বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদিবাসী হতে চাওয়ার প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যত ভাবনা

তিমির মজুমদার:

বাংলাদেশে বসবাসরত  বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র  জাতিসত্ত্বা ও বিভিন্ন গোত্র পরিচয়ের জনসাধারণকে সাংবিধানিকভাবে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭ তারিখে জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে “The United Nations Declaration on The Rights of Indigenous People” বা “আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র” জারী হবার পর, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নেতৃত্ব স্থানীয় ব্যক্তিরা হঠাৎ করেই নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে পরিচিতি লাভের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের মিডিয়ার একাংশ, সুশীল সমাজের কতিপয় ব্যক্তিবর্গ ও আন্তর্জাতিক কিছু সংস্থার সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে তাদের এই দাবী দিনের পর দিন আরও জোরালো হচ্ছে। তাদের এই দাবীর প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, ভৌগলিক অখণ্ডতা, জাতীয় সংহতি ও স্বাধীন দেশের অস্তিত্বের উপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব এই প্রবন্ধের বিবেচ্য।

আদিবাসী বলতে কি বুঝায়? এর সংজ্ঞা কি?  যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ান, অস্ট্রেলিয়ার এবরিজিন, নিউজিল্যান্ডের মাউরি, রাশিয়ার মেনেট, জাপানের আইনু, ফ্রান্স ও স্পেনে বাসকু, দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা ও মায়া, আরবের বেদুইন প্রভৃতি জনগোষ্ঠী যারা সুপ্রাচীনকাল থেকে স্ব স্ব ভূখণ্ডে বসবাস করেছেন তারা আদিবাসী হিসেবে বিশ্বে সর্বজন স্বীকৃত ও সুপরিচিতি। এখানে উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ানগণ অষ্ট্রেলিয়ায় গিয়ে বসবাস শুরু করলে তাদের অষ্ট্রেলিয়ার আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হবে না। আভিধানিক সংজ্ঞায় আদিবাসী শব্দের প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘Indigenous’ অথবা ‘Aborigine’ যার অর্থ হচ্ছে ‘Native Born, Originating or Produced Naturally in a Country, not Imported’ অথবা  Belonging to a particular place rather than, coming to it from somewhere else.’ যার বাংলা প্রতিশব্দ/অর্থ হচ্ছে ‘দেশী’, স্বদেশজাত, দেশীয়; বৈদেশিক অথবা বহিরাগত নয়।

অন্যদিকে নৃতাত্ত্বিক সংজ্ঞায় ‘আদিবাসী’ হচ্ছে কোন স্থানে স্মরণাতীত কাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী যাদের উৎপত্তি, বসতি স্থাপন, ছড়িয়ে পড়া ইত্যাদি সম্পর্কে বিশেষ কোন ইতিহাস জানা যায়নি। (The Indigenous are the groups of human race who have been residing in a place form time immemorial. They are the true sons of the soil: Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972)।

এখন দেখা যাক জাতিসংঘ উপজাতি ও আদিবাসীর সংজ্ঞা কিভাবে নির্ধারণ করেছে। এই প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের অধিভূক্ত প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (International Labor Organization-ILO) এর ৫ জুন ১৯৫৭ তারিখের ৪০তম অধিবেশনের কনভেশন- ১০৭ এবং ৭ জুন ১৯৮৯ তারিখের কনভেশন- ১৬৯ এ আদিবাসী ও উপজাতির সংজ্ঞা এবং এর সাথে তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সংযোজন করা হয়েছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭ তারিখে ৬১তম অধিবেশনের ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র’ যার প্রেক্ষিতে আমাদের দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা নিজেদের আদিবাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছে, সেটিতে উপজাতিদের বিষয়ে কিছুই উল্লেখ নেই এবং আদিবাসীদের সংজ্ঞাও নির্ধারণ করা হয়নি।

Indigenous and Tribal Populations Convention,1957(No. 107)

Article 1: This Convention Applies to:

(a)     members of tribal or semi-tribal populations in independent countries whose social and economic condition are at a less advanced stage than the stage reached by the other sections of the national community, and whose status is regulated wholly or partially by their own customs or traditions or by special laws or regulations.

(অর্থাৎ একটি দেশের মূল জনগোষ্ঠী থেকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে অন্যান্যদের চেয়ে অনগ্রসর এবং যারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, কৃষ্টি, আইন অথবা  বিশেষ আইন দ্বারা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে পরিচালিত তাদেরকে উপজাতি অথবা উপ–উপজাতি বলে গণ্য হবে)।

(b)     members of tribal or semi-tribal populations in independent countries which are regarded as indigenous on account of their descent from the populations which inhabited the country, or a geographical region to which the country belongs, at the time of conquest or colonization and which, irrespective of their legal status, live more in conformity with the social, economic and cultural institutions of that time than with the institutions of the nation to which they belong.

(অর্থাৎ যে সকল জনগোষ্ঠী একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস করছে বা অধিকৃত হওয়া অথবা উপনিবেশ সৃষ্টির পূর্ব থেকে বসবাস করছে এবং যারা তাদের কিছু বা সকল নিজস্ব সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতি, অর্থনৈতিক ও আইনগত অধিকার ও প্রতিষ্ঠানসমূহ ধরে রাখে তারা আদিবাসী বলে গণ্য হবে)।

Indigenous and Tribal Populations Convention, 1989 (No. 169) Article 1 :

This Convention Applies to:

(a)     tribal peoples in independent countries whose social, cultural and economic conditions distinguish them from other sections of the national community, and whose status is regulated wholly or partially be their own customs or traditions or by special laws or regulations.

(অর্থাৎ একটি দেশের মূল জনগোষ্ঠী থেকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্নতর যারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও আইন দ্বারা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে পরিচালিত তারা উপজাতি বলে গণ্য হবে)।

(b)     peoples in independent countries who are regarded as indigenous on account of their descent from the populations which inhabited the country, or a geographical region to which the country belongs, at the time of conquest or colonization or the establishment of present state boundaries and who, irrespective of their legal status, retain some or all of their own social, economic, cultural and political institutions.

(অর্থাৎ যে সকল জনগোষ্ঠী একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস করছে বা অধিকৃত হওয়া অথবা উপনিবেশ সৃষ্টির পূর্ব থেকে বসবাস করছে এবং যারা তাদের কিছু বা সকল নিজস্ব সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত অধিকার এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ ধরে রাখে তারা আদিবাসী বলে গণ্য হবে)।

উপরোল্লিখিত দুটি সংজ্ঞা পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কর্তৃক উপজাতি ও আদিবাসী সংজ্ঞার মূল পার্থক্য হচ্ছে নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস বা অধিকৃত হওয়ার বা উপনিবেশ সৃষ্টির পূর্বে থেকে বসবাস করা। বাকি শর্তগুলো মোটামুটি একই রকম। অর্থাৎ একটি জনগোষ্ঠী উপজাতি অথবা আদিবাসী হবেন উপরোক্ত শর্তের ভিত্তিতে। আইএলও’র এই সংজ্ঞাটি যদি বাংলাদেশর চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণের ক্ষেত্রে বিচার করা হয় তাহলে পরিস্কারভাবে বোঝা যায় যে, এরা আদিবাসী নয়;  উপজাতি।

এখন পর্যবেক্ষণ করা যাক বাংলাদেশর জন্য ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬১তম অধিবেশনের ‘United Nation Declaration on the Rights of Indigenous Peoples’ বা  ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র’টি কতটা প্রযোজ্য। ঘোষণাপত্রটির উদ্দেশ্য মহৎ হলেও এটি অনেক ক্ষেত্রে সংগতিপূর্ণ নয় এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতা বা সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে এর গ্রহণযোগ্যতা অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ। এই ঘোষণাপত্রের নিম্নোক্ত ধারাগুলি বিশেষভাবে অধ্যায়ন করা প্রয়োজনঃ

Article 3

Indigenous peoples have the right to self-determination. By virtue of that right’ they freely determine their political status and freely pursue their economic, social and cultural development. অর্থাৎ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার বলে তারা তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করতে এবং অবাধে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মপ্রয়াস অব্যাহত রাখতে পারবে।   

Article 4

Indigenous peoples, in exercising their right to self-determination, have the right to autonomy or self-government in matters relating to their internal and local affairs, as well as, ways and means for financing their autonomous functions.

অর্থাৎ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী আত্মনিয়ন্ত্রাধিকার চর্চার বেলায় তাদের আভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ের ক্ষেত্রে স্বায়ত্বশাসন বা স্ব শাসিত সরকারের অধিকার থাকবে এবং তাদের স্ব শাসনের কার্যাবলীর জন্য অর্থায়নের পন্থা ও উৎসের ক্ষেত্রেও অনুরূপ অধিকার থাকবে।

Article 5

Indigenous peoples have the right to maintain and strengthen their distinct political, legal, economic, social and cultural institutions, while retaining their right to participate fully, if they so choose, in the political, economic, social and cultural life of the State.

অর্থাৎ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী যদি পছন্দ করে তাহলে রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের পূর্ণ অধিকার রেখে নিজস্ব জাতিগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র রাজনৈতিক, আইনী, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অক্ষুণ্ন রাখা ও শক্তিশালীকরণের অধিকার থাকবে।

Article 10

Indigenous peoples not be forcibly removed from their lands or territories. অর্থাৎ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীকে তাদের ভূমি বা ভূখণ্ড থেকে জোর করে অন্য কোথাও সরানো যাবে না।

Article 30

Military activities shall not take place in the lands or territories of indigenous peoples, unless justified by relevant public interest or otherwise freely agreed with or requested by the indigenous peoples concerned.

 অর্থাৎ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি কিংবা ভূখণ্ডে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা  যাবে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত উপযুক্ত জনস্বার্থের প্রয়োজনে যুক্তিগ্রাহ্য হবে অথবা যদি সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় সম্মতিজ্ঞাপন বা অনুরোধ করে।

জাতিসংঘ সনদগুলোর বর্তমান অবস্থা কি? Indigenous and Tribal Populations Convention-1957 (No. 107) ১৯৫৭ সালে পাশ হলেও এ পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২৭ টি দেশ এই কনভেনশনটি র‍্যাটিফাই করেছে। ১৯৭২ সালের ২২ জুন বাংলাদেশও কনভেনশন- ১০৭ র‍্যাটিফাই করেছিল। পরবর্তীতে কনভেনশন- ১৬৯ পাশ হবার পর কনভেনশন ১০৭ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তামাদী হয়ে গেছে এবং বাংলাদেশ অদ্যাবধি কনভেনশন- ১৬৯ র‍্যাটিফাই করেনি। তাই এটি বাংলাদেশের জন্য অবশ্যপালনীয় নয়। এখানে লক্ষণীয় যে, ইতোমধ্যে ৮টি দেশ এই কনভেনশনকে নিন্দা করে তা থেকে বেরিয়ে গেছে।

অন্যদিকে Indigenous and Tribal Populations Convention-1989 (No.169), ১৯৮৯ সালে পাশ হলেও এখন পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২২ টি দেশ এই কনভেনশনটি  র‍্যাটিফাই করেছে।  এই উপমহাদেশের একমাত্র নেপাল ছাড়া আর কোনো দেশ এই কনভেনশনটি র‍্যাটিফাই করেনি। অন্যদিকে, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭ সালে জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক যে ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়েছে তাতে ভোটদানের সময় ১৪৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪টি দেশ বিপক্ষে, ১১টি দেশ বিরত এবং ৩৪টি দেশ অনুপস্থিত থাকে। বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত থাকে। বিরুদ্ধে ভোট দেয়া দেশগুলো হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। অথচ এই দেশগুলোতে আদিবাসীরাই ছিল এক সময়ে মূল জনগোষ্ঠী এবং জাতিগতভাবে যাদের সংখ্যা বিপদজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।

বিস্ময়কর অথবা পরিহাসের ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের আদিবাসীদের রক্ষায় খুব সোচ্চার ও পৃষ্ঠপোষক দেশগুলোর বেশিরভাগই কিন্তু নিজ দেশের জন্য আইএলও কনভেনশন- ১০৭ বা ১৬৯ ও জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্রের স্বাক্ষরকারী নয়, পক্ষে ভোট দেয়নি এবং র‍্যাটিফাইও করেনি। কাজেই তাদের কুমিরের অশ্রু বর্ষণের কারণ ও মতলব বুঝতে রকেট সায়েন্টিস্ট হবার প্রয়োজন নেই। এসব সাম্রাজ্যবাদী শক্তি গুলোর উপজাতি, আদিবাসী কিংবা ক্ষ্রদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য এই মায়াকান্নার পেছনে মূলত ভূ–রাজনৈতিক, ভূ–অর্থনৈতিক এবং সর্বোপরি অধিপত্যবাদী স্বার্থই প্রকাশ্যে কিংবা অবচেতনে প্রবলভাবে কাজ করেছে একথা নির্দিধায় বলা যায়।

তাহলে বাংলাদেশে সত্যিকার আদিবাসী কারা? নিঃসন্দেহে বাঙালী ও বাংলা ভাষাভাষীরা এদেশের সত্যিকারের আদিবাসী। কারণ এরাই  প্রোটো–অষ্ট্রেলিয়েড (Proto Astroloid) নামের আদি জনধারার অংশ এবং তারাই একমাত্র আদিবাসী বা  Son of the Soil বলে দাবি করতে পারে। এর পেছনে জাতিতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি প্রমাণও রয়েছে। বাংলাদেশের এই অঞ্চলে বাঙালিরা বসবাস করে আসছে চার হাজার বছরেরও পূর্বে থেকে। বিক্রমপুর, ওয়ারি–বটেশ্বর, সোনারগাঁও কিংবা মহাস্থানগড় থেকে প্রাপ্ত নৃতাত্তিক প্রমাণাদি এসব বিষয় নিশ্চিত করে।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান উপজাতি চাকমাদের আদি বাসস্থান ছিল আরাকানে, ত্রিপুরাদের আদি বসবাস ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে এবং মার্মা জনগোষ্ঠী এসেছে বার্মা থেকে। সেই অর্থে তারা কেউই বাংলাদেশের আদিবাসী নয় বরং তারা এদেশে অভিবাসী। তারা বিভিন্ন স্থান থেকে দেশান্তরী হয়ে এদেশের নানাস্থানে অভিবাসিত হয়ে আনুমানিক তিনশ থেকে পাঁচশ বৎসর পূর্ব থেকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে বসবাস করতে শুরু করেছে। তাই কোনোক্রমেই বাংলাদেশে বসবাসকারী চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, অন্যান্য ক্ষ্রদ্র নৃগোষ্ঠী এদেশের আদিবাসী হতে পারে না। যারা তাদের আদিবাসী বলে আখ্যায়িত করছেন তারা শুধু সংবিধান লংঘন করছেন তা নয় বরং তারা জেনে শুনে মিথ্যাচার করেছেন।

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো যে আদিবাসী নয় তার প্রমাণ কি?  বাংলাদেশের উপজাতীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো এদেশের আদিবাসী বা ভূমিপূত্র নয় তার প্রমাণ প্রখ্যাত উপজাতি গবেষক ও নৃতত্ত্ববিদ Robert Henry Sneyd Hutchinson তার বই  ‘An Account of Chittagong Hill Tracts’ (1906), Captain Thomas Herbart Lewin তার বই ‘The Chittagong Hill Tracts and Dwellers There in’ (1869) অমেরেন্দ্র লাল খিসা (১৯৯৬) প্রমুখের লেখা, গবেষণাপত্র, থিসিস এবং রিপোর্ট বিশ্লেষণে পাওয়া যায়। তারা সবাই একবাক্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজাতীয়দের নিকট অতীতের কয়েক দশক থেকে নিয়ে মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে এদেশে স্থানান্তরিত বা অভিবাসিত হবার যুক্তি প্রমাণ ও ইতিহাস তুলে ধরেছেন।

প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এবং ব্রিটিশ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম জেলা প্রশাসক Captain Thomas Herbart Lewin  এর মতে, ‘A greater portion of the hill tribes, at present living in the Chittagong Hills, undoubtedly came about two generations ago from Arracan.  This is asserted both by their own traditions and by records in the Chittagong Collectorate (Lewin 1869, 28). অর্থাৎ মাত্র দুই পুরুষ আগে ব্রিটিশদের সাথে বার্মা যুদ্ধের সময় চাকমারা পার্বত্য অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করে যা চট্টগ্রাম কালেক্টরেট অফিসে রক্ষিত দলিল দস্তাবেজ থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে। মারমা বা মগ জনগোষ্ঠী সদস্যরা ১৭৮৪ সনে এ অঞ্চলে বার্মা থেকে দলে দলে অনুপ্রবেশ করে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাস শুরু করে (Shelly, 1992 এবং Lewin, 1869)।

বিশিষ্ট ব্রিটিশ চাকমা পন্ডিত অমেরেন্দ্র লাল খিসা ‘অরিজিনস অব চাকমা পিপলস অব হিলট্রেক্ট চিটাগং’এ লিখেছেন, ‘তারা (চাকমারা)এসেছেন মংখেমারের আখড়া থেকে’। পরবর্তীতে  আরাকান এবং মগ কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে বান্দরবানে অনুপ্রবেশ করেন। আড়াইশ থেকে তিনশ বছর পূর্বে তারা উত্তর দিকে রাঙ্গামাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন’। এ বিষয়ে বিশিষ্ট গবেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবদুর রব, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা ড. খুরশীদা বেগম, বিজয় কী বোর্ডের উদ্ভাবক জনাব মোস্তফা জব্বার, পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কাজ করেছেন এমন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক জনাব মেহেদী হাসান পলাশ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছেন যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নয়। এছাড়া মার্মা সার্কেল চীফ অংশু প্রু চৌধুরী প্রদত্ত বিভিন্ন সময়ের বক্তব্য ও সাক্ষাৎকার এবং ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তিক্তে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের উপজাতি হিসাবে পরিচিতি প্রদান করা হয়েছে ‘আদিবাসী’ হিসেবে নয় (বিস্তারিতঃ https://www.youtube.com/watch?v=_IlixQ1SS6s)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদিবাসী আখ্যায়িত করেল অসুবিধা কি?   অনেককেই এটি বলতে শোনা যায় যে, আদিবাসী বললে যদি ওরা খুশী হয় বা খুশী থাকে তাহলে সমস্যা কি?  বিভিন্ন লেখা এবং দুই একটি সরকারী প্রজ্ঞাপনে এমনকি কোর্টের রায়ে পর্যন্ত অবচেতনভাবে তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এ থেকে কোন সমস্যা হবে না বলে মনে হতে পারে কিন্তু কিন্তু পরবর্তীতে ‘ইষ্ট তিমুর’ কিংবা ‘সাউথ সুদান’ এর মত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তার দায়ভার নিতে কি আমাদের সেই সব বুদ্ধিজীবী এবং মিডিয়া ভালো প্রস্তুত আছেন?

সকলের জ্ঞাতার্থে এখানে উল্লেখ্য করা অপ্রাসাঙ্গিক হবে না যে  ‘ইষ্ট তিমুর’ এবং ‘সাউথ সুদান’ এর মত একই পরিস্থিতি কাশ্মীর, চেচনিয়া, ফিলিপাইনের মিন্দনাও এবং পৃথিবীর আরও কিছু স্থানে বিরাজ করলেও সেখানে গণভোট অনুষ্ঠিত করে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়নি এবং হবার কোন সম্ভাবনাও নেই। তাছাড়া স্বাধীনতার পরপরই পার্বত্য চট্রগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একটি অংশ স্বাধীন ‘জম্মুল্যান্ড’ স্থাপন করার জন্য এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে পড়ে। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর একান্ত চেষ্টায় ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তারিখে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর হলেও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একাংশ এখনও জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং জেএসএস (সংস্কার) এর নামে তাদের সশস্ত্র কার্যক্রম চালু রেখেছে। কাজেই ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি আদায় করতে পারলে জাতিসংঘ ঘোষণা অনুযায়ী তারা ‘জুম্মল্যান্ড’ দাবী করবে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

কেননা ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র- ২০০৭’ অনুযায়ী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদিবাসী হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করলে সেই অনুযায়ী তাদের স্বায়ত্বশাসন, রাজনৈতিক, আইনী, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা প্রদান করার বাধ্যবাধকতা থাকবে। বিশেষ করে এই ঘোষণার ধারা ৩০ অনুযায়ী ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি কিংবা ভূখণ্ডে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না উপযুক্ত জনস্বার্থের প্রয়োজনে যুক্তিগ্রাহ্য হবে, অন্যথায় যদি সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় সম্মতিজ্ঞাপন বা অনুরোধ না করে।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশেষ কোন জনগোষ্ঠীর ভূমি বা ভূখণ্ড ব্যবহারের আগে যথাযথ পদ্ধতি ও বিশেষ করে তাদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিশেষ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা করে অনুমতি গ্রহণ করার বিষয়টি সেই রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। আর যদি তারা ‘স্বেচ্ছায় সম্মতি জ্ঞাপন’ না করে তাহলে কি হবে? যদি কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বহির্বিশ্বের কারো সঙ্গে কোনো অশুভ আঁতাত করে? যদি বহির্বিশ্ব থেকে ওই অঞ্চল আক্রান্ত হয় তবে সরকার কি সামরিক কার্যক্রম গ্রহণে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কারো সম্মতির অপেক্ষায় নিস্ক্রিয় থাকবে?  যদি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নেতৃত্ব সম্মতি না দেয় তাহলে কি হবে? বিশেষ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ অথবা এর কোন অঙ্গ সংগঠনের মত অনুযায়ী যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত না হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় জাতিসংঘ হস্তক্ষেপ করতে পারে।

এছাড়াও বাংলাদেশে কম–বেশি ৫০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ‘মালিকানাধীন’ ভূমি আছে এবং তারা যদি সেই ভূমি বা ভূখন্ড ব্যবহারে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ওপর এত বিধি–নিষেধ আরোপ করে তাহলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কী হবে?  এই সকল প্রশ্নের গুরুত্ব অনুধাবন করতঃ সকলকে এই বিষয়টিতে সতর্ক হতে হবে এবং ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’দের ‘আদিবাসী’ বলা বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও প্রচুর চাকমা, ত্রিপুরা ও অন্যান্য ট্রাইবাল জনেগোষ্ঠী রয়েছে। তারা সেখানে উপজাতি বা Schedule Cast হিসেবে পরিচিতি এবং সুবিধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। সেখানকার কোন মিডিয়া কিংবা বুদ্ধিজীবী তো তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেবার আন্দোলন করছেনা।

উল্লেখ্য যে, চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকা আমাদের মোট ভূখন্ডের দশভাগের একভাগ (১৩,২৯৫ বর্গ কিঃ মিঃ/৫,১৩৩ বর্গ মাইল) এবং এখানে মোট জনসংখ্যার মাত্র শতকরা এক ভাগ (২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী ১৫,৯৮,২৯১ জন) মানুষ বাস করে। এ এলাকায় জাতিগত বিভেদ সৃষ্টি করে বিচ্ছিন্নতাবাদকে যারা অবচেতনে উস্কে দিচ্ছেন তারা কি জানেন যে, এখানে বসবাসকারী মোট জনসংখ্যার অর্ধেক ক্ষূদ্র নৃগোষ্ঠী এবং বাকী অর্ধেক বাঙালী। মাত্র দশ বছর আগে থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের দাবীকৃত আদিবাসী হবার প্রবল ইচ্ছা আসলে জাতিসংঘের ২০০৭ সালের ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্রে’র বিভিন্ন ধারা থেকে ভবিষ্যতে ফায়দা লোটার কৌশল। এই কৌশলের ফাঁদে পা দেয়া ভয়ংকর এবং বিপজ্জনক। কারণ তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ তার এক দশমাংশ ভূমির মালিকানা হারাতে পারে যার সাথে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির ভৌগলিক অখন্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন জড়িত।

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই ভূখণ্ডের একদশমাংশ ছেড়ে দিতে কি আমরা প্রস্তুত? যার উত্তর অবশ্যই ‘না’। কাজেই সকলকে সতর্ক হতে হবে এবং এদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ‘আদিবাসী’ বলা বন্ধ করতে হবে। আশা করা যাচ্ছে যে, এই রচনা পাঠ করার পর আর কেউ স্বজ্ঞানে বা অবচেতনে বাংলাদেশে বসবাসরত ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’দের ‘আদিবাসী’ সম্বোধন করা থেকে বিরত থাকবেন।

(লেখক- শিক্ষাবিদ ও উন্নয়নকর্মী)

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিরা জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী আদিবাসী হবার পূর্বশর্তসমুহ পূরণ করে না

 পারভেজ হায়দার

নিজ মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা, দেশের স্বার্থে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকাই দেশপ্রেম । পুঁথিগতভাবে দেশপ্রেমের সংজ্ঞায় ভিন্নতা থাকলেও মৌলিক কয়েকটি বিষয় অনেকটাই সমার্থক । দেশপ্রেমের সাথে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের প্রতি ভালোবাসা জড়িত, এই ভালোবাসা শর্তহীন ভালবাসা । দেশপ্রেমিক মানুষ নিজস্ব ভূখণ্ড রক্ষার সংগ্রাম, ভূ-খণ্ডের রক্ষণাবেক্ষণ অথবা পুনরুদ্ধারে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকে ।

একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বিভিন্ন শ্রেণীর জাতি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের অধিবাসীরা বসবাস করতেই পারে, থাকতে পারে এদের ধর্মের ভিন্নতা, কিন্তু নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী একটি দেশের ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে দেশের মঙ্গলের জন্য কাজ করবে এবং প্রয়োজনে যেকোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকবে, এটাই স্বাভাবিক ।

একটি দেশের অধিবাসীদের মধ্যে বিভিন্ন সম্প্রদায়, ধর্ম ও গোষ্ঠীর বসবাস থাকলেও প্রায় প্রতিটি সম্প্রদায়ের মধ্যেই ব্যক্তিগত অথবা দলীয় অথবা ধর্মীয় মতাদর্শ ভিত্তিক ভিন্নতা থাকতে পারে । মতাদর্শগত এই ভিন্নতা সামগ্রিকভাবে দেশের মঙ্গলের জন্য পরিপূরক হওয়াই বাঞ্ছনীয় । কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতে দেশ স্বার্থ বিষয়ে স্ববিরোধীতা দৃশ্যমান ।

এ দেশের কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবী ব্যক্তিবর্গ দেশের স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত মতাদর্শকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন । তবে যেকোন মতাদর্শের মধ্যে যদিও একটি আদর্শিক বিষয় জড়িত তথাপি মতাদর্শের এই ভিন্নতা দেশের স্বার্থবিরোধী হলে তা ধরে রাখা একেবারেই কাম্য নয় । সমস্যাটি তখনই প্রকটাকারে দেখা দেয় যখন ভিন্ন মতাদর্শিক এই স্বার্থান্বেষী মহল অন্য দেশের স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে ব্যক্তিগত তথাকথিত মতাদর্শের পক্ষে তাদের ভাষায় ইতিবাচক ব্যাখ্যা দাড় করিয়ে ফেলেন ।

আগামী ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস । বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই । তবে সাম্প্রদায়িক রীতিনীতির ভিন্নতার কারণে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী থাকায় সরকার ঐ জনগোষ্ঠী গুলোকে ‚ক্ষুদ্র ও নৃ গোষ্ঠী” হিসাবে পরিগণিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন । সরকার এই সিদ্ধান্ত দেশের ঐতিহাসিক পটভূমি বিবেচনায় এবং বাংলাদেশে বসবাসরত ঐ ছোট ছোট জনগোষ্ঠী সমূহের উৎস ও প্রাথমিক আগমনের বিষয় আমলে নিয়ে ঐ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ।

কিন্তু বাংলাদেশের কিছু স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবী তাদের মনগড়া মতাদর্শ সরকারের সিদ্ধান্তের উপর চাপিয়ে দিতে চান । তাদের এই দাবির পিছনে ঐতিহাসিক কোন ভিত্তি নেই । যেহেতু তারা বুদ্ধিজীবী, তাই আশা করা যায়, তারা বিষয়টি বোঝেন, কিন্তু নিজেদের অহংকারপ্রসুত অথবা অন্য কোন স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে ব্যক্তিগত লাভের আশায় তারা তাদের ভ্রান্ত মতাদর্শ দেশের উপর চাপিয়ে দিতে চান । তাদের এই দাবি এবং কার্যক্রম চরমভাবে দেশ স্বার্থ বিরোধী হতে পারে এ বিষয়টি তারা ইচ্ছাকৃতভাবে একেবারেই বুঝতে চান না।

বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসরত ‚ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠীর” অধিবাসীগণ এবং তাদের সমর্থনপুষ্ট স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবীদের ‚আদিবাসী” সংক্রান্ত দাবী একেবারেই নতুন । ইতিপূর্বে ‚ক্ষুদ্র ও নৃ-গোষ্ঠীর” অধিবাসীগণ নিজেদের ‚উপজাতী” হিসেবে পরিচয় দিতে সম্মানিত বোধ করতো । এমনকি ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তিতেও ক্ষুদ্র ও নৃ গোষ্ঠীর এই অধিবাসীদের ‚উপজাতী” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ।

২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ অধিবেশনে The Nation Declaration on the Rights of Indigenous Peoples (UNDRIP) বিল পাশ হয় । ১৪৪ টি দেশ ঐ বিলের স্বপক্ষে, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশসমুহ ঐ বিলের বিপক্ষে এবং বাংলাদেশসহ আরও ১১টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে । পরবর্তীতে ২০১৬ সালের মে মাসে কানাডা UNDRIP থেকে তাদের আপত্তি প্রত্যাহার করে নেয়। বাংলাদেশ UNDRIP তে ভোটদানে বিরত থাকলেও জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক শর্তানুযায়ী বাংলাদেশে ‚আদিবাসীদের” উপস্থিতি সম্পর্কে যথেষ্ট গবেষণা করে সরকার ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর এই সম্প্রদায় সমুহকে ‚ক্ষুদ্র ও নৃ গোষ্ঠী” নামে অভিহিত করে আইন পাশ করেছে ।

তবে একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পালন করতেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই । ২০০৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে UNDRIP তে আদিবাসীদের কয়েকটি নির্দিষ্ট অধিকারের বিষয়ে নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে । আদিবাসীদের ভূমি অধিকার, জীবন ও নিরাপত্তা অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় স্বীকৃতি, শিক্ষা ও তথ্যের অধিকার এবং চাকুরী, দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার, আদিবাসী অধ্যুষিত ভূমিতে খনিজ সম্পদসহ অন্যান্য সম্পদের অধিকার, জ্ঞানের অধিকার, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রশাসন পরিচালনা করার অধিকার ইত্যাদি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে ।

অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে কোন নিদিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ‚আদিবাসী” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে ঐ ভূখণ্ডের উপর স্বাধীন সার্বভৌম দেশের সরকারের কর্তৃত্ব খর্ব হবে । এমনকি ঐ ভূখণ্ডে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদের বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে হলে ‚আদিবাসী” ঐ জনগোষ্ঠীর সাথে সরকারকে পরামর্শ করতে হবে । ঐতিহাসিকভাবে সত্য না হলেও সুযোগের সদ্ব্যবহার এবং বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে চাকমা সার্কেল প্রধান ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়সহ উপজাতিদের সমমনা বুদ্ধিজীবীগণ বাংলাদেশে বসবাসরত ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর জাতিসত্ত্বাসমূহকে ‚আদিবাসী” হিসেবে পরিগণিত করার দাবী তুলেছেন ।

এখানে মনে রাখতে হবে, একটি দেশের বসবাসরত অধিবাসীদের মধ্যে ‚Minorities” এবং ‚আদিবাসী” বিষয়টি এক নয়। তবে কিছু কিছু দেশে স্বীকৃত আদিবাসীগণ ‚Minorities” নয়। যেমন, গুয়েতেমালা, বলিভিয়া ইত্যাদি । বাংলাদেশে বসবাসরত ছোট ছোট জাতি জাতিসত্ত্বার আদিবাসীগণকে ‚Minorities” হিসেবে পরিগণিত করা অধিক যুক্তিযুক্ত ।

জাতিসংঘ কমিশনের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার হোসে মার্টিনেজ কোবে যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তাতে বলা হয়েছে, কোন ভূখণ্ডের আদিবাসী সম্প্রদায়, জাতিগোষ্ঠী বা জাতি বলতে তাদের বোঝায়, যাদের ঐ ভূখণ্ডে প্রাক-আগ্রাসন এবং প্রাক-উপনিবেশকাল থেকে বিকশিত সামাজিক ধারাসহ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে, যারা নিজেদেরকে ঐ ভূখণ্ডে বা ভূখণ্ডের কিয়দাংশে বিদ্যমান অন্যান্য সামাজিক জনগোষ্ঠী থেকে নিজেদের স্বতন্ত্র মনে করে । সেই সাথে তারা নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও আইন ব্যবস্থার ভিত্তিতে পূর্বপুরুষের ভূখণ্ড ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ভবিষ্যৎ বংশধরদের হাতে তুলে দেয়ার ইচ্ছাপোষণ করে ।

জাতিসংঘ এখানে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে । যারা কোন উপনিবেশ স্থাপনের আগে থেকেই ওই ভূখণ্ডে বাস করছিল, যারা ভূখণ্ডের নিজস্ব জাতিসত্ত্বার সংস্কৃতি ধরে রেখেছে ও তা ভবিষ্যৎ বংশধরদের হাতে তুলে দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করে, এবং যারা নিজেদের স্বতন্ত্র মনে করে ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতিদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী ‚আদিবাসী” হবার জন্য পূর্বশর্তসমুহ পূরণ করে না । তারা মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে চট্টগ্রাম তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে ১৭শ খ্রিস্টাব্দ ও ১৮শ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ের দিকে অবস্থান নিয়েছিল ।

আদিবাসীদেরকে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়, যেমন: অষ্ট্রেলিয়াতে ‚Aboriginal Peoples”, ফ্রান্সে ‚Autochthonous Peoples”, কানাডাতে ‚First Nations”, যুক্তরাষ্ট্রে ‚Indians” ইত্যাদি নামে ডাকা হয় । ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আদিবাসীগণ প্রকৃতির উপর নির্ভর করতে গিয়ে চরম দারিদ্রতার মধ্যে দৈনন্দিন জীবন অতিবাহিত করেছে । তারা সাধারণত সভ্য সমাজের অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের মত করে চলতে পছন্দ করে ।

আদিবাসীদের অধিকারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিগোচরে আনার জন্য ১৯৬৫ সালে জাতিসংঘে ‚International Convention To Eliminate All Forms Of Racial Discrimination” (ICERD) বিষয়ে সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয় । ২০০৭ সালে জাতিসংঘের অধিবেশনে পাশকৃত UNDRIP তে আদিবাসীদের জন্য কয়েকটি মৌলিক অধিকারের বিষয়ে সমুন্নত রাখা হয়েছে ।

তার মধ্যে Convention ১৬৯ অনুযায়ী আদিবাসীগণ যে দেশের ভূখণ্ডে অবস্থান করছে সেই দেশের সরকার বিভিন্ন আইনগত বিষয়ে যা আদিবাসীদের সরাসরিভাবে প্রভাবিত করবে সে বিষয়ে তাদের সাথে আলোচনা করতে বাধ্য থাকবে। উদাহরণ স্বরূপ : আদিবাসীদের বসবাসরত ভূখণ্ডে সরকার কোন বাঁধ (Dam) তৈরীর প্রয়োজনবোধ করলে অথবা কোন খনিজ সম্পদ আহরণ করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডে অবস্থানরত আদিবাসীদের সাথে সরকারকে আলোচনা করে নিতে হবে ।

Convention ১৬৯ এ আরো উল্লেখ আছে সরকার আদিবাসীদের সাথে আলোচনার সময় সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব নিয়ে আলোচনা করবে । ২০০৭ সালের জাতিসংঘ অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ে পাশকৃত ইস্যুটিতে তিনটি মৌলিক বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, প্রথমত তাদের ভূখণ্ডে সম্পদের অধিকার, দ্বিতীয়ত নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার অধিকার এবং তৃতীয়ত রাজনৈতিক অধিকার অর্থাৎ নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ও পদ্ধতিতে প্রশাসন ব্যবস্থাপনা ।

বাংলাদেশ সরকার জনগনের মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে বদ্ধপরিকর । ২০০৭ সালের জাতিসংঘের অধিবেশনে পাশকৃত UNDRIP তে আদিবাসীদের যেসকল অধিকার দেওয়া হয়েছে তা অনেকটা ঐ নির্দিষ্ট ভূখন্ডে স্বায়ত্বশাসন এরই নামান্তর । তথাপি বাংলাদেশ সরকার এদেশে বসবাসরত ছোট ছোট জাতি স্বত্ত্বার জনগোষ্ঠী যদি আসলেই ‚আদিবাসী” হবার পূর্বশর্তসমুহ পূরণ করতো তাহলে তাদের দাবী অনুযায়ী সরকার নিশ্চয়ই বিষয়টি নিয়ে দৃঢ়ভাবে বিবেচনা করতো ।

কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবীগণ এবং ক্ষুদ্র ও নৃ গোষ্ঠীর সুযোগ সন্ধানী কিছু নেতৃবৃন্দ তাদের সুদূরপ্রসারী দেশ বিরোধী স্বার্থের কারণে ২০০৭ সালের পর থেকে হঠাৎ করেই ‚আদিবাসী” বিষয় দাবী তুলেছেন । ভ্রান্ত এই দাবীটি দেশের স্বার্থ বিরোধী এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই । তথাপি দেশের কতিপয় স্বার্থান্বেষী নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, পাহাড়ে বসবাসরত শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ, এমনকি সাংবাদিকরাও ইদানিং ছোট ছোট ক্ষুদ্র বিভিন্ন সম্প্রদায়গুলোকে সরকার নির্দেশিত ‚ক্ষুদ্র ও নৃ-গোষ্ঠী” না বলে ‚আদিবাসী” হিসেবে অভিহিত করছেন । সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও সতর্কতা সত্ত্বেও ‚আদিবাসী” শব্দের ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, জাতীয় ঐতিহাসিক স্থানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করা হচ্ছে ।

উপজাতীদের ‚আদিবাসী” হিসেবে উল্লেখ না করার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও স্বার্থান্বেষী মহল খুব সচেতনভাবেই তা অমান্য করছেন । ২০১৫ সালের ১৬ আগস্ট গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-৩ অধিশাখা থেকে ‚বাংলাদেশে আদিবাসী নামক অসাংবিধানিক দাবি বাস্তবায়নের অপকৌশল রোধে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান ব্যবহারের অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন” সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় ।

দেশের প্রত্যেক মানুষেরই আলাদা আলাদা মতাদর্শ থাকতে পারে । এই মতাদর্শ যেন দেশপ্রেমের সাথে সাংঘর্ষিক না হয় সে বিষয়টি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে হবে । ব্যক্তিগত মতাদর্শের বিষয়টি দুই ধরণের হতে পারে- প্রথমত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মনেপ্রাণে ঐ মতাদর্শকে বিশ্বাস ও ধারণ করেন আবার দ্বিতীয়ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নির্দিষ্ট একটি মতাদর্শ মনে প্রাণে ধারণ না করলেও স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় দেশের স্বার্থ বিরোধী হলেও উক্ত বিতর্কিত মতাদর্শে স্থির থাকেন ।

সরকারের সুনিদিষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও যেহেতু বাংলাদেশের স্বার্থানেষী কিছু বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশের উপজাতীদের ‚আদিবাসী” হিসেবে সম্বোধন করছেন সেহেতু তারাও সুদূর প্রসারী কোন ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে করছেন, তা অনুমান করা যায় । তারা তাদের ব্যক্তিগত মতাদর্শের আবরণে উপজাতীদের ‚আদিবাসী” আন্দোলনকে আরও উৎসাহিত করছেন । তবে যদি আদিবাসী দাবীটির পিছনে সত্যতা থাকতো তাহলে বিষয়টি নিয়ে হয়তো বিতর্কের সুযোগ ছিলো।

কিন্তু একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত বিষয়ে কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবী কেন ক্রমাগত প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তা’ তারা নিজেরাই ভালো বলতে পারবেন । দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা, অখণ্ডতা রক্ষা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি  অর্জনের মত মৌলিক বিষয়ে কোন বিতর্ক সৃষ্টি কাঙ্ক্ষিত নয় । মৌলিক বিষয়সমূহে আমাদের মতাদর্শগত ভিন্নতা দেশপ্রেমের গভীরতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ।

অপ্রয়োজনীয় এবং অগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করে মেধাবী জনগোষ্ঠীর যেমন সময় নষ্ট হয় তেমনি দেশের স্বার্থের প্রয়োজনে ঐ মেধাসমুহ ঐ সময়গুলোতে কোন ভূমিকা রাখতে পারে না । দেশের মৌলিক বিষয় সমুহে ব্যক্তিগত মতাদর্শগত ভিন্নতা যেনো অহেতুক অহংকারে বা কোন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর স্বার্থের কারণে প্রভাবিত না হয় সেবিষয়ে দৃষ্টি দেয়া আবশ্যক ।

পারভেজ হায়দার- পার্বত্য গবেষক

বাঙালীরাই এদেশের আদিবাসী

13620921_300898163589352_2372225373615898346_n

মোয়াজ্জেমুল হক

ভারতীয় উপমহাদেশে নেপাল ছাড়া অন্য কোন দেশে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কোন আদিবাসী নেই। ভারত, পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশে আছে ক্ষুদ্র ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, উপজাতি। এসব ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ও উপজাতীয়দের আদিবাসী ঘোষণার জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি তৎপরতা লক্ষণীয়। এবারও অনুরূপ তৎপরতা প্রতীয়মান। যদিও ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদনকালে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) নিজেদের উপজাতি হিসেবে স্বীকার করেই চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করেছে।

কিন্তু বর্তমান চাকমা সার্কেল চীফ যিনি চাকমা রাজা নামে পরিচিত- দেবাশীষ রায় কয়েক বছর আগে আকস্মিকভাবে চাকমা উপজাতিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সদস্যদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতিদানের দাবি উত্থাপন করেন। এ দাবির সঙ্গে দেশীয় বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ সমর্থন যোগাচ্ছেন। ইতোমধ্যে গঠিত হয়েছে আদিবাসী ফোরাম। শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘আদিবাসী মন্ত্রণালয়’ করার দাবিও তোলা হয়েছে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কয়েকটি সাহায্য সংস্থা উপজাতীয়দের ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রমও পরিচালনা করছে।

কিন্তু সরকার পক্ষে ২০১১ সালের ২১ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আদিবাসী ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে এই বলে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের মূল ভূখ-ের অধিবাসী নয়। বরং বাংলাদেশের ১৫ কোটি (ওই সময়) জনগণের সকলেই বাংলাদেশে আদি এবং প্রাচীন ভূখ-ে শাশ্বতকাল ধরে বসবাস করার সুবাদে এদেশে আদিবাসী। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী আদিবাসী হলে অবশিষ্ট জনগণ বিদেশী হিসেবে পরিগণিত হবে বলে মত ব্যক্ত করা হয়; যা কখনও হতে পারে না।

ওই সভায় বলা হয়, বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী বা উপজাতি কর্তৃক নিজেদের আদিবাসী হিসেবে দাবি করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিতর্কের সৃষ্টি করছে। যাতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আদিবাসী শব্দটির ভুল ব্যবহারের ফলে শব্দটির সমাজতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ভৌগোলিক অখ-তার ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সভায় উল্লেখ করা হয়, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ যে এ ভূখণ্ডে আদিবাসী (ফার্স্ট নেশন) হিসেবে চার হাজার বছর ধরে বসবাস করছে।

অন্যপক্ষে, ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ক্ষুদ্র, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশের ভূখণ্ডে তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে আগমন ঘটেছে ১৭২৭ সাল থেকে। তখন হতে তারা ওই অঞ্চলে অভিবাসী হিসেবে বসবাস করে আসছে। সঙ্গত কারণে তারা আদিবাসী নয়। প্রয়াত বোমাং সার্কেলের চীফ তথা বোমাং রাজা অং শু প্রু চৌধুরী ৯৬ বছর বয়সে স্বীকার করেছেন তারা আদিবাসী নন বরং প্রায় ৩শ’ বছর ধরে এদেশে বসবাস করে আসছেন।

জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট ফোরামসমূহে আদিবাসী (ইনডিজেনাস) ও উপজাতি (ট্রাইবাল) জনগোষ্ঠীর সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ইনডিজেনাস পিপলস হচ্ছে তারাই যারা যুগ যুগ ধরে বর্তমান আবাসভূমিতে বাস করে আসছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ান ও অস্ট্রেলিয়ার এবোরিজিন্স। এ বিবেচনায় জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের পক্ষে এদেশে উপজাতি গোষ্ঠীকে ইনডিজেনাস বা আদিবাসী হিসেবে আখ্যায়িত না করে ট্রাইবাল বা এথনিক মাইনরিটি গ্রুপ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। জাতিসংঘ ফোরামে ভারত, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশও তাদের উপজাতি জনগোষ্ঠীদের কখনও ইনডিজেনাস হিসেবে আখ্যায়িত করে না।

বাংলাদেশে বসবাসকারী অধিকাংশ উপজাতি সম্প্রদায় এখন নিজ নিজ ধর্ম-সংস্কৃতিতে অবস্থান না করে অনেকেই খ্রীস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন। প্রসঙ্গত, প্রায় ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রায় ৪৫টি ক্ষুদ্র উপজাতীয় সম্প্রদায়ের বসবাস। এরমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে রয়েছে ১২টি উপজাতীয় সম্প্রদায়। এগুলো হচ্ছেÑ চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, মুরং, পাংখোয়া, চাক, খুমী, খিয়াং, লুসাই, তংচংগা, বম এবং রিয়াং; সিলেট অঞ্চলে রয়েছে মনিপুরী, খাসিয়া, ত্রিপুরা, পাত্র, হাজং; ময়মনসিংহ অঞ্চলে রয়েছে গারো, কুকি ও রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে রয়েছে সাঁওতালসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও উপজাতীয়রা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ে সক্ষম হলে আন্তর্জাতিক সমাজের সমর্থন নিয়ে সরকারের ওপর ক্রমাগত অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। জাতিসংঘ ইতোমধ্যে আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে এর অবস্থান ঘোষণা করেছে; যা ডিক্লারেশন অন দ্য রাইটস অব ইনডিজেনাস পিপলস হিসেবে ঘোষিত। উপজাতীয়রা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে জাতিসংঘ এবং জাতিসংঘের সমর্থনপুষ্ট বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন নিয়ে এরা কাক্সিক্ষত পথে এগিয়ে যাবে। পাশাপাশি পার্বত্য জেলাগুলো থেকে বাঙালীদের উচ্ছেদ এবং পার্বত্য অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করবে। এরা পরবর্তীতে বিচ্ছিন্নতাবাদের আন্দোলনে যে তৎপর হবে না তা কি নিশ্চিত বলা যায়?

সরকারী মতে, দেশের অধিকাংশ উপজাতীয় সম্প্রদায়ের বিশাল জনগোষ্ঠী ইতোমধ্যে খ্রীস্টান হয়ে গেছে। চাকমাদের মধ্যে খ্রীস্টানদের সংখ্যা কম হলেও মারমাদের অনেকেই এবং গারো, কুকি, লুসাই, পাংখো, মনিপুরী ও সাঁওতালদের বড় একটি অংশ খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন ভারতীয় অংশের অবস্থাও অনুরূপ। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল তথা মিজোরাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী উপজাতিরা খ্রীস্টান ধর্মে দীক্ষা নেয়ায় ইতোমধ্যে তারা তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।

গোয়েন্দা সূত্রে এমন তথ্যও রয়েছে, যেহেতু ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল এবং মিয়ানমারের একাংশ নিয়ে বঙ্গোপসাগরের উত্তরাংশে ভারত-বাংলাদেশের এই পার্বত্যাঞ্চল ভূরাজনৈতিক দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেহেতু বিদেশী নানা চক্র পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীদের আদিবাসী স্বীকৃতি আদায়ের মাধ্যমে ওই অঞ্চলকে ‘খ্রীস্টান রাষ্ট্র’ গঠনে তৎপর রয়েছে বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ান এবোরিজিন, যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ান, নিউজিল্যান্ডের মাউরি, দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা ও মায়া, জাপানের আইনু, রাশিয়ার মেনেড, ফ্রান্স ও স্পেনের বাসকু, আরবের বেদুইন প্রভৃতি জনগোষ্ঠী প্রাচীনকাল থেকে আদিবাসী হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক অতি সাম্প্রতিক সময়ে চালু হয়েছে। ভারতে এ জাতীয় নৃগোষ্ঠী ও উপজাতীদের তফসিলী সম্প্রদায়ভুক্ত জনগোষ্ঠী বলে স্বীকৃতি রয়েছে। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানে তাদের সকল জাতিসত্তাকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

ইনডিজেনাস এ্যান্ড ট্রাইবাল পপুলেশনস কনভেনশন-১৯৫৭ (নং-১০৭) সালে পাস হলেও এ পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২৭ দেশ এটি রেটিফাই করেছে। ১৯৭২ সালের ২২ জুন বাংলাদেশও রেটিফাই করেছিল। পরে কনভেনশন ১৬৯ পাস হওয়ার পর পূর্বোক্ত কনভেনশন ১০৭ তামাদি হয়ে যায়। বাংলাদেশ কনভেনশন ১৬৯ রেটিফাই করেনি। তাই এটি এদেশের জন্য পালনীয় নয়। লক্ষণীয় যে, এরই মধ্যে আটটি দেশ এ কনভেনশনকে নিন্দা করে তা থেকে বেরিয়ে গেছে। অন্যদিকে, ইনডিজেনাস এ্যান্ড ট্রাইবাল পপুলেশনস কনভেনশন-১৯৮৯ (নং-১৬৯) পাস হলেও এখন পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২২টি দেশ এ কনভেনশন রেটিফাই করেছে। এ উপমহাদেশের একমাত্র নেপাল ছাড়া আর কোন দেশ এ কনভেনশন রেটিফাই করেনি।

অন্যদিকে, ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক যে ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয় তাতে ভোটদানের সময় ১৪৩ দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪ দেশ বিপক্ষে, ১১ দেশ বিরত এবং ৩৪ দেশ অনুপস্থিত থাকে। ভোটদানে বিরতদের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল অন্যতম। বিরুদ্ধে ভোট দেয়া দেশগুলো হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র।

বাঙালী ও বাংলা ভাষীরাই এদেশের সত্যিকারের আদিবাসী। এর পেছনে জাতিতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও প্রমাণ রয়েছে। বাংলাদেশের এ অঞ্চলে বাঙালীরা বসবাস করে আসছে ৪ হাজার বছরেরও আগে থেকে। বিক্রমপুর, ওয়ারি-বটেশ্বর, সোনারগাঁ কিংবা মহাস্থানগড় থেকে প্রাপ্ত নৃতাত্ত্বিক প্রমাণাদি বিষয়টি নিশ্চিত করে। নৃতাত্ত্বিক ও জাতিতাত্ত্বিক ইতিহাস বিশ্লেষণে দিবালোকের মতো স্পষ্ট ও প্রতিষ্ঠিত যে, বাংলাদেশে বসবাসরত কোন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এদেশের আদিবাসী নয়। বিশ্বের তাবত শীর্ষস্থানীয় নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষক এ ব্যাপারে একমত।

অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান উপজাতি চাকমাদের আদি বাসস্থান ছিল আরাকান। ত্রিপুরাদের বসবাস ছিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে এবং মারমারাও এসেছে মিয়ানমার (সাবেক বার্মা) থেকে। সে অর্থে তারা কেউ আদিবাসী নয়, বরং অভিবাসী। তারা বিভিন্ন স্থান থেকে দেশান্তরী হয়ে এদেশের নানা স্থানে অভিবাসী হয়ে আনুমানিক সর্বোচ্চ ৫শ’ বছর থেকে এ ভূখণ্ডে বসবাস করে আসছে। তাই কোনক্রমেই এসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, উপজাতি সদস্যরা আদিবাসী হতে পারে না। এর যথাযথ প্রমাণ রয়েছে প্রখ্যাত উপজাতি গবেষক ও নৃতত্ত্ববিদ রবার্ট হেনরি ¯িœড হাচিনসনের বই ‘এ্যান্ড এ্যাকাউন্ট অব চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস (১৯০৬), ক্যাপ্টেন থমাস হার্বাট লেউইন (১৮৬৯) লেখা বই দি চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস এ্যান্ড ডুয়েলার্স দেয়ার ইন (১৮৬৯), অমরেন্দ্র লাল খিসা প্রমুখের লেখা গবেষণাপত্র, থিসিস এবং রিপোর্ট বিশ্লেষণে এর প্রমাণ মেলে যে, বাংলাদেশের উপজাতীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো এদেশের আদিবাসী বা ভূমিপুত্র নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকিজাতি বহির্ভূত অন্য সকল উপজাতীয় গোষ্ঠীই বহু পরে এ অঞ্চলে বসতি স্থাপনকারী। কুকিদের পাশাপাশি অন্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে ম্রো, খিয়াং, পাংখো জনগোষ্ঠীর সদস্য উল্লেখযোগ্য। এরা সর্বোচ্চ ৫শ’ বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বসবাস শুরু করে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর ইতিহাস হচ্ছে এরা সবাই যুদ্ধবিগ্রহ এবং হিংস্র দাঙ্গা-হাঙ্গামার ফলে তাদের পুরনো আবাসস্থল থেকে এ অঞ্চলে পালিয়ে এসেছে। এক জনগোষ্ঠী অন্য জনগোষ্ঠীর পশ্চাদ্ধাবন করে আক্রমণকারী হিসেবে এদেশে প্রবেশ করেছে। বিশিষ্ট চাকমা পণ্ডিত অমরেন্দ্র লাল খিসা ‘অরিজিন অব চাকমা পিপলস অব হিল ট্র্যাক্টস চিটাগং’ বইতে লিখেছেন, চাকমারা এসেছে তৎকালীন বার্মার মংখেমারের আখড়া থেকে। পরবর্তীকালে আরাকান এবং মগদের দ্বারা তাড়িত হয়ে তারা বান্দরবানে প্রবেশ করে। আরও পরবর্তী সময়ে উত্তরদিকে রাঙ্গামাটিসহ সন্নিহিত এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

গবেষকদের মতে, এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদিবাসী আখ্যা না দেয়ার যুক্তিতে রয়েছে, ইস্ট তিমুর, সাউথ সুদান, কাশ্মীর, চেচনিয়া, ফিলিপিন্সের মিননাউসহ পৃথিবীর আরও কয়েকটি স্থানের বিরাজমান পরিস্থিতি। তাদের মতে, ইউনাইটেড নেশন ডিক্লারেশন অন দ্য রাইটস অব ইনডিজেনাস পিপলস বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র ২০০৭ অনুযায়ী তাদেরকে আদিবাসী স্বীকৃতি প্রদান করলে সে অনুযায়ী ওই জনগোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসন, রাজনৈতিক, আইনী, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা প্রদান করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়ে যায়। বিশেষ করে জাতিসংঘ ঘোষণার ধারা ৩০ অনুযায়ী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি কিংবা ভূখণ্ডে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না উপযুক্ত জনস্বার্থের প্রয়োজন যুক্তিগ্রাহ্য হবে। অন্যথায় যদি সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় সম্মতি বা অনুরোধ জ্ঞাপন না করে।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশেষ কোন জনগোষ্ঠীর ভূমি বা ভূখণ্ড ব্যবহারের আগে যথাযথ পদ্ধতি ও বিশেষ করে তাদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিশেষ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা করে অনুমতি গ্রহণ করার বিষয়টি সে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে নিঃসন্দেহে। বাংলাদেশে যেসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে তাদের মতবাদও এক নয়। সবচেয়ে বড় উপজাতি চাকমারা পৃথক পৃথক জেএসএস এবং ইউপিডিএফের মতবাদে বিশ্বাসী।

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের সকল অঞ্চলের আদিবাসী বাঙালী। এদের মধ্যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরাও রয়েছেন। গত কয়েক বছর ধরে এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী বলে দাবিদাররা হঠাৎ করে আদিবাসী স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টার নেপথ্যে রয়েছে ভবিষ্যতে ফায়দা লোটার মূল কৌশল। এ কৌশলের ফাঁদে পা দেয়া ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনক। আদিবাসী স্বীকৃতির বিপরীতে রয়েছে এদেশের ভৌগোলিক অখ-তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি ব্যাপকভাবে জড়িত। যেহেতু বাঙালীরাই এদেশের মূল আদিবাসী এবং উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা মূলত অভিবাসী। সেক্ষেত্রে জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী পার্বত্য উপজাতীয় অধিবাসীরা আদিবাসী নয় এবং তাদের আদিবাসীর স্বীকৃতি আদায়ের অপচেষ্টা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক অখ-তাকে বিপজ্জনক করার একটি অপকৌশল মাত্র।

সূত্র: দৈনিক জনকণ্ঠ

আদিবাসী প্রসঙ্গ এবং ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন

পার্বত্য-চট্টগ্রাম11

♦ মুন্শী আবদুল মাননান ♦

বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা। এতে বক্তব্যে রাখেন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশিদ, নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবীর, অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, অধ্যাপিকা সাদেকা হালিম প্রমুখ।

ওয়াকিবহাল মহলের অজানা নেই, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা উপজাতীয় জনগোষ্ঠীকে আধিবাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অনেক দিন ধরেই বিভিন্ন মহল থেকে জোর চেষ্টা চলছে। উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলো যেমন নিজেদের আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করছে, তেমনি কিছু মহলও একই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত আদিবাসী ফোরাম গঠনের লক্ষ্যই হলো, ওইসব জনগোষ্ঠীর আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করা। বিশ্ব আদিবাসী দিবসে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠানাদির আয়োজনের লক্ষ্যও মূলত একই। এখানে স্মরণ করা দরকার, অতীতে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোর আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দেয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা একযোগে নিজেদের আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দাবি করছে কেন, তা একটি বড় প্রশ্ন। সাধারণ অর্থে কোনো দেশ বা অঞ্চলের বা ভূখ-ের সর্বপ্রাচীন অধিবাসীদের আদিবাসী বলে অভিহিত করা হয়।

বুঝতে অসুবিধা হয় না, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলো নিজেদের আদিবাসী দাবি করে এটা প্রমাণ করতে চাইছে, বাংলাদেশের বা তার বিশেষ বিশেষ অঞ্চলের তারাই সর্বপ্রাচীন আদিবাসী। এই দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বাংলাদেশের বা ওইসব অঞ্চলের ভূমি বা সম্পদের ওপর তাদের একটি বিশেষ অধিকার জন্মে এবং সেই অধিকার কায়েমের পথ প্রশস্ত হয়। অথচ ইতিহাসের সাক্ষ্য এই যে, চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, হাজংসহ কোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীই বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন আধিবাসী নয়। তারা মাত্র কয়েকশ বছরের ব্যবধানে অন্যান্য দেশ থেকে এসে বাংলাদেশে বসতি স্থাপন করেছে। বাংলাদেশে বাঙালিরাই সর্বপ্রাচীন অধিবাসী বা আদিবাসী।

ইতিহাসের এই সাক্ষ্য এখন স্বীকার বা মান্য করতে চাইছে না উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলো এবং কিছু মহল। তারা যে কোনো মূল্যে নিজেদের বা উপজাতীয়দের আদিবাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ইতোমধ্যে আমরা বিভিন্ন সময় ইতিহাসের অকাঠ্য তত্ত্ব-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছি (আরো অনেকে দেখিয়েছেন) বাংলাদেশে যেসব উপজাতীয় জনগোষ্ঠী বসবাস করে তাদের কেউই বাংলাদেশের আদিবাসী নয়। উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলো যেমন তেমন দেশের চিহ্নিত কিছু মহল সেটা মানতে নারাজ। তারা লাগাতার তাদের লক্ষ্য হাসিলে কাজ করে যাচ্ছে। ঘটা করে আদিবাসী দিবস পালন ওই তৎপরতারই অংশ।

লক্ষ্যণীয়, ওই দিনের অনুষ্ঠানে পূর্বে উল্লিখিত বক্তারা সবাই উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোকে আদিবাসী অভিধায় চিহ্নিত করে তাদের অধিকার সম্পর্কে বক্তব্য দিয়েছেন। সন্তু লারমার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন। সন্তু লারমা সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, সরকার ‘আদিবাসীদের’ অধিকারের প্রশ্নে আন্তরিক নয়। এটা নানাভাবে নানা যৌক্তিকতার মাধ্যমে প্রমাণ করা যায়। তিনি অভিযোগ করেছেন, বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগ ‘আদিবাসীদের’ অধিকারের পক্ষে কাজ না করে জনসংহতি সমিতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ‘আদিবাসীদের’ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি এর প্রতিকার চেয়েছেন এবং সবাইকে সংগ্রামী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, আমাদের সবাইকে নিজেদের প্রয়োজনেই সংগ্রামী হতে হবে। সংগ্রাম করেই বেঁচে থাকতে হবে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, একটি শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে দেশ স্বাধীন হলেও ‘আদিবাসীরা’ শোষণমুক্ত হওয়া তো দূরের কথা ‘আদিবাসী’ পরিচয়ই পাননি। আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে তথা রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই ‘আদিবাসীদের’ মূল্যায়ন করতে হবে। তাদের অধিকার দিতে হবে। আদিবাসী স্বীকৃতি সরকারি তরফ থেকে না আসায় অত্যন্ত মনোবেদনা প্রকাশ করে অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেছেন, আমাদের দেশে এখনো ‘আদিবাসীরা’ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। স্বাধীন বাংলাদেশে এখনো তাদের শিক্ষা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারিনি। এটা অত্যন্ত বেদনার ও হতাশার কথা।

ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, কোনো জনগোষ্ঠীর অধিকার হরণ করে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। সে রাষ্ট্রটি মাথা উঁচু করেও বিশ্বের দরবারে দাঁড়াতে পারে না। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও দার্শনিক ভিত্তি ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের প্রাপ্ত অধিকার দেয়া। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও ‘আদিবাসীরা’ সে সুযোগ পায়নি। পার্বত্য শান্তি চুক্তি প্রণয়নের পর ‘আদিবাসীরা’ তাদের ভূমির অধিকার সংরক্ষণের জন্য যে দাবি জানিয়ে আসছিল সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বা সংরক্ষিত হয়নি। মামুনুর রশীদ বলেছেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তিতে যে নিয়ম-কানুন হয়েছে, তার কোনোটিই তেমনভাবে কার্যকর হয়নি। অথচ তা হলে ‘আদিবাসীদের’ বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন মান আরো উন্নত হতো। অন্যদের বক্তব্য প্রায় একই রকম। কাজেই তাদের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দেয়ার প্রয়োজন বোধ করছি না। যাদের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের বক্তব্যের সারকথা হলো : কথিত আদিবাসীদের অধিকার অনর্জিত রয়েছে। ভাবটা এরকম যেন উপজাতীয় বাদে দেশের সকল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

প্রকৃত বাস্তবতা এই যে, উপজাতীয়দের চেয়েও দেশের বহু মানুষ শিক্ষা-দীক্ষা, চাকরি-বাকরি, অর্থনৈতিক অবস্থা ও সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। তারা উপজাতীয়দের অধিকার অনর্জিত থাকার জন্য সরকারকেই দায়ী করেছেন। সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন সরকার কেন উপজাতিদের আদিবাসী বলে না, এ জন্য। তাদের এই ক্ষোভ একটি অযৌক্তিক ও অনৈতিক দাবির প্রতি সমর্থনেরই নামান্তর। সরকার বরাবরই বলে আসছে, বাংলাদেশে তথাকথিত কোনো আদিবাসী নেই। এটাই রাষ্ট্রের অবস্থান। বস্তুত, তারা রাষ্ট্রের এই অবস্থানের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান নির্দিষ্ট করেছেন। উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোকে আদিবাসী হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করা হলে কী ধরনের বিপদ হতে পারে সে বিষয়ে অনেকেই আলোকপাত করেছেন।

যে সন্তু লারমা উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোকে আদিবাসী বানানোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যিনি একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতিও বটেন, তিনি এক সময় তথাকথিত শান্তি বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই ‘শান্তি বাহিনী’ বছরের পর বছর ধরে দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, মানুষ হত্যা করেছে, অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। ‘শান্তি বাহিনীর’ লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা করে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা। গত শতকের ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ‘শান্তি বাহিনী’র দৌরাত্ম্য ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। তখন সরকার দু’টি পন্থা অবলম্বন করে।

প্রথমত, নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং যথাসম্ভব এই বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে দমন করা। দ্বিতীয়ত, শান্তি স্থাপনের জন্য ‘শান্তিবাহিনী’র সঙ্গে আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত রাখা। ‘শান্তি বাহিনী’ সে সময় আলোচনায় পাঁচ দফা দাবিনামা পেশ করে। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক তার একটি লেখায় ওই পাঁচ দফা দাবির প্রথম দফাটি উল্লেখ করেছেন। দফাটি এই : ‘বর্তমান বাংলাদেশকে দু’টি প্রদেশে ভাগ করা হবে। একটি প্রদেশের নাম হবে বাংলাদেশ, রাজধানী ঢাকা। আরেকটি প্রদেশের নাম হবে জুম্মল্যান্ড; রাজধানী রাঙামাটি। ২টি প্রদেশ মিলে একটি ফেডারেশন হবে, ফেডারেশনের নাম হবে ফেডারেল রিপাবলিক অব বাংলাদেশ, রাজধানী ঢাকা। সাংবিধানিকভাবে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে বিষয় বণ্টন হবে; শুধু চারটি বিষয় থাকবে কেন্দ্রের হাতে, বাকি সব প্রাদেশিক সরকারের হাতে।’ সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম অতঃপর লিখেছেন: ‘শান্তি বাহিনীর পাঁচ দফা দাবিনামা ছিল অনেকটাই ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কর্তৃক পাকিস্তান সরকারের কাছে উপস্থাপিত ছয় দফা দাবিনামার অতিকিঞ্চিৎ সংশোধিত রূপ। পাঁচ দফা দাবিনামা মেনে নেয়া মানে ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মানচিত্র আবারো অংকন করা।’ বলা বাহুল্য, এ দাবিনামা মানা সম্ভব ছিল না এবং মানাও হয়নি।

‘শান্তি বাহিনী’ আনুষ্ঠানিকভাবে তার দাবিনামা পেশ করে ১৯৮৭ সালে। এর দশ বছর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি ও পার্বত্য জনসংহতি সমিতির মধ্যে একটি চুক্তি হয় যা ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি’ নামে অভিহিত হয়ে থাকে। এই চুক্তির পর এত বছর অতিবাহিত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বলা যাবে না। জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠাকামীরা তাদের লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে, এমন দাবিও জোর দিয়ে কেউ করতে পারে না। পর্যবেক্ষকদের মতে, তারা এখনো তৎপর ও সক্রিয়। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বহু সশস্ত্র গ্রুপ গড়ে উঠেছে। তারা হত্যা, চাঁদাবাজি ও জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১’ সংশোধিত হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ গত ৮ আগস্ট প্রণয়ন ও জারি করেছেন মাননীয় প্রেসিডেন্ট।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ১৯৯৯ সালে ৩ জুন বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে সরকার ল্যান্ড কমিশন গঠিত করে। ২০০১ সালে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১’ প্রণীত হয়। ওই সময়ই এই আইন নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ করা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী বাঙালীদের ভূমি অধিকার এই আইনে খর্ব হয়েছে। জনসংহতি সমিতিও এ আইনের ব্যাপারে আপত্তি তোলে। তার মতে, এতে উপজাতীয়দের ভূমি অধিকার নিরংকুশ হয়নি। কমিশনের নিয়ন্ত্রণও রয়ে গেছে সরকারের হাতে। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাবো না। শুধু এটুকু বলবো যে, জনসংহতি সমিতি আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে আইনের ১৯ দফা সুপারিশ পেশ করে। এই সংশোধনীগুলো পেশ করা হয় বাঙালীদের ভূমি অধিকার আরো খর্ব ও অনিশ্চিত করে উপজাতীয়দের অধিকার নিশ্চিত ও সংহত করার জন্য এবং কমিশনের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার জন্য।

যতদূর জানা গেছে, আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে আসা জনসংহতি সমিতির সংশোধনী প্রস্তাবগুলো সংশোধিত আইনে গুরুত্ব ও প্রাধান্য পেয়েছে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এখানে কম; সংক্ষেপে দুয়েকটি বিষয় ও প্রসঙ্গ এখানে উল্লেখ করছি। এক : মূল আইন বা ২০০১ সালে প্রণীত ৫৩ নং আইনের ৪ ধারার ২ উপধারায় উল্লিখিত ‘যে কোনো পার্বত্য জেলায়’ শব্দগুলোর পরিবর্তে সংশোধিত আইনে ‘যে কোনো পার্বত্য জেলাসহ অন্য কোনো স্থানে’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। ৪ নং ধারাটি কমিশনের কার্যালয় সংক্রান্ত। দেখা যাচ্ছে, মূল আইনে এর শাখা কার্যালয় যে কোনো পার্বত্য জেলায় স্থাপন করার কথা থাকলেও সংশোধিত আইন অনুযায়ী অন্য কোনো স্থানেও স্থাপন করা যাবে। অর্থাৎ কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরেও দেশের যে কোনো স্থানে শাখা কার্যালয় স্থাপন করতে পারবে। দুই : ২০০১ সালের আইনের ৬ ধারার উপধারা (১) এর (ক) দফা (ক) এর পরিবর্তে সংশোধিত আইনে দফা (ক) প্রতিস্থাপিত হয়েছে এভাবে : (ক) পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ এবং অবৈধ বন্দোবস্ত ও বেদখল হওয়া ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, নীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পন্ন করা; (খ) দফা (খ) তে উল্লিখিত ‘আইন ও রীতি’ শব্দগুলির পরিবর্তে ‘আইন, রীতি ও পদ্ধতি’ শব্দগুলি ও কমা প্রতিস্থাপিত হইবে; (গ) দফা (গ) এর পরিবর্তে যা প্রতিস্থাপিত হয়েছে তা এরকম : (গ) পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন। নীতি ও পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে চলে আসা ভূমিসহ (ঋৎরহমব খধহফ) কোনো ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান বা বেদখল করা হইয়া থাকিলে উহা বাতিল করণ এবং বন্দোবস্তজনিত বা বেদখলজনিত কারণে কোনো বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল; তবে শর্ত থাকে যে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত এবং বসতবাড়িসহ জলে ভাসা ভূমি, টিলা ও পাহাড় ব্যতীত কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা এবং বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকার ক্ষেত্রে এই উপধারা প্রযোজ্য হইবে না।’

উল্লেখ করা দরকার, মূল আইনে এই ‘শর্তের’ অংশটি ছিল এরকম। ‘তবে শর্ত থাকে যে, প্রযোজ্য আইনের অধীনে অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং রক্ষিত (জবংবৎাবফ) বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া। ভূ-উপগ্রহ এলাকা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প-কারখানা ও সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমির ক্ষেত্রে এই উপধারা প্রযোজ্য হইবে না।’ এখানে বিবেচ্য বিষয় এই যে, ‘আইন ও রীতি’র জায়গায় ‘আইনে, রীতি ও পদ্ধতি’ প্রতিস্থাপিত হলো যেন তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।

অন্যদিকে ‘শর্তের’ জায়গায় বনাঞ্চল, এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প-কারখানা ও সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমি বাদ গেল কেন, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। অনেকের অভিমত, পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই-তৃতীয়াংশ ভূমিই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এখন এই বনাঞ্চলের ভূমির দাবীও যে উপজাতীয়রা করতে পারবে। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের কথা নিয়ে আমরা ইতি টানবো এই নিবন্ধের। তিনি আগে উল্লেখিত নিবন্ধের শেষাংশে বলেছেন; ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি মোটেই শান্তিময় নয়। আট দশ দিন আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন আইন সংশোধিত হলো। আমার মতে, সংশোধনীর কারণে সমস্যা বাড়বে।

যা হোক, বিবেচনা সরকার করবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার এই মুহূর্তের ক্রাক্স বা চুম্বক অংশ হলো একটি প্রশ্ন ও তার উত্তর। প্রশ্নটি হলো, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা থাকবে কি থাকবে না ? যদি থাকে, তাহলে কত সংখ্যক ও কোন কোন শর্তে ?’

এক মানববন্ধনে তিনি বলেছেন : ‘১৯৮৭ সালে পার্বত্যাঞ্চলের এসব দেশদ্রোহীরা সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিলো পুরো বাংলাদেশ দু’টি ভাগে ভাগ করার। এক ভাগের নাম বাংলাদেশ, যার রাজধানী ঢাকা। আর এক ভাগের নাম হবে জুম্মল্যান্ড, যার রাজধানী রাঙামাটি। এই দুটি অংশ মিলে একটি ফেডারেল সরকার হবে। তখন আমরা রাজি হয়নি। কিন্তু বর্তমান ভূমি আইন বাস্তবায়নের ফলে বিদ্রোহীদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে।’

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে সামরিকায়িত অঞ্চল- বিশ্ব আদিবাসী সম্মেলনে বক্তারা

13187814_1180625511949781_1225968215_n

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

এশিয়ার আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে সামরিকায়ন সংঘাত ও মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরাম (ইউএনপিএফআইআই) পঞ্চদশ বার্ষিক সম্মেলনে অভিমত প্রকাশ করেছেন দি এশিয়া ইন্ডিজিনাস পিপল প্যাক্টের সেক্রেটারি জেনারেল জোয়ান কার্লিং।

ইন্টার প্রেস সার্ভিস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে বক্তারা বলেছেন, বিশ্বের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ আদিবাসী জনগোষ্ঠী এশিয়া অঞ্চলে বাস করে। তারা এ অঞ্চলে সমৃদ্ধ জনবৈচিত্র এনেছে। কিন্তু তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে স্বীকৃতি, সামরিকায়ন ও ভূমির উপর অধিকার। এরমধ্যে বাংলাদেশের ১১ আদিবাসী জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে সামরিকায়িত অঞ্চল।

আদিবাসী জনগণঃ দ্বন্দ্ব, শান্তি, ও সমাধান – এই থিম নিয়ে গত ৯ মে সোমবার জাতিসংঘ সদর দফতরে আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের পঞ্চদশ অধিবেশন শুরু হয়েছে। দুই সপ্তাহ ব্যাপী এই অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সহস্রাধিক প্রতিনিধি এ অংশগ্রহণ করছেন যাদের মধ্যে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, কর্মসূচি ও ফান্ড, আন্তর্জাতিক এনজিও প্রতিনিধি, জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান, আদিবাসী পার্লামেন্টারিয়ান, স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ারসহ আদিবাসী প্রতিনিধি রয়েছেন।

সম্মেলনের প্রথম দিনে প্রতিনিধি দলের একটি অংশ সাইড লাইন আলোচনায় এশিয়ার প্রেক্ষাপটে মূল থিমের উপর আলোচনা করেন।


আরও পড়ুন : প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ বাড়ছে


ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইন্ডিজিনাস এফেয়ার্সের(আইডব্লিউজিআইএ)মতে, বাংলাদেশের এক নবমাংশ ভূমিতে বসবাসকারী এক শতাংশ জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনবাহিনীর এক তৃতীয়াংশ অবস্থান করে। প্রথমদিকে বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য জনসংহতি সমিতির দুই দশকের অধিকার ও আঞ্চলিক স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবীর লড়াইয়ের প্রেক্ষাপটে সেখানে সেনাবাহিনী মোতাযেন করা হয়। কিন্তু ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তিতে সেখান থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার ও আত্ম নিয়ন্ত্রণাধিকারের কথা বলা হলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

13162219_1180641591948173_1973189504_n

সম্মেলনে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, ‘ এ চুক্তির ১৮ বছর পার হলেও চুক্তির প্রধান প্রধান শর্তগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু তারা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে। সামরিক বাহিনী সেখানে থাকতে পারে, কিন্তু সামরিক শাসন চলতে পারে না। ’।


আরও পড়ুন : দল ত্যাগ করায় নানিয়ারচরে ইউপিডিএফ কর্মী খুন


জাতিসংঘ নিযুক্ত স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার লার্স এন্ডার্স বাযের তার রিপোর্টে শান্তিচুক্তির শর্ত বাস্তবায়নের সরকারী ব্যর্থতা ও ওই অঞ্চলে সামরিক বাহিনীর বিস্তারের কথা তুলে ধরেছেন।

দ্রং বলেন, ‘সামরিক বাহিনীর দ্বারা ভিন্নমত দমন, নির্যাতন, গ্রেফতার ও ভূমি দখলের মতো ঘটনা ঘটছে। আদিবাসীদের বসত ও জমি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে তাদের জমি অস্থানীয়দের লিজ দেয়া হচ্ছে’ উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘পর্যটন শিল্পের সামরিক সম্পৃক্ততা আদিবাসীদের জমি বাজেয়াপ্ত ও ধংসে ভূমিকা রাখছে’।

‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সেনাকল্যাণ সংস্থা আবাসন, নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনা খাতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। সরকারী অনুদান ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে এ প্রতিষ্ঠান পার্বত্য চট্টগ্রামে নীলগিরির মতো বিলাসবহুল রিসোর্ট নির্মাণ করেছে। এর নির্মাণ কালে সেনাবাহিনী আদিবাসীদের ফলন্ত বাগান, দোকান ও নিকটস্থ স্কুল ধংস করেছে’ বলেও তিনি জানান।


আরও পড়ুন : পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি আওয়ামী লীগের


উল্লেখ্য, গত ৯ মে সোমবার জাতিসংঘ সদর দফতরে আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের পঞ্চদশ অধিবেশন শুরু হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুন অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নিজেদের ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নানা দ্বন্দ্ব-সংঘাতে বিপর্যস্ত আদিবাসী জনগণের পূর্ণ অধিকার পুনরুদ্ধারে নতুন পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন।

এক ভিডিও বার্তায় তিনি এবারের থিমকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য স্থায়ী শান্তিপূর্ণ পরিবেশ পূর্বশর্ত। জাতিসংঘ স্থায়ীত্বশীল উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) ২০৩০ এজেন্ডা বাস্তবায়নে আদিবাসীদের সাথে আলোচনা শুরু করার জন্য তিনি সাধারণ পরিষদকে আহ্বান জানান। বান কি-মুন আরো বলেন, নারীসহ আদিবাসীরা যাতে অংশগ্রহণ করে এবং উপকৃত হয়, তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের ভাইস-প্রেসিডেন্ট সুয়েন জারগেনসেন সকল সদস্য রাষ্ট্রকে উৎসাহিত করে বলেন, উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের অধিকার রয়েছে বলেই শুধু নয়, যেহেতু তারা বৈষম্যের কারণে প্রান্তিক ও বিপন্ন, তাই তাদের সাথে সদস্যরাষ্ট্রকে কাজ করতে হবে। তিনি আরো বলেন, ২০৩০ সালের এজেন্ডা বাস্তবায়নে আদিবাসী জনগণ যাতে বাদ না পড়ে, সেটি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। “লিভিং নো ওয়ান বিহাইন্ড” কথাটির প্রতিফলন থাকতে হবে।

এবারের অধিবেশনে বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের কারণে আদিবাসীদের ভূমির অধিকার, টেরিটরি ও সম্পদের অধিকার, স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অধিকার নিয়ে বিস্তর আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

অধিবেশনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট মগেন লুকটফ বলেন, যখন আদিবাসীরা অধিকারের কথা বলেন, তখন তাদের আক্রমণের টার্গেটে পরিণত করা হয়। আদিবাসীদের জীবনকে প্রভাবিত করে এমন সকল বিষয়ে জাতিসংঘে তাদের অধিকতর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মত দেন।

অধিবেশনে আরো বক্তব্য রেখেছেন কানাডার জাস্টিস মিনিস্টার মিস্ জোডি উইলসন রেবোল্ড, গুয়াতেমালার শ্রম ও সামাজিক সুরক্ষা মন্ত্রী অরা লেটিসিয়া তেলেগুয়ারিও এবং জাতিসংঘ আন্ডার-সেক্রেটারি জেনারেল মি. উ হংবো।

এই অধিবেশনে সদস্যরাষ্ট্রের সঙ্গে আদিবাসী প্রতিনিধিদের অর্থপূর্ণ আলোচনা ও সংলাপের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন।

বাংলাদেশ থেকে চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়সহ আটজন প্রতিনিধি এতে অংশ নিচ্ছেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের কাউন্সিলর এটিএম রকিবুল হক এতে অংশগ্রহণ করছেন। দ্বিতীয় সপ্তাহে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল অধিবেশনে যোগ দেবেন। অধিবেশন চলবে ২০ মে পর্যন্ত।

আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে সমস্যা কোথায়?

মেহেদী হাসান পলাশ 

মেহেদী হাসান পলাশ

আজ ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস। অন্যসব বছরের মতো এ বছরেও বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী সাড়ম্বরে দিনটি উৎযাপনের আয়োজন করেছে। এ বছর জাতিসংঘ দিনটির প্রতিপাদ্য ঠিক করেছে, Post : 2015 Agenda: Ensuring indigenous peoples’ health and well-being”. বিশ্ব আদিবাসী দিবসকে সামনে রেখে আবার নতুন করে আলোচিত হচ্ছে বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্কটি।

বাংলাদেশে আদিবাসী কারা- এই বিতর্কটি খুব প্রাচীন নয়, বড়ো জোর দেড় দশকের। ইস্যুটি পুরনো না হলেও তা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাস, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বকে নাড়া দিয়েছে। জাতীয় সংহতির প্রশ্নে তাই এ বিতর্কের আশু সমাধান জরুরি। ইতোপূর্বে দৈনিক ইনকিলাবে একই বিষয়ে বর্তমান লেখকের তিনটি উপ-সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছে। প্রবন্ধগুলো হচ্ছে, বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক, প্রকাশ, ২ আগস্ট ২০১৩; আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ, প্রকাশ ৩০ আগস্ট ২০১৩ এবং বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা, প্রকাশ, ১৫ আগস্ট ২০১৪। পঠনের পরম্পর্য রক্ষায় পাঠকগণ ইচ্ছে করলে উপরের হাইপার লিংক থেকে লেখাগুলো পড়ে নিতে পারবেন। বর্তমান লেখায় বাংলাদেশের সমতলে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সলুক সন্ধান ও তাদের আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে প্রতিবন্ধকতা কোথায় তা নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

আদিবাসী শব্দের ইংলিশ প্রতিশব্দ Indigenous people. . অনেকে আদিবাসী শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে Aborigine ব্যবহার করেন। কিন্তু Aborigine বলতে সার্বজনীনভাবে আদিবাসী বোঝায় না। Aborigine বলতে সুনির্দিষ্টভাবে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের বোঝায়। একইভাবে Red Indian বলতে মার্কিন আদিবাসীদের বোঝায়, অস্ট্রেলীয় Aborigine বা আদিবাসীদের বোঝায় না। প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী আদিবাসী হচ্ছে, ‘কোনো স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই।’ মর্গান বলেন, The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial … they are the true Sons of the soil…’ (Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972).

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে মোট ৪৫টি (কারো কারো মতে ৭৫) ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব রয়েছে। সাধারণভাবে এরা উপজাতি ও তফশিলী সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। তবে বিশেষ উদ্দেশ্যে কিছু মতলবাজগোষ্ঠী এ সম্প্রদায়গুলো আদিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের আদিবাসী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করা শুরু করেছে।  জাতি ও উপজাতি সংজ্ঞা এসব জনগোষ্ঠীর অনেকগুলোর জন্যই প্রযোজ্য নয়। তাই তাদের তফশিলী সম্প্রদায় বলা হয়। ভারতবর্ষেও সহস্রাধিক সম্প্রদায় ‘তফশিলী’ হিসেবেই রাষ্ট্রকাঠামোতে স্বীকৃত রয়েছে। বাংলাদেশের সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে সাঁওতাল, গারো, হাজং, কোচ, মনিপুরী, খাসিয়া, রাখাইন প্রধান। এখানে এসব জনগোষ্ঠীর আদি নিবাস ও বাংলাদেশে আগমন নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে।(পূর্বের ‘বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক’ শিরোনামের লেখায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাসিন্দাদের আদি নিবাস ও বাংলাদেশে আগমন নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। ইচ্ছে করলে পাঠকগণ উপরের হাইপার লিংকে ক্লিক করে সেসব তথ্য দেখে নিতে পারেন।)

ইতিহাসের এই বিশ্লেষণে সকল তথ্যের জন্য মাত্র তিনটি পুস্তককে রেফরেন্স ও তথ্যাগার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর একটি হলো বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রণীত `বাংলাপিডিয়া’, একই প্রতিষ্ঠানের `বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা’ এবং বাংলাদেশ আদিবাসী অধিকার আন্দোলন কর্তৃক প্রণীত `বাংলাদেশের আদিবাসী : এথনোগ্রাফীয় গবেষণা’। এই পুস্তক তিনটি নির্বাচনের প্রধান কারণ বাংলাদেশে আদিবাসী অধিকার ও স্বীকৃতির বিষয়ে অধিক সোচ্চার ব্যক্তিগণ এই বই তিনটির রচনা ও সম্পাদনার সাথে তারা জড়িত।

সাঁওতাল

ভারতবর্ষের প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাঁওতাল অন্যতম হলেও বাংলাদেশের তাদের আগমন মাত্র ব্রিটিশ আমলে। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, ব্রিটিশ সরকার রেল লাইন নির্মাণ কাজের জন্য ভারতের সাঁওতাল পরগণা থেকে সাঁওতালদের বাংলাদেশে নিয়ে আসে। এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রণীত বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালায় বাংলাদেশে সাঁওতালদের আগমন সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘দীর্ঘদিন ধরে সাঁওতালরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে বসবাস করছিলেন। ১৮৩৬ সালে ব্রিটিশ সরকার তাদেরকে নির্বিঘ্নে বসবাসের জন্য একটি স্থায়ী এলাকা নির্ধারণ করে দেয়। এ এলাকা সাঁওতাল পরগণা নামে খ্যাত হয়। সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর তাদের অনেকে সাঁওতাল পরগণায় থাকা নিরাপদ মনে না করে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। ড. পিয়ের বোসাইনেট উল্লেখ করেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) সাঁওতালদের অধিকাংশই সাঁওতাল পরগণা থেকে এখানে আগমন করেছেন।

গারো

নৃতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদদের মতে, গারোরা মঙ্গোলয়েড মহাজাতির টিবেটো-বার্মান দলের টিবেটো-চাইনিজ পরিবারের সদস্য। গারোদের ঐতিহ্যবাহী গানের মধ্যে তাদের এদেশে আগমনের সময়কাল সম্পর্কে বলা হয়েছে \’Do reng noktopgita, kilding jakbogita\’ অর্থাৎ ‘সে সময় চিলগুলো ছিল একটি ছোট্ট কুটিরের মতো, আর মাকড়সার জালের সুতা ছিল এক হাতের মতো বড়।’ গারোদের পূর্ব পুরুষদের ধারণা মতে, তাদের পূর্ব-পুরুষদের আদি বাসস্থান ছিল তিব্বত যা \’Torua\’ নামে পরিচিত ছিল। তিনটি পথ দিয়ে তিন দলে বিভক্ত হয়ে গারোদের পূর্ব-পুরুষরা এ উপমহাদেশে আসে। এর একটি দল দক্ষিণ দিকে সুরমা ও বরাক নদী হয়ে কাছাড় ও সিলেটে প্রবেশ করে। এই দলই পরবর্তীতে ‘বঙ্গে’ অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

হাজং

নৃবিজ্ঞানী মি. জে কে বোসের মতে, হাজং গরোদেরই একটি দল। বিভিন্ন লেখকের মতে, হাজংরা আসামের কামরূপ জেলার হাজো অঞ্চল থেকে ক্রমান্বয়ে এদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছে। প্রবীণ হাজংদের মতে, তাদের আদিনিবাস বিহারের অদূরে অবন্তিনগর (মালব) নামক স্থানে এবং নিজেদেরকে তারা সূর্যবংশীয় ক্ষত্রিয় বলে দাবি করে। হাজংরা সুদূর চীনের হোয়াংহো নদীর অববাহিকা থেকে তিব্বত, তিব্বত থেকে অবন্তিনগর (মালব), অবন্তিনগর থেকে প্রাগজ্যোতিষপুর (গৌহাটি) হাজোনগর এবং হাজোনগর থেকে গাড়ো পাহাড়ের কড়ইবাড়ি, বারহাজারী থেকে বাংলাদেশে বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করে।

কোচ

কোচেরা নিজেদের কুচবিহারের নৃপতি নরনারায়ণ এবং চিলারায়ের বংশধর হিসেবে পরিচয় দেয়। তাদের মতে, তাদের আদিনিবাস ছিল রাসান মৃকপ্রাক টারি (যে পাহাড়ে সূর্য প্রথম উদয় হয়) অথবা উদয়গিরি নামক স্থানে। সে আদিনিবাস ত্যাগ করে তারা প্রথমে কামরূপ অঞ্চলে বসতি গড়ে। কামরূপের পরে তারা হাজো অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। সেখান থেকে নানা পথ ঘুরে মেঘালয়ের পশ্চিম সমভূমি এলাকায় রাজ্য গড়ে তোলে যা কুচবিহার নামে পরিচিতি লাভ করে। এ কুচবিহার থেকেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে কোচেরা নানাদিকে দলে দলে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বর্তমানের বাংলাদেশেও সেরকম কয়েকটি দল প্রবেশ করে, যাদের উত্তর পুরুষরাই বর্তমানে একাধিক গোষ্ঠীর নামকরণপূর্বক এদেশের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করছে।

রাখাইন

নৃতাত্ত্বিক বিচারে এরা মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর লোক। রাখাইনদের আদিনিবাস ছিল আরাকান (বর্তমান মায়ানমারের অন্তর্ভুক্ত)। রাখাইনরা তাদের নিজ দেশকে ‘রক্ষইঙ্গি’ এবং নিজেদের ‘রাখাইন’ নামে পরিচয় দিত। রাখাইনদের অংশবিশেষ পনেরো শতক থেকে কক্সবাজারের রামু ও সংলগ্ন এলাকায় বসতি শুরু করলেও আঠারো শতকে আরকানের রাজনৈতিক দুর্যোগ তাদের অনেককেই স্বদেশ ভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য করে। ফলে তারা ক্রমান্বয়ে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় এবং বরগুনা ও পটুয়াখালীতে এসে বসবাস করতে থাকেন।

মণিপুরী

মণিপুরীরা উৎপত্তির ঊষালগ্নে ভারতের বৃহত্তর আসাম রাজ্যের পাদদেশে অবস্থিত বরাক নদীর অববাহিকায় পাতকায় উপত্যকাই অবস্থিত পার্বত্য রাজ্য, নৈসর্গিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ একদা স্বাধীন মণিপুর রাজ্যের অধিবাসী। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মণিপুরে প্রবেশ করে মণিপুরীদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ইংরেজগণ মণিপুরীদের পরাস্ত করে মণিপুরের রাজা বীরবিক্রম টিকেন্দ্রজিৎ সিংহকে পরাস্ত ও বন্দি করে। পরবর্তীকালে ১৯৪৯ সালে মণিপুরকে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের করদরাজ্য বিবেচনায় ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত করে। প্রাণরক্ষার তাগিদে বহু দিশেহারা মণিপুরী [১৭৫৮, ১৭৬৫, ১৮৯১ খ্রি.] নানা দলে বিভক্ত হয়ে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের সন্ধানে মণিপুর রাজ্য ছেড়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েন। তখন অনেক মণিপুরী লোক বাংলাদেশ ভূখণ্ডে এসে বসতি স্থাপন করে।

খাসিয়া

খাসিয়া বা খাসিমঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত উপজাতি। এদেশীয় খাসিয়ারা প্রায় ৫শ’ বছর পূর্বে আসাম থেকে এখানে এসে বসতি গড়েছে। তারা আসামে এসেছিল সম্ভবত তিব্বত থেকে। তাদের প্রধান আবাসস্থল উত্তরপূর্ব ভারত।

উপর্যুক্ত আলোচনায় দেখা যায়, ঐতিহাসিক বিচারে বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠীই বহিরাগত। এটা আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের নেতাকর্মী ও গবেষকগণ স্বীকার করে নিয়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় যেসব প্রত্নবস্তু, অবস্থান ও প্রমাণ পাওয়া গেছে তা খৃষ্টপূর্ব ১৬০০-৫০০ সালের পুরাতন। সেকারণে উপজাতিদের আদিবাসী আখ্যাদানকারী গবেষকগণ এখন ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) কনভেনশন-১৬৯’র আদিবাসী বিষয়ক সংজ্ঞার অপব্যাখ্যা করে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তফশিলী সম্প্রদায়কে আদিবাসী দাবি করছেন ও দাবি করতে উদ্বুদ্ধ করছেন। তবে এ কথা ভুললে চলবে না বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তফশিলী সম্প্রদায়ের অধিকাংশই এই ‘আদিবাসী’ দাবির সাথে সম্পৃক্ত নয়। দেশি-বিদেশি চিহ্নিত একটি মহলের ইন্ধন ও পৃষ্ঠপোষকতায় আঞ্চলিক ও সম্প্রদায়গত কিছু সংগঠন এবং এনজিওর সাথে জড়িত ব্যক্তিরা এই দাবির সাথে জড়িত। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) আদিবাসী কনসেপ্ট সমর্থন করে না। তারা সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে পছন্দ করে।

সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অনেক বিদগ্ধজনের মুখে শোনা যায়, উপজাতি বললে তারা যদি অপমানিত বোধ করে, হেয় বোধ করে এবং আদিবাসী বললে যদি খুশী হয় তাহলে তা বলতে দোষ কোথায়? ইতিহাসে যাই-ই থাক, শতকরা ৯৮ ভাগ একক বাঙালি জনগোষ্ঠীর দেশে আমরা আমাদের দেশের মুষ্টিমেয় উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি এইটুকু উদারতা কি দেখাতে পারি না? এই প্রশ্ন যেকোনো সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষের হৃদয় বিগলিত করতে বাধ্য।

প্রশ্নটি অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে। কিন্তু গোল বাঁধিয়েছে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র। ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক একটি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এ ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করলে ১৪৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪টি দেশ বিপক্ষে, ১১টি দেশ ভোট দানে বিরত এবং ৩৪টি দেশ অনুপস্থিত থাকে। ভোট দানে বিরত থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া দেশগুলো হচ্ছে- অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘোষণাপত্রে সর্বমোট ৪৬টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এসব অনুচ্ছেদের বেশ কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, অস্তিত্ব, কর্তৃত্ব, সংবিধান ও আত্মপরিচয়ের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

একথা নিশ্চিত করে বলা যায়, যেসব ব্যক্তিবর্গ খুব সরলভাবে বা অসেচতন-উদারতায় উপজাতিদের আদিবাসী বলতে ইচ্ছুক/আগ্রহী তাদের অনেকেই হয়তো এই ঘোষণাপত্র পড়ে দেখেননি অথবা তার মর্মার্থ অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন (অবশ্য তারা  মতলববাজদের কথা আলাদা)। নিম্নে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্রের কিছু অনুচ্ছেদ নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

অনুচ্ছেদ-৩ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার বলে তারা অবাধে তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করে এবং অবাধে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মপ্রয়াস অব্যাহত রাখে।

অনুচ্ছেদ-৪ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার উপভোগের বেলায়, তাদের অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ে তথা স্বশাসিত কার্যাবলীর অর্থায়নের পন্থা ও উৎস নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের স্বায়ত্তশাসন বা স্বশাসিত সরকারের অধিকার রয়েছে।

অনুচ্ছেদ-৫ : আদিবাসী জনগণ যদি পছন্দ করে তাহলে রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের পূর্ণ অধিকার রেখে তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক, আইনগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অক্ষুণ্ন রাখা ও শক্তিশালীকরণের অধিকার লাভ করবে।অনুচ্ছেদ-৬ : আদিবাসী ব্যক্তির জাতীয়তা লাভের অধিকার রয়েছে।

অনুচ্ছেদ-১৯ : রাষ্ট্র  আদিবাসীদের প্রভাবিত করতে পারে এমন আইন প্রণয়ন কিংবা প্রশাসনিক সংক্রান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পূর্বে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি নেয়ার জন্য তাদের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে আন্তরিকত্ব সদিচ্ছার সাথে আলোচনা ও সহযোগিতা করবে।

উপরের অনুচ্ছেদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে বাংলাদেশের ভেতর কমপক্ষে ৪৫টি স্বায়ত্তশাসিত বা স্বশাসিত অঞ্চল ও সরকার ব্যবস্থার সৃষ্টি হবে। এসব অঞ্চলে সরকার পরিচালনায় তারা নিজস্ব রাজনৈতিক কাঠামো, জাতীয়তা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আইনপ্রণয়ন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পাবে। এবং এসব অঞ্চলের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের অধিকার ও কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন হবে। লক্ষণীয়, প্রকাশ্যে বলা না হলেও এই আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বতন্ত্র জাতীয়তার মধ্যে লুকানো রয়েছে স্বাধীনতার বীজ।

এই ঘোষণাপত্রে আদিবাসীদের ভূমির উপর যে অধিকারের কথা বলা হয়েছে তা আরো ভয়ানক। যেমন :

অনুচ্ছেদ-১০ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের ভূমি কিংবা ভূখণ্ড থেকে জবরদস্তিমূলকভাবে উৎখাত করা যাবে না। আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের স্বাধীন ও পূর্ববহিত সম্মতি ছাড়া কোনভাবে অন্য এলাকায় স্থানান্তর করা যাবে না এবং ন্যায্য ও যথাযথ ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে সমঝোতা সাপেক্ষে স্থানান্তর করা হলেও, যদি কোন সুযোগ থাকে, পুনরায় তাদেরকে সাবেক এলাকায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

অনুচ্ছেদ-২৬ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তাদের ঐতিহ্যগতভাবে মালিকানাধীন, দখলীয় কিংবা অন্যথায় ব্যবহার্য কিংবা অধিগ্রহণকৃত জমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের অধিকার রয়েছে।

২৬: ৩. রাষ্ট্র এসব জমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের আইনগত স্বীকৃতি ও রক্ষার বিধান প্রদান করবে। সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রথা, ঐতিহ্য এবং ভূমি মালিকানা ব্যবস্থাপনা মেনে সেই স্বীকৃতি প্রদান করবে।

অনুচ্ছেদ-২৭ :  রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে যৌথভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আইন, ঐতিহ্য, প্রথা ও ভূমি মালিকানাধীন ব্যবস্থাপনার যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করবে।

অনুচ্ছেদ-২৮ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদ যা তাদের ঐতিহ্যগতভাবে মালিকানাধীন কিংবা অন্যথায় দখলকৃত বা ব্যবহারকৃত এবং তাদের স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি ছাড়া বেদখল, ছিনতাই, দখল বা ক্ষতিসাধন করা হয়েছে এসব যাতে ফিরে পায় কিংবা তা সম্ভব না হলে, একটা ন্যায্য, যথাযথ ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পায় তার প্রতিকার পাওয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রয়েছে।

২৮: ২. সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় অন্য কোন কিছু রাজি না হলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে গুণগত, পরিমাণগত ও আইনি মর্যাদার দিক দিয়ে সমান ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদ অথবা সমান আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে বা অন্য কোন যথাযথ প্রতিকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

অনুচ্ছেদ-৩০ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বেচ্ছায় সম্মতি জ্ঞাপন বা অনুরোধ ছাড়া ভূমি কিংবা ভূখ-ে সামরিক কার্যক্রম হাতে নেয়া যাবে না।

অনুচ্ছেদ-৩২ : ২. রাষ্ট্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের উপর প্রভাব বিস্তার করে এমন কোন প্রকল্প অনুমোদনের পূর্বে, বিশেষ করে তাদের খনিজ, জল কিংবা অন্য কোন সম্পদের উন্নয়ন, ব্যবহার বা আহরণের পূর্বে স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি গ্রহণের জন্য তাদের নিজস্ব প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে আলোচনা ও সহযোগিতা করবে।

উপরোক্ত অনুচ্ছেদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী আদিবাসী স্বীকৃতি পেলে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নিজস্ব আইনে নিজস্ব ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মুষ্টিমেয় চিহ্নিত উপজাতিরা দাবি করছে ঐতিহ্য ও প্রথাগত অধিকার বলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল ভূমির মালিক তারা। একই অধিকার বলে সমতলের উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকার সকল ভূমির মালিকানা সেখানকার উপজাতীয়রা দাবি করবে। সেখানে যেসব ভূমি সরকারি ও ব্যক্তিগত মালিকানা (আদিবাসী নয়) রয়েছে তা ফেরত দিতে হবে বা তার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এমনকি উপজাতীয়রা রাজি না হলে সমতল থেকে সমপরিমাণ সমগুরুত্বের ভূমি ফেরত দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে যেহেতু ঐ গোষ্ঠী সকল সামরিক স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার দাবি জানাচ্ছে, সেকারণে সেখান থেকে সকল সামরিক স্থাপনা সরিয়ে নিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অন্যান্য উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় যেসব বাঙালি বসতি স্থাপন করেছে তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। ইউএনডিপিসহ কিছু বৈদেশিক সংস্থা ইতোমেধ্যে প্রকাশ্যে এ দাবি তুলেছে।

ঘোষণাপত্রের ৩৬ অনুচ্ছেদটি আরো ভয়ানক।

অনুচ্ছেদ-৩৬ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর, বিশেষত্ব যারা আন্তর্জাতিক সীমানা দ্বারা বিভক্ত হয়েছে তারা অন্য প্রান্তের নিজস্ব জনগোষ্ঠী তথা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংক্রান্ত কার্যক্রমসহ যোগাযোগ, সম্পর্ক ও সহযোগিতা বজায় রাখার ও উন্নয়নের অধিকার রয়েছে।

আমরা জানি বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল উপজাতি জনগোষ্ঠীর মূল আবাস ভারত ও মিয়ানমার। সেখানে এখনো তাদের মূল জনগোষ্ঠী রয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশে তাদের খণ্ডিত অংশ যদি আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পায় তাহলে ভারতের সমগ্র সেভেন স্টিস্টার্স রাজ্য, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা এবং মিয়ানমারের বিপুল এলাকা আদিবাসী ল্যান্ড স্বীকৃতি পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে। একই সাথে সীমান্তের উভয়পাড়ের অভিন্ন জনগোষ্ঠী যদি অভিন্ন রাজনৈতিক, সরকার কাঠামো কিংবা স্বাধীনতার দাবি তোলে তা আঞ্চলিক সমস্যায় রূপ নেবে। এ বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার প্রতিবেশী ভারত সরকারের দৃষ্টিগোচর করতে পারে।  আদিবাসী জনগোষ্ঠী উল্লিখিত অধিকারসমূহ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ বিশেষভাবে ভূমিকা রাখতে পারবে যা ৪২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। পূর্ব তিমুর, দক্ষিণ সুদান স্বাধীন করণে জাতিসংঘের ভূমিকা বিশ্বের দেশপ্রেমিক জনগণকে আতঙ্কিত করেছে। অধুনা পশ্চিম পাপুয়া নিউগিনিতেও জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

যদিও ৪৬ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন আদিবাসীর দাবি এমন একটা জনগোষ্ঠী থেকে উচ্চারিত হচ্ছে যারা ৪২ বছর ধরে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। কৌশলগত কারণে তারা স্বায়ত্তশাসনের কথা যতোটা উচ্চকিত করে স্বাধীনতার কথা ততোটা নয়। ফলে দেশের অধিকাংশ মানুষই রাষ্ট্রবিরোধী এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থাও রহস্যময় আবরণে সযত্নে ঢেকে রেখেছে দেশবিরোধী এই দুষ্টুক্ষত। কিন্তু যারা সচেতন, বিশেষ করে যারা সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহার করেন তাদের প্রতি আহ্বান একবারের জন্য হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীদের পরিচালিত প্রোফাইল, গ্রুপ ও পেইজগুলো ভিজিট করে দেখুন কী ভয়ানক রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে সেখানে। স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ড গঠনের জন্য নিজস্ব জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, মানচিত্র দিয়ে কিভাবে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে তা সচেতনতার জন্য দেশবাসীর জানা উচিত।

পাঠকের জ্ঞাতার্থে সিএইচটি জুম্মল্যান্ড নামে তাদের পরিচালিত একটি পেইজের ঠিকানা এখানে দেয়া হলো :(https://www.facebook.com/pages/CHT-jummaland/327524104096965?fref=ts)। শুধু ফেসবুক বা সামাজিক গণমাধ্যম নয়, পাহাড়ী বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীরা নিউজ পোর্টাল খুলেও পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড গঠনের প্রচার চালাচ্ছে। তাদের পরিচালিত অসংখ্য সাইটের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, chtnews.com. এই সাইটে করুণালঙ্কার ভান্তে নামে জেএসএসের এক শীর্ষ নেতার ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার প্রচার হচ্ছে বেশ কয়েকদিন ধরে। বৌদ্ধ ভিক্ষুর বেশধারী এই ব্যক্তি নিজেকে স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিচয় দিয়ে বিশ্বব্যাপী স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠায় তার কর্মতৎপরতার কথা বিস্তারিতভাবে বলেছেন। অডিও-ভিডিও’র এই স্বাক্ষাৎকারে ভান্তে আরো জানিয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন করার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র তাদের হাতে রয়েছে। এখন তিনি শুধু ৫ লক্ষ গোলাবারুদ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এই পরিমাণ গোলাবারুদ সংগ্রহ করতে পারলে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা করে স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই ভিক্ষু সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা অর্জনের উদাহরণ তুলে ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী তরুণ প্রজন্মকে তার সাথে একাত্ম হতে অহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আন্তর্জাতিক শক্তিকে তিনি পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পাবেন বলেও জানিয়েছেন। কাজেই বাংলাদেশের উপজাতিদের আদিবাসী স্বীকৃতি কোনো ছেলের হাতের মোয়া নয়। এর সাথে জড়িত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, অস্তিত্ব, কর্তৃত্ব, ইতিহাস ও মর্যাদার প্রশ্ন।

Email:palash74@gmail.com

৯ আগস্ট ২০১৫ তারিখে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত।

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জাতীয় অবকাঠামো ভাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে জারি করা সরকারী প্রজ্ঞাপনের প্রতিবাদ জানিয়েছে জেএসএস

জনসংহতি সমিতি

স্টাফ রিপোর্টার:

সংবিধান বিরোধী আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জাতীয় অবকাঠামো ভাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ১৬ আগস্ট ২০১৫ তারিখে জারী করা প্রজ্ঞাপনের প্রতিবাদ জানিয়েছে পার্বত্য জনসংহতি সমিতি।

 উল্লেখ্য, গত ১৬ আগস্ট ২০১৫ তারিখে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-৩ অধিশাখা থেকে “বাংলাদেশে আদিবাসী নামক অসাংবিধানিক দাবী বাস্তবায়নের অপকৌশল রোধকল্পে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান ব্যবহারের অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন” সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপন জারী করা হয়।

মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব মো: মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত উক্ত নির্দেশনায় বলা হয়েছে যে, “সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন ছোট ছোট সম্প্রদায়/গোষ্ঠীকে উপজাতি/ক্ষুদ্র জাতিসত্তা/নৃগোষ্ঠী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। একটি স্বার্থান্বেষী মহল দেশী-বিদেশীদের সহায়তায় বাংলাদেশে আদিবাসী নামক অসাংবিধানিক দাবীটি প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এই অপকৌশল ও ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় স্বার্থান্বেষী মহল কর্তৃক শহর কেন্দ্রীক বিশেষ করে ঢাকা মহানগরের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা/অবকাঠামো যেমন: যুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, জাতীয় শহীদ মিনার, শিল্পকলা একাডেমী, জাতীয় জাদুঘর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বর, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটসহ আরো অনেক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কর্মসূচী পালনের জন্য ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সকল অনুষ্ঠানে জাতীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও সরকারের পদস্থ কর্মকর্তাগণকে সম্পৃক্ত করার প্রবণতাও লক্ষ্যনীয়। পত্রে বাংলাদেশে আদিবাসী নামক অসাংবিধানিক দাবী বাস্তবায়নের অপকৌশল রোধ কল্পে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান ব্যবহারের অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ করা হয়েছে। বর্ণিতাবস্থায় বাংলাদেশে আদিবাসী নামক অসাংবিধানিক দাবী বাস্তবায়নের অপকৌশল রোধ কল্পে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান ব্যবহারের অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।”

জন সংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ বস্তুত: গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উক্ত নির্দেশনা সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। সংবিধানের ৩৯ নং অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্-স্বাধীনতা, ৩৭ নং অনুচ্ছেদে সমাবেশের স্বাধীনতা, ৩৮ নং অনুচ্ছেদে সংগঠনের স্বাধীনতার নিশ্চিয়তার বিধান করা হয়েছে। বাক্-স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সংবিধানে কোথাও উল্লেখ নেই যে, কেবল সংবিধান সম্মত শব্দচয়ন করতে হবে বা সংবিধানে উল্লেখ নেই এমন কোন শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। এমনকি সংবিধানের স্বীকৃত নয় এমন কোন দাবিদাওয়া উত্থাপন বা বাস্তবায়নের জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করা যাবে না বলে সংবিধানে কোথাও সেরকম বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়নি”।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ পঞ্চদশ সংবিধানের মাধ্যমে “উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়” শব্দগুলো উল্লেখ করা হলেও সংবিধানে কোথাও উল্লেখ নেই ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা যাবে না। বরঞ্চ দেশের বিভিন্ন আইনে ও সরকারী পরিপত্রে ‘উপজাতি’ শব্দের পাশাপাশি ‘আদিবাসী’ শব্দটিরও ব্যবহার রয়েছে। আরো উল্লেখ্য যে, সংবিধানে ‘দলিত’, ‘সংখ্যালঘু’, ‘প্রতিবন্ধী’ ইত্যাদি অনেক শব্দের উল্লেখ না থাকলেও এসব শব্দগুলো নানাভাবে বিভিন্ন আলোচনায় ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এসব জনবর্গের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য যুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, জাতীয় শহীদ মিনার, শিল্পকলা একাডেমী, জাতীয় জাদুঘর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বর, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটসহ আরো অনেক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কর্মসূচী পালন করা হচ্ছে”।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, “আদিবাসী শব্দ নিয়ে অতি উৎসাহী ও অতি মাত্রায় উদ্যোগী হয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় তথা সরকারের এই নির্দেশনা জারির পেছনে অত্যন্ত হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেছে বলে জনসংহতি সমিতি মনে করে। ভিন্ন জাতিসত্তার অধিকারী জনসংখ্যায় ক্ষুদ্র এসব জাতিসমূহ সকল ক্ষেত্রে প্রান্তিক, দুর্বল ও অসহায় হিসেবে হয়তো বিবেচনা করা যায় বলে বলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মতো উদ্ভট, হাস্যকর ও অগণতান্ত্রিক নির্দেশনা দিতে সরকার উঠে পড়ে বলে বিবেচনা করা যায়। তাই অচিরেই উক্ত নির্দেশনা প্রত্যাহার করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় তথা সরকারের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছে”।

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্কের প্রভাব

মাহবুব মিঠু

মাহবুব মিঠু

 

১।। সমাধানহীন জাতীয় বিতর্কে আরেকটা নতুন পালক

আদিবাসী বিতর্কটা বাংলাদেশে আর পাঁচটা সমাধানহীন বিতর্কের মতোই ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করছে। সেই সাথে বিভিন্ন পক্ষ থেকে বিতর্কের সমাধানের চেয়ে বরং এটিকে রাজনীতিকরণ করা শুরু হয়েছে। ফলে আদিবাসী ইস্যুটা সমাধানের চেয়ে দিনকে দিন জটিলতার দিকেই এগুচ্ছে বলে মনে হয়। এই পরিস্থিতিতে শুধু বাংলাদেশে নয়, বরং সমগ্র এশিয়ায় ক্রমশঃ এটা একাধারে এক পক্ষের ধারণায় অবহেলিত এবং অন্য পক্ষের ধারণায় একটা বিতর্কিত চাপিয়ে দেয়া ইস্যু হয়ে পড়েছে।

মূলতঃ অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, আমেরিকা কিংবা অন্যান্য ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রগুলোর মতো এশিয়ার বিতর্কটা সাদা কালোর মতো পরিস্কার নয়। এই সুযোগটাকে ব্যবহার করে এক পক্ষের মতে কিছু ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী এখান থেকে ফায়দা নেবার চেষ্টায় ব্যস্ত। কোন জাতি আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় তারা কিছু বাড়তি সুযোগ সুবিধা পায়। যেমন জমির উপর কিছু বাড়তি অধিকার এবং অন্যান্য আরো কিছু সুযোগ সুবিধা।

বাঙ্গালীদের বড় অংশ মনে করে, পাহাড়ীদের এই দাবী অন্যায্য এবং এটা মানা হলে যে সুযোগ সুবিধাগুলো তারা ভোগ করবেন সেটা একদিকে অন্যায় এবং আমাদের রাষ্ট্রিয় অখণ্ডতা ভবিষ্যতে হুমকীর মুখে পড়বে। অন্যদিকে, আদিবাসী দাবীদাররা মনে করছেন, অস্পষ্টতার সুযোগে রাষ্ট্রের ডোমিনেন্ট গ্রুপ তাদেরকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।

প্রায় ৪/৫ বছর আগে গুরুত্বসহকারে বিতর্কের বিষয়টা আমার মাথায় ভর করে বসে। তখন থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এক ধরনের তথ্যানুসন্ধানে নেমে পড়ি। এটা করতে গিয়ে  একটা অদ্ভুদ সত্য উপলব্ধি করি যেটা বেশ লজ্জার। তথ্য প্রমাণ সংগ্রহের জন্য আমি বিভিন্ন ব্যক্তিকে ফোনে এবং মেইলে যোগাযোগ করি। এদের বেশীরভাগ লোকই ইতিমধ্যে আদিবাসী বিতর্কের পক্ষে এবং বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ফেলেছেন। বিভিন্ন পত্রিকায় অপর্যাপ্ত তথ্যসহ লেখাসহ ব্লগ এবং ফেইসবুকেও ভারি ভারি প্রচারণা চালিয়েছেন। অথচ এদের অনেকের কাছেই পর্যাপ্ত তথ্যই নেই। অবশ্য কিছু শুভাকাঙ্খীর কাছ থেকে সত্যিকার অর্থে যথেষ্ট রেফারেন্স পেয়েছি। কৃতজ্ঞতা তাদের প্রতি।

এর বাইরে অস্ট্রেলিয়ার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগে সেখানকার লাইব্রেরিসহ বিশ্বের বিভিন্ন অনলাইন লাইব্রেরিতে বিনে পয়সায় ঢুঁ মারার সৌভাগ্য হয়েছিল। এমনকি অস্ট্রেলিয়াতে আদিবাসী নিয়ে বর্তমানে যারা কাজ করছেন তাদের সঙ্গে ব্যাক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে আদিবাসী ধারণার উপরে একটা ধারণা লাভের চেষ্টা করি। তার বাইরেও পরিচিত বিভিন্ন বন্ধু বান্ধবের সাথে আলাপচারিতায় বাংলাদেশে আদিবাসী প্রসঙ্গে তাদের নিজস্ব ধারণাগুলো জানার মাধ্যমে আমাদের দেশে আদিবাসী বিতর্কের বহুমাত্রিক রূপটা উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। এর বাইরে বিভিন্ন জনের ফেইসবুক, ব্লগে ঘুরে এসে সকলের প্রতিক্রিয়া দেখার চেষ্টা করেছি।

এভাবে একদম সাধারণের ব্যাক্তিগত মতামত থেকে শুরু করে একাডেমিক আলোচনা এবং বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন, আদিবাসী বিষয়টা নিয়ে ভাবছেন এমন বু্দ্ধিজীবী সবোর্পরি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর রচিত আদিবাসী বিষয়ক বিভিন্ন প্রকাশনাগুলোকে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। আমার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার সম্মিলিত তথ্যের ভিত্তিতে লেখাগুলো সাজান। আমি বলব না যে, এটা একটা তথাকথিত ‘নিরপেক্ষ’ লেখা। নিরপেক্ষ বলতে কোন শব্দ থাকলেও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কোন কোন পক্ষের স্বীকৃতি নাও থাকতে পারে। ‘নিরপেক্ষ’ শব্দটাও মাঝে মাঝে ‘আদিবাসী’ সংজ্ঞার চেয়েও বেশী অস্পষ্ট এবং ক্ষেত্র বিশেষে বিতর্কিত হয়ে পড়ে।

তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে লিখতে গেলে কখনো কখনো সেটা এক পক্ষের সম্পূর্ণ বিপরীতে যেতেই পারে। তার কাছ থেকে নিরপেক্ষ খেতাব আশা করা যায় না। যার যার স্বার্থ অনুযায়ী এক এক যুক্তি একেক জনের কাছে নিরপেক্ষ আবার কখনো পক্ষপাতদুষ্ট। আসলে আমরা মুখে ‘নিরপেক্ষ’ শব্দটা ব্যবহার করলেও চিন্তায় থাকে ‘ভারসাম্যের’ ধারনা। ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান সব সময় সত্যের পক্ষে যায় না। এভাবে নিরপেক্ষ শব্দটা মাঝে মধ্যেই আপেক্ষিক হয়ে পড়ে। তাই সচেতনভাবে আমার উদ্যোগকে ’নিরপেক্ষ’ না বলে আমি ‘যুক্তি নির্ভর’ বলতে বেশী স্বাচ্ছন্দবোধ করি। যুক্তিগুলো দাঁড় করানোর চেষ্টা হয়েছে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে। লেখাগুলো ছাপা হলে অনেকেই হয়তো অনেকভাবে তাদের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করবেন। আমি তাদের অনুরোধ জানাব, আমিব্যাক্তিগতভাবে ভারত নাকি পাকিস্তানের দালাল নাকি হোপলেস সে প্রসংগে না গিয়ে বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে লেখার সবল এবং দুর্বল দিকগুলো তুলে ধরবেন। সকলের সম্মিলিত উদ্যোগে বিতর্কের অবসান হোক। বিদ্যমান বিভিন্ন রাজনৈতিক বিতর্কের সাথে নতুন কোন সমাধানহীন বিতর্কের সূচনা করা আমাদের কাম্য নয়।

২।। বারডেন অব প্রুফ

(একটা সময়ে সর্বসম্মতভাবে পাহাড়ে বসবাসকারীদের বলা হতো, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, জুম্ম জনগণ, পাহাড়ী, উপজাতি, ট্রাইবাল পিপল, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী। হঠাৎ করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে এবং পাহাড়ী অল্প কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদীদের স্বাধীনতার আন্দোলনকে যৌক্তিকতা দেবার অভিপ্রায়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আদিবাসী বিতর্কটাকে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে।)

বারডেন অব প্রুফ হচ্ছে সিভিল ষ্ট্যান্ডার্ড প্রুফ। ক্রিমিনাল ষ্টান্ডার্ডে যেখানে ‘Beyond reasonable doubt’প্রমাণ হতে হবে আলোচিত ক্রিমিনাল অভিযোগ কিম্বা অমিমাংসিত কোন ঘটনা সত্য অথবা মিথ্যা। সংজ্ঞা অনুযায়ী,

A duty placed upon a civil or criminal defendant to prove or disprove a disputed fact.

বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের সেই আদিপর্ব থেকে বিভিন্নভাবে পাহাড়ীদের পরিচয় সম্পর্কিত বিতর্ক লেগেই আছে। এক সময় শেখ মুজিব বলেছিলেন, তোমরা সবাই বাঙালী হয়ে যাও। যেটা ছিল সম্পূর্ণ বর্ণবাদী বক্তব্য। পাহাড়ীরা এখন জোরেশোরে দাবী করছে যে তারা এই এলাকার আদিবাসী। সমতলের অধিবাসী এবং সরকার বলছে, না, তারা সেটা নয়। এই পটভূমিতে মূলতঃ সরকারের দায়িত্ব ‘বারডেন অব প্রুফের’ আওতায় তাদের অবস্থান প্রমাণ করার। এবং অবশ্যই দাবীদার পাহাড়ী গোষ্ঠীকেও তাদের দাবীর প্রতি যথেষ্ট প্রমাণ হাজির করতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, উভয় পক্ষের বিতর্কটা প্রায়শই যুক্তি কিম্বা তথ্য প্রমাণ নির্ভর না হয়ে হয়ে পড়ছে তর্ক নির্ভর কিংবা প্রচ্ছন্ন হুমকি নির্ভর। পাহাড়ীদের একটা অংশ থেমে থেমে পুণরায় যুদ্ধ শুরুর হুমকি দিচ্ছে। প্রকারান্তরে এর মাধ্যমে তারা পার্বত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনী স্থায়ীভাবে রাখার পক্ষেই গ্রাউন্ড তৈরী করে দিয়েছে। তাদের দাবীকে আইনগতভাবে প্রমাণের চেষ্টা না করে কিছু সন্ত্রাসী পাহাড়ীর যুদ্ধ শুরুর হুমকি প্রমাণ করে যে, ঐ অঞ্চলে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি কতোটা জরুরী। অতএব, বিষয়টা যতোক্ষণ ‘বারডেন অব প্রুফের’ মধ্যে থাকবে ততোক্ষণ সেটাকে কেন্দ্র করে অব্যাহত বিতর্ক লেগেই থাকবে। সৃষ্টি হবে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার। সেই সুযোগে দেশের ভিতর এবং বাহির থেকে নানা পক্ষ নানাভাবে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা চালাবে।

আদিবাসীর পক্ষে যারা আছেন, তাদের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক প্রণীত কিছু ধোঁয়াশাচ্ছন্ন, অপরিস্কার ধারণাপত্র এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর (বাঙ্গালী) কিছু ঐতিহাসিক আন্দোলন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তারা বলতে চাইছেন, যে জাতি ৫২, ৬৯ এবং ৭১ এর আন্দোলন করেছে, সেই জাতি কেন পাহাড়ীদের দাবী মেনে নেবে না? এটা কি মামার বাড়ীর আবদার? উল্লেখিত আন্দোলনগুলোর একটা যৌক্তিক প্রেক্ষাপট ছিল। যতোদিন পাহাড়ীরা ‘আদিবাসী’ হিসেবে প্রমাণিত না হবেন, ততোদিন এই সব আবেগের স্থানে সুঁড়সুড়ি দিয়ে সেটা মেনে নিতে প্ররোচিত করা ইমোশনাল ব্লাকমেইল ছাড়া আর কি কিছু নয়। দু’দিন পরে কেউ স্বাধীনতা চেয়ে বসলে একই যুক্তিতে সেটাও দিয়ে দিতে হবে। তাই নয় কি? প্রথমেই তাদের দাবীর প্রতি প্রশ্নহীন প্রমাণ হাজির করতে হবে। কেবল তারপরেই তাদের আদিবাসী স্বীকৃতির দাবী যৌক্তিকতা পাবে। তার বাইরে এই দাবীকে কেন্দ্র করে যে কোন অরাজকতা আদতে নৈরাজ্য সৃষ্টির মতো চরম আইন বিরোধী কাজ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত। সেই সাথে এই গুরুত্বপূর্ণ অমিমাংসিত ইস্যু মিমাংসা না হওয়া পর্যন্ত যে সমস্ত পত্রিকা এবং তথাকথিত সুশীল সমাজ তাদেরকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে তুলে ধরে রাষ্ট্রের অবস্থানের বাইরে গিয়ে দেশের মধ্যে নৈরাজ্য সৃষ্টির পরোক্ষ ইন্ধন দেবে, তাদেরকে রাষ্ট্র বিরোধী আইনের আওতায় এনে বিচার করা উচিত।

আদিবাসী বিতর্কে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো এবং তাদের চালিত বিশ্ব সংস্থাগুলোর তৎপরতা যতোটা না প্রশংসনীয় তারচেয়ে বেশী তাদের সেই সব দেশের সত্যিকার আদিবাসীদের উপরে তাদের চালিত ‘অপরাধের’ প্রায়শ্চিত্য করার চেষ্টা। পশ্চিমারা তাদের মজ্জাগত আগ্রাসী, ঔপনিবেশিক চরিত্র থেকে অতীতকাল থেকে সারা বিশ্বে যখনই যেখানে সুযোগ পেয়েছে হামলে পড়েছে। একটা সময়ে তারা অষ্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডায় বসবাসকারী আদিবাসীদের নির্মূলের উদ্দেশ্যে নির্বিচারে হত্যা করেছে। তাদের চালিত গণহত্যা এবং অত্যাচারের ফলে আদিবাসীদের সাথে তাদের যে মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা আজো যায়নি। এই অবিশ্বাসের ফলে সেখানকার আদিবাসীরা এখনো মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে ভালবাসে। বিলুপ্তপ্রায় কিংবা কোনঠাসা সেই জাতিগোষ্ঠীকে কিছুটা সুবিধা দিয়ে পশ্চিমা শক্তি তাদের পূর্ব পুরুষের করা অপরাধকে কিছুটা লঘু করতে চায়। তাদের নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কর্তৃক প্রণীত আদিবাসী সম্পর্কিত ধারণাপত্রে সেই দায় মোচনের ছাপ সুস্পষ্ট। তারা সেখানে কবে এসেছিল, কিভাবে সেখানকার জনগোষ্ঠীকে মেরেছিল সেগুলো খুব পুরাতন ঘটনা নয়। তাদের পরিস্থিতির সাথে আমাদের দেশের পরিস্থিতির বিস্তর ফারাকে আছে।

আদিবাসী ধারণার বিকাশ: ‘আদিবাসী’ প্রত্যয়টি মূলত: প্রথমদিকে পরিব্রাজক এবং একাডেমিক্যালি নৃবিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। একটা সময়ে ইবনে বতুতা কিংবা কলম্বাসের মতো পরিব্রাজকরা বিশ্ব চষে বেড়িয়েছিলেন। মর্গান, ম্যালিনোস্কিসহ আরো অনেক নৃবিজ্ঞানীদের আগ্রহ ছিল এই সব জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার উপরে। মর্গানের ‘আদিম সমাজ’ বইটি এখনো আদিবাসী কেন্দ্রিক ধারণায়নে একটা মূলধারার বই হিসেবে মেনে নিতে হবে। তবে আদিবাসী বিষয়ক অধিকার সম্বলিত আলোচনার বিকাশ এবং বিস্তৃতি লাভ করে মূলত: অষ্ট্রেলিয়া, আমেরিকা এবং কানাডার আদিবাসী আলোচনাকে ঘিরে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অপরিস্কার ধারণাপত্রের উপর ভিত্তি করে ইউরোপের কোন কোন বসতি স্থাপনকারীরাও এখন নিজেদের আদিবাসী দাবী করছেন। এমনকি ইরাকের কুর্দি কিংবা কোথাও কোথাও ধর্মীয় পরিচয়ের সংখ্যালঘুরাও ইচ্ছে করলে নিজেদের আদিবাসী দাবী করতে পারেন। এই সংস্থাগুলোর অপরিস্কার ব্যাখ্যার কারণে বর্তমানে ‘আদিবাসী’ এবং ‘এথনিক মাইনরিটির’ মধ্যকার পার্থক্যগুলো ক্রমশ: সংকুচিত হয়ে পড়েছে। যে কোন এথনিক মাইনরিটিও মন চাইলেই নিজেদের আদিবাসী হিসেবে দাবী করে বসতে পারে।

আরেকটি পক্ষ দাবী করছে, সারা দেশের বিবেচনায় জুম্মরা আদিবাসী না হলেও পাহাড়ী অঞ্চলে কারা আগে বসতি গড়ে? অর্থাৎ অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডায় আদিবাসীরা জাতীয় ভিত্তিতে। কিন্তু বাংলাদেশ ভারতে কিছুটা আঞ্চলিক ভিত্তিতে স্বীকৃতি দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাহলে ময়মনসিংহ কিংবা উত্তর বঙ্গের সমতলে বাস করা ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাগুলোর পরিচয় কি হবে? তারা কি দাবী পরিহার করবে? তাছাড়া আঞ্চলিক ভিত্তিতে আদিবাসী নির্ধারণ করা কি হাস্যকর নয়? একটা দেশের ক্ষুদ্র একটা অঞ্চলে বাইরে থেকে এসে নতুন বসতি গড়লে সেকি আদিতে বাস শুরু করেছে সেটা বলা যায়? তাহলে বরিশাল কিংবা অন্য অঞ্চলে নতুন চর জেগে উঠলে সেখানে কোন ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা বাস করা শুরু করলে আজ থেকে ৫০ কি ১০০ বছর পরে তারাও কি দাবী করবে যে, আমরা আদিবাসী? কিম্বা এমন কোন অকাট্য প্রমাণ কি আছে যে, পার্বত্য অঞ্চলে এখনকার আদিবাসী দাবীদাররাই প্রথম ঘাঁটি গাড়ে?

৩।। আদিবাসী সংজ্ঞায়নে অস্পষ্টতা রয়েছে

আদিবাসী বিষয়ে ধারণায়নের জন্য মূলত: তিনটি আন্তর্জাতিক দলিলকে সবাই প্রধান্য দেয়। আইএলও কনভেনশন ১০৭ (১৯৫৭), আইএলও কনভেনশন ১৬৯ (১৯৬৯) এবং ২০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ প্রণীত আদিবাসী সংক্রান্ত ঘোষণা। প্রথমটিতে পাকিস্তান সরকার স্বাক্ষর করলেও পরের দু’টোতে বাঙলাদেশ সরকার স্বাক্ষর করেনি।

এভাবে আদিবাসী নামে যে সংজ্ঞাগুলো দেয়া হচ্ছে সেগুলো মূলত: এক ধরনের ধারণাপত্র বা গাইড লাইন। এই সকল ধারণাপত্রে নানা বিষয়ে গভীর অস্পষ্টতা রয়েছে। কিম্বা কিছু ধারণাপত্র এবং সংজ্ঞায় এমনভাবে ambiguity সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে যে, সেটার ব্যাখ্যা নানাজনে নিজস্ব সুবিধা অনুযায়ী দিতে পারেন। জাতিসংঘ প্রণীত আদিবাসীদের অধিকার বিষয়ক ঘোষণাতেও আদিবাসী সম্পর্কিত সংজ্ঞা এড়িয়ে শুধুমাত্র তাদের অধিকারগুলো উল্লেখ করে দায় সেরেছে। এই অস্পষ্টতার সুযোগে নানা গোষ্ঠী যার যার স্বার্থ হাসিলের জন্য ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করছেন।

বাংলাদেশের বিভিন্ন লিগ্যাল এবং পলিসি ডকুমেন্টে পাহাড়ে বসবাসকারীদের এ পর্যন্ত বিভিন্ন নামে পরিচয় করানো হয়েছে। কখনো পাহাড়ী, কখনো Indigenous, Aboriginal, বা এথনিক মাইনোরিটি, উপজাতি ইত্যাদি। পাহাড়ীদের মধ্যে আন্দোলনরত দলটি ইংরেজীতে ’Indigenous’ এবং বাঙলায় ’আদিবাসী’ শব্দটিকেই অধিক পছন্দ করেন।

১৯৮৯ সালে ILO Convention No. ১৬৯ এর আর্টিকেল-১ এ কোন সংজ্ঞা দেয়া হয়নি। বরঞ্চ একটা স্টেটমেন্ট আকারে বলা হয়েছে,

1. a) tribal peoples in independent countries whose social, cultural and economic conditions distinguish them from other sections of the national community and whose status is regulated wholly or partially by their own customs or traditions or by special laws or regulations;

 

1. b) peoples in independent countries who are regarded as indigenous on account of their descent from the populations which inhabited the country, or a geographical region to which the country belongs, at the time of conquest or colonization or the establishment of present state boundaries and who irrespective of their legal status, retain some or all of their own social, economic, cultural and political institutions.”

এই সংজ্ঞার আলোকে indigenous কথাটি বাঙলায় আদিবাসী হয় না। কারণ এখানে যাদের indigenous বলা হয়েছে তাদের আগমন কোন অঞ্চলে আদিতে অর্থাৎ সবার আগে হতে হবে সেটার উল্লেখ নাই। এখানে অন্যান্য সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়কে টেনে এনে এক ধরনের সংজ্ঞায়নের চেষ্টা করা হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নানা রকম ধারণাপত্র দেখে মনে হয়, তারা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে যেভাবেই হোক তাদের স্থানীয় প্রতিনিধি কর্তৃক মনোনীতদের indigenous স্বীকৃতি দিতে বদ্ধপরিকর এবং সেই অনুযায়ী তাদের প্রণীত ধারণাপত্রে ব্যাখ্যা জুড়ে দেয়াই তাদের লক্ষ্য। আগমনের ‘সময়কাল’ দিয়ে সেটা সম্ভব না হলে অন্য কোনভাবে হলেও সেটা করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন পকেটে নতুন গোলযোগ সৃষ্টি করে সেখানে তাদের খবরদারী করে অর্গানাইজেশনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এটা একটা সনাতনী কৌশল।

ILOর আরেকটি Concept পেপারে বলা হয়,

“Indigenous communities, peoples and nations are those which, having a historical continuity with pre-invasion and pre-colonial societies that developed on their territories, consider themselves distinct from other sectors of the societies now prevailing in those territories, or parts of them. They form at present non-dominant sectors of society and are determined to preserve, develop and transmit to future generations their ancestral territories, and their ethnic identity, as the basis of their continued existence as peoples, in accordance with their own cultural, social institutions and legal systems.”

জাতিসংঘ ১৯৯৩ সালকে আদিবাসী বর্ষ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে আদিবাসীর সংজ্ঞা দিয়েছে এভাবে:

Indigenous people are such population groups as we are, who from old age times have inhabited the lands when we live, who are aware of having a characters of our own, with social tradition and means of expression that are linked to the country inhabited from our ancestress, with a language or our own and having certain essential and unique characteristics which confer upon us the strong conviction of belonging to a people, who have an identity in ourselves and should be thus regarded by others (1993).

উপরের ধারণাপত্রগুলোতে যেভাবে আদিবাসীদের দেখা হয়েছে তার শর্তই হলো, যাদের প্রাক-আগ্রাসন ও প্রাক-সাম্রাজ্যবাদী অধিকারের আগে থেকেই কোন অঞ্চলে অবস্থানের একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা আছে। এরা dominant সমাজের সদস্য নয়। সেই হিসেবে বাঙলাদেশে ধর্মীয় দিক দিয়ে খ্রিস্টান-হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম হচ্ছে dominant সমাজ। তাহলে কোন প্রকৃতি-উপাসক কখনো ধর্মান্তরিত হয়ে সমাজচ্যুত হয়ে ধর্মীয় দিক দিয়ে কোন dominant সমাজের সদস্য হলে তার পরিচয় কি হবে? কিম্বা হিন্দু সমাজে যারা নিচু জাত হিসেবে বিবেচিত তাদের ধর্মীয় পরিচয় হিন্দু হলেও আদতে সমাজে তারা Non-dominant হিসেবেই বিবেচিত। তাদেরও নিজস্ব কিছু ইনফরমাল সিষ্টেম আছে। তাহলে তারাও কি আদিবাসী? তাছাড়া যারা আদিতে এ অঞ্চলে আগমন করে নাই, আদিবাসী স্বিকৃতি পাবার মাধ্যমে জমির উপরসহ অন্যান্য নানা ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধা আরোপকে ঐ সমাজের অন্যান্যরা কোন যুক্তিতে মেনে নেবে? উপরোক্ত সংজ্ঞার আওতায় কাউকে আদিবাসী স্বিকৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রণীত অধিকার দেবার চেষ্টা হলে নির্ঘাৎ বৃহৎ সমাজের সাথে এদের এক ধরনের সংঘাতের সৃষ্টি হবে। এর পরিণতিতে তাদের অস্তিত্ব হুমকীর মুখে পড়তে পারে। এভাবে জাতিগত বিদ্বেস সৃষ্টি করে কোন পক্ষ লাভবান হবে?

কাউকে আদিবাসী স্বীকৃতি দেবার জন্য ‘আগমনের সময়কাল’কে অবজ্ঞা করতে গিয়ে সংজ্ঞায়নে আরো জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। যারা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নামে এই ধরনের গাইড লাইনগুলো দিয়ে থাকেন, তাদের মূলতঃ এ অঞ্চলের সামাজিক/পারিবারিক সম্পর্ক (Kinship System) সম্পর্কে কোন ধারণা নেই বলে আমার মনে হয়। তাছাড়া সময়কালকে অগ্রাহ্য করে অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের আলোকে কেউ Indigenous হিসেবে দাবী করতে চাইলে এই শব্দের যথার্থ বাঙলা শব্দ কখনো আদিবাসী হতে পারে না। বরং অন্য কিছু হবে। আদিবাসী হিসেবে যারা স্বিকৃতি চান কিম্বা তাদের দাবীর প্রতি সহানুভূতিশীল মহল সংজ্ঞায় বসবাসের ‘সময়কালকে’ অগ্রাহ্য করলেও নাম নির্বাচনে ‘আদিবাসী’ শব্দটা খুব পছন্দ করেন।

অন্যদিকে, Oxford Dictionaryর সংজ্ঞা অনুযায়ী, আদিবাসী হলেন তারা:

‘(formal) belonging to a particular place rather than coming to it from somewhere else’.

এর সমার্থক শব্দ হিসেবে Native উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই সংজ্ঞামতে, আদিবাসী তারাই যারা ঐ অঞ্চলে প্রথম থেকে বসবাস করে আসছে। এই সংজ্ঞার আলোকে আদিবাসী হবার দাবীদার অনেকেরই দাবী খারিজ হয়ে যাবে।

Chris Cunningham আদিবাসী সংক্রান্ত এই জটিলতাটা বুঝতে পেরে স্বিকার করেছেন, অষ্ট্রেলিয়াতে এ্যাবঅরিজিনাল কিংবা আমেরিকা কানাডার ফার্ষ্ট নেশন কথার মাধ্যমে সেখানকার আদিবাসীদের সহজেই বুঝান যায়। কিন্তু বাদবাদী বিশ্বের বেলায় সেটা বুঝান বেশ কষ্টকর। Chris তার লেখায় Te Ahukaramu Charles Royal এর সংজ্ঞা ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন। তিনি্ আদিবাসী সংজ্ঞার এই নতুন ডাইমেনশনকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গী’ (world views) নামে। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী:

‘indigenous is used for those cultures whose world views place special significance on the idea of the unification of the humans with the natural world’.

এখানে তিন ধরনের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গীর বিবরণ আছে। ওয়েষ্টার্ন, ইষ্টার্ন এবং ইন্ডিজেনাস। ইন্ডিজেনাস বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গীর বিবরন দেয়া এভাবে,

‘which sees people as integral to the world, with humans having a seamless relationship with nature which includes seas, land, rivers, mountains, flora, and fauna’.

এখানে আসলে তেমন নতুন কিছু নেই। আগের দেয়া সংজ্ঞা এবং ধারণাপত্রগুলোই ভিন্ন সুরে গাওয়া হয়েছে।

তার সংজ্ঞা মেনে নিলে এই প্রকৃতির একদল মানুষ বাঙলাদেশের সমতলে গিয়ে কয়েক বছর আগে বসতি গড়লে তারাও কি ঐ অঞ্চলে আদিবাসী হিসেবে বিবেচিত হবেন? বিষয়টা কেবল অযৌক্তিক নয়, হাস্যকরও বটে! Royalএর সংজ্ঞা অনুযায়ী আজকালকার অনেক পরিবেশ আন্দোলনকারীও আদিবাসী দলে পড়ে যাবে। তারাও মানুষকে প্রকৃতির ইন্ট্রিগেরাল অংশ মনে করে।

বাঙলাদেশের কিছু বুদ্ধিজীবী যেভাবে আদিবাসী শব্দটিকে সংজ্ঞায়িত করতে চান, তার সাথে Te Ahukaramu Charles Royal ধারণার মিল আছে। অর্থাৎ

”আধুনিক জনগোষ্ঠীর জৈব, সামাজিক প্রভাবজাত নয়, এমন জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী বলা হয়” (মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী, প্রথম আলো)।

সেই হিসেবে তিনি প্রস্তাব দেন, সংসদে আদিবাসী প্রস্তাবটি পাশ হলে বরেন্দ্র সমতল অঞ্চলে বসবাসকারী, এমনকি বাগেরহাটে বসবাসকারী রাজবংশীদেরকেও আদিবাসী হিসেবে মর্যাদা দেয়া যাবে। উনিও এখানে সুকৌশলে আদিবাসী হবার আরেকটি আলোচিত বিষয়, ‘সময়কালকে’ ইগনোর করেছেন। এভাবে জোর করে কাউকে আদিবাসী বানাতে চাইলে যে সমস্যাগুলোর সৃষ্টি হবে, ওনারা সেগুলো বিবেচনাতেই আনেননি। উনি নিজেই উল্লেখ করেছেন যে,

“আদিবাসী জনগণের রয়েছে সে সব ভূমি, ভৌগলিক এলাকা, সম্পদ সমূহের উপর অধিকার যা তারা ঐতিহ্যগতভাবে অধিকার, দখল বা অন্যভাবে ব্যবহার অথবা অর্জন করে এসেছে।”(অনুচ্ছেদ ২৬, দফা ১।

২০০৬ সালের ২৯শে জুন, আদিবাসী জনগণের অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের ঘোষনাপত্র)।

আমাদের দেশের Kingship System বা আত্নীয়তার সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে যে উত্তারাধিকার সম্পর্কগুলো নির্ধারিত হয়, সেখানেও তো আপনি সম্পদের “ঐতিহ্যগতভাবে অধিকার, দখল বা অন্যভাবে ব্যবহার অথবা অর্জন” প্রথা খুঁজে পাবেন। এমনকি এখনো এই প্রথা অনেক গ্রামাঞ্চলে চালু আছে। ঐতিহ্যগতভাবে বংশ পরম্পরায় যে জমিগুলো কোন বংশের অধীনে ছিল, জমি কেনাবেঁচার সময় সাধারণতঃ সেই জমি নিজ বংশের কারো কাছে বিক্রী করার অলিখিত নিয়ম আছে। এটা বাধ্য করতে বংশের পক্ষ থেকে চাপও থাকে। এভাবে অন্যায্য এবং অযৌক্তিকভাবে আদিবাসী হিসেবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী স্বীকৃতি পেলে কেবল পাহাড়ী অঞ্চলেই নয়, বলতে গেলে পাহাড়ী জেলাগুলো বাদেও বাগেরহাট, নেত্রকোনা, সিলেট, রাজশাহী, মৌলভী বাজারসহ দেশের আরো কিছু অঞ্চলে ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দেবে। সৃষ্টি হবে জাতিগত টেনশন।

তথ্য সূত্রঃ

  • ১) UN ডকুমেন্ট
  • ২) ILO ডকুমেন্ট
  • ৩) IFAD ডকুমেন্ট
  • ৪) Indigenous by definition, experience, or world view; Links between people, their land, and culture need to be acknowledged, Chris Cunningham, director of health research
  • ৫) Country Technical Note on Indigenous People’s Issues (DRAFT), by Raja Devasish Roy, March 2010, IFAD.

 

৪।। আদিবাসীর সংজ্ঞার আলোকে বাঙলাদেশে আদিবাসী কারা?

বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল বলে পাহাড়ীরা কিম্বা সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী স্ব স্ব অঞ্চলের আদি বাসিন্দা নন। এটা মোটামুটিভাবে প্রমাণিত যে, এ অঞ্চলের আদি বাসিন্দা হচ্ছে বাঙালী, কিন্তু বাঙালীরা আদিবাসী (Indigenous People অর্থে) নয়। কারণ আদিবাসী সংজ্ঞায় আরো কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়। যেমন: বিভিন্ন কারণে তাদের অস্তিত্ব হুমকীর সম্মুখীন এবং অন্যান্য। অতএব, সংজ্ঞা এবং বাস্তবতার আলোকে এই উপসংহারে আসা যায়, বাঙলাদেশের আদিবাসিন্দা বাঙালী। তবে বাঙলাদেশে কোন আদিবাসী নেই এবং কখনো ছিল না। এ প্রসঙ্গে ভূ রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর আব্দুর রবের সাক্ষাৎকার থেকে কয়েকটি প্যারা তুলে ধরবো:

১) খোদ চাকমা পণ্ডিত অমেরেন্দ্র লাল খিসা অরিজিনস অব চাকমা পিপলস অব হিলট্রেক্ট চিটাগংএ লিখেছেন,

‘তারা এসেছেন মংখেমারের আখড়া থেকে পরবর্তীতে আরাকান এলাকায় এবং মগ কর্তৃক তাড়িত হয়ে  বান্দরবানে অনুপ্রবেশ করেন। আজ থেকে আড়াইশ তিনশ; বছর পূর্বে তারা ছড়িয়ে পড়ে উত্তর দিকে রাঙামাটি এলাকায়।’

এর প্রমাণ ১৯৬৬ বাংলাদেশ জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি প্রকাশিত দি অরিয়েন্টাল জিওগ্রাফার জার্নাল।

২) পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান লোকসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বাঙালি এবং বাকি অর্ধেক বিভিন্ন মঙ্গোলীয় গোষ্ঠীভুক্ত উপজাতীয় শ্রেণীভুক্ত। একথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য আদিকাল থেকে এ অঞ্চলে উপজাতি জনগোষ্ঠীর বাইরের ভূমিপুত্র বাঙালিরা বসবাস করে আসছে। তবে জনবসতি কম হওয়ায় বিভিন্ন ঘটনার বা পরিস্থিতির কারণে আশপাশের দেশ থেকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন এসে বসতি স্থাপন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকি জাতি বহির্ভূত অন্য সকল উপজাতীয় গোষ্ঠীই এখানে তুলনামূলকভাবে নতুন বসতি স্থাপনকারী। এখানকার আদিম জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ম্রো, খ্যাং, পাংখো এবং কুকিরা মূল ‘কুকি’ উপজাতির ধারাভুক্ত। ধারণা করা হয়, এরা প্রায় ২শ’ থেকে ৫শ’ বছর আগে এখানে স্থানান্তরিত হয়ে আগমন করে। চাকমারা আজ থেকে মাত্র দেড়শ’ থেকে ৩শ’ বছর পূর্বে মোগল শাসনামলের শেষ থেকে ব্রিটিশ শাসনামলের প্রথম দিকে মায়ানমার আরকান অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে (Lewin 1869)। প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এবং ব্রিটিশ প্রশাসক টি. এইচ. লেউইন-এর মতে,

“A greater portion of the hill tribes at present living in the Chittagong Hill Tracts undoubtedly come about two generations ago from Aracan. This is asserted both by their own traditions and by records in Chittagong Collectorate”. (Lewin, 1869, p. 28)।

পার্বত্য অঞ্চলের মারমা বা মগ জনগোষ্ঠী ১৭৮৪ সনে এ অঞ্চলে দলে দলে অনুপ্রবেশ করে এবং আধিপত্য বিস্তার করে (Shelley, 1992 and Lewin, 1869)। এরা ধর্মে বৌদ্ধ মতাবলম্বী। এরা তিনটি ধারায় বিভক্ত। যেমন: জুমিয়া, রোয়াং ও রাজবংশী মারমা।

চাইলে এ রকম আরো অনেক উদাহরণ টানা যেত, যেগুলো প্রমাণ করে আদিবাসীর দাবীদাররা এ অঞ্চলে কখনো আদিতে আগমন করেননি। তারা যেভাবে আদিবাসী দাবী করছে, একই যুক্তিতে মায়ানমারের রোহিঙ্গারাও আদিবাসী দাবী করতে পারে। অথচ তারা এখনো সেই অর্থে মায়ানমারের নাগরিকত্ত্বও পায়নি।

মোঃ আদনান আরিফ সালিম তার লেখায় বিভিন্ন তথ্য প্রমাণ ঘেঁটে বলেছেন, বস্তুত পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত কোন জনগোষ্ঠীই স্মরণাতীত কাল থেকে সেখানে ছিল না। এরা ভারতের ত্রিপুরা, আরাকানসহ বিভিন্ন পাহাড়ী অঞ্চল থেকে এখানে অভিবাসন করেছে। এরা খুব বেশি হলে দুই পুরুষ পূর্বে আরাকানের পাহাড়ী অঞ্চল থেকে অভিবাসিত হয়ে বাঙলাদেশের পার্বত্য জেলাগুলো বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থান নিয়েছে।

প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এবং ব্রিটিশ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম জেলা প্রশাসক Thomas Herbart Lewin এর মতে,

 A greater portion of the hill tribes at present living in the Chittagong Hill Tract undoubtedly came about two generations ago from Arakan. This is asserted both by their own traditions and by records in Chittagong Collectorate. It was in some measure due to the exodus of our hill tribes from Aracan that the Burmese war of 1824 took place … hired in a great measure upon refugee from hill tribes who, fleeing from Aracan into territory, were purshed and demanded at our hands by the Burmese. (Lewin 1869, pp 28-29).  সূত্রঃ ইনকিলাব।

অন্যদিকে সুপ্রিয় তালুকদার মায়ানমারের চম্পক নগর ঘুরে এসে লিখেছেন, চাকমাদের আগমন মায়ানমারের চম্পক নগর থেকেই।

আদিবাসী দাবীদারদের পক্ষের গোষ্ঠী শুরুতে তাদের আদি বাসিন্দা দাবী করে আদিবাসীর স্বীকৃতি চাইতো। ক্রমশ সত্যটা দিবালোকের মতো পরিস্কার হবার পরে তারা এখন সংজ্ঞার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যর আলোকে আদিবাসী স্বিকৃতি চায়। এই অংশের ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়, পশ্চাৎপদ, আধুনিক সমাজের থেকে পিছিয়ে। রাজা দেবাশীষ রায় একটা জায়গায় লিখেছিলেন, তারা ‘উপজাতি’ এবং ‘ট্রাইব’ শব্দ দু’টো বাদ দিতে চান। তারা মনে করেন, শব্দ দু’টো সাথে পশ্চাদপদতা (backwardness’) এবং আদিম যুগের (primitiveness) একটা গন্ধ মিশে আছে। ’আদিবাসী’ শব্দটার সাথেও কি পশ্চাদপদতা কিম্বা আদিম যুগের গন্ধ মিশে নেই? তারপরেও আদিবাসী শব্দটা তাদের পছন্দের। কারণ এই দাবী আদায়ের সাথে সাথে তারা কিছু বাড়তি অধিকার ভোগ করতে পারবে। সেই সাথে তারা যতোটা আন্তর্জাতিকভাবে বাড়তি নজর পাবে যার সুযোগ ব্যবহার করে পার্বত্য অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন করা সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। একটা সময়ে স্বাধীন জুম্মল্যান্ডের দাবীকেও তারা এক ধাপ এগিয়ে নিতে পারবে। মূলতঃ তিনটা একই ধরনের শব্দের মধ্যে দু’টো নিয়ে আপত্তির কারণ এবং তৃতীয়টি গ্রহণের পক্ষে মনোভাব দেখে সহজেই আঁচ করা যায় তাদের মূল উদ্দেশ্য কি!

অষ্ট্রেলিয়ায় যাদের Indigenous হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, তারা সংজ্ঞার সবগুলো বৈশিষ্ট্যই ধারণ করে। তারা এই ভূমির আদি বাসিন্দা। ইউরোপ থেকে মানুষ এসে তাদের হত্যা, দমন এবং নিপীড়ন করে ভূমির উপর কর্তৃত্ব নেয়। তারা এখনো মূলধারার চেয়ে অনেক অনেক পিছিয়ে। অতএব, Indigenous People হিসেবে স্বিকৃতি দিয়ে মূলতঃ ভূমির উপরে তাদের বাড়তি অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এবং তারা যেহেতু মূলধারার সাথে তুলনামূলকভাবে উন্নয়নে অনেক পিছিয়ে, এই স্বীকৃতির মাধ্যমে তাদেরকে সামনে এগিয়ে আনার একটা চেষ্টা হয়েছে। বাঙলাদেশের ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী মূলধারা সাথে তুলনামূলকভাবে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে সেটা সত্য বটে। উন্নয়নের এই গ্যাপটা কমানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোটা সিস্টেম আছে। তাহলে বাড়তি করে আদিবাসী স্বীকৃতির জন্য এতো চেষ্টা কেন? পাহাড়ীদের তুলনামূলক পিছিয়ে থাকার বা অনুন্নয়নের কারণই বা কি? তারা কি সংখ্যাগরিষ্ঠদের দ্বারা নিপীড়ন কিম্বা শোষণের শিকার? নাকি তাদের ’ভিন্ন সমাজ’ বা ‘ভিন্ন সংস্কৃতির’ সাথে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার প্রবণতাই দায়ী? প্রথমটা সত্য হলে রাষ্ট্রকে শোষণ পরিহার করে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য সমঅধিকারের পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য যে ধরণের সামাজিক আন্দোলন করা দরকার সেটা করা উচিত। আমাদের সংবিধানেই দেশের সকল নাগরিকের জন্য সমঅধিকারের বিষয়টা স্পষ্ট উল্লেখ আছে। যদিও বাস্তবে সেটার চর্চা নেই। এই সমস্যার প্রকৃতি ভিন্ন। আর মূলধারার সাথে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার প্রবণতা দায়ী হলে বুঝতে হবে ঐ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতির মধ্যেই এই বিচ্ছিন্ন থাকার উপাদান রয়েছে। তাহলে সেটা নিয়ে কিভাবে কাজ করা যায় তাই ভাবতে হবে।

এতো সব অস্পষ্টতা স্বত্ত্বেও যারা পাহাড়ে বসবাসকারীদের আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে চান তাদেরকে অবশ্যই ’বারডেন অব প্রুফের’ আওতায় তাদের দাবীর ন্যয্যতা পরিস্কার করে তুলে ধরতে হবে। সেই সাথে সরকারকেও তার অবস্থান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরতে হবে। দেশীয় কিছু সংস্থার চাপে কোন আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক প্রণীত কোন ধারণাপত্রের মাধ্যমে চাপিয়ে দেয়া কোন শর্ত কোন স্বাধীন রাষ্ট্র মেনে নিতে পারে না।

তথ্যসূত্র

  • ১) সুপ্রিয় তালুকদারঃ মায়ানমারে চম্পকনগরের পথে।
  • ২) IFAD ডকুমেন্ট
  • ৩) বাংলাদেশে ওরা আদিবাসী নয় : ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যাপক মাহফুজ আহমেদ | প্রকাশের সময় : ২০১৫-০৮-০৮, দৈনিক ইনকিলাব
  • ৪) Country Technical Note on Indigenous People’s Issues (DRAFT), by Raja Devasish Roy, March 2010, IFAD.

 

 

৫।। আদিবাসী বিতর্কে নাগরিক সমাজের অবস্থান

বেশ আগে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আরটিভি সুন্দর একটা টকশোর আয়োজন করেছিল। গোলাম মোর্তজার সঞ্চালনায় অতিথি হিসেবে ছিলেন জেনারেল (অব.) ইব্রাহীম এবং চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়।আদিবাসী স্বীকৃতি পেলে এর পরিণাম কি কি হতে পারে ঐ অনুষ্ঠানে জনাব ইব্রাহীম সেগুলো খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ২০০৭ সালে প্রণীত জাতিসংঘের ডিক্লারেশন ৩, ৪ এবং ১৮ ধারা মোতাবেক, স্বীকৃতি পাওয়া আদিবাসীদের চাহিদা অনুযায়ী তাদেরকে স্বায়ত্বশাসন দিতে রাষ্ট্র বাধ্য থাকবে। পাহাড়ীদের অনুমতি ছাড়া কেউ সেখানে বাস করতে পারবে না এবং তাদের অনুমতি ও সম্মতি ছাড়া ঐ এলাকায় রাষ্ট্র কোন রকমের সামরিক তৎপরতা চালাতে পারবে না।

জনাব ইব্রাহীমের দেয়া তথ্য খণ্ডাতে পারেননি রাজা দেবাশীষ রায়। এমনিতে পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টি করে রেখেছে একটা গোষ্ঠী। বাংলাদেশ থেকে পৃথক হওয়া তাদের লক্ষ্য। এই পরিস্থিতিতে আদিবাসী স্বীকৃতি নিয়ে স্বায়ত্বশাসনের দাবী জোরালো হলে সরকার আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে পড়বে। দেবাশীষ রায় কৌশলে জনাব ইব্রাহীমের স্বায়ত্বশাসনের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে এটাকে ইউনিয়ন পরিষদের স্বশাসনের সাথে গুলিয়ে বিষয়টাকে হালকা করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

জনাব ইব্রাহীম আরো বলেন, রাজা দেবাশীষ রায় একটা আদিবাসী ফোরামের সদস্য এবং এই ফোরাম জাতিসংঘের মাধ্যমে শর্ত দিয়েছে, আগামীতে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী বিশ্বের কোন দেশে শান্তি মিশনে গেলে পাহাড়ীদের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে যে, সেনাবাহিনী সেখানে কোন মানবাধিকার লংঘন করে নাই। ’মানবাধিকার লংঘন’ ক্ষেত্র বিশেষে একটা আপেক্ষিক শব্দ। পাহাড়ী সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর অভিযানকে সংজ্ঞায়িত করা হলে সেটাও হবে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভাষায় মানবাধিকার লংঘন। এই দাবী প্রতিষ্ঠা করতে পারলে পাহাড়ের সহিংসতাকে থামানো যাবে না। আমরা জানি, পাহাড়ীদের একটা অংশ রাঙ্গামাটিকে রাজধানী করে জুম্মল্যান্ড করার স্বপ্ন দেখছেন।

ড. জাফর ইকবাল ২০১১ সালের আগষ্ট মাসে ’প্রথম আলোতে’ ‘কারও মনে দুখ দিয়ো না…’ নামে একটা কলাম লেখেন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন, যার মধ্যে একটা ছিল ‘আদিবাসী’ ইস্যু। স্বভাবসুলভ ভঙ্গীমায় যুক্তি কম, আবেগ নির্ভর এবং অনেকগুলো ভুল তথ্যে ভরা ছিল লেখাটি। তিনি এই কলামে লিখেছেন, “মাত্র অল্প কয়দিন আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা হয়েছে—প্রথমবারের মতো আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, প্রতিবন্ধী কোটার সঙ্গে সঙ্গে আদিবাসী কোটায় ছাত্রছাত্রী ভর্তি করেছি।” এরপরেই তিনি লেখেন, ”দেশে যদি আদিবাসী নেই, তাহলে আদিবাসী কোটায় আমরা কাদের ভর্তি করেছি?” জাফর সাহেবে যাকে ‘আদিবাসী কোটা’ বলেছেন, আদতে ওটা হবে ‘উপজাতি কোটা’। ওনার মতো একজন শিক্ষাবিদ কি ভুল করে লিখলেন নাকি না জেনে লিখলেন? Indigenous কথার অর্থ খুঁজতে ডিকশনারী ঘাঁটতে গিয়ে ওনার পছন্দ মতো অর্থ খুঁজে না পেয়ে মর্মাহত হয়েছেন।

জনাব প্রশান্ত ত্রিপুরা, ১৯৯৩ সালে আন্তর্জাতিক আদিবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে “আন্তর্জাতিক আদিবাসী বর্ষ এবং বাংলাদেশের আদিবাসী জনগণ” শীর্ষক একটা নিবন্ধ লেখেন। নিবন্ধের শুরুতে অস্পষ্ট বিবরণের মাধ্যমে একটা যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি লিখেছেন, “কিছু শিল্পোন্নত দেশ Indigenous জনগোষ্ঠীর ধারণা এবং তাদের বিশেষ অধিকারের প্রশ্নকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিলেও অন্য অনেক দেশে অনুরূপ কোন উদ্যোগ নেই।” তিনি পরিস্কার করে বলেননি যে, ‘কিছু শিল্পোন্নত দেশ’ অর্থাৎ অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং আমেরিকার মতো আরো কিছু দেশে যেখানে এই স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে সেখানে Indigenous-রা হলো Native, অর্থাৎ তারা ঐ ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা। ইউরোপিয়ানরা সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য নতুন নতুন ভূমি দখল করে ’বহিরাগত’ হিসেবে এসব অঞ্চলে গেঁড়ে বসে। এই সত্যটুকু পরিস্কারভাবে না লিখলে পাঠকের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। Indigenous হিসেবে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি না পাওয়ায় তিনি  আক্ষেপ করে লিখেছেন, ”কিন্তু একজন গারো, সাঁওতাল বা ম্রোর কাছে এই সরকারী ব্যাখ্যা তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করারই নামান্তর।” আদিবাসী স্বীকৃতির অভাবে কিভাবে তাদের অস্তিত্ব সংকটে পড়ল তার ব্যাখ্যা নেই। শেখ মুজিবের ’বাঙালী’ করার ঘোষণা বাস্তবে তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হলেও রাজনৈতিক কারণে হয়তো তিনি এই সঠিক স্থানে আঘাত করতে সাহস পাননি।

জনাব ত্রিপুরার লেখায় আদিবাসী কথাটার অর্থ কি এবং বাংলাদেশে উপজাতি হিসেবে পরিচিত গোষ্ঠীগুলোকে আদৌ আদিবাসী বলা যায় কিনা প্রশ্নগুলো পরিস্কারভাবে করলেও উত্তরগুলো পরিস্কার নয়। সময়ের ’আপেক্ষিকতাকে’ ঢাল হিসেবে নিয়ে উনি এ অঞ্চলে পাহাড়ী নাকি বাঙালীরা আগে বসতি গড়ে সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে এড়িয়ে গেছেন। তিনি লিখেছেন, “অর্থাৎ স্থান ও কালের সীমানা কিভাবে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে, তার উপরই নির্ভর করছে কোন প্রেক্ষিতে কাদের আমরা Indigenous বলতে পারি। আমরা যদি সুদূর প্রাগৈতিহাসিক অতীতে চলে যাই তাহলে Indigenous কথাটি অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।”

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আদিবাসী বিতর্ক বিষয়ক স্থান তো নির্দিষ্ট। এবং ‘সময়’ সম্পর্কিত ধারণাও পরিস্কার। অর্থাৎ নির্দিষ্ট ভূখন্ডে আদিবাসীর দাবীদার যারা তারা কি ওখানে সংখ্যাগুরুর আগে এসেছিল নাকি পরে! বাঙালীদের আগমন আগে ঘটে থাকলে তারা ঐ অঞ্চলে পরে আসা অন্য জনগোষ্ঠীর ভূমির উপর অতিরিক্ত দাবীকে মেনে নেবে কেন? এভাবে বিভিন্নজনে আদিবাসী স্বীকৃতিকে পাকা করার জন্য বারবার অষ্ট্রেলিয়া, আমেরিকা এবং কানাডাকে টেনে আনলেও সেখানে স্বীকৃতি পাওয়া Indigenous-দের সাথে আমাদের এখানকার দাবীদারদের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যকে তুলে ধরছেন না। সেটা পরিস্কার করলে তাদের দাবীটাই অসাড় হয়ে যায়। মানুষকে এতো সহজে তাদের দাবীর দিকে টেনে আনা যাবে না। মূলতঃ বাঙলাদেশে যারা আদিবাসী স্বীকৃতির জন্য লড়ছেন, তাদের কাছে ‘আবেগ’ এবং ‘পরদেশের’ উদাহরণ ছাড়া শক্ত কোন যুক্তি নেই।

একটা পর্যায়ে তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে জাতিসংঘের আদিবাসী সংক্রান্ত দিক নির্দেশনা বা ধারণার একটা নিজস্ব সম্প্রসারিত ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন যেখানে শব্দটির মূল দ্যোতনা ‘আদি’কেই অস্বীকার করা হয়েছে। ”কোন দেশে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাদের পূর্ব পুরুষেরা প্রথমে সেখানে বসতী গেড়েছিল, এ প্রশ্ন গৌণ, মূলত: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তথাকথিত সভ্যতার বিকাশের শিকার tribal, primitive প্রভৃতি ঔপনেবিশিক আখ্যায় ভূষিত জনগোষ্ঠীদের সবাই Indigenous অভিধার বৈধ দাবীদার”।

সভ্যতার একই আক্রমণের শিকারতো আজ বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীও! তাহলে তারাও কি সেই একই দাবী করে বসবে? কিম্বা মায়ানমারের রোহিঙ্গারা? বরঞ্চ তার এই সম্প্রসারিত ব্যাখ্যার সূত্র ধরে এই জনগোষ্ঠীকে ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠী’ বলাই শ্রেয়। ‘বাংলাদেশী’ পরিচয় নির্ধারণেও তার কিছুটা আপত্তি আছে। তার ভাষায় এটা ‘আদিবাসীদের’ কথা ভেবে করা হয়নি। যে দেশটার নাম বাংলাদেশ, তার নাগরিকরা বাঙলাদেশী হবে না তো কি হবে? ভারতীয় নাগরিকদের ভারতীয়, পাকিস্তানীদের পাকিস্তানী বলা গেলে বাংলাদেশের নাগরিকরা তো বাংলাদেশীই হবে! পরোক্ষভাবে উনি কি দেশের নামটা পরিবর্তনের কথা বলছেন?  এথনিক পরিচয়ে জাতীয়তা এবং রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদ বা ন্যাশনালিটির পার্থক্য নিশ্চয়ই উনি অনেকের চেয়ে ভাল বুঝেন। এভাবে ‘বাংলাদেশী’ পরিচয় নিয়ে সংশয়ে থাকার অর্থ প্রচ্ছন্নভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদকেই ইঙ্গিত দেয়।

কিছু কিছু বাঙালীর এবং আরো বৃহত্তর পরিচয়ে বাংলাদেশীদের (কিছু কিছু) ’আবেগ’ সহজিয়া বা স্বাভাবিক নয়। এটা একধরনের ইমোশনাল ব্লাকমেইল।’ এদের আবেগ কোন ঘটনার কারণে স্বাভাবিকভাবে আসে না। কোন বিষয়কে নিজের অনুকূলে আনার জন্য এই বিশেষ ধরনের ’আবেগ’ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সৃষ্টি করা হয়। কেবলমাত্র মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আবেগ সৃষ্টি করে শাহবাগে লাখ লাখ মানুষ জড়ো করা গোষ্ঠী পরিশেষে কোটি কোটি টাকার মালিক হবার গল্প বাতাসে ওড়ে। একইভাবে আবেগের কৌশলী ব্যবহারের মাধ্যমে একটা গোষ্ঠী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দিতে চায়।

শ্রদ্ধেয় আতাউস সামাদ তার এক লেখায় বিবিসির সাংবাদিক থাকাকালীন সময়ের কিছু অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। সেই আশির দশকে যখন শান্তিবাহিনীর বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন তুঙ্গে, সে সময় থাইল্যান্ড বা জাপানে বৌদ্ধ সম্মেলন হলে এই সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সমর্থনে উদ্বেগ প্রকাশ করে যে বিবৃতি দেয়া হতো, মাঝে মাঝেই সেখানে লেখা থাকত ‘ওই এলাকায় বৌদ্ধদের উপরে অত্যাচার চলছে’। এভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সমর্থনে একটা জনমত সৃষ্টিতে দেশের বাইরের একটা গোষ্ঠী বেশ সোচ্চার ছিল। এখন এর পরিধি অনেক বেড়েছে। দেশের ভিতরে তথাকথিত কিছু মানবাধিকার সংগঠন এবং কিছু ব্যাক্তি ‘আদিবাসী’ বিতর্ককে উস্কে দিচ্ছেন।

জনাব আতাউস সামাদ সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, ঐ এলাকার এতো হই হট্টগোলের প্রধান উদ্দেশ্য সম্ভবত সেখানে বসতী স্থাপনকারী বাঙালীদের ফিরে যেতে বাধ্য করা। তিনি দেখিয়েছেন ২০১০ সালের ফ্রেব্রুয়ারীতে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘটা গোলযোগকে কেন্দ্র করে যেটা হয়ে গেল সেখানে দেখা গেছে প্রশাসন শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করে। অসহায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালী নারী পুরুষ শিশু রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে দাড়িঁয়ে থাকলেও তাদেরকে কোন ত্রাণ দেয়া হয়নি। বাঘাইহাটে বাঙালীদের যে ঘরবাড়ী পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল সেগুলো তখনো পর্যন্ত পাহাড়ীদের দখলে ছিল(বর্তমানের খবর জানা নেই আমার)। একই সূত্র থেকে জানা যায়, এক পাহাড়ীর কাছ থেকে বাঙালী জমি কিনলে তা তার দখলে না দিয়ে কোন এক এনজিওকে দিয়ে দেয়া হয়। শুরু হয় উত্তেজনা।

পাহাড়ের উত্তেজনার পিছনে এক তরফাভাবে বসতি স্থাপনকারী বাঙালী- বাংলাদেশীদের দোষ চাপানো সব সময় ঠিক নয়। এটাকে ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান বলে না। কিছু কিছু পত্রিকা তাদের বিভিন্ন লেখায় সরকারী অবস্থান থেকে সরে গিয়ে ‘আদিবাসী’ শব্দটা ব্যবহার করে ধৃষ্টতার পরিচয় দিচ্ছে। এ রকমের একটা স্পর্শকাতর বিষয়ে রাষ্ট্রিয় সিদ্ধান্তের বাইরে তাদের নিজস্ব অবস্থান রাষ্ট্রিয় অবমাননা কিনা ভেবে দেখা জরুরী।

অনেকের মতো্ আমিও মনে করি, আদিবাসী স্বীকৃতির সাথে সাথেই সরকারের উপর আন্তর্জাতিকভাবে কিছু দায়িত্ব এবং বাধ্যবাধকতা চলে আসবে। প্রথমত: ভূমির উপরে অধিকারের বলে সেখানকার বাঙালী খেদাও আন্দোলন শুরু হবে। সেনা ক্যাম্প সরিয়ে নেয়ার দাবী উঠবে। বিভিন্ন দাবী দাওয়ার নামে পাহাড়ীদের একটা অংশ আন্দোলনের নামে যে বিচ্ছিন্নতার আন্দোলন শুরু করছে সেটা জোরদার করতে পারবে। আদিবাসী স্বীকৃতির সাথে সাথেই তাদের উপরে জাতিসংঘের একটা সরাসরি পর্যবেক্ষণ থাকবে এবং তারা তদারকি করার সুযোগ পাবে। এ সব ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মতো পশ্চিমা লেজুড়বৃত্তিক সংগঠনগুলো যেটা করে সেটা হলো: শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর জন্য এক নিয়ম আর আমাদের মতো দুর্বলদের জন্য আরেক নিয়ম। বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমন করতে সামরিক পদক্ষেপ নিলে তখন তারা সরাসরি জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মদদে ‘আদিবাসী’ বাঁচাও সুর তুলে সরকারের সাথে বিচ্ছিন্নতার দেনদরবার করার সুযোগ পাবে। দেশ রক্ষা করার জন্য জীবনবাজী রেখে পাহাড়ী অঞ্চলে মোতায়েনকৃত সৈন্যরা পরিচিত হবেন আগ্রাসী বাহিনী হিসেবে। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা হবেন মুক্তিযোদ্ধা।

তথ্যসূত্র:

 

শেষ।। আদিবাসী বিতর্কের শুরুটা যেভাবে

পার্বত্য সমস্যার এক সুদীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক পটভূমি রয়েছে। আগের একটা পর্বে উল্লেখ করেছিলাম, আদিবাসী দাবীদার ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর আগমন ঘটে মাত্র কয়েক পুরুষ আগে ভারত এবং মিয়ানমার থেকে। আমাদের পার্বত্য অঞ্চলে তারও আগে থেকে বাঙালীরা বসবাস করে আসছিলেন। যদিও সংখ্যার দিক দিয়ে কম ছিল। ওখানকার সমস্যার উৎপত্তির মনস্তাত্ত্বিক কারণ অনুসন্ধান করলে এই ‘অভিবাসনের’ ভূমিকা আছে। এখনো এদের শেঁকড় রয়েছে ঐ দুই দেশের মাটিতে। পূর্ব পুরুষদের স্মৃতি, তাদের ঐতিহ্য, অনেকটাই ওখানে। শেঁকড়ের টানের প্রথম প্রতিফলন ঘটে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময়। এরা চেয়েছিল, যেখান থেকে এসেছে, সেই দেশের মানচিত্রে থাকতে। শুরু থেকেই তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্ন থাকার এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সে কারণে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তানের সব জায়গাতে পাকিস্তানের পতাকা উড়লেও ১৫ আগষ্ট বান্দরবনে মায়ানমারের (তৎকালীন বার্মা) পতাকা এবং রাঙ্গামাটিতে ভারতীয় পতাকা ওড়ে। ১৭ আগস্ট দেশ বিভাগের মানচিত্র পরিস্কার হলেও প্রায় এক সপ্তাহ জুড়ে ওখানে তারা যথাক্রমে দুই দেশের পতাকা টাঙিয়ে রাখে। ২১ আগস্ট পাকিস্তানী সৈন্যরা বাধ্য করে মায়ানমার এবং ভারতীয় পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানী পতাকা তুলতে।

ভারত এবং মিয়ানমারমুখী মনোভাবের প্রভাবে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে পাক শাসকদের সাথে তাদের সম্পর্কের কিছুটা টানাপোড়েন চলে। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের সংকট থেকে তৎকালীন পাকিস্তানী শাসকরা সিদ্ধান্ত নেয়, সমতল থেকে বাঙালী নিয়ে ওখানে পুনর্বাসন করা। তাদের ধারণা ছিল, পাহাড়ীরা ঐ এলাকায় সংখ্যাগুরু থাকলে যে কোন সময় দেশের অখণ্ডতার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখা দেবে। এছাড়াও পাহাড়ী সমস্যাকে আরো তীব্র করতে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের একটা ভূমিকা আছে। আমেরিকার অর্থায়নে রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলায় অবস্থিত কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে বাঁধ নির্মাণের কাজ ১৯৫২ সালে শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৫৮ সালে। যান্ত্রিক ত্রুটির ফলে বাঁধ ভেঙ্গে পড়লে পুণরায় কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৬২ সালে। এই বাঁধ নির্মাণের সময় প্রায় এক লাখ স্থানীয়দের বসতভিটা ছাড়তে হয়। প্রায় ৪০ ভাগ আবাদী জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। কাপ্তাই বাঁধের প্রভাবে পানিতে ডুবে যায় চাকমা রাজার প্রাসাদ, যার সাথে তাদের আবেগ জড়িত। সম্ভবত ১৯৯৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে একবার রাঙামাটি গিয়েছিলাম। তখনো চাকমা রাজার বাড়ীর মাথাটা কোন মতে পানির উপর মাথা উঁচু করে টিকে ছিল। পরে শুনেছি (নিশ্চিত নই), চিরতরে পানির নিচে বিলীন হয়ে যায়।

এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে দেশটা স্বাধীন হোল। সেই যুদ্ধে পাহাড়ীরাও অংশ নেয়। বাঙলাদেশে বাঙালী ছাড়াও আরো অন্ততঃ ৫৪টা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বার অস্তিত্ব আছে। পাহাড়ী তিনটি জেলা বাদে অন্যান্য ৩০টিরও বেশী জেলায় তাদের বাস।

অক্টোরব, ১৯৭২। স্বাধীন বাঙলাদেশের যে সংবিধান রচনা করা হোল সেখানে বাঙালী বাদে বাকী সবাইকে অস্বীকার করা হয়। সংবিধানের ৩ নং ধারায় বলা হলো:

”বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে, বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবে।”

এর প্রতিবাদে ওয়াক আউট করেছিলেন পাহাড়ী অঞ্চলের একমাত্র প্রতিনিধি মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা। এরপর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে রাঙ্গামাটি সফরে গেলে ১৫ ফেব্রুয়ারী পার্বত্য চট্টগ্রাম গণপরিষদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা নিচের ৪টি দাবী পেশ করেন,

  • ১) পাহাড়ের স্বায়ত্বশাসন
  • ২) পার্বত্য এলাকার জন্য ১৯০০ সালের ম্যানুয়েল অব্যাহত রাখা
  • ৩) তিন জাতির চীফের দপ্তর বিলুপ্তি না করা এবং
  • ৪) ঐ এলাকায় বাঙালী অনুপ্রবেশ রোধ করা।

সব শুনে মুজিব বললেন,

‘লারমা তুমি যদি বেশি বাড়াবাড়ি করো তাহলে এক লাখ, দুই লাখ, তিন লাখ, দশ লাখ বাঙালি পার্বত্য চট্টগ্রামে ঢুকিয়ে দেব। পার্বত্য চট্টগ্রামে আমি তোমাদের সংখ্যালঘু করে ছাড়ব।’  (সূত্রঃ পার্বত্য শান্তিচুক্তিঃ বর্তমান প্রেক্ষিত, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।)

১৯৭৩ সালে শেখ মুজিব পাহাড়ীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “তোরা সব বাঙালী হয়ে যা”। এটা ছিল  আক্ষরিক অর্থে এক বর্ণবাদী আহবান। বাঙলাদেশ স্বাধীন হবার পরে এভাবেই পাহাড়ে গোলযোগের সূত্রপাত হয়।  ফলশ্রুতিতে, ১৯৭৩ সালে শান্তিবাহিনী গঠনের মাধ্যমে শুরু হোল সশস্ত্র  আন্দোলন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে ১৯৭৮ সালে The Proclamations (Amendment) order,1978-এ Citizenship এর মাধ্যমে সংবিধানের বর্ণবাদী অংশটুকু পরিবর্তন করেন, “The citizens of Bangladesh shall be known as Bangladeshis.” কিন্তু বিচ্ছিন্নতার যে বীজ ইতিমধ্যে রোপিত হয়ে গেছে, সংবিধানের এই পরিবর্তনে কোন লাভ হয়নি। অন্ততঃ এই সংশোধনীর মাধ্যমে পবিত্র সংবিধান বর্ণবাদী কলঙ্ক থেকে রক্ষা পায়।

জিয়া ক্ষমতায় এসে ১৯৭৯ সালে ’পপুলেশন ট্রান্সফার’ এর আওতায় প্রায় ৪ লাখ সমতল অঞ্চলের নদী ভাঙ্গনের বাঙালীদের পুনর্বাসনের জন্য পাহাড়ী অঞ্চলে বসতি স্থাপন করায়। এতে পাহাড়ীরা ক্ষুব্ধ হয় এবং আরো জোরোশোরে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। তখন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত থেমে থেমে বহু ’বাঙালী/বাংলাদেশীকে’ হত্যা তারা করেছে। আমাদের দেশের অধিকাংশ পত্রিকা এবং কিছু সুশীল সমাজ পাহাড়ীদের বিচ্ছিন্নতাবাদকে উস্কে দিতে গিয়ে অন্য পক্ষের সন্ত্রাসকে প্রায়শই গোপন রাখে। এরফলে সেখানকার বাঙালী বসতি স্থাপনকারীরা ক্ষুব্ধ এবং তারাও মাঝে মাঝে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে পাহাড়ের বুকে অশান্তি সৃষ্টি করে। এই সকল পত্রিকা এবং বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী পাহাড়ী-বাঙালীদের মধ্যকার সম্পর্কোন্নয়নে কাজ না করে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টিতে সদা তৎপর। শাহরিয়ার কবিরতো তার এক লেখায় আকারে ইঙ্গিতে বুঝাতে চেয়েছেন, ১৯৪৭ এর ভারতভাগের সময় ওদের ভারত এবং মায়ানমারের অংশ হবার কথা ছিল। এভাবে তিনি পরোক্ষভাবে পাহাড়ীদের স্বাধীনতার ন্যায্যতাকে তুলে ধরেন।

পাহাড়ে ’বাঙালী বাংলাদেশী’ বসতি স্থাপনকে কেন্দ্র করে যে সশস্ত্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তার প্রেক্ষিতে জিয়াউর রহমান সেখানে সেনাবাহিনী পাঠান। এরশাদ ক্ষমতা দখল করার পর সামরিক শক্তি আরো বৃদ্ধি করেন। পুনর্বাসিত ’বাঙালী বাংলাদেশীদের’ ‘বহিরাগত’ হিসেবে অনেক বাঙালী বুদ্ধিজীবী অভিহিত করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে দু’টো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনার দাবী রাখলেও সেটা কখনো হয়নি।

প্রথমতঃ আপনি খুলনার মানুষ হয়ে বরিশালে বাড়ী বানালে কি বহিরাগত হবেন? দেশের সীমানার মধ্যে যে কোন স্থানে বৈধভাবে বসবাসের অধিকার কি দেশের নাগরিকদের নেই? ঢাকায় বসবাসরত পাহাড়ী অঞ্চলের মানুষ কি ’বহিরাগত’? আসলে এভাবে কোন কোন বুদ্ধিজীবী প্রকারান্তরে ‘বহিরাগত’ শব্দটি উল্লেখের মাধ্যমে পার্বত্য তিনটি জেলাকে বাংলাদেশের বাইরে অর্থাৎ তাদের স্বাধীনতার পক্ষেই বলছেন।

দ্বিতীয়তঃ সেই আঙ্গিকে বহিরাগত হলে তো পাহাড়ীরাই বহিরাগত। কারণ তাদের আগমন ঘটে ভারত কিম্বা মায়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। ঐ এলাকায় ’বাঙালী বাংলাদেশীদের’ আগমন পাহাড়ীদের অনেক আগে ঘটেছিল।

তারপরেও ’স্বাভাবিক মাইগ্রেশন’ এবং ’উদ্দেশ্যমূলক মাইগ্রেশনের’ মধ্যে একটা তফাৎ আছে। ১৯৪৭ থেকে নতুন সৃষ্ট দেশকে মেনে না নেবার মনোবৃত্তি থেকে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের যে অবনতি ঘটে এবং অন্যান্য কারণ মিলিয়ে পাহাড়ীরা যে সশস্ত্র আন্দোলনে নামে, সেটাকে দমনের কৌশল হিসেবে পরিকল্পিতভাবে উক্ত এলাকায় পাহাড়ীদের সংখ্যালঘু করার জন্যই মূলতঃ সমতলের বাঙালীদের পুনর্বাসন করানো হয়েছিল। কাজেই, পুরো সত্যকে এড়িয়ে কেবলমাত্র অর্ধসত্যকে ভিত্তি হিসেবে ধরে বাঙালী পুনর্বাসনের সমালোচনা করা উচিত নয়। রাষ্ট্রিয় নিরাপত্তা এবং নিরাপদ জীবনের জন্য অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকেও অনেক সময় মেনে নিতে হয়।

যেমন; ১৯৪৭ এর ভারত বিভাগের সময় ঘটা হিন্দু-মুসলমানের এপার ওপার মাইগ্রেশন কি ইচ্ছাকৃত ছিল? নাকি পরিস্থিতি তাদের বাধ্য করেছিল? দু’টোর প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও এক স্থানে মিল আছে। মাঝে মাঝে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যায়। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন হলে অনেক সময় রাষ্ট্রপক্ষ এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।

প্রসঙ্গত আলোচনার দাবী রাখে, শেখ মুজিব মানবেন্দ্র লারমাকে ১৯৭২ সালে পার্বত্য অঞ্চলে ’বাঙালী ঢুকিয়ে’ দেবার যে হুমকি দেন, পরবর্তীতে জিয়া সেটা বাস্তবায়ন করেন। আদিবাসী দাবীর প্রতি সক্রিয় অংশ জিয়াকে এজন্য মুন্ডুপাত করলেও এই কনসেপ্টের ধারক তৎকালীন রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে টুঁ শব্দ করেন না। আতাউস সামাদ ঠিকই বলেছেন, সব কিছুতে ”জিয়াই নন্দঘোষ”!

ওদের কাছে ক্ষমা চাইবে কে?

অষ্ট্রেলিয়ার ষ্টোলেন জেনারেশন সম্পর্কে জানতে নিচের উদ্ধৃত অংশগুলো সাহায্য করবে।

“The Stolen Generations (also known as Stolen Children) were the children of Australian Aboriginal and Torres Strait Islander descent who were removed from their families by the Australian Federal and State government agencies and church missions under acts of their respective parliaments. The removals occurred in the period between approximately 1905 and 1969, although in some places children were still being taken until the 1970s.

 ‘between one in three and one in ten Indigenous children were forcibly removed from their families and communities in the period from approximately 1910 until 1970….In that time not one Indigenous family has escaped the effects of forcible removal’.

 Northern Territory Protector of Natives, Dr. Cecil Cook ১০৩০ সালে “half-caste” শিশুদের সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তাদেরকে ’সাদাকরণের’ পূর্ণ ব্যবস্থার জন্য পরামর্শ দিয়ে লিখেন,

”Generally by the fifth and invariably by the sixth generation, all native characteristics of the Australian Aborigine are eradicated. The problem of our half-castes will quickly be eliminated by the complete disappearance of the black race, and the swift submergence of their progeny in the white”.

Chief Protector of Aborigines in Western Australia, A. O. Neville ১০৩০ সালে এক নিবন্ধে লিখেন,

” One factor, however, seems clear; atavism   is not in evidence so far as colour is concerned. Eliminate in future the full-blood and the white and one common blend will remain. Eliminate the full blood and permit the white admixture and eventually the race will become white.”

“In 1992 Prime Minister Keating acknowledged that ‘we took the children from their mothers’ at a speech in Redfern. In 1994 legal action was commenced in the Supreme Court of New South Wales. These children who were removed came to be known as the Stolen Generations.”

এরপর অষ্ট্রেলিয়ান প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী Kevin Rudd ২০০৮ সালের ১৩ ফ্রেব্রুয়ারী অষ্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের উপরে করা তার পূর্বসূরীদের সব রকমের অপকর্মের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চান।

” We apologise especially for the removal of Aboriginal and Torres Strait Islander children from their families, their communities and their country.”

আজ যারা বাঙলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বাকে আদিবাসী স্বীকৃতির পক্ষে কথা বলছেন, তাদের পূর্বের ইতিহাস এমনই নিষ্ঠুরতায় ভরা। তারপরেও বহু বছর পরে হলেও তারা কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু আমরা?

বাংলাদেশে যে গ্রুপটি পাহাড়ীদের আদিবাসী দাবীর প্রতি সংবেদনশীল, তারা আজো তৎকালীন রাষ্ট্রপতির বর্ণবাদী মন্তব্যের জোরালো কোন সমালোচনা করেননি। এথনিক পরিচয়ে নির্ধারিত বাঙালী জাতীয়তাবাদকে ন্যাশনালিটির সাথে গুলিয়ে ফেলতে গিয়ে তারা এভাবেই দেশে বসবাসরত অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বাকে সব সময় অস্বীকার করে চলেছেন।

আমি ব্যাক্তিগতভাবে মনে করি, তিনটি ইস্যুতে সরকারের পক্ষ থেকে পাহাড়ীদের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। প্রথমতঃ উন্নয়নের ’মানবিক’ দিক বিবেচনায় না এনে এবং পুনর্বাসনের কথা চিন্তা না করে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করা। দ্বিতীয়তঃ সংবিধানে জাতীয়তা ‘বাঙালী’ নির্ধারন করে বাকীদের অপমান করা এবং তৃতীয়তঃ শেখ মুজিব কর্তৃক পাহাড়ীদের ’বাঙালী’ হতে বলা।

তথ্যসূত্র:

  1. ১) সাম্প্রতিক রাজনীতির ময়না তদন্ত এবং একটি তথাকথিত উপসংহার, সত্যজিত দত্ত পুরো কায়স্থ, উন্মোচন, ১৯ আগষ্ট ২০১২।
  2. ২) ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং আদিবাসী বিতর্ক, ড. মোঃ আজিজুল হক, ২৬শে জুন ২০১১, ২৪ বাঙলা নিউজ।
  3. ৩) বিডিআরের বাংলায় নাম এবং ‘আদিবাসী’ বিতর্ক, আতাউস সামাদ, সমকাল ৪/৩/১০ ইং।
  4. ৪) পাহাড়েও জিয়াই নন্দ ঘোষ!  আতাউস সামাদ, আমার দেশ, ১/৩/১০ ইং।
  5. ৫) আদিবাসী বিতর্ক ও একটি প্রত্যাশা, এস হক, নয়াদিগন্ত,
  6. ৬) পার্বত্য শান্তিচুক্তিঃ বর্তমান প্রেক্ষিত, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া
  7. http://kathakata.com/archives/1199
  8. ৭) http://www.australia.gov.au/about-australia/our-country/our-people/apology-to-  australias-indigenous-peoples
  9. ৮) http://www.australia.gov.au/about-australia/australian-story/sorry-day-stolen-generations
  10. ৯) https://en.wikipedia.org/wiki/Stolen_Generations
  11. ১০) বাংলাদেশে আদিবাসীদের প্রান্তিকতা; সাদেকা হালিম।
  12. http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/30177
  13. ১১) পার্বত্য চট্টগ্রামে বহুমাত্রিক সমস্যার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পটভূমি। শাহরিয়ার কবীর।
  14. http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/208.

আদিবাসী বিতর্কের শুরুটা যেভাবে

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক- ৬

মাহবুব মিঠু

মাহবুব মিঠু:

পার্বত্য সমস্যার এক সুদীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক পটভূমি রয়েছে। আগের একটা পর্বে উল্লেখ করেছিলাম, আদিবাসী দাবীদার ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর আগমন ঘটে মাত্র কয়েক পুরুষ আগে ভারত এবং মিয়ানমার থেকে। আমাদের পার্বত্য অঞ্চলে তারও আগে থেকে বাঙালীরা বসবাস করে আসছিলেন। যদিও সংখ্যার দিক দিয়ে কম ছিল। ওখানকার সমস্যার উৎপত্তির মনস্তাত্ত্বিক কারণ অনুসন্ধান করলে এই ‘অভিবাসনের’ ভূমিকা আছে। এখনো এদের শেঁকড় রয়েছে ঐ দুই দেশের মাটিতে। পূর্ব পুরুষদের স্মৃতি, তাদের ঐতিহ্য, অনেকটাই ওখানে। শেঁকড়ের টানের প্রথম প্রতিফলন ঘটে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময়। এরা চেয়েছিল, যেখান থেকে এসেছে, সেই দেশের মানচিত্রে থাকতে। শুরু থেকেই তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্ন থাকার এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সে কারণে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তানের সব জায়গাতে পাকিস্তানের পতাকা উড়লেও ১৫ আগষ্ট বান্দরবনে মায়ানমারের (তৎকালীন বার্মা) পতাকা এবং রাঙ্গামাটিতে ভারতীয় পতাকা ওড়ে। ১৭ আগস্ট দেশ বিভাগের মানচিত্র পরিস্কার হলেও প্রায় এক সপ্তাহ জুড়ে ওখানে তারা যথাক্রমে দুই দেশের পতাকা টাঙিয়ে রাখে। ২১ আগস্ট পাকিস্তানী সৈন্যরা বাধ্য করে মায়ানমার এবং ভারতীয় পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানী পতাকা তুলতে।

ভারত এবং মিয়ানমারমুখী মনোভাবের প্রভাবে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে পাক শাসকদের সাথে তাদের সম্পর্কের কিছুটা টানাপোড়েন চলে। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের সংকট থেকে তৎকালীন পাকিস্তানী শাসকরা সিদ্ধান্ত নেয়, সমতল থেকে বাঙালী নিয়ে ওখানে পুনর্বাসন করা। তাদের ধারণা ছিল, পাহাড়ীরা ঐ এলাকায় সংখ্যাগুরু থাকলে যে কোন সময় দেশের অখণ্ডতার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখা দেবে। এছাড়াও পাহাড়ী সমস্যাকে আরো তীব্র করতে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের একটা ভূমিকা আছে। আমেরিকার অর্থায়নে রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলায় অবস্থিত কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে বাঁধ নির্মাণের কাজ ১৯৫২ সালে শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৫৮ সালে। যান্ত্রিক ত্রুটির ফলে বাঁধ ভেঙ্গে পড়লে পুণরায় কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৬২ সালে। এই বাঁধ নির্মাণের সময় প্রায় এক লাখ স্থানীয়দের বসতভিটা ছাড়তে হয়। প্রায় ৪০ ভাগ আবাদী জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। কাপ্তাই বাঁধের প্রভাবে পানিতে ডুবে যায় চাকমা রাজার প্রাসাদ, যার সাথে তাদের আবেগ জড়িত। সম্ভবত ১৯৯৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে একবার রাঙামাটি গিয়েছিলাম। তখনো চাকমা রাজার বাড়ীর মাথাটা কোন মতে পানির উপর মাথা উঁচু করে টিকে ছিল। পরে শুনেছি (নিশ্চিত নই), চিরতরে পানির নিচে বিলীন হয়ে যায়।

এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে দেশটা স্বাধীন হোল। সেই যুদ্ধে পাহাড়ীরাও অংশ নেয়। বাঙলাদেশে বাঙালী ছাড়াও আরো অন্ততঃ ৫৪টা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বার অস্তিত্ব আছে। পাহাড়ী তিনটি জেলা বাদে অন্যান্য ৩০টিরও বেশী জেলায় তাদের বাস।

অক্টোরব, ১৯৭২। স্বাধীন বাঙলাদেশের যে সংবিধান রচনা করা হোল সেখানে বাঙালী বাদে বাকী সবাইকে অস্বীকার করা হয়। সংবিধানের ৩ নং ধারায় বলা হলো: ”বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে, বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবে।”

এর প্রতিবাদে ওয়াক আউট করেছিলেন পাহাড়ী অঞ্চলের একমাত্র প্রতিনিধি মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা। এরপর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে রাঙ্গামাটি সফরে গেলে ১৫ ফেব্রুয়ারী পার্বত্য চট্টগ্রাম গণপরিষদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা নিচের ৪টি দাবী পেশ করেন,

  • ১) পাহাড়ের স্বায়ত্বশাসন
  • ২) পার্বত্য এলাকার জন্য ১৯০০ সালের ম্যানুয়েল অব্যাহত রাখা
  • ৩) তিন জাতির চীফের দপ্তর বিলুপ্তি না করা এবং
  • ৪) ঐ এলাকায় বাঙালী অনুপ্রবেশ রোধ করা।

সব শুনে মুজিব বললেন, ‘লারমা তুমি যদি বেশি বাড়াবাড়ি করো তাহলে এক লাখ, দুই লাখ, তিন লাখ, দশ লাখ বাঙালি পার্বত্য চট্টগ্রামে ঢুকিয়ে দেব। পার্বত্য চট্টগ্রামে আমি তোমাদের সংখ্যালঘু করে ছাড়ব।’  (সূত্রঃ পার্বত্য শান্তিচুক্তিঃ বর্তমান প্রেক্ষিত, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।)

১৯৭৩ সালে শেখ মুজিব পাহাড়ীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “তোরা সব বাঙালী হয়ে যা”। এটা ছিল  আক্ষরিক অর্থে এক বর্ণবাদী আহবান। বাঙলাদেশ স্বাধীন হবার পরে এভাবেই পাহাড়ে গোলযোগের সূত্রপাত হয়।  ফলশ্রুতিতে, ১৯৭৩ সালে শান্তিবাহিনী গঠনের মাধ্যমে শুরু হোল সশস্ত্র  আন্দোলন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে ১৯৭৮ সালে The Proclamations (Amendment) order,1978-এ Citizenship এর মাধ্যমে সংবিধানের বর্ণবাদী অংশটুকু পরিবর্তন করেন, “The citizens of Bangladesh shall be known as Bangladeshis.” কিন্তু বিচ্ছিন্নতার যে বীজ ইতিমধ্যে রোপিত হয়ে গেছে, সংবিধানের এই পরিবর্তনে কোন লাভ হয়নি। অন্ততঃ এই সংশোধনীর মাধ্যমে পবিত্র সংবিধান বর্ণবাদী কলঙ্ক থেকে রক্ষা পায়।

জিয়া ক্ষমতায় এসে ১৯৭৯ সালে ’পপুলেশন ট্রান্সফার’ এর আওতায় প্রায় ৪ লাখ সমতল অঞ্চলের নদী ভাঙ্গনের বাঙালীদের পুনর্বাসনের জন্য পাহাড়ী অঞ্চলে বসতি স্থাপন করায়। এতে পাহাড়ীরা ক্ষুব্ধ হয় এবং আরো জোরোশোরে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। তখন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত থেমে থেমে বহু ’বাঙালী/বাংলাদেশীকে’ হত্যা তারা করেছে। আমাদের দেশের অধিকাংশ পত্রিকা এবং কিছু সুশীল সমাজ পাহাড়ীদের বিচ্ছিন্নতাবাদকে উস্কে দিতে গিয়ে অন্য পক্ষের সন্ত্রাসকে প্রায়শই গোপন রাখে। এরফলে সেখানকার বাঙালী বসতি স্থাপনকারীরা ক্ষুব্ধ এবং তারাও মাঝে মাঝে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে পাহাড়ের বুকে অশান্তি সৃষ্টি করে। এই সকল পত্রিকা এবং বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী পাহাড়ী-বাঙালীদের মধ্যকার সম্পর্কোন্নয়নে কাজ না করে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টিতে সদা তৎপর। শাহরিয়ার কবিরতো তার এক লেখায় আকারে ইঙ্গিতে বুঝাতে চেয়েছেন, ১৯৪৭ এর ভারতভাগের সময় ওদের ভারত এবং মায়ানমারের অংশ হবার কথা ছিল। এভাবে তিনি পরোক্ষভাবে পাহাড়ীদের স্বাধীনতার ন্যায্যতাকে তুলে ধরেন।

পাহাড়ে ’বাঙালী বাংলাদেশী’ বসতি স্থাপনকে কেন্দ্র করে যে সশস্ত্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তার প্রেক্ষিতে জিয়াউর রহমান সেখানে সেনাবাহিনী পাঠান। এরশাদ ক্ষমতা দখল করার পর সামরিক শক্তি আরো বৃদ্ধি করেন। পুনর্বাসিত ’বাঙালী বাংলাদেশীদের’ ‘বহিরাগত’ হিসেবে অনেক বাঙালী বুদ্ধিজীবী অভিহিত করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে দু’টো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনার দাবী রাখলেও সেটা কখনো হয়নি।

প্রথমতঃ আপনি খুলনার মানুষ হয়ে বরিশালে বাড়ী বানালে কি বহিরাগত হবেন? দেশের সীমানার মধ্যে যে কোন স্থানে বৈধভাবে বসবাসের অধিকার কি দেশের নাগরিকদের নেই? ঢাকায় বসবাসরত পাহাড়ী অঞ্চলের মানুষ কি ’বহিরাগত’? আসলে এভাবে কোন কোন বুদ্ধিজীবী প্রকারান্তরে ‘বহিরাগত’ শব্দটি উল্লেখের মাধ্যমে পার্বত্য তিনটি জেলাকে বাংলাদেশের বাইরে অর্থাৎ তাদের স্বাধীনতার পক্ষেই বলছেন।

দ্বিতীয়তঃ সেই আঙ্গিকে বহিরাগত হলে তো পাহাড়ীরাই বহিরাগত। কারণ তাদের আগমন ঘটে ভারত কিম্বা মায়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। ঐ এলাকায় ’বাঙালী বাংলাদেশীদের’ আগমন পাহাড়ীদের অনেক আগে ঘটেছিল।

তারপরেও ’স্বাভাবিক মাইগ্রেশন’ এবং ’উদ্দেশ্যমূলক মাইগ্রেশনের’ মধ্যে একটা তফাৎ আছে। ১৯৪৭ থেকে নতুন সৃষ্ট দেশকে মেনে না নেবার মনোবৃত্তি থেকে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের যে অবনতি ঘটে এবং অন্যান্য কারণ মিলিয়ে পাহাড়ীরা যে সশস্ত্র আন্দোলনে নামে, সেটাকে দমনের কৌশল হিসেবে পরিকল্পিতভাবে উক্ত এলাকায় পাহাড়ীদের সংখ্যালঘু করার জন্যই মূলতঃ সমতলের বাঙালীদের পুনর্বাসন করানো হয়েছিল। কাজেই, পুরো সত্যকে এড়িয়ে কেবলমাত্র অর্ধসত্যকে ভিত্তি হিসেবে ধরে বাঙালী পুনর্বাসনের সমালোচনা করা উচিত নয়। রাষ্ট্রিয় নিরাপত্তা এবং নিরাপদ জীবনের জন্য অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকেও অনেক সময় মেনে নিতে হয়।

যেমন; ১৯৪৭ এর ভারত বিভাগের সময় ঘটা হিন্দু-মুসলমানের এপার ওপার মাইগ্রেশন কি ইচ্ছাকৃত ছিল? নাকি পরিস্থিতি তাদের বাধ্য করেছিল? দু’টোর প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও এক স্থানে মিল আছে। মাঝে মাঝে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যায়। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন হলে অনেক সময় রাষ্ট্রপক্ষ এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।

প্রসঙ্গত আলোচনার দাবী রাখে, শেখ মুজিব মানবেন্দ্র লারমাকে ১৯৭২ সালে পার্বত্য অঞ্চলে ’বাঙালী ঢুকিয়ে’ দেবার যে হুমকি দেন, পরবর্তীতে জিয়া সেটা বাস্তবায়ন করেন। আদিবাসী দাবীর প্রতি সক্রিয় অংশ জিয়াকে এজন্য মুন্ডুপাত করলেও এই কনসেপ্টের ধারক তৎকালীন রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে টুঁ শব্দ করেন না। আতাউস সামাদ ঠিকই বলেছেন, সব কিছুতে ”জিয়াই নন্দঘোষ”!

ওদের কাছে ক্ষমা চাইবে কে?

অষ্ট্রেলিয়ার ষ্টোলেন জেনারেশন সম্পর্কে জানতে নিচের উদ্ধৃত অংশগুলো সাহায্য করবে।

“The Stolen Generations (also known as Stolen Children) were the children of Australian Aboriginal and Torres Strait Islander descent who were removed from their families by the Australian Federal and State government agencies and church missions under acts of their respective parliaments. The removals occurred in the period between approximately 1905 and 1969, although in some places children were still being taken until the 1970s.

 ‘between one in three and one in ten Indigenous children were forcibly removed from their families and communities in the period from approximately 1910 until 1970….In that time not one Indigenous family has escaped the effects of forcible removal’.

 Northern Territory Protector of Natives, Dr. Cecil Cook ১০৩০ সালে “half-caste” শিশুদের সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তাদেরকে ’সাদাকরণের’ পূর্ণ ব্যবস্থার জন্য পরামর্শ দিয়ে লিখেন,

”Generally by the fifth and invariably by the sixth generation, all native characteristics of the Australian Aborigine are eradicated. The problem of our half-castes will quickly be eliminated by the complete disappearance of the black race, and the swift submergence of their progeny in the white”.

Chief Protector of Aborigines in Western Australia, A. O. Neville ১০৩০ সালে এক নিবন্ধে লিখেন,

” One factor, however, seems clear; atavism   is not in evidence so far as colour is concerned. Eliminate in future the full-blood and the white and one common blend will remain. Eliminate the full blood and permit the white admixture and eventually the race will become white.”

“In 1992 Prime Minister Keating acknowledged that ‘we took the children from their mothers’ at a speech in Redfern. In 1994 legal action was commenced in the Supreme Court of New South Wales. These children who were removed came to be known as the Stolen Generations.”

এরপর অষ্ট্রেলিয়ান প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী Kevin Rudd ২০০৮ সালের ১৩ ফ্রেব্রুয়ারী অষ্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের উপরে করা তার পূর্বসূরীদের সব রকমের অপকর্মের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চান।

” We apologise especially for the removal of Aboriginal and Torres Strait Islander children from their families, their communities and their country.”

আজ যারা বাঙলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বাকে আদিবাসী স্বীকৃতির পক্ষে কথা বলছেন, তাদের পূর্বের ইতিহাস এমনই নিষ্ঠুরতায় ভরা। তারপরেও বহু বছর পরে হলেও তারা কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু আমরা?

বাংলাদেশে যে গ্রুপটি পাহাড়ীদের আদিবাসী দাবীর প্রতি সংবেদনশীল, তারা আজো তৎকালীন রাষ্ট্রপতির বর্ণবাদী মন্তব্যের জোরালো কোন সমালোচনা করেননি। এথনিক পরিচয়ে নির্ধারিত বাঙালী জাতীয়তাবাদকে ন্যাশনালিটির সাথে গুলিয়ে ফেলতে গিয়ে তারা এভাবেই দেশে বসবাসরত অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বাকে সব সময় অস্বীকার করে চলেছেন।

আমি ব্যাক্তিগতভাবে মনে করি, তিনটি ইস্যুতে সরকারের পক্ষ থেকে পাহাড়ীদের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। প্রথমতঃ উন্নয়নের ’মানবিক’ দিক বিবেচনায় না এনে এবং পুনর্বাসনের কথা চিন্তা না করে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করা। দ্বিতীয়তঃ সংবিধানে জাতীয়তা ‘বাঙালী’ নির্ধারন করে বাকীদের অপমান করা এবং তৃতীয়তঃ শেখ মুজিব কর্তৃক পাহাড়ীদের ’বাঙালী’ হতে বলা।

 (সমাপ্ত)

  1. রেফারেন্সসমূহঃ
  2. ১) সাম্প্রতিক রাজনীতির ময়না তদন্ত এবং একটি তথাকথিত উপসংহার, সত্যজিত দত্ত পুরো কায়স্থ, উন্মোচন, ১৯ আগষ্ট ২০১২।
  3. ২) ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং আদিবাসী বিতর্ক, ড. মোঃ আজিজুল হক, ২৬শে জুন ২০১১, ২৪ বাঙলা নিউজ।
  4. ৩) বিডিআরের বাংলায় নাম এবং ‘আদিবাসী’ বিতর্ক, আতাউস সামাদ, সমকাল ৪/৩/১০ ইং।
  5. ৪) পাহাড়েও জিয়াই নন্দ ঘোষ!  আতাউস সামাদ, আমার দেশ, ১/৩/১০ ইং।
  6. ৫) আদিবাসী বিতর্ক ও একটি প্রত্যাশা, এস হক, নয়া দিগন্ত,
  7. ৬) পার্বত্য শান্তিচুক্তিঃ বর্তমান প্রেক্ষিত, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া
  8. http://kathakata.com/archives/1199
  9. ৭) http://www.australia.gov.au/about-australia/our-country/our-people/apology-to-  australias-indigenous-peoples
  10. ৮) http://www.australia.gov.au/about-australia/australian-story/sorry-day-stolen-generations
  11. ৯) https://en.wikipedia.org/wiki/Stolen_Generations
  12. ১০) বাংলাদেশে আদিবাসীদের প্রান্তিকতা; সাদেকা হালিম।
  13. http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/30177
  14. ১১) পার্বত্য চট্টগ্রামে বহুমাত্রিক সমস্যার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পটভূমি। শাহরিয়ার কবীর।
  15. http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/208

এই লেখার আগের পর্বগুলো পড়ুন এখান থেকে

  1. আদিবাসী বিতর্ক ১ ও ২
  2. আদিবাসী সংজ্ঞায়নে অস্পষ্টতা রয়েছে
  3. দিবাসীর সংজ্ঞার আলোকে বাঙলাদেশে আদিবাসী কারা?
  4. আদিবাসী বিতর্কে নাগরিক সমাজের অবস্থান

 

আদিবাসী বিতর্কে নাগরিক সমাজের অবস্থান

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক- ৫

মাহবুব মিঠু

মাহবুব মিঠু:

বেশ আগে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আরটিভি সুন্দর একটা টকশোর আয়োজন করেছিল। গোলাম মোর্তজার সঞ্চালনায় অতিথি হিসেবে ছিলেন জেনারেল (অবঃ) ইব্রাহীম এবং চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়।আদিবাসী স্বীকৃতি পেলে এর পরিণাম কি কি হতে পারে ঐ অনুষ্ঠানে জনাব ইব্রাহীম সেগুলো খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ২০০৭ সালে প্রণীত জাতিসংঘের ডিক্লারেশন ৩, ৪ এবং ১৮ ধারা মোতাবেক, স্বীকৃতি পাওয়া আদিবাসীদের চাহিদা অনুযায়ী তাদেরকে স্বায়ত্বশাসন দিতে রাষ্ট্র বাধ্য থাকবে। পাহাড়ীদের অনুমতি ছাড়া কেউ সেখানে বাস করতে পারবে না এবং তাদের অনুমতি ও সম্মতি ছাড়া ঐ এলাকায় রাষ্ট্র কোন রকমের সামরিক তৎপরতা চালাতে পারবে না।

জনাব ইব্রাহীমের দেয়া তথ্য খণ্ডাতে পারেননি রাজা দেবাশীষ রায়। এমনিতে পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টি করে রেখেছে একটা গোষ্ঠী। বাংলাদেশ থেকে পৃথক হওয়া তাদের লক্ষ্য। এই পরিস্থিতিতে আদিবাসী স্বীকৃতি নিয়ে স্বায়ত্বশাসনের দাবী জোরালো হলে সরকার আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে পড়বে। দেবাশীষ রায় কৌশলে জনাব ইব্রাহীমের স্বায়ত্বশাসনের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে এটাকে ইউনিয়ন পরিষদের স্বশাসনের সাথে গুলিয়ে বিষয়টাকে হালকা করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

জনাব ইব্রাহীম আরো বলেন, রাজা দেবাশীষ রায় একটা আদিবাসী ফোরামের সদস্য এবং এই ফোরাম জাতিসংঘের মাধ্যমে শর্ত দিয়েছে, আগামীতে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী বিশ্বের কোন দেশে শান্তি মিশনে গেলে পাহাড়ীদের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে যে, সেনাবাহিনী সেখানে কোন মানবাধিকার লংঘন করে নাই। ’মানবাধিকার লংঘন’ ক্ষেত্র বিশেষে একটা আপেক্ষিক শব্দ। পাহাড়ী সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর অভিযানকে সংজ্ঞায়িত করা হলে সেটাও হবে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভাষায় মানবাধিকার লংঘন। এই দাবী প্রতিষ্ঠা করতে পারলে পাহাড়ের সহিংসতাকে থামানো যাবে না। আমরা জানি, পাহাড়ীদের একটা অংশ রাঙ্গামাটিকে রাজধানী করে জুম্মল্যান্ড করার স্বপ্ন দেখছেন।

ড. জাফর ইকবাল ২০১১ সালের আগষ্ট মাসে ’প্রথম আলোতে’ ‘কারও মনে দুখ দিয়ো না…’ নামে একটা কলাম লেখেন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন, যার মধ্যে একটা ছিল ‘আদিবাসী’ ইস্যু। স্বভাবসুলভ ভঙ্গীমায় যুক্তি কম, আবেগ নির্ভর এবং অনেকগুলো ভুল তথ্যে ভরা ছিল লেখাটি। তিনি এই কলামে লিখেছেন, “মাত্র অল্প কয়দিন আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা হয়েছে—প্রথমবারের মতো আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, প্রতিবন্ধী কোটার সঙ্গে সঙ্গে আদিবাসী কোটায় ছাত্রছাত্রী ভর্তি করেছি।” এরপরেই তিনি লেখেন, ”দেশে যদি আদিবাসী নেই, তাহলে আদিবাসী কোটায় আমরা কাদের ভর্তি করেছি?” জাফর সাহেবে যাকে ‘আদিবাসী কোটা’ বলেছেন, আদতে ওটা হবে ‘উপজাতি কোটা’। ওনার মতো একজন শিক্ষাবিদ কি ভুল করে লিখলেন নাকি না জেনে লিখলেন? Indigenous কথার অর্থ খুঁজতে ডিকশনারী ঘাঁটতে গিয়ে ওনার পছন্দ মতো অর্থ খুঁজে না পেয়ে মর্মাহত হয়েছেন।

জনাব প্রশান্ত ত্রিপুরা, ১৯৯৩ সালে আন্তর্জাতিক আদিবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে “আন্তর্জাতিক আদিবাসী বর্ষ এবং বাংলাদেশের আদিবাসী জনগণ” শীর্ষক একটা নিবন্ধ লেখেন। নিবন্ধের শুরুতে অস্পষ্ট বিবরণের মাধ্যমে একটা যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি লিখেছেন, “কিছু শিল্পোন্নত দেশ Indigenous জনগোষ্ঠীর ধারণা এবং তাদের বিশেষ অধিকারের প্রশ্নকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিলেও অন্য অনেক দেশে অনুরূপ কোন উদ্যোগ নেই।” তিনি পরিস্কার করে বলেননি যে, ‘কিছু শিল্পোন্নত দেশ’ অর্থাৎ অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং আমেরিকার মতো আরো কিছু দেশে যেখানে এই স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে সেখানে Indigenous-রা হলো Native, অর্থাৎ তারা ঐ ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা। ইউরোপিয়ানরা সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য নতুন নতুন ভূমি দখল করে ’বহিরাগত’ হিসেবে এসব অঞ্চলে গেঁড়ে বসে। এই সত্যটুকু পরিস্কারভাবে না লিখলে পাঠকের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। Indigenous হিসেবে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি না পাওয়ায় তিনি  আক্ষেপ করে লিখেছেন, ”কিন্তু একজন গারো, সাঁওতাল বা ম্রোর কাছে এই সরকারী ব্যাখ্যা তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করারই নামান্তর।” আদিবাসী স্বীকৃতির অভাবে কিভাবে তাদের অস্তিত্ব সংকটে পড়ল তার ব্যাখ্যা নেই। শেখ মুজিবের ’বাঙালী’ করার ঘোষণা বাস্তবে তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকী হলেও রাজনৈতিক কারণে হয়তো তিনি এই সঠিক স্থানে আঘাত করতে সাহস পাননি।

জনাব ত্রিপুরার লেখায় আদিবাসী কথাটার অর্থ কি এবং বাংলাদেশে উপজাতি হিসেবে পরিচিত গোষ্ঠীগুলোকে আদৌ আদিবাসী বলা যায় কিনা প্রশ্নগুলো পরিস্কারভাবে করলেও উত্তরগুলো পরিস্কার নয়। সময়ের ’আপেক্ষিকতাকে’ ঢাল হিসেবে নিয়ে উনি এ অঞ্চলে পাহাড়ী নাকি বাঙালীরা আগে বসতি গড়ে সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে এড়িয়ে গেছেন। তিনি লিখেছেন, “অর্থাৎ স্থান ও কালের সীমানা কিভাবে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে, তার উপরই নির্ভর করছে কোন প্রেক্ষিতে কাদের আমরা Indigenous বলতে পারি। আমরা যদি সুদূর প্রাগৈতিহাসিক অতীতে চলে যাই তাহলে Indigenous কথাটি অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।”

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আদিবাসী বিতর্ক বিষয়ক স্থান তো নির্দিষ্ট। এবং ‘সময়’ সম্পর্কিত ধারণাও পরিস্কার। অর্থাৎ নির্দিষ্ট ভূখন্ডে আদিবাসীর দাবীদার যারা তারা কি ওখানে সংখ্যাগুরুর আগে এসেছিল নাকি পরে! বাঙালীদের আগমন আগে ঘটে থাকলে তারা ঐ অঞ্চলে পরে আসা অন্য জনগোষ্ঠীর ভূমির উপর অতিরিক্ত দাবীকে মেনে নেবে কেন? এভাবে বিভিন্নজনে আদিবাসী স্বীকৃতিকে পাকা করার জন্য বারবার অষ্ট্রেলিয়া, আমেরিকা এবং কানাডাকে টেনে আনলেও সেখানে স্বীকৃতি পাওয়া Indigenous-দের সাথে আমাদের এখানকার দাবীদারদের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যকে তুলে ধরছেন না। সেটা পরিস্কার করলে তাদের দাবীটাই অসাড় হয়ে যায়। মানুষকে এতো সহজে তাদের দাবীর দিকে টেনে আনা যাবে না। মূলতঃ বাঙলাদেশে যারা আদিবাসী স্বীকৃতির জন্য লড়ছেন, তাদের কাছে ‘আবেগ’ এবং ‘পরদেশের’ উদাহরণ ছাড়া শক্ত কোন যুক্তি নেই।

একটা পর্যায়ে তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে জাতিসংঘের আদিবাসী সংক্রান্ত দিক নির্দেশনা বা ধারণার একটা নিজস্ব সম্প্রসারিত ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন যেখানে শব্দটির মূল দ্যোতনা ‘আদি’কেই অস্বীকার করা হয়েছে। ”কোন দেশে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাদের পূর্ব পুরুষেরা প্রথমে সেখানে বসতী গেড়েছিল, এ প্রশ্ন গৌণ, মূলত: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তথাকথিত সভ্যতার বিকাশের শিকার tribal, primitive প্রভৃতি ঔপনেবিশিক আখ্যায় ভূষিত জনগোষ্ঠীদের সবাই Indigenous অভিধার বৈধ দাবীদার”।

সভ্যতার একই আক্রমণের শিকারতো আজ বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীও! তাহলে তারাও কি সেই একই দাবী করে বসবে? কিম্বা মায়ানমারের রোহিঙ্গারা? বরঞ্চ তার এই সম্প্রসারিত ব্যাখ্যার সূত্র ধরে এই জনগোষ্ঠীকে ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠী’ বলাই শ্রেয়। ‘বাংলাদেশী’ পরিচয় নির্ধারণেও তার কিছুটা আপত্তি আছে। তার ভাষায় এটা ‘আদিবাসীদের’ কথা ভেবে করা হয়নি। যে দেশটার নাম বাংলাদেশ, তার নাগরিকরা বাঙলাদেশী হবে না তো কি হবে? ভারতীয় নাগরিকদের ভারতীয়, পাকিস্তানীদের পাকিস্তানী বলা গেলে বাংলাদেশের নাগরিকরা তো বাংলাদেশীই হবে! পরোক্ষভাবে উনি কি দেশের নামটা পরিবর্তনের কথা বলছেন?  এথনিক পরিচয়ে জাতীয়তা এবং রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদ বা ন্যাশনালিটির পার্থক্য নিশ্চয়ই উনি অনেকের চেয়ে ভাল বুঝেন। এভাবে ‘বাংলাদেশী’ পরিচয় নিয়ে সংশয়ে থাকার অর্থ প্রচ্ছন্নভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদকেই ইঙ্গিত দেয়।

কিছু কিছু বাঙালীর এবং আরো বৃহত্তর পরিচয়ে বাংলাদেশীদের (কিছু কিছু) ’আবেগ’ সহজিয়া বা স্বাভাবিক নয়। এটা একধরনের ইমোশনাল ব্লাকমেইল।’ এদের আবেগ কোন ঘটনার কারণে স্বাভাবিকভাবে আসে না। কোন বিষয়কে নিজের অনুকূলে আনার জন্য এই বিশেষ ধরনের ’আবেগ’ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সৃষ্টি করা হয়। কেবলমাত্র মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আবেগ সৃষ্টি করে শাহবাগে লাখ লাখ মানুষ জড়ো করা গোষ্ঠী পরিশেষে কোটি কোটি টাকার মালিক হবার গল্প বাতাসে ওড়ে। একইভাবে আবেগের কৌশলী ব্যবহারের মাধ্যমে একটা গোষ্ঠী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দিতে চায়।

শ্রদ্ধেয় আতাউস সামাদ তার এক লেখায় বিবিসির সাংবাদিক থাকাকালীন সময়ের কিছু অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। সেই আশির দশকে যখন শান্তিবাহিনীর বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন তুঙ্গে, সে সময় থাইল্যান্ড বা জাপানে বৌদ্ধ সম্মেলন হলে এই সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সমর্থনে উদ্বেগ প্রকাশ করে যে বিবৃতি দেয়া হতো, মাঝে মাঝেই সেখানে লেখা থাকত ‘ওই এলাকায় বৌদ্ধদের উপরে অত্যাচার চলছে’। এভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সমর্থনে একটা জনমত সৃষ্টিতে দেশের বাইরের একটা গোষ্ঠী বেশ সোচ্চার ছিল। এখন এর পরিধি অনেক বেড়েছে। দেশের ভিতরে তথাকথিত কিছু মানবাধিকার সংগঠন এবং কিছু ব্যাক্তি ‘আদিবাসী’ বিতর্ককে উস্কে দিচ্ছেন।

জনাব আতাউস সামাদ সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, ঐ এলাকার এতো হই হট্টগোলের প্রধান উদ্দেশ্য সম্ভবত সেখানে বসতী স্থাপনকারী বাঙালীদের ফিরে যেতে বাধ্য করা। তিনি দেখিয়েছেন ২০১০ সালের ফ্রেব্রুয়ারীতে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘটা গোলযোগকে কেন্দ্র করে যেটা হয়ে গেল সেখানে দেখা গেছে প্রশাসন শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করে। অসহায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালী নারী পুরুষ শিশু রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে দাড়িঁয়ে থাকলেও তাদেরকে কোন ত্রাণ দেয়া হয়নি। বাঘাইহাটে বাঙালীদের যে ঘরবাড়ী পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল সেগুলো তখনো পর্যন্ত পাহাড়ীদের দখলে ছিল(বর্তমানের খবর জানা নেই আমার)। একই সূত্র থেকে জানা যায়, এক পাহাড়ীর কাছ থেকে বাঙালী জমি কিনলে তা তার দখলে না দিয়ে কোন এক এনজিওকে দিয়ে দেয়া হয়। শুরু হয় উত্তেজনা।

পাহাড়ের উত্তেজনার পিছনে এক তরফাভাবে বসতি স্থাপনকারী বাঙালী- বাংলাদেশীদের দোষ চাপানো সব সময় ঠিক নয়। এটাকে ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান বলে না। কিছু কিছু পত্রিকা তাদের বিভিন্ন লেখায় সরকারী অবস্থান থেকে সরে গিয়ে ‘আদিবাসী’ শব্দটা ব্যবহার করে ধৃষ্টতার পরিচয় দিচ্ছে। এ রকমের একটা স্পর্শকাতর বিষয়ে রাষ্ট্রিয় সিদ্ধান্তের বাইরে তাদের নিজস্ব অবস্থান রাষ্ট্রিয় অবমাননা কিনা ভেবে দেখা জরুরী।

অনেকের মতো্ আমিও মনে করি, আদিবাসী স্বীকৃতির সাথে সাথেই সরকারের উপর আন্তর্জাতিকভাবে কিছু দায়িত্ব এবং বাধ্যবাধকতা চলে আসবে। প্রথমত: ভূমির উপরে অধিকারের বলে সেখানকার বাঙালী খেদাও আন্দোলন শুরু হবে। সেনা ক্যাম্প সরিয়ে নেয়ার দাবী উঠবে। বিভিন্ন দাবী দাওয়ার নামে পাহাড়ীদের একটা অংশ আন্দোলনের নামে যে বিচ্ছিন্নতার আন্দোলন শুরু করছে সেটা জোরদার করতে পারবে। আদিবাসী স্বীকৃতির সাথে সাথেই তাদের উপরে জাতিসংঘের একটা সরাসরি পর্যবেক্ষণ থাকবে এবং তারা তদারকি করার সুযোগ পাবে। এ সব ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মতো পশ্চিমা লেজুড়বৃত্তিক সংগঠনগুলো যেটা করে সেটা হলো: শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর জন্য এক নিয়ম আর আমাদের মতো দুর্বলদের জন্য আরেক নিয়ম। বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমন করতে সামরিক পদক্ষেপ নিলে তখন তারা সরাসরি জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মদদে ‘আদিবাসী’ বাঁচাও সুর তুলে সরকারের সাথে বিচ্ছিন্নতার দেনদরবার করার সুযোগ পাবে। দেশ রক্ষা করার জন্য জীবনবাজী রেখে পাহাড়ী অঞ্চলে মোতায়েনকৃত সৈন্যরা পরিচিত হবেন আগ্রাসী বাহিনী হিসেবে। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা হবেন মুক্তিযোদ্ধা।

চলবে….

রেফারেন্স

 

এই লেখার আগের পর্বগুলো পড়ুন এখান থেকে

  1. আদিবাসী বিতর্ক ১ ও ২
  2. আদিবাসী সংজ্ঞায়নে অস্পষ্টতা রয়েছে
  3. দিবাসীর সংজ্ঞার আলোকে বাঙলাদেশে আদিবাসী কারা?