালিকানা (আদিবাসী নয়) রয়েছে তা ফেরত দিতে হবে বা তার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এমনকি উপজাতীয়রা রাজি না হলে সমতল থেকে সমপরিমাণ সমগুরুত্বের ভূমি ফেরত দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে যেহেতু ঐ গোষ্ঠী সকল সামরিক স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার দাবি জানাচ্ছে, সেকারণে সেখান থেকে সকল সামরিক স্থাপনা সরিয়ে নিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অন্যান্য উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় যেসব বাঙালি বসতি স্থাপন করেছে তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। ইউএনডিপিসহ কিছু বৈদেশিক সংস্থা ইতোমেধ্যে প্রকাশ্যে এ দাবি তুলেছে।

ঘোষণাপত্রের ৩৬ অনুচ্ছেদটি আরো ভয়ানক।

অনুচ্ছেদ-৩৬ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর, বিশেষত্ব যারা আন্তর্জাতিক সীমানা দ্বারা বিভক্ত হয়েছে তারা অন্য প্রান্তের নিজস্ব জনগোষ্ঠী তথা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংক্রান্ত কার্যক্রমসহ যোগাযোগ, সম্পর্ক ও সহযোগিতা বজায় রাখার ও উন্নয়নের অধিকার রয়েছে।

আমরা জানি বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল উপজাতি জনগোষ্ঠীর মূল আবাস ভারত ও মিয়ানমার। সেখানে এখনো তাদের মূল জনগোষ্ঠী রয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশে তাদের খণ্ডিত অংশ যদি আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পায় তাহলে ভারতের সমগ্র সেভেন স্টিস্টার্স রাজ্য, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা এবং মিয়ানমারের বিপুল এলাকা আদিবাসী ল্যান্ড স্বীকৃতি পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে। একই সাথে সীমান্তের উভয়পাড়ের অভিন্ন জনগোষ্ঠী যদি অভিন্ন রাজনৈতিক, সরকার কাঠামো কিংবা স্বাধীনতার দাবি তোলে তা আঞ্চলিক সমস্যায় রূপ নেবে। এ বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার প্রতিবেশী ভারত সরকারের দৃষ্টিগোচর করতে পারে।  আদিবাসী জনগোষ্ঠী উল্লিখিত অধিকারসমূহ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ বিশেষভাবে ভূমিকা রাখতে পারবে যা ৪২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। পূর্ব তিমুর, দক্ষিণ সুদান স্বাধীন করণে জাতিসংঘের ভূমিকা বিশ্বের দেশপ্রেমিক জনগণকে আতঙ্কিত করেছে। অধুনা পশ্চিম পাপুয়া নিউগিনিতেও জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

যদিও ৪৬ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন আদিবাসীর দাবি এমন একটা জনগোষ্ঠী থেকে উচ্চারিত হচ্ছে যারা ৪২ বছর ধরে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। কৌশলগত কারণে তারা স্বায়ত্তশাসনের কথা যতোটা উচ্চকিত করে স্বাধীনতার কথা ততোটা নয়। ফলে দেশের অধিকাংশ মানুষই রাষ্ট্রবিরোধী এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থাও রহস্যময় আবরণে সযত্নে ঢেকে রেখেছে দেশবিরোধী এই দুষ্টুক্ষত। কিন্তু যারা সচেতন, বিশেষ করে যারা সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহার করেন তাদের প্রতি আহ্বান একবারের জন্য হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীদের পরিচালিত প্রোফাইল, গ্রুপ ও পেইজগুলো ভিজিট করে দেখুন কী ভয়ানক রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে সেখানে। স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ড গঠনের জন্য নিজস্ব জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, মানচিত্র দিয়ে কিভাবে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে তা সচেতনতার জন্য দেশবাসীর জানা উচিত।

পাঠকের জ্ঞাতার্থে সিএইচটি জুম্মল্যান্ড নামে তাদের পরিচালিত একটি পেইজের ঠিকানা এখানে দেয়া হলো :(https://www.facebook.com/pages/CHT-jummaland/327524104096965?fref=ts)। শুধু ফেসবুক বা সামাজিক গণমাধ্যম নয়, পাহাড়ী বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীরা নিউজ পোর্টাল খুলেও পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড গঠনের প্রচার চালাচ্ছে। তাদের পরিচালিত অসংখ্য সাইটের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, chtnews.com. এই সাইটে করুণালঙ্কার ভান্তে নামে জেএসএসের এক শীর্ষ নেতার ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার প্রচার হচ্ছে বেশ কয়েকদিন ধরে। বৌদ্ধ ভিক্ষুর বেশধারী এই ব্যক্তি নিজেকে স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিচয় দিয়ে বিশ্বব্যাপী স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠায় তার কর্মতৎপরতার কথা বিস্তারিতভাবে বলেছেন। অডিও-ভিডিও’র এই স্বাক্ষাৎকারে ভান্তে আরো জানিয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন করার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র তাদের হাতে রয়েছে। এখন তিনি শুধু ৫ লক্ষ গোলাবারুদ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এই পরিমাণ গোলাবারুদ সংগ্রহ করতে পারলে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা করে স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই ভিক্ষু সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা অর্জনের উদাহরণ তুলে ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী তরুণ প্রজন্মকে তার সাথে একাত্ম হতে অহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আন্তর্জাতিক শক্তিকে তিনি পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পাবেন বলেও জানিয়েছেন। কাজেই বাংলাদেশের উপজাতিদের আদিবাসী স্বীকৃতি কোনো ছেলের হাতের মোয়া নয়। এর সাথে জড়িত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, অস্তিত্ব, কর্তৃত্ব, ইতিহাস ও মর্যাদার প্রশ্ন।

Email:palash74@gmail.com

৯ আগস্ট ২০১৫ তারিখে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত।

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর লোকেরা আদিবাসী নয়

chakma

আশিক জামান 

প্রতিবছর ৯ আগস্ট বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ পালন করা হয়। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে দেশে দেশে নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়ে থাকে। আদিবাসীদের অধিকার এবং তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে দাবি দাওয়া উত্থাপিত হয়। উত্থাপিত দাবির যৌক্তিকতা নিরূপণে ‘আদিবাসী’ কারা সে বিষয়ে সম্যক ধারণা আবশ্যক। নৃতাত্ত্বিক সংজ্ঞায় আদিবাসী বা ‘এবোরিজিন্যালস হচ্ছে কোনো অঞ্চলের আদি ও অকৃত্রিম ভূমিপুত্র বা Son of the soil. প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী, আদিবাসী হচ্ছে, কোন স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী, যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই। মর্গান বলেন, The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial … they are the true Sons of the soil…(Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972).

আদিবাসী বিষয়ে আভিধানিক সংজ্ঞার বাইরে জাতিসংঘের তরফ থেকে একটি সংজ্ঞা আমরা পেয়ে থাকি। এ বিষয়ে জাতিসংঘ ও এর অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে এ পর্যন্ত প্রধানত তিনটি চার্টারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এগুলো হলো : ১৯৫৭ সালের ০৫ জুন অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ৪০তম অধিবেশনে প্রদত্ত-Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107); আইএলও’র ১৯৮৯ সালের ৭ জুন অনুষ্ঠিত ৭৬তম অধিবেশনে প্রদত্ত Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169) এবং ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples. এখানে আইএলও’র প্রথম চার্টার দুটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। চার্টার দুটির শিরোনাম হচ্ছে Indigenous and Tribal Populations Convention.  অর্থাৎ আদিবাসী ও উপজাতি জনগোষ্ঠী বিষয়ক কনভেনশন। অর্থাৎ এই কনভেনশনটি আদিবাসী ও উপজাতি সংশ্লিষ্ট । কনভেনশনে পাস হওয়া ধারাগুলো একই সাথে আদিবাসী ও উপজাতি নির্ধারণ ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। Indigenous and Tribal Peoples Convention 1989-এ আদিবাসীর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে: আদিবাসী তারা যারা একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস করছে বা অধিকৃত হওয়া ও উপনিবেশ সৃষ্টির পূর্ব থেকে বসবাস করছে এবং যারা তাদের কিছু বা সকল নিজস্ব সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত অধিকার এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ ধরে রাখে। এবার আসা যাক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে।

উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণ করে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়, বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরাই বাংলাদেশে আদিবাসী। কারণ তারাই আদি জনধারার অংশ। বাংলাদেশের তারাই একমাত্র আদিবাসী এবং Son of the soil বলে দাবি করতে পারে। এর পেছনে অনেক জাতিতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও প্রমাণ রয়েছে। বাঙালি নামের বাংলাদেশের এই আদিবাসীরা যদিও একটি মিশ্র জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত যেখানে বহু জানা-অজানা আদি জনধারার সংমিশ্রণ সাধিত হয়েছে। তবুও যেহেতু এসব জনগোষ্ঠীর এদেশ সুস্পষ্ট অস্তিত্বের ইতিহাস সম্পূর্ণভাবে অজানা এবং স্মরণাতীতকাল থেকে এদের পূর্বপুরুষরা এই সমভূমিতে এসে বসতি স্থাপন করেছে সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই একমাত্র তারাই অর্থাৎ বাঙালিরাই Son of the soil বা আদিবাসী। বিশ্বের তাবৎ শীর্ষস্থানীয় নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষক এ ব্যাপারে একমত।

বাংলাদেশে অবস্থিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো কেন আদিবাসী নয়, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর আগমনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। ৫৯০ খ্রিস্টাব্দে পার্বত্য ত্রিপুরা রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা জুয়া রুপা (বীর রাজা) আরাকান রাজাকে পরাজিত করে রাঙ্গামাটিতে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। ৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে আরাকান রাজা সুলা সান্দ্র (Tsula Tsandra, 951-957 A.D) চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আবার দখল করে নেন। ১২৪০ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা রাজা পুনরায় এটিকে উদ্ধার করেন। সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ (১৩৩৮-১৩৪৯) চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু অংশ অধিকার করেন। বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শনের কারনে ১৪১৮ সালে চাকমা রাজা মেয়ান শ্লী (Mowan Tsni) বর্মা হতে বিতাড়িত হয়ে আলীকদমে একজন মুসলিম রাজকর্মচারীর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি (রাজকর্মচারী) রামু এবং টেকনাফে চাকমাদের বসতি স্থাপনের অনুমতি দেন। পার্বত্য এলাকায় সর্বপ্রথম বসতি স্থাপন করে কুকী গোত্রের (লসাই, পাংখু, মোরো, খুমি) উপজাতীয়রা। তাদের আগমন ঘটে উত্তর-পূর্ব দিক (সিনলুই ও চীন) হতে। এরপর ভারতের ত্রিপুরা এবং পার্শ্ববর্তী প্রদেশ হতে ত্রিপুরা গোত্রীয় বিভিন্ন উপজাতীয় (ত্রিপুরা, মরং, তংচংগা ও রিয়াং) আসে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকানী গোত্র (চাকমা ও মগ) এ এলাকায় আগমন করে। কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকান-বার্মা যুদ্ধের সময় মগরা তাদের এ এলাকা ছেড়ে উত্তর দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে চলে যেতে বাধ্য করে। উত্তর দিকে আরকানী গোত্রদের আগমনের ফলে কুকীরা উত্তর-পূর্ব দিকে সরে যেতে বাধ্য হয়। সংক্ষিপ্ত ইতিহাস হতে সহজেই বুঝা যায়, বাংলাদেশে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এদেশের আদিবাসী নয়।

একইভাবে ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, সমতলের উপজাতীয় সম্প্রদায় যেমন সাঁওতাল, গারো, হাজং, মনিপুরী প্রভৃতির বাংলাদেশে আগমনের ইতিহাস তিন-চারশ’ বছরের বেশি নয়। উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, সাঁওতাল সম্প্রদায় রেল সম্প্রসারণের কাজে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ভারতের উড়িষ্যা ও বিহার অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে আসে। কাজেই উপযুক্ত আলোচনায় প্রমাণিত হয় আভিধানিকভাবে বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী কোনোভাবেই এখানকার স্বদেশজাত বা ভূমিপুত্র বা আদিবাসী নয়। প্রখ্যাত উপজাতি গবেষক ও নৃতত্ত্ববিদ RHS Hutchison (1960), TH Lewin (1869), অমেরেন্দ্র লাল খিসা, Jaffa (1989) Ges  Ahmed (1959) প্রমুখের লেখা, গবেষণাপত্র, থিসিস এবং রিপোর্ট বিশ্লেষণে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়, উপ-জাতীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী গুলো আদিবাসী নয়। তারা সবাই একবাক্যে বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজাতীয়রা নিকট অতীতের কয়েক দশক থেকে নিয়ে মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে এদেশে স্থানান্তরিত হয়ে অভিবাসিত হয়েছে।

খোদ চাকমা পন্ডিত অমরেন্দ্র লাল খিসা অরিজিনস অব চাকমা পিপলস অব হিলট্রাক্ট চিটাগাং-এ লিখেছেন, তারা এসেছেন মংখেমারের আখড়া থেকে পরবর্তীতে আরাকান এলাকায় এবং মগ কর্তৃক তাড়িত হয়ে বান্দরবানে অনুপ্রবেশ করেন। আজ থেকে আড়াইশ-তিনশ’ বছর পূর্বে তারা ছড়িয়ে পড়েন উত্তর দিকে রাঙ্গামাটি এলাকায়। এর প্রমাণ ১৯৬৬ বাংলাদেশ জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি প্রকাশিত দি অরিয়েন্টাল জিওগ্রাফার জার্নাল। পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান লোকসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বাঙালি এবং বাকি অর্ধেক বিভিন্ন মঙ্গোলীয় গোষ্ঠীভুক্ত উপজাতীয় শ্রেণীভুক্ত। এ কথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য, আদিকাল থেকে এ অঞ্চলে উপজাতি জনগোষ্ঠীর বাইরের ভূমিপুত্র বাঙালিরা বসবাস করে আসছে তবে জনবসতি কম হওয়ায় বিভিন্ন ঘটনা বা পরিস্থিতির কারণে আশপাসের দেশ থেকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন এসে বসতি স্থাপন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকি জাতিবহির্ভূত অন্য সব উপজাতীয় গোষ্ঠীই এখানে তুলনামূলকভাবে নতুন বসতি স্থাপনকারী। এখানকার আদিম জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ম্রো, খ্যাং, পাংখো, কুকিরা মূল কুকি উপজাতির ধারাভুক্ত। ধারণা করা হয়, এরা প্রায় ২শ’ থেকে ৫শ’ বছর আগে এখানে স্থানান্তরিত হয়ে আগমন করে। চাকমা রাজা দেড়শ’ থেকে ৩শ’ বছর পূর্বে মোগল শাসনামলের শেষ দিকে ব্রিটিশ শাসনামলের প্রথম দিকে মায়ানমার আরকান অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে (Lewin 1869)।

প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এবং ব্রিটিশ প্রশাসক টি.এইচ. লেইউইনের মতে \”A greater portion of the hill at present living in the Chittagong Hill Tracts undoubtedly come about two generations ago for Aracan. This is asserted both by their own traditions and by records in Chittagong Collectorate.\” (Lewin, 1869, P-28)। পার্বত্য অঞ্চলের মারমা বা মগ জনগোষ্ঠী ১৭৮৪ সালে এ অঞ্চলে দলে দলে অনুপ্রবেশ করে এবং আধিপত্য বিস্তার করে। (Shelley, 1992 and Lewin, 1869)। এরা ধর্মে বৌদ্ধ মতাবলম্বী। এরা তিনটি ধারায় বিভক্ত। যেমন : জুমিয়া, রোয়াং ও রাজবংশী মারমা। বোমরা মায়ানমার-চীন পর্বত থেকে নিয়ে তাশন পর্যন্ত বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম আগমন করে। শুধু ভাষাতাত্ত্বিক বিবেচনায়ই নয়, বরং অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের নিরিখেও দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে ঐসব মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মিলের চেয়ে অমিল এবং বিস্তর অনৈক্য বর্তমান।এদের এক একটি জনগোষ্ঠীর বিবাহ রীতি, আত্মীয়তা সম্পর্ক (Keenship Relations), সম্পত্তির মালিকানা বণ্টন রীতি এবং উত্তরাধিকার প্রথা, জন্ম ও মৃত্যুর সামাজিক ও ধর্মীয় কৃত্যাদি বা অন্যান্য সামাজিক প্রথা এবং রীতি এক এক ধরনের এবং প্রায় প্রত্যেকটি আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত (Denise and Bernot, 1957)।

পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এসব জনগোষ্ঠীগুলো প্রায় সবাই যুদ্ধবিগ্রহ এবং হিং¯্র দাঙ্গা-হাঙ্গামার ফলে তাদের পুরাতন বসতিস্থান থেকে এখানে পালিয়ে এসেছে। নতুবা, এক জনগোষ্ঠী অন্য জনগোষ্ঠীর পশ্চাৎধাবন করে আক্রমণকারী হিসেবে এদেশে প্রবেশ করেছে (Huchinson 1909, Bernot 1960 and Risley 1991) | বর্তমানে এদের পরস্পরের মধ্যে প্রচুর রেষারেষি এবং দ্বন্দ্ব বিদ্যমান রয়েছে বলে জানা যায় (Belal, 1992) । পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের জনসংখ্যার বণ্টনচিত্রও সমান নয়। এরা গোষ্ঠী ও জাতিতে বিভক্ত হয়ে সারা পার্বত্য অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করে। তবে কোনো কোনো স্থানে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে মিশ্র জনসংখ্যা দৃষ্টিগোচর হয়। চাকমারা প্রধানত পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলের চাকমা সার্কেলে কর্ণফুলী অববাহিকা এবং রাঙ্গামাটি অঞ্চলে বাস করে।

মগরা (মারমা) পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণাংশের বোমাং এবং মং সার্কেলে বাস করে। ত্রিপুরা (টিপরা)গণ পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি সার্কেলে অর্থাৎ চাকমা সার্কেল, বোমাং সার্কেল এবং মং সার্কেল সকল স্থানেই ছড়িয়ে থাকলেও নিজেরা দলবেঁধে থাকে। ¤্রাে, থ্যাং, খুমী এবং মরং বোমাং সার্কেলের বাসিন্দা। বাংলাভাষী বাঙালি অভিবাসীরা সারা পার্বত্য চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়লেও এদের বেশিরভাগই দলবদ্ধভাবে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রামগড় প্রভৃতি শহরাঞ্চলে বসবাস করে। বাকি বাঙালি জনসংখ্যা এখানকার উর্বর উপত্যকাগুলো সমভূমিতে গুচ্ছগ্রামে বসবাস করে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের বাদ দিলে এখন আসে এদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট-মৌলভীবাজারের খাসিয়া, মনিপুরী, পাত্র (পাত্তর) গোষ্ঠীর কথা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল অঞ্চলের গারোদের কথা এবং দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুরের কুচ রাজবংশী সাঁওতাল, ওরাও ও মুন্ডাদের কথা। এদের সবাই সংখ্যার দিক বিচারে খুব নগণ্য ও বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, সিলেট অঞ্চলের খাসিয়া, মনিপুরী ও পাত্ররা তৎকালীন বৃহত্তর আসামের খাসিয়া-জয়ন্তী পাহাড়, মনিপুর, কাঁচাড় ও অন্যান্য সংলগ্ন দুর্গম বনাচ্ছাদিত আরণ্যক জনপদ থেকে যুদ্ধ, আগ্রাসন, মহামারী এবং জীবিকার অন্বেষণে সুরমা অববাহিকায় প্রবেশ করে ও সিলেটের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে বসতি স্থাপন করে।

নৃ-বিজ্ঞান ও ভৌগোলিক জ্ঞানের সকল বিশ্লেষণেই এরা উপজাতীয় এবং ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠী বৈ আর কিছুই নয়। এরা কোনো বিবেচনায়ই সিলেটের আদিবাসী হতে পারে না। এরা আদি আরণ্যক পার্বত্য নিবাসের (আসাম, মণিপুর, মেঘালয় ইত্যাদি) আদিবাসী হলেও যখন স্থানান্তরিত হয়ে নতুন ভূখণ্ডে আসে জাতি সেখানে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ক্ষুদ্র উপজাতীয় গোষ্ঠী কিংবা ভিন্ন সংস্কৃতির ক্ষুদ্র জাতিসত্তা হিসেবে সমান্তরালভাবে থাকতে পারে। কিন্তু কখনো তারা নতুন জায়গায় আদিবাসী হতে পারে না। ঠিক একইভাবে ময়মনসিংহ (হালুয়াঘাট অঞ্চল) এবং টাঙ্গাইল অঞ্চলের (মধুপুর) গারো সিংট্যানেরা ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের পরে এদের অনেকে তাদের আদিনিবাস ভারতের উত্তরের গারো পাহাড়ে ফিরে গেলেও বেশ কিছুসংখ্যক গারো ও সিংট্যানা বাংলাদেশের ঐসব অঞ্চলে রয়ে গেছে। গারোদের আদি নিবাস ভারতের গারোল্যান্ড। কোনোক্রমেই ময়মনসিংহ কিংবা টাঙ্গাইলের তারা আদিবাসী নয়।

আরো বলা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে আজ থেকে ৬০-৭০ কিংবা একশ’-সোয়াশ’ বছর আগে সিলেটের শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং উত্তর সিলেটের কোন নিচু পাহাড়ি অঞ্চলে চা বাগান স্থাপনের জন্য ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা বর্তমান ভারতের বিহার, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন জঙ্গলাকীর্ণ মালভূমি অঞ্চল যেমন: ছোট নাগপুরের বীরভুম, সীঙভুম, মানভূম, বাকুড়া, দুমকা, বর্ধমান প্রভৃতি অঞ্চল যা তৎকালীন সাঁওতাল পরগণাখ্যাত ছিল সেসব অঞ্চলে গরিব অরণ্যচারী আদিবাসী সাঁওতাল, মুন্ডা, কুল, বীর, অঁরাও, বাউরী ইত্যাদি নানা নামের কৃষ্ণকায় আদিক জনগোষ্ঠীর মানুষকে শ্রমিক হিসেবে স্থানান্তরিত করে অভিবাসী হিসেবে নিয়ে আসে। একইভাবে যুদ্ধ, মহামারী থেকে আত্মরক্ষার জন্য এবং জীবিকার সন্ধানে রাজমহলের গিরিপথ ডিঙ্গিয়ে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের বরেন্দ্রভূমি অঞ্চলে (রাজশাহী, দিনাজপুর ও রংপুর) বসবাস শুরু করে। উত্তরাঞ্চলের কুচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলা থেকে দক্ষিণের রংপুর-দিনাজপুরের নদী অববাহিকাম-িত সমভূমিতে নেমে বসবাস শুরু করে কুচ-রাজবংশী জনগোষ্ঠী। এর সকলেই তাদের মূল নিবাসের আদিবাসী হিসেবে বিবেচ্য হলেও কোনো যুক্তিতে তাদের নতুন আবাসস্থল বাংলাদেশের ঐসব অঞ্চলের আদিবাসী বা ভূমিপুত্র হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে না।

উল্লেখ্য, রংপুর, দিনাজপুর ও রাজশাহী অঞ্চলের নি¤œবর্ণের হিন্দুদের সাথে ও স্থানীয় অন্যান্য বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাথে কুচ রাজবংশীদের অনেকে সমসংস্কৃতিকরণ প্রক্রিয়ার (Acculturation Process) মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একীভূত (Assimilated) হয়ে গেছে। মানবিক বিবেচনার মহানুভবতায় এদেশে বসবাসকারী মানবগোষ্ঠীর সমান মর্যাদা, অধিকার ও স্বীয় জাতি, ভাষা, ধর্ম অথবা সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের পূর্ণ অধিকার এবং সম্মান নিয়ে সবাই স্বকীয়তায় সমান্তরাল চলতে পারে বা মিশে যেতে পারে। কিন্তু কোনো বিবেচনায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ বাংলাদেশের আদিবাসী নয়।বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠীরা আদিবাসী হিসেবে কোথাও স্বীকৃত নয়। সরকার তাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকার করে না। এরা আদিবাসী হলে অবশ্যই জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে আমরা মানতাম। বাংলাদেশে বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরাই আদি জনধারার অংশ। তাছাড়া আর কেউ আদিবাসী নয়।

কাজেই জাতিসংঘ ও আইএলওর সংজ্ঞার অপব্যাখ্যা করে বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীদের আদিবাসী বানানোর কোনো সুযোগ নেই। বরং ওইসব কনভেনশন ও চার্টার অনুযায়ী ট্রাইবাল বা উপজাতির যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা বিচার করেই নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো উপজাতি। একই কারণে আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘ চার্টার বাংলাদেশের উপজাতিদের জন্য প্রযোজ্য নয়। বিশ্ব আদিবাসী দিবসে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রকৃত আদিবাসীদের স্বার্থ সংরক্ষিত হোক এবং তাদের অধিকার বাস্তবায়িত হোক, এই আমাদের কামনা।

চাকমা: আদিবাসী নয় বহিরাগত

আবদুস সাত্তার

আবদুস সাত্তার

পার্বত্য চট্রগ্রামে উপজাতিদের মধ্যে চাকমা, মগ, মুরং, কুকি, বনজোগী, পাঙ্খো, লুসাই, তংচঙ্গা, টিপরা (ত্রিপুরা) এবং সেন্দুজ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। টিপরারা হিন্দুধর্মাবলম্বী, মগ ও চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং অপরাপর জাতির মধ্যে কেউ কেউ  নিজেদেরকে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী বলে স্বীকার করলেও ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক জীবনের রীতিনীতিতে তাদের বৈসাদৃশ্য লক্ষণীয়। পার্বত্য চট্রগ্রাম পূর্বে চট্রগ্রামের সাথে যুক্ত ছিল। পাহাড়ি জাতিদের আলাদা বৈশিষ্ট্যের দাবিতে ১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দের ১ আগস্ট পার্বত্য চট্রগ্রাম স্বতন্ত্র জেলার মর্যাদা লাভ করে।[i]

চাকমারা কোথা থেকে এখানে এসেছে এবং এদের উৎপত্তিই-বা কোথায়, এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে। উপজাতিদের উদ্ভব ও বসতি বিস্তার সম্পর্কে সবকিছু জানা সম্ভব না হলেও এ সম্পর্কে আমাদের মন সব সময়েই কৌতূহলী ও উৎসুক। চাকমা জাতি যে এককালে ব্রক্ষ্মদেশে ছিল, সে সম্বন্ধে কর্নেল ফেইরী আলোকপাত করেছেন।[ii] ব্রক্ষ্মদেশে পুরাবৃত্ত ‘চুইজং ক্য থং’ এবং আরাকান কাহিনী ‘দেঙ্গাওয়াদি আরেদফুং’ নামক গ্রন্থদ্বয়েও অনুরূপ উল্লেখ রয়েছে।

‘দেঙ্গাওয়াদি আরেদফুং’ গ্রন্থেও বর্ণনা অনুযায়ী ৪৮০ মগাব্দে (খ্রীষ্টীয় ১১১৮-১৯ সালে) চাকমাদের সর্বপ্রথম উল্লেখ পরিদৃষ্ট হয়। ‘‘ এ সময়ে পেগো (আধুনিক পেগু) দেশে আলং চিছু নামে জনৈক রাজা ছিলেন। পশ্চিমের বাঙালিদিগের সহিত মিলিত হয়ে চাকমাগণ তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ উপস্থিত করে। পেগো রাজা স্বীয় প্রধানমন্ত্রী কোরেংগরীকে সেনাপতি পদে বরণ করিয়া যুদ্ধার্থে প্রেরণ করিলেন। তিনি যুদ্ধ স্থলে উপনীত হইলে একটি সারসপক্ষী একখানি মৃত প্রাণীর চর্ম মুখে লইয়া তাঁহার সম্মুখে পতিত হইল। তিন তাহাকে ধরিয়া রাজার শিবিরে লইয়া গেলেন এবং বুঝিয়া দিলেন যে, এই সারস বাঙালি ও চর্মখানি-চাকমা, উভয়ের মিত্রতা ঘটিয়েছে। কিন্তু আমাদের এই যুদ্ধে নিশ্চয়ই বাঙালি ও চাকমাগণ এই সারসের ন্যায় বশ্যতা স্বীকার করিবে।

‘‘রাজা মন্ত্রীর এহেন যুক্তিগর্ভ আশ্বাস বাক্যে অতিশয় আহলাদিত হইয়া তাহাকে একটি হস্তী উপহার প্রদান করেন। অনন্তর হঠাৎ চতুর্দিকে নানা অশুভ লক্ষণ দেখা দিল, পবিত্র ‘মহামুনি’ মূর্তি স্বেদসিক্ত হইলেন। ঘন ঘন অশনি নিপাত, অকাল বৃষ্টি সমন্তাৎ হাহাকার পড়িয়া গেল। রাজা যুদ্ধে ক্ষান্ত হইয়া এই অমঙ্গল শান্তির নিমিত্ত পুরোহিতকে শতমুদ্রা প্রদান করিলেন।

‘‘ এই ঘটনার বহুকাল পরে আনালুম্বা নামক পেগু রাজার শাসন সময়ে পুনরায় বাঙালি ও চাকমাগণ মিলিয়া উত্থিত হয়। রাজা পঞ্চাশ হাজার সৈন্য লইয়া দাম্বাজিয়াকে সেনাপতি করিয়া পাঠাইলেন। দাম্বাজিয়া যাত্রা করিয়া সম্মুখে দেখিলেন একটি বক ও একটি কাক ঝগড়া করিতেছে, অবশেষে বক কাকের ডানা ভাঙ্গিয়া দিল। তিনি রাজার নিকট আসিয়া ইহা বিবৃত ককরিলেন। মন্ত্রী বুঝিয়া দিলেন, এই কাক বাঙালি এবং বক আমরা। ইহা দ্বারা সুস্পষ্ট দেখা যাইতেছে, এই যুদ্ধে আমাদের জয়লাভ নিশ্চিত। ‘‘সেনাপতি অমিত-উৎসাহে যুদ্ধারম্ভ করিলেন। পাঁচদিন অবিরাম যুদ্ধের পর বাঙালি ও চাকমাগণ পলায়ন করে।’’[iii]

ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত রাজমালায়ও[iv] একই কথার প্রতিধ্বনি বর্তমান। এ সম্বন্ধে ১৭৮৭ খ্রীস্টাব্দের ২জুন তারিখে চট্রগ্রামের তদানীন্তন শাসনকর্তাকে লিখিত ব্রক্ষ্মরাজের একটি চিঠির উদ্ধৃতি থেকেই আমাদের বক্তব্যের যথার্থতার কিছুটা প্রমাণ মিলবে:

‘আমরা পরস্পর এতদিন বন্ধুত্বসূত্রে আবদ্ধ ছিলাম এবং এক দেশের অধিবাসীরা অন্য দেশের অধিবাসীদের সাথে অবাধ মেলামেশা করতে পারতো। …ত্রুটি নামে এক ব্যক্তি আমাদের সাম্রাজ্য থেকে পালিয়ে গিয়ে আপনার সাম্রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছে। তাকে জোরপূর্বক আনার ইচ্ছে আমাদের ছিল না বলেই তাকে ফিরিয়ে দেবার অনুরোধ করে আমরা আপনাদের কাছে বিনয়সহকারে চিঠি লিখেছিলাম। কিন্তু আপনারা তাকে ফেরত পাঠাতে অস্বীকার করেন। আমাদের সাম্রাজ্যের পরিধি নেহাৎ কম নয় এবং ত্রুটি তার অবাধ্য আচরণে আমাদের রাজশক্তির অবমাননা ও শান্তি ভঙ্গ করেছে।…ডোমকান, চাকমা, কিরুপা, লেইস, মুরং এবং অন্যান্য জাতির লোকও আরাকান থেকে পালিয়ে গিয়েছে ও আপনাদের দেশের পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে তারা সীমান্তবর্তী উভয়দেশের অধিবাসীদের উপর অত্যাচার ও লুটতরাজ করেছে। তাছাড়া, তারা নাফ নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের একজন খ্রীস্টানকে হত্যা করে তার যথাসর্বস্ব হরণ করে নিয়ে গেছে। এই কথা শুনে আমি একদল সৈন্য নিয়ে সীমান্ত এলাকায় এসেছি তাদের ধরে নেবার জন্যে। যেহেতু, তারা আমাদের সাম্রাজ্যের অধিবাসী এবং আমাদের রাজশক্তির অবমাননা করে বর্তমানে ডাকাতি বৃত্তি গ্রহণ করেছে। …তাদেরকে আশ্রয় দেয়া আমাদের পক্ষে মোটেই সমীচীন নয় এবং মগরা যারা আরাকান থেকে পালিয়ে গিয়েছে, তাদেরকেও ফেরত পাঠাতে যথাবিহিত ব্যবস্থা করবেন। এতে আমাদের পরস্পরেরর বন্ধুত্বসূত্র আরও দৃঢ় হবে এবং দুই দেশের পথিক এবং ব্যবসায়ীরাও ডাকাতির হাত থেকে অব্যাহতি পাবে।… মোহাম্মদ ওয়াসিমের মারফত এই চিঠি পাঠাচ্ছি। চিঠি পেয়ে যথাবিহিত ব্যবস্থা করবেন এবং অনুগ্রহ করে চিঠিটার উত্তরও তাড়াতাড়ি দিবেন।…’

এ চিঠির উত্তরে কি বলা হয়েছিল তা অবশ্য আমাদের প্রতিপাদ্য নয়, তবে চিঠিটার ঐতিহাসিক মূল্য যে যথেষ্ট তাতে সন্দেহ নেই। এ থেকে চাকমারা কি করে ব্রক্ষ্মদেশ থেকে চট্রগ্রামে আগমন করেছিল তার হদিস পাওয়া যায়।

শাসন ব্যবস্থার সুবিধার জন্য বেঙ্গল গভর্নমেন্ট ১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দের পহেলা সেপ্টেম্বর[v] এই বিস্তৃত পার্বত্যভূমিকে তিনটি সার্কেল যথা: চাকমা সার্কেল, বোমাং সার্কেল ও মঙ সার্কেলে বিভক্ত করেন এবং প্রত্যেক সার্কেলের জন্য একজন রাজা বা প্রধান নিযুক্ত করেন। চাকমা সার্কেলের (২৪২১ বর্গমাইল) রাজা রাঙামাটিতে, বোমাং সার্কেলের (২০৬৪ বর্গমাইল) রাজা বান্দরবানে, এবং মঙ সার্কেলের (৬৫৩ বর্গমাইল) রাজা রামগড় মহকুমার মানিকছড়িতে  অবস্থান করেন। উল্লিখিত জাতিদের মধ্যে চাকমারা সংখ্যার দিক থেকে রাঙামাটিতেই সর্বাধিক এবং অন্যান্য জায়গায়ও এদেরকে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় দেখা যায়।

পার্বত্য চট্রগ্রামের এসব উপজাতি যে এখানকার ভূমিজ সন্তান নয় তা আমাদের উপরোক্ত আলোচনা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়। নৃতত্ত্ববিদদের মতে, উপমহাদেশের আদিম অধিবাসী মাত্রই বাইরে থেকে এখানে আগমন করেছে এবং ভাষাতত্ত্ববিদরাও বিভিন্ন আদিম জাতির ভাষা বিশ্লেষণ করে একই কথার সমর্থন জানিয়েছেন। ‘সুদূর অতীতে অন্যান্য ভূখণ্ডের মত এই উপমহাদেশের মাটিতেও হয়তো এক শ্রেণীর দ্বিপদ বৃক্ষচর প্রাণী নিতান্ত জন্তুদশা থেকে কালক্রমে বিবর্তিত হয়ে নরদশা লাভ করেছে।’ নৃতত্ত্ববিদ ড. জে এইচ হাটনও[vi] এখানকার আদি অধিবাসী সম্বন্ধে এই মতপোষণ করেন এবং তাঁর ধারণা ক্রমবিবর্তন ও বিভিন্ন সময়ের বংশানুক্রমিক রক্তের মিশ্রণে এইসব আদি মানব নিজেদের আদিম অবস্থা হারিয়ে ফেলেছে[vii]

পার্বত্য চট্রগ্রামের চাকমাদের বেলায় এই যুক্তি আংশিক সত্য। এদের ধর্ম ভাষ্য আচার-ব্যবহার এবং সামাজিক জীবনের রীতিনীতি বিভিন্ন ধর্মের সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে, তাদের আদিম বৈশিষ্ট্য অনেক ক্ষেত্রে খুঁজে বের করা অসম্ভব।

চাকমারা মূলত কি ছিল কিংবা কোন জাতি থেকে এদের উৎপত্তি, সে বিষয়টি জানা নিতান্ত কষ্টসাধ্য হলেও অনুসন্ধানের অপেক্ষা রাখে। কোনও জাতির সঠিক পরিচয় নির্ণয়ে সে জাতির অতীত ইতিহাস অনেকটা সহায়ক। ইতিহাসের অভাবে সেসব মানবগোষ্ঠির আকৃতি-প্রকৃতি, বেশ-ভূষা, আচার-ব্যবহার, ধর্ম-কর্ম, ভাব-ভাষা ইত্যাদির সাথে সম্যক পরিচয় কিংবা তাদের কালস্থায়ী পরিবেশের গূঢ় উবলব্ধি না থাকলে সেসব জাতি সম্বন্ধে কিছু বলা সম্ভব নয়।

স্যার রিজলীর মতে, ব্রক্ষ্ম ভাষার ‘সাক’ বা ‘সেক’ জাতি থেকে চাকমাদের উৎপত্তি। ক্যাপ্টেন লুইন বলেন:

‘…the name chakma is given to this tribe in general by the inhabitants of the Chittagong District, and the largest and dominant section of the tribe recognizes this as its rightful appellation. It is also sometimes spelt Tsakma or Tsak, or as it called in Burmese Thek’[viii].

এই মন্তব্যে চাকমা কথাটি যে মূলত পার্বত্য চট্রগ্রামের নয় সম্ভবত এ কথাটি তিনি বোঝাতে চেয়েছেন।

আরাকানের প্রাচীন রাজধানী রামাবতী নগরের নিকটবর্তী অঞ্চলে এই সাক বা সেক জাতি এককালে খুব প্রবল ও প্রতিপত্তিশালী হয়ে উঠেছিল। তাদের সাহায্যে ব্রক্ষ্মরাজ ন্যা সিং ন্যা থৈন ৩৫৬ মগাব্দে (৯৯৪ খ্রীষ্টাব্দ) সিংহাসন অধিকার করেছিলেন।

কর্নেল ফেইরী এর মতে[ix], তখন সেই অঞ্চলে পশ্চিম দেশের বিভিন্ন লোক বাণিজ্য উপলক্ষ্যে আগমন করে এবং পরিশেষে উপনিবেশ স্থাপন করে। তাদের উপাধি ছিল ‘সাক’ বা ‘সক’।

কেউ কেউ অনুমান করেন, তখন আরব-ইরান তুরস্ক  থেকে বহু মুসলমান সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যর উদ্যেশে আগমন করে এবং তাদের অনেকেই দেশে ফিরে না গিয়ে সে অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। অতএব বোঝা যাচ্ছে, এইসব সাক বা সেক শব্দ ইসলামি শব্দের অপভ্রংশ।

এখনও ব্রক্ষ্মদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী স্থানে এই সাক সম্প্রদায় দেখা যায়। ধর্মীয় রীতিনীতিতে তাদের সাথে পার্বত্য চট্রগ্রামের চাকমাদের মিল না খাকলেও আকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে চাকমারা সাকদেরই উত্তর পুরুষ। মগদের মতে, চাকমারা মুঘলদের বংশধর[x]। কোন এক সময়ে মুঘলরা আরাকান রাজ্যের হাতে পরাজয়বরণ করে; ফলে বহু মূঘল সৈন্য বন্দিদশায় আরাকানে অবস্থান করতে বাধ্য হয়। আরাকান রাজ তাদেরকে স্বদেশের মেয়েদের সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হবার আদেশ জানিয়ে আরাকানেই অন্তরীণ করে রাখেন। এসব মুঘল সৈন্যদের ঔরসে এবং আরাকানি নারীদের গর্ভে যে জাতির উদ্ভব হয়েছিল তারাই ‘সেক’ বা ‘সাক’।

জে. পি. মিলস্-ও একই মত পোষণ করেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘‘চাকমাগণ মগনারী ও মুঘল সৈন্যদের সমন্বরজাত। সপ্তদশ শতাব্দীতে চাকমাদের অনেকেই মুঘল ধর্ম গ্রহণ করে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং তখনকার চাকমা প্রধানগণও মুসলমানী নাম ধারণ করেন। অতঃপর সেখানে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় ফলে তারা হিন্দু ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়, কিন্তু পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব প্রকট হয়ে দেখা দেয় এবং হিন্দু ধর্ম অন্তর্হিত হয়[xi]।’’

ক্যাপ্টেন হার্বার্ট লুইন এর মন্তব্যেও এই উক্তির সমর্থন মিলে। তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন চাকমারা মুঘলদের বংশধর না হলেও এককালে এরা মুসলমান ছিল। কালের বিবর্তনে হয়তো ধর্মীয় ধারা পরিবর্তিত হয়েছে। এই মন্তব্যের সমর্থনে শ্রী সতীশচন্দ্র ঘোষ প্রতিপন্ন করেছেন যে, ‘১৭১৫ খ্রীষ্টাব্দ হতে ১৮৩০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত জামুল খাঁ, সেরমুস্ত খাঁ, সের দৌলত খাঁ, জান বক্স খাঁ, জব্বার খাঁ, টব্বার খাঁ, ধরম বক্স খাঁ প্রভৃতি চাকমা ভূপতিবর্গ ‘খাঁ’ উপাধি পরিগ্রহ করতেন। তদানুসষঙ্গিক ইহাও উল্লিখিত হইতে পারে যে, এই সময়ে তাঁহাদের কুলবধূগণেরও ‘বিবি’ খেতাব প্রচলিত ছিল। এখনও অশিক্ষিত সাধারণে ‘সালাম’ শব্দে অভিবাদন করে এবং আশ্চর্য বা খেদসূচক আবেগে ‘খোদায়’ নাম স্বরণ করিয়া থাকে[xii]।’

কেউ কেউ অনুমান করেন তখন মুসলিম (মুঘল শাসন) শাসনের প্রাধান্য ছিল বলে চাকমা রাজারা তাদের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য মুসলমানী নাম, ‘খা’ খেতাব[xiii] ইত্যাদি গ্রহণ করেছিলেন, ফলে তাদের চাল-চলনে মুসলমানী ভাব এবং কথা-বার্তায়ও অনেক আরবী-ফারসি শব্দ প্রবেশ করেছিল।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, ‘খাঁ’ উপাধি গ্রহণের বেলায় এই মতবাদ কতকটা শিথিল বলে ধরা যেতে পারে; কেননা, মধ্যপ্রদেশের কোন কোন স্থানে হিন্দুরাজাদের মধ্যেও ‘খাঁ’ খেতাব পরিলক্ষিত হয় এবং বাংলাদেশেরও কোন কোন হিন্দু পরিবারের ‘খাঁ’ পদবী দেখা যায়। কিন্তু মুসলমানী নাম আচার-ব্যবহার এবং কথা-বার্তায় ইসলামী ভাবগ্রহণ করে এভাবে নিজের সত্তাকে বিলিয়ে দেবার প্রমাণ একমাত্র চাকমা সমাজেই দেখা গেছে। অনুরূপ দৃষ্টান্ত দুনিয়ার আর কোন জাতির ইতিহাসে দেখা যায় না।

প্রসঙ্গত আরও উল্লেখযোগ্য যে, চাকমা রাজাদের মুদ্রার প্রতিকৃতি খাস ফরাসী ভাষায় উৎকীর্ণ ছিল। মুদ্রাগুলোর মধ্যে একটিতে খোদিত আছে ‘আল্লাহ রাব্বী’[xiv]। এমনকি চাকমা রাজাদের কামানগুলোও ‘ফতেহ খাঁ’ ‘কালু খাঁ’ নামে পরিচিত।

‘শ্রী শ্রী জয়কালী জয়নারায়ণ                      জব্বর খাঁ ১১৬৩’

[রাজা জব্বর খাঁর আমলের ফারসিতে উৎকীর্ণ (১১৬৩ মগাব্দ) মুদ্রার প্রতিকৃতি]

‘জান বখশ্ খাঁ                                       জামেনদার’

[চাকমা রাজা জান বখ্শ খাঁ জমিদারের আমলের ফারসিতে উৎকীর্ণ মুদ্রার প্রতিকৃতি]

চাকমা রাজাদের মধ্যে শের দৌলত খাঁর (১৭৫৪ খ্রীষ্টাব্দ) উপসনা পদ্ধতি ছিল খাঁটি ইসলামী ভাবধারার সম্ভূত এবং মারেফতের শিক্ষাই ছিল তার সাধনার প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়। সেই সাধনার বলে তিনি এতদূর উন্নীত হয়েছিলেন বলে জানা যায় যে, নিজের নাড়ীভূড়ি পর্যন্ত বের করে পানিতে পরিষ্কার করে পুনরায় তা যথাস্থানে সংস্থাপন করতে পারতেন। গৃহের এক নিভৃত কক্ষে তিনি আরাধনায় রত থাকতেন। তাঁর উপাসনাকালে কেউ যাতে তাঁর গৃহে প্রবেশ না করে এমন নির্দেশও দেওয়া থকতো। কিন্তু একদিন তাঁর স্ত্রী কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে সেই সাধনা কক্ষের ছিদ্র পথে  দৃষ্টি দিতেই দেখতে পান যে, রাজা তাঁর নিজের অন্ত্র বের করে পরিষ্কার করছেন। এই দৃশ্য অবলোকন করে রাণী অবাক হয়ে চীৎকার দিয়ে ওঠেন, ফলে রাজার ধ্যান ভেঙে যায়। কথিত আছে তিনি সবগুলো অন্ত্র যথাস্থানে সংস্থাপন করতে পারেননি, যার ফলে তিনি উম্মাদ হয়ে যান। এ সম্পর্কে এখনও চাকমা সমাজে একটা গান প্রচলিত আছে:

   মুনি দরবেশ ধ্যান করে

  পাগলা রাজা আপন চিৎ-কল্জা খৈ-নাই স্যান গরে।

[সাধু-দরবেশ যেমন ধ্যান ধরে থাকে, সেই রকম পাগলা রাজা নিজের কলজে বের করে স্নান করাতেন]

এ ছাড়াও চাকমা রাজারা যে ইসলাম ধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত ছিলেন তার আরও অনেক প্রমাণ উপস্থিত করা যায়।

চাকমা রাজমহিষী প্রীমতী কালিন্দী রাণী প্রথমদিকে ইসলাম ধর্মের প্রতি অটল বিশ্বাসী ছিলেন এবং ইসলামের অনেক অনুশাসনও তিনি মেনে চলতেন। রাজানগরে বিরাট মসজিদ তাঁর নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মসজিদ তদারক ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মুসল্লিদের ইমামত করার জন্য তিনি একজন মৌলানা নিযুক্ত করেন। কথিত আছে, রাণী সেই মৌলানার কাছ থেকে অনেক সময় ইসলাম ধর্মের মর্মবাণী সম্পর্কে জ্ঞান সংগ্রহ করতেন। চাকমা রাজ পরিবারের মহিলাদের অবরোধ প্রথা প্রচলিত ছিল। ইসলাম ধর্মের প্রতি বিশেষ বিশ্বাসী থাকা সত্ত্বেও শ্রীমতী কালিন্দী রাণী পরবর্তীকালে ধর্মবিশ্বাস পরিবর্তন করেন। তিনি প্রথমে হিন্দু ধর্ম এবং পরিশেষে বৌদ্ধ ধর্মগ্রহণ করেন।

এসব প্রমাণাদি থেকে অনুমিত হয় যে, চাকমারা হয়ত বা মুসলমান ছিল। মুঘল বংশধর না হলেও এরা যে ব্রক্ষ্ম দেশের সাক বা সেক জাতির (ইসলামী শায়েখ বা শেখ থেকে) অন্তর্ভুক্ত ছিল তা অনুমান করা যায়।

কিন্তু চাকমাদের নিজেদের মতে, উপরোক্ত যুক্তিসমূহ সর্বৈব মিথ্যা। মুসলমানী নাম গ্রহণ এবং তাদের মধ্যে মুসলিম প্রভাবের কারণ সম্পর্কে তারা শুধু এই বলতে চায় যে, অতীতকালে কোন এক চাকমা রাজা জনৈক মুসলমান নবাব কন্যার প্রেমে পড়ে তাঁকে বিয়ে করেন। সেই নবাব কন্যার প্রভাবে চকমা রাজ ইসলামী ভাবধারার সমর্থক হয়ে ওঠে। যার ফলে পরবর্তীকালে তাঁদের নামকরণ উপাধি গ্রহণ আচার-ব্যবহার প্রভৃতিতেও ইসলামী প্রভাব পরিলক্ষিত হয়[xv]। এক সময় চাকমা সমাজে কোনও রমণীর মৃত্যু ঘটলে তাকে রীতিমত কাফন পরিবৃত করে উত্তর শিয়রে কবরস্থ করা হতো এরূপ ঘটনাও বিরল নয়।

কোন জাতির আদি পরিচয় উদঘাটনে প্রাচীন সংস্কারের দান অপরিসীম। এ দিক দিয়ে বিচার করলে চাকমাদের এই যুক্তি অনেকটা শিথিল মনে হয়। কিন্তু চাকমারা কোনক্রমেই মানতে রাজি নয় যে, তারা কোনকালে মুসলমান ছিল। চাকমারাজ শ্রী ভুবনমোহন রায় (মৃত্যু ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৬ খ্রীষ্টাব্দ) দেখাতে চেয়েছেন যে, চাকমারা আসলে শাক্য বংসম্ভূত মহামুনি বুদ্ধের বংশধর[xvi]। পুরাকালে যে তাঁরা পৈতাধারী ক্ষত্রিয় ছিলেন- একথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

মগভাষায় ‘শাক্য’ অর্থ ‘সাক’ আর যারা রাজবংশম্ভূত তাঁদেরকে বলা হয় ‘সাকমাং’ (মাং রাজা অর্থে)। এই ‘সাকমাং’ থেকে ‘চাকমা’। এই বিশেষ কথাটির উপর চাকমারা সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করে থাকেন। চাকমাদের এই নিজস্ব মতামত এবং মগদের এই ভাষাগত অর্থের পরিপ্রেক্ষিতেই তারা প্রমাণ করতে চান যে, তাঁরা শাক্য বংশম্ভূত মহামুনি বুদ্ধের বংশধর।

চাকমা জাতির আদি উৎস সম্পর্কে চাকমা সমাজে দুটি পুরাকাহিনী প্রচলিত আছে- ‘রাধামহন-ধনপতি’ উপাখ্যান এবং ‘চাটিগাঁ ছাড়া’। এই কাহিনী দুটি মূলত এক এবং দ্বিতীয়টি প্রথমটির দ্বিতীয় অধ্যায় মাত্র। উক্ত কাহিনীতে রাজা সাধ্বিংগিরির উল্লেখ রয়েছে। রাজা সাধ্বিংগিরি চম্পকনগরে (মতান্তরে চম্পানগরে) বাস করতেন। এই চম্পক বা চম্পা থেকে না-কি চাকমা জাতির নামকরণ করা হয়েছে। সেকালে চম্পনগরে বিজয়গিরি হরিশচন্দ্র নামে আরও দুজন সামন্ত রাজা ছিলেন। তাঁরা সবাই চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয়। চাকমারা নিজেদের এঁদেরই বংশধর বলে দাবি করে। ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত ‘রাজমালায়’ অবশ্য উক্ত কাহিনী দুটি সম্বন্ধে মতভেদ রয়েছে।

আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, এই চম্পকনগর বা চম্পানগরের ভৌগলিক অবস্থান সম্পর্কে কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ উপস্থিত করা যায় কি-না। কেউ কেউ অনুমান করেন, চম্পানগর বিহারে অবস্থিত। আবার চীনা পর্যটক ফা-হিয়েনের (৪২৯ খ্রীষ্টাব্দ) বর্ণনায় পাওয়া যায় চম্পানগর ছিল তখনকার সময়ে ভাগলপুরের কর্ণপুর রাজ্যের রাজধানী। ক্যাপ্টেন থমাস হার্বার্ট লুইন বলেন, চম্পানগর মালাক্কার নিকটবর্তী একটি শহর।’ এ থেকে কেউ কেউ ধারণা করে থাকেন যে, চাকমারা ‘মালয় বংশজ’। অবশ্য এ সম্পর্কেও মতভেদ রয়েছে।

ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত ‘রাজমালায়’য় চম্পা বা চম্পকনগরের সরাসরি কোন উল্লেখ নাই। তবে চাকমা সমাজে প্রচলিত একটি গানে চম্পানগর নয় নুর নগরের উল্লেখ রয়েছে। গানটির রচনাকাল জানা যায়নি, তবে চাকমা রাজাদের কেউ হয়তো একবার নিজ দেশ ছেড়ে ব্রক্ষ্ম দেশে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠার ফলে দেশে ফিরে আসার অভিলাষ জ্ঞাপন করে তাঁরা ছড়া কেটে গান করতেন (আনুমানিক ৭০০ মগাব্দ):

ডোমে বাজায় দোল্ দগর          ফিরে যাইয়ম্ নুরনগর

(বাদ্যকেরা ঢোল-ডগরা বাজায়। আমাদের নুরনগর ফিরে যেতে ইচ্ছা হয়)

এই নুরনগর পার্বত্য ত্রিপুরায় অবস্থিত। চাকমারা আগে (বর্তমানেও আছে) পার্বত্য ত্রিপুরায় ছিল। ত্রিপুরা জেলায় অবস্থিত গোমতী নদীর উৎস সম্বন্ধে যে আখ্যান প্রচলিত আছে চাকমা সমাজে এখনও তা পবিত্র জ্ঞান করা হয়। পার্বত্য ত্রিপুরার সাথে চাকমাদের যোগসূত্র প্রাচীনকাল থেকেই। বস্তুত, এই নুরনগরই আসলে চম্পানগর কি-না তাও অবশ্য গবেষণার বিষয়।

সুতরাং এসব কাহিনীর উপর ভিত্তি করে একটা জাতির আসল পরিচয় উদঘাটন সম্ভব নয়। চাকমাদের ধর্মভাবের পরিবর্তন সম্পর্কে প্রসঙ্গত আরও একটি প্রমাণ উপস্থিত করা যায়। নিম্নে কয়েকজন চাকমা রাজার নাম এবং তাঁদের সিংহাসন লাভের সময়কাল উল্লেখ করা হলো:

জব্বার খান ১৬৮৬ খ্রীষ্টাব্দ

বেল্লাল খান ১৭০০ খ্রীষ্টাব্দ

জালাল খান ১৭০৬ খ্রীষ্টাব্দ

শেরমুস্ত খান ১৭৩১ খ্রীষ্টাব্দ

শের দৌলত খান ১৭৫৪ খ্রীষ্টাব্দ

জান বখ্স খান ১৭৮২ খ্রীষ্টাব্দ

ধরম বখ্স খান ১৮১৮ খ্রীষ্টাব্দ ইত্যাদি।

শেষের নামটির ‘ধরম’ (সংস্কৃত) কথাটি সম্ভবত বাংলা ‘ধর্ম’ শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে এবং ‘বখ্স কথাটি খাঁটি ফরাসি ভাষার শব্দ।

‘ফতেহ্ খাঁ ১১৩৩’- [চাকমা রাজা ফতেহ্ খাঁর আমলের (১১৩৩ হিজরী) ফরাসীতে উৎকীর্ণ মুদ্রা]

‘শুকদের রায় ১২১০ হিজরী’ [চাকমা রাজা শুকদের রায় (১২১০ হিজরী) এর আমলের মুদ্রার প্রতিকৃতি]

‘জয়কালী সহায় ধরম্ বখ্শ খাঁ’ [রাজা ধরম বখ্শ খাঁর আমলের মুদ্রার প্রতিকৃতি]

‘সিংহ চিহ্নিত চাকমা মুদ্রা’

ধরম বখশের স্ত্রী শ্রীমতী কালিন্দী রাণী এই সময়েই হিন্দু ভাবাপন্ন হন। পূর্বে চাকমা রাজাদের মুদ্রায় আরবী ফারসী শব্দের প্রতিকৃতি ‘আল্লাহ’ ‘খোদা’ ইত্যাদি লেখা থাকতো; কিন্তু এই ধরম বখ্শ খান তাঁর মুদ্রার মধ্যে ‘জয়কালী সহায়’ খুদিত করেন।

পরে শ্রীমতী কালিন্দী রাণী বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন এবং রাজানগরে বাংলা ১২৭৬ সালের ৮ চৈত্র ‘মহামুনি’ সংস্থাপন করেন। মন্দিরগাত্রে সর্বসাধারণের জ্ঞাপনার্থে একটি প্রস্তরফলক স্থাপিত হয়। নিম্নে প্রস্তর ফলকটির হুবহু উদ্ধৃতি দিচ্ছি:

শ্রী শ্রী ভোক্ত

ফড়া

বিজ্ঞাপন

সর্বসাধারণের অবগতার্থে এ বিজ্ঞাপন প্রচার করিতেছি যে, অত্র চট্রগ্রামস্থ পার্বত্যাধিপতি আদৌ রাজা শেরমস্থ খাঁ তৎপর রাজা শুকদের রায় অতঃপর রাজা সের দৌলত খাঁ পরে রাজা জানবকস্ খাঁ অপরে রাজা টর্বর খাঁ অনন্তর রাজা জব্বর খাঁ আর্য্যপুত্র রাজা ধরম বকস্ খাঁ তৎসহধর্মিনী আমি শ্রীমতী কালিন্দী রাণী আপোন অদৃষ্ট সাফল্যাভিলাসে তাহানদ্বিগের প্রতি কৃতাজ্ঞাতাসূচক নমস্কার প্রদান করিলাম যদিও পূর্ববর্তীর ধর্মার্থে বৌদ্ধ ধর্মের শ্রীবৃদ্ধিসাধন জন্য দ্বিগদ্বেসিয় অনেকানেক ষুধিগণ কর্তৃক সাস্ত্রানুসারে ১২৭৬ বাংলার ৮ই চৈত্র দিবস অত্র রাজানগর মোকামে স্থলকুল রত্নাকর ‘চিঙ্গঁ’ সংস্থাপন হইয়াছে তাহাতে আজাবধি বিনা করে বৌদ্ধধর্মাবলম্বি ঠাকুর হইতে পারিবেক উল্যেকিত পৃণ্যক্ষেত্রের দক্ষিণাংশে শ্রী শ্রী ছাইক্য মুনি স্থাপিত হইয়া তদুপলক্ষ্যে প্রত্যেক সনাখেরিতে মহাবিষুর যে সমারোহ হইয়া থাকে ঐ সমারোহতে ক্রয়-বিক্রয় করণার্থে যে সমস্ত দোকানি ব্যাপারি আগমন করে ও মঙ্গলময় মুনি দর্শনে যে যাত্রিক উপনিত হয়, তাহারার দ্বিগ হইতে কোন প্রকারের মহাষুল অর্থাৎ কর গ্রহণ করা জাইবেক না ইদানিক কি করে বা করায় তব এই জর্ন্মে ঐ জর্ন্মে এবং জর্ন্মে জর্ন্মে মহাপতিকিপাত্র পরিগণিত হইবেন।

কিমাধিক মিতি … কালিন্দী রাণী

শ্রীমতী কালিন্দী রাণীর হস্তলিপি

শ্রীমতী কালিন্দী রাণী যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন এই অনুশাসন লিপির প্রতিটি অক্ষর তিনি যথাযথ প্রতিপালন করে গিয়েছেন। শ্রীমতী কালিন্দী রাণীর সময়ই চাকমারা পুরোপুরি বৌদ্ধ ধর্মের শাসনে চলে যায়।

চাকমাদের আদি উৎস নির্ণয় সম্পর্কে যেসব যুক্তি ও প্রমাণাদির উল্লেখ করা হয়েছে তার সঙ্গে তার ধর্মীয় বিষয়াদিও জড়িত। পাহাড়ি জাতি মাত্রই অপেক্ষাকৃত সরল। এদের মনোভাবও বিশেষ কোমল। এ কারণে তাদের ধর্মবিশ্বাসেও স্থৈর্য লক্ষ্য করা যায় না। বর্তমানে অবশ্য মিশনারীদের প্রচেষ্টায় অনেক পাহাড়ি সম্প্রদায়ও খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করতে আরম্ভ করেছে; কাজেই প্রবহমান ধর্মনীতির উপর নির্ভর করে কোন জাতির উৎস নির্ণয় সবক্ষেত্রে সঠিক ও নিরাপদ নয়।

তথ্যসূত্র

[i]  Vide Bengal Govt. Act XXIII dt. 1.8.1860.

[ii] Colonel Phayre : The History of Burma, p 39.

[iii]  দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদফুং, পৃ ১৭-১৯।

[iv]  ‘দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদফুং’, এবং ‘রাজমালা’র বর্ণণায় যথেষ্ট সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। শুধুমাত্র রাজা-বাদশাহদের নামের মধ্যে কিছু কিছু তফাৎ দেখা যায়। যথা: রাজমালা দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদফং অরুণযুগ (চাকমা-রাজা ৬৯৬ মগাব্দ) ইয়াংজ (৬৯৬ মগাব্দ) মইসাং রাজা প্রি ৯৮ মংছুই রাজা প্রি ১১২ মারিক্যা রাজা প্রি ৫৭ মরেক্যজ রাজা প্রি ৫৫ জনু রাজা(৮৮০ মগাব্দ) প্রি ৩৯ চনুই রাজা(৮৮০ মগাব্দ) প্রি ৫৮ সাজেম্বী(৮৮১ মগাব্দ) প্রি ২৩ সাজাইয়ু(৮৮১ মগাব্দ) প্রি ৫৯ ইত্যাদি।

[v]  Vide letter No. 1985/797 LR dt. 1. 9. 1881.

[vi] সুবোধ ঘোষ: ভারতের আদিবাসী(উদ্ধৃত), ‍পৃ ৪।

[vii] Census Report Of Bengal 1931.

[viii] T. H. Lewin: The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein, p. 62.

[ix] Colonel Phayre: Journal of Asiatic Society of Bengal, No. 145, 1844, pp. 201-202.

[x] সতীশ চন্দ্র ঘোষ: চাকমা জাতি, পৃ ৫।

[xi]  J. P. Mills: Notes on a Tour: In the Chittagong Hill Tracts in 1926:  Census of India 1931.

[xii]  সতীশ চন্দ্র ঘোষ: প্রাগুক্ত, পৃ ৬।

[xiii]  ড. দীনেশ চন্দ্র সেন: ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’। ‘সেকালের উপাধিগুলি কিছু অদ্ভুত রকমের ছিল।‘পুরন্দর খাঁ’ ‘গুণরাজ খাঁ’ এসব রাজদত্ত খেতাব।’

[xiv]  সতীশ চন্দ্র ঘোষ: প্রাগুক্ত, পৃ ৬৯।

[xv]  শ্রী মাধবচন্দ্র চাকমাধর্মী: শ্রী শ্রী রাজনামা, পৃষ্ঠা, ভূমিকা e/o.

[xvi] ভুবন মোহন রায়: চাকমা রাজবংশের ইতিহাস,(১৯১৯) পৃ ৩৭।

♦ আবদুস সাত্তার: কবি, গবেষক ও আরণ্য জনপদের লেখক।

দিনে দিনে পার্বত্য উপজাতীয়রা এলিট বাঙালীরা নিঃস্ব শ্রেণিতে পরিণত হচ্ছে

উপজাতি বাঙালী

মো: সাইফুল ইসলাম:

 পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতিদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উপজাতীয়দের সকল প্রকার লেনদেন আয়কর মুক্ত। পার্বত্য এলাকায় যেসব উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ব্যয় বরাদ্দ দু’লক্ষ টাকার মধ্যে সেগুলোর ঠিকাদারী সম্পূর্ণরূপে উপজাতীয়দের জন্য সংরক্ষিত। দু’লাখ টাকার ঊর্ধ্বে বরাদ্দকৃত প্রকল্পের ১০% উপজাতীয়দের জন্য সংরক্ষিত। বাকি ৯০% ঠিকাদারির সিংহভাগ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে উপজাতীয়রাই দখল করে নেয়। কারণ তাদের আয়কর দিতে হয় না বলে তারা বাঙালিদের চাইতে কম দরে কাজ করার সুযোগ পায়। উপজাতীয়রা ব্যাংক ঋণ নিলে তাদের সুদ দিতে হয় শতকরা মাত্র ৫ টাকা। আর বাঙালিদের সুদ দিতে হয় সারা দেশবাসীর মতই শতকরা ১৬ টাকা বা তার চেয়েও বেশি। সরকারিভাবে গৃহীত এ ধরনের ভ্রান্তনীতির কারণে পার্বত্যাঞ্চলের বাঙালিরা উপজাতীয়দের তুলনায় প্রতিনিয়তই পিছিয়ে পড়ছে।

দিনে দিনে উপজাতীয়রা এলিট শ্রেণিতে পরিণত হচ্ছে আর অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হতে হতে বাঙালিরা আজ অবহেলিত এবং উপজাতীয়দের অনুগত শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। সরকারিভাবে এ ধরনের জাতিগত বৈষম্য তৈরি কখনোই কাম্য হতে পাওে না। আর এমন বৈষম্য নীতি কোন অঞ্চলের শান্তির জন্যও সহায়ক নয়। তাই এসব বৈষম্যের অবসান করে পার্বত্যাঞ্চলে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করার সময় এখনই।

চুক্তি পূর্ব বিশৃঙ্খল অবস্থায় যেসব উপজাতীয় নাগরিক ভারতে আশ্রয় গ্রহণকরেছিল তাদেরকে ফিরিয়ে এনে ২০দফা প্যাকেজ সুযোগ সুবিধা দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। এভাবে ৬০ হাজারেরও বেশি উপজাতীয় জনগণ বর্তমানে পুনর্বাসিত হয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করছে।
অন্যদিকে ১৯৮৬ সাল থেকে ২৮ হাজারের বেশি বাঙালি পরিবারকে অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণে গুচ্ছ গ্রামে এনে কার্যত বন্দী অবস্থায় রাখা হয়েছে। গুচ্ছ গ্রামগুলোতে পরিবার প্রতি একটি মাত্র ঘর তোলার জায়গা আর মাসিক ৮৬ কেজি চাল অথবা গম তাদের একমাত্র অবলম্বন। ২৯ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এসব গুচ্ছ গ্রামের এক একটি পরিবার ভেঙ্গে বর্তমানে ২টি, ৩টি বা তার চেয়েও বেশি পরিবারে বিভক্ত হয়েছে। কিন্তু বাড়েনি তাদের ঘর তোলার জায়গা, মাসিক রেশনের পরিমাণও বাড়ানো হয়নি। তাছাড়া গুচ্ছ গ্রামগুলোতে সেনিটেশন ব্যবস্থাও নেই। নেই ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার জন্য স্কুল কলেজ। চাষাবাদের জমিও তাদের নেই। ফলে তারা একমাত্র মাসিক ৮৬ কেজি রেশনের উপর নির্ভরশীল হয়ে কোনো রকমে জীবন ধারণ করছে। মা-বাবা, ছেলে-মেয়ে, ছেলের বউ, মেয়ের জামাই, হাঁস-মুরগী, গরু-ছাগলসহ একই ঘরে গাদাগাঁদি করে মানবেতর জীবনযাপন করছে গুচ্ছ গ্রামবাসী বাঙালি পরিবারগুলো। অথচ তাদের কবুলিয়ত ভুক্ত জমি-জমাগুলো দুস্কৃতিকারী উপজাতীয়রা দখল করছে নানা কৌশলে। কখনও বাঙালিদের জমিতে রাতারাতি কেয়াং নির্মাণ করে আবার কখনও চাষ করে দখল করছে বাঙালিদের জমি। সব কিছু দেখেও আমাদের সরকার এবং প্রশাসন নির্বিকার। তাদের যেন কিছুই করার নেই।
বাঙালিরা গুচ্ছগ্রামে আবদ্ধ হয়ে যুগ যুগ ধরে বসবাস করতে থাকবে এটাই যেন স্বাভাবিক। কিন্তু এ অমানবিক অবস্থা দীর্ঘ দিন চলতে পারে না। আর চললেও সরকার এবং উপজাতি কারো জন্যই তা মঙ্গলজনক হবে না। তা ছাড়া রেশন বাবদ প্রতিমাসে সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এসব বিবেচনা করে গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙালিদেরকে তাদের কবুলিয়তভুক্ত জমিতে পুনর্বাসন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আশা করি সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
পার্বত্য চুক্তির ভূমিকার সাথে এর ধারা উপধারা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক অবস্থার মধ্যে সাংঘর্ষিক আরও অনেক বিষয় রয়েছে। আর এসব কিছুর ফলেই পার্বত্য চুক্তিকে শুরু থেকে সচেতন দেশবাসী মেনে নিতে পারেনি। ভবিষ্যতেও মেনে নেয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে গত ১৭ বছরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সরকার চুক্তির বিতর্কিত ধারা উপধারাগুলি নতুনভাবে বিবেচনা করতে পারে। এতে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম নয় সারা দেশই উপকৃত হবে বলে আশা করা যায়।

হঠাৎ উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম: খতিয়ে দেখতে হবে এখনই

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ 

হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। গত ১০-১২ দিনে একের পর এক সহিংস ঘটনায় তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পাহাড়ি-বাঙালিদের মাঝে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সেনা, বিজিবি ও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতির উপর আপাতত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলেও সেখানে বিরাজ করছে চাপা উত্তেজনা ও বিষ্ফোরনোন্মুখ পরিস্থিতি।

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে গত ৬ ডিসেম্বর প্রায় একই সময়ে পৃথক তিন উপজেলায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে দু’জন নিহত ও চারজন আহত হয়েছে। এর মধ্যে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে চিংসামং চৌধুরী (৪২) নামের এক স্কুল শিক্ষক নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন মংসাজাই মারমা ওরফে জাপান নামের মানিকছড়ি উপজেলা জেএসএস সভাপতি। তাকে চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। বেশ কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৬ ডিসেম্বর মংসাজাই মারমা ওরফে জাপান মারা যান। পৃথক এক ঘটনায়, জেলার পানছড়ি উপজেলার মগপাড়া (হলধর পাড়া) এলাকায় অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীদের গুলিতে রমজান আলী (৫৫) ও তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (৪০) গুরুতর আহত হয়েছেন। অপর এক ঘটনায় মাটিরাঙ্গা উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছেন চুক্তি স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমা সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা আশুতোষ ত্রিপুরা (২৬)। চিংসামং চৌধুরীর খুনের ঘটনায় খাগড়াছড়ি জেলার মারমা সম্প্রদায় প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ ও মারমা সম্প্রদায়ের উপর পরিচালিত আরেকটি উপজাতীয় সংগঠনের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে খাগড়াছড়িতে মিছিল মিটিং ও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। সেখান থেকে চাকমাদের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনাও ঘটে। মারমাদের এই শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে আঙুল তোলা কার্যত তিন পার্বত্য জেলার প্রভাবশালী চাকমা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ছিল। এরই মধ্যে ১৫ ডিসেম্বর কাপ্তাইয়ের ব্যাঙছড়িতে সুউচ্চ পাহাড়ের উপর ছবি মারমা (১৫) নামে এক উপজাতীয় তরুণীকে ধর্ষণের পর জবাই করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। কাপ্তাই থানা ওইদিন বিকেলে জবাই করা লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য থানায় নিয়ে যায়। পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিহত তরুণী চিৎমরম স্কুলের জেএসসি ফলপ্রার্থী। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১২টার দিকে বাসার জন্য গসিয়া নামক এক প্রকার খাদ্য আনার জন্য সুউচ্চ পাহাড়ের উপর জুম এলাকায় যায় সে। দুপুরে পরিবারের লোকজন খবর পায়, তাকে কে বা কারা জবাই করে জঙ্গলের মধ্যে ফেলে গেছে। এদিকে ৯ ডিসেম্বর বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার ডলু ঝিরি এলাকায় উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠন ম্রো ন্যাশনাল পার্টির (এমএনপি) সন্ত্রাসীরা দুই বাঙালি নারীকে গণধর্ষণ ও দুইজনকে অপহরণ করে। একই সাথে ৭-৮টি বাঙালি পরিবারের ওপর হামলা চালিয়ে স্বর্বস্ব লুট করে।
এদিকে রাঙামাটিতে ছবি মারমা নিহত হওয়ার একদিন পরই অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর জেলার নানিয়ারচর উপজেলার তরুণীপাড়া এলাকায় মধ্যরাতে বাঙালিদের প্রায় পনের একর আনারস বাগানের সাড়ে ৪ লাখ ফলন্ত আনারসের গাছ এবং একটি নতুন সেগুন বাগানের ২২ হাজার সেগুন গাছের চারা কেটে ফেলে দুর্বৃত্তরা। ভোরে আনারস বাগানের মালিক নুরুল ইসলাম, মো. আসাদ, কামাল হোসেন, জামাল হোসেন এবং সেগুন বাগানের মালিক আবছার মাস্টার বাগানে গিয়ে নিজেদের বাগানের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পান। তাদের অভিযোগ, পাশের গ্রামের পাহাড়িরাই রাতের আঁধারে তাদের বাগানের গাছগুলো কেটে ধ্বংস করে দিয়েছে। পার্বত্য জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে দাবি করেছে, প্রতিপক্ষ পাহাড়ি সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্টের সদস্যরা এই বর্বরতা চালিয়েছে। ওই আনারস ও সেগুন বাগান কেটে ফেলার ঘটনাকে ঘিরে কুতুকছড়ি ইউনিয়নের বগাছড়ি এলাকার বাঙালিদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর এক পর্যায়ে মঙ্গলবার সকাল পৌনে আটটার দিকে দলবদ্ধভাবে ক্ষুব্ধ বাঙালিরা বিক্ষোভ শুরু করে। অন্যদিকে দুর্বৃত্তরা পাশের তিনটি পাহাড়ি গ্রাম বগাছড়ি, ছড়িদাশ পাড়া ও নবীন তালুকদার পাড়ায় দোকানপাট ও বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। অগ্নিসংযোগে পাহাড়িদের বাড়িঘর ও দোকানপাট পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এসময় বাঙালিদেরও কয়েকটি ঘর পুড়তে দেখা গেছে। পাহাড়িদের অভিযোগ, এ সময় বুড়িঘাট ইউনিয়নের সুরিদাসপাড়া এলাকার ‘করুণা বিহার’ নামের একটি বৌদ্ধ বিহারে হামলা চালায় হামলাকারীরা। এ ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার থেকেই রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইউপিডিএফ সমর্থিত সংগঠন ভূমি রক্ষা কমিটি। নানিয়ারচরের ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ১৭ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদককে অপহরণ করে অজ্ঞাতনামারা। অপহৃত ব্যক্তির নাম অমল কুমার ত্রিপুরা (২৩)। সে পানছড়ি উপজেলার ৫নং উল্টাছড়ি ইউপির মরাটিলা এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য শান্তি কুমার ত্রিপুরার ছেলে। একই দিন খাগড়াছড়ির দীঘিনালার বাবুছড়া এলাকায় মন্টু বিকাশ চাকমা নামে এক ইউপিডিএফ সদস্যের বাসায় গুলি ও গ্রেনেড ছুড়ে মেরেছে দুর্বৃত্তরা। গ্রেনেডটি অবিস্ফোরিত অবস্থায় উদ্ধার করেছে দীঘিনালা থানা পুলিশ।
উপরের সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো উপায় নেই। কারণ, শান্তিচুক্তির ১৭ বছর পূর্তি উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র ব্যোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা সরকারকে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে এর মধ্যে শান্তিচুক্তির দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপ্রিয় ও অশান্তিপ্রিয় পন্থায় অসহযোগ আন্দোলন করার হুমকি দেন। ২৯ নভেম্বর রাজধানীর হোটেল সুন্দরবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সন্তু লারমা এ হুমকি দিয়ে বলেন, ১ মে ২০১৫ থেকে এই অসহযোগ আন্দোলন শুরু হবে। সন্তু লারমা অকষ্মাৎ এমন উক্তি করেছেন, বিষয়টি এমন নয়। গত কয়েক বছর ধরেই তিনি শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হলে পুরাতন সশস্ত্র সংগ্রামের হুমকি দিয়ে আসছেন। শান্তিচুক্তির দেড় দশকপূর্তির অনুষ্ঠানে প্রথম তিনি এই সশস্ত্র সংগ্রামের হুমকি দেন। তবে এবারে তার হুমকি দেয়ার পর থেকেই পাহাড়ে যে নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে তা সচেতন দেশবাসীকে চিন্তিত করে তুলেছে।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমা ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি চুক্তি অনুযায়ী খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে শান্তিবাহিনীর ৭৩৯ সদস্যের প্রথম দলটি সন্তু লারমার নেতৃত্বে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট অস্ত্রসমর্পণ করেছিল। পরবর্তীতে ১৬ ও ২২ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে ৪ দফায় শান্তিবাহিনীর মোট ১৯৪৭ জন অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানেই শান্তিবাহিনীর একাংশ শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যান করে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়াম কালো পতাকায় ঢেকে ফেলে। সৃষ্টি হয় প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে চুক্তিবিরোধী নতুন সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ। সে সময় থেকেই তারা প্রতিবছর ২ ডিসেম্বরকে ‘বেঈমান দিবস’ হিসাবে পালন করে আসছে। বলা হয়ে থাকে, শান্তিবাহিনীর সকল সদস্য আত্মসমর্পণ করেনি ও তাদের সব অস্ত্র জমা পড়েনি বরং পুরাতন ও ভাঙাচোরা কিছু অস্ত্র জমা দিয়ে তারা সরকারকে ধোঁকা দিয়েছিল।
২০১৪ সালের পরিসংখ্যান পুরোপুরি পাওয়া না গেলেও নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র মতে, শান্তিচুক্তির পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলায় সন্ত্রাসী কর্তৃক নিহতের সংখ্যা ৭৫৩ জন। আহত হয়েছে ৯৩২ জন। অপহৃত হয়েছে ১৩৬৫ জন। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে গ্রেফতার হয়েছে ৩৮৬৫ জন, গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে ১২৫১টি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে ২০টি। নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সন্ত্রাসীদের সম্মুখ যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে ৬৭ বার। জেএসএস-ইউপিডিএফ’র মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে ১৭৫ বার। পার্বত্য চট্টগ্রাম সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এটি পূর্ণাঙ্গ তথ্য নয়। প্রকৃত পরিসংখ্যান আরো বেশি। পার্বত্যাঞ্চলের আঞ্চলিক দলগুলো পারস্পরিক দ্বন্দ্বে শান্তিচুক্তির ১৬ বছরে ৩৪৪ নেতাকর্মী নিহত ও সহ¯্রাধিক আহত হয়েছে। ইউপিডিএফের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের তথ্য মতে, পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর থেকে ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত তাদের ২৫৪ জন নেতাকর্মী প্রতিপক্ষের সশস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছে। অন্যদিকে জেএসএসের কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য মোতাবেক, শান্তিচুক্তির পর থেকে একই সময় পর্যন্ত তাদের ৯০ জন নেতাকর্মী প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়েছে। এদিকে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৮ জন নিহত হয়েছে। ১২৬ জন আহত হয়েছে। ৮৭ জন অপহৃত হয়েছে। ৪৪টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, যে শান্তির অন্বেষণে শান্তিচুক্তি করা হয়েছিল তা পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আনতে সফল হয়নি। উল্টো সেখানকার প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি সম্প্রদায়কে এই চুক্তির মাধ্যমে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে নিজ দেশে পরবাসী করে ফেলা হয়েছে।
সন্তু লারমা কথায় কথায় সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিচুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে থাকেন। বস্তুত ১৯৯৮ সালের ৬ ডিসেম্বর আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের পর থেকেই তিনি এ অভিযোগ তুলে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদ গ্রহণে গড়িমসি করছিলেন। কিন্তু সে সময় সরকার সন্তু লারমাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো জেএসএস নেতা এ পদে বসানোর হুমকি দিলে তিনি তড়িঘড়ি করে ১৯৯৯ সালের ১২ মে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদে যোগ দেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় এই পদে অবস্থান করে সকল রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন এবং মাঝে মাঝেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকি দিচ্ছেন। এ পদে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ উপজাতি নেতারাই করেছেন বিভিন্ন সময়। শান্তিচুক্তি অনুযায়ী এই পদের মেয়াদ ৫ বছর। অথচ ১৬ বছর ধরে তিনি এই পদটি দখল করে ক্রমাগত শান্তিচুক্তি লঙ্ঘন করে চলেছেন। যদিও হাইকোর্ট আঞ্চলিক পরিষদকে রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র বলে তাকে সংবিধান ও রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দিয়ে বাতিল করে দিয়েছেন। তবে রায়টি উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্টে অবস্থায় রয়েছে।
শান্তিচুক্তির কোথাও সন্তু লারমাকে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তি হিসাবে দেয়া হয়নি। তিন পার্বত্য জেলায় বিভিন্ন উপজাতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষাদীক্ষা, জনপ্রিয়তা, প্রশাসনিক দক্ষতায় তার চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য উপজাতীয় নেতা রয়েছেন। এই পদে বসলে আরো যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন বলেই পাহাড়িরা বিশ্বাস করে। এমনকি তার নিজের দল জেএসএসের মধ্যেও অনেক যোগ্য নেতা রয়েছেন। ত্যাগ, তিতীক্ষা, জনপ্রিয়তা ও দক্ষতায় যারা এ পদের যোগ্য দাবিদার। সন্তু লারমা তাদের কোনো সুযোগ দেননি। সন্তু লারমার ক্ষমতালিপ্সার প্রতিবাদেই আরেক দফা জেএসএসে ভাঙন সৃষ্টি হয়। জন্ম নেয় জেএসএস (সংস্কার) পার্টির। কাজেই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের স্বার্থে সংশোধিত আইনে জেলা পরিষদসমূহের পুনর্গঠন শেষ হলে শান্তিচুক্তির গ খণ্ডের ১২ ধারা অনুযায়ী সরকারকে নতুন করে অন্তবর্তীকালীন আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের বিষয়টি সক্রিয় ভাবে বিবেচনা করে দেখতে হবে। অন্য যোগ্য উপজাতীয় নেতাকে সুযোগ দিতে হবে।
বাস্তবতা হচ্ছে, শান্তিচুক্তি অনুযায়ী সেসব স্থান থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে সেসব স্থান পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। শান্তিচুক্তির সুযোগ নিয়ে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে চাঁদাবাজির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। বাৎসরিক প্রায় ৪শ’ কোটি টাকা সেখানে চাঁদাবাজির মাধ্যমে পাহাড়ি সংগঠনগুলো আয় করে থাকে বলে ধারণা করা হয়। এর সাথে রয়েছে আর্মস, ড্রাগস ও মানব পাচার। অপহৃতদের লুকিয়ে রাখার জন্যও এসব স্থান নিরাপদ জোন হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কারণে বিগত কয়েক বছরে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা যেসব অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে মুক্তিপণ ছাড়া তাদের উদ্ধার সম্ভব হয়নি। এখন যখন সরকার ঐসব স্থানে জনগণের নিরাপত্তা বিধানে বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে, পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা উচ্ছেদ ও ভূমি দখলের অভিযোগ তুলে তা থামাতে চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে তারা জাতীয় পর্যায়ের বামপন্থী রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমের অকুণ্ঠ সহায়তা পাচ্ছে। পাহাড়িদের প্রতি বামপন্থীদের এই আত্মঘাতী সমর্থন নতুন নয়। সম্প্রতি প্রকাশিত মহিউদ্দীন আহমদ লিখিত ‘জাসদের উত্থান পতন : অস্থির সময়ের রাজনীতি’ গ্রন্থে দেখা যায়, জনসংহতি সমিতির স্বায়ত্তশাসন দাবি জোরালো করবার আগেই ১৯৭৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি জাসদের নির্বাচনী ইশতেহারে উপজাতীয়দের স্বায়ত্তশাসন দেবার দাবি উত্থাপন করা হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে, একই বছরের ২৯ ডিসেম্বর জাসদের ২৯ দফায় উপজাতীয়দের স্বায়ত্তশাসন এমনকি স্বাধীনতা দেবার দাবিও করা হয়। (প্রাগুক্ত, ৯৬ ও ১০৮ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)। বর্তমানেও একই গোষ্ঠী পাহাড় থেকে নিরাপত্তাবাহিনী ও বাঙালি প্রত্যাহারের দাবিতে উপজাতীয়দের সাথে কোরাস করছে। মূলত একটি রাষ্ট্রের কোথায় সেনাবাহিনী বা বিজিবি ক্যাম্প থাকবে এটি নির্ধারণ করবেন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা আর কোনো কিছুর সঙ্গে তুল্য হতে পারে না।
স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শান্তিচুক্তির বেশিরভাগ বিষয়ই বাস্তবায়ন হয়েছে। চুক্তিতে ৭২টি শর্ত আছে, তার মধ্যে ৪৮টি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে। আর ১৫টি আংশিকভাবে হয়েছে এবং ৯টি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, বাকি ধারাগুলোও শীঘ্রই বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু সন্তু লারমা একে অসত্য, বিভ্রান্তিমূলক ও মনগড়া বক্তব্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অথচ সাবেক সিএইচটি প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদারের মতে, ২০১৩ সালে চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভায় ৪৮টি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মতৈক্যপত্রে সন্তু লারমা স্বয়ং স্বাক্ষর করেছেন। অর্থাৎ সন্তু লারমা তার নিজের জনগণের সাথেও ধোঁকাবাজির খেলা খেলছেন। এদিকে জেএসএসের সাথে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নকারী দল হিসাবে আওয়ামী লীগ কৃতিত্ব দাবি করলেও সন্তু লারমা তা মানতে রাজি নন। শান্তিচুক্তির ১৬ বছর পূর্তিতে রাঙামাটিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলে দেন, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি নিয়ে মিথ্যাচার ও প্রতারণা করে চলেছে। শান্তিচুক্তি কোনো একক ব্যক্তি বা একক সরকারের কৃতিত্ব নয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম পার্বত্য অঞ্চলের বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিরসনে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সংলাপের সূচনা করেছিলেন। তার সময়ের সিনিয়র মন্ত্রী মশিউর রহমানসহ আরো কয়েকজনের সাথে সফল আলোচনা হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে এরশাদ আমলে ৬টি, বেগম খালেদা জিয়া সরকারের প্রথম আমলে ১৩টি ও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে ৭টি মিলে মোট ২৬টি সংলাপের মাধ্যমে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এমনকি সেই অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রক্ষাকবচ বলেও উল্লেখ করেন সন্তু লারমা। অথচ এ বছর তিনি শান্তিচুক্তিকে প্রতারণা বলে আখ্যা দিয়েছেন।
বস্তুত তিন পার্বত্য জেলায় জেএসএসের সাথে শাসকদল আওয়ামী লীগের ব্যাপক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। বিগত জাতীয় সংসদ, উপজেলা ও বিভিন্ন আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচনে জেএসএসকে দেখা গেছে বিরোধী দল বিএনপির সাথে অঘোষিত সমঝোতা করতে। জাতীয়ভাবে সংসদ নির্বাচন বয়কট করলেও রাঙামাটিতে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা জেএসএস প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছে। খাগড়াছড়িতে জেএসএস না থাকলেও অপর আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফের সাথে বিএনপির সম্পর্কের প্রচার রয়েছে। উপজেলা নির্বাচনে এসে এই সমঝোতা আরো ব্যাপক আকার ধারণ করে। অর্থাৎ কখনো নৌকায় পা দিয়ে, কখনো ধানের শীষ মাথায় নিয়ে সন্তু লারমা তার নিজস্ব লক্ষ্য জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তার এই লক্ষ্য বাংলাদেশের অখন্ডতার প্রতি চরম হুমকি স্বরূপ। দেশি-বিদেশি দাতাসংস্থা, এনজিও ও মিশনারিদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা পাবার ফলে সন্তু লারমা এখন বাংলাদেশের সরকার ও সার্বভৌমত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়তেও দ্বিধা করছেন না।
আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের জাতীয় আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে সক্রিয় যেকোনো দেশি-বিদেশি এনজিও ও দাতাসংস্থা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে চলতে বাধ্য। বিগত কয়েক বছর যাবত বেশকিছু এনজিও ও দাতাসংস্থা বাংলাদেশের সংবিধান বিরোধী ও রাষ্ট্রীয় নীতির পরিপন্থী ‘আদিবাসী’ ধারণাকে প্রচার, প্রসার, জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠা করতে নানা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এটি সম্পূর্ণ আইনবিরোধী এবং তাদের এখতিয়ার ও অধিকারের লঙ্ঘন। রাষ্ট্রীয় অখ-তার স্বার্থে সরকারকে অতিদ্রুত এই সকল দাতাসংস্থা ও এনজিওর আদিবাসী বিষয়ক প্রোগ্রামসমূহ বন্ধ করতে বাধ্য করতে হবে এবং যারা বাংলাদেশে আইন ও সংবিধান মানতে অস্বীকার করবে তাদের কার্যক্রম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করতে হবে। জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক চার্টার অনুযায়ী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের জাতীয়তা, রাজনৈতিক অধিকার, নাগরিক স্ট্যাটাস ও আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অধিকার সংরক্ষণ করে। তাই সন্তু লারমা তার জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপায় হিসাবে নিজেদের আদিবাসী স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
Email : palash74@gmail.com

প্রবন্ধটি গত ২১ ডিসেম্বর ২০১৪ তারি্খে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত হয়েছিল

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

 

পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতীয় কর্তৃক বাঙালী নারী ধর্ষণ নির্যাতন আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে চলেছে

ধর্ষণ

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

বাঙালী কর্তৃক উপজাতীয় নারী নির্যাতনের বিষয়ে উপজাতীয়দের প্রচার- প্রপাগাণ্ডা, প্রতিবাদ মিছিল, বিক্ষোভ সমাবেশের আড়ালে পাহাড়ের দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে উপজাতি কর্তৃক বাঙ্গালী নারী ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনা। উপজাতি কর্তৃক বাঙ্গালী নারী ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনাগুলো বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। কিন্তু কোন ঘটনারই সুষ্ঠু বিচার হয়নি। কোন এক অদৃশ্য ক্ষমতাবলে এসব অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এনিয়ে নিরীহ বাঙ্গালীদের মাঝে দিনের পর বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। ক্ষীণ হয়ে আসছে ন্যায় বিচার পাওয়ার আশাও। অন্যদিকে একের পর এক ঘটনা করে পার পেয়ে যাওয়া উপজাতীয় যুবকদের দৌরাত্ম বেড়েই চলছে। পরিস্থিতি বর্তমানে এতোটাই খারাপ হয়েছে যে, বিভিন্ন ফেসবুক পেইজে পাহাড়ী যুবকেরা বাঙালী নারীদের সুপার ইম্পোজ ছবি পোস্ট করছে, তাদেরকে ধর্ষণের জন্য পাহাড়ী যুবকদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে।

পার্বত্যনিউজের তথ্যানুসন্ধান ও ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২ সালের ১৩জুন মাটিরাঙ্গা উপজেলার পলাশপুর জোন সদরের কাছাকাছি দক্ষিণ কুমিল্লা টিলা এলাকায় মুসলিমপাড়ার বাসিন্দা মো: আব্দুল মান্নানের মেয়ে কুলসুম আকতার (১২) নামে এক কিশোরী ধর্ষনের শিকার হয়। ঘটনার সূত্রে জানা যায়, নিজেদের বাড়ি হতে মাটিরাঙ্গা বাজারে কেনাকাটার জন্য যাবার পথে এক পাহাড়ি যুবকসহ চার যুবক তাকে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় স্থানীয়রা ঘটনাস্থল থেকে মোহন ত্রিপুরা নামক এক ব্যক্তিকে আটক করে থানায় সোপর্দ করে। এসময় অন্য তিনজন পালিয়ে যায়। ঘটনার পরদিন তার পরিবারের পক্ষ থেকে মাটিরাঙ্গা থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ কর্তৃক অভিযান চালিয়ে অপর ব্যক্তিদের আটক করে।

এক্সক্লুসিভ লোগো

এ ঘটনার এক মাসের মাথায় ২৩ জুলাই মহালছড়ির মাইসছড়ি এলাকায় শাহদা বেগম (৫৫) নামে এক বাঙ্গালী গৃহবধুকে পাহাড়ী যুবক কর্তৃক ধর্ষনের অভিযোগ উঠেছে। সে মাইসছড়ির মো: সয়ন উদ্দীনের স্ত্রী। জানা গেছে, ঐ মহিলা তার গরু খোজার জন্য নিকটবর্তী নীলাৎপল খীসার সবজি ক্ষেতে গেলে চার পাহাড়ী যুবক তাকে মারধর ও ধর্ষণ করে। পরে মহালছড়ি জোন কমান্ডার লে: কর্ণেল মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম এর নেতৃত্বে সেনা সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে মহালছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রেরণ ও জোনের পক্ষ থেকে চিকিৎসা বাবদ পাঁচ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। এ ব্যাপারে ধর্ষিতার ছেলে মো: গুলজার হোসেন মহালছড়ি থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ অভিযুক্ত লাব্রেচাই মারমা ও মাউশিং মারমা নামে দুই যুবককে আটক করে।

এ ঘটনার কয়েক মাসের মাথায় ৯ অক্টোবর মহালছড়ির শ্মশানখোলা এলাকার বাসিন্দা শামছুন্নাহার (৩০) নামে একজনকে ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ উঠে। এসময় উপজাতি যুবকের দা‘র আঘাতে শামছুন্নাহারের মাথায় মারাত্বক জখম হয়। পরবর্তীতে তাকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতলে ভর্তি করা হয়। এঘটনায় পুলিশী কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

এদিকে ২০১৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী খাগড়াছড়ির আলুটিলাস্থ ইমাং রেস্টুরেন্টে গণ-ধর্ষণের শিকার হয় জান্নাতুল ফেরদৌস (১৫) নামে এক বাঙ্গালী কিশোরী। সে জেলার রামগড় উপজেলার বাসিন্দা। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঘটনার দিন জান্নাতুল ফেরদৌস বান্ধবীর বাড়ীতে যাওয়ার পথে অজ্ঞাত পরিচয়ধারী উপজাতীয় দুষ্কৃতিকারীরা তাকে অপহরণপূর্বক এই ঘটনা ঘটায়। ধর্ষণের শিকার এই কিশোরী ঘটনার পরদিন ০৫ ফেব্রুয়ারি হোটেলর ২য় তলা থেকে জানালা দিয়ে নীচে লাফ দিয়ে ধর্ষণকারীদের কবল হতে পালানোর চেষ্টা করলে গুরুতর আহত হয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে। উদ্ধারের পর প্রথমে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতাল ও পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। এসময় সন্দেহভাজন হোটেল কর্মচারি রাহুল ত্রিপুরাকে (২৮) আটক করে পুলিশ।

এ ঘটনার কয়েকদিনের মাথায় ১৩ ফেব্রুয়ারী মহালছড়ি জোনের আওতাধীন থলিপাড়া এলাকায় মহালছড়ি ডিগ্রী কলেজের ছাত্রী মিতা সরকারের সাথে অসদাচরনসহ তাকে উত্যক্ত করে রামপ্রু মারমা নামে উপজাতি স্কুল ছাত্র। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি ও বাঙ্গালি যুবকদের মাঝে হাতাতির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনা জানাজানি হলে মহালছড়ি জোন ও এপি ব্যাটালিয়নের পৃথক দুটি টহলদল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে জোন কমান্ডার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যান, কলেজের অধ্যক্ষ, অভিযুক্ত ছাত্র রামপ্রু মারমা‘র পিতা এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে ভবিষ্যতে আর কখনো এ ধরণের কার্যকলাপে লিপ্ত হবে না মর্মে মুচলেকা দিয়ে সেবারের মতো রেহাই পায় বখাটে উপজাতি যুবক রামপ্রু মারমা।

এর পরপরই স্বাধীনতার মাসে (১৮ মার্চ) গুইমারার রামসু বাজারে মিসেস ফেরদৌসি বেগম (৩৫) এর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে উপজাতিয় মোটরসাইকেল চালক অংচল মারমা (৩২)। প্রাপ্ত সূত্রমতে, ফেরদৌসি বেগম ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলযোগে মানিকছড়ি হতে গুইমারা বাজারে যাওয়ার পথে তার শ্ললতাহানির চেষ্টা চালালো হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে এ ঘটনা জানার সাথে সাথে গুইমারা সেনা ক্যাম্পের একটি টহল দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে সিএমএইচ-এ ভর্তি করে। পরবর্তীতে, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে মাটিরাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানান্তর করা হয়। এ ঘটনায় স্থানীয়রা অভিযুক্ত মোরসাইকের চালককে আটকপূর্বক গুইমারা থানা পুলিশের নিকট সোপর্দ করে। এ ব্যাপারে গুইমারা থানায় মোটরসাইকেল চালকের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে একটি মামল করা হয়।

এরপর ৩০ এপ্রিল আলীকদম জোনের আওতাধীন গুড়রঝিরি এলাকার একটি তামাক ক্ষেতে মোছাম্মদ হুরাইরা (২৬) নামের এক বাঙ্গালি নারী উপজাতিয় যুবক মংচিং আই মারমা (৩০) কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয়। জানা গেছে হুরাইরা ও তার স্বামী উক্ত তামাক ক্ষেতের শ্রমিক। তার স্বামীর অনুপুস্থিতিতে একই তামাক ক্ষেতের অপর শ্রমিক মং চিং আই মারমা উক্ত ঘটনা ঘটায়। সেনাসদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে। এ ঘটনার ব্যাপারে লামা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। ঘটনার পর থেকে ধর্ষক মং চিং আই মারমা পলাতক রয়েছে।

২০১৪ সালের ৪ এপ্রিল পুর্বপ্রণয়ের জের ধরে মাটিরাঙ্গার গাজীনগর বটতলী এলাকার বাঙ্গালি কিশোরী সবিলা আক্তর (২৪)-কে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্ঠা করে উপজাতিয় যুবক কৃঞ্চমাহন ত্রিপুরা (২৭)। স্থানীয়রা বিষয়টি জানলে পলায়নকৃত কৃঞ্চমাহন ত্রিপুরা ও সবিলা আক্তরকে আটক করে মাটিরাঙ্গা থানায় হস্তান্তর করে।

এর কয়েকদিনের মাথায় ৮ এপ্রিল আলকদম জোনের আওতাধীন সেলতিপাড়া এলাকায় পাখী আক্তার (৩৫) নামে বাঙ্গালী গৃহবধুর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে উপজাতি যুবক সামারি মারমা (৩৬)। উক্ত ঘটনায় স্থানীয় বাঙ্গালীরা উত্তেজিত হয়ে সামারি মারমাকে মারধর করে। পরবর্তীতে, এই ঘটনা উক্ত এলাকায় পাহাড়ি-বাঙ্গালিদের মাঝে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এ ঘটনা জানার পর সেনাবাহিনীর একটি টহল দল ঘটনাস্থলে গিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নিয়োজিত রাখে।

একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর সদরখিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী রুনা আক্তার (৭)-কে ধর্ষনের অভিযোগ উঠেছে একই বিদ্যালয়ের উপজাতি ছাত্রের বিরুদ্ধে। ধর্ষণের শিকার মেয়ে শিশুটির ভাষ্যমতে জানা যায়, বিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরার পথে উপজাতীয় ছাত্র তাকে বিদ্যালয় ভবনের পিছনে নিয়ে উক্ত ঘটনা ঘটায়। পরবর্তীতে, শিশুটির মা ও নেপচুন টি স্টেট‘র শ্রমিক কাঞ্চন মালা তাকে চিকিৎসার জন্য মানিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতলে প্ররণ করে। এ ব্যাপারে কাঞ্চন মালা বাদী হয়ে মানিকছড়ি থানায় একটি মামলা দায়ের করে।

পরবর্তীতে, মানিকছড়ি উপজেলার ইউএনও, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, স্থানীয় বাটনাতলী ইউপি চেয়াম্যান এবং বিদ্যালয়ের পরিচালক কমিটির সদস্যবৃন্দ ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে ০১ অক্টোবর সদরখিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্ষণের শিকার শিশুটি কর্তৃক অভিযুক্ত প্রথম শ্রেণির ছাত্র রাজ কুমার চাকমাকে (১২) সনাক্ত করা হয়। পরে পুলিশ কর্তৃক রাজ কুমার চাকমাকে আটক পূর্বক খাগড়াছড়ি জেলে প্রেরণ করা হয়।

সমঅধিকার আন্দোলন একাংশের মহাসচিব মনিরুজ্জামান মনির পার্বত্যনিউজকে বলেন, বাঙালী কর্তৃক কোনো উপজাতি নারী নির্যাতিত হলে উপজাতি সমর্থিত বিপুল মিডিয়ার প্রচার প্রপাগাণ্ডা, প্রতিবাদ, বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতি ও আন্তর্জাতিক মহলের চাপে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু উপজাতি কর্তৃক বাঙালী নারী ধর্ষিত বা নির্যাতিত হলে সরকারের তরফ থেকে সেই তাগিদ লক্ষ্য করা যায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই একজন নামেমাত্র গ্রেফতার হলেও অল্পদিন পরই তারা জামিনে বেরিয়ে আসে। আর এই বিচার বছরের পর বছর ধরে ফাইলবন্দী থেকে একসময় তামাদি হয়ে যায়। বাঙালী নারীদের ক্ষেত্রে জাতীয় গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী আন্তর্জাতিক মহল কারোরই আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় না। বাঙালী নারীদের ক্ষেত্রে বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদে। তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে বিচার না হওয়ায়,, সম্মান কিম্বা নিরাপত্তার কারণে বাঙালীরা বিচার প্রার্থিও হয় না। ঘটনার আসল সংখ্যা কখনোই জানা যায় না।

এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে ন্যায় বিচারের প্রত্যাশা করে পাহাড়ের সচেতন মহল বলেন, এভাবে চলতে দেয়া যায় না। বাঙ্গালী যুবকের দ্বারা কোন পাহাড়ী নারী ধর্ষিত হলে কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবীমহল মাঠ গরমের চেষ্টা করলেও এতোগুলো ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনায় তাদের কোন বক্তব্য-বিবৃতি জাতি দেখেনি। পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা ও বাঙালীর অবস্থান নিশ্চিত করতে এ ধরণের ঘটনা রোধ করা ও সুবিচার নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

বাঙ্গালী বসতি স্থাপন ও প্রতিরক্ষা

gussagram 1
আ তি কু র  র হ মা ন:

বাংলাদেশ রাষ্ট্র বাঙ্গালী সংখ্যাগরিষ্ঠতার ফসল। পার্বত্য চট্টগ্রাম তারই ভৌগোলিক অঞ্চল। পার্বত্য চট্টগ্রামের অমুসলিম প্রধান অঞ্চল হওয়া মৌলিক নয়, কৃত্রিম। এ কারণেই ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগকালে এটি ভারতের প্রাপ্য বা স্বতন্ত্র অঞ্চলরূপে স্বীকৃতি লাভ করেনি।

ভারত বিভাগকালে সীমান্তবর্তী অঞ্চলসমূহের ভাগ্যে অনেক ওলট-পালট হয়েছে। পূর্ব পাঞ্জাবের অধীন গুরুদাসপুর জেলা সীমান্তবর্তী মুসলিম প্রধান অঞ্চলরূপে পাকিস্তানের প্রাপ্য ছিলো। কিন্তু কাশ্মীরের পক্ষে ভারতের সাথে যোগদানের সুযোগ বজায় রাখার প্রয়োজনে ভূমি সংযোগরূপে গুরুদাসপুরকে ভারতভুক্ত করে দেয়া হয়। ঠিক একই কারণে আসাম ও ত্রিপুরার সাথে ভারতের ভূমি সংযোগ রক্ষার প্রয়োজনে, পশ্চিম দিনাজপুর ও করিমগঞ্জ অঞ্চলকে ভারতের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এই দুই সংযোগ ঘটান না হলে কাশ্মীর হতো পাকিস্তানের বাধ্য অঞ্চল, এবং আসাম ও ত্রিপুরা হতো বাংলাদেশের দ্বারা বিচ্ছিন্ন বাধ্য এলাকা। পার্বত্য চট্টগ্রামের পক্ষে অনুরূপ ভূমি সংযোগ হওয়ার কোনরূপ ভৌগোলিক ও জাতিগত আনুকুল্য ছিলো না। এর উত্তরে অবস্থিত ত্রিপুরা ও পূর্বে অবস্থিত মিজোরাম দুর্গম পর্বতসংকুল সীমান্ত। এ পথে আসামের সাথে সংযোগ সাধন দুরুহ। জাতিগতভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামবাসী উপজাতীয়রা হলো বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত ও স্বতন্ত্র। স্থল যোগাযোগের দুরুহতা ও জাতিগত ভিন্নতা হেতু, এতদাঞ্চলের ভারতভুক্তি বিচ্ছিন্নতারই সহায়ক হবে বলে বিবেচিত হয়। সুতরাং চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অখন্ডতা, অর্থনৈতিক অভিন্নতা ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে রক্ষার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামকে সঠিকভাবেই বাংলাদেশভুক্ত রাখা হয়, যার কোন বিকল্প ছিলো না।

ভৌগোলিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম, মুল চট্টগ্রামেরই অংশ এবং লোক হিসেবে স্থানীয় উপজাতীয়রা জেলা ভাগের সুযোগে আকস্মিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মাত্র। তারা আদি চট্টগ্রামী মূলের লোক নয়। অভিবাসনের মাধ্যমে তারা হালে স্থানীয় অধিবাসী রূপে স্বীকৃত। মাত্র শত বছর আগে পার্বত্য অঞ্চল শাসন আইন ধারা নং ৫২ তথা পর্বতে অভিবাসন নামক আইন বলে তারা স্থানীয় অধিবাসী। তারা চট্টগ্রামী মৌলিকত্ব সম্পন্ন স্থানীয় আদি ও স্থায়ী অধিবাসীর মর্যাদা সম্পন্ন লোক নয়। এই বিচারে তাদের অগ্রাধিকার, বিশেষাধিকার, স্বায়ত্তশাসন বা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের দাবী অযৌক্তিক। তদুপরি এই প্রশ্নে তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ সংঘটন, একটি অমার্জনীয় রাজনৈতিক বাড়াবাড়ি।

সুতরাং তাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী বিবেচিত হয়। এই ব্যবস্থারই অংশ হলো এতদাঞ্চলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারকরণ ও রাষ্ট্রের স্বপক্ষ জনশক্তি বাঙ্গালীদের সংখ্যাগত প্রাধান্য রচনা। বাঙ্গালী বসতি স্থাপনকে তাই অবাঙ্গালী বিদ্রোহের বিকল্প ভাবাই সঙ্গত। এতে কারো বিরোধিতা ও আপত্তি উত্থাপন যৌক্তিক নয়। স্থানীয়ভাবে সেনাবাহিনীর অবস্থান প্রতিরক্ষামূলক। স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনযাপন তাদের হস্তক্ষেপের বিষয়বস্তু নয়। তাদের হস্তক্ষেপকে ঠেকাতে, সশস্ত্র উপজাতি বিদ্রোহের বিপক্ষে শান্তিস্থাপক সপক্ষীয় জনশক্তির উপস্থিতি প্রয়োজন। বাঙ্গালী বসতি সেই প্রয়োজনেরই সম্পূরক। এটা উপজাতীয় বৈরীতা নয়।

সেনাবাহিনীর দায়িত্বপালন সংক্রান্ত কঠোরতা তাতে হালকা হয়েছে। উপজাতীয় বিদ্রোহ দমাতে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বেসামরিক বাঙ্গালী জনশক্তি মোতায়েন নমনীয় ব্যবস্থা। যখন বাঙ্গালী বসতি স্থাপনের সূচনা হয়নি, বাংলাদেশের সেই শিশুকালে, উপজাতীয় বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়েছে। তখন দেশের অখন্ডতা রক্ষার প্রয়োজনে এতদাঞ্চলে সেনা মোতায়েন ছাড়া উপায় ছিলো না। তৎপর বিদ্রোহী পক্ষের সাথে আপোষ-রফামূলক আলোচনা ও বৈঠক হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। তাই সরকারী পর্যায়েই সিদ্ধান্ত হয় যে, সেনাবাহিনী কেবল সশস্ত্র দুষ্কর্মই ঠেকাবে। বিদ্রোহী জনশক্তির মোকাবেলায় স্বপক্ষ বাঙ্গালী জনশক্তিকে সংখ্যা ও সামর্থে জোরদার করে তুলতে হবে। সুতরাং উপজাতীয় বিদ্রোহেরই ফল সেনা মোতায়েন ও বাঙ্গারী বসতি স্থাপন। এই দুই শক্তির বিরুদ্ধে উপজাতীয় পক্ষের আপত্তি ও আন্দোলন এই প্রেক্ষাপটে যৌক্তিক নয়।

এখনো উপজাতীয় পক্ষ উগ্রতা, হিংসা, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি আর অরাজকতা ত্যাগ করে স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের ধারায় ফিরে এলে সেনাবাহিনীর পক্ষে তার ক্যাম্পে ফিরে যাবার পরিবেশ সৃষ্টি হবে এবং বাঙ্গালী জনস্রোতও থেমে যাবে। বাঙ্গালী পাহাড়ী শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সমঅধিকার নীতি প্রতিষ্ঠিত হলে, এতদাঞ্চলে শান্তি ও উন্নয়নের ধারা অবশ্যই জোরদার হবে। কেবল স্বপক্ষীয় সুযোগ-সুবিধা আর বিপক্ষ বৈরীতা, পার্বত্য অঞ্চলকে সংঘাতমুখর ও বিক্ষুব্ধ করে রেখেছে। বাঙ্গালীরা মুহুর্তে সব উপজাতীয় বৈরীতা ভুলে যেতে প্রস্তুত, যদি উপজাতীয় পক্ষ সকলের সমঅধিকার ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিকে তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্য রূপে গ্রহণ করে। সুতরাং পার্বত্য রাজনীতি খেলার ট্রাম কার্ড তাদের হাতেই নিহিত। অযথা সেনাবাহিনী আর বাঙ্গালী পক্ষকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।

অরাজক ও বিক্ষুব্ধ পার্বত্য অঞ্চল থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহৃত হলে, এতদাঞ্চলের শান্তি-শৃঙ্খলা আর অখন্ডতা রক্ষার দায়িত্ব কে পালন করবে? উপজাতীয় কোন জনসংগঠন সে দায়িত্ব পালনের উপযোগী আস্থা এখনো অর্জন করতে পারেনি। তারা নিজেরাও ঐক্যবদ্ধ নয়। বরং পরস্পর সংঘাত ও বৈরীতায় লিপ্ত। এটা ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের ধারক নয়। উপজাতীয়রা পরস্পর রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত ও সংঘাতে লিপ্ত। তারা গঠনমূলক রাজনীতির কোন উদাহরণ স্থাপন করতে পারেনি। দেশ ও জাতি তাদের প্রতি আস্থাশীল নয়। জাতীয় সন্দেহপ্রবণতাকে কাটাতে তাদের কোন রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মসূচী নেই।

উপজাতীয় দাবিও সংখ্যালঘু স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতেই বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ গৃহীত হয়েছে। এখন তারা তাতে স্থির নেই, বিকল্প জুম্ম জাতীয়তাবাদেই অনড়। তাদের আগ্রহেই উপজাতীয় সুবিধাবাদ গৃহীত হয়েছিলো। কিন্তু এখন তাদের লক্ষ্য জাতিসংঘ ঘোষিত আদিবাসী পরিচয় গ্রহণ। দেশ ও জাতি থেকে তারা কেবল গ্রহণেই অভ্যস্ত, কিছু দিতে নয়। তারা দেশ ও জাতির বিপক্ষে বৈরী শক্তিরূপে প্রতিভাত। এই বৈরী ভাবমূর্তি কাটাবার দায়িত্ব তাদের নিজেদেরই। এমনটা ঘটলেই তাদের পক্ষে জাতীয় আস্থা গড়ে ওঠা সম্ভব। কেবল উত্যক্ত করা, দাবী-দাওয়ার বহর বৃদ্ধি, আর নিজেদের স্বার্থকেই বড় করে দেখা, এই প্রবণতা, জাতীয় আস্থা ও সহানুভুতি গড়ে ওঠার অনুকূল নয়।

পার্বত্য বাঙ্গালীরা ঐ বাঙ্গালীদেরই অংশ, যারা গোটা দেশের শাসক শক্তি এবং তারা সংখ্যায় বাংলাদেশী জাতি সত্তার ৯৯%। সুতরাং পার্বত্য বাঙ্গালীদের সাথে সদ্ভাব সৃষ্টি, গোটা জাতিকে প্রভাবিত করারই সূত্র। এই বোধোদয় না ঘটা, উপজাতীয়দের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। বাঙ্গালীপ্রেমী সাধারণ উপজাতীয় লোক অবশ্যই আছেন, এবং এমন উদার মনোভাব সম্পন্ন সাধারণ উপজাতীয় লোকেরও অভাব নেই, যারা পাহাড়ী বাঙ্গালীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সম্প্রীতিকে গুরুত্ব দেন। কিন্তু এরা সংখ্যালঘু ও দুর্বল। এরা উপজাতীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন না। সমাজে এদের অবস্থান নিরীহ।

দেশ ও জাতি অনির্দিষ্ট দীর্ঘকাল অনুকূল উপজাতীয় বোধোদয়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারে না। ধ্বংসাত্মক উপজাতীয় শক্তিকে নিস্ক্রিয় ও নির্মূল করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। তজ্জন্য গৃহীত রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপকে শিথিল বা পরিত্যাগ করা যথার্থ নয়। সেনাশক্তি ও জনশক্তি মোতায়েনের অতীত নীতিকে পরিহারের কোন অবকাশ নেই। ইতিমধ্যে গৃহীত কোন শৈথিল্য ফলপ্রসু প্রমাণিত হয়নি। নতুবা এতোদিনে উপজাতীয় বিদ্রোহী শক্তি এক ক্ষুদ্র অপশক্তিতে পরিণত হতো, এবং পর্বতাঞ্চলে বাঙ্গালীরাই হয়ে উঠতো সংখ্যাগরিষ্ঠ। এমনটি ঘটানো ছাড়া এতদাঞ্চলে বাংলাদেশ নিরাপদ হবে সে আশা করা যায় না, আর একমাত্র তখনই উপজাতীয়রা হবে দেশ ও জাতির পক্ষে বাধ্য অনুগত। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রয়োজনে এমনটি ঘটান অন্যায় নয়। এমন শক্ত মনোভাব জাতীয় রাজনীতিতে থাকা আবশ্যক। তাই পার্বত্য নীতিতে বাঙ্গালী বসতি স্থাপন ও পূনর্বাসন পুনঃবিবেচিত হওয়া দরকার।

বাঙ্গালী বসতি স্থাপন ও পুনর্বাসন কাজ অসম্পন্ন আছে। তা বাস্তবায়ন না করা ক্ষতিকর। সরকারের এই দায় অপরিত্যজ্য। লক্ষ লক্ষ বাঙ্গালী সরকারী দায়িত্বহীনতার ফলে পর্বতের আনাচে-কানাচে ভূমিহীন, আশ্রয়হীন, বেকার। ভূমি দান ও পুনর্বাসনের অঙ্গীকারে তারা সরকারীভাবে এতদাঞ্চলে আনিত। এই অঙ্গীকার পালন করা সরকারের একটি দায়। নিরূপায় হয়ে ভূমি বঞ্চিত বাঙ্গালীদের অনেকেই সর্বোচ্চ আদালতে মামলা করেছে। কিন্তু ঐ মামলাগুলোর অগ্রগতি নেই। এমনি একটি মামলা হলো রীট নং-৬৩২৯/২০০১, যার শুনানীর দিন ধার্য্য ছিলো ২৫ আগস্ট ২০০৪ সে শুনানী অনুষ্ঠিত হয়নি। এছাড়াও আরো কয়েকটি রীট দায়ের করা আছে যেগুলোর মীমাংসা হচ্ছে না। তবে এই পথ ধরে একদিন বিষয়টির সুরাহা অবশ্যই হবে, সে আশায় নিঃস্ব পার্বত্য বাঙ্গালীরা আশান্বিত দিন যাপন করছে।

রাষ্ট্র কর্তৃক বাঙ্গালী পুনর্বাসন মানে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশী চরিত্র দান, উন্নয়নের অর্থ পশ্চাদপদতার অবসান ঘটান, সেনা নিয়ন্ত্রণের অর্থ অরাজকতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ, আর পার্বত্য চুক্তি হলো বিদ্রোহীদের গৃহবন্দি করার কৌশল। এগুলো রাষ্ট্র প্রবর্তিত কর্মসূচী। উপজাতীয়দের আনুগত্য প্রদর্শন ছাড়া এই কার্যক্রমের কোন ব্যতিক্রম হতে পারে না।

গত ১৬ জুন ২০০৪ তারিখে গৃহীত সরকারী সিদ্ধান্তটি পার্বত্য বাঙ্গালীদের অবশ্যই বিক্ষুব্ধ করবে। তারা সরকার কর্তৃক পুনর্বাসনের অঙ্গীকারে পার্বত্য চট্টগ্রামে আনিত, এবং নিরাপত্তার প্রয়োজনে আবাসত্যাগী ও গুচ্ছগ্রাম সমূহে পুনর্বাসিত। এই আনয়ন ও বসতি বন্ধকরণ ভুল হয়ে থাকলে, তার খেসারত ঐ বাঙ্গালীদের প্রাপ্য নয়। সরকারই নিজ ভুলের দায়িত্ব নিতে ও খেসারত দিতে বাধ্য। গুচ্ছগ্রামবাসী ও ভাসমান অন্যান্য পার্বত্য বাঙ্গালীরা স্বউদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি গড়েনি। তাদের কিছু সরকারীভাবে প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে, কিছু প্রেসিডেন্ট এরশাদের আমলে এবং বাদ বাকিরা বেসরকারীভাবে পাকিস্তান আমলে ও শেখ মুজিবের উৎসাহে বাংলাদেশ আমলের শুরুতে, এতদাঞ্চলে আনিত ও স্বউদ্যোগে বসতি স্থাপন করেছে। এরা রাষ্ট্রের স্বপক্ষীয় জনশক্তি। বিদ্রোহী উপজাতীয়দের বিপক্ষে এই সপক্ষীয় জনশক্তির প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রীয়ভাবে কাম্য।

১৯৮৬ সাল আমলে বিদ্রোহী শান্তিবাহিনীর মদদে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক আকার ধারণ করে। তাতে উপদ্রুত বাঙ্গালীরা মারমুখী হয়ে ওঠে এবং দাঙ্গা উপদ্রুত উপজাতীয়রাও বিপুল সংখ্যায় শরণার্থীরূপে ভারতমুখী হতে শুরু করে। এই বিরূপ পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বাঙ্গালীদের তাদের বাড়ি-ঘর ও জায়গা-জমি থেকে উঠিয়ে এনে সেনাক্যাম্প সমূহের আশপাশে গুচ্ছগ্রাম গড়ে বসবাস করতে দেন। বাড়ি-ঘর, জায়গা-জমি, ফল-ফসল ও রুজি-রোজগারচ্যুত এই গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙ্গালীরা হয়ে পড়ে সরকারী ত্রাণ নির্ভর। ঐ ২৬ হাজার গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙ্গালী পরিবারের দাবী হলো, তাদের পুরাতন বাড়ি-ঘর ও জায়গা-জমি ফেরত লাভ, নতুনভাবে পুনর্বাসন নয়। সরকারের দ্বারা প্রকৃত অবস্থার মূল্যায়ন হয়নি। তারা বাস্তবে আবাসিত ও পুনর্বাসিত পার্বত্য চট্টগ্রামবাসী লোক। তাদের স্থানীয় নাগরিকত্ব প্রশ্নাতীত। এদের প্রবীনরা এখানকার অর্ধ শতাব্দী ও তার আরো বেশি সময়ের বাসিন্দা এবং সন্তান-সন্ততিরা জন্মসূত্রে স্থানীয় অধিবাসী।

পর্বতবাসী এই বাঙ্গালীরা সরকার কর্তৃক বার বার বিভ্রান্ত হচ্ছে। এই বিভ্রান্তি সত্ত্বেও তারা স্বপক্ষীয় ভোট ব্যাংক বলে অনুমিত। তবে হালে তাদের ভুল ভাঙছে। একা বিএনপি নয় আওয়ামী লীগকেও তারা উপযুক্ত মূল্য দিতে এখন প্রস্তুত। তারা ভাবছে আওয়ামী লীগ তাদের চির শত্রু নয়। বহু সংখ্যক বাঙ্গালী মরহুম শেখ মুজিবের উৎসাহে এতদাঞ্চলে এসেছে ও বসতি গড়েছে। বিদ্রোহের বিরুদ্ধে প্রথম সেনা ছাউনীর প্রতিষ্ঠাতা হলেন শেখ মুজিব নিজে। আওয়ামী লীগ সরকার প্রধান শেখ হাসিনা, পার্বত্য চুক্তির বিরুদ্ধে বাঙ্গালীদের হরতাল পালনের দিন ঘোষণা করেছিলেন; একজন বাঙ্গালীকেও পার্বত্য অঞ্চল থেকে বিতাড়ন করা হবে না। তার সরকার সন্ত্রাস উপদ্রুত উদ্বাস্তু পাহাড়ী ও বাঙ্গালীদের সবাইকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছেন।

পুনর্বাসন তালিকায় গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙ্গালীরা অন্তর্ভুক্ত আছে। সরকার কর্তৃক সম্পাদিত পার্বত্য চুক্তিতে সাংবিধানিক ব্যবস্থার পক্ষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ায়, বাঙ্গালীদের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়েছে। সুতরাং পার্বত্য বাঙ্গালীদের একমাত্র মিত্র সংগঠন বিএনপি নয়, আওয়ামী লীগও তাদের মিত্রের মর্যাদা প্রাপ্ত দল।
এটা কৃতজ্ঞতার বিষয় যে, প্রেসিডেন্ট জিয়া, শেখ মুজিব ও এরশাদ বাঙ্গালীদের সরকারীভাবে পার্বত্য অঞ্চলে আবাস দান করেছেন। তবে এটাও প্রশংসনীয় কাজ নয় যে, ঐ সরকারগুলো জায়গা-জমি বন্দোবস্তি ও হস্তান্তর বন্ধ করে দিয়েছেন। তারা পার্বত্য চুক্তির আপত্তিজনক দফাগুলো বাস্তবায়নে আগ্রহী, গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙ্গালীদের সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার দানে নিষ্ক্রিয়, এবং বিদ্রোহী উপজাতীয় পক্ষের তোষামোদে লিপ্ত। এই পরিস্থিতিতে পার্বত্য বাঙ্গালীরা নতুন মিত্র খুঁজতে বাধ্য।

আবার বলি, বাংলাদেশ রাষ্ট্র বাঙ্গালী সংখ্যাগরিষ্ঠতার ফসল। পার্বত্য চট্টগ্রাম তারই ভৌগোলিক অঞ্চল। পার্বত্য চট্টগ্রামের অমুসলিম প্রধান অঞ্চল হওয়া মৌলিক নয়, কৃত্রিম। এ কারণেই ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগকালে এটি ভারতের প্রাপ্য বা স্বতন্ত্র অঞ্চলরূপে স্বীকৃতি লাভ করেনি।

♦ আতিকুর রহমান পার্বত্য বিষয়ক গবেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা এবং উপদেষ্টা, পার্বত্যনিউজ ডটকম।