আদিবাসী বিতর্কের শুরুটা যেভাবে

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক- ৬

মাহবুব মিঠু

মাহবুব মিঠু:

পার্বত্য সমস্যার এক সুদীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক পটভূমি রয়েছে। আগের একটা পর্বে উল্লেখ করেছিলাম, আদিবাসী দাবীদার ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর আগমন ঘটে মাত্র কয়েক পুরুষ আগে ভারত এবং মিয়ানমার থেকে। আমাদের পার্বত্য অঞ্চলে তারও আগে থেকে বাঙালীরা বসবাস করে আসছিলেন। যদিও সংখ্যার দিক দিয়ে কম ছিল। ওখানকার সমস্যার উৎপত্তির মনস্তাত্ত্বিক কারণ অনুসন্ধান করলে এই ‘অভিবাসনের’ ভূমিকা আছে। এখনো এদের শেঁকড় রয়েছে ঐ দুই দেশের মাটিতে। পূর্ব পুরুষদের স্মৃতি, তাদের ঐতিহ্য, অনেকটাই ওখানে। শেঁকড়ের টানের প্রথম প্রতিফলন ঘটে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময়। এরা চেয়েছিল, যেখান থেকে এসেছে, সেই দেশের মানচিত্রে থাকতে। শুরু থেকেই তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্ন থাকার এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সে কারণে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তানের সব জায়গাতে পাকিস্তানের পতাকা উড়লেও ১৫ আগষ্ট বান্দরবনে মায়ানমারের (তৎকালীন বার্মা) পতাকা এবং রাঙ্গামাটিতে ভারতীয় পতাকা ওড়ে। ১৭ আগস্ট দেশ বিভাগের মানচিত্র পরিস্কার হলেও প্রায় এক সপ্তাহ জুড়ে ওখানে তারা যথাক্রমে দুই দেশের পতাকা টাঙিয়ে রাখে। ২১ আগস্ট পাকিস্তানী সৈন্যরা বাধ্য করে মায়ানমার এবং ভারতীয় পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানী পতাকা তুলতে।

ভারত এবং মিয়ানমারমুখী মনোভাবের প্রভাবে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে পাক শাসকদের সাথে তাদের সম্পর্কের কিছুটা টানাপোড়েন চলে। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের সংকট থেকে তৎকালীন পাকিস্তানী শাসকরা সিদ্ধান্ত নেয়, সমতল থেকে বাঙালী নিয়ে ওখানে পুনর্বাসন করা। তাদের ধারণা ছিল, পাহাড়ীরা ঐ এলাকায় সংখ্যাগুরু থাকলে যে কোন সময় দেশের অখণ্ডতার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখা দেবে। এছাড়াও পাহাড়ী সমস্যাকে আরো তীব্র করতে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের একটা ভূমিকা আছে। আমেরিকার অর্থায়নে রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলায় অবস্থিত কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে বাঁধ নির্মাণের কাজ ১৯৫২ সালে শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৫৮ সালে। যান্ত্রিক ত্রুটির ফলে বাঁধ ভেঙ্গে পড়লে পুণরায় কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৬২ সালে। এই বাঁধ নির্মাণের সময় প্রায় এক লাখ স্থানীয়দের বসতভিটা ছাড়তে হয়। প্রায় ৪০ ভাগ আবাদী জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। কাপ্তাই বাঁধের প্রভাবে পানিতে ডুবে যায় চাকমা রাজার প্রাসাদ, যার সাথে তাদের আবেগ জড়িত। সম্ভবত ১৯৯৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে একবার রাঙামাটি গিয়েছিলাম। তখনো চাকমা রাজার বাড়ীর মাথাটা কোন মতে পানির উপর মাথা উঁচু করে টিকে ছিল। পরে শুনেছি (নিশ্চিত নই), চিরতরে পানির নিচে বিলীন হয়ে যায়।

এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে দেশটা স্বাধীন হোল। সেই যুদ্ধে পাহাড়ীরাও অংশ নেয়। বাঙলাদেশে বাঙালী ছাড়াও আরো অন্ততঃ ৫৪টা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বার অস্তিত্ব আছে। পাহাড়ী তিনটি জেলা বাদে অন্যান্য ৩০টিরও বেশী জেলায় তাদের বাস।

অক্টোরব, ১৯৭২। স্বাধীন বাঙলাদেশের যে সংবিধান রচনা করা হোল সেখানে বাঙালী বাদে বাকী সবাইকে অস্বীকার করা হয়। সংবিধানের ৩ নং ধারায় বলা হলো: ”বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে, বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবে।”

এর প্রতিবাদে ওয়াক আউট করেছিলেন পাহাড়ী অঞ্চলের একমাত্র প্রতিনিধি মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা। এরপর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে রাঙ্গামাটি সফরে গেলে ১৫ ফেব্রুয়ারী পার্বত্য চট্টগ্রাম গণপরিষদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা নিচের ৪টি দাবী পেশ করেন,

  • ১) পাহাড়ের স্বায়ত্বশাসন
  • ২) পার্বত্য এলাকার জন্য ১৯০০ সালের ম্যানুয়েল অব্যাহত রাখা
  • ৩) তিন জাতির চীফের দপ্তর বিলুপ্তি না করা এবং
  • ৪) ঐ এলাকায় বাঙালী অনুপ্রবেশ রোধ করা।

সব শুনে মুজিব বললেন, ‘লারমা তুমি যদি বেশি বাড়াবাড়ি করো তাহলে এক লাখ, দুই লাখ, তিন লাখ, দশ লাখ বাঙালি পার্বত্য চট্টগ্রামে ঢুকিয়ে দেব। পার্বত্য চট্টগ্রামে আমি তোমাদের সংখ্যালঘু করে ছাড়ব।’  (সূত্রঃ পার্বত্য শান্তিচুক্তিঃ বর্তমান প্রেক্ষিত, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।)

১৯৭৩ সালে শেখ মুজিব পাহাড়ীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “তোরা সব বাঙালী হয়ে যা”। এটা ছিল  আক্ষরিক অর্থে এক বর্ণবাদী আহবান। বাঙলাদেশ স্বাধীন হবার পরে এভাবেই পাহাড়ে গোলযোগের সূত্রপাত হয়।  ফলশ্রুতিতে, ১৯৭৩ সালে শান্তিবাহিনী গঠনের মাধ্যমে শুরু হোল সশস্ত্র  আন্দোলন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে ১৯৭৮ সালে The Proclamations (Amendment) order,1978-এ Citizenship এর মাধ্যমে সংবিধানের বর্ণবাদী অংশটুকু পরিবর্তন করেন, “The citizens of Bangladesh shall be known as Bangladeshis.” কিন্তু বিচ্ছিন্নতার যে বীজ ইতিমধ্যে রোপিত হয়ে গেছে, সংবিধানের এই পরিবর্তনে কোন লাভ হয়নি। অন্ততঃ এই সংশোধনীর মাধ্যমে পবিত্র সংবিধান বর্ণবাদী কলঙ্ক থেকে রক্ষা পায়।

জিয়া ক্ষমতায় এসে ১৯৭৯ সালে ’পপুলেশন ট্রান্সফার’ এর আওতায় প্রায় ৪ লাখ সমতল অঞ্চলের নদী ভাঙ্গনের বাঙালীদের পুনর্বাসনের জন্য পাহাড়ী অঞ্চলে বসতি স্থাপন করায়। এতে পাহাড়ীরা ক্ষুব্ধ হয় এবং আরো জোরোশোরে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। তখন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত থেমে থেমে বহু ’বাঙালী/বাংলাদেশীকে’ হত্যা তারা করেছে। আমাদের দেশের অধিকাংশ পত্রিকা এবং কিছু সুশীল সমাজ পাহাড়ীদের বিচ্ছিন্নতাবাদকে উস্কে দিতে গিয়ে অন্য পক্ষের সন্ত্রাসকে প্রায়শই গোপন রাখে। এরফলে সেখানকার বাঙালী বসতি স্থাপনকারীরা ক্ষুব্ধ এবং তারাও মাঝে মাঝে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে পাহাড়ের বুকে অশান্তি সৃষ্টি করে। এই সকল পত্রিকা এবং বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী পাহাড়ী-বাঙালীদের মধ্যকার সম্পর্কোন্নয়নে কাজ না করে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টিতে সদা তৎপর। শাহরিয়ার কবিরতো তার এক লেখায় আকারে ইঙ্গিতে বুঝাতে চেয়েছেন, ১৯৪৭ এর ভারতভাগের সময় ওদের ভারত এবং মায়ানমারের অংশ হবার কথা ছিল। এভাবে তিনি পরোক্ষভাবে পাহাড়ীদের স্বাধীনতার ন্যায্যতাকে তুলে ধরেন।

পাহাড়ে ’বাঙালী বাংলাদেশী’ বসতি স্থাপনকে কেন্দ্র করে যে সশস্ত্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তার প্রেক্ষিতে জিয়াউর রহমান সেখানে সেনাবাহিনী পাঠান। এরশাদ ক্ষমতা দখল করার পর সামরিক শক্তি আরো বৃদ্ধি করেন। পুনর্বাসিত ’বাঙালী বাংলাদেশীদের’ ‘বহিরাগত’ হিসেবে অনেক বাঙালী বুদ্ধিজীবী অভিহিত করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে দু’টো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনার দাবী রাখলেও সেটা কখনো হয়নি।

প্রথমতঃ আপনি খুলনার মানুষ হয়ে বরিশালে বাড়ী বানালে কি বহিরাগত হবেন? দেশের সীমানার মধ্যে যে কোন স্থানে বৈধভাবে বসবাসের অধিকার কি দেশের নাগরিকদের নেই? ঢাকায় বসবাসরত পাহাড়ী অঞ্চলের মানুষ কি ’বহিরাগত’? আসলে এভাবে কোন কোন বুদ্ধিজীবী প্রকারান্তরে ‘বহিরাগত’ শব্দটি উল্লেখের মাধ্যমে পার্বত্য তিনটি জেলাকে বাংলাদেশের বাইরে অর্থাৎ তাদের স্বাধীনতার পক্ষেই বলছেন।

দ্বিতীয়তঃ সেই আঙ্গিকে বহিরাগত হলে তো পাহাড়ীরাই বহিরাগত। কারণ তাদের আগমন ঘটে ভারত কিম্বা মায়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। ঐ এলাকায় ’বাঙালী বাংলাদেশীদের’ আগমন পাহাড়ীদের অনেক আগে ঘটেছিল।

তারপরেও ’স্বাভাবিক মাইগ্রেশন’ এবং ’উদ্দেশ্যমূলক মাইগ্রেশনের’ মধ্যে একটা তফাৎ আছে। ১৯৪৭ থেকে নতুন সৃষ্ট দেশকে মেনে না নেবার মনোবৃত্তি থেকে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের যে অবনতি ঘটে এবং অন্যান্য কারণ মিলিয়ে পাহাড়ীরা যে সশস্ত্র আন্দোলনে নামে, সেটাকে দমনের কৌশল হিসেবে পরিকল্পিতভাবে উক্ত এলাকায় পাহাড়ীদের সংখ্যালঘু করার জন্যই মূলতঃ সমতলের বাঙালীদের পুনর্বাসন করানো হয়েছিল। কাজেই, পুরো সত্যকে এড়িয়ে কেবলমাত্র অর্ধসত্যকে ভিত্তি হিসেবে ধরে বাঙালী পুনর্বাসনের সমালোচনা করা উচিত নয়। রাষ্ট্রিয় নিরাপত্তা এবং নিরাপদ জীবনের জন্য অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকেও অনেক সময় মেনে নিতে হয়।

যেমন; ১৯৪৭ এর ভারত বিভাগের সময় ঘটা হিন্দু-মুসলমানের এপার ওপার মাইগ্রেশন কি ইচ্ছাকৃত ছিল? নাকি পরিস্থিতি তাদের বাধ্য করেছিল? দু’টোর প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও এক স্থানে মিল আছে। মাঝে মাঝে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যায়। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন হলে অনেক সময় রাষ্ট্রপক্ষ এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।

প্রসঙ্গত আলোচনার দাবী রাখে, শেখ মুজিব মানবেন্দ্র লারমাকে ১৯৭২ সালে পার্বত্য অঞ্চলে ’বাঙালী ঢুকিয়ে’ দেবার যে হুমকি দেন, পরবর্তীতে জিয়া সেটা বাস্তবায়ন করেন। আদিবাসী দাবীর প্রতি সক্রিয় অংশ জিয়াকে এজন্য মুন্ডুপাত করলেও এই কনসেপ্টের ধারক তৎকালীন রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে টুঁ শব্দ করেন না। আতাউস সামাদ ঠিকই বলেছেন, সব কিছুতে ”জিয়াই নন্দঘোষ”!

ওদের কাছে ক্ষমা চাইবে কে?

অষ্ট্রেলিয়ার ষ্টোলেন জেনারেশন সম্পর্কে জানতে নিচের উদ্ধৃত অংশগুলো সাহায্য করবে।

“The Stolen Generations (also known as Stolen Children) were the children of Australian Aboriginal and Torres Strait Islander descent who were removed from their families by the Australian Federal and State government agencies and church missions under acts of their respective parliaments. The removals occurred in the period between approximately 1905 and 1969, although in some places children were still being taken until the 1970s.

 ‘between one in three and one in ten Indigenous children were forcibly removed from their families and communities in the period from approximately 1910 until 1970….In that time not one Indigenous family has escaped the effects of forcible removal’.

 Northern Territory Protector of Natives, Dr. Cecil Cook ১০৩০ সালে “half-caste” শিশুদের সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তাদেরকে ’সাদাকরণের’ পূর্ণ ব্যবস্থার জন্য পরামর্শ দিয়ে লিখেন,

”Generally by the fifth and invariably by the sixth generation, all native characteristics of the Australian Aborigine are eradicated. The problem of our half-castes will quickly be eliminated by the complete disappearance of the black race, and the swift submergence of their progeny in the white”.

Chief Protector of Aborigines in Western Australia, A. O. Neville ১০৩০ সালে এক নিবন্ধে লিখেন,

” One factor, however, seems clear; atavism   is not in evidence so far as colour is concerned. Eliminate in future the full-blood and the white and one common blend will remain. Eliminate the full blood and permit the white admixture and eventually the race will become white.”

“In 1992 Prime Minister Keating acknowledged that ‘we took the children from their mothers’ at a speech in Redfern. In 1994 legal action was commenced in the Supreme Court of New South Wales. These children who were removed came to be known as the Stolen Generations.”

এরপর অষ্ট্রেলিয়ান প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী Kevin Rudd ২০০৮ সালের ১৩ ফ্রেব্রুয়ারী অষ্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের উপরে করা তার পূর্বসূরীদের সব রকমের অপকর্মের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চান।

” We apologise especially for the removal of Aboriginal and Torres Strait Islander children from their families, their communities and their country.”

আজ যারা বাঙলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বাকে আদিবাসী স্বীকৃতির পক্ষে কথা বলছেন, তাদের পূর্বের ইতিহাস এমনই নিষ্ঠুরতায় ভরা। তারপরেও বহু বছর পরে হলেও তারা কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু আমরা?

বাংলাদেশে যে গ্রুপটি পাহাড়ীদের আদিবাসী দাবীর প্রতি সংবেদনশীল, তারা আজো তৎকালীন রাষ্ট্রপতির বর্ণবাদী মন্তব্যের জোরালো কোন সমালোচনা করেননি। এথনিক পরিচয়ে নির্ধারিত বাঙালী জাতীয়তাবাদকে ন্যাশনালিটির সাথে গুলিয়ে ফেলতে গিয়ে তারা এভাবেই দেশে বসবাসরত অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বাকে সব সময় অস্বীকার করে চলেছেন।

আমি ব্যাক্তিগতভাবে মনে করি, তিনটি ইস্যুতে সরকারের পক্ষ থেকে পাহাড়ীদের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। প্রথমতঃ উন্নয়নের ’মানবিক’ দিক বিবেচনায় না এনে এবং পুনর্বাসনের কথা চিন্তা না করে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করা। দ্বিতীয়তঃ সংবিধানে জাতীয়তা ‘বাঙালী’ নির্ধারন করে বাকীদের অপমান করা এবং তৃতীয়তঃ শেখ মুজিব কর্তৃক পাহাড়ীদের ’বাঙালী’ হতে বলা।

 (সমাপ্ত)

  1. রেফারেন্সসমূহঃ
  2. ১) সাম্প্রতিক রাজনীতির ময়না তদন্ত এবং একটি তথাকথিত উপসংহার, সত্যজিত দত্ত পুরো কায়স্থ, উন্মোচন, ১৯ আগষ্ট ২০১২।
  3. ২) ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং আদিবাসী বিতর্ক, ড. মোঃ আজিজুল হক, ২৬শে জুন ২০১১, ২৪ বাঙলা নিউজ।
  4. ৩) বিডিআরের বাংলায় নাম এবং ‘আদিবাসী’ বিতর্ক, আতাউস সামাদ, সমকাল ৪/৩/১০ ইং।
  5. ৪) পাহাড়েও জিয়াই নন্দ ঘোষ!  আতাউস সামাদ, আমার দেশ, ১/৩/১০ ইং।
  6. ৫) আদিবাসী বিতর্ক ও একটি প্রত্যাশা, এস হক, নয়া দিগন্ত,
  7. ৬) পার্বত্য শান্তিচুক্তিঃ বর্তমান প্রেক্ষিত, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া
  8. http://kathakata.com/archives/1199
  9. ৭) http://www.australia.gov.au/about-australia/our-country/our-people/apology-to-  australias-indigenous-peoples
  10. ৮) http://www.australia.gov.au/about-australia/australian-story/sorry-day-stolen-generations
  11. ৯) https://en.wikipedia.org/wiki/Stolen_Generations
  12. ১০) বাংলাদেশে আদিবাসীদের প্রান্তিকতা; সাদেকা হালিম।
  13. http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/30177
  14. ১১) পার্বত্য চট্টগ্রামে বহুমাত্রিক সমস্যার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পটভূমি। শাহরিয়ার কবীর।
  15. http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/208

এই লেখার আগের পর্বগুলো পড়ুন এখান থেকে

  1. আদিবাসী বিতর্ক ১ ও ২
  2. আদিবাসী সংজ্ঞায়নে অস্পষ্টতা রয়েছে
  3. দিবাসীর সংজ্ঞার আলোকে বাঙলাদেশে আদিবাসী কারা?
  4. আদিবাসী বিতর্কে নাগরিক সমাজের অবস্থান

 

আদিবাসী বিতর্কে নাগরিক সমাজের অবস্থান

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক- ৫

মাহবুব মিঠু

মাহবুব মিঠু:

বেশ আগে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আরটিভি সুন্দর একটা টকশোর আয়োজন করেছিল। গোলাম মোর্তজার সঞ্চালনায় অতিথি হিসেবে ছিলেন জেনারেল (অবঃ) ইব্রাহীম এবং চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়।আদিবাসী স্বীকৃতি পেলে এর পরিণাম কি কি হতে পারে ঐ অনুষ্ঠানে জনাব ইব্রাহীম সেগুলো খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ২০০৭ সালে প্রণীত জাতিসংঘের ডিক্লারেশন ৩, ৪ এবং ১৮ ধারা মোতাবেক, স্বীকৃতি পাওয়া আদিবাসীদের চাহিদা অনুযায়ী তাদেরকে স্বায়ত্বশাসন দিতে রাষ্ট্র বাধ্য থাকবে। পাহাড়ীদের অনুমতি ছাড়া কেউ সেখানে বাস করতে পারবে না এবং তাদের অনুমতি ও সম্মতি ছাড়া ঐ এলাকায় রাষ্ট্র কোন রকমের সামরিক তৎপরতা চালাতে পারবে না।

জনাব ইব্রাহীমের দেয়া তথ্য খণ্ডাতে পারেননি রাজা দেবাশীষ রায়। এমনিতে পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টি করে রেখেছে একটা গোষ্ঠী। বাংলাদেশ থেকে পৃথক হওয়া তাদের লক্ষ্য। এই পরিস্থিতিতে আদিবাসী স্বীকৃতি নিয়ে স্বায়ত্বশাসনের দাবী জোরালো হলে সরকার আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে পড়বে। দেবাশীষ রায় কৌশলে জনাব ইব্রাহীমের স্বায়ত্বশাসনের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে এটাকে ইউনিয়ন পরিষদের স্বশাসনের সাথে গুলিয়ে বিষয়টাকে হালকা করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

জনাব ইব্রাহীম আরো বলেন, রাজা দেবাশীষ রায় একটা আদিবাসী ফোরামের সদস্য এবং এই ফোরাম জাতিসংঘের মাধ্যমে শর্ত দিয়েছে, আগামীতে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী বিশ্বের কোন দেশে শান্তি মিশনে গেলে পাহাড়ীদের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে যে, সেনাবাহিনী সেখানে কোন মানবাধিকার লংঘন করে নাই। ’মানবাধিকার লংঘন’ ক্ষেত্র বিশেষে একটা আপেক্ষিক শব্দ। পাহাড়ী সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর অভিযানকে সংজ্ঞায়িত করা হলে সেটাও হবে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভাষায় মানবাধিকার লংঘন। এই দাবী প্রতিষ্ঠা করতে পারলে পাহাড়ের সহিংসতাকে থামানো যাবে না। আমরা জানি, পাহাড়ীদের একটা অংশ রাঙ্গামাটিকে রাজধানী করে জুম্মল্যান্ড করার স্বপ্ন দেখছেন।

ড. জাফর ইকবাল ২০১১ সালের আগষ্ট মাসে ’প্রথম আলোতে’ ‘কারও মনে দুখ দিয়ো না…’ নামে একটা কলাম লেখেন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন, যার মধ্যে একটা ছিল ‘আদিবাসী’ ইস্যু। স্বভাবসুলভ ভঙ্গীমায় যুক্তি কম, আবেগ নির্ভর এবং অনেকগুলো ভুল তথ্যে ভরা ছিল লেখাটি। তিনি এই কলামে লিখেছেন, “মাত্র অল্প কয়দিন আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা হয়েছে—প্রথমবারের মতো আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, প্রতিবন্ধী কোটার সঙ্গে সঙ্গে আদিবাসী কোটায় ছাত্রছাত্রী ভর্তি করেছি।” এরপরেই তিনি লেখেন, ”দেশে যদি আদিবাসী নেই, তাহলে আদিবাসী কোটায় আমরা কাদের ভর্তি করেছি?” জাফর সাহেবে যাকে ‘আদিবাসী কোটা’ বলেছেন, আদতে ওটা হবে ‘উপজাতি কোটা’। ওনার মতো একজন শিক্ষাবিদ কি ভুল করে লিখলেন নাকি না জেনে লিখলেন? Indigenous কথার অর্থ খুঁজতে ডিকশনারী ঘাঁটতে গিয়ে ওনার পছন্দ মতো অর্থ খুঁজে না পেয়ে মর্মাহত হয়েছেন।

জনাব প্রশান্ত ত্রিপুরা, ১৯৯৩ সালে আন্তর্জাতিক আদিবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে “আন্তর্জাতিক আদিবাসী বর্ষ এবং বাংলাদেশের আদিবাসী জনগণ” শীর্ষক একটা নিবন্ধ লেখেন। নিবন্ধের শুরুতে অস্পষ্ট বিবরণের মাধ্যমে একটা যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি লিখেছেন, “কিছু শিল্পোন্নত দেশ Indigenous জনগোষ্ঠীর ধারণা এবং তাদের বিশেষ অধিকারের প্রশ্নকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিলেও অন্য অনেক দেশে অনুরূপ কোন উদ্যোগ নেই।” তিনি পরিস্কার করে বলেননি যে, ‘কিছু শিল্পোন্নত দেশ’ অর্থাৎ অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং আমেরিকার মতো আরো কিছু দেশে যেখানে এই স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে সেখানে Indigenous-রা হলো Native, অর্থাৎ তারা ঐ ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা। ইউরোপিয়ানরা সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য নতুন নতুন ভূমি দখল করে ’বহিরাগত’ হিসেবে এসব অঞ্চলে গেঁড়ে বসে। এই সত্যটুকু পরিস্কারভাবে না লিখলে পাঠকের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। Indigenous হিসেবে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি না পাওয়ায় তিনি  আক্ষেপ করে লিখেছেন, ”কিন্তু একজন গারো, সাঁওতাল বা ম্রোর কাছে এই সরকারী ব্যাখ্যা তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করারই নামান্তর।” আদিবাসী স্বীকৃতির অভাবে কিভাবে তাদের অস্তিত্ব সংকটে পড়ল তার ব্যাখ্যা নেই। শেখ মুজিবের ’বাঙালী’ করার ঘোষণা বাস্তবে তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকী হলেও রাজনৈতিক কারণে হয়তো তিনি এই সঠিক স্থানে আঘাত করতে সাহস পাননি।

জনাব ত্রিপুরার লেখায় আদিবাসী কথাটার অর্থ কি এবং বাংলাদেশে উপজাতি হিসেবে পরিচিত গোষ্ঠীগুলোকে আদৌ আদিবাসী বলা যায় কিনা প্রশ্নগুলো পরিস্কারভাবে করলেও উত্তরগুলো পরিস্কার নয়। সময়ের ’আপেক্ষিকতাকে’ ঢাল হিসেবে নিয়ে উনি এ অঞ্চলে পাহাড়ী নাকি বাঙালীরা আগে বসতি গড়ে সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে এড়িয়ে গেছেন। তিনি লিখেছেন, “অর্থাৎ স্থান ও কালের সীমানা কিভাবে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে, তার উপরই নির্ভর করছে কোন প্রেক্ষিতে কাদের আমরা Indigenous বলতে পারি। আমরা যদি সুদূর প্রাগৈতিহাসিক অতীতে চলে যাই তাহলে Indigenous কথাটি অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।”

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আদিবাসী বিতর্ক বিষয়ক স্থান তো নির্দিষ্ট। এবং ‘সময়’ সম্পর্কিত ধারণাও পরিস্কার। অর্থাৎ নির্দিষ্ট ভূখন্ডে আদিবাসীর দাবীদার যারা তারা কি ওখানে সংখ্যাগুরুর আগে এসেছিল নাকি পরে! বাঙালীদের আগমন আগে ঘটে থাকলে তারা ঐ অঞ্চলে পরে আসা অন্য জনগোষ্ঠীর ভূমির উপর অতিরিক্ত দাবীকে মেনে নেবে কেন? এভাবে বিভিন্নজনে আদিবাসী স্বীকৃতিকে পাকা করার জন্য বারবার অষ্ট্রেলিয়া, আমেরিকা এবং কানাডাকে টেনে আনলেও সেখানে স্বীকৃতি পাওয়া Indigenous-দের সাথে আমাদের এখানকার দাবীদারদের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যকে তুলে ধরছেন না। সেটা পরিস্কার করলে তাদের দাবীটাই অসাড় হয়ে যায়। মানুষকে এতো সহজে তাদের দাবীর দিকে টেনে আনা যাবে না। মূলতঃ বাঙলাদেশে যারা আদিবাসী স্বীকৃতির জন্য লড়ছেন, তাদের কাছে ‘আবেগ’ এবং ‘পরদেশের’ উদাহরণ ছাড়া শক্ত কোন যুক্তি নেই।

একটা পর্যায়ে তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে জাতিসংঘের আদিবাসী সংক্রান্ত দিক নির্দেশনা বা ধারণার একটা নিজস্ব সম্প্রসারিত ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন যেখানে শব্দটির মূল দ্যোতনা ‘আদি’কেই অস্বীকার করা হয়েছে। ”কোন দেশে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাদের পূর্ব পুরুষেরা প্রথমে সেখানে বসতী গেড়েছিল, এ প্রশ্ন গৌণ, মূলত: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তথাকথিত সভ্যতার বিকাশের শিকার tribal, primitive প্রভৃতি ঔপনেবিশিক আখ্যায় ভূষিত জনগোষ্ঠীদের সবাই Indigenous অভিধার বৈধ দাবীদার”।

সভ্যতার একই আক্রমণের শিকারতো আজ বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীও! তাহলে তারাও কি সেই একই দাবী করে বসবে? কিম্বা মায়ানমারের রোহিঙ্গারা? বরঞ্চ তার এই সম্প্রসারিত ব্যাখ্যার সূত্র ধরে এই জনগোষ্ঠীকে ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠী’ বলাই শ্রেয়। ‘বাংলাদেশী’ পরিচয় নির্ধারণেও তার কিছুটা আপত্তি আছে। তার ভাষায় এটা ‘আদিবাসীদের’ কথা ভেবে করা হয়নি। যে দেশটার নাম বাংলাদেশ, তার নাগরিকরা বাঙলাদেশী হবে না তো কি হবে? ভারতীয় নাগরিকদের ভারতীয়, পাকিস্তানীদের পাকিস্তানী বলা গেলে বাংলাদেশের নাগরিকরা তো বাংলাদেশীই হবে! পরোক্ষভাবে উনি কি দেশের নামটা পরিবর্তনের কথা বলছেন?  এথনিক পরিচয়ে জাতীয়তা এবং রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদ বা ন্যাশনালিটির পার্থক্য নিশ্চয়ই উনি অনেকের চেয়ে ভাল বুঝেন। এভাবে ‘বাংলাদেশী’ পরিচয় নিয়ে সংশয়ে থাকার অর্থ প্রচ্ছন্নভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদকেই ইঙ্গিত দেয়।

কিছু কিছু বাঙালীর এবং আরো বৃহত্তর পরিচয়ে বাংলাদেশীদের (কিছু কিছু) ’আবেগ’ সহজিয়া বা স্বাভাবিক নয়। এটা একধরনের ইমোশনাল ব্লাকমেইল।’ এদের আবেগ কোন ঘটনার কারণে স্বাভাবিকভাবে আসে না। কোন বিষয়কে নিজের অনুকূলে আনার জন্য এই বিশেষ ধরনের ’আবেগ’ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সৃষ্টি করা হয়। কেবলমাত্র মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আবেগ সৃষ্টি করে শাহবাগে লাখ লাখ মানুষ জড়ো করা গোষ্ঠী পরিশেষে কোটি কোটি টাকার মালিক হবার গল্প বাতাসে ওড়ে। একইভাবে আবেগের কৌশলী ব্যবহারের মাধ্যমে একটা গোষ্ঠী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দিতে চায়।

শ্রদ্ধেয় আতাউস সামাদ তার এক লেখায় বিবিসির সাংবাদিক থাকাকালীন সময়ের কিছু অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। সেই আশির দশকে যখন শান্তিবাহিনীর বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন তুঙ্গে, সে সময় থাইল্যান্ড বা জাপানে বৌদ্ধ সম্মেলন হলে এই সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সমর্থনে উদ্বেগ প্রকাশ করে যে বিবৃতি দেয়া হতো, মাঝে মাঝেই সেখানে লেখা থাকত ‘ওই এলাকায় বৌদ্ধদের উপরে অত্যাচার চলছে’। এভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সমর্থনে একটা জনমত সৃষ্টিতে দেশের বাইরের একটা গোষ্ঠী বেশ সোচ্চার ছিল। এখন এর পরিধি অনেক বেড়েছে। দেশের ভিতরে তথাকথিত কিছু মানবাধিকার সংগঠন এবং কিছু ব্যাক্তি ‘আদিবাসী’ বিতর্ককে উস্কে দিচ্ছেন।

জনাব আতাউস সামাদ সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, ঐ এলাকার এতো হই হট্টগোলের প্রধান উদ্দেশ্য সম্ভবত সেখানে বসতী স্থাপনকারী বাঙালীদের ফিরে যেতে বাধ্য করা। তিনি দেখিয়েছেন ২০১০ সালের ফ্রেব্রুয়ারীতে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘটা গোলযোগকে কেন্দ্র করে যেটা হয়ে গেল সেখানে দেখা গেছে প্রশাসন শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করে। অসহায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালী নারী পুরুষ শিশু রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে দাড়িঁয়ে থাকলেও তাদেরকে কোন ত্রাণ দেয়া হয়নি। বাঘাইহাটে বাঙালীদের যে ঘরবাড়ী পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল সেগুলো তখনো পর্যন্ত পাহাড়ীদের দখলে ছিল(বর্তমানের খবর জানা নেই আমার)। একই সূত্র থেকে জানা যায়, এক পাহাড়ীর কাছ থেকে বাঙালী জমি কিনলে তা তার দখলে না দিয়ে কোন এক এনজিওকে দিয়ে দেয়া হয়। শুরু হয় উত্তেজনা।

পাহাড়ের উত্তেজনার পিছনে এক তরফাভাবে বসতি স্থাপনকারী বাঙালী- বাংলাদেশীদের দোষ চাপানো সব সময় ঠিক নয়। এটাকে ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান বলে না। কিছু কিছু পত্রিকা তাদের বিভিন্ন লেখায় সরকারী অবস্থান থেকে সরে গিয়ে ‘আদিবাসী’ শব্দটা ব্যবহার করে ধৃষ্টতার পরিচয় দিচ্ছে। এ রকমের একটা স্পর্শকাতর বিষয়ে রাষ্ট্রিয় সিদ্ধান্তের বাইরে তাদের নিজস্ব অবস্থান রাষ্ট্রিয় অবমাননা কিনা ভেবে দেখা জরুরী।

অনেকের মতো্ আমিও মনে করি, আদিবাসী স্বীকৃতির সাথে সাথেই সরকারের উপর আন্তর্জাতিকভাবে কিছু দায়িত্ব এবং বাধ্যবাধকতা চলে আসবে। প্রথমত: ভূমির উপরে অধিকারের বলে সেখানকার বাঙালী খেদাও আন্দোলন শুরু হবে। সেনা ক্যাম্প সরিয়ে নেয়ার দাবী উঠবে। বিভিন্ন দাবী দাওয়ার নামে পাহাড়ীদের একটা অংশ আন্দোলনের নামে যে বিচ্ছিন্নতার আন্দোলন শুরু করছে সেটা জোরদার করতে পারবে। আদিবাসী স্বীকৃতির সাথে সাথেই তাদের উপরে জাতিসংঘের একটা সরাসরি পর্যবেক্ষণ থাকবে এবং তারা তদারকি করার সুযোগ পাবে। এ সব ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মতো পশ্চিমা লেজুড়বৃত্তিক সংগঠনগুলো যেটা করে সেটা হলো: শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর জন্য এক নিয়ম আর আমাদের মতো দুর্বলদের জন্য আরেক নিয়ম। বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমন করতে সামরিক পদক্ষেপ নিলে তখন তারা সরাসরি জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মদদে ‘আদিবাসী’ বাঁচাও সুর তুলে সরকারের সাথে বিচ্ছিন্নতার দেনদরবার করার সুযোগ পাবে। দেশ রক্ষা করার জন্য জীবনবাজী রেখে পাহাড়ী অঞ্চলে মোতায়েনকৃত সৈন্যরা পরিচিত হবেন আগ্রাসী বাহিনী হিসেবে। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা হবেন মুক্তিযোদ্ধা।

চলবে….

রেফারেন্স

 

এই লেখার আগের পর্বগুলো পড়ুন এখান থেকে

  1. আদিবাসী বিতর্ক ১ ও ২
  2. আদিবাসী সংজ্ঞায়নে অস্পষ্টতা রয়েছে
  3. দিবাসীর সংজ্ঞার আলোকে বাঙলাদেশে আদিবাসী কারা?

আদিবাসী বিতর্ক

১।। সমাধানহীন জাতীয় বিতর্কে আরেকটা নতুন পালক

মাহবুব মিঠু

মাহবুব মিঠু

আদিবাসী বিতর্কটা বাংলাদেশে আর পাঁচটা সমাধানহীন বিতর্কের মতোই ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করছে। সেই সাথে বিভিন্ন পক্ষ থেকে বিতর্কের সমাধানের চেয়ে বরং এটিকে রাজনীতিকরণ করা শুরু হয়েছে। ফলে আদিবাসী ইস্যুটা সমাধানের চেয়ে দিনকে দিন জটিলতার দিকেই এগুচ্ছে বলে মনে হয়। এই পরিস্থিতিতে শুধু বাংলাদেশে নয়, বরং সমগ্র এশিয়ায় ক্রমশঃ এটা একাধারে এক পক্ষের ধারণায় অবহেলিত এবং অন্য পক্ষের ধারণায় একটা বিতর্কিত চাপিয়ে দেয়া ইস্যু হয়ে পড়েছে।

মূলতঃ অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, আমেরিকা কিংবা অন্যান্য ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রগুলোর মতো এশিয়ার বিতর্কটা সাদা কালোর মতো পরিস্কার নয়। এই সুযোগটাকে ব্যবহার করে এক পক্ষের মতে কিছু ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী এখান থেকে ফায়দা নেবার চেষ্টায় ব্যস্ত। কোন জাতি আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় তারা কিছু বাড়তি সুযোগ সুবিধা পায়। যেমন জমির উপর কিছু বাড়তি অধিকার এবং অন্যান্য আরো কিছু সুযোগ সুবিধা।

বাঙ্গালীদের বড় অংশ মনে করে, পাহাড়ীদের এই দাবী অন্যায্য এবং এটা মানা হলে যে সুযোগ সুবিধাগুলো তারা ভোগ করবেন সেটা একদিকে অন্যায় এবং আমাদের রাষ্ট্রিয় অখণ্ডতা ভবিষ্যতে হুমকীর মুখে পড়বে। অন্যদিকে, আদিবাসী দাবীদাররা মনে করছেন, অস্পষ্টতার সুযোগে রাষ্ট্রের ডোমিনেন্ট গ্রুপ তাদেরকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।

প্রায় ৪/৫ বছর আগে গুরুত্বসহকারে বিতর্কের বিষয়টা আমার মাথায় ভর করে বসে। তখন থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এক ধরনের তথ্যানুসন্ধানে নেমে পড়ি। এটা করতে গিয়ে  একটা অদ্ভুদ সত্য উপলব্ধি করি যেটা বেশ লজ্জার। তথ্য প্রমাণ সংগ্রহের জন্য আমি বিভিন্ন ব্যক্তিকে ফোনে এবং মেইলে যোগাযোগ করি। এদের বেশীরভাগ লোকই ইতিমধ্যে আদিবাসী বিতর্কের পক্ষে এবং বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ফেলেছেন। বিভিন্ন পত্রিকায় অপর্যাপ্ত তথ্যসহ লেখাসহ ব্লগ এবং ফেইসবুকেও ভারি ভারি প্রচারণা চালিয়েছেন। অথচ এদের অনেকের কাছেই পর্যাপ্ত তথ্যই নেই। অবশ্য কিছু শুভাকাঙ্খীর কাছ থেকে সত্যিকার অর্থে যথেষ্ট রেফারেন্স পেয়েছি। কৃতজ্ঞতা তাদের প্রতি।

এর বাইরে অস্ট্রেলিয়ার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগে সেখানকার লাইব্রেরিসহ বিশ্বের বিভিন্ন অনলাইন লাইব্রেরিতে বিনে পয়সায় ঢুঁ মারার সৌভাগ্য হয়েছিল। এমনকি অস্ট্রেলিয়াতে আদিবাসী নিয়ে বর্তমানে যারা কাজ করছেন তাদের সঙ্গে ব্যাক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে আদিবাসী ধারণার উপরে একটা ধারণা লাভের চেষ্টা করি। তার বাইরেও পরিচিত বিভিন্ন বন্ধু বান্ধবের সাথে আলাপচারিতায় বাংলাদেশে আদিবাসী প্রসঙ্গে তাদের নিজস্ব ধারণাগুলো জানার মাধ্যমে আমাদের দেশে আদিবাসী বিতর্কের বহুমাত্রিক রূপটা উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। এর বাইরে বিভিন্ন জনের ফেইসবুক, ব্লগে ঘুরে এসে সকলের প্রতিক্রিয়া দেখার চেষ্টা করেছি।

এভাবে একদম সাধারণের ব্যাক্তিগত মতামত থেকে শুরু করে একাডেমিক আলোচনা এবং বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন, আদিবাসী বিষয়টা নিয়ে ভাবছেন এমন বু্দ্ধিজীবী সবোর্পরি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর রচিত আদিবাসী বিষয়ক বিভিন্ন প্রকাশনাগুলোকে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। আমার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার সম্মিলিত তথ্যের ভিত্তিতে লেখাগুলো সাজান। আমি বলব না যে, এটা একটা তথাকথিত ‘নিরপেক্ষ’ লেখা। নিরপেক্ষ বলতে কোন শব্দ থাকলেও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কোন কোন পক্ষের স্বীকৃতি নাও থাকতে পারে। ‘নিরপেক্ষ’ শব্দটাও মাঝে মাঝে ‘আদিবাসী’ সংজ্ঞার চেয়েও বেশী অস্পষ্ট এবং ক্ষেত্র বিশেষে বিতর্কিত হয়ে পড়ে।

তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে লিখতে গেলে কখনো কখনো সেটা এক পক্ষের সম্পূর্ণ বিপরীতে যেতেই পারে। তার কাছ থেকে নিরপেক্ষ খেতাব আশা করা যায় না। যার যার স্বার্থ অনুযায়ী এক এক যুক্তি একেক জনের কাছে নিরপেক্ষ আবার কখনো পক্ষপাতদুষ্ট। আসলে আমরা মুখে ‘নিরপেক্ষ’ শব্দটা ব্যবহার করলেও চিন্তায় থাকে ‘ভারসাম্যের’ ধারনা। ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান সব সময় সত্যের পক্ষে যায় না। এভাবে নিরপেক্ষ শব্দটা মাঝে মধ্যেই আপেক্ষিক হয়ে পড়ে। তাই সচেতনভাবে আমার উদ্যোগকে ’নিরপেক্ষ’ না বলে আমি ‘যুক্তি নির্ভর’ বলতে বেশী স্বাচ্ছন্দবোধ করি। যুক্তিগুলো দাঁড় করানোর চেষ্টা হয়েছে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে। লেখাগুলো ছাপা হলে অনেকেই হয়তো অনেকভাবে তাদের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করবেন। আমি তাদের অনুরোধ জানাব, আমিব্যাক্তিগতভাবে ভারত নাকি পাকিস্তানের দালাল নাকি হোপলেস সে প্রসংগে না গিয়ে বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে লেখার সবল এবং দুর্বল দিকগুলো তুলে ধরবেন। সকলের সম্মিলিত উদ্যোগে বিতর্কের অবসান হোক। বিদ্যমান বিভিন্ন রাজনৈতিক বিতর্কের সাথে নতুন কোন সমাধানহীন বিতর্কের সূচনা করা আমাদের কাম্য নয়।

২।। বারডেন অব প্রুফ

(একটা সময়ে সর্বসম্মতভাবে পাহাড়ে বসবাসকারীদের বলা হতো, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, জুম্ম জনগণ, পাহাড়ী, উপজাতি, ট্রাইবাল পিপল, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী। হঠাৎ করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে এবং পাহাড়ী অল্প কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদীদের স্বাধীনতার আন্দোলনকে যৌক্তিকতা দেবার অভিপ্রায়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আদিবাসী বিতর্কটাকে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে।)

বারডেন অব প্রুফ হচ্ছে সিভিল ষ্ট্যান্ডার্ড প্রুফ। ক্রিমিনাল ষ্টান্ডার্ডে যেখানে ‘Beyond reasonable doubt’প্রমাণ হতে হবে আলোচিত ক্রিমিনাল অভিযোগ কিম্বা অমিমাংসিত কোন ঘটনা সত্য অথবা মিথ্যা। সংজ্ঞা অনুযায়ী,

A duty placed upon a civil or criminal defendant to prove or disprove a disputed fact.

বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের সেই আদিপর্ব থেকে বিভিন্নভাবে পাহাড়ীদের পরিচয় সম্পর্কিত বিতর্ক লেগেই আছে। এক সময় শেখ মুজিব বলেছিলেন, তোমরা সবাই বাঙালী হয়ে যাও। যেটা ছিল সম্পূর্ণ বর্ণবাদী বক্তব্য। পাহাড়ীরা এখন জোরেশোরে দাবী করছে যে তারা এই এলাকার আদিবাসী। সমতলের অধিবাসী এবং সরকার বলছে, না, তারা সেটা নয়। এই পটভূমিতে মূলতঃ সরকারের দায়িত্ব ‘বারডেন অব প্রুফের’ আওতায় তাদের অবস্থান প্রমাণ করার। এবং অবশ্যই দাবীদার পাহাড়ী গোষ্ঠীকেও তাদের দাবীর প্রতি যথেষ্ট প্রমাণ হাজির করতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, উভয় পক্ষের বিতর্কটা প্রায়শই যুক্তি কিম্বা তথ্য প্রমাণ নির্ভর না হয়ে হয়ে পড়ছে তর্ক নির্ভর কিংবা প্রচ্ছন্ন হুমকি নির্ভর। পাহাড়ীদের একটা অংশ থেমে থেমে পুণরায় যুদ্ধ শুরুর হুমকি দিচ্ছে। প্রকারান্তরে এর মাধ্যমে তারা পার্বত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনী স্থায়ীভাবে রাখার পক্ষেই গ্রাউন্ড তৈরী করে দিয়েছে। তাদের দাবীকে আইনগতভাবে প্রমাণের চেষ্টা না করে কিছু সন্ত্রাসী পাহাড়ীর যুদ্ধ শুরুর হুমকি প্রমাণ করে যে, ঐ অঞ্চলে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি কতোটা জরুরী। অতএব, বিষয়টা যতোক্ষণ ‘বারডেন অব প্রুফের’ মধ্যে থাকবে ততোক্ষণ সেটাকে কেন্দ্র করে অব্যাহত বিতর্ক লেগেই থাকবে। সৃষ্টি হবে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার। সেই সুযোগে দেশের ভিতর এবং বাহির থেকে নানা পক্ষ নানাভাবে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা চালাবে।

আদিবাসীর পক্ষে যারা আছেন, তাদের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক প্রণীত কিছু ধোঁয়াশাচ্ছন্ন, অপরিস্কার ধারণাপত্র এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর (বাঙ্গালী) কিছু ঐতিহাসিক আন্দোলন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তারা বলতে চাইছেন, যে জাতি ৫২, ৬৯ এবং ৭১ এর আন্দোলন করেছে, সেই জাতি কেন পাহাড়ীদের দাবী মেনে নেবে না? এটা কি মামার বাড়ীর আবদার? উল্লেখিত আন্দোলনগুলোর একটা যৌক্তিক প্রেক্ষাপট ছিল। যতোদিন পাহাড়ীরা ‘আদিবাসী’ হিসেবে প্রমাণিত না হবেন, ততোদিন এই সব আবেগের স্থানে সুঁড়সুড়ি দিয়ে সেটা মেনে নিতে প্ররোচিত করা ইমোশনাল ব্লাকমেইল ছাড়া আর কি কিছু নয়। দু’দিন পরে কেউ স্বাধীনতা চেয়ে বসলে একই যুক্তিতে সেটাও দিয়ে দিতে হবে। তাই নয় কি? প্রথমেই তাদের দাবীর প্রতি প্রশ্নহীন প্রমাণ হাজির করতে হবে। কেবল তারপরেই তাদের আদিবাসী স্বীকৃতির দাবী যৌক্তিকতা পাবে। তার বাইরে এই দাবীকে কেন্দ্র করে যে কোন অরাজকতা আদতে নৈরাজ্য সৃষ্টির মতো চরম আইন বিরোধী কাজ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত। সেই সাথে এই গুরুত্বপূর্ণ অমিমাংসিত ইস্যু মিমাংসা না হওয়া পর্যন্ত যে সমস্ত পত্রিকা এবং তথাকথিত সুশীল সমাজ তাদেরকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে তুলে ধরে রাষ্ট্রের অবস্থানের বাইরে গিয়ে দেশের মধ্যে নৈরাজ্য সৃষ্টির পরোক্ষ ইন্ধন দেবে, তাদেরকে রাষ্ট্র বিরোধী আইনের আওতায় এনে বিচার করা উচিত।

আদিবাসী বিতর্কে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো এবং তাদের চালিত বিশ্ব সংস্থাগুলোর তৎপরতা যতোটা না প্রশংসনীয় তারচেয়ে বেশী তাদের সেই সব দেশের সত্যিকার আদিবাসীদের উপরে তাদের চালিত ‘অপরাধের’ প্রায়শ্চিত্য করার চেষ্টা। পশ্চিমারা তাদের মজ্জাগত আগ্রাসী, ঔপনিবেশিক চরিত্র থেকে অতীতকাল থেকে সারা বিশ্বে যখনই যেখানে সুযোগ পেয়েছে হামলে পড়েছে। একটা সময়ে তারা অষ্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডায় বসবাসকারী আদিবাসীদের নির্মূলের উদ্দেশ্যে নির্বিচারে হত্যা করেছে। তাদের চালিত গণহত্যা এবং অত্যাচারের ফলে আদিবাসীদের সাথে তাদের যে মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা আজো যায়নি। এই অবিশ্বাসের ফলে সেখানকার আদিবাসীরা এখনো মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে ভালবাসে। বিলুপ্তপ্রায় কিংবা কোনঠাসা সেই জাতিগোষ্ঠীকে কিছুটা সুবিধা দিয়ে পশ্চিমা শক্তি তাদের পূর্ব পুরুষের করা অপরাধকে কিছুটা লঘু করতে চায়। তাদের নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কর্তৃক প্রণীত আদিবাসী সম্পর্কিত ধারণাপত্রে সেই দায় মোচনের ছাপ সুস্পষ্ট। তারা সেখানে কবে এসেছিল, কিভাবে সেখানকার জনগোষ্ঠীকে মেরেছিল সেগুলো খুব পুরাতন ঘটনা নয়। তাদের পরিস্থিতির সাথে আমাদের দেশের পরিস্থিতির বিস্তর ফারাকে আছে।

আদিবাসী ধারণার বিকাশ

‘আদিবাসী’ প্রত্যয়টি মূলত: প্রথমদিকে পরিব্রাজক এবং একাডেমিক্যালি নৃবিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। একটা সময়ে ইবনে বতুতা কিংবা কলম্বাসের মতো পরিব্রাজকরা বিশ্ব চষে বেড়িয়েছিলেন। মর্গান, ম্যালিনোস্কিসহ আরো অনেক নৃবিজ্ঞানীদের আগ্রহ ছিল এই সব জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার উপরে। মর্গানের ‘আদিম সমাজ’ বইটি এখনো আদিবাসী কেন্দ্রিক ধারণায়নে একটা মূলধারার বই হিসেবে মেনে নিতে হবে। তবে আদিবাসী বিষয়ক অধিকার সম্বলিত আলোচনার বিকাশ এবং বিস্তৃতি লাভ করে মূলত: অষ্ট্রেলিয়া, আমেরিকা এবং কানাডার আদিবাসী আলোচনাকে ঘিরে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অপরিস্কার ধারণাপত্রের উপর ভিত্তি করে ইউরোপের কোন কোন বসতি স্থাপনকারীরাও এখন নিজেদের আদিবাসী দাবী করছেন। এমনকি ইরাকের কুর্দি কিংবা কোথাও কোথাও ধর্মীয় পরিচয়ের সংখ্যালঘুরাও ইচ্ছে করলে নিজেদের আদিবাসী দাবী করতে পারেন। এই সংস্থাগুলোর অপরিস্কার ব্যাখ্যার কারণে বর্তমানে ‘আদিবাসী’ এবং ‘এথনিক মাইনরিটির’ মধ্যকার পার্থক্যগুলো ক্রমশ: সংকুচিত হয়ে পড়েছে। যে কোন এথনিক মাইনরিটিও মন চাইলেই নিজেদের আদিবাসী হিসেবে দাবী করে বসতে পারে।

আরেকটি পক্ষ দাবী করছে, সারা দেশের বিবেচনায় জুম্মরা আদিবাসী না হলেও পাহাড়ী অঞ্চলে কারা আগে বসতি গড়ে? অর্থাৎ অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডায় আদিবাসীরা জাতীয় ভিত্তিতে। কিন্তু বাংলাদেশ ভারতে কিছুটা আঞ্চলিক ভিত্তিতে স্বীকৃতি দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাহলে ময়মনসিংহ কিংবা উত্তর বঙ্গের সমতলে বাস করা ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাগুলোর পরিচয় কি হবে? তারা কি দাবী পরিহার করবে? তাছাড়া আঞ্চলিক ভিত্তিতে আদিবাসী নির্ধারণ করা কি হাস্যকর নয়? একটা দেশের ক্ষুদ্র একটা অঞ্চলে বাইরে থেকে এসে নতুন বসতি গড়লে সেকি আদিতে বাস শুরু করেছে সেটা বলা যায়? তাহলে বরিশাল কিংবা অন্য অঞ্চলে নতুন চর জেগে উঠলে সেখানে কোন ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা বাস করা শুরু করলে আজ থেকে ৫০ কি ১০০ বছর পরে তারাও কি দাবী করবে যে, আমরা আদিবাসী? কিম্বা এমন কোন অকাট্য প্রমাণ কি আছে যে, পার্বত্য অঞ্চলে এখনকার আদিবাসী দাবীদাররাই প্রথম ঘাঁটি গাড়ে?

♦ চলবে

ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর লোকেরা আদিবাসী নয়

chakma

আশিক জামান 

প্রতিবছর ৯ আগস্ট বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ পালন করা হয়। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে দেশে দেশে নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়ে থাকে। আদিবাসীদের অধিকার এবং তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে দাবি দাওয়া উত্থাপিত হয়। উত্থাপিত দাবির যৌক্তিকতা নিরূপণে ‘আদিবাসী’ কারা সে বিষয়ে সম্যক ধারণা আবশ্যক। নৃতাত্ত্বিক সংজ্ঞায় আদিবাসী বা ‘এবোরিজিন্যালস হচ্ছে কোনো অঞ্চলের আদি ও অকৃত্রিম ভূমিপুত্র বা Son of the soil. প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী, আদিবাসী হচ্ছে, কোন স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী, যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই। মর্গান বলেন, The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial … they are the true Sons of the soil…(Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972).

আদিবাসী বিষয়ে আভিধানিক সংজ্ঞার বাইরে জাতিসংঘের তরফ থেকে একটি সংজ্ঞা আমরা পেয়ে থাকি। এ বিষয়ে জাতিসংঘ ও এর অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে এ পর্যন্ত প্রধানত তিনটি চার্টারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এগুলো হলো : ১৯৫৭ সালের ০৫ জুন অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ৪০তম অধিবেশনে প্রদত্ত-Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107); আইএলও’র ১৯৮৯ সালের ৭ জুন অনুষ্ঠিত ৭৬তম অধিবেশনে প্রদত্ত Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169) এবং ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples. এখানে আইএলও’র প্রথম চার্টার দুটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। চার্টার দুটির শিরোনাম হচ্ছে Indigenous and Tribal Populations Convention.  অর্থাৎ আদিবাসী ও উপজাতি জনগোষ্ঠী বিষয়ক কনভেনশন। অর্থাৎ এই কনভেনশনটি আদিবাসী ও উপজাতি সংশ্লিষ্ট । কনভেনশনে পাস হওয়া ধারাগুলো একই সাথে আদিবাসী ও উপজাতি নির্ধারণ ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। Indigenous and Tribal Peoples Convention 1989-এ আদিবাসীর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে: আদিবাসী তারা যারা একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস করছে বা অধিকৃত হওয়া ও উপনিবেশ সৃষ্টির পূর্ব থেকে বসবাস করছে এবং যারা তাদের কিছু বা সকল নিজস্ব সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত অধিকার এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ ধরে রাখে। এবার আসা যাক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে।

উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণ করে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়, বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরাই বাংলাদেশে আদিবাসী। কারণ তারাই আদি জনধারার অংশ। বাংলাদেশের তারাই একমাত্র আদিবাসী এবং Son of the soil বলে দাবি করতে পারে। এর পেছনে অনেক জাতিতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও প্রমাণ রয়েছে। বাঙালি নামের বাংলাদেশের এই আদিবাসীরা যদিও একটি মিশ্র জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত যেখানে বহু জানা-অজানা আদি জনধারার সংমিশ্রণ সাধিত হয়েছে। তবুও যেহেতু এসব জনগোষ্ঠীর এদেশ সুস্পষ্ট অস্তিত্বের ইতিহাস সম্পূর্ণভাবে অজানা এবং স্মরণাতীতকাল থেকে এদের পূর্বপুরুষরা এই সমভূমিতে এসে বসতি স্থাপন করেছে সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই একমাত্র তারাই অর্থাৎ বাঙালিরাই Son of the soil বা আদিবাসী। বিশ্বের তাবৎ শীর্ষস্থানীয় নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষক এ ব্যাপারে একমত।

বাংলাদেশে অবস্থিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো কেন আদিবাসী নয়, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর আগমনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। ৫৯০ খ্রিস্টাব্দে পার্বত্য ত্রিপুরা রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা জুয়া রুপা (বীর রাজা) আরাকান রাজাকে পরাজিত করে রাঙ্গামাটিতে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। ৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে আরাকান রাজা সুলা সান্দ্র (Tsula Tsandra, 951-957 A.D) চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আবার দখল করে নেন। ১২৪০ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা রাজা পুনরায় এটিকে উদ্ধার করেন। সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ (১৩৩৮-১৩৪৯) চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু অংশ অধিকার করেন। বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শনের কারনে ১৪১৮ সালে চাকমা রাজা মেয়ান শ্লী (Mowan Tsni) বর্মা হতে বিতাড়িত হয়ে আলীকদমে একজন মুসলিম রাজকর্মচারীর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি (রাজকর্মচারী) রামু এবং টেকনাফে চাকমাদের বসতি স্থাপনের অনুমতি দেন। পার্বত্য এলাকায় সর্বপ্রথম বসতি স্থাপন করে কুকী গোত্রের (লসাই, পাংখু, মোরো, খুমি) উপজাতীয়রা। তাদের আগমন ঘটে উত্তর-পূর্ব দিক (সিনলুই ও চীন) হতে। এরপর ভারতের ত্রিপুরা এবং পার্শ্ববর্তী প্রদেশ হতে ত্রিপুরা গোত্রীয় বিভিন্ন উপজাতীয় (ত্রিপুরা, মরং, তংচংগা ও রিয়াং) আসে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকানী গোত্র (চাকমা ও মগ) এ এলাকায় আগমন করে। কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকান-বার্মা যুদ্ধের সময় মগরা তাদের এ এলাকা ছেড়ে উত্তর দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে চলে যেতে বাধ্য করে। উত্তর দিকে আরকানী গোত্রদের আগমনের ফলে কুকীরা উত্তর-পূর্ব দিকে সরে যেতে বাধ্য হয়। সংক্ষিপ্ত ইতিহাস হতে সহজেই বুঝা যায়, বাংলাদেশে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এদেশের আদিবাসী নয়।

একইভাবে ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, সমতলের উপজাতীয় সম্প্রদায় যেমন সাঁওতাল, গারো, হাজং, মনিপুরী প্রভৃতির বাংলাদেশে আগমনের ইতিহাস তিন-চারশ’ বছরের বেশি নয়। উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, সাঁওতাল সম্প্রদায় রেল সম্প্রসারণের কাজে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ভারতের উড়িষ্যা ও বিহার অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে আসে। কাজেই উপযুক্ত আলোচনায় প্রমাণিত হয় আভিধানিকভাবে বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী কোনোভাবেই এখানকার স্বদেশজাত বা ভূমিপুত্র বা আদিবাসী নয়। প্রখ্যাত উপজাতি গবেষক ও নৃতত্ত্ববিদ RHS Hutchison (1960), TH Lewin (1869), অমেরেন্দ্র লাল খিসা, Jaffa (1989) Ges  Ahmed (1959) প্রমুখের লেখা, গবেষণাপত্র, থিসিস এবং রিপোর্ট বিশ্লেষণে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়, উপ-জাতীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী গুলো আদিবাসী নয়। তারা সবাই একবাক্যে বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজাতীয়রা নিকট অতীতের কয়েক দশক থেকে নিয়ে মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে এদেশে স্থানান্তরিত হয়ে অভিবাসিত হয়েছে।

খোদ চাকমা পন্ডিত অমরেন্দ্র লাল খিসা অরিজিনস অব চাকমা পিপলস অব হিলট্রাক্ট চিটাগাং-এ লিখেছেন, তারা এসেছেন মংখেমারের আখড়া থেকে পরবর্তীতে আরাকান এলাকায় এবং মগ কর্তৃক তাড়িত হয়ে বান্দরবানে অনুপ্রবেশ করেন। আজ থেকে আড়াইশ-তিনশ’ বছর পূর্বে তারা ছড়িয়ে পড়েন উত্তর দিকে রাঙ্গামাটি এলাকায়। এর প্রমাণ ১৯৬৬ বাংলাদেশ জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি প্রকাশিত দি অরিয়েন্টাল জিওগ্রাফার জার্নাল। পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান লোকসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বাঙালি এবং বাকি অর্ধেক বিভিন্ন মঙ্গোলীয় গোষ্ঠীভুক্ত উপজাতীয় শ্রেণীভুক্ত। এ কথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য, আদিকাল থেকে এ অঞ্চলে উপজাতি জনগোষ্ঠীর বাইরের ভূমিপুত্র বাঙালিরা বসবাস করে আসছে তবে জনবসতি কম হওয়ায় বিভিন্ন ঘটনা বা পরিস্থিতির কারণে আশপাসের দেশ থেকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন এসে বসতি স্থাপন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকি জাতিবহির্ভূত অন্য সব উপজাতীয় গোষ্ঠীই এখানে তুলনামূলকভাবে নতুন বসতি স্থাপনকারী। এখানকার আদিম জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ম্রো, খ্যাং, পাংখো, কুকিরা মূল কুকি উপজাতির ধারাভুক্ত। ধারণা করা হয়, এরা প্রায় ২শ’ থেকে ৫শ’ বছর আগে এখানে স্থানান্তরিত হয়ে আগমন করে। চাকমা রাজা দেড়শ’ থেকে ৩শ’ বছর পূর্বে মোগল শাসনামলের শেষ দিকে ব্রিটিশ শাসনামলের প্রথম দিকে মায়ানমার আরকান অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে (Lewin 1869)।

প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এবং ব্রিটিশ প্রশাসক টি.এইচ. লেইউইনের মতে \”A greater portion of the hill at present living in the Chittagong Hill Tracts undoubtedly come about two generations ago for Aracan. This is asserted both by their own traditions and by records in Chittagong Collectorate.\” (Lewin, 1869, P-28)। পার্বত্য অঞ্চলের মারমা বা মগ জনগোষ্ঠী ১৭৮৪ সালে এ অঞ্চলে দলে দলে অনুপ্রবেশ করে এবং আধিপত্য বিস্তার করে। (Shelley, 1992 and Lewin, 1869)। এরা ধর্মে বৌদ্ধ মতাবলম্বী। এরা তিনটি ধারায় বিভক্ত। যেমন : জুমিয়া, রোয়াং ও রাজবংশী মারমা। বোমরা মায়ানমার-চীন পর্বত থেকে নিয়ে তাশন পর্যন্ত বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম আগমন করে। শুধু ভাষাতাত্ত্বিক বিবেচনায়ই নয়, বরং অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের নিরিখেও দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে ঐসব মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মিলের চেয়ে অমিল এবং বিস্তর অনৈক্য বর্তমান।এদের এক একটি জনগোষ্ঠীর বিবাহ রীতি, আত্মীয়তা সম্পর্ক (Keenship Relations), সম্পত্তির মালিকানা বণ্টন রীতি এবং উত্তরাধিকার প্রথা, জন্ম ও মৃত্যুর সামাজিক ও ধর্মীয় কৃত্যাদি বা অন্যান্য সামাজিক প্রথা এবং রীতি এক এক ধরনের এবং প্রায় প্রত্যেকটি আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত (Denise and Bernot, 1957)।

পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এসব জনগোষ্ঠীগুলো প্রায় সবাই যুদ্ধবিগ্রহ এবং হিং¯্র দাঙ্গা-হাঙ্গামার ফলে তাদের পুরাতন বসতিস্থান থেকে এখানে পালিয়ে এসেছে। নতুবা, এক জনগোষ্ঠী অন্য জনগোষ্ঠীর পশ্চাৎধাবন করে আক্রমণকারী হিসেবে এদেশে প্রবেশ করেছে (Huchinson 1909, Bernot 1960 and Risley 1991) | বর্তমানে এদের পরস্পরের মধ্যে প্রচুর রেষারেষি এবং দ্বন্দ্ব বিদ্যমান রয়েছে বলে জানা যায় (Belal, 1992) । পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের জনসংখ্যার বণ্টনচিত্রও সমান নয়। এরা গোষ্ঠী ও জাতিতে বিভক্ত হয়ে সারা পার্বত্য অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করে। তবে কোনো কোনো স্থানে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে মিশ্র জনসংখ্যা দৃষ্টিগোচর হয়। চাকমারা প্রধানত পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলের চাকমা সার্কেলে কর্ণফুলী অববাহিকা এবং রাঙ্গামাটি অঞ্চলে বাস করে।

মগরা (মারমা) পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণাংশের বোমাং এবং মং সার্কেলে বাস করে। ত্রিপুরা (টিপরা)গণ পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি সার্কেলে অর্থাৎ চাকমা সার্কেল, বোমাং সার্কেল এবং মং সার্কেল সকল স্থানেই ছড়িয়ে থাকলেও নিজেরা দলবেঁধে থাকে। ¤্রাে, থ্যাং, খুমী এবং মরং বোমাং সার্কেলের বাসিন্দা। বাংলাভাষী বাঙালি অভিবাসীরা সারা পার্বত্য চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়লেও এদের বেশিরভাগই দলবদ্ধভাবে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রামগড় প্রভৃতি শহরাঞ্চলে বসবাস করে। বাকি বাঙালি জনসংখ্যা এখানকার উর্বর উপত্যকাগুলো সমভূমিতে গুচ্ছগ্রামে বসবাস করে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের বাদ দিলে এখন আসে এদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট-মৌলভীবাজারের খাসিয়া, মনিপুরী, পাত্র (পাত্তর) গোষ্ঠীর কথা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল অঞ্চলের গারোদের কথা এবং দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুরের কুচ রাজবংশী সাঁওতাল, ওরাও ও মুন্ডাদের কথা। এদের সবাই সংখ্যার দিক বিচারে খুব নগণ্য ও বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, সিলেট অঞ্চলের খাসিয়া, মনিপুরী ও পাত্ররা তৎকালীন বৃহত্তর আসামের খাসিয়া-জয়ন্তী পাহাড়, মনিপুর, কাঁচাড় ও অন্যান্য সংলগ্ন দুর্গম বনাচ্ছাদিত আরণ্যক জনপদ থেকে যুদ্ধ, আগ্রাসন, মহামারী এবং জীবিকার অন্বেষণে সুরমা অববাহিকায় প্রবেশ করে ও সিলেটের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে বসতি স্থাপন করে।

নৃ-বিজ্ঞান ও ভৌগোলিক জ্ঞানের সকল বিশ্লেষণেই এরা উপজাতীয় এবং ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠী বৈ আর কিছুই নয়। এরা কোনো বিবেচনায়ই সিলেটের আদিবাসী হতে পারে না। এরা আদি আরণ্যক পার্বত্য নিবাসের (আসাম, মণিপুর, মেঘালয় ইত্যাদি) আদিবাসী হলেও যখন স্থানান্তরিত হয়ে নতুন ভূখণ্ডে আসে জাতি সেখানে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ক্ষুদ্র উপজাতীয় গোষ্ঠী কিংবা ভিন্ন সংস্কৃতির ক্ষুদ্র জাতিসত্তা হিসেবে সমান্তরালভাবে থাকতে পারে। কিন্তু কখনো তারা নতুন জায়গায় আদিবাসী হতে পারে না। ঠিক একইভাবে ময়মনসিংহ (হালুয়াঘাট অঞ্চল) এবং টাঙ্গাইল অঞ্চলের (মধুপুর) গারো সিংট্যানেরা ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের পরে এদের অনেকে তাদের আদিনিবাস ভারতের উত্তরের গারো পাহাড়ে ফিরে গেলেও বেশ কিছুসংখ্যক গারো ও সিংট্যানা বাংলাদেশের ঐসব অঞ্চলে রয়ে গেছে। গারোদের আদি নিবাস ভারতের গারোল্যান্ড। কোনোক্রমেই ময়মনসিংহ কিংবা টাঙ্গাইলের তারা আদিবাসী নয়।

আরো বলা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে আজ থেকে ৬০-৭০ কিংবা একশ’-সোয়াশ’ বছর আগে সিলেটের শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং উত্তর সিলেটের কোন নিচু পাহাড়ি অঞ্চলে চা বাগান স্থাপনের জন্য ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা বর্তমান ভারতের বিহার, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন জঙ্গলাকীর্ণ মালভূমি অঞ্চল যেমন: ছোট নাগপুরের বীরভুম, সীঙভুম, মানভূম, বাকুড়া, দুমকা, বর্ধমান প্রভৃতি অঞ্চল যা তৎকালীন সাঁওতাল পরগণাখ্যাত ছিল সেসব অঞ্চলে গরিব অরণ্যচারী আদিবাসী সাঁওতাল, মুন্ডা, কুল, বীর, অঁরাও, বাউরী ইত্যাদি নানা নামের কৃষ্ণকায় আদিক জনগোষ্ঠীর মানুষকে শ্রমিক হিসেবে স্থানান্তরিত করে অভিবাসী হিসেবে নিয়ে আসে। একইভাবে যুদ্ধ, মহামারী থেকে আত্মরক্ষার জন্য এবং জীবিকার সন্ধানে রাজমহলের গিরিপথ ডিঙ্গিয়ে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের বরেন্দ্রভূমি অঞ্চলে (রাজশাহী, দিনাজপুর ও রংপুর) বসবাস শুরু করে। উত্তরাঞ্চলের কুচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলা থেকে দক্ষিণের রংপুর-দিনাজপুরের নদী অববাহিকাম-িত সমভূমিতে নেমে বসবাস শুরু করে কুচ-রাজবংশী জনগোষ্ঠী। এর সকলেই তাদের মূল নিবাসের আদিবাসী হিসেবে বিবেচ্য হলেও কোনো যুক্তিতে তাদের নতুন আবাসস্থল বাংলাদেশের ঐসব অঞ্চলের আদিবাসী বা ভূমিপুত্র হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে না।

উল্লেখ্য, রংপুর, দিনাজপুর ও রাজশাহী অঞ্চলের নি¤œবর্ণের হিন্দুদের সাথে ও স্থানীয় অন্যান্য বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাথে কুচ রাজবংশীদের অনেকে সমসংস্কৃতিকরণ প্রক্রিয়ার (Acculturation Process) মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একীভূত (Assimilated) হয়ে গেছে। মানবিক বিবেচনার মহানুভবতায় এদেশে বসবাসকারী মানবগোষ্ঠীর সমান মর্যাদা, অধিকার ও স্বীয় জাতি, ভাষা, ধর্ম অথবা সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের পূর্ণ অধিকার এবং সম্মান নিয়ে সবাই স্বকীয়তায় সমান্তরাল চলতে পারে বা মিশে যেতে পারে। কিন্তু কোনো বিবেচনায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ বাংলাদেশের আদিবাসী নয়।বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠীরা আদিবাসী হিসেবে কোথাও স্বীকৃত নয়। সরকার তাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকার করে না। এরা আদিবাসী হলে অবশ্যই জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে আমরা মানতাম। বাংলাদেশে বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরাই আদি জনধারার অংশ। তাছাড়া আর কেউ আদিবাসী নয়।

কাজেই জাতিসংঘ ও আইএলওর সংজ্ঞার অপব্যাখ্যা করে বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীদের আদিবাসী বানানোর কোনো সুযোগ নেই। বরং ওইসব কনভেনশন ও চার্টার অনুযায়ী ট্রাইবাল বা উপজাতির যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা বিচার করেই নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো উপজাতি। একই কারণে আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘ চার্টার বাংলাদেশের উপজাতিদের জন্য প্রযোজ্য নয়। বিশ্ব আদিবাসী দিবসে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রকৃত আদিবাসীদের স্বার্থ সংরক্ষিত হোক এবং তাদের অধিকার বাস্তবায়িত হোক, এই আমাদের কামনা।

আদিবাসী প্রসংগে কিছু কথা

ড.ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী

ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী

সাম্প্রতিককালে আদিবাসী, দলিত ইত্যাদি বিভিন্ন নামে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছোট ছোট জনগোষ্ঠিকে সংগঠিত করার উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের ‘স্বকীয়তা’র সুরক্ষার নামে নতুন করে তাদের মুখের ভাষার জন্য বর্ণমালা তৈরী বা ‘লৈখিক ভাষা’ সৃষ্টিরও প্রয়াস চলছে । এ ক্ষেত্রে কিছু বিদেশী সংস্থার উদার পৃষ্ঠপোষকতা লক্ষ্যণীয়। এই কর্মকান্ড এই সকল ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠিকে আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক-সংস্কৃতিক-সামাজিক পরিমন্ডল থেকে পৃথক করে রাখার কোন দীর্ঘমেয়াদী কার্যক্রমের অংশ কি-না, তা’ অবশ্যই বিবেচনার দাবী রাখে।

পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠির প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করা ভালো কাজ, সন্দেহ নেই। কিন্তু তা’ করতে গিয়ে দেশের বৃহত্তর জনসমষ্টির সাথে তাদের দূরত্ব বাড়িয়ে দেওয়া, কিংবা বৈরী অবস্থান তৈরী করা মোটেই বাঞ্চনীয় নয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, ইউরোপ-আমেরিকার কিছু সংস্থা এখন দেশে দেশে ‘আদিবাসী’ খুঁজে বেড়াচ্ছে। ইন্টারনেট সূত্রে জানা যায়, খ্রীষ্ট-ধর্ম প্রচারে অতি-উৎসাহী-কিছু চার্চ পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে মাত্র ৫ হাজার জনসংখ্যার কোন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির সন্ধান পেলেই তাকে টার্গেট করে কাজ শুরু করছে।

প্রথমে চিহ্নিত জনগোষ্ঠির ধর্ম-বিশ্বাস, সামাজিক কাঠামো, ভাষা, জীবন-প্রণালী ইত্যাদি ভালোভাবে অনুসন্ধান করা হয়। তারপর তৈরী হয় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও প্রকল্প। অনেকটা ‘টেন্ডার’ আহ্বান করার মত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের চার্চ সম্প্রদায়ের সাথে যোগাযোগ করে একটি চার্চ এর উপর ঐ বিশেষ জনগোষ্ঠির ’দায়িত’¡ অর্পন করা হয়। ঐ অত:পর চার্চের ব্যবস্থাপনায় সেখানে শুরু হয় ’এনজিও’ কার্যক্রম। পশ্চিমা জগতের কয়েকটি শক্তিমান রাষ্ট্র তাদের রাজনৈতিক-সামরিক ও কৌশলগত স্বার্থের সহযোগী তৈরীর লক্ষ্য নিয়ে এই কার্যক্রমে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে চলেছে।

শুরুতে দান-দক্ষিণা এবং সদুপদেশের মাধ্যমে সখ্যতা এবং নির্ভরশীলতা গড়ে তোলা হয়। এভাবে টার্গেট জনগোষ্ঠির কাছে তাঁরা হয়ে ওঠেন ত্রাণ-কর্তা। অত:পর চলতে থাকে চিহ্নিত জনগোষ্ঠিকে তার পারিপার্শ্বিক বৃহত্তর জনগোষ্ঠি থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া। তাদেরকে বোঝানো হয় পারিপার্শ্বিক জনগোষ্ঠির শোষণ ও অবহেলার কারণেই তারা পিছিয়ে আছে। একাজে হাতের কাছে পাওয়া যায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠির কিছু মানুষকেও। যাঁরা নিজ নিজ এনজিও কার্যক্রমে উদার সহযোগিতার বিনিময়ে পুঁজিবাদের বিশ্ববিজয়ের এই সুদূরপ্রসারী নব-অভিযানে পথ-প্রদর্শক ও ‘লোকাল কোলাবরেটর’ এর ভূমিকা পালন করেন নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে।

কিছু রাজনৈতিক দল-উপদলকেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠির বিপরীতে এই সকল ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির মধ্যে সমর্থক সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে দেখা যায়। তাঁরা কথিত ‘আদিবাসী’ সম্প্রদায়ের কাছে জনপ্রিয় হতে গিয়ে এমন সব কথা বলেন যা বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় স্বার্থের জন্য সংকট সৃষ্টি করে। পরবর্তী ধাপে শুরু হয় ধর্মান্তরকরণ। এভাবেই মিজো, নাগা, গারো, খসিয়া, বোড়ো, টিপরা সম্প্রদায় সহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় সব ক্ষুদ্র জাতি-উপজাতি আজ খ্রীষ্ট ধর্মের বলয়ে।

আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামেও একই ধারায় কাজ চলছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ইন্টারনেটে বেশ কয়েকটি ওয়েব সাইট চালু রয়েছে বহুকাল ধরে। এগুলোতে যে ধরণের dis-information প্রচার করা হয় তা’ রীতিমত উদ্বেগজনক। এসব অপপ্রচারের জবাব দেয়ার মত পাল্টা কোন ব্যবস্থা নেই। না সরকারের পক্ষ থেকে, না কোন রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে।

আদিবাসী কে?
‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে-একটি অঞ্চলে সুপ্রাচীন অতীত থেকে বাস করছে এমন জনগোষ্ঠি। সেই বিচারে আজকের বাংলাদেশের ‘আদিবাসী’ বা আদি-বাসিন্দা কারা?

ক্ষুদ্র জাতি-উপজাতি হলেই ‘আদিবাসী’ বা আদি-বাসিন্দা হবে তেমন কোন কথা নয়। বাংলাদেশের বৃহত্তর পরিম-লে ‘আদিবাসী’ বা আদি-বাসিন্দাদের উত্তরসূরী হবার প্রথম দাবীদার এদেশের কৃষক সম্প্রদায়, যারা বংশ পরম্পরায় শতাব্দির পর শতাব্দি মাটি কামড়ে পড়ে আছে। বান-ভাসি, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, নদী-ভাঙ্গন, ভিনদেশী হামলা–কোন কিছুই তাদেরকে জমি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। নদীভাঙ্গনে কেবল এখান থেকে ওখানে, নদীর এক তীর থেকে অপর তীরে সরে গেছে। এ মাটিতেই মিশে আছে তাদের শত পুরুষের রক্ত, কয়েক হাজার বছরের। কাজেই বাংলার ‘আদিবাসী’ অভিধার প্রকৃত দাবীদার বাংলার কৃষক — আদিতে প্রকৃতি পুজারী, পরবর্তীতে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান যে ধর্মের অনুসারীই হোক না কেন।

গংগা-ব্রক্ষ্মপুত্র-মেঘনার এই বদ্বীপভূমিতে আদি-অষ্ট্রিক, অষ্ট্রালয়েড, দ্রাবিড়, মোংগল, টিবেটো-বার্মান—বিচিত্র রক্তের সংমিশ্রন ঘটেছে খ্রীষ্টপূর্ব দশম শতকের পূর্বে। অত:পর ধাপে ধাপে এসেছে ‘শক-হুনদল পাঠান-মোগল’, সেই সাথে ইরানী-তুরানী-আরব। সবশেষে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক আমলে স্বল্পমাত্রায় হলেও পর্তুগীজ, আর্মেনিয়ান, ইংরেজ, ফরাসী, গ্রীক। কালের প্রবাহে বিচিত্র রক্তধারা একাকার হয়ে উদ্ভূত এক অতি-শংকর মানবপ্রজাতি-‘বাঙালী’।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বেশ কিছু ক্ষুদ্র ও খন্ড জাতি-উপজাতি আজকের দিনেও তাদের পৃথক সত্ত্বা নিয়ে বিরাজ করছে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠির মাঝখানে বা প্রান্তিক অবস্থানে থেকেও তাদের অবস্থান বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত। এর কারণ প্রথমত: আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক পরিমন্ডলে জাতিসত্ত্বার বিকাশে অপূর্ণতা এবং যথার্থ গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক সমাজচেতনার অনুপস্থিতি। দ্বিতীয়ত: অসম ও শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে সমাজের দূর্বলতর অংশের দারিদ্রের চক্রজালে আবদ্ধ থাকা এবং তৃতীয়ত: বৃহত্তর জনগোষ্ঠির মধ্যে সমাজের ক্ষুদ্রতর বা পিছিয়ে থাকা অংশের প্রতি মানবতাবোধে উজ্জীবিত ‘গ্রহনীয়’ বা রহপষঁংরাব দৃষ্টিভংগির অভাব। আমাদের সমাজে অন্য ধর্মালম্বী বা অন্য জাতি-গোষ্ঠীর কোন মানুষকে হাত বাড়িয়ে বরণ করে নেয়ার মানসিকতার অভাব খুবই স্পষ্ট। ফলে সুদীর্ঘকার পাশাপাশি বা কাছাকাছি থেকেও এসব ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী নিজ নিজ বৃত্তে আবদ্ধ থেকে গেছে।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার এতদঞ্চলে আগমন কয়েকশ’ বছরের বেশী পূর্বে নয়। বিশেষ করে চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলার চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা এই তিন প্রধান সম্প্রদায়ের এতদঞ্চলে আগমনের নানা বিবরণ সুনির্দিষ্ট ভাবে ইতিহাসে বিধৃত আছে।

চাকমাদের এতদঞ্চলে আগমন তিন- চারশ’ বছর পূর্বে। থাইল্যান্ড বা মিয়ানমারের কোন একটি অঞ্চলে গোত্রীয় সংঘাতের জের ধরে এই জনগোষ্ঠি আরাকান হয়ে কক্সবাজার এলাকা হয়ে চট্টগ্রামে আগমন করে এবং চট্টগ্রামের সমতল ভূমিতে বসতি স্থাপন করে বাস করতে থাকে। এক সময়ে তারা চট্টগ্রাম অঞ্চলে রাজশক্তিতেও পরিণত হয়েছিল। এই জনগোষ্ঠি পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানান্তরিত হয় ব্রিটিশ আমলে। ব্রিটিশরা লুসাই পাহাড়ে তাদের দখল স্থাপনের জন্য হামলা চালাবার সময় চাকমা সম্প্রদায়কে কাজে লাগায়। ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে মিজোদের বিরুদ্ধে তারা লড়াই করে। তার বিনিময়ে লড়াই শেষে তাদেরকে রাঙামাটি অঞ্চলে বসতি গড়ার সুযোগ দেয়া হয়।
মারমা সম্প্রদায়ের ইতিহাসও প্রায় একই রকম। কয়েক বছর আগে বান্দরবনের সাবেক মং রাজা অংশে প্রু চৌধুরী এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছেন-‘আমরা এই অঞ্চলে আদিবাসী নই’। বান্দরবন এলাকায় মারমা বসতি ২০০ বছরেরও পুরনো। মং রাজাদের বংশলতিকা এবং ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে লিপিবদ্ধ থাকায় এ বিষয়ে সংশয়ের কিছু নেই।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩য় বৃহৎ জনগোষ্ঠি ‘ত্রিপুরা’। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছে পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা রাজ্য থেকে। কথিত আছে সেখানকার রাজরোধ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ত্রিপুরা জনগোষ্ঠির একটি ক্ষুদ্রতর অংশ স্বেচ্ছা নির্বাসন বেছে নিয়ে এখানে এসেছে। সেটাও বেশী দিনের কথা নয়। এর বাইরে পার্বত্য চট্টগ্রামে আছে আরো ৮টি ক্ষুদ্র জাতি। তাদের কোন কোনটি চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদেরও পূর্ব থেকে এই অঞ্চলে বসবাস করছে। সংখ্যায় নগণ্য হলেও তাদের পৃথক নৃতাত্ত্বিক সত্ত্বা দৃশ্যমান । বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকায় গারো, হাজং, সাঁওতাল, ওরাঁও, রাজবংশী, মনিপুরী, খসিয়া প্রভৃতি বিভিন্ন জনগোষ্ঠী রয়েছে। এদের অধিকাংশেরই বৃহত্তর অংশ রয়েছে প্রতিবেশী ভারতে। ক্ষুদ্রতর একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে আগে-পরে বাংলাদেশে এসেছে। তারাও দীর্ঘকাল ধরে এদেশে বসবাস করছে বিধায় এদেশের নাগরিক হিসেবে সমঅধিকার ও সমসুযোগ তাদের অবশ্যপ্রাপ্য। তবে এদের কোনটিই বাংলাদেশের আদি বাসিন্দা বা ’আদিবাসী’ নয়।

এই সকল জনগোষ্ঠির প্রধান দাবী তাদের পৃথক জাতিস্বত্ত্বার স্বীকৃতি । সরকার এসব জনগোষ্ঠিকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের আকাংখা অনুযায়ী পৃথক জাতি-সত্ত্বার সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদানেও কোন আপত্তি থাকা উচিত নয়। কারণ সামগ্রিক জাতীয় পরিচয়ে তাতে কোন সমস্যা দেখা দেয় না।

একটি আধুনিক জাতির-রাষ্ট্র যতই এগিয়ে যাবে তার পরিমন্ডলে অবস্থিত বিভিন্ন জনগোষ্ঠি কাল-প্রবাহে বৃহত্তর দৈশিক আবহে ততই একক ও অভিন্ন পরিচয়ে ধাতস্থ হয়ে যাবে। এটাই ইতিহাসের ধারা। দুনিয়া জুড়ে প্রতিটি জাতি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই অসংখ্য ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা বিরাজমান। এক হিসাবে পৃথিবীতে এখনও এরকম ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৫০০০। এদের প্রত্যেকের পৃথক সত্ত্বার স্বীকৃতি মেনে নিয়েই তাদেরকে আত্মস্থ করে নিতে উদ্যোগী হতে হবে সব জাতি-রাষ্ট্রকে। সেজন্যে প্রয়োজন উদার ও সংবেদনশীল মানসিকতা। পিছিয়ে থাকা গোষ্ঠির প্রতি সহমর্মিতা। তাদেরকে পিছিয়ে থাকা অবস্থান থেকে অতিদ্রুত সামগ্রিক জাতীয় পরিমন্ডলে অন্যদের সমকক্ষতায় নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় ত্যাগ-স্বীকারের মানসিকতা।

পশ্চিমা বিশ্ব এখানেই বাধ সাধছে:
পশ্চিমা বিশ্ব এখানেই বাধ সাধছে। একদিকে সারা দুনিয়াজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘নোডাল পয়েন্ট’ গুলিতে সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলা হয়েছে। অন্যদিকে চলছে বিভিন্ন দেশের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠিগুলোকে পশ্চিমা জগতের ‘আউটপোষ্টে’ পরিণত করা এবং সংশ্লিষ্ট জাতি-রাষ্ট্রের বৃহত্তর জনগোষ্ঠি থেকে তাদেরকে পৃথক করে দুনিয়া জুড়ে পশ্চিমের কায়েমী স্বার্থের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
‘আদিবাসী’ শ্লোাগানটি এক্ষেত্রে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী: রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক। ই-মেইল-shapshin@gtlbd.com

বাংলাদেশে ওরা আদিবাসী নয় : ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী

chakma

অধ্যাপক মাহফুজ আহমেদ

পৃথিবীর অনেক দেশের সাথে বাংলাদেশে প্রতি বছরের মতো এ বছরও আগামীকাল ৯ আগস্ট ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ পালিত হবে। অস্ট্রেলিয়ান এবরিজিন, যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ান, নিউজিল্যান্ডের মাউরি, দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা ও মায়া, জাপানের আইনু, রাশিয়ার মেনেট, ফ্রান্স ও স্পেনে বাসকু, আরব বেদুইন প্রভৃতি জনগোষ্ঠী প্রাচীন কাল থেকেই আদিবাসী হিসেবে বিশ্বে পরিচিত। বাংলাদেশে আদিবাসী কারা-এই নিয়েও একটি বিতর্ক ইদানীং চালু হয়েছে। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর যে অংশটি নিজেদের হঠাৎ আদিবাসী বলে দাবি করতে শুরু করছে তারা কিন্তু কয়েক বছর আগেও নিজেদের এ পরিচয়ে পরিচিত করাতে চায়নি। তারা দীর্ঘ দিন ধরে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা অথবা নিজস্ব গোত্র পরিচয়েই পরিচিত হবার দাবি করে আসছিল। গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭ সালে জাতিসংঘ সদর দপ্তর নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples  অর্থাৎ ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র’ জারি হওয়ার পর হঠাৎ করে তারা নিজেদের আদিবাসী বলে দাবি করতে শুরু করেন। এরকম হঠাৎ করে আদিবাসী হতে চাওয়ার নজির বিশ্বে আর কোথাও নেই। ইস্যুটি পুরাতন না হলেও তা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ইতিহাস, অখ-তা ও সার্বভৌমত্বের উপর প্রভাব ফেলেছে।

যে বিষয়টি সবচেয়ে ভয়ংকর এবং আত্মঘাতী তা হচ্ছে আমাদের মিডিয়া ও সুশীল সমাজের একটি অংশের জোরাল সমর্থন ও আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে তারা ইতোমধ্যে বিষয়টিকে মেনে নেওয়ার জন্য সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী সরকার তাদের দাবির কাছে কিছুটা নমনীয় হয়ে বাংলাদেশের সংবিধানে এ সকল জাতিসত্ত্বাকে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আর এই সুযোগে ‘তফসিলী সম্প্রদায়’ভুক্ত জনগোষ্ঠীও (যারা উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হওয়ার বৈশিষ্ট্যধারী নয়) ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে গেছে। অথচ এ সকল জনগোষ্ঠীর মূল অংশ ভারতে এখনো সাংবিধানিকভাবে ‘তফসিলী সম্প্রদায়’ (Schedule Cast) হিসেবে চিহ্নিত, পরিচিত ও সুবিধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।

আদিবাসীর সংজ্ঞা ও জাতিসংঘ কনভেনশন/ঘোষণা 

আদিবাসী বিতর্কের সমাধানে প্রথমেই আমাদের আদিবাসীর সংজ্ঞা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। আদিবাসী বিষয়ে দুই ধরনের সংজ্ঞা পাওয়া যায়। একটি আভিধানিক সংজ্ঞা এবং অন্যটি জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত সংজ্ঞা। প্রথমেই দেখা যাক আভিধানিক সংজ্ঞায় আদিবাসী মানে কী? আদিবাসী শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Indigenous People. অনেকে আবার আদিবাসী শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে Aborigine শব্দটি ব্যবহার করেন। যাতে প্রকৃতপক্ষে সার্বজনীনভাবে আদিবাসী বোঝায় না। Aborigine বলতে সুনির্দিষ্টভাবে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের বোঝায়। অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে Aborigine শব্দের অর্থ বলা হয়েছে, A person, animal or plant that has been in a country or region from earliest times; An aboriginal inhabitant of Australia.  একইভাবে Red Indian বলতে যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসীদের বোঝায়; অস্ট্রেলিয়ান এবরিজিন বা আদিবাসীদের বোঝায় না। এ ছাড়াও বিভিন্ন ডিকশনারিতে আদিবাসী বিষয়ে যে সকল সংজ্ঞা ও প্রতিশব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা হচ্ছে : Aborigine: earliest, primitive, a member of a race of people who were the original living in a country, specially Australia.

অন্যদিকে বিভিন্ন অভিধানে নিম্নরূপে Indigenous- এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে; Indigenous: belonging to a particular place rather than coming to it from somewhere else.  চেম্বার্স ডিকশনারিতে Indigenous, Native born, originating or produced naturally in a country, not imported. এখানে Indigenous শব্দের বিপরীত শব্দ হিসেবে exotic শব্দটিকে ব্যবহার করা হয়েছে যার অর্থ হচ্ছে ‘বহিরাগত’। আভিধানিকভাবে আদিবাসী শব্দের অর্থ দেশি, স্বদেশজাত বা ভূমিপুত্র। একইভাবে বাংলা একাডেমির অভিধানে Indigenous শব্দের অর্থ বলা হয়েছে: দেশি, দৈশিক, স্বদেশীয়, স্বদেশজাত। কোলকাতা থেকে প্রকাশিত সংসদ অভিধানে Indigenous শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে: স্বদেশজাত, দেশীয়। অন্যদিকে নৃতাত্ত্বিক সংজ্ঞায় আদিবাসী হচ্ছে কোনো অঞ্চলের আদি ও অকৃত্রিম ভূমিপুত্র বা Son of the Soil. প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী ‘আদিবাসী হচ্ছে কোনো স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই’।

এখন দেখা যাক জাতিসংঘ উপজাতি ও আদিবাসীর সংজ্ঞা কীভাবে নির্ধারণ করেছে। উপজাতি ও আদিবাসী বিষয়ে জাতিসংঘ ও এর অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে এ পর্যন্ত প্রধানত তিনটি চার্টারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। (১) জাতিসংঘের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার International Labour Organization (ILO) ১৯৫৭ সালের ৫ জুন অনুষ্ঠিত ৪০তম অধিবেশনে প্রদত্ত Indigenous and Tribal Populations Convention-1957 (No.107); (২) আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ১৯৮৯ সালের ৭ জুন অনুষ্ঠিত ৭৬তম অধিবেশনে প্রদত্ত Indigenous and Tribal Populations Convention -1989 (No.169) এবং (৩) ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples বা ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র’।

উপর্যুক্ত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার প্রথম চার্টার দুটি (No.107 ও No.169) বিশেষভাবে লক্ষণীয় যাতে আদিবাসী ও উপজাতি বিষয়ক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সংযোজন করা হয়েছে। এই কনভেনশন দুটিতে উপজাতি ও আদিবাসীদের জন্য আলাদা সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। কনভেনশনে পাস হওয়া ধারাগুলো একই সাথে আদিবাসী ও উপজাতি নির্ধারণ এবং তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে; শুধু আদিবাসীদের নয়। অথচ বাংলাদেশে এই চার্টারকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একান্তভাবে আদিবাসীদের হিসেবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে ২০০৭ সালের The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples- শীর্ষক ঘোষণাপত্রটি শুধুমাত্র আদিবাসীদের স্বার্থ-সংশ্লি¬ষ্ট বিষয়াদি নিয়ে। এই ঘোষণাপত্রটিতে উপজাতিদের বিষয়ে কোনো কিছুই উল্লেখ করা হয়নি; এমনকি আদিবাসীদের সংজ্ঞাও নির্ধারণ করা হয়নি।

ppppppp

উপর্যুক্ত দুটি সংজ্ঞা পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কর্তৃক উপজাতি ও আদিবাসী সংজ্ঞার মূল পার্থক্য হচ্ছে নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস বা অধিকৃত হওয়ার বা উপনিবেশ সৃষ্টির পূর্ব থেকে বসবাস করা। বাকি শর্তগুলো মোটামুটি একই রকম। অর্থাৎ একটি জনগোষ্ঠী উপজাতি অথবা আদিবাসী হবেন উপর্যুক্ত শর্তের ভিত্তিতে। আইএলওর এই সংজ্ঞাটি যদি বাংলাদেশের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণের ক্ষেত্রে বিচার করা হয় তাহলে পরিষ্কার বোঝা যায় এরা আদিবাসী নয়; উপজাতি। কিন্তু বাংলাদেশের মিডিয়া ও সুশীল সমাজের কিছু ব্যক্তিবর্গ জাতিসংঘ কনভেনশনের উপস্থাপিত সংজ্ঞাটির Tribal বা ‘উপজাতি’ অংশটি সম্পূর্ণ চেপে গিয়ে শুধু Indigenous বা ‘আদিবাসী’র সংজ্ঞাটি উপস্থাপন করেন।

এখন পর্যবেক্ষণ করা যাক, বাংলাদেশের জন্য ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬১তম অধিবেশনের United Nation Declaration on the Rights of Indigenous Peoples বা ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র’, প্রযোজ্য কিনা। ঘোষণাপত্রটির উদ্দেশ্য মহৎ হলেও এটি অনেক ক্ষেত্রে সংগতিপূর্ণ নয় এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতা বা সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে এর গ্রহণযোগ্যতা অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ এবং এই ঘোষণাপত্রের নিম্নোক্ত ধারাগুলো বিশেষভাবে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন :

Article 3 : Indigenous peoples have the right to self-determination. By virtue of that right they freely determine their political status and freely pursue their economic, social and cultural development.  অর্থাৎ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে সেই অধিকার বলে তারা অবাধে তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করে এবং অবাধে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সংস্কৃতিক কর্ম প্রয়াস অব্যাহত রাখতে পারবে।

Article 4 : Indigenous peoples, in exercising their right to self-determination, have the right to autonomy or self-government in matters relating to their internal and local affairs, as well as ways and means for financing their autonomous functions. অর্থাৎ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী আত্মনিয়ন্ত্রাধিকার চর্চার বেলায় তাদের অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ের ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন বা স্বশাসিত সরকারের অধিকার রয়েছে এবং তাদের স্বশাসনের কার্যাবলীর জন্য অর্থায়নের পন্থা ও উৎসের ক্ষেত্রেও অনুরূপ অধিকার থাকবে।

Article 5 : Indigenous peoples have the right to maintain and strengthen their distinct political, legal, economic, social and cultural institutions, while retaining their right to participate fully, if they so choose, in the political, economic, social and cultural life of the State. অর্থাৎ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী যদি পছন্দ করে তাহলে রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশ গ্রহণের পূর্ণ অধিকার রেখে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র রাজনৈতিক, আইনী, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অক্ষুণ্ণ রাখা ও শক্তিশালীকরণের অধিকার থাকবে।

Article 10 : Indigenous peoples shall not be forcibly removed from their lands or territories.  অর্থাৎ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীকে তাদের ভূমি বা ভূখণ্ড থেকে জবরদস্তিমূলকভাবে উৎখাত করা যাবে না।

Article 20 : 1. Indigenous peoples have the right to maintain and develop their political, economic and social systems or institutions.  অর্থাৎ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী তাদের জীবন-জীবিকা উন্নয়নের নিজস্ব ধারা নিশ্চিত করার জন্য এবং তাদের ঐতিহ্যগত ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কার্যক্রমে স্বাধীনভাবে নিযুক্ত থাকার জন্য তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা বা প্রতিষ্ঠান বজায় রাখা ও উন্নয়নের অধিকার থাকবে।

Article 30 : 1. Military activities shall not take place in the lands or territories of indigenous peoples, unless justified by a relevant public interest or otherwise freely agreed with or requested by the indigenous peoples concerned. অর্থাৎ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি কিংবা ভূখন্ডে সামরিক কার্যক্রম হাতে নেওয়া যাবে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত উপযুক্ত জনস্বার্থের প্রয়োজনে যুক্তিগ্রাহ্য হবে, অন্যথায় যদি সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় সম্মতি স্থাপন বা অনুরোধ করে।

উপরোক্ত ধারাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে United Nation Declaration on the Rights of Indigenous Peoples বা ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র’ অনুসারে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর তাদেরকে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, স্বতন্ত্র তথা স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। এমনকি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি তারা মনে করে যে তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রে থাকবে না বা ভারতেও যোগ দেবে না; তবে তারা স্বাধীন রাষ্ট্র স্থাপন করতে পারবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রে থাকলেও তারা যে অঞ্চলে বাস করে সেই অঞ্চলের ভূমির মালিকানা বাংলাদেশের হবে না এবং সে অঞ্চলে সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। তারা আত্মনিয়ন্ত্রণ, স্বায়ত্তশাসন, স্বশাসিত সরকার ও তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক, সামাজিক, সংস্কৃতিক ও আইনী কার্যক্রম এবং তা পরিচালনার জন্য স্বনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করতে পারবে। উপর্যুক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত হলে প্রকারান্তরে তা এই অঞ্চলের উপর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ খর্ব করবে।

Indigenous and Tribal Populations Convention-1957 (No.107) ১৯৫৭ সালে পাস হলেও এ পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২৭টি দেশ এই কনভেনশনটি র‌্যাটিফাই করেছে। ১৯৭২ সালের ২২ জুন বাংলাদেশও কনভেনশন ১০৭ র‌্যাটিফাই করেছিল। পরে কনভেনশন ১৬৯ পাস হওয়ার পর পূর্বোক্ত কনভেনশন ১০৭ তামাদি হয়ে গেছে এবং বাংলাদেশ অদ্যাবধি কনভেনশন ১৬৯ র‌্যাটিফাই করেনি। তাই এটি আমাদের দেশের জন্য অবশ্য পালনীয় নয়। এখানে লক্ষণীয় যে এরই মধ্যে ৮টি দেশ এই কনভেনশনকে নিন্দা করে তা থেকে বেরিয়ে গেছে। অন্যদিকে Indigenous and Tribal Populations Convention-1989 (No.169), ১৯৮৯ সালে পাস হলেও এখন পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২২টি দেশ এই কনভেনশনটি র‌্যাটিফাই করেছে। এই উপমহাদেশের একমাত্র নেপাল ছাড়া আর কোনো দেশ এই কনভেনশনটি র‌্যাটিফাই করেনি।

অন্যদিকে, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭ সালে জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক যে ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়েছে তাতে ভোটদানের সময় ১৪৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪টি দেশ বিপক্ষে, ১১টি দেশ বিরত এবং ৩৪টি দেশ অনুপস্থিত থাকে। বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত থাকে। বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া দেশগুলো হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র।

বিস্ময়কর অথবা পরিহাসের ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের তথাকথিত আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় খুব সোচ্চার ও পৃষ্ঠপোষক দেশগুলোর বেশিরভাগই কিন্তু নিজ দেশের জন্য আইএলও কনভেনশন ১০৭ বা ১৬৯ ও জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণা পত্রের সিগনেটরি নয়, পক্ষে ভোট দেয়নি এবং র‌্যাটিফাইও করেনি। কাজেই তাদের কুম্ভিরাশ্রু বর্ষণের কারণ ও মতলব বুঝতে সায়েন্টিস্ট হওয়ার প্রয়োজন নেই। এসব সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর উপজাতি, আদিবাসী কিংবা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য এই মায়াকান্নার পেছনে মূলত ভূ-রাজনৈতিক, ভূ-অর্থনৈতিক এবং সর্বোপরি আধিপত্যবাদী স্বার্থই প্রকাশ্যে কিংবা অবচেতনে প্রবলভাবে কাজ করেছে-একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

তাহলে বাংলাদেশে সত্যিকার আদিবাসী কারা : নিঃসন্দেহে বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরা এদেশের সত্যিকারের আদিবাসী। কারণ তারাই প্রোটো-অস্ট্রোলয়েড (Proto Astroloid) নামে আদি জনধারার অংশ এবং তারাই একমাত্র আদিবাসী বা Son of the Soil বলে দাবি করতে পারে। এর পেছনে জাতিতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি প্রমাণও রয়েছে। বাংলাদেশের এই অঞ্চলে বাঙালিরা বসবাস করে আসছে চার হাজার বছরেরও পূর্বে থেকে। বিক্রমপুর, ওয়ারি-বটেশ্বর, সোনারগাঁ কিংবা মহাস্থানগড় থেকে প্রাপ্ত নৃতাত্ত্বিক প্রমাণাদি এসব বিষয় নিশ্চিত করে। নৃতাত্ত্বিক ও জাতিতাত্ত্বিক ইতিহাস বিশ্লেষণে দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট ও প্রতিষ্ঠিত যে, বাংলাদেশে বসবাসরত কোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এ দেশের আদিবাসী নয়-বিশ্বের তাবৎ শীর্ষস্থানীয় নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষণাকারীরা এ ব্যাপারে একমত।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান উপজাতি চাকমাদের আদি বাসস্থান ছিল আরাকান, ত্রিপুরাদের আদি বসবাস ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে এবং মারমা জনগোষ্ঠী এসেছে বার্মা থেকে। সেই অর্থে তারা কেউই বাংলাদেশের আদিবাসী নয় বরং অভিবাসী। তারা বিভিন্ন স্থান থেকে দেশান্তরী হয়ে এদেশের নানা স্থানে অভিবাসিত হয়ে আনুমানিক তিনশ’ থেকে পাঁচশ’ বছর পূর্ব থেকে বাংলাদেশ ভূখন্ডে বসবাস করতে শুরু করেছে। তাই কোনোক্রমেই বাংলাদেশে বসবাসকারী চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এদেশের আদিবাসী হতে পারে না।

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো যে আদিবাসী নয় তার প্রমাণ : বাংলাদেশের উপজাতীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো এদেশের আদিবাসী বা ভূমিপুত্র নয় তার প্রমাণ প্রখ্যাত উপজাতি গবেষক ও নৃতত্ত্ববিদ Robert Henry Sneyd Hutchinson তাঁর বই An Account of Chittagong Hill Tracts (1906), Captain Thomas Herbart Lewin (1869), তাঁর বই The Chittagong Hill Tracts and Dwellers Therein (1869), অমেরেন্দ্র লাল খিসা (১৯৯৬) প্রমুখের লেখা, গবেষণাপত্র, থিসিস এবং রিপোর্ট বিশ্লেষণে পাওয়া যায়। তারা সবাই একবাক্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজাতীয়দের নিকট অতীতের কয়েক দশক থেকে নিয়ে মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে এদেশে স্থানান্তরিত বা অভিবাসিত হওয়ার যুক্তি প্রমাণ ও ইতিহাস তুলে ধরেছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকি জাতি বহির্ভূত অন্য সকল উপজাতীয় গোষ্ঠীই এখানে তুলনামূলকভাবে নতুন বসতি স্থাপনকারী। এখানকার সবচেয়ে আগের জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ম্রো, খিয়াং, পাংখো এবং কুকিরা মূল ‘কুকি’ উপজাতির ধারাভুক্ত। ধারণা করা হয়, এরা প্রায় তিনশ’ থেকে পাঁচশ’ বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় এসে বসবাস শুরু করেছিল। চাকমারা আজ থেকে মাত্র আড়াইশ’ থেকে তিনশ’ বছর পূর্বে মোগল শাসনামলের শেষ থেকে ব্রিটিশ শাসনামলের প্রথম দিকে মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে (খবরিহ ১৮৬৯)। প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এবং ব্রিটিশ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম জেলা প্রশাসক Thomas Herbart Lewin- এর মতে, A greater portion of the hill tribes at present living in the Chittagong Hill Tract undoubtedly came about two generations ago from Arakan. This is asserted both by their own traditions and by records in Chittagong Collect-orate. It was in some measure due to the exodus of our hill tribes from Arakan that the Burmese war of 1824 took place … hired in a great measure upon refugee from hill tribes who, fleeing from Arakan into territory, were purshed and demanded at our hands by the Burmese. (Lewin 1869, pp 28-29).  অর্থাৎ মাত্র দুই পুরুষ আগে ব্রিটিশদের সাথে বার্মা যুদ্ধের সময় চাকমারা পার্বত্য অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করে যা চট্টগ্রাম কালেক্টরেট অফিসে দলিল দস্তাবেজ থেকে নিশ্চিত হয়েছেন। অন্যদিকে পার্বত্য অঞ্চলের মারমা জনগোষ্ঠী ১৭৮৪ সনে এ অঞ্চলে বার্মা থেকে দলে দলে অনুপ্রবেশ করে এবং বসবাস শুরু করে (Shelley, 1992 and Lewin, 1869).

পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এসব জনগোষ্ঠীগুলোর প্রায় সবাই যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং হিংস্র দাঙ্গা-হাঙ্গামার ফলে তাদের পুরাতন আবাসস্থল থেকে এখানে পালিয়ে এসেছ অথবা এক জনগোষ্ঠী অন্য জনগোষ্ঠীর পশ্চাদ্ধাবন করে আক্রমণকারী হিসেব এদেশে প্রবেশ করেছে। বিশিষ্ট চাকমা পন্ডিত অমেরেন্দ্র লাল খিসা ‘অরিজিনস অব চাকমা পিপলস অব হিলট্রেক্ট চিটাগং’-এ লিখেছেন, ‘তারা (চাকমারা) এসেছেন মংখেমারের আখড়া থেকে। পরবর্তীতে আরাকান এবং মগ কর্তৃক তাড়িত হয়ে বান্দরবানে অনুপ্রবেশ করেন। আজ থেকে আড়াইশ-তিনশ বছর পূর্বে তারা উত্তর দিকে রাঙামাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন।’ বাংলাদেশে এ বিষয়ে যারা গবেষণা করেছেন এবং প্রবন্ধ লিখেছেন যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবদুর রব, অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা ড. খুরশীদা বেগম, বিজয় কী বোর্ডের উদ্ভাবক মোস্তফা জব্বার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কাজ করছেন এমন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক মেহেদী হাসান পলাশ প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছেন যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নয়।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদিবাসী আখ্যায়িত করলে অসুবিধা কী : অনেককেই এটি বলতে শোনা যায় যে, আদিবাসী বললে যদি ওরা খুশী হয় বা খুশী থাকে তাহলে সমস্যা কী? বিভিন্ন লেখা এবং দুই একটি সরকারি প্রজ্ঞাপনেও অবচেতনভাবে তাদের আদিবাসী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে তাতে এখনই কোনো সমস্যা মনে নাও হতে পারে কিন্তু পরবর্তীসময়ে ‘ইষ্ট তিমুর’ কিংবা ‘সাউথ সুদান’-এর মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তার দায়ভার নিতে কি আমাদের সেই সব বুদ্ধিজীবী এবং মিডিয়া প্রস্তুত আছেন? সকলের জ্ঞাতার্থে এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে ‘ইস্ট তিমুর’ এবং ‘সাউথ সুদান’-এর মতো পরিস্থিতি কাশ্মীর, চেচনিয়া, ফিলিপাইনের মিন্দনাওসহ পৃথিবীর আরও কিছু স্থানে বিরাজ করলেও সেখানে গণভোট অনুষ্ঠিত করে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হচ্ছে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের নিকটবর্তী দেশ মিয়ানমারে আরাকানী মুসলিমদের সাথে কী ধরনের আচরণ করা হচ্ছে এবং তার প্রতিক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কতটা সহানুভূতিশীল ভূমিকা রাখছে তা-ও পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে।

আসল কথা হচ্ছে যে, United Nation Declaration on the Rights of Indigenous Peoples বা ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র’ ২০০৭ অনুযায়ী তাদের আদিবাসী স্বীকৃতি প্রদান করলে সেই অনুযায়ী তাদের স্বায়ত্তশাসন, রাজনৈতিক, আইনী, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা প্রদান করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। বিশেষ করে এই ঘোষণার ধারা ৩০ অনুযায়ী ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি কিংবা ভূখ-ে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না উপযুক্ত জনস্বার্থের প্রয়োজন যুক্তিগ্রাহ্য হবে, অন্যথায় যদি সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় সম্মতি জ্ঞাপন বা অনুরোধ না করে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশেষ কোনো জনগোষ্ঠীর ভূমি বা ভূখ- ব্যবহারের আগে যথাযথ পদ্ধতি ও বিশেষ করে তাদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লি¬ষ্ট বিশেষ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা করে অনুমতি গ্রহণ করার বিষয়টি সেই রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে বলেই অনুমেয়। এছাড়া উল্লি¬খিত জাতিসংঘ ঘোষণার অসংগতি পূর্ণ বিষয়গুলো যেমন ‘উপযুক্ত জনস্বার্থের’ সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা কী? বাংলাদেশ সরকার জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং সংস্কারবাদীদের সাথে আলোচনা করবে? এই দলগুলোর মতবাদও তো এক নয়। ‘স্বেচ্ছায় যদি সম্মতি জ্ঞাপন’ না করে তারা তাহলে কী হবে? যদি কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বহির্বিশ্বের কারো সঙ্গে কোনো অশুভ আঁতাত করে? যদি বহির্বিশ্ব থেকে ওই অঞ্চল আক্রান্ত হয়, সরকার কি সামরিক কার্যক্রম গ্রহণে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কারো সম্মতির অপেক্ষায় নিষ্ক্রিয় থাকবে? যদি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নেতৃত্ব সম্মতি না দেয় তাহলে কী হবে? এছাড়াও বাংলাদেশে কমবেশি ৫০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ‘মালিকানাধীন’ ভূমি আছে এবং তারা যদি সেই ভূমি বা ভূখণ্ড ব্যবহারে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ওপর এত বিধি-নিষেধ আরোপ করতে থাকে তাহলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কী হবে?

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবদুর রবের অভিমত, ‘একশ্রেণীর মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী দেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে আদিবাসী বলে ব্যাপকভাবে প্রচার করছে। এক কথায় বললে এরা মূর্খ। এদের কারো এনথ্রোপলজি, সোসিওলোজি, ইতিহাস, ভূগোল এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, আদিবাসী ও উপজাতি সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। আর যারা জেনে বুঝে এ কাজ করছে তারা বিভিন্ন পারিতোষিক, বৃত্তি, উচ্চ বেতনের চাকরি প্রভৃতির লোভে করছে। প্রিন্ট/ইলেকট্রনিক মিডিয়া, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা এনজিও কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণীর প্রভাবশালীরা লোভের বশে দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এমন মিথ্যাচার করছে। কাজেই আমাদের সকলকে এই বিষয়টিতে সতর্ক হতে হবে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদিবাসী বলা বন্ধ করতে হবে।’

চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকা আমাদের মোট ভূখণ্ডের দশভাগের একভাগ (১৩,২৯৫ বর্গকিমি/৫,১৩৩ বর্গমাইল) এবং এখানে মোট জনসংখ্যার মাত্র শতকরা এক ভাগ (২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ১৫,৯৮,২৯১ জন) মানুষ বাস করে। এ এলাকায় জাতিগত বিভেদ সৃষ্টি করে বিচ্ছিন্নতাবাদকে যারা অবচেতনে উস্কে দিচ্ছে তারা জানে না যে, এখানে বসবাসকারী মোট জনসংখ্যার অর্ধেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। অভিবাসন, নৃতাত্ত্বিক ও জাতিতাত্ত্বিকসহ অন্যান্য সকল বিবেচনায়ই তারা এই ভূখণ্ডের মূল বা আদি বাসিন্দা নয়। বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানের মতো এখানকার আদিবাসীও আসলে বাঙালিরা। তবে এদেশের সকল নাগরিকের মতো ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরাও বাংলাদেশের নাগরিক। তাদের অল্প কিছুদিন আগে থেকে দাবিকৃত আদিবাসী হওয়ার প্রবল ইচ্ছা আসলে জাতিসংঘের ২০০৭ সালের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্রের বিভিন্ন ধারা থেকে ভবিষ্যতে ফায়দা লোটার কৌশল। এই কৌশলের ফাঁদে পা দেওয়া ভয়ংকর এবং বিপজ্জনক। কারণ তাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ তার এক দশমাংশ ভূমির মালিকানা হারাতে পারে যার সাথে আমাদের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন জড়িত। কাজেই সকলকে সতর্ক হতে হবে এবং এদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদিবাসী বলা বন্ধ করতে হবে।

লেখক: শিক্ষাবিদ ও সমাজ উন্নয়ন গবেষক।

চাকমা: আদিবাসী নয় বহিরাগত

আবদুস সাত্তার

আবদুস সাত্তার

পার্বত্য চট্রগ্রামে উপজাতিদের মধ্যে চাকমা, মগ, মুরং, কুকি, বনজোগী, পাঙ্খো, লুসাই, তংচঙ্গা, টিপরা (ত্রিপুরা) এবং সেন্দুজ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। টিপরারা হিন্দুধর্মাবলম্বী, মগ ও চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং অপরাপর জাতির মধ্যে কেউ কেউ  নিজেদেরকে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী বলে স্বীকার করলেও ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক জীবনের রীতিনীতিতে তাদের বৈসাদৃশ্য লক্ষণীয়। পার্বত্য চট্রগ্রাম পূর্বে চট্রগ্রামের সাথে যুক্ত ছিল। পাহাড়ি জাতিদের আলাদা বৈশিষ্ট্যের দাবিতে ১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দের ১ আগস্ট পার্বত্য চট্রগ্রাম স্বতন্ত্র জেলার মর্যাদা লাভ করে।[i]

চাকমারা কোথা থেকে এখানে এসেছে এবং এদের উৎপত্তিই-বা কোথায়, এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে। উপজাতিদের উদ্ভব ও বসতি বিস্তার সম্পর্কে সবকিছু জানা সম্ভব না হলেও এ সম্পর্কে আমাদের মন সব সময়েই কৌতূহলী ও উৎসুক। চাকমা জাতি যে এককালে ব্রক্ষ্মদেশে ছিল, সে সম্বন্ধে কর্নেল ফেইরী আলোকপাত করেছেন।[ii] ব্রক্ষ্মদেশে পুরাবৃত্ত ‘চুইজং ক্য থং’ এবং আরাকান কাহিনী ‘দেঙ্গাওয়াদি আরেদফুং’ নামক গ্রন্থদ্বয়েও অনুরূপ উল্লেখ রয়েছে।

‘দেঙ্গাওয়াদি আরেদফুং’ গ্রন্থেও বর্ণনা অনুযায়ী ৪৮০ মগাব্দে (খ্রীষ্টীয় ১১১৮-১৯ সালে) চাকমাদের সর্বপ্রথম উল্লেখ পরিদৃষ্ট হয়। ‘‘ এ সময়ে পেগো (আধুনিক পেগু) দেশে আলং চিছু নামে জনৈক রাজা ছিলেন। পশ্চিমের বাঙালিদিগের সহিত মিলিত হয়ে চাকমাগণ তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ উপস্থিত করে। পেগো রাজা স্বীয় প্রধানমন্ত্রী কোরেংগরীকে সেনাপতি পদে বরণ করিয়া যুদ্ধার্থে প্রেরণ করিলেন। তিনি যুদ্ধ স্থলে উপনীত হইলে একটি সারসপক্ষী একখানি মৃত প্রাণীর চর্ম মুখে লইয়া তাঁহার সম্মুখে পতিত হইল। তিন তাহাকে ধরিয়া রাজার শিবিরে লইয়া গেলেন এবং বুঝিয়া দিলেন যে, এই সারস বাঙালি ও চর্মখানি-চাকমা, উভয়ের মিত্রতা ঘটিয়েছে। কিন্তু আমাদের এই যুদ্ধে নিশ্চয়ই বাঙালি ও চাকমাগণ এই সারসের ন্যায় বশ্যতা স্বীকার করিবে।

‘‘রাজা মন্ত্রীর এহেন যুক্তিগর্ভ আশ্বাস বাক্যে অতিশয় আহলাদিত হইয়া তাহাকে একটি হস্তী উপহার প্রদান করেন। অনন্তর হঠাৎ চতুর্দিকে নানা অশুভ লক্ষণ দেখা দিল, পবিত্র ‘মহামুনি’ মূর্তি স্বেদসিক্ত হইলেন। ঘন ঘন অশনি নিপাত, অকাল বৃষ্টি সমন্তাৎ হাহাকার পড়িয়া গেল। রাজা যুদ্ধে ক্ষান্ত হইয়া এই অমঙ্গল শান্তির নিমিত্ত পুরোহিতকে শতমুদ্রা প্রদান করিলেন।

‘‘ এই ঘটনার বহুকাল পরে আনালুম্বা নামক পেগু রাজার শাসন সময়ে পুনরায় বাঙালি ও চাকমাগণ মিলিয়া উত্থিত হয়। রাজা পঞ্চাশ হাজার সৈন্য লইয়া দাম্বাজিয়াকে সেনাপতি করিয়া পাঠাইলেন। দাম্বাজিয়া যাত্রা করিয়া সম্মুখে দেখিলেন একটি বক ও একটি কাক ঝগড়া করিতেছে, অবশেষে বক কাকের ডানা ভাঙ্গিয়া দিল। তিনি রাজার নিকট আসিয়া ইহা বিবৃত ককরিলেন। মন্ত্রী বুঝিয়া দিলেন, এই কাক বাঙালি এবং বক আমরা। ইহা দ্বারা সুস্পষ্ট দেখা যাইতেছে, এই যুদ্ধে আমাদের জয়লাভ নিশ্চিত। ‘‘সেনাপতি অমিত-উৎসাহে যুদ্ধারম্ভ করিলেন। পাঁচদিন অবিরাম যুদ্ধের পর বাঙালি ও চাকমাগণ পলায়ন করে।’’[iii]

ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত রাজমালায়ও[iv] একই কথার প্রতিধ্বনি বর্তমান। এ সম্বন্ধে ১৭৮৭ খ্রীস্টাব্দের ২জুন তারিখে চট্রগ্রামের তদানীন্তন শাসনকর্তাকে লিখিত ব্রক্ষ্মরাজের একটি চিঠির উদ্ধৃতি থেকেই আমাদের বক্তব্যের যথার্থতার কিছুটা প্রমাণ মিলবে:

‘আমরা পরস্পর এতদিন বন্ধুত্বসূত্রে আবদ্ধ ছিলাম এবং এক দেশের অধিবাসীরা অন্য দেশের অধিবাসীদের সাথে অবাধ মেলামেশা করতে পারতো। …ত্রুটি নামে এক ব্যক্তি আমাদের সাম্রাজ্য থেকে পালিয়ে গিয়ে আপনার সাম্রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছে। তাকে জোরপূর্বক আনার ইচ্ছে আমাদের ছিল না বলেই তাকে ফিরিয়ে দেবার অনুরোধ করে আমরা আপনাদের কাছে বিনয়সহকারে চিঠি লিখেছিলাম। কিন্তু আপনারা তাকে ফেরত পাঠাতে অস্বীকার করেন। আমাদের সাম্রাজ্যের পরিধি নেহাৎ কম নয় এবং ত্রুটি তার অবাধ্য আচরণে আমাদের রাজশক্তির অবমাননা ও শান্তি ভঙ্গ করেছে।…ডোমকান, চাকমা, কিরুপা, লেইস, মুরং এবং অন্যান্য জাতির লোকও আরাকান থেকে পালিয়ে গিয়েছে ও আপনাদের দেশের পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে তারা সীমান্তবর্তী উভয়দেশের অধিবাসীদের উপর অত্যাচার ও লুটতরাজ করেছে। তাছাড়া, তারা নাফ নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের একজন খ্রীস্টানকে হত্যা করে তার যথাসর্বস্ব হরণ করে নিয়ে গেছে। এই কথা শুনে আমি একদল সৈন্য নিয়ে সীমান্ত এলাকায় এসেছি তাদের ধরে নেবার জন্যে। যেহেতু, তারা আমাদের সাম্রাজ্যের অধিবাসী এবং আমাদের রাজশক্তির অবমাননা করে বর্তমানে ডাকাতি বৃত্তি গ্রহণ করেছে। …তাদেরকে আশ্রয় দেয়া আমাদের পক্ষে মোটেই সমীচীন নয় এবং মগরা যারা আরাকান থেকে পালিয়ে গিয়েছে, তাদেরকেও ফেরত পাঠাতে যথাবিহিত ব্যবস্থা করবেন। এতে আমাদের পরস্পরেরর বন্ধুত্বসূত্র আরও দৃঢ় হবে এবং দুই দেশের পথিক এবং ব্যবসায়ীরাও ডাকাতির হাত থেকে অব্যাহতি পাবে।… মোহাম্মদ ওয়াসিমের মারফত এই চিঠি পাঠাচ্ছি। চিঠি পেয়ে যথাবিহিত ব্যবস্থা করবেন এবং অনুগ্রহ করে চিঠিটার উত্তরও তাড়াতাড়ি দিবেন।…’

এ চিঠির উত্তরে কি বলা হয়েছিল তা অবশ্য আমাদের প্রতিপাদ্য নয়, তবে চিঠিটার ঐতিহাসিক মূল্য যে যথেষ্ট তাতে সন্দেহ নেই। এ থেকে চাকমারা কি করে ব্রক্ষ্মদেশ থেকে চট্রগ্রামে আগমন করেছিল তার হদিস পাওয়া যায়।

শাসন ব্যবস্থার সুবিধার জন্য বেঙ্গল গভর্নমেন্ট ১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দের পহেলা সেপ্টেম্বর[v] এই বিস্তৃত পার্বত্যভূমিকে তিনটি সার্কেল যথা: চাকমা সার্কেল, বোমাং সার্কেল ও মঙ সার্কেলে বিভক্ত করেন এবং প্রত্যেক সার্কেলের জন্য একজন রাজা বা প্রধান নিযুক্ত করেন। চাকমা সার্কেলের (২৪২১ বর্গমাইল) রাজা রাঙামাটিতে, বোমাং সার্কেলের (২০৬৪ বর্গমাইল) রাজা বান্দরবানে, এবং মঙ সার্কেলের (৬৫৩ বর্গমাইল) রাজা রামগড় মহকুমার মানিকছড়িতে  অবস্থান করেন। উল্লিখিত জাতিদের মধ্যে চাকমারা সংখ্যার দিক থেকে রাঙামাটিতেই সর্বাধিক এবং অন্যান্য জায়গায়ও এদেরকে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় দেখা যায়।

পার্বত্য চট্রগ্রামের এসব উপজাতি যে এখানকার ভূমিজ সন্তান নয় তা আমাদের উপরোক্ত আলোচনা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়। নৃতত্ত্ববিদদের মতে, উপমহাদেশের আদিম অধিবাসী মাত্রই বাইরে থেকে এখানে আগমন করেছে এবং ভাষাতত্ত্ববিদরাও বিভিন্ন আদিম জাতির ভাষা বিশ্লেষণ করে একই কথার সমর্থন জানিয়েছেন। ‘সুদূর অতীতে অন্যান্য ভূখণ্ডের মত এই উপমহাদেশের মাটিতেও হয়তো এক শ্রেণীর দ্বিপদ বৃক্ষচর প্রাণী নিতান্ত জন্তুদশা থেকে কালক্রমে বিবর্তিত হয়ে নরদশা লাভ করেছে।’ নৃতত্ত্ববিদ ড. জে এইচ হাটনও[vi] এখানকার আদি অধিবাসী সম্বন্ধে এই মতপোষণ করেন এবং তাঁর ধারণা ক্রমবিবর্তন ও বিভিন্ন সময়ের বংশানুক্রমিক রক্তের মিশ্রণে এইসব আদি মানব নিজেদের আদিম অবস্থা হারিয়ে ফেলেছে[vii]

পার্বত্য চট্রগ্রামের চাকমাদের বেলায় এই যুক্তি আংশিক সত্য। এদের ধর্ম ভাষ্য আচার-ব্যবহার এবং সামাজিক জীবনের রীতিনীতি বিভিন্ন ধর্মের সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে, তাদের আদিম বৈশিষ্ট্য অনেক ক্ষেত্রে খুঁজে বের করা অসম্ভব।

চাকমারা মূলত কি ছিল কিংবা কোন জাতি থেকে এদের উৎপত্তি, সে বিষয়টি জানা নিতান্ত কষ্টসাধ্য হলেও অনুসন্ধানের অপেক্ষা রাখে। কোনও জাতির সঠিক পরিচয় নির্ণয়ে সে জাতির অতীত ইতিহাস অনেকটা সহায়ক। ইতিহাসের অভাবে সেসব মানবগোষ্ঠির আকৃতি-প্রকৃতি, বেশ-ভূষা, আচার-ব্যবহার, ধর্ম-কর্ম, ভাব-ভাষা ইত্যাদির সাথে সম্যক পরিচয় কিংবা তাদের কালস্থায়ী পরিবেশের গূঢ় উবলব্ধি না থাকলে সেসব জাতি সম্বন্ধে কিছু বলা সম্ভব নয়।

স্যার রিজলীর মতে, ব্রক্ষ্ম ভাষার ‘সাক’ বা ‘সেক’ জাতি থেকে চাকমাদের উৎপত্তি। ক্যাপ্টেন লুইন বলেন:

‘…the name chakma is given to this tribe in general by the inhabitants of the Chittagong District, and the largest and dominant section of the tribe recognizes this as its rightful appellation. It is also sometimes spelt Tsakma or Tsak, or as it called in Burmese Thek’[viii].

এই মন্তব্যে চাকমা কথাটি যে মূলত পার্বত্য চট্রগ্রামের নয় সম্ভবত এ কথাটি তিনি বোঝাতে চেয়েছেন।

আরাকানের প্রাচীন রাজধানী রামাবতী নগরের নিকটবর্তী অঞ্চলে এই সাক বা সেক জাতি এককালে খুব প্রবল ও প্রতিপত্তিশালী হয়ে উঠেছিল। তাদের সাহায্যে ব্রক্ষ্মরাজ ন্যা সিং ন্যা থৈন ৩৫৬ মগাব্দে (৯৯৪ খ্রীষ্টাব্দ) সিংহাসন অধিকার করেছিলেন।

কর্নেল ফেইরী এর মতে[ix], তখন সেই অঞ্চলে পশ্চিম দেশের বিভিন্ন লোক বাণিজ্য উপলক্ষ্যে আগমন করে এবং পরিশেষে উপনিবেশ স্থাপন করে। তাদের উপাধি ছিল ‘সাক’ বা ‘সক’।

কেউ কেউ অনুমান করেন, তখন আরব-ইরান তুরস্ক  থেকে বহু মুসলমান সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যর উদ্যেশে আগমন করে এবং তাদের অনেকেই দেশে ফিরে না গিয়ে সে অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। অতএব বোঝা যাচ্ছে, এইসব সাক বা সেক শব্দ ইসলামি শব্দের অপভ্রংশ।

এখনও ব্রক্ষ্মদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী স্থানে এই সাক সম্প্রদায় দেখা যায়। ধর্মীয় রীতিনীতিতে তাদের সাথে পার্বত্য চট্রগ্রামের চাকমাদের মিল না খাকলেও আকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে চাকমারা সাকদেরই উত্তর পুরুষ। মগদের মতে, চাকমারা মুঘলদের বংশধর[x]। কোন এক সময়ে মুঘলরা আরাকান রাজ্যের হাতে পরাজয়বরণ করে; ফলে বহু মূঘল সৈন্য বন্দিদশায় আরাকানে অবস্থান করতে বাধ্য হয়। আরাকান রাজ তাদেরকে স্বদেশের মেয়েদের সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হবার আদেশ জানিয়ে আরাকানেই অন্তরীণ করে রাখেন। এসব মুঘল সৈন্যদের ঔরসে এবং আরাকানি নারীদের গর্ভে যে জাতির উদ্ভব হয়েছিল তারাই ‘সেক’ বা ‘সাক’।

জে. পি. মিলস্-ও একই মত পোষণ করেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘‘চাকমাগণ মগনারী ও মুঘল সৈন্যদের সমন্বরজাত। সপ্তদশ শতাব্দীতে চাকমাদের অনেকেই মুঘল ধর্ম গ্রহণ করে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং তখনকার চাকমা প্রধানগণও মুসলমানী নাম ধারণ করেন। অতঃপর সেখানে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় ফলে তারা হিন্দু ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়, কিন্তু পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব প্রকট হয়ে দেখা দেয় এবং হিন্দু ধর্ম অন্তর্হিত হয়[xi]।’’

ক্যাপ্টেন হার্বার্ট লুইন এর মন্তব্যেও এই উক্তির সমর্থন মিলে। তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন চাকমারা মুঘলদের বংশধর না হলেও এককালে এরা মুসলমান ছিল। কালের বিবর্তনে হয়তো ধর্মীয় ধারা পরিবর্তিত হয়েছে। এই মন্তব্যের সমর্থনে শ্রী সতীশচন্দ্র ঘোষ প্রতিপন্ন করেছেন যে, ‘১৭১৫ খ্রীষ্টাব্দ হতে ১৮৩০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত জামুল খাঁ, সেরমুস্ত খাঁ, সের দৌলত খাঁ, জান বক্স খাঁ, জব্বার খাঁ, টব্বার খাঁ, ধরম বক্স খাঁ প্রভৃতি চাকমা ভূপতিবর্গ ‘খাঁ’ উপাধি পরিগ্রহ করতেন। তদানুসষঙ্গিক ইহাও উল্লিখিত হইতে পারে যে, এই সময়ে তাঁহাদের কুলবধূগণেরও ‘বিবি’ খেতাব প্রচলিত ছিল। এখনও অশিক্ষিত সাধারণে ‘সালাম’ শব্দে অভিবাদন করে এবং আশ্চর্য বা খেদসূচক আবেগে ‘খোদায়’ নাম স্বরণ করিয়া থাকে[xii]।’

কেউ কেউ অনুমান করেন তখন মুসলিম (মুঘল শাসন) শাসনের প্রাধান্য ছিল বলে চাকমা রাজারা তাদের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য মুসলমানী নাম, ‘খা’ খেতাব[xiii] ইত্যাদি গ্রহণ করেছিলেন, ফলে তাদের চাল-চলনে মুসলমানী ভাব এবং কথা-বার্তায়ও অনেক আরবী-ফারসি শব্দ প্রবেশ করেছিল।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, ‘খাঁ’ উপাধি গ্রহণের বেলায় এই মতবাদ কতকটা শিথিল বলে ধরা যেতে পারে; কেননা, মধ্যপ্রদেশের কোন কোন স্থানে হিন্দুরাজাদের মধ্যেও ‘খাঁ’ খেতাব পরিলক্ষিত হয় এবং বাংলাদেশেরও কোন কোন হিন্দু পরিবারের ‘খাঁ’ পদবী দেখা যায়। কিন্তু মুসলমানী নাম আচার-ব্যবহার এবং কথা-বার্তায় ইসলামী ভাবগ্রহণ করে এভাবে নিজের সত্তাকে বিলিয়ে দেবার প্রমাণ একমাত্র চাকমা সমাজেই দেখা গেছে। অনুরূপ দৃষ্টান্ত দুনিয়ার আর কোন জাতির ইতিহাসে দেখা যায় না।

প্রসঙ্গত আরও উল্লেখযোগ্য যে, চাকমা রাজাদের মুদ্রার প্রতিকৃতি খাস ফরাসী ভাষায় উৎকীর্ণ ছিল। মুদ্রাগুলোর মধ্যে একটিতে খোদিত আছে ‘আল্লাহ রাব্বী’[xiv]। এমনকি চাকমা রাজাদের কামানগুলোও ‘ফতেহ খাঁ’ ‘কালু খাঁ’ নামে পরিচিত।

‘শ্রী শ্রী জয়কালী জয়নারায়ণ                      জব্বর খাঁ ১১৬৩’

[রাজা জব্বর খাঁর আমলের ফারসিতে উৎকীর্ণ (১১৬৩ মগাব্দ) মুদ্রার প্রতিকৃতি]

‘জান বখশ্ খাঁ                                       জামেনদার’

[চাকমা রাজা জান বখ্শ খাঁ জমিদারের আমলের ফারসিতে উৎকীর্ণ মুদ্রার প্রতিকৃতি]

চাকমা রাজাদের মধ্যে শের দৌলত খাঁর (১৭৫৪ খ্রীষ্টাব্দ) উপসনা পদ্ধতি ছিল খাঁটি ইসলামী ভাবধারার সম্ভূত এবং মারেফতের শিক্ষাই ছিল তার সাধনার প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়। সেই সাধনার বলে তিনি এতদূর উন্নীত হয়েছিলেন বলে জানা যায় যে, নিজের নাড়ীভূড়ি পর্যন্ত বের করে পানিতে পরিষ্কার করে পুনরায় তা যথাস্থানে সংস্থাপন করতে পারতেন। গৃহের এক নিভৃত কক্ষে তিনি আরাধনায় রত থাকতেন। তাঁর উপাসনাকালে কেউ যাতে তাঁর গৃহে প্রবেশ না করে এমন নির্দেশও দেওয়া থকতো। কিন্তু একদিন তাঁর স্ত্রী কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে সেই সাধনা কক্ষের ছিদ্র পথে  দৃষ্টি দিতেই দেখতে পান যে, রাজা তাঁর নিজের অন্ত্র বের করে পরিষ্কার করছেন। এই দৃশ্য অবলোকন করে রাণী অবাক হয়ে চীৎকার দিয়ে ওঠেন, ফলে রাজার ধ্যান ভেঙে যায়। কথিত আছে তিনি সবগুলো অন্ত্র যথাস্থানে সংস্থাপন করতে পারেননি, যার ফলে তিনি উম্মাদ হয়ে যান। এ সম্পর্কে এখনও চাকমা সমাজে একটা গান প্রচলিত আছে:

   মুনি দরবেশ ধ্যান করে

  পাগলা রাজা আপন চিৎ-কল্জা খৈ-নাই স্যান গরে।

[সাধু-দরবেশ যেমন ধ্যান ধরে থাকে, সেই রকম পাগলা রাজা নিজের কলজে বের করে স্নান করাতেন]

এ ছাড়াও চাকমা রাজারা যে ইসলাম ধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত ছিলেন তার আরও অনেক প্রমাণ উপস্থিত করা যায়।

চাকমা রাজমহিষী প্রীমতী কালিন্দী রাণী প্রথমদিকে ইসলাম ধর্মের প্রতি অটল বিশ্বাসী ছিলেন এবং ইসলামের অনেক অনুশাসনও তিনি মেনে চলতেন। রাজানগরে বিরাট মসজিদ তাঁর নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মসজিদ তদারক ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মুসল্লিদের ইমামত করার জন্য তিনি একজন মৌলানা নিযুক্ত করেন। কথিত আছে, রাণী সেই মৌলানার কাছ থেকে অনেক সময় ইসলাম ধর্মের মর্মবাণী সম্পর্কে জ্ঞান সংগ্রহ করতেন। চাকমা রাজ পরিবারের মহিলাদের অবরোধ প্রথা প্রচলিত ছিল। ইসলাম ধর্মের প্রতি বিশেষ বিশ্বাসী থাকা সত্ত্বেও শ্রীমতী কালিন্দী রাণী পরবর্তীকালে ধর্মবিশ্বাস পরিবর্তন করেন। তিনি প্রথমে হিন্দু ধর্ম এবং পরিশেষে বৌদ্ধ ধর্মগ্রহণ করেন।

এসব প্রমাণাদি থেকে অনুমিত হয় যে, চাকমারা হয়ত বা মুসলমান ছিল। মুঘল বংশধর না হলেও এরা যে ব্রক্ষ্ম দেশের সাক বা সেক জাতির (ইসলামী শায়েখ বা শেখ থেকে) অন্তর্ভুক্ত ছিল তা অনুমান করা যায়।

কিন্তু চাকমাদের নিজেদের মতে, উপরোক্ত যুক্তিসমূহ সর্বৈব মিথ্যা। মুসলমানী নাম গ্রহণ এবং তাদের মধ্যে মুসলিম প্রভাবের কারণ সম্পর্কে তারা শুধু এই বলতে চায় যে, অতীতকালে কোন এক চাকমা রাজা জনৈক মুসলমান নবাব কন্যার প্রেমে পড়ে তাঁকে বিয়ে করেন। সেই নবাব কন্যার প্রভাবে চকমা রাজ ইসলামী ভাবধারার সমর্থক হয়ে ওঠে। যার ফলে পরবর্তীকালে তাঁদের নামকরণ উপাধি গ্রহণ আচার-ব্যবহার প্রভৃতিতেও ইসলামী প্রভাব পরিলক্ষিত হয়[xv]। এক সময় চাকমা সমাজে কোনও রমণীর মৃত্যু ঘটলে তাকে রীতিমত কাফন পরিবৃত করে উত্তর শিয়রে কবরস্থ করা হতো এরূপ ঘটনাও বিরল নয়।

কোন জাতির আদি পরিচয় উদঘাটনে প্রাচীন সংস্কারের দান অপরিসীম। এ দিক দিয়ে বিচার করলে চাকমাদের এই যুক্তি অনেকটা শিথিল মনে হয়। কিন্তু চাকমারা কোনক্রমেই মানতে রাজি নয় যে, তারা কোনকালে মুসলমান ছিল। চাকমারাজ শ্রী ভুবনমোহন রায় (মৃত্যু ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৬ খ্রীষ্টাব্দ) দেখাতে চেয়েছেন যে, চাকমারা আসলে শাক্য বংসম্ভূত মহামুনি বুদ্ধের বংশধর[xvi]। পুরাকালে যে তাঁরা পৈতাধারী ক্ষত্রিয় ছিলেন- একথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

মগভাষায় ‘শাক্য’ অর্থ ‘সাক’ আর যারা রাজবংশম্ভূত তাঁদেরকে বলা হয় ‘সাকমাং’ (মাং রাজা অর্থে)। এই ‘সাকমাং’ থেকে ‘চাকমা’। এই বিশেষ কথাটির উপর চাকমারা সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করে থাকেন। চাকমাদের এই নিজস্ব মতামত এবং মগদের এই ভাষাগত অর্থের পরিপ্রেক্ষিতেই তারা প্রমাণ করতে চান যে, তাঁরা শাক্য বংশম্ভূত মহামুনি বুদ্ধের বংশধর।

চাকমা জাতির আদি উৎস সম্পর্কে চাকমা সমাজে দুটি পুরাকাহিনী প্রচলিত আছে- ‘রাধামহন-ধনপতি’ উপাখ্যান এবং ‘চাটিগাঁ ছাড়া’। এই কাহিনী দুটি মূলত এক এবং দ্বিতীয়টি প্রথমটির দ্বিতীয় অধ্যায় মাত্র। উক্ত কাহিনীতে রাজা সাধ্বিংগিরির উল্লেখ রয়েছে। রাজা সাধ্বিংগিরি চম্পকনগরে (মতান্তরে চম্পানগরে) বাস করতেন। এই চম্পক বা চম্পা থেকে না-কি চাকমা জাতির নামকরণ করা হয়েছে। সেকালে চম্পনগরে বিজয়গিরি হরিশচন্দ্র নামে আরও দুজন সামন্ত রাজা ছিলেন। তাঁরা সবাই চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয়। চাকমারা নিজেদের এঁদেরই বংশধর বলে দাবি করে। ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত ‘রাজমালায়’ অবশ্য উক্ত কাহিনী দুটি সম্বন্ধে মতভেদ রয়েছে।

আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, এই চম্পকনগর বা চম্পানগরের ভৌগলিক অবস্থান সম্পর্কে কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ উপস্থিত করা যায় কি-না। কেউ কেউ অনুমান করেন, চম্পানগর বিহারে অবস্থিত। আবার চীনা পর্যটক ফা-হিয়েনের (৪২৯ খ্রীষ্টাব্দ) বর্ণনায় পাওয়া যায় চম্পানগর ছিল তখনকার সময়ে ভাগলপুরের কর্ণপুর রাজ্যের রাজধানী। ক্যাপ্টেন থমাস হার্বার্ট লুইন বলেন, চম্পানগর মালাক্কার নিকটবর্তী একটি শহর।’ এ থেকে কেউ কেউ ধারণা করে থাকেন যে, চাকমারা ‘মালয় বংশজ’। অবশ্য এ সম্পর্কেও মতভেদ রয়েছে।

ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত ‘রাজমালায়’য় চম্পা বা চম্পকনগরের সরাসরি কোন উল্লেখ নাই। তবে চাকমা সমাজে প্রচলিত একটি গানে চম্পানগর নয় নুর নগরের উল্লেখ রয়েছে। গানটির রচনাকাল জানা যায়নি, তবে চাকমা রাজাদের কেউ হয়তো একবার নিজ দেশ ছেড়ে ব্রক্ষ্ম দেশে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠার ফলে দেশে ফিরে আসার অভিলাষ জ্ঞাপন করে তাঁরা ছড়া কেটে গান করতেন (আনুমানিক ৭০০ মগাব্দ):

ডোমে বাজায় দোল্ দগর          ফিরে যাইয়ম্ নুরনগর

(বাদ্যকেরা ঢোল-ডগরা বাজায়। আমাদের নুরনগর ফিরে যেতে ইচ্ছা হয়)

এই নুরনগর পার্বত্য ত্রিপুরায় অবস্থিত। চাকমারা আগে (বর্তমানেও আছে) পার্বত্য ত্রিপুরায় ছিল। ত্রিপুরা জেলায় অবস্থিত গোমতী নদীর উৎস সম্বন্ধে যে আখ্যান প্রচলিত আছে চাকমা সমাজে এখনও তা পবিত্র জ্ঞান করা হয়। পার্বত্য ত্রিপুরার সাথে চাকমাদের যোগসূত্র প্রাচীনকাল থেকেই। বস্তুত, এই নুরনগরই আসলে চম্পানগর কি-না তাও অবশ্য গবেষণার বিষয়।

সুতরাং এসব কাহিনীর উপর ভিত্তি করে একটা জাতির আসল পরিচয় উদঘাটন সম্ভব নয়। চাকমাদের ধর্মভাবের পরিবর্তন সম্পর্কে প্রসঙ্গত আরও একটি প্রমাণ উপস্থিত করা যায়। নিম্নে কয়েকজন চাকমা রাজার নাম এবং তাঁদের সিংহাসন লাভের সময়কাল উল্লেখ করা হলো:

জব্বার খান ১৬৮৬ খ্রীষ্টাব্দ

বেল্লাল খান ১৭০০ খ্রীষ্টাব্দ

জালাল খান ১৭০৬ খ্রীষ্টাব্দ

শেরমুস্ত খান ১৭৩১ খ্রীষ্টাব্দ

শের দৌলত খান ১৭৫৪ খ্রীষ্টাব্দ

জান বখ্স খান ১৭৮২ খ্রীষ্টাব্দ

ধরম বখ্স খান ১৮১৮ খ্রীষ্টাব্দ ইত্যাদি।

শেষের নামটির ‘ধরম’ (সংস্কৃত) কথাটি সম্ভবত বাংলা ‘ধর্ম’ শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে এবং ‘বখ্স কথাটি খাঁটি ফরাসি ভাষার শব্দ।

‘ফতেহ্ খাঁ ১১৩৩’- [চাকমা রাজা ফতেহ্ খাঁর আমলের (১১৩৩ হিজরী) ফরাসীতে উৎকীর্ণ মুদ্রা]

‘শুকদের রায় ১২১০ হিজরী’ [চাকমা রাজা শুকদের রায় (১২১০ হিজরী) এর আমলের মুদ্রার প্রতিকৃতি]

‘জয়কালী সহায় ধরম্ বখ্শ খাঁ’ [রাজা ধরম বখ্শ খাঁর আমলের মুদ্রার প্রতিকৃতি]

‘সিংহ চিহ্নিত চাকমা মুদ্রা’

ধরম বখশের স্ত্রী শ্রীমতী কালিন্দী রাণী এই সময়েই হিন্দু ভাবাপন্ন হন। পূর্বে চাকমা রাজাদের মুদ্রায় আরবী ফারসী শব্দের প্রতিকৃতি ‘আল্লাহ’ ‘খোদা’ ইত্যাদি লেখা থাকতো; কিন্তু এই ধরম বখ্শ খান তাঁর মুদ্রার মধ্যে ‘জয়কালী সহায়’ খুদিত করেন।

পরে শ্রীমতী কালিন্দী রাণী বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন এবং রাজানগরে বাংলা ১২৭৬ সালের ৮ চৈত্র ‘মহামুনি’ সংস্থাপন করেন। মন্দিরগাত্রে সর্বসাধারণের জ্ঞাপনার্থে একটি প্রস্তরফলক স্থাপিত হয়। নিম্নে প্রস্তর ফলকটির হুবহু উদ্ধৃতি দিচ্ছি:

শ্রী শ্রী ভোক্ত

ফড়া

বিজ্ঞাপন

সর্বসাধারণের অবগতার্থে এ বিজ্ঞাপন প্রচার করিতেছি যে, অত্র চট্রগ্রামস্থ পার্বত্যাধিপতি আদৌ রাজা শেরমস্থ খাঁ তৎপর রাজা শুকদের রায় অতঃপর রাজা সের দৌলত খাঁ পরে রাজা জানবকস্ খাঁ অপরে রাজা টর্বর খাঁ অনন্তর রাজা জব্বর খাঁ আর্য্যপুত্র রাজা ধরম বকস্ খাঁ তৎসহধর্মিনী আমি শ্রীমতী কালিন্দী রাণী আপোন অদৃষ্ট সাফল্যাভিলাসে তাহানদ্বিগের প্রতি কৃতাজ্ঞাতাসূচক নমস্কার প্রদান করিলাম যদিও পূর্ববর্তীর ধর্মার্থে বৌদ্ধ ধর্মের শ্রীবৃদ্ধিসাধন জন্য দ্বিগদ্বেসিয় অনেকানেক ষুধিগণ কর্তৃক সাস্ত্রানুসারে ১২৭৬ বাংলার ৮ই চৈত্র দিবস অত্র রাজানগর মোকামে স্থলকুল রত্নাকর ‘চিঙ্গঁ’ সংস্থাপন হইয়াছে তাহাতে আজাবধি বিনা করে বৌদ্ধধর্মাবলম্বি ঠাকুর হইতে পারিবেক উল্যেকিত পৃণ্যক্ষেত্রের দক্ষিণাংশে শ্রী শ্রী ছাইক্য মুনি স্থাপিত হইয়া তদুপলক্ষ্যে প্রত্যেক সনাখেরিতে মহাবিষুর যে সমারোহ হইয়া থাকে ঐ সমারোহতে ক্রয়-বিক্রয় করণার্থে যে সমস্ত দোকানি ব্যাপারি আগমন করে ও মঙ্গলময় মুনি দর্শনে যে যাত্রিক উপনিত হয়, তাহারার দ্বিগ হইতে কোন প্রকারের মহাষুল অর্থাৎ কর গ্রহণ করা জাইবেক না ইদানিক কি করে বা করায় তব এই জর্ন্মে ঐ জর্ন্মে এবং জর্ন্মে জর্ন্মে মহাপতিকিপাত্র পরিগণিত হইবেন।

কিমাধিক মিতি … কালিন্দী রাণী

শ্রীমতী কালিন্দী রাণীর হস্তলিপি

শ্রীমতী কালিন্দী রাণী যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন এই অনুশাসন লিপির প্রতিটি অক্ষর তিনি যথাযথ প্রতিপালন করে গিয়েছেন। শ্রীমতী কালিন্দী রাণীর সময়ই চাকমারা পুরোপুরি বৌদ্ধ ধর্মের শাসনে চলে যায়।

চাকমাদের আদি উৎস নির্ণয় সম্পর্কে যেসব যুক্তি ও প্রমাণাদির উল্লেখ করা হয়েছে তার সঙ্গে তার ধর্মীয় বিষয়াদিও জড়িত। পাহাড়ি জাতি মাত্রই অপেক্ষাকৃত সরল। এদের মনোভাবও বিশেষ কোমল। এ কারণে তাদের ধর্মবিশ্বাসেও স্থৈর্য লক্ষ্য করা যায় না। বর্তমানে অবশ্য মিশনারীদের প্রচেষ্টায় অনেক পাহাড়ি সম্প্রদায়ও খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করতে আরম্ভ করেছে; কাজেই প্রবহমান ধর্মনীতির উপর নির্ভর করে কোন জাতির উৎস নির্ণয় সবক্ষেত্রে সঠিক ও নিরাপদ নয়।

তথ্যসূত্র

[i]  Vide Bengal Govt. Act XXIII dt. 1.8.1860.

[ii] Colonel Phayre : The History of Burma, p 39.

[iii]  দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদফুং, পৃ ১৭-১৯।

[iv]  ‘দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদফুং’, এবং ‘রাজমালা’র বর্ণণায় যথেষ্ট সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। শুধুমাত্র রাজা-বাদশাহদের নামের মধ্যে কিছু কিছু তফাৎ দেখা যায়। যথা: রাজমালা দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদফং অরুণযুগ (চাকমা-রাজা ৬৯৬ মগাব্দ) ইয়াংজ (৬৯৬ মগাব্দ) মইসাং রাজা প্রি ৯৮ মংছুই রাজা প্রি ১১২ মারিক্যা রাজা প্রি ৫৭ মরেক্যজ রাজা প্রি ৫৫ জনু রাজা(৮৮০ মগাব্দ) প্রি ৩৯ চনুই রাজা(৮৮০ মগাব্দ) প্রি ৫৮ সাজেম্বী(৮৮১ মগাব্দ) প্রি ২৩ সাজাইয়ু(৮৮১ মগাব্দ) প্রি ৫৯ ইত্যাদি।

[v]  Vide letter No. 1985/797 LR dt. 1. 9. 1881.

[vi] সুবোধ ঘোষ: ভারতের আদিবাসী(উদ্ধৃত), ‍পৃ ৪।

[vii] Census Report Of Bengal 1931.

[viii] T. H. Lewin: The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein, p. 62.

[ix] Colonel Phayre: Journal of Asiatic Society of Bengal, No. 145, 1844, pp. 201-202.

[x] সতীশ চন্দ্র ঘোষ: চাকমা জাতি, পৃ ৫।

[xi]  J. P. Mills: Notes on a Tour: In the Chittagong Hill Tracts in 1926:  Census of India 1931.

[xii]  সতীশ চন্দ্র ঘোষ: প্রাগুক্ত, পৃ ৬।

[xiii]  ড. দীনেশ চন্দ্র সেন: ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’। ‘সেকালের উপাধিগুলি কিছু অদ্ভুত রকমের ছিল।‘পুরন্দর খাঁ’ ‘গুণরাজ খাঁ’ এসব রাজদত্ত খেতাব।’

[xiv]  সতীশ চন্দ্র ঘোষ: প্রাগুক্ত, পৃ ৬৯।

[xv]  শ্রী মাধবচন্দ্র চাকমাধর্মী: শ্রী শ্রী রাজনামা, পৃষ্ঠা, ভূমিকা e/o.

[xvi] ভুবন মোহন রায়: চাকমা রাজবংশের ইতিহাস,(১৯১৯) পৃ ৩৭।

♦ আবদুস সাত্তার: কবি, গবেষক ও আরণ্য জনপদের লেখক।

অমিত সম্ভাবনার পার্বত্য চট্টগ্রাম : শান্তি, সম্প্রীতি এবং উন্নয়নের স্বপ্ন ও বাস্তবতা

bri. gen. tofayel ahmed

ব্রি. জে. মো. তোফায়েল আহমেদ, পিএসসি

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সুপ্রাচীন কাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ঐতিহাসিক এবং ভৌগলিক অবস্থানজনিত কারণে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানকার জীবনযাত্রা সমতল এলাকার তুলনায় কঠিন ছিল বিধায় অতীতে খুব বেশিসংখ্যক লোকজন এই এলাকায় বাস করতে উৎসাহী হয়নি। বর্তমানে যেসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আছেন তারা ইদানীং নিজেদের আদিবাসী বলে দাবী করেন এবং এদেশের কিছু মিডিয়া এবং বুদ্ধিজীবিগণ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন না করে, জেনে অথবা না জেনে বিভিন্ন সময়ে এ শব্দের প্রতিধ্বনি করে যাচ্ছে। আদিবাসী হচ্ছে অষ্ট্রেলিয়ার এ্যাবোরেজিনিয়াস, নেটিভ আমেরিকান রেড ইন্ডিয়ান, ফ্রান্স ও স্পেন এর বাসকু, দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা ও মায়া, জাপানের আইনু, আরব বেদুইন সম্প্রদায় ইত্যাদি যারা সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডে আদিকাল থেকে বসবাস করে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশের একদশমাংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় (১৩,২৯৫ বর্গ কিঃমিঃ/৫,১৩৩ বর্গ মাইল) যে মাত্র এক শতাংশ জনসংখ্যা (২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী ১৫,৯৮,২৯১ জন) বাস করছে তার ৪৭% বাঙালী, ২৬% চাকমা, ১২% মারমা এবং ১৫% অন্যান্য পাহাড়ী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যারা সিনলুন, চিন, আরাকান, ত্রিপুরা, বার্মা এবং অন্যান্য এলাকা থেকে আনুমানিক মাত্র তিনশ থেকে পাঁচশ বছর পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে আবাস স্থাপন করেছে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় প্রথম আসে কুকীরা। পরবর্তীতে ত্রিপুরাগণ এবং ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে আসে আরাকানী গোত্রভুক্ত চাকমা ও মার্মা সম্প্রদায়। অথচ এদেশে বাঙালী বা তাদের পূর্বপুরুষগণ বসবাস করতে শুরু করেছে প্রায় চার হাজার বছর আগে থেকে। কাজেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদিবাসী হবার দাবীর প্রশ্নটি এখানে অবান্তর এবং আবাসপত্তনের সময় হিসেব করলে বাঙালীরাই বাংলাদেশের আদিবাসী । আর পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত অবাঙালীরা এদেশের সংবিধানের স্বীকৃতি অনুযায়ী ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী।

দেশ বিভাগ ও মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমিকা
কালের পরিক্রমায় পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা দুইবার বড় ধরনের ভুল করে। প্রথমবার ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের সময় তারা ভারতের অংশ হবার চেষ্টা করে এবং চাকমা নেতা কামিনী মোহন দেওয়ান ও স্নেহকুমার চাকমা রাঙ্গামাটিতে ভারতীয় এবং বোমাং রাজা বান্দরবনে বার্মার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। দ্বিতীয়বার ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় এবং বোমাং রাজা মংশৈ প্রু চৌধুরী পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করে রাজাকার এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এর মধ্যে রাজা ত্রিদিব রায় যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন এবং ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে পাকিস্তানে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে কখনোই আর তিনি বাংলাদেশে ফেরৎ আসেননি। কিন্তু এর ব্যতিক্রম ছিলেন মং সার্কেলের রাজা মং প্রু সাইন। তিনিই একমাত্র রাজা যিনি মুক্তিযুদ্ধে আখাউড়া ও ভৈরব এলাকায় সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং সেনাবাহিনীর কর্ণেল পদমর্যাদা প্রাপ্ত হয়েছিলেন। রাজা মং প্রু সাইন নিজস্ব ৩৩টি অস্ত্র, ৪টি গাড়ী এবং অনেক অর্থ মুক্তিযুদ্ধের জন্য ব্যয় করেছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসররা মং রাজার ৮টি হাতি, ৭টি ঘোড়া, ১৭০টি মহিষ, ১৬৬৩টি গরু, গুদাম ঘরে রক্ষিত ৯০,০০০ আড়ি ধান, ২৭০০টি চেয়ারসহ অনেক মূল্যবান ফার্নিচার, দশহাজার অতিথিকে আপ্যায়ন করার মত সরঞ্জামাদি, ১৮টি পাওয়ারটিলার, ১০টি জেনারেটর, রাজ পরিবারের শত বছরের স্মৃতি বিজড়িত অজস্ত্র স্বর্ণালংকার ও কয়েক কোটি টাকার ধনসম্পত্তি লুণ্ঠন করে। উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধে এতবড় ত্যাগ এবং অবদান রাখার পরও তাঁকে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক যথাযথ সম্মান প্রদর্শন এখনও পর্যন্ত করা হয়নি। আশা করা যায়, মুক্তিযুদ্ধে তার এবং এই রাজপরিবারের অবদান যথাসময়ে মূল্যায়ন করা হবে।

কাপ্তাই ড্যাম ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল
১৯৬২ সালের কাপ্তাই ড্যাম অধ্যায় যে ন্যাক্কারজনকভাবে সমাধান করা হয়েছে তা মানব সভ্যতার ইতিহাসে সত্যিই বিরল। হাজার হাজার মানুষ (তার মধ্যে অনেক বাঙালীও ছিল) যারা তাদের বসতবাড়ি হারালো অথচ তাদের যথাযথভাবে ক্ষতিপুরণ প্রদান এবং পূর্নবাসন করলো না তদানিন্তন পাকিস্তানি সরকার। ১৯৭০ সালে থেগামুখ, শুভলং এবং রাইনখিয়াং থেকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল সৃষ্টির জন্য অনেক পরিবারকে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক একইভাবে যথাযথ পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করা হয়েছিল। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সেই পাকিস্তান সরকারের পক্ষেই অস্ত্র ধরলো ঐ পাহাড়ী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির বেশীর ভাগ  এবং হত্যা করলো ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদেরসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাদের। তাদের এই ভূমিকার কথা এদেশের আপামর জনসাধারণের ক’জনই বা জানে? এখন দেশে মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য রাজাকারদের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একই অপরাধে তারা অপরাধী কিনা সময়ই তা বলে দিবে।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী কার্যক্রম
মুক্তিযুদ্ধের ধকল কাটতে না কাটতেই এই অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ১৯৭৬ সালের ১৮ জুলাই বিলাইছড়ি থানার তক্তানালার কাছে মালু মিয়া পাহাড়ের নিকটে সকাল ১১টায় রাঙ্গামাটি থেকে আগত পুলিশ পেট্রোলের উপর আক্রমণ পরিচালনার মধ্য দিয়ে আরেকটি অসম যুদ্ধের সূচনা হয়। এর পরবর্তী ইতিহাস রক্তের হোলি খেলার ইতিহাস। শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হত্যা করেছিল অসংখ্য নিরীহ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, বাঙালী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের। বর্তমানে একই ধরনের কার্যক্রম ইউপিডিএফ, জেএসএস এবং সংস্কারবাদী দলের সন্ত্রাসীরা সবাই মিলে করছে। তথ্য মতে, ৩০ জুন ২০১৫ পর্যন্ত সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০৯৬ জনকে হত্যা, ১৮৮৭ জনকে আহত এবং ২১৮৮ জনকে অপহরণ করা হয়েছে। এর প্রায় এক তৃতীয়াংশ পার্বত্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য। নিরাপত্তা বাহিনীকেও সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমির ভৌগলিক অখন্ডতা রক্ষার জন্য বেশ চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। শুরু থেকে ২০১৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৫৩ জন প্রাণ দিয়েছেন, আহত হয়েছেন ৪৫২ জন এবং ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য রোগে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ২৫৫ জন।

শান্তিচুক্তি ও পরবর্তী অধ্যায়
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তি চুক্তির মাধ্যমে হত্যা, লুণ্ঠন, জ্বালাও, পোড়াও, নারী নির্যাতনসহ অসংখ্য সন্ত্রাসী কার্য়ক্রমের অবসান হবে বলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত জনসাধারণ ধারণা করেছিল। কিন্তু বর্তমানে কি দেখা যাচ্ছে? শুধু বাঙ্গালী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নয়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরাও অত্যাচারিত, নিপীড়িত এবং ভয়ংকর জিঘাংসার শিকার। জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং সংস্কারবাদী নামে গড়ে উঠা সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত মানুষদের কাছ থেকে নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে জোর জবরদস্তি করে চাঁদা আদায় করে, আদায়কৃত চাঁদার টাকা দিয়ে অস্ত্র কিনে এবং সেই অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে আরো বেশি চাঁদা আদায় করে। এ যেন এক সীমাহীন চলমান গোলক ধাঁধার বৃত্ত। এখানকার বিত্তহীন নিরীহ মানুষদের হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, ফসল ধ্বংস, বাগান ধ্বংস, জ্বালাও-পোড়াও, ভয়ভীতি এবং নির্যাতন এখনও চলছে। ইদানীং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় সংগঠিত সকল বিষয়ে তারা প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, আদেশ নির্দেশ ও মিমাংসা না মানার জন্য ভয় ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করছে যা সংবিধান বিরোধী এবং দেশদ্রোহীতার নামান্তর। তারা পার্বত্য জনপদে সরকার ও প্রশাসনের একটি বিকল্প সরকার ও ছায়া প্রশাসন জোর করে এখানকার মানুষদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। আর প্রশাসন কখনো কখনো নিরুপায় হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নির্যাতন ও অত্যাচারের ভয়ে এই সব সন্ত্রাসী কর্মকান্ড মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এত অমিত সম্ভবনাময় এই অঞ্চল অথচ এখানে সকলে আসতে ভয় পায় কেন? কেন সকল উন্নয়ন কার্যক্রমে তাদের চাঁদা দিতে হয়? কেন কলা, কচু, মুরগি, ছাগল, শুকর, গরু বিক্রি থেকে শুরু করে ধানিজমি, বাগান সব কিছুর জন্য চাঁদা দিতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে ?

শান্তিচুক্তি বাস্ততবায়নের অগ্রগতি
একটি অর্ধেক পানি ভর্তি গ্লাসকে অর্ধেক পুর্ণ বা অর্ধেক খালি হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। শান্তি চুক্তির সর্বমোট ৭২টি ধারার মধ্যে ইতোমধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ, ১৫টি ধারার বেশীর ভাগ অংশ এবং অবশিষ্ট ৯টি ধারার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বর্তমান সরকারের প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সালে ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি করেছিলেন এবং অবশ্যই তিনি তা বাস্তবায়ন করতে বদ্ধপরিকর। চুক্তি অনুযায়ী নিরাপত্তা বাহিনীর অনেক ক্যাম্প ইতোমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে অথচ সন্ত্রাসীরা তাদের সকল অস্ত্র এখনও পর্যন্ত সমর্পন করেনি। কিন্তু পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত সাধারণ জনগন দাবী করেছে যে নিরাপত্তা বাহিনী এখান থেকে চলে গেলে তারা আরও বেশী নিরপত্তা ঝুকিতে আবর্তিত হবে। শান্তিচুক্তির সবচেয়ে জটিল যে বিষয়টি তা হচ্ছে ভুমি ব্যবস্থাপনা। এ বিষয়ে ভুমি কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং সেই কমিশন কাজ করছে। ভুমি কমিশনের প্রধান ছাড়া বাকী সকল সদস্যই পার্বত্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। বিষয়টির ব্যপকতা এবং জটিলতার কারণেই একটু বেশী সময় লাগছে সমাধান করতে। তবে প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে একথা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়। এ পর্যন্ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙ্গালী উভয় পক্ষ খাগড়াছড়িতে ৩১০৫টি, রাঙ্গামাটিতে ৯৬৯টি এবং বান্দরবনে ৩৮৪টিসহ সর্বমোট ৪৪০৮টি ভুমি সংক্রান্ত মামলা করেছে। অগ্রগতি হিসেবে ইতোমধ্যে কমবেশী ৪০০০টি মামলার ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হয়েছে, ৩৩টি মামলার শুনানী শেষ হয়েছে এবং বাকী মামলাগুলোর ব্যাপারে কার্যক্রম চলছে। দেখা গেছে, এখানকার সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো ভুমি সমস্যা সমাধান কার্যক্রমে সর্বদা বাধা প্রদান করে থাকে, কারণ ভূমি সমস্যা সমাধান হয়ে গেলে তাদের হাতে কোন ইস্যু থাকবেনা যা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের ট্রাম কার্ড। একইভাবে যে সকল বিত্তবান ব্যক্তিবর্গ অবৈধভাবে প্রাপ্যের চেয়ে অনেক বেশী জমি দখল করে আছেন তারাও চান না ভূমি সমস্যা দ্রুত সমাধান হোক। এছাড়া আর একটি জটিলতা হলো, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তিবর্গের ভূমির মালিকানার যথাযথ কাগজপত্র না থাকা। কারণ অতীতে তারা কোন প্রকার কাগজপত্র ব্যতিরেকেই জমি ভোগদখল করতো। এছাড়া শান্তিচুক্তির কিছু ধারা আমাদের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। সেগুলোর সমাধানের বিষয়ে কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। এখানে ভুলে গেলে চলবে না যে পৃথিবীর অনেক দেশে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর হবার পরও তা নানান কারণে কার্যকর করা যায়নি বা সম্ভব হয়নি। উদাহরণ স্বরূপ সুদান (১৯৭২), সোমালিয়া (১৯৯০), এঙ্গোলা (১৯৯১ ও ১৯৯৪), রুয়ান্ডা (১৯৯৩), নর্দান আয়ারল্যান্ড ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। কাজেই শান্তি চুক্তির অনিষ্পন্ন বিষয়াবলির সামধানের জন্য ধৈর্য্যচ্যুতি কারও জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে বলে মনে হয় না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই আর্থসামাজিক উন্নয়নে ও মানবতার কল্যাণে নিরাপত্তাবাহিনীর ভূমিকা  অনেকেই অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রম সম্বন্ধে তেমনটা ওয়াকিবহাল নন। সন্ত্রাস দমন ও দেশের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখন্ডতা নিশ্চিত করার সাথে সাথে নিরাপত্তা বাহিনী এই অশান্ত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জনগনের জন্য আবাসন স্থাপনে সহযোগীতা, স্থানীয় জনগনকে বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান এবং প্রায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে সরাসরি ভুমিকা রাখা; শিল্প ব্যবস্থার উন্নয়ন ও কুটির শিল্প স্থাপন; নিরাপদ হাইজিন ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা; কৃষি, পশুপালন, মাছ চাষ, হাঁস-মুরগী পালন, বৃক্ষ রোপন; ধর্মীয় ও বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান পালন, চিত্তবিনোদন, খেলাধুলা, প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলা এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক উন্নয়নে নিরাপত্তাবাহিনীর সাফল্যের কথা কোন এক অজানা কারণে এদেশের মানুষ জানতে পারে না বা জানানো হয় না। আমাদের মিডিয়াগুলো এ ব্যাপারে তেমন কার্যকরী ভূমিকা নেয় না বলেই অভিযোগ রয়েছে। একটি বিষয় এখানে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়, পক্ষপাতহীন কার্যক্রমের জন্যই পার্বত্য চট্টগ্রামে শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় সন্ত্রাসী ব্যক্তিবর্গ ছাড়া বাকী সকলের কাছে এখনও নিরাপত্তাবাহিনীই সবচেয়ে বেশী গ্রহণযোগ্য।

সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীদের স্বপ্ন
পার্বত্য চট্টগ্রামের অঞ্চলিক দল ও তাদের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের চাওয়া এবং স্বপ্নগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করা জরুরী। অবস্থাদৃষ্টে তাদের চাহিদাগুলো নিম্নরূপ বলে প্রতীয়মান হয়:

শিক্ষার উন্নয়নে বাধা প্রদান

তাদের প্রথম স্বপ্ন সম্ভবতঃ এই এলাকার পশ্চাৎপদ মানুষদের মূর্খ করে রাখা। রাঙ্গামটিতে মেডিক্যাল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে বাধা প্রদান তার প্রমাণ। না হলে এখানকার নিরীহ জনগণ, যারা তাদের ভয়ে নিয়মিত চাঁদা দেয়, তাদের ছেলেমেয়রা স্কুল/কলেজে যেতে পারে না; অথচ তাদের দেয়া চাঁদার টাকায় সেই সব নেতানেত্রীদের ছেলে মেয়েরা লেখাপড়া করে শহরের নামী দামী স্কুল/কলেজে এবং বিদেশে। সেসব নেতানেত্রীদের সন্তানেরা ইংরেজী মাধ্যমে লেখাপড়া করলেও তারা চান সাধারণ জনগণের সন্ত্রানেরা শুধুমাত্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের নিজস্ব ভাষা শিখে এবং বাংলা ও ইংরেজী না শিখে জংগলের আরও গভীরে চলে যাক। এখানে মায়ের ভাষা ভুলে যাবার কথা বলা হচ্ছে না, প্রগতি ও অগ্রগতির কথা বলা হচ্ছে। ভারতে সবাইকে কমপক্ষে ৩টি ভাষা শিখতে হয়। পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের ইচ্ছা, এখানকার জনগণ মূর্খ থাকলে তাদের পক্ষে শোষণ করা সহজ; যেমনটি তারা এতকাল ধরে করে এসেছে। বাংলাদেশ সরকার এই এলাকার শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য অনেক কাজ করেছে। ১৯৭০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে মাত্র ৬টি উচ্চ বিদ্যালয়/কলেজ ছিল যার বর্তমান সংখ্যা ৪৭৯টি। প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন প্রতি পাড়ায় পাড়ায়। এছাড়া ইতোমধ্যে এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় (ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করা হয়েছে), একটি মেডিক্যাল কলেজ, ৫টি স্টেডিয়াম, ২৫টি হাসপাতাল এবং বর্তমানে ১৩৮২টি বিভিন্ন কটেজ ইন্ডাষ্ট্রি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার হার ১৯৭০ সালে মাত্র ২% শতাংশ ছিল যা বেড়ে এখন ৪৪.৬% হয়েছে। অবশ্য এই তথ্যে সন্তুষ্ট হবার কিছু নেই। এখানে বসবাসরত মানুষদের জন্য আরও অনেক কিছু করার দরকার ছিল এবং আরও অনেক কিছু করা সম্ভব ছিল। অনেক কিছুই করা সম্ভব হয়নি এখানকার তথাকথিত সেইসব কল্যাণকামী (?) নেতানেত্রী এবং তাদের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বাঁধার কারণে।

জনগণের থেকে জোর করে আদায় করা চাঁদার টাকায় আরাম আয়েশে দিনযাপন করা

এটি তাদের দ্বিতীয় স্বপ্ন এবং বর্তমানে নিষ্ঠুর বাস্তবতা। জানা গেছে, যে শুধুমাত্র মাটিরাঙ্গা থেকে বছরে ৩২ কোটি টাকার মত এবং সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বছরে কমবেশী ৪০০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। কোথায় ব্যয় হয় সেই টাকা? কয়টা স্কুল, কয়টা কলেজ, কয়টা হাসপাতাল তৈরি করে দিয়েছে জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং সংষ্কারবাদীরা? কত ফিট রাস্তা তারা এ পর্যন্ত নির্মাণ করে দিয়েছে? কি করেছে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত টাকা জবরদস্তী করে লুট করে নিয়ে? এখন সময় এসেছে এখানকার সন্ত্রাসী নেতাদের সম্পত্তির হিসাব নেয়ার কারণ জানা গেছে যে, নেতাদের অনেকেই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, করেছেন বাড়ী/গাড়ী, ব্যাংক ব্যালেন্স ইত্যাদি। পাহাড়ে বসবারত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা সরকারকে কর প্রদান করে না। পক্ষান্তরে করের থেকে কয়েকগুণ বেশী চাঁদা দিতে বাধ্য হয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের। এত কিছুর পরেও বাংলাদেশ সরকার সমতল ভূমির জনগণের কর থেকে অর্জিত অর্থ পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে ব্যয় করছে । পার্বত্য অঞ্চলে ১৯৭০ সালে মাত্র ৪৮ কিঃমিঃ রাস্তা ছিল। বাংলাদেশ সরকার নির্মাণ করেছে প্রায় ১,৫০০ কিঃমিঃ রাস্তা, অসংখ্য ব্রিজ ও কালভার্টসহ সম্পন্ন করেছে অনেক উন্নয়ন কার্যক্রম। কিন্তু রাস্তাঘাট ও ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণে এবং সকল প্রকার উন্নয়ন কার্যক্রমে তারা সবসময়ে বাঁধা দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে। সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজী এবং শ্রমিক অপহরণ ও বাঁধার সৃষ্টি না করলে উন্নয়ন কাজ আরও সহজে সম্পন্ন করা যেত। জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সকল নির্মাণ কাজে জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং সংস্কারবাদী সন্ত্রাসীদের যথাক্রমে ১০%, ৫% ও ৩% অথবা আরোও বেশী হারে চাঁদা দিতে হয়। এখানে কোন বিত্তশালী কিংবা দেশী বিদেশী কোম্পানী পুঁজি বিনিয়োগ করতে চান না কেন ? লক্ষীছড়ি থেকে বার্মাছড়ি পর্যন্ত রাস্তার কাজ বন্ধ করে ঠিকাদার কেন পালিয়ে গেলেন? এই অত্যাচার থেকে এখানে বসবাসরত নিরীহ মানুষদের কবে মুক্তি মিলবে ?

স্বায়ত্বশাসন তথা পৃথক জম্মুল্যান্ড গঠন  

পার্বত্য সন্ত্রাসীদের তৃতীয় দিবা কিংবা অলীক স্বপ্ন হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বায়ত্বশাসিত প্রকারান্তরে স্বাধীন একটি দেশ প্রতিষ্ঠা করা যার নাম হবে ‘জম্মুল্যান্ড’। বর্তমান বিশ্বে দুই জার্মানী এক হলো, দুই কোরিয়া এক হতে চেষ্টা করেছে, ইন্ডিয়া সিকিমকে যুক্ত করে আরও বড় হয়েছে, সমগ্র ইউরোপ অভিন্ন মুদ্রা ব্যবহার করছে এবং পাসপোর্টবিহীনভাবে ইউরোপের সব দেশে চলাচল করছে, হংকং চীনের সাথে অঙ্গীভুত হয়েছে, স্কটল্যান্ডের জনগন পৃথক দেশ গঠনের বিরুদ্ধে গণভোট প্রয়োগ করেছে; অর্থাৎ সবাই যখন যুক্তভাবে শক্তিশালী হতে চেষ্টা করেছে তখন পার্বত্য সন্ত্রাসীরা চেষ্টা করছে এদেশ ভেঙ্গে ছোট করতে; প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমিকে টুকরো টুকরো করতে। তাদের স্বায়ত্বশাসন বা স্বাধীন ভূ-খন্ডের এই অলীক ও অবাস্তব স্বপ্ন কখনই পূরণ হবে না, হতে পারে না। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন থেকে প্রায় সব দেশ স্বাধীন হয়েছে। পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল। কিন্তু লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই ভূখণ্ডে নতুন করে আরেকটি দেশ তৈরী করা কখনোই সম্ভব হবে না। এখানে আরোও দুটি বিষয়ে আলোকপাত করা দরকারঃ

বর্তমান চাহিদামত নতুন ভূখণ্ড তথা ‘জম্মুল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠিত হলেও তাদের আরও এক বা একাধিকবার যুদ্ধ করতে হবে স্বতন্ত্র চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমা ল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করার জন্য। কারণ সবাই জানে যে চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমাদের মধ্যে শিক্ষা, সুযোগ সুবিধা, জীবনযাত্রার মানের বিভিন্ন সূচকে রয়েছে বিশাল বৈষম্য। অপর বিষয়টি হলো: ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, এক সাগর রক্তের দামে কেনা এদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তথা রাজাকারদের কোন প্রচেষ্টা, এদেশের ১৬ কোটি মানুষ এবং এদেশের চৌকষ নিরাপত্তা বাহিনী সফল হতে দেবে কিনা তা বিবেচনার ভার পাঠকদের উপর থাকলো।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠিকে বিতাড়িত করা

এখানকার সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আরেকটি স্বপ্ন এখানে বসবাসরত অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অর্থাৎ বাঙালী সম্প্রদায়কে এখান থেকে বিতাড়িত করা। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশ আমেরিকাকে বলা হয় ইমিগ্রান্ট বা অভিবাসীদের দেশ। আমেরিকাতে নেটিভদের বাদ দিলে শতকরা ৯৯% জনেরও বেশী মানুষ পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকে গিয়ে সেখানকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কানাডা ও ইউরোপে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠি একত্রে বসবাস করছে। এখানকার অনেক নেতা নেত্রীদের সন্তান ও আত্বীয়/স্বজনেরা আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া ও ব্রিটেন এর স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছেন কিংবা নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। তারা বাংলাদেশের যে কোন স্থানে বসতি স্থাপন করতে পারে এবং করছে। কিন্তু সমতলের বাংলাদেশীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করাতেই তাদের যত আপত্তি। তাদের এক অদ্ভুত দাবী। এখানে যার জন্ম হয়েছে, এই মাটির ধূলা মাখিয়ে যে বড় হয়েছে, এখানের বাতাসে যে নিশ্বাস প্রশ্বাস গ্রহণ করে বেঁচে আছে, তাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে। কি অদ্ভুত এবং অবাস্তব আবদার। শান্তিচুক্তিতেও কিন্তু একথা লেখা নেই যে এখানে বসবাসরত বাঙালীদের এখান থেকে চলে যেতে হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই দাবী মোটেই বাস্তব সম্মত নয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাসবাসরত জনসাধারনের করণীয় কি

একটু আগেই বলা হয়েছে যে এখানকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরাও মুষ্টিমেয় সন্ত্রাসীদের ভয়ংকর জীঘাংসার শিকার। কিন্তু পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাসরত সাধারণ মানুষদের ইচ্ছা অনিচ্ছায় কিছু যায় আসে না। তাদের পালন করতে হয় এখানকার নেতৃত্ব ও সন্ত্রাসীদের নির্দেশ। এই প্রসঙ্গে নিম্নের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব আরোপ করা যেতে পারে যেমন:

নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদের নিশ্চিত করতে হবে

পৃথিবীর এমন কোন শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনী নেই যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সকলকে নিরাপত্তা দিতে পারে। তাই এখানকার জনসাধারণের নিরাপত্তা নিজেদেরকে সম্মিলিতভাবে নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য নিজ নিজ এলাকায়, প্রতিটি বাজারে এবং পাড়ায় পাড়ায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যথার্থ তথ্য দিলে যে সব অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও দুস্কৃতিকারীরা এলাকায় শান্তি বিনষ্ট করছে তাদের আইনের হাতে সোপর্দ করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নিরাপত্তা বাহিনী সদা প্রস্তুত রয়েছে।

চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে

যেকোন ভাবে সকলকে নিয়মিত ও অনিয়মিত চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে এখানকার উন্নয়ন কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, মোবাইল কোম্পানী, আন্তঃজেলা বাসমালিক ও ব্যবসায়ীদেরকে সন্ত্রাসীদের চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে। তাহলেই তারা অস্ত্র কেনা এবং অন্যান্য দলীয় কার্যক্রম সম্পাদনে অর্থ যোগানের জটিলতায় ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পরবে। তাই নিজ নিজ পাড়া ও বাজার এলাকাকে চাঁদাবাজী ও সন্ত্রাস মুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে। চাঁদাবাজদের পাকড়াও করে আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে। কারো একার পক্ষে এই কাজ সম্ভব না হলেও সম্মিলিত ভাবে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের প্রতিরোধ করা সম্ভব।

টেকসই আর্থ সামাজিক উন্নয়নে সচেষ্ট হতে হবে

টেকসই আর্থ সামাজিক উন্নয়নের জন্য সবাইকে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা বজায় এবং আত্মনিয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। শিক্ষা শুধু “পাশের হার” এবং “জিপিএ”র হলে চলবে না। সত্যিকার অর্থে আত্মকর্মসংস্থান সম্ভব হবে এমন শিক্ষাগ্রহণ করতে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা ও উৎসাহিত করতে হবে। আর এজন্য যা দরকার তা হচ্ছে নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক। কৃষি, বৃক্ষরোপণ, পশুপালন, মাছ চাষ, একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্প, ক্ষুদ্র কুটির শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্যের মাধ্যমে সকলকে স্বাবলম্বী হতে চেষ্টা করতে হবে এবং জীবনযাত্রার মান এগিয়ে নিয়ে যেতে সচেষ্ট থাকতে হবে। বর্তমান প্রজন্ম যে অবস্থায় আছে তার চেয়ে পরবর্তী প্রজন্ম যেন আরও ভালো থাকতে পারে এই চেষ্টা বজায় রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, সৃষ্টিকর্তা তাকেই সহযোগিতা করেন যিনি নিজেকে সাহায্য করতে সচেষ্ট থাকেন।

শান্তি ও সামাজিক সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে হবে                                                                 

সকলকে শান্তি ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। বাংলাদেশের প্রধান শক্তিই হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। বাঙালী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টানসহ সকল ধর্মালম্বী ও সকল জাতি গোষ্ঠীদের পরস্পরের প্রতি সহনশীল ও শ্রদ্ধাশীল আচরণ করতে হবে। কেউ যেন কখনই অন্য কারো কৃষ্টি, সভ্যতা, সামাজিকতা, ধর্মীয় অনুভূতি ইত্যাদিতে আঘাত না করে তা নিশ্চিত করতে হবে।

উপসংহার
স্বাধীনতার পর ৪২ বছরে বাংলাদেশের অর্জন প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক ভালো। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ ও সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য সমাধানে সময় নষ্ট করা কারও কাম্য হতে পারে না। অতীতের হানাহানী ও বিবাদভূলে সকলকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অগ্রসর হতে হবে। এখানকার ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠীর অধিকার, তাদের উত্তরাধিকারীদের অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নতির অধিকার সুষমভাবে নিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই। একই সাথে এখানে বসবাসরত অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালীরাও নিষ্ঠুর বাস্তবতার শিকার। এই সমস্যার সমাধান তাদের অন্যত্র পাঠিয়ে দেয়ার মধ্যে নয় বরং উভয় পক্ষের স্বার্থ ও সম্প্রীতি রক্ষা করার মাধ্যমেই সম্ভব। এদেশের জনগণ কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত অর্থ নিজের পরিবারের জন্য ব্যয় করতে চায়। দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে পরে শান্তিতে জীবন যাপন করতে চায়। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুশিক্ষা এবং উন্নত জীবন চায়। অসুস্থ্য হলে সুচিকিৎসা চায়। এই অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য অঞ্চলে মুষ্টিমেয় কিছু সন্ত্রাসী কর্তৃক সৃষ্ট অশান্তি ও অস্ত্রের ঝনঝনানী সমূলে উৎপাটন করে সকলে মিলে একটি শান্তিপূর্ণ ও উন্নত জীবন যাপন করা এবং পরবর্তী বংশধরদের জন্য বসবাসযোগ্য বাংলাদেশ রেখে যাওয়াই সকলের স্বপ্ন। এদেশের অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য এলাকায় সকলে মিলে শান্তি ও সম্প্রীতির সাথে বসবাস করতে পারলে উন্নয়ন এবং উন্নত জীবনযাপন নিশ্চিত হতে বাধ্য।

 লেখক: কমান্ডার, ২৪ আর্টিলারি ব্রিগেড ও গুইমারা রিজিয়ন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

আদিবাসী ইস্যু : দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের নীল নকশা

ষড়যন্ত্র

॥ মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ॥
শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পরবর্তী সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলসমূহ আন্তঃকলহ, বিভাজন, ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি, নেতৃত্বের সংকট, সঠিক দিকনির্দেশনা ও সর্বোপরি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে পার্বত্য জনগণ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি তাদের আন্দোলন-কর্মসূচি জনবিমুখ ও স্থবির হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে জেএসএস (মূল), ইউপিডিএফ এবং নব্যসৃষ্ট জেএসএস (সংস্কারপন্থী) দল ও তাদের অঙ্গ-সংগঠনসমূহ সক্রিয় থাকলেও তাদের কার্যক্রম মূলত আন্তঃদলীয় কোন্দল ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ। নিকট অতীতে এসকল দলসমূহ শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, ভূমি সমস্যার সমাধান, উপজাতীয় উদ্বাস্তু শরণার্থী পুনর্বাসন, বাঙালিদের সমতলে স্থানান্তর, সেনাক্যাম্প অপসারণসহ স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও সাধারণ উপজাতির অকুণ্ঠ সমর্থন লাভে ব্যর্থ হয়েছে। পার্বত্য সমস্যার সূচনাকাল হতে এসকল রাজনৈতিক দলসমূহকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও দেশীয় নেতৃত্ব, সংস্থা ও সংগঠন সাহায্য, সমর্থন, পরামর্শ ও দিক-নির্দেশনা প্রদান করে এসেছে।

সম্প্রতি আর্ন্তজাতিক ও জাতীয় কিছু সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের সমর্থনপুষ্ট হয়ে আঞ্চলিক দলসমূহ ‘আদিবাসী’ ইস্যুতে আন্দোলন কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগ নেয়। এরই অংশ হিসেবে তারা আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিমণ্ডলে একতরফাভাবে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণায় বাংলাদেশের পার্বত্য জেলায় বসবাসরত পাহাড়ী জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসাবে উপস্থাপন করার অপপ্রয়াসে লিপ্ত রয়েছে। এ কাজে আন্তর্জাতিক কিছু সংস্থা, এনজিও এবং দেশীয় কিছু বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমের কর্মী, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রচারণা চালাচ্ছে। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, আর্দশগত ও মতের মিল না থাকলেও অন্তত এই একটি বিষয়ে আঞ্চলিক দলসমূহ একটি মতানৈক্যে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা যায়।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র উপজাতীয় গোষ্ঠীকে নৃ-গোষ্ঠী হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে জাতীয় সংসদে বিল পাশ করা হলেও সাম্প্রতিককালে ‘আদিবাসী’ নামে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছোট ছোট জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করার অসাংবিধানিক উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের ‘স্বকীয়তা’ সুরক্ষার নামে নতুন করে তাদের মুখের ভাষার জন্য ইংরেজীতে বর্ণমালা তৈরি বা ‘লৈখিক ভাষা’ সৃষ্টিরও প্রয়াস চলছে। এক্ষেত্রে কিছু বিদেশী সংস্থার উদার পৃষ্ঠপোষকতা লক্ষ্যণীয়। এসকল কর্মকাণ্ড এসব ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক পরিমণ্ডল থেকে পৃথক করে রাখার কোনো দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমের অংশ কিনা, তা অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে। পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করা ভালো কাজ, কিন্তু তা করতে গিয়ে দেশের বৃহত্তর জনসমষ্টির সঙ্গে তাদের দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়া কিংবা বৈরী অবস্থান তৈরি করা মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়।

ইন্টারনেট সূত্রে জানা যায়, খ্রিস্টধর্ম প্রচারে অতি-উৎসাহী কিছু চার্চ পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে মাত্র ৫ হাজার জনসংখ্যার কোন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর সন্ধান পেলেই তাকে টার্গেট করে কাজ শুরু করে। প্রথমে চিহ্নিত জনগোষ্ঠীর ধর্ম-বিশ্বাস, সামাজিক কাঠামো, ভাষা, জীবনপ্রণালী ইত্যাদি ভালোভাবে অনুসন্ধান করা হয়। তারপর তৈরি হয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রকল্প। পশ্চিমা জগতের কয়েকটি শক্তিমান রাষ্ট্রের সাথে নব্যশক্তিধর রাষ্ট্রসমূহ তাদের রাজনৈতিক-সামরিক ও কৌশলগত স্বার্থের সহযোগী তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এ কার্যক্রমে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে চলেছে। শুরুতে দান-দক্ষিণা এবং সদুপদেশের মাধ্যমে সখ্য এবং নির্ভরশীলতা গড়ে তোলা হয়। এভাবে টার্গেট জনগোষ্ঠীর কাছে তারা হয়ে ওঠেন ত্রাণকর্তা। অতঃপর চলতে থাকে চিহ্নিত জনগোষ্ঠীকে তার পারিপার্শ্বিক বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া। তাদের বোঝানো হয়, পারিপার্শ্বিক জনগোষ্ঠীর শোষণ ও অবহেলার কারণেই তারা পিছিয়ে আছে। এ কাজে হাতের কাছে পাওয়া যায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কিছু সুবিধাভোগী মানুষ। যারা নিজ নিজ এনজিও কার্যক্রমে উদার সহযোগিতার বিনিময়ে পুঁজিবাদের বিশ্ব বিজয়ের এই সুদূরপ্রসারী নবঅভিযানে পথপ্রদর্শক ও ‘লোকাল কোলাবরেটর’-এর ভূমিকা পালন করেন নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে। কিছু রাজনৈতিক দল-উপদলকেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর বিপরীতে এসব ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমর্থক সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে দেখা যায়। তারা কথিত ‘আদিবাসী’ সম্প্রদায়ের কাছে জনপ্রিয় হতে গিয়ে এমন সব কথা বলেন বা কাজ করেন, যা বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় স্বার্থের জন্য সংকট সৃষ্টি করে।

এর পরবর্তী ধাপে শুরু হয় ধর্মান্তরকরণ। এভাবেই মিজো, নাগা, গারো, খাসিয়া, বোড়ো, টিপরা সম্প্রদায়সহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় সব ক্ষুদ্র জাতি-উপজাতি আজ খ্রিস্টধর্মের বলয়ে। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামেও একই ধারায় কাজ চলছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ইন্টারনেটে বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইট চালু রয়েছে বহুকাল ধরে। এগুলোতে যে ধরনের প্রচার-প্রচারণা করা হয় তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। এসব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সরকার, রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে তেমন জোরালো কোন প্রতিবাদ বা প্রচারণা লক্ষ্য করা যায় না।

‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে- একটি অঞ্চলে সুপ্রাচীন অতীত থেকে বাস করছে এমন জনগোষ্ঠী। ক্ষুদ্র জাতি-উপজাতি হলেই ‘আদিবাসী’ বা আদি-বাসিন্দা হবে তেমন কোন কথা নেই। আদিবাসী হলো ঐসব জনগোষ্ঠী যারা কোনো একটি বিশেষ এলাকায় জন্ম-জন্মান্তর থেকে অবস্থান করছে, যারা ‘ভূমি সন্তান’ হিসেবে পরিচিত। পার্বত্য জেলাগুলোতে বসবাসরত পাহাড়ীদের আদিনিবাস এখানে নয়। তারা মঙ্গোলয়েড বংশোদ্ভূত এবং বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার)-এর আরাকান, ভারতের বিহার ও মিজোরাম, থাইল্যান্ড ও চীন হতে এদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছে। ‘আদিবাসী’র আভিধানিক সংজ্ঞা সম্পর্কে ধারণাটা স্পষ্ট হওয়া দরকার। ‘আদিবাসী’ মানে হলো ‘ভূমি সন্তান’। ড. জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী কর্তৃক সম্পাদিত এবং বাংলা একাডেমি হতে প্রকাশিত ইংলিশ-বাংলা অভিধানে অইঙজওএওঘঅখ বলতে ঐসব মানুষ এবং প্রাণীকে বোঝানো হয়েছে যারা আদিকাল থেকে একই স্থানে বসবাস করছেন এবং পরিচিতি পেয়েছেন।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ফিজির দিকে তাকালে আসল আদিবাসী সম্পর্কে ধারণা আরো স্পষ্ট হবে। সেখানে বসবাসকারী স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী যারা ভূমি সন্তান হিসেবে পরিচিত। তারা কোনো অঞ্চল থেকে গিয়ে উক্ত এলাকায় বসতি স্থাপন করেনি এবং তাদের সংস্কৃতি এবং আচারের উৎসও তাদের নিজস্ব। তারাই হলো আসল আদিবাসী। যেমন আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান্স, অস্ট্রেলিয়ার এবরিজিন্স। উক্ত জনগোষ্ঠী ইউরোপিয়ান কর্তৃক আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কারের পূর্ব থেকেই ঐ দেশে বসবাস করতো।

বাংলাদেশের বৃহত্তর পরিম-লে ‘আদিবাসী’ বা আদি-বাসিন্দাদের উত্তরসূরি হওয়ার প্রথম দাবিদার এদেশের কৃষক সম্প্রদায়, যারা বংশপরম্পরায় শতাব্দীর পর শতাব্দী মাটি কামড়ে পড়ে আছে। বানভাসি, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, নদীভাঙন, ভিনদেশী হামলা- কোন কিছুই তাদের জমি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। নদীভাঙনে কেবল এখান থেকে ওখানে, নদীর এক তীর থেকে অপর তীরে সরে গেছে। এ মাটিতেই মিশে আছে তাদের শত পুরুষের রক্ত, কয়েক হাজার বছরের। কাজেই বাংলার ‘আদিবাসী’ অভিধার প্রকৃত দাবিদার বাংলার কৃষক- আদিতে প্রকৃতি পূজারী, পরবর্তী সময়ে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান যে ধর্মের অনুসারীই হোক না কেন। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার এই বদ্বীপ ভূমিতে আদি-অস্ট্রিক, অস্ট্রালয়েড, দ্রাবিড়, মোংগল, টিবেটো-বার্মান- বিচিত্র রক্তের সংমিশ্রণ ঘটেছে খ্রিস্টপূর্ব দশম শতকের আগে। অতঃপর ধাপে ধাপে এসেছে ‘শক-হুনদল পাঠান-মোগল’, সেই সঙ্গে ইরানি-তুরানি-আরব। সবশেষে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক আমলে স্বল্পমাত্রায় হলেও পর্তুগিজ, আর্মেনিয়ান, ইংরেজ, ফরাসি, গ্রিক। কালের প্রবাহে বিচিত্র রক্তধারা একাকার হয়ে উদ্ভূত হয় এক অতি-শংকর মানবপ্রজাতি-‘বাঙালি’। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বেশ কিছু ক্ষুদ্র ও খণ্ডিত জাতি-উপজাতি আজকের দিনেও তাদের পৃথক সত্ত্বা নিয়ে বসবাস করছে।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার এতদঞ্চলে আগমন কয়েকশ’ বছরের বেশি আগে নয়। বিশেষ করে চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলার চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা এই তিন প্রধান সম্প্রদায়ের এতদঞ্চলে আগমনের নানা বিবরণ সুনির্দিষ্টভাবে ইতিহাসে বিধৃত আছে। চাকমাদের এতদঞ্চলে আগমন তিন-চারশ’ বছর আগে। থাইল্যান্ড বা মিয়ানমারের কোন একটি অঞ্চলে গোত্রীয় সংঘাতের জের ধরে এই জনগোষ্ঠী আরাকান থেকে কক্সবাজার এলাকা হয়ে চট্টগ্রামে আগমন করে এবং চট্টগ্রামের সমতল ভূমিতে বসতি স্থাপন করে বাস করতে থাকে। এক সময়ে তারা চট্টগ্রাম অঞ্চলে রাজশক্তিতেও পরিণত হয়েছিল। এ জনগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানান্তরিত হয় ব্রিটিশ আমলে। ব্রিটিশরা লুসাই পাহাড়ে তাদের দখল স্থাপনের জন্য হামলা চালানোর সময় চাকমা সম্প্রদায়কে কাজে লাগায়। ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে মিজোদের বিরুদ্ধে তারা লড়াই করে। তার বিনিময়ে লড়াই শেষে তাদের রাঙ্গামাটি অঞ্চলে বসতি গড়ার সুযোগ দেয়া হয়। মারমা সম্প্রদায়ের ইতিহাসও প্রায় একই রকম।

সম্প্রতি বান্দরবানের বর্ষীয়ান মং রাজা অংশে প্রু চৌধুরী এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমরা এই অঞ্চলে আদিবাসী নই’। বান্দরবান এলাকায় মারমা বসতি ২০০ বছরেরও পুরনো। মং রাজাদের বংশলতিকা এবং ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে লিপিবদ্ধ থাকায় এ বিষয়ে সংশয়ের কিছু নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের তৃতীয় বৃহৎ জনগোষ্ঠী ‘ত্রিপুরা’। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছে পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা রাজ্য থেকে। কথিত আছে সেখানকার রাজরোষ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্রতর অংশ স্বেচ্ছা নির্বাসন বেছে নিয়ে এখানে এসেছে। সেটাও বেশিদিনের কথা নয়। এর বাইরে পার্বত্য চট্টগ্রামে আছে আরও ৮টি ক্ষুদ্র জাতি। তাদের কোন কোনটি চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদেরও পূর্ব থেকে এই অঞ্চলে বসবাস করছে। সংখ্যায় নগণ্য হলেও তাদের পৃথক নৃ-তাত্ত্বিক সত্তা দৃশ্যমান। বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকায় গারো, হাজং, সাঁওতাল, ওরাঁও, রাজবংশী, মনিপুরী, খাসিয়া প্রভৃতি বিভিন্ন জনগোষ্ঠী রয়েছে। এদের অধিকাংশেরই বৃহত্তর অংশ রয়েছে প্রতিবেশী ভারতে। ক্ষুদ্রতর একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে আগে-পরে বাংলাদেশে এসেছে। তারাও দীর্ঘকাল ধরে এদেশে বসবাস করছে বিধায় এদেশের নাগরিক হিসেবে সমঅধিকার ও সমসুযোগ তাদের অবশ্য প্রাপ্য। তবে এদের কোনটিই বাংলাদেশের আদি বাসিন্দা বা ‘আদিবাসী’ নয়।

বাংলাদেশে আদিবাসী কোনো গোষ্ঠীর অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়নি; বরং বাংলা ভাষাভাষীরাই এদেশের আদিনিবাসী। আর পার্বত্য এলাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী উপজাতিরা জীবিকার প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে এদেশে তথা ভারতবর্ষে এসেছে এবং উপজাতীয়দের সংস্কৃতি ও আচারের উৎস এ অঞ্চলের নিজস্ব নয়। প্রত্যেক গোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি ও আচারের উৎস তারা যেসব অঞ্চল থেকে এসেছে, সেখান থেকেই আসা। তাই বাংলাদেশের পার্বত্য জেলাগুলোতে বসবাসরত উপজাতীয় জনগোষ্ঠীকে কেবল ক্ষুদ্র উপজাতীয় নৃ-গোষ্ঠী বলা যেতে পারে। কোনোভাবেই তাদেরকে আদিবাসী বলা বা আদিবাসী হিসেবে গণ্য করা সমীচীন নয়।

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে যে ১৩টি উপজাতীয় নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস, তাদের আগমন হয় ১৬০০ থেকে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে। তাদের প্রত্যেকের আদিনিবাস এবং পার্বত্য জেলায় আগমনের তথ্য  পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বর্তমানে তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসরত মগ বা মার্মা, মুরং, ত্রিপুরা, লসাই, খুমিস, বোমাং বা বম, খিয়াং, চাক, পাঙ্খু, তঞ্চক্ষা, কুকি, রাখাইন, চাকমাসহ সকল উপজাতি বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চল ও দেশ থেকে এসে বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। ফলে উপরিউক্ত জাতি-গোষ্ঠীর অতীত বিশ্লেষণে এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের পার্বত্য জেলাগুলোতে বসবাসরত পাহাড়িরা কখনোই এ এলাকার আদিবাসী নয়।

আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ পাহাড়ি এবং আদিবাসীদের মধ্যকার পার্থক্য বুঝতে পারার কথা নয়। দেশের সুবিধাবাদী জনগোষ্ঠীর একটি অংশ সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে পাহাড়িদেরকে আদিবাসী হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। এ কাজে কিছু দেশী-বিদেশী এনজিও জড়িত, যারা তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসরত পাহাড়িদের দৈন্যতার সুযোগ নিয়ে তাদের জীবনমান উন্নয়নের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। এতে সাধারণ পাহাড়িদের কাছ থেকে তারা প্রচুর সাড়াও পাচ্ছে। আর এভাবে একবার যদি তারা উপজাতিদেরকে আদিবাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়, তবে আমাদের জন্য তা হবে চরম শঙ্কার কারণ। কেননা আদিবাসীদের বিষয়ে জাতিসংঘের নীতিমালা অত্যন্ত রক্ষণশীল এবং স্পর্শকাতর।

আদিবাসীদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য আইএলও কনভেনশন ১০৭ যা বাংলাদেশ অনুমোদন করেছে, একই সাথে আইএলও কনভেনশন ১৬৯ (১৯৮৯) এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর একটি রেজুলেশন পাস করে; যা বাংলাদেশ সরকার সঙ্গতকারণেই অনুমোদন করেনি। কারণ এ সকল রেজুলেশনে অনেক নির্দেশনা রয়েছে যেগুলো দ্বারা আদিবাসীদের অধিকারকে সুরক্ষিত করা হয়েছে। আদিবাসীদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য এ ধরনের নির্দেশনা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য এবং এতে কারো কোনো দ্বিমত নেই। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উক্ত রেজুলেশন প্রযোজ্য নয়। কারণ বাংলাদেশে আদিবাসীদের কোনো অস্তিত্ব নেই। বাংলাদেশের সার্বভৌম ভূখণ্ডের একাংশে বসবাসকারী ঐ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীরা কেবল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে অভিহিত। তাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী পৃথক জাতিসত্তার অস্তিত্ব সংরক্ষণের জন্য সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কারণ সামগ্রিক জাতীয় পরিচয়ে তাতে কোনো সমস্যা দেখা দেয় না। মনে রাখতে হবে যে, তারাও এই স্বাধীন এবং সার্বভৌম দেশেরই নাগরিক। তাই দেশের অন্যান্য স্থানের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সাথে মিল রেখে ঐ অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীর ভাগ্য উন্নয়নেও আমাদেরকে সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যে, কোনোভাবেই যাতে তাদের নাগরিক অধিকার বিঘ্নিত না হয়। কেননা, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং মানবিক।

একটি আধুনিক জাতির রাষ্ট্র যতই এগিয়ে যাবে তার পরিমণ্ডলে অবস্থিত বিভিন্ন জনগোষ্ঠী কালপ্রবাহে বৃহত্তর দৈশিক আবহে ততই একক ও অভিন্ন পরিচয়ে ধাতস্থ হয়ে যাবে। এটাই ইতিহাসের ধারা। দুনিয়াজুড়ে প্রতিটি জাতি-রাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই অসংখ্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বিরাজমান। এক হিসেবে পৃথিবীতে এখনও এরকম ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৫০০০। এদের প্রত্যেকের পৃথক সত্তার স্বীকৃতি মেনে নিয়েই তাদের আয়ত্ব করে নিতে উদ্যোগী হতে হবে সব জাতি-রাষ্ট্রকে। সেজন্য প্রয়োজন উদার ও সংবেদনশীল মানসিকতা। পিছিয়ে থাকা গোষ্ঠীর প্রতি সহমর্মিতা। তাদের পিছিয়ে থাকা অবস্থান থেকে অতিদ্রুত সামগ্রিক জাতীয় পরিমণ্ডলে অন্যদের সমকক্ষতায় নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা। পশ্চিমা বিশ্ব এখানেই বাদ সাধছে। একদিকে দুনিয়াজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘নোডাল পয়েন্ট’ গুলোতে সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলা হয়েছে। অন্যদিকে চলছে বিভিন্ন দেশের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোকে পশ্চিমা জগতের ‘আউটপোস্টে’ পরিণত করা এবং সংশ্লিষ্ট জাতি-রাষ্ট্রের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে তাদের পৃথক করে দুনিয়াজুড়ে পশ্চিমাদের কায়েমি স্বার্থের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। ‘আদিবাসী’ স্লোগান এক্ষেত্রে কেবল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন। চুক্তির ফলে একদিকে যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সন্ত্রাসীর অস্ত্র সমর্পণ নিশ্চিত করা যায়নি। অপরদিকে ইউপিডিএফ ও জেএসএস (সংস্কারপন্থী) নামে নতুন সশস্ত্র সংগঠনের জন্ম হয়েছে। চুক্তির ফলে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের যুদ্ধ হ্রাস পেলেও সাধারণ মানুষ হত্যা হ্রাস করা যায়নি। বরং সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অপহরণ, ধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ অনেক ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী প্রত্যাবাসিত বাঙালিরা শরণার্থীর মতো নিজ ভূমে পরবাসী হয়ে জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে। চুক্তির শর্তানুযায়ী নিরাপত্তাবাহিনী প্রত্যাহার করায় দুর্গম পাহাড়ে বসবাসকারী নিরীহ উপজাতীয়দের নিরাপত্তা সবচেয়ে বিপন্ন হয়ে পড়েছে। সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম ভূখ-কে ব্যবহার করছে।

প্রকৃতপক্ষে, সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীলতার জন্য দায়ী জেএসএস ও ইউপিডিএফ’র সন্ত্রাসী সদস্য এবং কিছু কুমতলববাজ এনজিও কর্মী। এর বাইরে পাহাড়ের সকল শ্রেণীর বাঙালি ও উপজাতীয় বাসিন্দাগণ শান্তিপ্রিয় ও সহাবস্থানে বিশ্বাসী। স্বাধীন জুম্ম ল্যান্ড, সেনা প্রত্যাহার, বাঙালি খেদাও কোনো কিছুতেই তাদের আগ্রহ নেই। বরং বর্তমানে বাঙালি-পাহাড়ী সহাবস্থান, সৌহার্দ্য, সৌজন্যতা, আতিথেয়তা এমনকি বিয়ে-শাদীর মতো আত্মীয়তা ও সামাজিক সর্ম্পক বিনিময় হচ্ছে। আবহমান কাল হতে বিরাজমান এই সহজ, সুন্দর, স্থায়ী শান্তির সম্পর্ক ও সহাবস্থানকে বর্তমান ও সাবেক গুটিকয়েক সন্ত্রাসী এবং অন্যদিকে শান্তিচুক্তির ছায়ায় ইউএনডিপির মতো বিশ্ব সংস্থা ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর বিতর্কিত কার্যকলাপ বাধাগ্রস্ত করছে।

লেখক : সমাজকর্মী, বিশ্লেষক ও গবেষক

হঠাৎ উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম: খতিয়ে দেখতে হবে এখনই

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ 

হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। গত ১০-১২ দিনে একের পর এক সহিংস ঘটনায় তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পাহাড়ি-বাঙালিদের মাঝে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সেনা, বিজিবি ও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতির উপর আপাতত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলেও সেখানে বিরাজ করছে চাপা উত্তেজনা ও বিষ্ফোরনোন্মুখ পরিস্থিতি।

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে গত ৬ ডিসেম্বর প্রায় একই সময়ে পৃথক তিন উপজেলায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে দু’জন নিহত ও চারজন আহত হয়েছে। এর মধ্যে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে চিংসামং চৌধুরী (৪২) নামের এক স্কুল শিক্ষক নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন মংসাজাই মারমা ওরফে জাপান নামের মানিকছড়ি উপজেলা জেএসএস সভাপতি। তাকে চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। বেশ কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৬ ডিসেম্বর মংসাজাই মারমা ওরফে জাপান মারা যান। পৃথক এক ঘটনায়, জেলার পানছড়ি উপজেলার মগপাড়া (হলধর পাড়া) এলাকায় অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীদের গুলিতে রমজান আলী (৫৫) ও তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (৪০) গুরুতর আহত হয়েছেন। অপর এক ঘটনায় মাটিরাঙ্গা উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছেন চুক্তি স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমা সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা আশুতোষ ত্রিপুরা (২৬)। চিংসামং চৌধুরীর খুনের ঘটনায় খাগড়াছড়ি জেলার মারমা সম্প্রদায় প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ ও মারমা সম্প্রদায়ের উপর পরিচালিত আরেকটি উপজাতীয় সংগঠনের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে খাগড়াছড়িতে মিছিল মিটিং ও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। সেখান থেকে চাকমাদের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনাও ঘটে। মারমাদের এই শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে আঙুল তোলা কার্যত তিন পার্বত্য জেলার প্রভাবশালী চাকমা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ছিল। এরই মধ্যে ১৫ ডিসেম্বর কাপ্তাইয়ের ব্যাঙছড়িতে সুউচ্চ পাহাড়ের উপর ছবি মারমা (১৫) নামে এক উপজাতীয় তরুণীকে ধর্ষণের পর জবাই করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। কাপ্তাই থানা ওইদিন বিকেলে জবাই করা লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য থানায় নিয়ে যায়। পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিহত তরুণী চিৎমরম স্কুলের জেএসসি ফলপ্রার্থী। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১২টার দিকে বাসার জন্য গসিয়া নামক এক প্রকার খাদ্য আনার জন্য সুউচ্চ পাহাড়ের উপর জুম এলাকায় যায় সে। দুপুরে পরিবারের লোকজন খবর পায়, তাকে কে বা কারা জবাই করে জঙ্গলের মধ্যে ফেলে গেছে। এদিকে ৯ ডিসেম্বর বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার ডলু ঝিরি এলাকায় উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠন ম্রো ন্যাশনাল পার্টির (এমএনপি) সন্ত্রাসীরা দুই বাঙালি নারীকে গণধর্ষণ ও দুইজনকে অপহরণ করে। একই সাথে ৭-৮টি বাঙালি পরিবারের ওপর হামলা চালিয়ে স্বর্বস্ব লুট করে।
এদিকে রাঙামাটিতে ছবি মারমা নিহত হওয়ার একদিন পরই অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর জেলার নানিয়ারচর উপজেলার তরুণীপাড়া এলাকায় মধ্যরাতে বাঙালিদের প্রায় পনের একর আনারস বাগানের সাড়ে ৪ লাখ ফলন্ত আনারসের গাছ এবং একটি নতুন সেগুন বাগানের ২২ হাজার সেগুন গাছের চারা কেটে ফেলে দুর্বৃত্তরা। ভোরে আনারস বাগানের মালিক নুরুল ইসলাম, মো. আসাদ, কামাল হোসেন, জামাল হোসেন এবং সেগুন বাগানের মালিক আবছার মাস্টার বাগানে গিয়ে নিজেদের বাগানের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পান। তাদের অভিযোগ, পাশের গ্রামের পাহাড়িরাই রাতের আঁধারে তাদের বাগানের গাছগুলো কেটে ধ্বংস করে দিয়েছে। পার্বত্য জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে দাবি করেছে, প্রতিপক্ষ পাহাড়ি সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্টের সদস্যরা এই বর্বরতা চালিয়েছে। ওই আনারস ও সেগুন বাগান কেটে ফেলার ঘটনাকে ঘিরে কুতুকছড়ি ইউনিয়নের বগাছড়ি এলাকার বাঙালিদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর এক পর্যায়ে মঙ্গলবার সকাল পৌনে আটটার দিকে দলবদ্ধভাবে ক্ষুব্ধ বাঙালিরা বিক্ষোভ শুরু করে। অন্যদিকে দুর্বৃত্তরা পাশের তিনটি পাহাড়ি গ্রাম বগাছড়ি, ছড়িদাশ পাড়া ও নবীন তালুকদার পাড়ায় দোকানপাট ও বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। অগ্নিসংযোগে পাহাড়িদের বাড়িঘর ও দোকানপাট পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এসময় বাঙালিদেরও কয়েকটি ঘর পুড়তে দেখা গেছে। পাহাড়িদের অভিযোগ, এ সময় বুড়িঘাট ইউনিয়নের সুরিদাসপাড়া এলাকার ‘করুণা বিহার’ নামের একটি বৌদ্ধ বিহারে হামলা চালায় হামলাকারীরা। এ ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার থেকেই রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইউপিডিএফ সমর্থিত সংগঠন ভূমি রক্ষা কমিটি। নানিয়ারচরের ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ১৭ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদককে অপহরণ করে অজ্ঞাতনামারা। অপহৃত ব্যক্তির নাম অমল কুমার ত্রিপুরা (২৩)। সে পানছড়ি উপজেলার ৫নং উল্টাছড়ি ইউপির মরাটিলা এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য শান্তি কুমার ত্রিপুরার ছেলে। একই দিন খাগড়াছড়ির দীঘিনালার বাবুছড়া এলাকায় মন্টু বিকাশ চাকমা নামে এক ইউপিডিএফ সদস্যের বাসায় গুলি ও গ্রেনেড ছুড়ে মেরেছে দুর্বৃত্তরা। গ্রেনেডটি অবিস্ফোরিত অবস্থায় উদ্ধার করেছে দীঘিনালা থানা পুলিশ।
উপরের সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো উপায় নেই। কারণ, শান্তিচুক্তির ১৭ বছর পূর্তি উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র ব্যোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা সরকারকে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে এর মধ্যে শান্তিচুক্তির দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপ্রিয় ও অশান্তিপ্রিয় পন্থায় অসহযোগ আন্দোলন করার হুমকি দেন। ২৯ নভেম্বর রাজধানীর হোটেল সুন্দরবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সন্তু লারমা এ হুমকি দিয়ে বলেন, ১ মে ২০১৫ থেকে এই অসহযোগ আন্দোলন শুরু হবে। সন্তু লারমা অকষ্মাৎ এমন উক্তি করেছেন, বিষয়টি এমন নয়। গত কয়েক বছর ধরেই তিনি শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হলে পুরাতন সশস্ত্র সংগ্রামের হুমকি দিয়ে আসছেন। শান্তিচুক্তির দেড় দশকপূর্তির অনুষ্ঠানে প্রথম তিনি এই সশস্ত্র সংগ্রামের হুমকি দেন। তবে এবারে তার হুমকি দেয়ার পর থেকেই পাহাড়ে যে নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে তা সচেতন দেশবাসীকে চিন্তিত করে তুলেছে।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমা ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি চুক্তি অনুযায়ী খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে শান্তিবাহিনীর ৭৩৯ সদস্যের প্রথম দলটি সন্তু লারমার নেতৃত্বে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট অস্ত্রসমর্পণ করেছিল। পরবর্তীতে ১৬ ও ২২ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে ৪ দফায় শান্তিবাহিনীর মোট ১৯৪৭ জন অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানেই শান্তিবাহিনীর একাংশ শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যান করে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়াম কালো পতাকায় ঢেকে ফেলে। সৃষ্টি হয় প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে চুক্তিবিরোধী নতুন সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ। সে সময় থেকেই তারা প্রতিবছর ২ ডিসেম্বরকে ‘বেঈমান দিবস’ হিসাবে পালন করে আসছে। বলা হয়ে থাকে, শান্তিবাহিনীর সকল সদস্য আত্মসমর্পণ করেনি ও তাদের সব অস্ত্র জমা পড়েনি বরং পুরাতন ও ভাঙাচোরা কিছু অস্ত্র জমা দিয়ে তারা সরকারকে ধোঁকা দিয়েছিল।
২০১৪ সালের পরিসংখ্যান পুরোপুরি পাওয়া না গেলেও নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র মতে, শান্তিচুক্তির পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলায় সন্ত্রাসী কর্তৃক নিহতের সংখ্যা ৭৫৩ জন। আহত হয়েছে ৯৩২ জন। অপহৃত হয়েছে ১৩৬৫ জন। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে গ্রেফতার হয়েছে ৩৮৬৫ জন, গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে ১২৫১টি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে ২০টি। নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সন্ত্রাসীদের সম্মুখ যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে ৬৭ বার। জেএসএস-ইউপিডিএফ’র মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে ১৭৫ বার। পার্বত্য চট্টগ্রাম সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এটি পূর্ণাঙ্গ তথ্য নয়। প্রকৃত পরিসংখ্যান আরো বেশি। পার্বত্যাঞ্চলের আঞ্চলিক দলগুলো পারস্পরিক দ্বন্দ্বে শান্তিচুক্তির ১৬ বছরে ৩৪৪ নেতাকর্মী নিহত ও সহ¯্রাধিক আহত হয়েছে। ইউপিডিএফের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের তথ্য মতে, পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর থেকে ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত তাদের ২৫৪ জন নেতাকর্মী প্রতিপক্ষের সশস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছে। অন্যদিকে জেএসএসের কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য মোতাবেক, শান্তিচুক্তির পর থেকে একই সময় পর্যন্ত তাদের ৯০ জন নেতাকর্মী প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়েছে। এদিকে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৮ জন নিহত হয়েছে। ১২৬ জন আহত হয়েছে। ৮৭ জন অপহৃত হয়েছে। ৪৪টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, যে শান্তির অন্বেষণে শান্তিচুক্তি করা হয়েছিল তা পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আনতে সফল হয়নি। উল্টো সেখানকার প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি সম্প্রদায়কে এই চুক্তির মাধ্যমে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে নিজ দেশে পরবাসী করে ফেলা হয়েছে।
সন্তু লারমা কথায় কথায় সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিচুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে থাকেন। বস্তুত ১৯৯৮ সালের ৬ ডিসেম্বর আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের পর থেকেই তিনি এ অভিযোগ তুলে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদ গ্রহণে গড়িমসি করছিলেন। কিন্তু সে সময় সরকার সন্তু লারমাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো জেএসএস নেতা এ পদে বসানোর হুমকি দিলে তিনি তড়িঘড়ি করে ১৯৯৯ সালের ১২ মে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদে যোগ দেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় এই পদে অবস্থান করে সকল রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন এবং মাঝে মাঝেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকি দিচ্ছেন। এ পদে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ উপজাতি নেতারাই করেছেন বিভিন্ন সময়। শান্তিচুক্তি অনুযায়ী এই পদের মেয়াদ ৫ বছর। অথচ ১৬ বছর ধরে তিনি এই পদটি দখল করে ক্রমাগত শান্তিচুক্তি লঙ্ঘন করে চলেছেন। যদিও হাইকোর্ট আঞ্চলিক পরিষদকে রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র বলে তাকে সংবিধান ও রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দিয়ে বাতিল করে দিয়েছেন। তবে রায়টি উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্টে অবস্থায় রয়েছে।
শান্তিচুক্তির কোথাও সন্তু লারমাকে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তি হিসাবে দেয়া হয়নি। তিন পার্বত্য জেলায় বিভিন্ন উপজাতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষাদীক্ষা, জনপ্রিয়তা, প্রশাসনিক দক্ষতায় তার চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য উপজাতীয় নেতা রয়েছেন। এই পদে বসলে আরো যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন বলেই পাহাড়িরা বিশ্বাস করে। এমনকি তার নিজের দল জেএসএসের মধ্যেও অনেক যোগ্য নেতা রয়েছেন। ত্যাগ, তিতীক্ষা, জনপ্রিয়তা ও দক্ষতায় যারা এ পদের যোগ্য দাবিদার। সন্তু লারমা তাদের কোনো সুযোগ দেননি। সন্তু লারমার ক্ষমতালিপ্সার প্রতিবাদেই আরেক দফা জেএসএসে ভাঙন সৃষ্টি হয়। জন্ম নেয় জেএসএস (সংস্কার) পার্টির। কাজেই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের স্বার্থে সংশোধিত আইনে জেলা পরিষদসমূহের পুনর্গঠন শেষ হলে শান্তিচুক্তির গ খণ্ডের ১২ ধারা অনুযায়ী সরকারকে নতুন করে অন্তবর্তীকালীন আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের বিষয়টি সক্রিয় ভাবে বিবেচনা করে দেখতে হবে। অন্য যোগ্য উপজাতীয় নেতাকে সুযোগ দিতে হবে।
বাস্তবতা হচ্ছে, শান্তিচুক্তি অনুযায়ী সেসব স্থান থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে সেসব স্থান পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। শান্তিচুক্তির সুযোগ নিয়ে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে চাঁদাবাজির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। বাৎসরিক প্রায় ৪শ’ কোটি টাকা সেখানে চাঁদাবাজির মাধ্যমে পাহাড়ি সংগঠনগুলো আয় করে থাকে বলে ধারণা করা হয়। এর সাথে রয়েছে আর্মস, ড্রাগস ও মানব পাচার। অপহৃতদের লুকিয়ে রাখার জন্যও এসব স্থান নিরাপদ জোন হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কারণে বিগত কয়েক বছরে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা যেসব অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে মুক্তিপণ ছাড়া তাদের উদ্ধার সম্ভব হয়নি। এখন যখন সরকার ঐসব স্থানে জনগণের নিরাপত্তা বিধানে বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে, পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা উচ্ছেদ ও ভূমি দখলের অভিযোগ তুলে তা থামাতে চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে তারা জাতীয় পর্যায়ের বামপন্থী রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমের অকুণ্ঠ সহায়তা পাচ্ছে। পাহাড়িদের প্রতি বামপন্থীদের এই আত্মঘাতী সমর্থন নতুন নয়। সম্প্রতি প্রকাশিত মহিউদ্দীন আহমদ লিখিত ‘জাসদের উত্থান পতন : অস্থির সময়ের রাজনীতি’ গ্রন্থে দেখা যায়, জনসংহতি সমিতির স্বায়ত্তশাসন দাবি জোরালো করবার আগেই ১৯৭৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি জাসদের নির্বাচনী ইশতেহারে উপজাতীয়দের স্বায়ত্তশাসন দেবার দাবি উত্থাপন করা হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে, একই বছরের ২৯ ডিসেম্বর জাসদের ২৯ দফায় উপজাতীয়দের স্বায়ত্তশাসন এমনকি স্বাধীনতা দেবার দাবিও করা হয়। (প্রাগুক্ত, ৯৬ ও ১০৮ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)। বর্তমানেও একই গোষ্ঠী পাহাড় থেকে নিরাপত্তাবাহিনী ও বাঙালি প্রত্যাহারের দাবিতে উপজাতীয়দের সাথে কোরাস করছে। মূলত একটি রাষ্ট্রের কোথায় সেনাবাহিনী বা বিজিবি ক্যাম্প থাকবে এটি নির্ধারণ করবেন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা আর কোনো কিছুর সঙ্গে তুল্য হতে পারে না।
স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শান্তিচুক্তির বেশিরভাগ বিষয়ই বাস্তবায়ন হয়েছে। চুক্তিতে ৭২টি শর্ত আছে, তার মধ্যে ৪৮টি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে। আর ১৫টি আংশিকভাবে হয়েছে এবং ৯টি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, বাকি ধারাগুলোও শীঘ্রই বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু সন্তু লারমা একে অসত্য, বিভ্রান্তিমূলক ও মনগড়া বক্তব্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অথচ সাবেক সিএইচটি প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদারের মতে, ২০১৩ সালে চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভায় ৪৮টি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মতৈক্যপত্রে সন্তু লারমা স্বয়ং স্বাক্ষর করেছেন। অর্থাৎ সন্তু লারমা তার নিজের জনগণের সাথেও ধোঁকাবাজির খেলা খেলছেন। এদিকে জেএসএসের সাথে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নকারী দল হিসাবে আওয়ামী লীগ কৃতিত্ব দাবি করলেও সন্তু লারমা তা মানতে রাজি নন। শান্তিচুক্তির ১৬ বছর পূর্তিতে রাঙামাটিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলে দেন, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি নিয়ে মিথ্যাচার ও প্রতারণা করে চলেছে। শান্তিচুক্তি কোনো একক ব্যক্তি বা একক সরকারের কৃতিত্ব নয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম পার্বত্য অঞ্চলের বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিরসনে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সংলাপের সূচনা করেছিলেন। তার সময়ের সিনিয়র মন্ত্রী মশিউর রহমানসহ আরো কয়েকজনের সাথে সফল আলোচনা হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে এরশাদ আমলে ৬টি, বেগম খালেদা জিয়া সরকারের প্রথম আমলে ১৩টি ও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে ৭টি মিলে মোট ২৬টি সংলাপের মাধ্যমে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এমনকি সেই অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রক্ষাকবচ বলেও উল্লেখ করেন সন্তু লারমা। অথচ এ বছর তিনি শান্তিচুক্তিকে প্রতারণা বলে আখ্যা দিয়েছেন।
বস্তুত তিন পার্বত্য জেলায় জেএসএসের সাথে শাসকদল আওয়ামী লীগের ব্যাপক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। বিগত জাতীয় সংসদ, উপজেলা ও বিভিন্ন আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচনে জেএসএসকে দেখা গেছে বিরোধী দল বিএনপির সাথে অঘোষিত সমঝোতা করতে। জাতীয়ভাবে সংসদ নির্বাচন বয়কট করলেও রাঙামাটিতে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা জেএসএস প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছে। খাগড়াছড়িতে জেএসএস না থাকলেও অপর আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফের সাথে বিএনপির সম্পর্কের প্রচার রয়েছে। উপজেলা নির্বাচনে এসে এই সমঝোতা আরো ব্যাপক আকার ধারণ করে। অর্থাৎ কখনো নৌকায় পা দিয়ে, কখনো ধানের শীষ মাথায় নিয়ে সন্তু লারমা তার নিজস্ব লক্ষ্য জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তার এই লক্ষ্য বাংলাদেশের অখন্ডতার প্রতি চরম হুমকি স্বরূপ। দেশি-বিদেশি দাতাসংস্থা, এনজিও ও মিশনারিদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা পাবার ফলে সন্তু লারমা এখন বাংলাদেশের সরকার ও সার্বভৌমত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়তেও দ্বিধা করছেন না।
আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের জাতীয় আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে সক্রিয় যেকোনো দেশি-বিদেশি এনজিও ও দাতাসংস্থা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে চলতে বাধ্য। বিগত কয়েক বছর যাবত বেশকিছু এনজিও ও দাতাসংস্থা বাংলাদেশের সংবিধান বিরোধী ও রাষ্ট্রীয় নীতির পরিপন্থী ‘আদিবাসী’ ধারণাকে প্রচার, প্রসার, জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠা করতে নানা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এটি সম্পূর্ণ আইনবিরোধী এবং তাদের এখতিয়ার ও অধিকারের লঙ্ঘন। রাষ্ট্রীয় অখ-তার স্বার্থে সরকারকে অতিদ্রুত এই সকল দাতাসংস্থা ও এনজিওর আদিবাসী বিষয়ক প্রোগ্রামসমূহ বন্ধ করতে বাধ্য করতে হবে এবং যারা বাংলাদেশে আইন ও সংবিধান মানতে অস্বীকার করবে তাদের কার্যক্রম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করতে হবে। জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক চার্টার অনুযায়ী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের জাতীয়তা, রাজনৈতিক অধিকার, নাগরিক স্ট্যাটাস ও আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অধিকার সংরক্ষণ করে। তাই সন্তু লারমা তার জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপায় হিসাবে নিজেদের আদিবাসী স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
Email : palash74@gmail.com

প্রবন্ধটি গত ২১ ডিসেম্বর ২০১৪ তারি্খে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত হয়েছিল

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা