আরাকান আর্মির হামলায় ৩০ বার্মিজ সেনা নিহত: সীমান্তে সেনা-বিজিবি বিশেষ অভিযান

বার্মিজ সেনা

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

মিয়ানমারের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি দাবী করেছে তাদের অতর্কিত হামলায় ৩০ বার্মিজ সেনা সদস্য নিহত হয়েছে। যদিও মিয়ানমার সরকার বা সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এ প্রাণহানীর বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। ৩ মার্চ বিকাল ৫ টার দিকে আরাকানের বুচিডং নামক স্থানে সংঘটিত ওই সংঘর্ষে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দুইটি ট্রাকও ভষ্মিভূত হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে এই হামলার পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সেদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অপারেশন শুরু করেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যেন সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়তে না পারে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা বিজিবি চট্টগ্রাম অঞ্চল কমান্ডারকে অনুরোধ জানায়। বিজিপি’র আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিজিবি ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে যাতে সেদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তাড়া খেয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়তে না পারে।

খিং থুখা নামে আরাকান আর্মির এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ৫৬ লাইটেনিং ব্যাটালিয়নের একটি কনভয়ের উপর আরাকানের বুচিডং টাউনশিপের কাছে এম্বুশে আরাকান আর্মির ৫ম ব্রিগ্রেডের একটি দল রকেট প্রপেলড গ্রেনেড লঞ্চারসহ ভারী অস্ত্র দ্বারা হামলা করে এই সেনাসদস্যদের হত্যা করে। এসময় আরো বেশ কিছু সেনাসদস্য আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। নিহত সেনা সদস্যদের মধ্যে মেজর ও ক্যপ্টেন পদমর্যাদার দুইজন অফিসার রয়েছে বলে জানা গেছে। এসময় তাদের হামলায় সেনাবাহিনীর দুইটি ট্রাক ভষ্মিভূত হয়।

খিং থুখা আরো জানান, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১ মার্চ, ২ মার্চ ও ৩ মার্চ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে আরাকান আর্মির ৫ম ব্রিগ্রেডের কয়েকদফা সংঘর্ষ হয়। ফলে সেনাবাহিনী অত্র এলাকায় অতিরিক্ত শক্তিবৃদ্ধি করে। তারা সেনাবাহিনীর এই বাড়তি শক্তি ধংস করে দিতে সক্ষম হয়েছেন বলে তার দাবী।

মুখপাত্র দাবী করেন, সেনাবাহিনীর সাথে বন্দুক যুদ্ধে আরাকান আর্মির বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হওয়ার প্রতিক্রিয়া হিসাবে তারা এই অতর্কিত হামলা চালায়।

বৃহস্পতিবার বুথিডঙের একটি আদালত আরাকান আর্মির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪ ব্যক্তির ফাঁসির রায় দিয়েছে।এই নিয়ে ২০১৫ সাল থেকে মিয়ানমারের বিভিন্ন স্থানে ৩০ জনকে একই অভিযোগে শাস্তি দিয়েছে আদালত।

এদিকে উক্ত ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ৮ মার্চ থেকে বান্দরবানের মায়ানমার সীমান্তে সেনা-বিজিবির আবারো যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনী ও বিজিবি’র প্রায় আড়াইশত সদস্য এই অপারেশনে অংশ নিয়েছে বলে জানা গেছে।

মায়ানমারের আরাকান রাজ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতা ঠেকাতে আলীকদমের পুয়ামুহুরী সীমান্তের ৬২ নং পিলার থেকে শুরু করে ৬৮ নং পিলার পর্যন্ত এলাকায় চলছে এই অভিযান।

সীমান্ত দিয়ে যাতে মায়ানমারের কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী এদেশে অনুপ্রবেশ করতে না পারে সে লক্ষে সীমান্তে চিরুনী অভিযান চালানো হচ্ছে বলে।

সন্ত্রাসীরা যাতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না পারে সে জন্য মায়ানমার সরকার বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তা চেয়েছে। মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া অভিযানে সেনাবাহিনীর হেলিকাপ্টারে করে সীমান্তে বিপুল সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবি’র কর্মকর্তরা জানিয়েছেন, সীমান্ত অনেকটাই সিল করে দেয়া হয়েছে। যাতে কোন সন্ত্রাসীই এদেশে প্রবেশ করতে না পারে।

উল্লেখ্য গত বছরের ২৬ আগষ্ট বান্দরবানের থানচি উপজেলার বড় মদক এলাকায় নাছালং পাড়ায় আরাকান আর্মির সদস্যরা বিজিবির উপর গুলিবর্ষণ করলে ২ বিজিবি সদস্য আহত হয়। অন্যদিকে রাঙ্গামাটির বড় থলি এলাকার সেপ্রু পাড়ায় আরাকান লিবারেশন আর্মির (এএলপি) সদস্যদের হামলায় ১ আনসার ভিডিপি সদস্য নিহত হয়। সন্ত্রাসীরা ঢাকার দুই পর্যটককে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এখনো তাদের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।

রাঙামাটিতে আরাকান আর্মি অভিযুক্ত ২আসামির এক মামলায় অব্যাহতি

Rangamati Armi kriminal Arest pic 1

স্টফ রিপোর্টার:

রাজস্থলীতে আটক মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সদস্য হিসেবে অভিযুক্ত দু’আসামিকে এক মামলায় অব্যাহতি দিয়েছে রাঙামাটি আদালত। আসামিরা হলেন, মং সু অং মারমা (৩৯) ও জো সো অং মারমা (৪২)।

বুধবার বেলা ১২টায় রাঙামাটির অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাবরিনা আলীর আদালতে আসামিদের হাজির করা হলে আদালত অবৈধ অনুপ্রবেশ ও বিদেশি নাগরিক সম্পর্কিত আইনের মামলা থেকে তাদের অব্যাহতি দেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে বিদেশি মূদ্রা পাচার ও সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা থাকার কারণে আসামিদের আবারও কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।

রাঙামাটি আদালতের পুলিশ পরিদর্শক মোমিনুল ইসলাম জানান, বুধবার বেলা ১২টায় রাঙামাটির অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাবরিনা আলীর আদালতে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নেতা ডা. রেনিন সোয়ে মারমা তাঁর সহযোগী অং ইউ ইয়াং রাখাইন ও দু’কর্মচারী মং সু অং মারমা ও জো সো অং মারমাকে রাঙামাটির অতিরিক্ত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাবরিনা আলীর আদালতে হাজির করা হয়।

এ সময় আসামিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সন্ত্রাস দমন, বিশেষ ক্ষমতা আইন ও বিদেশি নাগরিক সম্পর্কিত আইনের মামলায় রাঙামাটির ৮জন আইনজীবী আসামি পক্ষে জামিন আবেদন করেন। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আসামিদের জামিন আবেদন বিরোধীতা করা হলে আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগপত্র গ্রহণ করে। শুধুমাত্র বিদেশি নাগরিক সম্পর্কিত আইনের মামলা থেকে দুই কর্মচারীকে অব্যাহতি দেন। তবে আরও দু’মামলার আবেদন জামিন নামঞ্জুর করে তাদের আবারও রাঙামাটি কারাগারে পাঠানো নির্দেশ দেন। এ সময় আসামী ডা. লেলিন ও অং ইউ ইয়াং জামিনও নামঞ্জুর করা হয়। আদালত আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি মামলার পরবর্তী তারিখ ধায্য করেন।

এর আগে পরে কড়া পুলিশ নিরাপত্তায় আসামিদের রাঙামাটি কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

প্রসঙ্গত, ২০১৫সালে ২৭ আগস্ট রাঙামাটি জেলার রাজস্থলী উপজেলায় গাইন্দ্যা ইউনিয়নের তাইতংপাড়া কলেজগেট এলাকায় স্থানী ডা. রেনেই জু মারমা বাড়ি থেকে অভিযান চালিয়ে দু’হাতের কর্জি ছাড়া মিয়ানমারের নাগরিক ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সহযোগী অং ইউ ইয়াং রাখাইনকে আটক করে যৌথবাহিনীর দল। পর ২৮ আগষ্ট ওই গ্রুপের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে রাজস্থলীর গাইন্দ্যা ইউনিয়নের মুগ্ধপাড়া পূনর্বাসন এলাকা থেকে রহস্যময় সুরম্য বাড়িটির কর্মচারী চ সুই অং মারমা ও মংস ওয়াং মারমাকে আটক করা হয়।

এ ঘটনায় রাজস্থলী থানায় তাদের বিরুদ্ধে পৃথক ৩টি মামলা করে রাজস্থলী উপজেলা থানা পুলিশ। প্রথম বৈধ অনুপ্রবেশ ও বিদেশি নাগরিক আইনের মামলা ও সন্ত্রাস দমন আইনে মামলায় ও বিদেশি মূদ্রা পাচার মামলা করা হয়। সে সময় তাদের রিমান্ডেও নেয় পুলিশ। তাঁদের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে বেরিয়ে আসে ডা. রেনিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন তথ্য। এ ঘটনার পর আটক করা হয় ডা. রেনিনকে। তার বিরুদ্ধে রাঙামাটি রাজস্থলী থানায় দায়ের করা হয় পৃথক ৩টি মামলা।

বহুল আলোচিত আরাকান আর্মি ‘নেতা’ ডা. রেনিন সোয়ের রহস্যময় জীবন

390781_242972929103146_1338977904_n

স্টাফ রিপোর্টার:

ডা. রেনিন সোয়ে তালুকদার। বাংলাদেশের মিডিয়ায় তিনি আরাকান আর্মির নেতা হিসাবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছেন। কিন্তু আসলে কে এই রেনিন সোয়ে? কি তার আসল পরিচয়- এ নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। তার পরিচয় বের করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও হতে হচ্ছে গলদঘর্ম। রাঙামাটি জেলার রাজস্থলীর প্রত্যন্ত এলাকায় সুরম্য অট্টালিকা, বাড়ির চারপাশে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরাসহ বিশেষ ধরণের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, হাতে স্যাটেলাইট ফোন, দামী দামী গাড়ি, কখনো ডাক্তার, কখনো ব্যবসায়ী, কখনো খনিজ সম্পদ কোম্পানী কর্মকর্তা, কখনো এনজিও কর্মকর্তা নানা পেশাজীবী পরিচয় রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মন্ত্রী এমপি থেকে শুরু করে বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী ও সমাজের নেতাদের সাথে তার একান্ত সমপর্ক রয়েছে। অনেকের কাছেই তিনি দানবীর।  বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে তার সম্পর্ক রয়েছে। তাদেরকে তিনি রাঙামাটিতে নিয়ে আসতেন। সম মিলিয়ে রাঙামাটির এক রহস্যময় পুরুষ তিনি। এই রহস্য ঘিরেই স্থানীয়দের মাঝে সৃষ্টি হয়েছিল আগ্রহ। সকলের সাথে এতোই অমায়িক ব্যবহার করতেন যে কারো মনে কখনো খারাপ কিছু আসেইনি।

তবে গত ২৭ আগস্ট বান্দরবানের থানচি উপজেলার বড় মোদকে বিজিবি’র উপর মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ আরাকান আর্মি আক্রমণ করলে সেনাবাহিনী এই ঘরটি ঘিরে ফেলে আটক করে রেনিন সোয়ে এক সহযোগীকে আটক করে। তার কাছ থেকে বাড়ির মালিক ডা. রেনিন সোয়ের নাম ও পরিচয় জানা গেলে রাতামাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন তিনি। বহুল আলোচিত আরাকান আর্মির নেতা ডা. রেনিন সোয়ের রয়েছে এক বিশাল বর্ণাঢ্য ও রহস্যময়। পার্বত্যনিউজ অনুসন্ধান করে তার রহস্য ও বর্ণাঢ্যময় জীবনের কিছু তথ্য জানতে পেরেছে।

rennin soe

তার পুরো নাম ডা. রেনিন সোয়ে তালুকদার। জন্মসূত্রে রাখাইন ও বুদ্ধিস্ট। গণমাধ্যমে তাকে মিয়ানমারের নাগরিক হিসাবে উপস্থাপন করা হলেও তিনি নিজে বরাবরই সে সকল দাবী প্রত্যাখ্যান করে দাবী করেছেন তিনি মিয়ানমারের নয় বাংলাদেশের নাগরিক। প্রমাণ হিসাবে তিনি সামাজিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের জন্মসনদ উপস্থাপন করেন। জন্মসনদ ছাড়াও তার বাংলাদেশী পাসপোর্ট রয়েছে- যা ১৪ অক্টোবর আটক হওয়ার সময় জব্দ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার বাংলাদেশী পাসপোর্ট ও জন্মসনদের সত্যতা নিয়ে সন্দিহান।

জন্ম সনদ অনুয়ায়ী ১৯৬৯ সালের ৭ জানুয়ারী রাজস্থলীর কলেজ পাড়ায় তার জন্ম। তার পিতার নাম উ সান সোয়ে তালুকদার মিয়ানমারে মারা যান। মাতার নাম মা তুন সেইন তালুকদার। ১০-১২ বছর পূর্বে রাঙামাটির রাজস্থলীতে মারা যান। রেনিন সোয়ের শৈশবের কিছুকাল কাটে পটুয়াখালীর রাখাইন পল্লীতে। তবে তার পরিবার কিভাবে বা কেন পটুয়াখালীতে গিয়েছিলেন সে কারণ জানা যায়নি। ১৯৭০-৭১ সালের দিকে সোয়ের পরিবার পটুয়াখালী থেকে মিয়ানমারের স্যালুলে গমণ করেন। তার পূর্ব পুরুষেরা মিয়ানমারের নাগরিক। সেইসূত্রে সেখানে তাদের সম্পদ ও সম্পত্তিও ছিল। সোয়ে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে স্কুল পর্যায়ে পড়াশোনা করে ইয়াঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিবিএস পাস করেন। ১৯৯০ সালে অং  সাং সুকির দল এনডিপিকে বার্মিজ সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর না করলে সামরিক সরকার বিরোধী আন্দোলনের সাথে তিনি যোগদান করেন। এভাবেই  তিনি মিয়ানমারের গনতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন।

রেনিন সোয়ে 1

ছাত্রাবস্থায় মায়ানমারের একাধিকবার তিনি রাজনৈতিক কারণে কারাবরণ করেন।  কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৯০ সালের দিকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে রাঙামাটিতে বসবাস শুরু করেন ডা. রেনিন সোয়ে। ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের পেট্রোবাংলার  ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার হিসেবে সিলেটে কর্মরত ছিলেন বলে তিনি দাবী করেছেন। জানা যায়, ১৯৯৭ সালে গ্যাসের খনির সন্ধানের কথা বলে তিনি রাজস্থলীতে আসেন।  ১৯৯৮ সালে তিনি রাঙামাটিতে অংসাই প্রু মারমার মেয়েকে বিয়ে করেন। তার স্ত্রীর নাম হাসি নু মারমা। তার দুইটি কন্যা সন্তান রয়েছে। বিবাহের পর থেকে তিনি রাজস্থলীতে আসতেন এবং লোকজনকে বলতেন, তিনি বিদেশের একজন চিকিৎসক। এভাবেই তিনি নানা পরিচয়ে আড়ালে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন রাঙামাটিতে অবস্থান করেন।

২০০৪ সালের দিকে রাজস্থলী তাইতং পাড়া কলেজ সংলগ্ন এলাকার পশ্চিম তাইতং পাড়া কার্বারি রেনেজু রাখাইন এর শালিকার জামাতা অনুমং মারমার নিকট থেকে ৫০ শতক জায়গা ক্রয় করে আনুমানিক তিন কোটি টাকা খরচ করে তিনতলা বিশিষ্ট বিলাসবহুল বাড়িটি নির্মাণ করেন। কিন্তু বর্তমান তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, জায়গাটি এখনো অনুমং মারমার নামেই রয়েছে। বাড়িটিতে ঢুকতে এবং গেস্টরুমে রয়েছে দুইটি অত্যাধুনিক আইপি সিস্টেম সিসি ক্যামেরা। গত কয়েকমাস আগে রাজস্থলী উপজেলার প্রায় ২০০ ভান্তে নিয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রবজ্জ্যা পালন করেন। যেটি একটি ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান। সেখানে বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ২-৩ হাজার মানুষকে আপ্যায়ন করেন। অথচ উপজেলার অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি অনূষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন না। তিনি ২০০১ সালে বাংলাদেশ থেকে নেদারল্যান্ড গমন করেন। সেখানে নিউরো সার্জারি বিষয় পড়াশুনা করেন। এসময় তিনি নেদারল্যান্ডের নাগরিকত্ব লাভ করেন। ২০০৬ সালে তিনি স্ত্রী সন্তানদের নেদারল্যান্ড  নিয়ে যান। তার স্ত্রী নেদারল্যান্ডের একটি ব্যাংকে চাকরী করেন এবং সন্তানদের নিয়ে সেখানেই বসবাস করেন।

125624

আরাকান আর্মি নেতা হিসাবে তাকে বলা হলেও তিনি এ বাহিনীর কোনো নেতা নন। বরং ২০১৪ সালে রেনিন সোয়ে আরাকান আর্মির এডভাইজার নিযুক্ত হন। তার ইউরোপীয় কানেকশেনের জন্যই আরাকান আর্মি তাকে এ পদে নিয়োগ দেয়। বাংলাদেশে থাকলে বেশিরভাগ সময় তিনি ঢাকাতেই থাকতেন বলে তার দাবী। বাংলাদেশ বিজনেস সেন্টার বা বিবিসি নামে তার একটি ব্যবসা কোম্পানী রয়েছে। তবে এ বিষয়ে অধিক কিছু জানা যায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন মন্ত্রী, এমপি. রাজা, আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের প্রধানসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে তার দহরম মহরম ছিল। এ সম্পর্কের কিছু ছবি তিনি নিজেই তার ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে কৌশলগত কোনো বিনিময় ও সহযোগিতা ছিল কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে রেনিন সোয়ে’র বাড়ি থেকে উদ্ধারকৃত ল্যাপটপ থেকে পাওয়া এক চিঠিতে দেখা গেছে, তিনি এম এন লারমা নামে পার্বত্য জন সংহতি সমিতির এক শীর্ষ নেতার কাছে নিজেকে আরাকান আর্মির নেতা পরিচয় দিয়ে লিখেছেন।

পডসস

চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ২৪ জুলাই ২০১৫ তারিখে আরাকান আর্মির সদস্য আই থোয়াইকে শান্তি বাহিনীর সদস্য সাই থোয়াই আটক করে তার উপর নির্যাতন চালিয়েছে। তার উপর নির্যাতন না চালিয়ে তাকে ছেড়ে দিয়ে আরাকান আর্মির সাথে সহাবস্থান নিশ্চিত করার জন্য আহ্বান করা হয়। অন্যথায় পিসিজেএসএসকে পরিণতি ভোগ করার হুমকিও দেয়া হয়েছে চিঠিতে। চিঠিটি এম এন লারমার কাছে পাঠানো হলেও এমএন লারমা অনেক আগেই মারা গেছে। তবে এমএন লারমা সাংকেতিক নাম দিয়ে পিসিজেএসএস’র কোনো শীর্ষ নেতার কাছে পাঠানো হয়েছে বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা। এতে প্রমাণিত হয় পিসিজেএসএসের কোনো কোনো নেতা রেনিন সোয়ের আরাকান আর্মির সম্পৃক্ততা জানতো।

উল্লেখ্য, গত ২৫ আগস্ট বান্দরবানের থানচির তিন্দু ও আন্দারমানিক এলাকায় আরাকান আর্মির জন্য ক্রয়কৃত দুই দফায় ১৩টি ঘোড়া আটক করে বিজিবি। এ ঘটনার জের ধরে ২৭ আগস্ট সকালে বড় মদকের দোলিয়ান পাড়া বিজিবি ক্যাম্পে মিয়ানমারের আরাকান আর্মি (এ, এ) সদস্যরা হামলা চালায়। এতে জাকির হোসেন ও আহম্মদ গনি আহত হন। বিজিবির সদস্যরাও পাল্টা গুলি এবং মর্টারশেল ছোঁড়েন। বিমান বাহিনীর ৫টি হেলিকপ্টার ও জঙ্গী বিমান এ হামলায় ব্যবহৃত হয়। পরে সেনাবাহিনী ও বিজিবির তীব্র প্রতিরোধের মুখে সন্ত্রাসীরা পিছু হটে।

এ ঘটনার পর আলোচনায় আসেন ডা. রেনিন সোয়ে। জানা যায়, রেনিন সোয়ে আরাকান আর্মির জন্য এই ঘোড়াগুলো ক্রয় করে বান্দরবানে পাঠিয়েছিলেন। একই দিন অর্থাৎ ২৭ আগস্ট গোপন সূত্রে খবর পেয়ে সেনাবাহিনীর একটি দল রাজস্থলীর কলেজ পাড়া এলাকার স্থানীয় রেনিন সোয়ের বাসায় অভিযান চালায়। এসময় তাকে আটক করা না গেলেও মিয়ানমারের নাগরিক ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সহযোগী অং ইউ ইয়াং রাখাইনকে আটক করে সেনাবাহিনীর দলটি। বাড়ীতে তল্লাশী চালিয়ে তিনটি আরাকান আর্মির পোশাক, পোশাক তৈরির ৩০ গজ কাপড়, তিনটি ল্যাপটপ, মোডেম, দুইটি ডিজিটাল ক্যামেরা, একটি হেন্ডিক্যাম, দুইটি ঘোড়া, তিনটি মটরসাইকেল, মোবাইল ও পার্সপোট পাওয়া যায়।

ঐ দিন ডা রেনিন সোয়েসহ তার সহযোগি ও কেয়ারটেকারের বিরুদ্ধে রাজস্থলী থানায় সন্ত্রাস দমন আইন ও অবৈধ অনুপ্রবেশ আইনে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। ঐ দুই মামলার পলাতক আসামী ছিলেন ডা. রেনিন সোয়ে।

rennin

জানা যায়, আটকের আগ মুহুর্তে রেনিন সোয়ে তার বাড়ি থেকে পালাতে সক্ষম হন। এর পর তিনি বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমে বিবৃতি, ছবি, ডকুমেন্ট ও ভিডিওবার্তার মাধ্যমে তার কাজের সপক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা করেন। ভাইবার ও স্কাইপি’র মাধ্যমে একাধিক বার্তা সংস্থার কাছে স্বাক্ষাৎকার দেন। তিনি পার্বত্যনিউজকেও একটি সাক্ষাৎকার দেন যা অনিবার্য কারণে প্রকাশ করা হয়নি।  একটি স্যাটেলাইট ফোন নম্বরের মাধ্যমে সংযুক্ত হয়ে তিনি গণমাধ্যমকে নিজের অবস্থান সম্পর্কে জানান, তিনি চীনে অবস্থান করছেন। তার এই দাবী সংশ্লিষ্ট কেউই বিশ্বাস করেনি। তবে তিনি ঠিক কোথায় অবস্থান করছিলেন তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। কারো মতে, এই সময়ে তিনি ভারতের দিল্লীতে গিয়ে আবার ফিরে আসেন। আবার কারো মতে, বেনপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে যাবার চেষ্টা করেও তিনি সফল হননি।  চলমান রিমান্ডে তার সঠিক অবস্থান জানা যাবে। এভাবে দীর্ঘ দেড় মাস পলাতক থাকার পর মঙ্গলবার ভোর রাতে পুলিশ ও বিজিরি হাতে রাজস্থলীতে আটক হন তিনি।

১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার রাত প্রায় সাড়ে তিন টায় দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বর্ডার গাড বাংলাদেশ বিজিবির মেজর শাব্বির আহমেদ, মেজর কামাল পাশা ও রাজস্থলী থানার পুলিশসহ যৌথ অভিযান চালিয়ে ইসলামপুরের একটি নির্মানাধীন মসজিদ আত্মগোপন করে থাকা অভিযুক্ত মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরাকান আর্মীর নেতা রেনিন সুয়ে মারমাকে আটক করা হয়েছে। এসময় তল্লাশী চালিয়ে তার কাছ থেকে ৫০টি ৫০০ টাকার নোটের ভারতীয় রুপি, বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডের পার্সপোট, একটি ল্যাপটপ কম্পিউটার,  ২টি মোবাইল সেট, তিনটি ক্রেডিট কার্ড আর একটি ব্যাগে ব্যবহৃত পোশাক উদ্ধার করা হয়েছে। আটকের পর বুধবার সন্ধ্যায় পুলিশ আরাকন আর্মির নেতা ডা. রেনিন সোয়েকে আদালতে হাজির করে তার বিরুদ্ধে ১০দিনের রিমান্ডের আবেদন করে। তবে রাঙামাটি জজ আদালতের অতিরিক্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট সাবরিনা আলী’র শুনানী শেষে ৫দিনে রিমান্ড আদেশ প্রদান করেন। বর্তমানে তিনি রিমান্ডাধীন।