এমএন লারমার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পাহাড়ে বেপরোয়া চাঁদাবাজী চলছে

সন্তোষ বড়ুয়া, রাঙামাটি থেকে:

পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা মানবেন্ত্র নারায়ন লারমার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় বেপরোয়া চাঁদাবাজী শুরু করেছে উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর একাংশ। তিন পার্বত্য জেলায় অনুসন্ধান চালিয়ে, সাধারণ মানুষ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে কথা বলে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

উল্লেখ্য, আগামী ১০ নভেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এম এন লারমা) এর ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮৩ সালের এই দিনে তিনি নিজ দলের বিদ্রোহী সশস্ত্র শাখার গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। এই দিনটিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি সশস্ত্র সংগঠনের একটি অংশ জুম্মজাতির শোক দিবস হিসেবে পালন করে ।

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সকল নাগরিকদের কাছে জাতির পিতা “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব” হলেও, উপজাতি সশস্ত্র সংগঠনের ঐ গ্রুপ দাবী করে এম এন লারমা তাদের  জাতির পিতা। কিন্তু, তারা যাকে তাদের জাতির পিতা বলে মান্য করে ৩৪ বছর পার হয়ে গেলেও তারা তাদের সেই জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচার চায়নি কখনও।

অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামে যে কোন উপজাতি ব্যক্তি খুন হলে অথবা ছোটখাট অনেক বিষয় নিয়ে তারা দেশে-বিদেশে সরকার, সেনাবাহিনী এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের ঘাড়ে মিথ্যা দোষ চাপিয়ে নানান ধরণের প্রচার প্রচারণা চালালেও নিজ জাতির পিতা বলে খ্যাত এত বড় একজন নেতার হত্যাকারী কারা, তিনি কেন মারা গিয়েছিলেন, হত্যাকারীরা এখন কোথায় কি অবস্থায় আছে এ সমস্ত বিষয়গুলি নিয়ে তারা কখনই দাবি বা আন্দোলন করেনি। উপজাতিদের এই নীরবতা জনমনে প্রশ্ন এবং সন্দেহের উদ্রেক সৃষ্টি করে।

ইতিহাসের ঘটনাবলী থেকে জানা যায় যে, এম এন লারমা পাহাড়ি ছাত্র সমিতির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষিত তরুণদের সংগঠিত করেন এবং ১৯৭২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। সাবেক সংসদ সদস্য মি. রোয়াজা ছিলেন উক্ত সংগঠনের সভাপতি এবং এম এন লারমা ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। ১৯৭০ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে এম এন লারমা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনেও এম এন লারমা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।

এম এন লারমা সংসদ সদস্য হিসাবে নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিচালনাকালে পাহাড়ি ছাত্র সমিতিসহ কতিপয় তরুণদের সাথে তার ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। ১৯৭৩ সালে এম এন লারমা জনসংহতি সমিতির একটি সশস্ত্র গ্রুপ গঠন করেন, পরে তা শান্তিবাহিনী রূপে পরিচিতি লাভ করে।

১৯৭৬ সালে ক্ষমতার লোভ, স্বার্থপরতা, দলীয় মতাদর্শসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শান্তিবাহিনীর মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। এ সময় এম এন লারমা চীনাপন্থী ও প্রীতি কুমার চাকমা ভারতপন্থী নীতি গ্রহণ করেন।

১৯৮১ সালে শান্তিবাহিনী সম্পূর্ণ রূপে দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই সময় দলীয় কোন্দল চরম আকার ধারণ করে যার ফলে নিজেদের মধ্যে মারামারি আর হানাহানিতে শান্তিবাহিনীর শতাধিক সদস্য নিহত হয়।

এই ঘটনার জের ধরেই ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর আন্তঃদলীয় কোন্দল আর ক্ষমতার লোভের বলি হিসেবে প্রতিপক্ষ প্রীতি গ্রুপের সশস্ত্র হামলায় নিহত হন এম এন লারমা।

এ প্রসংগে ১৮ নভেম্বর ১৯৮৩ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয় যে, “তথাকথিত শান্তিবাহিনীর প্রধান এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির চেয়ারম্যান মি: মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা নিহত হইয়াছেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়া গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাত্রে আমাদের রাংগামাটি সংবাদদাতা জানান, মি: লারমা গত ১০ই নভেম্বর সীমান্তের অপর পারে ভারতে ইমারা গ্রামে বাগমারা নামক স্থানে শান্তিবাহিনীর কল্যানপুর ক্যাম্পে প্রতিদ্বন্দ্বী শান্তিবাহিনীর ‘প্রীতি’ গ্রুপের সদস্যদের হামলায় নিহত হইয়াছেন”।

বিভিন্ন তথ্য বিবরণী এবং ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, শান্তিবাহিনীর ক্যাপ্টেন এলিনের নেতৃত্বে প্রীতিগ্রুপের আট-দশজনের একটি সুইসাইডাল স্কোয়াড এম এন লারমা গ্রুপের শিবিরে সশস্ত্র অভিযান চালায়। উক্ত হামলায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সাথে তার বড় ভাইয়ের শ্যালক মনি চাকমা, খাগড়াছড়ি হাই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক অপর্ণা চরম চাকমা, কল্যানময় চাকমা ও স্বঘোষিত লেফটেনেন্ট রিপনসহ শান্তিবাহিনীর মোট আটজন সদস্য ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান।

ঘটনার পরপর প্রীতি কুমার চাকমা তার দলবল নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় এম এন লারমা গ্রুপের অন্যান্য সদস্যদেরকেও হত্যা করার জন্য খুঁজে বেড়াতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১০ নভেম্বর ১৯৮৩ সালে একই দিনে প্রীতি গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা খাগড়াছড়ির তৎকালীন লতিবান পুলিশ ক্যাম্পের এক মাইল পূর্বে এম এন লারমার মামার বাড়িতে অবস্থানরত শান্তিবাহিনীর সদস্যদের উপরও আক্রমন চালায়। কিন্তু উক্ত আক্রমনে অবশ্য কেউ হতাহত হয়নি।

এম এন লারমার মৃত্যুর পর জনসংহতি সমিতির পূর্ণ নেতৃত্ব চলে যায় তার আপন ভাই সন্তু লারমার হাতে যিনি বর্তমানে জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান। সন্তু লারমার পাশাপাশি বর্তমানে উল্লেখযোগ্য উপজাতি নেতার মধ্যে আছেন সাবেক শান্তিবাহিনী কমান্ডার ঊষাতন তালুকদার যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে একজন নির্বাচিত সাংসদ এবং জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য। এম এন লারমার মৃত্যুর ৩৪ বছর হয়ে গেলেও জনসংহতি সমিতির নেতারা কখনই তাদের অবিসংবাদিত নেতা এম এন লারমার হত্যার বিচার চায়নি।

১০ নভেম্বর উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর একাংশ বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু তারা তাদের নতুন প্রজন্মের কাছে এই মৃত্যুর ইতিহাস চাপা দিয়ে রেখে শুধুমাত্র দিবসটিকে জুম্ম জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করে। কারণ এই ঘটনার মধ্যে তাদের জাতিগত হিংস্রতা আর বিভেদের চিত্র প্রকাশ পায়।

তাই এই ঘটনা নতুন প্রজন্মের কাছে তারা কৌশলে গোপন করে রাখে। প্রতি বছর এই দিবসকে সামনে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতি  সশস্ত্র সংগঠণগুলোর চাঁদাবাজির তৎপরতা বেপরোয়াভাবে বৃদ্ধি পায়। এতে করে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল শ্রেণী-পেশার সাধারণ উপজাতি ও বাঙালিরা ঐসব সশস্ত্র সংগঠনগুলোর হুমকির মুখে চাঁদা দিতে বাধ্য হয়। প্রাণভয়ে এ বিষয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।

চলতি বছরও ১০ নভেম্বরকে সামনে রেখে পাহাড়ে চলছে ব্যাপক চাঁদাবাজি। বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান, কাঠ ব্যবসায়ী সমিতি, যানবাহন মালিক সমিতি, ব্রিকফিল্ড সমিতি, জেলা পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড, ব্যাংক, এনজিও, সরকারি/বেসরকারি অফিস ইত্যাদি থেকে চিঠি দিয়ে রশিদের মাধ্যমে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।

পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের চাঁদা আদায়ের এরকম একটি রশিদ এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। মূলতঃ ১০ নভেম্বরকে পুঁজি করে উপজাতি সংগঠণগুলো ব্যাপক চাঁদাবাজি করে নিজেদেরকে আর্থিকভাবে হৃষ্টপুষ্ট করছে। ১০ নভেম্বর এখন আর জুম্ম জাতির শোক দিবস নয় বরং অবৈধ চাঁদা আদায়ের বাণিজ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে পাহাড়ের স্থাণীয় ভূক্তভোগীরা জানান।




পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে স্বার্থান্বেষী উপজাতি সংগঠনগুলো

সন্তোষ বড়ুয়া, রাঙামাটি থেকে:

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ ২১ বছরের সংঘাত এবং রক্তক্ষরণের অবসান ঘটে। তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অন্য কোনো তৃতীয়পক্ষের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এই শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয় যা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত। চুক্তি স্বাক্ষর হবার পর থেকে বিগত ২০ বছরে এর বাস্তবায়নে সরকার বেশ আন্তরিকতার পরিচয় দিলেও চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী সন্তুলারমাদের অভিযোগ, বাস্তবায়ন হয়নি চুক্তির মৌলিক অনেক বিষয়।

অথচ, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায় যে, চুক্তির অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়েছে। এ পর্যন্ত শান্তিচুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টির পূর্ণ বাস্তবায়ন, ১৫টির আংশিক বাস্তবায়ন এবং ৯টি ধারার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় হস্তান্তরযোগ্য ৩৩টি বিষয়/বিভাগের মধ্যে এ পর্যন্ত রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে ২৮টি বিষয়/দফতর হস্তান্তর করা হয়েছে।

অপরদিকে শান্তিচুক্তি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত না হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হলো শান্তিচুক্তির বেশ কিছু ধারা বাংলাদেশ সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। এছাড়া আদালতে শান্তিচুক্তির বেশ কিছু ধারা চ্যালেঞ্জ করে মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

এ সমস্ত বিষয়সহ শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পথে যে সমস্ত অন্তরায় রয়েছে সেগুলোর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত শান্তিচুক্তির পূর্ণাংগ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তবে বর্তমান সরকার চুক্তির যে ধারাগুলো বাস্তবায়িত হয়নি সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে।

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন না করা নিয়ে উপজাতি বিভিন্ন সংগঠন সরকারকে দোষারোপ করে দেশে-বিদেশে নানা ধরনের নেতিবাচক কর্মসূচি পালন করে আসছে। অথচ, চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিকতা দেখালেও উপজাতীয় সংগঠনগুলো চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে ততটা তৎপর নয়। উল্টো তারা পাহাড়ে স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানানো শুরু করেছে। এ নিয়ে তারা নানা রকম অপতৎপরতা চালাচ্ছে।

বিশেষ করে পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালি ও সাধারণ উপজাতিদের কাছ থেকে আদায় করছে বিপুল অংকের চাঁদা। তা দিয়ে তারা তাদের সশস্ত্র গ্রæপকে শক্তিশালী করছে। গোপনে বিদেশ থেকে কেনা হচ্ছে ভারি, দামি ও অত্যাধুনিক অস্ত্র। সামরিক আদলে কাঠামো তৈরি করে নিজেদের সংগঠিত করছে। অন্যদিকে তিন পার্বত্য জেলাকে অস্ত্রের রুট হিসেবে ব্যবহার করছে সশস্ত্র গ্রুপের সদস্যরা। এতে নিজেদের অস্ত্রের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি দেশে জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িতদের কাছে বিক্রি করছে ভারি ও অত্যাধুনিক অস্ত্র। এর মাধ্যমে আর্থিকভাবে হৃষ্টপুষ্ট হচ্ছে পাহাড়ে তৎপর জেএসএস (সন্তু), জেএসএস (সংস্কার) ও ইউপিডিএফ-এর সশস্ত্র গ্রুপ।

পাহাড়ে শান্তিচুক্তি বিতর্ক প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রাকৃতিক সম্পদ সমৃদ্ধ এই এলাকায় গত চার দশকের বেশি সময় ধরে অস্থিতিশীল করে রেখেছে জেএসএস (জনসংহতি সমিতি) নামের একটি সশস্ত্র সংগঠন। তাদের দাবি এই অঞ্চলকে স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। কিন্তু দেশের ভেতরে আরেকটি দেশ গঠন হলে দেশের কোনো সার্বভৌমত্ব থাকে না। তাই কোনো সরকারই তাদের এই অন্যায় দাবি মেনে নেয়নি। আদতে, সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক থাকলেও আঞ্চলিক উপজাতি রাজনৈতিক দলসমূহের বিরূপ মনোভাব বিষেশতঃ ভূমি ইস্যু ও তাদের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দাবী, সশস্ত্র গ্রুপ পরিচালনা, আইনশৃংখলার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন এবং সরকারি যে কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা প্রদান করে শান্তিচুক্তির অবশিষ্ট প্রক্রিয়াধীন বিষয়গুলোকে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি করছে।

আঞ্চলিক উপজাতি সংগঠনগুলোর এরূপ নেতিবাচক মনোভাব থাকলে সরকারের পক্ষে শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। চুক্তি বাস্তবায়নে সকলকে শান্তিপূর্ণ ও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা গিয়েছে যে, সরকারের আন্তরিকতা ও অব্যাহত প্রচেষ্টার কারণে শান্তিচুক্তির পর হতে এ যাবতকাল পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে এবং এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। চুক্তির সুফল হিসেবে উপজাতি শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, তাদের দলের অন্যান্য সদস্য এবং পাহাড়ের সাধারণ মানুষ বেশ কিছু সুবিধা ভোগ করছে।

সমতলের জেলাগুলোর মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোতেও বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামোগত সুবিধা গড়ে উঠেছে। সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করে ইতোমধ্যে পাহাড়ের সব উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যন্ত পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সালে মাত্র ৪৮ কি.মি. রাস্তা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য অঞ্চলে নির্মাণ করেছে প্রায় ১৫৩৫ কি.মি. রাস্তা, অসংখ্য ব্রিজ ও কালভার্ট। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনটি স্থল বন্দর নির্মাণ এবং টেলিযোগাযোগের ব্যাপক উন্নয়নের ফলে বাণিজ্য এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রেও প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে দেশি এবং বিদেশি এনজিওসমূহের কার্যক্রম, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পার্বত্যাঞ্চলে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ, ভারত ও মিয়ানমারের সাথে যোগাযোগ সড়ক, অরক্ষিত সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তা বিধান, অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার, পার্বত্যাঞ্চলে মোতায়নরত সেনাবাহিনীকে ছয়টি স্থায়ী সেনানিবাসে প্রত্যাবর্তন, সামাজিক উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ উন্নয়নসহ প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ৩ পার্বত্য জেলায় ৪১ হাজার ৮৪৭ জনকে বয়স্ক ভাতা, ২২ হাজার ৪১০ জনকে বিধবা ভাতা, ৭ হাজার ৩১১ জনকে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা এবং ৯৮১ জন প্রতিবন্ধীকে শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের আওতায় এ অঞ্চলে ১ হাজার ৪৬টি সমিতির মাধ্যমে ৫২ হাজার ১৭২ জন সদস্যের দারিদ্র্য বিমোচন তথা জীবনমান উন্নয়ন করা সম্ভব হয়েছে।

এছাড়া আশ্রয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ৬২৩টি পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। শিক্ষার ক্ষেত্রেও পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের ছোঁয়া ব্যাপকভাবে লেগেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ ছিলো না সরকার সেখানে নতুন করে ১টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১টি মেডিকেল কলেজ স্থাপন করেছে। আশির দশকে যেখানে উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের সংখ্যা ছিলো মাত্র ১১টি সেটা এখন ৪৭৯টি, প্রায় প্রতিটি পাড়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। শিক্ষার হার ২ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৪৪.৬২ শতাংশে এ পৌঁছেছে। যেখানে বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষার হার ৫৯.৮২ শতাংশ সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার হার ৭৩ শতাংশ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের শিক্ষার হার ২৩% (সূত্র: বাংলাদেশ আদম শুমারী-২০১১)।

এছাড়াও, পার্বত্য চট্টগ্রামে কারিগরী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ১টি থেকে ৩টি করা হয়েছে, হাসপাতালের সংখ্যা ৩টি থেকে ২৫টিতে উন্নীত হয়েছে। যেখানে কোন খেলার মাঠ ছিলো না বর্তমানে সেখানে ৫টি স্টেডিয়াম নির্মিত হয়েছে। কলকারখানা, ক্ষুদ্র কুটির শিল্প ১৯৩টি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে এখন ১৩৮২টিতে উন্নীত হয়েছে। ফলে সরকারের উন্নয়ন প্রচেষ্টায় পার্বত্য চট্টগ্রামে এককালের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রভূত উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

সরকার যেখানে পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, আর্থ-সামাজিক ও শিক্ষার মান উন্নয়নে মেডিকেল কলেজ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সড়ক ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা, কুটির শিল্প, কলকারখানা নির্মাণ করছে সেখানেও কতিপয় স্বার্থান্বেষী উপজাতি নেতৃবৃন্দ বাধার সৃষ্টি করছে। পৃথিবীর ইতিহাসে নিজেদের উন্নয়নকে পেছনে টেনে নিয়ে যাওয়ার এমন নজির সম্ভবত আর নেই।

পাশাপাশি, সরকার চাকরি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে উপজাতিদের জন্য ৫ শতাংশ রিজার্ভ কোটার ব্যবস্থা করেছে, উপজাতিদেরকে সরকারি ট্যাক্সের আওতামুক্ত রেখেছে। এ সবই করা হয়েছে তাদের আর্থ-সামাজিক ও জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে। সরকার প্রদত্ত এ সকল সুবিধা ভোগ করে শিক্ষা, চাকরি এবং জীবনযাত্রার মানের ক্ষেত্রে উপজাতিদের ব্যাপক উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে। দিন দিন এ অবস্থার আরও উন্নতি হবে। শান্তিচুক্তির সুফল ভোগ করে উপজাতিদের বর্তমান জীবন যাত্রার মান, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে অগ্রসরতা প্রভৃতি বিবেচনা করে এ কথা বলা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন আর বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া কোনো জনপদ নয়।

কোটা সুবিধার সুফল হিসেবে চলতি বছর সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস প্রথম বর্ষের (২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ) ভর্তি পরীক্ষার প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, ভর্তি পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের মধ্যে ৭০-৮০ নম্বর পেয়েও সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে দেশের হাজার হাজার বাঙালি ছাত্র-ছাত্রী। অন্যদিকে ভর্তি পরীক্ষায় সর্বনিম্ন ৫৭.৫০ নম্বর পেয়েই অনেক উপজাতি শিক্ষার্থী সরকারি মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে।

সার্বিকভাবে সরকার প্রদত্ত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ ও তা ভোগ করলেও উপজাতিরা সরকারের এই আন্তরিকতার প্রতি কখনই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনি। বরং তারা দেশে-বিদেশে বাংলাদেশ সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত নিরাপত্তাবাহিনী এবং সেখানে বসবাসরত বাঙালিদের জড়িয়ে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যে, শান্তিচুক্তি উপজাতিদের কাছে অনেকটা সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁসের মতো। কারণ, নিজেরাই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে আগ্রহ না দেখিয়ে উল্টো বাধার সৃষ্টি করছে এবং দেশে-বিদেশে প্রচার করছে যে সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করছে না।

এভাবে তারা তাদের অনুকূলে দেশি-বিদেশি মহলের সহানুভূতি আদায় করে চলেছে আর নিজেদেরকে অবহেলিত ও অনগ্রসর প্রমাণ করে বিভিন্ন এনজিও এবং সংস্থা হতে বিশাল অংকের ত্রাণ ও অনুদান সংগ্রহ করছে। এর সাথে পাহাড়ে তাদের চাঁদাবাজির বিশাল নেটওয়ার্কও সচল রেখেছে। যার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ উপজাতি-বাঙালিরা উপজাতি তিন সশস্ত্র দলের ক্রমাগত নির্যাতন সহ্য করে যাচ্ছে আর মাঝখান থেকে আর্থিকভাবে হৃষ্টপুষ্ট হচ্ছে কতিপয় স্বার্থান্বেষী উপজাতি নেতা।




পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্কেল প্রথার আড়ালে বঞ্চনা ও সাম্প্রদায়িকতা

সন্তোষ বড়ুয়া, রাঙামাটি থেকে:

প্রবাদ আছে “ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, নিধিরাম সর্দার”। কালের বিবর্তনে প্রবাদটির বাস্তব রূপ এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন স্ব-ঘোষিত রাজার বেলায়। এরা নিজেরা নিজেদেরকে রাজা বললেও আইন অনুযায়ী এদের প্রকৃত পদের নাম ‘সার্কেল চিফ’। বৃটিশ শাসনামলে চিটাগাং হিল ট্রাক্টস রেগুলেশন ১৯০০ আইন বা চিটাগাং হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়েল এর ক্ষমতাবলে এই পদের সৃষ্টি হয়। দূর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য এবং চাকমা বিদ্রোহ দমনের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি সার্কেল বা অঞ্চলে বিভক্ত করে তারা। চাকমা সার্কেল চিফের অধীনে রাঙামাটি, বোমাং সার্কেল বান্দরবানে আর মং সার্কেলের অধীনে খাগড়াছড়ি জেলাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। সেই থেকে চালু হয় সার্কেল প্রথা। সেই থেকে ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল ও বাংলাদেশ আমলে তারা সার্কেল চিফ নামেই অভিহিত হয়ে আসছে। শান্তিচুক্তিতেও তাদের সার্কেল চিফই বলা হয়েছে।

তবে নিজ সার্কেলে বসবাসকারী জনগণের কাছে তারা নিজেদেরকে রাজা বলেই পরিচয় দেয়। যা Chittagong Hill Tracts Regulation 1/1900 এর ৩৫ নং আইন এবং অন্যান্য বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বিধি সম্মত নয়।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা এদেশ থেকে চলে যাওয়ার পরেও সার্কেল চিফরা তাদের এই প্রথা চালু রেখেছিলো। সমতলের জমিদার প্রথার সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্কেল প্রথার ভিন্নতা রয়েছে। সমতলের জমিদারদের জমি কেনা বেচার অধিকার থাকলেও সার্কেল চিফদের জমির মালিকানা ছিলো না। ১৯০০ সালের আইন অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জমির মালিক সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসক। সার্কেল চিফরা হলো তাদের উপদেষ্টা ও পরামর্শক। পাকিস্তান আমলে জমিদারী অধিগ্রহণ আইন করার পর জমিদারদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্কেল প্রথা চালমান রয়েছে। স্থানীয় অধিবাসীদের কাছ থেকে সরকারের পক্ষে ট্যাক্স আদায় করাই তাদের মূল দায়িত্ব। একই সাথে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীগুলোর প্রথাগত আইনে সামাজিক বিচার-শালিস করার দায়িত্বও তাদের। উচ্চ শিক্ষিত এবং আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এর প্রয়োজনীয়তা ফিকে হয়ে এলেও পার্বত্য তিন জেলায় এখনো টিকে আছে এই সার্কেল প্রথা।

প্রতি বছর সার্কেল চীফরা তাদের অধীনস্ত এলাকার অধিবাসীদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করে। এর থেকে নামমাত্র একটা অংশ সরকারী কোষাগারে জমা দেয় আর বড় অংশই যায় তাদের ব্যক্তিগত কোষাগারে। নিজেদের কোষাগারকে আর্থিকভাবে হৃষ্টপুষ্ট করার এই বাণিজ্যের কারনেই তারা নানান ধরনের অযুহাত আর আইন দেখিয়ে এই সার্কেল প্রথা চালু রেখেছে।

দেশে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী জায়গা-জমি ক্রয়-বিক্রয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, সরকারী চাকরীতে আবেদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তিকে নাগরিকত্বের সনদ বা স্থায়ী বাসিন্দা সনদ (Permanent Resident Certificate) দাখিল করতে হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, বান্দরবন এবং খাগড়াছড়ি ছাড়া দেশের অন্য সকল জেলায় এই সনদপত্র সাধারণত সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অথবা পৌর মেয়র বা কাউন্সিলরের কর্তৃক করা হয়ে থাকে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোতে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও সার্কেল চিফগণ এই সনদপত্র প্রদান করে থাকেন।

সার্কেল চিফগণ যেহেতু উপজাতি সম্প্রদায়ের তাই এক্ষেত্রে উপজাতিরা সহজেই এ সকল সনদপত্র পেলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিরা প্রায়শঃই এই সনদপত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে বঞ্চিত ও দূর্ভোগের শিকার হচ্ছে। বাঙালিরা সঠিক দলিল বা কাগজপত্র উপস্থাপন করার পরও তাদের দাখিলকৃত দলিল বা কাগজপত্রে ভুল বা অসংগতি রয়েছে বলে উল্লেখ করে সার্কেল চিফগণ কৌশলে বাঙালিদের সনদপত্র প্রদানে বিরত থাকেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালি অপসারণ ও বিতাড়ন উপজাতিদের বহু পুরানো বাসনা। বাঙালিদের প্রতি সার্কেল চিফদের এহেন বৈষম্য তারই অন্যতম বহিঃপ্রকাশ।

সার্কেল চিফগণ স্থায়ী বাসিন্দা সনদপত্র প্রদানে যে ফরম ব্যবহার করেন সেখানে তারা নিজেদেরকে রাজা হিসেবে উল্লেখ করেন যা Chittagong Hill Tracts Regulation 1/1900  এর ৩৫ নং আইন অনুযায়ী বিধি সম্মত নয় এ কথা পূর্বেই বলেছি। এছাড়াও, বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী মোতাবেক ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও সার্কেল চিফগণ তাদের সনদপত্রে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করছেন।

বাঙালিরা সনদ আনতে গেলে তাদের সনদ না দিয়ে বলেন যে, সনদপত্রে ‘আদিবাসী’ শব্দটি মুদ্রিত আছে তাই এটি বাঙালিদের জন্য প্রযোজ্য নয়। সার্কেল চিফগণ তাদের সনদপত্রের ফরমে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করে বাংলাদেশ সংবিধানের অবমাননা করছেন।

সম্প্রতি, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক চিঠিতে সার্কেল চিফদের সনদপত্রের ফরমে সংবিধান পরিপন্থি ‘আদিবাসী’ শব্দটি পরিহার করে সংবিধানে উল্লেখিত ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’, ‘নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ শব্দগুলো ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধান এবং বিভিন্ন সরকারি প্রজ্ঞাপনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সার্কেল চিফগণ কর্তৃক ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার এবং উপজাতি সংগঠণগুলোর নানান ধরনের আদিবাসি দাবীর তৎপরতার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি জনগোষ্ঠী সার্কেল চিফগণের সনদপত্রে ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার এবং তাদের সনদপত্র প্রাপ্তির জটিলতার ক্ষেত্রে এই আইনের পূর্ণ বাস্তবায়ন হবার আগ পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছে না। একই সাথে তারা দাবী করে পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্কেল প্রধানদের স্বঘোষিত রাজা দাবী করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।


মুক্তমতে প্রকাশিত লেখার সকল ভাষ্য, তথ্য ও বক্তব্য লেখকের নিজস্ব। পার্বত্যনিউজের সম্পাদকীয় নীতি এক্ষেত্রে প্রয়োজ্য নয়।




ভাইবোনছড়া গুচ্ছগ্রাম: পার্বত্য চট্টগ্রামের অবহেলিত বাঙালীদের নিদারুণ কষ্টের প্রতিচ্ছবি

সন্তোষ বড়ুয়া, রাঙামাটি থেকে:

গুচ্ছগ্রাম খুব সুন্দর একটি নাম। যারা পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন তাদের কাছে নামটি খুবই পরিচিত। তবে যারা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বসবাস করেন তাদের কাছে এটি খু্ব বেশি পরিচিত নাম নাও হতে পারে, বিশেষ করে পার্বত্যাঞ্চলের গুচ্ছগ্রাম। পার্বত্য চট্টগ্রামে অসংখ্য ছোট বড় গুচ্ছগ্রাম রয়েছে যার বেশীর ভাগেরই অবস্থা প্রায় এক ও অভিন্ন।

আজ আমি তেমনই একটি গুচ্ছগ্রামে আমার সাম্প্রতিক অবলোকনের প্রতিচ্ছবি আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্ট করব। যার নাম ভাইবোনছড়া গুচ্ছগ্রাম। এটি রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলায় অবস্থিত।

মূল লেখায় যাবার আগে এখানে একটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি জনগোষ্ঠী কারও তাড়া খেয়ে, যাযাবর হয়ে বা কারও দয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে আসেনি। রাষ্ট্রের প্রয়োজন মেটাতেই কিছু বাঙালি পরিবারকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসন করা হয়েছিলো। তৎকালীন সময়ের পাহাড়ের ভূমিরূপ, খাদ্য এবং সার্বিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি তাদের বসবাসের জন্য উপযোগী ছিল না। তা সত্ত্বেও প্রাচীনকাল থেকে সেখানে বাঙালিদের যাতায়াত ও বসবাস ছিল।

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সহায়তায় ১৯৭৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হলে সেখানে যোগাযোগসহ বিভিন্ন সেক্টরে বিপুল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়। ফলে উন্নয়ন কাজ সমাধা করার জন্য প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। কিন্তু পাহাড়িরা এই কাজে অভ্যস্ত বা অভিজ্ঞ ছিল না। যার কারণে বাঙালিরা এই কাজে সহায়তার জন্য এগিয়ে আসে।

এক্ষেত্রে বাঙালি শ্রমিকদের পক্ষে গহিন পাহাড়ি অরণ্যে কাজ করে দিনে দিনে ফিরে আসা সম্ভব ছিল না। ফলে নিকটবর্তী স্থানে তাদের বসতি গড়তে হয়। কোনো উপজাতি শ্রমিক উন্নয়নের কাজে সহায়তা করতে চাইলেও তৎকালীন শান্তিবাহিনীর বাঁধা ও হুমকির মুখে তারা তা করতে পারত না। কারণ, সন্ত্রাসীরা সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন বিরোধী ছিল। শান্তিবাহিনী কর্তৃক নিরীহ বাঙালি হত্যা, নির্যাতন প্রক্রিয়া রোধ করতেই গুচ্ছগ্রাম সৃষ্টি করে বাঙালি ও উপজাতিদের নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসা হয়।

এ প্রক্রিয়ায় বাঙালিদের জন্য ১০৯টি গুচ্ছগ্রামে ৩১ হাজার ৬২০ পরিবারের ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৫৭ ব্যক্তিকে জায়গা-জমি দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়। কিন্তু শান্তিবাহিনীর নির্যাতন আর অরাজকতার ফলে বাঙালিরা সরকার প্রদত্ত তাদের বসতভিটা ও চাষের জমিতে যেতে পারতো না, ফলে ধীরে ধীরে ঐ সমস্ত জমি উপজাতিরা দখল করে নিতে থাকে। সেই আশির দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বাঙালিরা আর তাদের সেই ভিটা ও আবাদি জমি ফেরত পায়নি। প্রতিবছর খাজনা দিয়ে ডিসি অফিসের খাতায় জমির দখল স্বত্ব বহাল রাখলেও তাতে বসত বা আবাদ করতে পারছে না।


এবার মূল লেখায় আসি। ভাইবোনছড়া বাঙালি অধ্যুষিত একটি এলাকা যা লংগদু উপজেলা সদর হতে ১০ কিঃমিঃ দক্ষিণে কাপ্তাই হ্রদের নীল পানি ও সবুজ পাহাড়ে ঘেরা বন্দুকভাঙ্গা হিল রেঞ্জের পূর্ব পাশে অবস্থিত। বাঙালি ও উপজাতিদের মাঝে জমি বিরোধ নিয়ে ঐ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে।

স্থানীয় বাঙালি নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলে জানা যায় যে গত ১৫ মে ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সরকার তৎকালীন লংগদু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান, কারবারী ও স্থানীয় কানুনগো এর মাধ্যমে ৯ জন গ্রুপ লিডারের নেতৃত্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল হতে আগত ৪৬৩ টি বাঙালি পরিবারকে (আনুমানিক জনসংখ্যা ৩১০০) প্রায় ৫৯৭ একর জমি বরাদ্দ দেয় এবং প্রতিটি পরিবার ৩ একর করে জমি প্রাপ্ত হয়।

স্থানীয় বয়স্ক বাঙালিদের সাথে কথা বলে জানা যায় যে, ১৯৮৭ সালে উপজাতি সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ২৩ জন বাঙালিকে ভাইবোনছড়া এলাকা হতে অপরহরণ করে যারা আর কোন দিন তাদের পরিবারের কাছে ফিরে আসেনি। তৎকালীন সরকার বাঙালিদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ঐসব পরিবারকে বন্দোবস্তি জমি হতে সরিয়ে এনে মাত্র ৪০টি পরিবারকে গুচ্ছগ্রামে পূর্ণবাসিত করে যারা সরকার কর্তৃক প্রদত্ত নির্দিষ্ট পরিমাণ রেশন পেয়ে থাকে।

অবশিষ্ট বাঙালি পরিবার (৪২৩ পরিবার) সমূহ সরকারী যাবতীয় সুযোগ সুবিধা হতে বঞ্চিত হয়। ঐ বিশাল জনগোষ্ঠী যত্রতত্রভাবে যে যেখানে পেরেছে আশ্রয় নিয়েছে। বেশীর ভাগই অন্যের আঙ্গিনায় কিংবা রাস্তা/বাজার/স্কুলের পাশে কোন মতে মাথা গুঁজে ঠাই নিয়েছে। ভাইবোনছড়া বাজারের আশেপাশে এবং ভাইবোনছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে এভাবে গড়ে ওঠা বহুসংখ্যক জীর্ণ বাড়ী যেন তারই বিমর্ষ প্রতিচ্ছবি।

নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা বাঙালিদের নিরাপত্তা বিধানে ১৯৮২ সালে সেখানে একটি সেনা ক্যাম্প এবং পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে গুচ্ছগ্রাম সংলগ্ন একটি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে একটি ক্যাম্প রেখে এপিবিএন এর হেডকোয়ার্টার মহালছড়িতে স্থানান্তরিত হলে স্থানীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ ইউপিডিএফ’র উপদ্রব বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। তিনটি আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপের ছত্রছায়ায় কিছু স্বার্থান্বেষী উপজাতি ব্যক্তিবর্গ দলিল/কাগজপত্র ব্যতীত বাঙালিদের জমি দখলের অপচেষ্টা চালায়।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন যে, ১৯৮৭ সালে ২৩ জন বাঙালি অপহরণ হওয়ার পর হতে বৈধ দলিল পত্র ছাড়াই উপজাতিরা বাঙালিদের জমির উপর আস্তে আস্তে প্রভাব খাটাতে শুরু করে এবং তা নিজেদের দখলে নিতে শুরু করে। বাঙালিরা তাদের জমিতে চাষাবাদ করতে গেল উপজাতিরা তাদের প্রাণনাশের হুমকি দিতে থাকে। এছাড়া প্রায়শঃই তারা বাঙালিদের গরু, মহিষ, ছাগল ইত্যাদি গৃহপালিত পশু ধরে নিয়ে যাওয়া শুরু করে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সম্ভাব্য দাঙ্গা এড়াতে ঐসব বিরোধপূর্ণ ভূমির উপর মৌখিকভাবে নিষেধাজ্ঞা দিলে বাঙালিরা তা মেনে চলে।

পক্ষান্তরে উপজাতিরা তা না মেনে সুপরিকল্পিতভাবে বাঙালিদের চাষের জমি দখল এবং বসত ভিটায় নতুন নতুন বাড়ী তৈরী করা শুরু করে। সরেজমিনে দেখা যায় শুধু গত ২-১ বছরের ব্যবধানে পাহাড়ীরা বাঙালিদের বসত বাড়ীতে শতাধিক নতুন বাড়ী তৈরী করেছে। এমনকি বারবুনিয়া আর্মড পুলিশ ক্যাম্পের ২০০-১০০ গজ পশ্চিমেও বহু নতুন বাড়ী তৈরী করা হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে জেএসএস ও ইউপিডিএফ এর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ছত্রছায়ায় এবং তাদের আর্থিক সহায়তায় ঐসব বাড়ী তৈরী করা হচ্ছে। দীর্ঘ ২৯ বছরের ব্যবধানে স্বাভাবিক নিয়মে প্রত্যেকটি বাঙালি পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেড়েছে, পাশাপাশি বেড়েছে তাদের আর্থিক সংকট (৫১৫ পরিবারে বর্তমান আনুমানিক জনসংখ্যা ৪৬০০)। অনেকে প্রাণের ভয়ে নিজ বসত বাড়ী ছেড়ে সমতলে যেতে বাধ্য হয়েছে।

চাষাবাদের জমি না থাকায় অনেকেই শুধু মাছ ধরার মাধ্যমে কোন রকম দিনাতিপাত করছে, যে বয়সে একটি শিশুর বই হাতে স্কুলে যাওয়ার কথা সে সময় তাকে বৈঠা হাতে জাল কাঁধে মাছ শিকারে বের হতে হচ্ছে। অপুষ্টি এদের জীবনের আর একটি অভিশাপ।

গত কয়েক দিন আগের ভারী বর্ষণে হঠাৎ করেই লেকের পানি বেড়ে তলিয়ে যায় ভাইবোনছড়া গুচ্ছগ্রাম সংলগ্ন আনোয়ার টিলা। এখানে ৩৫ টি বাঙালি পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে গত ২/৩ দিনে ১৫ টি বাড়ীর ভুমি ক্ষয় হয়ে পানিতে সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যায় এবং অন্তত ১০ টি বাড়ী মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

ফলে ৩/৪ টি পরিবার একই ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করছে এবং ৪টি পরিবারের মাথা গুঁজার ঠাই হয়েছে ভাইবোনছড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এলাকার একমাত্র মসজিদটিও ভয়াবহ ভাঙ্গনের স্বীকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত ২৩ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে লংগদুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার, ভারপ্রাপ্ত থানা কর্মকর্তা এবং ইউপি চেয়ারম্যান উক্ত এলাকাটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।

প্রতি বৎসর যখন সরকারীভাবে তিন মাস (মে হতে জুলাই) মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে তখন গুচ্ছগ্রামের বাঙালীদের জীবন নির্বাহের আর কোন পথ থাকে না। অনেকেই জড়িয়ে পরে নানাবিধ অনৈতিক কর্মকান্ডে এমনকি সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের চাঁদা আদায়কারী হিসাবেও কাজ করতে বাধ্য হয়। সন্ত্রাসীরা খুব সহজেই সুযোগ নিচ্ছে তাদের এহেন দুর্বলতার।

সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিকভাবে ঐসব বাঙালি পরিবারের সদস্যগণ এক নিদারুণ ও বর্ণনাতীত বৈষম্যের স্বীকার হয়ে মাটি কামড়ে বেঁচে আছে। অনেকেই গরু-ছাগলের সাথে গোয়াল ঘরে শুয়ে রাত কাটায়। শিক্ষা, চাকুরী ও অন্যান্য ক্ষেত্রে উপজাতিদের জন্য কোটা বরাদ্দ থাকলেও বাঙালিদের জন্য কোন কোটা না থাকায় ধীরে ধীরে তারা উপজাতিদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে পড়ছে।

উদাহরণ হিসেবে একই ইউনিয়নের ফোরেরমুখ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হতভাগা ছাত্র-ছাত্রী বাঙালি হলেও উপজাতি কোটার কারণে শতভাগ শিক্ষকই (ছয় জন) উপজাতি। নিজ দেশেই বৈষম্যের স্বীকার হয়ে দেশের জন্য চরম বোঝা হয়ে এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে বেড়ে উঠছে এক নতুন প্রজন্ম। নিশ্চিত অন্ধকারই যাদের একমাত্র ভবিষ্যৎ।

শান্তি চুক্তির পর নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্পের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে প্রত্যাহারের ফলে উপজাতিরা বাঙালিদের জমি দখল করে বসতি স্থাপন করার সুযোগ পেয়েছে, বেড়েছে তাদের চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড। অস্ত্রের ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পাচ্ছে না। নির্দিষ্ট অংকের চাঁদা দিয়ে এবং উপজাতি সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার সাথে আপোষ করে চলছে তাদের জীবন।

উপজাতিরা যাতে অবৈধভাবে খাস জমি দখল করতে না পারে সে ব্যাপারে এবং ইতিমধ্যে দখলকৃত জমি পুনরুদ্ধার করে বাঙালিদের মাথা গুঁজার ঠাই করে দেওয়ার জন্য ভুক্তভোগীরা সরকারের প্রতি আকুল আবেদন করেছে।




রাবেতা মডেল কলেজের উন্নয়ন বরাদ্দ বাতিলকারীদের উদ্দেশ্য কি?

তাজুল ইসলাম নাজিম:

লংগদু উপজেলা। গত ২জুন মটর চালক নয়নকে হত্যা ও ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দেশে আলোচিত হয়ে উঠে। উপজেলাটির ব্যপার পরিচিতি পায়। পার্বত্য চট্টগ্রামে যে দুটি উপজেলা সবচেয়ে বেশি বাঙালি অধ্যুষিত লংগদু তার একটি। অন্যটি খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙা উপজেলা।

রাঙামাটি জেলার কৃষি উৎপাদন সবচেয়ে বেশি হয় লংগদুতে। মৎস আহরণেওও এগিয়ে এই উপজেলা। জেলার সবসবচেয়ে বড় স্থানীয় বাজার(মাঈনীমূখ) এই উপজেলায় অবস্থিত।

পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ বাঙালি অধ্যুষিত লংগদু ও মাটিরাঙা উপজেলা। পাহাড়ে উন্নয়নের নামে সরকারের পর সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় কারী জাতিসংঘের উন্নয়ন সহযোগী ‘ইউএনডিপি'(UNDP)। অভিযোগ রয়েছে ইউএনডিপি পাহাড়ে ২০০৩ সালে যাত্রা শুরু করার পর ২০১২ সাল পর্যন্ত লংগদু ও মাটিরাঙা উপজেলাকে তাদের উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসেনি শুধু বাঙালি অধ্যুষিত বলে। ২০১২ সাল থেকে আংশিক কার্যক্রম শুরু করে তাও উপজাতীয় এলাকাগুলোতে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন উন্নয়নের নামে পাহাড়ে কি ধরনের বৈযম্য হচ্ছে। তাছাড়া, পাহাড়ে বাঙালিসহ ১৩টি সম্প্রদায়ের মধ্যে কেবল চাকমারাই ইউএনডিপির সবসবচেয়ে বেশি সুবিধা পায় বলে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ হতে একাধিকবার আভিযোগ করা হয়েছে।

লংগদু উপজেলার উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতে একমাত্র “রাবেতা মডেল কলেজ”। আমার আজকের লেখার মূল বিষয় এই কলেজের উন্নয়নে সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় হতে ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ও তা স্থগিত প্রসঙ্গে।

আগেই বলেছি লংগদু উপজেলার একমাত্র উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাবেতা মডেল কলেজ যা ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়াও রয়েছে রাবেতা মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়, লংগদু উপজেলার সীমানা ঘেষা পার্শ্ববর্তী বাঘাইছড়ি উপজেলার আমতলীতে ইসলামিক সেন্টার উচ্চ বিদ্যালয়ের (বর্তমান নাম আমতলী উচ্চ বিদ্যালয়) নাম উল্লেখযোগ্য।

দরিদ্র পীড়িত লংগদু উপজেলার শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক পাশ করার পর অত্র এলাকার শিক্ষার্থীদের পক্ষে জেলা সদরের স্থায়ীভাবে থেকে পড়াশোনা করা সম্ভব ছিল না। তাই অত্র এলাকার জন্য একমাত্র আলোকবর্তিকা হিসেবে শিক্ষার আলো জ্বেলে আসছে রাবেতা মডেল কলেজ। লংগদু উপজেলায় এখন ঘরে ঘরে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পাশ ছেলে মেয়ে থাকলেও অনার্স বা ডিগ্রী পাস শিক্ষার্থীর হাতে গোনা। এর প্রধান কারণ নিজ উপজেলায় এইচএসসি পর্যন্ত পড়তে পারলেও কলেজে ডিগ্রি বা অনার্স কোর্স না থাকায় দরিদ্র বাবা-মা উচ্চশিক্ষার জন্য তাদের ছেলেমেয়েদেরকে বাহিরে পাঠানোর সামর্থ্য রাখে না।

খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থীর আছে যারা উচ্চশিক্ষার জন্য জেলা শহরে যায়। এতটুকু বলা যায় যদি কলেজটি না থাকতো তাহলে হয়তো এসএসসি পাশের পরেই ৯৫ ভাগ শিক্ষার্থী ঝরে পড়তো। একটি বিষয় উল্লেখ্য যে অত্র রাবেতা মডেল কলেজ, রাবেতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয় ও আমতলী ইসলামিক সেন্টার উচ্চ বিদ্যালয়ে শুধুমাত্র বাঙালিরা লেখাপড়া করে তা নয় উপজাতি শিক্ষার্থীরাও সমান সুযোগ পেয়ে পড়াশোনা করে আসছে। পাহাড়ের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলেও উক্ত প্রতিষ্ঠানে কখনোই কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি।

এবার কলেজের কিছু দুর্দশার কথা বলি। ১৯৯৫ সালে ক্ষুদ্র পরিসরে প্রতিষ্ঠার পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। কলেজ প্রতিষ্ঠার সাথে জামায়াত সম্পৃক্ত থাকার অজুহাতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সেখানে কোনো উন্নয়ন বরাদ্দ দেয়নি বলে অনেকে মনে করেন।

এরপর বিএনপি জামাত ক্ষমতায় আসলে ২০০৩ সালে তৎকালীন উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ও খাগড়াছড়ি হতে নির্বাচিত সংসদ সদস্য জনাব ওয়াদুদ ভূইয়া একটি একতলা ভবন উদ্বোধন করেন। বর্তমানে কলেজে একটি দ্বিতল (ছোট আকারের) ও দুটি সেমি পাকা ভবন রয়েছে (পুরনো হয়ে গেছে)।২০০৯ সালে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আর কোনো বরাদ্দ পায়নি কলেজটি। পরিতাপের বিষয় হলো কলেজটিতে এখনো ডিগ্রি বা অনার্স কোর্স চালু না হওয়া।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন প্রতিটি উপজেলায় একটি করে সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করার এবং পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষা প্রসারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী প্রথম দফায় সারাদেশে ১৯৯ টি ও দ্বিতীয় দফায় ৬৪ টি কলেজ জাতীয়করণ করা হয়। প্রত্যেক উপজেলায় একটি করে জাতীয়করণের আওতায় রাঙামাটি অন্যান্য উপজেলায় কলেজগুলোর জাতীয়করণ হলেও সেই আওতায় পড়েনি লংগদু উপজেলার একমাত্র কলেজ রাবেতা মডেল কলেজ।

জানিনা কেন, কিভাবে, কোন শুভ বুদ্ধির উদয়ের ফলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও রাংগামাটির স্থানীয় এমপি জনাবা ফিরোজা বেগম চিনুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৩কোটি টাকার একটি প্রকল্প বরাদ্দ করে রাবেতা মডেল কলেজের জন্য। হয়তো রাজনীতির ঊর্ধ্বে এসে অত্র এলাকার সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি ও দলীয় ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার কথা চিন্তা করে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ জনগনের কল্যাণের উদ্দেশ্যে কলেজের উন্নয়নে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্য আমির ব্যক্তিগত ও অত্র এলাকার জনগণের পক্ষ হতে স্থানীয় এমপি জানাবা ফিরোজা বেগম চিনু ও আওয়ামীলীগ সরকারকে সাধুবাদ জানাই।

লেখাটি এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু না। লেখাটি আরো দীর্ঘ করতে হয়েছে। অতি উৎসাহী একটি পক্ষের উস্কানিমূলক প্রচারণা ও পত্রিকায় লেখালেখির প্রেক্ষিতে সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে থেকে রাবেতা মডেল কলেজের জন্য ৩ কোটি টাকার বরাদ্দ স্থগিত করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ জামায়াত নেতা প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তাদের আরও অভিযোগ উক্ত প্রতিষ্ঠান কে ঘিরে অত্র এলাকায় জামায়াত-শিবিরের ঘাঁটি গড়ে উঠেছে। সেখানে জামাত-শিবির গোপন মিটিং ও নাশকতার পরিকল্পনা করে।

যেহেতু অতি উৎসাহী লোকদের এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের বরাদ্দ স্থগিত করেছে তাই তাদের অভিযোগটি ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। স্থানীয় এমপি ও আওয়ামী লীগের জনসমর্থন থাকার পরও তারা বরাদ্দটি বন্ধ করতে পেরেছে বা কর্তৃপক্ষ বন্ধ করেছে। তাই আমরা অনুমান করে নিতে পারি তাদের হাত অনেক লম্বা হবে। আসলে এরা কারা? চলুন এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে তাদের অভিযোগের সত্যতা খুজিঁ।

যেহেতু জামায়াতের প্রথম সারির নেতা দুর্গম উপজেলা লংগদুতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে তাই অনুমান করা যায় উক্ত সুবিধা কাজে লাগিয়ে, অশিক্ষিত দারিদ্রতাকে পুঁজি করে উক্ত এলাকায় হয়তো জামাত তাদের শক্ত ঘাঁটি গড়ে তুলেছে। মোটেইনা। লংগদু উপজেলার মোট ভোটার প্রায় ৪৫ হাজার যার মধ্যে আট থেকে দশ হাজার উপজাতি। উপজেলার জনপ্রতিনিধিদের তালিকা দেখলে বুঝা যায় সেখানে আসলে জামায়াতের অবস্থান কি।

লংগদু উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান বিএনপি সমর্থিত, ভাইস চেয়ারম্যান (পুরুষ) জামায়াত সমর্থিত, ভাইস চেয়ারম্যান (মহিলা) আওয়ামী লীগ সমর্থিত। এখানে উল্লেখ্য যে, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিএনপির কোনো প্রার্থী না থাকায় জামাত থেকে ভাইস চেয়ারম্যান জয়ী হয়েছে। এর আগেরবার ভাইস চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের ছিলো। এছাড়াও সাতটি ইউনিয়ন পরিষদের ২টি জনসংহতি সমিতি, ৪টি আওয়ামী লীগ ও একটিতে বিএনপি’র চেয়ারম্যান রয়েছে। সাতটি ইউনিয়নের একটিতেও কোন ইউপি সদস্য বা মেম্বার জনপ্রতিনিধি নেই জামায়াতের। তাছাড়া জেলা, মহানগর ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কোনো নেতাও তৈরি হয়নি লংগদু উপজেলা থেকে।

বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা বিএনপির ঘাঁটি বলে যে প্রচার ছিল এতদিনে তা আজ আর নেই। লংগদু উপজেলার আওওয়ীমী লীগের সাধারণ সম্পাদক বর্তমানে রাঙামাটি জেলা পরিষদের একজন সদস্য। উপজাতীয়রা জাতীয় রাজনীতির না করায় (খুবই কমসংখ্যক করে) আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় ভোট ব্যাংক এখন লংগদু উপজেলা।

সুতরাং জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীদের ভয় দেখিয়ে, পত্র পত্রিকায় নিউজ করে যারা উক্ত এলাকার শিক্ষা প্রচারের সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখা প্রতিষ্ঠাটির উন্নয়ন বরাদ্দ বন্ধ করে দিল এরা কিছুতেই বাঙালি অধ্যুষিত লংগদু উপজেলার ভালো চায়না তা সহজেই অনুমেয়।

প্রিয় পাঠক ওপরে প্রশ্ন রেখেছিলাম এরা কারা। এরা ঐ একই চক্রের লোক না তো যারা বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা বলেন বিগত দিনে তাদের উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় লংগদু উপজেলাকে অন্তুর্ভুক্তি করেনি।
আমরা সবাই জানি তাদের সমর্থক গোষ্ঠীর সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। পাহাড়ের যত উন্নয়ন হয় এদের হাত হয়েই আসে। এদের মর্জির উপর অনেক কিছুই নির্ভর করে। এরা রাঙ্গামাটিতে মেডিকেল কলেজ ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত হতে দিতে চায়নি। একমাত্র প্রধানমন্ত্রী সুদৃঢ় অবস্থানের কারণেই তা বন্ধ করতে পারেনি। তার মানে এই নয় যে প্রধানমন্ত্রীকে কোন বেগ পোহাতে হয়নি। অনেক চাপ মোকাবেলা করে প্রধানমন্ত্রী তা বাস্তবায়ন করেছেন। তবে এদের চাপ এখনো অব্যাহত আছে।

এখন সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি করবে। ঐ চক্রান্তকারীদের কাছে মাথানত করবে নাকি অত্র এলাকার একমাত্র স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান সার্বিক উন্নয়নে এগিয়ে আসবে।

লেখক: অনলাইন এক্টিভিস্ট




পার্বত্য নেতাদের স্ব-বিরোধী বক্তব্য ও স্বার্থপরতা

সন্তোষ বড়ুয়া, রাঙ্গামাটি থেকে:

ছোটবেলা থেকেই জেনে এসেছি আর বই পুস্তকে পড়ে এসেছি যে, বাংলাদেশে চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, গারো, খাসিয়া, ত্রিপুরা ইত্যাদি নামে উপজাতি বসবাস করে। কিন্তু হঠাৎ করে এখন শুনছি এরা নাকি উপজাতি নয়, এরা আদিবাসী। বিষয়টা নিয়ে একটু ভাবনা চিন্তা করা শুরু করলাম। এই বিষয় নিয়ে খোঁজ-খবরের ডালপালা বিস্তৃত করলাম।

সকল তথ্য-উপাত্ত আর ইতিহাস থেকে যা জানলাম তাতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ পেলাম যে, ওরা আসলেই উপজাতি। আদিবাসী নয়। তবে আমার আজকের লেখার বিষয় উপজাতি-আদিবাসী বিতর্ক নয়। এই বিষয়ে খোঁজ-খবরের ডালপালা বিস্তার করতে গিয়ে দেখেছি যে, উপজাতি নেতারা সবসময় স্ব-বিরোধী বক্তব্য প্রদান করে থাকে। এমনই কিছু বক্তব্যই আজ আপনাদের সামনে উপস্থাপন করবো।

২০১১ সালে সিলেটে এক অনুষ্ঠানে সরকারদলীয় নারী সাংসদ সৈয়দা জেবুন্নেছা হক বলেছিলেন, “আমি তো জানি উপজাতি। সারা জীবন তো এভাবেই বলে আসছি। এখন উপজাতিরা অনুষ্ঠান আয়োজন করে আদিবাসী স্বীকৃতির নামে সরকারের সমালোচনা করবে, আর আমি তো বসে থাকতে পারব না” (দৈনিক প্রথম আলো, ১০-০৮-২০১১)

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষ নেয়া চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের ছেলে বর্তমান চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় বলেন- “আমরা চাপিয়ে দেয়া কোনো পরিচয় মানি না। আমরা উপজাতি নই, আদিবাসী। এ দাবি বাস্তবায়নে আমরা কাজ করে যাবো” (somewhereinblog, ৩০ শে মে, ২০১১)। দেবাশীষ রায়ের এই কথার স্ব-বিরোধী বক্তব্য পাওয়া যায়। কারণ, বিগত তত্বাবধায়ক সরকারের বিশেষ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে চাকমা সার্কেল চীফ রাজা ব্যরিস্টার দেবাশিষ রায় ‘রাষ্ট্রীয়ভাবে’ অফিসিয়ালি লিখেছিলেন যে, “বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নাই। কিছু জনগোষ্ঠি আছে”।

এ প্রসংগে, জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধি ইকবাল আহমেদ ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সাথে সরকার যে চুক্তি করেছে সে প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেছিলেন, চুক্তির সবখানে তারা নিজেদের উপজাতি হিসেবে স্বীকার করে নিয়ে সই করেছে। সে সময় এ নিয়ে কোনো কথা তোলেননি। তাদের উপর এ পরিচয় চাপিয়ে দেয়া হয়নি। এমনকি তাদের কেউ এ নিয়ে আপত্তিও করেননি। কারণ ওখানে কোনো আদিবাসী নেই। (somewhereinblog, ৩০ শে মে, ২০১১)

জাতিসংঘের আদিবাসী দশক ঘোষণার পর ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে যখন প্রথম আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন করা হয়েছিল, তখন সন্তু লারমা বলেছিলেন “এই দেশে কোন আদিবাসী নাই। এখানে আমরা সবাই উপজাতি। জুম্ম জনগনের আন্দোলন ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য আদিবাসী দিবস পালন করা হচ্ছে”। এ প্রসংগে সাবেক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার বলেছিলেন, “১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের সময়ে আমি সন্তু লারমাকে বলেছিলাম এসময়ে উপজাতির পরিবর্তে আদিবাসী বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে ফেলি, তখনও সন্তু লারমা রাজি হয়নি। তখনও সন্তু লারমা বলেছিলেন আমরা আদিবাসী নই, আমরা উপজাতি। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তিতে প্রচলিত ‘উপজাতি’ শব্দটি বহাল রাখা হয়”।

পার্বত্য নেতাদের এরকম স্ব-বিরোধী বক্তব্য জনমনে যেমন হাস্যরসের সৃষ্টি করছে তেমনি তারা তাদের নিজস্ব অবস্থান এবং পদমর্যাদাকে উপহাসের পাত্রে পরিণত করছে। আসল কথা হচ্ছে একজন মানুষ যখন মিথ্যার পিছনে ছোটে এবং যখন সে নিজেই জানে না যে সে কি চায় শুধুমাত্র তখনই সম্ভব এ ধরনের গাঁজাখুরি আর স্ব-বিরোধী বক্তব্য প্রদান করা। নেতাদের এরুপ স্ব-বিরোধী বক্তব্য আর কর্মকান্ডের কারণে তাদেরই স্বজাতি উপজাতিরা তাদের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তাদের এ পাগলের প্রলাপ এখন আর সরকার, জনগণ এবং মিডিয়ার কাছে গুরুত্ব পায় না।

পার্বত্য নেতা সন্তু লারমার কিছু স্ব-বিরোধী বক্তব্য নীচে দেয়া হলঃ

  1. ৪৬ বছর ধরে সেনা শাসন চলছে: সন্তু লারমা (পরিবর্তন ডট কম, ১২ নভেম্বর ২০১৬)।

  2. পাহাড়ে সেনা শাসন চলছে: সন্তু লারমা (bbartanet, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭)

  3. পার্বত্য অঞ্চলে এখনও সেনা কর্তৃত্ব বলবৎ: সন্তু লারমা (jagonewscom, ২৫ জানুয়ারি ২০১৭)।

  4. পার্বত্যাঞ্চলে ৪৬ বছর ধরে চলছে সেনা শাসন : সন্তু লারমা (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৩ নভেম্বর ২০১৬)

  5. সেনা শাসনের কারণে রাষ্টের আইনগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামে অকার্যকর – সন্তু লারমা (com, ১২ নভেম্বর ২০১৬)

  6. পার্বত্য অঞ্চলে চলছে এক ধরনের সেনা শাসন :সন্তু লারমা (ইত্তেফাক,২৪ নভেম্বর ২০১৩)

  7. পার্বত্য অঞ্চলে সামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে সেনাবাহিনী: সন্তু লারমা (ভোরের কাগজ, ৯ নভেম্বর ২০১৬)

  8. পাহাড়ে মানব সম্পদ উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে সেনাবাহিনী: সন্তু লারমা (com, ৮ নভেম্বর ২০১৬)

  9. একটা সময় সবাই মনে করত, জনগণের সঙ্গে সেনাবাহিনীর থাকা ঠিক নয়। কিন্তু এখন সেই ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে। সেনাবাহিনী নানাভাবে দেশ ও সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করছে: সন্তু লারমা (প্রথম আলো, ১৯ মার্চ ২০১৫)

  10. সেনাবাহিনী নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি জনকল্যাণে অবদান রেখে চলেছে। সারা বিশ্বে এখন এটাই চলছে। এমন কার্যক্রম শুধু আমার কাছে নয়, সব নেতা ও শিক্ষিত সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য: সন্তু লারমা (প্রথম আলো, ১৯ মার্চ ২০১৫)

  11. সেনাবাহিনী জনকল্যাণে ব্যাপক কাজ করে চলেছে: সন্তু লারমা (নয়াদিগন্ত, ১৯ মার্চ ২০১৫)

  12. সেনাবাহিনী সামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে: সন্তু লারমা (কালেরকন্ঠ, ৮ নভেম্বর, ২০১৬)

  13. পাহাড়ে ক্রীড়ার উন্নয়নে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে: সন্তু লারমা (ntvbd.com, ০৯ জানুয়ারি ২০১৬)

  14. পার্বত্যাঞ্চলের উন্নয়নে কাজ করছে সেনাবাহিনীঃ সন্তু লারমা (পরিবর্তন ডট কম, ৮ নভেম্বর ২০১৬)।

  15. সামাজিক উন্নয়নে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণঃ সন্তু লারমা (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৯ নভেম্বর ২০১৬)।

    দেবাশীষ রায় ও সন্তু লারমার এই স্ববিরোধী বক্তব্য মূলত তাদের স্বার্থপর রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব ও মুখোশ উন্মোচন করে।




যুগে যুগে চাকমা নেতৃত্বে স্বার্থপরতা এবং অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম

পারভেজ হায়দার

১৯৯৭ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক উপজাতি নেতৃত্বের সাথে যে শান্তিচুক্তি হয়েছিল তার ফলস্বরূপ এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা কাঙ্ক্ষিত ছিল। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপের মাধ্যমে শান্তিচুক্তির অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়নের করেছে এবং অবশিষ্ট ধারাসমূহ বাস্তবায়নের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু ভূমিবণ্টনসহ অন্যান্য কিছু মৌলিক বিষয়ে বিভিন্ন দল ও জনগোষ্ঠীর মতামতে ভিন্নতা শান্তিচুক্তির অবাস্তবায়িত ধারাসমূহ বাস্তবায়ন করতে দীর্ঘসূত্রিতা সৃষ্টি করেছে।

ইতোমধ্যে পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতি আঞ্চলিক নেতৃত্বের মধ্যে দ্বিধা-বিভক্তির কারণেও চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী পিসিজেএসএস ছাড়াও অন্য আরও দুইটি আঞ্চলিক উপজাতি দল গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে একটি দল ইউপিডিএফ শান্তিচুক্তির সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে স্বায়ত্বশাসন দাবি করছে। অন্যদিকে আঞ্চলিক অপর দল জেএসএস (সংস্কার), জেএসএস (মূল) দলের সাথে নেতৃত্বের সংঘাতে জড়িয়ে পৃথক অবস্থানে রয়েছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে কাঙ্ক্ষিত শান্তি ফিরে আসার কথা থাকলেও সেই অনুযায়ী আশানুরূপ শান্তি ফিরে আসেনি। আঞ্চলিক উপজাতি তিনটি দলই পৃথক পৃথক সশস্ত্র গ্রুপ পরিচালনা করে।

তিনটি দলই সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিভিন্ন এলাকায় ভাগ করে নিয়মিত চাঁদাবাজী ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আঞ্চলিক উপজাতি দলসমূহের সশস্ত্র সংগঠনসমূহ আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ উপজাতি-বাঙালি অধিবাসীগণ উল্লেখিত তিনটি সশস্ত্র সংগঠনের চাঁদাবাজীতে অতীষ্ঠ। সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্যের কারণে পার্বত্য অঞ্চলে গড়ে উঠছে না কোন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিমূলক স্থাপনা।

অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অনুমান করা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমানে এই অশান্ত হয়ে ওঠা, শান্তিচুক্তির পরেও সাধারণ উপজাতি, বাঙালিদের নিরাপত্তাহীনতা এসব কিছুর জন্যই কিছু কিছু উপজাতি নেতৃবৃন্দের স্বার্থপরতা ও ব্যক্তিগত ক্ষমতা গ্রহণের লিপ্সাই দায়ী।

ঐতিহাসিকভাবে এবং বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আঞ্চলিক উপজাতি দলসমূহের নেতৃত্বে সব সময় চাকমা সম্প্রদায়ই সুদৃঢ় অবস্থানে ছিল এবং বর্তমানেও আছে। বর্তমানে অশান্ত এই পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি আঞ্চলিক দল এবং এর সশস্ত্র সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে মূলত চাকমারাই আছে।

একই সাথে আরও একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, শান্তিচুক্তির ফলে গড়ে ওঠা সংস্থাসমূহ যেমন- আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ ইত্যাদিতে চাকমা সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গ অধিকাংশ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। একই সাথে বিদেশি সংস্থাসমূহের শীর্ষস্থানীয় পদসমূহে চাকমা সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গ দায়িত্ব প্রাপ্ত রয়েছে।

তাই সার্বিকভাবে বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রধানত ১৩ থেকে ১৪টি উপজাতি সম্প্রদায়ের বসবাস থাকলেও সর্বক্ষেত্রেই চাকমা সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গই নেতৃত্বের অবস্থানে শীর্ষস্থান দখল করে আছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, চাকমা সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব কতটুকু সাধারণ উপজাতিদের কল্যাণে কাজ করছে এবং চাকমা ব্যতিত অন্যান্য উপজাতি সম্প্রদায়ের অধিবাসীবৃন্দই বা কতটুকু উপকৃত হচ্ছে।

পার্বত্য অঞ্চলের ঘটনাপ্রবাহ এবং চাকমা সম্প্রদায়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চাকমা নেতৃত্বের মধ্যে এক প্রকার স্বার্থপরতা, ক্ষমতার প্রতি লোভ এবং যেকোন প্রকারে শীর্ষস্থান দখলের প্রবণতা কাজ করেছে। চাকমা সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের মধ্যে সবসময় ‚নিজ এবং ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে দেখা গেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা সম্প্রদায়ের জমিদারদের মধ্যে স্বীকৃত প্রথম জমিদার কালিন্দি রায়ের সিপাহী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ, ইংরেজদের তুষ্ট করার প্রবণতা, ইংরেজ কর্তৃক দেশ বিভাগের সময় সকল উপজাতি সম্প্রদায়ের ভারতের সাথে সংযুক্তির ইচ্ছে থাকলেও নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য নলিনাক্ষ রায়ের পাকিস্তানের সাথে সংযুক্তিতে স্বস্তি, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ত্রিদিব রায়ের পাকিস্তানকে সমর্থন ও সহযোগিতা, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর এম এন লারমা কর্তৃক সশস্ত্র গেরিলা সংগঠন শান্তিবাহিনী গঠন, দেবাশীষ রায়ের দেশবিরোধী প্রচারণার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্বার্থন্বেষী মহলের সহায়তায় নতুন উদ্ভাবিত ‘আদিবাসী’ দাবি ইত্যাদি, এসব কিছুই চাকমা সম্প্রদায়ের কোন কোন গোত্রের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের স্বার্থপরতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ফুটে ওঠে।

সার্বিক বিষয়ে আলোচনার পূর্বে আসুন চাকমা জাতির ইতিহাস সম্পর্কে কিছুটা জেনে নেয়া যাক। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, চাকমারা মঙ্গলীয় জাতির একটি শাখা, বর্তমান মায়ানমারের আরাকানে বসবাসকারী ডাইংনেট জাতি গোষ্ঠীকে চাকমাদের একটি শাখা হিসেবে গণ্য করা হয়। চাকমারা প্রধানত থেরাবাদ বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী, চাকমাদের ভাষার নাম চাকমা (চাংমা)। চাকমারা ৪৬টি বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীতে বিভক্ত। পূর্বে এ জাতি হরি ধর্মের অনুসারী হলেও পরবর্তীতে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে। চাকমা শব্দটি সংস্কৃত শব্দ ‘শক্তিমান’ থেকে আগত। বর্মী রাজত্বের শুরুর দিকে বর্মী রাজারা ‘চাকমা’ শব্দটি প্রচলন করেন।

তখনকার সময় বর্মী রাজারা চাকমাদের রাজার পরামর্শক, মন্ত্রী এবং পালি ভাষার বৌদ্ধ ধর্মের পাঠ অনুবাদকের কাজে নিয়োগ করতেন। রাজা কর্তৃক সরাসরি নিয়োগকৃত হওয়ায় বর্মী রাজ পরিবারে চাকমারা বেশ প্রভাবশালী ছিলো। তবে চাকমাদের চতুরতা ও স্বার্থপরতা বর্মীদের কাছে প্রকাশিত হয়ে পড়েছিল। বার্মায় প্রচলিত চাকমাদের নাম সংক্ষেপ ‘সাক’ শব্দটি সংস্কৃত শব্দ ‘শক্তিমানের’ বিকৃত রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরবর্তীতে এই জনগোষ্ঠীর নাম ‘সাকমা’ এবং কালক্রমে ‘চাকমা’ নামেই পরিচিতি লাভ করে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, চাকমা সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে ঐতিহাসিকভাবেই বিভিন্ন মহলের নেতিবাচক অনুভূতি ছিল।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ চাকমাই আরাকান অঞ্চল থেকে শরণার্থী হিসেবে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে এসেছিল। চাকমাদের তথাকথিত রাজবংশের শুরুটা ছিল কালিন্দি রায়ের মৃত্যুর পর থেকে। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে কালিন্দি রায় ও ধরম বক্স খাঁ’র কন্যা মেনকা এবং তার স্বামী গোপীনাথ দেওয়ান চাকমার সন্তান হরিশ্চন্দ্র রায় পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমাদের জমিদারির দায়িত্ব পাবার পর, ‘এই অঞ্চলটি চাকমাদের’ এরূপভাবে প্রচার পেতে শুরু করে।

মোঘল জমিদার ধরম বক্স খাঁর মৃত্যুর পর তার প্রথম স্ত্রী কালিন্দি রায় (যিনি চাকমা সম্প্রদায় থেকে জমিদার পরিবারের বধূ হয়ে এসেছিলেন) ব্রিটিশদের আনুকূল্যে ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে ক্ষমতা লাভের পূর্বে চাকমাদের জন্য পৃথক কোন জমিদারি ছিল না। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে চাকমা সম্প্রদায় আরাকানিদের নিকট থেকে বিতাড়িত হবার পর প্রাথমিক পর্যায়ে বান্দরবানের আলীকদমে অবস্থান নেয়, তবে চাকমাদের পূর্বে আলীকদমে মোঘলদেরও অবস্থান ছিল। বিভিন্ন সময় উত্থান পতনের পর আলীকদম থেকে মোঘল জনগোষ্ঠীর জমিদারগণ ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় অবস্থান নেন।

আর এখানে প্রথম জামিদারি স্থাপন করেন শেরমস্ত খাঁ (১৭৩৭-১৭৫৩ খ্রি.)। এরপর যথাক্রমে রাজা শুকদেব (১৭৫৩-১৭৫৮ খ্রি.), রাজা শের জব্বার খাঁ (১৭৫৮-১৭৬৫ খ্রি.), রাজা শের দৌলত খাঁ (১৭৬৫-১৭৮২ খ্রি.), রাজা জানবক্স খাঁ (১৭৮২-১৮০০ খ্রি.), রাজা তব্বার খাঁ (১৮০০-১৮০১ খ্রি.), রাজা জব্বর খাঁ (১৮০১-১৮১২ খ্রি.), রাজা ধরম বক্স খাঁ (১৮১২-১৮৩২ খ্রি.) এবং কালিন্দি রায় (১৮৪৪-১৮৭৩ খ্রি.) পর্যায়ক্রমে জমিদারি পরিচালনা করেন। কিন্তু এই জমিদার পরিবারের বিপত্তি শুরু হয় ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে যখন রাজা জব্বর খাঁ তার উত্তরাধিকার হিসেবে কোন পুত্র না থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। রাজা জব্বর খাঁর মৃত্যুর ১৮ মাস পর তার স্ত্রীর গর্ভে পুত্র সন্তানের (ধরম বক্স খাঁ) জম্ম হলে ঐ সন্তানকে জমিদারের উত্তরাধিকারী হিসেবে কেউ মেনে নিতে চায়নি। ব্রিটিশরা এই পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করে।

তারা জমিদার পরিবারের বিশৃংখল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মুসলিম এবং মোঘলদের কোণঠাসা করতেই বিতর্কিত শিশু ধরম বক্স খাঁ’র পক্ষ নেয় এবং তাদের সহযোগিতায় ধরম বক্স খাঁ জমিদার হিসেবে ঐ সময় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে মাত্র বিশ বছর বয়সে রোগাক্রান্ত হয়ে রাজা ধরম বক্স খাঁ মৃত্যুবরণ করায় আদালতের রায়ের মাধ্যমে ইংরেজ সরকার মোঘল বংশাজাত সুখলাল খাঁকে জমিদারী পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করে। কিন্তু ধরম বক্স খাঁ’র স্ত্রী কালিন্দি রায় (চাকমা সম্প্রদায়ের মেয়ে, ধরম বক্স খাঁ’র স্ত্রী) বিষয়টি আদালতে আপিল করলে দীর্ঘ ১২ বছর পর ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে তার অনুকূলে রায় পান। তারপর থেকে ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কালিন্দি রায় জমিদারী পরিচালনা করে মৃত্যুবরণ করেন। কালিন্দি রায়ের মৃত্যুর পর তার দৌহিত্র হরিশ্চন্দ্র জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমান চাকমা সম্প্রদায়ের তথাকথিত রাজাদের রাজত্ব হরিশ্চন্দ্র থেকেই শুরু হয়েছিল।

এখানে আরো একটি বিয়য় বলে রাখা ভালো। ১৮৫৭ সালে হরিশ্চন্দ্র তৎকালীন জমিদার কালিন্দির নির্দেশে সিপাহী বিদ্রোহের সময় ইংরেজ সরকারকে সহায়তা করার উপহার স্বরূপ রায়বাহাদুর খেতাব অর্জন করেছিলেন। পরবর্তীতে হরিশ্চন্দ্র জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণের পর রাঙ্গুনিয়ার রাজানগর থেকে তার জমিদারী রাঙ্গামাটিতে স্থানান্তর করেন। রাঙ্গামাটিতে চাকমাদের জমিদারি স্থানান্তরের পর যথাক্রমে হরিশ্চন্দ্র রায় (১৮৭৩-১৮৮৫ খ্রি.), ভুবন মোহন রায় (১৮৮৬-১৯৩৩ খ্রি.), রাজা নলিনাক্ষ রায় (১৯৩৪-১৯৫১ খ্রি.), রাজা ত্রিদিব রায় (১৯৫২-১৯৭১ খ্রি.), রাজা কুমার সুমিত রায় (১৯৭২-১৯৭৭ খ্রি.) এবং রাজা দেবাশীষ রায় (১৯৭৭ থেকে বর্তমান পর্যন্ত) চাকমা সম্প্রদায়ের রাজা হিসাবে কর্তব্য পালন করছেন। এখানে উল্লেখ্য, চাকমা সম্প্রদায়ের জমিদারদেররায় ‘বাহাদুর’ উপাধি থাকলেও তারা ‘রাজা’ ছিল না।

১৯৩৯ সালের ৮ জুন ইংরেজ সম্রাট ষষ্ঠ জর্জের জন্মদিবস উপলক্ষে সম্রাট জয়ন্তীতে তৎকালীন চাকমা জমিদার নলিনাক্ষ রায়কে ‘রাজা’ উপাধি প্রদান করা হয়। তার পর থেকে নলিনাক্ষ রায় নিজে এবং তার উত্তরাধিকারীগণ তাদের নামের শুরুতে ‘রাজা’ উপাধি ব্যবহার করছেন। ইংরেজ শাসনামলে ভারতবর্ষে মুসলমানদের দূরবস্থার সাথে সাথে প্রভাবশালী হিন্দুদের আধিপত্য বৃদ্ধি পায়। চাকমা সম্প্রদায়ের মেয়ে বিচক্ষণ জমিদার কালিন্দি রায়ও এটা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন বিধায় তিনি ইংরেজদের সহায়তায় জমিদারির দখল রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিনিময়ে তিনি ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী স্বাধীনতাকামী দেশপ্রেমিক সিপাহীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন এবং তাদের গ্রেফতার করে ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেন।

এ বিষয়ে মোহাম্মদ ওয়াজিউল্লাহ তার ‘আমাদের মুক্তি-সংগ্রাম’, ১৯৬৭, পৃ.-১০৩-এ লিখেছেন, ‘কালিন্দির পূর্বে প্রত্যক্ষভাবে চাকমাদের সাথে ব্রিটিশ কোম্পানির তেমন কোন বিশেষ সম্পর্ক ছিল না। বিচক্ষণ কালিন্দি রায় আনুগত্য লাভের আশায় ব্রিটিশ সরকারকে বিশেষভাবে সহযোগিতা প্রদান করেন। এমনকি ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামে সিপাহী বিদ্রোহকালে বিদ্রোহী সৈনিকরা পার্বত্য অঞ্চলে আত্মগোপন করলে, কালিন্দি রায় তাদেরকে ধৃত করার জন্য ব্রিটিশ সরকারকে সহযোগিতা করেছিলেন। সিপাহী বিদ্রোহের পলাতক সৈনিকদের বিরুদ্ধে এহেন দায়িত্ব পালনে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হয়ে কালিন্দি রায়কে কর্ণফুলী নদীর বার্ষিক জলকর (১১৪৩ টাকা) মওকুফ করে দেয়।’ অর্থাৎ কালিন্দি রায়ের হাত ধরে যে চাকমা রাজত্বের ইতিহাস শুরু সেই ইতিহাসে রয়েছে কালিন্দির স্বামী ধরম বক্সের বিতর্কিত পিতৃ পরিচয় এবং পরবর্তীতে নিজের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সিপাহী বিদ্রোহে স্বাধীনতাকামীদের সাথে বেঈমানির ইতিহাস।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর রাঙ্গামাটিতে চাকমাদের অন্য একজন রাজনৈতিক নেতা স্নেহ কুমার চাকমার নেতৃত্বে ধর্মের ভিত্তিতে সীমানা নির্ধারিত হচ্ছে এই হিসেবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের সাথে যুক্ত হবে এই আশায় ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেন, যা পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিশেষ আলোচিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। যদিও তৎকালীন ইংরেজ জেলা প্রশাসক কর্নেল জি. এল. হাইড নিজেও উক্ত পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে পতাকায় স্যালুট করেন তথাপি বাউন্ডারি কমিশনের প্রধান স্যার সিরিল রেডক্লিফ এর নেতৃত্বাধীন পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিভিন্ন অর্থনৈতিক এবং অবস্থানগত কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে মুসলিমরা সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও এলাকাটি পাকিস্তানের সাথে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্তটি অনেককে অবাক করলেও, তৎকালীন চাকমা রাজা নালিনাক্ষ রায় খুশিই হয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, ভারতের কংগ্রেস নীতি অনুযায়ী তারা স্বাধীন ভারতে কোন ধরনের স্থানীয় রাজা-রাজ কুমার বা রাজকীয় ক্ষুদ্র রাজ্য মেনে নেবে না। চাকমা রাজার পক্ষে ভারতে যোগ দিয়ে রাজত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হতো।

রাজা নলিনাক্ষের মৃত্যুর পর তার পুত্র ত্রিদিব রায় যখন ১৯৫১ সালে রাজা হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তিনি পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করা শুরু করেন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য অর্থাৎ এমপি। কাপ্তাই হাইড্রো প্রজেক্টের ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারের সাথে প্রথম দিকে মতবিরোধ থাকলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রলোভনে তিনি সর্বতোভাবে সহযোগিতা করা শুরু করেন। রাজা ত্রিদিব রায় মনে করেছিলেন, পাকিস্তানের সামরিক শাসনই পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমাদের স্বায়ত্বশাসন নিশ্চিত করবে।

তাই পাকিস্তান আমলের শুরু থেকেই তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক এবং বেসামরিক আমলাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। লন্ডনভিত্তিক ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রিয়জিত দেব সরকার রচিত তার বই ‘দ্য লাস্ট রাজা অর ওয়েষ্ট পাকিস্তান’ বইটির তথ্য অনুযায়ী, ত্রিদিব রায়ের সিদ্ধান্ত ছিল আত্মস্বার্থ কেন্দ্রিক। নিজের রাজত্ব টিকিয়ে রাখতেই ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের সাথে হাত মিলিয়েছেন। উনি চাইছিলেন তার রাজত্ব এবং রাজ পরিবারের শাসন যেন বজায় থাকে। যদিও অনেক সাধারণ চাকমা তার নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর আহবানে সাড়া না দিয়ে ত্রিদিব রায় পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে না দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেন। চাকমা রাজা হিসেবে তার প্রভাবাধীন হেডম্যান-কারবারীদের ব্যবহার করে চাকমা যুবকদের দলে দলে রাজাকার বাহিনীতে ভর্তি করেন। তাদের ট্রেনিং এবং অস্ত্র দিয়ে লেলিয়ে দেন মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে পাকিস্তানের পরাজয় অনুধাবন করতে পেরে ত্রিদিব রায় ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে পাকিস্তানি সৈন্যদের সহায়তায় মিয়ানমার হয়ে পাকিস্তানে পালিয়ে যান।

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বের হওয়া হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র’ (সশস্ত্র সংগ্রাম-১) নবম খণ্ডের (জুন, ২০০৯) ৯৩ পৃষ্ঠায় মে.জে. মীর শওকত আলী (বীর উত্তম) লিখেছেন, ‘চাকমা উপজাতিদের হয়ত আমরা সাহায্য পেতাম। কিন্তু রাজা ত্রিদিব রায়ের বিরোধিতার জন্য তারা আমাদের বিপক্ষে চলে যায়।’

অন্যদিকে ১৯৭১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা) এইচটি ইমাম তার বই ‘বাংলাদেশ সরকার-১৯৭১’-এর (মার্চ, ২০০৪) ২৬০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় প্রথম থেকেই নির্লিপ্ত এবং গোপনে পাকিস্তানীদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন।’ বাংলাদেশ এবং বাঙালি বিদ্বেষী মনোভাব ও কার্যক্রমের পুরস্কার স্বরূপ ‘পাকিস্তানের জাতীয় বীর’ খেতাব এবং আজীবন মন্ত্রিত্ব নিয়ে তিনি পাকিস্তানেই বসবাস করেছেন।

অপরদিকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের রেখে যাওয়া রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এম এন লারমা) গড়ে তোলেন সশস্ত্র সংগঠন শান্তিবাহিনী। গত তিন যুগের বেশি সময় ধরে অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে হাজার হাজার নিরীহ পাহাড়ি বাঙালি জনগণ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। এদেরই উত্তরসূরিদের হাতে এখনো অব্যাহতভাবে চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং খুনের শিকার হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের অসহায় মানুষগুলো।

২০০৩ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনী মূলক বই The Departed Melody-তে ত্রিদিব রায় নিজেই রাজাকার হিসেবে তার কর্মকাণ্ড বিস্তৃতভাবে উল্লেখ করেছেন এবং এসব অপকর্মের কারণে তিনি অনুতপ্ত তো ননই বরং গর্ব প্রকাশ করেছেন তার বইয়ে। একই সাথে তিনি মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে ব্যঙ্গ করার পাশাপাশি পাকিস্তানী হানাদারদের প্রসংশা করেছেন।

১৯৭১ সালের নভেম্বরে ত্রিদিব রায় পাকিস্তানী সৈন্যদের সহায়তায় মায়ানমার হয়ে পাকিস্তানে পালিয়ে যাওয়ার পর পাকিস্তান সরকার তাকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশেষ দূত হিসেবে ঐ বছরই থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে প্রেরণ করে। জাতিসংঘের ১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত জেনারেল এসেম্বলিতে বাংলাদেশের সদস্য পদ প্রদানের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে পাকিস্তান সরকার-এর বিরোধিতা করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লবিং করার জন্য ত্রিদিব রায়কে প্রধান করে এক প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে। বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী ত্রিদিব রায়ের লবিংয়ের কারণে চীন ভেটো প্রয়োগ করায় ঐ বছর বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ করতে ব্যর্থ হয়।

তার এই সফলতায় মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং তার মন্ত্রিসভা জাতিসংঘ ফেরত ত্রিদিব রায়কে ‘জাতীয় বীর’ খেতাব দিয়ে লাল গালিচা সংবর্ধনা প্রদান করে। পরবর্তীতে ত্রিদিব রায় ধারাবাহিকভাবে পাকিস্তানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সভা-সেমিনারে বক্তব্য দিয়ে, প্রবন্ধ লিখে, বই লিখে বাংলাদেশ বিরোধী অপপ্রচারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। গত ২০০০ সালের ৪ অক্টোবর পাকিস্তানি ইংরেজী দৈনিক ডন পত্রিকায় ‘চিটাগং হিল ট্র্যাক্ট: লেট জাস্টিস বি ডান’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রবন্ধ এবং ২০০৩ সালে প্রকাশিত তার আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থ The Departed Melody-তে সরাসরি বাংলাদেশ এবং স্বাধীনতাবিরোধী বক্তব্য রেখেছেন।

ত্রিদিব রায় পাকিস্তান সরকারের কাছে এতটাই অনুগত ছিলেন যে, তাকে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ফেডারেল মন্ত্রী, ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত পর্যটন ও সংখ্যালঘু বিষয়ক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, ১৯৮১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আমেরিকার ৫টি দেশের রাষ্ট্রদূত করে আর্জেন্টিনায় প্রেরণ, ১৯৯৫ সালের মে মাস থেকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় এ্যাম্বাসেডর এ্যাট লার্জ হিসেবে নিয়োগ, ২ এপ্রিল ২০০৩ থেকে পাকিস্তানের দপ্তর বিহীন ফেডারেল মন্ত্রী হিসেবে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়। রাজা ত্রিদিব রায়ের উত্তরসূরি তার সন্তান তথা বর্তমান চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় এর ভূমিকা সুস্পষ্টভাবে বাংলাদেশের স্বার্থ বিরোধী বলে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।

‘আদিবাসী’ ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিরোধী বক্তব্য এবং অব্যাহত অপপ্রচার তারই সাক্ষ্য বহন করে। চাকমা রাজপরিবারের প্রধানদের ধারাবাহিক এসব কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে, তারা সব সময়ই এদেশ এবং এদেশের মুক্তিকামী মানুষের আবেগ ও প্রত্যাশার বিরোধী ছিল এবং এখনো তাদের মধ্যে এই ধরনের বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব বিদ্যমান রয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় চাকমা রাজপরিবারের ইতিহাসকে স্বার্থপরতার ইতিহাস বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না।

দেবাশীষ রায় ১৯৯৮ সালে ‘টংগ্যা’ নামে একটি এনজিও প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৯৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ করে বাঙালি বিদ্বেষী ব্যক্তিদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য এনজিওগুলোর সমন্বয়ে হিল ট্র্যাক্ট এনজিও ফোরাম (এইচটিএনএফ) নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন তিনি। এর চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি নিজেই। সংগঠনটির বাঙালি বিদ্বেষী কর্মকাণ্ড এবং পাহাড়ে জাতিগত বৈষম্য তৈরিতে ভূমিকা রাখার বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে এনজিও বিষয়ক ব্যুরো কর্তৃক উক্ত এনজিওর কার্যক্রমের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। পরবর্তীতে এইচটিএনএফ এর আদলে প্রতিষ্ঠা করা হয় এইচটিএনএন নামের আরো একটি সংগঠন।

ব্রিটিশ আমল থেকেই সরকারগুলো ধারাবাহিকভাবে পার্বত্যাঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে বাধার সন্মুখীন হয়ে এসেছে। প্রথম দিকে ব্রিটিশরা তাদের শাসন কার্য পরিচালনার সুবিধার্থে কিছুসংখ্যক পাহাড়িকে শিক্ষিত করার উদ্যোগ নিলে চাকমা রাজপরিবার থেকে বাধা দেয়া হয়। ব্রিটিশরা ১৯৩৭-৩৮ খ্রিস্টাব্দে পাহাড়ে মাতৃভাষায় শিক্ষা দান চালু করেও এই পাহাড়ি নেতাদের আন্দোলনের কারণেই তা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল।

এখানে উল্লেখ্য রাঙ্গামাটি হাই স্কুলও সাধারণ পাহাড়িদের শিক্ষিত করার ব্রত নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি, বরং বর্তমান চাকমা সার্কেল চীফের পূর্ব পুরুষ ভূবন মোহন রায়কে শিক্ষিত করার জন্য এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ১৮৯০ সালে গড়ে তোলা হয়েছিল। পাকিস্তান আমলে, ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাঙ্গামাটি কলেজ। কিন্তু এটি স্থাপনও সহজ কাজ ছিল না। কারণ তৎকালীন চাকমা সার্কেল চীফ ত্রিদিব রায় রাঙ্গামাটিতে কলেজ প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি শুধু বিরোধিতা করেই ক্ষান্ত হননি বরং এটি যাতে কোনভাবেই বাস্তবায়িত হতে না পারে সে চেষ্টাও করেছিলেন। এর জন্য তিনি প্রথমে ঢাকার রাজস্ব বোর্ডের সদস্য এস এম হাসানের কাছে এবং পরবর্তীতে তৎকালীন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার করিম ইকবালের কাছে চিঠি লিখে রাঙ্গামাটিতে কলেজ স্থাপনের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার সিদ্দিকুর রহমানের দৃঢ়তায় শেষ পর্যন্ত কলেজটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

চাকমা রাজপরিবার কর্তৃক সাধারণ পাহাড়িদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের পথে অন্তরায় সৃষ্টির আরো অনেক নির্মম ইতিহাস পাওয়া যাবে অঙ্কুর প্রকাশনী থেকে ২০০২ সালে প্রকাশিত শরদিন্দু শেখর চাকমার আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থ ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আমার জীবন (প্রথম খন্ড)’ এর বিভিন্ন স্থানে। এছাড়া বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক রাঙ্গামাটিতে মেডিকেল কলেজ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হলে চাকমা সম্প্রদায়ের নেতৃত্বাধীন উপজাতি আঞ্চলিক দলগুলোর প্রবল বাঁধার মুখে পড়ে। পরবর্তীতে সরকার উপজাতি নেতৃবৃন্দের সাথে সমন্বয় করে উক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ চালু করতে সমর্থ হয়।

সার্বিক বিষয় বিশ্লেষনে নিঃসন্দেহে বলা যায় তৎকালীন চাকমা নেতৃত্ব ঐতিহাসিকভাবে সবসময় ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তারা ব্রিটিশ সরকারের সময় ব্রিটিশদের অনুগত ছিলেন এবং সিপাহী বিদ্রোহের সময় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকারীদের গ্রেফতারে সরাসরি সহায়তা করেছেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল উপজাতি যখন ধর্মের ভিত্তিতে ভারতের অধীনস্ত হওয়ার জন্য মত প্রকাশ করেছিল, তখন তৎকালীন চাকমা রাজা নলিনাক্ষ রায় অন্যান্য উপজাতিদের মতামতের আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা না নিয়ে, ব্রিটিশদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলটি পাকিস্তানের সাথে সংযুক্তির বিষয়ে খুশি হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় পাকিস্তান সরকারের অনুগত ছিলেন।

১৯৫৮ সালে যখন কাপ্তাই বাধ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয় তখন চাকমা নেতৃবৃন্দ তাদের জাতিগোষ্ঠীর কথা  বিবেচনা না করে পাকিস্তান সরকারের অনুগত হিসেবে অবস্থান নিয়েছিলো। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ যখন পশ্চিম পাকিস্তানের একপেশে আচরণের কারণে স্বাধীনতা লাভের জন্য উন্মুখ ছিল তখনও চাকমা নেতৃবৃন্দ পাকিস্তানের অনুগত হিসেবে অবস্থান নিয়েছিলো। তৎকালীন চাকমা সার্কেল প্রধান স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার হিসেবে সক্রিয়ভাবে কাজ করার সময় যখন অনুভব করলেন পাকিস্তানের পরাজয় সুনিশ্চিত তখন তিনি পালিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। এখানে যদি তিনি তার মাতাদর্শের বিষয়ে গুরুত্ব দিতেন তা হলে স্বপরিবারে পালিয়ে যেতে পারতেন, তা না করে বাংলাদেশে তার সম্প্রদায়ের অবস্থান ধরে রাখা এবং একই সাথে নিজে পাকিস্তানে অবস্থান করে বাংলাদেশবিরোধী কর্মকান্ডে লিপ্ত ছিলেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু যখন একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে ব্যস্ত তখন চাকমাদের আরেক নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বঙ্গবন্ধুর স্নেহসুলভ একটি উক্তির (তোরা সব বাঙালি হয়ে যা) অজুহাতে শান্তিবাহিনী গঠন করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেন। চাকমা নেতৃত্ব সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছিল শুধুমাত্র তাদের প্রতি করা বঙ্গবন্ধুর সেই সরল উক্তিকে তারা অহেতুক অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছে। শান্তিবাহিনী সাথে সংঘর্ষে অসংখ্য পাহাড়ী, বাঙালি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অনেক সদস্য নিহত হয়েছেন।

চাকমা নেতৃত্বের একাংশের স্বার্থপরতা এবং একপেশে নীতির কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য সম্প্রদায়ের উপজাতি অধিবাসীগণ বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। চাকমা নেতৃত্ব কখনও অন্য জাতিগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের বিকাশ সহ্য করে না। চাকমা ব্যতিত অন্য জাতিগোষ্ঠির মধ্যেও যে মেধা রয়েছে তার অনেক উদাহরণ বর্তমান সমাজে রয়েছে। সামাজিকভাবে সহায়তার অভাব এবং পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষার প্রবৃদ্ধিতে বাধা সত্ত্বেও চাকমা ব্যতিত অন্যান্য সম্প্রদায়ের উপজাতিগণ নিজস্ব মেধা ও শ্রম দিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করছে।

খাগড়াছড়ির ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের মধ্যে, গুইমারাতে মারমা সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের মধ্যে এবং বান্দরবানে চাকমা ব্যতিত অন্যান্য সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ এবং অধিবাসীগণও উল্লেখযোগ্যভাবে সমান তালে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে চাকমারা অযাচিতভাবে প্রভাব বিস্তার না করলে অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠির আরো এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো। চাকমাদের সৃষ্ট অশান্ত এই পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থা স্বাভাবিক হলে অপার সম্ভাবনাময় এই অঞ্চলে ব্যাপক হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটত।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন প্রকার কল-কারখানা, পর্যটনসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটত। সর্বোপরি দেশের অর্থনীতিতে বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক হতো। ঐতিহাসিকভাবে চাকমা নেতৃত্বের স্বার্থপরতাজনিত এই বিতর্কিত ভূমিকা দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠির স্বার্থবিরোধী হয়ে দেখা দিয়েছে।

চাকমা সম্প্রদায়ের ৪৬ ধরনের গোত্রের মধ্যে অধিকাংশ গোত্র সাধারণ উপজাতি ও বাঙালিদের সাথে মিলে মিশে এক সাথে কাজ করতে চায়। ঐতিহাসিকভাবে চাকমা সম্প্রদায়ের বিতর্কিত প্রশ্নবৃদ্ধ ভূমিকা সাধারণ পাহাড়ী, বাঙালিদের জনজীবন অতিষ্ঠ করাসহ দেশের সামগ্রীক উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বার্থান্বেষী গুটি কয়েক চাকমা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের আচরণ এবং কার্যক্রমের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরে আসছে না।

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি পুনরুদ্ধারে এবং উক্ত অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য ব্যাপক শিল্পায়ন প্রয়োজন। যুগে যুগে চাকমা সম্প্রদায়ের নেতৃত্বের স্বার্থপরতার জন্য উচ্চবিত্তদের সন্তানগণ শিক্ষার আলো পেলেও, সাধারণ পাহাড়ীদের সন্তানগণ শিক্ষাসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জাতি/গোষ্ঠী নিজ নিজ সম্প্রদায়ের জনগণের আগামী প্রজম্মকে উন্নত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য চাকমা সম্প্রদায়ের চিহ্নিত কিছু নেতৃবৃন্দের নিজ জাতিগোষ্ঠীর স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের সাথে সহমত প্রকাশ না করে, নিজ দেশ বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে নিজেকে আরো উন্নত গর্বিত বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে, এই প্রত্যাশা সকলের।


মুক্তমতে লেখা, বক্তব্য ও তথ্য পাঠকের নিজস্ব। পার্বত্যনিউজের সম্পাদকীয় নীতি এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।




চাকমা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা

সন্তোষ বড়ুয়া, রাংগামাটি থেকে:

চাকমাদের সাধারণ পরিচিতি:

চাকমা তথা চাংমা বাংলাদেশের প্রধান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলাতে চাকমাদের সংখ্যা প্রায় ৭ লক্ষ। রাঙামাটিখাগড়াছড়ি জেলাতে এদের সংখ্যা বেশী। তবে বান্দরবানেও স্বল্প সংখ্যায় চাকমাদের উপস্থিতি রয়েছে। চাকমা জনগোষ্ঠীর কিছু অংশ বর্তমান ভারতের উত্তর-পূর্বাংশে তথা ত্রিপুরা ও অরুণাচল রাজ্যে বসবাস করছে। এছাড়া চাকমাদের বড় একটি অংশ অভিবাসন নিয়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে।

চাকমাদের প্রধান জীবিকা কৃষি কাজ। এরা প্রধানত থেরাবাদ বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। তবে বর্তমানে অনেকে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষা নিচ্ছে। বুদ্ধপুর্ণিমা ছাড়া তাদের অন্যতম প্রধান আনন্দ উৎসব বিজু। চাকমাদের ভাষার নামও চাকমা (চাংমা)। চাকমাদের নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। বাঁশের অঙ্কুর হল চাকমাদের ঐতিহ্যগত খাদ্য। তারা এটাকে “বাচ্ছুরি” নামে ডাকে। এছাড়া চাকমারা শুকরের মাংস খেতে পছন্দ করে।

চাকমা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ তাদের সার্কেলের প্রধানকে রাজা বলে থাকে। সার্কেল চিফ তাদের প্রথা, রীতি, নীতি, ভূমি, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, পার্বত্য জেলা পরিষদ অধিবেশনে যোগ দেয়া, কার্বারী নিয়োগ, হেডম্যান নিয়োগের মত কাজ করে থাকে। কার্বারীরা যাবতীয় ঝগড়া, নানা সমস্যার নিস্পত্তি করে থাকে। হেডম্যানরা অনেক কাজ করলেও মুল কাজ খাজনা তোলা। চাকমা সমাজ পিতৃতান্ত্রিক সমাজ। চাকমা সমাজে ছেলেরা পূর্ব পুরুষদের সম্পত্তির বৈধ উত্তরাধিকার। ছেলেদের বর্তমানে কন্যা সন্তান কেবলমাত্র বিয়ের কাল পর্যন্ত ভরনপোষণ পাওয়ার অধিকার রাখে। পিতা বা স্বামীর অবর্তমানে চাকমা নারীরা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন।

চাকমাদের আদিনিবাস ও মূল উৎসস্থান:

চাকমাদের বিষয়ে বিস্তারিত লিখতে গেলে একটা আলাদা ইতিহাসগ্রন্থ হয়ে দাঁড়াবে। তবে অতি সংক্ষেপে এদের বিষয়ে কিছু আলোকপাত করা যাক।  ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, চাকমারা এই দেশের আদিবাসী নয়, তারা মঙ্গোলীয় জাতির একটি শাখা। বর্তমান মিয়ানমারের আরাকানে বসবাসকারী ডাইংনেট জাতিগোষ্ঠীকে চাকমাদের একটি শাখা হিসেবে গণ্য করা হয়।

আনুমানিক ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে পর্তুগিজ মানচিত্র প্রণেতা লাভানহা অঙ্কিত বাংলার সর্বাপেক্ষা পুরাতন মানচিত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব চাকমাদের সম্পর্কে উল্লেখ পাওয়া যায়। কর্ণফুলি নদীর তীর বরাবর চাকমাদের বসতি ছিল। চাকমাদের আরও আগের ইতিহাস সম্পর্কে দুটি তাত্ত্বিক অভিমত প্রচলিত। উভয় অভিমতে মনে করা হয়, চাকমারা বাইরে থেকে এসে তাদের বর্তমান আবাসভূমিতে বসতি স্থাপন করে। বিশেষজ্ঞের অভিমত অনুযায়ী, চাকমারা মূলত ছিল মধ্য মায়ানমার ও আরাকান এলাকার অধিবাসী।

এ অভিমতে বলা হয়, চাকমারা উত্তর ভারতের চম্পকনগর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে অভিবাসী হিসেবে আসে। আঠারো শতকের শেষের দিকে কেবল পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলই নয় বরং আজকের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার পাহাড়ি এলাকাগুলোতেও তাদের বিক্ষিপ্ত অবস্থান ছিল।

রাজা ভুবনমোহন রায় বিরচিত এবং বিপ্রদাশ বড়ুয়া সম্পাদিত ‘চাকমা রাজবংশের ইতিহাস’ নামক বইয়ে উল্লেখ করা আছে যে, চাকমা ও বড়ুয়ারা দীর্ঘকাল চট্টগ্রাম ও আরাকানে বাস করলেও তাঁরা এখানকার আদি বাসিন্দা নন জানতে পারি। চাকমারা চম্পকনগর থেকে এসেছেন- সেই হারানো চম্পকনগরের সংখ্যা এক নয়, একাধিক- তাও জানতে পারি’।

বৃটিশ কর্ণেল প্রী (Colonel Phyree) চট্টগ্রামের বড়ুয়া ও চাকমাদের ব্রহ্ম ইতিহাসের ৪৭ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন যে, বড়ুয়া ও চাকমাদের আকৃতিগত বৈশিষ্ট্যতার জন্য তাঁহারা দক্ষিণ বিহার অর্থাৎ মগধ হইতে আসিয়া থাকিবেন’।

আসামের ব্রহ্মপুত্রের তীরবর্তীতে চাকমা রাজ্যের রাজধানী ছিল চম্পক নগর। অনেকে বিশ্বাস করে চম্পকনগর ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ থেকে অনেক দূরে অবস্থিত এবং চাকমারা চন্দ্র বংশের ক্ষত্রীয়দের উত্তরসূরী কিন্তু তাদের চেহারার বা মুখমন্ডলের বৈশিষ্ট্য আর্যদের চেয়ে মঙ্গোলীয়দের সঙ্গে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। সিংহভাগ চাকমাদের বিশ্বাস, তারা উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের পরবর্তী বংশধর।

সার্বিক বিবেচনায় তাই বলা যায় যে, চাকমা বা অন্যান্য উপজাতীয়রা নয়, বরং বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরাই এই দেশের আদিবাসী। কারণ তারাই প্রোটো-অস্ট্রোলয়েড (Proto Astroloid) নামের আদি জনধারার অংশ এবং বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর তারাই একমাত্র আদিবাসী বা Son of the Soil বলে দাবি করতে পারে। এর পেছনে অনেক জাতিতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি-প্রমাণও রয়েছে। বিশ্বের তাবৎ শীর্ষস্থানীয় নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষকবৃন্দই এ ব্যাপারে একমত।

আদিবাসী বিতর্ক এবং চাকমাদের অবস্থান:

বাংলাদেশ সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই; বরং মূল বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিপরীতে এই অ-বাঙালি জনসমষ্টিকে- উপজাতি; ক্ষুদ্র জাতিসত্তা; নৃগোষ্ঠী নামে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু, এই অ-বাঙালি জনগোষ্ঠী জাতিসংঘ আদিবাসী অধিকার ঘোষণা ২০০৭ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ১০৭ ও ১৬৯ নং কনভেনশনের ঘোষণা অনুযায়ী নিজেদের আদিবাসী স্বীকৃতির দাবি আদায়ের কর্মসূচি পালন করে আসছে।

তবে বাংলাদেশ সরকারের দৃঢ় অবস্থানের ফলে আদিবাসী ইস্যু কিছুটা স্তিমিত হলেও কতিপয় চাকমা নেতা দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের হাত করে এ ব্যাপারে তাদের অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। বিশেষতঃ UNPFII (United Nations Permanent Forum on Indigenous Issues), ILO (International Labour Organization), CHTC (Chittagong Hill Tracts Commision), আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস, আদিবাসী ফোরাম ইত্যাদি সংগঠনের মদদে এই ইস্যুটি এখনও চলমান রয়েছে। এতে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছে বর্তমান চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় এবং অন্যান্য চাকমা শীর্ষস্থানীয় নেতাদের একাংশ।

চাকমা সার্কেল চিফ দেবাশীষ রায় UNPFII’এর দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রতিনিধি হিসেবে ২০১১-২০১৩ এবং ২০১৪-২০১৬ সালের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই অবস্থানকে পুঁজি করে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী/সংস্থাসমূহের সাথে যোগসাজশের মাধ্যমে অত্যন্ত সুকৌশলে ইস্যুটির স্বপক্ষে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাছাড়া, বিভিন্ন দেশে (অস্ট্রেলিয়া, সুইডেন, থাইল্যান্ড, ডেনমার্ক, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ইত্যাদি) অভিবাসী হিসেবে বসবাসরত পার্বত্য উপজাতীয় সদস্যদের দ্বারাও একই তৎপরতা লক্ষ করা যায়।

সেই সাথে দেশের অভ্যন্তরে সরকারি বিভিন্ন পদস্থ কর্মকর্তা বা সংস্থার ব্যানারে এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধির মাধ্যমে এই দাবির পক্ষে প্রত্যক্ষ/পরোক্ষভাবে অত্যন্ত সুকৌশলে একচেটিয়া প্রচারণা চালানো হয়, যা সরকারের ভাবমর্যাদা ও অবস্থানকে ক্ষুণ্ন করে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে, মানবাধিকার কমিশন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন’কে প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করে এবং কতিপয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দ্বারা আদিবাসী প্রচারণায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই দাবিকে পুনরায় জোরালো করবার তৎপরতা জারি রয়েছে।

চাকমাদের আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে সমস্যা কোথায়?

আমার মত অনেক মানুষের মাথার মধ্যেই এই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। তাদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে বাংলাদেশের ভেতর সকল উপজাতীয়রা স্বায়ত্তশাসিত বা স্বশাসিত অঞ্চল ও সরকার ব্যবস্থার বৈধতা পাবে। ফলে বাংলাদেশকে বিভক্ত করে তাঁরা নতুন রাষ্ট্র গঠনের বৈধতা পাবে। এসব অঞ্চলে সরকার পরিচালনায় তারা নিজস্ব রাজনৈতিক কাঠামো, জাতীয়তা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আইনপ্রণয়ন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পাবে এবং এসব অঞ্চলের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের অধিকার ও কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন হবে। এ জন্যই চাকমারা পার্বত্য জেলাগুলোকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন ‘জুম্মল্যান্ড’ গঠনের স্বপ্নে বিভোর।

বর্তমান চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের পিতা ত্রিদিব রায় ছিলো একজন কুখ্যাত রাজাকার। তার অনুসারীরা এখনো সেই আদর্শ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। আর সুযোগ সন্ধানী সন্তু লারমার সাহস কোন স্তরে থাকলে ভাবুন তো, আজো সে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেনি!!! নিজস্ব পতাকা, মানচিত্র, মুদ্রা, আইডি কার্ড থেকে শুরু করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার জন্য যত কিছু প্রয়োজন সব কিছুর প্রাথমিক যোগান তারা করে রেখেছে। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে সিএইচটি জুম্মল্যান্ড নামে চাকমা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পরিচালিত একটি পেইজের ঠিকানা এখানে দেয়া হলো (https://web.facebook.com/JUMMALAND.BD/?hc_ref=ARS8eWssT9AHidH9N357RcPPQu-q-evCgsma1Qx8_kwoIZD1hdsvT3vn7Bjh6VPwpnM)।

শুধু ফেসবুক বা সামাজিক গণমাধ্যম নয়, পাহাড়ী বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন নিউজ পোর্টাল খুলেও পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড গঠনের প্রচার চালাচ্ছে। তারা দাবি করে যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন করার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র তাদের হাতে রয়েছে। কাজেই বাংলাদেশের উপজাতিদের আদিবাসী স্বীকৃতি কোনো ছেলের হাতের মোয়া নয়। এর সাথে জড়িত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, অস্তিত্ব, কর্তৃত্ব, ইতিহাস ও মর্যাদার প্রশ্ন।

মুক্তিযুদ্ধ ও চাকমাদের বিতর্কিত অবস্থান:

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কতিপয় উপজাতীয় লোকজন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকলেও বেশিরভাগ উপজাতীয়রা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করে। বর্তমান চাকমা সার্কেল চীফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের পিতা ত্রিদিব রায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করেন। তার আশঙ্কা ছিল যে স্বাধীন বাংলাদেশে চাকমা রাজ্যের স্বায়ত্তশাসন থাকবে না এবং বাঙালিদের কারণে চাকমারা স্থানচ্যুত হবে। তাই তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে যুক্ত থেকে স্বায়ত্ত্বশাসন বজায় রাখতে চেয়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তিনি রাংগামাটি জেলার রিজার্ভ বাজার এবং তবলছড়ি বাজারে জনসভায় ভাষণ দেন। এসব জনসভায় তিনি ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগানের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করেন। ত্রিদিব রায় বাংলাদেশের একমাত্র যুদ্ধপরাধী যার লাশ পাকিস্তানে সমাহিত করা হয়েছে। যদিও তার ইচ্ছা ছিল যাতে তার শেষকৃত্য বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়। তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ দেশপ্রেমিক বাংলাদেশি জনতার প্রবল প্রতিরোধের মুখে তা সম্ভব হয়নি। মৃত্যুর দশদিন পর পাকিস্তানের ইসলামাবাদে তাকে দাহ করা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করতে এবং রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকান্ডে চাকমা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভূমিকা:

পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থিতিশীল পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা স্বাধীন ‘জুম্মল্যান্ড’ নামক দেশ গঠনের জন্য চাকমা নেতাদের একাংশ গোপনে বিভিন্ন কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছে। তারা দেশে-বিদেশে বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠনসহ নানান সংস্থার সাথে এ ব্যাপারে লবিং করছে। পাশাপাশি তারা নিজেদের সশস্ত্র সংগঠনের জন্য ব্যাপক অস্ত্র ক্রয় করছে। জানা যায় যে, পার্বত্য চট্রগ্রামের উপজাতি সন্ত্রাসীদের কাছে মায়ানমার থেকে সব অস্ত্রের চালান আসতো আরাকান আর্মির নেতা ডা. রেনিন সোয়ের মাধ্যমে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান তিনটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল জেএসএস(সন্তু), জেএসএস(সংস্কার) এবং ইউপিডিএফ এবং এর সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মূল চালিকা শক্তি এই চাকমা উপজাতির একাংশ। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর এম এন লারমার সশস্ত্র গেরিলা শান্তিবাহিনী গঠন; সন্তু লারমা, দেবাশীষ রায়, ঊষাতন তালুকদারদের দেশীয় স্বার্থ বিরোধী বিভিন্ন প্রচারণার পাশাপাশি বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের সহায়তায় নতুন উদ্ভাবিত “আদিবাসী” স্বীকৃতির দাবী, ‘জুম্মল্যান্ড’ নামে আলাদা দেশ গঠনের চক্রান্ত এসব কিছুই চাকমা সম্প্রদায়ের দেশদ্রোহিতার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে ফুটে ওঠে।

চাকমাদের একক আধিপত্যের কারণে পিছিয়ে পড়ছে অন্যান্য উপজাতি সম্প্রদায়:

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন উপজাতি সম্প্রদায়ের বসবাস থাকলেও সর্বক্ষেত্রেই চাকমা সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গই নেতৃত্বের শীর্ষ স্থান দখল করে আছে। শিক্ষা এবং চাকুরীর ক্ষেত্রে চাকমারা অন্যান্য উপজাতিদের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে। ২০১১ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে সামগ্রিক শিক্ষার হার ৫৯.৬২% যেখানে চাকমাদের শিক্ষার হার ৭৩%। অথচ, পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য সকল উপজাতিদের শিক্ষার হার ৪৪.৬২%।

শান্তিচুক্তির পর গড়ে ওঠা সংস্থাসমুহ যেমন- আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ ইত্যাদিতে চাকমা সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গ অধিকাংশ সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে। বাংলাদেশ সরকার ৫% উপজাতি কোটা বরাদ্দ করলেও এর অধিকাংশই চাকমারা ভোগ করছে। একই সাথে, বিদেশী সংস্থাসমূহের শীর্ষস্থানীয় পদগুলোতে চাকমা সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গ দায়িত্বপ্রাপ্ত রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনাপ্রবাহ এবং চাকমা সম্প্রদায়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চাকমা নেতৃত্বের মধ্যে একপ্রকার স্বার্থপরতা, ক্ষমতার প্রতি লোভ এবং যেকোন প্রকারে শীর্ষ স্থান দখলের প্রবণতা কাজ করেছে।

চাকমাদের এই স্বার্থপরতা এবং ক্ষমতার লোভের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য উপজাতি সম্প্রদায় অনগ্রসরতার বেড়াজাল থেকে বের হতে পারছে না। সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতিকে চাকমারা নিজেদের স্বার্থের কারণে কুক্ষিগত করে রেখেছে। চাকমা সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের মধ্যে সবসময় ‘নিজ’ এবং গোষ্ঠীস্বার্থকে প্রাধান্য দিতে দেখা গিয়েছে। চাকমাদের এই একক আধিপত্য ও স্বার্থপরতাকে অন্যান্য উপজাতি সম্প্রদায় মেনে নিতে পারে না কিন্তু চাকমাদের সশস্ত্র সংগঠন আর বিভিন্ন দেশী-বিদেশী মহলে যোগাযোগ থাকার কারণে তারা ভয়ে কিছু বলতে পারে না।

পরিশেষ:

চাকমা সম্প্রদায়ের চিহ্নিত কিছু নেতৃবৃন্দ যদি স্বার্থপরতা ভুলে নিজ দেশ বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করে তবে তা পার্বত্য চট্টগ্রামের পিছিয়ে পড়া অন্যান্য সম্প্রদায়কে আরো উন্নত গর্বিত বাংলাদেশী নাগরিক হিসাবে গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, বর্ণের সমন্বয়ে গঠিত আমাদের এই বাংলাদেশ। সকল সম্প্রদায়ের কৃষ্টি-কালচার মিলে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে করেছে সমৃদ্ধ। আর তাই অতীতের সংঘাত এবং জাতিগত ভেদাভেদ ভুলে সকলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলে এ দেশ সোনার বাংলা হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেই।


মুক্তমতে লেখা, বক্তব্য ও তথ্য পাঠকের নিজস্ব। পার্বত্যনিউজের সম্পাদকীয় নীতি এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।




পার্বত্য চট্টগ্রামের উপাখ্যানঃ পেশাভিত্তিক চাঁদাবাজি যেন বৈধ উৎসব

সন্তোষ বড়ুয়া, রাংগামাটি থেকে:

মাথার মধ্যে একটা প্রশ্ন ঘুরঘুর করছে। সেটা নিয়েই আমার আজকের লেখা। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি সংগঠণগুলোর কাড়ি কাড়ি টাকার উৎস কি? নানান সময়ে এরা পার্বত্য চট্টগ্রামসহ ঢাকা, চট্টগ্রাম এমনকি দেশের বাইরেও বিভিন্ন স্থানে সভা, সমাবেশ, মিছিল, মিটিং, সেমিনার করে। এই সমস্ত অনুষ্ঠান করতে বহুত টাকা খরচ হয়। এই টাকাগুলো আসে কোত্থেকে?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য গত বেশ কিছুদিন পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গায় সরেজমিনে ঘুরে বেড়িয়েছি। কথা বলেছি সাধারণ উপজাতি-বাংগালী সবার সাথে। বিশেষ করে রাঙামাটি জেলায় একটু বেশী ঘুরেছি। পরিচিত, স্বল্প পরিচিত সবার সাথে কথা বলে যা জেনেছি- তা সত্যিই ভয়ংকর।

বৌদ্ধ হওয়ার কারণে আমার বিশেষ কিছু সুবিধা আছে। কিন্তু বাঙালী হবার কারণে সেই সাথে কিছু অসুবিধাও রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরীহ মানুষের কাছ থেকে ব্যাপক চাঁদাবাজি আর বিভিন্ন এনজিও’র কাড়ি কাড়ি টাকার বিনিয়োগই হলো এই অবৈধ টাকার উৎস।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জেনেছি যে, তিন পার্বত্য জেলায় দৈনিক গড়ে দেড় কোটি টাকা চাঁদা তুলছে উপজাতি সশস্ত্র গ্রুপগুলো। চাঁদা আদায়ে নিয়োজিত রয়েছে জেএসএস ও ইউপিডিএফের পাঁচ হাজার সশস্ত্র প্রশিক্ষিত কর্মী। আদায় করা চাঁদার টাকা দিয়েই দলের নেতা-কর্মীদের বেতন-ভাতা, রেশন, অবসরকালীন ভাতা, ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি দেয়া হয়। এছাড়া পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো চাঁদার এ অর্থ দিয়ে দেশ-বিদেশে সরকার, সেনাবাহিনী এবং বাঙালি বিদ্বেষী প্রচারণা ও তাদের অস্ত্র ভান্ডার সমৃদ্ধ করার কাজ করে।

ইউপিডিএফ, জেএসএস(সন্তু লারমা), জেএসএস(সংস্কার)সহ নামি বেনামী আরও বহু উপজাতি গ্রুপ সক্রিয় এই চাঁদাবাজিতে। অনেকে হয়তো বলবেন যে, চাঁদাবাজি তো দেশের আরও অনেক জায়গায় হচ্ছে, এখানে বিশেষত্ব কী? কথা সত্য, কিন্তু পাহাড়ে চাঁদাবাজিতে চরম শঙ্কার কারণ এই জন্য যে, এই সমস্ত কোটি কোটি টাকা যাচ্ছে দুর্ভেদ্য পাহাড়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর কাছে যারা পার্বত্য জেলাগুলোকে নিয়ে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন ‘জুম্মল্যান্ড’ গঠনের স্বপ্নে বিভোর।

বর্তমান চাকমা সার্কেল চীফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের পিতা ত্রিদিব রায় ছিলো একজন কুখ্যাত রাজাকার। তার অনুসারীরা এখনো সেই আদর্শ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। আর সুযোগ সন্ধানী সন্তু লারমার সাহস কোন স্তরে থাকলে ভাবুন তো, আজো সে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেনি!!!

নিজস্ব পতাকা, মানচিত্র, মুদ্রা, আইডি কার্ড থেকে শুরু করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার জন্য যত কিছু প্রয়োজন সব কিছুর প্রাথমিক যোগান তারা করে রেখেছে। এই দেশে বহু লোক নিজেকে বিরাট বড় দেশপ্রেমিক হিসেবে পরিচয় দেয় কিন্তু আজো কোন দেশপ্রেমিক দেশকে ভালোবেসে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করেছে বলে শুনিনি।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক খাগড়াছড়ির এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আঞ্চলিক দলগুলোর চাঁদাবাজি অহরহ ঘটছে। কোনো পরিবহন মাল নিয়ে খাগড়াছড়ি ঢোকার সময় অথবা বের হওয়ার সময় চাঁদা দিতে হয়। একেক সময় তারা একেক স্থান থেকে চাঁদা তোলে। চাঁদা না দিলে গাড়ি থামিয়ে স্টাফদের মারধর করা হয়, অনেক ক্ষেত্রে গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। চাঁদা না দেয়ায় চলতি বছর বিআরটিসি ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের গাড়ি পুড়িয়ে দেয় ইউপিডিএফ নামক সশস্ত্র সংঠণের কর্মীরা’।

উপজাতি সংগঠণগুলো তাদের বিরুদ্ধে আনীত চাঁদাবাজির অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে থাকে। তারা বলে যে, তারা চাঁদাবাজি করে না। পাহাড়িদের কল্যাণে তারা কাজ করে, মানুষের সহযোগিতায় তাদের দল পরিচালিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ( ইউপিডিএফ)’র সামরিক শাখার প্রধান প্রদীপন খীসা’র বাড়ি থেকে প্রায় ৮০ লাখ টাকার (৭৮ লাখ ৯৫ হাজার ৯৬৬ টাকা) পাশাপাশি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার করে নিরাপত্তা বাহিনী। এই সমস্ত নথিপত্রের মধ্যে ইউপিডিএফের মাসিক আয় ব্যয়ের বিবরণী রয়েছে।

মাসিক প্রতিবেদন নামে জব্ধ হওয়া দুটি নথিতে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বিভিন্ন খাতে ৫ লাখ ৮০ হাজার ১৫৮ লাখ টাকা ও গত বছরের মার্চ মাসে ৬ লাখ ৯৬ হাজার ৬২৬ টাকাসহ ১২ লাখ ৭৬ হাজার ৭৮৪ টাকা খরচের হিসাব পাওয়া গেছে। খরচের খাতগুলো হচ্ছে, খানাপিনা খাতে ৪৬ হাজার ৪৩৫ টাকা, সাংগঠনিক ৬৮ হাজার ১৪১ টাকা, যাতায়াত ও যোগাযোগ ৪০ হাজার ৫৪৫ টাকা, চিকিৎসা ৩৩ হাজার ৫২ টাকা, পরিবার ভাতা ২৭ হাজার ২৮০ টাকা, কর্মী ভাতা ১০ হাজার ৫০০ টাকা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের জন্য খরচ ১৯ হাজার ৫০ টাকা, যুব ফোরামের খরচ ১৭ হাজার ৩০০ টাকা,  মোবাইল রিচার্জ ১০ হাজার ৫৫৭ টাকা, ছুটি ভাতা ৬ হাজার টাকা, পেপার বিল ২৪০ টাকা, দাপ্তরিক ৫ হাজার ৫০৬ টাকা, পোষাক পরিচ্ছদ খাতে ৮ হাজার ৯০ টাকা, নিরাপত্তা খাতে ২ হাজার ৫৭০ টাকা, হাওলাত প্রদান ১০ হাজার টাকা, হাল নাগাদ পরিশোধ ৬০ হাজার টাকা, এইচ পি বাজেট ১০ হাজার টাকা ও মেসি বাজেট ১ লাখ টাকা ইত্যাদি।

এতকিছুর পরও ইউপিডিএফ এই অর্থকে সংগঠনের সেবা খাতে উত্তোলিত গণচাঁদা দাবী করেছে। আমার প্রশ্ন হল এই গণচাঁদা তারা কার কাছ থেকে আদায় করেছে? চাঁদা আদায়ের অনুমতিই বা কে দিয়েছে তাদের?

তিন পার্বত্য জেলায় উপজাতি সশস্ত্র গ্রুপগুলোর চাঁদা আদায়ের পরিমাণ দিনে দিনে বেড়েই যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে পার্বত্য চট্টগ্রামে জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়বে। পার্বত্যাঞ্চল ঘুরে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাঁদাবাজি এখানে একটি স্বীকৃত বিষয়। সরকারি ভ্যাট-ট্যাক্স না দিলেও বাধ্যতামূলকভাবে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর নির্ধারিত চাঁদা পরিশোধ করতে হয়। থানা ও প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করলেও কোনো প্রতিকার পান না ভুক্তভোগীরা।

এ প্রসংগে বান্দরবানের লামা উপজেলার এক উপজাতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে হতাশার সুরে বলেন যে, ‘শান্তি চুক্তি আমাদের জন্য হিতে-বিপরীত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, শান্তি চুক্তির আগে শুধু মাত্র শান্তি বাহিনীকে চাঁদা দিতে হত আর এখন তিনটি দলকে (জেএসএস সন্তু, জেএসএস সংস্কার ও ইউপিডিএফ) চাঁদা দিতে হচ্ছে। এভাবে চাঁদা দিতে দিতে আমাদের মত স্বল্প আয়ের মানুষের পক্ষে পেট চালানোয় দায় হয়ে পড়ছে’।

ঐ উপজাতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কথা যে মিথ্যা নয় তার প্রমাণ পেলাম বান্দরবানের জেলা প্রশাসকের এক বিবৃতিতে। গত বছর বান্দরবান জেলার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক পার্বত্যাঞ্চলের আঞ্চলিক তিন সংগঠন সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতি (জেএসএস), জেএসএস (সংস্কার) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির চিত্র প্রকাশ্যে তুলে ধরেন।

সভায় তিনি বলেন, ‘এখানে তিনটি গ্রুপ চাঁদা সংগ্রহ করে। এলাকায় চলাচল করা প্রতিটি বাসকে জেএসএসের দুই গ্রুপকে বছরে ৫ হাজার টাকা করে এবং ইউপিডিএফকে ৩ হাজার টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। ট্রাকপ্রতি প্রতিটি গ্রুপকে ৬ হাজার টাকা করে, চাঁদের গাড়ি ৩ হাজার, ২ হাজার ও দেড় হাজার টাকা হারে চাঁদা দিতে হচ্ছে’।

তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিটি খাতের পণ্য বেচাকেনায় চাঁদা আদায় করছে সন্ত্রসীরা। ক্ষুদ্র মাছ ব্যবসায়ীরাও চাঁদার আওতার মধ্যে রয়েছেন। গ্রামের চাষীরা বাজারে আনারস, কাঁঠাল, আমসহ বিভিন্ন ফল ও ফসল বিক্রি করলে সেখান থেকেও চাঁদা দিতে হচ্ছে তাদের। একটা কাঁঠাল বিক্রি হলে তিন গ্রুপ মিলে ৫ টাকা চাঁদা আদায় করে। প্রতিটি কলার ছড়িতে দিতে হয় ৫ টাকা করে। এমন কোনো আইটেম নেই যেখানে চাঁদা দিতে হয় না’।

এমনকি সরকারী অফিসার হলেও ফরেস্ট অফিসারদের ওপরও চাঁদা ধার্য করেছে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা। পারমিটের গাছ চেক করার জন্য কোন অফিসার বাগানে যেতে হলে ফি বাবদ ৪,০০০ টাকা জমা দিতে হয়। তাছাড়া কোন অফিসার পারমিটের কী পরিমাণ গাছ চেক করবেন, তার জন্য চাঁদা কালেক্টরের লিখিত অনুমতি নিতে হয়।

অনুমতির বাইরে একটি পারমিটও তদন্ত করার ক্ষমতা সরকারি বন বিভাগের কর্মকর্তারা রাখেন না। অর্থাৎ বন বিভাগের ওপর সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। যার প্রমাণ, ২০১৫ সালে রাঙ্গামাটির তিনজন বন কর্মকর্তাকে চাঁদা বকেয়া পড়ার অপরাধে অপহরণের ঘটনা।

বাঘাইহাট রেঞ্জ কর্মকর্তা সৈয়দ গোলাম সাহিদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘এখানে আমাদের কিছু সমস্যা আছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়েছি’। তিনি আরো বলেন, ‘এখানে আমাদের সরকার ছাড়াও আরেকটি সরকার কাজ করে। এখানে আমাদের কিছুটা নিয়ম মেনে চলতে হয়। বনে যেতে অনেক সময় আমাদের অনুমতি নিতে হয়’। কার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয় সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘সব কিছু আমি খুলে বলতে পারবো না কারণ আমাকে তো এখানেই বসবাস করতে হয়’।

সরেজমিনে ঘুরে আরো জানতে পেরেছি যে, নদীপথের জলযান, সড়ক পথের যানবাহন, মৎস্য ব্যাবসায়ীদের ওপর, হাট-বাজার ও বাজারজাতকৃত পণ্যে ওপর, ঠিকাদারদের ওপর, বাঁশ ও বেত জাতীয় সম্পদের ওপর, কৃষি জমি ও বাগানসহ হেন কোন সেক্টর নেই যেখানে চাঁদা দিতে হয় না। চাঁদা না দিলেই খুন, গুম, ধর্ষণসহ নানান নির্যাতন সইতে হয় উপজাতি-বাংগালী সকল পেশা ও শ্রেণীর মানুষকে।

বিভিন্ন সূত্র মারফত জানা যায় যে, বিভিন্ন খাত ছাড়াও বছরের বিভিন্ন সময়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, জুম্ম জাতীয় নেতার মৃত্যু দিবস, মাতৃভাষা দিবস, দলের কাউন্সিল, বৈসাবি/বিজু/সাংগ্রাই, পূজা, বৌদ্ধ পুর্ণিমা, বৌদ্ধ বিহার/মন্দির, কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান ইত্যাদির নামে বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, কাঠ ব্যবসায়ী সমিতি, যানবাহন মালিক সমিতি, ব্রিক ফিল্ড সমিতি, জেলা পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড, ব্যাংক, এনজিও, সরকারি/বেসরকারি অফিস ইত্যাদি থেকে চিঠি দিয়ে রশিদের মাধ্যমে চাঁদা আদায় করে থাকে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো চাঁদার এ অর্থ দিয়ে দেশ-বিদেশে বাঙালি বিদ্বেষী প্রচারণা ও তাদের অস্ত্রভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার কাজ করে থাকে।

অনগ্রসর জাতি হিসেবে সরকার উপজাতিদেরকে ইনকাম ট্যাক্সের আওতামুক্ত রেখেছে। এই সুযোগের অপব্যবহার করছে উপজাতিরা। উপজাতি হর্তা-কর্তাদের সম্পদের হিসেব নিয়ে দূর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কখনো মাথা ঘামায় না। উপজাতিদের বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে, অনেক উপজাতি নেতা-কর্মীরা বাংলাদেশের অনেক ধনী লোকের চেয়েও বেশী ধনী।

ভাবতে ভালোই লাগছে যে, উপজাতিরা আজ অনগ্রসর থেকে অগ্রসরের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সরকার এবং প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি যে, সকল উপজাতি সংগঠন এবং কর্তা ব্যক্তিদের সম্পদের হিসাব নেয়া হোক, তাদের আয়ের উৎস সম্পর্কে খোঁজ নেয়া হোক। তাহলেই প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসবে। পাশাপাশি, ইনকাম ট্যাক্স প্রদানে সক্ষম উপজাতি ব্যক্তিবর্গদেরকে ইনকাম ট্যাক্সের আওতায় নিয়ে আসা হোক। এতে করে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে উপজাতিদের অবৈধ আয় বন্ধ হবে বলে আশা করছি।




পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ফেসবুকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হিংসাত্মক বিদ্বেষমূলক ও রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা

সন্তোষ বড়ুয়া, রাঙামাটি থেকে:

বর্তমান সময়ে ‘ফেসবুক’ একটি অতি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু বিপথগামী উপজাতি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন এবং তাদের দোসর কতিপয় স্বার্থান্বষী তথাকথিত অনলাইন এক্টিভিস্ট ও বুদ্ধিজীবিরা ফেসবুককে তাদের হিংসাত্মক, বিদ্বেষমূলক, ঘৃণাত্মক ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতা বিরোধী অপপ্রচারণার মুখপত্র বানিয়ে ছেড়েছে। তাদের এহেন প্রচারণার কারণে ইদানিং ফেসবুককে অনেকে ‘ফেকবুক’- নামেও অভিহিত করছে।

তারা বিভিন্ন নামে বেনামে ফেসবুক আইডি, পেজ আর গ্রুপ খুলে নানান রকম মিথ্যা, বানোয়াট, আজগুবি, গাঁজাখুরি আর বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছে। তাদের এ সমস্ত প্রচারণার বেশীরভাগই রাষ্ট্রবিরোধী।

দেশের প্রচলিত আইন-কানুন আর সংবিধানকে তোয়াক্কা না করে তারা নিজেদের মত করে নানা রকম মিথ্যাচার করে থাকে। অনেকে হয়তো বলবেন ‘বাক-স্বাধীনতা’র কথা।

কিন্তু বাক স্বাধীনতা মানে এই নয় যে, আপনি দেশের স্বাধীনতা আর সার্বভৌমত্বের বিপক্ষে কথা বলবেন। বাক স্বাধীনতা মানে এই নয় যে, আপনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির পথ সুগম করে তুলবেন।

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অখণ্ড ভূ-খণ্ড পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি আর বান্দরবান নিয়ে ‘জুম্মল্যান্ড’ নামে আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পাঁয়তারা করছে এই সমস্ত উপজাতিরা।

স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য তারা আলাদা সামরিক বাহিনী গঠন, নিজস্ব পতাকা, মুদ্রা, আইডি কার্ড এমনকি মানচিত্র পর্যন্ত ফেসবুকে প্রচার করে আসছে।

পাশাপাশি তাদের দলীয় নেতারা প্রকাশ্যে বিভিন্ন সভা-সেমিনার করেও পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের হুমকি দিয়ে আসছে।


 

কতিপয় বিপথগামী এই সমস্ত উপজাতি সংগঠনগুলোর স্বার্থ-সিদ্ধিতে হাত মিলিয়েছে দেশের কতিপয় বুদ্ধিজীবীর মুখোশধারী দেশদ্রোহী ভদ্রমানুষগুলো।

বুঝে, না বুঝে অথবা টাকার কাছে নিজেদের বিবেক বিসর্জন দিয়ে এই মুখোশধারী বুদ্ধিজীবীরা উপজাতিদের এই সমস্ত দেশদ্রোহী কর্মকান্ডে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে আসছে।

 

চলমান রোহিঙ্গা সংকটকে পূঁজি করেও পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র শুরু করে দিয়েছে উপজাতিরা। রোহিঙ্গা সংকটের আগুন পার্বত্য চট্টগ্রামে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য ভেতরে ভেতরে পাহাড়ী উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানা গেছে।

বিশেষ করে ফেসবুকে এইসব উপজাতীয় সন্ত্রাসী ও তাদের সমর্থক আইডি/পেইজগুলোতে রোহিঙ্গা সঙ্কটকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বিভিন্ন ধরণের উষ্কানীমূলক পোস্ট প্রদান করছে।

এসব পোস্টে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে রোহিঙ্গাদের মতো বাঙালীদের জানমাল ধংস করে তাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়া করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার হুমকি দেয়া হয়েছে।

ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত ও দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা পেয়েছে একটি স্বাধীন দেশ। বর্তমান চাকমা সার্কেল চীফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের পিতা ত্রিদেব রায় ছিলো একজন কু-খ্যাত রাজাকার। ত্রিদিব রায় বাংলাদেশের একমাত্র রাজাকার যে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও পাকিস্তান মন্ত্রীসভার সদস্য ছিল। মৃত্যুর পর যার লাশ পাকিস্তানেই সমাহিত করা হয়েছে।

সেই কু-খ্যাত রাজাকারের অনুসারীরা আজ স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রকে খন্ডিত করে ‘জুম্মল্যান্ড’ গঠনের পাঁয়তারা করছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ০৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ সূর্যসন্তানের একজন হলেন বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ। যার সমাধিস্থল রাংগামাটি জেলাতে। সেই পবিত্র মাটি কি জুম্মল্যান্ডের অংশ হবে?

উপজাতীদের এই সমস্ত কার্যক্রমকে শুধুমাত্র ফেসবুকে অপপ্রচার হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রদ্রোহীতামূলক কার্যক্রমের জন্য তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকার এবং প্রশাসনের নিকট অনুরোধ জানাচ্ছি।