আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে সমস্যা কোথায়?

মেহেদী হাসান পলাশ 

মেহেদী হাসান পলাশ

আজ ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস। অন্যসব বছরের মতো এ বছরেও বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী সাড়ম্বরে দিনটি উৎযাপনের আয়োজন করেছে। এ বছর জাতিসংঘ দিনটির প্রতিপাদ্য ঠিক করেছে, Post : 2015 Agenda: Ensuring indigenous peoples’ health and well-being”. বিশ্ব আদিবাসী দিবসকে সামনে রেখে আবার নতুন করে আলোচিত হচ্ছে বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্কটি।

বাংলাদেশে আদিবাসী কারা- এই বিতর্কটি খুব প্রাচীন নয়, বড়ো জোর দেড় দশকের। ইস্যুটি পুরনো না হলেও তা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাস, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বকে নাড়া দিয়েছে। জাতীয় সংহতির প্রশ্নে তাই এ বিতর্কের আশু সমাধান জরুরি। ইতোপূর্বে দৈনিক ইনকিলাবে একই বিষয়ে বর্তমান লেখকের তিনটি উপ-সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছে। প্রবন্ধগুলো হচ্ছে, বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক, প্রকাশ, ২ আগস্ট ২০১৩; আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ, প্রকাশ ৩০ আগস্ট ২০১৩ এবং বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা, প্রকাশ, ১৫ আগস্ট ২০১৪। পঠনের পরম্পর্য রক্ষায় পাঠকগণ ইচ্ছে করলে উপরের হাইপার লিংক থেকে লেখাগুলো পড়ে নিতে পারবেন। বর্তমান লেখায় বাংলাদেশের সমতলে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সলুক সন্ধান ও তাদের আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে প্রতিবন্ধকতা কোথায় তা নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

আদিবাসী শব্দের ইংলিশ প্রতিশব্দ Indigenous people. . অনেকে আদিবাসী শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে Aborigine ব্যবহার করেন। কিন্তু Aborigine বলতে সার্বজনীনভাবে আদিবাসী বোঝায় না। Aborigine বলতে সুনির্দিষ্টভাবে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের বোঝায়। একইভাবে Red Indian বলতে মার্কিন আদিবাসীদের বোঝায়, অস্ট্রেলীয় Aborigine বা আদিবাসীদের বোঝায় না। প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী আদিবাসী হচ্ছে, ‘কোনো স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই।’ মর্গান বলেন, The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial … they are the true Sons of the soil…’ (Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972).

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে মোট ৪৫টি (কারো কারো মতে ৭৫) ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব রয়েছে। সাধারণভাবে এরা উপজাতি ও তফশিলী সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। তবে বিশেষ উদ্দেশ্যে কিছু মতলবাজগোষ্ঠী এ সম্প্রদায়গুলো আদিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের আদিবাসী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করা শুরু করেছে।  জাতি ও উপজাতি সংজ্ঞা এসব জনগোষ্ঠীর অনেকগুলোর জন্যই প্রযোজ্য নয়। তাই তাদের তফশিলী সম্প্রদায় বলা হয়। ভারতবর্ষেও সহস্রাধিক সম্প্রদায় ‘তফশিলী’ হিসেবেই রাষ্ট্রকাঠামোতে স্বীকৃত রয়েছে। বাংলাদেশের সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে সাঁওতাল, গারো, হাজং, কোচ, মনিপুরী, খাসিয়া, রাখাইন প্রধান। এখানে এসব জনগোষ্ঠীর আদি নিবাস ও বাংলাদেশে আগমন নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে।(পূর্বের ‘বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক’ শিরোনামের লেখায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাসিন্দাদের আদি নিবাস ও বাংলাদেশে আগমন নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। ইচ্ছে করলে পাঠকগণ উপরের হাইপার লিংকে ক্লিক করে সেসব তথ্য দেখে নিতে পারেন।)

ইতিহাসের এই বিশ্লেষণে সকল তথ্যের জন্য মাত্র তিনটি পুস্তককে রেফরেন্স ও তথ্যাগার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর একটি হলো বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রণীত `বাংলাপিডিয়া’, একই প্রতিষ্ঠানের `বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা’ এবং বাংলাদেশ আদিবাসী অধিকার আন্দোলন কর্তৃক প্রণীত `বাংলাদেশের আদিবাসী : এথনোগ্রাফীয় গবেষণা’। এই পুস্তক তিনটি নির্বাচনের প্রধান কারণ বাংলাদেশে আদিবাসী অধিকার ও স্বীকৃতির বিষয়ে অধিক সোচ্চার ব্যক্তিগণ এই বই তিনটির রচনা ও সম্পাদনার সাথে তারা জড়িত।

সাঁওতাল

ভারতবর্ষের প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাঁওতাল অন্যতম হলেও বাংলাদেশের তাদের আগমন মাত্র ব্রিটিশ আমলে। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, ব্রিটিশ সরকার রেল লাইন নির্মাণ কাজের জন্য ভারতের সাঁওতাল পরগণা থেকে সাঁওতালদের বাংলাদেশে নিয়ে আসে। এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রণীত বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালায় বাংলাদেশে সাঁওতালদের আগমন সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘দীর্ঘদিন ধরে সাঁওতালরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে বসবাস করছিলেন। ১৮৩৬ সালে ব্রিটিশ সরকার তাদেরকে নির্বিঘ্নে বসবাসের জন্য একটি স্থায়ী এলাকা নির্ধারণ করে দেয়। এ এলাকা সাঁওতাল পরগণা নামে খ্যাত হয়। সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর তাদের অনেকে সাঁওতাল পরগণায় থাকা নিরাপদ মনে না করে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। ড. পিয়ের বোসাইনেট উল্লেখ করেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) সাঁওতালদের অধিকাংশই সাঁওতাল পরগণা থেকে এখানে আগমন করেছেন।

গারো

নৃতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদদের মতে, গারোরা মঙ্গোলয়েড মহাজাতির টিবেটো-বার্মান দলের টিবেটো-চাইনিজ পরিবারের সদস্য। গারোদের ঐতিহ্যবাহী গানের মধ্যে তাদের এদেশে আগমনের সময়কাল সম্পর্কে বলা হয়েছে \’Do reng noktopgita, kilding jakbogita\’ অর্থাৎ ‘সে সময় চিলগুলো ছিল একটি ছোট্ট কুটিরের মতো, আর মাকড়সার জালের সুতা ছিল এক হাতের মতো বড়।’ গারোদের পূর্ব পুরুষদের ধারণা মতে, তাদের পূর্ব-পুরুষদের আদি বাসস্থান ছিল তিব্বত যা \’Torua\’ নামে পরিচিত ছিল। তিনটি পথ দিয়ে তিন দলে বিভক্ত হয়ে গারোদের পূর্ব-পুরুষরা এ উপমহাদেশে আসে। এর একটি দল দক্ষিণ দিকে সুরমা ও বরাক নদী হয়ে কাছাড় ও সিলেটে প্রবেশ করে। এই দলই পরবর্তীতে ‘বঙ্গে’ অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

হাজং

নৃবিজ্ঞানী মি. জে কে বোসের মতে, হাজং গরোদেরই একটি দল। বিভিন্ন লেখকের মতে, হাজংরা আসামের কামরূপ জেলার হাজো অঞ্চল থেকে ক্রমান্বয়ে এদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছে। প্রবীণ হাজংদের মতে, তাদের আদিনিবাস বিহারের অদূরে অবন্তিনগর (মালব) নামক স্থানে এবং নিজেদেরকে তারা সূর্যবংশীয় ক্ষত্রিয় বলে দাবি করে। হাজংরা সুদূর চীনের হোয়াংহো নদীর অববাহিকা থেকে তিব্বত, তিব্বত থেকে অবন্তিনগর (মালব), অবন্তিনগর থেকে প্রাগজ্যোতিষপুর (গৌহাটি) হাজোনগর এবং হাজোনগর থেকে গাড়ো পাহাড়ের কড়ইবাড়ি, বারহাজারী থেকে বাংলাদেশে বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করে।

কোচ

কোচেরা নিজেদের কুচবিহারের নৃপতি নরনারায়ণ এবং চিলারায়ের বংশধর হিসেবে পরিচয় দেয়। তাদের মতে, তাদের আদিনিবাস ছিল রাসান মৃকপ্রাক টারি (যে পাহাড়ে সূর্য প্রথম উদয় হয়) অথবা উদয়গিরি নামক স্থানে। সে আদিনিবাস ত্যাগ করে তারা প্রথমে কামরূপ অঞ্চলে বসতি গড়ে। কামরূপের পরে তারা হাজো অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। সেখান থেকে নানা পথ ঘুরে মেঘালয়ের পশ্চিম সমভূমি এলাকায় রাজ্য গড়ে তোলে যা কুচবিহার নামে পরিচিতি লাভ করে। এ কুচবিহার থেকেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে কোচেরা নানাদিকে দলে দলে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বর্তমানের বাংলাদেশেও সেরকম কয়েকটি দল প্রবেশ করে, যাদের উত্তর পুরুষরাই বর্তমানে একাধিক গোষ্ঠীর নামকরণপূর্বক এদেশের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করছে।

রাখাইন

নৃতাত্ত্বিক বিচারে এরা মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর লোক। রাখাইনদের আদিনিবাস ছিল আরাকান (বর্তমান মায়ানমারের অন্তর্ভুক্ত)। রাখাইনরা তাদের নিজ দেশকে ‘রক্ষইঙ্গি’ এবং নিজেদের ‘রাখাইন’ নামে পরিচয় দিত। রাখাইনদের অংশবিশেষ পনেরো শতক থেকে কক্সবাজারের রামু ও সংলগ্ন এলাকায় বসতি শুরু করলেও আঠারো শতকে আরকানের রাজনৈতিক দুর্যোগ তাদের অনেককেই স্বদেশ ভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য করে। ফলে তারা ক্রমান্বয়ে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় এবং বরগুনা ও পটুয়াখালীতে এসে বসবাস করতে থাকেন।

মণিপুরী

মণিপুরীরা উৎপত্তির ঊষালগ্নে ভারতের বৃহত্তর আসাম রাজ্যের পাদদেশে অবস্থিত বরাক নদীর অববাহিকায় পাতকায় উপত্যকাই অবস্থিত পার্বত্য রাজ্য, নৈসর্গিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ একদা স্বাধীন মণিপুর রাজ্যের অধিবাসী। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মণিপুরে প্রবেশ করে মণিপুরীদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ইংরেজগণ মণিপুরীদের পরাস্ত করে মণিপুরের রাজা বীরবিক্রম টিকেন্দ্রজিৎ সিংহকে পরাস্ত ও বন্দি করে। পরবর্তীকালে ১৯৪৯ সালে মণিপুরকে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের করদরাজ্য বিবেচনায় ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত করে। প্রাণরক্ষার তাগিদে বহু দিশেহারা মণিপুরী [১৭৫৮, ১৭৬৫, ১৮৯১ খ্রি.] নানা দলে বিভক্ত হয়ে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের সন্ধানে মণিপুর রাজ্য ছেড়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েন। তখন অনেক মণিপুরী লোক বাংলাদেশ ভূখণ্ডে এসে বসতি স্থাপন করে।

খাসিয়া

খাসিয়া বা খাসিমঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত উপজাতি। এদেশীয় খাসিয়ারা প্রায় ৫শ’ বছর পূর্বে আসাম থেকে এখানে এসে বসতি গড়েছে। তারা আসামে এসেছিল সম্ভবত তিব্বত থেকে। তাদের প্রধান আবাসস্থল উত্তরপূর্ব ভারত।

উপর্যুক্ত আলোচনায় দেখা যায়, ঐতিহাসিক বিচারে বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠীই বহিরাগত। এটা আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের নেতাকর্মী ও গবেষকগণ স্বীকার করে নিয়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় যেসব প্রত্নবস্তু, অবস্থান ও প্রমাণ পাওয়া গেছে তা খৃষ্টপূর্ব ১৬০০-৫০০ সালের পুরাতন। সেকারণে উপজাতিদের আদিবাসী আখ্যাদানকারী গবেষকগণ এখন ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) কনভেনশন-১৬৯’র আদিবাসী বিষয়ক সংজ্ঞার অপব্যাখ্যা করে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তফশিলী সম্প্রদায়কে আদিবাসী দাবি করছেন ও দাবি করতে উদ্বুদ্ধ করছেন। তবে এ কথা ভুললে চলবে না বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তফশিলী সম্প্রদায়ের অধিকাংশই এই ‘আদিবাসী’ দাবির সাথে সম্পৃক্ত নয়। দেশি-বিদেশি চিহ্নিত একটি মহলের ইন্ধন ও পৃষ্ঠপোষকতায় আঞ্চলিক ও সম্প্রদায়গত কিছু সংগঠন এবং এনজিওর সাথে জড়িত ব্যক্তিরা এই দাবির সাথে জড়িত। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) আদিবাসী কনসেপ্ট সমর্থন করে না। তারা সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে পছন্দ করে।

সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অনেক বিদগ্ধজনের মুখে শোনা যায়, উপজাতি বললে তারা যদি অপমানিত বোধ করে, হেয় বোধ করে এবং আদিবাসী বললে যদি খুশী হয় তাহলে তা বলতে দোষ কোথায়? ইতিহাসে যাই-ই থাক, শতকরা ৯৮ ভাগ একক বাঙালি জনগোষ্ঠীর দেশে আমরা আমাদের দেশের মুষ্টিমেয় উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি এইটুকু উদারতা কি দেখাতে পারি না? এই প্রশ্ন যেকোনো সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষের হৃদয় বিগলিত করতে বাধ্য।

প্রশ্নটি অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে। কিন্তু গোল বাঁধিয়েছে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র। ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক একটি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এ ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করলে ১৪৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪টি দেশ বিপক্ষে, ১১টি দেশ ভোট দানে বিরত এবং ৩৪টি দেশ অনুপস্থিত থাকে। ভোট দানে বিরত থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া দেশগুলো হচ্ছে- অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘোষণাপত্রে সর্বমোট ৪৬টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এসব অনুচ্ছেদের বেশ কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, অস্তিত্ব, কর্তৃত্ব, সংবিধান ও আত্মপরিচয়ের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

একথা নিশ্চিত করে বলা যায়, যেসব ব্যক্তিবর্গ খুব সরলভাবে বা অসেচতন-উদারতায় উপজাতিদের আদিবাসী বলতে ইচ্ছুক/আগ্রহী তাদের অনেকেই হয়তো এই ঘোষণাপত্র পড়ে দেখেননি অথবা তার মর্মার্থ অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন (অবশ্য তারা  মতলববাজদের কথা আলাদা)। নিম্নে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্রের কিছু অনুচ্ছেদ নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

অনুচ্ছেদ-৩ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার বলে তারা অবাধে তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করে এবং অবাধে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মপ্রয়াস অব্যাহত রাখে।

অনুচ্ছেদ-৪ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার উপভোগের বেলায়, তাদের অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ে তথা স্বশাসিত কার্যাবলীর অর্থায়নের পন্থা ও উৎস নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের স্বায়ত্তশাসন বা স্বশাসিত সরকারের অধিকার রয়েছে।

অনুচ্ছেদ-৫ : আদিবাসী জনগণ যদি পছন্দ করে তাহলে রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের পূর্ণ অধিকার রেখে তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক, আইনগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অক্ষুণ্ন রাখা ও শক্তিশালীকরণের অধিকার লাভ করবে।অনুচ্ছেদ-৬ : আদিবাসী ব্যক্তির জাতীয়তা লাভের অধিকার রয়েছে।

অনুচ্ছেদ-১৯ : রাষ্ট্র  আদিবাসীদের প্রভাবিত করতে পারে এমন আইন প্রণয়ন কিংবা প্রশাসনিক সংক্রান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পূর্বে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি নেয়ার জন্য তাদের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে আন্তরিকত্ব সদিচ্ছার সাথে আলোচনা ও সহযোগিতা করবে।

উপরের অনুচ্ছেদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে বাংলাদেশের ভেতর কমপক্ষে ৪৫টি স্বায়ত্তশাসিত বা স্বশাসিত অঞ্চল ও সরকার ব্যবস্থার সৃষ্টি হবে। এসব অঞ্চলে সরকার পরিচালনায় তারা নিজস্ব রাজনৈতিক কাঠামো, জাতীয়তা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আইনপ্রণয়ন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পাবে। এবং এসব অঞ্চলের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের অধিকার ও কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন হবে। লক্ষণীয়, প্রকাশ্যে বলা না হলেও এই আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বতন্ত্র জাতীয়তার মধ্যে লুকানো রয়েছে স্বাধীনতার বীজ।

এই ঘোষণাপত্রে আদিবাসীদের ভূমির উপর যে অধিকারের কথা বলা হয়েছে তা আরো ভয়ানক। যেমন :

অনুচ্ছেদ-১০ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের ভূমি কিংবা ভূখণ্ড থেকে জবরদস্তিমূলকভাবে উৎখাত করা যাবে না। আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের স্বাধীন ও পূর্ববহিত সম্মতি ছাড়া কোনভাবে অন্য এলাকায় স্থানান্তর করা যাবে না এবং ন্যায্য ও যথাযথ ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে সমঝোতা সাপেক্ষে স্থানান্তর করা হলেও, যদি কোন সুযোগ থাকে, পুনরায় তাদেরকে সাবেক এলাকায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

অনুচ্ছেদ-২৬ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তাদের ঐতিহ্যগতভাবে মালিকানাধীন, দখলীয় কিংবা অন্যথায় ব্যবহার্য কিংবা অধিগ্রহণকৃত জমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের অধিকার রয়েছে।

২৬: ৩. রাষ্ট্র এসব জমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের আইনগত স্বীকৃতি ও রক্ষার বিধান প্রদান করবে। সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রথা, ঐতিহ্য এবং ভূমি মালিকানা ব্যবস্থাপনা মেনে সেই স্বীকৃতি প্রদান করবে।

অনুচ্ছেদ-২৭ :  রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে যৌথভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আইন, ঐতিহ্য, প্রথা ও ভূমি মালিকানাধীন ব্যবস্থাপনার যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করবে।

অনুচ্ছেদ-২৮ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদ যা তাদের ঐতিহ্যগতভাবে মালিকানাধীন কিংবা অন্যথায় দখলকৃত বা ব্যবহারকৃত এবং তাদের স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি ছাড়া বেদখল, ছিনতাই, দখল বা ক্ষতিসাধন করা হয়েছে এসব যাতে ফিরে পায় কিংবা তা সম্ভব না হলে, একটা ন্যায্য, যথাযথ ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পায় তার প্রতিকার পাওয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রয়েছে।

২৮: ২. সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় অন্য কোন কিছু রাজি না হলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে গুণগত, পরিমাণগত ও আইনি মর্যাদার দিক দিয়ে সমান ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদ অথবা সমান আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে বা অন্য কোন যথাযথ প্রতিকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

অনুচ্ছেদ-৩০ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বেচ্ছায় সম্মতি জ্ঞাপন বা অনুরোধ ছাড়া ভূমি কিংবা ভূখ-ে সামরিক কার্যক্রম হাতে নেয়া যাবে না।

অনুচ্ছেদ-৩২ : ২. রাষ্ট্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের উপর প্রভাব বিস্তার করে এমন কোন প্রকল্প অনুমোদনের পূর্বে, বিশেষ করে তাদের খনিজ, জল কিংবা অন্য কোন সম্পদের উন্নয়ন, ব্যবহার বা আহরণের পূর্বে স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি গ্রহণের জন্য তাদের নিজস্ব প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে আলোচনা ও সহযোগিতা করবে।

উপরোক্ত অনুচ্ছেদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী আদিবাসী স্বীকৃতি পেলে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নিজস্ব আইনে নিজস্ব ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মুষ্টিমেয় চিহ্নিত উপজাতিরা দাবি করছে ঐতিহ্য ও প্রথাগত অধিকার বলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল ভূমির মালিক তারা। একই অধিকার বলে সমতলের উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকার সকল ভূমির মালিকানা সেখানকার উপজাতীয়রা দাবি করবে। সেখানে যেসব ভূমি সরকারি ও ব্যক্তিগত মালিকানা (আদিবাসী নয়) রয়েছে তা ফেরত দিতে হবে বা তার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এমনকি উপজাতীয়রা রাজি না হলে সমতল থেকে সমপরিমাণ সমগুরুত্বের ভূমি ফেরত দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে যেহেতু ঐ গোষ্ঠী সকল সামরিক স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার দাবি জানাচ্ছে, সেকারণে সেখান থেকে সকল সামরিক স্থাপনা সরিয়ে নিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অন্যান্য উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় যেসব বাঙালি বসতি স্থাপন করেছে তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। ইউএনডিপিসহ কিছু বৈদেশিক সংস্থা ইতোমেধ্যে প্রকাশ্যে এ দাবি তুলেছে।

ঘোষণাপত্রের ৩৬ অনুচ্ছেদটি আরো ভয়ানক।

অনুচ্ছেদ-৩৬ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর, বিশেষত্ব যারা আন্তর্জাতিক সীমানা দ্বারা বিভক্ত হয়েছে তারা অন্য প্রান্তের নিজস্ব জনগোষ্ঠী তথা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংক্রান্ত কার্যক্রমসহ যোগাযোগ, সম্পর্ক ও সহযোগিতা বজায় রাখার ও উন্নয়নের অধিকার রয়েছে।

আমরা জানি বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল উপজাতি জনগোষ্ঠীর মূল আবাস ভারত ও মিয়ানমার। সেখানে এখনো তাদের মূল জনগোষ্ঠী রয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশে তাদের খণ্ডিত অংশ যদি আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পায় তাহলে ভারতের সমগ্র সেভেন স্টিস্টার্স রাজ্য, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা এবং মিয়ানমারের বিপুল এলাকা আদিবাসী ল্যান্ড স্বীকৃতি পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে। একই সাথে সীমান্তের উভয়পাড়ের অভিন্ন জনগোষ্ঠী যদি অভিন্ন রাজনৈতিক, সরকার কাঠামো কিংবা স্বাধীনতার দাবি তোলে তা আঞ্চলিক সমস্যায় রূপ নেবে। এ বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার প্রতিবেশী ভারত সরকারের দৃষ্টিগোচর করতে পারে।  আদিবাসী জনগোষ্ঠী উল্লিখিত অধিকারসমূহ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ বিশেষভাবে ভূমিকা রাখতে পারবে যা ৪২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। পূর্ব তিমুর, দক্ষিণ সুদান স্বাধীন করণে জাতিসংঘের ভূমিকা বিশ্বের দেশপ্রেমিক জনগণকে আতঙ্কিত করেছে। অধুনা পশ্চিম পাপুয়া নিউগিনিতেও জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

যদিও ৪৬ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন আদিবাসীর দাবি এমন একটা জনগোষ্ঠী থেকে উচ্চারিত হচ্ছে যারা ৪২ বছর ধরে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। কৌশলগত কারণে তারা স্বায়ত্তশাসনের কথা যতোটা উচ্চকিত করে স্বাধীনতার কথা ততোটা নয়। ফলে দেশের অধিকাংশ মানুষই রাষ্ট্রবিরোধী এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থাও রহস্যময় আবরণে সযত্নে ঢেকে রেখেছে দেশবিরোধী এই দুষ্টুক্ষত। কিন্তু যারা সচেতন, বিশেষ করে যারা সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহার করেন তাদের প্রতি আহ্বান একবারের জন্য হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীদের পরিচালিত প্রোফাইল, গ্রুপ ও পেইজগুলো ভিজিট করে দেখুন কী ভয়ানক রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে সেখানে। স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ড গঠনের জন্য নিজস্ব জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, মানচিত্র দিয়ে কিভাবে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে তা সচেতনতার জন্য দেশবাসীর জানা উচিত।

পাঠকের জ্ঞাতার্থে সিএইচটি জুম্মল্যান্ড নামে তাদের পরিচালিত একটি পেইজের ঠিকানা এখানে দেয়া হলো :(https://www.facebook.com/pages/CHT-jummaland/327524104096965?fref=ts)। শুধু ফেসবুক বা সামাজিক গণমাধ্যম নয়, পাহাড়ী বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীরা নিউজ পোর্টাল খুলেও পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড গঠনের প্রচার চালাচ্ছে। তাদের পরিচালিত অসংখ্য সাইটের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, chtnews.com. এই সাইটে করুণালঙ্কার ভান্তে নামে জেএসএসের এক শীর্ষ নেতার ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার প্রচার হচ্ছে বেশ কয়েকদিন ধরে। বৌদ্ধ ভিক্ষুর বেশধারী এই ব্যক্তি নিজেকে স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিচয় দিয়ে বিশ্বব্যাপী স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠায় তার কর্মতৎপরতার কথা বিস্তারিতভাবে বলেছেন। অডিও-ভিডিও’র এই স্বাক্ষাৎকারে ভান্তে আরো জানিয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন করার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র তাদের হাতে রয়েছে। এখন তিনি শুধু ৫ লক্ষ গোলাবারুদ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এই পরিমাণ গোলাবারুদ সংগ্রহ করতে পারলে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা করে স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই ভিক্ষু সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা অর্জনের উদাহরণ তুলে ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী তরুণ প্রজন্মকে তার সাথে একাত্ম হতে অহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আন্তর্জাতিক শক্তিকে তিনি পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পাবেন বলেও জানিয়েছেন। কাজেই বাংলাদেশের উপজাতিদের আদিবাসী স্বীকৃতি কোনো ছেলের হাতের মোয়া নয়। এর সাথে জড়িত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, অস্তিত্ব, কর্তৃত্ব, ইতিহাস ও মর্যাদার প্রশ্ন।

Email:palash74@gmail.com

৯ আগস্ট ২০১৫ তারিখে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত।

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

মেহেদী হাসান পলাশ, Mehadi Hassan Palash
 
মেহেদী হাসান পলাশ :
বান্দরবানে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে এনজিও ব্যুরো। নির্দেশ পাওয়ার পরপরই ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম গুটিয়ে ও কার্যালয়ের আসবাবপত্র সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি। বান্দরবান ওয়ার্ল্ড ভিশন কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়স্থ এনজিও ব্যুরোর কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত পরিপত্রে বলা হয়, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের পর থেকে বান্দরবান জেলায় ওয়ার্ল্ড ভিশন আর কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। সে পত্র মোতাবেক বান্দরবান শহরের বাস স্টেশন এলাকায় অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ভিশন কার্যালয়ের যাবতীয় কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলা হচ্ছে। ঠিক কি কারণে বান্দরবানে তার কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে সে বিষয়ে কোনো পক্ষই মুখ খুলছে না।
ওয়ার্ল্ড ভিশন নামক এই এনজিওটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্রিশ্চিয়ানাইজেশন, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতায় উসকানী প্রদান, পক্ষপাতদুষ্টু কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ করে আসছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালী অধিবাসীরা। বিভিন্ন সরকারি ও গোয়েন্দা তদন্তে এর প্রমাণও মিলেছে। এ ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিও ও মিশনারী সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করা হয়েছে সেসব রিপোর্টে। সে কারণে পার্বত্য বাঙালীরা দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামের এ ধরনের এনজিওর কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার দাবি করে আসছিলো। ওয়ার্ল্ড ভিশনের বান্দরবানে ডাইরেক্ট একশন (ডাক) বা সরাসরি কর্মকাণ্ড বন্ধের নির্দেশ তারই অংশ বলে নাম না প্রকাশ করার শর্তে একটি সূত্র উল্লেখ করেছে। শুধু ওয়ার্ল্ড ভিশন নয় পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রবিরোধী কিংবা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে যুক্ত সব এনজিও ও মিশনারী সংস্থাকেই সরকার একে একে নিয়ন্ত্রেণে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে দাবি করেছে সূত্রটি।
 
ওয়ার্ল্ড ভিশনের বান্দরবান এডিপি ম্যানেজার টিমথি উজ্জ্বল কান্তি সরকার জানান, আশির দশকের আগে থেকে ওয়ার্ল্ড ভিশন বান্দরবান জেলায় জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সম্প্রতি তার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সরকার ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম নবায়ন না করে বরং  কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংস্থাটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এর ফলে ওই মেয়াদের (৩০ সেপ্টেম্বর) মধ্যেই আমরা বান্দরবানে ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলার কাজ শুরু করেছি। তিনি আরো জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিরোধিতায় সরকার ওয়ার্ল্ড ভিশনের নবায়ন বন্ধ করে দিয়েছে। সরকার বলেছে, ওয়ার্ল্ড ভিশন আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, তাই বাংলাদেশে সরাসরি সংস্থাটি কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। তবে ওয়ার্ল্ড ভিশন স্থানীয় এনজিওর সাথে পার্টনারশীপে জনহিতকর কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। জানা গেছে, ওয়ার্ল্ড ভিশনে ৮ জন কর্মকর্তা ও ৮০ জন স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে সীমিত আকারে বান্দরবান সদর উপজেলার সদর, কুহালং ও সুয়ালক এই তিনটি ইউনিয়ন ও বান্দরবান পৌরএলাকায় কৃষি বিষয়ক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিশু কল্যাণ ও দুর্যোগকালীন সেবামূলক কার্যক্রম পরিচলনা করে আসছিল। এছাড়া বিভিন্ন এলাকার ১ হাজার ২৮০ জন ওয়ার্ল্ড ভিশনের স্পন্সর ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের অর্থিক ও শিক্ষা উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করে আসছিল।
গত মঙ্গলবার সরেজমিনে বাস স্টেশন এলাকায় অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ভিশন কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তত্ত্বাবধানে সংস্থাটির আসবাবপত্র অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এসময় দেখা যায়, ওই মাঠে প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ার্ল্ড ভিশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মোতাবেক নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে অপ্রয়োজনীয় কাগজ পুড়িয়ে ফেলা হয়। তাই এসব কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে।
এদিকে ওয়ার্ল্ড ভিশনের সরাসরি কর্মকাণ্ড বান্দরবানে বন্ধ করায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে বান্দরবানের বাঙালি জনগোষ্ঠী। একই সাথে তারা কর্মকাণ্ডে লিপ্ত অন্যসব এনজিও, দাতা সংস্থা ও মিশনারী প্রতিষ্ঠানের সরাসরি কার্যক্রম শুধু বান্দরবান নয়, তিন পার্বত্য জেলাতেই বন্ধের দাবি জানিয়েছে। এ খবরে আলোচ্য বিষয় হলো, ওয়ার্ল্ড ভিশনের মতো একটি আন্তর্জাতিক এনজিও’র কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বলা সরকারি আদেশ, বড় মাপের একটি সিদ্ধান্ত। বর্তমান সরকার বলিষ্ঠতার পরিচয় দিয়ে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে। জাতীয় স্বার্থে এটি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক সিদ্ধান্ত।
 
২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উপজাতিদের ‘আদিবাসী’ বলে অভিহিত না করার জন্য একটি প্রজ্ঞাপণ জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপণের ভাষার বলিষ্ঠতা ছিল লক্ষণীয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার নানা ষড়যন্ত্রের কথা সুস্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের উপজাতিদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে আখ্যা দেয়ার অন্তর্নিহিত কারণ সেখানে চিহ্নিত করে দেশবাসী বিশেষ করে গণমাধ্যমের সাথে সংশ্লিষ্টদের ‘আদিবাসী’ শব্দ পরিহার করার জন্য অনুরোধ করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বর্তমান সরকারের এ দুটি বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত দেশব্যাপী প্রশংসিত হয়েছিল। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাঙালিরা সরাসরি সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। কিন্তু এর সুফল ঘরে তুলতে পারেনি সরকার। এর কারণ সরকারের কিছু উপদেষ্টা, মন্ত্রী, এমপি, আমলা, মহাজোটের শরীক কিছু নেতার বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড। সরকারের দায়িত্বশীল এসব ব্যক্তিবর্গ এমন কিছু বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন, যাতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারের ভাবমর্যাদা উন্নত হওয়ার পরিবর্তে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
 
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক দশমাংশ ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত। জনসংখ্যা সীমিত হলেও জনবৈচিত্র্য বাংলাদেশের অন্য যে কোনো অংশের থেকে আলাদা। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ভূ-রাজনীতিতে বিশ্বে এ অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। সমৃদ্ধ সম্পদে সে আপনা মাংসে হরিণা বৈরী। পার্বত্য চট্টগ্রাম সন্নিহিত কক্সবাজার ও এর পদচুমে বঙ্গোপসাগরের অবস্থান বিশ্বের দৃষ্টিতে লোভনীয়। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে বিশ্বশক্তির রয়েছে অনেক ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও লোলুপ দৃষ্টি। তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে সেনসেটিভ ভূখণ্ড এই পার্বত্য চট্টগ্রাম। সেকারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের কাছে, বাংলাদেশের জনগণের কাছে, সরকারের কাছে আলাদা গুরুত্বের দাবি রাখে। সঙ্গত কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যে কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত ও কর্মপরিকল্পনা হতে হবে সুচিন্তিত, সুপরিকল্পিত ও সুদুরপ্রসারী।
 
ooo 
 
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিচালিত হচ্ছে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত, এডহক নীতি ও অনেকক্ষেত্রে খামখেয়ালীপনার ভিত্তিতে। প্রেসিডেন্ট এরশাদ গুচ্ছগ্রাম সৃষ্টির সময় যেমন পুনর্বাসনের কথা চিন্তা করেননি, ঠিক তেমনি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন তৈরির সময় ১৯০০ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রণীত একটি মৃত আইন- হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়ালকে জীবিত করেছেন। এমনকি এ আইন সৃষ্টিতে রাষ্ট্রিয় সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, কর্তৃত্ব ও সংবিধানকে সুবিবেচনা করা হয়নি। সে কারণেই শান্তিচুক্তির বিরুদ্ধে দায়ের করা রিটে উচ্চ আদালত জেলা পরিষদ আইনের বেশ কিছু ধারাকে “রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র’ আখ্যা দিয়ে অসাংবিধানিক ও রাষ্ট্রবিরোধী বলে বাতিল করে দিয়েছেন। এরশাদের পর বিএনপি ক্ষমতায় এসে শান্তিচুক্তি করার জন্য কর্নেল অলি আহমদ ও রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করে জেএসএস’র সাথে আলোচনা চালিয়ে গেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে যখন সেই শান্তিচুক্তি করেছে বিএনপি তাকে ‘দেশ বিক্রির কালো চুক্তি’ বলে আখ্যা দিয়ে তারা ক্ষমতায় গেলে তা বাতিল করার ঘোষণা দিয়ে প্রবল আন্দোলন করেছে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, আওয়ামী লীগ নিজেও যখন শান্তিচুক্তি করেছে তখন সংবিধান ও সার্বভৌমত্বের চেয়ে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তিকেই হয়ত বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। ফলে আদালতের স্টে অর্ডারের স্যালাইন দিয়ে শান্তিচুক্তিকে এখন আইসিইউতে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এদিকে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় এসে কিন্তু ‘দেশ বিক্রির কালো চুক্তি’ বাতিল করেনি, বরং তারাই এচুক্তি সবচেয়ে বেশি বাস্তবায়ন করেছে।
 
‘আদিবাসী’ বিষয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে নিম্নস্তরে এক ধরনের সমর্থন ছিল সবসময়। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারেও এই ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে ‘আদিবাসী’ কনসেপ্টের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্ত অবস্থান নিয়েছে আওয়ামী লীগই। এ বিষয়ে ভারতীয় সমর্থন পাওয়ার ফলেই সরকারের পক্ষে এমন শক্ত অবস্থান নেয়া সম্ভব হয়েছে। আমাদের পার্বত্য নীতি স্পষ্ট হলে এমন অনেক আন্তর্জাতিক বন্ধু পাওয়া সম্ভব।(যদিও সিএইচটি নিয়ে ভারতের সব নীতিই আমাদের স্বার্থানুকূল হবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই)।  কিন্তু শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের নামে বিভিন্ন স্থান থেকে ঢালাওভাবে বহু নিরাপত্তা ক্যাম্প সরিয়ে নেয়ার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন কার্যত পাহাড়ী চাঁদাবাজ, অপহরণকারী ও সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি। সেকারণে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পদটি পাহাড়ীদের দখলে থাকলেও সচিব পদটিতে বাঙালি আমলার পদায়ন হয়েছে সব সময়। ফলে সরকারী কার্যক্রম ও নীতিতে এক ধরণের ভারসাম্য ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে মন্ত্রীর পাশাপাশি সচিব পদেও পাহাড়ী পদায়ন করায় পার্বত্য মন্ত্রণালয় কার্যত, একটি ভারসাম্যহীন একপেশে সাম্প্রদায়িক মন্ত্রণালয়ে পরিণত হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় রাজনীতি, সমাজব্যবস্থা, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানে।
 
এভাবেই সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারী নীতি পরিবর্তন হয়। শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, সরকারি কর্মকর্তা পরিবর্তনের সাথে সাথেও সেখানে নীতির পরিবর্তন ঘটে। এক কর্মকর্তা পার্বত্য চট্টগ্রামে ২-৩ বছরের দায়িত্ব পালনকালে যে নীতি অনুসরণ করেন পরবর্তী কর্মকর্তা এসে তা সম্পূর্ণ উল্টে দেন। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অগ্রগতি ও সহাবস্থান চরমভাবে ব্যাহত হয়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন নিয়ে সাম্প্রতিক অস্থিরতা। আদালত শান্তিচুক্তির মৌলিক ধারাগুলোর বেশিরভাগই অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দেয়ার পর ভূমি কমিশনও অসাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাতিল হয়ে যাবে, এমনটাই মতামত ছিল দেশের প্রাজ্ঞ আইনজীবীদের। বর্তমান সরকারের কতিপয় ব্যক্তির অতি আগ্রহে যখন ভূমি কমিশন একতরফাভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হয়, তখন স্বভাবতই বাঙালিরা ভূমি কমিশন বাতিলের দাবিতে তীব্র আন্দালন গড়ে তোলে। সেসময় কোনো কোনো কর্মকর্তা মনে করলেন, সরকারেরও মুখ রক্ষা করা দরকার। ব্যাস, বাঙালিদের একটি অংশের হাতে ভূমি কমিশন সংস্কার প্রস্তাবের একটি ড্রাফট তুলে দিয়ে সরকারী কর্তৃপক্ষের সাথে বৈঠকে বসিয়ে দিলেন। ফলে দেশের সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রিয় অখণ্ডতা, সংবিধান, সরকারি কর্তৃত্ব, আদালতের এখতিয়ার বিরোধী একটি প্রতিষ্ঠান বাতিল না হয়ে টিকে থাকার পথ তৈরি হলো। এ নিয়ে ইতোমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক নৈরাজ্য, বিভেদ ও দ্বন্দ্ব। এমনও দেখা গেছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্বপালনকালে কোনো এক সরকারী কর্মকর্তা পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভালবেসে এর উপর দুটি বই লিখে ফেলেন ছদ্মনামে। তথ্যবহুল ও গবেষণামূলক এই বইটি প্রচারে তখন সরকারীভাবে ব্যাপক প্রমোট করা হয়। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে এ বইটিই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। এ বইটিই অত্যন্ত মেধাবী এ কর্মকর্তার চাকুরী অবসানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণায় প্রায় সকল সরকারী অফিসেই বইটি অনুসৃত হয়। এরপর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ভালবেসে কিছু করার ক্ষেত্রে সরকারী কর্মকর্তাদের মধ্যেও এক ধরণের দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে থাকে। একটি স্থায়ী পার্বত্য নীতি না থাকার কুফল এটি।
 
সিএইচটি নিয়ে যে পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্র ভারতের সেভেন সিস্টার্সও তার অন্তর্ভূক্ত। সেটা বুঝতে পেরেই ভারত সরকার সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোতে পাশ্চাত্যের আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার সরাসরি কার্যক্রম বা ডাইরেক্ট একশন (ডাক) বন্ধ করে দিয়েছে।  সেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়নে কার্যক্রম পরিচালনা করে ভারত সরকার বা ভারতীয় এনজিও। কিন্তু বাংলাদেশে এসব আন্তর্জাতিক এনজিও, দাতা সংস্থা ও মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি কার্যক্রম পরিচালনা করে। তাদের কার্যক্রম ও অর্থ পরিচালনার কোনো হিসেব বাংলাদেশ সরকারকে দেয় না। এমনকি তাদের মিটিংগুলোতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদের ঢুকতে দেয় না। কেউ ঢুকলেও পরিচয় পেলে অপমান করে বের করে দেয়। সে ক্ষেত্রে বান্দরবানে ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ ইতিবাচক। অন্যান্য এনজিও ও দাতা সংস্থার ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা কাম্য। অথচ একই সময়ে সরকারের কোনো কোনা মন্ত্রী ইউএনডিপির মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে বহুল বিতর্কিত দাতা সংস্থার কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধির জন্য ডিও লেটার পাঠাচ্ছে তাদের আবাসিক কার্যালয়ে এবং তা সাথে সাথে গৃহীতও হয়েছে। একটি স্থায়ী পার্বত্য নীতির অভাবেই এমনটি ঘটছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী-বাঙালি বিভেদের কথাই কেবল দেশবাসী জেনে আসছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আট লক্ষাধিক উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বড়জোর হাজার দশেক লোক এই বিভেদের সাথে জড়িত। এরা ইউপিডিএফ, জেএসএস’র সন্ত্রাসী ও মতলববাজ এনজিও কর্মী। বাকি সকল উপজাতি সদস্য কিন্তু শান্তিপ্রিয়, পাহাড়ী বাঙালি সহাবস্থানে বিশ্বাসী ও দেশপ্রেমিক। কিন্তু মুষ্টিমেয় সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের মুখে তারা বাধ্য হয় সন্ত্রাসীদের সেখানো বুলি প্রচার করতে, তাদের গাইডেড পথে চলতে। অথচ এই সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্র বিশেষে তারা বাঙালীদের থেকেও বেশি ঘৃণা করে। কারণ বাঙালিদের থেকে তারা আরো বেশি সন্ত্রাসের/ চাঁদাবাজির শিকার। সিএইচটিতে কর্মরত এনজিও কর্মীরা নানা কায়দার বিভেদ ছড়িয়ে দিয়ে একটি বাঙালী বিদ্বেষী প্রজন্ম সৃষ্টি করতে অপচেষ্ট। অথচ এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শান্তিপ্রিয় দেশপ্রেমিক উপজাতিদের নিরাপত্তা দিয়ে, ভালবেসে কাছে টানা হয়নি কখনো।বরং উপজাতি বলে সন্ত্রাসীদের পাল্লায় তুলে কেবল দূরেই ঠেলে দেয়া হয়েছে। সেখানে বিভেদের দশভূজা জাগ্রত কিন্তু শান্তির বীণাপাণি নিদ্রা যায়। কোনো কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে সরকারী পৃষ্টপোষকতায় সম্প্রীতি মিছিল চোখে পড়লেও সরকারী লোকেরা যেভাবে সে মিছিল চারপাশ থেকে ঘিরে রাখে তাতে সম্প্রীতির থেকে সংশয় চোখে পড়ে বেশী।
 
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বিভ্রান্তি দেশের বুদ্ধিজীবী মহলের মধ্যে বেশি। এদের বেশিরভাগই মনে করেন বাঙালি ও সেনাবাহিনী সেখানে যত সমস্যার মূল। সন্দেহ নেই, তাদের বিভ্রান্তি ভিত্তিহীন। কিন্তু সে বিভ্রান্তি অপনোদনের চেষ্টা রাষ্ট্রিয় পর্যায় থেকে কি যথাযথভাবে নেয়া হয়েছে? ঘটনার প্রেক্ষিতে মাঝে মাঝে সেখানে মিডিয়া টিম পাঠানো হয়, বুদ্ধিজীবীদের কাউকে অনুরোধ করে লেখানো হয়। কিন্তু এ দেশের কতজন মানুষ জানে পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন প্রেক্ষাপটে বাঙালিদের পাঠানো হয়েছে? কতজন জানে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি অবস্থানের গুরুত্ব? কতজন জানে সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে আসলে কি করে? তাদের সেবা, ত্যাগ, কমিটমেন্টের কথা কতো জনের মাঝে তুলে ধরা হয়েছে? কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবদান নিয়ে বলিউডে অনেক সিনেমা হয়েছে, হলিউডের কথা বললে তো একটি বই লেখা হয়ে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগের অনেক ঘটনা গল্প ও ছবিকে হার মানায়। কিন্তু তার কথা দেশের কতজন মানুষ জানে। একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি না থাকার কারণেই তা সম্ভব হয়নি।
 
কাজেই বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থির পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনো এডহক সিদ্ধান্তে সমাধান না খুঁজে একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি প্রণয়নের দিকে বেশি জোর দিতে হবে। সেখানে বসবাসকারী সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ,  সিভিল ও সামরিক প্রশাসন, বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিটির মাধ্যমে এ পার্বত্যনীতি প্রণয়ন করতে হবে- যা সব সরকার ও সব ব্যক্তির জন্য অনুসরণযোগ্য ক্ষেত্র বিশেষে বাধ্যতামূলক করতে হবে। এখনই সময়। কারণ লেটার ইজ বেটার দ্যান নেভার।  
Email:palash74@gmail.com, সৌজন্যে- দৈনিক ইনকিলাব। (ইষৎ পরিবর্তিত)

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

 

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

মেহেদী হাসান পলাশ, Mehadi Hassan Palash

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক-২

মেহেদী হাসান পলাশ

আদিবাসী বিষয়ে আভিধানিক সংজ্ঞার বাইরে জাতিসংঘের তরফ থেকে একটি সংজ্ঞা আমরা পেয়ে থাকি। এ বিষয়ে জাতিসংঘ ও এর অধিভূক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে এ পর্যন্ত প্রধানত: তিনটি চার্টারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এগুলো হলো: ১৯৫৭ সালের ৫ জুন অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের অধিভূক্ত প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ৪০তম অধিবেশনে প্রদত্ত-  Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107),  আইএলও’র ১৯৮৯ সালের ৭ জুন অনুষ্ঠিত ৭৬তম অধিবেশনে প্রদত্ত-Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169) ,  এবং ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে  The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples.
এখানে আইএলও’র প্রথম চার্টার দুটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। চার্টার দুটির শিরোনাম হচ্ছে- Indigenous and Tribal Populations Convention . অর্থাৎ আদিবাসী ও উপজাতি জনগোষ্ঠী  বিষয়ক কনভেনশন। অর্থাৎ এই কনভেনশনটি আদিবাসী ও উপজাতি বিষয়ক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। কনভেনশনে পাস হওয়া ধারাগুলো একই সাথে আদিবাসী ও উপজাতি  নির্ধারণ ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। শুধু আদিবাসীদের নয়। অথচ বাংলাদেশে এই চার্টারকে আদিবাসীদের জন্য এক্সক্লুসিভ করে উপস্থাপন করা হয়।

এখানে উপজাতি ও আদিবাসীদের জন্য আলাদা সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে।-  Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)–  এর আর্টিকল ১ এর (a)তে ট্রাইবাল বা উপজাতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘tribal peoples in independent countries whose social, cultural and economic conditions distinguish them from other sections of the national community, and whose status is regulated wholly or partially by their own customs or traditions or by special laws or regulations’’. অর্থাৎ  একটি দেশের মূল জনগোষ্ঠী থেকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্নতর যারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও আইন দ্বারা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে পরিচলিত তাদেরকে উপজাতি বলা হয়। এখন আইএলও’র এই সংজ্ঞাটি যদি আমরা বাংলাদেশের চাকমা, মারমা, সাঁওতাল ও অন্যান্য সাবস্পেসিসসমূহের সাথে বিচার করি তাহলে পরিষ্কার বোঝা যায় এরা উপজাতি। কিন্তু বাংলাদেশের মতলববাজ বুদ্ধিজীবীরা আইএলও কনভেনশনের আর্টিকল ১-এ্র উপস্থাপিত ট্রাইবাল ডেফিনেশনটি সম্পূর্ণ চেপে গিয়ে শুধু ইনডিজিন্যাসের সংজ্ঞাটি উপস্থাপন করে।

এখন আমরা ইনডিজিন্যাসের সংজ্ঞাটি বিশ্লেষণ করবো।  Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)– এর আর্টিকল ১-এর (b)তে ইনডিডজিন্যাস বা আদিবাসীর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, `peoples in independent countries who are regarded as indigenous on account of their descent from the populations which inhabited the country, or a geographical region to which the country belongs, at the time of conquest or colonization or the establishment of present state boundaries and who, irrespective of their legal status, retain some or all of their own social, economic, cultural and political institutions’.
অর্থাৎ আদিবাসী তারা যারা একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস করছে বা অধিকৃত হওয়া ও উপনিবেশ সৃষ্টির পূর্ব থেকে বসবাস করছে। এবং যারা তাদের কিছু বা সকল নিজস্ব সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত অধিকার ও প্রতিষ্ঠানসমূহ ধরে রাখে।
আইএলও কর্তৃক উপজাতি ও আদিবাসী সংজ্ঞার মূল পার্থক্য হচ্ছে নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস বা অধিকৃত হওয়ার বা উপনিবেশ সৃষ্টি পূর্ব থেকে বসবাস। বাকি শর্তগুলো মোটামুটি এক। অর্থাৎ একজন উপজাতি আদিবাসী হবেন বা হবেন না উপরোক্ত শর্তের ভিত্তিতে। এছাড়াও রয়েছে ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples চার্টার। এটি এক্সক্লুসিভলি আদিবাসীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট, উপজাতিদের নয়।

Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107)-  ১৯৫৭ সালে পাস হলেও এ পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২৭টি দেশ এই কনভেশন র‌্যাটিফাই করেছে। ১৯৭২ সালের ২২ জুন বাংলাদেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। বাংলাদেশের বাইরে উপমহাদেশের পাকিস্তান ও ভারত এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। যদিও এরই মধ্যে ৮টি দেশ এই কনভেনশকে নিন্দা করে তা থেকে বেরিয়ে গেছে। অন্য দিকে  Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)- – ১৯৮৯ পাস হলেও এখন পর্যন্ত বিশ্বের  মাত্র ২২টি দেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। এরমধ্যে কনভেনশন-১০৭ থেকে বেরিয়ে আসা ৮টি দেশও রয়েছে। উপমাহদেশের একমাত্র নেপাল ছাড়া আর কোনো দেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেনি। কনভেনশন- ১৬৯ অবশ্য ১০৭-এর মডিফিকেশন, তবুও তা আলাদা করে র‌্যাটিফিকেশন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক চার্টার কোনো দেশ র‌্যাটিফাই না করলে তা তার জন্য প্রযোজ্য নয়। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, আইএলও কনভেনশন ১০৭ ও ১৬৯ যে দেশগুলো র‌্যাটিফাই করেছে তাদের বেশিরভাগই আফ্রিকান ও দক্ষিণ আমেরিকান দেশ যাদের প্রধান বা অন্যতম প্রধান জনগোষ্ঠী বা গোষ্ঠীগুলো আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃত।
অন্যদিকে ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক একটি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এ ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করলে ১৪৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪টি দেশ বিপক্ষে, ১১টি দেশ ভোট দানে বিরত এবং ৩৪টি দেশ অনুপস্থিত থাকে। ভোট দানে বিরত থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিরুদ্ধে ভোট দেয়া দেশগুলো হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যাণ্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় খুব সোচ্চার ও পৃষ্টপোষক দেশগুলোর বেশিরভাগই কিন্তু নিজ দেশের জন্য আইএলও কনভেনশন ১০৭, ১৬৯ ও জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক চার্টারের সিগনেটরি বা ভোটদানকারী নয়। এ থেকেই নিজ দেশের আদিবাসীদের জন্য তাদের নিজেদের অবস্থান এবং অন্যদেশের ‘আদিবাসীদের’ জন্য কুম্ভিরাশ্রু বর্ষণের কারণ ও মতলব পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। উল্লিখিত চারটি দেশ শুধু ইউএন চার্টারের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে তাই নয় বরং অধিবেশনে তাদের প্রতিনিধিরা এই চার্টারের প্রবল সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছে।

এখন বিবেচনা করা যাক, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীসমূহ বাংলাদেশের বর্তমান ভূখণ্ড অধিকৃত হওয়ার পূর্ব থেকে বা প্রি-কলোনিয়াল কি-না? তবে এ আলোচনার পূর্বে একটি বিষয় নির্ধারণ করা জরুরি যে, বিবেচনাটি কি সম্পূর্ণ বাংলাদেশ ভূখণ্ডের উপর হবে, না বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ভিত্তিক হবে। কারণ অঞ্চলভিত্তিক হলে সেন্টমার্টিন দ্বীপে যিনি প্রথম বসতিস্থাপন করেছেন তিনিও বাংলাদেশের আদিবাসী। এবং আগামীতে যদি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে নতুন কোনো দ্বীপ সৃষ্টি হয় আর সেই দ্বীপে যারা বা যিনি নতুন বসতি গড়বেন তিনিও আদিবাসী হবেন। একইভাবে ঢাকার আদি বাসিন্দা যারা তারাও বাংলাদেশের আদিবাসী এবং যেসকল উপজাতি ঢাকায় নানাভাবে স্যাটেল করেছেন তারা স্যাটেলার। কারণ এই সংজ্ঞার উপাদানগুলো ইংলিশ OR  শব্দদ্বারা বা অথবা শব্দ দ্বারা বিভক্ত।
আর যদি সমগ্র বাংলাদেশ ভূখ- ধরা হয়, তবে বাংলাদেশের প্রথম উপনিবেশকারী হচ্ছে আর্যজাতি। আর্যরা উত্তর বঙ্গ দিয়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে। তখন বাংলাদেশ ভূখণ্ডে চাকমা, মারামা, গারো, হাজং, সাঁওতাল কারো অস্তিÍত্ব ছিল না। অর্থাৎ আর্যদের আগমনের পূর্বে এখানে যে অনার্য জনগোষ্ঠী বসবাস করতো তারা প্রি-কলোনিয়াল। আর্যদের আগমণের পূর্বে এখানকার অনার্য বাসিন্দারা প্রাকৃত ধর্মে বিশ্বাসী ছিল। আর্যদের প্রভাবে তারা সনাতন ধর্ম গ্রহণ করে। পরবর্তীতে হিন্দু রাজাদের নিকট থেকে বাংলা বৌদ্ধ রাজাদের দখলে যায়। বাংলাদেশে বৌদ্ধদের ইতিহাস সমৃদ্ধির ও গৌরবের ইতিহাস। বাংলা সাহিত্যের আদি কিতাব চর্যাপদ তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। পাল রাজারা বাঙালি ছিলেন, যেমন ছিলেন মহামতি অতীশ দীপঙ্কর। বাংলায় বৌদ্ধদের ইতিহাস আর চাকমাদের ইতিহাস এক নয়।

অন্যদিকে উয়ারী বটেশ্বরের সমৃদ্ধ নাগরিক সভ্যতার কথা কিম্বা মেগাস্থিনিস ও টলেমির কিতাবে গ্রীক বীর আলেকজাণ্ডরের মনে ভীতি ছড়ানো গঙ্গরিড়ঢ়ী সভ্যতার কথা যারা জানেন তারা কখনোই চাকমা মারমা সাঁওতালদের প্রি-কলোনিয়াল বলতে পারেন না। চাকমাদের আলোচনায় অনেকে বৌদ্ধ-মুসলিম ইতিহাস টানেন যা অপ্রয়োজনীয় কুতর্ক। সেন রাজাদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে বাংলায় মুসলিম আগমন বৌদ্ধ সম্প্রদায় কর্তৃক স্বাগত হয়েছিল। এক কথায় বাংলাদেশের প্রি কলোনিয়াল জনগোষ্ঠী হচ্ছে এখানকার অনার্য জনগোষ্ঠী, ইতিহাসবিদরা যাকে প্রাকৃতজন বা প্রাকৃত জনগোষ্ঠী বলে আখ্যা দিয়েছেন। শত শত বছর ধরে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিস্টান নানা ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যদিয়ে পরিবর্তিত হয়ে নানা ধর্মে বিভক্ত হয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি পরিচয়ে টিকে থাকা মূল জনগোষ্ঠী।

এখন খুব সংক্ষেপে আইএলও কনভেনশনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্য, আইন ও রাজনৈতিক বিষয়ের দিকে আলোকপাত করা যাক। বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীগুলো শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক ও আইনি কাঠামো মেনে চলছে না। একই সাথে পরির্বতন এসেছে ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ধারাতেও। রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের রাজনৈতিক অবস্থানেরও পরিবর্তন হয়েছে। শুরুতেই চাকমাদের নিয়ে কথা বলা যায়। চাকমাদের নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক কাঠামো কোনো কালে ছিল বলে ইতিহাসে প্রমাণিত নয়। বর্তমানে চাকমারা প্রাচীনকালের বিভিন্ন চাকমা রাজার নানা বীরত্বগাথার কথা বলে থাকেন। চাকমাদের লেখা বইতেই বলা হচ্ছে, এগুলো কিংবদন্তী। কিংবদন্তী ইতিহাসের উপাদান হিসেবে গণ্য হতে পারে কিন্তু ইতিহাস হিসেবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত নয়। মোগল আমলে বিভিন্ন মুসলিম নামধারী চাকমা রাজার ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু তারা মোগল সুবাদার, চাকমা নয়। চাকমারা তাদের রাজা মেনে নিয়েছিল ও মানতে বাধ্য হয়েছিল। আজকের চাকমা রাজার কাঠামোটি ব্রিটিশদের দেয়া। এর প্রকৃত নাম সার্কেল চিফ। কার্যত তা কালেক্টর বা প্রধান খাজনা আদায়কারী। মোগল বা ব্রিটিশরা তাদের রাজা বলে কোনো সনদ দেয়নি। ব্রিটিশ সরকার সমতলের জমিদারদের জমিদারী দিলেও সার্কেল চিফদের জমির মলিক ছিল ডিস্ট্রিক্ট সুপরিন্টেন্ড তথা সরকার। কিন্তু খাজনা আদায়ের দায়িত্ব পেয়ে চাকমা সার্কেল চিফ নিজেকে সামন্ত রাজায় পরিণত করেন খাজনা আদায়ের নানা আচার যোগ করে। সাম্যবাদী এমএন লারমা শুরুতে এই সামন্ততন্ত্রের শোষণ থেকে উপজাতীয় জনগণকে মুক্তি দিতে সমাজতান্ত্রিক (বামধারা) আন্দোলন শুরু করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু সাংবিধানিক ভুল না করলে এমএন লারমাকে বিশ্ব হয়তো সাম্যবাদী নেতা হিসেবেই চিনতো। কিন্তু ’৭২-এর সংবিধান ইতিহাসের গতি পাল্টে দিলেও সন্তু লারমা ও দেবশীষ রায়ের সেই দূরত্ব এখনো বিদ্যমান ভেতরে ভেতরে। কিন্তু এমএন লারমার প্রতিষ্ঠিত জেএসএস বা পরবর্তীকালের ইউপিডিএফ কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর রাজনৈতিক কাঠামো নয়, এটি অঞ্চলভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামো। তাছাড়া সকল উপজাতি সম্প্রদায়ের লোকেরাই এখন বিএনপি, আওয়ামী লীগের মতো বাংলাদেশের মূল ধারার রাজনীতির সাথে জড়িত। এভাবেই চাকমা সমাজদেহেও নানা পরিবর্তন এসেছে।

অন্যদিকে উপজাতীয় সংস্কৃতি প্রধানত ধর্ম থেকে উৎসারিত। কিন্তু বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা বাদে অন্যান্য উপজাতীয় জনগোষ্ঠী গড়ে ৯০ ভাগ ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে। মারমা ও ত্রিপুরাদের মধ্যেও প্রায় ৫০ ভাগ খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে। চাকমাদের ক্ষেত্রে এই হার কিছুটা কম। কিন্তু চাকমাদের আদি ধর্ম বৌদ্ধ নয়। ব্রিটিশ আমলে রানী কালিন্দী রায়ের বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করার আগে চাকমা রাজারা মুসলমান ছিল। মোগল আমলের পূর্বে তাদের নিজস্ব ধর্ম পালন করতো। এভাবে ধর্ম পরিবর্তনের সাথে সাথে উপজাতি জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচার, রীতিতে পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষা, অর্থনীতি ও প্রযুক্তির প্রভাবেও পাল্টে গেছে জীবনযাপনও। কয়েকটি অনুষ্ঠান ছাড়া নাগরিক ও সচ্ছল উপজাতিদের নিজস্ব পোশাকের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায় না। সেখানকার মিশনারীরাও ধর্মান্তরিত উপজাতিদের পূজা আর্চায় বাধা দেয় না ‘আদিবাসী’ তকমা ধরে রাখার জন্য।

মাইকেল সঞ্জীব দ্রং আদিবাসী নেতা হতে পারেন কিন্তু কোনো উপজাতি যদি ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেন তাহলে তিনি আদিবাসী হওয়ায় যোগ্যতা হারান। যদিও খ্রিস্ট ও বৌদ্ধ ধর্ম সংখ্যাতাত্তিক বিচারে ইসলামের থেকে বৃহৎ ধর্ম। একইভাবে নিজস্ব বর্ণমালার কথা বলে বাংলা বর্ণমালা বর্জন করলেও ইউরোপীয় বর্ণমালাতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। যদি আদিম পদ্ধতিতে জীবনযাপনের কথা বলা হয়, তাহলে পৃথিবীর আদিম পেশা হচ্ছে কৃষি ও শিকার। সে বিচারে বাংলার কৃষক ও জেলেদের আদিবাসী বলতে হয়। এককথায় সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিচারেও বাংলাদেশের উপজাতিরা আদিবাসী নয়।

এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি জনগোষ্ঠীর একটা বিপুল অংশ নিজেদের আদিবাসী মনে করেন না। পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফ এই আদিবাসী তত্ত্বে বিশ্বাসী নয়। তারা আদিবাসী দিবস পালনও করে না। ইউপিডিএফ’র অন্যতম শীর্ষ নেতা উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা এক সাক্ষাৎকারে আমাকে একথা পরিষ্কার করে বলেছিলেন তারা আদিবাসী কনসেপ্টে বিশ্বাসী নন। তবে উপজাতি শব্দের প্রতিও তাদের আপত্তি আছে। তাদের মতে বাংলাদেশে অনেক জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে। যেমন বাঙালি একটি জাতি তেমনি চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা প্রভৃতিও এক একটি জাতি। সন্তু লারমার ঘনিষ্ঠদের সাথে কথা বলে জেনেছি, তিনিও শুরুতে এই আদিবাসী কনসেপ্টের সাথে একমত ছিলেন না। এখনও তার কাছে এটি মুফতে পাওয়ার মতো একটি বিষয়। আদিবাসী বিষয়টি একান্তভাবে সার্কেল চীফ দেবাশীষ রায়ের কনসেপ্ট।

কাজেই জাতিসংঘ ও আইএলওর সংজ্ঞার অপব্যাখ্যা বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীদের আদিবাসী বানানোর কোনো সুযোগ নেই। বরং ওইসব কনভেনশন ও চার্টার অনুযায়ী ট্রাইবাল বা উপজাতির যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা বিচার করেই নিশ্চিতভাবে বলা যায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো উপজাতি। একই কারণে আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘ চাটার বাংলাদেশের উপজাতিদের জন্য প্রযোজ্য নয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের উপজাতিদের আদিবাসী হিসেবে মেনে নিলে সমস্যা কোথায়? কিম্বা এই আদিবাসী বিতর্কের সমাধানই বা কিভাবে সম্ভব? সেটা এক বিস্তর আলোচনা হবে অন্য কোনো দিন।

সৌজন্যে- দৈনিক ইনকিলাব।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

 

 

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

মেহেদী হাসান পলাশ, Mehadi Hassan Palash

মেহেদী হাসান পলাশ

আগামীকাল ৩ আগস্ট এ বছরের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের মূল অনুষ্ঠান পালিত হবে বাংলাদেশে। ঈদের ছুটির কারণে কেন্দ্রীয়ভাবে ৯ আগস্টের বদলে আদিবাসী দিবসের কর্মসূচি কিছুটা এগিয়ে এনে পালন হচ্ছে। জাতিসংঘ ঘোষিত আদিবাসী দিবসে এবারের শ্লোগান হচ্ছে, “আদিবাসী জাতিসমূহের অধিকার সংক্রান্ত সকল চুক্তি ও অঙ্গীকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন!”

ঢাকা রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে দিবসের কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন রাশেদ খান মেনন, এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন আদিবাসী ফোরামের সভাপতি ও পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা।

বিশ্ব আদিবাসী দিবসকে সামনে রেখে আবার নতুন করে আলোচিত হচ্ছে বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্কটি। বাংলাদেশে আদিবাসী কারা- এই বিতর্কটি খুব প্রাচীন নয়, বড়ো জোর এক দশকের। ইস্যুটি পুরাতন না হলেও তা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাস, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বকে নাড়া দিয়েছে। জাতীয় সংহতির প্রশ্নে তাই এ বিতর্কের আশু সমাধান জরুরি।

বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর যে অংশটি নিজেদের হঠাৎ আদিবাসী বলে দাবী করতে শুরু করছে তারা কিন্তু বছর দশেক আগেও নিজেদের এ পরিচয়ে পরিচিত করাতে চায়নি। উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা বা নিজ জাতির পরিচয়েই তারা পরিচিত হতে চেয়ে দাবী করে আসছিল দীর্ঘ দিন ধরে। এরকম হঠাৎ করে আদিবাসী হয়ে যাওয়ার নজির বিশ্বে আর নেই। আদিবাসী জনগোষ্ঠী হিসাবে বিশ্বে যারা সুপরিচিত, যেমন, অস্ট্রেলিয়ার এবরিজিন, যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ান, নিউজিল্যান্ডের মাউরি, দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা প্রভৃতি সুপ্রাচীন কাল থেকেই আদিবাসী হিসেবে বিশ্বে সুপরিচিত। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কিছু অংশ যারা ১৯৯৭ সালেও নিজেদের উপজাতি বলে জাতীয়ভাবে পরিচিত করিয়েছে তারা হঠাৎ করে সেলফ প্রমোশন নিয়ে একবিংশ শতকের শুরু থেকে নিজেদের আদিবাসী বলে দাবী করতে শুরু করে। এমনকি দেশের মধ্যে বসবাসকারী যাযাবর ও তফসিলী সম্প্রদায়গুলোকেও তারা আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত করে নিয়েছে। আর এভাবে দাবী করা হচ্ছে বাংলাদেশে ৭৫টি (মতান্তরে ৪৫টি) আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে।

বাংলাদেশের  আত্মঘাতী মিডিয়া ও সুশীল সমাজের একটি অংশের জোরালো সমর্থন ও আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে তারা এরই মধ্যে সরকারের উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে একক বাঙালী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী সরকারও তাদের দাবীর কাছে আংশিক নতি স্বীকার করে সংবিধানে তাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আর এই সুযোগে তফসিলী সম্প্রদায়ভুক্ত জনগোষ্ঠী (উপজাতি বা ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা হবার বৈশিষ্ট্যধারী নয়) নিজেদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা হিসেবে স্বীকৃতি মুফতে পেয়ে গেছে। অথচ একই জনগোষ্ঠীগুলো মূল অংশ ভারতে এখনো সাংবিধানিকভাবে তফসিলী সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত ও সুবিধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।

আদিবাসী বিতর্কের সমাধানে প্রথমেই আমাদের আদিবাসীর সংজ্ঞা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। আদিবাসী বিষয়ে দুধরণের সংজ্ঞা পাওয়া যায়। একটি আভিধানিক সংজ্ঞা এবং অন্যটি জাতিসংঘের অধীনস্ত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত সংজ্ঞা- যা জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত। প্রথমেই আমরা আভিধানিক সংজ্ঞা নিয়ে আলোচনা করতে পারি।

 আদিবাসীর সংজ্ঞা কী?

আদিবাসী শব্দের ইংলিশ প্রতিশব্দ Indigenous people.  অনেকে আদিবাসী শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে Aborigine ব্যবহার করেন। কিন্তু Aborigine বলতে সার্বজনীনভাবে আদিবাসী বোঝায় না। Aborigine বলতে সুনির্দিষ্টভাবে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের বোঝায়। অক্সফোর্ড ডিকশনারীতে Aborigine  শব্দের অর্থ বলা হয়েছে Ôa member of a race of people who were the original living in a country, especially AustraliaÕ. একইভাবে Red Indian বলতে মার্কিন আদিবাসীদের বোঝায়, অস্ট্রেলীয় Aborigine বা আদিবাসীদের বোঝায় না। এ ছাড়াও বিভিন্ন ডিকশনারীতে আদিবাসী বিষয়ে যে সংজ্ঞা ও প্রতিশব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা নিম্নরূপ:

Aborigine: noun. a member of a race of people who were the original living in a country, especially Australia. Indigenous: belonging to a particular place rather than coming to it from some where else. Native. The indigenous people/ indigenous area. Aborigine: earliest. Primitive. Indigenous. Indigenous: adj. Native born or produced naturally in a country, not imported (opposite to exotic).

 অন্যদিকে বাংলা একাডেমীর অভিধানে Indigenous শব্দের অর্থ বলা হয়েছে: দেশী, দৈশিক, স্বদেশীয়, স্বদেশজাত। কোলকাতা থেকে প্রকাশিত সংসদ অভিধানে Indigenous শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে, স্বদেশজাত, দেশীয়। আবার চেম্বার্স ডিকশনারীতে Indigenous শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে, native born, originating or produced naturaly in a country, not imported. একই ডিকশনারীতে Indigenous শব্দের বিপরীত শব্দ হিসেবে exotic শব্দটিকে ব্যবহার করা হয়েছেÑ যার অর্থ বহিরাগত। অর্থাৎ অভিধানিকভাবে আদিবাসী শব্দের অর্থ দেশী, স্বদেশজাত বা ভূমিপুত্র।

 এখন ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার বাংলাদেশে যারা নিজেদের আদিবাসী বলে দাবী করছেন তারা কতোটা ‘স্বদেশজাত’ বা ‘ভূমিপুত্র’।

ইতিহাসের এই বিশ্লেষণে দেশী বিদেশী অনেক পুস্তকের রেফরেন্স নেওয়া যায়, কিন্তু এ আলোচনায় মাত্র দুটি পুস্তককে রেফরেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হলো। এর একটি হলো বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রণীত বাংলা পিডিয়া এবং বাংলাদেশ আদিবাসী অধিকার আন্দোলন কর্তৃক প্রণীত বাংলাদেশের আদিবাসীঃ এথনোগ্রাফীয় গবেষণা।

এ বই দুটি নির্বাচনের কারণটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাপিডিয়াতে এ সংক্রান্ত এন্ট্রির শিরোনাম ‘আদিবাসী’- রচয়িতা বাংলাদেশের আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক, আদিবাসী বিষয়ক জাতীয় কোয়ালিশনের মুখপাত্র, আন্তর্জাতিক সিএইচটি কমিশনের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল। অন্যদিকে দাতা সংস্থা অক্সফামের সহায়তায় বাংলাদেশের আদিবাসী অধিকার আন্দোলন কর্তৃক প্রকাশিত তিন খণ্ডের বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা বইটির প্রথম খণ্ডের গবেষণা ও সম্পাদনা করার কাজটি করেছেন, মঙ্গল কুমার চাকমা, জেমস ওয়ার্ড খকশী, পল্লব চাকমা, মংসিংঞো মারমা, হেলেনা বাবলি তালাং। পুস্তকটির ৫ সদস্যের রিভিউ কমিটির মধ্যে আছেন বাংলাদেশে আদিবাসী আন্দোলনের প্রবর্তক ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায় এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিব দ্রং। লেখার পরিসর চিন্তা করে এ লেখায় শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠিগুলোর ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হলো।

 চাকমা

1356_487607401320978_1904084497_n

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ভিন্ন ভাষাভাষী আদিবাসী দাবীদার জুম্ম জনগোষ্ঠীর অন্যতম চাকমা জনগোষ্ঠী।  তিন পার্বত্য জেলাতেই চাকমাদের বসবাস রয়েছে। চাকমারা বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী উপজাতীয় জনগোষ্ঠী। তবে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় সবচেয়ে অধিক চাকমা বসবাস করে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিন পার্বত্য জেলায় চাকমাদের  মোট জনসংখ্যা ২,৩৯,৪১৭ জন । ঐ সময় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ভারতের  ত্রিপুরা  রাজ্যে প্রায় ৬০ হাজার চাকমা শরণার্থী হিসেবে অবস্থান করছিল বলে অভিযোগ করা হয়ে থাকে- যাদের গণনায় অর্ন্তভুক্ত করা হয়নি। বাংলাপিডিয়া মতে, আনুমানিক ১৫৫০ খ্রিষ্টব্দের দিকে পর্তুগিজ মানচিত্র প্রণেতা লাভানহা অঙ্কিত বাংলার সর্বাপেক্ষা পুরাতন ও এ পর্যন্ত অস্তিত্বশীল মানচিত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই চাকমাদের সম্পর্কে উল্লেখ পাওয়া যায়। কর্ণফুলীর নদীর তীর বরাবর চাকমাদের বসতি ছিল। চাকমাদের আরো আগের ইতিহাস সম্পর্কে দুটি তাত্ত্বিক অভিমত প্রচলিত। উভয় অভিমতে মনে করা হয়, চাকমারা বাইরে থেকে এসে তাদের বর্তমান আবাসভূমিতে বসতি স্থাপন করে। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তাত্ত্বিক অভিমত অনুযায়ী, চাকমারা মূলত ছিল মধ্য মায়ানমারের আরাকান এলাকার অধিবাসী। তবে বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে, কিংবদন্তী অনুযায়ী অতীতে চাকমারা চম্পকনগর নামে একটি রাজ্যে বাস করত। চম্পক নগর ত্রিপুরা রাজ্যেরই কাছাকাছি কোন জায়গায় অবস্থিত ছিল।  এ ব্যাপারে নানা সাক্ষ্যও পাওয়া যায়। অশোক কুমার দেওয়ানের অনুমানে উত্তর ত্রিপুরার কোন স্থানে বসবাসকারী চাকমারা সেখানে আনুমানিক দুশ থেকে আড়াইশ বছর কাল অতিবাহিত করার পর পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে উত্তর ত্রিপুরা থেকে দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পূর্বদিকে সরে আসতে থাকে এবং পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকেই পার্বত্য চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এবং তার উপনদীসমূহের উপত্যকা ভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে। এই হিসাব অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমাদের আগমন ৫০০ বছরের বেশি নয়।

চাকমা রাজবংশের ইতিহাস অনুযায়ী বিজয়গিরিকে ১ম রাজা ধরলে ৩২/৩৩ তম রাজা হচ্ছেন অরুণযুগ (ইয়াংজ )। তার শাসনকাল আনুমানিক ১৩১৬ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১৩৩৩ খ্রিষ্টাব্দ। চাকমা ঐতিহাসিকদের মতে অরুণ যুগের পতনের পরপরই অর্থাৎ ১৩৩৩ খ্রিষ্টাব্দে চাকমারা বার্মা থেকে চট্টগ্রামে বা পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমন করেন ।

খুমি

পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি এই তিন উপজেলায় খুমীরা বসবাস করে। ২০০৬ সালে সিঅং খুমী ( একজন সাংস্কৃতিক কর্মী) এর নেতৃত্বে এক জরিপ পরিচালনা হয়েছিল। সে জরিপ অনুযায়ী খুমী জনসংখ্যা  ছিল ২০৯৪ জন ।

বাংলাপিডিয়া মতে, সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিকে খুমিরা আরাকান থেকে বাংলাদেশে আসে। খ্যাং উপজাতি তাদেরকে আরাকান থেকে বিতাড়ন করে। তবে এখনো কিছু খুমি আরাকানের কোলাদাইন নদীর তীরে বসবাস করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে, খুমি আদিবাসীরা মূলত মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীভুক্ত একটি দল। তারা তিব্বতি বার্মিজ-কুকি-চীন ভাষায় কথা বলে। বাংলাদেশে খুমি নৃ-গোষ্ঠীর আগমন বার্মার চীন প্রদেশ থেকে। এই চীন হিলস প্রদেশ ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭ সালে আরাকান প্রদেশ থেকে আলাদা হয়ে নামকরণ করা হয় চায়না হিলস। অনেকের মতে, সতের শতকের মাঝামাঝি সময়ে খুমীরা চায়না হিল (তৎকালীন সময়ে আরাকান প্রদেশ নামে পরিচিত) থেকে এসে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করে। খুমি আদিবাসীরা সার্মথাং(Samthang) গোত্রের পূর্ব-পুরুষদের মৌখিক (অলিখিত) ইতিহাস থেকে জানা যায় যে খুমিরা বাংলাদেশে আট পুরুষ(বংশধর) ধরে বসবাস করছে ।

চাক

বান্দরবান পার্বত্য জেলার ৭টি উপজেলার মধ্যে সর্বদক্ষিণ প্রান্তে মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশের সীমানা বরাবর অবস্থিত নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় চাকদের আবাসস্থল। ১৯৯১ সালের আদমশুমারী প্রতিবেদন অনুসারে চাকদের লোকসংখ্যা ২০০০ জন । বাংলাপিডিয়া মতে, কয়েক শতাব্দি আগে মায়ানমারের ইরাবতী নদীর উজান অঞ্চল থেকে এরা আরাকান দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে। অন্যদিকে বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে, বাংলাদেশের বাইরেও বিভিন্ন দেশে যেমন: ভারতের মনিপুর ও অরুণাচল, মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশ, মধ্য বার্মা (রোহমা পর্বতের পাদদেশে ), উত্তর ও দক্ষিণ বার্মা এবং লাওসে বিচ্ছিন্নভাবে চাক জনগোষ্ঠীর বংশভুক্ত প্রাচীন আদিবাসী আছে। ইতিহাসে জানা যায়, হিমালয়ের দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলের পামির মালভূমি চাকদের উৎপত্তিস্থল । ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে চাকরা বংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চলে বসতি গড়ে তোলে। প্রায় তিনশত বছর আগে (সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ্বে) ক্যউ বলী নামে এক পরাক্রমশালী চাক ব্যক্তির নেতৃত্বে গুটিকয়েক পরিবার নিয়ে বর্তমান বাইশারীতে চাষাবাদ ও ক্ষেত খামার শুরু করে। পরবর্তীতে  ম্রাসাঅং রোয়াজা, ধুংরী মহাজন, ক্যজরী মহাজন, থোয়াইঅং মহাজন, অংগাইজাই চাক প্রমুখ ব্যক্তিগণ ও বাইশারীতে এসে ক্যউ বলীর সাথে একত্রিত হয় এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্ম আজ পর্যন্ত ঐ খানে বাস করছে।

ত্রিপুরা

বাংলাদেশের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস করে। তিন পার্বত্য জেলা ছাড়াও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী সমতল এলাকার কুমিল্লা, সিলেট, বৃহত্তর চট্টগামের বিভিন্ন উপজেলা, রাজবাড়ি, চাঁদপুর, ফরিদপুর ইত্যাদি অঞ্চলেও বর্তমানে বসবাস করে। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে একসময় ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী যে সবর্ত্র ছিল ১৮৭২ ও ১৮৮১ সালের আদমশুমারী প্রতিবেদন পরীক্ষা করলে তার প্রমাণ মেলে। ১৮৭২ সালে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মোট সংখ্যা ছিল ১৫,৬৩২ জন যা ১৮৮১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৮,৫০৯ জনে। বর্তমানে বাংলাদেশে ত্রিপুরাদের জনসংখ্যা অনেকেই মনে করেন দুই লক্ষের কাছাকাছি। তার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে ত্রিপুরাদের জনসংখ্যা দেড় লক্ষাধিক। বাংলাপিডিয়া মতে, এরা ছিল বর্তমান বারীয় রাজ্য ত্রিপুরার পার্বত্য এলাকার অধিবাসী। পরবর্তীতে এরা নিজ এলাকা ছেড়ে বাংলাদেশের মূলত কুমিল্লা, সিলেট এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বসতি স্থাপন করে। অনেকের মতে, টিপরারা আসাম, বার্মা এবং থাইল্যাণ্ডের অধিবাসী সাধারণ এক উপজাতির পূর্বপুরুষ বডো জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে, এ জাতির মূল অংশ বাস করছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে। ত্রিপুরা রাজ্য ছাড়াও ভারতের মিজোরাম , আসাম প্রভৃতি প্রদেশেও অনেক ত্রিপুরা বাস করে। মিয়ানমারেও ত্রিপুরাদের জনবসতি আছে বলে জানা যায়। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ইতিহাস থেকে জানা যায় আনুমানিক ৬৫ খ্রিস্টাব্দে সুই বংশের সময়কালে পশ্চিম চীনের ইয়াংসি ও হোয়াংহো নদীর উপত্যাকা হচ্ছে এদের প্রাচীন আবাসস্থল। পরবর্তীতে এই জনগোষ্ঠী ভারতের আসাম হয়ে বর্তমান বসতি অঞ্চলে বসতি গড়ে তোলে এবং রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে  বলে ইতিহাস সূত্রে জানা যায়।

 পাঙ্খো

 সাধারণত পাঙ্খোয়ারা উঁচু পাহাড়ের উপরে বসবাস করতে পছন্দ এবং সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় বিলাইছড়ি ইউনিয়নে পাঙ্খোয়া পাড়া এবং বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলার সাইজাম পাড়া ও নানখারপাড়া (বড়থুলী) প্রভৃতি স্থানে পাংখোয়াদের বসবাস রয়েছে। রাঙ্গামাটি সদর থানার কর্ণফুলী নদীর পূর্ব পাড়ে ১৬১০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট বসন্তমোন- এ অবস্থিত পাংখোয়া পাড়াটি সবচেয়ে পুরোনো। ২০০ বছরেরও আগে তারা এখানে বসতি স্থাপন করে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী পাংখোয়া জনসংখ্যা ৩২২৭ জন। তবে বর্তমানে পাংখোয়াদের মোট জনসংখ্যা ৪০০০ জন হতে পারে  বলে পাংখোয়ারা মনে করে। 

বাংলাপিডিয়া মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের এই উপজাতিকে মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর একটি উপশাখা বলে মনে করা হয়। এদের আদি নিবাস সম্ভবত ব্রহ্মদেশ(মায়ানমার)। সেখান থেকে কোনো কারণে বিতাড়িত হয়ে কয়েকশ’ বছর আগে তারা এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছে। বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে, পাংখোয়াদের বিশ্বাস অতীতে তারা লুসাই পাহাড়ের পাংখোয়া নামক কোন গ্রাম থেকে এসেছিল। মিজোরাম প্রাদেশিক দলিলপত্র ও মানচিত্রে ৫৬১১ নং পাংখোয়া গ্রামটির চিহ্ন উল্লেখ পাওয়া  যায়।  তারা বিশ্বাস করে যে, তারা বার্মার শান জাতির অংশ এবং দক্ষিণ দিক থেকে তারা এসেছিল।  তাদের মূল আবাসভূমি বর্তমান মিয়ানমারের চীন প্রদেশ। পণ্ডিতদের মতে, পাংখোয়ারা সেই অঞ্চল থেকে সরে এসে ক্রমান্বয়ে আরাকান ওলুসাই হিলসে বসতি স্থাপন করে এবং কালক্রমে ধীরে ধীরে  জীবন জীবিকার সন্ধানে পাংখোয়াদের একটি অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে।

 মগ

মারমা সম্প্রদায়ের অনেকের মতে মগ কোনো সতন্ত্র উপজাতি নয়, আরাকানবাসীর একটি উচ্ছৃঙ্খল দল মাত্র। ১৭৮৪ সালে বার্মা কর্তৃক স্বাধীন আরাকান রাজ্যের পতনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে মগদের বসতি গড়ে ওঠে। বার্মার সাথে আরাকানের সংযুক্তির পর বার্মার রাজা বোদাওপা এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। এর ফলে আরাকানের জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশ বাংলার দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে দেশান্তরিত হয়। ব্রিটিশ সরকার তাদের পুনর্বাসনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বার্মার এক সাবেক নৌ অফিসার ক্যাপ্টেন এইচ কক্সকে মগ বসতির জন্য তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করা হয়। তার নামানুসারে বাংলাদেশের সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের নামকরণ করা হয়। মগদের এরূপ আশ্রয় দান, ও তাদের লুটতরাজের ফলে ১৯২৪-১৯২৫ সালে প্রথম ইঙ্গ বার্মিজ যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যাতে বার্মা পরাজিত হয় এবং ১৮২৬ সালের ইয়ানদাবু চুক্তির ফলে আরাকান ও তেনাসারিম অঞ্চল ব্রিটিশ শাসনভুক্ত হয়। এর ফল স্বরূপ, আরাকান থেকে দ্বিতীয় দফায় মগদের দেশত্যাগ আরম্ভ হয়, আরাকান থেকে দ্বিতীয় দফায় মগদের দেশত্যাগ আরম্ভ হয়, আরাকান থেকে আগত শরণার্থীরা চট্টগ্রাম জেলার দক্ষিণ অঞ্চলে একটা স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে নেয়। ক্রমে মাতামুহুরী উপত্যকার মধ্য দিয়ে তারা বান্দরবানে ছড়িয়ে পড়ে। তৃতীয় দলটি সীতাকুণ্ডু অঞ্চল থেকে খাগড়াছড়িতে প্রবেশ করে। চতুর্থ দলটি বঙ্গোপসাগর অতিক্রম করে বৃহত্তর পটুয়াখালীর দক্ষিণ অঞ্চলে পৌছে এবং সেখানে বসতি গড়ে তোলে।

 মারমা

 তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে মারমাদের সবচেয়ে বেশি লোক বান্দরবান জেলায় বাস করে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারী অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত মারমা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হচ্ছে ১,৪২,৩৩৪ জন।  বাংলাপিডিয়া মতে, মারমা শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে বার্মিজ শব্দ ‘মায়ানমা’ থেকে, যার অর্থ বার্মার অধিবাসী। মারমা জনগণের পূর্ব পুরুষগণ বার্মার পেগু নগরে বসবাস করতেন। আরাকান রাজার সেনাবাহিনীর অধিনায়ক মহাপিন্নাগি ১৫৯৯ সালে বার্মায় একটি আগ্রাসন পরিচালনা করেন। তখন তারা বঙ্গীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে, ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে আরাকানের রাজা শ্রী সুধাম্মার ( শ্রীসুধর্ম ) মৃত্যুর পর তার এক অমাত্য নরপতি আরাকানের সিংহাসন দখল করে রাজপরিবারের সদস্য ও পণ্ডিতদেরকে মৃতুদণ্ড দিতে থাকলে অনেকেই দেশ ছেড়ে পালাতে থাকে। দেশের এই রাজনৈতিক দুর্যোগের সময় রাজার পুত্র নাগাথোয়াইখিন রাজপরিবারের সদস্যবর্গ ও পণ্ডিতদের নিয়ে রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যান। এসময় তিনি চট্টগ্রামের কাইসাঁ জায়গায় আশ্রয় নেন। প্রায় ৫০০০০ সৈন্য তাকে অনুসরন করে। কাইসাঁ  বা কর্ণফুলী নদীর তীরে বাস করতে থাকে।  নাগাথোয়াইখিন কাইঁসা অঞ্চলের শাসক  হিসেবে  বা  ম্রাইমাগ্রি মাঙঃ বা ম্রাইমাগ্রিদের রাজা  হিসেবে পরিচিতি পান। আরাকানের নতুন রাজা নাগাথোয়াইখিন এর অবস্থান জানার পর শত্রুতার পথে না গিয়ে তাকে কাইসাঁ অঞ্চলের শাসক হিসেবে স্বীকিৃতি দেন।১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকা থেকে আরাকানি শাসনের পতন হলে মোগল শাসণাধীনে মারমাদের পেলেংসা: গোত্র মোগলদের কর প্রদানের  মাধ্যমে নিজেদের স্থায়ী আবাসভূমি গড়ে তুলেছিল। ১৭৮২  সালের দিকে তারা পেলেংসা: রাজবংশের পূর্বসূরী ম্রাচাই ধাবইং এর নেতৃত্বে সীতাকুন্ড এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ধাবইং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে কার্পাস মহলের কর আদায়ের চুক্তি অনুসারে ঐ এলাকার চিফ পদ লাভ করেন।

 মুরং

তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে ম্রোরা শুধু বান্দরবান জেলায় বাস করে। মুরংরা ছিল আরাকানের একটি সুপরিচিত জনগোষ্ঠী। দুই মুরং রাজা আ-মিয়া-থু(৯৫৭)এবং পাই ফ্যু(৯৬৪) দশম শতাব্দিতে আরাকান শাসন করেন। সে সময় আরাকানের রাজধানী ছিল ওয়াথালি। কোলাদাইন নদীর তীরে খুমি উপজাতির সঙ্গে মুরংদের এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছিল। যুদ্ধে খুমিরা মুরংদের পরাজিত করে আরাকান থেকে বিতাড়ন করে। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে মুরংরা পার্বত্য চট্টগ্রামে চলে আসে। আরাকন রাজাদের ধারা বিবরণী রাজওয়াং-এ বলা হয়েছে দ্বাদশ শতাব্দিতে আরাকানের রাজা দা থা রাজাকে(১১৫৩-১১৬৫) ‘মহামুণি মূর্তির’ অবস্থান খুঁজে বের করতে দু’জন ম্রো সাহায্য করেছিলেন। চতুর্দশ শতকে খুমি নামে একটি শক্তিশালী উপজাতি ম্রোদের আরাকান থেকে বিতাড়িত করলে তারা বান্দরবানের পার্বত্য অঞ্চলে চলে আসে এবং মাতামুহুরী নদীর তীর বরাবর সাঙ্গু উপত্যকার পশ্চিমে বসতি স্থাপন শুরু করে। তৎকালীন বার্মা রাজা কর্তৃক চট্টগ্রামের জেলা প্রধানের কাছে লিখিত এক চিঠিতে এর সমর্থন পাওয়া যায়। বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে,  ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের মতে, ম্রো (মুরং) নামে একটি জনজাতি যারা পূর্বে আরাকান হিলস-এ বাস করত তারা প্রধানত এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের সাঙ্গু নদীর পশ্চিমে এবং মাতামুহুরী নদী বরাবর বাস করে। তারা নিশ্চিত করে খুমিরা তাদের আরাকান থেকে বের করে দেয়।  মুরংরা বর্তমানে বোমাং রাজার প্রজা। বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক স্যার আর্থার ফেইরি তার বিখ্যাত  ‘বার্মার ইতিহাস’ গ্রন্থে জানান যে, এটা একটি জনজাতি বর্তমানে তাদের প্রাচীন রাজ্য থেকে কমে গেছে। তারা এক সময় কোলদান নদী ও এর উপনদীতে বাস করত। কিন্তু খুমি জনজাতি কর্তৃক ধীরে ধীরে বিতাড়িত হয়ে তারা পশ্চিমে স্থানান্তর হয়েছিল এবং আরাকান  ও চট্টগ্রাম সীমান্তবর্তী এলাকায় বসতি গড়ে তোলে।

 লুসাই

লুসাইগণ বর্তমানে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার বাঘাইছড়ি থানার সাজেক উপত্যাকায় বাস করে। তবে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলায়ও খুব অল্প সংখ্যক লুসাই বাস করে। সিলেট জেলাতে ও লুসাইদের বসবাস রয়েছে। বাংলাদেশের লুসাইদের সংখ্যা আনুমানিক ১০০০-এর মত। বাংলাপিডিয়া মতে, লুসাইদের পূর্বপুরুষরা মিজোরামে তাদের আধিপত্য বিস্তার করে, সেখান থেকেই তাদের কোনো কোনো দল বিভিন্ন সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছিল। একই সময়ে তাদের স্বগোত্রীয় লোকজন বার্মায়ও গিয়ে পৌঁছে। বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকে লুসাইদের বিষয়ে বলা হয়েছে, লুসাই হিল লুসাই জনগোষ্ঠীর মূল আবাস ভূমি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এককালে লুসাই হিল বর্তমানে মিজোরাম নামে পরিচিত । লুসাইদের পূর্বপুরুষেরা চিনলুং থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয় এবং নিজেদেরকে তারা মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর বংশধর বলেই পরিচয় দেন।

অহমিয়া

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলা যথাক্রমে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় অরণ্যময় পরিবেশে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর লোকজন সুদীর্ঘকাল ধরে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছে। এই অহমিয়া জনগোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে আসাম হিসেবে বলা হয়ে থাকে। অহমিয়া বা অসমদের মূল জনগোষ্ঠী ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চল আসাম রাজ্যে বাস করছে। মূলত অহমিয়া জনগোষ্ঠীর নামে ভারতের উক্ত প্রদেশের নাম আসাম নামকরণ হয়েছে। ব্রিটিশ কর্তৃক আসাম দখলের পর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তার শাসনকার্য পারচালনা এবং আরো বেশি বেশি পার্বত্যাঞ্চলে দুর্ধষ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোকে আয়ত্তে আনার লক্ষ্যে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর  অংশ হিসেবে অধীনস্থ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর লোক নিয়ে বিভিন্ন রেজিমেন্ট গঠন করে। তার মধ্যে আসাম রেজিমেন্ট ছিল অন্যতম । এই আসাম রেজিমেন্টের সৈনিক হিসেবে বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী অহমিয়া জনগোষ্ঠীর পূর্বসুরিরা এ অঞ্চলে আগমন করে ।

 খিয়াং

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার রাজস্থলি, কাপ্তাই এবং বান্দরবান জেলার সদর, রুমা, থানচি ও রোয়াংছড়ি উপজেলায় খিয়াং জনগোষ্ঠীর বসবাস। ১৯৮১ এবং ১৯৯১ সালের আদমশুমারী অনুসারে খিয়াং জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা যথাক্রমে ৫৪৫৩ এবং ১৯৫০। দক্ষিণের টেম- চিন  বা উত্তরের ওয়াইল্ড চিন নামে অবহিত আরাকান ইয়োমা উপত্যাকার অববাহিকায় খিয়াংদের আদি নিবাস ছিল বলে অনেকে অভিমত ব্যক্ত করেন। প্রথম মতবাদে খিয়াংরা আরাকানের উত্তর ও দক্ষিণের ইয়োমা পর্বত হতে জীবন জীবিকা আরম্ভ করে। বার্মার (বর্তমান মিয়ানমারে) আকিয়াব, ক্যকপু এবং সানডোওয়ে জেলার পশ্চিমে তাদের বসবাস রয়েছে বলে জানা যায়। অন্য মতবাদে জানা যায়, বার্মার চীন হিলসের অধিবাসীদের খিয়াং বলা হয়। বার্মিজরা এদের চিনস আর আরাকানিরা  খিয়াং বলে ডাকে।

গুর্খা

গুর্খা জনগোষ্ঠীর লোকেরা রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার অর্ন্তগত মাঝের বস্তি, আসাম বস্তি, জেল রোড , কন্ট্রাক্টর পাড়া প্রভৃতি এলাকায় বাস করে। বান্দরবান জেলায় ও ৪/৫ টি গুর্খা পরিবার রয়েছে। সরকারি আদমশুমারীতে গুর্খা জনগোষ্ঠীর লোকসংখ্যা আলাদাভাবে উল্লেখ নেই। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে গুর্খাদের সম্ভাব্য জনসংখ্যা ৩০০ থেকে ৫০০ এর মধ্যে হতে পারে বলে ধারণা করা হয় । পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও বাংলাদেশের ঢাকা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, সিলেট,  খুলনা, পটুয়াখালী প্রভৃতি  জেলায় অনেক গুর্খা বাস করে। গুর্খারা  তাদের  নাম গ্রহণ করে  ৮ম শতাব্দীর আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ গুরু গোরকনাথ থেকে। অতীতে দুর্গম পাহাড়-পর্বতময় জনপদের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্রিটিশরা ছিল অসহায়। এমন অবস্থায় কৌশল হিসেবে তখন বাধ্য হয়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নেপাল ও ভারত থেকে ২য় গুর্খা রেজিমেন্টকে লুসাই বিদ্রোহ দমনের জন্য এই এলাকায় নিয়ে আসে। প্রশিক্ষিত গুর্খাদের অসীম সাহস, দুধর্ষ তৎপরতা ও যুদ্ধ কৌশলের সামনে লুসাইরা তাদের অসহায়ত্ব বুঝতে পারে ও বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য হয়। আর ব্রিটিশরাও পরবর্তীতে গুর্খাদের পার্বত্য এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে দেয়।

 তঞ্চঙ্গ্যা

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলায় তঞ্চঙ্গ্যাদের প্রধান বসতিগুলো রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া থানার উত্তর পূর্বাংশে এবং  কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বসতি রয়েছে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ কর্তৃক প্রদর্শিত তঞ্চঙ্গ্যা জনসংখ্যা ১৯,২১৭ জন।

 তঞ্চঙ্গ্যাদের বর্তমান বসতি স্থানসমূহের দিকে লক্ষ্য করলে অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে তারা দীর্ঘকাল আগে থেকে তাদের মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। বার্মার ইতিহাস, দান্যাওয়াদি আরে তবুং বা আরাকান ইতিহাস (অনেকে লেখেন দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদ ফুং) অনুসারে এবং নৃতাত্ত্বিকদের গবেষণা থেকে এই সিদ্ধান্ত পাওয়া গিয়েছে যে, তঞ্চঙ্গ্যারা দাইনাক পরিচয়ে দান্যাওয়াদির (আরাকান) মূল অধিবাসী ছিল। তারা প্রথমে মাতামুহুরী নদীর উপনদী তৈনছং এ (তৈনছড়ি-মারমাদের  তৈনছং ) প্রথম বসতি স্থাপন করে। সেখান থেকে তারা কালক্রমে মাতামুহুরী অববাহিকা ধরে পশ্চিম দিকে সরে গিয়ে কিছু দক্ষিণে এবং কিছু পশ্চিমে চট্টগ্রামের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে উত্তর পূর্বদিকে স্থানান্তরিত হয়ে রাঙ্গুনিয়া অঞ্চলে এবং অবশেষে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে স্থায়ী হয়ে যায়।

 বম

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এবং মিয়ানমারের চীন প্রদেশে বম জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান পার্বত্য জেলার রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি ও বান্দরবান সদর উপজেলায় এবং রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় ৭০টি গ্রামে বমরা বাস করে। ২০০৩ সালের বম সোশাল কাউন্সিল বাংলাদেশ কর্তৃক পরিচালিত জরিপ অনুসারে বম আদিবাসীদের মোট সংখ্যা ৯৫০০ জন।

উনবিংশ শতকের পূর্বে এবং বিংশ শতকের বিভিন্ন লেখালেখিসমূহে বমদেরকে চীন জাতির উপশাখা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফায়েব, লুইন, বার্বি মিলস হাচিনসন গ্রীয়ারসনও অন্যান্য লেখকগণও একই মত পোষণ করেন। বমদের আদি নিবাস নিয়ে নানা কাহিনী প্রচলিত আছে। বলা হয় চীনের চিনলুং এলাকার এক গুহা থেকে তারা এসেছে। বর্তমান স্থানে বমদের আগমন সপ্তদম শতকে। সবচেয়ে বড় কথা বছর দুয়েক আগে, সাবেক বোমাং রাজা চ্যানেল আই-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, বাংলাদেশে তারা আদিবাসী নন, তাদের পূর্ব পুরুষ আরাকান থেকে এসেছে।

 একইভাবে ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, সমতলের উপজাতীয় সম্প্রদায় যেমন, সাঁওতাল, গারো, হাজং, মনিপুরী প্রভৃতির বাংলাদেশে আগমনের ইতিহাস তিন-চারশত বছরের বেশি নয়। উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন বিভিন্ন ইতিহাস থেকে জানা যায়, সাঁওতাল সম্প্রদায় রেল সম্প্রসারণের কাজে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ভারতের উড়িষ্যা ও বিহার অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে আগমন ঘটে। কাজেই উপর্যুক্ত আলোচনায় প্রমাণিত হয় আভিধানিকভাবে বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী কোনোভাবেই এখানকার স্বদেশজাত বা ভূমিপুত্র বা আদিবাসী নয়।

 এখন আদিবাসীর আরেকটি সংজ্ঞা, আইএলও কনভেনশন ১০৭ ও ১৬৯ অনুসারে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহ আদিবাসী হিসাবে পরিচিত হতে পারে কিনা তার বিবেচনা বাকি রইল। আগামী পর্বে ইনশাল্লাহ সে আলোচনা করা হবে।

Email: palash74@gmail.com

 সৌজন্যে: দৈনিক ইনকিলাব(পরিবর্ধিত আকারে)

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩