অপহরণের প্রতিবাদ: মানবিক, বাণিজ্যিক, না রাজনৈতিক?

  • মাহের ইসলাম

প্রকাশ্য দিবালোকে সশস্ত্র কিছু দুষ্কৃতিকারী দুইজন মানুষকে অপহরণ করলে, সবারই খারাপ লাগার কথা, ভয় পাওয়ার কথা; এমনকি অপহৃতদের ক্ষতির আশঙ্কায় উৎকণ্ঠিত হওয়ার কথা। এরপর শত ভয়ভীতি এবং উৎকণ্ঠা সত্ত্বেও, সমাজের কিছু বিবেকবান মানুষ এই ঘটনার প্রতিবাদ করবে; একই সাথে অপহরণকারীদের ধরতে এবং অপহৃতদের উদ্ধারে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাবে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী, অনেক ক্ষেত্রে সফলও হবে। অন্যদিকে, অনিষ্টের উৎকণ্ঠার পাশাপাশি, তাদের মঙ্গল কামনায় নীরবে প্রার্থনা এবং সরবে তাদের উদ্ধারের দাবী জানানো আমাদের সমাজে খুবই স্বাভাবিক।

এই স্বাভাবিক ব্যাপারগুলোই একের পর এক ঘটে চলেছে পার্বত্য অঞ্চলের আঞ্চলিক সংগঠনের দুই নারী নেত্রীর অপহরণকে কেন্দ্র করে। এরই ধারাবাহিকতায়, গত ২ তারিখে অপহৃত একজনের মায়ের করুণ ছবি সম্বলিত একটি নিউজ করেছে দেশেরই একটা শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক। এছাড়া অপহৃতদের উদ্ধারসহ ৫দফা দাবিতে ঢাকায় নারী-যুব-ছাত্র সংগঠনসমূহের প্রতিবাদী মশাল মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে একই দিন সন্ধ্যায়।

ঘটনা যাদেরকে নিয়ে, সেই মন্টি চাকমা ও দয়াসোনা চাকমাকে অপহরণের পর প্রায় ১৫ দিন পার হয়ে গেছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ঘটনার যে বর্ণনা পাওয়া গেছে, তা থেকে জানা যায়, অস্ত্রের মুখে কিছু সন্ত্রাসী গত ১৮ মার্চ রাঙামাটির সদরের কুতুকছড়ির উপর পাড়া গ্রাম থেকে  ইউপিডিএফ সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশনের এই দুই নেত্রীকে অপহরণ করে। ঐ সময় সন্ত্রাসীদের ছোঁড়া গুলিতে ধর্মসিং চাকমা নামে একজন ইউপিডিএফ নেতা গুলিবিদ্ধও হয়েছে। সন্ত্রাসীরা এসময় একটি ঘরে আগুনও ধরিয়ে দেয়। এ অপহরণ ঘটনায় ২১জনকে আসামি করে রাঙামাটির কোতয়ালী থানায় একটি মামলা হয়েছে। তন্মধ্যে, নানিয়াচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাকে প্রধান আসামি এবং সদ্য গঠিত ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলের সভাপতি তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মাকে দ্বিতীয় আসামি করা হয়েছে।

এ ঘটনার প্রতিবাদে পার্বত্য অঞ্চলের পাশাপাশি ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সমাবেশ, মশাল মিছিল, প্রেস ব্রিফিং করে অপহৃতদের উদ্ধারের দাবী জানানো হয়েছে। বলাবাহুল্য যে, প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ সমর্থিত তিন সংগঠন গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন যৌথভাবে ২১মার্চ খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে অবরোধ কর্মসূচি পালন করে।  এ কর্মসূচীতে তাদের সমর্থকেরা যথারীতি জ্বালাও – পোড়াও, গাড়ি ভাংচুর, মারধোরের ঘটনা, পুলিশের উপর হামলা ইত্যাদি ঘটনার জন্ম দিয়েছে।

অবরোধ চলাকালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে এক অটোরিক্সার চালক আহত হয়, অপর একটি অটোরিক্সায় ছোঁড়া ইটের আঘাতে দেড় বছরের একটি শিশুও আহত হয়। ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে একাধিক গাড়িতে, মারধোর করা হয়েছে যাত্রী ও চালককে। পরিশেষে, অবরোধে হামলা ভাংচুরের দায়ে ইউপিডিএফ’র ৮০ নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলাও দায়ের করা হয়েছে।

ঘটনার এখানেই শেষ নয়; শেষ হওয়ার কথাও নয়। কারণ অপহৃতদের অদ্যাবধি উদ্ধার করা যায়নি। প্রায় প্রতিদিনই আমরা খবরের কাগজে এই সংক্রান্ত সংবাদ পাচ্ছি। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিদিনই তাদের উদ্ধারের দাবী জানিয়ে বিভিন্ন স্থানে, অনেকেই যার যার সাধ্যানুযায়ী কিছু না কিছু করার চেষ্টা করছেন। এই চেষ্টা্তে ফেসবকে পোস্ট ও কমেন্টের ঝড় বইছে।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে, ইতোমধ্যেই অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং জন প্রতিনিধি  অপহরণসহ গুম, খুন, ধর্ষণের বিচারহীনতা এবং সরকারের নির্লিপ্ততার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এবং অবিলম্বে অপহৃত নেত্রীদ্বয়কে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে অপহরণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের দাবি জানিয়ে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন বা ইমেইলে সংহতি জানিয়েছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই স্বাভাবিক ব্যাপার কিন্তু সবসময় আমাদের দেশের সবক্ষেত্রে ঘটে না। বিস্মিত হওয়ার বিষয়টি হলো এই যে, এমনকি এই পার্বত্য অঞ্চলেই অনেক অপহরণের পরেও ঢাকায় এমন আন্দোলন বা বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ কর্তৃক বিবৃতি স্বাক্ষর বা সংহতি প্রকাশ বা জাতীয় দৈনিকে সংবাদ দেখা যায় না। সহজ ভাষায়, আমাদের সমাজেরই কিছু তথাকথিত মানব দরদী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি এই দুই নারীর ক্ষেত্রে যে প্রতিক্রিয়া বা কর্মসূচী করছেন তা সকল অপহৃত নর বা নারীর জন্যে করেন না। অর্থাৎ, উনাদের কর্মকাণ্ড বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি বা দলের জন্যে এক রকম, আর অন্য সকল মানুষের জন্যে আরেক রকম।

আমি ইচ্ছে করেই শান্তি চুক্তির আগের সময়কার কথা বলছি না। ঢাকা ট্রিবিউন এর ২৭ জুলাই ২০১৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে গত ১৩ বছরে (২০০১ – ২০১৩) কমপক্ষে ৬৪০ জনকে অপহরণ করা হয়, তন্মধ্যে গুটিকয়েক ভাগ্যবান মুক্তিপণের বিনিময়ে ফিরে আসতে পেরেছিলেন। ভেবে দেখতে পারেন, বিগত বছরগুলোতে কতবার বা কতজনের জন্যে এমন আয়োজন দেখেছেন, আজ যেমন দেখছেন এই দুই নেত্রীর জন্যে।  এই দুই নেত্রীর জন্য যে প্রতিক্রিয়া দেখানো হচ্ছে আমি তার বিরোধীতা করছি না। বরং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই স্বাভাবিক ঘটনাটি যখন অন্য অনেকের ক্ষেত্রে না ঘটে- তখন কিছু প্রশ্নের জন্ম দেয়! প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতিক্রিয়ার আসল উদ্দেশ্য বা অর্ন্তনিহিত তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।  বর্তমান লেখার মূল উদ্দেশ্য সেটাই।

উদাহরণ স্বরূপ পার্বত্য চট্টগ্রামে সম্প্রতিকালে ঘটে যাওয়া কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অপহরণের ঘটনার দিকে পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করা যেতে পারে।

১. চাঁদা না দেয়ায়  ২৭ মার্চ, ২০১৮ তারিখে খাগড়াছড়ি সদর থেকে মোবাইল অপারেটর রবি কোম্পানীর চার প্রকৌশলীকে অপহরণ করেছে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা। বিষয়টি কঠোরভাবে গোপন রাখায় অপহরণের ঘটনাটি এতদিন প্রকাশ পায়নি। সংবাদে আরো জানা গেছে, অপহরণ করে কয়েক কোটি টাকা টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছে অপহরণকারীরা। (পার্বত্যনিউজ, ৩ এপ্রিল ২০১৮)।

২. খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার ছদুরখীল এলাকায় মোবাইল ফোন কোম্পানীর চার টেকনিশিয়ানকে অপহরণ করা হয় ৬ মার্চ, ২০১৮ তারিখে। ইতিপূর্বে, চাঁদা না দেওয়ায় চাঁদাবাজরা কয়েকবার টাওয়ারের লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পরে, রবি টাওয়ারের মেরামতের  কাজে আসলে এই টেকনিশিয়ানদের অপহরণ করে সন্ত্রাসীরা। (পার্বত্যনিউজ, ৬ মার্চ ২০১৮)

৩. নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ একত্রে ৬২ জনকে অপহরণ করেছিল একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে। ‘অপহরণের ১৬২ দিন পর মুক্তি পেলেন ৩৫ জন’ শিরোনামে দৈনিক প্রথম আলোর ৩০ জুলাই ২০১৩ তে প্রকাশিত সংবাদ হতে আরো জানা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষে ইঞ্জিনচালিত নৌকাযোগে রাঙামাটি থেকে বাড়ি ফেরার পথে এদেরকে অপহরণ করা হয়। পরে নয়জন নারী, শিশু ও বৃদ্ধকে মুক্তি দেয়। সংবাদ প্রকাশের দিনও আরো ১৫জন অপহরণকারীদের হাতে জিম্মি ছিল।

৪.  ২০১৪ সালের নভেম্বরে লংগদু উপজেলার সদর ইউনিয়নের হারিহাবা নামক এলাকা থেকে অপহৃত হন বন বিভাগের তিনজন কর্মকর্তা। দৈনিক প্রথম আলোর ৮ নভেম্বর ২০১৪ তারিখের সংবাদ অনুসারে, তাদের মুক্তির বিনিময়ে অপহরণকারীরা ১৫লাখ টাকা দাবি করে। ৬ নভেম্বরে অপহৃত হওয়ার ১৯ দিন পরে যৌথ বাহিনীর অভিযানের মধ্যে দিয়ে তাদের মুক্তি ঘটে।

৫. ২০১৩ সালের ৮ জুলাই বাঘাইছড়ি উপজেলার মারিশ্যা থেকে বি টেকনোলজির প্রকৌশলীসহ পাঁচজনকে অপহরণ করে ৪০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরবর্তীতে, দর কষাকষির এক পর্যায়ে, মুক্তিপণ ৪০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন কোটি টাকা দাবি করায় বি টেকনোলজির প্রতিনিধির সঙ্গে অপহরণকারীদের বৈঠক ভেস্তে যায়। (দৈনিক প্রথম আলো, ২২ জুলাই ২০১৩)।

৬. এক ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারকে তার দুই ডেনিস সহকর্মীসহ রাঙ্গামাটির গুনিয়াপাড়া থেকে ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আটজনের একদল সশস্ত্র পাহাড়ি  মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ করে। একই গাড়িতে থাকা আরো একজন বিদেশি এবং গাড়ির ড্রাইভারকে তারা ছেড়ে দেয় মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করার জন্যে।  কত টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে মাসাধিককাল পরে তারা মুক্তি পেয়েছিলেন, তা অবশ্য জানা যায় নি। (দি টেলিগ্রাফ, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০০১)।

৭. ডেনিশ সাহায্যকারী সংস্থা ডানিডাতে কর্মরত দুইজন বাংলাদেশিকে থানচির নিকটবর্তী এক গ্রাম থেকে ২০০৭ সালের জুলাই মাসে অপহরণ করা হয়। (রয়টার্স, ১৩ জুলাই ২০০৭)।

৮. রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি থেকে একজন স্থানীয় গাইডসহ দুই বাঙ্গালী পর্যটককে অপহরণ করা হয় ২০১৫ এর ৩ অক্টোবর তারিখে। (ডেইলি সান, ১৩ অক্টোবর ২০১৫)।

৯. গুইমারা উপজেলার বাইল্যাছড়ি সাইনবোর্ড এলাকায় বাসের গতিরোধ করে, বাস থেকে স্বামীর পাশে বসে থাকা স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তারিখে। পরে ২০১৮ সালের মার্চে ইউপিডিএফ সমর্থিত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কর্মী সজীব ত্রিপুরাকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তার স্বীকারোক্তি হতে পুলিশ জানতে পারে যে, গৃহবধু ফাতেমা বেগমকে অপহরণ করে ইউপিডিএফের সদস্যরা মিলে পালাক্রমে ধর্ষণ করেছে। তার অপরাধ ছিলো সে বাঙালী ছেলেকে ভালবেসে বিয়ে করেছে ধর্মান্তরিত হয়ে (পার্বত্যনিউজ, ৪ মার্চ ২০১৮)।

১০. খাগড়াছড়ি জেলা শহরের এক হাসপাতাল থেকে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ এর  দুই নেতাকে অস্ত্রের মূখে অপহরণ করা হয় ২০১৭ সালের অক্টোবরে। এই ঘটনায়  আঞ্চলিক একটি রাজনৈতিক দলকে দায়ী করা হয়। (পার্বত্যনিউজ, অক্টোবর ২২, ২০১৭)।

১১. নভেম্বর ২০১৭ তে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার কমলছড়িতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) দুই সদস্যকে মারধরের পর গুরুতর জখম অবস্থায় অপহরণ ও হরিনাথ পাড়া থেকে ইউপিডিএফ’র অপর এক সমর্থককে অপহরণের অভিযোগ পাওয়া যায় ইউপিডিএফ খাগড়াছড়ি ইউনিটের সংগঠক মাইকেল চাকমার এক বিবৃতিতে।(পার্বত্যনিউজ, নভেম্বর ১৮, ২০১৭)।

১২. ১১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর পোষ্টার লাগানোর সময় রাঙ্গামাটি থেকে ইউপিডিএফের  সাতজন কর্মীকে ২০০৯ এর ডিসেম্বরে অপহরণ করা হয়। এই ঘটনার পিছনে, জে এস এস এর সন্ত্রাসীরা এই অপহরণের সাথে জড়িত বলে ইউপিডিএফের পক্ষ হতে অভিযোগ করা হয়। (ডেইলি স্টার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০০৯)।

১৩. বিপক্ষ দলের হয়ে মিছিলে অংশ নেয়ায় নানিয়ারচরের ৫ জন ইউপি সদস্যসহ ২০ জনকে ২১ ডিসেম্বর ২০১৭ তে অপহরণের অভিযোগ করা হয়। (পার্বত্যনিউজ, ডিসেম্বর ২২, ২০১৭)।

১৪. অতি সম্প্রতি, নব গঠিত ইউপিডিএফ ডেমোক্র্যাটিক এর তরফ হতে প্রকাশিত এক বুকলেটে ১৮ জন ইউপিডিএফ কর্মীর নাম ও ঠিকানা দেয়া হয়েছে। বুকলেটের দাবী অনুযায়ী, দলের সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত করায় এই ১৮ জনকে মেরেই ফেলা হয়েছে।

১৫. ২০১৭ সালের ২১ এপ্রিলে এক ত্রিপুরা নারী চা শ্রমিক বাঙ্গালী ছেলেকে ভালবেসে পালিয়ে বিয়ে করার জের ধরে  পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের হাতে অপহৃত ফটিকছড়ির নাছিয়া চা বাগানের ১৯টি পরিবারের নারী ও শিশুসহ ৭৮ জনকে অপহরণ করে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা।

১৬. ৫ জানুয়ারী ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ৩ জানুয়ারিতে জেএসএস এমএনলারমা গ্রুপের সমর্থিত খাগড়াছড়ি আসনের স্বতন্ত্রপ্রার্থী মৃনাল কান্তি ত্রিপুরার স্ত্রীসহ ৬জন নারী কর্মীকে জেলা সদরের গিরিফুল দক্ষিণ হেডম্যান পাড়া এলাকা হতে অপহরণ করা হয়ে। প্রার্থী মৃনাল কান্তি ত্রিপুরা জানায়, পানছড়ি সড়কস্থ গিরিফুল এলাকায় তার স্ত্রী পারুমিতা চাকমা (পুতুলী), তার বউদি মেনকা ত্রিপুরা, তার শেলিকা অনুভা ত্রিপুরা এবং আরও ৩কর্মীসহ ভোট চাওয়ার জন্য গেলে ঘটনাস্থলে অপহরণের শিকার হয়। তিনি এ ঘটনায় ইউপিডিএফকে দায়ী করেন।

এরকম আরো অসংখ্য ঘটনার উদাহরণ দেয়া যায়, কিন্তু তা পাঠকদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে পারে বিধায় সে চেষ্টায় বিরত থাকা হলো।

শান্তি চুক্তির পরে গত ২০ বছরে, পাহাড়ি-বাঙ্গালী মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় হাজার দেড়েক মানুষ অপহরণের ঘটনার শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে পাহাড়িদের সংখ্যাই বেশি। আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতেই সবচেয়ে বেশি অপহরণ, হত্যা বা ধর্ষণের মতো অপরাধের শিকার হচ্ছে নিরীহ পাহাড়িরা। কিন্তু ভয়ে তারা মুখ খুলতে সাহস পায় না কখনই, তাই এই সব ঘটনার বেশির ভাগই রয়ে যায় সকলের অজ্ঞাতে। এসব অপহরণের কথা, অহরণের পর হত্যার কথা মিডিয়াতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খুব একটা আলোচিত হয় না।

অপহৃত দুই নেত্রী অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী দলের হওয়ায় এবং অপহরণকারীদের দৌরাত্ম এখনো অতটা বাড়েনি বলেই হয়তবা আমরা এই ঘটনার কথা জানা গেছে। যদি এর ঊল্টোটা ঘটতো, অর্থাৎ চিরাচরিত প্রথার মতই প্রধান দুই আঞ্চলিক দলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ছোট দুই দলের নেতাদের অপহরণ করত, তাহলে যে আর যাই হোক এত মিছিল, প্রতিবাদের লোক পাওয়া যেত না- সেটা বুঝতে এতক্ষণে নিশ্চয় কারো দেরি হওয়ার কথা নয়।

উপরে যেসকল অপহরণের ঘটনার কথা আলোচিত হয়েছে, এরকম আরো অসংখ্য অপহরণের ঘটনায় এখন যাদের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে তাদের টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি, বিবৃতি, কর্মসূচীতো দুরে থাকুক।

ভেবে দেখুন, দিনে দুপুরে সবার সামনে থেকে স্বামীর পাশে বসা গৃহবধুকে অপহরণ করার পরেও কিন্তু আমরা এই সকল নারীবাদী, মানবাধিকার কর্মী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কোন ধরনের বক্তৃতা বা বিবৃতি দেখিনি। কেউই তখন ফাতেমা বেগমকে উদ্ধার বা অপহরণকারীদের গ্রেফতারের দাবী জানিয়ে রাজপথে একটি বারের জন্যেও মশাল মিছিলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। মামলা আছে, গ্রেফতারকৃত আসামির স্বীকারোক্তি আছে, অথচ বাকি অপরাধীদের গ্রেফতার বা শাস্তির দাবিতে কোন আওয়াজ নেই।

আজ যারা অপহৃত এই দুই নেত্রীকে নিয়ে এত কিছু বলছেন, এদের অনেকেই হয়ত সৈকত ভদ্র অথবা রেটিনা চাকমার সহযোদ্ধা ছিলেন; অথচ কী এক অদ্ভুত কারণে রেটিনা চাকমার অপহরণ ও তাকে নিলামে তুলে ধর্ষণ নিয়ে কেউ কখনই কিছু বলেননি এবং বলছেন ও না। দিপা ত্রিপুরার অপহরণকারী এবং যৌন নির্যাতনকারীদের ব্যাপারেও কেউ কিছু কখনই বলে না।

চোখের সামনে ঘটে যাওয়া হাজারো জলজ্যান্ত অপহরণের ঘটনা থাকা সত্ত্বেও কী এক অদ্ভুত কারণে কিছু লোক প্রতি বছরই কল্পনা চাকমার বানোয়াট এক অপহরণের বিচার চায়! কারণটি অনুধাবনের ও খুঁজে বের করার ভার সচেতন পাঠকদের উপরই রইল!

♦ লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।


মাহের ইসলামের আরো লেখা পড়ুন

  1. পার্বত্য চট্টগ্রামে অপপ্রচার: মুদ্রার অন্য দিক
  2. মারমা দুই বোন, অপপ্রচার এবং ডিজিটাল যুগের দুর্বলতা
  3. পাহাড়িদের সরলতা কি গুটিকয়েকজনের ক্রীড়নক: প্রেক্ষিত বিলাইছড়ি ইস্যু
  4. পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীঃ নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দোষী
  5. মিথুন চাকমার প্রতি সহানুভুতি কি অবিচার ?
  6. দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় চেতনা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে অপপ্রচার বন্ধে কোনো ছাড় নয়
  7. ইমতিয়াজ মাহমুদ- মিথ্যা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি না করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখান(ভিডিও)

 

একের পর এক মটর সাইকেল চালক কেন টার্গেট হচ্ছে পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের

খাগড়াছড়ি সাড়ে ৬ বছরে ১৬ মোটরসাইকেল চালক খুন ও গুম


নিজস্ব প্রতিবেদক, খাগড়াছড়ি ও খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি, পার্বত্যনিউজ:

খাগড়াছড়িতে যাত্রীবেশি সন্ত্রাসীদের হাতে ভাড়া চালিত মোটরসাইকেল চালক খুন, অপহরণ, গুম ও হামলা করে মোটরসাইকেল ছিনতাই এখন নিত্যনৈতিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত প্রায় সাড়ে ৬ বছরে খাগড়াছড়িতে অন্তত ৮জন মোটর সাইকেল চালক যাত্রীবেশীদের হাতে খুন হয়েছে। গুম হয়েছেন ৮জন। এদের মধ্যে একজন ছাড়া সকলেই খাগড়াছড়ির বাসিন্দা। অপহরণ হয়েছে অন্তত এক ডজন। এছাড়া অস্ত্রের মুখে মোটরসাইকেল ছিনতাই ও চুরি হয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক।

 

নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার যেমন বিচার পায়নি, তেমনি নিখোঁজ ব্যক্তিরা হয়তো ফিরে আসবে সে প্রতিক্ষায় আছে তাদের পরিবার- স্বজনরা। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হারিয়ে যাওয়ায় তাদের পরিবার-পরিজন অভাব-অনটনে দিন পার করছে। সে সাথে একের পর এক মোটর সাইকেল চালক খন-গুমের ঘটনায় প্রায় অস্থির হয়ে আছে খাগড়াছড়ি।

এ সকল হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে জেলায় দফায় দফায় হরতাল-অবরোধে উত্তাল হয়েছে। এছাড়াও মানববন্ধন ও প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিকট স্মারকলিপি প্রদান এবং প্রশাসনের কাছ থেকে বিচারের আশ্বাস মিললেও বাস্তবে এ সকল হতভাগ্য মোটরসাইকেল চালকের জীবনে খুন ও অপহরণের ঘটনা ঘটলেও একটিরও বিচার হয়নি।

এদিকে একের পর এক মোটরসাইকেল চালকদের খুন, অপহরণ ও মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহকারীদের মধ্যে আতংক দেখা দিয়েছে।

খাগড়াছড়িতে যাত্রী পরিবহনের মোটরসাইকেল একটি জনপ্রিয় বাহন। ভূ প্রকৃতি এই জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ। জেলায় অন্তত দুই হাজার বেকার যুবক ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। কিন্তু একের পর এক যাত্রীবেশি সন্ত্রাসীদের হাতে মোটরসাইকেল চালক খুন, গুম ও অস্ত্রের মুখে মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ঘটনায় এখন চালকদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত প্রায় ছয় বছরে ১৬ জন মোটরসাইকেল চালক খুন ও গুম হয়েছে। জেলার মহালছড়ি ছাদিকুল ইসলাম, মাটিরাঙার আজিজুল হাকিম শান্ত, আব্দুর রহিম, গুইমারা নিজাম উদ্দিন সোহাগ, দীঘিনালার শাহ আলম, আব্দুস সাত্তার, চান মিয়া ও সর্বশেষ পার্শ্ববর্তী লংগদু উপজেলার নুরুল ইসলাম নয়ন খুন হন খাগড়াছড়ি জেলা সদরের যৌথ খামার এলাকায়।

লংগদুতে প্রায় দুই শতাধিক পাহাড়ি বাড়ীঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নয়ন হত্যাকান্ডটি দেশব্যাপী আলোচনায় আসলেও অন্য হত্যাকান্ডগুলো তেমন কোন আলোচনায় আসেনি। একই সময় দীঘিনালার মোটরসাইকেল চালক আবুল কাশেম, মো: আলী, পানছড়ির হোসেন আলী, মানিকছড়ির মো: মোরশেদ, রাজিব কান্তি দে, গুইমারার রেজাউল করিম, আল আমীন ও শংকর দীর্ঘ দিন ধরে মোটরসাইকেলসহ নিখোঁজ রয়েছে।

এছাড়া একই সময়ে খাগড়াছড়িতে অন্তত অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেল ছিনতাই ও চুরির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু উদ্ধার হয়েছে মাত্র কয়েকটি। প্রতিটি খুন, অপহরণ ও ছিনতাইয়ের জন্য দায়ী করা হচ্ছে পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে।

সর্বশেষ গত ১ জুন খাগড়াছড়ির যৌথ খামার এলাকায় খুন হন লংগদু উপজেলার যুবলীগের নেতা নুরুল ইসলাম নয়ন। তার এ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে পরের দিন সেখানে প্রায় দুই শতাধিক পাহাড়িদের বাড়ী ঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

নিহত নয়নের ছোট ভাই লিটনের অভিযোগ ঐদিন সকালে তার বড় ভাই দুই পাহাড়ি যাত্রীকে নিয়ে খাগড়াছড়ি আসার পর নিখোঁজ হন। পরে সামাজিকে যোগাযোগ মাধ্যমে তার ভাইয়ে লাশের সন্ধান পান।

খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক মো: আব্দুল হান্নান পার্বত্যনিউজকে জানান, নুরুল ইসলাম নয়ন হত্যার ঘটনায় তার ভাই লিটন বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামী করে মামলা করেছেন। নয়ন হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন ও হত্যাকারীদের গ্রেফতারের পুলিশ সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শিঘ্রই সু-সংবাদ পাবেন বলেও তিনি জানান।

এদিকে গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালক ছাদিকুল ইসলামকে (২৩) দুই উপজাতি মহালছড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে রাঙ্গামাটির ঘিলাছড়ি উদ্দেশ্যে ভাড়া করে নিয়ে যাওয়ার পর ছাদিকুল ইসলাম নিখোঁজ হন। তিনদিন পর ১৩ এপ্রিল বিকালে রাঙামাটির নানিয়াচর উপজেলার ঘিলাছড়ি এলাকায় ছাদিকুল ইসলামের ক্ষতবিক্ষত লাশ মাটি চাপা দেওয়া অবস্থায় পাওয়া যায়।

নিহত ছাদিকুলের নিহত ছাদিকুল ইসলামের বড় ভাই রফিকুল ইসলাম পার্বত্যনিউজকে জানান, দুই উপজাতি লোক ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার সময় মহালছড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে তার ভাইকে রাঙ্গামাটির ঘিলাছড়ি উদ্দেশ্যে তাকে ভাড়া করে নিয়ে যায়।

নিখোঁজ হওয়ার চারদিন পর চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারী দুপরে খাগড়াছড়ি আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের রিছাং ঝর্না এলাকার দুর্গম পাহাড় থেকে মাটিরাযার মেটরসাইকেল চালক আজিজুল হাকিম শান্ত’র লাশ পুলিশ।

মাটিরাঙা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাহদাত হোসেন টিটু পার্বত্যনিউজকে জানান, ১৮ ফেব্রুয়ারী রাত ৯টার দিকে খাগড়াছড়ি থেকে যাত্রী নিয়ে মাটিরাঙা যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন মোটর সাইকেল চালক মো: আজিজুল হাকিম শান্ত। এ ঘটনায় ধন বিকাশ ত্রিপুরা নামে একজনকে আটকের পর তিনি ঘটনার সাথে জড়িত আরো দুই জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে জানিয়েছেন মাটিরাঙা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাহদাত হোসেন টিটু। তবে শান্ত’র মোটরসাইকেলটি এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

নিখোঁজের একদিন পর ২০১৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার বেলছড়ি ইউনিয়নের হাজীপাড়া কবরস্থান এলাকার গভীর জঙ্গল থেকে মোটরসাইকেল চালক মো: আবদুর রহিমের (২৫) লাশ উদ্ধার করে মাটিরাঙ্গা থানা পুলিশ। নিহত আবদুর রহিম বেলছড়ির ২নং ওয়ার্ডের চেয়ারম্যানপাড়ার বাসিন্দা মো: জাহাঙ্গীর আলম এর ছেলে।

পুলিশ জানায়, এক সন্তানের জনক মো: আবদুর রহিম ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। ১৭ সেপ্টেম্বর সে বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হয়,কিন্তু রাতে সে বাড়ি ফিরেনি। পরের দিন বিকাল ৩টায় স্থানীয় নারী শ্রমিকরা লাকড়ি কুড়াতে গেলে বেলছড়ির হাজীপাড়া কবরস্থান এলাকার গভীর জঙ্গলে তার লাশ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় বিজিবিকে খবর দেয়।

একই বছরের ৭ মে সন্ধ্যায় খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালার ভৈরফা পাড়া এলাকায় শাহ আলম নামে এক মোটরসাইকেল চালককে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে শাহ আলমের লাশ উদ্ধার করে।

২০১৬ সালের ২৭ জন নিখোঁজ হন মানিকছড়ির মোটরসাইকেল চালক রাজিব কান্তি দে। স্থানীয় সমীর পালের ছেলে রাজিব দুপুরে যাত্রী নিয়ে যাওয়ার পর আর ফিরেনি।

২০১৪ সালের ২ জুন খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় মোটর সাইকেল চালককে গাছের সাথে বেঁধে রেখে অভিনব কায়দায় মোটর সাইকেল ছিনতাই করেছে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা। ঘটনার চার ঘন্টা পর রাত সাড়ে আটটার দিকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার মোটর সাইকল চালক চরপাড়ার মো: ধনা ময়িা‘র ছেলে মো: খলিলুর রহমান (২৭) কে উদ্ধার করে মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

একই বছরের ৩০ জুলাই খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি থেকে চন্দন ত্রিপুরা (২৪) নামে ভাড়ায় চালিত এক মোটরসাইকেলে চালককে অপহরণ করেছেন অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। উপজেলার গামারীঢালা এলাকা থেকে  তাকে অপহরণ করা হয়। অপহৃত চালকের বাড়ি জেলা শহরের খাগড়াপুর হাদুক পাড়ায়।

২০১১ সালের ১০ জন খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় উপজেলার জালিয়াপাড়ার মাহবুব নগর এলাকায় মোটরসাইকেল চালক নিজাম উদ্দিন সোহাগকে হত্যা করে মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নিয়ে সন্ত্রাসীরা। সে গুইমারা উপজেলার কালাপানি এলাকার বাসিন্দা সালেহ আহমেদের ছেলে।

পুলিশ জানায়, সোহাগ দুই যাত্রী নিয়ে রামগড় যাওয়ার পথে নির্মম এ ঘটনা ঘটে। সোহাগ মাহবুব নগর পৌছুলে যাত্রীবেশী হোন্ডা ছিনতাইকারী তাকে কুপিয়ে এবং জবাই করে লাশ রাস্তায় ফেলে হোন্ডা নিয়ে পালিয়ে যায়।

এছাড়া ২০১১ সালে যাত্রীবেশি সন্ত্রাসীদের হাতে জেলার দীঘিনালার কবাখালীর বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার ও চান মিয়া।

এদিকে চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারী থেকে দীঘিনালায় মোটরসাইকেল চালক মোহাম্মদ আলী নিখোঁজ রয়েছেন। সে উপজেলার দক্ষিণ মিলনপুর গ্রামের হরমুজ আলীর পুত্র। এ ঘটনায় মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী মোছা ফাতেমা বেগম দীঘিনালা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে।

মোছা: ফাতেমা বেগম পার্বত্যনিউজকে জানান, তার স্বামী ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক মোহাম্মদ আলী বিকালে উপজেলার বাসটার্মিনাল থেকে একজন যাত্রী নিয়ে রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় যায়। এর পর থেকেই সে আর বাড়ি ফিরেনি। নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তার মুঠোফোন নম্বর বন্ধ রয়েছে।

মোছা: ফাতেমা বেগম জানান, সংসারের একমাত্র উপার্জন ক্ষম ব্যক্তি স্বামী নিখোঁজ থাকায় দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবন পার করছেন তিনি। স্বামীকে উদ্ধারে প্রশাসনও কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করে ফাতেমা বেগম।

২০১০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হন দীঘিনালার রশিকনগরে বাসিন্দা আবুল কাশেম পিসি।

আবুল কাশেম পিসির স্ত্রী ছানোয়ারা বেগম পার্বত্যনিউজকে বলেন, নিখোঁজের পর স্বামীর লাশটাও পাননি তিনি। সংসারের এক মাত্র আয় সক্ষম স্বামী না থাকায় এক মেয়ে ও চার ছেলেকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। কোথাও থেকে কোন ধরনের সহযোগিতাও তিনি পাননি।

আবুল কাশেম পিসির ছেলে সাইদুর রহমান পিতার হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে বিচারের দাবী জানান প্রশাসনের কাছে।

২০১৬ সালের ২৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ আছেন, জেলার পানছড়ি উপজেলার নিখোঁজ মোটর সাইকেল চালক হোসেন আলী। সে পানছড়ি উপজেলার ৫নং উল্টাছড়ি ইউপির জিয়ানগর গ্রামের মনসুর আলীর ছেলে। তার ব্যবহৃত মোটর সাইকেলটি মাটিরাঙ্গা সদর ইউপির ৫নং ওয়ার্ডের ব্রজেন্দ্র কার্বারী পাড়ার নির্জন এলাকা থেকে পুলিশ পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্বার করলেও হোসেন আলীর সন্ধান মেলেনি।

পানছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার পার্বত্যনিউজকে জানান, ২০১৬ সালের ২৬ এপ্রিল বিকাল ৪টার দিকে হোসেন আলী যাত্রী নিয়ে যায় । এর পর থেকে সে নিখোঁজ। এ ঘটনায় ৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ৪জনকে। নিখোঁজ হোসেন আলীর মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে। ২০১৬ সালের ২৭ জুন যাত্রী নিয়ে যাওয়ার নিখোঁজ হন মানিকছড়ির মোটরসাইকেল চালক রাজিব কান্তি দে।

২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী থেকে নিখোঁজ আছেন মানিকছড়ির মোটরসাইকেল চালক মো. মোরশেদ আলম। সে উপজেলার বড়ডলু মাস্টার পাড়ার বাসিন্দা মো. জয়নাল আবেদীনের পুত্র। মোরেশেদ আলম প্রতিদিনের ন্যায় গত ৬ ফেব্রুয়ারী সকালে মোটরসাইকেল নিয়ে যাত্রী পরিবহনে যান। কিন্তু ঐদিন রাতে বাড়ীতে ফিরে না আসায় থানায় সাধারন ডায়েরী করা হয়।

২০১২ সালে গুইমারা উপজেলার রেজাউল করিম, আল-আমীন ও শংকর যাত্রী নিয়ে রামগড় যাওয়ার পর নিখোঁজ হন। এখনো পর্যন্ত পুলিশ নিখোঁজ ব্যক্তিদের মোটরসাইকেলগুলোও উদ্ধার করতে পারেনি।

২০১৪ সালের ২ জুন বিকালে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় চালককে গাছের সাথে বেঁধে রেখে অভিনব কায়দায় মোটর সাইকেল ছিনতাই করে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। ঘটনার প্রায় চার ঘন্টা পর রাত সাড়ে আটটার দিকে আহত মোটর সাইকল চালক চরপাড়ার মো: ধনা মিয়ার ছেলে মো: খলিলুর রহমানকে উদ্ধার করে মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

মোটরসাইকেল চালক মো: খলিলুর রহমান পার্বত্যনিউজকে জানান, ঐদিন বিকাল ৪টার দিকে রিজেন ত্রিপুরা এক সহযোগিসহ মাটিরাঙ্গা বাজারে আসার কথা বলে চক্রপাড়া থেকে যাত্রী বেশে মোটর সাইকেলে উঠে চক্রপাড়া রহিমের টিলায় আসা মাত্র সেখানে থাকা আরো দুই পাহাড়ি যুবক গাড়ী থামাতে বলে। মোটরসাইকেল থামানো মাত্রই কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই সন্ত্রাসীরা তাকে মারধর তাকে গাছের সাথে বেঁধে মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়।

দীঘিনালার মোটরসাইকেল চালক ফারুক হোসেন পার্বত্যনিউজকে বলেন, অন্যকোন কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকায় মোটরসাইকেল চালিয়ে তিনি সংসার চালান। কিন্তু সম্প্রতিককালে যাত্রীবেশি হাতে মোটরসাইকেল চালক খুন, গুম ও মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ফলে আতংকে দিন পার করছেন। নিহত ও গুম হওয়া পরিবারেও চলছে শোকের মাতম ও অভাব-অনটন।

বছরের পর বছর এভাবে একের পর এক মটর সাইকেল চালক খুন, গুম, অপহরণ বা নিখোঁজ হচ্ছে কেন- জানতে চেয়েছিলাম অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম ফর চিটাগাং হিল ট্রাক্টসের সদস্য তাজুল ইসলাম নাজিমের কাছে। তিনি জানান, প্রধান কারণ উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠনের চাঁদাবাজী। মটরসাইকেল চালকরা উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠনের চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় তাদের খুন, গুম ও অপহরণের স্বীকার হতে হয়।

এ ছাড়াও আরো কিছু কারণ রয়েছে। নাজিম বলেন, মটর সাইকেল চালকদের বেশিরভাগই বাঙালী। শিক্ষিত ও অর্ধ শিক্ষিত বাঙালী যুবকেরা কোটা সুবিধার কারণে পাহাড়ী যুবকদের সাথে চাকরীর প্রতিযোগিতায় পেরে না উঠে বিকল্প কর্ম সংস্থান হিসাবে মটর সাইকেল চালায়। পাহাড়ী সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো চায় না কোনো বাঙালী যুবক মটর সাইকেল চালাক।

সে কারণে তারা বিভিন্ন সময় বাঙালী মটর সাইকেল চালকদের যাত্রী না হবার জন্য পাহাড়ীদের প্রতি হুমকি, হুশিয়ারিও দিয়েছে। তাতে কাজ না হওয়ায় এই নির্যাতন।

মটর সাইকেল চালকদের যেহেতু যাত্রীদের ইচ্ছামত গভীর ও নির্জন পাহাড়ী অঞ্চলে যেতে হয়, তাই তাদের অপহরণ করা সহজ বলেও তিনি মনে করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনের খাগড়াছড়ি জেলার শাখার সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন পার্বত্যনিউজকে বলেন, পাহাড়ে পাহাড়িদের তিনটি সশস্ত্র গ্রুপ রয়েছে। এরা সর্বত্র চাঁদাবাজি,খুন, গুম ও অপহরণ করে যাচ্ছে। অবৈধ উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব না হলে পাহাড়ে বার বার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হবে। সমঅধিকার আন্দোলন সকল সকল জনগোষ্ঠীর হয়ে কাজ করছে বলেও তিনি দাবী করেন।

খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার আলী আহমদ খান পুলিশের উপর আস্থা রাখার অনুরোধ জানিয়ে পার্বত্যনিউজকে বলেন, পুলিশের কাছে সবাই সমান। পুলিশ অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, মোটরসাইকেল এ অঞ্চলে একটি জনপ্রিয় বাহন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পুলিশ কাজ করছে। তিনি মোটরসাইকেল চালকদের কোন যাত্রী পরিবহনের আগে যাত্রীর নাম ও কোথায় যাত্রী নিয়ে যাচ্ছেন ইত্যাদি রেজিষ্টারে লিপিবদ্ধ করে যাওয়ার পরমর্শ দিয়ে বলেন, শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সিসি ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও চাঁদাবাজি বন্ধ ছাড়া এ অঞ্চলে শান্তি ও উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, প্রতি বছর এসব ঘটনা ঘটতে দেওয়া যাবে না। তিনি আইন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করার আহবান জানান।

এ থেকে পরিত্রাণের উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে খাগড়াছড়ির এক পরিরহন ব্যবসায়ী পার্বত্যনিউজকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মটর সাইকেল চালকদের একটা এসোসিয়েশন তৈরি করতে হবে। কোনো চালক যখন কোনো যাত্রী নেবে তখন সেই যাত্রীর নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ও গন্তব্য এসোসিয়েশন অফিসে নির্ধারিত ব্যক্তির নিকট জানিয়ে দেবে। এতে অপহরণ বা গুম কমে যাবে।

খাগড়াছড়িতে শুধু মোটরসাইকেল চালক নয়, সকল সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ সকলকে এগিয়ে আসা জরুরী মনে করেন সচেতন মহল।

কল্পনা চাকমা কি বেঁচে আছেন?

kalpona chakma

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

কল্পনা চাকমা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত নাম। ১২ জুন ১৯৯৬ সালে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ির নিউ লাইল্লাঘোনা গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে অপহৃত হয় কল্পনা চাকমা। অপহরণের সময় আঞ্চলিক সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। রাজনীতি, আন্দোলন ও নেতৃত্বে স্বল্প সময়ের মধ্যেই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। ফলে তার অপহরণ ঘটনা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলে। অপহরণের পরদিন কল্পনা চাকমার বড় ভাই কালিন্দী কুমার চাকমা বাদী হয়ে স্থানীয় থানায় একটি মামলা করেন।

সে সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. আবদুল জলিলকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল। কমিশন ৯৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেও এ অপহরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি। তবে সরকার সেই তদন্ত প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশও করেনি। মামলা দায়েরের ১৪ বছর পর ২০১০ সালের ২১ মে মামলাটির প্রথম চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। ১৪ বছর তদন্তাধীন থাকার পর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আসামিদের অজ্ঞাতনামা উল্লেখ করে তা দাখিল করা হয়। বাদী ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে নারাজি দিলে পরবর্তী সময়ে অধিকতর তদন্তের জন্য আদালত মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করেন। সিআইডি দুই বছর সময় নিয়ে অবশেষে ২০১২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে।সব মিলিয়ে এ ঘটনার তদন্ত হয়েছে তিনবার। এর মধ্যে দুবার তদন্ত করেছে সিআইডি। তাতে দু’বারই নারাজি আবেদন করে কল্পনা চাকমার পরিবার।

images

সর্বশেষ রাঙামাটির পুলিশ সুপার আমেনা বেগমের দেয়া তদন্ত রিপোর্টও প্রত্যাখ্যান করে মামলার বাদী। অপহরণের পর থেকে মামলার বাদী ও পাহাড়ি সংগঠনগুলো অপহরণের জন্য এক সেনা কর্মকর্তা লে. ফেরদৌস ও তিনজন ভিডিপি সদস্যকে দায়ী করে। কিন্তু দীর্ঘ ১৮ বছরের একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের নাম না আসায় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবী জানিয়ে নারাজি আবেদন দিয়ে যাচ্ছেন মামলার বাদী। বর্তমানে কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলাটি রাঙামাটি জেলা পুলিশ সুপারের অধীনে পুনঃ তদন্তাধীন।

রাঙামাটির বর্তমান পুলিশ সুপার সাইদ তারিকুল হাসানের কাছে এ মামলার তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি জানতে চাইলে তিনি আবারো বলেন, ‘মামলাটি তদন্তাধীন। আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্ত কাজ চলছে। আদালত যেসকল বিষয়ে আলাদা আলাদা করে অবজারভেশন নিয়ে তদন্ত করতে বলেছে আমরা সেগুলো তদন্ত করছি। এটি অনেক পুরাতন মামলা। তাই সময় লাগছে’।

কল্পনা চাকমার অপহরণের তদন্ত নিয়ে যেমন দীর্ঘসূত্রিতা হয়েছে। তেমনি জিইয়ে থাকার সুযোগে একটি মহল এই মামলাকে সামনে রেখে গত ২০ বছর ধরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী ও সেনাবাহিনীর অবস্থান নিয়ে দেশে বিদেশে ব্যাপক প্রপাগাণ্ডা চালিয়েছে যার বেশিরভাগই মিথ্যা।

Kalpana-Chakma-poster-in-Bengali

উদাহরণ স্বরূপ, চলছি বছর জুন মাসের শুরু থেকে পাহাড়ীদের বিভিন্ন ওয়েব সাইট ও ফেসবুক পেইজে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কল্পনা চাকমার বিচার দাবীতে বাংলাদেশ সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির লক্ষে ‘ফটো একশন’ নামে একটি ক্যাম্পেইন চালু করেছে। এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের লোগোসহ কল্পনা চাকমার ছবি হাতে নিয়ে তা পাঠাতে বলা হয়েছে। কিন্তু এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইট খুঁজে এ ধরনের কোনো ক্যাম্পেইনের খবর পাওয়া যায়নি।  অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, একটি মহল থেকে এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের লোগো ও কল্পনা চাকমা ছবি দিয়ে একটি এ্যাপ তৈরী করা হয়েছে। এ্যাপটিতে নিজের ছবি লাগিয়ে পোস্ট করলে আয়োজকরা বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমে এমনেস্টির লোগোসহ ব্যাক্তির ছবির সাথে কল্পনা চাকমার ছবি প্রচার করছে। অথচ এই প্রপাগাণ্ডায় ব্যবহার করা হচ্ছে এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নাম।

প্রশ্ন হচ্ছে, কল্পনা চাকমা কোথায়? তিনি কি আদৌ অপহৃত হয়েছিলেন? তিনি কি সেনাবাহিনীর সদস্য কর্তৃক অপহৃত হয়েছিলেন? তিনি কি স্বজন বা পরিচিত কারো দ্বারা অপহৃত হয়েছিলেন? তিনি কি মারা গেছেন? তিনি কি বেঁচে আছেন? বেঁচে থাকলে কোথায় আছেন? — এমন প্রশ্ন বিগত ২০ বছর ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।

পার্বত্যনিউজের তরফে এসকল প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে গিয়ে বিগত ২০ বছরের অনেক তথ্য, উপাত্ত, প্রমাণ, রিপোর্ট, বর্ণণা আমাদের পরীক্ষা করে দেখতে হয়। এই মামলা নিয়ে কাজ করেছেন, শুরু থেকে মামলা পর্যবেক্ষণ করেছেন এমন কিছু লোকের সাথেও কথা হয়।


এ সংক্রান্ত আরো খবর পড়ুন


রাঙামাটি জেলার একজন আইনজীবী শুরু থেকেই কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনাবলীর উপর নজর রেখেছিলেন।  নিরাপত্তার কারণে না প্রকাশ না করার শর্তে পার্বত্যনিউজকে বলেন, কল্পনা চাকমার অপহরণ তদন্ত করতে গেলে ঘটনার সময় বিচার করা জরুরী। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙ্গামাটি জেলায় পাহাড়ী সংগঠনগুলো নিজস্ব প্রার্থী হিসেবে তাদের অঙ্গ সংগঠন পাহাড়ী গণপরিষদ কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য বিজয় কেতন চাকমাকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে (প্রজাপতি মার্কা) দাঁড় করায়। তার পক্ষে প্রচারণা চালানোর জন্য তাদের প্রকাশ্য সংগঠন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), পাহাড়ী গণপরিষদ (পিজিপি) ও হিল উইমেন ফেডারেশন (এইচডব্লিউএফ)কে নির্দেশ দেয়। অপরদিকে রাঙামাটিতে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী দীপংকর তালুকদারের পক্ষে নাগরিক কমিটিসহ বেশিরভাগ ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠী ও বাঙ্গালী জনগন সমর্থন দেয় এবং প্রচারণায় নামে । তৎকালীন শান্তিবাহিনীর দোসর পিসিপি, পিজিপি ও এইচডব্লিউএফ দীপংকর  তালুকদারের জনপ্রিয়তায় শঙ্কিত হয়ে তার সমর্থক বিভিন্ন নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ উপজাতীয়দের হুমকি দেয়া ও হয়রানি করা শুরু করে ।

kalpana-chakma_1_808

পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা সেসময় সমগ্র পার্বত্যাঞ্চলে প্রায় ৩৫ জন আওয়ামীলীগ সমর্থককে নির্বাচনের আগে ও পরে অপহরণ করে । এদিকে কল্পনা চাকমা আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর হয়ে প্রচার কাজ চালাচ্ছিলেন যদিও তিনি হিল উইমেন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদিকা ছিলেন। এসব মিলিয়ে ঘটনাটি তাদের উপদলীয় কোন্দলের সৃষ্টি করেছিল এবং তাকে উক্ত প্রচার থেকে বিরত থাকার জন্য সন্ত্রাসীরা বেশ কয়েকবার হুমকিও দিয়েছিল। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে কল্পনা চাকমাকে অপহরণের নাটক সাজিয়ে শান্তিবাহিনী ও পিসিপি ভোটের পূর্বের রাতে তাৎক্ষণিক একটি ইস্যু তৈরি করে নির্বাচনে জনমতকে তাদের পক্ষে নিয়ে যাবার অপচেষ্টা চালিয়েছিল।

উক্ত ঘটনার আকষ্মিকতায় এমন পরিস্থিতি তৈরী হয়েছিল যে, প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারদের তথ্য মতে, পাহাড়ী ভোটাররা সকাল ৮ ঘটিকায় ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও ভোট দেয়া থেকে বেশ কিছুক্ষণ বিরত থাকেন। ঐ সময় প্রার্থী নির্বাচনে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বিলম্ব করেন বলেও জানা যায়।

পুরাতন তথ্য বিশ্লেষণ করে ওই আইনজীবী আরো জানান, এরপর ১৭ জুন ১৯৯৬ তারিখ পাহাড়ী গণপরিষদ, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ এবং হিল উইমেন ফেডারেশন কর্তৃক জেলা প্রশাসক বরাবর একটি স্বারকলিপি প্রেরণ করে। কল্পনা চাকমার অপহরণের জন্য সংগঠনগুলো তৎকালীন উগলছড়ি ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার লে. ফেরদৌসকে দায়ী করেন। সংগঠনগুলোর ভাষ্য মতে, ঐদিন দিবাগত রাতে উক্ত কর্মকর্তাসহ নিরাপত্তাবাহিনীর ৮/৯ জন সদস্য উগলছড়ি আর্মি ক্যাম্প থেকে নিউ লাইল্লাঘোনায় এসে জোরপূর্বক কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করে।

kalpona chakma 1

ঘটনার সময় খাগড়াছড়িতে কর্মরত ছিলেন এমন একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা পার্বত্যনিউজকে বলেন, লে. ফেরদৌস কচুছড়ি আর্মি ক্যাম্পে ক্যাম্প কমান্ডারের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন । তিনি ১১ জুন ১৯৯৬ তারিখে কচুছড়ি সেনা ক্যাম্প থেকে একটি টহল দলকে নেতৃত্ব দিয়ে উগলছড়ি সেনা ক্যাম্পে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডিউটির জন্য আসেন। তার সাথে আরও তিনজন কর্মকর্তা উগলছড়ি ক্যাম্পে রাত্রিযাপন করেন । ফেরদৌস তার টহলদল ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিয়ে ১২ জুন ১৯৯৬ তারিখ সকাল সাতটায় নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে ক্যাম্প থেকে পোলিং সেন্টারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান।

তিনি আরো বলেন, লে. ফেরদৌস শান্তিবাহিনীর অবৈধ কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সাফল্যজনক কয়েকটি অপারেশন পরিচালনা করেন । ঘটনার কিছুদিন পূর্বে বাঘাইছড়ি ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান সম্রাট সুর চাকমার বাড়ীতে অবৈধ চাঁদা আদায়কারীদের অবস্থানের খবর পেয়ে তিনি একটি তল্লাশী অভিযান চালান । এছাড়াও তিনি আরেকটি অপারেশন চালিয়ে পিসিপির দুইজন অবৈধ চাঁদাবাজকে হাতেনাতে গ্রেফতার করেন । এরপর থেকে সম্রাট সুর চাকমা ও পিসিপি লে. ফেরদৌসকে শায়েস্তা করার জন্য নানা চেষ্টা করে আসছিলেন। তার এই অপারেশন কার্যক্রমে দিশেহারা হয়ে শান্তিবাহিনী ও পিসিপি তার পেট্রোল এর উপর বেশ কয়েকবার এম্বুশ করেও তার কোন ক্ষতি করতে পারেনি। দুঃসাহসিক ও নিবেদিত প্রাণ এই কর্মকর্তা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার অপারেশনাল কর্মকাণ্ড নিষ্ঠার সাথে পালন করে যাচ্ছিলেন।  উপায়ান্তর না দেখে উক্ত অফিসার তথা সেনাবাহিনীকে ঘায়েল করার ভিন্ন পথ খুঁজে নেয় পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা। তারা মিথ্যা অভিযোগ ও অপপ্রচারের অস্ত্র ব্যবহার করার পরিকল্পনা ফাঁদে।

তবে পার্বত্য নাগরিক পরিষদের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আলকাস আল মামুন ভুঁইয়া পার্বত্যনিউজকে বলেন, আমরা শুনেছিলাম, কল্পনা চাকমার তৎকালীন প্রেমিক ও পরবর্তীতে স্বামী অরুণ বিকাশ চাকমা ভারতের অরুণাচল প্রদেশের ভারতীয় যুব কংগ্রেসের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। তারা উভয়েই দূরসম্পর্কের আত্মীয়। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। কিন্তু তাদের প্রেমের ব্যাপারে পারিবারিক বাঁধা থাকায় অরুণ বিকাশ কল্পনাকে অপহরণ করে বলে বিভিন্ন সূত্র অবগত করে। আর এই সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছিল তৎকালীন শান্তিবাহিনী আর পিসিপি’র সদস্যরা। তিনি বলেন, কল্পনা চাকমার প্রেমিক পিসিপি’র সহযোগিতায় এই অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে। বিষয়টি তার পরিবারের সকলেই অবগত।

ঘটনার পর তদন্ত করতে গিয়ে কল্পনা চাকমার বাড়ীতে তার পরিধেয় বস্ত্র, বইপুস্তক ও নিত্য ব্যবহার্য কোন সামগ্রী খুঁজে পায়নি তদন্ত কমিটি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে তিনি অপহৃত হয়েছেন, নাকি স্বেচ্ছায় আত্মগোপন করে নিরাপত্তা বাহিনীকে জড়িয়ে একটি ইস্যু তৈরি করেছেন । এ যাবত পরিচালিত কোন তদন্তেই কল্পনা চাকমা অপহৃত হয়েছেন এমন কোন আলামত পাওয়া যায়নি। পাওয়া যায়নি কথিত অপহরণের সাথে নিরাপত্তাবাহিনীর সংশ্লিষ্টতার কোন প্রমাণ।

Kalpana Chakma 10

কল্পনা চাকমার অপহরণ ঘটনা নিয়ে একটি স্বতন্ত্র তদন্ত করেছিল তৎকালীন মানবাধিকার কমিশন। এ তদন্তের বিষয়ে ১৯৯৬ সালের ৮ আগস্ট রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তদন্তের নানা তথ্য, উপাত্ত, ভিডিও প্রদর্শন করেন। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক ও জাতীয় সমন্বয়কারী এডভোকেট কে এম হক কায়সার বলেছেন, “পূর্ব পরিকল্পিতভাবে তারই লোকজন দ্বারা কল্পনা চাকমা নিখোঁজ রয়েছে।  লে. ফেরদৌস অথবা অন্য কোনো সামরিক বাহিনীর সদস্যই যে, এই ঘটনার সাথে জড়িত নয় তা কল্পনা চাকমার মা, আত্মীয় স্বজন ও স্থানীয় জনগণের বক্তব্যে প্রকাশ পায়। তিনি আরো বলেন, কল্পনা চাকমা বর্তমানে ত্রিপুরা রাজ্যের গণ্ডাছড়া মহকুমার শুক্রে নামক স্থানে অবস্থান করছে। ….বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত প্রতিবেদন পাঠ করেন, সংগঠনের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক ও জাতীয় সমন্বয়কারী এডভোকেট কে এম হক কায়সার। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসোসিয়েট প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ, সাইফুল ইসলাম দিলদার, মুনির উদ্দীন খান, সুপ্রীম কোর্টের এডভোকেট ইতরাত আমিন, মানবাধিকার গবেষণা সহকারী সাহেলা পারভীন লুনা। বিভিন্ন তথ্য প্রমাণসহ লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, কল্পনা চাকমা শেষ কবে মার সাথে যোগাযাগ করেছে, এই প্রশ্নের জবাবে মা বাধনী চাকমা জানান, নিখোঁজ হওয়ার পর দুই বার যোগাযোগ করেছে, এবং সর্বশেষে যোগাযোগ হয়েছে ১ আগস্ট ’৯৬। এতে প্রমাণিত হয় যে, কল্পনা চাকমা বেঁচে আছেন এবং কোথায় আছেন তা তার মা বেশ ভাল ভাবেই জানেন।”(দৈনিক মিল্লাত ৯ আগস্ট, ১৯৯৬)।

এ প্রেস কনফারেন্সের পরদিন ৯ আগস্ট ১৯৯৬ সালে বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টের শিরোনাম দেখা যেতে পারে। ‘মায়ের স্বীকারোক্তি কল্পনা চাকমা এখন ত্রিপুরায়’- দৈনিক মিল্লাত, ‘কল্পনা চাকমা এখন ত্রিপুরায়: মা’র সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে তার’- দৈনিক দিনকাল, ‘কল্পনা চাকমা জীবিত এবং কোথায় আছেন তা তার মা ভালভাবেই জানেন’- দৈনিক ইনকিলাব, ‘কল্পনা চাকমা ত্রিপুরায় আছেন, অপহরণ সাজানো নাটকঃ মানবাধিকার কমিশনের তথ্য প্রকাশ’- দৈনিক পূর্বকোণ, ‘বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের ভাষ্য কল্পনা চাকমা ত্রিপুরায়’- দৈনিক ভোরের কাগজ, ‘কল্পনা চাকমা ভারতে আছেন’- দৈনিক সংগ্রাম, ‘সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, কল্পনা চাকমা ভারতের ত্রিপুরায়।। অপহরণ ঘটনার সাথে সামরিক বাহিনী জড়িত নয়’- দৈনিক আজাদী, ‘অবশেষে রহস্য ফাঁস কল্পনা চাকমা ভারতে’- দৈনিক দেশজনতা, ‘মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ পরিকল্পিতভাবে কল্পনা চাকমাকে নিখোঁজ রাখা হয়েছে’- দৈনিক সবুজ দেশ, ‘সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকার কমিশন, কল্পনা চাকমা এখনো বেঁচে আছেন’- দৈনিক লাল সবুজ, ‘কল্পনা চাকমা ত্রিপুরার গঙ্গাছড়া এলাকায় রয়েছে।। মানবাধিকার কমিশন’- দৈনিক সকালের খবর, `Kalpana Chakma Traced, living in Tripura’- The New Nation.

কল্পনা চাকমাকে গঠিত একটি তদন্ত কমিটির সদস্য ভারতের অরুণাচলে অবস্থিত কল্পনা চাকমার সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি কল্পনা চাকমাকে বাংলাদেশে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন।  কল্পনা চাকমা ফিরতি চিঠিতে তাকে জানান, তিনিও দেশে ফিরতে আগ্রহী। কিন্তু তিনি দেশে ফিরলে তাকে পাহাড়ীদের পক্ষ থেকে হত্যা করা হতে পারে আশঙ্কা করেন।

প্রকৃতপক্ষে কল্পনা চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে একটি মিস্টিরিয়াস ক্যারেক্টার। প্রকৃতপক্ষে তিনি অপহৃত হয়েছেন, পালিয়ে গিয়েছেন, ধর্ষিতা হয়েছিলেন, মারা গিয়েছেন নাকি বেঁচে আছেন এ নিয়ে রয়েছে রহস্যের বিশাল ধুম্রজাল। দেশের স্বার্থে, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, জাতীয় মর্যাদার স্বার্থে এই রহস্যের উদঘাটন জরুরী। কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলা ঝুলে থাকা জাতির জন্য কল্যাণকর হচ্ছে না। তাই দ্রুত গতিতে এই মামলার তদন্ত ও বিচারকাজ সমাপ্ত করে এই ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান জরুরী।

অপহরণের চারদিন পর আলুটিলা থেকে মাটিরাঙ্গার মটরসাইকেল চালকের লাশ উদ্ধার

20.02.2016_Matiranga Motorcycle NEWS Pic

স্টাফ রিপোর্টার:

অপহরণের চারদিন পর খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙা উপজেলার মটরসাইকেল চালক আজিজুল হাকিম শান্তর লাশ উদ্ধার করা হযেছে। রবিবার সকাল ১০ টার দিকে খাগড়াছড়ির আলুটিলা পাহাড়ে তার লাশ পাওয়া যায়।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার দুপুরে খাওয়া-ধাওয়া শেষে মোটরসাইকেল ভাড়া মারার জন্য বের হওয়ার পর আর বাড়িতে ফিরেনি। নিখোঁজ মোটরসাইকেল চালক মো. আজিজুল হাকিম শান্তর বাবা মো. ছালেহ আহাম্মদ জানান, সেদিন রাত ৯টার সময় খাগড়াছড়ি থেকে ভাড়া নিয়ে মাটিরাঙ্গা ফিরে এসে সর্বশেষ কথা বলে সে।

এরপর থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত তার মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও সে ফোন ধরেনি। তখন বিষয়টি পার্শ্ববর্তী লোকজন ও অন্যান্য মোটরসাইকেল চালকদের জানালে তারাও তার সাথে কথা বলার চেষ্ঠা করে ব্যার্থ হয়। সারারাত তাকে বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করার পর পাওয়া যায়নি।

নিখোঁজ মোটরসাইকেল চালক আজিজুল হাকিম শান্ত মাটিরাঙ্গা পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের নতুনপাড়া গ্রামের মো. ছালেহ আহাম্মদ এর ছেলে। ব্যাক্তিগত জীবনে বিবাহিত শান্ত এক কণ্যা সন্তানের জনক।

বিস্তারিত আসছে…

মহেশখালীতে অস্ত্র ঠেকিয়ে স্কুল ছাত্রী অপহরণ

নিজস্ব প্রতিনিধি:

মহেশখালীর কালারমারছড়ায় এক স্কুল ছাত্রী (এসএসসি পরীক্ষার্থী) কে বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পথে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে গভীর অরণ্যে নিয়ে গেছে সন্ত্রাসীরা। মঙ্গলবার বেলা ১২টায় কালারমারছড়ার পূর্ব আধাঁরঘোনার আনন্দ মার্কেটে এ ঘটনা ঘটে।

জনারণ্য এলাকা থেকে স্কুল ছাত্রীকে অপরহরণ করে নিয়ে গেলেও সন্ত্রসীরা ফাঁকা গুলি ছোড়ায় কেউ উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেনি। স্থানীয় আবুল কাসেমের পুত্র ও ওয়ার্ড মেম্বার নুরুল ইসলামের ভাতিজা রাসেলের নেতৃত্বে এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।

কালারমারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নির্মল ও কালারমারছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা পাহাড়ে তল্যাশী চালিয়েও স্কুল ছাত্রীকে উদ্ধার করতে পারে নি।

প্রত্যক্ষদর্শী রজমান আলী জানিয়েছেন, অস্ত্র ঠেকিয়ে স্কুল ছাত্রীকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। এখন যে অবস্থা বিরাজ করছে এতে কোন মেয়ে বিদ্যালয়ে যেতে পারবে না। এটি প্রকাশ্যে হওয়ায় প্রশাসনের নজরে এসেছে। অজান্তে অনেক কিছুই করে যাচ্ছে সন্ত্রাসীরা।

কালারমারছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবুল হাসেম ও সিনিয়র শিক্ষক রুহুল আমিন জানিয়েছেন, বিদ্যালয় থেকে কোচিং শেষে বাড়ি ফেরার পথে শিক্ষার্থীকে অপহরণ করা হয়েছে। অপহরণকারিরা প্রভাবশালী হওয়ায় ওই শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করতে কেউ এগিয়ে আসেনি। বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। আমরা নিজেরাও তাকে উদ্ধারে পাহাড়ী এলাকায় গিয়েছি।

কালারমারছড়া পুলিশ ফাড়ির ইনচার্জ এসআই নির্মল জানান, স্কুল ছাত্রীকে উদ্ধারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অপহৃতাকে উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

পাহাড়ে অপহরণ-মুক্তিপণ খেলা!

wadud bhuyan

ওয়াদুদ ভূইয়া

অবশেষে গতকাল ১৭ জুলাই ২০১৪ খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা থেকে অপহৃত চার শ্রমিক উদ্ধার। অপহরণের ১১ দিন পরে অপহরণকারীদের থেকে জেলার ব্যাঙমারা এলাকায় সেতু উন্নয়ন প্রকল্পের অপহৃত চার বাঙ্গালী শ্রমিককে উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী।

সিন্ধুকছড়ি জোনের আওতাধীন কংসীমুড়া প্রাক্তন সেনা ক্যাম্প এলাকা থেকে বৃহস্পতিবার রাত পৌন ৯টার দিকে তাদেরকে উদ্ধার করা হয় বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। উদ্ধারকৃতরা হলেন- বুলডোজার চালক রাজু মিয়া, বুলডোজারের হেলপার হাসান মিয়া, মো. ফারুক মিয়া ও লিয়াকত আলী।

এখানে পার্বত্য অঞ্চলের একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসাবে সংশ্লিষ্ট ও দায়িত্বযুক্ত মহলের কাছে আমার বিনীত প্রশ্ন:

. পাহাড়ের এই গরিব মানুষগুলো অপহরণ করলো কারা, করে আসছে কারা? তাদের সাংগঠনিক বা সামাজিক পরিচয় কি বের করা হয়েছে? সরকার/প্রশাসন তা প্রকাশ করেছে? তাদের নামে কি কোন মামলা নেয়া হয়েছে? যদি এসব না করা হয়ে থাকে, তাহলে কেন করা হয়নি? ভাসুরর নাম নিতে বাধা কোথায়? নাকি ভাসুরপোকে মাঝে মাঝে নিজের পো মনে হয়? নাকি নিজের পো’র মত করে লালন পালন করা হয়?

আজ সময় এসেছে পার্বত্যবাসী তা জানতে চায় এবং পার্বত্যবাসী তা সন্দেহের দৃষ্টিপথে ভাবছে! যা বিগত ৪০ বছরও ভাবার বা অনুভবযোগ্য মনে করেনি! কিন্তু আজ কেন করবে তাও দায়িত্ববানদের বিবেচনায় নেয়া দরকার। কারণ সংবাদে বলা হয়েছে অপহৃতদের উদ্ধার করা হয়েছে ঘেরাও দিয়ে, আবার কেউ কেউ বলছে এদের উদ্ধারের পেছনে স্থানীয় সরকারী দলের লালিত এক মেয়রের মাধ্যমে অপহৃতদের প্রকল্প কোম্পানি থেকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে অপহৃতদের মুক্তি দিয়েছে অপহরণকারীরা।

এখন প্রশ্ন হলো কোনটি সত্য? অন্যদিকে কেউ বলছে অপহরণকারীরা ইউপিডিএফ, আবার কেউ বলছে জেএসএস। আমি জানতে পেরেছি অপহরণকারীরা হচ্ছে ‘জেএসএস (সংস্কার)। পাহাড়ে আগে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, চাঁদা আদায়, হত্যাকারী ছিল শুধুমাত্র একটি আঞ্চলিক দল। আর এখন তা দাঁড়িয়েছে তিনগ্রুপে। এখন তিনগ্রুপই অপহরণ, চাঁদা আদায় ও সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। এই সন্ত্রাসের শিকার পাহাড়ের নিরীহ, নিরস্ত্র পাহাড়ি – বাঙ্গালী সবাই। জেএসএস-এর এক সময়ের ছাত্র সংগঠনের নেতার হাত ধরে, বর্তমানে ইউপিডিএফ শক্ত অবস্থান নিয়েছে। জেএসএস-এর শীর্ষ নেতাদের একসময়কার সহকর্মীরা ওয়ান-ইলেভেনে জাতীয় রাজনৈতিকদলগুলোর সংস্কারপন্থী গ্রুপের অনুকরণে এবং পার্বত্য অঞ্চলের ওই সময়কালের ক্ষমতাসীনদের অনুগ্রহবর্ষণে বা নির্দেশনায় জেএসএস (সংস্কার) নামে পাহাড়ে তৃতীয় আঞ্চলিক শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।

বর্তমানে এই তিনটি আঞ্চলিক অস্ত্রধারী দল পাহাড়ে, আবার দেশের বাহিরে নিজেদেরকে গ্রুপভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসাবে পরিচয় দিয়েও অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘমেয়াদে। এই তিনগ্রুপের নির্যাতনের লক্ষ্যই হলো নিরস্ত্র বাঙ্গালী -পাহাড়ি বিশাল জনগোষ্ঠী। মনে হয় যেন, রাষ্ট্র এই জনগোষ্ঠীর সাথে নাই, বরং অনেকটা সহানুভূতিশীল অস্ত্রধারী ক্ষুদ্র গ্রুপগুলোর পক্ষে।

17.07.2014_Matiranga Labour Recover Pic-03

. অপহৃত চারজনকে উদ্ধার করা হলো, খুবই খুশির খবর। কিন্তু অপহরণকারীদের মধ্যে থেকে একজনও ধরা পড়লো না! অতীতে কি উল্লেখযোগ্য কোন অপহরকারী আটক হয়েছিল? হয়ে থাকলে তাদেরকে কি বিচারের আওতাভুক্ত রাখা হয়েছে? আমার জানামতে তেমন উল্লেখযোগ্য কেউ নেই। তাহলে কি কারনে অপরাধীদেরকে তাদের অপকর্ম সহজতর করে দেয়া হচ্ছে? এতে কি এই অপহরণ, গুম, হত্যা ইত্যাদি দীর্ঘপথে নিয়ে যেতে রাষ্ট্র সহায়ক ভূমিকা রাখছে না? কেউ কেউ মনে করে, রাখছে। নিকট আগামীতে রাষ্ট্রকেই এ আঘাতজনিত ব্যথাহত হতে হবে। এটা আমাদের সবাইকে ভেবে দেখা জরুরি।

. আমাদের জানতে ইচ্ছে করে প্রায় ৫-৬ মাস আগে খাগড়াছড়ি সদরের ভূয়াছড়ি থেকে অপহৃত শিশু শহিদুলকে কেন আজও উদ্ধার করা হলো না? বা উদ্ধারকাজ চলছে কিনা? কিন্তু ওই শিশু অপহরণের পর মহালছড়ি-রাংগামাটি সড়কে অপহৃত রাংগামাটির বিশিষ্ট শিল্পী ও দেশের বড় আমলার মেয়ের পাহাড়ি জামাই হওয়াতে তাকে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হল। কিন্তু বাঙ্গালী শিশুটি কি গরিব ঘরের সন্তান বা সরকার দলের কোন মদদপুষ্ট মেয়রের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকার বিনিময় করতে পারেনি বলে শিশুটির ভাগ্যে কি ঘটেছে আজও তার মা-বাবা ও পার্বত্যবাসী জানতে পারছে না? তাহলে এখানে দায়িত্বশীলদের ভূমিকা কই? তাহলে কি শুধু অর্থ ও মুক্তিপনের বিনিময়েই আমাদের মুক্তি হবে,বছরের পর বছর?

. আজ পাহাড়ের সাধারণ নাগরিক তথা নিরস্ত্র পাহাড়ি -বাঙ্গালীরা জানতে চায়, কবে আর কতকাল পরে পাহাড়ে শান্তি স্থাপন হবে। হবে নাগরিকদের বসবাসযোগ্য একটু স্বাধীন ভূমি? আমার দীর্ঘদিন পাহাড়ে কাজ করে একটা বিষয়ে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, পাহাড়ের সাধারন নাগরিকরা সত্যিই শান্তিতে বসবাস করতে চায়, সমঝোতা ও সহাবস্থান চায়। চায় শান্তি ও উন্নয়ন এবং এই অস্ত্রহীন পাহাড়ি – বাঙ্গালীরা সত্যিকারভাবেই এই সন্ত্রাসী অস্ত্রধারী চাঁদাবাজদের পতন চায়। এখন দরকার সকল মহলের আন্তরিক ইচ্ছা, যা কিনা সাধারণ মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাবে, যা হলে এই চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে রুখে দেয়া খুব কঠিন নয়। এ অবস্থায় পাহাড়বাসীর পক্ষে এ বিষয়ে আমি সকলের শুভ ইচ্ছাময় ভূমিকা কামনা করছি।

লেখক: সাবেক সংসদ সদস্য, ও সাবেক চেয়ারম্যান, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড

পাহাড়ে অপহরণ আতঙ্ক: এখনো উদ্ধার হয়নি লংগদুতে অপহৃত ২ ভাই

Follow Up - Copy

স্টাফ রিপোর্টার, রাঙামাটি:

এখনো উদ্ধার হয়নি রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় অপহৃত দু’ভাই। সোমবার মধ্যরাতে জেলার লংগদু উপজেলার আটারক ছড়া ইউনিয়নের বড় উল্টাছড়ি নামক গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে প্রিয়ময় চাকমা ও তার বড় ভাই সুসময় চাকমাকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যায় সশস্ত্র উপজাতি সন্ত্রাসীরা।

 

২দিন পার হয়ে গেলেও কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি অপহৃতদের। কার্বারী (গ্রাম প্রধান) প্রিয়ময় চাকাম ও তার বড় ভাই আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি জেএসএসের নেতা বলে দাবী করেছে সংগঠনটি। তাই চুক্তি বিরোধী সংগঠন জনসংহতি সমিতির বিদ্রোহী গ্রুপ এমএন লারমা (সংষ্কারপন্থী) এ অপহরণের ঘটনার সাথে জরিত বলে জানিয়েছে, জেএসএসের সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা।

তবে জেএসএসের বিদ্রোহী গ্রুপ এমএন লারমা (সংষ্কারপন্থি) তথ্য ও প্রচার সম্পাদক প্রশান্ত চাকমা অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, জেএসএসের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এতে তাদের সংগঠন কোনো ভাবেই জড়িত নয়।

এ ব্যাপারে রাঙামাটি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) হাবিবুর রহমান হাবিব জানায়, অপহৃতদের উদ্ধার তৎপরতা চলছে। বিভিন্ন  পাহাড়ি এলাকায় পুলিশের বিশেষ টিম, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও প্রশাসনের বিভিন্ন বাহিনী উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হবে।

অভিযোগ উঠেছে, সারা দেশেরমত তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়িবান্দরবানে উদ্বেগজনক হারে গুম, হত্যা ও অপহরণ ঘটনা ঘটছে। বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা। পাহাড়ে বিরাজ করছে অপহরণ আতংক। প্রায় প্রতিদিনই পার্বত্যাঞ্চলের আনাচে কানাচে কোথাও না কোথাও ঘটছে এসব অপরাধমুলক কর্মকান্ড।

একাধিক সূত্রের তথ্য মতে, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর এ পর্যন্ত কমপক্ষে দুই হাজারের মতো মানুষ অপহরণের শিকার হয়েছে তিন পার্বত্য জেলায়। খুনের শিকার হয়েছে পাঁচ শতাধিক মানুষ। গুমের ঘটনা ঘটেছে অহরহ। যার কোনো সঠিক তথ্যও নেই।

তথ্য সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১৬ ফেব্রয়ারি জেলার লংগদু এলাকা থেকে একসঙ্গে ৭০ জেএসএস কর্মী ও সমর্থককে অপহরণ করে দুর্বৃত্তরা। পরে সামাজিক সমঝোতার মাধ্যমে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। ওই ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। তার আগে ২০১২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে অপহৃত হন রাঙামাটি কৃষক লীগের সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অনিল তঞ্চঙ্গ্যা। অপহরণের পর এ পর্যন্ত তার আর কোনো হদিস মেলেনি। সবার ধারণা অপহরণের পর হত্যা করে তার লাশ গুম করেছে দুর্বৃত্তরা। এছাড়াও পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর জানা অজানা অহরহ অপহরণ ঘটনা ঘটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী জেলায় এ বছর মার্চ মাসে ২৭টি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। তন্মধ্যে মামলা হয়েছে খুনের ঘটনায় পাঁচটি, অপহরণ ঘটনায় একটি ও অস্ত্র আইনে একটি। অন্য মামলাগুলো হয়েছে চুরি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে।

রাঙামাটি জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ (ডিএসবি) জানান, রাঙামাটি জেলায় গত ২০১৩ সালে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২০টি। অপহরণ ঘটনায় মামলা হয়েছে পাঁচটি। এ পাঁচ মামলায় ছয় আসামির মধ্যে গ্রেফতার হয়েছে মাত্র তিনজন। ২০১৪ সালে এ পর্যন্ত জেলায় খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১১টি। আর অপহরণ ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র দুইটি। এছাড়া ২০১৩ সালে জেলায় অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে চারটি। এসব মামলা মূলে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ১৭টি। ২০১৪ সালে এ পর্যন্ত জেলায় অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে তিনটি। আর মামলা মূলে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে দুইটি।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ, পেশিশক্তির লড়াই, মুক্তিপণ ও চাঁদা আদায়, আধিপত্য বিস্তার, এলাকা দখল, সাম্প্রদায়িক সহিংসতাসহ নানা কারণে খুন, অপহরণ ও গুমের ঘটনাগুলো পাহাড়ে বেশি ঘটছে। কিন্তু তুলনামুলকভাবে এসব অপরাধমুলক ঘটনায় থানায় বা আদালতে মামলা হয় খুব কম। নিরাপত্তা সংকট ও সামাজিক সমঝোতা এর কারণ। যা কারণে অপরাধীরা অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে।

নাইক্ষ্যংছড়িতে অপহৃতদের খোঁজ মেলেনি এখনও

Untitled-1

নিজস্ব প্রতিবেদক:

অপহরণের ২১ ঘণ্টা পরও বান্দরবানের বাইশারি কৃষি ব্যাংকের ক্যাশিয়ার জীতেন্দ্র কিশোর দেবসহ অপহৃত তিনজনের খোঁজ মেলেনি। সোমবার রাত সাড়ে ৯টায় ঈদগড়-বাইশারি সড়কের ব্যাঙডোবা এলাকায় অস্ত্রের মুখে যাত্রীবাহী মিনিবাস থামিয়ে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের বাইশারি শাখার ক্যাশিয়ার জীতেন্দ্র কিশোর দেবসহ তিনজনকে অপহরণ করে সন্ত্রাসীরা।

 

অপহরণকারীরা এখনো অপহৃতদের পরিবারের কাছ থেকে কোনো মুক্তিপণ চায়নি। যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ প্রশাসন। অপহৃত তিনজনের মধ্যে ব্যাংকের ক্যশিয়ার জীতেন্দ্র কিশোর দেব এবং ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক মাহববুবুর রহমান সেলিমের পরিচয় জানা গেলেও অপরজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। ঘটনার পরপরই পুলিশ ও নাইক্ষ্যংছড়িতে দায়িত্বরত বিজিবি’র ৩১নং ব্যাটালিয়নের জওয়ানরা উদ্ধার অভিযান শুরু করে।

ব্যাটেলিয়ন কমান্ডার লে. কর্নেল শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, অপহৃতদের অবস্থান সম্পর্কে তারা প্রায় নিশ্চিত হয়েছেন। তবে কি কারণে এবং কারা তাদের অপহরণ করেছে- সে বিষয়ে পুলিশ বা অপহৃতদের আত্মীয়-স্বজনরা কোন তথ্য জানাতে পারেননি।

বান্দরবান পুলিশ সুপার দেবদাশ ভট্টাচার্য্য জানান, অপহৃত এলাকাটি বান্দরবান ও কক্সবাজার সীমানার মধ্যবর্তী এলাকা। মিয়ানমার ও বাইশারী এলাকার সন্ত্রাসীরা যৌথ ভাবে অপহরনের কাজটি করেছে। কক্সবাজার ও বান্দরবানের পুলিশ যৌথ ভাবে অপারেশনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নাইক্ষ্যংছড়ির স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন যাবৎ এ অঞ্চলে ডাকাতি-অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। বেশীর ভাগ অপহরনের ঘটনা ঘটছে বাইশারী এলাকার খাস জমি নিয়ে। বাইশারির বড় বড় রাবার বাগানের মালিকদের ইন্দনে অপহরণ-ডাকাতিরমত পরিকল্পিত বিভিন্ন ঘটনা ঘটানোর অভিযোগ এলাকার সচেতন মহলের। বিভিন্ন ঘটনার ধারাবাহিকতায় এবারও মুক্তিপণের জন্যেই তাদের অপহরণ করা হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

ইদগড় পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. ফিরোজ জানান, সি লাইন পরিবহনের একটি ছোট বাস রাত সাড়ে ৮টার দিকে তিনজন যাত্রী নিয়ে ইদগড় বাজার থেকে বাইশারী আসার পথে ব্যাঙ্গ ডোবা এলাকায় পৌঁছালে সেখানে ওত পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা গাড়ির গতিরোধ করে তিনজনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। দুর্বৃত্তরা ডাকাত হয়ে থাকতে পারে বলে পুলিশ ধারণা করছে। বাসের চালক পুলিশকে জানিয়েছেন দুর্বৃত্তরা হঠাৎ গাড়ির গতিরোধ করে তিনজন যাত্রীকে বেঁধে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়।

বাইশারী পুলিশ ফাড়ির ইনচার্জ আনিসুর রহমান জানান, রাত ৮টার দিকে অজ্ঞাত স্থান থেকে এক মহিলা ফোনে তাকে জানিয়েছেন ব্যাঙ্গ ডোবা এলাকার জঙ্গলে একদল ডাকাত জড়ো হয়েছে। তিনি বিষয়টি ইদগড় পুলিশকে জানিয়েছেন। ব্যাঙ্গ ডোবা স্থানটিতে প্রায় সময় ডাকাতির ঘটনা ঘটে থাকে বলে পুলিশ জানিয়েছে। বাইশারী ইদগড় সড়কে ডাকাতির ঘটনা বেশি হওয়ায় পুলিশ টহল দিলেও রাত ৮টার পর কোনো টহল থাকে না। গাড়ির চালকদের মানা করা সত্ত্বেও তারা ঝুঁকি নিয়ে যাত্রী পরিবহন করে থাকে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এদিকে, অপহৃত সেলিমের স্ত্রী শাহানা বেগম জানান, মঙ্গলবার সকালে মোবাইল ফোন করে সেলিম তাকে জানিয়েছে, তারা তিনজনই একই ঘরে আটক রয়েছেন এবং ভালো আছেন। তবে কি কারণে তাদের অপহরণ করা হয়েছে- সে বিষয়ে কোন তথ্য জানাননি তিনি।

ব্যাংকের বাইশারি শাখা ব্যবস্থাপক অসীম বড়ুয়া জানান, একদিনের ছুটি নিয়ে জীতেন্দ্র কিশোর দেব রবিবার বাড়ি যান। অফিসে ফেরার পথে অন্য দু’জনের সঙ্গে তিনিও অপহৃত হন।

লংগদু উপজেলায় কার্বারীসহ জেএসএস’র দুই নেতা অপহৃত

অপহরণ

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

রাঙামাটিলংগদু থেকে এক গ্রামপ্রধান(কার্বারী)সহ দুই উপজাতিকে অপহরণ করার খবর পাওয়া গেছে। গতকাল রাত সাড়ে ১০টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

অপহূত ব্যক্তিরা হলেন বড় উল্টাছড়ির গ্রামপ্রধান/কার্বারী প্রিয়ময় চাকমা (৩৫) এবং তাঁর বড় ভাই সুসময় চাকমা (৪২)। তাঁরা সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির সমর্থক বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।

লংগদুর স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার দিকে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত আটরকছড়া ইউনিয়নের বড় উল্টাছড়ি গ্রামে আসে। এ সময় তারা গ্রামপ্রধান প্রিয়ময় চাকমা ও তাঁর বড় ভাই সুসময় চাকমাকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে নিয়ে যায়। দুর্বৃত্তরা অপহূত ব্যক্তিদের পরিবারের লোকজনকে বাঘাইছড়িতে যোগাযোগ করতে বলে।

লংগদু জেএসএস সাধারণ সম্পাদক মনিশংকর চাকমা এ ঘটনার জন্য জেএসএস সংস্কারপন্থীদের দায়ী করে বলেছেন, বাঘাইছড়ি সংস্কারপন্থী নেতা জুপিটার চাকমার নেতৃত্বে এ অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে অপহৃতদের উদ্ধারে তৎপরতা শুরু করেছে।

বান্দরবানে কৃষি ব্যাংক শাখার ক্যাসিয়ারসহ ৩ জনকে অপহরণ

অপহরণ

স্টাফ রিপোর্টার, বান্দরবান:

বান্দরবানের বাইশারী কৃষি ব্যাংক শাখার ক্যাসিয়ারসহ ৩ জনকে অপহরণ করেছে দুর্বৃত্তরা। সোমবার রাতে (রাত সাড়ে ৯টার দিকে) ইদগড় বাইশারী সড়কের ব্যাঙ্গ ডোবা নামক স্থানে ব্যারিকেড দিয়ে দুবৃত্তরা একটি গাড়ি থেকে তাদের অপহরন করে নিয়ে যায়।

এ ঘটনার পর ঐ এলাকার আশেপাশের জঙ্গলে বিজিবি-পুলিশ তল্লাশী চালাচ্ছে। বাইশারী ও পাশ্ববর্তী ইদগড় পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা অভিযানে অংশ নিয়েছে। অপহৃদের মধ্যে দুজনের নাম পাওয়া গেছে, এরা হলো বাইশারী কৃষি ব্যাংক শাখার ক্যাসিয়ার জিতেন্দ্র নাথ ও স্থানীয় ভাড়ায় চালিত মটরসাইকেল চালক মো: সেলিম। অপর জনের নাম পাওয়া যায়নি।

তবে অপহরকারীরা এখনো তাদের পরিবারের কাছ থেকে কেউ কোন মুক্তিপণ চায়নি। ইদগড় পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো: ফিরোজ ও বাইশারী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আনিসুর রহমান জানান, সি লাইন পরিবহনের একটি ছোট বাস রাত সাড়ে ৮ টার দিকে ৩ জন যাত্রী নিয়ে ইদগড় বাজার হতে ছেড়ে বাইশারী আসার পথে ব্যঙ্গডোবা এলাকায় পৌছলে সেখানে ওঁৎপেতে থাকা দুর্বৃত্তরা গাড়ির গতিরোধ করে ব্যাংকের ক্যাসিয়ারসহ ৩ জনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। ঘ

টনার পর পরই ইদগড় বাইশারী ও চকরিয়া থেকে পুলিশ এসে তল্লাশী শুরু করে। দুর্বৃত্তরা ডাকাত হয়ে থাকতে পারে বলে পুলিশ ধারণা করছে।

বাসের চালক পুলিশকে জানিয়েছে দুর্বৃত্তরা হঠাৎ গাড়ির গতিরোধ করে ৩ জন যাত্রীকে বেঁধে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়। ৩ জনের মধ্যে একজন ব্যাংকের ক্যাসিয়ার ছিল। বাইশারী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আনিসুর রহমান জানান, রাত ৮ টার দিকে অজ্ঞাত স্থান থেকে এক মহিলা ফোনে তাকে জানিয়েছেন ব্যঙ্গডোবা এলাকার জঙ্গলে একদল ডাকাত জড়ো হয়েছে। তিনি তাৎক্ষনিক বিষয়টি ইদগড় পুলিশকে জানিয়েছেন।

ব্যঙ্গডোবা স্থানটিতে প্রায় সময় ডাকাতির ঘটনা ঘটে থাকে বলে পুলিশ জানিয়েছে। বাইশারী ইদগড় সড়কে ডাকাতির ঘটনা বেশি হওয়ায় পুলিশ টহল দিলেও রাত ৮টার পর কোন টহল থাকে না। গাড়ির চালকদের মানা করা সত্বেও তারা রাতে ঝুঁকি নিয়ে যাত্রী পরিবহণ করে থাকে বলে পুলিশ জানিয়েছে।