বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্কের প্রভাব

মাহবুব মিঠু

মাহবুব মিঠু

 

১।। সমাধানহীন জাতীয় বিতর্কে আরেকটা নতুন পালক

আদিবাসী বিতর্কটা বাংলাদেশে আর পাঁচটা সমাধানহীন বিতর্কের মতোই ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করছে। সেই সাথে বিভিন্ন পক্ষ থেকে বিতর্কের সমাধানের চেয়ে বরং এটিকে রাজনীতিকরণ করা শুরু হয়েছে। ফলে আদিবাসী ইস্যুটা সমাধানের চেয়ে দিনকে দিন জটিলতার দিকেই এগুচ্ছে বলে মনে হয়। এই পরিস্থিতিতে শুধু বাংলাদেশে নয়, বরং সমগ্র এশিয়ায় ক্রমশঃ এটা একাধারে এক পক্ষের ধারণায় অবহেলিত এবং অন্য পক্ষের ধারণায় একটা বিতর্কিত চাপিয়ে দেয়া ইস্যু হয়ে পড়েছে।

মূলতঃ অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, আমেরিকা কিংবা অন্যান্য ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রগুলোর মতো এশিয়ার বিতর্কটা সাদা কালোর মতো পরিস্কার নয়। এই সুযোগটাকে ব্যবহার করে এক পক্ষের মতে কিছু ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী এখান থেকে ফায়দা নেবার চেষ্টায় ব্যস্ত। কোন জাতি আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় তারা কিছু বাড়তি সুযোগ সুবিধা পায়। যেমন জমির উপর কিছু বাড়তি অধিকার এবং অন্যান্য আরো কিছু সুযোগ সুবিধা।

বাঙ্গালীদের বড় অংশ মনে করে, পাহাড়ীদের এই দাবী অন্যায্য এবং এটা মানা হলে যে সুযোগ সুবিধাগুলো তারা ভোগ করবেন সেটা একদিকে অন্যায় এবং আমাদের রাষ্ট্রিয় অখণ্ডতা ভবিষ্যতে হুমকীর মুখে পড়বে। অন্যদিকে, আদিবাসী দাবীদাররা মনে করছেন, অস্পষ্টতার সুযোগে রাষ্ট্রের ডোমিনেন্ট গ্রুপ তাদেরকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।

প্রায় ৪/৫ বছর আগে গুরুত্বসহকারে বিতর্কের বিষয়টা আমার মাথায় ভর করে বসে। তখন থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এক ধরনের তথ্যানুসন্ধানে নেমে পড়ি। এটা করতে গিয়ে  একটা অদ্ভুদ সত্য উপলব্ধি করি যেটা বেশ লজ্জার। তথ্য প্রমাণ সংগ্রহের জন্য আমি বিভিন্ন ব্যক্তিকে ফোনে এবং মেইলে যোগাযোগ করি। এদের বেশীরভাগ লোকই ইতিমধ্যে আদিবাসী বিতর্কের পক্ষে এবং বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ফেলেছেন। বিভিন্ন পত্রিকায় অপর্যাপ্ত তথ্যসহ লেখাসহ ব্লগ এবং ফেইসবুকেও ভারি ভারি প্রচারণা চালিয়েছেন। অথচ এদের অনেকের কাছেই পর্যাপ্ত তথ্যই নেই। অবশ্য কিছু শুভাকাঙ্খীর কাছ থেকে সত্যিকার অর্থে যথেষ্ট রেফারেন্স পেয়েছি। কৃতজ্ঞতা তাদের প্রতি।

এর বাইরে অস্ট্রেলিয়ার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগে সেখানকার লাইব্রেরিসহ বিশ্বের বিভিন্ন অনলাইন লাইব্রেরিতে বিনে পয়সায় ঢুঁ মারার সৌভাগ্য হয়েছিল। এমনকি অস্ট্রেলিয়াতে আদিবাসী নিয়ে বর্তমানে যারা কাজ করছেন তাদের সঙ্গে ব্যাক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে আদিবাসী ধারণার উপরে একটা ধারণা লাভের চেষ্টা করি। তার বাইরেও পরিচিত বিভিন্ন বন্ধু বান্ধবের সাথে আলাপচারিতায় বাংলাদেশে আদিবাসী প্রসঙ্গে তাদের নিজস্ব ধারণাগুলো জানার মাধ্যমে আমাদের দেশে আদিবাসী বিতর্কের বহুমাত্রিক রূপটা উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। এর বাইরে বিভিন্ন জনের ফেইসবুক, ব্লগে ঘুরে এসে সকলের প্রতিক্রিয়া দেখার চেষ্টা করেছি।

এভাবে একদম সাধারণের ব্যাক্তিগত মতামত থেকে শুরু করে একাডেমিক আলোচনা এবং বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন, আদিবাসী বিষয়টা নিয়ে ভাবছেন এমন বু্দ্ধিজীবী সবোর্পরি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর রচিত আদিবাসী বিষয়ক বিভিন্ন প্রকাশনাগুলোকে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। আমার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার সম্মিলিত তথ্যের ভিত্তিতে লেখাগুলো সাজান। আমি বলব না যে, এটা একটা তথাকথিত ‘নিরপেক্ষ’ লেখা। নিরপেক্ষ বলতে কোন শব্দ থাকলেও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কোন কোন পক্ষের স্বীকৃতি নাও থাকতে পারে। ‘নিরপেক্ষ’ শব্দটাও মাঝে মাঝে ‘আদিবাসী’ সংজ্ঞার চেয়েও বেশী অস্পষ্ট এবং ক্ষেত্র বিশেষে বিতর্কিত হয়ে পড়ে।

তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে লিখতে গেলে কখনো কখনো সেটা এক পক্ষের সম্পূর্ণ বিপরীতে যেতেই পারে। তার কাছ থেকে নিরপেক্ষ খেতাব আশা করা যায় না। যার যার স্বার্থ অনুযায়ী এক এক যুক্তি একেক জনের কাছে নিরপেক্ষ আবার কখনো পক্ষপাতদুষ্ট। আসলে আমরা মুখে ‘নিরপেক্ষ’ শব্দটা ব্যবহার করলেও চিন্তায় থাকে ‘ভারসাম্যের’ ধারনা। ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান সব সময় সত্যের পক্ষে যায় না। এভাবে নিরপেক্ষ শব্দটা মাঝে মধ্যেই আপেক্ষিক হয়ে পড়ে। তাই সচেতনভাবে আমার উদ্যোগকে ’নিরপেক্ষ’ না বলে আমি ‘যুক্তি নির্ভর’ বলতে বেশী স্বাচ্ছন্দবোধ করি। যুক্তিগুলো দাঁড় করানোর চেষ্টা হয়েছে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে। লেখাগুলো ছাপা হলে অনেকেই হয়তো অনেকভাবে তাদের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করবেন। আমি তাদের অনুরোধ জানাব, আমিব্যাক্তিগতভাবে ভারত নাকি পাকিস্তানের দালাল নাকি হোপলেস সে প্রসংগে না গিয়ে বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে লেখার সবল এবং দুর্বল দিকগুলো তুলে ধরবেন। সকলের সম্মিলিত উদ্যোগে বিতর্কের অবসান হোক। বিদ্যমান বিভিন্ন রাজনৈতিক বিতর্কের সাথে নতুন কোন সমাধানহীন বিতর্কের সূচনা করা আমাদের কাম্য নয়।

২।। বারডেন অব প্রুফ

(একটা সময়ে সর্বসম্মতভাবে পাহাড়ে বসবাসকারীদের বলা হতো, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, জুম্ম জনগণ, পাহাড়ী, উপজাতি, ট্রাইবাল পিপল, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী। হঠাৎ করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে এবং পাহাড়ী অল্প কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদীদের স্বাধীনতার আন্দোলনকে যৌক্তিকতা দেবার অভিপ্রায়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আদিবাসী বিতর্কটাকে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে।)

বারডেন অব প্রুফ হচ্ছে সিভিল ষ্ট্যান্ডার্ড প্রুফ। ক্রিমিনাল ষ্টান্ডার্ডে যেখানে ‘Beyond reasonable doubt’প্রমাণ হতে হবে আলোচিত ক্রিমিনাল অভিযোগ কিম্বা অমিমাংসিত কোন ঘটনা সত্য অথবা মিথ্যা। সংজ্ঞা অনুযায়ী,

A duty placed upon a civil or criminal defendant to prove or disprove a disputed fact.

বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের সেই আদিপর্ব থেকে বিভিন্নভাবে পাহাড়ীদের পরিচয় সম্পর্কিত বিতর্ক লেগেই আছে। এক সময় শেখ মুজিব বলেছিলেন, তোমরা সবাই বাঙালী হয়ে যাও। যেটা ছিল সম্পূর্ণ বর্ণবাদী বক্তব্য। পাহাড়ীরা এখন জোরেশোরে দাবী করছে যে তারা এই এলাকার আদিবাসী। সমতলের অধিবাসী এবং সরকার বলছে, না, তারা সেটা নয়। এই পটভূমিতে মূলতঃ সরকারের দায়িত্ব ‘বারডেন অব প্রুফের’ আওতায় তাদের অবস্থান প্রমাণ করার। এবং অবশ্যই দাবীদার পাহাড়ী গোষ্ঠীকেও তাদের দাবীর প্রতি যথেষ্ট প্রমাণ হাজির করতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, উভয় পক্ষের বিতর্কটা প্রায়শই যুক্তি কিম্বা তথ্য প্রমাণ নির্ভর না হয়ে হয়ে পড়ছে তর্ক নির্ভর কিংবা প্রচ্ছন্ন হুমকি নির্ভর। পাহাড়ীদের একটা অংশ থেমে থেমে পুণরায় যুদ্ধ শুরুর হুমকি দিচ্ছে। প্রকারান্তরে এর মাধ্যমে তারা পার্বত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনী স্থায়ীভাবে রাখার পক্ষেই গ্রাউন্ড তৈরী করে দিয়েছে। তাদের দাবীকে আইনগতভাবে প্রমাণের চেষ্টা না করে কিছু সন্ত্রাসী পাহাড়ীর যুদ্ধ শুরুর হুমকি প্রমাণ করে যে, ঐ অঞ্চলে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি কতোটা জরুরী। অতএব, বিষয়টা যতোক্ষণ ‘বারডেন অব প্রুফের’ মধ্যে থাকবে ততোক্ষণ সেটাকে কেন্দ্র করে অব্যাহত বিতর্ক লেগেই থাকবে। সৃষ্টি হবে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার। সেই সুযোগে দেশের ভিতর এবং বাহির থেকে নানা পক্ষ নানাভাবে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা চালাবে।

আদিবাসীর পক্ষে যারা আছেন, তাদের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক প্রণীত কিছু ধোঁয়াশাচ্ছন্ন, অপরিস্কার ধারণাপত্র এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর (বাঙ্গালী) কিছু ঐতিহাসিক আন্দোলন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তারা বলতে চাইছেন, যে জাতি ৫২, ৬৯ এবং ৭১ এর আন্দোলন করেছে, সেই জাতি কেন পাহাড়ীদের দাবী মেনে নেবে না? এটা কি মামার বাড়ীর আবদার? উল্লেখিত আন্দোলনগুলোর একটা যৌক্তিক প্রেক্ষাপট ছিল। যতোদিন পাহাড়ীরা ‘আদিবাসী’ হিসেবে প্রমাণিত না হবেন, ততোদিন এই সব আবেগের স্থানে সুঁড়সুড়ি দিয়ে সেটা মেনে নিতে প্ররোচিত করা ইমোশনাল ব্লাকমেইল ছাড়া আর কি কিছু নয়। দু’দিন পরে কেউ স্বাধীনতা চেয়ে বসলে একই যুক্তিতে সেটাও দিয়ে দিতে হবে। তাই নয় কি? প্রথমেই তাদের দাবীর প্রতি প্রশ্নহীন প্রমাণ হাজির করতে হবে। কেবল তারপরেই তাদের আদিবাসী স্বীকৃতির দাবী যৌক্তিকতা পাবে। তার বাইরে এই দাবীকে কেন্দ্র করে যে কোন অরাজকতা আদতে নৈরাজ্য সৃষ্টির মতো চরম আইন বিরোধী কাজ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত। সেই সাথে এই গুরুত্বপূর্ণ অমিমাংসিত ইস্যু মিমাংসা না হওয়া পর্যন্ত যে সমস্ত পত্রিকা এবং তথাকথিত সুশীল সমাজ তাদেরকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে তুলে ধরে রাষ্ট্রের অবস্থানের বাইরে গিয়ে দেশের মধ্যে নৈরাজ্য সৃষ্টির পরোক্ষ ইন্ধন দেবে, তাদেরকে রাষ্ট্র বিরোধী আইনের আওতায় এনে বিচার করা উচিত।

আদিবাসী বিতর্কে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো এবং তাদের চালিত বিশ্ব সংস্থাগুলোর তৎপরতা যতোটা না প্রশংসনীয় তারচেয়ে বেশী তাদের সেই সব দেশের সত্যিকার আদিবাসীদের উপরে তাদের চালিত ‘অপরাধের’ প্রায়শ্চিত্য করার চেষ্টা। পশ্চিমারা তাদের মজ্জাগত আগ্রাসী, ঔপনিবেশিক চরিত্র থেকে অতীতকাল থেকে সারা বিশ্বে যখনই যেখানে সুযোগ পেয়েছে হামলে পড়েছে। একটা সময়ে তারা অষ্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডায় বসবাসকারী আদিবাসীদের নির্মূলের উদ্দেশ্যে নির্বিচারে হত্যা করেছে। তাদের চালিত গণহত্যা এবং অত্যাচারের ফলে আদিবাসীদের সাথে তাদের যে মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা আজো যায়নি। এই অবিশ্বাসের ফলে সেখানকার আদিবাসীরা এখনো মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে ভালবাসে। বিলুপ্তপ্রায় কিংবা কোনঠাসা সেই জাতিগোষ্ঠীকে কিছুটা সুবিধা দিয়ে পশ্চিমা শক্তি তাদের পূর্ব পুরুষের করা অপরাধকে কিছুটা লঘু করতে চায়। তাদের নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কর্তৃক প্রণীত আদিবাসী সম্পর্কিত ধারণাপত্রে সেই দায় মোচনের ছাপ সুস্পষ্ট। তারা সেখানে কবে এসেছিল, কিভাবে সেখানকার জনগোষ্ঠীকে মেরেছিল সেগুলো খুব পুরাতন ঘটনা নয়। তাদের পরিস্থিতির সাথে আমাদের দেশের পরিস্থিতির বিস্তর ফারাকে আছে।

আদিবাসী ধারণার বিকাশ: ‘আদিবাসী’ প্রত্যয়টি মূলত: প্রথমদিকে পরিব্রাজক এবং একাডেমিক্যালি নৃবিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। একটা সময়ে ইবনে বতুতা কিংবা কলম্বাসের মতো পরিব্রাজকরা বিশ্ব চষে বেড়িয়েছিলেন। মর্গান, ম্যালিনোস্কিসহ আরো অনেক নৃবিজ্ঞানীদের আগ্রহ ছিল এই সব জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার উপরে। মর্গানের ‘আদিম সমাজ’ বইটি এখনো আদিবাসী কেন্দ্রিক ধারণায়নে একটা মূলধারার বই হিসেবে মেনে নিতে হবে। তবে আদিবাসী বিষয়ক অধিকার সম্বলিত আলোচনার বিকাশ এবং বিস্তৃতি লাভ করে মূলত: অষ্ট্রেলিয়া, আমেরিকা এবং কানাডার আদিবাসী আলোচনাকে ঘিরে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অপরিস্কার ধারণাপত্রের উপর ভিত্তি করে ইউরোপের কোন কোন বসতি স্থাপনকারীরাও এখন নিজেদের আদিবাসী দাবী করছেন। এমনকি ইরাকের কুর্দি কিংবা কোথাও কোথাও ধর্মীয় পরিচয়ের সংখ্যালঘুরাও ইচ্ছে করলে নিজেদের আদিবাসী দাবী করতে পারেন। এই সংস্থাগুলোর অপরিস্কার ব্যাখ্যার কারণে বর্তমানে ‘আদিবাসী’ এবং ‘এথনিক মাইনরিটির’ মধ্যকার পার্থক্যগুলো ক্রমশ: সংকুচিত হয়ে পড়েছে। যে কোন এথনিক মাইনরিটিও মন চাইলেই নিজেদের আদিবাসী হিসেবে দাবী করে বসতে পারে।

আরেকটি পক্ষ দাবী করছে, সারা দেশের বিবেচনায় জুম্মরা আদিবাসী না হলেও পাহাড়ী অঞ্চলে কারা আগে বসতি গড়ে? অর্থাৎ অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডায় আদিবাসীরা জাতীয় ভিত্তিতে। কিন্তু বাংলাদেশ ভারতে কিছুটা আঞ্চলিক ভিত্তিতে স্বীকৃতি দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাহলে ময়মনসিংহ কিংবা উত্তর বঙ্গের সমতলে বাস করা ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাগুলোর পরিচয় কি হবে? তারা কি দাবী পরিহার করবে? তাছাড়া আঞ্চলিক ভিত্তিতে আদিবাসী নির্ধারণ করা কি হাস্যকর নয়? একটা দেশের ক্ষুদ্র একটা অঞ্চলে বাইরে থেকে এসে নতুন বসতি গড়লে সেকি আদিতে বাস শুরু করেছে সেটা বলা যায়? তাহলে বরিশাল কিংবা অন্য অঞ্চলে নতুন চর জেগে উঠলে সেখানে কোন ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা বাস করা শুরু করলে আজ থেকে ৫০ কি ১০০ বছর পরে তারাও কি দাবী করবে যে, আমরা আদিবাসী? কিম্বা এমন কোন অকাট্য প্রমাণ কি আছে যে, পার্বত্য অঞ্চলে এখনকার আদিবাসী দাবীদাররাই প্রথম ঘাঁটি গাড়ে?

৩।। আদিবাসী সংজ্ঞায়নে অস্পষ্টতা রয়েছে

আদিবাসী বিষয়ে ধারণায়নের জন্য মূলত: তিনটি আন্তর্জাতিক দলিলকে সবাই প্রধান্য দেয়। আইএলও কনভেনশন ১০৭ (১৯৫৭), আইএলও কনভেনশন ১৬৯ (১৯৬৯) এবং ২০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ প্রণীত আদিবাসী সংক্রান্ত ঘোষণা। প্রথমটিতে পাকিস্তান সরকার স্বাক্ষর করলেও পরের দু’টোতে বাঙলাদেশ সরকার স্বাক্ষর করেনি।

এভাবে আদিবাসী নামে যে সংজ্ঞাগুলো দেয়া হচ্ছে সেগুলো মূলত: এক ধরনের ধারণাপত্র বা গাইড লাইন। এই সকল ধারণাপত্রে নানা বিষয়ে গভীর অস্পষ্টতা রয়েছে। কিম্বা কিছু ধারণাপত্র এবং সংজ্ঞায় এমনভাবে ambiguity সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে যে, সেটার ব্যাখ্যা নানাজনে নিজস্ব সুবিধা অনুযায়ী দিতে পারেন। জাতিসংঘ প্রণীত আদিবাসীদের অধিকার বিষয়ক ঘোষণাতেও আদিবাসী সম্পর্কিত সংজ্ঞা এড়িয়ে শুধুমাত্র তাদের অধিকারগুলো উল্লেখ করে দায় সেরেছে। এই অস্পষ্টতার সুযোগে নানা গোষ্ঠী যার যার স্বার্থ হাসিলের জন্য ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করছেন।

বাংলাদেশের বিভিন্ন লিগ্যাল এবং পলিসি ডকুমেন্টে পাহাড়ে বসবাসকারীদের এ পর্যন্ত বিভিন্ন নামে পরিচয় করানো হয়েছে। কখনো পাহাড়ী, কখনো Indigenous, Aboriginal, বা এথনিক মাইনোরিটি, উপজাতি ইত্যাদি। পাহাড়ীদের মধ্যে আন্দোলনরত দলটি ইংরেজীতে ’Indigenous’ এবং বাঙলায় ’আদিবাসী’ শব্দটিকেই অধিক পছন্দ করেন।

১৯৮৯ সালে ILO Convention No. ১৬৯ এর আর্টিকেল-১ এ কোন সংজ্ঞা দেয়া হয়নি। বরঞ্চ একটা স্টেটমেন্ট আকারে বলা হয়েছে,

1. a) tribal peoples in independent countries whose social, cultural and economic conditions distinguish them from other sections of the national community and whose status is regulated wholly or partially by their own customs or traditions or by special laws or regulations;

 

1. b) peoples in independent countries who are regarded as indigenous on account of their descent from the populations which inhabited the country, or a geographical region to which the country belongs, at the time of conquest or colonization or the establishment of present state boundaries and who irrespective of their legal status, retain some or all of their own social, economic, cultural and political institutions.”

এই সংজ্ঞার আলোকে indigenous কথাটি বাঙলায় আদিবাসী হয় না। কারণ এখানে যাদের indigenous বলা হয়েছে তাদের আগমন কোন অঞ্চলে আদিতে অর্থাৎ সবার আগে হতে হবে সেটার উল্লেখ নাই। এখানে অন্যান্য সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়কে টেনে এনে এক ধরনের সংজ্ঞায়নের চেষ্টা করা হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নানা রকম ধারণাপত্র দেখে মনে হয়, তারা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে যেভাবেই হোক তাদের স্থানীয় প্রতিনিধি কর্তৃক মনোনীতদের indigenous স্বীকৃতি দিতে বদ্ধপরিকর এবং সেই অনুযায়ী তাদের প্রণীত ধারণাপত্রে ব্যাখ্যা জুড়ে দেয়াই তাদের লক্ষ্য। আগমনের ‘সময়কাল’ দিয়ে সেটা সম্ভব না হলে অন্য কোনভাবে হলেও সেটা করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন পকেটে নতুন গোলযোগ সৃষ্টি করে সেখানে তাদের খবরদারী করে অর্গানাইজেশনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এটা একটা সনাতনী কৌশল।

ILOর আরেকটি Concept পেপারে বলা হয়,

“Indigenous communities, peoples and nations are those which, having a historical continuity with pre-invasion and pre-colonial societies that developed on their territories, consider themselves distinct from other sectors of the societies now prevailing in those territories, or parts of them. They form at present non-dominant sectors of society and are determined to preserve, develop and transmit to future generations their ancestral territories, and their ethnic identity, as the basis of their continued existence as peoples, in accordance with their own cultural, social institutions and legal systems.”

জাতিসংঘ ১৯৯৩ সালকে আদিবাসী বর্ষ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে আদিবাসীর সংজ্ঞা দিয়েছে এভাবে:

Indigenous people are such population groups as we are, who from old age times have inhabited the lands when we live, who are aware of having a characters of our own, with social tradition and means of expression that are linked to the country inhabited from our ancestress, with a language or our own and having certain essential and unique characteristics which confer upon us the strong conviction of belonging to a people, who have an identity in ourselves and should be thus regarded by others (1993).

উপরের ধারণাপত্রগুলোতে যেভাবে আদিবাসীদের দেখা হয়েছে তার শর্তই হলো, যাদের প্রাক-আগ্রাসন ও প্রাক-সাম্রাজ্যবাদী অধিকারের আগে থেকেই কোন অঞ্চলে অবস্থানের একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা আছে। এরা dominant সমাজের সদস্য নয়। সেই হিসেবে বাঙলাদেশে ধর্মীয় দিক দিয়ে খ্রিস্টান-হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম হচ্ছে dominant সমাজ। তাহলে কোন প্রকৃতি-উপাসক কখনো ধর্মান্তরিত হয়ে সমাজচ্যুত হয়ে ধর্মীয় দিক দিয়ে কোন dominant সমাজের সদস্য হলে তার পরিচয় কি হবে? কিম্বা হিন্দু সমাজে যারা নিচু জাত হিসেবে বিবেচিত তাদের ধর্মীয় পরিচয় হিন্দু হলেও আদতে সমাজে তারা Non-dominant হিসেবেই বিবেচিত। তাদেরও নিজস্ব কিছু ইনফরমাল সিষ্টেম আছে। তাহলে তারাও কি আদিবাসী? তাছাড়া যারা আদিতে এ অঞ্চলে আগমন করে নাই, আদিবাসী স্বিকৃতি পাবার মাধ্যমে জমির উপরসহ অন্যান্য নানা ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধা আরোপকে ঐ সমাজের অন্যান্যরা কোন যুক্তিতে মেনে নেবে? উপরোক্ত সংজ্ঞার আওতায় কাউকে আদিবাসী স্বিকৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রণীত অধিকার দেবার চেষ্টা হলে নির্ঘাৎ বৃহৎ সমাজের সাথে এদের এক ধরনের সংঘাতের সৃষ্টি হবে। এর পরিণতিতে তাদের অস্তিত্ব হুমকীর মুখে পড়তে পারে। এভাবে জাতিগত বিদ্বেস সৃষ্টি করে কোন পক্ষ লাভবান হবে?

কাউকে আদিবাসী স্বীকৃতি দেবার জন্য ‘আগমনের সময়কাল’কে অবজ্ঞা করতে গিয়ে সংজ্ঞায়নে আরো জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। যারা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নামে এই ধরনের গাইড লাইনগুলো দিয়ে থাকেন, তাদের মূলতঃ এ অঞ্চলের সামাজিক/পারিবারিক সম্পর্ক (Kinship System) সম্পর্কে কোন ধারণা নেই বলে আমার মনে হয়। তাছাড়া সময়কালকে অগ্রাহ্য করে অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের আলোকে কেউ Indigenous হিসেবে দাবী করতে চাইলে এই শব্দের যথার্থ বাঙলা শব্দ কখনো আদিবাসী হতে পারে না। বরং অন্য কিছু হবে। আদিবাসী হিসেবে যারা স্বিকৃতি চান কিম্বা তাদের দাবীর প্রতি সহানুভূতিশীল মহল সংজ্ঞায় বসবাসের ‘সময়কালকে’ অগ্রাহ্য করলেও নাম নির্বাচনে ‘আদিবাসী’ শব্দটা খুব পছন্দ করেন।

অন্যদিকে, Oxford Dictionaryর সংজ্ঞা অনুযায়ী, আদিবাসী হলেন তারা:

‘(formal) belonging to a particular place rather than coming to it from somewhere else’.

এর সমার্থক শব্দ হিসেবে Native উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই সংজ্ঞামতে, আদিবাসী তারাই যারা ঐ অঞ্চলে প্রথম থেকে বসবাস করে আসছে। এই সংজ্ঞার আলোকে আদিবাসী হবার দাবীদার অনেকেরই দাবী খারিজ হয়ে যাবে।

Chris Cunningham আদিবাসী সংক্রান্ত এই জটিলতাটা বুঝতে পেরে স্বিকার করেছেন, অষ্ট্রেলিয়াতে এ্যাবঅরিজিনাল কিংবা আমেরিকা কানাডার ফার্ষ্ট নেশন কথার মাধ্যমে সেখানকার আদিবাসীদের সহজেই বুঝান যায়। কিন্তু বাদবাদী বিশ্বের বেলায় সেটা বুঝান বেশ কষ্টকর। Chris তার লেখায় Te Ahukaramu Charles Royal এর সংজ্ঞা ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন। তিনি্ আদিবাসী সংজ্ঞার এই নতুন ডাইমেনশনকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গী’ (world views) নামে। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী:

‘indigenous is used for those cultures whose world views place special significance on the idea of the unification of the humans with the natural world’.

এখানে তিন ধরনের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গীর বিবরণ আছে। ওয়েষ্টার্ন, ইষ্টার্ন এবং ইন্ডিজেনাস। ইন্ডিজেনাস বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গীর বিবরন দেয়া এভাবে,

‘which sees people as integral to the world, with humans having a seamless relationship with nature which includes seas, land, rivers, mountains, flora, and fauna’.

এখানে আসলে তেমন নতুন কিছু নেই। আগের দেয়া সংজ্ঞা এবং ধারণাপত্রগুলোই ভিন্ন সুরে গাওয়া হয়েছে।

তার সংজ্ঞা মেনে নিলে এই প্রকৃতির একদল মানুষ বাঙলাদেশের সমতলে গিয়ে কয়েক বছর আগে বসতি গড়লে তারাও কি ঐ অঞ্চলে আদিবাসী হিসেবে বিবেচিত হবেন? বিষয়টা কেবল অযৌক্তিক নয়, হাস্যকরও বটে! Royalএর সংজ্ঞা অনুযায়ী আজকালকার অনেক পরিবেশ আন্দোলনকারীও আদিবাসী দলে পড়ে যাবে। তারাও মানুষকে প্রকৃতির ইন্ট্রিগেরাল অংশ মনে করে।

বাঙলাদেশের কিছু বুদ্ধিজীবী যেভাবে আদিবাসী শব্দটিকে সংজ্ঞায়িত করতে চান, তার সাথে Te Ahukaramu Charles Royal ধারণার মিল আছে। অর্থাৎ

”আধুনিক জনগোষ্ঠীর জৈব, সামাজিক প্রভাবজাত নয়, এমন জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী বলা হয়” (মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী, প্রথম আলো)।

সেই হিসেবে তিনি প্রস্তাব দেন, সংসদে আদিবাসী প্রস্তাবটি পাশ হলে বরেন্দ্র সমতল অঞ্চলে বসবাসকারী, এমনকি বাগেরহাটে বসবাসকারী রাজবংশীদেরকেও আদিবাসী হিসেবে মর্যাদা দেয়া যাবে। উনিও এখানে সুকৌশলে আদিবাসী হবার আরেকটি আলোচিত বিষয়, ‘সময়কালকে’ ইগনোর করেছেন। এভাবে জোর করে কাউকে আদিবাসী বানাতে চাইলে যে সমস্যাগুলোর সৃষ্টি হবে, ওনারা সেগুলো বিবেচনাতেই আনেননি। উনি নিজেই উল্লেখ করেছেন যে,

“আদিবাসী জনগণের রয়েছে সে সব ভূমি, ভৌগলিক এলাকা, সম্পদ সমূহের উপর অধিকার যা তারা ঐতিহ্যগতভাবে অধিকার, দখল বা অন্যভাবে ব্যবহার অথবা অর্জন করে এসেছে।”(অনুচ্ছেদ ২৬, দফা ১।

২০০৬ সালের ২৯শে জুন, আদিবাসী জনগণের অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের ঘোষনাপত্র)।

আমাদের দেশের Kingship System বা আত্নীয়তার সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে যে উত্তারাধিকার সম্পর্কগুলো নির্ধারিত হয়, সেখানেও তো আপনি সম্পদের “ঐতিহ্যগতভাবে অধিকার, দখল বা অন্যভাবে ব্যবহার অথবা অর্জন” প্রথা খুঁজে পাবেন। এমনকি এখনো এই প্রথা অনেক গ্রামাঞ্চলে চালু আছে। ঐতিহ্যগতভাবে বংশ পরম্পরায় যে জমিগুলো কোন বংশের অধীনে ছিল, জমি কেনাবেঁচার সময় সাধারণতঃ সেই জমি নিজ বংশের কারো কাছে বিক্রী করার অলিখিত নিয়ম আছে। এটা বাধ্য করতে বংশের পক্ষ থেকে চাপও থাকে। এভাবে অন্যায্য এবং অযৌক্তিকভাবে আদিবাসী হিসেবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী স্বীকৃতি পেলে কেবল পাহাড়ী অঞ্চলেই নয়, বলতে গেলে পাহাড়ী জেলাগুলো বাদেও বাগেরহাট, নেত্রকোনা, সিলেট, রাজশাহী, মৌলভী বাজারসহ দেশের আরো কিছু অঞ্চলে ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দেবে। সৃষ্টি হবে জাতিগত টেনশন।

তথ্য সূত্রঃ

  • ১) UN ডকুমেন্ট
  • ২) ILO ডকুমেন্ট
  • ৩) IFAD ডকুমেন্ট
  • ৪) Indigenous by definition, experience, or world view; Links between people, their land, and culture need to be acknowledged, Chris Cunningham, director of health research
  • ৫) Country Technical Note on Indigenous People’s Issues (DRAFT), by Raja Devasish Roy, March 2010, IFAD.

 

৪।। আদিবাসীর সংজ্ঞার আলোকে বাঙলাদেশে আদিবাসী কারা?

বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল বলে পাহাড়ীরা কিম্বা সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী স্ব স্ব অঞ্চলের আদি বাসিন্দা নন। এটা মোটামুটিভাবে প্রমাণিত যে, এ অঞ্চলের আদি বাসিন্দা হচ্ছে বাঙালী, কিন্তু বাঙালীরা আদিবাসী (Indigenous People অর্থে) নয়। কারণ আদিবাসী সংজ্ঞায় আরো কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়। যেমন: বিভিন্ন কারণে তাদের অস্তিত্ব হুমকীর সম্মুখীন এবং অন্যান্য। অতএব, সংজ্ঞা এবং বাস্তবতার আলোকে এই উপসংহারে আসা যায়, বাঙলাদেশের আদিবাসিন্দা বাঙালী। তবে বাঙলাদেশে কোন আদিবাসী নেই এবং কখনো ছিল না। এ প্রসঙ্গে ভূ রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর আব্দুর রবের সাক্ষাৎকার থেকে কয়েকটি প্যারা তুলে ধরবো:

১) খোদ চাকমা পণ্ডিত অমেরেন্দ্র লাল খিসা অরিজিনস অব চাকমা পিপলস অব হিলট্রেক্ট চিটাগংএ লিখেছেন,

‘তারা এসেছেন মংখেমারের আখড়া থেকে পরবর্তীতে আরাকান এলাকায় এবং মগ কর্তৃক তাড়িত হয়ে  বান্দরবানে অনুপ্রবেশ করেন। আজ থেকে আড়াইশ তিনশ; বছর পূর্বে তারা ছড়িয়ে পড়ে উত্তর দিকে রাঙামাটি এলাকায়।’

এর প্রমাণ ১৯৬৬ বাংলাদেশ জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি প্রকাশিত দি অরিয়েন্টাল জিওগ্রাফার জার্নাল।

২) পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান লোকসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বাঙালি এবং বাকি অর্ধেক বিভিন্ন মঙ্গোলীয় গোষ্ঠীভুক্ত উপজাতীয় শ্রেণীভুক্ত। একথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য আদিকাল থেকে এ অঞ্চলে উপজাতি জনগোষ্ঠীর বাইরের ভূমিপুত্র বাঙালিরা বসবাস করে আসছে। তবে জনবসতি কম হওয়ায় বিভিন্ন ঘটনার বা পরিস্থিতির কারণে আশপাশের দেশ থেকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন এসে বসতি স্থাপন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকি জাতি বহির্ভূত অন্য সকল উপজাতীয় গোষ্ঠীই এখানে তুলনামূলকভাবে নতুন বসতি স্থাপনকারী। এখানকার আদিম জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ম্রো, খ্যাং, পাংখো এবং কুকিরা মূল ‘কুকি’ উপজাতির ধারাভুক্ত। ধারণা করা হয়, এরা প্রায় ২শ’ থেকে ৫শ’ বছর আগে এখানে স্থানান্তরিত হয়ে আগমন করে। চাকমারা আজ থেকে মাত্র দেড়শ’ থেকে ৩শ’ বছর পূর্বে মোগল শাসনামলের শেষ থেকে ব্রিটিশ শাসনামলের প্রথম দিকে মায়ানমার আরকান অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে (Lewin 1869)। প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এবং ব্রিটিশ প্রশাসক টি. এইচ. লেউইন-এর মতে,

“A greater portion of the hill tribes at present living in the Chittagong Hill Tracts undoubtedly come about two generations ago from Aracan. This is asserted both by their own traditions and by records in Chittagong Collectorate”. (Lewin, 1869, p. 28)।

পার্বত্য অঞ্চলের মারমা বা মগ জনগোষ্ঠী ১৭৮৪ সনে এ অঞ্চলে দলে দলে অনুপ্রবেশ করে এবং আধিপত্য বিস্তার করে (Shelley, 1992 and Lewin, 1869)। এরা ধর্মে বৌদ্ধ মতাবলম্বী। এরা তিনটি ধারায় বিভক্ত। যেমন: জুমিয়া, রোয়াং ও রাজবংশী মারমা।

চাইলে এ রকম আরো অনেক উদাহরণ টানা যেত, যেগুলো প্রমাণ করে আদিবাসীর দাবীদাররা এ অঞ্চলে কখনো আদিতে আগমন করেননি। তারা যেভাবে আদিবাসী দাবী করছে, একই যুক্তিতে মায়ানমারের রোহিঙ্গারাও আদিবাসী দাবী করতে পারে। অথচ তারা এখনো সেই অর্থে মায়ানমারের নাগরিকত্ত্বও পায়নি।

মোঃ আদনান আরিফ সালিম তার লেখায় বিভিন্ন তথ্য প্রমাণ ঘেঁটে বলেছেন, বস্তুত পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত কোন জনগোষ্ঠীই স্মরণাতীত কাল থেকে সেখানে ছিল না। এরা ভারতের ত্রিপুরা, আরাকানসহ বিভিন্ন পাহাড়ী অঞ্চল থেকে এখানে অভিবাসন করেছে। এরা খুব বেশি হলে দুই পুরুষ পূর্বে আরাকানের পাহাড়ী অঞ্চল থেকে অভিবাসিত হয়ে বাঙলাদেশের পার্বত্য জেলাগুলো বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থান নিয়েছে।

প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এবং ব্রিটিশ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম জেলা প্রশাসক Thomas Herbart Lewin এর মতে,

 A greater portion of the hill tribes at present living in the Chittagong Hill Tract undoubtedly came about two generations ago from Arakan. This is asserted both by their own traditions and by records in Chittagong Collectorate. It was in some measure due to the exodus of our hill tribes from Aracan that the Burmese war of 1824 took place … hired in a great measure upon refugee from hill tribes who, fleeing from Aracan into territory, were purshed and demanded at our hands by the Burmese. (Lewin 1869, pp 28-29).  সূত্রঃ ইনকিলাব।

অন্যদিকে সুপ্রিয় তালুকদার মায়ানমারের চম্পক নগর ঘুরে এসে লিখেছেন, চাকমাদের আগমন মায়ানমারের চম্পক নগর থেকেই।

আদিবাসী দাবীদারদের পক্ষের গোষ্ঠী শুরুতে তাদের আদি বাসিন্দা দাবী করে আদিবাসীর স্বীকৃতি চাইতো। ক্রমশ সত্যটা দিবালোকের মতো পরিস্কার হবার পরে তারা এখন সংজ্ঞার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যর আলোকে আদিবাসী স্বিকৃতি চায়। এই অংশের ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়, পশ্চাৎপদ, আধুনিক সমাজের থেকে পিছিয়ে। রাজা দেবাশীষ রায় একটা জায়গায় লিখেছিলেন, তারা ‘উপজাতি’ এবং ‘ট্রাইব’ শব্দ দু’টো বাদ দিতে চান। তারা মনে করেন, শব্দ দু’টো সাথে পশ্চাদপদতা (backwardness’) এবং আদিম যুগের (primitiveness) একটা গন্ধ মিশে আছে। ’আদিবাসী’ শব্দটার সাথেও কি পশ্চাদপদতা কিম্বা আদিম যুগের গন্ধ মিশে নেই? তারপরেও আদিবাসী শব্দটা তাদের পছন্দের। কারণ এই দাবী আদায়ের সাথে সাথে তারা কিছু বাড়তি অধিকার ভোগ করতে পারবে। সেই সাথে তারা যতোটা আন্তর্জাতিকভাবে বাড়তি নজর পাবে যার সুযোগ ব্যবহার করে পার্বত্য অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন করা সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। একটা সময়ে স্বাধীন জুম্মল্যান্ডের দাবীকেও তারা এক ধাপ এগিয়ে নিতে পারবে। মূলতঃ তিনটা একই ধরনের শব্দের মধ্যে দু’টো নিয়ে আপত্তির কারণ এবং তৃতীয়টি গ্রহণের পক্ষে মনোভাব দেখে সহজেই আঁচ করা যায় তাদের মূল উদ্দেশ্য কি!

অষ্ট্রেলিয়ায় যাদের Indigenous হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, তারা সংজ্ঞার সবগুলো বৈশিষ্ট্যই ধারণ করে। তারা এই ভূমির আদি বাসিন্দা। ইউরোপ থেকে মানুষ এসে তাদের হত্যা, দমন এবং নিপীড়ন করে ভূমির উপর কর্তৃত্ব নেয়। তারা এখনো মূলধারার চেয়ে অনেক অনেক পিছিয়ে। অতএব, Indigenous People হিসেবে স্বিকৃতি দিয়ে মূলতঃ ভূমির উপরে তাদের বাড়তি অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এবং তারা যেহেতু মূলধারার সাথে তুলনামূলকভাবে উন্নয়নে অনেক পিছিয়ে, এই স্বীকৃতির মাধ্যমে তাদেরকে সামনে এগিয়ে আনার একটা চেষ্টা হয়েছে। বাঙলাদেশের ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী মূলধারা সাথে তুলনামূলকভাবে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে সেটা সত্য বটে। উন্নয়নের এই গ্যাপটা কমানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোটা সিস্টেম আছে। তাহলে বাড়তি করে আদিবাসী স্বীকৃতির জন্য এতো চেষ্টা কেন? পাহাড়ীদের তুলনামূলক পিছিয়ে থাকার বা অনুন্নয়নের কারণই বা কি? তারা কি সংখ্যাগরিষ্ঠদের দ্বারা নিপীড়ন কিম্বা শোষণের শিকার? নাকি তাদের ’ভিন্ন সমাজ’ বা ‘ভিন্ন সংস্কৃতির’ সাথে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার প্রবণতাই দায়ী? প্রথমটা সত্য হলে রাষ্ট্রকে শোষণ পরিহার করে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য সমঅধিকারের পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য যে ধরণের সামাজিক আন্দোলন করা দরকার সেটা করা উচিত। আমাদের সংবিধানেই দেশের সকল নাগরিকের জন্য সমঅধিকারের বিষয়টা স্পষ্ট উল্লেখ আছে। যদিও বাস্তবে সেটার চর্চা নেই। এই সমস্যার প্রকৃতি ভিন্ন। আর মূলধারার সাথে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার প্রবণতা দায়ী হলে বুঝতে হবে ঐ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতির মধ্যেই এই বিচ্ছিন্ন থাকার উপাদান রয়েছে। তাহলে সেটা নিয়ে কিভাবে কাজ করা যায় তাই ভাবতে হবে।

এতো সব অস্পষ্টতা স্বত্ত্বেও যারা পাহাড়ে বসবাসকারীদের আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে চান তাদেরকে অবশ্যই ’বারডেন অব প্রুফের’ আওতায় তাদের দাবীর ন্যয্যতা পরিস্কার করে তুলে ধরতে হবে। সেই সাথে সরকারকেও তার অবস্থান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরতে হবে। দেশীয় কিছু সংস্থার চাপে কোন আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক প্রণীত কোন ধারণাপত্রের মাধ্যমে চাপিয়ে দেয়া কোন শর্ত কোন স্বাধীন রাষ্ট্র মেনে নিতে পারে না।

তথ্যসূত্র

  • ১) সুপ্রিয় তালুকদারঃ মায়ানমারে চম্পকনগরের পথে।
  • ২) IFAD ডকুমেন্ট
  • ৩) বাংলাদেশে ওরা আদিবাসী নয় : ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যাপক মাহফুজ আহমেদ | প্রকাশের সময় : ২০১৫-০৮-০৮, দৈনিক ইনকিলাব
  • ৪) Country Technical Note on Indigenous People’s Issues (DRAFT), by Raja Devasish Roy, March 2010, IFAD.

 

 

৫।। আদিবাসী বিতর্কে নাগরিক সমাজের অবস্থান

বেশ আগে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আরটিভি সুন্দর একটা টকশোর আয়োজন করেছিল। গোলাম মোর্তজার সঞ্চালনায় অতিথি হিসেবে ছিলেন জেনারেল (অব.) ইব্রাহীম এবং চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়।আদিবাসী স্বীকৃতি পেলে এর পরিণাম কি কি হতে পারে ঐ অনুষ্ঠানে জনাব ইব্রাহীম সেগুলো খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ২০০৭ সালে প্রণীত জাতিসংঘের ডিক্লারেশন ৩, ৪ এবং ১৮ ধারা মোতাবেক, স্বীকৃতি পাওয়া আদিবাসীদের চাহিদা অনুযায়ী তাদেরকে স্বায়ত্বশাসন দিতে রাষ্ট্র বাধ্য থাকবে। পাহাড়ীদের অনুমতি ছাড়া কেউ সেখানে বাস করতে পারবে না এবং তাদের অনুমতি ও সম্মতি ছাড়া ঐ এলাকায় রাষ্ট্র কোন রকমের সামরিক তৎপরতা চালাতে পারবে না।

জনাব ইব্রাহীমের দেয়া তথ্য খণ্ডাতে পারেননি রাজা দেবাশীষ রায়। এমনিতে পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টি করে রেখেছে একটা গোষ্ঠী। বাংলাদেশ থেকে পৃথক হওয়া তাদের লক্ষ্য। এই পরিস্থিতিতে আদিবাসী স্বীকৃতি নিয়ে স্বায়ত্বশাসনের দাবী জোরালো হলে সরকার আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে পড়বে। দেবাশীষ রায় কৌশলে জনাব ইব্রাহীমের স্বায়ত্বশাসনের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে এটাকে ইউনিয়ন পরিষদের স্বশাসনের সাথে গুলিয়ে বিষয়টাকে হালকা করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

জনাব ইব্রাহীম আরো বলেন, রাজা দেবাশীষ রায় একটা আদিবাসী ফোরামের সদস্য এবং এই ফোরাম জাতিসংঘের মাধ্যমে শর্ত দিয়েছে, আগামীতে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী বিশ্বের কোন দেশে শান্তি মিশনে গেলে পাহাড়ীদের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে যে, সেনাবাহিনী সেখানে কোন মানবাধিকার লংঘন করে নাই। ’মানবাধিকার লংঘন’ ক্ষেত্র বিশেষে একটা আপেক্ষিক শব্দ। পাহাড়ী সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর অভিযানকে সংজ্ঞায়িত করা হলে সেটাও হবে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভাষায় মানবাধিকার লংঘন। এই দাবী প্রতিষ্ঠা করতে পারলে পাহাড়ের সহিংসতাকে থামানো যাবে না। আমরা জানি, পাহাড়ীদের একটা অংশ রাঙ্গামাটিকে রাজধানী করে জুম্মল্যান্ড করার স্বপ্ন দেখছেন।

ড. জাফর ইকবাল ২০১১ সালের আগষ্ট মাসে ’প্রথম আলোতে’ ‘কারও মনে দুখ দিয়ো না…’ নামে একটা কলাম লেখেন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন, যার মধ্যে একটা ছিল ‘আদিবাসী’ ইস্যু। স্বভাবসুলভ ভঙ্গীমায় যুক্তি কম, আবেগ নির্ভর এবং অনেকগুলো ভুল তথ্যে ভরা ছিল লেখাটি। তিনি এই কলামে লিখেছেন, “মাত্র অল্প কয়দিন আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা হয়েছে—প্রথমবারের মতো আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, প্রতিবন্ধী কোটার সঙ্গে সঙ্গে আদিবাসী কোটায় ছাত্রছাত্রী ভর্তি করেছি।” এরপরেই তিনি লেখেন, ”দেশে যদি আদিবাসী নেই, তাহলে আদিবাসী কোটায় আমরা কাদের ভর্তি করেছি?” জাফর সাহেবে যাকে ‘আদিবাসী কোটা’ বলেছেন, আদতে ওটা হবে ‘উপজাতি কোটা’। ওনার মতো একজন শিক্ষাবিদ কি ভুল করে লিখলেন নাকি না জেনে লিখলেন? Indigenous কথার অর্থ খুঁজতে ডিকশনারী ঘাঁটতে গিয়ে ওনার পছন্দ মতো অর্থ খুঁজে না পেয়ে মর্মাহত হয়েছেন।

জনাব প্রশান্ত ত্রিপুরা, ১৯৯৩ সালে আন্তর্জাতিক আদিবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে “আন্তর্জাতিক আদিবাসী বর্ষ এবং বাংলাদেশের আদিবাসী জনগণ” শীর্ষক একটা নিবন্ধ লেখেন। নিবন্ধের শুরুতে অস্পষ্ট বিবরণের মাধ্যমে একটা যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি লিখেছেন, “কিছু শিল্পোন্নত দেশ Indigenous জনগোষ্ঠীর ধারণা এবং তাদের বিশেষ অধিকারের প্রশ্নকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিলেও অন্য অনেক দেশে অনুরূপ কোন উদ্যোগ নেই।” তিনি পরিস্কার করে বলেননি যে, ‘কিছু শিল্পোন্নত দেশ’ অর্থাৎ অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং আমেরিকার মতো আরো কিছু দেশে যেখানে এই স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে সেখানে Indigenous-রা হলো Native, অর্থাৎ তারা ঐ ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা। ইউরোপিয়ানরা সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য নতুন নতুন ভূমি দখল করে ’বহিরাগত’ হিসেবে এসব অঞ্চলে গেঁড়ে বসে। এই সত্যটুকু পরিস্কারভাবে না লিখলে পাঠকের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। Indigenous হিসেবে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি না পাওয়ায় তিনি  আক্ষেপ করে লিখেছেন, ”কিন্তু একজন গারো, সাঁওতাল বা ম্রোর কাছে এই সরকারী ব্যাখ্যা তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করারই নামান্তর।” আদিবাসী স্বীকৃতির অভাবে কিভাবে তাদের অস্তিত্ব সংকটে পড়ল তার ব্যাখ্যা নেই। শেখ মুজিবের ’বাঙালী’ করার ঘোষণা বাস্তবে তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হলেও রাজনৈতিক কারণে হয়তো তিনি এই সঠিক স্থানে আঘাত করতে সাহস পাননি।

জনাব ত্রিপুরার লেখায় আদিবাসী কথাটার অর্থ কি এবং বাংলাদেশে উপজাতি হিসেবে পরিচিত গোষ্ঠীগুলোকে আদৌ আদিবাসী বলা যায় কিনা প্রশ্নগুলো পরিস্কারভাবে করলেও উত্তরগুলো পরিস্কার নয়। সময়ের ’আপেক্ষিকতাকে’ ঢাল হিসেবে নিয়ে উনি এ অঞ্চলে পাহাড়ী নাকি বাঙালীরা আগে বসতি গড়ে সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে এড়িয়ে গেছেন। তিনি লিখেছেন, “অর্থাৎ স্থান ও কালের সীমানা কিভাবে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে, তার উপরই নির্ভর করছে কোন প্রেক্ষিতে কাদের আমরা Indigenous বলতে পারি। আমরা যদি সুদূর প্রাগৈতিহাসিক অতীতে চলে যাই তাহলে Indigenous কথাটি অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।”

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আদিবাসী বিতর্ক বিষয়ক স্থান তো নির্দিষ্ট। এবং ‘সময়’ সম্পর্কিত ধারণাও পরিস্কার। অর্থাৎ নির্দিষ্ট ভূখন্ডে আদিবাসীর দাবীদার যারা তারা কি ওখানে সংখ্যাগুরুর আগে এসেছিল নাকি পরে! বাঙালীদের আগমন আগে ঘটে থাকলে তারা ঐ অঞ্চলে পরে আসা অন্য জনগোষ্ঠীর ভূমির উপর অতিরিক্ত দাবীকে মেনে নেবে কেন? এভাবে বিভিন্নজনে আদিবাসী স্বীকৃতিকে পাকা করার জন্য বারবার অষ্ট্রেলিয়া, আমেরিকা এবং কানাডাকে টেনে আনলেও সেখানে স্বীকৃতি পাওয়া Indigenous-দের সাথে আমাদের এখানকার দাবীদারদের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যকে তুলে ধরছেন না। সেটা পরিস্কার করলে তাদের দাবীটাই অসাড় হয়ে যায়। মানুষকে এতো সহজে তাদের দাবীর দিকে টেনে আনা যাবে না। মূলতঃ বাঙলাদেশে যারা আদিবাসী স্বীকৃতির জন্য লড়ছেন, তাদের কাছে ‘আবেগ’ এবং ‘পরদেশের’ উদাহরণ ছাড়া শক্ত কোন যুক্তি নেই।

একটা পর্যায়ে তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে জাতিসংঘের আদিবাসী সংক্রান্ত দিক নির্দেশনা বা ধারণার একটা নিজস্ব সম্প্রসারিত ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন যেখানে শব্দটির মূল দ্যোতনা ‘আদি’কেই অস্বীকার করা হয়েছে। ”কোন দেশে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাদের পূর্ব পুরুষেরা প্রথমে সেখানে বসতী গেড়েছিল, এ প্রশ্ন গৌণ, মূলত: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তথাকথিত সভ্যতার বিকাশের শিকার tribal, primitive প্রভৃতি ঔপনেবিশিক আখ্যায় ভূষিত জনগোষ্ঠীদের সবাই Indigenous অভিধার বৈধ দাবীদার”।

সভ্যতার একই আক্রমণের শিকারতো আজ বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীও! তাহলে তারাও কি সেই একই দাবী করে বসবে? কিম্বা মায়ানমারের রোহিঙ্গারা? বরঞ্চ তার এই সম্প্রসারিত ব্যাখ্যার সূত্র ধরে এই জনগোষ্ঠীকে ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠী’ বলাই শ্রেয়। ‘বাংলাদেশী’ পরিচয় নির্ধারণেও তার কিছুটা আপত্তি আছে। তার ভাষায় এটা ‘আদিবাসীদের’ কথা ভেবে করা হয়নি। যে দেশটার নাম বাংলাদেশ, তার নাগরিকরা বাঙলাদেশী হবে না তো কি হবে? ভারতীয় নাগরিকদের ভারতীয়, পাকিস্তানীদের পাকিস্তানী বলা গেলে বাংলাদেশের নাগরিকরা তো বাংলাদেশীই হবে! পরোক্ষভাবে উনি কি দেশের নামটা পরিবর্তনের কথা বলছেন?  এথনিক পরিচয়ে জাতীয়তা এবং রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদ বা ন্যাশনালিটির পার্থক্য নিশ্চয়ই উনি অনেকের চেয়ে ভাল বুঝেন। এভাবে ‘বাংলাদেশী’ পরিচয় নিয়ে সংশয়ে থাকার অর্থ প্রচ্ছন্নভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদকেই ইঙ্গিত দেয়।

কিছু কিছু বাঙালীর এবং আরো বৃহত্তর পরিচয়ে বাংলাদেশীদের (কিছু কিছু) ’আবেগ’ সহজিয়া বা স্বাভাবিক নয়। এটা একধরনের ইমোশনাল ব্লাকমেইল।’ এদের আবেগ কোন ঘটনার কারণে স্বাভাবিকভাবে আসে না। কোন বিষয়কে নিজের অনুকূলে আনার জন্য এই বিশেষ ধরনের ’আবেগ’ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সৃষ্টি করা হয়। কেবলমাত্র মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আবেগ সৃষ্টি করে শাহবাগে লাখ লাখ মানুষ জড়ো করা গোষ্ঠী পরিশেষে কোটি কোটি টাকার মালিক হবার গল্প বাতাসে ওড়ে। একইভাবে আবেগের কৌশলী ব্যবহারের মাধ্যমে একটা গোষ্ঠী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দিতে চায়।

শ্রদ্ধেয় আতাউস সামাদ তার এক লেখায় বিবিসির সাংবাদিক থাকাকালীন সময়ের কিছু অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। সেই আশির দশকে যখন শান্তিবাহিনীর বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন তুঙ্গে, সে সময় থাইল্যান্ড বা জাপানে বৌদ্ধ সম্মেলন হলে এই সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সমর্থনে উদ্বেগ প্রকাশ করে যে বিবৃতি দেয়া হতো, মাঝে মাঝেই সেখানে লেখা থাকত ‘ওই এলাকায় বৌদ্ধদের উপরে অত্যাচার চলছে’। এভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সমর্থনে একটা জনমত সৃষ্টিতে দেশের বাইরের একটা গোষ্ঠী বেশ সোচ্চার ছিল। এখন এর পরিধি অনেক বেড়েছে। দেশের ভিতরে তথাকথিত কিছু মানবাধিকার সংগঠন এবং কিছু ব্যাক্তি ‘আদিবাসী’ বিতর্ককে উস্কে দিচ্ছেন।

জনাব আতাউস সামাদ সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, ঐ এলাকার এতো হই হট্টগোলের প্রধান উদ্দেশ্য সম্ভবত সেখানে বসতী স্থাপনকারী বাঙালীদের ফিরে যেতে বাধ্য করা। তিনি দেখিয়েছেন ২০১০ সালের ফ্রেব্রুয়ারীতে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘটা গোলযোগকে কেন্দ্র করে যেটা হয়ে গেল সেখানে দেখা গেছে প্রশাসন শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করে। অসহায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালী নারী পুরুষ শিশু রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে দাড়িঁয়ে থাকলেও তাদেরকে কোন ত্রাণ দেয়া হয়নি। বাঘাইহাটে বাঙালীদের যে ঘরবাড়ী পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল সেগুলো তখনো পর্যন্ত পাহাড়ীদের দখলে ছিল(বর্তমানের খবর জানা নেই আমার)। একই সূত্র থেকে জানা যায়, এক পাহাড়ীর কাছ থেকে বাঙালী জমি কিনলে তা তার দখলে না দিয়ে কোন এক এনজিওকে দিয়ে দেয়া হয়। শুরু হয় উত্তেজনা।

পাহাড়ের উত্তেজনার পিছনে এক তরফাভাবে বসতি স্থাপনকারী বাঙালী- বাংলাদেশীদের দোষ চাপানো সব সময় ঠিক নয়। এটাকে ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান বলে না। কিছু কিছু পত্রিকা তাদের বিভিন্ন লেখায় সরকারী অবস্থান থেকে সরে গিয়ে ‘আদিবাসী’ শব্দটা ব্যবহার করে ধৃষ্টতার পরিচয় দিচ্ছে। এ রকমের একটা স্পর্শকাতর বিষয়ে রাষ্ট্রিয় সিদ্ধান্তের বাইরে তাদের নিজস্ব অবস্থান রাষ্ট্রিয় অবমাননা কিনা ভেবে দেখা জরুরী।

অনেকের মতো্ আমিও মনে করি, আদিবাসী স্বীকৃতির সাথে সাথেই সরকারের উপর আন্তর্জাতিকভাবে কিছু দায়িত্ব এবং বাধ্যবাধকতা চলে আসবে। প্রথমত: ভূমির উপরে অধিকারের বলে সেখানকার বাঙালী খেদাও আন্দোলন শুরু হবে। সেনা ক্যাম্প সরিয়ে নেয়ার দাবী উঠবে। বিভিন্ন দাবী দাওয়ার নামে পাহাড়ীদের একটা অংশ আন্দোলনের নামে যে বিচ্ছিন্নতার আন্দোলন শুরু করছে সেটা জোরদার করতে পারবে। আদিবাসী স্বীকৃতির সাথে সাথেই তাদের উপরে জাতিসংঘের একটা সরাসরি পর্যবেক্ষণ থাকবে এবং তারা তদারকি করার সুযোগ পাবে। এ সব ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মতো পশ্চিমা লেজুড়বৃত্তিক সংগঠনগুলো যেটা করে সেটা হলো: শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর জন্য এক নিয়ম আর আমাদের মতো দুর্বলদের জন্য আরেক নিয়ম। বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমন করতে সামরিক পদক্ষেপ নিলে তখন তারা সরাসরি জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মদদে ‘আদিবাসী’ বাঁচাও সুর তুলে সরকারের সাথে বিচ্ছিন্নতার দেনদরবার করার সুযোগ পাবে। দেশ রক্ষা করার জন্য জীবনবাজী রেখে পাহাড়ী অঞ্চলে মোতায়েনকৃত সৈন্যরা পরিচিত হবেন আগ্রাসী বাহিনী হিসেবে। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা হবেন মুক্তিযোদ্ধা।

তথ্যসূত্র:

 

শেষ।। আদিবাসী বিতর্কের শুরুটা যেভাবে

পার্বত্য সমস্যার এক সুদীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক পটভূমি রয়েছে। আগের একটা পর্বে উল্লেখ করেছিলাম, আদিবাসী দাবীদার ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর আগমন ঘটে মাত্র কয়েক পুরুষ আগে ভারত এবং মিয়ানমার থেকে। আমাদের পার্বত্য অঞ্চলে তারও আগে থেকে বাঙালীরা বসবাস করে আসছিলেন। যদিও সংখ্যার দিক দিয়ে কম ছিল। ওখানকার সমস্যার উৎপত্তির মনস্তাত্ত্বিক কারণ অনুসন্ধান করলে এই ‘অভিবাসনের’ ভূমিকা আছে। এখনো এদের শেঁকড় রয়েছে ঐ দুই দেশের মাটিতে। পূর্ব পুরুষদের স্মৃতি, তাদের ঐতিহ্য, অনেকটাই ওখানে। শেঁকড়ের টানের প্রথম প্রতিফলন ঘটে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময়। এরা চেয়েছিল, যেখান থেকে এসেছে, সেই দেশের মানচিত্রে থাকতে। শুরু থেকেই তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্ন থাকার এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সে কারণে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তানের সব জায়গাতে পাকিস্তানের পতাকা উড়লেও ১৫ আগষ্ট বান্দরবনে মায়ানমারের (তৎকালীন বার্মা) পতাকা এবং রাঙ্গামাটিতে ভারতীয় পতাকা ওড়ে। ১৭ আগস্ট দেশ বিভাগের মানচিত্র পরিস্কার হলেও প্রায় এক সপ্তাহ জুড়ে ওখানে তারা যথাক্রমে দুই দেশের পতাকা টাঙিয়ে রাখে। ২১ আগস্ট পাকিস্তানী সৈন্যরা বাধ্য করে মায়ানমার এবং ভারতীয় পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানী পতাকা তুলতে।

ভারত এবং মিয়ানমারমুখী মনোভাবের প্রভাবে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে পাক শাসকদের সাথে তাদের সম্পর্কের কিছুটা টানাপোড়েন চলে। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের সংকট থেকে তৎকালীন পাকিস্তানী শাসকরা সিদ্ধান্ত নেয়, সমতল থেকে বাঙালী নিয়ে ওখানে পুনর্বাসন করা। তাদের ধারণা ছিল, পাহাড়ীরা ঐ এলাকায় সংখ্যাগুরু থাকলে যে কোন সময় দেশের অখণ্ডতার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখা দেবে। এছাড়াও পাহাড়ী সমস্যাকে আরো তীব্র করতে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের একটা ভূমিকা আছে। আমেরিকার অর্থায়নে রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলায় অবস্থিত কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে বাঁধ নির্মাণের কাজ ১৯৫২ সালে শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৫৮ সালে। যান্ত্রিক ত্রুটির ফলে বাঁধ ভেঙ্গে পড়লে পুণরায় কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৬২ সালে। এই বাঁধ নির্মাণের সময় প্রায় এক লাখ স্থানীয়দের বসতভিটা ছাড়তে হয়। প্রায় ৪০ ভাগ আবাদী জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। কাপ্তাই বাঁধের প্রভাবে পানিতে ডুবে যায় চাকমা রাজার প্রাসাদ, যার সাথে তাদের আবেগ জড়িত। সম্ভবত ১৯৯৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে একবার রাঙামাটি গিয়েছিলাম। তখনো চাকমা রাজার বাড়ীর মাথাটা কোন মতে পানির উপর মাথা উঁচু করে টিকে ছিল। পরে শুনেছি (নিশ্চিত নই), চিরতরে পানির নিচে বিলীন হয়ে যায়।

এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে দেশটা স্বাধীন হোল। সেই যুদ্ধে পাহাড়ীরাও অংশ নেয়। বাঙলাদেশে বাঙালী ছাড়াও আরো অন্ততঃ ৫৪টা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বার অস্তিত্ব আছে। পাহাড়ী তিনটি জেলা বাদে অন্যান্য ৩০টিরও বেশী জেলায় তাদের বাস।

অক্টোরব, ১৯৭২। স্বাধীন বাঙলাদেশের যে সংবিধান রচনা করা হোল সেখানে বাঙালী বাদে বাকী সবাইকে অস্বীকার করা হয়। সংবিধানের ৩ নং ধারায় বলা হলো:

”বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে, বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবে।”

এর প্রতিবাদে ওয়াক আউট করেছিলেন পাহাড়ী অঞ্চলের একমাত্র প্রতিনিধি মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা। এরপর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে রাঙ্গামাটি সফরে গেলে ১৫ ফেব্রুয়ারী পার্বত্য চট্টগ্রাম গণপরিষদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা নিচের ৪টি দাবী পেশ করেন,

  • ১) পাহাড়ের স্বায়ত্বশাসন
  • ২) পার্বত্য এলাকার জন্য ১৯০০ সালের ম্যানুয়েল অব্যাহত রাখা
  • ৩) তিন জাতির চীফের দপ্তর বিলুপ্তি না করা এবং
  • ৪) ঐ এলাকায় বাঙালী অনুপ্রবেশ রোধ করা।

সব শুনে মুজিব বললেন,

‘লারমা তুমি যদি বেশি বাড়াবাড়ি করো তাহলে এক লাখ, দুই লাখ, তিন লাখ, দশ লাখ বাঙালি পার্বত্য চট্টগ্রামে ঢুকিয়ে দেব। পার্বত্য চট্টগ্রামে আমি তোমাদের সংখ্যালঘু করে ছাড়ব।’  (সূত্রঃ পার্বত্য শান্তিচুক্তিঃ বর্তমান প্রেক্ষিত, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।)

১৯৭৩ সালে শেখ মুজিব পাহাড়ীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “তোরা সব বাঙালী হয়ে যা”। এটা ছিল  আক্ষরিক অর্থে এক বর্ণবাদী আহবান। বাঙলাদেশ স্বাধীন হবার পরে এভাবেই পাহাড়ে গোলযোগের সূত্রপাত হয়।  ফলশ্রুতিতে, ১৯৭৩ সালে শান্তিবাহিনী গঠনের মাধ্যমে শুরু হোল সশস্ত্র  আন্দোলন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে ১৯৭৮ সালে The Proclamations (Amendment) order,1978-এ Citizenship এর মাধ্যমে সংবিধানের বর্ণবাদী অংশটুকু পরিবর্তন করেন, “The citizens of Bangladesh shall be known as Bangladeshis.” কিন্তু বিচ্ছিন্নতার যে বীজ ইতিমধ্যে রোপিত হয়ে গেছে, সংবিধানের এই পরিবর্তনে কোন লাভ হয়নি। অন্ততঃ এই সংশোধনীর মাধ্যমে পবিত্র সংবিধান বর্ণবাদী কলঙ্ক থেকে রক্ষা পায়।

জিয়া ক্ষমতায় এসে ১৯৭৯ সালে ’পপুলেশন ট্রান্সফার’ এর আওতায় প্রায় ৪ লাখ সমতল অঞ্চলের নদী ভাঙ্গনের বাঙালীদের পুনর্বাসনের জন্য পাহাড়ী অঞ্চলে বসতি স্থাপন করায়। এতে পাহাড়ীরা ক্ষুব্ধ হয় এবং আরো জোরোশোরে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। তখন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত থেমে থেমে বহু ’বাঙালী/বাংলাদেশীকে’ হত্যা তারা করেছে। আমাদের দেশের অধিকাংশ পত্রিকা এবং কিছু সুশীল সমাজ পাহাড়ীদের বিচ্ছিন্নতাবাদকে উস্কে দিতে গিয়ে অন্য পক্ষের সন্ত্রাসকে প্রায়শই গোপন রাখে। এরফলে সেখানকার বাঙালী বসতি স্থাপনকারীরা ক্ষুব্ধ এবং তারাও মাঝে মাঝে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে পাহাড়ের বুকে অশান্তি সৃষ্টি করে। এই সকল পত্রিকা এবং বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী পাহাড়ী-বাঙালীদের মধ্যকার সম্পর্কোন্নয়নে কাজ না করে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টিতে সদা তৎপর। শাহরিয়ার কবিরতো তার এক লেখায় আকারে ইঙ্গিতে বুঝাতে চেয়েছেন, ১৯৪৭ এর ভারতভাগের সময় ওদের ভারত এবং মায়ানমারের অংশ হবার কথা ছিল। এভাবে তিনি পরোক্ষভাবে পাহাড়ীদের স্বাধীনতার ন্যায্যতাকে তুলে ধরেন।

পাহাড়ে ’বাঙালী বাংলাদেশী’ বসতি স্থাপনকে কেন্দ্র করে যে সশস্ত্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তার প্রেক্ষিতে জিয়াউর রহমান সেখানে সেনাবাহিনী পাঠান। এরশাদ ক্ষমতা দখল করার পর সামরিক শক্তি আরো বৃদ্ধি করেন। পুনর্বাসিত ’বাঙালী বাংলাদেশীদের’ ‘বহিরাগত’ হিসেবে অনেক বাঙালী বুদ্ধিজীবী অভিহিত করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে দু’টো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনার দাবী রাখলেও সেটা কখনো হয়নি।

প্রথমতঃ আপনি খুলনার মানুষ হয়ে বরিশালে বাড়ী বানালে কি বহিরাগত হবেন? দেশের সীমানার মধ্যে যে কোন স্থানে বৈধভাবে বসবাসের অধিকার কি দেশের নাগরিকদের নেই? ঢাকায় বসবাসরত পাহাড়ী অঞ্চলের মানুষ কি ’বহিরাগত’? আসলে এভাবে কোন কোন বুদ্ধিজীবী প্রকারান্তরে ‘বহিরাগত’ শব্দটি উল্লেখের মাধ্যমে পার্বত্য তিনটি জেলাকে বাংলাদেশের বাইরে অর্থাৎ তাদের স্বাধীনতার পক্ষেই বলছেন।

দ্বিতীয়তঃ সেই আঙ্গিকে বহিরাগত হলে তো পাহাড়ীরাই বহিরাগত। কারণ তাদের আগমন ঘটে ভারত কিম্বা মায়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। ঐ এলাকায় ’বাঙালী বাংলাদেশীদের’ আগমন পাহাড়ীদের অনেক আগে ঘটেছিল।

তারপরেও ’স্বাভাবিক মাইগ্রেশন’ এবং ’উদ্দেশ্যমূলক মাইগ্রেশনের’ মধ্যে একটা তফাৎ আছে। ১৯৪৭ থেকে নতুন সৃষ্ট দেশকে মেনে না নেবার মনোবৃত্তি থেকে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের যে অবনতি ঘটে এবং অন্যান্য কারণ মিলিয়ে পাহাড়ীরা যে সশস্ত্র আন্দোলনে নামে, সেটাকে দমনের কৌশল হিসেবে পরিকল্পিতভাবে উক্ত এলাকায় পাহাড়ীদের সংখ্যালঘু করার জন্যই মূলতঃ সমতলের বাঙালীদের পুনর্বাসন করানো হয়েছিল। কাজেই, পুরো সত্যকে এড়িয়ে কেবলমাত্র অর্ধসত্যকে ভিত্তি হিসেবে ধরে বাঙালী পুনর্বাসনের সমালোচনা করা উচিত নয়। রাষ্ট্রিয় নিরাপত্তা এবং নিরাপদ জীবনের জন্য অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকেও অনেক সময় মেনে নিতে হয়।

যেমন; ১৯৪৭ এর ভারত বিভাগের সময় ঘটা হিন্দু-মুসলমানের এপার ওপার মাইগ্রেশন কি ইচ্ছাকৃত ছিল? নাকি পরিস্থিতি তাদের বাধ্য করেছিল? দু’টোর প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও এক স্থানে মিল আছে। মাঝে মাঝে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যায়। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন হলে অনেক সময় রাষ্ট্রপক্ষ এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।

প্রসঙ্গত আলোচনার দাবী রাখে, শেখ মুজিব মানবেন্দ্র লারমাকে ১৯৭২ সালে পার্বত্য অঞ্চলে ’বাঙালী ঢুকিয়ে’ দেবার যে হুমকি দেন, পরবর্তীতে জিয়া সেটা বাস্তবায়ন করেন। আদিবাসী দাবীর প্রতি সক্রিয় অংশ জিয়াকে এজন্য মুন্ডুপাত করলেও এই কনসেপ্টের ধারক তৎকালীন রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে টুঁ শব্দ করেন না। আতাউস সামাদ ঠিকই বলেছেন, সব কিছুতে ”জিয়াই নন্দঘোষ”!

ওদের কাছে ক্ষমা চাইবে কে?

অষ্ট্রেলিয়ার ষ্টোলেন জেনারেশন সম্পর্কে জানতে নিচের উদ্ধৃত অংশগুলো সাহায্য করবে।

“The Stolen Generations (also known as Stolen Children) were the children of Australian Aboriginal and Torres Strait Islander descent who were removed from their families by the Australian Federal and State government agencies and church missions under acts of their respective parliaments. The removals occurred in the period between approximately 1905 and 1969, although in some places children were still being taken until the 1970s.

 ‘between one in three and one in ten Indigenous children were forcibly removed from their families and communities in the period from approximately 1910 until 1970….In that time not one Indigenous family has escaped the effects of forcible removal’.

 Northern Territory Protector of Natives, Dr. Cecil Cook ১০৩০ সালে “half-caste” শিশুদের সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তাদেরকে ’সাদাকরণের’ পূর্ণ ব্যবস্থার জন্য পরামর্শ দিয়ে লিখেন,

”Generally by the fifth and invariably by the sixth generation, all native characteristics of the Australian Aborigine are eradicated. The problem of our half-castes will quickly be eliminated by the complete disappearance of the black race, and the swift submergence of their progeny in the white”.

Chief Protector of Aborigines in Western Australia, A. O. Neville ১০৩০ সালে এক নিবন্ধে লিখেন,

” One factor, however, seems clear; atavism   is not in evidence so far as colour is concerned. Eliminate in future the full-blood and the white and one common blend will remain. Eliminate the full blood and permit the white admixture and eventually the race will become white.”

“In 1992 Prime Minister Keating acknowledged that ‘we took the children from their mothers’ at a speech in Redfern. In 1994 legal action was commenced in the Supreme Court of New South Wales. These children who were removed came to be known as the Stolen Generations.”

এরপর অষ্ট্রেলিয়ান প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী Kevin Rudd ২০০৮ সালের ১৩ ফ্রেব্রুয়ারী অষ্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের উপরে করা তার পূর্বসূরীদের সব রকমের অপকর্মের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চান।

” We apologise especially for the removal of Aboriginal and Torres Strait Islander children from their families, their communities and their country.”

আজ যারা বাঙলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বাকে আদিবাসী স্বীকৃতির পক্ষে কথা বলছেন, তাদের পূর্বের ইতিহাস এমনই নিষ্ঠুরতায় ভরা। তারপরেও বহু বছর পরে হলেও তারা কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু আমরা?

বাংলাদেশে যে গ্রুপটি পাহাড়ীদের আদিবাসী দাবীর প্রতি সংবেদনশীল, তারা আজো তৎকালীন রাষ্ট্রপতির বর্ণবাদী মন্তব্যের জোরালো কোন সমালোচনা করেননি। এথনিক পরিচয়ে নির্ধারিত বাঙালী জাতীয়তাবাদকে ন্যাশনালিটির সাথে গুলিয়ে ফেলতে গিয়ে তারা এভাবেই দেশে বসবাসরত অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বাকে সব সময় অস্বীকার করে চলেছেন।

আমি ব্যাক্তিগতভাবে মনে করি, তিনটি ইস্যুতে সরকারের পক্ষ থেকে পাহাড়ীদের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। প্রথমতঃ উন্নয়নের ’মানবিক’ দিক বিবেচনায় না এনে এবং পুনর্বাসনের কথা চিন্তা না করে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করা। দ্বিতীয়তঃ সংবিধানে জাতীয়তা ‘বাঙালী’ নির্ধারন করে বাকীদের অপমান করা এবং তৃতীয়তঃ শেখ মুজিব কর্তৃক পাহাড়ীদের ’বাঙালী’ হতে বলা।

তথ্যসূত্র:

  1. ১) সাম্প্রতিক রাজনীতির ময়না তদন্ত এবং একটি তথাকথিত উপসংহার, সত্যজিত দত্ত পুরো কায়স্থ, উন্মোচন, ১৯ আগষ্ট ২০১২।
  2. ২) ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং আদিবাসী বিতর্ক, ড. মোঃ আজিজুল হক, ২৬শে জুন ২০১১, ২৪ বাঙলা নিউজ।
  3. ৩) বিডিআরের বাংলায় নাম এবং ‘আদিবাসী’ বিতর্ক, আতাউস সামাদ, সমকাল ৪/৩/১০ ইং।
  4. ৪) পাহাড়েও জিয়াই নন্দ ঘোষ!  আতাউস সামাদ, আমার দেশ, ১/৩/১০ ইং।
  5. ৫) আদিবাসী বিতর্ক ও একটি প্রত্যাশা, এস হক, নয়াদিগন্ত,
  6. ৬) পার্বত্য শান্তিচুক্তিঃ বর্তমান প্রেক্ষিত, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া
  7. http://kathakata.com/archives/1199
  8. ৭) http://www.australia.gov.au/about-australia/our-country/our-people/apology-to-  australias-indigenous-peoples
  9. ৮) http://www.australia.gov.au/about-australia/australian-story/sorry-day-stolen-generations
  10. ৯) https://en.wikipedia.org/wiki/Stolen_Generations
  11. ১০) বাংলাদেশে আদিবাসীদের প্রান্তিকতা; সাদেকা হালিম।
  12. http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/30177
  13. ১১) পার্বত্য চট্টগ্রামে বহুমাত্রিক সমস্যার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পটভূমি। শাহরিয়ার কবীর।
  14. http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/208.

আদিবাসী বিতর্কের শুরুটা যেভাবে

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক- ৬

মাহবুব মিঠু

মাহবুব মিঠু:

পার্বত্য সমস্যার এক সুদীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক পটভূমি রয়েছে। আগের একটা পর্বে উল্লেখ করেছিলাম, আদিবাসী দাবীদার ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর আগমন ঘটে মাত্র কয়েক পুরুষ আগে ভারত এবং মিয়ানমার থেকে। আমাদের পার্বত্য অঞ্চলে তারও আগে থেকে বাঙালীরা বসবাস করে আসছিলেন। যদিও সংখ্যার দিক দিয়ে কম ছিল। ওখানকার সমস্যার উৎপত্তির মনস্তাত্ত্বিক কারণ অনুসন্ধান করলে এই ‘অভিবাসনের’ ভূমিকা আছে। এখনো এদের শেঁকড় রয়েছে ঐ দুই দেশের মাটিতে। পূর্ব পুরুষদের স্মৃতি, তাদের ঐতিহ্য, অনেকটাই ওখানে। শেঁকড়ের টানের প্রথম প্রতিফলন ঘটে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময়। এরা চেয়েছিল, যেখান থেকে এসেছে, সেই দেশের মানচিত্রে থাকতে। শুরু থেকেই তাদের মধ্যে বিচ্ছিন্ন থাকার এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সে কারণে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তানের সব জায়গাতে পাকিস্তানের পতাকা উড়লেও ১৫ আগষ্ট বান্দরবনে মায়ানমারের (তৎকালীন বার্মা) পতাকা এবং রাঙ্গামাটিতে ভারতীয় পতাকা ওড়ে। ১৭ আগস্ট দেশ বিভাগের মানচিত্র পরিস্কার হলেও প্রায় এক সপ্তাহ জুড়ে ওখানে তারা যথাক্রমে দুই দেশের পতাকা টাঙিয়ে রাখে। ২১ আগস্ট পাকিস্তানী সৈন্যরা বাধ্য করে মায়ানমার এবং ভারতীয় পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানী পতাকা তুলতে।

ভারত এবং মিয়ানমারমুখী মনোভাবের প্রভাবে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে পাক শাসকদের সাথে তাদের সম্পর্কের কিছুটা টানাপোড়েন চলে। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের সংকট থেকে তৎকালীন পাকিস্তানী শাসকরা সিদ্ধান্ত নেয়, সমতল থেকে বাঙালী নিয়ে ওখানে পুনর্বাসন করা। তাদের ধারণা ছিল, পাহাড়ীরা ঐ এলাকায় সংখ্যাগুরু থাকলে যে কোন সময় দেশের অখণ্ডতার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখা দেবে। এছাড়াও পাহাড়ী সমস্যাকে আরো তীব্র করতে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের একটা ভূমিকা আছে। আমেরিকার অর্থায়নে রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলায় অবস্থিত কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে বাঁধ নির্মাণের কাজ ১৯৫২ সালে শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৫৮ সালে। যান্ত্রিক ত্রুটির ফলে বাঁধ ভেঙ্গে পড়লে পুণরায় কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৬২ সালে। এই বাঁধ নির্মাণের সময় প্রায় এক লাখ স্থানীয়দের বসতভিটা ছাড়তে হয়। প্রায় ৪০ ভাগ আবাদী জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। কাপ্তাই বাঁধের প্রভাবে পানিতে ডুবে যায় চাকমা রাজার প্রাসাদ, যার সাথে তাদের আবেগ জড়িত। সম্ভবত ১৯৯৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে একবার রাঙামাটি গিয়েছিলাম। তখনো চাকমা রাজার বাড়ীর মাথাটা কোন মতে পানির উপর মাথা উঁচু করে টিকে ছিল। পরে শুনেছি (নিশ্চিত নই), চিরতরে পানির নিচে বিলীন হয়ে যায়।

এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে দেশটা স্বাধীন হোল। সেই যুদ্ধে পাহাড়ীরাও অংশ নেয়। বাঙলাদেশে বাঙালী ছাড়াও আরো অন্ততঃ ৫৪টা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বার অস্তিত্ব আছে। পাহাড়ী তিনটি জেলা বাদে অন্যান্য ৩০টিরও বেশী জেলায় তাদের বাস।

অক্টোরব, ১৯৭২। স্বাধীন বাঙলাদেশের যে সংবিধান রচনা করা হোল সেখানে বাঙালী বাদে বাকী সবাইকে অস্বীকার করা হয়। সংবিধানের ৩ নং ধারায় বলা হলো: ”বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে, বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবে।”

এর প্রতিবাদে ওয়াক আউট করেছিলেন পাহাড়ী অঞ্চলের একমাত্র প্রতিনিধি মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা। এরপর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে রাঙ্গামাটি সফরে গেলে ১৫ ফেব্রুয়ারী পার্বত্য চট্টগ্রাম গণপরিষদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা নিচের ৪টি দাবী পেশ করেন,

  • ১) পাহাড়ের স্বায়ত্বশাসন
  • ২) পার্বত্য এলাকার জন্য ১৯০০ সালের ম্যানুয়েল অব্যাহত রাখা
  • ৩) তিন জাতির চীফের দপ্তর বিলুপ্তি না করা এবং
  • ৪) ঐ এলাকায় বাঙালী অনুপ্রবেশ রোধ করা।

সব শুনে মুজিব বললেন, ‘লারমা তুমি যদি বেশি বাড়াবাড়ি করো তাহলে এক লাখ, দুই লাখ, তিন লাখ, দশ লাখ বাঙালি পার্বত্য চট্টগ্রামে ঢুকিয়ে দেব। পার্বত্য চট্টগ্রামে আমি তোমাদের সংখ্যালঘু করে ছাড়ব।’  (সূত্রঃ পার্বত্য শান্তিচুক্তিঃ বর্তমান প্রেক্ষিত, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।)

১৯৭৩ সালে শেখ মুজিব পাহাড়ীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “তোরা সব বাঙালী হয়ে যা”। এটা ছিল  আক্ষরিক অর্থে এক বর্ণবাদী আহবান। বাঙলাদেশ স্বাধীন হবার পরে এভাবেই পাহাড়ে গোলযোগের সূত্রপাত হয়।  ফলশ্রুতিতে, ১৯৭৩ সালে শান্তিবাহিনী গঠনের মাধ্যমে শুরু হোল সশস্ত্র  আন্দোলন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে ১৯৭৮ সালে The Proclamations (Amendment) order,1978-এ Citizenship এর মাধ্যমে সংবিধানের বর্ণবাদী অংশটুকু পরিবর্তন করেন, “The citizens of Bangladesh shall be known as Bangladeshis.” কিন্তু বিচ্ছিন্নতার যে বীজ ইতিমধ্যে রোপিত হয়ে গেছে, সংবিধানের এই পরিবর্তনে কোন লাভ হয়নি। অন্ততঃ এই সংশোধনীর মাধ্যমে পবিত্র সংবিধান বর্ণবাদী কলঙ্ক থেকে রক্ষা পায়।

জিয়া ক্ষমতায় এসে ১৯৭৯ সালে ’পপুলেশন ট্রান্সফার’ এর আওতায় প্রায় ৪ লাখ সমতল অঞ্চলের নদী ভাঙ্গনের বাঙালীদের পুনর্বাসনের জন্য পাহাড়ী অঞ্চলে বসতি স্থাপন করায়। এতে পাহাড়ীরা ক্ষুব্ধ হয় এবং আরো জোরোশোরে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। তখন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত থেমে থেমে বহু ’বাঙালী/বাংলাদেশীকে’ হত্যা তারা করেছে। আমাদের দেশের অধিকাংশ পত্রিকা এবং কিছু সুশীল সমাজ পাহাড়ীদের বিচ্ছিন্নতাবাদকে উস্কে দিতে গিয়ে অন্য পক্ষের সন্ত্রাসকে প্রায়শই গোপন রাখে। এরফলে সেখানকার বাঙালী বসতি স্থাপনকারীরা ক্ষুব্ধ এবং তারাও মাঝে মাঝে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে পাহাড়ের বুকে অশান্তি সৃষ্টি করে। এই সকল পত্রিকা এবং বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী পাহাড়ী-বাঙালীদের মধ্যকার সম্পর্কোন্নয়নে কাজ না করে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টিতে সদা তৎপর। শাহরিয়ার কবিরতো তার এক লেখায় আকারে ইঙ্গিতে বুঝাতে চেয়েছেন, ১৯৪৭ এর ভারতভাগের সময় ওদের ভারত এবং মায়ানমারের অংশ হবার কথা ছিল। এভাবে তিনি পরোক্ষভাবে পাহাড়ীদের স্বাধীনতার ন্যায্যতাকে তুলে ধরেন।

পাহাড়ে ’বাঙালী বাংলাদেশী’ বসতি স্থাপনকে কেন্দ্র করে যে সশস্ত্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তার প্রেক্ষিতে জিয়াউর রহমান সেখানে সেনাবাহিনী পাঠান। এরশাদ ক্ষমতা দখল করার পর সামরিক শক্তি আরো বৃদ্ধি করেন। পুনর্বাসিত ’বাঙালী বাংলাদেশীদের’ ‘বহিরাগত’ হিসেবে অনেক বাঙালী বুদ্ধিজীবী অভিহিত করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে দু’টো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনার দাবী রাখলেও সেটা কখনো হয়নি।

প্রথমতঃ আপনি খুলনার মানুষ হয়ে বরিশালে বাড়ী বানালে কি বহিরাগত হবেন? দেশের সীমানার মধ্যে যে কোন স্থানে বৈধভাবে বসবাসের অধিকার কি দেশের নাগরিকদের নেই? ঢাকায় বসবাসরত পাহাড়ী অঞ্চলের মানুষ কি ’বহিরাগত’? আসলে এভাবে কোন কোন বুদ্ধিজীবী প্রকারান্তরে ‘বহিরাগত’ শব্দটি উল্লেখের মাধ্যমে পার্বত্য তিনটি জেলাকে বাংলাদেশের বাইরে অর্থাৎ তাদের স্বাধীনতার পক্ষেই বলছেন।

দ্বিতীয়তঃ সেই আঙ্গিকে বহিরাগত হলে তো পাহাড়ীরাই বহিরাগত। কারণ তাদের আগমন ঘটে ভারত কিম্বা মায়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। ঐ এলাকায় ’বাঙালী বাংলাদেশীদের’ আগমন পাহাড়ীদের অনেক আগে ঘটেছিল।

তারপরেও ’স্বাভাবিক মাইগ্রেশন’ এবং ’উদ্দেশ্যমূলক মাইগ্রেশনের’ মধ্যে একটা তফাৎ আছে। ১৯৪৭ থেকে নতুন সৃষ্ট দেশকে মেনে না নেবার মনোবৃত্তি থেকে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের যে অবনতি ঘটে এবং অন্যান্য কারণ মিলিয়ে পাহাড়ীরা যে সশস্ত্র আন্দোলনে নামে, সেটাকে দমনের কৌশল হিসেবে পরিকল্পিতভাবে উক্ত এলাকায় পাহাড়ীদের সংখ্যালঘু করার জন্যই মূলতঃ সমতলের বাঙালীদের পুনর্বাসন করানো হয়েছিল। কাজেই, পুরো সত্যকে এড়িয়ে কেবলমাত্র অর্ধসত্যকে ভিত্তি হিসেবে ধরে বাঙালী পুনর্বাসনের সমালোচনা করা উচিত নয়। রাষ্ট্রিয় নিরাপত্তা এবং নিরাপদ জীবনের জন্য অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকেও অনেক সময় মেনে নিতে হয়।

যেমন; ১৯৪৭ এর ভারত বিভাগের সময় ঘটা হিন্দু-মুসলমানের এপার ওপার মাইগ্রেশন কি ইচ্ছাকৃত ছিল? নাকি পরিস্থিতি তাদের বাধ্য করেছিল? দু’টোর প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও এক স্থানে মিল আছে। মাঝে মাঝে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যায়। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন হলে অনেক সময় রাষ্ট্রপক্ষ এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।

প্রসঙ্গত আলোচনার দাবী রাখে, শেখ মুজিব মানবেন্দ্র লারমাকে ১৯৭২ সালে পার্বত্য অঞ্চলে ’বাঙালী ঢুকিয়ে’ দেবার যে হুমকি দেন, পরবর্তীতে জিয়া সেটা বাস্তবায়ন করেন। আদিবাসী দাবীর প্রতি সক্রিয় অংশ জিয়াকে এজন্য মুন্ডুপাত করলেও এই কনসেপ্টের ধারক তৎকালীন রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে টুঁ শব্দ করেন না। আতাউস সামাদ ঠিকই বলেছেন, সব কিছুতে ”জিয়াই নন্দঘোষ”!

ওদের কাছে ক্ষমা চাইবে কে?

অষ্ট্রেলিয়ার ষ্টোলেন জেনারেশন সম্পর্কে জানতে নিচের উদ্ধৃত অংশগুলো সাহায্য করবে।

“The Stolen Generations (also known as Stolen Children) were the children of Australian Aboriginal and Torres Strait Islander descent who were removed from their families by the Australian Federal and State government agencies and church missions under acts of their respective parliaments. The removals occurred in the period between approximately 1905 and 1969, although in some places children were still being taken until the 1970s.

 ‘between one in three and one in ten Indigenous children were forcibly removed from their families and communities in the period from approximately 1910 until 1970….In that time not one Indigenous family has escaped the effects of forcible removal’.

 Northern Territory Protector of Natives, Dr. Cecil Cook ১০৩০ সালে “half-caste” শিশুদের সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তাদেরকে ’সাদাকরণের’ পূর্ণ ব্যবস্থার জন্য পরামর্শ দিয়ে লিখেন,

”Generally by the fifth and invariably by the sixth generation, all native characteristics of the Australian Aborigine are eradicated. The problem of our half-castes will quickly be eliminated by the complete disappearance of the black race, and the swift submergence of their progeny in the white”.

Chief Protector of Aborigines in Western Australia, A. O. Neville ১০৩০ সালে এক নিবন্ধে লিখেন,

” One factor, however, seems clear; atavism   is not in evidence so far as colour is concerned. Eliminate in future the full-blood and the white and one common blend will remain. Eliminate the full blood and permit the white admixture and eventually the race will become white.”

“In 1992 Prime Minister Keating acknowledged that ‘we took the children from their mothers’ at a speech in Redfern. In 1994 legal action was commenced in the Supreme Court of New South Wales. These children who were removed came to be known as the Stolen Generations.”

এরপর অষ্ট্রেলিয়ান প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী Kevin Rudd ২০০৮ সালের ১৩ ফ্রেব্রুয়ারী অষ্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের উপরে করা তার পূর্বসূরীদের সব রকমের অপকর্মের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চান।

” We apologise especially for the removal of Aboriginal and Torres Strait Islander children from their families, their communities and their country.”

আজ যারা বাঙলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বাকে আদিবাসী স্বীকৃতির পক্ষে কথা বলছেন, তাদের পূর্বের ইতিহাস এমনই নিষ্ঠুরতায় ভরা। তারপরেও বহু বছর পরে হলেও তারা কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু আমরা?

বাংলাদেশে যে গ্রুপটি পাহাড়ীদের আদিবাসী দাবীর প্রতি সংবেদনশীল, তারা আজো তৎকালীন রাষ্ট্রপতির বর্ণবাদী মন্তব্যের জোরালো কোন সমালোচনা করেননি। এথনিক পরিচয়ে নির্ধারিত বাঙালী জাতীয়তাবাদকে ন্যাশনালিটির সাথে গুলিয়ে ফেলতে গিয়ে তারা এভাবেই দেশে বসবাসরত অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বাকে সব সময় অস্বীকার করে চলেছেন।

আমি ব্যাক্তিগতভাবে মনে করি, তিনটি ইস্যুতে সরকারের পক্ষ থেকে পাহাড়ীদের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। প্রথমতঃ উন্নয়নের ’মানবিক’ দিক বিবেচনায় না এনে এবং পুনর্বাসনের কথা চিন্তা না করে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করা। দ্বিতীয়তঃ সংবিধানে জাতীয়তা ‘বাঙালী’ নির্ধারন করে বাকীদের অপমান করা এবং তৃতীয়তঃ শেখ মুজিব কর্তৃক পাহাড়ীদের ’বাঙালী’ হতে বলা।

 (সমাপ্ত)

  1. রেফারেন্সসমূহঃ
  2. ১) সাম্প্রতিক রাজনীতির ময়না তদন্ত এবং একটি তথাকথিত উপসংহার, সত্যজিত দত্ত পুরো কায়স্থ, উন্মোচন, ১৯ আগষ্ট ২০১২।
  3. ২) ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং আদিবাসী বিতর্ক, ড. মোঃ আজিজুল হক, ২৬শে জুন ২০১১, ২৪ বাঙলা নিউজ।
  4. ৩) বিডিআরের বাংলায় নাম এবং ‘আদিবাসী’ বিতর্ক, আতাউস সামাদ, সমকাল ৪/৩/১০ ইং।
  5. ৪) পাহাড়েও জিয়াই নন্দ ঘোষ!  আতাউস সামাদ, আমার দেশ, ১/৩/১০ ইং।
  6. ৫) আদিবাসী বিতর্ক ও একটি প্রত্যাশা, এস হক, নয়া দিগন্ত,
  7. ৬) পার্বত্য শান্তিচুক্তিঃ বর্তমান প্রেক্ষিত, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া
  8. http://kathakata.com/archives/1199
  9. ৭) http://www.australia.gov.au/about-australia/our-country/our-people/apology-to-  australias-indigenous-peoples
  10. ৮) http://www.australia.gov.au/about-australia/australian-story/sorry-day-stolen-generations
  11. ৯) https://en.wikipedia.org/wiki/Stolen_Generations
  12. ১০) বাংলাদেশে আদিবাসীদের প্রান্তিকতা; সাদেকা হালিম।
  13. http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/30177
  14. ১১) পার্বত্য চট্টগ্রামে বহুমাত্রিক সমস্যার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পটভূমি। শাহরিয়ার কবীর।
  15. http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/208

এই লেখার আগের পর্বগুলো পড়ুন এখান থেকে

  1. আদিবাসী বিতর্ক ১ ও ২
  2. আদিবাসী সংজ্ঞায়নে অস্পষ্টতা রয়েছে
  3. দিবাসীর সংজ্ঞার আলোকে বাঙলাদেশে আদিবাসী কারা?
  4. আদিবাসী বিতর্কে নাগরিক সমাজের অবস্থান

 

আদিবাসী বিতর্কে নাগরিক সমাজের অবস্থান

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক- ৫

মাহবুব মিঠু

মাহবুব মিঠু:

বেশ আগে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আরটিভি সুন্দর একটা টকশোর আয়োজন করেছিল। গোলাম মোর্তজার সঞ্চালনায় অতিথি হিসেবে ছিলেন জেনারেল (অবঃ) ইব্রাহীম এবং চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়।আদিবাসী স্বীকৃতি পেলে এর পরিণাম কি কি হতে পারে ঐ অনুষ্ঠানে জনাব ইব্রাহীম সেগুলো খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ২০০৭ সালে প্রণীত জাতিসংঘের ডিক্লারেশন ৩, ৪ এবং ১৮ ধারা মোতাবেক, স্বীকৃতি পাওয়া আদিবাসীদের চাহিদা অনুযায়ী তাদেরকে স্বায়ত্বশাসন দিতে রাষ্ট্র বাধ্য থাকবে। পাহাড়ীদের অনুমতি ছাড়া কেউ সেখানে বাস করতে পারবে না এবং তাদের অনুমতি ও সম্মতি ছাড়া ঐ এলাকায় রাষ্ট্র কোন রকমের সামরিক তৎপরতা চালাতে পারবে না।

জনাব ইব্রাহীমের দেয়া তথ্য খণ্ডাতে পারেননি রাজা দেবাশীষ রায়। এমনিতে পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টি করে রেখেছে একটা গোষ্ঠী। বাংলাদেশ থেকে পৃথক হওয়া তাদের লক্ষ্য। এই পরিস্থিতিতে আদিবাসী স্বীকৃতি নিয়ে স্বায়ত্বশাসনের দাবী জোরালো হলে সরকার আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে পড়বে। দেবাশীষ রায় কৌশলে জনাব ইব্রাহীমের স্বায়ত্বশাসনের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে এটাকে ইউনিয়ন পরিষদের স্বশাসনের সাথে গুলিয়ে বিষয়টাকে হালকা করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

জনাব ইব্রাহীম আরো বলেন, রাজা দেবাশীষ রায় একটা আদিবাসী ফোরামের সদস্য এবং এই ফোরাম জাতিসংঘের মাধ্যমে শর্ত দিয়েছে, আগামীতে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী বিশ্বের কোন দেশে শান্তি মিশনে গেলে পাহাড়ীদের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে যে, সেনাবাহিনী সেখানে কোন মানবাধিকার লংঘন করে নাই। ’মানবাধিকার লংঘন’ ক্ষেত্র বিশেষে একটা আপেক্ষিক শব্দ। পাহাড়ী সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর অভিযানকে সংজ্ঞায়িত করা হলে সেটাও হবে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভাষায় মানবাধিকার লংঘন। এই দাবী প্রতিষ্ঠা করতে পারলে পাহাড়ের সহিংসতাকে থামানো যাবে না। আমরা জানি, পাহাড়ীদের একটা অংশ রাঙ্গামাটিকে রাজধানী করে জুম্মল্যান্ড করার স্বপ্ন দেখছেন।

ড. জাফর ইকবাল ২০১১ সালের আগষ্ট মাসে ’প্রথম আলোতে’ ‘কারও মনে দুখ দিয়ো না…’ নামে একটা কলাম লেখেন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন, যার মধ্যে একটা ছিল ‘আদিবাসী’ ইস্যু। স্বভাবসুলভ ভঙ্গীমায় যুক্তি কম, আবেগ নির্ভর এবং অনেকগুলো ভুল তথ্যে ভরা ছিল লেখাটি। তিনি এই কলামে লিখেছেন, “মাত্র অল্প কয়দিন আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা হয়েছে—প্রথমবারের মতো আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, প্রতিবন্ধী কোটার সঙ্গে সঙ্গে আদিবাসী কোটায় ছাত্রছাত্রী ভর্তি করেছি।” এরপরেই তিনি লেখেন, ”দেশে যদি আদিবাসী নেই, তাহলে আদিবাসী কোটায় আমরা কাদের ভর্তি করেছি?” জাফর সাহেবে যাকে ‘আদিবাসী কোটা’ বলেছেন, আদতে ওটা হবে ‘উপজাতি কোটা’। ওনার মতো একজন শিক্ষাবিদ কি ভুল করে লিখলেন নাকি না জেনে লিখলেন? Indigenous কথার অর্থ খুঁজতে ডিকশনারী ঘাঁটতে গিয়ে ওনার পছন্দ মতো অর্থ খুঁজে না পেয়ে মর্মাহত হয়েছেন।

জনাব প্রশান্ত ত্রিপুরা, ১৯৯৩ সালে আন্তর্জাতিক আদিবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে “আন্তর্জাতিক আদিবাসী বর্ষ এবং বাংলাদেশের আদিবাসী জনগণ” শীর্ষক একটা নিবন্ধ লেখেন। নিবন্ধের শুরুতে অস্পষ্ট বিবরণের মাধ্যমে একটা যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি লিখেছেন, “কিছু শিল্পোন্নত দেশ Indigenous জনগোষ্ঠীর ধারণা এবং তাদের বিশেষ অধিকারের প্রশ্নকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিলেও অন্য অনেক দেশে অনুরূপ কোন উদ্যোগ নেই।” তিনি পরিস্কার করে বলেননি যে, ‘কিছু শিল্পোন্নত দেশ’ অর্থাৎ অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং আমেরিকার মতো আরো কিছু দেশে যেখানে এই স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে সেখানে Indigenous-রা হলো Native, অর্থাৎ তারা ঐ ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা। ইউরোপিয়ানরা সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য নতুন নতুন ভূমি দখল করে ’বহিরাগত’ হিসেবে এসব অঞ্চলে গেঁড়ে বসে। এই সত্যটুকু পরিস্কারভাবে না লিখলে পাঠকের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। Indigenous হিসেবে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি না পাওয়ায় তিনি  আক্ষেপ করে লিখেছেন, ”কিন্তু একজন গারো, সাঁওতাল বা ম্রোর কাছে এই সরকারী ব্যাখ্যা তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করারই নামান্তর।” আদিবাসী স্বীকৃতির অভাবে কিভাবে তাদের অস্তিত্ব সংকটে পড়ল তার ব্যাখ্যা নেই। শেখ মুজিবের ’বাঙালী’ করার ঘোষণা বাস্তবে তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকী হলেও রাজনৈতিক কারণে হয়তো তিনি এই সঠিক স্থানে আঘাত করতে সাহস পাননি।

জনাব ত্রিপুরার লেখায় আদিবাসী কথাটার অর্থ কি এবং বাংলাদেশে উপজাতি হিসেবে পরিচিত গোষ্ঠীগুলোকে আদৌ আদিবাসী বলা যায় কিনা প্রশ্নগুলো পরিস্কারভাবে করলেও উত্তরগুলো পরিস্কার নয়। সময়ের ’আপেক্ষিকতাকে’ ঢাল হিসেবে নিয়ে উনি এ অঞ্চলে পাহাড়ী নাকি বাঙালীরা আগে বসতি গড়ে সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে এড়িয়ে গেছেন। তিনি লিখেছেন, “অর্থাৎ স্থান ও কালের সীমানা কিভাবে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে, তার উপরই নির্ভর করছে কোন প্রেক্ষিতে কাদের আমরা Indigenous বলতে পারি। আমরা যদি সুদূর প্রাগৈতিহাসিক অতীতে চলে যাই তাহলে Indigenous কথাটি অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।”

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আদিবাসী বিতর্ক বিষয়ক স্থান তো নির্দিষ্ট। এবং ‘সময়’ সম্পর্কিত ধারণাও পরিস্কার। অর্থাৎ নির্দিষ্ট ভূখন্ডে আদিবাসীর দাবীদার যারা তারা কি ওখানে সংখ্যাগুরুর আগে এসেছিল নাকি পরে! বাঙালীদের আগমন আগে ঘটে থাকলে তারা ঐ অঞ্চলে পরে আসা অন্য জনগোষ্ঠীর ভূমির উপর অতিরিক্ত দাবীকে মেনে নেবে কেন? এভাবে বিভিন্নজনে আদিবাসী স্বীকৃতিকে পাকা করার জন্য বারবার অষ্ট্রেলিয়া, আমেরিকা এবং কানাডাকে টেনে আনলেও সেখানে স্বীকৃতি পাওয়া Indigenous-দের সাথে আমাদের এখানকার দাবীদারদের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যকে তুলে ধরছেন না। সেটা পরিস্কার করলে তাদের দাবীটাই অসাড় হয়ে যায়। মানুষকে এতো সহজে তাদের দাবীর দিকে টেনে আনা যাবে না। মূলতঃ বাঙলাদেশে যারা আদিবাসী স্বীকৃতির জন্য লড়ছেন, তাদের কাছে ‘আবেগ’ এবং ‘পরদেশের’ উদাহরণ ছাড়া শক্ত কোন যুক্তি নেই।

একটা পর্যায়ে তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে জাতিসংঘের আদিবাসী সংক্রান্ত দিক নির্দেশনা বা ধারণার একটা নিজস্ব সম্প্রসারিত ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন যেখানে শব্দটির মূল দ্যোতনা ‘আদি’কেই অস্বীকার করা হয়েছে। ”কোন দেশে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাদের পূর্ব পুরুষেরা প্রথমে সেখানে বসতী গেড়েছিল, এ প্রশ্ন গৌণ, মূলত: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তথাকথিত সভ্যতার বিকাশের শিকার tribal, primitive প্রভৃতি ঔপনেবিশিক আখ্যায় ভূষিত জনগোষ্ঠীদের সবাই Indigenous অভিধার বৈধ দাবীদার”।

সভ্যতার একই আক্রমণের শিকারতো আজ বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীও! তাহলে তারাও কি সেই একই দাবী করে বসবে? কিম্বা মায়ানমারের রোহিঙ্গারা? বরঞ্চ তার এই সম্প্রসারিত ব্যাখ্যার সূত্র ধরে এই জনগোষ্ঠীকে ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠী’ বলাই শ্রেয়। ‘বাংলাদেশী’ পরিচয় নির্ধারণেও তার কিছুটা আপত্তি আছে। তার ভাষায় এটা ‘আদিবাসীদের’ কথা ভেবে করা হয়নি। যে দেশটার নাম বাংলাদেশ, তার নাগরিকরা বাঙলাদেশী হবে না তো কি হবে? ভারতীয় নাগরিকদের ভারতীয়, পাকিস্তানীদের পাকিস্তানী বলা গেলে বাংলাদেশের নাগরিকরা তো বাংলাদেশীই হবে! পরোক্ষভাবে উনি কি দেশের নামটা পরিবর্তনের কথা বলছেন?  এথনিক পরিচয়ে জাতীয়তা এবং রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদ বা ন্যাশনালিটির পার্থক্য নিশ্চয়ই উনি অনেকের চেয়ে ভাল বুঝেন। এভাবে ‘বাংলাদেশী’ পরিচয় নিয়ে সংশয়ে থাকার অর্থ প্রচ্ছন্নভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদকেই ইঙ্গিত দেয়।

কিছু কিছু বাঙালীর এবং আরো বৃহত্তর পরিচয়ে বাংলাদেশীদের (কিছু কিছু) ’আবেগ’ সহজিয়া বা স্বাভাবিক নয়। এটা একধরনের ইমোশনাল ব্লাকমেইল।’ এদের আবেগ কোন ঘটনার কারণে স্বাভাবিকভাবে আসে না। কোন বিষয়কে নিজের অনুকূলে আনার জন্য এই বিশেষ ধরনের ’আবেগ’ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সৃষ্টি করা হয়। কেবলমাত্র মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আবেগ সৃষ্টি করে শাহবাগে লাখ লাখ মানুষ জড়ো করা গোষ্ঠী পরিশেষে কোটি কোটি টাকার মালিক হবার গল্প বাতাসে ওড়ে। একইভাবে আবেগের কৌশলী ব্যবহারের মাধ্যমে একটা গোষ্ঠী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দিতে চায়।

শ্রদ্ধেয় আতাউস সামাদ তার এক লেখায় বিবিসির সাংবাদিক থাকাকালীন সময়ের কিছু অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। সেই আশির দশকে যখন শান্তিবাহিনীর বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন তুঙ্গে, সে সময় থাইল্যান্ড বা জাপানে বৌদ্ধ সম্মেলন হলে এই সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সমর্থনে উদ্বেগ প্রকাশ করে যে বিবৃতি দেয়া হতো, মাঝে মাঝেই সেখানে লেখা থাকত ‘ওই এলাকায় বৌদ্ধদের উপরে অত্যাচার চলছে’। এভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সমর্থনে একটা জনমত সৃষ্টিতে দেশের বাইরের একটা গোষ্ঠী বেশ সোচ্চার ছিল। এখন এর পরিধি অনেক বেড়েছে। দেশের ভিতরে তথাকথিত কিছু মানবাধিকার সংগঠন এবং কিছু ব্যাক্তি ‘আদিবাসী’ বিতর্ককে উস্কে দিচ্ছেন।

জনাব আতাউস সামাদ সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, ঐ এলাকার এতো হই হট্টগোলের প্রধান উদ্দেশ্য সম্ভবত সেখানে বসতী স্থাপনকারী বাঙালীদের ফিরে যেতে বাধ্য করা। তিনি দেখিয়েছেন ২০১০ সালের ফ্রেব্রুয়ারীতে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘটা গোলযোগকে কেন্দ্র করে যেটা হয়ে গেল সেখানে দেখা গেছে প্রশাসন শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করে। অসহায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালী নারী পুরুষ শিশু রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে দাড়িঁয়ে থাকলেও তাদেরকে কোন ত্রাণ দেয়া হয়নি। বাঘাইহাটে বাঙালীদের যে ঘরবাড়ী পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল সেগুলো তখনো পর্যন্ত পাহাড়ীদের দখলে ছিল(বর্তমানের খবর জানা নেই আমার)। একই সূত্র থেকে জানা যায়, এক পাহাড়ীর কাছ থেকে বাঙালী জমি কিনলে তা তার দখলে না দিয়ে কোন এক এনজিওকে দিয়ে দেয়া হয়। শুরু হয় উত্তেজনা।

পাহাড়ের উত্তেজনার পিছনে এক তরফাভাবে বসতি স্থাপনকারী বাঙালী- বাংলাদেশীদের দোষ চাপানো সব সময় ঠিক নয়। এটাকে ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান বলে না। কিছু কিছু পত্রিকা তাদের বিভিন্ন লেখায় সরকারী অবস্থান থেকে সরে গিয়ে ‘আদিবাসী’ শব্দটা ব্যবহার করে ধৃষ্টতার পরিচয় দিচ্ছে। এ রকমের একটা স্পর্শকাতর বিষয়ে রাষ্ট্রিয় সিদ্ধান্তের বাইরে তাদের নিজস্ব অবস্থান রাষ্ট্রিয় অবমাননা কিনা ভেবে দেখা জরুরী।

অনেকের মতো্ আমিও মনে করি, আদিবাসী স্বীকৃতির সাথে সাথেই সরকারের উপর আন্তর্জাতিকভাবে কিছু দায়িত্ব এবং বাধ্যবাধকতা চলে আসবে। প্রথমত: ভূমির উপরে অধিকারের বলে সেখানকার বাঙালী খেদাও আন্দোলন শুরু হবে। সেনা ক্যাম্প সরিয়ে নেয়ার দাবী উঠবে। বিভিন্ন দাবী দাওয়ার নামে পাহাড়ীদের একটা অংশ আন্দোলনের নামে যে বিচ্ছিন্নতার আন্দোলন শুরু করছে সেটা জোরদার করতে পারবে। আদিবাসী স্বীকৃতির সাথে সাথেই তাদের উপরে জাতিসংঘের একটা সরাসরি পর্যবেক্ষণ থাকবে এবং তারা তদারকি করার সুযোগ পাবে। এ সব ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মতো পশ্চিমা লেজুড়বৃত্তিক সংগঠনগুলো যেটা করে সেটা হলো: শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর জন্য এক নিয়ম আর আমাদের মতো দুর্বলদের জন্য আরেক নিয়ম। বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমন করতে সামরিক পদক্ষেপ নিলে তখন তারা সরাসরি জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মদদে ‘আদিবাসী’ বাঁচাও সুর তুলে সরকারের সাথে বিচ্ছিন্নতার দেনদরবার করার সুযোগ পাবে। দেশ রক্ষা করার জন্য জীবনবাজী রেখে পাহাড়ী অঞ্চলে মোতায়েনকৃত সৈন্যরা পরিচিত হবেন আগ্রাসী বাহিনী হিসেবে। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা হবেন মুক্তিযোদ্ধা।

চলবে….

রেফারেন্স

 

এই লেখার আগের পর্বগুলো পড়ুন এখান থেকে

  1. আদিবাসী বিতর্ক ১ ও ২
  2. আদিবাসী সংজ্ঞায়নে অস্পষ্টতা রয়েছে
  3. দিবাসীর সংজ্ঞার আলোকে বাঙলাদেশে আদিবাসী কারা?