ত্রান চাইনা মাথা গোজার ঠাঁই চাই

কাপ্তাই প্রতিনিধি:

আমরা আশ্রয় চাই না আমরা মাথা গোজার ঠাঁই চাই। আর কত দিন এ আশ্রয় কেন্দ্রে থাকব। কোন বাসা বাড়ি নেই সব পাহাড় ধ্বংস করে নিয়ে গেছে। ঘর নেই, বাড়ি নেই, কাজ নেই থাকার কোন জায়গা নেই আমাদের আবার ঈদ।

কথা গুলো অতি দুঃখ বেদনা আর কান্না কণ্ঠে বলেছেন ইতিহাসের স্মরণ কালের মোরার আঘাত এবং ভয়াবহ পাহাড় ধ্বসে দীর্ঘ ১৩ দিন যাবত আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা নিহত  এবং আহত ঘর বাড়ি হারা পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় লোকজন।

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার পাহাড়, সবুজ বন আর জীববৈচিত্র্য এখন শুধু ধ্বংসলীলা। যে দিকে তাকানো হয় শুধু ধ্বংস আর ধবংস নেড়া পাড়া নিথর অবস্থায় পড়ে আছে সবুজ গাছ গাছিলা। কাপ্তাই উপজেলার ১৮জন লোক পাহাড় ধ্বসে মারা যায় এবং প্রায় শতাধীক লোকজন আহত হয়। শত, শত বসতঘর পাহাড় ধ্বসে বিধস্ত হয়ে অসহায় লোকজন কাপ্তাই আশ্রয় কেন্দ্রে মানবতার জীবন যাপান করছে। মাথা গোজার ঠাঁই খুঁজছেন।

পাহাড় ধ্বসে কাপ্তাই নিহত রমজান আলীর মা সুমি আক্তার বলেন, আমি স্বামী হারা, একটি ছেলে তাও কেড়ে নিল পাহাড়। আমি এখন অসহায় হয়ে পড়েছি। সরকার থেকে বিশ হাজার টাকা, ত্রিশ কেজি চাল পেয়েছি আর আশ্রয় কেন্দ্রে শুধু খানা দিচ্ছে আর কিছু পাচ্ছিনা।

পাহাড় ধ্বসে ঘর ভেঙ্গে কর্ণফুলী নদীতে বিলিন হয়ে যাওয়া অসুস্থ ইসমাইল, সাধন দাশ, মহি উদ্দিন, আমির আলী, রোজিনা বেগম, কমলা বালা জল দাশ এরা বলেন, আমাদের কাজ নেই, কোন কর্ম নেই, কোথায় যাব তারও কোন কুল কিনারা পাচ্ছিনা। নিজস্ব কোন সম্পত্তি নেই যে মাথায় গোজার ঠাঁই করে নিব। সরকারের পক্ষ হতে এখন পর্যন্ত কোন ধরনের সাহায্য পাচ্ছিনা যে সোজা হয়ে দাঁড়াবো। আর একদিন পরে আমাদের ঈদ ছেলে মেয়েদের যে একটি নুতন জামা কাপড় কিনে দিব মা, বাবা হয়ে তাও পারছিনা। আমাদের মতো দুঃখি মানুষের কান্না কেউ শোনেনা।

পঙ্গু হেলেনা বেগম বলেন, আমার ছোট ছেলে মেয়েরা কান্না করছে মা আমাদের ঘরে ফিরে চল আর আশ্রয় কেন্দ্রে থাকতে মন চায়না। মায়ের দুঃখ চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। আর বলছে বাবা আমাদের তো ঘর নেই থাকার জায়গা নেই কোথায় যাব।

এদিকে আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা ঘর-বাড়ি হারা ৬৩ পরিবারের ২শত ৬৪জন আজ প্রায় ১৪দিন যাবত নিথর অবস্থায় পড়ে আছে।তারা বলেন, শুধু প্রশাসনের পক্ষ হতে খাবার পাচ্ছি। আর কোন সাহায্য বা আমাদের কোন আশ্রয় দেওয়া হবে কিনা তা কেউ বলছেনা। এ রমযান মাসে আমরা সরকারকে বলতে চাই আমাদের চিরস্থায়ীর জন্য ঠাঁই দেওয়া হউক না হয় এ আশ্রয় কেন্দ্রে আমাদের সবাইকে মেরা ফেলা হউক।

 




দুর্গতের পাশে রাঙামাটি মেডিকেলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা

নিজস্ব প্রতিনিধি:

রাঙামাটির ভূমিধ্বসে মারা যায় অসংখ্য নিরীহ মানুষ, নেমে আসে বিপর্যয়। সুন্দর পাহাড়ে ঘেরা শহরটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে অন্য শহর হতে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন শহরে যেনো নেমে আসে অসভ্য কালোছায়া। স্বজনহারা, ঘরহারা মানুষরা তখন আশ্রয় নেয় বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে।

রাঙামাটি মেডিকেলের ছাত্ররা এসব কিছুর সাক্ষী, নিজ চোখে দেখেছে মাটিচাপা লাশ, স্বজনহারা মানুষের হাহাকার। দূর্যোগের কারণে বন্ধ হয় কলেজ, হল ছেড়ে চলে যায় সবাই। কিন্তু যে শহরে তারা বিদ্যার্জনে এসেছে যে মানুষগুলো তাদের কে বিভিন্নভাবে আপন করে নিয়েছে, সাহায্য করেছে বিভিন্ন ভাবে।

তাদের প্রতি, পাহাড়ের প্রতি মমতার টানে মেডিকেল কলেজের ২য় ব্যাচের মনিটর অর্নব ও কামরুল হাসান সজীব উদ্যোগ নেয় তাদের পাশে দাঁড়ানোর। সাথে সাথে সাড়া মেলে ব্যাচের সব শিক্ষার্থীর। ১৭ তারিখে ফেসবুকে তৈরি হলো ইভেন্ট ‘ভুমিধ্বসে দুর্গতদের পাশে এগিয়ে আসুন’। সাড়া পাওয়া যায় ঢাকা, চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যায়নরত বন্ধুদের।

এছাড়াও এতে সাড়া দেয় কলেজের অধ্যক্ষ ডা. টিপু সুলতান, ডা. বিপ্লব বড়ুয়াসহ অন্যান্য শিক্ষকদের। যাদের অনুপ্রেরণা ছাত্রদের এগিয়ে যেতে সাহস যোগায়। শুরু হলো বিভিন্ন স্থান হতে সাহায্য তোলা, বন্ধুদের কেউ ডোনেশন বক্স নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে শহরের মার্কেটে মার্কেটে, কেউ যাচ্ছে কোচিং সেন্টারে, কেউ বা স্যারদের কাছে। বিভিন্ন সংগঠন যেমন হাতেহাত ফাউন্ডেশন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

একদিকে খোঁজ চলছে আশ্রয়কেন্দ্রে কোন জিনিসটির অভাব, কোনটি পেলে এ ঘরহারা, স্বজনহারা মানুষরা একটু স্বস্তি পাবে যা ত্রাণ হিসেবে দেয়া যাবে। ৫দিনের তৎপরতায় ৩০০টি পরিবারকে ১৭টি করে ত্রাণ সামগ্রী দেবার মতো অর্থের যোগান মেলে। ফল স্বরুপ ২২ জুন ত্রাণ দেয়ার জন্য ৭জন অর্নব, সজীব, সাবিত, সাঈদ, জয়দেব, ইফরাদ, চয়ন। রাঙামাটির ছাত্রসহ অন্যান্য হাতেহাত ফাউন্ডেশনের সদস্য আরিফ, রমিজ, ফারুক, মুহিব, কামরুল, রাকিব।

এছাড়ও মো. বিল্লাল, অসীম, পরাগ, ত্রাণ নিয়ে বোট সহযোগে রওনা দেয়। বেলা ১২টার পর থেকে শুরু ত্রাণ বিতরণ যেখানে উপস্থিত ছিলেন অধক্ষ ডা. টিপু সুলতান, রাঙামাটি মেডিকেল কলজের কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষক। ত্রাণ বিতরণের আগ মুহূর্ত থেকে শুরু মুষুলধারে বৃষ্টি, যেনো থামতেই চায় না। কিন্তু এ বাঁধা থামাতে পারেনি এ তরুণদের। টানা ৬-৭ ঘন্টা বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে ৫টি আশ্রয়কেন্দ্র রাঙামাটি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, পুলিশ লাইন্স স্কুল, মনোঘর আবাসিক স্কুল, যুব উন্নয়ন কেন্দ্র, ভেদভেদি পৌর উচ্চবিদ্যালয়সহ একটি প্রত্যন্ত গ্রামের নাম উল্লাছড়া ত্রাণ দেয়া হয়। সন্ধ্যা নাগাদ ত্রাণ কাজ শেষ করে এ তরুণরা প্রবল বর্ষণের মাঝে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বোট সহযোগে রওনা দেয়। বাসায় ফিরে রাত ১২টার পর।




ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রান দিল চট্টগ্রামের ‘ইরা’

নিজস্ব প্রতিনিধি:

চট্টগ্রামের সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন ‘ইরা’র পক্ষ থেকে রাঙামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রান সহায়তা দেয়া হয়েছে।

শুক্রবার সকাল থেকে রাঙামাটির বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে ঘুরে ঘুরে এ সহায়তা প্রদান করা হয়। আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়া লোকজনের মাঝে শুকনো খাবার, ওষুধ, সাবান বিতরণ করেন তারা। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, মোনঘর আবাসিক স্কুল, উলুছড়া, আলুটিলাসহ বেশ কয়েকটি আশ্রয় কেন্দ্রে প্রায় পাঁচ শতাধিক লোকজনের মাঝে এসব ত্রান সহায়তা দেয়া হয়।

এসময় সংগঠনের সভাপতি প্রবীর দেবনাথ, সহ-সভাপতি শুভ বিশ্বাস, সাধারণ সম্পাদক জয়া শর্মা, সাংগঠনিক সম্পাদক তাসলিমুল হক শাওন, অর্থ সম্পাদক জয় পাল, জন যোগাযোগ বিষয়ক সম্পাদক ক্য মং চিং মার্মা (জয়), সদস্য তুলি চৌধুরী, নাঈম মাহমুদ, ফয়জুর রহমান দীপ্ত, অরিজিৎ বড়ুয়া, মিশকাত উপস্থিত ছিলেন।




কাপ্তাই-রাজস্থলী ১০টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে সংস্কার বাবদ অনুদান প্রদান

কাপ্তাই প্রতিনিধি:

পার্বত্য রাঙ্গামাটি আসনের সংসদ সদস্য উষাতন তালুকদার ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের ধর্মীয় উদ্দেশ্যে মঞ্জুরী খাতে কাপ্তাই ও রাজস্থলীর উপজেলার ১০টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে সংস্কার বাবদ অনুদান প্রদান করেন।

শুক্রবার সংস্কার ও পূর্ণবাসনের জন্য দুই লাখ চল্লিশ হাজার টাকা প্রতিষ্ঠান প্রধানের নিকট এমপির প্রতিনিধি এম আর হোসাইন জহির(এপিএস) নিজ হাতে নগদ অনুদান প্রদান করে।

এছাড়া পাহাড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে অনুদান ও ত্রান প্রদান করা হয় বলেও জানান। 




পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ধস, অযাচিতভাবে প্রশ্নের তীর বাঙালিদের দিকে


পারভেজ হায়দার ::
গত ১১-১৩ জুন ভারি বর্ষণের সময় বৃহত্তর চট্টগ্রাম, অর্থাৎ চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং কক্সবাজারে দেড় শতাধিক মানুষের প্রাণহানী ঘটেছে। বৃহত্তর চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের করণে প্রাণহানির ঘটনা একবারে নতুন না হলেও এ বছরের পাহাড়ধসজনিত বিপর্যয় ইতিপূর্বের সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। বৃহত্তর চট্টগ্রামের মধ্যে নিঃসন্দেহে রাঙ্গামাটিতে এ বছর প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। মর্মান্তিক মানবিক বিপর্যয়ের এই বিষয়টি সামনে রেখে বর্তমানে বেসরকারি টেলিভিশনে টক-শোসমূহে বক্তাদের বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বার্থান্বেষী মহলের অযাচিত মন্তব্য এবং বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টগুলোতে আপাত দৃষ্টিতে সাম্প্রতিক পাহাড়ধসের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী করা হচ্ছে। গত ১৬ জুন ২০১৭ প্রথম আলো পত্রিকায় ‘ছয় বছরে নিহতদের ৬৪ ভাগ বাঙালি’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, বন ও পাহাড় কেটে যত্রতত্র বাঙালি পুনর্বাসন করা হয়েছে। অধ্যাপক আখতার পার্বত্য অঞ্চলের এই বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে যথেষ্ট গবেষণা করে উপরোল্লেখিত মন্তব্য করেছেন কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি একেবারে সরলীকরন করে পক্ষপাতমূলকভাবে কোন একটি জনগোষ্ঠীর উপর দোষ চাপিয়ে দেয়া সম্পূর্ণ অবিবেচনাপ্রসূত।

সাম্প্রতিক বছরগুলোর কথা যদি বিবেচনায় আনা হয়, তাহলে দেখা যায়, ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামের ৭টি স্থানে পাহাড় ধসের কারণে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়, ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামের লালখান বাজার মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড় ধসে ৪টি পরিবারের ১২ জনের মৃত্যু হয়, ২০১১ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রামের টাইগারপাস এলাকার বাটালি হিলের ঢালে পাহাড় ও প্রতিরক্ষা দেওয়াল ধসে ১৭ জনের মৃত্যু হয়, ২০১২ সালের ২৬-২৭ জুন চট্টগ্রাম, বান্দরবান, কক্সবাজার ও সিলেটে ৯৪ জন মৃত্যুবরণ করে। এছাড়া ২০১৫ সালের ২৬-২৭ জুন টানা বর্ষণ, ধস আর পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারে ১৯ জনের মৃত্যুর বিষয়ও এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর পাহাড়ধসজনিত এই প্রাণহানির বিষয় বিশ্লেষণে অনুমান করা যায় যে, পাহাড় ধসের ভৌগোলিক বিপর্যয় শুধুমাত্র পার্বত্য জেলাগুলোতে নয়, পাহাড় পরিবেষ্টিত বৃহত্তর চট্টগ্রামের অধিকাংশ স্থানেই ঘটছে। বৃহত্তর চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় ভৌগোলিক দিক দিয়ে কিছুটা ভিন্ন। এখানে সমতল ভূমির পাশাপাশি উঁচু-নিচু, ছোট-বড় অনেক পাহাড় বা টিলা রয়েছে। বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো সাধারণত মাটি এবং বালু মিশ্রিত, এসকল পাহাড়ের মাটি এটেল মাটির মত আঠালো নয়। এ অঞ্চলের পাহাড়গুলো সাধারণত পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের পাহাড়গুলোর মতো পাথর পরিবেষ্টিত নয়। এই পাহাড়গুলোর মাটি কোন নির্দিষ্ট শক্ত অবলম্বনের অনুপস্থিতিতে ভারি বর্ষণের ফলে সহজে ধসে পড়ে। এখানে সহায়ক অবলম্বন বলতে ব্যাপক বনায়নই গ্রহণযোগ্য সমাধান। কিন্তু যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিকতার ছোঁয়া পার্বত্য চট্টগ্রামেও পড়েছে। অনেক বছর আগে সাধারণত পাহাড়ের গ্রাম অঞ্চলে ‘সনাতনী উপজাতী বন ও কৃষি সভ্যতার’ ঐতিহ্যবাহী লোকজ শিক্ষা থেকে Watershed Management ও পরিবেশ সংরক্ষণের কলাকৌশল অনুসরন করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তাদের ঘরবাড়ি তৈরী করত। এবিষয় অনস্বীকার্য যে এ ধরনের লোকজ জ্ঞানকেই ১৯৯২ সালে প্রথম বিশ্ব ধরিত্রী সম্মেলনে Traditional Scientific Knowledge হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। অনেক আগের সেই সময়গুলোতে এই সনাতনী ধারা অবলম্বন করেই পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীরা পাহাড়ের মাটি না কেটে খুঁটির ওপর ‘টং ঘর’ তৈরি করা হতো। এছাড়া তাদের ধর্মীয় একটি সংস্কারও ছিল সেই সময়গুলোতে। প্রয়াত বিশিষ্ট উপজাতী গবেষক ও লেখক অমরেন্দ্র লাল খীসার গবেষণা পত্র থেকে জানা যায়, অধিকাংশ গোত্রের উপজাতীরা ‘ধরিত্রীকে আঘাত করে মাটি কর্ষণ করাকে পাপ মনে করতো’। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপজাতীদের জীবনে আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষা, বাসস্থান ও পোষাক পরিচ্ছেদে আমূল পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকাতেও উপজাতী যুবক-যুবতীদের জিন্স, টি-শার্টেই স্বাচ্ছন্দবোধ করতে দেখা যায়। এখানে আরো একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে পার্বত্য এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। অনেক আগে দুর্গম পাহাড় এবং প্রত্যন্ত এলাকায় যখন কোন রাস্তা-ঘাট ছিল না, পাহাড়িরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ভালো মূল্য পেত না। সাম্প্রতিক কয়েক দশকের ক্রম উন্নয়নের অন্যতম হচ্ছে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় রাস্তাঘাট তৈরি। বর্তমান সময়ে প্রত্যন্ত এলাকায় পাহাড়িদের উৎপাদিত পণ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যপক উন্নয়নের ফলে শহর এলাকায় পরিবহন সহজেই সম্ভব হয়। পাহাড়িরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ভালো দাম পাচ্ছেন এবং নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনেও ক্রমান্বয়ে আধুনিকতার সাথে মানিয়ে নিতে আগ্রহবোধ করেন। তার অর্থ হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন অর্থাৎ পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করা ছিল সময়ের দাবী।

প্রশ্ন হচ্ছে, যারা এই রাস্তাগুলো তৈরি করেছেন তারা কি যথেষ্ঠ নিরাপদভাবে রাস্তা তৈরি করতে পেরেছেন কি না? এর উত্তর হ্যাঁও হতে পারে আবার নাও হতে পারে। যেকোন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের সাথে আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নির্ভরশীল। বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাগুলো তৈরি করতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিবেচনায় পাহাড়ের পাদদেশসমূহ কেটে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। সাধারণ জ্ঞানে পাহাড়ি এলাকায় রাস্তার দীর্ঘস্থায়ীত্ব নিশ্চিত করতে পানি সঞ্চালনের সু-ব্যবস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়। যতটুকু জানা যায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরির ক্ষেত্রে পানি সঞ্চালনের জন্য উপযুক্ত কার্যকর ড্রেন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য নিরাপত্তার বিষয়টি ভালভাবে নিশ্চিত করেছেন। এছাড়াও সময়ে সময়ে প্রতিনিয়ত রাস্তাগুলোর রক্ষণাবেক্ষনের ব্যবস্থা তারা ভালোভাবেই করছেন। তাই, পাহাড় ধসের মূল কারণ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় আধুনিকতার অন্যতম নিয়ামক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, আধুনিক বাসস্থান তৈরি, পর্যটনের উন্নয়ন ইত্যাদি একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়। চট্টগ্রাম মহানগরীতে ২০০৭ সালের ভূমিধসের পর গঠিত তদন্ত কমিটি পাহাড় ধসের কারণ হিসেবে যে সমস্ত সমস্যা চিহ্নিত করেছিল তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভারি বর্ষণ, পাহাড়ের মাটিতে বালির ভাগ বেশি থাকা, উপরিভাগে গাছ না থাকা, গাছ কেটে ভারসাম্য নষ্ট করা, পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস, পাহাড় থেকে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না রাখা, বনায়নের পদক্ষেপের অভাব, বর্ষণে পাহাড় থেকে নেমে আসা বালি এবং মাটি অপসারনের দুর্বলতা ইত্যাদি। এখানে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে, অতি বৃষ্টিপাতও বালি/মাটি মিশ্রিত পাহাড়ধসের অন্যতম ‘কারণ’ হিসাবে চিহ্নিত। নাসার তথ্যমতে, গত ১২-১৪ জুন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ৫১০ মিলি অর্থাৎ ২০ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হয়েছে (ডেইলি স্টার, ১৭ জুন ২০১৭)। শুধুমাত্র ১৩ জুন সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত, একদিনে রাঙ্গামাটিতে ৫২৪ মিলি বৃষ্টিপাত হয় (ইন্ডিপেন্ডেন্ট, ১৪ জুন ২০১৭)। পূর্ববর্তী বছরগুলোতে দৃষ্টিপাত পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, রাঙ্গামাটির জুন মাসের গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হলো, ৪৫৩.১ মিলি (২০১৬), ৩৯৭.৩ মিলি (২০১৫), ৩৩৬.৭ মিলি (২০১৪), ৩১৬.৯ মিলি (২০১৩), ৩৩৫.৪ মিলি (২০১২)। অর্থাৎ পাহাড়ধস জনিত মানবিক বিপর্যয়ের ওই দিনগুলোতে একদিনের গড় বৃষ্টিপাত অন্যান্য বছরের জুন মাসের গড় বৃষ্টিপাতের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ বৃহত্তর চট্টগ্রামের পূর্বের অভিজ্ঞতার বিবেচনায় বর্তমান বছরের পাহাড়ধসের কারণ হিসাবে শুধুমাত্র একটি জাতিগোষ্ঠী, অর্থাৎ বাঙালিদের দায়ী করা নিতান্তই অবিবেচনা প্রসূত, অপরিপক্ক চিন্তা-ভাবনা বলে প্রতীয়মান হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে গত শতকের ৭০ এবং ৮০ দশকে তৎকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যে সকল বাঙালিকে পুনর্বাসন করা হয়েছিল, তাদের পরিবার প্রতি পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন খাস জমি থেকে সমতল ভূমি হলে ২.৫ একর আবার পাহাড় এবং সমতল মিশ্র ভূমি হলে ৪ একর ও সম্পূর্ণ পাহাড়ি ভূমি হলে ৫ একর করে জমির বন্দোবস্তি দেওয়া হয়েছিল। এ প্রসংগে উল্লেখ করা যেতে পারে, খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি এলাকার ৩টি মৌজায় ১৮,৮৬৪ একর, বাবুছড়া এলাকার ৬টি মৌজায় ১৭,৬৭৩ একর, বড় মেরুং এলাকার ২টি মৌজায় ১১,৮৯৩ একর, ছোট মেরুং এলাকার ১টি মৌজায় ১০,৪৮১ একর, খাগড়াছড়ি সদর এলাকার গোলাবাড়ী মৌজায় ১৯,৬১৬ একর, মহালছড়ি এলাকার ৭টি মৌজায় ২৬,৬২৫ একর, রামগড় এলাকার ২টি মৌজায় ২৬,৬৭৪ একর, আলুটিলা এলাকার ৯টি মৌজায় ২৯,৩৪৭ একর, মানিকছড়ি এলাকার ৭টি মৌজায় ২২,৫৪৪ একর, লক্ষীছড়ির ৫টি মৌজায় ১৩,১৬৫ একর, কাপ্তাই এলাকার ২টি মৌজায় ১৭,৮৭৯ একর, রাঙ্গামাটি সদর এলাকার ৪টি মৌজায় ৭,২১৬ একর, বুড়িঘাট এলাকার ৬টি মৌজায় ১০,৫৯৪ একর, জুরাছড়ি এলাকার ৪টি মৌজায় ৯,৩০০ একর, ভূষণছড়া এলাকার ৬টি মৌজায় ২৬,৭১৭ একর, সুভলং এলাকার ২টি মৌজায় ১০,৯০৫ একর, লংগদু এলাকার ২টি মৌজায় ৮,৬৯৭ একর, কাচালং এলাকার ১টি মৌজায় ১৪,০০০ একর এবং আটারকছাড়া এলাকার ১টি মৌজায় ২,৬৩৩ একর জমি বাঙালিদের বন্দোবস্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন সময়ে শান্তিবাহিনীর আক্রমণ এবং নিরাপত্তা জনিত কারণে অধিকাংশ বাঙালি পরিবারকে সরকার তাদের বন্দবস্তিকৃত জমিগুলোতে স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ পায়নি। ১৯৮৬ সাল পরবর্তী সময়ে তাদের নিরাপত্তা বিবেচনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার গুচ্ছগ্রামে স্থানান্তর করা হয়। তবে সরকারি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অনেক বাঙালি অবৈধভাবে রাস্তা সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশে ঘরবাড়ি তৈরি করে থাকছে। একই সাথে উপজাতীয়দের অনেকেও বাঙালিদের মতো পাহাড়ের পাদদেশে ঘরবাড়ি তৈরি করে বসবাস করছে। এ ক্ষেত্রে, উভয় সম্প্রদায়ই সনাতন উপজাতীয়দের বহুল প্রচলিত লোকজ প্রথা অর্থাৎ Watershed Management অনুসরণ করে, অর্থাৎ পাহাড়ের মাটি না কেটে খুটির উপর ‘টং ঘর’ জাতীয় ঘরে বসবাস করছে না। বাঙালি/পাহাড়ি উভয় সম্প্রদায় পাহাড় কেটে অনিরাপদভাবে তাদের বসতবাড়ি নির্মাণ করে অবস্থান করছে। প্রথম আলোর ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় পাথুরে না হলেও, গাছের আচ্ছাদন এ পাহাড়কে ধস থেকে রক্ষা করে, কিন্তু পাহাড় দিন দিন ন্যাড়া হয়েছে’। প্রকৃতপক্ষে, এই পাহাড় ন্যাড়া হওয়ার পিছনে উপজাতীয়দের বহুল প্রচলিত জুম চাষই দায়ী। জুম চাষের জন্য একটি পাহাড়কে উপযোগী করার জন্য পাহাড়ের সমস্ত গাছ পুড়িয়ে ফেলা হয়। তারপর ওই জমিতে ক্রমান্বয়ে জুম চাষ করা হয়। পূর্বে পার্বত্য এলাকায় যখন জনসংখ্যা কম ছিল, পাহাড়িরা এক বছরে একটি পাহাড় পুড়িয়ে জুম চাষ করার পর পরের বছরে অন্য একটি পাহড়ে জুম চাষ করতো। এভাবে প্রতি বছর পাহাড় পরিবর্তন করে প্রথম পাহাড়ে ফিরে আসতে তাদের ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগতো। তাই একটি পাহাড় জুম চাষের ফলে প্রথম বছর ভূমি ধসের ‘কারণ’ তৈরি করলেও ১৫ থেকে ২০ বছর পর ঐ জমিতে ফিরে আসার কারণে মধ্যবর্তী বছরগুলোতে নতুন করে প্রাকৃতিকভাবেই বনাঞ্চল তৈরি হয়ে যেত। কিন্তু বর্তমানে উপজাতীয়দের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবার কারণে ২ থেকে ৩ বছর পর পর একই পাহাড়ে পুনরায় জুম চাষ করার ফলে সেখানে প্রাকৃতিকভাবে নতুন বনাঞ্চল তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকছে না। তাই একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম এর পাহাড় ধসের পিছনে জুম চাষ প্রথা অন্যতমভাবে দায়ী।

এখানে উল্লেখ্য, জুম চাষ শুধুমাত্র উপজাতীয়রাই জনগোষ্ঠীরা করে থাকে, বাঙালিরা জুম চাষে অভ্যস্ত নয়। গত ১১-১৩ জুন রাঙ্গামাটির বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত পাহাড়ধসের বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পাহাড়ের পাদদেশে অবৈধভাবে বাঙালি ও পাহাড়িদের অনিরাপদভাবে তৈরিকৃত বাসস্থান এলাকায় পাহাড়ধসের পাশাপাশি, জনবসতিহীন অনেক পাহাড়েও ব্যাপক ভূমিধস হয়েছে। তাই এ বিষয় নিশ্চিত করে বলা যায়, পাহাড়ের পাদদেশে অবৈধভাবে বাঙালি বা পাহাড়িদের বসতি স্থাপনই ভূমিধসের অন্যতম কারণ নয়, যদি তাই হতো তাহলে যে সকল পাহাড়ে বসতি স্থাপিত হয়নি, সেই পাহাড়গুলোতে ভূমি ধস হতো না।

উপর্যুক্ত আলোচনায় এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং টক-শোগুলোতে লেখক এবং বক্তাগণ প্রকৃত গবেষণাপ্রসূত বক্তব্য উপস্থাপন না করে অবিবেচনা প্রসূত ও অপরিপক্ক বক্তব্য দিচ্ছেন। এতে করে পাহাড়ধসের প্রকৃত কারণ অপ্রকাশিত থেকে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পাহাড়ধসের কারণ হিসেবে ‘শুধুমাত্র পাহাড়ি’ অথবা ‘শুধুমাত্র বাঙালিরা’ দায়ী একথা ঢালাওভাবে বলা যাবে না। সময়ের প্রয়োজনে যুগের সাথে সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে পরিবর্তন আসা খুবই স্বাভাবিক। আধুনিকতার এ পরিবর্তন ছিল সময়ের দাবি, যা বাঙালি বা পাহাড়ি কারো পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

২০০৭ সালে চট্টগ্রাম মহানগরীতে ভূমিধসের পর গঠিত তদন্ত কমিটি কর্তৃক পাহাড়ের ৫ কি. মি. এর মধ্যে আবাসিক প্রকল্প গড়ে না তোলা, পাহাড়ে জরুরি ভিত্তিতে বনায়ন, ঢালু পাহাড়ে গাইড ওয়াল নির্মাণ, পানি নিষ্কাশনের ড্রেন ও মজবুত সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, পাহাড়ের পানি ও বালি অপসারনের ব্যবস্থা করা, যত্রতত্র পাহাড়ি বালি উত্তোলন নিষিদ্ধ করা, পাহাড়ি এলাকার ১০ কি. মি. এর মধ্যে ইটের ভাটা নিষিদ্ধ করা, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসতি স্থাপন নিষিদ্ধ করা, পাহাড় কাটার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। যতটুকু জানা গেছে, এবারও পাহাড়ধসের সমস্যা চিহ্নিত ও করণীয় নির্ধারনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সত্যব্রত সাহা’কে প্রধান করে ২১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি নিশ্চয়ই পাহাড়ধসের সঠিক কারণ চিহ্নিত করতে এবং পরবর্তী কর্মপন্থা সম্পর্কে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের মতামতের আলোকে সুপারিশ করবেন। এর মধ্যে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে মনগড়া বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা করা সমীচীন নয়। বর্তমানে পাহাড়ধসে পাহাড়ি বাঙালি উভয় সম্প্রদায় তীব্র মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে আছেন। সরকার প্রাকৃতিক এই বিপর্যয় থেকে উত্তোরণে এবং ক্ষতিগ্রস্থ মানুষগুলোকে স্বাভাবিক জীবন ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছেন। আমাদের সকলেরই উচিত সংঘটিত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতিকে ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করে নিজস্ব স্বার্থান্বেষী আচরণ পরিহার করা। এই দেশ আমাদের সকলের। পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠী এই স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের গর্বিত নাগরিক। পার্বত্য এলাকায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের এই সন্ধিক্ষণে ব্যক্তিগত পছন্দ ও মতামতকে ঊর্ধ্বে রেখে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ একসাথে কাজ করবে, এটাই কাম্য।

লেখক : পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক    




আট দিন পর চালু হলো চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মহাসড়ক

রাঙামাটি প্রতিনিধি:

ভারী বর্ষণে সড়ক ধ্বসের আট দিন পর রাঙামাটির সঙ্গে চট্টগ্রামের মহাসড়ক যোগাযোগ চালু করা হয়েছে।  বুধবার দুপুরে সড়কটি হালকা যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।

গত ১৩ জুন প্রবল বর্ষণে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম প্রধান সড়কের শালবাগান এলাকায় ১৫০ মিটার সড়ক ধ্বসে পড়ে। এর পর থেকে রাঙামাটির সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষ। পরে বিকল্প সড়ক তৈরির কাজ শুরু করে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর এবং সেনাবাহিনী। এক সপ্তাহ ধরে দিনরাত পরিশ্রমের পর আজ দুপুরে সড়কটি হালকা যান চলাচলের উপযোগী করে খুলে দেওয়া হয়।

সড়কটি চালুর সময় উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এমএএন সিদ্দিক, সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার, বিভাগীয় কমিশনার মো. রুহুল আমিন, রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. ওমর ফারুক, রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান ও পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের সচিব এমএএন ছিদ্দিকুর রহমান জানিয়েছেন, বুধবার আড়াইটায় হালকা যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে।

রাঙামাটি-চট্টগ্রাম, রাঙামাটি-বান্দরবান, রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কের ৭টি রুটের ১৪৫টি স্থানে পাহাড় ধ্বস হয়েছে। এছাড়া সড়কের ৩৭টি স্থান ভেঙ্গে পড়েছে। এর মধ্যে ঘাগড়ার শালবাগান এলাকার সড়কটি ৬১কি.মি. এলাকায় একশ ফুট সড়ক ২শ-৩শ ফুট পাহাড়ের নিচে ধসে গেছে। সড়কগুলো প্রথমদিকে হালকা যান চলাচলের জন্য সচল করা হয়েছে। পরবর্তীতে মাসখানেকের মধ্যে স্থায়ী সমাধানের মাধ্যমে ভারী যান চলাচলের জন্য উপযোগী করা হবে।

সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার বলেন, ‘আপনাদের আমরা কথা দিয়েছিলাম তিনদিন আগে, এ রাস্তাটা ছোট গাড়ি চলাচলের জন্য তুলে দেব। আল্লাহর অশেষ রহমত। বৃষ্টি হয়েছে এর মধ্যে, তারপরও আমরা আমাদের কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন এবং রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে একত্রে মিলে এটা একটা অসাধ্য সাধন করেছি।’

জাহাঙ্গীর আলম আরও বলেন, ‘গত ১৩ তারিখ থেকে আজ পর্যন্ত চলাচল বন্ধ ছিল, মানুষের যে ভোগান্তি হচ্ছিল, ভোগান্তিটা অ্যাটলিস্ট আজকে থেকে সমাধান হবে ইনশাল্লাহ। যেখানে যেখানে সমস্যা আছে সেই সমস্যাগুলো সমাধান করা হবে এবং ইনশাল্লাহ ছোট গাড়ির কোনো সমস্যা হবে না।’




কাপ্তাই ইউনিয়ন বিএনপির ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত

কাপ্তাই প্রতিনিধি:

কাপ্তাই ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের উদোগে মঙ্গলবার রিভার ভিউ পিকনিক ক্যাফেতে মো. ইউসুফ এর সভাপতিত্বে ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এ সময় শ্রমিকদলে নেতা কবিরুল ইসলাম, বেলাল হোসেন, কাপ্তাই ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি লোকমান আহমেদ, সম্পাদক সামশুল আলম নুর মুন্না, মহিউদ্দিনসহ ইউনিয়নের সকল নেতা ও সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

পরে দোয়া ও মুনাজাত করেন মাওলানা শহিদ উল্লাহ।




কাপ্তাইয়ে আ’লীগের ত্রান বিতরণ

কাপ্তাই প্রতিনিধি:

রাঙ্গামাটি জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারের পক্ষে কাপ্তাই পাহাড় ধ্বসে নিহত ও আহতদের পরিবারের মাঝে মঙ্গলবার ১নং চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নে চাল, ডাল, সেমাই, চিনি, দুধ, নারিকেলসহ বিভিন্ন ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়।

এ সময় জেলা পরিষদ সদস্য ও কাপ্তাই উপজেলা আওয়ামী লীগ সম্পাদক প্রকৌশলী থোয়াইচিং মং, রাঙ্গামাটি জেলা আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক সম্পাদক মফিজুল হক, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা মো. হানিফ, ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চৌধুরী বেবী, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. ইলিয়াছ, আওয়ামী লীগ নেতা এম ইসমাইল ফরিদ, আলী আকবর খোকন, উপজেলা ছাত্রলীগ সম্পাদক এআর লিমনসহ ১নং চন্দ্রঘোনা ইউনিয়ন পরিষদের সকল সদস্য উপস্থিত ছিলেন।




কাপ্তাইয়ে এখনো মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের ওপর বসবাস

কাপ্তাই প্রতিনিধি:

কাপ্তাইয়ে এখনো মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে মানুষ বসবাস করছে পাহাড়ের ঢালে। ইতিমধ্যে ঘূর্ণিঝড় মোরা’র কারণে এবং ভয়াবহ প্রবল বর্ষণে পাহাড় ধ্বসে বিভিন্ন ক্ষতিসহ কাপ্তাইয়ে ১৮জনের মৃত্যু হয়। এছাড়াও প্রায় পঞ্চাশ জন আহত হয়। নিহত ও আহতদের পরিবারের মধ্যে এখনও চলছে কান্নার রোল।

কাপ্তাইয়ে পাহাড় ধ্বসে ইতিমধ্যে ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারংবার মাইকিং করে পাহাড়ের ঢালু হতে নিরাপদ স্থানে সরে আসার কথা বলা হলেও, মাত্র কিছু লোক সরে আসে। তবে অনেকেই বাসা-বাড়ির মায়া ছেড়ে আসতে পারছেনা। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে ওই সুউচ্চ পাহাড়ে বসবাস করছে। কাপ্তাই নতুনবাজার ঢাকাইয়া কলোনী নামক এলাকায় সুউচ্চ পাহাড়ের উপরে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে কয়েকশ’ পরিবার বসবাস করছে।

এলাকার অভিজ্ঞ মহলের ধারণা পাহাড়ের উপর বসবাসরত প্রতিটি ঘরই অতি ঝুঁকিপূর্ণ। একটি ঘর কোন রকমে ভেঙ্গে নিচের ঘরের উপর পরলে নিশ্চিত মৃত্যু। ইতিমধ্যে পাহাড় ধ্বসে ওই পাহাড়ের ঢালের নিচে ঘর ভেঙ্গে অন্য একটি ঘরের মধ্যে পড়ে রমজান নামের পাঁচ বছরের একটি শিশু মারা যায় এবং আবুল হোসেন নামের আরো এক ব্যক্তি নিহত হয়।

অনেক পরিবার কাপ্তাই উচ্চ বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে আসলেও অনেক পরিবার আবার মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও বসবাস করছে। তাই সকলের একটি দাবি-কাপ্তাই নতুনবাজার, লগগেইট, ঢাকাইয়াকলোনীসহ বিভিন্ন এলাকার লোকদের সরকারের পক্ষ থেকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হউক না হয় কাপ্তাইয়ে দ্রত মৌজা বাস্তবায়ন করা হোক।




আশ্রয় কেন্দ্রগুলোর সবাই ভালো ও সুস্থ আছে

রাঙামাটি প্রতিনিধি:

আশ্রয় কেন্দ্রের আশ্রিতরা ভালো আছে। খাদ্য এবং ঔষধপত্রের কোন অভাব নেই। আশ্রয় কেন্দ্রের আশ্রিতরা সরকারি-বেসরকারি, নিরাপত্তা বাহিনী ও সেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো থেকে সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে।

সোমবার সকালে শহরের সরকারি কলেজ, ভেদভেদীস্থ বিএডিসি, সড়ক বিভাগ, যুবউন্নয়ন, টিভি কেন্দ্র, বেতার কেন্দ্র, উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, আব্দুল আলী একাডেমী, শিশু একাডেমী, সরকারি গভ. স্কুল, আমানতবাগ স্কুল আশ্রয় কেন্দ্রে গেলে আশ্রিতরা জানান, সকাল-বিকালের নাস্তা, দুপুর ও রাতের খাবার পাচ্ছি। কোন সমস্যা হচ্ছে না।

সরকারি কলেজ আশ্রয় কেন্দ্রের মেডিকেল টিম এর ডাক্তার আব্দুর রহমান জানান, এ কেন্দ্রের ২১৮ জনই সুস্থ আছে। তবে আজকে দূর্গত এলাকার আরো লোকজন আসতে পারে বলেও জানান তিনি। এসময় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আশ্রিতদের মধ্যে দুপুরের খাবারও বিতরণ করে।

বিএডিসি’র নুরুল ইসলাম, আহমদ মিয়া, বেতার কেন্দ্রের মিনারা বেগম, টিভি কেন্দ্রের কুলসুম বেগম, যুব উন্নয়ন কেন্দ্রের জ্যোতিষ সেন ও দর্পণ চাকমা জানান এখানে খাদ্যের কোন অভাব হচ্ছেনা। ঔষধপত্রও নিয়মিত পাচ্ছি। এখনো পর্যন্ত কোন সমস্যা হয়নি। তবে সরকারি সুযোগ কম হলেও নিরাপত্তা বাহিনী এবং সেচ্ছসেবী সংগঠনগুলো নিয়মিত সেবা দান করে যাচ্ছে। রবিবার সেনা সুত্রগুলো জানায়, একই সময়ে সকল আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রিতদের খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।

এদিকে ভেদভেদীস্থ শ্রী শ্রী লোকনাথ আশ্রমের পক্ষ থেকে সেখানের প্রায় ৫০০ আশ্রিতদের নিজ উদ্যোগে সকাল -বিকালের নাস্তা, দুপুর ও রাতের খাবারসহ ওরস্যালাইন এবং শুকনো খাবার, মোমবাতি ও পানি বিতরণ করছে। আশ্রম কমিটির কুশল চৌধুরী, মিলন কান্তি চৌধুরী ও আনন্দ ধর জানান, এটি নিজ উদ্যেগেই করা হচ্ছে। তবে কেউ দান করতে চাইলে আশ্রিতদের জন্য নেওয়া হবে।

এদিকে কাপ্তাই লেকের ফারুয়া-কাপ্তাই রুট বিপুল পরিমাণ কুচুরিপানায় ঢেকে যাওয়ায় সেনাবাহিনীর বিলাইছড়ি জোন ভিডিপির সহায়তায় কুচুরিপানা অপসারণ করে নৌ চলাচল উপযোগী করেছে। একইসাথে এই রুটটি যাতে পুণরায় নৌ চলাচলের অনুপোযোগী না হয়ে পড়ে সেকারণে ভিডিপির টিম দিয়ে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে।

এদিকে বড়ইছড়ি-ওয়াগ্গাছড়া-রাঙামাটি রাস্তায় নতুন করে পাহাড় ধসের কারণে মাটি অপসারণ কাজে ওয়াগ্গাছড়া বিজিবি কাপ্তাই কর্ণফুলী পেপার মিল থেকে দুইটি ড্রোজার সংগ্রহ করে এক প্লাটুন জনবল নিয়ে মাটি অপসারণ করে রাস্তা চলাচলের উপযোগী করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি বিলাইছড়ি জোনের আওতায় দূর্গতদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে।

এদিকে রবিবার থেকে আবারো দফায় দফায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সোমবার ভোর সকালে টানা বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির কারনে পাহাড়ী ও ঘটনাস্থলের অনেকেই এখন আশ্রয় কেন্দ্রে চলে যাচ্ছে। ফলে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোয় আশ্রিতের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসন দূর্যোগ মোকাবিলা ও জনস্বার্থে সরকারি সর্তকমূলক বার্তা প্রচার অব্যাহত রেখেছে। গতকাল জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইখতিয়ার উদ্দীন আরাফাত জানান, আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রিতের সংখ্যা প্রায় ২৬ শত তবে নতুন করে এর সংখ্যা বাড়ছে এবং আশ্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা প্রয়োজনে বাড়ানো হবে এবং আশ্রিতদের জন্য সরকারি সহযোগীতা অব্যহত থাকবে।