বাংলাদেশের উপজাতীয়রা আদিবাসী নয় কেন?

মেহেদী হাসান পলাশ

আজ ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস। ১৯৮২ সালের এই দিনে ফ্রান্সের জেনেভা শহরে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক কার্যনির্বাহী কমিটির মিটিংয়ে ৯ আগস্টকে বিশ্ব আদিবাসী দিবস হিসাবে নির্ধারণ করা হয় এবং ১৯৯৪ সালের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সম্মেলনে এ দিবসকে বিশ্ব আদিবাসী দিবস রূপে ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে সারা বিশ্ব প্রতিবছর বিশ্বে ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালন করে আসছে। বর্তমান বিশ্বে ৩৭ কোটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাস- যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫ ভাগ। বিশ্বের ৯০ টি দেশে এই ৩৭ কোটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করে। তারা বিশ্বের ৭ হাজার ভাষা ও ৫ হাজার স্বতন্ত্র সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। প্রত্যেক বছর বিশ্ব আদিবাসী দিবসের একটি থিম থাকে। এ বছর বিশ্ব আদিবাসী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে- “Indigenous peoples’ migration and movement.” বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম এর বাংলা করেছে, ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দেশান্তর ও প্রতিরোধের সংগ্রাম’।বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বিশ্বের এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি অগ্রীম শুভেচ্ছা ও শুভ কামনা জানাই।

২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় বা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর লোকেরা বাংলাদেশে নিজেদের আদিবাসী দাবী করে বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালন শুরু করে।  পরবর্তীকালে তারা দেশের সমতলের বিভিন্ন উপজাতীয় ও তফসিলী জনগোষ্ঠীকেও এতে সামিল করে মোট ৪৫ টি মতান্তরে ৭৫ টি জনগোষ্ঠীকে একত্রে আদিবাসী আখ্যা দিয়ে করে বাংলাদেশ সরকারের কাছে তাদের স্বীকৃতি দাবী করে। কিন্তু বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী এই আদিবাসী দাবী শুরুতেই দেশের মধ্যে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করে। কারণ আভিধানিক ও নৃতাত্ত্বিক সংজ্ঞা অনুযায়ী আদিবাসী মানে আদিবাসিন্দা। আদিবাসী শব্দের ইংলিশ প্রতিশব্দ Indigenous people. প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী আদিবাসী হচ্ছে, “কোনো স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই।” মর্গান বলেন, The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial … they are the true Sons of the soil…”. (Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972).

সকল ঐতিহাসিক, নৃতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর কেউই বাংলাদেশে স্মরণাতীত কাল থেকে বসবাস করছে না। তাদের সকলেই বর্হিবিশ্ব বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বিভিন্ন সময়। এই অনুপ্রবেশও স্মরণাতীত কাল পূর্বে ঘটে নাই। মাত্র ৫-৭ শত বছর পূর্বে ভারত ও মিয়ানমার থেকে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। উপরন্তু বাংলাদেশের এই উপজাতীয় জনগোষ্ঠী তাদের আদিনিবাস ভারত ও মিয়ানমারেও আদিবাসী জনগোষ্ঠী হিসাবে স্বীকৃত নয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় মানব বসতির যেসব প্রত্নবস্তু, অবস্থান ও প্রমাণ পাওয়া গেছে তা খৃষ্টপূর্ব ১৬০০-৫০০ সালের পুরাতন। সেকারণে উপজাতিদের আদিবাসী আখ্যাদানকারী গবেষকগণ এখন ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) কনভেনশন-১৬৯’র আদিবাসী বিষয়ক সংজ্ঞার অপব্যাখ্যা করে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তফশিলী সম্প্রদায়কে আদিবাসী দাবি করছেন ও দাবি করতে উদ্বুদ্ধ করছেন।

এ বিষয়ে জাতিসংঘ ও এর অধিভূক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে এ পর্যন্ত প্রধানত: তিনটি চার্টারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এগুলো হলো: ১৯৫৭ সালের ৫ জুন অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের অধিভূক্ত প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ৪০তম অধিবেশনে প্রদত্ত-  Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107),  আইএলও’র ১৯৮৯ সালের ৭ জুন অনুষ্ঠিত ৭৬তম অধিবেশনে প্রদত্ত- Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169),  এবং ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে  The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples.

এখানে আইএলও’র প্রথম চার্টার দুটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। চার্টার দুটির শিরোনাম হচ্ছে- Indigenous and Tribal Populations Convention. অর্থাৎ আদিবাসী ও উপজাতি জনগোষ্ঠী বিষয়ক কনভেনশন। অর্থাৎ এই কনভেনশনটি আদিবাসী ও উপজাতি বিষয়ক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। কনভেনশনে পাস হওয়া ধারাগুলো একই সাথে আদিবাসী ও উপজাতি নির্ধারণ ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। শুধু আদিবাসীদের নয়। অথচ বাংলাদেশে এই চার্টারকে আদিবাসীদের জন্য এক্সক্লুসিভ করে উপস্থাপন করা হয়।

এখানে উপজাতি ও আদিবাসীদের জন্য আলাদা সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)-  এর আর্টিকল ১ এর (a)তে ট্রাইবাল বা উপজাতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘tribal peoples in independent countries whose social, cultural and economic conditions distinguish them from other sections of the national community, and whose status is regulated wholly or partially by their own customs or traditions or by special laws or regulations’. অর্থাৎ  একটি দেশের মূল জনগোষ্ঠী থেকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্নতর যারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও আইন দ্বারা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে পরিচলিত তাদেরকে উপজাতি বলা হয়। এখন আইএলও’র এই সংজ্ঞাটি যদি আমরা বাংলাদেশের চাকমা, মারমা, সাঁওতাল ও অন্যান্য সাবস্পেসিসসমূহের সাথে বিচার করি তাহলে পরিস্কার বোঝা যায় তারা উপজাতি। কেননা, ট্রাইব শব্দের বাংলা অর্থ উপজাতি। কিন্তু বাংলাদেশের মতলববাজ বুদ্ধিজীবীরা আইএলও কনভেনশনের আর্টিকল ১-এ উপস্থাপিত ট্রাইবাল ডেফিনেশনটি সম্পূর্ণ চেপে গিয়ে শুধু ইনডিজিন্যাস পিপলের সংজ্ঞাটি উপস্থাপন করে থাকেন।

এখন আমরা ইনডিজিন্যাস পিপলের সংজ্ঞাটি বিশ্লেষণ করবো।  Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)- এর আর্টিকল ১-এর (b)তে ইনডিডজিন্যাস পিপল বা আদিবাসীর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘peoples in independent countries who are regarded as indigenous on account of their descent from the populations which inhabited the country, or a geographical region to which the country belongs, at the time of conquest or colonization or the establishment of present state boundaries and who, irrespective of their legal status, retain some or all of their own social, economic, cultural and political institutions’.

অর্থাৎ আদিবাসী তারা যারা একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস করছে বা অধিকৃত হওয়া বা বর্তমান সীমানা নির্ধারণের পূর্বে বা উপনিবেশ সৃষ্টির পূর্ব থেকে বসবাস করছে। এবং যারা তাদের কিছু বা সকল নিজস্ব সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত অধিকার ও প্রতিষ্ঠানসমূহ ধরে রাখে।

আইএলও কর্তৃক উপজাতি ও আদিবাসী সংজ্ঞার মূল পার্থক্য হচ্ছে নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস বা অধিকৃত হওয়ার, বর্তমান সীমানা নির্ধারণের পূর্বে বা উপনিবেশ সৃষ্টি পূর্ব থেকে বসবাস। বাকি শর্তগুলো মোটামুটি উপজাতিদের মতোই। অর্থাৎ একজন উপজাতি আদিবাসী হবেন বা হবেন না উপরোক্ত শর্তের ভিত্তিতে।

এছাড়াও রয়েছে ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples চার্টার। এটি এক্সক্লুসিভলি আদিবাসীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট, উপজাতিদের নয়।

Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107)-  ১৯৫৭ সালে পাস হলেও এ পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২৭টি দেশ এই কনভেশন র‌্যাটিফাই করেছে। ১৯৭২ সালের ২২ জুন বাংলাদেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। বাংলাদেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করলেও তা ছিল বৈশ্বিক দৃষ্টিতে। কেননা, বাংলাদেশ কখনই এ দেশে কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠী আছে তা স্বীকার করেনি। বাংলাদেশের বাইরে উপমহাদেশের পাকিস্তান ও ভারত এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। যদিও এরই মধ্যে ৮টি দেশ এই কনভেনশনকে নিন্দা করে তা থেকে বেরিয়ে গেছে। অন্যদিকে  Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)- ১৯৮৯ পাস হলেও এখন পর্যন্ত বিশ্বের  মাত্র ২৩টি দেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। এরমধ্যে কনভেনশন-১০৭ থেকে বেরিয়ে আসা ৮টি দেশও রয়েছে। উপমাহদেশের একমাত্র নেপাল ছাড়া আর কোনো দেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেনি। অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো উপমহাদেশীয় রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানও Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107)- র‌্যাটিফাই করলেও কনভেনশন-১৬৯ র‌্যাটিফাই করেনি। কনভেনশন- ১৬৯ অবশ্য ১০৭-এর মডিফিকেশন, তবুও তা আলাদা করে র‌্যাটিফিকেশন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কেননা, কনভেনশন-১৬৯ পাস হওয়ার পর কনভেনশন-১০৭ এর গুরুত্ব হারিয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক চার্টার কোনো দেশ র‌্যাটিফাই না করলে তা তার জন্য প্রযোজ্য নয়। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, আইএলও কনভেনশন ১০৭ ও ১৬৯ যে দেশগুলো র‌্যাটিফাই করেছে তাদের বেশিরভাগই আফ্রিকান ও দক্ষিণ আমেরিকান দেশ যাদের প্রধান বা অন্যতম প্রধান জনগোষ্ঠী বা গোষ্ঠীগুলো আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃত।

অন্যদিকে ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক একটি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এ ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করলে ১৪৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪টি দেশ বিপক্ষে, ১১টি দেশ ভোট দানে বিরত এবং ৩৪টি দেশ অনুপস্থিত থাকে। ভোট দানে বিরত থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিরুদ্ধে ভোট দেয়া দেশগুলো হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যাণ্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় খুব সোচ্চার ও পৃষ্ঠপোষক দেশগুলোর বেশিরভাগই কিন্তু নিজ দেশের জন্য আইএলও কনভেনশন ১০৭, ১৬৯ ও জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক চার্টারের সিগনেটরি বা ভোটদানকারী নয়। এ থেকেই নিজ দেশের আদিবাসীদের জন্য তাদের নিজেদের অবস্থান এবং অন্যদেশের ‘আদিবাসীদের’ জন্য কুম্ভিরাশ্রু বর্ষণের কারণ ও মতলব পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। উল্লিখিত চারটি দেশ শুধু ইউএন চার্টারের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে তাই নয় বরং অধিবেশনে তাদের প্রতিনিধিরা এই চার্টারের প্রবল সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছে।

এখন বিবেচনা করা যাক, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীসমূহ বাংলাদেশের বর্তমান ভূখণ্ড অধিকৃত হওয়ার পূর্ব থেকে বা প্রি-কলোনিয়াল কি-না? তবে এ আলোচনার পূর্বে একটি বিষয় নির্ধারণ করা জরুরি যে, বিবেচনাটি কি সম্পূর্ণ বাংলাদেশ ভূখণ্ডের উপর হবে, না বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক হবে। কারণ অঞ্চলভিত্তিক হলে সেন্টমার্টিন দ্বীপে যিনি প্রথম বসতিস্থাপন করেছেন তিনিও বাংলাদেশের আদিবাসী। এবং আগামীতে যদি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে নতুন কোনো দ্বীপ সৃষ্টি হয় আর সেই দ্বীপে যারা বা যিনি নতুন বসতি গড়বেন তিনিও আদিবাসী হবেন। বর্তমান সরকার নতুন সৃষ্ট ভাসান চরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করার চেষ্টা করছে, সেটা যদি সফল হয় তাহলে রোহিঙ্গাদেরও কি বাংলাদেশের আদিবাসী বলা হবে? সাংস্কৃতিকভাবে রোহিঙ্গারাও তো বৈশিষ্টমণ্ডিত। একইভাবে ঢাকার আদি বাসিন্দা যারা তারাও বাংলাদেশের আদিবাসী এবং যেসকল উপজাতি ঢাকায় নানাভাবে স্যাটেল করেছেন তারা স্যাটেলার? কারণ এই সংজ্ঞার উপাদানগুলো ইংলিশ OR  শব্দদ্বারা বা অথবা শব্দ দ্বারা বিভক্ত।

আর যদি সমগ্র বাংলাদেশ ভূখণ্ড ধরা হয়, তবে বাংলাদেশের প্রথম উপনিবেশকারী হচ্ছে আর্যজাতি। আর্যরা উত্তর বঙ্গ দিয়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে। তখন বাংলাদেশ ভূখণ্ডে চাকমা, মারমা, গারো, হাজং, সাঁওতাল কারো অস্তিত্ব ছিল না। অর্থাৎ আর্যদের আগমনের পূর্বে এখানে যে অনার্য জনগোষ্ঠী বসবাস করতো তারা প্রি-কলোনিয়াল। আর্যদের আগমণের পূর্বে এখানকার অনার্য বাসিন্দারা প্রাকৃত ধর্মে বিশ্বাসী ছিল। আর্যদের প্রভাবে তারা সনাতন ধর্ম গ্রহণ করে। পরবর্তীতে হিন্দু রাজাদের নিকট থেকে বাংলা বৌদ্ধ রাজাদের দখলে যায়। বাংলাদেশে বৌদ্ধদের ইতিহাস সমৃদ্ধির ও গৌরবের ইতিহাস। বাংলা সাহিত্যের আদি কিতাব চর্যাপদ তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। পাল রাজারা বাঙালি ছিলেন, যেমন ছিলেন মহামতি অতীশ দীপঙ্কর। বাংলায় বৌদ্ধদের ইতিহাস আর চাকমাদের ইতিহাস এক নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রি কলোনিয়াল জনগোষ্ঠী হচ্ছে নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে উঠে আসা এখানকার মূল জনস্রোত, বাঙালি জনগোষ্ঠী।

সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অনেক বিদগ্ধজনের মুখে শোনা যায়, উপজাতি বললে তারা যদি অপমানিত বোধ করে, হেয় বোধ করে এবং আদিবাসী বললে যদি খুশী হয় তাহলে তা বলতে দোষ কোথায়? ইতিহাসে যাই-ই থাক, শতকরা ৯৮ ভাগ একক বাঙালি জনগোষ্ঠীর দেশে আমরা আমাদের দেশের মুষ্টিমেয় উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি এইটুকু উদারতা কি দেখাতে পারি না? এই প্রশ্ন যেকোনো সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষের হৃদয় বিগলিত করতে বাধ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্বনামধন্য ভাইস চ্যান্সেলরও একবার একান্ত আলোচনায় আমার কাছে এই মত প্রকাশ করেছিলেন। প্রশ্নটি অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে। কিন্তু গোল বাঁধিয়েছে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র। ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক একটি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। আগেই বলা হয়েছে, এ ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করলে ১৪৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪টি দেশ বিপক্ষে, ১১টি দেশ ভোট দানে বিরত এবং ৩৪টি দেশ অনুপস্থিত থাকে। ভোট দানে বিরত থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া দেশগুলো হচ্ছে- অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘোষণাপত্রে সর্বমোট ৪৬টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এসব অনুচ্ছেদের বেশ কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, অস্তিত্ব, কর্তৃত্ব, সংবিধান ও আত্মপরিচয়ের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

একথা নিশ্চিত করে বলা যায়, যেসব ব্যক্তিবর্গ খুব সরলভাবে বা অসেচতন-উদারতায় উপজাতিদের আদিবাসী বলতে ইচ্ছুক/আগ্রহী তাদের অনেকেই হয়তো এই ঘোষণাপত্র পড়ে দেখেননি অথবা তার মর্মার্থ অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন (অবশ্য তারা মতলববাজদের কথা আলাদা)। নিম্নে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্রের কিছু অনুচ্ছেদ নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

অনুচ্ছেদ-৩ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার বলে তারা অবাধে তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করে এবং অবাধে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মপ্রয়াস অব্যাহত রাখে।

অনুচ্ছেদ-৪ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার উপভোগের বেলায়, তাদের অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ে তথা স্বশাসিত কার্যাবলীর অর্থায়নের পন্থা ও উৎস নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের স্বায়ত্তশাসন বা স্বশাসিত সরকারের অধিকার রয়েছে।

অনুচ্ছেদ-৫ : আদিবাসী জনগণ যদি পছন্দ করে তাহলে রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের পূর্ণ অধিকার রেখে তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক, আইনগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অক্ষুণ্ন রাখা ও শক্তিশালীকরণের অধিকার লাভ করবে।অনুচ্ছেদ-৬ : আদিবাসী ব্যক্তির জাতীয়তা লাভের অধিকার রয়েছে।

অনুচ্ছেদ-১৯ : রাষ্ট্র  আদিবাসীদের প্রভাবিত করতে পারে এমন আইন প্রণয়ন কিংবা প্রশাসনিক সংক্রান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পূর্বে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি নেয়ার জন্য তাদের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে আন্তরিকত্ব সদিচ্ছার সাথে আলোচনা ও সহযোগিতা করবে।

উপরের অনুচ্ছেদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে বাংলাদেশের ভেতর কমপক্ষে ৪৫টি স্বায়ত্তশাসিত বা স্বশাসিত অঞ্চল ও সরকার ব্যবস্থার সৃষ্টি হবে। এসব অঞ্চলে সরকার পরিচালনায় তারা নিজস্ব রাজনৈতিক কাঠামো, জাতীয়তা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আইনপ্রণয়ন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পাবে। এবং এসব অঞ্চলের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের অধিকার ও কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন হবে। লক্ষণীয়, প্রকাশ্যে বলা না হলেও এই আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বতন্ত্র জাতীয়তার মধ্যে লুকানো রয়েছে স্বাধীনতার বীজ।

এই ঘোষণাপত্রে আদিবাসীদের ভূমির উপর যে অধিকারের কথা বলা হয়েছে তা আরো ভয়ানক। যেমন :

অনুচ্ছেদ-১০ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের ভূমি কিংবা ভূখণ্ড থেকে জবরদস্তিমূলকভাবে উৎখাত করা যাবে না। আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের স্বাধীন ও পূর্ববহিত সম্মতি ছাড়া কোনভাবে অন্য এলাকায় স্থানান্তর করা যাবে না এবং ন্যায্য ও যথাযথ ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে সমঝোতা সাপেক্ষে স্থানান্তর করা হলেও, যদি কোন সুযোগ থাকে, পুনরায় তাদেরকে সাবেক এলাকায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

অনুচ্ছেদ-২৬ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তাদের ঐতিহ্যগতভাবে মালিকানাধীন, দখলীয় কিংবা অন্যথায় ব্যবহার্য কিংবা অধিগ্রহণকৃত জমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের অধিকার রয়েছে।

২৬: ৩. রাষ্ট্র এসব জমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের আইনগত স্বীকৃতি ও রক্ষার বিধান প্রদান করবে। সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রথা, ঐতিহ্য এবং ভূমি মালিকানা ব্যবস্থাপনা মেনে সেই স্বীকৃতি প্রদান করবে।

অনুচ্ছেদ-২৭ :  রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে যৌথভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আইন, ঐতিহ্য, প্রথা ও ভূমি মালিকানাধীন ব্যবস্থাপনার যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করবে।

অনুচ্ছেদ-২৮ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদ যা তাদের ঐতিহ্যগতভাবে মালিকানাধীন কিংবা অন্যথায় দখলকৃত বা ব্যবহারকৃত এবং তাদের স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি ছাড়া বেদখল, ছিনতাই, দখল বা ক্ষতিসাধন করা হয়েছে এসব যাতে ফিরে পায় কিংবা তা সম্ভব না হলে, একটা ন্যায্য, যথাযথ ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পায় তার প্রতিকার পাওয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রয়েছে।

২৮: ২. সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় অন্য কোন কিছু রাজি না হলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে গুণগত, পরিমাণগত ও আইনি মর্যাদার দিক দিয়ে সমান ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদ অথবা সমান আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে বা অন্য কোন যথাযথ প্রতিকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

অনুচ্ছেদ-৩০ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বেচ্ছায় সম্মতি জ্ঞাপন বা অনুরোধ ছাড়া ভূমি কিংবা ভূখ-ে সামরিক কার্যক্রম হাতে নেয়া যাবে না।

অনুচ্ছেদ-৩২ : ২. রাষ্ট্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের উপর প্রভাব বিস্তার করে এমন কোন প্রকল্প অনুমোদনের পূর্বে, বিশেষ করে তাদের খনিজ, জল কিংবা অন্য কোন সম্পদের উন্নয়ন, ব্যবহার বা আহরণের পূর্বে স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি গ্রহণের জন্য তাদের নিজস্ব প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে আলোচনা ও সহযোগিতা করবে।

উপরোক্ত অনুচ্ছেদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী আদিবাসী স্বীকৃতি পেলে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নিজস্ব আইনে নিজস্ব ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মুষ্টিমেয় চিহ্নিত উপজাতিরা দাবি করছে ঐতিহ্য ও প্রথাগত অধিকার বলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল ভূমির মালিক তারা। একই অধিকার বলে সমতলের উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকার সকল ভূমির মালিকানা সেখানকার উপজাতীয়রা দাবি করবে। সেখানে যেসব ভূমি সরকারি ও ব্যক্তিগত মালিকানা (আদিবাসী নয়) রয়েছে তা ফেরত দিতে হবে বা তার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এমনকি উপজাতীয়রা রাজি না হলে সমতল থেকে সমপরিমাণ সমগুরুত্বের ভূমি ফেরত দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে যেহেতু ঐ গোষ্ঠী সকল সামরিক স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার দাবি জানাচ্ছে, সেকারণে সেখান থেকে সকল সামরিক স্থাপনা সরিয়ে নিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অন্যান্য উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় যেসব বাঙালি বসতি স্থাপন করেছে তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। ইউএনডিপিসহ কিছু বৈদেশিক সংস্থা ইতোমেধ্যে প্রকাশ্যে এ দাবি তুলেছে।

ঘোষণাপত্রের ৩৬ অনুচ্ছেদটি আরো ভয়ানক।

অনুচ্ছেদ-৩৬ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর, বিশেষত্ব যারা আন্তর্জাতিক সীমানা দ্বারা বিভক্ত হয়েছে তারা অন্য প্রান্তের নিজস্ব জনগোষ্ঠী তথা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংক্রান্ত কার্যক্রমসহ যোগাযোগ, সম্পর্ক ও সহযোগিতা বজায় রাখার ও উন্নয়নের অধিকার রয়েছে।

আমরা জানি বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল উপজাতি জনগোষ্ঠীর মূল আবাস ভারত ও মিয়ানমার। সেখানে এখনো তাদের মূল জনগোষ্ঠী রয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশে তাদের খণ্ডিত অংশ যদি আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পায় তাহলে ভারতের সমগ্র সেভেন স্টিস্টার্স রাজ্য, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা এবং মিয়ানমারের বিপুল এলাকা আদিবাসী ল্যান্ড স্বীকৃতি পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে। একই সাথে সীমান্তের উভয়পাড়ের অভিন্ন জনগোষ্ঠী যদি অভিন্ন রাজনৈতিক, সরকার কাঠামো কিংবা স্বাধীনতার দাবি তোলে তা আঞ্চলিক সমস্যায় রূপ নেবে। এ বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার প্রতিবেশী ভারত সরকারের দৃষ্টিগোচর করতে পারে।  আদিবাসী জনগোষ্ঠী উল্লিখিত অধিকারসমূহ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ বিশেষভাবে ভূমিকা রাখতে পারবে যা ৪২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। পূর্ব তিমুর, দক্ষিণ সুদান স্বাধীন করণে জাতিসংঘের ভূমিকা বিশ্বের দেশপ্রেমিক জনগণকে আতঙ্কিত করেছে। অধুনা পশ্চিম পাপুয়া নিউগিনিতেও জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

যদিও ৪৬ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন আদিবাসীর দাবি এমন একটা জনগোষ্ঠী থেকে উচ্চারিত হচ্ছে যারা ৪২ বছর ধরে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। কৌশলগত কারণে তারা স্বায়ত্তশাসনের কথা যতোটা উচ্চকিত করে স্বাধীনতার কথা ততোটা নয়। ফলে দেশের অধিকাংশ মানুষই রাষ্ট্রবিরোধী এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থাও রহস্যময় আবরণে সযত্নে ঢেকে রেখেছে দেশবিরোধী এই দুষ্টুক্ষত। কিন্তু যারা সচেতন, বিশেষ করে যারা সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহার করেন তাদের প্রতি আহ্বান একবারের জন্য হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীদের পরিচালিত প্রোফাইল, গ্রুপ ও পেইজগুলো ভিজিট করে দেখুন কী ভয়ানক রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে সেখানে। স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ড গঠনের জন্য নিজস্ব জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, মানচিত্র দিয়ে কিভাবে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে তা সচেতনতার জন্য দেশবাসীর জানা উচিত।

পাঠকের জ্ঞাতার্থে সিএইচটি জুম্মল্যান্ড নামে তাদের পরিচালিত একটি পেইজের ঠিকানা এখানে দেয়া হলো :(https://www.facebook.com/pages/CHT-jummaland/327524104096965?fref=ts)।

শুধু ফেসবুক বা সামাজিক গণমাধ্যম নয়, পাহাড়ী বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীরা নিউজ পোর্টাল খুলেও পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড গঠনের প্রচার চালাচ্ছে। তাদের পরিচালিত অসংখ্য সাইটের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, chtnews.com. এই সাইটে করুণালঙ্কার ভান্তে নামে জেএসএসের এক শীর্ষ নেতার ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার প্রচার হচ্ছে বেশ কয়েকদিন ধরে। বৌদ্ধ ভিক্ষুর বেশধারী এই ব্যক্তি নিজেকে স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিচয় দিয়ে বিশ্বব্যাপী স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠায় তার কর্মতৎপরতার কথা বিস্তারিতভাবে বলেছেন। অডিও-ভিডিও’র এই স্বাক্ষাৎকারে ভান্তে আরো জানিয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন করার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র তাদের হাতে রয়েছে। এখন তিনি শুধু ৫ লক্ষ গোলাবারুদ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এই পরিমাণ গোলাবারুদ সংগ্রহ করতে পারলে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা করে স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই ভিক্ষু সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা অর্জনের উদাহরণ তুলে ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী তরুণ প্রজন্মকে তার সাথে একাত্ম হতে অহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আন্তর্জাতিক শক্তিকে তিনি পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পাবেন বলেও জানিয়েছেন। কাজেই বাংলাদেশের উপজাতিদের আদিবাসী স্বীকৃতি কোনো ছেলের হাতের মোয়া নয়। এর সাথে জড়িত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, অস্তিত্ব, কর্তৃত্ব, ইতিহাস ও মর্যাদার প্রশ্ন।

সূত্র: পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ, আগস্ট, ২০১৮ সংখ্যা।

♦ মেহেদী হাসান পলাশ: সম্পাদক, পার্বত্যনিউজ ও সহকারী সম্পাদক, দৈনিক ইনকিলাব।

email: palash74@gmail.com  


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিরা জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী আদিবাসী হবার পূর্বশর্তসমুহ পূরণ করে না

 পারভেজ হায়দার

নিজ মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা, দেশের স্বার্থে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকাই দেশপ্রেম । পুঁথিগতভাবে দেশপ্রেমের সংজ্ঞায় ভিন্নতা থাকলেও মৌলিক কয়েকটি বিষয় অনেকটাই সমার্থক । দেশপ্রেমের সাথে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের প্রতি ভালোবাসা জড়িত, এই ভালোবাসা শর্তহীন ভালবাসা । দেশপ্রেমিক মানুষ নিজস্ব ভূখণ্ড রক্ষার সংগ্রাম, ভূ-খণ্ডের রক্ষণাবেক্ষণ অথবা পুনরুদ্ধারে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকে ।

একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বিভিন্ন শ্রেণীর জাতি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের অধিবাসীরা বসবাস করতেই পারে, থাকতে পারে এদের ধর্মের ভিন্নতা, কিন্তু নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী একটি দেশের ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে দেশের মঙ্গলের জন্য কাজ করবে এবং প্রয়োজনে যেকোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকবে, এটাই স্বাভাবিক ।

একটি দেশের অধিবাসীদের মধ্যে বিভিন্ন সম্প্রদায়, ধর্ম ও গোষ্ঠীর বসবাস থাকলেও প্রায় প্রতিটি সম্প্রদায়ের মধ্যেই ব্যক্তিগত অথবা দলীয় অথবা ধর্মীয় মতাদর্শ ভিত্তিক ভিন্নতা থাকতে পারে । মতাদর্শগত এই ভিন্নতা সামগ্রিকভাবে দেশের মঙ্গলের জন্য পরিপূরক হওয়াই বাঞ্ছনীয় । কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতে দেশ স্বার্থ বিষয়ে স্ববিরোধীতা দৃশ্যমান ।

এ দেশের কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবী ব্যক্তিবর্গ দেশের স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত মতাদর্শকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন । তবে যেকোন মতাদর্শের মধ্যে যদিও একটি আদর্শিক বিষয় জড়িত তথাপি মতাদর্শের এই ভিন্নতা দেশের স্বার্থবিরোধী হলে তা ধরে রাখা একেবারেই কাম্য নয় । সমস্যাটি তখনই প্রকটাকারে দেখা দেয় যখন ভিন্ন মতাদর্শিক এই স্বার্থান্বেষী মহল অন্য দেশের স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে ব্যক্তিগত তথাকথিত মতাদর্শের পক্ষে তাদের ভাষায় ইতিবাচক ব্যাখ্যা দাড় করিয়ে ফেলেন ।

আগামী ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস । বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই । তবে সাম্প্রদায়িক রীতিনীতির ভিন্নতার কারণে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী থাকায় সরকার ঐ জনগোষ্ঠী গুলোকে ‚ক্ষুদ্র ও নৃ গোষ্ঠী” হিসাবে পরিগণিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন । সরকার এই সিদ্ধান্ত দেশের ঐতিহাসিক পটভূমি বিবেচনায় এবং বাংলাদেশে বসবাসরত ঐ ছোট ছোট জনগোষ্ঠী সমূহের উৎস ও প্রাথমিক আগমনের বিষয় আমলে নিয়ে ঐ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ।

কিন্তু বাংলাদেশের কিছু স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবী তাদের মনগড়া মতাদর্শ সরকারের সিদ্ধান্তের উপর চাপিয়ে দিতে চান । তাদের এই দাবির পিছনে ঐতিহাসিক কোন ভিত্তি নেই । যেহেতু তারা বুদ্ধিজীবী, তাই আশা করা যায়, তারা বিষয়টি বোঝেন, কিন্তু নিজেদের অহংকারপ্রসুত অথবা অন্য কোন স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে ব্যক্তিগত লাভের আশায় তারা তাদের ভ্রান্ত মতাদর্শ দেশের উপর চাপিয়ে দিতে চান । তাদের এই দাবি এবং কার্যক্রম চরমভাবে দেশ স্বার্থ বিরোধী হতে পারে এ বিষয়টি তারা ইচ্ছাকৃতভাবে একেবারেই বুঝতে চান না।

বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসরত ‚ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠীর” অধিবাসীগণ এবং তাদের সমর্থনপুষ্ট স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবীদের ‚আদিবাসী” সংক্রান্ত দাবী একেবারেই নতুন । ইতিপূর্বে ‚ক্ষুদ্র ও নৃ-গোষ্ঠীর” অধিবাসীগণ নিজেদের ‚উপজাতী” হিসেবে পরিচয় দিতে সম্মানিত বোধ করতো । এমনকি ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তিতেও ক্ষুদ্র ও নৃ গোষ্ঠীর এই অধিবাসীদের ‚উপজাতী” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ।

২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ অধিবেশনে The Nation Declaration on the Rights of Indigenous Peoples (UNDRIP) বিল পাশ হয় । ১৪৪ টি দেশ ঐ বিলের স্বপক্ষে, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশসমুহ ঐ বিলের বিপক্ষে এবং বাংলাদেশসহ আরও ১১টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে । পরবর্তীতে ২০১৬ সালের মে মাসে কানাডা UNDRIP থেকে তাদের আপত্তি প্রত্যাহার করে নেয়। বাংলাদেশ UNDRIP তে ভোটদানে বিরত থাকলেও জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক শর্তানুযায়ী বাংলাদেশে ‚আদিবাসীদের” উপস্থিতি সম্পর্কে যথেষ্ট গবেষণা করে সরকার ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর এই সম্প্রদায় সমুহকে ‚ক্ষুদ্র ও নৃ গোষ্ঠী” নামে অভিহিত করে আইন পাশ করেছে ।

তবে একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পালন করতেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই । ২০০৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে UNDRIP তে আদিবাসীদের কয়েকটি নির্দিষ্ট অধিকারের বিষয়ে নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে । আদিবাসীদের ভূমি অধিকার, জীবন ও নিরাপত্তা অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় স্বীকৃতি, শিক্ষা ও তথ্যের অধিকার এবং চাকুরী, দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার, আদিবাসী অধ্যুষিত ভূমিতে খনিজ সম্পদসহ অন্যান্য সম্পদের অধিকার, জ্ঞানের অধিকার, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রশাসন পরিচালনা করার অধিকার ইত্যাদি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে ।

অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে কোন নিদিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ‚আদিবাসী” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে ঐ ভূখণ্ডের উপর স্বাধীন সার্বভৌম দেশের সরকারের কর্তৃত্ব খর্ব হবে । এমনকি ঐ ভূখণ্ডে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদের বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে হলে ‚আদিবাসী” ঐ জনগোষ্ঠীর সাথে সরকারকে পরামর্শ করতে হবে । ঐতিহাসিকভাবে সত্য না হলেও সুযোগের সদ্ব্যবহার এবং বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে চাকমা সার্কেল প্রধান ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়সহ উপজাতিদের সমমনা বুদ্ধিজীবীগণ বাংলাদেশে বসবাসরত ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর জাতিসত্ত্বাসমূহকে ‚আদিবাসী” হিসেবে পরিগণিত করার দাবী তুলেছেন ।

এখানে মনে রাখতে হবে, একটি দেশের বসবাসরত অধিবাসীদের মধ্যে ‚Minorities” এবং ‚আদিবাসী” বিষয়টি এক নয়। তবে কিছু কিছু দেশে স্বীকৃত আদিবাসীগণ ‚Minorities” নয়। যেমন, গুয়েতেমালা, বলিভিয়া ইত্যাদি । বাংলাদেশে বসবাসরত ছোট ছোট জাতি জাতিসত্ত্বার আদিবাসীগণকে ‚Minorities” হিসেবে পরিগণিত করা অধিক যুক্তিযুক্ত ।

জাতিসংঘ কমিশনের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার হোসে মার্টিনেজ কোবে যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তাতে বলা হয়েছে, কোন ভূখণ্ডের আদিবাসী সম্প্রদায়, জাতিগোষ্ঠী বা জাতি বলতে তাদের বোঝায়, যাদের ঐ ভূখণ্ডে প্রাক-আগ্রাসন এবং প্রাক-উপনিবেশকাল থেকে বিকশিত সামাজিক ধারাসহ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে, যারা নিজেদেরকে ঐ ভূখণ্ডে বা ভূখণ্ডের কিয়দাংশে বিদ্যমান অন্যান্য সামাজিক জনগোষ্ঠী থেকে নিজেদের স্বতন্ত্র মনে করে । সেই সাথে তারা নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও আইন ব্যবস্থার ভিত্তিতে পূর্বপুরুষের ভূখণ্ড ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ভবিষ্যৎ বংশধরদের হাতে তুলে দেয়ার ইচ্ছাপোষণ করে ।

জাতিসংঘ এখানে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে । যারা কোন উপনিবেশ স্থাপনের আগে থেকেই ওই ভূখণ্ডে বাস করছিল, যারা ভূখণ্ডের নিজস্ব জাতিসত্ত্বার সংস্কৃতি ধরে রেখেছে ও তা ভবিষ্যৎ বংশধরদের হাতে তুলে দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করে, এবং যারা নিজেদের স্বতন্ত্র মনে করে ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতিদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী ‚আদিবাসী” হবার জন্য পূর্বশর্তসমুহ পূরণ করে না । তারা মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে চট্টগ্রাম তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে ১৭শ খ্রিস্টাব্দ ও ১৮শ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ের দিকে অবস্থান নিয়েছিল ।

আদিবাসীদেরকে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়, যেমন: অষ্ট্রেলিয়াতে ‚Aboriginal Peoples”, ফ্রান্সে ‚Autochthonous Peoples”, কানাডাতে ‚First Nations”, যুক্তরাষ্ট্রে ‚Indians” ইত্যাদি নামে ডাকা হয় । ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আদিবাসীগণ প্রকৃতির উপর নির্ভর করতে গিয়ে চরম দারিদ্রতার মধ্যে দৈনন্দিন জীবন অতিবাহিত করেছে । তারা সাধারণত সভ্য সমাজের অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের মত করে চলতে পছন্দ করে ।

আদিবাসীদের অধিকারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিগোচরে আনার জন্য ১৯৬৫ সালে জাতিসংঘে ‚International Convention To Eliminate All Forms Of Racial Discrimination” (ICERD) বিষয়ে সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয় । ২০০৭ সালে জাতিসংঘের অধিবেশনে পাশকৃত UNDRIP তে আদিবাসীদের জন্য কয়েকটি মৌলিক অধিকারের বিষয়ে সমুন্নত রাখা হয়েছে ।

তার মধ্যে Convention ১৬৯ অনুযায়ী আদিবাসীগণ যে দেশের ভূখণ্ডে অবস্থান করছে সেই দেশের সরকার বিভিন্ন আইনগত বিষয়ে যা আদিবাসীদের সরাসরিভাবে প্রভাবিত করবে সে বিষয়ে তাদের সাথে আলোচনা করতে বাধ্য থাকবে। উদাহরণ স্বরূপ : আদিবাসীদের বসবাসরত ভূখণ্ডে সরকার কোন বাঁধ (Dam) তৈরীর প্রয়োজনবোধ করলে অথবা কোন খনিজ সম্পদ আহরণ করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডে অবস্থানরত আদিবাসীদের সাথে সরকারকে আলোচনা করে নিতে হবে ।

Convention ১৬৯ এ আরো উল্লেখ আছে সরকার আদিবাসীদের সাথে আলোচনার সময় সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব নিয়ে আলোচনা করবে । ২০০৭ সালের জাতিসংঘ অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ে পাশকৃত ইস্যুটিতে তিনটি মৌলিক বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, প্রথমত তাদের ভূখণ্ডে সম্পদের অধিকার, দ্বিতীয়ত নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার অধিকার এবং তৃতীয়ত রাজনৈতিক অধিকার অর্থাৎ নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ও পদ্ধতিতে প্রশাসন ব্যবস্থাপনা ।

বাংলাদেশ সরকার জনগনের মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে বদ্ধপরিকর । ২০০৭ সালের জাতিসংঘের অধিবেশনে পাশকৃত UNDRIP তে আদিবাসীদের যেসকল অধিকার দেওয়া হয়েছে তা অনেকটা ঐ নির্দিষ্ট ভূখন্ডে স্বায়ত্বশাসন এরই নামান্তর । তথাপি বাংলাদেশ সরকার এদেশে বসবাসরত ছোট ছোট জাতি স্বত্ত্বার জনগোষ্ঠী যদি আসলেই ‚আদিবাসী” হবার পূর্বশর্তসমুহ পূরণ করতো তাহলে তাদের দাবী অনুযায়ী সরকার নিশ্চয়ই বিষয়টি নিয়ে দৃঢ়ভাবে বিবেচনা করতো ।

কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবীগণ এবং ক্ষুদ্র ও নৃ গোষ্ঠীর সুযোগ সন্ধানী কিছু নেতৃবৃন্দ তাদের সুদূরপ্রসারী দেশ বিরোধী স্বার্থের কারণে ২০০৭ সালের পর থেকে হঠাৎ করেই ‚আদিবাসী” বিষয় দাবী তুলেছেন । ভ্রান্ত এই দাবীটি দেশের স্বার্থ বিরোধী এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই । তথাপি দেশের কতিপয় স্বার্থান্বেষী নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, পাহাড়ে বসবাসরত শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ, এমনকি সাংবাদিকরাও ইদানিং ছোট ছোট ক্ষুদ্র বিভিন্ন সম্প্রদায়গুলোকে সরকার নির্দেশিত ‚ক্ষুদ্র ও নৃ-গোষ্ঠী” না বলে ‚আদিবাসী” হিসেবে অভিহিত করছেন । সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও সতর্কতা সত্ত্বেও ‚আদিবাসী” শব্দের ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, জাতীয় ঐতিহাসিক স্থানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করা হচ্ছে ।

উপজাতীদের ‚আদিবাসী” হিসেবে উল্লেখ না করার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও স্বার্থান্বেষী মহল খুব সচেতনভাবেই তা অমান্য করছেন । ২০১৫ সালের ১৬ আগস্ট গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-৩ অধিশাখা থেকে ‚বাংলাদেশে আদিবাসী নামক অসাংবিধানিক দাবি বাস্তবায়নের অপকৌশল রোধে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান ব্যবহারের অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন” সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় ।

দেশের প্রত্যেক মানুষেরই আলাদা আলাদা মতাদর্শ থাকতে পারে । এই মতাদর্শ যেন দেশপ্রেমের সাথে সাংঘর্ষিক না হয় সে বিষয়টি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে হবে । ব্যক্তিগত মতাদর্শের বিষয়টি দুই ধরণের হতে পারে- প্রথমত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মনেপ্রাণে ঐ মতাদর্শকে বিশ্বাস ও ধারণ করেন আবার দ্বিতীয়ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নির্দিষ্ট একটি মতাদর্শ মনে প্রাণে ধারণ না করলেও স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় দেশের স্বার্থ বিরোধী হলেও উক্ত বিতর্কিত মতাদর্শে স্থির থাকেন ।

সরকারের সুনিদিষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও যেহেতু বাংলাদেশের স্বার্থানেষী কিছু বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশের উপজাতীদের ‚আদিবাসী” হিসেবে সম্বোধন করছেন সেহেতু তারাও সুদূর প্রসারী কোন ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে করছেন, তা অনুমান করা যায় । তারা তাদের ব্যক্তিগত মতাদর্শের আবরণে উপজাতীদের ‚আদিবাসী” আন্দোলনকে আরও উৎসাহিত করছেন । তবে যদি আদিবাসী দাবীটির পিছনে সত্যতা থাকতো তাহলে বিষয়টি নিয়ে হয়তো বিতর্কের সুযোগ ছিলো।

কিন্তু একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত বিষয়ে কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবী কেন ক্রমাগত প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তা’ তারা নিজেরাই ভালো বলতে পারবেন । দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা, অখণ্ডতা রক্ষা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি  অর্জনের মত মৌলিক বিষয়ে কোন বিতর্ক সৃষ্টি কাঙ্ক্ষিত নয় । মৌলিক বিষয়সমূহে আমাদের মতাদর্শগত ভিন্নতা দেশপ্রেমের গভীরতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ।

অপ্রয়োজনীয় এবং অগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করে মেধাবী জনগোষ্ঠীর যেমন সময় নষ্ট হয় তেমনি দেশের স্বার্থের প্রয়োজনে ঐ মেধাসমুহ ঐ সময়গুলোতে কোন ভূমিকা রাখতে পারে না । দেশের মৌলিক বিষয় সমুহে ব্যক্তিগত মতাদর্শগত ভিন্নতা যেনো অহেতুক অহংকারে বা কোন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর স্বার্থের কারণে প্রভাবিত না হয় সেবিষয়ে দৃষ্টি দেয়া আবশ্যক ।

পারভেজ হায়দার- পার্বত্য গবেষক

আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে সমস্যা কোথায়?

মেহেদী হাসান পলাশ 

মেহেদী হাসান পলাশ

আজ ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস। অন্যসব বছরের মতো এ বছরেও বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী সাড়ম্বরে দিনটি উৎযাপনের আয়োজন করেছে। এ বছর জাতিসংঘ দিনটির প্রতিপাদ্য ঠিক করেছে, Post : 2015 Agenda: Ensuring indigenous peoples’ health and well-being”. বিশ্ব আদিবাসী দিবসকে সামনে রেখে আবার নতুন করে আলোচিত হচ্ছে বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্কটি।

বাংলাদেশে আদিবাসী কারা- এই বিতর্কটি খুব প্রাচীন নয়, বড়ো জোর দেড় দশকের। ইস্যুটি পুরনো না হলেও তা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাস, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বকে নাড়া দিয়েছে। জাতীয় সংহতির প্রশ্নে তাই এ বিতর্কের আশু সমাধান জরুরি। ইতোপূর্বে দৈনিক ইনকিলাবে একই বিষয়ে বর্তমান লেখকের তিনটি উপ-সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছে। প্রবন্ধগুলো হচ্ছে, বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক, প্রকাশ, ২ আগস্ট ২০১৩; আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ, প্রকাশ ৩০ আগস্ট ২০১৩ এবং বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা, প্রকাশ, ১৫ আগস্ট ২০১৪। পঠনের পরম্পর্য রক্ষায় পাঠকগণ ইচ্ছে করলে উপরের হাইপার লিংক থেকে লেখাগুলো পড়ে নিতে পারবেন। বর্তমান লেখায় বাংলাদেশের সমতলে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সলুক সন্ধান ও তাদের আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে প্রতিবন্ধকতা কোথায় তা নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

আদিবাসী শব্দের ইংলিশ প্রতিশব্দ Indigenous people. . অনেকে আদিবাসী শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে Aborigine ব্যবহার করেন। কিন্তু Aborigine বলতে সার্বজনীনভাবে আদিবাসী বোঝায় না। Aborigine বলতে সুনির্দিষ্টভাবে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের বোঝায়। একইভাবে Red Indian বলতে মার্কিন আদিবাসীদের বোঝায়, অস্ট্রেলীয় Aborigine বা আদিবাসীদের বোঝায় না। প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী আদিবাসী হচ্ছে, ‘কোনো স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই।’ মর্গান বলেন, The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial … they are the true Sons of the soil…’ (Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972).

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে মোট ৪৫টি (কারো কারো মতে ৭৫) ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব রয়েছে। সাধারণভাবে এরা উপজাতি ও তফশিলী সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। তবে বিশেষ উদ্দেশ্যে কিছু মতলবাজগোষ্ঠী এ সম্প্রদায়গুলো আদিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের আদিবাসী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করা শুরু করেছে।  জাতি ও উপজাতি সংজ্ঞা এসব জনগোষ্ঠীর অনেকগুলোর জন্যই প্রযোজ্য নয়। তাই তাদের তফশিলী সম্প্রদায় বলা হয়। ভারতবর্ষেও সহস্রাধিক সম্প্রদায় ‘তফশিলী’ হিসেবেই রাষ্ট্রকাঠামোতে স্বীকৃত রয়েছে। বাংলাদেশের সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে সাঁওতাল, গারো, হাজং, কোচ, মনিপুরী, খাসিয়া, রাখাইন প্রধান। এখানে এসব জনগোষ্ঠীর আদি নিবাস ও বাংলাদেশে আগমন নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে।(পূর্বের ‘বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক’ শিরোনামের লেখায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাসিন্দাদের আদি নিবাস ও বাংলাদেশে আগমন নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। ইচ্ছে করলে পাঠকগণ উপরের হাইপার লিংকে ক্লিক করে সেসব তথ্য দেখে নিতে পারেন।)

ইতিহাসের এই বিশ্লেষণে সকল তথ্যের জন্য মাত্র তিনটি পুস্তককে রেফরেন্স ও তথ্যাগার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর একটি হলো বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রণীত `বাংলাপিডিয়া’, একই প্রতিষ্ঠানের `বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা’ এবং বাংলাদেশ আদিবাসী অধিকার আন্দোলন কর্তৃক প্রণীত `বাংলাদেশের আদিবাসী : এথনোগ্রাফীয় গবেষণা’। এই পুস্তক তিনটি নির্বাচনের প্রধান কারণ বাংলাদেশে আদিবাসী অধিকার ও স্বীকৃতির বিষয়ে অধিক সোচ্চার ব্যক্তিগণ এই বই তিনটির রচনা ও সম্পাদনার সাথে তারা জড়িত।

সাঁওতাল

ভারতবর্ষের প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাঁওতাল অন্যতম হলেও বাংলাদেশের তাদের আগমন মাত্র ব্রিটিশ আমলে। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, ব্রিটিশ সরকার রেল লাইন নির্মাণ কাজের জন্য ভারতের সাঁওতাল পরগণা থেকে সাঁওতালদের বাংলাদেশে নিয়ে আসে। এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রণীত বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালায় বাংলাদেশে সাঁওতালদের আগমন সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘দীর্ঘদিন ধরে সাঁওতালরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে বসবাস করছিলেন। ১৮৩৬ সালে ব্রিটিশ সরকার তাদেরকে নির্বিঘ্নে বসবাসের জন্য একটি স্থায়ী এলাকা নির্ধারণ করে দেয়। এ এলাকা সাঁওতাল পরগণা নামে খ্যাত হয়। সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর তাদের অনেকে সাঁওতাল পরগণায় থাকা নিরাপদ মনে না করে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। ড. পিয়ের বোসাইনেট উল্লেখ করেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) সাঁওতালদের অধিকাংশই সাঁওতাল পরগণা থেকে এখানে আগমন করেছেন।

গারো

নৃতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদদের মতে, গারোরা মঙ্গোলয়েড মহাজাতির টিবেটো-বার্মান দলের টিবেটো-চাইনিজ পরিবারের সদস্য। গারোদের ঐতিহ্যবাহী গানের মধ্যে তাদের এদেশে আগমনের সময়কাল সম্পর্কে বলা হয়েছে \’Do reng noktopgita, kilding jakbogita\’ অর্থাৎ ‘সে সময় চিলগুলো ছিল একটি ছোট্ট কুটিরের মতো, আর মাকড়সার জালের সুতা ছিল এক হাতের মতো বড়।’ গারোদের পূর্ব পুরুষদের ধারণা মতে, তাদের পূর্ব-পুরুষদের আদি বাসস্থান ছিল তিব্বত যা \’Torua\’ নামে পরিচিত ছিল। তিনটি পথ দিয়ে তিন দলে বিভক্ত হয়ে গারোদের পূর্ব-পুরুষরা এ উপমহাদেশে আসে। এর একটি দল দক্ষিণ দিকে সুরমা ও বরাক নদী হয়ে কাছাড় ও সিলেটে প্রবেশ করে। এই দলই পরবর্তীতে ‘বঙ্গে’ অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

হাজং

নৃবিজ্ঞানী মি. জে কে বোসের মতে, হাজং গরোদেরই একটি দল। বিভিন্ন লেখকের মতে, হাজংরা আসামের কামরূপ জেলার হাজো অঞ্চল থেকে ক্রমান্বয়ে এদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছে। প্রবীণ হাজংদের মতে, তাদের আদিনিবাস বিহারের অদূরে অবন্তিনগর (মালব) নামক স্থানে এবং নিজেদেরকে তারা সূর্যবংশীয় ক্ষত্রিয় বলে দাবি করে। হাজংরা সুদূর চীনের হোয়াংহো নদীর অববাহিকা থেকে তিব্বত, তিব্বত থেকে অবন্তিনগর (মালব), অবন্তিনগর থেকে প্রাগজ্যোতিষপুর (গৌহাটি) হাজোনগর এবং হাজোনগর থেকে গাড়ো পাহাড়ের কড়ইবাড়ি, বারহাজারী থেকে বাংলাদেশে বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করে।

কোচ

কোচেরা নিজেদের কুচবিহারের নৃপতি নরনারায়ণ এবং চিলারায়ের বংশধর হিসেবে পরিচয় দেয়। তাদের মতে, তাদের আদিনিবাস ছিল রাসান মৃকপ্রাক টারি (যে পাহাড়ে সূর্য প্রথম উদয় হয়) অথবা উদয়গিরি নামক স্থানে। সে আদিনিবাস ত্যাগ করে তারা প্রথমে কামরূপ অঞ্চলে বসতি গড়ে। কামরূপের পরে তারা হাজো অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। সেখান থেকে নানা পথ ঘুরে মেঘালয়ের পশ্চিম সমভূমি এলাকায় রাজ্য গড়ে তোলে যা কুচবিহার নামে পরিচিতি লাভ করে। এ কুচবিহার থেকেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে কোচেরা নানাদিকে দলে দলে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বর্তমানের বাংলাদেশেও সেরকম কয়েকটি দল প্রবেশ করে, যাদের উত্তর পুরুষরাই বর্তমানে একাধিক গোষ্ঠীর নামকরণপূর্বক এদেশের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করছে।

রাখাইন

নৃতাত্ত্বিক বিচারে এরা মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর লোক। রাখাইনদের আদিনিবাস ছিল আরাকান (বর্তমান মায়ানমারের অন্তর্ভুক্ত)। রাখাইনরা তাদের নিজ দেশকে ‘রক্ষইঙ্গি’ এবং নিজেদের ‘রাখাইন’ নামে পরিচয় দিত। রাখাইনদের অংশবিশেষ পনেরো শতক থেকে কক্সবাজারের রামু ও সংলগ্ন এলাকায় বসতি শুরু করলেও আঠারো শতকে আরকানের রাজনৈতিক দুর্যোগ তাদের অনেককেই স্বদেশ ভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য করে। ফলে তারা ক্রমান্বয়ে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় এবং বরগুনা ও পটুয়াখালীতে এসে বসবাস করতে থাকেন।

মণিপুরী

মণিপুরীরা উৎপত্তির ঊষালগ্নে ভারতের বৃহত্তর আসাম রাজ্যের পাদদেশে অবস্থিত বরাক নদীর অববাহিকায় পাতকায় উপত্যকাই অবস্থিত পার্বত্য রাজ্য, নৈসর্গিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ একদা স্বাধীন মণিপুর রাজ্যের অধিবাসী। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মণিপুরে প্রবেশ করে মণিপুরীদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ইংরেজগণ মণিপুরীদের পরাস্ত করে মণিপুরের রাজা বীরবিক্রম টিকেন্দ্রজিৎ সিংহকে পরাস্ত ও বন্দি করে। পরবর্তীকালে ১৯৪৯ সালে মণিপুরকে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের করদরাজ্য বিবেচনায় ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত করে। প্রাণরক্ষার তাগিদে বহু দিশেহারা মণিপুরী [১৭৫৮, ১৭৬৫, ১৮৯১ খ্রি.] নানা দলে বিভক্ত হয়ে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের সন্ধানে মণিপুর রাজ্য ছেড়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েন। তখন অনেক মণিপুরী লোক বাংলাদেশ ভূখণ্ডে এসে বসতি স্থাপন করে।

খাসিয়া

খাসিয়া বা খাসিমঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত উপজাতি। এদেশীয় খাসিয়ারা প্রায় ৫শ’ বছর পূর্বে আসাম থেকে এখানে এসে বসতি গড়েছে। তারা আসামে এসেছিল সম্ভবত তিব্বত থেকে। তাদের প্রধান আবাসস্থল উত্তরপূর্ব ভারত।

উপর্যুক্ত আলোচনায় দেখা যায়, ঐতিহাসিক বিচারে বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠীই বহিরাগত। এটা আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের নেতাকর্মী ও গবেষকগণ স্বীকার করে নিয়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় যেসব প্রত্নবস্তু, অবস্থান ও প্রমাণ পাওয়া গেছে তা খৃষ্টপূর্ব ১৬০০-৫০০ সালের পুরাতন। সেকারণে উপজাতিদের আদিবাসী আখ্যাদানকারী গবেষকগণ এখন ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) কনভেনশন-১৬৯’র আদিবাসী বিষয়ক সংজ্ঞার অপব্যাখ্যা করে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তফশিলী সম্প্রদায়কে আদিবাসী দাবি করছেন ও দাবি করতে উদ্বুদ্ধ করছেন। তবে এ কথা ভুললে চলবে না বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তফশিলী সম্প্রদায়ের অধিকাংশই এই ‘আদিবাসী’ দাবির সাথে সম্পৃক্ত নয়। দেশি-বিদেশি চিহ্নিত একটি মহলের ইন্ধন ও পৃষ্ঠপোষকতায় আঞ্চলিক ও সম্প্রদায়গত কিছু সংগঠন এবং এনজিওর সাথে জড়িত ব্যক্তিরা এই দাবির সাথে জড়িত। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) আদিবাসী কনসেপ্ট সমর্থন করে না। তারা সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে পছন্দ করে।

সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অনেক বিদগ্ধজনের মুখে শোনা যায়, উপজাতি বললে তারা যদি অপমানিত বোধ করে, হেয় বোধ করে এবং আদিবাসী বললে যদি খুশী হয় তাহলে তা বলতে দোষ কোথায়? ইতিহাসে যাই-ই থাক, শতকরা ৯৮ ভাগ একক বাঙালি জনগোষ্ঠীর দেশে আমরা আমাদের দেশের মুষ্টিমেয় উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি এইটুকু উদারতা কি দেখাতে পারি না? এই প্রশ্ন যেকোনো সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষের হৃদয় বিগলিত করতে বাধ্য।

প্রশ্নটি অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে। কিন্তু গোল বাঁধিয়েছে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র। ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক একটি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এ ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করলে ১৪৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪টি দেশ বিপক্ষে, ১১টি দেশ ভোট দানে বিরত এবং ৩৪টি দেশ অনুপস্থিত থাকে। ভোট দানে বিরত থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া দেশগুলো হচ্ছে- অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘোষণাপত্রে সর্বমোট ৪৬টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এসব অনুচ্ছেদের বেশ কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, অস্তিত্ব, কর্তৃত্ব, সংবিধান ও আত্মপরিচয়ের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

একথা নিশ্চিত করে বলা যায়, যেসব ব্যক্তিবর্গ খুব সরলভাবে বা অসেচতন-উদারতায় উপজাতিদের আদিবাসী বলতে ইচ্ছুক/আগ্রহী তাদের অনেকেই হয়তো এই ঘোষণাপত্র পড়ে দেখেননি অথবা তার মর্মার্থ অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন (অবশ্য তারা  মতলববাজদের কথা আলাদা)। নিম্নে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্রের কিছু অনুচ্ছেদ নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

অনুচ্ছেদ-৩ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার বলে তারা অবাধে তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করে এবং অবাধে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মপ্রয়াস অব্যাহত রাখে।

অনুচ্ছেদ-৪ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার উপভোগের বেলায়, তাদের অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ে তথা স্বশাসিত কার্যাবলীর অর্থায়নের পন্থা ও উৎস নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের স্বায়ত্তশাসন বা স্বশাসিত সরকারের অধিকার রয়েছে।

অনুচ্ছেদ-৫ : আদিবাসী জনগণ যদি পছন্দ করে তাহলে রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের পূর্ণ অধিকার রেখে তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক, আইনগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অক্ষুণ্ন রাখা ও শক্তিশালীকরণের অধিকার লাভ করবে।অনুচ্ছেদ-৬ : আদিবাসী ব্যক্তির জাতীয়তা লাভের অধিকার রয়েছে।

অনুচ্ছেদ-১৯ : রাষ্ট্র  আদিবাসীদের প্রভাবিত করতে পারে এমন আইন প্রণয়ন কিংবা প্রশাসনিক সংক্রান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পূর্বে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি নেয়ার জন্য তাদের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে আন্তরিকত্ব সদিচ্ছার সাথে আলোচনা ও সহযোগিতা করবে।

উপরের অনুচ্ছেদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে বাংলাদেশের ভেতর কমপক্ষে ৪৫টি স্বায়ত্তশাসিত বা স্বশাসিত অঞ্চল ও সরকার ব্যবস্থার সৃষ্টি হবে। এসব অঞ্চলে সরকার পরিচালনায় তারা নিজস্ব রাজনৈতিক কাঠামো, জাতীয়তা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আইনপ্রণয়ন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পাবে। এবং এসব অঞ্চলের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের অধিকার ও কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন হবে। লক্ষণীয়, প্রকাশ্যে বলা না হলেও এই আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বতন্ত্র জাতীয়তার মধ্যে লুকানো রয়েছে স্বাধীনতার বীজ।

এই ঘোষণাপত্রে আদিবাসীদের ভূমির উপর যে অধিকারের কথা বলা হয়েছে তা আরো ভয়ানক। যেমন :

অনুচ্ছেদ-১০ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের ভূমি কিংবা ভূখণ্ড থেকে জবরদস্তিমূলকভাবে উৎখাত করা যাবে না। আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের স্বাধীন ও পূর্ববহিত সম্মতি ছাড়া কোনভাবে অন্য এলাকায় স্থানান্তর করা যাবে না এবং ন্যায্য ও যথাযথ ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে সমঝোতা সাপেক্ষে স্থানান্তর করা হলেও, যদি কোন সুযোগ থাকে, পুনরায় তাদেরকে সাবেক এলাকায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

অনুচ্ছেদ-২৬ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তাদের ঐতিহ্যগতভাবে মালিকানাধীন, দখলীয় কিংবা অন্যথায় ব্যবহার্য কিংবা অধিগ্রহণকৃত জমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের অধিকার রয়েছে।

২৬: ৩. রাষ্ট্র এসব জমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের আইনগত স্বীকৃতি ও রক্ষার বিধান প্রদান করবে। সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রথা, ঐতিহ্য এবং ভূমি মালিকানা ব্যবস্থাপনা মেনে সেই স্বীকৃতি প্রদান করবে।

অনুচ্ছেদ-২৭ :  রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে যৌথভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আইন, ঐতিহ্য, প্রথা ও ভূমি মালিকানাধীন ব্যবস্থাপনার যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করবে।

অনুচ্ছেদ-২৮ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদ যা তাদের ঐতিহ্যগতভাবে মালিকানাধীন কিংবা অন্যথায় দখলকৃত বা ব্যবহারকৃত এবং তাদের স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি ছাড়া বেদখল, ছিনতাই, দখল বা ক্ষতিসাধন করা হয়েছে এসব যাতে ফিরে পায় কিংবা তা সম্ভব না হলে, একটা ন্যায্য, যথাযথ ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পায় তার প্রতিকার পাওয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রয়েছে।

২৮: ২. সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় অন্য কোন কিছু রাজি না হলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে গুণগত, পরিমাণগত ও আইনি মর্যাদার দিক দিয়ে সমান ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদ অথবা সমান আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে বা অন্য কোন যথাযথ প্রতিকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

অনুচ্ছেদ-৩০ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বেচ্ছায় সম্মতি জ্ঞাপন বা অনুরোধ ছাড়া ভূমি কিংবা ভূখ-ে সামরিক কার্যক্রম হাতে নেয়া যাবে না।

অনুচ্ছেদ-৩২ : ২. রাষ্ট্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের উপর প্রভাব বিস্তার করে এমন কোন প্রকল্প অনুমোদনের পূর্বে, বিশেষ করে তাদের খনিজ, জল কিংবা অন্য কোন সম্পদের উন্নয়ন, ব্যবহার বা আহরণের পূর্বে স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি গ্রহণের জন্য তাদের নিজস্ব প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে আলোচনা ও সহযোগিতা করবে।

উপরোক্ত অনুচ্ছেদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী আদিবাসী স্বীকৃতি পেলে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নিজস্ব আইনে নিজস্ব ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মুষ্টিমেয় চিহ্নিত উপজাতিরা দাবি করছে ঐতিহ্য ও প্রথাগত অধিকার বলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল ভূমির মালিক তারা। একই অধিকার বলে সমতলের উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকার সকল ভূমির মালিকানা সেখানকার উপজাতীয়রা দাবি করবে। সেখানে যেসব ভূমি সরকারি ও ব্যক্তিগত মালিকানা (আদিবাসী নয়) রয়েছে তা ফেরত দিতে হবে বা তার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এমনকি উপজাতীয়রা রাজি না হলে সমতল থেকে সমপরিমাণ সমগুরুত্বের ভূমি ফেরত দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে যেহেতু ঐ গোষ্ঠী সকল সামরিক স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার দাবি জানাচ্ছে, সেকারণে সেখান থেকে সকল সামরিক স্থাপনা সরিয়ে নিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অন্যান্য উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় যেসব বাঙালি বসতি স্থাপন করেছে তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। ইউএনডিপিসহ কিছু বৈদেশিক সংস্থা ইতোমেধ্যে প্রকাশ্যে এ দাবি তুলেছে।

ঘোষণাপত্রের ৩৬ অনুচ্ছেদটি আরো ভয়ানক।

অনুচ্ছেদ-৩৬ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর, বিশেষত্ব যারা আন্তর্জাতিক সীমানা দ্বারা বিভক্ত হয়েছে তারা অন্য প্রান্তের নিজস্ব জনগোষ্ঠী তথা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংক্রান্ত কার্যক্রমসহ যোগাযোগ, সম্পর্ক ও সহযোগিতা বজায় রাখার ও উন্নয়নের অধিকার রয়েছে।

আমরা জানি বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল উপজাতি জনগোষ্ঠীর মূল আবাস ভারত ও মিয়ানমার। সেখানে এখনো তাদের মূল জনগোষ্ঠী রয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশে তাদের খণ্ডিত অংশ যদি আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পায় তাহলে ভারতের সমগ্র সেভেন স্টিস্টার্স রাজ্য, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা এবং মিয়ানমারের বিপুল এলাকা আদিবাসী ল্যান্ড স্বীকৃতি পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে। একই সাথে সীমান্তের উভয়পাড়ের অভিন্ন জনগোষ্ঠী যদি অভিন্ন রাজনৈতিক, সরকার কাঠামো কিংবা স্বাধীনতার দাবি তোলে তা আঞ্চলিক সমস্যায় রূপ নেবে। এ বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার প্রতিবেশী ভারত সরকারের দৃষ্টিগোচর করতে পারে।  আদিবাসী জনগোষ্ঠী উল্লিখিত অধিকারসমূহ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ বিশেষভাবে ভূমিকা রাখতে পারবে যা ৪২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। পূর্ব তিমুর, দক্ষিণ সুদান স্বাধীন করণে জাতিসংঘের ভূমিকা বিশ্বের দেশপ্রেমিক জনগণকে আতঙ্কিত করেছে। অধুনা পশ্চিম পাপুয়া নিউগিনিতেও জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

যদিও ৪৬ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন আদিবাসীর দাবি এমন একটা জনগোষ্ঠী থেকে উচ্চারিত হচ্ছে যারা ৪২ বছর ধরে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। কৌশলগত কারণে তারা স্বায়ত্তশাসনের কথা যতোটা উচ্চকিত করে স্বাধীনতার কথা ততোটা নয়। ফলে দেশের অধিকাংশ মানুষই রাষ্ট্রবিরোধী এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থাও রহস্যময় আবরণে সযত্নে ঢেকে রেখেছে দেশবিরোধী এই দুষ্টুক্ষত। কিন্তু যারা সচেতন, বিশেষ করে যারা সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহার করেন তাদের প্রতি আহ্বান একবারের জন্য হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীদের পরিচালিত প্রোফাইল, গ্রুপ ও পেইজগুলো ভিজিট করে দেখুন কী ভয়ানক রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে সেখানে। স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ড গঠনের জন্য নিজস্ব জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, মানচিত্র দিয়ে কিভাবে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে তা সচেতনতার জন্য দেশবাসীর জানা উচিত।

পাঠকের জ্ঞাতার্থে সিএইচটি জুম্মল্যান্ড নামে তাদের পরিচালিত একটি পেইজের ঠিকানা এখানে দেয়া হলো :(https://www.facebook.com/pages/CHT-jummaland/327524104096965?fref=ts)। শুধু ফেসবুক বা সামাজিক গণমাধ্যম নয়, পাহাড়ী বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীরা নিউজ পোর্টাল খুলেও পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড গঠনের প্রচার চালাচ্ছে। তাদের পরিচালিত অসংখ্য সাইটের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, chtnews.com. এই সাইটে করুণালঙ্কার ভান্তে নামে জেএসএসের এক শীর্ষ নেতার ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার প্রচার হচ্ছে বেশ কয়েকদিন ধরে। বৌদ্ধ ভিক্ষুর বেশধারী এই ব্যক্তি নিজেকে স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিচয় দিয়ে বিশ্বব্যাপী স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠায় তার কর্মতৎপরতার কথা বিস্তারিতভাবে বলেছেন। অডিও-ভিডিও’র এই স্বাক্ষাৎকারে ভান্তে আরো জানিয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন করার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র তাদের হাতে রয়েছে। এখন তিনি শুধু ৫ লক্ষ গোলাবারুদ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এই পরিমাণ গোলাবারুদ সংগ্রহ করতে পারলে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা করে স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই ভিক্ষু সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা অর্জনের উদাহরণ তুলে ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী তরুণ প্রজন্মকে তার সাথে একাত্ম হতে অহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আন্তর্জাতিক শক্তিকে তিনি পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পাবেন বলেও জানিয়েছেন। কাজেই বাংলাদেশের উপজাতিদের আদিবাসী স্বীকৃতি কোনো ছেলের হাতের মোয়া নয়। এর সাথে জড়িত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, অস্তিত্ব, কর্তৃত্ব, ইতিহাস ও মর্যাদার প্রশ্ন।

Email:palash74@gmail.com

৯ আগস্ট ২০১৫ তারিখে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত।

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জাতীয় অবকাঠামো ভাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে জারি করা সরকারী প্রজ্ঞাপনের প্রতিবাদ জানিয়েছে জেএসএস

জনসংহতি সমিতি

স্টাফ রিপোর্টার:

সংবিধান বিরোধী আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জাতীয় অবকাঠামো ভাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ১৬ আগস্ট ২০১৫ তারিখে জারী করা প্রজ্ঞাপনের প্রতিবাদ জানিয়েছে পার্বত্য জনসংহতি সমিতি।

 উল্লেখ্য, গত ১৬ আগস্ট ২০১৫ তারিখে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-৩ অধিশাখা থেকে “বাংলাদেশে আদিবাসী নামক অসাংবিধানিক দাবী বাস্তবায়নের অপকৌশল রোধকল্পে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান ব্যবহারের অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন” সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপন জারী করা হয়।

মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব মো: মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত উক্ত নির্দেশনায় বলা হয়েছে যে, “সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন ছোট ছোট সম্প্রদায়/গোষ্ঠীকে উপজাতি/ক্ষুদ্র জাতিসত্তা/নৃগোষ্ঠী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। একটি স্বার্থান্বেষী মহল দেশী-বিদেশীদের সহায়তায় বাংলাদেশে আদিবাসী নামক অসাংবিধানিক দাবীটি প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এই অপকৌশল ও ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় স্বার্থান্বেষী মহল কর্তৃক শহর কেন্দ্রীক বিশেষ করে ঢাকা মহানগরের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা/অবকাঠামো যেমন: যুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, জাতীয় শহীদ মিনার, শিল্পকলা একাডেমী, জাতীয় জাদুঘর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বর, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটসহ আরো অনেক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কর্মসূচী পালনের জন্য ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সকল অনুষ্ঠানে জাতীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও সরকারের পদস্থ কর্মকর্তাগণকে সম্পৃক্ত করার প্রবণতাও লক্ষ্যনীয়। পত্রে বাংলাদেশে আদিবাসী নামক অসাংবিধানিক দাবী বাস্তবায়নের অপকৌশল রোধ কল্পে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান ব্যবহারের অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ করা হয়েছে। বর্ণিতাবস্থায় বাংলাদেশে আদিবাসী নামক অসাংবিধানিক দাবী বাস্তবায়নের অপকৌশল রোধ কল্পে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান ব্যবহারের অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।”

জন সংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ বস্তুত: গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উক্ত নির্দেশনা সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। সংবিধানের ৩৯ নং অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্-স্বাধীনতা, ৩৭ নং অনুচ্ছেদে সমাবেশের স্বাধীনতা, ৩৮ নং অনুচ্ছেদে সংগঠনের স্বাধীনতার নিশ্চিয়তার বিধান করা হয়েছে। বাক্-স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সংবিধানে কোথাও উল্লেখ নেই যে, কেবল সংবিধান সম্মত শব্দচয়ন করতে হবে বা সংবিধানে উল্লেখ নেই এমন কোন শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। এমনকি সংবিধানের স্বীকৃত নয় এমন কোন দাবিদাওয়া উত্থাপন বা বাস্তবায়নের জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করা যাবে না বলে সংবিধানে কোথাও সেরকম বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়নি”।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ পঞ্চদশ সংবিধানের মাধ্যমে “উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়” শব্দগুলো উল্লেখ করা হলেও সংবিধানে কোথাও উল্লেখ নেই ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা যাবে না। বরঞ্চ দেশের বিভিন্ন আইনে ও সরকারী পরিপত্রে ‘উপজাতি’ শব্দের পাশাপাশি ‘আদিবাসী’ শব্দটিরও ব্যবহার রয়েছে। আরো উল্লেখ্য যে, সংবিধানে ‘দলিত’, ‘সংখ্যালঘু’, ‘প্রতিবন্ধী’ ইত্যাদি অনেক শব্দের উল্লেখ না থাকলেও এসব শব্দগুলো নানাভাবে বিভিন্ন আলোচনায় ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এসব জনবর্গের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য যুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, জাতীয় শহীদ মিনার, শিল্পকলা একাডেমী, জাতীয় জাদুঘর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বর, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটসহ আরো অনেক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কর্মসূচী পালন করা হচ্ছে”।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, “আদিবাসী শব্দ নিয়ে অতি উৎসাহী ও অতি মাত্রায় উদ্যোগী হয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় তথা সরকারের এই নির্দেশনা জারির পেছনে অত্যন্ত হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেছে বলে জনসংহতি সমিতি মনে করে। ভিন্ন জাতিসত্তার অধিকারী জনসংখ্যায় ক্ষুদ্র এসব জাতিসমূহ সকল ক্ষেত্রে প্রান্তিক, দুর্বল ও অসহায় হিসেবে হয়তো বিবেচনা করা যায় বলে বলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মতো উদ্ভট, হাস্যকর ও অগণতান্ত্রিক নির্দেশনা দিতে সরকার উঠে পড়ে বলে বিবেচনা করা যায়। তাই অচিরেই উক্ত নির্দেশনা প্রত্যাহার করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় তথা সরকারের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছে”।

আদিবাসী বিতর্ক

১।। সমাধানহীন জাতীয় বিতর্কে আরেকটা নতুন পালক

মাহবুব মিঠু

মাহবুব মিঠু

আদিবাসী বিতর্কটা বাংলাদেশে আর পাঁচটা সমাধানহীন বিতর্কের মতোই ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করছে। সেই সাথে বিভিন্ন পক্ষ থেকে বিতর্কের সমাধানের চেয়ে বরং এটিকে রাজনীতিকরণ করা শুরু হয়েছে। ফলে আদিবাসী ইস্যুটা সমাধানের চেয়ে দিনকে দিন জটিলতার দিকেই এগুচ্ছে বলে মনে হয়। এই পরিস্থিতিতে শুধু বাংলাদেশে নয়, বরং সমগ্র এশিয়ায় ক্রমশঃ এটা একাধারে এক পক্ষের ধারণায় অবহেলিত এবং অন্য পক্ষের ধারণায় একটা বিতর্কিত চাপিয়ে দেয়া ইস্যু হয়ে পড়েছে।

মূলতঃ অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, আমেরিকা কিংবা অন্যান্য ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রগুলোর মতো এশিয়ার বিতর্কটা সাদা কালোর মতো পরিস্কার নয়। এই সুযোগটাকে ব্যবহার করে এক পক্ষের মতে কিছু ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী এখান থেকে ফায়দা নেবার চেষ্টায় ব্যস্ত। কোন জাতি আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় তারা কিছু বাড়তি সুযোগ সুবিধা পায়। যেমন জমির উপর কিছু বাড়তি অধিকার এবং অন্যান্য আরো কিছু সুযোগ সুবিধা।

বাঙ্গালীদের বড় অংশ মনে করে, পাহাড়ীদের এই দাবী অন্যায্য এবং এটা মানা হলে যে সুযোগ সুবিধাগুলো তারা ভোগ করবেন সেটা একদিকে অন্যায় এবং আমাদের রাষ্ট্রিয় অখণ্ডতা ভবিষ্যতে হুমকীর মুখে পড়বে। অন্যদিকে, আদিবাসী দাবীদাররা মনে করছেন, অস্পষ্টতার সুযোগে রাষ্ট্রের ডোমিনেন্ট গ্রুপ তাদেরকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।

প্রায় ৪/৫ বছর আগে গুরুত্বসহকারে বিতর্কের বিষয়টা আমার মাথায় ভর করে বসে। তখন থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এক ধরনের তথ্যানুসন্ধানে নেমে পড়ি। এটা করতে গিয়ে  একটা অদ্ভুদ সত্য উপলব্ধি করি যেটা বেশ লজ্জার। তথ্য প্রমাণ সংগ্রহের জন্য আমি বিভিন্ন ব্যক্তিকে ফোনে এবং মেইলে যোগাযোগ করি। এদের বেশীরভাগ লোকই ইতিমধ্যে আদিবাসী বিতর্কের পক্ষে এবং বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ফেলেছেন। বিভিন্ন পত্রিকায় অপর্যাপ্ত তথ্যসহ লেখাসহ ব্লগ এবং ফেইসবুকেও ভারি ভারি প্রচারণা চালিয়েছেন। অথচ এদের অনেকের কাছেই পর্যাপ্ত তথ্যই নেই। অবশ্য কিছু শুভাকাঙ্খীর কাছ থেকে সত্যিকার অর্থে যথেষ্ট রেফারেন্স পেয়েছি। কৃতজ্ঞতা তাদের প্রতি।

এর বাইরে অস্ট্রেলিয়ার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগে সেখানকার লাইব্রেরিসহ বিশ্বের বিভিন্ন অনলাইন লাইব্রেরিতে বিনে পয়সায় ঢুঁ মারার সৌভাগ্য হয়েছিল। এমনকি অস্ট্রেলিয়াতে আদিবাসী নিয়ে বর্তমানে যারা কাজ করছেন তাদের সঙ্গে ব্যাক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে আদিবাসী ধারণার উপরে একটা ধারণা লাভের চেষ্টা করি। তার বাইরেও পরিচিত বিভিন্ন বন্ধু বান্ধবের সাথে আলাপচারিতায় বাংলাদেশে আদিবাসী প্রসঙ্গে তাদের নিজস্ব ধারণাগুলো জানার মাধ্যমে আমাদের দেশে আদিবাসী বিতর্কের বহুমাত্রিক রূপটা উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। এর বাইরে বিভিন্ন জনের ফেইসবুক, ব্লগে ঘুরে এসে সকলের প্রতিক্রিয়া দেখার চেষ্টা করেছি।

এভাবে একদম সাধারণের ব্যাক্তিগত মতামত থেকে শুরু করে একাডেমিক আলোচনা এবং বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন, আদিবাসী বিষয়টা নিয়ে ভাবছেন এমন বু্দ্ধিজীবী সবোর্পরি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর রচিত আদিবাসী বিষয়ক বিভিন্ন প্রকাশনাগুলোকে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। আমার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার সম্মিলিত তথ্যের ভিত্তিতে লেখাগুলো সাজান। আমি বলব না যে, এটা একটা তথাকথিত ‘নিরপেক্ষ’ লেখা। নিরপেক্ষ বলতে কোন শব্দ থাকলেও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কোন কোন পক্ষের স্বীকৃতি নাও থাকতে পারে। ‘নিরপেক্ষ’ শব্দটাও মাঝে মাঝে ‘আদিবাসী’ সংজ্ঞার চেয়েও বেশী অস্পষ্ট এবং ক্ষেত্র বিশেষে বিতর্কিত হয়ে পড়ে।

তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে লিখতে গেলে কখনো কখনো সেটা এক পক্ষের সম্পূর্ণ বিপরীতে যেতেই পারে। তার কাছ থেকে নিরপেক্ষ খেতাব আশা করা যায় না। যার যার স্বার্থ অনুযায়ী এক এক যুক্তি একেক জনের কাছে নিরপেক্ষ আবার কখনো পক্ষপাতদুষ্ট। আসলে আমরা মুখে ‘নিরপেক্ষ’ শব্দটা ব্যবহার করলেও চিন্তায় থাকে ‘ভারসাম্যের’ ধারনা। ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান সব সময় সত্যের পক্ষে যায় না। এভাবে নিরপেক্ষ শব্দটা মাঝে মধ্যেই আপেক্ষিক হয়ে পড়ে। তাই সচেতনভাবে আমার উদ্যোগকে ’নিরপেক্ষ’ না বলে আমি ‘যুক্তি নির্ভর’ বলতে বেশী স্বাচ্ছন্দবোধ করি। যুক্তিগুলো দাঁড় করানোর চেষ্টা হয়েছে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে। লেখাগুলো ছাপা হলে অনেকেই হয়তো অনেকভাবে তাদের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করবেন। আমি তাদের অনুরোধ জানাব, আমিব্যাক্তিগতভাবে ভারত নাকি পাকিস্তানের দালাল নাকি হোপলেস সে প্রসংগে না গিয়ে বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে লেখার সবল এবং দুর্বল দিকগুলো তুলে ধরবেন। সকলের সম্মিলিত উদ্যোগে বিতর্কের অবসান হোক। বিদ্যমান বিভিন্ন রাজনৈতিক বিতর্কের সাথে নতুন কোন সমাধানহীন বিতর্কের সূচনা করা আমাদের কাম্য নয়।

২।। বারডেন অব প্রুফ

(একটা সময়ে সর্বসম্মতভাবে পাহাড়ে বসবাসকারীদের বলা হতো, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, জুম্ম জনগণ, পাহাড়ী, উপজাতি, ট্রাইবাল পিপল, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী। হঠাৎ করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে এবং পাহাড়ী অল্প কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদীদের স্বাধীনতার আন্দোলনকে যৌক্তিকতা দেবার অভিপ্রায়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আদিবাসী বিতর্কটাকে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে।)

বারডেন অব প্রুফ হচ্ছে সিভিল ষ্ট্যান্ডার্ড প্রুফ। ক্রিমিনাল ষ্টান্ডার্ডে যেখানে ‘Beyond reasonable doubt’প্রমাণ হতে হবে আলোচিত ক্রিমিনাল অভিযোগ কিম্বা অমিমাংসিত কোন ঘটনা সত্য অথবা মিথ্যা। সংজ্ঞা অনুযায়ী,

A duty placed upon a civil or criminal defendant to prove or disprove a disputed fact.

বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের সেই আদিপর্ব থেকে বিভিন্নভাবে পাহাড়ীদের পরিচয় সম্পর্কিত বিতর্ক লেগেই আছে। এক সময় শেখ মুজিব বলেছিলেন, তোমরা সবাই বাঙালী হয়ে যাও। যেটা ছিল সম্পূর্ণ বর্ণবাদী বক্তব্য। পাহাড়ীরা এখন জোরেশোরে দাবী করছে যে তারা এই এলাকার আদিবাসী। সমতলের অধিবাসী এবং সরকার বলছে, না, তারা সেটা নয়। এই পটভূমিতে মূলতঃ সরকারের দায়িত্ব ‘বারডেন অব প্রুফের’ আওতায় তাদের অবস্থান প্রমাণ করার। এবং অবশ্যই দাবীদার পাহাড়ী গোষ্ঠীকেও তাদের দাবীর প্রতি যথেষ্ট প্রমাণ হাজির করতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, উভয় পক্ষের বিতর্কটা প্রায়শই যুক্তি কিম্বা তথ্য প্রমাণ নির্ভর না হয়ে হয়ে পড়ছে তর্ক নির্ভর কিংবা প্রচ্ছন্ন হুমকি নির্ভর। পাহাড়ীদের একটা অংশ থেমে থেমে পুণরায় যুদ্ধ শুরুর হুমকি দিচ্ছে। প্রকারান্তরে এর মাধ্যমে তারা পার্বত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনী স্থায়ীভাবে রাখার পক্ষেই গ্রাউন্ড তৈরী করে দিয়েছে। তাদের দাবীকে আইনগতভাবে প্রমাণের চেষ্টা না করে কিছু সন্ত্রাসী পাহাড়ীর যুদ্ধ শুরুর হুমকি প্রমাণ করে যে, ঐ অঞ্চলে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি কতোটা জরুরী। অতএব, বিষয়টা যতোক্ষণ ‘বারডেন অব প্রুফের’ মধ্যে থাকবে ততোক্ষণ সেটাকে কেন্দ্র করে অব্যাহত বিতর্ক লেগেই থাকবে। সৃষ্টি হবে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার। সেই সুযোগে দেশের ভিতর এবং বাহির থেকে নানা পক্ষ নানাভাবে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা চালাবে।

আদিবাসীর পক্ষে যারা আছেন, তাদের প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক প্রণীত কিছু ধোঁয়াশাচ্ছন্ন, অপরিস্কার ধারণাপত্র এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর (বাঙ্গালী) কিছু ঐতিহাসিক আন্দোলন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তারা বলতে চাইছেন, যে জাতি ৫২, ৬৯ এবং ৭১ এর আন্দোলন করেছে, সেই জাতি কেন পাহাড়ীদের দাবী মেনে নেবে না? এটা কি মামার বাড়ীর আবদার? উল্লেখিত আন্দোলনগুলোর একটা যৌক্তিক প্রেক্ষাপট ছিল। যতোদিন পাহাড়ীরা ‘আদিবাসী’ হিসেবে প্রমাণিত না হবেন, ততোদিন এই সব আবেগের স্থানে সুঁড়সুড়ি দিয়ে সেটা মেনে নিতে প্ররোচিত করা ইমোশনাল ব্লাকমেইল ছাড়া আর কি কিছু নয়। দু’দিন পরে কেউ স্বাধীনতা চেয়ে বসলে একই যুক্তিতে সেটাও দিয়ে দিতে হবে। তাই নয় কি? প্রথমেই তাদের দাবীর প্রতি প্রশ্নহীন প্রমাণ হাজির করতে হবে। কেবল তারপরেই তাদের আদিবাসী স্বীকৃতির দাবী যৌক্তিকতা পাবে। তার বাইরে এই দাবীকে কেন্দ্র করে যে কোন অরাজকতা আদতে নৈরাজ্য সৃষ্টির মতো চরম আইন বিরোধী কাজ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত। সেই সাথে এই গুরুত্বপূর্ণ অমিমাংসিত ইস্যু মিমাংসা না হওয়া পর্যন্ত যে সমস্ত পত্রিকা এবং তথাকথিত সুশীল সমাজ তাদেরকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে তুলে ধরে রাষ্ট্রের অবস্থানের বাইরে গিয়ে দেশের মধ্যে নৈরাজ্য সৃষ্টির পরোক্ষ ইন্ধন দেবে, তাদেরকে রাষ্ট্র বিরোধী আইনের আওতায় এনে বিচার করা উচিত।

আদিবাসী বিতর্কে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো এবং তাদের চালিত বিশ্ব সংস্থাগুলোর তৎপরতা যতোটা না প্রশংসনীয় তারচেয়ে বেশী তাদের সেই সব দেশের সত্যিকার আদিবাসীদের উপরে তাদের চালিত ‘অপরাধের’ প্রায়শ্চিত্য করার চেষ্টা। পশ্চিমারা তাদের মজ্জাগত আগ্রাসী, ঔপনিবেশিক চরিত্র থেকে অতীতকাল থেকে সারা বিশ্বে যখনই যেখানে সুযোগ পেয়েছে হামলে পড়েছে। একটা সময়ে তারা অষ্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডায় বসবাসকারী আদিবাসীদের নির্মূলের উদ্দেশ্যে নির্বিচারে হত্যা করেছে। তাদের চালিত গণহত্যা এবং অত্যাচারের ফলে আদিবাসীদের সাথে তাদের যে মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা আজো যায়নি। এই অবিশ্বাসের ফলে সেখানকার আদিবাসীরা এখনো মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে ভালবাসে। বিলুপ্তপ্রায় কিংবা কোনঠাসা সেই জাতিগোষ্ঠীকে কিছুটা সুবিধা দিয়ে পশ্চিমা শক্তি তাদের পূর্ব পুরুষের করা অপরাধকে কিছুটা লঘু করতে চায়। তাদের নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কর্তৃক প্রণীত আদিবাসী সম্পর্কিত ধারণাপত্রে সেই দায় মোচনের ছাপ সুস্পষ্ট। তারা সেখানে কবে এসেছিল, কিভাবে সেখানকার জনগোষ্ঠীকে মেরেছিল সেগুলো খুব পুরাতন ঘটনা নয়। তাদের পরিস্থিতির সাথে আমাদের দেশের পরিস্থিতির বিস্তর ফারাকে আছে।

আদিবাসী ধারণার বিকাশ

‘আদিবাসী’ প্রত্যয়টি মূলত: প্রথমদিকে পরিব্রাজক এবং একাডেমিক্যালি নৃবিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। একটা সময়ে ইবনে বতুতা কিংবা কলম্বাসের মতো পরিব্রাজকরা বিশ্ব চষে বেড়িয়েছিলেন। মর্গান, ম্যালিনোস্কিসহ আরো অনেক নৃবিজ্ঞানীদের আগ্রহ ছিল এই সব জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার উপরে। মর্গানের ‘আদিম সমাজ’ বইটি এখনো আদিবাসী কেন্দ্রিক ধারণায়নে একটা মূলধারার বই হিসেবে মেনে নিতে হবে। তবে আদিবাসী বিষয়ক অধিকার সম্বলিত আলোচনার বিকাশ এবং বিস্তৃতি লাভ করে মূলত: অষ্ট্রেলিয়া, আমেরিকা এবং কানাডার আদিবাসী আলোচনাকে ঘিরে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার অপরিস্কার ধারণাপত্রের উপর ভিত্তি করে ইউরোপের কোন কোন বসতি স্থাপনকারীরাও এখন নিজেদের আদিবাসী দাবী করছেন। এমনকি ইরাকের কুর্দি কিংবা কোথাও কোথাও ধর্মীয় পরিচয়ের সংখ্যালঘুরাও ইচ্ছে করলে নিজেদের আদিবাসী দাবী করতে পারেন। এই সংস্থাগুলোর অপরিস্কার ব্যাখ্যার কারণে বর্তমানে ‘আদিবাসী’ এবং ‘এথনিক মাইনরিটির’ মধ্যকার পার্থক্যগুলো ক্রমশ: সংকুচিত হয়ে পড়েছে। যে কোন এথনিক মাইনরিটিও মন চাইলেই নিজেদের আদিবাসী হিসেবে দাবী করে বসতে পারে।

আরেকটি পক্ষ দাবী করছে, সারা দেশের বিবেচনায় জুম্মরা আদিবাসী না হলেও পাহাড়ী অঞ্চলে কারা আগে বসতি গড়ে? অর্থাৎ অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডায় আদিবাসীরা জাতীয় ভিত্তিতে। কিন্তু বাংলাদেশ ভারতে কিছুটা আঞ্চলিক ভিত্তিতে স্বীকৃতি দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাহলে ময়মনসিংহ কিংবা উত্তর বঙ্গের সমতলে বাস করা ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাগুলোর পরিচয় কি হবে? তারা কি দাবী পরিহার করবে? তাছাড়া আঞ্চলিক ভিত্তিতে আদিবাসী নির্ধারণ করা কি হাস্যকর নয়? একটা দেশের ক্ষুদ্র একটা অঞ্চলে বাইরে থেকে এসে নতুন বসতি গড়লে সেকি আদিতে বাস শুরু করেছে সেটা বলা যায়? তাহলে বরিশাল কিংবা অন্য অঞ্চলে নতুন চর জেগে উঠলে সেখানে কোন ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা বাস করা শুরু করলে আজ থেকে ৫০ কি ১০০ বছর পরে তারাও কি দাবী করবে যে, আমরা আদিবাসী? কিম্বা এমন কোন অকাট্য প্রমাণ কি আছে যে, পার্বত্য অঞ্চলে এখনকার আদিবাসী দাবীদাররাই প্রথম ঘাঁটি গাড়ে?

♦ চলবে

বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ 

গত ৯ আগস্ট রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ সাড়ম্বরেই পালিত হলো বিশ্ব আদিবাসী দিবস। যদিও বিশ্ব আদিবাসী দিবস উদযাপনের দুই দিন আগে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার পরিহারের জন্য নির্দেশনা জারি করে সরকার।

 

৭ আগস্ট সরকারি এক তথ্য বিবরণীতে এ নির্দেশনা জারি করা হয়। তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী বর্তমানে দেশে আদিবাসীদের কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও বিভিন্ন সময় বিশেষ করে জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে ‘আদিবাসী’ শব্দটি বারবার ব্যবহার হয়ে থাকে। পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে উল্লেখ করে তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, “আগামী ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আলোচনা ও টকশোতে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার পরিহার করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে এবং সকল আলোচনা ও টকশোতে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ এবং সংবাদপত্রের সম্পাদকসহ সুশীল সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিবর্গকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আদিবাসী শব্দটির ব্যবহার পরিহারের জন্য পূর্বেই সচেতন থাকতে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।”

আদিবাসী দিবস উদযাপনে এই তথ্য বিবরণীর তেমন কোনো প্রভাব দেশের মধ্যে দৃশ্যমান হয়নি। বেশিরভাগ গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম ব্যক্তিগণকে পূর্ববৎ তাদের সংবাদ, ভাষ্য, মন্তব্য, টকশোতে আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করতে দেখা যায়। বিশেষ করে যে সরকার এই পরিপত্র জারি করে সেই সরকারেরই অনেক মন্ত্রী, এমপিসহ ঊর্ধ্বতন পদাধিকারিকগণ এই পরিপত্র অবজ্ঞা করে আদিবাসী দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে উপজাতি সম্প্রদায়গুলোকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতিদানের জন্য জোরালো দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে তারা সরকারি পরিপত্রের তীব্র সমালোচনা করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্কের পক্ষে-বিপক্ষে জোরালো অবস্থান রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও জাতীয় গণমাধ্যম বিশেষ করে পত্রিকার সম্পাদকীয়/প্রবন্ধ/মন্তব্য ও টিভি চ্যানেলের টকশোতে একপাক্ষিকভাবে অর্থাৎ আদিবাসীদের পক্ষেই প্রচারণা চালানো হয়। তাদের বেশিরভাগই বর্তমান সরকারের অতীতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, বক্তব্য, অবস্থান ও বাণীর রেফারেন্স দিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২৮ জানুয়ারি ২০১০ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত ‘উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলোকে আদিবাসী হিসেবে অভিহিত করার অপতৎপরতা প্রসঙ্গে’ শিরোনামের গোপনীয় প্রতিবেদনে (স্মারক : পাচবিম (সম-২)২৯/২০১০/২৫, তারিখ : ২৮/১/২০১০) বলা হয় : “বাংলাদেশে ৪৫টি উপজাতীয় জনগোষ্ঠী বসবাস করে। বাংলাদেশের সংবিধান, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ আইন, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ আইন এবং ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তিতে উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলোকে ‘উপজাতি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাদের কোথাও ‘আদিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়নি। তথাপি কতিপয় নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, পাহাড়ে বসবাসরত শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ, এমনকি সাংবাদিকরাও ইদানিং উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলোকে ‘উপজাতি’ না বলে ‘আদিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করতে দেখা যাচ্ছে। এতদ বিষয়ে বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান, বিদেশী সংবাদ মাধ্যম, জাতিসংঘের আড়ালে থাকা খ্রিস্টান রাষ্ট্রসমূহ এ সকল ব্যক্তিবর্গের সাহায্যে তাদের একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সহায়তায় অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বসবাসকারী অধিকাংশ উপজাতীয় সম্প্রদায় এখন নিজ নিজ ধর্ম, সংস্কৃতিতে অবস্থান না করে তাদের অনেকেই খ্রিস্টান হয়ে গেছে। বাংলাদেশীয় উপজাতীয়দেরকে ‘আদিবাসী’ উল্লেখ না করার বিষয়ে ইতিপূর্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে সে নির্দেশনার কোনো কার্যকারিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি উপজাতীয়দেরকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে চি‎হ্নিতকরণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে আদিবাসী মন্ত্রণালয় করার ব্যাপারে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উত্থাপিত হচ্ছে বলে জানা যায়। ইউএনডিপি, ডানিডা, এডিবিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ এবং উপজাতীয়দের ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই সাথে উপজাতীয়দের ‘আদিবাসী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তাছাড়া আমাদের দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও ওয়ার্কশপে এবং সাংবাদিকরা বিভিন্ন লেখায় উপজাতীয়দের ‘আদিবাসী’ হিসেবে চিহ্ণিত করছে। এরূপ কাজ অব্যাহত রাখলে উপজাতীয়দের ভবিষ্যতে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া আবশ্যক হয়ে পড়বে। বর্ণিত অবস্থায় বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন উপজাতীয় সম্প্রদায়কে কোনো অবস্থাতেই যেন ‘উপজাতি’ এর পরিবর্তে ‘আদিবাসী’ হিসেবে উল্লেখ না করা হয় এবং পার্বত্য অঞ্চলে যে সমস্ত এনজিও প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বৃদ্ধিকরণসহ সতর্কতামূলক কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।”

২০১১ সালের মে মাসে আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের (ইউএনপিএফআইআই) অধিবেশনের দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ বৈঠকে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর একটি প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে অধিবেশনে উপস্থাপন করা প্রতিবেদনে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক লার্স আন্দ্রেস বায়ের বলেন, সরকারের সদিচ্ছার অভাবে চুক্তি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে আদিবাসীদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি জাতিসংঘ শান্তি মিশনের কোনো দেশের সেনা সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার আগে তাদের মানবাধিকার রেকর্ড পরীক্ষা করে দেখারও সুপারিশ করেন বায়ের। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যান্য স্থানে বসবাসকারী আদিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাবি করে আসছে। তাদের এই দাবি পূরণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান ইউএনপিএফআইআইর অধিবেশনে যোগদানকারী বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠনের প্রতিনিধিরা। নিউইয়র্কে আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘের স্থায়ী ফোরামে (ইউএনপিএফআইআই) পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক দশম অধিবেশনের দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ বৈঠকে ফোরামের সাবেক সদস্য লার্স-অ্যান্ডার্সবায়ের এ সুপারিশ করেন বলে জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে জানানো হয়। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন তিনি। ১৯ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে ১১৯ বার আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করা ছাড়াও তাদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানানো হয়। কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, লারস এন্ডারস পার্বত্য চট্টগ্রাম (সিএইচটি) কমিশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ সফর করে প্রতিবেদন তৈরি করেন স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার হিসেবে। বিষয়টি প্রতারণা ও উদ্দেশ্যমূলক।
অবশ্য জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের ফার্স্ট সেক্রেটারি ইকবাল আহমেদ অভিযোগ অস্বীকার করার পাশাপাশি বায়েরের দেয়া প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই দাবি করে তিনি বলেন, এ কারণে শান্তি চুক্তি নিয়ে এই ফোরামে আলোচনার কোনো অবকাশও নেই।

ওই বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করে ঢাকায় বিদেশি মিশন প্রধানদের মাধ্যমে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি সারাবিশ্বকে জানান, এ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো আদিবাসী নয়। বাঙালি নৃগোষ্ঠীই এ ভূখ-ে ৪ হাজার বছর বা তারও বেশি সময় ধরে বসবাস করছে। আদিবাসী হিসেবে দাবি করা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো ১৬ শতকের আগে এ ভূখণ্ডে ছিল এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিদেশি মিশনগুলোর প্রধানদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দীপু মনি বলেন, “১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তিতে ‘উপজাতি’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছিল। এরপর স্বার্থান্বেষী কিছু মহল উপজাতি শব্দকে অপব্যাখ্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, পরিচয়কে চ্যালেঞ্জ করে জাতিসংঘ ফোরাম ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ সুবিধা আদায় করতে চাইছে।” পররাষ্ট্রমন্ত্রীর শক্ত অবস্থান আঁচ করতে পেরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিদেশী রাষ্ট্রদূত ও দাতাসংস্থার প্রতিনিধিগণ বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে আরো আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে মন্তব্য করলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপুমণি তাদের দৃঢ়তার সাথে বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ় ও সুস্পষ্ট। কাজেই ভবিষ্যতে এ নিয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ সরকার কখনোই বাংলাদেশের উপজাতীয় বাসিন্দাদের ‘আদিবাসী’ বলে সরকারিভাবে স্বীকার করেনি। তা সত্ত্বেও কোনো কোনো সরকারি মন্ত্রী-এমপিসহ সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে উপজাতিদের আদিবাসী বলে বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে আসছে। বর্তমান সরকারও শুরু থেকেই পার্বত্য উপজাতিদের দাফতরিকভাবে ‘আদিবাসী’ বলে স্বীকার করেনি। সে কারণেই ব্যাপক দাবি সত্ত্বেও মানবাধিকার কমিশনেও ‘নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনে’ ‘উপজাতি’ শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার না করে ‘নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী’ ব্যবহার করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানে উপজাতিদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সর্বপ্রথম সরকারিভাবে জানানো হয় যে, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই এবং একই সাথে বাংলাদেশে বসবাসকারী উপজাতি জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ না বলতে নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর কতিপয় নেতা জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে নিজেদের আদিবাসী বলে পরিচয় দিয়ে আর্থিক সহায়তাসহ তাদের নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও তৎসংলগ্ন ভারত এবং মিয়ানমারের বিশাল এলাকার বাসিন্দাদের জাতিসংঘের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের সহায়তায় ব্যাপকহারে খ্রিস্টানকরণ এবং ২০২০ সালের মধ্যে ইসরাইল বা পূর্ব তিমুরের মতো স্বতন্ত্র খ্রিস্টান ‘বাফার স্টেট’ তৈরির পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে গেলে বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট মহল সতর্ক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক চার্টারে আদিবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় জাতিসংঘ তার সদস্যভুক্ত কোনো দেশে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে এ মর্মে ক্লজ থাকায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সেই চার্টারে স্বাক্ষর দিতে আপত্তি জানায়। এরই প্রেক্ষিতে ২০০৮ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৫ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের permanent forum for indigenous people-এর ৭ম অধিবেশনে বাংলাদেশ পরিষ্কারভাবে জানায় :The country has some tribal population and there are no indigenous people.’ এরপর ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদের ৬৩তম অধিবেশনের আলোচ্যসূচিতে আদিবাসী প্রসঙ্গ থাকায় বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে জানতে চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র, সমাজকল্যাণ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়ে চিঠি লেখে। এর উত্তরে ২০০৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একই কথা জানায়। [(স্মারক নং : পাচবিম(সম-১)৩৭/৯৭-১১৭ তারিখ : ৯/৯/২০০৮) :The country has some tribal population and there are no indigenous people.’

বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে নীতিরও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু উপরোক্ত আলোচনায় দেখা যাচ্ছে, আদিবাসী বিষয়ে বাংলাদেশের পরপর তিনটি সরকারের নীতি অভিন্ন রয়েছে। নীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এ এক উজ্জ্বল ও ইতিবাচক ব্যতিক্রম। কিন্তু তা সত্ত্বেও ‘কতিপয় নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, পাহাড়ে বসবাসরত শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ, এমনকি সাংবাদিকরা বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান, বিদেশি সংবাদ মাধ্যম, জাতিসংঘের আড়ালে থাকা খ্রিস্টান রাষ্ট্রসমূহ এসকল ব্যক্তিবর্গের সাহায্যে’ বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে উঠেপড়ে লেগেছে। অবশ্য অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিও সরল মনে কখনো বলে থাকেন, “উপজাতি বললে যদি তারা আহত হয় তবে আদিবাসী বলেন, কী এমন সমস্যা তাতে?” বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল হলে উপজাতিদের আদিবাসী বলে মেনে নিতে এতটা আপত্তি হয়তো থাকত না ১৬ কোটি বাংলাদেশীর।

ঐতিহাসিক ভুল
আদিবাসী শব্দের ইংলিশ প্রতিশব্দ Indigenous people. অনেকে আদিবাসী শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে Aborigine ব্যবহার করেন। কিন্তু Aborigine বলতে সার্বজনীনভাবে আদিবাসী বোঝায় না। Aborigine বলতে সুনির্দিষ্টভাবে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের বোঝায়। অক্সফোর্ড ডিকশনারীতে Aborigine শব্দের অর্থ বলা হয়েছে ‘a member of a race of people who were the original living in a country, especially Australia’. একইভাবে Red Indian বলতে মার্কিন আদিবাসীদের বোঝায়, অস্ট্রেলীয় Aborigine বা আদিবাসীদের বোঝায় না। এ ছাড়াও বিভিন্ন ডিকশনারীতে আদিবাসী বিষয়ে যে সংজ্ঞা ও প্রতিশব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা নিম্নরূপ:
Aborigine : noun. a member of a race of people who were the original living in a country, especially Australia. Indigenous : belonging to a particular place rather than coming to it from some where else. Native. The indigenous people/indigenous area. Aborigine : earliest. Primitive. Indigenous. Indigenous : adj. Native born or produced naturally in a country, not imported (opposite to exotic).
অন্যদিকে বাংলা একাডেমির অভিধানে Indigenous শব্দের অর্থ বলা হয়েছে : দেশি, দৈশিক, স্বদেশীয়, স্বদেশজাত। কলকাতা থেকে প্রকাশিত সংসদ অভিধানে Indigenous শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে, স্বদেশজাত, দেশীয়। আবার চেম্বার্স ডিকশনারীতে Indigenous শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে, native born, originating or produced naturaly in a country, not imported. একই ডিকশনারীতে Indigenous শব্দের বিপরীত শব্দ হিসেবে exotic শব্দটিকে ব্যবহার করা হয়েছে- যার অর্থ বহিরাগত। নৃতত্ত্ববিদ লুই মর্গান (Louis Morgan) মনে করেন, “The aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial. They are the sons of the soil.\\\( Louis Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972.) অর্থাৎ অভিধানিকভাবে আদিবাসী শব্দের অর্থ দেশি, স্বদেশজাত বা ভূমিপুত্র। তাহলে প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশের যে উপজাতীয় জনগোষ্ঠী নিজেদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দাবি করছে তারা কী বাংলাদেশের ভূমিপুত্র বা স্বদেশজাত?
এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখা গত ১ আগস্ট ২০১৩ তারিখে পার্বত্যনিউজে প্রকাশিত হয়েছে যারা ওয়েবলিংক (বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক)| । প্রয়োজনে পাঠকগণ তা দেখে নিতে পারেন।

সংক্ষেপে এখানে শুধু একটি কথা বলা যায়, বাংলাদেশের কোনো উপজাতি ও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল গবেষকও এখন বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীগুলোকে ভূমিপুত্র বা স্বদেশজাত বলে দাবি করেন না। বরং তাদের রচিত ইতিহাসেই প্রমাণিত হয়েছে এরা বহিরাগত। বাংলাদেশের ভূমিপুত্র হচ্ছে এদেশের মূল জনগোষ্ঠী বাঙালি ও তাদের পূর্বপুরুষগণ। প্রাচীন বিভিন্ন ইতিহাসে সে কথা নানাভাবে এসেছে। বাংলাদেশে নৃবিজ্ঞানের আধুনিক আবিষ্কারগুলো সে ইতিহাসকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণ করছে। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভাল, অনেক বিশেষজ্ঞ আন্তর্জাতিক আইন তথা আইএলও সংজ্ঞা অনুযায়ী বাংলাদেশের উপজাতিদের আদিবাসী আখ্যা দিয়ে থাকেন। কিন্তু সেটাও যে সবৈর্ব ভুল ব্যাখা তা জানতে পার্বত্যনিউজে প্রকাশিত আমার আরো একটি লেখা দেখতে পারেন এই লিংক থেকে: (আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ).

অন্যদিকে বাংলাদেশের সকল উপজাতি সম্প্রদায় নিজেদের আদিবাসী দাবি করছে না। বরং বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্র অংশের যারা মূলত বিচ্ছিন্নতাবাদ, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা, সন্ত্রাসী কর্মকা- কিংবা এনজিও কার্যক্রমের সাথে জড়িত বা তাদের দ্বারা সুবিধাপ্রাপ্ত তারাই কেবল নিজেদের আদিবাসী বলে দাবি করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী উল্লিখিত শ্রেণীর জনগোষ্ঠীই এ দাবির মূল পরিচালক। তবে তাদের এ দাবিটি অতি অধুনা। অতীতে তারা নিজেদের উপজাতি পরিচয়ে পরিচিত করিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। এমনকি স্বাধীনতার পর যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার প্রথম শুরু হয় তখন তাদের সর্বজনগ্রাহ্য নেতা মানবেন্দ্র লারমা সংসদে জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি দাবি করেছিলেন, আদিবাসী পরিচয়ের নয়। ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের সময়ও বর্তমান নেতা নিজেকে উপজাতি পরিচয়েই পরিচিত করিয়েছিলেন। চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ক প্রচারণার কী পার্সন। জনসংহতি সমিতি ও সন্ত্রাসী সংগঠন শান্তি বাহিনীর নেতা সন্তু লারমাও শুরুতে আদিবাসী দাবির পক্ষে ছিলেন না। দেবাশীষ রায়ের দাবি বলে তিনি এর সাথে একমত ছিলেন না। কিন্তু পরবর্তীকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বিদেশী রাষ্ট্র ও দাতা সংস্থার সমর্থন এবং আর্থিক প্রলোভনে তিনি এই দাবিতে শরিক হন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি।

এ বিষয়ে রাঙ্গামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদার গত শনিবার জাতীয় শোক দিবসের আলোচনায় বলেছেন, আমি ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে যখন প্রথম আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন করেছিলাম, তখন সন্তু লারমা বলেছিলেন, এই দেশে কোনো আদিবাসী নেই। এখানে আমরা সবাই উপজাতি। জুম্ম জনগণের আন্দোলন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আদিবাসী দিবস পালন করা হচ্ছে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের সময়ে আমি সন্তু লারমাকে বলেছিলাম এ সময়ে উপজাতির পরিবর্তে আদিবাসী বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে ফেলি, তখনও সন্তু লারমা রাজি হননি। তখনও সন্তু লারমা বলেছিলেন আমরা আদিবাসী নই, আমরা উপজাতি। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তিতে প্রচলিত উপজাতি শব্দটি বহাল রাখা হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার আরো বলেন, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিশেষ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে চাকমা সার্কেল চিফ রাজা ব্যারিস্টার দেবাশিষ রায় রাষ্ট্রীয়ভাবে অফিসিয়ালি লিখেছেন, বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই। কিছু জনগোষ্ঠী আছে উপজাতি। তাহলে এখন কেন আদিবাসী দাবিতে সংগ্রাম-সংঘর্ষের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে? এটি কোন দেশের ষড়যন্ত্রের আলামত? সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার বলেছেন, এখানে আদিবাসী আছে কি নেই গবেষণার দরকার, গবেষণায় প্রমাণ হলে আদিবাসী হবে, না হলে নেই। কিন্তু এ নিয়ে সংঘর্ষ, মারামারি হবে কেন ?

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ নিজেদের আদিবাসী বলে মনে করে না। প্রকাশ্যতঃ পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ইউপিডিএফ নামক অনিবন্ধিত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ও সন্ত্রাসী সংগঠনের সমর্থকরা আদিবাসী দিবস পালনের ঘোর বিরোধী। তারা জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি চায়- যা এম এন লারমার দাবির কাছাকাছি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে, ৯ আগষ্ট “বিশ্ব আদিবাসী দিবস” উদযাপন নিয়ে পাহাড়ে ধুম্রজাল তৈরি হয়েছিল। বিগত বছরগুলোতে এ দিবসটি পালনে পাহাড়ের এনজিওগুলো অনেক আগ থেকেই তোড়জোড় শুরু করলেও এবার তেমনটি দেখা যায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ সমর্থিত “গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম” আদিবাসী দিবস পালনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়। শুধু তাই নয়, সংগঠনটির পক্ষ থেকে তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন এলাকায় আদিবাসী দিবস বিরোধী জনমত সংঘটিত করা হচ্ছে বলে সূত্রে জানা গেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, জনসংহতি সমিতির প্রধান সন্তু লারমার নেপথ্য সহযোগিতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি জাতি-গোষ্ঠী আদিবাসী দিবস পালনের নাম করে সরকার ও বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর কাছ থেকে ব্যাপক অর্থ পেয়ে থাকে এবং এ অর্থের সামান্য একটি অংশ দিয়ে র‌্যালি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হয়, বাকি অর্থ তারা নিজেরা ভাগ-বাটোয়ারা এবং সন্তু গ্রুপের জন্য অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে।
বান্দরবানের প্রয়াত বোমাং রাজা ২০১০ সালে চ্যানেল আইয়ের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তারা আদিবাসীও নয়, স্থানীয়ও নয়। তারা মিয়ানমার থেকে এখানে এসেছিলেন।

ঐতিহাসিক বিচারে বাংলাদেশে আদিবাসিন্দা বা ভূমিপুত্র বা স্বদেশজাত বলতে আমরা যাদের বুঝি তারা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর মূল স্রোতধারা বাঙালী ও তাদের পূর্বপুরুষগণ। নৃবিজ্ঞানের আধুনিক আবিষ্কারও সে কথা প্রমাণ করছে। পৃথিবীর প্রথম মানুষ হযরত আদম (আ.) জান্নাত থেকে দুনিয়াতে প্রথম পদার্পণ করেছিলেন শ্রীলঙ্কায়। ঐতিহাসিক ও গবেষক ড. মোহাম্মদ হান্নান লিখেছেন, “হযরত আদম (আ.) থেকে আমাদের এই মানব জাতির শুরু। কিন্তু হযরত নূহ (আ.)-এর সময়ে সমগ্র পৃথিবীতে এক মহাপ্লাবন ঘটেছিল। এই মহাপ্লাবনে দুনিয়ার সকল কিছু ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কেউ জীবিত ছিল না, শুধু নূহ (আ.)-এর নৌকায় আরোহণ করেছিলেন ৮০ জন নূহের ভক্ত; এই ৮০ জন থেকেই মানব জাতির আবার নতুন যাত্রা।”এই নতুন যাত্রায় বেঁচে যাওয়া ৮০ জনের মধ্যে ছিলেন হযরত নূহের এক পুত্র; নাম তার ‘হাম’। নূহ তার পুত্র হামকে বললেন, ‘তুমি মানব বসতি স্থাপনের জন্যে চলে যাও পৃথিবীর দক্ষিণ দিকে’। পিতার নির্দেশ পেয়ে হাম চলে এলেন আমাদের এশিয়া মহাদেশের কাছাকাছি। সেখানে এসে তিনি তার জ্যেষ্ঠ পুত্র হিন্দকে পাঠালেন ভারতের দিকে। অনেকে মনে করেন, হামের পুত্র হিন্দের নাম অনুসারেই ভারতের নাম হয়েছে হিন্দুস্তান। “হিন্দের দ্বিতীয় পুত্রের নাম ছিল ‘বঙ্গ’। এই ‘বঙ্গ’-এর সন্তানরাই বাঙালি বলে পরিচিতি লাভ করে। সে হিসাবে বাঙালির আদি পুরুষ হচ্ছেন ‘বঙ্গ’।” প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলার ইতিহাস (প্রথম খণ্ড) থেকে ছোট্ট আর একটি উদ্ধৃতি : ‘ঐতরেয় আরণ্যকে বঙ্গ শব্দের সর্বপ্রাচীন উল্লেখ পাওয়া গিয়াছে। … যে সময়ে ঐতরের ব্রাহ্মণে বা আরণ্যকে আমরা বঙ্গ অথবা পুণ্ড্রজাতির উল্লেখ দেখিতে পাই সে সময়ে অঙ্গে, বঙ্গে অথবা মগধে আর্য্য জাতির বাস ছিল না।’ পবিত্র ঋগ্বেদে একইভাবে এই অঞ্চলে বঙ্গ নামে জাতির উল্লেখ আছে এবং এইসব কম-বেশি তিন হাজার বছর আগের কথা।’ মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচিত “Bengal, Bengali’s, Their manners, customs and Literature ” নামক অপ্রকাশিত প্রবন্ধ থেকে একটি উদ্ধৃতি দেয়া যায় : ‘বাংলার ইতিহাস এখনও এত পরিষ্কার হয় নাই যে কেহ নিশ্চয় বলিতে পারেন বাংলা Egypt হইতে প্রাচীন অথবা নূতন। বাঙ্গালা Ninevah ও Babylon হইতেও প্রাচীন অথবা নূতন। বাঙ্গালা চীন হইতেও প্রাচীন অথবা নতুন। যখন আর্য্যগণ মধ্য এশিয়া হইতে পাঞ্জাবে আসিয়া উপনীত হন, তখনও বাংলা সভ্য ছিল। আর্য্যগণ আপনাদের বসতি বিস্তার করিয়া যখন এলাহাবাদ পর্যন্ত উপস্থিত হন, বাংলার সভ্যতায় ঈর্ষাপরবশ হইয়া তাহারা বাঙালিকে ধর্মজ্ঞানশূন্য পক্ষী বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন।’ মেগাস্থিনিস ও টলেমি প্রমুখ ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদদের বর্ণনায় ভারতবর্ষে শক্তিশালী গঙ্গরিড়হী রাজ্যের কথা বলা হয়েছে তার অবস্থান আজকের বাংলাদেশে। যার বিশাল হস্তিবাহিনীর কথা শুনে ভয় পেয়েছিলেন গ্রীক বীর আলেকজান্ডার। রামায়নে উল্লিখিত মহাবালী রাজাকে ঐতিহাসিকগণ প্রাচীন বাংলার কোনো পরাক্রমশালী রাজা বলে শনাক্ত করেছেন।

নৃবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের পলিমাটির বয়স ২০ হাজার বছরের প্রাচীন। পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজে সংরক্ষিত নৌকা দুটির আনুমানিক বয়স ৩ হাজার বছর বলে তারা মনে করেন। পঞ্চগড়ের ভিতরগড় দুর্গের বয়স প্রায় ২ হাজার বছর। তার চেয়েও প্রাচীন উয়ারী বটেশ্বরের সভ্যতাকে নৃবিজ্ঞানীগণ মহেঞ্জোদারো সভ্যতার সমসাময়িক বলে দাবি করেন। প্রাচীন বাংলার স্বীকৃত সভ্যতা বৌদ্ধ সভ্যতা। কিন্তু সে বৌদ্ধরা চাকমা ছিলেন না। ছিলেন বাঙালি। শক্তিশালী বৌদ্ধ রাজা ধর্মপাল বাঙালি ছিলেন। বাঙালী বৌদ্ধ ধর্মগুরুরা তাদের পাণ্ডিত্বে বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে সুদুর চীন পর্যন্ত আলো ছড়িয়েছিলেন। বাংলা ভাষার প্রাচীন পুস্তিকা চর্যাপদও আবিস্কৃত হযেছে নেপালের রাজসভায়। উল্লেখ্য, চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধগান।

অন্যদিকে লালমনিরহাটের মজদের আড়ায় ৬৯ হিজরীতে নির্মিত মসজিদের শিলালিপি পাওয়া গেছে। এমনকি খোদ পার্বত্য চট্টগ্রামও প্রাচীন বাংলার হরিকল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে সময় বাঙালিরা এ অঞ্চলে বসবাস করত। কিন্তু বৈরী ভূপ্রকৃতি, খাদ্যাভাস, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন প্রভৃতি কারণে বেশিরভাগ বাঙালি সেখানে বসবাস করতে না পেরে সমতলের দিকে সরে আসে। এ সকল ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক বর্ণনা প্রমাণ করে বাংলাদেশের ভূমিপুত্র বা আদিবাসিন্দা বা আদিবাসী কোনো চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, গারো, হাজং, ত্রিপুরা উপজাতি নয়,বরং বাঙালি।
Email: palash74@gmsil.com

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বাংলা একাডেমীতে দুইদিনব্যাপী প্রদর্শণী

1ff5b17dd83f3597dee63eb08d401f9a-12

স্টাফ রিপোর্টার:

রাজধানীর বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে আদিবাসী দিবস উপলক্ষ্যে দুইদিনব্যপী আদিবাসী মেলা ও প্রদর্শণী। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন আয়োজিত এ প্রদর্শনী শনিবার দুপুরে শুরু হয়। এ প্রদর্শনী চলবে রবিবার বিকেল পর্যন্ত। এবারের আদিবাসী দিবসের মুল প্রতিপাদ্য আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠায় মুক্তিকামী জনতার সেতুবন্ধন।

শনিবার দুপুর দেড়টায় এ প্রদর্শণীর উদ্বোধন করেন বিমান, পর্যটন ও বেসামিরক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। বেলুন উড়িয়ে এ প্রদর্শণীর উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী বক্তব্যে বিমানমন্ত্রী ‘আদিবাসী’ অধিকার রক্ষায় পাহাড়ী বাঙ্গালী ও সমতলের ‘আদিবাসীদের’ সেতুবন্ধন রচনা করার উপর জোর তাগিদ দেন।

এ সময় সেখানে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যেতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা), মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি শাহীন আনামসহ অন্যান্য নেতারা।

এর পরপরই তারা মেলা প্রাঙ্গন ঘুরে দেখেন। প্রদর্শনীতে ‘আদিবাসী’ সম্প্রদায়ের নিজস্ব পণ্য ও সংস্কৃতি প্রদর্শন করা হয়। এদিকে বিকেলে মেলা প্রাঙ্গনে সেমিনারের আয়োজন করে সংগঠনটি। আলোচনার বিষয়বস্তু বাংলাদেশের জুম চাষ বিরোধী প্রচারণার ইতিহাস ও রাজনৈতিক অর্থনীতি। সেমিনারের সঞ্চালনা করেন সংগঠনের পরিচালক শাহীন আনাম। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক প্রশান্ত ত্রিপুরা।

আলোচনা করেন প্রতিবেশ ও প্রাণ বৈচিত্র্য সংরক্ষণ গবেষক পাভেল পার্থ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের সহকারী অধ্যাপক অসামী হারুন, বান্দরবানের পার্বত্য চট্রগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলন কমিটির সভাপতি জুয়াম লিয়ান আমলাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল।

এদিকে রবিবার সকাল ১০টা থেকে প্রদর্শনী শুরু হয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলবে। দুপুর ১২টায় পার্বত্য চট্রগ্রামের নারীর অস্বীকৃত কাজের অবদান, ধারণায়ন, প্রভাব ও সম্ভাবনা শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনা করবেন সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচির পরিচালক আন্না মিরাজ। সামাজিক ক্ষমতায়ন ব্রাকের অধ্যাপক ড. নাসিম, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আখতার হোসাইন।

বিকেলে ‘আদিবাসী’ শিল্পীগোষ্ঠীর পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এর পর সন্ধ্যায় আলোকচিত্রী প্রদর্শনীর মাধ্যমে দুইদিনব্যাপী মেলা ও প্রদর্শনীর সমাপনী করা হবে।

‘এই সরকারের আমলেই আদিবাসীদের পূর্ণাঙ্গ অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হবে’- রাশেদ খান মেনন

10407232_688570641197140_9017712600448763519_n

স্টাফ রিপোর্টার, পার্বত্যনিউজ :

এই সরকারের আমলেই পার্বত্য শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন করা হবে বলে ‘আদিবাসীদের’ আশ্বাস দিলেন বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তির মাধ্যমে ‘আদিবাসীদের’ ভূমি অধিকারের কথা বলা হয়েছে। আমাদের সংবিধানেও ‘আদিবাসীদের’ অধিকারের কথা বলা আছে। এখন এর যথাযথ স্বীকৃতির মাধ্যমে ‘আদিবাসীদের’ অধিকার রক্ষা করতে হবে। এ জন্য সেতুবন্ধন রচনা করা জরুরী।

শনিবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আন্তর্জাতিক আধিবাসী দিবস উপলক্ষ্যে আদিবাসী ফোরামের র‌্যলি পূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ সব কথা বলেন। এবারের অনুষ্ঠানের মুল প্রতিপাদ্য ছিল ‘আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠায় মুক্তিকামী জনতার সেতুবন্ধন’।

রাশেদ খান মেনন এ সময় ‘আদিবাসীদের’ অধিকার রক্ষায় পাহাড়ী-বাঙ্গালী ও সমতলের ‘আদিবাসীদের’ মধ্যে সেতুবন্ধনের উপর জোর দেন। তিনি বলেন, এই শহীদ মিনার আমাদের এক করবে। এ জন্য আমাদের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে ঐক্যবদ্ধতা অত্যন্ত জরুরী। এ সময় মন্ত্রী বেশকিছু সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমালোচনা করে বলেন, কিছু কিছু সুশীলরা নিরাপত্তার চশমা পড়ে ‘আদিবাসীদের’ দেখেন। এতে ‘আদিবাসীদের’ অধিকার খর্ব হচ্ছে। স্বশস্ত্র পাহারার মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়না, নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় ভালবাসার মাধ্যমে। ভালবাসার চোখ দিয়ে ‘আদিবাসী’ ও বাঙ্গালীদের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করতে হবে। এখন্ও পর্যন্ত ‘আদিবাসীরা’ নানাভাবে নির্যাতিত ও অবহেলিত হয়ে আসছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, সমতলের ‘আদিবাসীরা’ ভূমির অধিকার ও মানবাধিকার থেকে এখন্ও বঞ্চিত। কিন্তু এখন্ও সরকারীভাবে তাদের অধিকার আদায়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে এই সরকারের আমলেই আদিবাসীদের পূর্ণাঙ্গ অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

সমাবেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, আদিবাসীদের অস্তিত্ব অস্বীকার করলে এই দেশেরই অস্তিত্ব থাকে না। তাই দেশের স্বার্থে ‘আদিবাসী’ ও বাঙ্গালীদের মধ্যে সেতুবন্ধন জরুরী। ইসরায়েলের মত আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে ‘আদিবাসীদের’ দমিয়ে রাখলে দেশের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে।স্বাধীনতার এত বছর পর এখন্ও ‘আদিবাসীরা’ র্নিযাতিত ও নিপীড়িত অভিযোগ করে তিনি বলেন, দেশের একটি অংশের জন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আর সংখ্যালঘু ‘আদিবাসী’ সম্প্রদায়ের জন্য সামরিক ব্যবস্থা এটা হতে পারেনা। সামরিক শাসনের মাধ্যমে ‘আদিবাসীদের’ দমিয়ে রাখা হযেছে। তাই অতিদ্রুত ‘আদিবাসীদের’ ভুমির অধিকার ও মানবাধিকারের জন্য সেতুবন্ধন জরুরী বলে মনে করেন মানবাধিকারের চেয়ারম্যান।

অনুষ্ঠানের সভাপতি পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) বলেন, বর্তমান সরকারের কাছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের আবেদন-নিবেদনের পালা শেষ হয়ে গেছে। এবার স্বাধিকার আদায়ে তাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রামে নামতে হবে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে সন্তু লারমা বলেন, সরকার ও রাষ্ট্র আমাদের দাবিকে অবহেলা করে। অবজ্ঞা করে। আমাদের কোনো দাবিই তারা আমলে নেয়নি। তিনি বলেন, আমরা এখন বিরক্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যা করা দরকার আমরা আজ থেকে তাই করবো। অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার বোবা হয়ে গেছে, কানা হয়ে গেছে। তারা আমাদের কোনো কথা শুনে না। সরকার যদি মনে করে দেশে ‘আদিবাসী’ বলে কেউ নেই তাহলে তারা ভুল করবে।

সন্তু লারমা বলেন, আমাদের জীবনের পথ এখন রুদ্ধ হয়ে আছে। দিনের পর দিন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা বঞ্চিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠীর কাছে আমরা আবেদন করেও কোনো ফল পাইনি। আমরা জানি, কিভাবে স্বাধিকারের জন্য সংগ্রাম করতে হবে। অনুষ্ঠানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, আজকের এ দিনে আপনাদের সবার প্রতি আহবান জানাই ঐক্যবদ্ধভাবে আপনারা অধিকার আদায় করে নিবেন। তিনি বলেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা শুরু থেকেই নির্যাতিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন সরকারের সময়, বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠীর কাছে আমরা আবেদন করে ব্যর্থ হয়েছি। কেউ আমাদের দাবি শুনছে না।

সমাবেশে শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন ও সমতলের ‘আদিবাসীদের’ অধিকার রক্ষায় আলাদা মন্ত্রনালয়ের তাগিদ দেন বাংলাদেশ কমিউনিষ্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।

আইন ও শালিস কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল বলেন, যুদ্ধ করে আমরা এ দেশ স্বাধীন করেছি। তাই ‘আদিবাসীদের’ অধিকার রক্ষায় আমাদের লড়াই করতে হবে। এ সময় তিনি ‘আদিবাসীদের’ উপর নিপীড়ন ও অস্বীকৃতির বিরুদ্ধে সেতুবন্ধন রক্ষা করার তাগিদ দেন। এ সময় বাংলা একাডেমীর মত সংখ্যালঘু ‘আদিবাসীদের’ জন্য একটি একাডেমী প্রতিষ্ঠা জরুরী বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি।

আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যেতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার সভাপতিত্বে সমাবেশে এ সময় অন্যন্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেবায়েত ফেরদৌস, সাদেকা হালিম, নাট্যব্যাক্তিত্ব মামুনুর রশিদ, কানাডিয়ান হাইকমিশনার ডানিয়েল লুসি, ইউএনডিপির কান্ট্রি ডিরেক্টর পলিন তেমাসিস প্রমূখ।

নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান আদিবাসী ফোরামের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)। “এবার আর কোনো আবেদন-নিবেদন নয়, দাবি আদায়ে কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে। আদিবাসীরাও মানুষ, তাদেরও আশা-আকাঙ্ক্ষা আছে, তারা জানে কিভাবে লড়াই করতে হয়।”

এর আগে সকাল ১০টায় বেলুন উড়িয়ে সমাবেশের উদ্বোধন করেন মানবাধিকারের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান। সমাবেশ শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও র‌্যালি অনুষ্ঠিত হয়।

 

আজ বিশ্ব আদিবাসী দিবস

10014953_10152205492782136_7347320575026373571_o পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট: আজ ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস। বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক, আদিবাসী প্রচারণা, কারা আদিবাসী-কারা নয়; কেন আদিবাসী দাবী, কী ঘটবে পাহাড়ীরা আদিবাসী স্বীকৃতি পেলে ইত্যাদি বিষয়ে ইতিহাস, বর্তমান বাস্তবতা, অন্তরালের খবর, ষযড়ন্ত্র প্রভৃতি বিষয়ে অনুপুঙ্খ আলোচনা রয়েছে parbattanews.com এর তথ্যবহুল লেখাগুলিতে। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি শুধু এই লেখাগুলো পড়লেই বাংলাদেশে আদিবাসী প্রচারণার আদিগন্ত জানার তৃষ্ণা মিটবে। সংরক্ষণে রাখার মতো এই সংগ্রহটি শেয়ার করে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য সবাইকে অনুরোধ করছি:

 

 

১. বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক- মেহেদী হাসান পলাশ
http://parbattanews.com/বাংলাদেশে-আদিবাসী-বিতর্ক/#.U99Yo-OSzaB
২. আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ: বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক-২
– মেহেদী হাসান পলাশ
http://parbattanews.com/আদিবাসী-বিষয়ে-আন্তর্জাতি/#.U99YuOOSzaB
৩. বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আদিবাসী শব্দ ব্যবহার না করতে তথ্য বিবরণী জারী করেছে সরকার- মেহেদী হাসান পলাশ
http://parbattanews.com/বাংলাদেশের-আদিবাসী-2/#.U-RyzvmSxZg
৪. বাংলাদেশ নাগরিকের রাষ্ট্র, কোন আদিবাসীর নয়- ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন
http://parbattanews.com/বাংলাদেশ-নাগরিকের-রাষ্ট্/#.U99Y0OOSzaA
৫. আদিবাসী বা নৃতাত্ত্বিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী বিতর্ক-মে. জে. (অব:) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক
http://parbattanews.com/আদিবাসী-বা-নৃতাত্ত্বিক-ক/#.U99Y5OOSzaA
৬. বাংলাদেশে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ প্রচারণা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রশ্নসাপেক্ষ- ড. খুরশীদা বেগম
http://parbattanews.com/বাংলাদেশে-তথাকথিত-আদিবা/#.U99Y7OOSzaA
৭. বাংলাদেশের ‘আদিবাসী’ সঙ্কট -মোস্তফা জব্বার
http://parbattanews.com/বাংলাদেশের-আদিবাসী-সঙ্/#.U99Y7uOSzaA
৮. উপজাতিরা নয় বাঙালিরাই আদিবাসী – একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রফেসর ড. আবদুর রব
http://parbattanews.com/বাঙালিরাই-আদিবাসী/#.U-R6TvmSxZg
৯. বাংলাদেশে আদিবাসী নিয়ে বাড়াবাড়ি ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি- জালাল উদ্দিন ওমর
http://parbattanews.com/বাংলাদেশে-আদিবাসী-নিয়ে-ব/#.U99Y3OOSzaA
১০. মুসলমানরাই বাংলাদেশের আদিবাসী- মাহমুদ ইউসুফ
http://parbattanews.com/বাংলাদেশের-আদিবাসী/#.U-CLNeOSzaA
১১. পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনা-বাঙ্গালী প্রত্যাহার ও খ্রিস্টান অঞ্চল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন- সুকুমার বড়ুয়া
http://parbattanews.com/পার্বত্য-চট্টগ্রাম-থেকে/#.U99ZEuOSzaA
১২. পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা রাষ্ট্র বানানোর জন্যই পাহাড়ীরা নিজেদেরকে আদিবাসী দাবি করছে- মো: শামীম উদ্দিন
http://parbattanews.com/পার্বত্য-চট্টগ্রামকে-আলা/#.U99ZTeOSzaA
১৩. কী ঘটবে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ীদের ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দেয়া হলে?- নাজমুল আহসান
http://parbattanews.com/কী-ঘটবে-পার্বত্য-চট্টগ্র/#.U99ZT-OSzaA
১৪. পার্বত্য উপজাতীয় অধিবাসীরা আদিবাসী নয়- ইব্রাহীম খলিল
http://parbattanews.com/পার্বত্য-উপজাতীয়-অধিবাসী/#.U99ZWuOSzaA

অধিকার আদায়ে আদিবাসীদের আরো বেশী সংগ্রামী হতে হবে- সন্তু লারমা

10589908_717395464963914_996227919_n

নিজস্ব প্রতিবেদক:

নিজেদের অধিকার ও দাবি আদায়ে ‘আদিবাসীদের’ ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরেও এখনো এদেশে কোনো গণমুখী সরকার প্রতিষ্ঠা হয়নি। এ কারণে আমাদের ‘আদিবাসীদের’ অধিকার ও দাবি আদায়ে এখনো আন্দোলন করতে হচ্ছে। দেশে একটি গণমুখী সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য ‘আদিবাসীদের’ ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করতে হবে বলেও গুরুত্বারোপ করেন জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) প্রধান সন্তু লারমা। 

৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে দুপুরে রাজধানীর সুন্দরবন হোটেলে আদিবাসী ফোরাম আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি এসব কথা বলেন। পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান ও আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা বলেন, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে জুম্ম (পাহাড়ি) জনগণকে বিকল্প ভাবনা ভাবতে হবে। পাশাপাশি অস্তিত্ব রক্ষায় পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীকে হতে হবে আরো বেশি সংগ্রামী। তিনি মুক্তিযুদ্ধের উদাহরণ টেনে বলেন, এ সংগ্রামের রূপ কি হবে, সময়ই তা বলে দেবে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এবার আদিবাসী দিবসের স্লোগান হচ্ছে ‘আদিবাসী অধিকার আদায়ে মুক্তিকামী জনতার সেতুবন্ধন’। অন্যান্যদের মধ্যে এতে উপস্থিত ছিলেন আদিবাসী ফোরামের সঞ্জিব দ্রং, জনসংহতি সমিতির শক্তিপদ ত্রিপুরা, খাসি ওয়েল ফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের এন্ড্রু সলেমার, ঐক্য ন্যাপের পংকজ ভট্টাচার্য, আরডিসি’র অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, আইইডি’র নুমান আহমেদ খান প্রমুখ।

এক প্রশ্নের জবাবে সন্তু লারমা বলেন, পার্বত্য শান্তিচুক্তির ১৭ বছর পেরিয়ে ১৮ বছর হতে চলেছে। এ সরকারের আমলে ১৯৯৭ সালে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। ১৭ বছরে সরকারগুলো চুক্তি বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, উল্টো চুক্তিপ রিপন্থী কাজ করে চলেছে। এ জন্য চুক্তি বাস্তবায়নে জুম্ম জনগণকে বিকল্প ভাবনা ভাবতে হবে। ‘সংবিধানে আদিবাসীর অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে পার্বত্যাঞ্চলসহ সারা দেশের ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর অধিকার পর্যুদস্ত করা হয়েছে। পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগুলো প্রতিনিয়ত নিপীড়িত-নিগৃহিত হচ্ছে। অধিকার কেউ কাউকে দেয় না। অধিকার অর্জন করতে হয়। মুক্তিযুদ্ধ এটি প্রমাণ করেছে আরেকবার।

সন্তু লারমা আরো বলেন, ‘ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর জাতীয় জীবনে শাসকেরা গণমুখী, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক নয়। তাই নিজেদের অধিকার আদায়ে আরো বেশি সংগ্রামী হতে হবে। সে সংগ্রামে রূপরেখা কি হবে, তা আমি বলতে পারবো না। সময়েই তা বলে দেবে। ‘আদিবাসীদের’ লড়াই- সংগ্রামের বাস্তবতা শাসকগোষ্ঠীকে গভীরে গিয়ে বুঝতে হবে। এটি হালকাভাবে বুঝলে চলবে না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ৪৩ বছর ধরে সেনাশাসন চলছে। বাংলাদেশের কোথাও তো সামরিক শাসন নেই। এই বাস্তবতা কি নীতি নির্ধারকরা বোঝেন না? অবশ্যই তারা তা বোঝেন। অথচ কিছুদিন আগে একজন মন্ত্রী পূর্বাঞ্চল সফর করে বলেছেন, চুক্তি বাস্তবায়নে আরো নাকি তিন-চার বছর সময় লাগবে। অর্থাৎ চুক্তি বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা রয়েছে। অন্যদিকে, সমতলে অব্যহতভাবে ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠী জমি-জমা হারাচ্ছেন, ভূমি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছেন, দেশান্তরী হতে বাধ্য হচ্ছেন। এ অবস্থায় নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখার চেষ্টা হতেই পারে। এটি বাস্তবতা।

আরেক প্রশ্নের জবাবে সন্তু লারমা বলেন, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নামক পাহাড়িদের একটি সশস্ত্র গ্রুপ শান্তিচুক্তিবিরোধী সরকারের একাংশ ও সেনাবাহিনীর মদদে সৃষ্টি। শান্তিচুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করতে এটি সৃষ্টি করা হয়েছে। অন্যদিকে সংস্কারপন্থী জনসংহতি সমিতি নামক গ্রুপটির সৃষ্টি এক-এগারোর সরকারের মদদে। এটি একটি উপদলীয় চক্রান্ত।

এতে লিখিত বক্তব্যে সন্তু লারমা সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে ‘আদিবাসীদের’ সাংবিধানিক স্বীকৃতির পাশাপাশি সংসদের উত্থাপিত তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ বিল-২০১৪ প্রত্যাহার এবং সদ্য পাশ হওয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন-২০১৪ বাতিল ও বিলুপ্তির দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে সঞ্জিব দ্রং বলেন, সরকার ‘হাত ধোয়া দিবস’সহ আরো নানা দিবস পালন করে। এসব দিবস পালনে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়। অথচ ক্ষুদ্র জাতির অধিকার রক্ষায় জাতিসংঘের সনদে স্বাক্ষর করেও সরকার দেশে আদিবাসী দিবস পালন করছে না।

পংকজ ভট্টাচার্য বলেন, সোমবারই চাঁপাইনবাবগঞ্জে জমির অধিকার রক্ষায় সোচ্চার একজন উঁরাও জনগোষ্ঠীর নেত্রীকে সন্ত্রাসীরা গণধর্ষণ করা হয়েছে। এর আগে রাষ্ট্রীয় বাহিনী অপহরণ করেছে পাহাড়ি নেত্রী কল্পনা চাকমাকে। পাহাড় ও সমতলে ক্ষুদ্র জাতির নারীর প্রতি এমনই সহিংসতা চলছে।

অধ্যাপক মেসবাহ কামাল প্রশ্ন রেখে বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর আস্থা রেখে শান্তিচুক্তির পর ভারত থেকে দেশে ফিরেছেন সাড়ে ৬৫ হাজার পাহাড়ি শরণার্থী। এ ছাড়া পাহাড়ে রয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু। তাদের অধিকাংশই নিজ বসতভিটা ফেরত পাননি। প্রধানমন্ত্রী কি এদের কথা ভেবে একবার পেছনের দিকে তাকাবেন?

আদিবাসী দিবসের কর্মসূচি :

সংবাদ সম্মেলনে আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, ৯ আগস্ট সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পালিত হবে আদিবাসী দিবসের মূল অনুষ্ঠান। এ উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছে সমাবেশ, শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান কর্মসূচির উদ্বোধন ঘোষণা করবেন। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। সভাপতিত্ব করবেন পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা। একই দিন দুপুর ১২টায় মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে দুপুর ১২টায় বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হবে ক্ষুদ্র জাতির মেলা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ ছাড়া ৬ আগস্ট সকাল ১১টায় রাজধানীর শাহবাগে আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হবে মানববন্ধন। ৮ আগস্ট বিকাল ৩টায় রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা। ১৩টি সংগঠন এর আয়োজক। একই দিন সন্ধ্যা ৬টায় গারো ছাত্র সংসদের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজন করা হয়েছে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন কর্মসূচি। ১১ আগস্ট বিকাল ৩টায় জাতীয় জাদুঘরে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনাসভা ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী। কাপেং ফাউন্ডেশন ও আদিবাসী সাংস্কৃতিক ফোরাম এর উদ্যোক্তা। ১৪ আগস্ট বিকাল ৫টায় মাদল গানের দলের উদ্যোগে রাজধানীর আগারগাঁর জাতীয় গ্রন্থাগারে পরিবেশিত হবে ঐতিহ্যবাহী সংগীত।

ঢাকার বাইরে ৯ আগস্ট আদিবাসী দিবসে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের উদ্যোগে রাজশাহী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট ও নওগাঁয়, আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে, আদিবাসী দিবস উদযাপন কমিটির উদ্যোগে সিলেটে, কুবরাজ অন্তপুঞ্জি উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের আয়োজনে মৌলভীবাজার ও কুয়াকাটায়, জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদসহ ১৪টি সংগঠনের উদ্যোগে টাঙ্গাইল ও মধুপুরে, আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে নাটোরে, আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে নেত্রকোনা, শেরপুর ও গাজীপুরে পালিত হবে অনুরূপ নানা কর্মসূচি।

 

 

আদিবাসী ফোরামের নেতারা বাংলাদেশে বিশ্ব আদিবাসী দিবস জাতীয়ভাবে পালনের আহ্বান জানিয়ে এদেশে আদিবাসীদের ভূমি ও সামাজিক অধিকার বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। 

সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেজবাহ কামাল বলেন, আদিবাসীরা এখনো নানা দাবিতে তাদের অধিকার নিয়ে আন্দোলন করছে। তাহলে সরকার কীভাবে দাবি করে যে, তারা সকলের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে?

বিশ্বের ৯০টি দেশের ৪০ কোটি আদিবাসীর মতো এদেশেও ৩০ লাখ আদিবাসী বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালন করবে জানিয়ে পাঁচ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। – See more at: http://www.banglanews24.com/beta/fullnews/bn/312315.html#sthash.jXZ5mD9s.dpuf