জনগনের আপদে বিপদে সেনাবাহিনী কতটুকু পাশে আছে?


পারভেজ হায়দার

ছোটবেলা থেকেই আর্মির প্রতি ছিল দূর্নিবার আকর্ষণ। আর্মির পোষাক, ঢা-ঢা গুলির আওয়াজ আমাকে আকর্ষণ করতো । সেই সময়ে টুকটাক ইতিহাসের বিভিন্ন বই যখন পড়তাম, বিশ্বের নামকরা নেতাদের সাথে কোন না কোনভাবে আর্মি যোগসূত্র খুঁজে পেতাম । মনে হতো, একজন নেতা হতে হলে আমাকে আর্মি হতে হবে । কিন্তু আমার এই স্বপ্ন দু—দু’বার হোঁচট খেয়েছে । শুনেছিলাম ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হলে নাকি সহজে আর্মি হওয়া যায় । ক্যাডেট কলেজের ক্লাশ সেভেন থেকে ইউনিফর্ম পরা সুশৃঙ্খল জীবনের শুরু হয়, যা পরবর্তীতে একজন সফল আর্মি হতে অনেক কাজে লাগে ।

কিন্তু ক্লাশ সেভেনে ক্যাডেট কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় কেন যেন উতরে যেতে পারলাম না । স্বপ্ন যাত্রার এই ক্ষণে হোঁচট খেয়ে অনেকটা দুঃখ নিয়েই লেখাপড়া চালিয়ে গেলাম, আর এক সময়ে কলেজের গণ্ডি পার হলাম । রেজাল্টও নেহায়েত খারাপ করলাম না । আমার সহপাঠী বন্ধুরা যখন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার আশায় মেডিকেল কলেজ আর বুয়েটে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আমার ছোটবেলার সেই স্বপ্ন পূরণে দ্বিতীয়বারের মত চেষ্টা করলাম । আমি মেডিকেল কলেজ বা বুয়েটে ভর্তির চেষ্টা বাদ দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসার হওয়ার জন্য প্রস্তুতি শুরু করলাম, কিন্তু এবারও আমাকে হোঁচট খেতে হলো । ওরা যে কি চায়, তা আমি আজও বুঝিনা । আমার মনে হয়েছিল আমার পরীক্ষা যথেষ্ট ভালো হয়েছে, আমার শারিরীক গঠনও ভালো, আর আমি ভালো দৌঁড়াতেও পারি, তারপরও কেন যেন ওদের পাশ নম্বরের মাপকাঠিতে আমি পৌঁছাতে পারলাম না ।

ছেলেবেলা থেকেই আর্মি হওয়ার স্বপ্ন এভাবে ভেঙ্গে যাওয়ার পর, ওদের উপর আমার একপ্রকার ঘৃণা কাজ করতো । এরপর একটু দেরিতে হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পছন্দের সাবজেক্টে ভর্তি হয়ে জীবনটাকে নতুন করে গুছিয়ে নিতে শুরু করলাম । বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে আমাদের শিক্ষক, ছাত্রনেতা এমনকি সাধারণ ছাত্রদের মাঝে সেনাবাহিনীর প্রতি এক প্রকার অপছন্দ, বিরক্তি আবার কোন কোন ক্ষেত্রে ঘৃণা আমার চোখে পড়েছে । আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম তখন একটা শ্লোগান প্রায় ছাত্রনেতাদের মুখে শুনেছি, “সামরিক খাতে ব্যয় কমাও, শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াও”।

আর্মি হবার স্বপ্ন ধুলিস্মাত হবার পর ওদের (আর্মিদের) প্রতি আমার পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, তৎকালীন আমার শিক্ষক, ছাত্রনেতা আর বন্ধুদের মনোভাব আর মন্তব্যের সাথে মনের অজান্তেই একমত পোষণ করতে অনুপ্রাণিত হতাম । ওদের মতো আমিও ভাবতাম সেনাবাহিনীর লোকজন খুব আরাম-আয়েশে দিন কাটায়, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কোন ভূমিকা রাখে না, এদেশে কখনো যুদ্ধ হবে নাকি ! এত বড় সেনাবাহিনী পুষে লাভ কি, বাজেটের বড় অংশই সেনাবাহিনীর পিছনে খরচ হয়, একটা গরিব দেশের জন্য এই সেনাবাহিনী কি আদৌ দরকার আছে ! সেনাবাহিনীর লোকজন সবাই ফ্রি খায়, দেশের গরীব লোকজন খেতে পায় না ! ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট শহরের অর্ধেক জায়গা দখল করে আছে, ক্যান্টনমেন্টগুলোতে ঢুকতে হলে প্রশ্নবানে জর্জরিত হতে হয়, ঢাকা শহরে যানজট ক্যান্টনমেন্টের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে এমনি আরও অনেক মন্তব্য ও বক্তব্যের সাথে আমি সহমত প্রকাশ করতাম ।

ছাত্র জীবনের সে সময়গুলোতে আমার পড়াশুনার বিষয়ভিত্তিক বই ছাড়া, গবেষণামূলক কোন বিষয়ে সময় নিয়ে পড়াশুনা করার সময় পেতাম না, তাই সেনাবাহিনীর প্রতি আমাদের শিক্ষকদের মনোভাব, ছাত্রনেতাদের বক্তব্য, টেলিভিশন আর পত্র পত্রিকায় সুশীল সমাজের কর্তা ব্যক্তিদের লেখনী এবং সর্বোপরী সেনাবাহিনীর প্রতি আমার দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ সব মিলিয়ে সেনাবাহিনীকে আমার কাছে এক প্রকার প্রতিপক্ষ হিসেবে মতো হতো ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যখন কর্মজীবনে এলাম, তখন আমার কর্মস্থলের কর্তা ব্যক্তিদের দেশ স্বার্থ বিরোধী সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড, আমাকে সার্বিক বিষয় নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখার জন্য প্ররোচিত করলো । সবচেয়ে আমাকে হতাশ করেছিল স্বার্থান্বেষী সুশিল সমাজের কর্তা ব্যক্তিদের ভূমিকা । এছাড়া দেশের স্বার্থ পরিপন্থি বিষয়গুলোতে প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার আশানুরূপ গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা দেখে আমি ব্যথিত হতে শুরু করলাম । কোন কোন ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থে সরকার সুচিন্তিত কোন সিদ্ধান্ত নিলে তথাকথিত সুশীল সমাজের বিপক্ষে অবস্থানগ্রহণ আমাকে আশ্চার্যাণ্বিত করে তুলতো ।

সরকার ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেশের স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীদের তাদের ২০০৭ সাল থেকে নতুন দাবী অনুযায়ী “আদিবাসী” না বলে‚ “ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠী” বলে ডাকার জন্য সার্কুলার জারী করেছে । যদি ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে আসলেই তারা হতো তাহলে কোন আপত্তি ছিল না । কিন্তু প্রকৃত পক্ষে তারা “আদিবাসী” নন, বিষয়টি ধ্রুব সত্য । তারা ২০০৭ সাল থেকে হঠাৎ করেই “আদিবাসী” হতে চাইছেন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে । বাংলাদেশের সুশীল সমাজ বিষয়টি অনুধাবন করতে পারেন না তা নয়, তারা তাদের ব্যক্তিগত মুনাফা বিবেচনায় দেশের স্বার্থ বিরোধী জেনেও উপজাতিদের “আদিবাসী” বলে ডাকেন ।

এক্ষেত্রে তারা দেশের প্রচলিত আইনের বিধি নিষেধ এর কোন তোয়াক্কা করেন না । এমনিভাবে অনেক বিষয়ে ক্রমান্বয়ে তাদের বক্তব্যের সাথে যখন বাস্তবের অমিল খুঁজে পেলাম তখন আমাকে একটু নড়েচড়ে বসতেই হলো । এরই মধ্যে অবসর সময়ে বিভিন্ন প্রকার বই, প্রবন্ধ, দেশ বিদেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের লিখিত ইতিহাস ইত্যাদি অধ্যয়নের পর আস্তে আস্তে আমার উপলব্ধির পরিবর্তন হচ্ছে বলে মনে হলো ।

এখন কোন বিষয় সামনে আসলে, বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচারিত তথ্যের সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশুনা করে সত্য জানার জন্য অভ্যাস গড়ে তুললাম । ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক শিক্ষা আমাকে সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকতে সব সময়ে উৎসাহিত করতো । ছাত্র জীবন আর দীর্ঘ কর্ম জীবনের এই পর্যায়ে আমার ছোট্ট উপলব্ধি হচ্ছে, কোন প্রতিষ্ঠানের শক্ত মেরুদণ্ডের ভিত্তি হচ্ছে “সততা” । আমার মনে হয়েছে, কাজের ক্ষেত্রে সংস্থার কেউ কেউ ভুল ভ্রান্তি করতেই পারে, তবে ঐকান্তিক ইচ্ছা আর সততার সাথে যদি দেশপ্রেম থাকে তাহলে সেই সংস্থার সাফল্য মোটামুটি সু-নিশ্চিত ।

লেখার মত অনেক বিষয়ই আছে, তবে আজ আমি আমার ছোটবেলার পছন্দের সেনাবাহিনী যাদের পরবর্তীতে আমি ঘৃণা করতে শুরু করেছিলাম তাদের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে কলম ধরতে ইচ্ছে হলো । সেনাবহিনী নিয়ে আমার বর্তমান এই ভাবান্তর গত ১১ জুন ২০১৭ তারিখে রাঙামাটিতে পাহাড় ধসের পর দুইজন সেনা অফিসার আর দুইজন সৈনিক পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে শাহাদাতবরণের খবরটি শুনবার পর থেকে।


চিত্র-১: রাঙামাটিতে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছে সেনাসদস্যরা ।

সেনাবাহিনীতে আমি কাজ করার সুযোগ না পেলেও আমার অনেক বন্ধু-বান্ধব সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদবীতে কাজ করছে । তাদের বিভিন্ন ফেসবুক স্ট্যাটাস এর মাধ্যমে পাহাড় ধসে মর্মান্তিকভাবে নিহত হন ৪ জন (শহীদ মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল হক, শহীদ ক্যাপ্টেন মো. তানভীর সালাম, শহীদ কর্পোরাল মো. আজিজুল হক এবং শহীদ সৈনিক মো. শাহিন আলম) এবং আহত ১০ জন সেনাসদস্য সম্পর্কে জানতে পারলাম । এদের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন এবং দেশ নিয়ে চিন্তা ভাবনা সবকিছু আমাকে সেনাবাহিনীর প্রতি মনের ভিতর পুষে রাখা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যেন ক্রমান্বয়ে আমার পুষে রাখা পুরোনো উপলব্ধি পরিবর্তনে পুনরায় ভাবার জন্য তাগাদা দিচ্ছিল । শহীদ মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল হক এবং তার অধিনস্ত সৈনিকগণ সেদিন কারও অনুরোধের জন্য অপেক্ষা করেননি, তারা পাহাড় ধসে বিপদগ্রস্ত মানুষদের উদ্ধারে নিঃস্বার্থভাবে ঝাপিয়ে পড়েছিল । পাহাড় ধসে উদ্ধারের বিষয়ে হয়তো তাদের কোন প্রশিক্ষণ ছিল না, কিন্তু দেশের মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোকে নিজেদের কর্তব্য মনে করেই ওরা সেদিন এগিয়ে গিয়েছিল ।


চিত্র-২: কমান্ডো সেনাসদস্যদের হলি আর্টিজানে অভিযান পরিচালনার দৃশ্য ।

গত ১ জুলাই ২০১৭ তারিখে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচাইতে নৃশংস জঙ্গি আক্রমণের একবছর পূর্তি হলো । যতদূর মনে পড়ে সেদিন হলি আর্টিজান বেকারির ভিতরে জঙ্গি নৃশংসতার বলি হয় দেশী-বিদেশী মোট ২০ জন নাগরিক । এদের মধ্যে ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপনী, ১ জন ভারতীয়, ১ জন বাংলাদেশী/আমেরিকান এবং ২ জন বাংলাদেশী নাগরিক ছিল । প্রাথমিকভাবে এই ধরনের জঙ্গি হামলা মোকাবেলায় পুলিশের আভিযানিক প্রস্তুতি ও যথেষ্ট সক্ষমতা না থাকায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমান্ডো দলকে ঐ অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় ।

সেনাবাহিনী তাদের কমান্ডো অভিযানে দেশী-বিদেশী মোট ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয় । হলি আর্টিজান বেকারির জঙ্গি হামলার এক বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বিভিন্ন মিডিয়া ও প্রকাশনায় পুলিশের সাফল্যকে ফলাও করে প্রচার করা হলেও মূলত গত বছরের ঐ দিনে সেনাবাহিনীর কমান্ডো দলের প্রয়োজন ছিল বিধায় তাদেরকে অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল । তবে একটি বিষয় অনস্বীকার্য যে পুলিশের দুইজন সদস্য তাদের অভিযানের শুরুতেই জঙ্গিদের নিক্ষেপকৃত গ্রেনেডের আঘাতে নিহত হয়েছিল । তাই পুলিশ বা সেনাবাহিনীর সাফল্যের মাপকাঠিতে কার ভূমিকা কত বেশি সেই বিতর্কে না গিয়ে, যার যার অবস্থান থেকে তাদের ভূমিকার জন্য যথাযথ স্বীকৃতি অবশ্যই দিতে হবে ।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চৌকশ কমান্ডো দল নিজেদের কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই অতি অল্প সময়ে জঙ্গিদের নির্মূল করতে যে পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে, সারা বিশ্বের কাছে তা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে । আমরা যারা নিয়মিত একটু খোঁজ খবর রাখি তারা নিশ্চয়ই সহজে অনুধাবন করতে পারবো যে, উন্নত বিশ্বে অর্থাৎ ইউরোপ বা আমেরিকায় এ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া জঙ্গি হামলা মোকাবেলার সাফল্যের তুলনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমান্ডো দলের মত এমন ঈর্ষণীয় সাফল্য খুব কম ক্ষেত্রেই হয়েছে ।

                                                        চিত্র-৩: সিলেটের শিববাড়ী এলাকায় আতিয়া মহলে জঙ্গি নির্মূল অভিযান পরিচালনার দৃশ্য ।

গত মার্চ ২০১৭’তে সিলেটের শিববাড়ী এলাকার আতিয়া মহলে জঙ্গি হামলা দমনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমান্ডো দল “অপারেশন টোয়াইলাইট” এ সাফল্য জনকভাবে অংশগ্রহণ করে নিজস্ব কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই জঙ্গিদের সমূলে নির্মূলসহ আতিয়া মহলে অবস্থানরত ৭৮ জন নিরীহ পুরুষ, মহিলা এবং শিশুদের সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয় । আতিয়া মহলের মত বিশাল আকারের ভবনের মধ্যে থেকে জঙ্গিদের নির্মূল শেষে বিপুল সংখ্যক বেসামরিক ব্যক্তিবর্গকে উদ্ধারের বিষয়টি নিঃসন্দেহে তাদের উন্নত পেশাদারিত্বের পরিচয় বহন করে ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টি একটি নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। খাগড়াছড়ি জেলার দূর্গম সাজেক এলাকায়, বান্দরবানের দূর্গম থানচি এলাকায় ক্ষুধার্ত, খাদ্যাভাব পীড়িত সাধারণ উপজাতিদের কাছে হেলিকপ্টারে করে অথবা নিজেরা পায়ে হেটে দূর্গম পাহাড় ডিঙ্গিয়ে খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার ঘটনা তো প্রায় প্রতি বছরই ঘটছে । গত বছর কোন একটি পত্রিকায় পড়েছিলাম সাজেকের দূর্গম এলাকায় মহামারি আকারে ডায়রিয়া আর অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে । ঐ সময়ে ৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অতি দ্রুত সেখানে ছুটে গিয়ে দূর্গম পাহাড়ের মধ্যে অস্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণ করে সেখানে ৩৫০-৪০০ মহামারী আক্রান্ত রোগীদের পরম যত্নের সাথে চিকিৎসা সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলে । যত দূর মনে পড়ে দূর্গম ঐ এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা নিজেদের আহার বিশ্রামের বিষয়ে গুরুত্ব না দিয়ে, ১০ দিন যাবৎ বিভিন্ন প্রকার চিকিৎসা সেবা এবং জনস্বার্থমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল ।


চিত্র-৫: সেনাবাহিনীর অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্রে অসুস্থদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে।

গত মাসে রাঙামাটিতে পাহাড় ধসে সেনাবাহিনীর কয়েকজে সদস্য শহীদ হবার পর থেকে আমার যখন বোধদ্বয় শুরু হলো, আস্তে আস্তে সেনাবাহিনীর কার্যক্রমের বিষয়ে জানার চেষ্টা করলাম । মুক্তযুদ্ধকালীন সময় থেকে এ পর্যন্ত প্রতিনিয়ত সবসময়ে বাংলাদেশের মানুষ যখন কোন আপদে/বিপদে পড়েছে সেনাবাহিনীর সদস্যদেরকে কোন না কোনভাবে নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে যেতে দেখা গেছে, এমন ঘটনা অসংখ্যবার ঘটেছে। যেসকল ঘটনা আর ইতিহাস এই সীমিত পরিসরে বলে শেষ করা যাবে না।

তবে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, বিগত ২৪ এপ্রিল ২০১৩ সালের বহুল আলোচিত ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর যে মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল সেই পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রায় ২৫০০ আহত নারী-পুরুষকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল । পরবর্তীতে রানা প্লাজার ধসে যাওয়া ভবনের ধ্বংসস্তুপ অপসারণের কাজটি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরাই করেছিল । বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ যেকোনো প্রকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বড় ধরণের দূর্যোগে সেনাবাহিনীকে সবার আগে ডাক পড়ে। অথবা অগতির গতি হিসাবেও সেনাবাহিনীর ডাক পড়ে।

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবনে সেনাবাহিনী সম্পর্কে যে সকল নেতিবাচক বক্তব্য শুনেছি তার মধ্যে বহুল আলোচিত একটি হলো সেনাবাহিনী বাংলাদেশের বাজেটের বড় একটি অংশ খেয়ে ফেলছে । কিছুদিন আগে পর্যন্ত আমি নিজে সেই বিশ্বাস ধারন করে ছিলাম । কিন্তু পরবর্তীতে সেনাবাহিনী সম্পর্কে কিছুটা খোঁজখবর করতে গিয়ে জানতে পারলাম সেনাবাহিনীর জন্য বাজেট, দেশের বাজেটের সব খাতগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে তো নয়ই বরং অনেক পিছনে অবস্থান করছে । আর বরাদ্দকৃত এই বাজেটের বড় অংশই চলে যায় সেনাবাহিনী সদস্যদের বেতন ও ভাতা সংকুলানে।

তবে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন জাগতে পারে সেনানিবাসগুলো এত পরিপাটি আর সুন্দর থাকে কি করে? অনেকের মধ্যেই এমন মনে হতে পারে ক্যান্টনমেন্টগুলো সেনাবাহিনীর বিপুল অংকের বরাদ্দ ব্যবহার করে সৌন্দর্য রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় । আসলে বিষয়টি তা’ নয়, সেনাবাহিনীর মধ্যে চমৎকার শৃঙ্খলা এবং সততা এখনো টিকে আছে বিধায় স্বল্প বরাদ্দকৃত অর্থের মাধ্যমেই সেনাবাহিনী নিজেদের সুন্দরভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে । উন্নত বিশ্বের সেনাবাহিনীর মত অত্যাধুনিক সরঞ্জামাদি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে না থাকলেও, সীমিত সম্পদের সঠিক ব্যবহারের কারণে সেনাবাহিনীর মধ্যে ক্রমান্বয়ে আধুনিকরণ সম্ভব হচ্ছে । বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা আর ইন্টারনেট সূত্রের মাধ্যমে জেনেছি, সেনাবাহিনীর প্রতিটি বিভাগেই আধুনিকায়নের জন্য জোর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে ।

নতুন প্রজন্মের বড় অংশের বিশ্বাস চিন্তাধারা আর তাদের পথ প্রদর্শনকারী শিক্ষক সমাজের মনস্তাত্ত্বিক ভাবনা সব কিছুতেই সেনাবাহিনী সম্পর্কে একটা নেতিবাচক মনোভাব আর প্রচারণা দৃশ্যমান । বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা আমাদের সমাজ থেকেই যোগদান করে । সেক্ষেত্রে সেনাবাহিনীও আমাদের সমাজেরই অংশ। দেশের মানুষের আপদে বিপদে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা যেভাবে নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে যায়, তাতে মনে হয় ওরা তাদের সামাজিক এই দায়বদ্ধতা ভালোভাবেই পালন করছে ।

কালের পরিক্রমায় অনেক কাজের ভিড়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভুলভ্রান্তি হওয়া অস্বাভাবিক নয়, হয়তো তাদের কিছু কিছু কার্যক্রম সাধারণ মানুষকে কষ্ট দিয়েছে, হয়তো তাদের কিছু বিপথগামী সদস্য কিছু ভুলভ্রান্তি করেছে, তবে সার্বিক বিষয় বিশ্লেষণ করে নেতিবাচক ঐ বিষয়গুলোকে আমি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই দেখতে চাই ।

সেনাবাহিনীর মত বড় এই সংগঠন, যারা শৃঙ্খলা আর সততার সাথে কাজ করছে, জাতিসংঘ মিশনসহ বিভিন্ন বৈদেশিক দায়িত্ব পালনে উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে উঁচু মানের পেশাদারিত্বের পরিচয় দিচ্ছে, সেই সেনাবাহিনীর প্রতি অসন্তুষ্টি নয় বরং মনস্তাত্ত্বিকভাবে তাদের উৎসাহ দিয়ে সাধারণ মানুষের বিপদে এবং দেশ মাতৃকার বিভিন্ন উন্নয়নে তাদের অধিক সম্পৃক্ত করতে পারাই দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গল ।

স্বপ্নের এই সেনাবাহিনীতে আমি যোগদান করার সুযোগ না পেলেও আমার সমাজের ভাইয়েরাই তো ওখানে আছেন । ওনাদের ভালো কাজে অর্জিত গর্বে আমরাও অংশীদার হতে পারি । বর্হিঃবিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ক্রিকেট, এ দেশের গার্মেন্টস ছাড়া আর যে বিষয়টি এ দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে তা হচ্ছে, জাতিসংঘে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ সংখ্যক অংশগ্রহণ । এই দেশ আমাদের সকলের । গর্বের যতসামান্য বিষয়গুলো নিয়ে অহেতুক বির্তকে না জড়িয়ে, ইতিবাচক গ্রহণযোগ্যতার মনোভাব নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের আপন করে নিয়ে একসাথে কাজ করাই শ্রেয় ।


উৎসর্গঃ এই প্রবন্ধটি গত ১১ জুন ২০১৭ তারিখে রাংগামাটির পাহাড় ধসে দুর্গতদের উদ্ধারে এগিয়ে যাওয়া শহীদ মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল হক, শহীদ ক্যাপ্টেন মোঃ তানভীর সালাম, শহীদ কর্পোরাল মোঃ আজিজুল হক এবং শহীদ সৈনিক মোঃ শাহিন আলম এর আত্মত্যাগের স্মৃতি স্বরূপ ।




বাংলাদেশের উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রথাগত আইনে নারীর অধিকার বিশ্লেষণ

পারভেজ হায়দার

বাংলাদেশের সমতল এবং তিন পার্বত্য জেলায় ৫৪টি উপজাতি জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী বাংলাদেশে বসবাসরত ১৫,৮৭,০০০ জন উপজাতি জনগণের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১.০৮%। উপজাতি এই জনগোষ্ঠীর অর্ধেক হলেন নারী। উপজাতি জনগোষ্ঠীসমূহের অধিকাংশই তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসরত। সমতলের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নারীরা পিতা বা স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার, বিবাহ সংক্রান্ত প্রমাণপত্র এবং অন্যান্য সামাজিক অধিকার যথাযথভাবে পেলেও উপজাতি নারীরা তাদের এ জাতীয় অধিকার হতে বঞ্চিত রয়েছে। এ সকল জনগোষ্ঠীর বসবাস বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডে হলেও তারা নারীদের অধিকারের বিষয়ে বাংলাদেশের সংবিধান, আইনের শাসন ইত্যাদি অনুসরণ না করে নিজেদের প্রথাগত রীতিনীতি এবং পদ্ধতিগত ঐতিহ্য অনুসরণ করেন।

গারো সম্প্রদায় ব্যতীত অন্যান্য উপজাতি সম্প্রদায় পিতৃতান্ত্রিক বিধায় তাদের রীতিনীতি অনুযায়ী পিতার সম্পত্তির উপর নারীদের অধিকার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুরক্ষিত নয়। অধিকাংশ উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রথা অনুযায়ী নারীদের পিতা-মাতা ও স্বামীর সম্পদের মালিকানায় উত্তরাধিকারের কোন পদ্ধতি নেই বিধায় উপজাতি নারীরা সম্পত্তির অধিকার হতে বঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমানে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের সংশোধনী পাশ হওয়ায় উপজাতি নারীরা আদৌ তার সুফল ভোগ করতে পারবে কিনা সে বিষযে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। পার্বত্য জেলাসমূহে উপজাতি নারীরা কায়িক পরিশ্রম ছাড়াও গৃহস্থলী কাজের পাশাপাশি জঙ্গল/বনে কাঠ আহরণ, খাদ্য অন্বেষণ ও জুম চাষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ভূমি কমিশন আইন পাশ হওয়ার পর পার্বত্য জেলাসমূহে উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দিয়ে সরকার ভূমি কমিশন আইন বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিষয়টি উপজাতিদের ভূমি অধিকার আদায়ের পথকে আরও সু-প্রসারিত করলেও, উপজাতিদের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী ভূমির অধিকারের বিষয়ে নারীদের একেবারেই প্রাধান্য না থাকায় তারা ভূমি অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।

প্রায় সকল উপজাতি সম্প্রদায়ের বিবাহ বন্ধনের ক্ষেত্রে নারীদের মতামতকে প্রাধান্য না দিয়ে শুধুমাত্র অভিভাবকদের মতামতের ভিত্তিতে পাত্রস্থ করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে পরিবারের অভিভাবকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্য সম্প্রদায়ের যুবকের সাথে কোন মেয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে তাকে পরিবার ও সমাজচ্যুত করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে প্রেম বা অবৈধ সম্পর্কের বিষয়টি ধরা পড়লে সমাজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি শুকর/বন্য অথবা এর মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ জরিমানা করে, ছেলে এবং মেয়েকে জুতার মালা পরিয়ে জনসম্মুখে ঘোরানো হয় যা বর্তমানে প্রেক্ষাপটে সচেতন সমাজে কোন ক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়।

কোনো কোনো সমাজে ধর্ষণের অপরাধে প্রথাগত আইনে পুরুষকে একটি শুকর জরিমানা করা হয়। পরে সেই শুকর জবাই করে সমাজপতিরা উৎসব করে খায় এবং শুকরের রক্ত ছড়িয়ে দিয়ে পাড়া পবিত্র করা হয়। এতে যেসব যুবকের অধিক সম্পদ আছে তারা এই অপরাধের জন্য শুকর দিয়ে পার পেয়ে গেলেও মেয়েটি কিছুই পায় না।

বিবাহের নিবন্ধন না থাকায় বর্তমান শিক্ষিত উপজাতি যুব সমাজের মধ্যে একাধিক বিবাহ করার প্রবণতার পাশাপাশি পূর্বের স্ত্রীকে অস্বীকার ও ভরণ পোষণ সঠিকভাবে প্রদান না করার ঘটনা ঘটছে। উপজাতি নারীরা চরমভাবে অবমূল্যায়িত হলেও বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের আশ্রয় নিতে তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাহস পান না। সমাজ তাদের একেবারেই সহযোগিতা তো করেই না বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তাই বাধ্য হয়ে তাদেরকে সাম্প্রদায়িক প্রথা এবং সামাজিক রীতিনীতি অনুযায়ী স্থানীয় হেডম্যান ও কারবারীর করা বিচারের রায় অমানবিক হলেও মাথা পেতে মেনে নিতে হয়।

আবার কোন কোন ক্ষেত্রে আঞ্চলিক উপজাতি সংগঠন এর চাপে উপজাতি মেয়েরা সঠিক বিচার পাওয়া তো দূরের কথা বরং তাকে অপমানজনক নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়, এমনকি বিষয়টি যাতে চাপা থাকে সেজন্য মেয়ে এবং মেয়ের পরিবারের সদস্যদের নানাভাবে হুমকি প্রদর্শনও করা হয়। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, বাংলাদেশের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমতা, ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণী নির্বিশেষে সকলের সম অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র ও নারীর প্রতি সকল ধরণের বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডো) স্বাক্ষর করেছে।

ইতিমধ্যে সরকার নারী-পুরুষের সম অধিকার, নারীর সুরক্ষা ও নারীর উন্নয়নে বেশ কিছু নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নারীর সুরক্ষায় প্রচলিত আইনের পাশাপাশি যৌতুক নিরোধ আইন-১৯৮০ মত বিশেষ আইন প্রণীত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে অন্যান্য এলাকার স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নারী সদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও উপজাতি জনগোষ্ঠীর সমাজ ব্যবস্থা এবং তাদের রীতিনীতি অনুযায়ী পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়াজাল ডিঙিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীরা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। তাই পার্বত্য অঞ্চলের নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার পাশাপাশি ভূমির অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত রয়েছেন।

২০১১ সালের ডিসেম্বর হতে ২০১৫ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত রাংগামাটি পার্বত্য জেলায় অবস্থিত ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, মোট ২২০ জন নারী ও শিশু ভিকটিম সেবা গ্রহণ করেছেন। এদের মধ্যে ৪৪ জনের যৌন নিপীড়নজনিত অভিযোগের পাশাপাশি পারিবারিক সহিংসতার শিকার। সেবা গ্রহণকারীর সংখ্যা ৭১ জন, যারা উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রথাগত রীতিনীতির শিকার।

পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে কোন প্রাতিষ্ঠানিক জরিপ না হলেও নির্যাতনের মাত্রা মোটেও কম নয়, কোন কোন উপজাতি পরিবারের পুরুষগণের মদ খেয়ে তাদের স্ত্রীদের উপর নির্যাতন যেন নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার, তা যেন তাদের সমাজ ব্যবস্থার একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের সংশোধনীতে নারীদের বিষয়টি আলাদাভাবে উল্লেখ না থাকায়, পার্বত্য এলাকার ভূমি উপজাতি জনগোষ্ঠীর সামাজিক ব্যবস্থায় ভোগ ও দখলের অধিকারের ক্ষেত্রে উপজাতি নারীগণ পুনরায় বঞ্চিত ও অবহেলিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান – সার্কেল চীফ, হেডম্যান, কারবারী যাদের উপর পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত উপজাতিদের সামাজিক বিচার, মৌজা সার্কেলের ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনাসহ খাজনা আদায়ের দায়িত্ব অর্পিত, এ প্রতিষ্ঠানগুলো পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোর অন্তর্ভূক্ত। আমাদের একটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে অনুধাবন করতে হবে যে, বর্তমান বিশ্বে নারীদের অধিকারের বিষয়টি সকল ক্ষেত্রে আলোচিত বিষয় হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশের নারীরাও জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

উপজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে বর্তমানে শিক্ষা এবং আধুনিকতার প্রভাব বিস্তার করায় যুব সম্প্রদায়ের পাশাপাশি উপজাতি যুবতীরাও তাদের প্রথাগত রীতিনীতি ও সমাজ ব্যবস্থার অনেক কিছুই পরিহার করে আধুনিকতার মানসিকতা নিয়ে জীবনযাপন করতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করছেন। উপজাতি নারীরাও বর্হিবিশ্ব এবং বাংলাদেশের সমতলের নারীদের ন্যায় তাদের অধিকার আদায়ে বিভিন্ন কর্মসূচী পালনে সচেষ্ট রয়েছেন।

উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রথাগত রীতি এবং সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের অধিকার যথাযথভাবে না থাকায় সার্কেল চিফগণ বিষয়টি উপলব্ধি করে সাম্প্রতিক সময়ে নারীদের অধিকার সু-রক্ষায় কিছু কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, যার অংশ হিসাবে বিগত কয়েক বছরে চাকমা সার্কেল চীফ কর্তৃক ১২০ জনের অধিক নারীকে কারবারী পদে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে, যা নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং নারী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে নানা কর্মসূচী গ্রহন করছে।

বিগত কয়েক বছর ধরে উইমেন রিসোর্স নেটওয়ার্ক, কাপেং ফাউন্ডেশন, মালেয়া ফাউন্ডেশন, হিল উইমেন ফেডারেশন, কেএমকেএস, অন্যান্য নারী কল্যাণ সংস্থা, বলিপাড়া নারী কল্যাণ সংস্থা, জাবারাং কল্যাণ সমিতি, প্রগেসিভ, বাংলাদেশ উপজাতি (আদিবাসী) নারী নেটওয়ার্ক, খাগড়াপুর মাহিলা সমিতি, গর্জনতলী নারী কল্যাণ সমিতিসহ বিভিন্ন সংস্থা নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ এবং অধিকার আদায়ে নানা কর্মসূচী চালিয়ে যাচ্ছে।

তবে সমতলে এনজিওগুলো নারী অধিকার নিয়ে সোচ্চার হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্যাতিত কোনো নারী যখন উপজাতীয় রীতি বা প্রথার নামে বঞ্চিত ও নিপীড়িত হয় তখন এসকল এনজিওগুলো চুপ করে থাকে। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, সম্পত্তির উত্তরাধিকার, বিবাহ-বিচ্ছেদ, সন্তানের অভিভাবকত্ব, ভরণ-পোষণ প্রভৃতির ক্ষেত্রে বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য উপজাতি ভিত্তিক নারী সংগঠনগুলো ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়ে উঠছে।

উপজাতি জনগোষ্ঠীসমূহের মধ্যে বিভিন্ন সম্প্রদায় ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম পালন করে থাকেন। যেমন, চাকমা-বৌদ্ধ ধর্ম, মারমা-বৌদ্ধ ধর্ম, ত্রিপুরা-সনাতন হিন্দু ধর্ম, বম-খ্রীষ্টান ধর্ম, সাওতাল-সনাতন ধর্ম, ম্রো-বৌদ্ধ ধর্ম ইত্যাদি ধর্ম পালন করেন। উপজাতি সম্প্রদায়গুলো তাদের নিজ নিজ ধর্মের নিয়ম কানুন অনুসরণ করলেও তাদের ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী নারীদের অধিকার এবং নারীদের মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে তা অনুসরন করেন না, বরং তারা তাদের নিজ নিজ সম্প্রদায়ের প্রথা অনুসরণ করে থাকেন। ফলে ধর্মীয় ভাবে উপজাতি নারীরা ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক জীবন, বৈবাহিক জীবন এবং পিতা বা স্বামীর সম্পদের উত্তরাধিকারের বিষয়ে গুরুত্ব পাবার কথা থাকলেও সাম্প্রদায়িক প্রথার কারণে তারা ব্যাপক ভাবে অবমূল্যয়িত হন।

উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রথাগত উত্তরাধিকার আইন এবং বিবাহ বন্ধনের ক্ষেত্রে প্রচলিত ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত কিছু তথ্য এখানে আলোচনা করা যেতে পারে।

 চাকমা 
চাকমা প্রথা মতে কোন ব্যক্তির মৃত্যুর পর শুধুমাত্র তার পুত্র বা পুত্র সন্তানরাই একমাত্র উত্তরাধিকারী হন। কন্যা সন্তান কোন প্রকার সম্পদের উত্তরাধিকারী হতে পারেন না। কন্যা সন্তান পরিবারের অমতে বিয়ে করলে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ বিচারের ব্যবস্থা করা হয়। বিচারে সাধারণত ১ অথবা ২ মুষ্ঠিতে ধরা যায় এমন শুকর সমাজের সকলকে খাওয়ানোর আদেশ দেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে অপমানজনকভাবে সকলের সামনে তাদের জুতার মালা পরানো হয়। তারপর তাদের বিয়ের অনুমতি দেয়া হয়। চাকমা নারীরা তাদের স্বামীর সম্পদেরও কোন অংশ পান না।

 মারমা
মারমা সম্প্রদায়ের প্রচলিত প্রথা কয়েক ধরনের হয়ে থাকে। মারমা সম্প্রদায়ের বার্মিজ প্রথা অনুসরণকারী উপজাতিগণ বিশেষ করে বান্দরবানে বসবাসরত মারমা সম্প্রদায়ের মেয়েরা পিতা-মাতার সম্পত্তি ছেলেদের ন্যায় সমানভাবে উত্তরাধিকারী হয়ে থাকেন। তবে যে সন্তান পিতা-মাতার ভরণ পোষণ বহন করবে তাকে একভাগ বেশি সম্পত্তি দেওয়া হয়ে থাকে। পরিবারের অমতে নারীগণ বিবাহ করলে সমাজ তাকে ত্যাজ্য ঘোষণা না করা পর্যন্ত তারা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়ে থাকেন।

তবে খাগড়াছড়ি জেলায় বসবাসরত মারমা সম্প্রদায়ের নারীগণ পিতা-মাতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন না। মারমা সমাজে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করলে ঐ ব্যক্তির সকল অস্থাবর সম্পত্তিসহ ঘরবাড়ী প্রথম স্ত্রীকে দিতে হয়। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্ত্রী কোন সম্পত্তি পান না, তবে তার (দ্বিতীয় স্ত্রীর) সন্তানেরা পিতার স্থাবর সম্পত্তির তিন ভাগের এক ভাগ পেয়ে থাকেন।

মারমা সমাজে আরও একটি অদ্ভুত প্রথা প্রচলিত আছে, যা নারীদের জন্য চরমভাবে অপমানজনক। কোন মারমা ছেলে কোন মারমা মেয়েকে পছন্দ হবার পর যদি জোর করে ধরে নিয়ে আসে এবং সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিয়ে বাড়ীর মত আপ্যায়ন করে, তবে সমাজ বিষয়টি মেনে নেয়। এ ক্ষেত্রে উক্ত নারীর ব্যক্তিগত পছন্দের অথবা মতামতের কোন মূল্য দেওয়া হয় না।

 ত্রিপুরা 
ত্রিপুরা মাহিলারা অন্যান্য উপজাতিদের ন্যায় পিতার এবং স্বামীর সম্পদের উত্তরাধিকারী হন না। কোন বিবাহিত ত্রিপুরা মাহিলার অনৈতিক কার্মকাণ্ডের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সামাজিক আদালতে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে স্ত্রীর চরিত্রের সংশোধনের জন্যে ১৫ দিন অন্তর অন্তর তিনবার সুযোগ দেয়া হয়ে থাকে। তিনবার সুযোগ দেবার পরও স্ত্রী চরিত্র সংশোধনে ব্যর্থ হলে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের অনুমতি দেওয়া হয়।

অন্যান্য উপজাতি সম্প্রদায়ের ন্যায় ত্রিপুরা নারীদের অভিভাবকের মতামতের ভিত্তিতে মেয়েদেরকে বিবাহ দেওয়া হয়, বিবাহের সময়ে বর পক্ষকে কণের মায়ের দুধের ঋণ শোধ বাবদ রূপার পাঁচ টাকা, দুই জোড়া নারিকেল এবং এক বোতল মদ প্রদান করতে হয়। ত্রিপুরাদের মধ্যে ‘‘নাইত”, ‘‘দেনদা” সহ বিভিন্ন গোষ্ঠী থাকায় এক গোষ্ঠীর ছেলের সাথে অন্য গোষ্ঠীর মেয়ের বিবাহ বা প্রণয় ঘটিত বিষয়গুলো সহজে মেনে নেওয়া হয় না।

তঞ্চঙ্গ্যা
তঞ্চঙ্গ্যা উপজাতিটি চাকমাদের একটি উপদল। তাদের প্রথাও অনেকটা চাকমাদের মতই, যেখানে নারীর অধিকারকে চরমভাবে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। তঞ্চঙ্গ্যা প্রথা মতে, কোন ব্যক্তি মৃত্যুর পর শুধুমাত্র তার পুত্র বা পুত্র সন্তানরাই মৃত ব্যক্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী হন। কন্যা সন্তান কোন প্রকার সম্পদের উত্তরাধিকারী হতে পারেন না। কন্যা সন্তান পরিবারের অমতে বিয়ে করলে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ বিচার এর ব্যবস্থা করা হয়। বিচারে সাধারণত ১ অথবা ২ মুষ্ঠিতে ধরা যায় এমন শুকর সমাজের সকলকে খাওয়ানোর আদেশ দেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে অপমানজনকভাবে সকলের সামনে তাদের জুতার মালা পরানো হয়। তারপর তাদের বিয়ের অনুমতি দেয়া হয়। তঞ্চঙ্গ্যা নারীরাও তাদের স্বামীর সম্পদের কোন অংশ পান না।

চাক 
চাক সম্প্রদায়ে পিতার সম্পদের উত্তরাধিকারী হিসাবে শুধুমাত্র পুত্র সন্তানগণই সম্পদ পেয়ে থাকেন। মেয়ে বা স্ত্রী কেউ কোন সম্পত্তি পান না। সন্তান শুধুমাত্র মেয়ে হলে ঐ ব্যক্তি সম্পত্তি তার ভাই অথবা ভাই এর ছেলেরা পেয়ে থাকে। এই সম্প্রদায়ের নারীরা পিতা-মাতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন না, এক্ষেত্রে এই সম্প্রদায়ের মহিলারা দেশের প্রচলিত আইনের আশ্রয় গ্রহণ করলেও সমাজ তা গ্রহণ করে না। বৈধ বিবাহ ব্যতিরেকে কোন নারী গর্ভবতী হলে সামাজিক আদালতে গর্ভবতী মহিলার প্রমাণ সাপেক্ষ্যে ভূমিষ্ঠ সন্তানের পিতৃত্ব স্বীকৃত হলেও ঐ সন্তান পিতার সম্পত্তির আইনগত উত্তরাধিকারী হয় না। পরিবারের অমতে নারীরা বিবাহ করলে তাকে পরিবার ও সমাজচ্যূত করা প্রচলন রয়েছে।

খিয়াং 
এ সম্প্রদায়ে বিবাহের ক্ষেত্রে পুরুষদেরকে পণ দিয়ে নারীদের বিবাহ করতে হয়। সাধারনত রুপার দশ টাকা প্রদান করার প্রচলন রয়েছে। খিয়াং জনগোষ্ঠীর প্রচলিত রীতি অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির পুত্র ও কন্যা সন্তানগণ সম্পদের উত্তরাধিকার হয়ে থাকেন। মৃত পিতার নামীয় সম্পত্তি থেকে পুত্রগণ তিনভাগের দুই ভাগ এবং কন্যাগণ একভাগ সম্পদের উত্তরাধিকারী সূত্রে পেয়ে থাকেন। দত্তক সন্তান চারভাগের একভাগ সম্পদ পেয়ে থাকেন। পুত্রের অবর্তমানে কন্যা সন্তানগণ পিতার সম্পূর্ণ সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়ে থাকেন।

 ম্রো/মুরং
এ সম্প্রদায়ে বিবাহের সময়ে মাহিলাদেরকে পণ দিয়ে ঘরে তুলতে হয় বিধায়, বিবাহ বিচ্ছেদ হলে স্বামীর সম্পত্তিতে তাদের কোন অধিকার থাকে না, বরং পণের টাকা সমুদয় ফেরত দিতে হয়। এক্ষেত্রে দরিদ্র পরিবারের নারীরা পিতার পরিবারে ফেরত যেতে চাইলেও তাদের পক্ষে পণের টাকা ফেরত দেয়া সম্ভব হয় না বিধায় তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্যাতন ও কষ্টের স্বীকার হয়ে থাকেন। এই জনগোষ্ঠীর সমাজ ব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক বিধায় এখানে শুধুমাত্র পুরুষদের কর্তৃত্ব বজায় থাকে যেমন, যেকোন সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব, পূজা পার্বণ ইত্যাদি পারিবারিক যেকোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পুরুষদের একক ভূমিকা থাকে।

 লুসাই

লুসাই নরীরা স্বামী কিংবা বাবার সম্পত্তি থেকে কোন অংশ গ্রহণ করতে পারেন না।

পাংখোয়া 
পাংখোয়া নারীরা পিতা বা স্বামীর সম্পদের উত্তরাধিকারী হন না। এই সম্প্রদায়ের নারীগণ বিবাহের পূর্বে যে পারিবারিক পদবী বা সামাজিক মর্যাদার অধিকারী হন না কেন, বিবাহের পর তিনি স্বামীর পরিবারের পদবী ও মর্যাদার অধিকারী হয়ে থাকেন। তবে ‘‘লাল” উপাধী বা কারবারী হিসাবে নিজেকে পরিচয় দিতে পারেন না।

 বম 
বম সম্প্রদায়ে নারীদের বিবাহের ক্ষেত্রে পুরুষদেরকে মেয়ের পরিবারকে পণ দিতে হয়। সমাজের রীতি অনুযায়ী স্বামীর কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ হলে স্ত্রীকে অর্থ দিতে হয় যা, স্বামীর উত্তরাধিকারের ৫০ শতাংশ। আর যদি স্ত্রীর কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে তাহলে বিবাহের সময় স্বামী কর্তৃক প্রদত্ত পণ এর সমুদয় অর্থ ফেরত দিতে হয়। এ সম্প্রদায়ের নারীরা পিতার অস্থাবর সম্পত্তির চার ভাগের এক ভাগ পেয়ে থাকেন, কোন মেয়ে পালিয়ে অন্য সম্প্রদায়ের ছেলেদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে তাকে সমাজ চ্যূত করা হয়।

খুমী 
স্বামীর মৃত্যুর পর খুমী নারীরা মৃত স্বামীর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হতে পারেন না । স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা নারীর ভরণ পোষণের সকল দায়িত্ব তার ভাইদের বহন করতে হয়। খুমী নারীরা তার পিতা অথবা স্বামীর কোন প্রকার সম্পদের অংশ বিশেষও পান না।

উপজাতি নারীদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে যে অনবদ্য অবদান রয়েছে তা সাধারণত সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। নারীর প্রতি মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিবারের পাশাপাশি সমাজের সকল প্রতিষ্ঠানে জেন্ডার সংবেদনশীলতা নিশ্চিত করা জরুরী হয়ে পড়েছে। এজন্য সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নারী পুরুষের সম অধিকারে বিশ্বাসী ও বাস্তব জীবনে বিশ্বাসী সম্মান ও মর্যাদা প্রদানকারী ব্যক্তিদের নেতৃত্বে নিয়ে আসার জন্য আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার।

ত্রিপুরা সম্প্রদায়ে পুরুষদের একাধিক বিবাহ করার প্রচলন থাকায় সাম্প্রতিক সময়ে নারীদের সম্পত্তির অধিকার আদায়ে সামাজিক সংগঠনগুলো নারীদের মামলা করা বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। খাগড়াছড়ি জেলার একটি নারী সংগঠনের উদ্যোগে ‘‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি” পদ্ধতি হিসাবে নারীদের আদালতে মামলার জটিলতা থেকে রেহাই পাওয়ার স্বার্থে জেলা যুগ্ন জজ এর উপস্থিতিতে উভয় পরিবারের অভিভাবক, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, আইনজীবী এবং বাদী-বিবাদী এর সমন্বয়ে সমঝোতা মূলকভাবে মীমাংসা করে দেবার প্রচলন শুরু হয়েছে।

উপজাতি নারীগণ ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচীতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখলেও পুরুষতান্ত্রিক ও প্রথাগত ব্যবস্থার কারণে তাদের সে অবদান সেইভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। উদাহরণ স্বরূপ, হাজংদের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, টংক আন্দোলন, তেভাগা আনোদালন, হাতিখেদা আন্দোলন, চাকমা বিদ্রোহ, খাসী বিদ্রোহ, মুন্ডা বিদ্রোহ, মণিপুরীদের ভানুবিল আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন, নানকার বিদ্রোহ, চা শ্রমিক আন্দোলন, ইকো পার্ক বিরোধী আন্দোলন এবং ফুলবাড়ি কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলন প্রভৃতি ক্ষেত্রে উপজাতি নারীদের ভূমিকার বিষয়ে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।

এখানে আরো উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৮৮৫ সালে সাঁওতাল বিদ্রোহে ফুলমণি মুর্মু এবং জান মুর্মুরা পুরুষদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন, কিন্তু উক্ত বিদ্রোহে নারীদের অবদানের কথা এড়িয়ে গিয়ে ‘‘সিধু-কানু” দিবস হিসাবে ইতিহাসে প্রচারণা রয়েছে। ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত নেত্রকোনার দূর্গাপুর এলাকায় হাজং কৃষকদের অধিকার রক্ষায় জমিদার এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে রাশিমণি হাজং, দিস্তামণি হাজং, বাসন্তি হাজংসহ অনেক নারী মৃত্যু জীবন দিয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখলেও তাদের সে আত্নত্যাগের বিষয়টি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।

সম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশসহ বর্হিবিশ্বের সাথে উপজাতি নারীদের মধ্যে বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রভাব এবং নারী অধিকারের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের প্রথাগত সমাজ ব্যবস্থায় জীবন যাপন করতে অধিকাংশ নারীই স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন না। তদুপরি বিবাহ সংক্রান্ত কোন দলিল না থাকায় পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে শ্বশুরালয়ে এবং পিতার পরিবারে নানা নির্যাতন ও হয়রানির স্বীকার হওয়ায় উপজাতি নারীদের মধ্যে তাদের অধিকারের বিষয়ে বোধদয় সৃষ্টি হচ্ছে।

বিষয়টি সমাধানে বিভিন্ন নারী সংগঠন সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি নারী অধিকার রক্ষা ও আদায়ে সচেতন নারী মহল পাড়া, মহল্লা, উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে নানা সচেতনতা মূলক কর্মসূচী পরিচালনাসহ এনজিও সংগঠনের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম অব্যহত রেখেছে। কিছুদিন আগে রাঙামাটি জেলায় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত আইন সংস্কার ও উপজাতি নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার দাবীতে সংবাদ সম্মেলনে উপজাতি ভিত্তিক নারী সংগঠন বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ, প্রোগ্রেসিভ এনজিও এবং আশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র এর প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করেন।

উক্ত সম্মেলনে বিবাহের সনদ না থাকায় স্ত্রীকে অস্বীকার করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও স্বামীর ঔরসজাত সন্তানের ভরণ পোষণ না করা, সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া, নারী নেতৃত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে নারী হেডম্যান কারবারী নিয়োগে সার্কেল চীফদের আরও মনোযোগী হওয়া, নারী বিষয়ে উপজাতিদের প্রথাগত বৈষম্য ও অনৈতিক শাস্তির বিধান রহিত করাসহ লিখিতরূপে প্রথাগত বিধান সংরক্ষণের পরামর্শ প্রদান ও দাবী জানানো হয়।

তবু সার্বিক বিষয় বিশ্লেষণে একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আঞ্চলিক উপজাতি দলগুলোর আহবানে সরকার পার্বত্য এলাকার ভূমি সমস্যা সমাধানে ভূমি কমিশন আইন পাশ করেছে। এই আইন অনুযায়ী পার্বত্য এলাকার ভূমির বন্টন উপজাতিদের রীতি,, নীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী করা হবে। প্রশ্ন হচ্ছে উপজাতিদের রীতি, নীতি এবং প্রথা নারীদের অধিকার কতটুকু নিশ্চিত করেছে।

পৃথিবীতে প্রচলিত বিভিন্ন বৃহৎ ধর্ম এবং বাংলাদেশের সংবিধান নারীদের যতটুকু সংরক্ষিত করেছে, উপজাতিদের প্রথা নারীদের আরো পিছিয়ে দিয়েছে। সকল ক্ষেত্রে নারীদের বঞ্চিত করা হয়েছে। নারীদের ব্যক্তিগত জীবন, বৈবাহিক জীবন, সম্পত্তির উত্তরাধিকার কোন ক্ষেত্রেই সার্বিকভাবে তাদের মূল্যায়ন করা হয়নি।

কোন কোন উপজাতিদের প্রথা নারীদের অনেকটা পণ্য হিসাবে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অর্ধেক সংখ্যক নারী রয়েছে। এই অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে কোন প্রথাই কার্যকর হতে পারে না।

পৃথিবীতে যুগে যুগে মানুষ সামনে এগিয়ে যাবার সংগ্রাম করছে। কোন গোত্র বা জনগোষ্ঠীর সকল নিয়ম কানুন বা প্রথা সর্বগ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে, তাই যুগে যুগে মানুষ ভাল ব্যবস্থাপনাকেই গ্রহণ করেছে, অপছন্দনীয় বিষয়গুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে, নারী কিংবা পুরুষ সকলকে মানুষ হিসাবে সমভাবে মূল্যায়ন করে সামনে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করেছে। উপজাতি নেতৃবৃন্দ এবং আঞ্চলিক দলসমূহ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় আনবে, তা’ সকলের প্রত্যাশা।

পারভেজ হায়দার- পার্বত্য গবেষক।




বাংলাদেশে আদিবাসী দিবস কেন?

মিল্টন বিশ্বাস :

বাংলাদেশে ৯ আগস্ট ‘বিশ্ব আদিবাসী দিবস’ জাতীয়ভাবে পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রতিবছর ‘আদিবাসী ফোরাম’ নামক সংগঠনের ব্যানারে সন্তু লারমা এবং ঢাকার কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি সেই দাবি জানিয়ে থাকেন। প্রতিনিয়ত সংবাদ সম্মেলন করে পার্বত্য ইস্যুতে অনেক কথা বলা হচ্ছে। নিজেদের অধিকার আদায়ে দেশে একটি গণমুখী সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য আদিবাসীদের ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করতে হবে বলে মন্তব্য করেন জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) চেয়ারম্যান সন্তু লারমা। তিনি সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির পাশাপাশি সংসদের উত্থাপিত তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ বিল-২০১৪ প্রত্যাহার এবং পাস হওয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০১৪ বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছিলেন। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে পার্বত্য এলাকায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের বিরোধিতা করেন তিনি। পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নসহ বেশ কয়েকটি দাবিতে রাজধানীর এক হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বলেন, ‘পার্বত্যবাসী এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য এখনও প্রস্তুত নয়। এগুলো বহিরাগত অনুপ্রবেশের দ্বারে পরিণত হবে। তাই চুক্তি বাস্তবায়ন পর্যন্ত এসব প্রকল্প স্থগিত রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।’ উপরন্তু দেশের অন্য স্থানে অবস্থিত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজসহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাহাড়ী ছাত্রছাত্রীদের অধিকসংখ্যক কোটা সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়েছিলেন সন্তু লারমা। তাঁর কথার সূত্র ধরে বলা দরকার, পার্বত্য এলাকার অধিকাংশ উপজাতি জনগোষ্ঠী কোটা সুবিধা গ্রহণ করে কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয় অনেক সরকারী অফিসে উচ্চপদে আসীন এ কারণে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সমতলের বাঙালীদের দ্বারা এই কোটা সুবিধা বাতিলের কিংবা কমানোর দাবিটাও যৌক্তিক। আশ্চর্য হলো পাহাড়ী জনজীবনে প্রভূত উন্নতি সত্ত্বেও বর্তমান সরকার উপজাতীয় কোটা সংরক্ষণ করছেন।

২০১৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটি সফরের সময় জনসমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের ঘোষণা দেন। তারপর থেকেই এর পক্ষে-বিপক্ষে স্থানীয়দের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক চলে। অথচ পার্বত্য এলাকার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতার কোন অভাব নেই। ৫ জানুয়ারি (২০১৪) নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের ‘সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, অনুন্নত সম্প্রদায় ও পার্বত্য চট্টগ্রাম’ শীর্ষক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদে পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনী পাস করে আওয়ামী লীগ ’৭২-এর সংবিধানের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি পুনর্প্রতিষ্ঠিত করেছে। সকল ধর্মের সমান অধিকার এবং দেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-জাতিগোষ্ঠী ও উপজাতিদের অধিকার ও মর্যাদার সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়ার ফলে ধর্মীয় ও নৃ-জাতিসত্তাগত সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান এবং তাদের জীবন, সম্পদ, উপাসনালয়, জীবনধারা ও সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য রক্ষার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা দৃঢ়ভাবে সমুন্নত থাকবে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের জমি, বসতভিটা, বনাঞ্চল, জলাভূমি ও অন্য সম্পদের সুরক্ষা করা হবে। সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জমি, জলাধার ও বন এলাকায় অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি কমিশনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। অনগ্রসর ও অনুন্নত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, দলিত ও চা-বাগান শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে বিশেষ কোটা এবং সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত থাকবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির অবশিষ্ট অঙ্গীকার ও ধারাসমূহ বাস্তবায়িত করা হবে। পার্বত্য জেলাগুলোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা হবে এবং তিন পার্বত্য জেলার ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখা, বনাঞ্চল, নদী-জলাশয়, প্রাণিসম্পদ এবং গিরিশৃঙ্গগুলোর সৌন্দর্য সংরক্ষণ করে তোলা হবে। এই তিন জেলায় পর্যটন শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পের বিকাশে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।’ অর্থাৎ বর্তমান সরকারের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাই রয়েছে সন্তু লারমাসহ সকল উপজাতি জনগোষ্ঠীর জানমাল ও সম্পদ সুরক্ষার বিষয়ে। ওয়াদা করা হয়েছে অনগ্রসর ও অনুন্নত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, দলিত ও চা-বাগানের শ্রমিকদের জন্য কোটা ও সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখার। আর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন ও সে অঞ্চলের উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছে। গত মহাজোট সরকারের শাসনামলে তিন পার্বত্য এলাকার উন্নয়নে শেখ হাসিনার সরকার ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। যে দুর্গম এলাকা মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে ছিল সে স্থানসমূহ তথ্য-প্রযুক্তির আওতায় আনা হয়েছে। যেখানে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও বাজারের সঙ্কট ছিল সেসব জায়গা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বেঁচে থাকার উপায় হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এ সত্ত্বেও যদি হুমকি দেয়া হয় তাহলে আমাদের মতো সাধারণ জনতার মনে আশঙ্কা এবং প্রশ্ন জাগ্রত হওয়াটাই স্বাভাবিক যে পার্বত্য এলাকা আসলেই সন্তু লারমার পৈত্রিক ভিটা কিনা?

উপজাতীয় কোটা সম্পর্কে আগেই বলা হয়েছে। সংবিধানে স্বীকৃত রয়েছে সেই কোটা ব্যবস্থা। বাংলাদেশ সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে বর্ণিত দেশের ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’-এর জন্য সরকারী, আধাসরকারী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরির ক্ষেত্রে এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য কোটা সুবিধার কথা রয়েছে। অথচ এসব সুবিধাভোগীরা প্রতিবছর ‘আদিবাসী ফোরাম’ নামের সংগঠন থেকে ৯ আগস্ট ‘বিশ্ব আদিবাসী দিবস’ পালনের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে। পক্ষান্তরে কয়েক বছর ধরে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আদিবাসী শব্দটি না থাকায় বিভিন্ন জেলা প্রশাসকের কাছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো চিঠিতে বিশ্ব আদিবাসী দিবস উদযাপনে সরকারের কোন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত না হওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সংবিধানের ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ শব্দগুলোর পরিবর্তে আদিবাসী ফোরামের দাবি এখানে ‘আদিবাসী জাতিসমূহ’ সংযুক্ত করা হোক। বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন এবং তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট আছেন। অথচ জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা আগের বছরগুলোর মতো এবারও নানা বক্তব্য ও মন্তব্যে অসহযোগিতার মনোভাব প্রকাশ করেছেন। সন্তু লারমা সম্ভবত আইএলও কনভেনশন-১০৭ এর অনুচ্ছেদ ১ এর উপ-অনুচ্ছেদ ১(খ) বর্ণিত ‘আদিবাসী’ সংজ্ঞাটি মনোযোগসহকারে পাঠ করেননি। সেখানে বলা হয়েছে- ‘স্বাধীন দেশসমূহের আদিবাসী এবং ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর সদস্যদের ক্ষেত্রে রাজ্য বিজয় কিংবা উপনিবেশ স্থাপনকালে এই দেশে কিংবা যে ভৌগোলিক ভূখ-ে দেশটি অবস্থিত সেখানে বসবাসকারী আদিবাসীদের উত্তরাধিকারী হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ‘আদিবাসী’ বলে পরিগণিত এবং যারা, তাদের আইনসঙ্গত মর্যাদা নির্বিশেষ নিজেদের জাতীয় আচার ও কৃষ্টির পরিবর্তে ওই সময়কার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আচার ব্যবহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপন করে।’ অন্যদিকে ‘উপজাতি’ সম্পর্কে আইএলও কনভেনশন-১০৭ এর অনুচ্ছেদ ১ এর উপ-অনুচ্ছেদ ১(ক) অংশে বলা হয়েছে- ‘স্বাধীন দেশসমূহের আদিবাসী এবং ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর সদস্যদের বেলায়, যাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা জাতীয় জনসমষ্টির অন্যান্য অংশের চেয়ে কম অগ্রসর এবং যাদের মর্যাদা সম্পূর্ণ কিংবা আংশিকভাবে তাদের নিজস্ব প্রথা কিংবা রীতিনীতি অথবা বিশেষ আইন বা প্রবিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।’ অর্থাৎ ‘আদিবাসী’ হলো ‘সন অব দি সয়েল।’ আর ‘উপজাতি’ হলো প্রধান জাতির অন্তর্ভুক্ত ক্ষুদ্র জাতি।

‘আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র ২০০৭’ অনুসারে তাদের ৪৬টি অধিকারের কথা লিপিবদ্ধ হয়েছে। এই ঘোষণাপত্রে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়নি বা সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত হয়নি। তাছাড়া ঘোষণাপত্রের ওপর সব সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে সর্বসম্মত সমর্থন নেই। এ কারণে বাংলাদেশ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্রের ওপর ভোটগ্রহণের সময় তারা ভোটদানে বিরত ছিল। তবে যে কোন অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীর অধিকারের প্রতি সমর্থন রয়েছে সরকারের। সংবিধান অনুসারে সরকারপ্রধান প্রধান মানবাধিকার চুক্তির প্রতি অনুগত এবং উপজাতিদের অধিকার সমর্থন করে আসছে। উল্লেখ্য, ‘আদিবাসী’ শব্দটি সংবিধানে সংযোজিত হলে ২০০৭ সালের ‘আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র’ মেনে নিতে হবে; যা হবে বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী। কারণ ঘোষণাপত্রের অনুচ্ছেদ-৪-এ আছে : ‘আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার চর্চার বেলায়, তাদের অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ের ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন এবং স্বশাসিত সরকারের অধিকার রয়েছে ও তাদের স্বশাসনের কার্যাবলীর জন্য অর্থায়নের পন্থা এবং উৎসের ক্ষেত্রেও অনুরূপ অধিকার রয়েছে।’ অর্থাৎ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করলে ও পার্বত্য অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের অনুমতি ছাড়া বাংলাদেশ সরকার খাগড়াছড়ির গ্যাস উত্তোলন করে অন্য জেলায় আনতে পারত না। কারণ সেখানকার স্বশাসিত আদিবাসী শাসক নিজেদের অর্থায়নের উৎস হিসেবে সেই খনিজ, বনজ ও অন্যান্য সম্পদ নিজেদের বলে চিন্তা করত। আবার অনুচ্ছেদ-৩৬-এ আছে, ‘আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর, বিশেষত যারা আন্তর্জাতিক সীমানা দ্বারা বিভক্ত হয়েছে, তাদের অন্য প্রান্তের নিজস্ব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক কার্যক্রমসহ যোগাযোগ সম্পর্ক ও সহযোগিতা বজায় রাখার এবং উন্নয়নের অধিকার রয়েছে।’ রাষ্ট্র এই অধিকার কার্যকর সহযোগিতা প্রদান ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে। ঘোষণাপত্রের এই নির্দেশ কোন সরকারই মেনে নিতে পারবে না। কারণ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক কার্যক্রম অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হবে। তাছাড়া বাংলাদেশে পার্বত্য অঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকায় জঙ্গী তৎপরতা বৃদ্ধি পাবে; যা ক্রমেই সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে জাতীয় উন্নয়ন ব্যাহত করবে। জাতিসংঘের এই ঘোষণাপত্রের শেষ অনুচ্ছেদ-৪৬-এ সবার মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানোর কথা বলা হয়েছে এবং এই কাজটি গত মহাজোট সরকার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সম্পন্ন করেছে। এর আগে ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি’ অনুসারে ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, সমতা, বৈষম্যহীনতা, সুশাসন এবং সরল বিশ্বাসের মূলনীতি অনুসরণ করা হয়েছে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী তথা উপজাতিগুলোর উন্নয়নে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে ১৯৭২ সালের ২২ জুন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ওখঙ) প্রণীত ‘ইন্ডিজেনাস এ্যান্ড ট্রাইবাল পপুলেশনস কনভেনশন, ১৯৫৭’ (কনভেনশন নম্বর ১০৭)-এ অনুস্বাক্ষর করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী এবং ট্রাইবাল জাতিগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়সহ তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার জন্য জাতিসংঘের এই সংস্থাটি আবার সংশোধিত ‘ইন্ডিজেনাস এ্যান্ড ট্রাইবাল পপুলেশনস কনভেনশন ১৯৮৯’ (কনভেনশন নম্বর ১৬৯) গ্রহণ করে। এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইনী দলিল জাতীয় পর্যায়ে উপজাতিদের অধিকারকে প্রতিষ্ঠা ও কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয়। এখানে ট্রাইবাল বা সেমি-ট্রাইবাল বলতে ওই গোষ্ঠী ও ব্যক্তিদের বোঝানো হয়েছে, যারা তাদের ট্রাইবাল বৈশিষ্ট্য হারানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং এখনও জাতীয় জনসমষ্টির সঙ্গে একীভূত হয়নি। বঙ্গবন্ধুর অনুসৃত পথে অগ্রসর হয়ে বর্তমান সরকার পার্বত্য শান্তি চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ী অধিবাসীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র : দৈনিক জনকণ্ঠ, ৯ আগস্ট ২০১৭




পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিরা জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী আদিবাসী হবার পূর্বশর্তসমুহ পূরণ করে না

 পারভেজ হায়দার

নিজ মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা, দেশের স্বার্থে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকাই দেশপ্রেম । পুঁথিগতভাবে দেশপ্রেমের সংজ্ঞায় ভিন্নতা থাকলেও মৌলিক কয়েকটি বিষয় অনেকটাই সমার্থক । দেশপ্রেমের সাথে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের প্রতি ভালোবাসা জড়িত, এই ভালোবাসা শর্তহীন ভালবাসা । দেশপ্রেমিক মানুষ নিজস্ব ভূখণ্ড রক্ষার সংগ্রাম, ভূ-খণ্ডের রক্ষণাবেক্ষণ অথবা পুনরুদ্ধারে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকে ।

একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বিভিন্ন শ্রেণীর জাতি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের অধিবাসীরা বসবাস করতেই পারে, থাকতে পারে এদের ধর্মের ভিন্নতা, কিন্তু নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী একটি দেশের ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে দেশের মঙ্গলের জন্য কাজ করবে এবং প্রয়োজনে যেকোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকবে, এটাই স্বাভাবিক ।

একটি দেশের অধিবাসীদের মধ্যে বিভিন্ন সম্প্রদায়, ধর্ম ও গোষ্ঠীর বসবাস থাকলেও প্রায় প্রতিটি সম্প্রদায়ের মধ্যেই ব্যক্তিগত অথবা দলীয় অথবা ধর্মীয় মতাদর্শ ভিত্তিক ভিন্নতা থাকতে পারে । মতাদর্শগত এই ভিন্নতা সামগ্রিকভাবে দেশের মঙ্গলের জন্য পরিপূরক হওয়াই বাঞ্ছনীয় । কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতে দেশ স্বার্থ বিষয়ে স্ববিরোধীতা দৃশ্যমান ।

এ দেশের কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবী ব্যক্তিবর্গ দেশের স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত মতাদর্শকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন । তবে যেকোন মতাদর্শের মধ্যে যদিও একটি আদর্শিক বিষয় জড়িত তথাপি মতাদর্শের এই ভিন্নতা দেশের স্বার্থবিরোধী হলে তা ধরে রাখা একেবারেই কাম্য নয় । সমস্যাটি তখনই প্রকটাকারে দেখা দেয় যখন ভিন্ন মতাদর্শিক এই স্বার্থান্বেষী মহল অন্য দেশের স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে ব্যক্তিগত তথাকথিত মতাদর্শের পক্ষে তাদের ভাষায় ইতিবাচক ব্যাখ্যা দাড় করিয়ে ফেলেন ।

আগামী ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস । বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই । তবে সাম্প্রদায়িক রীতিনীতির ভিন্নতার কারণে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী থাকায় সরকার ঐ জনগোষ্ঠী গুলোকে ‚ক্ষুদ্র ও নৃ গোষ্ঠী” হিসাবে পরিগণিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন । সরকার এই সিদ্ধান্ত দেশের ঐতিহাসিক পটভূমি বিবেচনায় এবং বাংলাদেশে বসবাসরত ঐ ছোট ছোট জনগোষ্ঠী সমূহের উৎস ও প্রাথমিক আগমনের বিষয় আমলে নিয়ে ঐ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ।

কিন্তু বাংলাদেশের কিছু স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবী তাদের মনগড়া মতাদর্শ সরকারের সিদ্ধান্তের উপর চাপিয়ে দিতে চান । তাদের এই দাবির পিছনে ঐতিহাসিক কোন ভিত্তি নেই । যেহেতু তারা বুদ্ধিজীবী, তাই আশা করা যায়, তারা বিষয়টি বোঝেন, কিন্তু নিজেদের অহংকারপ্রসুত অথবা অন্য কোন স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে ব্যক্তিগত লাভের আশায় তারা তাদের ভ্রান্ত মতাদর্শ দেশের উপর চাপিয়ে দিতে চান । তাদের এই দাবি এবং কার্যক্রম চরমভাবে দেশ স্বার্থ বিরোধী হতে পারে এ বিষয়টি তারা ইচ্ছাকৃতভাবে একেবারেই বুঝতে চান না।

বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসরত ‚ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠীর” অধিবাসীগণ এবং তাদের সমর্থনপুষ্ট স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবীদের ‚আদিবাসী” সংক্রান্ত দাবী একেবারেই নতুন । ইতিপূর্বে ‚ক্ষুদ্র ও নৃ-গোষ্ঠীর” অধিবাসীগণ নিজেদের ‚উপজাতী” হিসেবে পরিচয় দিতে সম্মানিত বোধ করতো । এমনকি ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তিতেও ক্ষুদ্র ও নৃ গোষ্ঠীর এই অধিবাসীদের ‚উপজাতী” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ।

২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ অধিবেশনে The Nation Declaration on the Rights of Indigenous Peoples (UNDRIP) বিল পাশ হয় । ১৪৪ টি দেশ ঐ বিলের স্বপক্ষে, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশসমুহ ঐ বিলের বিপক্ষে এবং বাংলাদেশসহ আরও ১১টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে । পরবর্তীতে ২০১৬ সালের মে মাসে কানাডা UNDRIP থেকে তাদের আপত্তি প্রত্যাহার করে নেয়। বাংলাদেশ UNDRIP তে ভোটদানে বিরত থাকলেও জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক শর্তানুযায়ী বাংলাদেশে ‚আদিবাসীদের” উপস্থিতি সম্পর্কে যথেষ্ট গবেষণা করে সরকার ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর এই সম্প্রদায় সমুহকে ‚ক্ষুদ্র ও নৃ গোষ্ঠী” নামে অভিহিত করে আইন পাশ করেছে ।

তবে একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পালন করতেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই । ২০০৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে UNDRIP তে আদিবাসীদের কয়েকটি নির্দিষ্ট অধিকারের বিষয়ে নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে । আদিবাসীদের ভূমি অধিকার, জীবন ও নিরাপত্তা অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় স্বীকৃতি, শিক্ষা ও তথ্যের অধিকার এবং চাকুরী, দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার, আদিবাসী অধ্যুষিত ভূমিতে খনিজ সম্পদসহ অন্যান্য সম্পদের অধিকার, জ্ঞানের অধিকার, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রশাসন পরিচালনা করার অধিকার ইত্যাদি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে ।

অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে কোন নিদিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ‚আদিবাসী” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে ঐ ভূখণ্ডের উপর স্বাধীন সার্বভৌম দেশের সরকারের কর্তৃত্ব খর্ব হবে । এমনকি ঐ ভূখণ্ডে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদের বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে হলে ‚আদিবাসী” ঐ জনগোষ্ঠীর সাথে সরকারকে পরামর্শ করতে হবে । ঐতিহাসিকভাবে সত্য না হলেও সুযোগের সদ্ব্যবহার এবং বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে চাকমা সার্কেল প্রধান ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়সহ উপজাতিদের সমমনা বুদ্ধিজীবীগণ বাংলাদেশে বসবাসরত ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর জাতিসত্ত্বাসমূহকে ‚আদিবাসী” হিসেবে পরিগণিত করার দাবী তুলেছেন ।

এখানে মনে রাখতে হবে, একটি দেশের বসবাসরত অধিবাসীদের মধ্যে ‚Minorities” এবং ‚আদিবাসী” বিষয়টি এক নয়। তবে কিছু কিছু দেশে স্বীকৃত আদিবাসীগণ ‚Minorities” নয়। যেমন, গুয়েতেমালা, বলিভিয়া ইত্যাদি । বাংলাদেশে বসবাসরত ছোট ছোট জাতি জাতিসত্ত্বার আদিবাসীগণকে ‚Minorities” হিসেবে পরিগণিত করা অধিক যুক্তিযুক্ত ।

জাতিসংঘ কমিশনের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার হোসে মার্টিনেজ কোবে যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তাতে বলা হয়েছে, কোন ভূখণ্ডের আদিবাসী সম্প্রদায়, জাতিগোষ্ঠী বা জাতি বলতে তাদের বোঝায়, যাদের ঐ ভূখণ্ডে প্রাক-আগ্রাসন এবং প্রাক-উপনিবেশকাল থেকে বিকশিত সামাজিক ধারাসহ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে, যারা নিজেদেরকে ঐ ভূখণ্ডে বা ভূখণ্ডের কিয়দাংশে বিদ্যমান অন্যান্য সামাজিক জনগোষ্ঠী থেকে নিজেদের স্বতন্ত্র মনে করে । সেই সাথে তারা নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও আইন ব্যবস্থার ভিত্তিতে পূর্বপুরুষের ভূখণ্ড ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ভবিষ্যৎ বংশধরদের হাতে তুলে দেয়ার ইচ্ছাপোষণ করে ।

জাতিসংঘ এখানে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে । যারা কোন উপনিবেশ স্থাপনের আগে থেকেই ওই ভূখণ্ডে বাস করছিল, যারা ভূখণ্ডের নিজস্ব জাতিসত্ত্বার সংস্কৃতি ধরে রেখেছে ও তা ভবিষ্যৎ বংশধরদের হাতে তুলে দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করে, এবং যারা নিজেদের স্বতন্ত্র মনে করে ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতিদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী ‚আদিবাসী” হবার জন্য পূর্বশর্তসমুহ পূরণ করে না । তারা মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে চট্টগ্রাম তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে ১৭শ খ্রিস্টাব্দ ও ১৮শ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ের দিকে অবস্থান নিয়েছিল ।

আদিবাসীদেরকে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়, যেমন: অষ্ট্রেলিয়াতে ‚Aboriginal Peoples”, ফ্রান্সে ‚Autochthonous Peoples”, কানাডাতে ‚First Nations”, যুক্তরাষ্ট্রে ‚Indians” ইত্যাদি নামে ডাকা হয় । ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আদিবাসীগণ প্রকৃতির উপর নির্ভর করতে গিয়ে চরম দারিদ্রতার মধ্যে দৈনন্দিন জীবন অতিবাহিত করেছে । তারা সাধারণত সভ্য সমাজের অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের মত করে চলতে পছন্দ করে ।

আদিবাসীদের অধিকারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিগোচরে আনার জন্য ১৯৬৫ সালে জাতিসংঘে ‚International Convention To Eliminate All Forms Of Racial Discrimination” (ICERD) বিষয়ে সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয় । ২০০৭ সালে জাতিসংঘের অধিবেশনে পাশকৃত UNDRIP তে আদিবাসীদের জন্য কয়েকটি মৌলিক অধিকারের বিষয়ে সমুন্নত রাখা হয়েছে ।

তার মধ্যে Convention ১৬৯ অনুযায়ী আদিবাসীগণ যে দেশের ভূখণ্ডে অবস্থান করছে সেই দেশের সরকার বিভিন্ন আইনগত বিষয়ে যা আদিবাসীদের সরাসরিভাবে প্রভাবিত করবে সে বিষয়ে তাদের সাথে আলোচনা করতে বাধ্য থাকবে। উদাহরণ স্বরূপ : আদিবাসীদের বসবাসরত ভূখণ্ডে সরকার কোন বাঁধ (Dam) তৈরীর প্রয়োজনবোধ করলে অথবা কোন খনিজ সম্পদ আহরণ করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডে অবস্থানরত আদিবাসীদের সাথে সরকারকে আলোচনা করে নিতে হবে ।

Convention ১৬৯ এ আরো উল্লেখ আছে সরকার আদিবাসীদের সাথে আলোচনার সময় সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব নিয়ে আলোচনা করবে । ২০০৭ সালের জাতিসংঘ অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ে পাশকৃত ইস্যুটিতে তিনটি মৌলিক বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, প্রথমত তাদের ভূখণ্ডে সম্পদের অধিকার, দ্বিতীয়ত নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার অধিকার এবং তৃতীয়ত রাজনৈতিক অধিকার অর্থাৎ নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ও পদ্ধতিতে প্রশাসন ব্যবস্থাপনা ।

বাংলাদেশ সরকার জনগনের মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে বদ্ধপরিকর । ২০০৭ সালের জাতিসংঘের অধিবেশনে পাশকৃত UNDRIP তে আদিবাসীদের যেসকল অধিকার দেওয়া হয়েছে তা অনেকটা ঐ নির্দিষ্ট ভূখন্ডে স্বায়ত্বশাসন এরই নামান্তর । তথাপি বাংলাদেশ সরকার এদেশে বসবাসরত ছোট ছোট জাতি স্বত্ত্বার জনগোষ্ঠী যদি আসলেই ‚আদিবাসী” হবার পূর্বশর্তসমুহ পূরণ করতো তাহলে তাদের দাবী অনুযায়ী সরকার নিশ্চয়ই বিষয়টি নিয়ে দৃঢ়ভাবে বিবেচনা করতো ।

কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবীগণ এবং ক্ষুদ্র ও নৃ গোষ্ঠীর সুযোগ সন্ধানী কিছু নেতৃবৃন্দ তাদের সুদূরপ্রসারী দেশ বিরোধী স্বার্থের কারণে ২০০৭ সালের পর থেকে হঠাৎ করেই ‚আদিবাসী” বিষয় দাবী তুলেছেন । ভ্রান্ত এই দাবীটি দেশের স্বার্থ বিরোধী এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই । তথাপি দেশের কতিপয় স্বার্থান্বেষী নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, পাহাড়ে বসবাসরত শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ, এমনকি সাংবাদিকরাও ইদানিং ছোট ছোট ক্ষুদ্র বিভিন্ন সম্প্রদায়গুলোকে সরকার নির্দেশিত ‚ক্ষুদ্র ও নৃ-গোষ্ঠী” না বলে ‚আদিবাসী” হিসেবে অভিহিত করছেন । সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও সতর্কতা সত্ত্বেও ‚আদিবাসী” শব্দের ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, জাতীয় ঐতিহাসিক স্থানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করা হচ্ছে ।

উপজাতীদের ‚আদিবাসী” হিসেবে উল্লেখ না করার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও স্বার্থান্বেষী মহল খুব সচেতনভাবেই তা অমান্য করছেন । ২০১৫ সালের ১৬ আগস্ট গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-৩ অধিশাখা থেকে ‚বাংলাদেশে আদিবাসী নামক অসাংবিধানিক দাবি বাস্তবায়নের অপকৌশল রোধে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান ব্যবহারের অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন” সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় ।

দেশের প্রত্যেক মানুষেরই আলাদা আলাদা মতাদর্শ থাকতে পারে । এই মতাদর্শ যেন দেশপ্রেমের সাথে সাংঘর্ষিক না হয় সে বিষয়টি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে হবে । ব্যক্তিগত মতাদর্শের বিষয়টি দুই ধরণের হতে পারে- প্রথমত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মনেপ্রাণে ঐ মতাদর্শকে বিশ্বাস ও ধারণ করেন আবার দ্বিতীয়ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নির্দিষ্ট একটি মতাদর্শ মনে প্রাণে ধারণ না করলেও স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় দেশের স্বার্থ বিরোধী হলেও উক্ত বিতর্কিত মতাদর্শে স্থির থাকেন ।

সরকারের সুনিদিষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও যেহেতু বাংলাদেশের স্বার্থানেষী কিছু বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশের উপজাতীদের ‚আদিবাসী” হিসেবে সম্বোধন করছেন সেহেতু তারাও সুদূর প্রসারী কোন ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে করছেন, তা অনুমান করা যায় । তারা তাদের ব্যক্তিগত মতাদর্শের আবরণে উপজাতীদের ‚আদিবাসী” আন্দোলনকে আরও উৎসাহিত করছেন । তবে যদি আদিবাসী দাবীটির পিছনে সত্যতা থাকতো তাহলে বিষয়টি নিয়ে হয়তো বিতর্কের সুযোগ ছিলো।

কিন্তু একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত বিষয়ে কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবী কেন ক্রমাগত প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তা’ তারা নিজেরাই ভালো বলতে পারবেন । দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা, অখণ্ডতা রক্ষা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি  অর্জনের মত মৌলিক বিষয়ে কোন বিতর্ক সৃষ্টি কাঙ্ক্ষিত নয় । মৌলিক বিষয়সমূহে আমাদের মতাদর্শগত ভিন্নতা দেশপ্রেমের গভীরতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ।

অপ্রয়োজনীয় এবং অগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করে মেধাবী জনগোষ্ঠীর যেমন সময় নষ্ট হয় তেমনি দেশের স্বার্থের প্রয়োজনে ঐ মেধাসমুহ ঐ সময়গুলোতে কোন ভূমিকা রাখতে পারে না । দেশের মৌলিক বিষয় সমুহে ব্যক্তিগত মতাদর্শগত ভিন্নতা যেনো অহেতুক অহংকারে বা কোন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর স্বার্থের কারণে প্রভাবিত না হয় সেবিষয়ে দৃষ্টি দেয়া আবশ্যক ।

পারভেজ হায়দার- পার্বত্য গবেষক




পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ধস, অযাচিতভাবে প্রশ্নের তীর বাঙালিদের দিকে


পারভেজ হায়দার ::
গত ১১-১৩ জুন ভারি বর্ষণের সময় বৃহত্তর চট্টগ্রাম, অর্থাৎ চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং কক্সবাজারে দেড় শতাধিক মানুষের প্রাণহানী ঘটেছে। বৃহত্তর চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের করণে প্রাণহানির ঘটনা একবারে নতুন না হলেও এ বছরের পাহাড়ধসজনিত বিপর্যয় ইতিপূর্বের সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। বৃহত্তর চট্টগ্রামের মধ্যে নিঃসন্দেহে রাঙ্গামাটিতে এ বছর প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। মর্মান্তিক মানবিক বিপর্যয়ের এই বিষয়টি সামনে রেখে বর্তমানে বেসরকারি টেলিভিশনে টক-শোসমূহে বক্তাদের বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বার্থান্বেষী মহলের অযাচিত মন্তব্য এবং বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টগুলোতে আপাত দৃষ্টিতে সাম্প্রতিক পাহাড়ধসের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী করা হচ্ছে। গত ১৬ জুন ২০১৭ প্রথম আলো পত্রিকায় ‘ছয় বছরে নিহতদের ৬৪ ভাগ বাঙালি’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, বন ও পাহাড় কেটে যত্রতত্র বাঙালি পুনর্বাসন করা হয়েছে। অধ্যাপক আখতার পার্বত্য অঞ্চলের এই বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে যথেষ্ট গবেষণা করে উপরোল্লেখিত মন্তব্য করেছেন কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি একেবারে সরলীকরন করে পক্ষপাতমূলকভাবে কোন একটি জনগোষ্ঠীর উপর দোষ চাপিয়ে দেয়া সম্পূর্ণ অবিবেচনাপ্রসূত।

সাম্প্রতিক বছরগুলোর কথা যদি বিবেচনায় আনা হয়, তাহলে দেখা যায়, ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামের ৭টি স্থানে পাহাড় ধসের কারণে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়, ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামের লালখান বাজার মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড় ধসে ৪টি পরিবারের ১২ জনের মৃত্যু হয়, ২০১১ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রামের টাইগারপাস এলাকার বাটালি হিলের ঢালে পাহাড় ও প্রতিরক্ষা দেওয়াল ধসে ১৭ জনের মৃত্যু হয়, ২০১২ সালের ২৬-২৭ জুন চট্টগ্রাম, বান্দরবান, কক্সবাজার ও সিলেটে ৯৪ জন মৃত্যুবরণ করে। এছাড়া ২০১৫ সালের ২৬-২৭ জুন টানা বর্ষণ, ধস আর পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারে ১৯ জনের মৃত্যুর বিষয়ও এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর পাহাড়ধসজনিত এই প্রাণহানির বিষয় বিশ্লেষণে অনুমান করা যায় যে, পাহাড় ধসের ভৌগোলিক বিপর্যয় শুধুমাত্র পার্বত্য জেলাগুলোতে নয়, পাহাড় পরিবেষ্টিত বৃহত্তর চট্টগ্রামের অধিকাংশ স্থানেই ঘটছে। বৃহত্তর চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় ভৌগোলিক দিক দিয়ে কিছুটা ভিন্ন। এখানে সমতল ভূমির পাশাপাশি উঁচু-নিচু, ছোট-বড় অনেক পাহাড় বা টিলা রয়েছে। বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো সাধারণত মাটি এবং বালু মিশ্রিত, এসকল পাহাড়ের মাটি এটেল মাটির মত আঠালো নয়। এ অঞ্চলের পাহাড়গুলো সাধারণত পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের পাহাড়গুলোর মতো পাথর পরিবেষ্টিত নয়। এই পাহাড়গুলোর মাটি কোন নির্দিষ্ট শক্ত অবলম্বনের অনুপস্থিতিতে ভারি বর্ষণের ফলে সহজে ধসে পড়ে। এখানে সহায়ক অবলম্বন বলতে ব্যাপক বনায়নই গ্রহণযোগ্য সমাধান। কিন্তু যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিকতার ছোঁয়া পার্বত্য চট্টগ্রামেও পড়েছে। অনেক বছর আগে সাধারণত পাহাড়ের গ্রাম অঞ্চলে ‘সনাতনী উপজাতী বন ও কৃষি সভ্যতার’ ঐতিহ্যবাহী লোকজ শিক্ষা থেকে Watershed Management ও পরিবেশ সংরক্ষণের কলাকৌশল অনুসরন করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তাদের ঘরবাড়ি তৈরী করত। এবিষয় অনস্বীকার্য যে এ ধরনের লোকজ জ্ঞানকেই ১৯৯২ সালে প্রথম বিশ্ব ধরিত্রী সম্মেলনে Traditional Scientific Knowledge হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। অনেক আগের সেই সময়গুলোতে এই সনাতনী ধারা অবলম্বন করেই পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীরা পাহাড়ের মাটি না কেটে খুঁটির ওপর ‘টং ঘর’ তৈরি করা হতো। এছাড়া তাদের ধর্মীয় একটি সংস্কারও ছিল সেই সময়গুলোতে। প্রয়াত বিশিষ্ট উপজাতী গবেষক ও লেখক অমরেন্দ্র লাল খীসার গবেষণা পত্র থেকে জানা যায়, অধিকাংশ গোত্রের উপজাতীরা ‘ধরিত্রীকে আঘাত করে মাটি কর্ষণ করাকে পাপ মনে করতো’। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপজাতীদের জীবনে আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষা, বাসস্থান ও পোষাক পরিচ্ছেদে আমূল পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকাতেও উপজাতী যুবক-যুবতীদের জিন্স, টি-শার্টেই স্বাচ্ছন্দবোধ করতে দেখা যায়। এখানে আরো একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে পার্বত্য এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। অনেক আগে দুর্গম পাহাড় এবং প্রত্যন্ত এলাকায় যখন কোন রাস্তা-ঘাট ছিল না, পাহাড়িরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ভালো মূল্য পেত না। সাম্প্রতিক কয়েক দশকের ক্রম উন্নয়নের অন্যতম হচ্ছে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় রাস্তাঘাট তৈরি। বর্তমান সময়ে প্রত্যন্ত এলাকায় পাহাড়িদের উৎপাদিত পণ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যপক উন্নয়নের ফলে শহর এলাকায় পরিবহন সহজেই সম্ভব হয়। পাহাড়িরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ভালো দাম পাচ্ছেন এবং নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনেও ক্রমান্বয়ে আধুনিকতার সাথে মানিয়ে নিতে আগ্রহবোধ করেন। তার অর্থ হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন অর্থাৎ পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করা ছিল সময়ের দাবী।

প্রশ্ন হচ্ছে, যারা এই রাস্তাগুলো তৈরি করেছেন তারা কি যথেষ্ঠ নিরাপদভাবে রাস্তা তৈরি করতে পেরেছেন কি না? এর উত্তর হ্যাঁও হতে পারে আবার নাও হতে পারে। যেকোন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের সাথে আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নির্ভরশীল। বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাগুলো তৈরি করতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিবেচনায় পাহাড়ের পাদদেশসমূহ কেটে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। সাধারণ জ্ঞানে পাহাড়ি এলাকায় রাস্তার দীর্ঘস্থায়ীত্ব নিশ্চিত করতে পানি সঞ্চালনের সু-ব্যবস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়। যতটুকু জানা যায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরির ক্ষেত্রে পানি সঞ্চালনের জন্য উপযুক্ত কার্যকর ড্রেন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য নিরাপত্তার বিষয়টি ভালভাবে নিশ্চিত করেছেন। এছাড়াও সময়ে সময়ে প্রতিনিয়ত রাস্তাগুলোর রক্ষণাবেক্ষনের ব্যবস্থা তারা ভালোভাবেই করছেন। তাই, পাহাড় ধসের মূল কারণ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় আধুনিকতার অন্যতম নিয়ামক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, আধুনিক বাসস্থান তৈরি, পর্যটনের উন্নয়ন ইত্যাদি একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়। চট্টগ্রাম মহানগরীতে ২০০৭ সালের ভূমিধসের পর গঠিত তদন্ত কমিটি পাহাড় ধসের কারণ হিসেবে যে সমস্ত সমস্যা চিহ্নিত করেছিল তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভারি বর্ষণ, পাহাড়ের মাটিতে বালির ভাগ বেশি থাকা, উপরিভাগে গাছ না থাকা, গাছ কেটে ভারসাম্য নষ্ট করা, পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস, পাহাড় থেকে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না রাখা, বনায়নের পদক্ষেপের অভাব, বর্ষণে পাহাড় থেকে নেমে আসা বালি এবং মাটি অপসারনের দুর্বলতা ইত্যাদি। এখানে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে, অতি বৃষ্টিপাতও বালি/মাটি মিশ্রিত পাহাড়ধসের অন্যতম ‘কারণ’ হিসাবে চিহ্নিত। নাসার তথ্যমতে, গত ১২-১৪ জুন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ৫১০ মিলি অর্থাৎ ২০ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হয়েছে (ডেইলি স্টার, ১৭ জুন ২০১৭)। শুধুমাত্র ১৩ জুন সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত, একদিনে রাঙ্গামাটিতে ৫২৪ মিলি বৃষ্টিপাত হয় (ইন্ডিপেন্ডেন্ট, ১৪ জুন ২০১৭)। পূর্ববর্তী বছরগুলোতে দৃষ্টিপাত পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, রাঙ্গামাটির জুন মাসের গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হলো, ৪৫৩.১ মিলি (২০১৬), ৩৯৭.৩ মিলি (২০১৫), ৩৩৬.৭ মিলি (২০১৪), ৩১৬.৯ মিলি (২০১৩), ৩৩৫.৪ মিলি (২০১২)। অর্থাৎ পাহাড়ধস জনিত মানবিক বিপর্যয়ের ওই দিনগুলোতে একদিনের গড় বৃষ্টিপাত অন্যান্য বছরের জুন মাসের গড় বৃষ্টিপাতের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ বৃহত্তর চট্টগ্রামের পূর্বের অভিজ্ঞতার বিবেচনায় বর্তমান বছরের পাহাড়ধসের কারণ হিসাবে শুধুমাত্র একটি জাতিগোষ্ঠী, অর্থাৎ বাঙালিদের দায়ী করা নিতান্তই অবিবেচনা প্রসূত, অপরিপক্ক চিন্তা-ভাবনা বলে প্রতীয়মান হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে গত শতকের ৭০ এবং ৮০ দশকে তৎকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যে সকল বাঙালিকে পুনর্বাসন করা হয়েছিল, তাদের পরিবার প্রতি পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন খাস জমি থেকে সমতল ভূমি হলে ২.৫ একর আবার পাহাড় এবং সমতল মিশ্র ভূমি হলে ৪ একর ও সম্পূর্ণ পাহাড়ি ভূমি হলে ৫ একর করে জমির বন্দোবস্তি দেওয়া হয়েছিল। এ প্রসংগে উল্লেখ করা যেতে পারে, খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি এলাকার ৩টি মৌজায় ১৮,৮৬৪ একর, বাবুছড়া এলাকার ৬টি মৌজায় ১৭,৬৭৩ একর, বড় মেরুং এলাকার ২টি মৌজায় ১১,৮৯৩ একর, ছোট মেরুং এলাকার ১টি মৌজায় ১০,৪৮১ একর, খাগড়াছড়ি সদর এলাকার গোলাবাড়ী মৌজায় ১৯,৬১৬ একর, মহালছড়ি এলাকার ৭টি মৌজায় ২৬,৬২৫ একর, রামগড় এলাকার ২টি মৌজায় ২৬,৬৭৪ একর, আলুটিলা এলাকার ৯টি মৌজায় ২৯,৩৪৭ একর, মানিকছড়ি এলাকার ৭টি মৌজায় ২২,৫৪৪ একর, লক্ষীছড়ির ৫টি মৌজায় ১৩,১৬৫ একর, কাপ্তাই এলাকার ২টি মৌজায় ১৭,৮৭৯ একর, রাঙ্গামাটি সদর এলাকার ৪টি মৌজায় ৭,২১৬ একর, বুড়িঘাট এলাকার ৬টি মৌজায় ১০,৫৯৪ একর, জুরাছড়ি এলাকার ৪টি মৌজায় ৯,৩০০ একর, ভূষণছড়া এলাকার ৬টি মৌজায় ২৬,৭১৭ একর, সুভলং এলাকার ২টি মৌজায় ১০,৯০৫ একর, লংগদু এলাকার ২টি মৌজায় ৮,৬৯৭ একর, কাচালং এলাকার ১টি মৌজায় ১৪,০০০ একর এবং আটারকছাড়া এলাকার ১টি মৌজায় ২,৬৩৩ একর জমি বাঙালিদের বন্দোবস্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন সময়ে শান্তিবাহিনীর আক্রমণ এবং নিরাপত্তা জনিত কারণে অধিকাংশ বাঙালি পরিবারকে সরকার তাদের বন্দবস্তিকৃত জমিগুলোতে স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ পায়নি। ১৯৮৬ সাল পরবর্তী সময়ে তাদের নিরাপত্তা বিবেচনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার গুচ্ছগ্রামে স্থানান্তর করা হয়। তবে সরকারি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অনেক বাঙালি অবৈধভাবে রাস্তা সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশে ঘরবাড়ি তৈরি করে থাকছে। একই সাথে উপজাতীয়দের অনেকেও বাঙালিদের মতো পাহাড়ের পাদদেশে ঘরবাড়ি তৈরি করে বসবাস করছে। এ ক্ষেত্রে, উভয় সম্প্রদায়ই সনাতন উপজাতীয়দের বহুল প্রচলিত লোকজ প্রথা অর্থাৎ Watershed Management অনুসরণ করে, অর্থাৎ পাহাড়ের মাটি না কেটে খুটির উপর ‘টং ঘর’ জাতীয় ঘরে বসবাস করছে না। বাঙালি/পাহাড়ি উভয় সম্প্রদায় পাহাড় কেটে অনিরাপদভাবে তাদের বসতবাড়ি নির্মাণ করে অবস্থান করছে। প্রথম আলোর ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় পাথুরে না হলেও, গাছের আচ্ছাদন এ পাহাড়কে ধস থেকে রক্ষা করে, কিন্তু পাহাড় দিন দিন ন্যাড়া হয়েছে’। প্রকৃতপক্ষে, এই পাহাড় ন্যাড়া হওয়ার পিছনে উপজাতীয়দের বহুল প্রচলিত জুম চাষই দায়ী। জুম চাষের জন্য একটি পাহাড়কে উপযোগী করার জন্য পাহাড়ের সমস্ত গাছ পুড়িয়ে ফেলা হয়। তারপর ওই জমিতে ক্রমান্বয়ে জুম চাষ করা হয়। পূর্বে পার্বত্য এলাকায় যখন জনসংখ্যা কম ছিল, পাহাড়িরা এক বছরে একটি পাহাড় পুড়িয়ে জুম চাষ করার পর পরের বছরে অন্য একটি পাহড়ে জুম চাষ করতো। এভাবে প্রতি বছর পাহাড় পরিবর্তন করে প্রথম পাহাড়ে ফিরে আসতে তাদের ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগতো। তাই একটি পাহাড় জুম চাষের ফলে প্রথম বছর ভূমি ধসের ‘কারণ’ তৈরি করলেও ১৫ থেকে ২০ বছর পর ঐ জমিতে ফিরে আসার কারণে মধ্যবর্তী বছরগুলোতে নতুন করে প্রাকৃতিকভাবেই বনাঞ্চল তৈরি হয়ে যেত। কিন্তু বর্তমানে উপজাতীয়দের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবার কারণে ২ থেকে ৩ বছর পর পর একই পাহাড়ে পুনরায় জুম চাষ করার ফলে সেখানে প্রাকৃতিকভাবে নতুন বনাঞ্চল তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকছে না। তাই একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম এর পাহাড় ধসের পিছনে জুম চাষ প্রথা অন্যতমভাবে দায়ী।

এখানে উল্লেখ্য, জুম চাষ শুধুমাত্র উপজাতীয়রাই জনগোষ্ঠীরা করে থাকে, বাঙালিরা জুম চাষে অভ্যস্ত নয়। গত ১১-১৩ জুন রাঙ্গামাটির বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত পাহাড়ধসের বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পাহাড়ের পাদদেশে অবৈধভাবে বাঙালি ও পাহাড়িদের অনিরাপদভাবে তৈরিকৃত বাসস্থান এলাকায় পাহাড়ধসের পাশাপাশি, জনবসতিহীন অনেক পাহাড়েও ব্যাপক ভূমিধস হয়েছে। তাই এ বিষয় নিশ্চিত করে বলা যায়, পাহাড়ের পাদদেশে অবৈধভাবে বাঙালি বা পাহাড়িদের বসতি স্থাপনই ভূমিধসের অন্যতম কারণ নয়, যদি তাই হতো তাহলে যে সকল পাহাড়ে বসতি স্থাপিত হয়নি, সেই পাহাড়গুলোতে ভূমি ধস হতো না।

উপর্যুক্ত আলোচনায় এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং টক-শোগুলোতে লেখক এবং বক্তাগণ প্রকৃত গবেষণাপ্রসূত বক্তব্য উপস্থাপন না করে অবিবেচনা প্রসূত ও অপরিপক্ক বক্তব্য দিচ্ছেন। এতে করে পাহাড়ধসের প্রকৃত কারণ অপ্রকাশিত থেকে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পাহাড়ধসের কারণ হিসেবে ‘শুধুমাত্র পাহাড়ি’ অথবা ‘শুধুমাত্র বাঙালিরা’ দায়ী একথা ঢালাওভাবে বলা যাবে না। সময়ের প্রয়োজনে যুগের সাথে সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে পরিবর্তন আসা খুবই স্বাভাবিক। আধুনিকতার এ পরিবর্তন ছিল সময়ের দাবি, যা বাঙালি বা পাহাড়ি কারো পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

২০০৭ সালে চট্টগ্রাম মহানগরীতে ভূমিধসের পর গঠিত তদন্ত কমিটি কর্তৃক পাহাড়ের ৫ কি. মি. এর মধ্যে আবাসিক প্রকল্প গড়ে না তোলা, পাহাড়ে জরুরি ভিত্তিতে বনায়ন, ঢালু পাহাড়ে গাইড ওয়াল নির্মাণ, পানি নিষ্কাশনের ড্রেন ও মজবুত সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, পাহাড়ের পানি ও বালি অপসারনের ব্যবস্থা করা, যত্রতত্র পাহাড়ি বালি উত্তোলন নিষিদ্ধ করা, পাহাড়ি এলাকার ১০ কি. মি. এর মধ্যে ইটের ভাটা নিষিদ্ধ করা, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসতি স্থাপন নিষিদ্ধ করা, পাহাড় কাটার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। যতটুকু জানা গেছে, এবারও পাহাড়ধসের সমস্যা চিহ্নিত ও করণীয় নির্ধারনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সত্যব্রত সাহা’কে প্রধান করে ২১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি নিশ্চয়ই পাহাড়ধসের সঠিক কারণ চিহ্নিত করতে এবং পরবর্তী কর্মপন্থা সম্পর্কে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের মতামতের আলোকে সুপারিশ করবেন। এর মধ্যে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে মনগড়া বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা করা সমীচীন নয়। বর্তমানে পাহাড়ধসে পাহাড়ি বাঙালি উভয় সম্প্রদায় তীব্র মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে আছেন। সরকার প্রাকৃতিক এই বিপর্যয় থেকে উত্তোরণে এবং ক্ষতিগ্রস্থ মানুষগুলোকে স্বাভাবিক জীবন ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছেন। আমাদের সকলেরই উচিত সংঘটিত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতিকে ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করে নিজস্ব স্বার্থান্বেষী আচরণ পরিহার করা। এই দেশ আমাদের সকলের। পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠী এই স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের গর্বিত নাগরিক। পার্বত্য এলাকায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের এই সন্ধিক্ষণে ব্যক্তিগত পছন্দ ও মতামতকে ঊর্ধ্বে রেখে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ একসাথে কাজ করবে, এটাই কাম্য।

লেখক : পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক    




পাহাড়ে আর্মি পাহাড়ীদের চক্ষুশুল কেন?

মেজর জেনারেল আ. ল. ম. ফজলুর রহমান

সেই ১৯৭৫ সাল থেকে আর্মি পার্বত্য চট্টগ্রামে অভিযানে নিয়োজিত । ১৯৭৭ সালে প্রথম শান্তিবাহিনী বাংলাদেশ আর্মি কনভয়ের উপরে আক্রমণ চালায়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ( এম এন লারমা ) নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতি ( পিসিজেএসএস ) গঠিত হয়। ১৯৭২ সালেই এম এন লারমা পিসিজেএস এর সশস্ত্র শাখা হিসাবে ষ্টাফ ব্যাটলারস ( এস বি ) গঠন করেন যা পরে শান্তিবাহিনী নাম পায়।

সাধারণ্যে প্রচলিত ধারণা, বংগবন্ধু পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ীদের বাঙালী হতে বলেন এবং পাহাড়ীদের স্বায়ত্ব শাসনের দাবী না মানার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম আজও অশান্ত হয়ে আছে। আমি এই ধারণার সাথে একমত নই।

বঙ্গবন্ধু পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ীদের বাঙালী হতে বললেন আর পাহাড়ীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে যুদ্ধ শুরু করে দিলো- এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। রাঙামাটির বর্তমান রাজা ব্যারিস্টার দেবাষিশ রায়ের পিতা রাজা ত্রিদিব রায় ’৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে পাকিস্তানীদের সহায়তা প্রদান করেন। তখন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ বিরোধী একটি গোষ্ঠি সক্রিয় থেকে যায়। যার পুর্ণ সুযোগ প্রতিবেশী দেশ গ্রহণ করে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে দুর্বল করে সুবিধা আদায়ের সব পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এরই ফলশ্রুতিতে গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ( পিসিজেএসএস ) এবং শান্তিবাহিনী।

প্রশ্ন হলো, প্রতিবেশী দেশ এম এন লারমা এবং তার ভাই সন্তু লারমাকে দিয়ে পিসিজেএসএস এবং শান্তিবাহিনী গঠনে সর্বপ্রকার সহায়তা কেন দিয়েছিলো? এর জবাব পেতে হলে একটু পিছনে ফিরে যেতে হবে।

১৯৪৭ এ স্বাধীনতা লাভের পরে ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। কাশ্মীর নিয়ে উভয় দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৫ তে ভারত-পাকিস্তান আর একদফা যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ভারত-পাকিস্তান একে অপরের ক্ষতি করতে উঠে পড়ে লাগে।

তারই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান ভারতের সাত বোন খ্যাত রাজ্যসমুহের অশান্ত গেরিলা যোদ্ধাদের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের গহীন জংগলে সামরিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প খুলে তাদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করে এবং অন্যান্য সহায়তাও অব্যাহত রাখে। ফলে মিজোরামের গেরিলা নেতা লালডেঙ্গা এবং নাগাল্যান্ডের ড. ফিজো অপ্রতিরোধ্য হয় ওঠে ফলে প্রতিবেশী দেশের পক্ষে সাত রাজ্যের গেরিলাদের দমন করা অসম্ভব হয় পড়ে।

বাংলাদেশ স্বাধীনের পরে প্রতিবেশী দেশের জন্য সাত রাজ্যের গেরিলা যোদ্ধাদের পরাজিত করার একটা চমৎকার সুযোগের সৃষ্টি হয়। প্রতিবেশী দেশ রাজা ত্রিদিব রায়ের সংক্ষুব্ধ অনুসারীদের দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তোলে তিনটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেঃ

১। পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত করে প্রতিবেশী দেশের গেরিলা যোদ্ধাদের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিপদসঙ্কুল করে তোলা।

২। প্রতিবেশী দেশ পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনীর সৃষ্টি করে তাদের এক্সটেন্ডেড সিকিউরিটি হ্যান্ড হিসাবে যাতে শান্তিবাহিনীর সাহায্যে প্রতিবেশী দেশের সাত রাজ্যের গেরিলাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় এবং জংগল থেকে তাদের ঝেটিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। এতে প্রতিবেশী দেশ কৃতকার্য হয় এবং সাত রাজ্যের গেরিলাদের দমনে সক্ষম হয়।

এর ফলশ্রুতিতে লালডেঙ্গা এবং নাগাল্যান্ডের ড. ফিজো প্রতিবেশী দেশের সাথে শান্তি স্হাপনে বাধ্য হয়। আজও প্রতিবেশী দেশের সাত রাজ্যে গেরিলা যুদ্ধ পুনরায় মাথাচাড়া দিতে সক্ষম হয় নাই। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে পিসিজেএসএস এবং শান্তিবাহিনীর প্রতিবেশী দেশবান্ধব তৎপরতা।

৩। পার্বত্য চট্টগ্রামে পিসিজেএসএস এবং শান্তিবাহিনী সৃষ্টি করে বাংলাদেশের বুক চিরে রক্তক্ষরণ নিশ্চিত করা যাতে বাংলাদেশে অশান্তির আগুন প্রজ্বলিত রেখে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে রাখা সম্ভব হয় । কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। পার্বত্য চট্টগ্রামের লাইফ ব্যাটেল গ্রাউন্ডে প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতায় সিক্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু যে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছে তানয় জাতিসংঘের হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত এখন বাংলাদেশের গর্ব বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

প্রশ্ন হতে পারে পার্বত্য চট্টগ্রামে কি শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়েছে? পিসিজেএসএস সরকারের সাথে শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ হতে বাধ্য হয়েছে এর কৃতিত্ব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর। আমার দৃঢ় ধারণা শান্তিবাহিনীর একটি অংশ ইউপিডিএফ নামে পিসিজেএসএস এর সাথে সমঝোতার মাধ্যমে পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায় ইউপিডিএফ এর এখন বড় কাজ হচ্ছে পাহাড়ে চাঁদা আদায় করা এবং প্রতিবেশী দেশের প্ররোচনায় পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির চেষ্টা করা। এরও অবসান কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমি বলবো পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সরকারের বিজয় অর্জিত হয়েছে যার মুল কুশীলব বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এই বিজয় প্রতিবেশী কোনো দেশের পক্ষে তাদের দেশের গেরিলা যুদ্ধের উপরে অর্জন করা সম্ভব হয়নি যা বাংলাদেশ করেছে।

১৯৭৮- ৮০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংগালীদের পুনর্বাসন হয়। এটা নতুন কোনো বিষয় নয়। গেরিলা যুদ্ধ সংকুল সব স্হানে সব দেশ স্ব-স্বদেশের নাগরিকদের পুনর্বাসন করেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংগালীদের পুনর্বাসনের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। বাংগালীদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পাহাড়ীদের মাঝে নবউন্নয়নের ধারণার সূচনা হয়েছে।

এখন না হলেও ভবিষ্যতে পাহাড়ী বাংগালী মিলে পুর্ণ শান্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে একে অপরের সম্পূরক হিসাবে নিজেদের নিয়োজিত করবে। একটা জাতির উত্তরণ ঘটাতে হলে অভিজ্ঞতার অন্ত আদান প্রদানের কোনো বিকল্প নাই।

পাহাড়ে বাংগালীরা পাহাড়ীদের জন্য সেই কাজটাই করছে। আজ পাহাড়ীদের অনেকে জুম চাষ বাদ দিয়ে অন্য জীবিকার চিন্তা করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক স্হান এখন পর্যটন এবং হর্টিকালচারের হাব হিসাবে গড়ে উঠছে। আমি নিজে আশির দশকে তিনবার পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি পদাতিক ব্যটালিয়নের অধিনায়কের দায়িত্ব পালনের সময় দেখেছি কিভাবে পাহাড়ের পর পাহাড় ধ্বংস হয়েছে জ্যুম চাষের ফলে।

একটি পাহাড়ে পর পর কয়েকবার জুম চাষ করলে তা বন্ধা বা রাইন্যা হয়ে যায়। ঐ পাহাড়ে কোনো প্রকার গাছপালা জন্মে না। সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এভাবেই পার্বত্য চট্টগ্রামের জীববৈচিত্র ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছে।

আশির দশকে যখন পার্বত্য চট্টগ্রামে সবখানে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প ছিলো তখন পাহাড়ের প্রাকৃতিক সম্পদের উপরে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছিলো। পাহাড়ী বাংগালী নির্বিশেষে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত ছিলো। ’৯৭ তে শান্তি চুক্তির পরে অস্হায়ী সেনা ক্যাম্প উঠে যাবার পরে উজাড় হচ্ছে যেমন পাহাড়ী বন তেমনি পাহাড়ময় ছড়িয়ে পড়ছে সন্ত্রাস। এখন কারো নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। এটাই পাহাড়ে সন্ত্রাস যারা চায় তাদের মুল লক্ষ্য।

পাহাড়ী এবং কিছু বাংগালী বুদ্ধিজীবী তারস্বরে চিৎকার করে সেনা শাসনের অবসানের কথা বলে। তারা চায় বাংগালীরা পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সমতলে চলে আসুক। কিন্তু তারা নিজেরা জানে না, সেনা শাসন বলতে কি বুঝায়? পার্বত্য চট্টগ্রামে সিভিল প্রশাসন আছে তারা তা পরিচালিত করে। পাহাড়ে সেনাবাহিনীর কাজ হলোঃ

১। সন্ত্রাস দমন করা।

২। পাহাড়ী-বাংগালী নির্বিশেষে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

৩। শান্তকরণ ( পেসিফিকেশন ) কার্যক্রম পরিচালিত করা।

এখানে সেনা শাসনের প্রশ্ন কি করে আসে? পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, স্থিতিশীলতা, প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র রক্ষা করতে হলে প্রত্যেকটি অস্হায়ী সেনা ক্যাম্প পুনর্জীবিত করে সত্ত্বর সেখানে সেনাবাহিনী প্রেরণের ব্যবস্থা অনতিবিলম্বে সরকারকে গ্রহণ করার জন্য আমরা অনুরোধ করছি। যদি তা করা না হয় তবে পরিস্থিতির চরম অবনতি হলে পাহাড়ে নতুন করে সন্ত্রাসের উম্মেষ ঘটার সম্ভাবনা প্রকট হবে যা যা পাহাড়ী, বাংগালী কারুর জন্য কাম্য হবে না।

লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ রাইফেলস ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা।




রাষ্ট্র, নাগরিক ও ‘সেটলার’

কাকন রেজা :

অনেকের অনেক লেখাতেই দেখি ‘সেটেলার’ শব্দটি। বিশেষ করে দেশের পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী বাংলাভাষীদের বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। অনেকে ‘সেটেলার’ এর পরিভাষা হিসাবে বোঝান ‘শরণার্থী’ শব্দটিকে, অর্থাৎ অন্য দেশ বা স্থান হতে আসা ‘আশ্রয়প্রার্থী’। ‘শরণার্থী’ বা ‘আশ্রয়প্রার্থী’ দুটিরই ইংরেজি `Refugee’, যার আরেকটি বাংলা প্রতিশব্দ ‘উদ্বাস্তু’। কিন্তু মজার বিষয় অভিধান খুঁজলে কিন্তু আলোচিত ‘সেটেলার’ শব্দটির দেখা মেলে না। যে শব্দটির দেখা মেলে সেটি হলো ‘সেটলার’। শব্দটি ভাঙলে দেখায় অনেকটা “সেট্ল(র)” এরূপ আর কী। যার অর্থ হলো, ‘ঔপনিবেশিক’। ব্যাখ্যা হলো, ‘নতুন উন্নয়নশীল দেশে বাস করতে আসা বিদেশী বসতকার’। ইংরেজিতে ‘সেটলার’ বিষয়টি বোঝানোর জন্য `The settlers had come to America to look for land’ এই বাক্যটিই সাধারণত ব্যবহার করা হয়। ক্যামব্রিজ অভিধান ‘সেটলার’ শব্দটিকে সুনির্দিষ্টি করতে বলেছে, ‘a person who arrivesespecially from another country’। আমাদের দেশে  ‘সেটলার’ কে ‘সেটেলার’ বানাতে গিয়ে শব্দটির মতো পুরো বিষয়টিতেই বিভ্রান্তি ঘটানো হয়েছে।

বিষদ বলার আগে রাষ্ট্র বিষয়ে বলি। সোজা ভাষায়, ‘একটি সুনির্দিষ্ট ভূখন্ডকে ঘিরে, রাষ্ট্রিক পরিচয়ে পরিচিত মানবগোষ্ঠীর স্বাধীন সত্ত্বাই হলো রাষ্ট্র’। যা আমরা ১৯৭১-এ একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করেছিলাম। এই মানবগোষ্ঠীর বিপরীতে ‘সেটলার’ শব্দটি কী যায়? যদি যায় তাহলে রাষ্ট্র মানে কী? এ পর্যায়ে নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব সাথে নাগরিক অধিকারের কথায় আসি এবং যথারীতি সহজ ভাষায়। যে অধিকার প্রশ্নে মাঝেমধ্যেই অনেকের ঘুম হারাম হয়ে যায় তারমধ্যে প্রধানতম হলো খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান। একজন নাগরিকের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের সংস্থান করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। আমাদের স্বাধীন সীমানার যে কোন স্থানে যে কোন নাগরিককে পুনর্বাসন করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের। একজন ভূমিহীন নাগরিকের বাসস্থান এবং খাদ্যের যোগানদানের অধিকার রাষ্ট্র সংরক্ষণ করে, যেহেতু এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এর বিরোধিতা করা নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের কমিটমেন্টের বিরোধিতা করা। মানবাধিকারের প্রশ্নে যা সবচেয়ে বড় মানবাধিকার বিরোধী কাজ।

সবাই মিলে যদি আমরা দেশটা স্বাধীন করে থাকি, তাহলে পুরো দেশটাই আমাদের। এখানে সম্প্রদায়, গোত্র বা ধর্মের প্রশ্নে আলাদা করে কিছু থাকার কথা নয়। থাকার কথা নয় সংখ্যাধিক্যেও। সুতরাং কোন যুক্তিতেই দেশের কোন অঞ্চল বা জায়গা সম্প্রদায়, ধর্ম বা অন্যকোন ভিত্তিতেই আলাদা করে বন্টনের প্রশ্ন উঠতে পারে না। দেশের একটি অঞ্চলকে কারো জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়ার প্রচেষ্টা মানেই দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে দ্বৈততার সৃষ্টি করা, বিরোধ সৃষ্টি করা। এমন হলে আঞ্চলিকতার ভিত্তিতে, সম্প্রদায়গত কারণে সারাদেশ বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে পড়বে। উদাহরণ হিসাবে সিলেটের কথাই বলি। সিলেটের ভাষাকে অনেকেই বাংলার চেয়ে আলাদা বলেন। সিলেটের আলাদা বর্ণমালার কথাও ওঠে। তাহলে কী সিলেটকে শুধু সিলেটের মানুষের জন্য আলাদা করা দেয়ার কথা তুলতে হবে? বলতে হবে এখানে অন্যরা ‘সেটলার’, ‘ঔপনিবেশিক’? এমন কথা তোলা কী অন্যায়, রাষ্ট্র পরিপন্থী সর্বোপরি ৭১’এর অর্জন বিরোধী নয়?

অনেকেই পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে মেতেছেন। দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী বাংলাভাষীদের ‘সেটেলার’ তথা ‘সেটলার’ বলে আখ্যায়িত করছেন তারা। খুব ‘সহজিয়া’ প্রশ্ন করা যায়, তবে কী বাংলাভাষীরা ‘ঔপনিবেশিক’? তারা কী?

‘a person who arrivesespecially from another country’? তাদের ক্ষেত্রে কী `The Bangladeshi settlers had come to Hill to look for land’ এই উদাহরণ ব্যবহার করা হবে? এর কী জবাব আমি জানি না। তবে একটা বিষয় জানি, আবেগ দিয়ে কোন কিছু ব্যাখ্যার আগে বাস্তবতাটা চিন্তা করে নেয়া দরকার। চিন্তা করা দরকার যে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা এই স্বাধীন ভূখন্ড অর্জন করেছিলাম, তা সম্প্রদায়, গোত্র, ভাষা, ধর্ম বা অন্যকোনে পরিচয়ে বিভক্ত করা জন্য নয়। এই দেশ অর্জিত হয়েছিল পুরো ভূখন্ডটিই নিজের ‘মাটি’ ভাবার জন্য, ‘মা’ ভাবার জন্য; খালা বা মাসি ভাবার জন্য নয়।

অন্যের জমি যদি কেড়ে নেয়া হয় তাহলে অন্যায়, কিন্তু একজন ভূমিহীনকে রাষ্ট্র যদি তার জায়গা বসবাসের জন্য দেয় তা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাও কী উচিত? সেক্ষেত্রে ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়গত পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ‍তোলা তো আরো বেশী অনুচিতের মধ্যে পড়ে। অসাম্প্রদায়িকতার কথা যারা বলেন, তারা বলুন তো এরচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িকতা আর কী আছে? এটা রাষ্ট্রের কোন দয়ার দান নয়, একজন নাগরিকের প্রতি দেয়া রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি। একজন নাগরিক যিনি ভূমিহীন, তিনি সেই রাষ্ট্রেরই অংশ। জানি এর বিপরীতে অনেক কথা আসবে। আসবে রাষ্ট্র ও ‘সেটলার’ কর্তৃক নিপীড়নের কথা। আসবে ‘বাহিনী’ বিষয়ক কথকতা। এর বিপরীতেও যুক্তি আছে যা খন্ডন করা খুব আয়াসসাধ্য নয়। তবে যুক্তি যখন মার খায় তখন কৌশলীরা আবেগের আশ্রয় নেন, মানুষের সহানুভূতির জায়গায় খোঁচা দেন। যুক্তি ও বাস্তবতার বিপরীতে আবেগ একটি অপকৌশল, এটা যারা নেন তারাও বোঝেন।

সম্প্রতি রোমেল বা রমেল চাকমা নামে একজন পাহাড়ের অধিবাসী যুবকের প্রশ্নবোধক মৃত্যু নিয়ে কথা হচ্ছে। বিনা বিচারে একজন মানুষের মৃত্যু বিনা প্রশ্নে মেনে নেয় যারা তাদের মধ্যে ন্যায়বোধ সঠিক ভাবে বিকশিত হয়নি। কিন্তু এখানেও কথা আছে, এক যাত্রায় দুই ফল বিষয়ে। আমি যখন একটি বিচারবিহীন মৃত্যু নিয়ে সোচ্চার হবো, আরেকটির বিষয়ে চোখ বুঝে থাকবো তখন বুঝতে হবে আমার এই চাওয়ার মধ্যে ‘ইনটেনশন’ আছে। যে কোন বিচার বহির্ভূত মৃত্যুই সমর্থনযোগ্য নয়।

সুতরাং ‘ন্যায়বোধে’র বিষয়টি প্রমাণ করতে হলে সব বিচার বহির্ভূত মৃত্যুর ব্যাপারেই বলতে হবে, সেটি যদি শত্রুপক্ষেরও হয়। এটাই ‘ন্যায়বোধ’। আর মানুষের সাধারণ ‘ন্যায়বোধ’ থেকেই কিন্তু সৃষ্টি আইনের। জানি, এরপরেও এ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, ব্যাখ্যা আসবে, আসবে ‘কী’ ও ‘কেনো’ সহযোগে প্রশ্নমালা। তবে এসব ‘কী’ ও ‘কেনো’র উত্তর খুঁজতে হলে যেতে হবে ইতিহাসের পথে অনেকদূর। ইতিহাস আর যুক্তির পথে অত দূরভ্রমন সবার জন্য আনন্দময় নাও হতে পারে।

ফুটনোট : আমি সাধারণত খুব সহজভাবে সব কিছু বলতে পছন্দ করি। কারণ অহেতুক তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে যারা যান তাদের সেই পথেও হেটে দেখেছি, মঞ্জিল কিন্তু একটাই। তাই সহজ করে বলাটাই সবচেয়ে ভালো। পান করাই যখন লক্ষ্য কী দরকার পানি ঘোলা করে। তাতে শুধু পানির বিশুদ্ধতাই নষ্ট হবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট




পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নীতি-কৌশলের পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ

গত ডিসেম্বর ও চলতি জানুয়ারি মাসে দেশের বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে ধারাবাহিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এ সকল পত্রিকার রিপোর্টার ও সিনিয়র সাংবাদিকগণের সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে লেখা এসব সরেজমিন প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রামের উদ্বেগজনক পরিস্থিতির চিত্র ফুটে উঠেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কিত খবরের নিয়মিত পাঠক হিসাবে বলতে পারি, বাংলাদেশের বেশিরভাগ জাতীয় দৈনিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখালেখির একটি কমন ট্রেন্ড রয়েছে। এই ট্রেন্ডের টার্গেট থাকে পুনর্বাসিত বাঙালি ও সেনাবাহিনী। পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল অশান্তি ও অস্থিরতার জন্য এদেরকে দায়ী করা হয় এবং আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সশস্ত্র শাখার সন্ত্রাসী তৎপরতাকে সযত্মে আড়াল করা হয়। কিন্তু এবারের প্রতিবেদনগুলোতে সেই ট্রেন্ড ছিল না। রিপোর্টারগণ সরেজমিন পরিদর্শন করে খোলা চোখে যা দেখেছেন তাই লিখেছেন। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃত এবং লুকানো বাস্তবতা উঠে এসেছে এই রিপোর্টগুলোতে। এতে সারাদেশের মানুষের মনে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃত চিত্রের উপর কিছুটা হলেও ধারণা তৈরি হয়েছে। এর ইতিবাচক ফলও পাওয়া গেছে।

গত ৯ জানুয়ারি সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ২১তম বৈঠক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তৎপরতা বাড়াতে সুপারিশ করা। একই সাথে সকল রাজনৈতিক শক্তিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে কমিটির পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়। প্রকৃতপক্ষে এটি ইতিবাচক রিপোর্টের সুফল।

স্বাধীন বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের কালপঞ্জীকে আমরা মোটামুটি তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারি। সত্তরের দশকে জেএসএস ও শান্তিবাহিনীর প্রতিষ্ঠা, আশির দশকে বাঙালি পুনর্বাসন এবং ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি।  ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। শুধু রাজনীতি নয়; নিরাপত্তা, উন্নয়নসহ জনজীবনের সকল ক্ষেত্রেই এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ও দিকবদল। শান্তিচুক্তির পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় সন্ত্রাসী ও নিরাপত্তা বাহিনী পরস্পর মুখোমুখি ও শত্রুতাপূর্ণ অবস্থানে ছিল। শান্তিবাহিনী যেখানে পেরেছে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের উপর অতর্কিত বা পরিকল্পিত হামলা পরিচালনা করেছে। নিরাপত্তা বাহিনীগুলোও হামলা চালিয়ে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত শান্তিবাহিনীর আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তাদের আটক করেছে।

শান্তিচুক্তির পর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের একটি অংশ অস্ত্র জমা দিয়ে সাধারণ ক্ষমার আওতায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। শুধু ফিরে আসাই নয়, শান্তিচুক্তির পুনর্বাসনের আওতায় জেএসএস ও শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসীরা অতিদ্রুতই মন্ত্রী-এমপিসহ বিভিন্ন পদমর্যাদায় সরকারি পদে আসীন হয়। ফলে কিছুদিন আগেও যে সন্ত্রাসী হিসাবে রাষ্ট্রের ও সেই সুবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর শত্রু ছিল, চুক্তির বছরখানেকের মধ্যেই তারা একই অফিসের বস বা সহকর্মীদের পরিণত হয়। অনেকেই আবার রাষ্ট্র প্রদত্ত বিভিন্ন সুবিধার আওতায় ব্যবসা বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ভাবে বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়।

তবে একথা সকলেই জানেন যে, পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের একটি বড় অংশ শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করে অস্ত্র সমর্পণ না করে রাষ্ট্রবিরোধী সশস্ত্র তৎপরতায় লিপ্ত থাকে। শান্তিচুক্তির দুই দশক পরেও এই তৎপরতা স্তিমিত না হয়ে ক্রমাগত বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। এদের নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে নিরাপত্তা বাহিনীগুলো নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিগত ২ বছরে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশংসনীয় অর্জন রয়েছে। বিশেষ করে সাজেক, বাঘাইছড়ি, দিঘীনালা, মহালছড়ি, রাঙামাটি ও রুমাতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন পরিচালনা করে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছে। অন্যদিকে আলীকদমে আলোচনার মাধ্যমে অর্ধশতাধিক সন্ত্রাসী শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। সে কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাস মোকাবেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সশস্ত্র অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ নিয়ে অতীতে বিস্তারিত লিখেছি বহুবার।

কিন্তু শান্তিচুক্তির পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে শান্তিবাহিনী ও জেএসএসের যেসকল নেতাকর্মী পূর্বের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যেই কাজ করে যাচ্ছে তাদের মোকাবেলার বিষয়টি আজ অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা, বর্তমান প্রেক্ষাপট গভীরভাবে বিবেচনা করে দেখলে এটা সহজেই প্রতিভাত হয়ে যে, শান্তিবাহিনী সশস্ত্র লড়াই করে যা অর্জন করতে পারেনি, শান্তিবাহিনীর সাবেক ও গুপ্ত সদস্যরা নিরস্ত্র লড়াই চালিয়ে তার চেয়ে ঢের বেশী অর্জন করেছে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সশস্ত্র লড়াইয়ের ঝুঁকি ও কষ্টকর জীবন পার্বত্য চট্টগ্রামের অভিজাত, শিক্ষিত ও নিরীহ উপজাতীয় সমাজে যতটা থাবা বিস্তার করতে পেরেছিল, নিরস্ত্র লড়াই তার থাবা সহজেই অনেক গভীরে বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে অফিস-আদালত, হাটে-মাঠে, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প বাণিজ্য, মিডিয়া প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে শান্তিবাহিনীর নিরস্ত্র অনুসারীরা জালের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। প্রত্যেকটি অবস্থানে থেকে এই নিরস্ত্র অনুসারীরা প্রকাশ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন এবং গোপনে স্বাধীনতার জন্য বা স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার জন্য অভিন্ন লক্ষ্যে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। তাই আজকের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সামনে, বাংলাদেশের ইন্টিলিজেন্স এজেন্সিগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই নিরস্ত্র ও গুপ্ত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মোকাবেলার উপায় বের করা।

আমরা জানি, রাষ্ট্রগঠনের মৌলিক উপাদান হচ্ছে জাতীয়তা বা জাতীয়তাবোধের চেতনা। এই জাতীয়তাবোধের চেতনা থেকেই দেশপ্রেমের জন্ম হয়। এই জাতীয়তাবোধের চেতনা বা দেশপ্রেমের কারণেই ১৯৪৭ সালে এই ভূখ-ের নাগরিকেরা ভারতে যোগ না দিয়ে পাকিস্তান নামে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন হয়েছে। ইতিহাস খুললে দেখতে পাই, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় সামন্ত সমাজের বড় অংশটিই ১৯৪৭ সালে এবং ১৯৭১ সালে এই জাতীয় চেতনার বিরোধিতা করে এ ভূখ-ে ভারত, মিয়ানমার ও পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করেছিল বা সমর্থন দিয়েছিল। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের একটি অংশ এখনো এই জাতীয় চেতনার বিরোধিতা করে চলেছে। তার প্রমাণ ১৯৪৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটি থেকে ভারতীয় পতাকা নামানোর দিনকে উপজাতীয় এ সকল জনগোষ্ঠীর একাংশ কর্তৃক ‘পাকিস্তান আগ্রাসন দিবস’ পালন করা, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনের নেতাদের স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস পালন না করা প্রভৃতি।

শুধু জাতীয় চেতনার সাথে অঙ্গীভূত না হওয়াই নয়, বরং পার্বত্য চট্টগ্রামে এই জাতীয় চেতনার বিরুদ্ধে চরম বিদ্বেষমূলক, প্রতিহিংসামূলক ও ঘৃণাত্মক প্রচারণা চলানো হচ্ছে প্রবলভাবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের নেতারা ও তাদের অনুসারীগণ ক্রমাগত বিভিন্নভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ঘৃণাত্মক, বিদ্বেষমূলক ও প্রতিহিংসাপরায়ণ প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এ অপপ্রচারণায় সরলপ্রাণ, সাধারণ ও নিরীহ পাহাড়ি তরুণরা বিভ্রান্ত হচ্ছে। এতে তাদের মনেও জন্ম নিচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি  ঘৃণা, বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসা। বাংলাদেশ রাষ্ট্র উপজাতীয়দের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান দিয়েছে বিশেষ কোটা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জন্যও দিয়েছে নানা প্রকার আর্থিক বিশেষ সুবিধা। এই কোটা ও আর্থিক সুবিধার আওতায় বড় হয়ে একটি পাহাড়ি তরুণের যেখানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অপার দেশপ্রেম প্রদর্শন করার কথা, বাস্তবে হচ্ছে তার উল্টো।

পাহাড়ি সংগঠনগুলোর হেট্রেইট ক্যাম্পেইনের শিকার হয়ে আজ পাহাড়ের ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি বিদ্বেষী তরুণ প্রজন্ম যাদের আনুগত্য বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি নয়, বরং জুম্মল্যান্ড নামক কল্পিত রাষ্ট্রের প্রতি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে পলাতক (পরে ভারতে আটক) ক্যাপ্টেন উদ্ভাস চাকমা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। উদ্ভাস চাকমা ইনফেন্ট্রি অফিসার হিসাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে গৌরবোজ্জ্বল ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ পেয়েছিল। পরে আর্টিলারি ও কমান্ডো অফিসারের কোর্সও করার সুযোগ পায় সে। এমন উন্নত ভবিষ্যতের হাতছানিও তাকে আটকে রাখতে পারেনি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে কল্পিত জুম্মরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী জুম্ম লিবারেশনর আর্মির প্রশিক্ষক হিসাবে যোগ দেয়ার জন্য ভারতে গমন করে। উদ্ভাস চাকমা শুধু একজন নয়, রাষ্টের বিভিন্ন সেক্টরে এমন অনেক উদ্ভাস চাকমা আছে যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে কল্পিত জুম্ম রাষ্ট্রের জন্য কাজ করে যাচ্ছে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের অপপ্রচারের প্রধান টার্গেট বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুনর্বাসিত বাঙালি। কারণও স্পষ্ট। কল্পিত জুম্ম রাষ্ট্রের পক্ষে এ দুটিই প্রধান বাধা। পাহাড়ি সন্ত্রাসী ও তাদের সমর্থকরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে এ দুটির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অপপ্রচার চালিয়ে আসছে।

এদের জন্য মঞ্চ, মিডিয়া, বই, জার্নাল, গবেষণা, বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থন, আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতা সবই রয়েছে। জাতীয় গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকদের একটি বড় অংশ সজ্ঞানে অথবা বিভ্রান্তির শিকার হয়ে এই রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় সমর্থন জুগিয়ে আসছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কথা অনেকেই জানেন। কাজেই জুম্মরাষ্ট্রের সমর্থকদের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থনের কারণও স্পষ্ট। বাংলাদেশের তথাকথিত নাগরিক সমাজের সমর্থনের কারণও একই। দেখা যায়, নাগরিক সমাজের নেতাকর্মী কোনো না কোনোভাবে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল বিভিন্ন দেশ ও সেসব দেশের এনজিও এবং দাতা সংস্থার সাথে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত বা উপকারভোগী। পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল রাজনীতিবিদদের জন্যও এ কথা সত্য। তবে এদের বেশিরভাগই আবার বামধারার রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সাথে বাম ধারার রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর নানা কারণে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সামগ্রিক এই সমর্থন, পৃষ্ঠপোষকতা, অপপ্রচারের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা গড়ে উঠতে পারেনি। সে কারণে রামপাল নিয়ে জাতীয়ভাবে যে আন্দোলন দেখেছি, পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধনী-২০১৬ এর বিরুদ্ধে তার ছিটেফোঁটাও পরিলক্ষিত হয়নি। অথচ গুরুত্ব বিচার করলে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন বাংলাদেশের এক-দশমাংশ  ভূখণ্ড পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এর জন্য কে দায়ী? দায়ী রাষ্ট্র, দায়ী সরকারসমূহ, দায়ী দেশপ্রেমিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলো। কেননা তারা কখনই পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে জাতীয় দৃষ্টিতে দেখেনি, জাতীয়ভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের গুরুত্ব, সমস্যা ও সম্ভাবনাকে তুলে ধরেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব এবং এ অঞ্চলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের বিষয়ে দেশবাসীকে সচেতন করেনি। সে কারণে সরকারের সাথে সাথে পার্বত্য নীতি পরিবর্তিত হয়েছে, এমনকি অফিসার পরিবর্তনের সাথে সাথেও এ নীতি পরিবর্তিত হতে দেখা যায়। অথচ প্রতিপক্ষ কিন্তু অর্ধ শতাব্দী ধরে একই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে এবং আজ তার সুফল পেতে শুরু করেছে।

একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। সকল ইতিহাস ও যুক্তি উপেক্ষা করে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ও নাগরিক সমাজে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ বলা হয়। এ নিয়ে কথা বলতে গেলে বলা হয়, ‘উপজাতি’ বললে তারা যদি অপমানিত বোধ করে এবং ‘আদিবাসী’ বললে তারা যদি সম্মানিত বোধ করে তাহলে সমস্যা কোথায়? কেউ কেউ এ নসিহতও করেন যে, বড় জাতি বাঙালিদের এতটুকু উদারতা দেখানো উচিত। অদ্ভুত এক সরল চিন্তা। কিন্তু ‘আদিবাসী’ উপমার আড়ালে যে ভয়াবহ রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের আন্তর্জাতিক ব্লু প্রিন্ট লুকায়িত রয়েছে, দেশের বেশিরভাগ মানুষই সে বিষয়ে অজ্ঞাত। কারণ রাষ্ট্র তাদের সচেতন করেনি।

রাষ্ট্র মিডিয়াকে দূষেছে, অথচ মিডিয়াকেও ডেকে, বুঝিয়ে বলা হয়নি, কেন ‘আদিবাসী’ থিওরিটি বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর এবং কতটা ক্ষতিকর। আমাদের পাঠ্যপুস্তকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে শুধু পড়ানো হয়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বছরের পর বছর একই সিলেবাস পড়তে পড়তে শিক্ষার্থীদের ধারণা জন্মে পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন শুধু পাহাড়িদের আবাসস্থল। ফলে বড় হয়ে তাদের ধারণা জন্মে বাঙালিদের ও সেনাবাহিনীকে সেখানে পাঠানো ভুল সিদ্ধান্ত। আমাদের সিলেবাসে ’৭১ সালের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনী ও সংগ্রামের কাহিনী পড়ানো হয় অথচ স্বাধীনতার পর দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পার্বত্য চট্টগ্রামে শত শত সেনাসদস্য অকাতরে প্রাণ দিয়েছে তাদের জীবনী পড়ানো হয় না। ফলে শহীদ লে. মুশফিক, ক্যাপ্টেন জসিমউদ্দীন, মেজর মহসিন রেজাদের আত্মত্যাগ আড়ালেই রয়ে গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ’৭১ শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে জেলায় জেলায়। অথচ স্বাধীনতার পর দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যারা শহীদ হয়েছেন তাদের নাম কোথাও প্রদর্শিত হয়নি। ফলে পর্যটকরা পার্বত্য চট্টগ্রামের সৌন্দর্য দেখে বিমোহিত হয়ে ফিরে আসেন, কিন্তু এই পার্বত্য চট্টগ্রামকে পর্যটনবান্ধব করে আজকের অবস্থায় আনতে যারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন তাদের কথা কেউ জানে না।

হলিউড বলিউডে রাষ্ট্রবিরোধীদের সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন লড়াইয়ের বিভিন্ন কাহিনী নিয়ে সিনেমা, নাটক তৈরি হয় কিন্তু বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর সংগ্রাম নিয়ে কোনো ডকুমেন্টারি ফিল্ম তৈরি হয়নি। বলিউডে কারগিল নিয়ে অনেক সিনেমা হয়েছে, সীমান্তে ফেলানীকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রেখে সিনেমা বানিয়েছে বজরঙ্গি ভাইজান। ওরা নিরাপত্তা বাহিনীর ত্যাগকে জাতীয়ভাবে গৌরবের উপাদান হিসাবে তুলে ধরছে কিন্তু বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম। বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সম্ভাবনা, ভৌগোলিক গুরুত্বের বিষয়টি পড়ানো হয় না। পড়ানো হয় না পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি ও নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থানের গুরুত্ব। ফলে আমরা চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বৈসাবি, কোমর তাঁত, দোচুয়ানী, বাঁশ নৃত্য, বোতল নৃত্য প্রভৃতি উপজাতীয় সম্প্রদায়ের নাম, খাদ্য, পোশাক ও সংস্কৃতির বাইরে আর কিছুই জানতে পারছি না।

দেখা যায়, আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিদর্শন করতে এলে তাকে যে সকল প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য দেয়া হয় তা একটি পক্ষের প্রতি পক্ষপাতদুষ্টু। এমনকি তিনি/তারা যাদের সাথে কথা বলেন, সেই নাগরিক সমাজের ব্যক্তিবর্গও বিশেষ পক্ষের প্রতি সহানুভূতিশীল। ফলে ঐ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি ফিরে গিয়ে যখন রিপোর্ট করেন তাও একদেশদর্শী হয়। এতে করে রাষ্ট্রের ভাবমর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়। রাষ্ট্র তখন ওই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিযোগ করে। কিন্তু বাস্তবতা কী? রাষ্ট্র কি তার কাছে নিরপেক্ষ তথ্য গবেষণা পৌঁছে দিয়েছে? নাকি রাষ্ট্রের এ ধরনের কোন ইন্সট্রুমেন্ট বা থিংক ট্যাংক আছে? বিষয়গুলো ভেবে দেখার দাবি রাখে।

তাই আজ সময় এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে জাতীয় সচেতনতা সৃষ্টির উপায় বের করা। একই সাথে এ অঞ্চল নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে যে বিভ্রান্তিকর, হিংসাত্মক, বিদ্বেষপ্রসূত ও ঘৃণাব্যঞ্জক প্রচারণা চালানো হচ্ছে তা মোকাবেলা করা। এই কাজটি খুব সহজ নয়। কেননা শান্তিচুক্তির আগে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা যখন অস্ত্র নিয়ে জঙ্গলে অবস্থান করছিলো তখন হয়তো তাদের অস্ত্র নিয়ে মোকাবেলা করা যেত। কিন্তু শান্তিবাহিনীর যে সাবেক সদস্য বা তাদের অনুসারী অফিসে, আদালতে, মিডিয়াতে, মঞ্চে, ময়দানে, এনজিওতে, আন্তর্জাতিক ফোরামে বসে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তাকে তো অস্ত্র দিয়ে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। তাকে মোকাবেলার জন্য তার ক্ষেত্রেই উপায় ও ইন্সট্রুমেন্ট তৈরি করতে হবে।

ফেসবুকসহ সামাজিক গণমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে যে ব্যক্তিটি সরকার ও দেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে তাকে আইসিটি অ্যাক্ট দিয়ে মোকাবেলা করে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়, মিথুন চাকমা তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। সামাজিক গণমাধ্যমের অপপ্রচার যেমন সামাজিক গণমাধ্যমেই কাউন্টার করে জবাব দিতে হবে। তেমনি মিডিয়া, বই, পুস্তক, গবেষণা, সেমিনারের জবাব আইন ও শাসন দিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। এগুলোর জবাবও মিডিয়া, বই, পুস্তক, জার্নাল, গবেষণা, তথ্য, উপাত্ত ও সেমিনার করেই দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় আজ নিরাপত্তা টহলের চেয়েও অপপ্রচারের মোকাবেলা (কাউন্টার ক্যাম্পেইনিং) অধিক গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ ফেসবুকের বিরুদ্ধে ফেসবুক, কলমের বিরুদ্ধে কলম, তথ্যের বিরুদ্ধে তথ্য, মিডিয়ার বিরুদ্ধে মিডিয়া, মঞ্চের বিরুদ্ধে মঞ্চ সৃষ্টি করতে হবে।

আগামী দিনের তরুণ ও যুবকেরা যেনো সন্ত্রাসবাদী, রাষ্ট্রবিরোধী ও তাদের অনুসারীদের খপ্পরে পড়ে রাষ্ট্রবিদ্বেষী না হয়ে পড়ে তা দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। তাদের প্রবলভাবে জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত করতে, দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারের উন্নয়ন ও ইতিবাচক পদক্ষেপগুলোর প্রতি পার্বত্যবাসীকে সচেতন ও আন্তরিক করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সাথে ১৬ কোটি মানুষকে দেশের এই এক দশমাংশ ভূখ-ের প্রতি ভালোবাসা, আগ্রহ, অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। এ কাজে কোনো গাফলতি, ধীরগতি কেবল জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অখ-তাকেই হুমকির মুখেই ফেলবে।
email: palash74@gmail.com


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

  1. ♦ বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা

  2.  পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারী সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা কাম্য

  3.  বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে

  4.  আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে সমস্যা কোথায়?

  5.  পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

  6.  একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

  7.  বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

  8.  আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

  9.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

  10.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

  11.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

  12.  শান্তিচুক্তির এক যুগ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

  13.  পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ গোষ্ঠির অতিআগ্রহ বন্ধ করতে হবে

  14.  হঠাৎ উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম: খতিয়ে দেখতে হবে এখনই

  15.  অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান সময়ের দাবী

  16.  পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর কি কাজ

  17.  রোহিঙ্গা ইস্যু : শেখ হাসিনা কি ইন্দিরা গান্ধী হতে পারেন না?




পার্বত্য চট্টগ্রাম তুমি কার?

%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%9a%e0%a6%9f%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ae

জি. মুনীর

পার্বত্য চট্টগ্রাম। দেশের মোট ভূখণ্ডের এক-দশমাংশ এই পার্বত্য চট্টগ্রাম। তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান নিয়ে গঠিত পার্বত্য এলাকা। এ তিন জেলায় ১৬ লাখ লোকের বসবাস। এদের ৫১ শতাংশ পাহাড়ি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও ৪৯ শতাংশ বাঙালি জনগোষ্ঠীর বসবাস এই পার্বত্য চট্টগ্রামে। বরাবরের অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম।

একপর্যায়ে এই অশান্ত পার্বত্য জনপদে শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে পাহাড়িদের শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি’ নামে এই চুক্তি সমধিক পরিচিত। এই চুক্তিতে পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পক্ষে স্বাক্ষর করেন প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ এই পার্বত্য এলাকার স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে বহু বছর ধরে ভারতের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সশস্ত্র আন্দোলন করে আসা জেএসএস তথা জনসংহতি সমিতির নেতা সন্তু লারমা। এ শান্তিচুক্তির ৭২টি দফার ৪৮টি ইতোমধ্যে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর পরও অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের এখন পর্যন্ত শান্তি ফিরে আসেনি, বরং সময়ের সাথে এই অশান্ত পরিবেশ আরো তীব্র আকার ধারণ করছে।

শান্তিচুক্তির সূচনায় অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন, কথিত এই শান্তিচুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। কারণ, দীর্ঘ ২২ বছর আগে করা এই শান্তিচুক্তি শুরুতেই মেনে নেয়নি সেখানকার তিনটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। বলা হয়, এ তিনটি গোষ্ঠীতে এখনো সক্রিয় রয়েছে প্রায় দুই হাজার সশস্ত্র সন্ত্রাসী। এরা সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় প্রতিষ্ঠা করতে চায় জুমল্যান্ড কিংবা স্বায়ত্তশাসিত সরকার। এই গোষ্ঠী তিনটি হচ্ছে- জনসংহতি সমিতি (জেএসএস- সন্তু), জনসংহতি সমিতি (সংস্কারবাদী) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)।

এ কথা সত্য, পার্বত্য চট্টগামে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে ভূমিবিরোধ একটি বড় সমস্যা। ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু করে এমনকি পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশ আমলের এই তিন জেলায় কোনো ভূমি জরিপ হয়নি। অথচ ভূমির মালিকানা নির্ধারণের আগে মোট জমির পরিমাণ নির্ধারণ জরুরি ছিল। তা ছাড়া পাহাড়িরা মনে করে, তারাই এই তিন পার্বত্য জেলার আদিবাসী। অতএব এ এলাকার ভূমির মালিক তারাই। আর বাঙালিরা সেখানে পাহাড়িদের ভূমি জবরদখল করে নিয়েছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলের বিভিন্ন সরকারের আমলে। কিন্তু পাহাড়িরা সেখানকার আদিবাসী, এ দাবির ঐতিহাসিক সত্যতা নেই। বাংলাদেশের কোনো সরকার পাহাড়িদের এই দাবি স্বীকার করে না।

এ ধরনের দাবির প্রেক্ষাপটে বাঙালিদের পার্বত্য তিন জেলা থেকে উচ্ছেদ করে তাদের জমিজমা পাহাড়িদের মধ্যে বণ্টন করার অযৌক্তিক দাবিও মেনে নেয়নি এবং মেনে নিতে পারে না যথার্থ কারণেই। বরং বাংলাদেশ সরকার চায় এই তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ি-বাঙালি একসাথে মিলেমিশে সেখানে বসবাস করুক। সেই লক্ষ্যেই ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত হয় শান্তিচুক্তি। এই চুক্তির ৪, ৫ ও ৬ ধারা অনুযায়ী ২০০১ সালের ১৭ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন পাস করা হয়। এই আইনের লক্ষ্য পূরণে গঠন করা হয় ‘পার্বত্য জেলাগুলোর ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন’।

আইন মতে, এই কমিশনের চেয়ারম্যান হবেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। কমিশনে থাকবেন আরো চারজন সদস্য : আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারমান অথবা তার পরিষদের মধ্য থেকে মনোনীত কোনো সদস্য, পদাধিকার বলে সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পদাধিকার বলে সংশ্লিষ্ট সার্কেলের সার্কেল চিফ এবং চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার অথবা তার মনোনীত একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার। সে অনুযায়ী একটি কমিশনও গঠন করা হয়। কিন্তু নানা কারণে এই কমিশন ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারেনি। ফলে সরকার নতুন করে গঠন করে এই কমিশন।

২০০৯ সালে সিদ্ধান্ত হয়, পার্বত্য জেলার ভূমি ব্যবস্থাপনা, জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় প্রশাসনে কমিশনের উপস্থাপিত বা দাখিলকৃত তথ্য-উপাত্ত প্রচলিত আইন বিবেচনায় পার্বত্য জেলাধীন পাহাড় ও পানিতে ভাসা জমিসহ সমুদয় ভূমি (প্রযোজ্য আইনের অধীনে অধিগ্রহণকৃত ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পকারখানা এবং সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমি ব্যতীত) মৌজাওয়ারি স্থানীয় জরিপকাজ পরিচালনার। ওই সময় সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে সার্কেল চিফ ও আঞ্চলিক পরিষদ প্রতিনিধি কমিশনের সভা বর্জন করে এবং পাশাপাশি আঞ্চলিক পরিষদ থেকে ২৩ দফা ও পরে সংশোধিত ১৩ দফা প্রস্তাব পাঠানো হয়।

এ দিকে পাহাড়িদের দাবির প্রেক্ষাপটে ২০১৬ সালের ১ জুলাই মন্ত্রিসভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের একটি সংশোধনী গেজেট আকারে পাস হয়ে একই বছরের ৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদে পাস হয়। এই সংশোধনীর ব্যাপারে পাহাড়িরা সন্তুষ্ট হলেও বাঙালিরা এ সংশোধনীতে নাখোশ। এ সংশোধনী অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে কমিশনের চেয়ারম্যান করে সংশ্লিষ্ট সার্কেল চিফ বা তার মনোনীত প্রতিনিধি, আঞ্চলিক পরিষদের চিফ বা তার মনোনীত প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, বিভাগীয় কমিশনার বা অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার নিয়ে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন নতুন করে পুনর্গঠন করা হয়েছে। এতে সার্কেল চিফ বা তার প্রতিনিধি, আঞ্চলিক পরিষদ প্রধান বা তার প্রতিনিধি, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বা তার প্রতিনিধিরা উপজাতীয় সদস্য হবেন। চেয়ারম্যান বা সদস্যসচিব সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে বাঙালি বা পাহাড়ি যে কেউ হতে পারেন।

কিন্তু লক্ষণীয়, যেখানে ভূমি বিরোধের বিষয়টিতে বাঙালিরা একটি পক্ষ, সেখানে এই কমিশনে বাঙালিদের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। এ ছাড়া কমিশনের বিচারিক আইনে উপজাতীয়দের সামাজিক আইনপ্রথা, রীতি ও পদ্ধতিকে নির্ধারণ করায়, তা বাঙালিদের বিরুদ্ধে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের, বিশেষ করে পুনর্বাসিত বাঙালিদের সরকারি খাস জমিতে পুনর্বাসিত করায় সেখানে উপজাতীয় সামাজিক রীতি গণ্য করা হয়নি। এতে বাঙালিদের পক্ষ থেকে সঠিক বিচার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে বাঙালিদের দাবি। অন্য দিকে কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ না থাকায়, এই কমিশনের আওতায় চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাঙালিরাই।

ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনী প্রশ্নে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি নেতাদের বক্তব্য হচ্ছে- সংশোধনীতে ৬(গ) ধারায় ‘ভূমি’র পরিবর্তে ‘যেকোনো ভূমি’ শব্দগুলো জুড়ে দেয়ায় তিন পার্বত্য জেলার যেকোনো ভূমি বা জমি পাহাড়িরা নিজের দাবি করে ভূমি কমিশনে আবেদন করতে পারবে। এর পর কমিশন বৈঠকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবাদে দাবি করা ভূমি উপজাতিদের নামে নামজারি করতে পারবে। এতে এক দিকে যেমন সরকারের এখতিয়ার খর্ব হবে, তেমনি তিন পার্বত্য জেলায় বাঙালিরা ভূমিহীন হতে বাধ্য হবে।

কারণ, কমিশনের গঠন কাঠামো অনুযায়ী ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন বরাবর হবে উপজাতি সংখ্যাগরিষ্ঠ। তা ছাড়া পার্বত্য ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের ‘ঘ’ অনুচ্ছেদের ৪-এ বলা হয়েছে- ‘গঠিত ভূমি কমিশন পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জায়গা-জমির বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তিসহ এযাবৎ যেসব ভূমি ও পাহাড় অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হয়েছে, সেসব পাহাড় ও জমির মালিকানার স্বত্ব বাতিলে পূর্ণ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। এখানে ভারত থেকে প্রত্যাগত ১২ হাজার ২২২টি উপজাতি পরিবারকে পুনর্বাসনের কথা বলা হয়েছে।

এসব প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিনিধিকে বলেন, উপজাতিদের দাবি অনুযায়ী সব দফা বাস্তবায়ন করা হলে পার্বত্যাঞ্চল আর বাংলাদেশের থাকবে না। কারণ, তাদের হাতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও বন বিভাগ চলে যাবে। এখান থেকে সব নিরাপত্তা সংস্থার লোকজন চলে যেতে হবে। এসি ল্যান্ড চলে যাবে। এসব যদি চলে যায়, দেশের এক-দশমাংশের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব থাকবে না। উপজাতি নেতারা সরকারের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করেছেন, যাতে এরা স্বায়ত্তশাসন পায়। কিন্তু ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির কোথাও স্বায়ত্তশাসনের কথাটি উল্লেখ পর্যন্ত নেই। অতএব উপজাতিদের স্বায়ত্তশাসনের দাবি অযৌক্তিক।

বাঙালি নেতারা আরো বলেন, মন্ত্রিসভা যে ছয়টি সংশোধনী প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন দেয়, সে সম্পর্কে পাহাড়ি ও বাঙালি কারো কোনো ধরণা নেই। পাহাড়িদের রীতিনীতি ও উল্লিখিত সংশোধনী মতে কাজ করলে, এই পার্বত্য জেলায় বসবাসকারী বাঙালিরা ভিটেমাটি-ছাড়া হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্য মতে, কার্যত ঘটছেও তাই। পত্রিকাটি জানিয়েছে- মুখের কথায় এখন পার্বত্য চট্টগ্রামে জমির মালিক বনে যাচ্ছে উপজাতিরা। আর সরকারি বরাদ্দ পেয়েও ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে বাঙালিরা। উপজাতিদের জমির মালিকানার স্বীকৃতি দিচ্ছেন সেখানকার কারবারি ও হেডম্যানরা। ফলে সরকারিভাবে বরাদ্দ পাওয়া জমি হারিয়ে ভূমিহীনে পরিণত হচ্ছে সেখানকার বাঙালিরা। নতুন করে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি আইন সংশোধন করে সেখানকার আঞ্চলিক প্রথা ও পদ্ধতি অনুযায়ী সেখানকার ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি করার বিধান করায় এ পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করেছে।

পার্বত্য তিন জেলা সরেজমিন ঘুরে এসে এই দৈনিকটি জানিয়েছে- পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির সিএস সার্ভে হয়নি। ওই এলাকার পুরো জমির মালিকানাই সরকারের। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে আশ্রয় নেয় এসব উপজাতি। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তাদেরকে সেখানে পুনর্বাসন করেন। তখন মুখের কথার মাধ্যমে বিভিন্ন জমি উপজাতিদের বসবাস ও চাষাবাদ করার জন্য দেয়া হয়েছিল।

আজ তাদের সেই জমির মালিকানার পক্ষে প্রমাণপত্রও দিচ্ছে সেখানকার কারবারি বা হেডম্যানরা। অপর দিকে সরকারের বরাদ্দ দেয়া জমি থেকে উচ্ছেদ করেছে উপজাতি সন্ত্রাসীরা। এরা এরই মধ্যে কোনো কোনো এলাকার বাঙালিদের বাড়ি ও জমি দখল করে নিয়েছে। এ ধরনের অনেক বাঙালি পরিবারকে সরকার গুচ্ছগ্রামে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেয়। যাদের জীবনযাপন চলে সরকারের দেয়া রেশনের ওপর নির্ভর করে।

আরেকটি জাতীয় দৈনিক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে- স্থানীয়দের দেয়া তথ্য মতে, ১৯৮১ সালে ৮৩২টি বাঙালি পরিবার পার্বত্য চট্টগ্রামে যায়। সরকারের তরফ থেকে প্রত্যেক পরিবারকে ৫ একর করে জায়গা দেয়া হয়। পরে উপজাতি সন্ত্রাসীদের হামলা ও ভয়ভীতিতে প্রায় সাড়ে ৩০০ পরিবার পালিয়ে যায়। এখন ৫০০ পরিবার বসবাস করছে সে এলাকায়। তারা বলেন, উপজাতিরা এখন যেভাবে প্রতিনিয়ত অত্যাচার করছে, তাতে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।

আরেকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর মতে, সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছে পাহাড়ি জনগণ। চাকরিজীবীদের মূল বেতনের ২ শতাংশ হারে চাঁদা চেয়ে সন্ত্রাসীরা চিঠি দিচ্ছে। প্রমাণস্বরূপ এই চিঠির একটি কপিও পত্রিকাটি প্রকাশ করেছে। সরেজমিন এই প্রতিবেদনে জানানো হয়- বাঙালি কিংবা উপজাতি সবাইকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিতে বাধ্য হয়। এমনকি কলা, মুরগি ও ডিম বিক্রি করলেও সেখান থেকে চাঁদা আদায় করছে সন্ত্রাসীরা। প্রকাশ্যে চিঠি দিয়ে চাকরিজীবীদের কাছ থেকেও চাঁদা আদায় করছে এরা। পুলিশ ও প্রশাসনের লোকজনের কাছে এসব চাঁদাবাজির ঘটনা সুস্পষ্ট হলেও এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না।

২০১৬ সালের ১৩ জুলাই বান্দরবান জেলার আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে ওই জেলার জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক পার্বত্য জেলাগুলোর সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির চিত্র প্রকাশ্যে তুলে ধরে বলেন, ‘এখানে তিনটি গ্রুপ চাঁদা সংগ্রহ করে : জেএসএস (সন্তু), জেএসএস (সংস্কার) ও ইউপিডিএফ। বাসপ্রতি জেএসএসকে (দুই গ্রুপ) বছরে পাঁচ হাজার টাকা ও ইউপিডিএফকে তিন হাজার টাকা করে দিতে হয়। ট্রাকপ্রতি প্রতি গ্রুপকে ছয় হাজার টাকা করে এবং চাঁদের গাড়ি তিন হাজার, দুই হাজার ও দেড় হাজার টাকা হারে, এভাবে প্রতি সেক্টরে এমনকি ক্ষুদ্র মাছ ব্যবসায়ীকেও চাঁদা দিতে হয়।

অপর দিকে গোয়েন্দা সূত্রে যেসব খবর আসছে, তা আরো উদ্বেগজনক। ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে তিন সশস্ত্র গ্রুপ। চলছে অবাধ চাঁদাবাজিও। এদের টার্গেট জুমল্যান্ড বা স্বায়ত্তশাসন। এদের কাছে তিন পার্বত্য জেলার মানুষ এখন রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছে। আর সরকার একের পর এক উপজাতিদের দাবি-দাওয়া মেনে নিচ্ছে। তাতে করে এই পার্বত্য তিন জেলার ওপর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ হারানোর উপক্রম হয়েছে। আমরা যদি এখন থেকে সচেতন পদক্ষেপ না নিই, তবে এক সময় দেশের এই এক-দশমাংশ ভূখণ্ড আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তখন কিছুই করার থাকবে না।

সূত্র: দৈনিক নয়াদিগন্ত




পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি নিয়ে যত কথা

%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%9c%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%b2-%e0%a6%ae%e0%a7%8b%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%a6-%e0%a6%86%e0%a6%b2

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)

গত ২ ডিসেম্বর ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির ১৯তম বর্ষপূতি। এদিন রাজধানীতে বেশ কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন অনুষ্ঠানে চুক্তির বাস্তবায়ন সম্পর্কে বক্তাদের কাছ থেকে কিছু মিশ্র, আবার কিছুটা বিপরীতমুখী কথাবার্তা ও মন্তব্য শোনা গেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পক্ষে চুক্তি স্বাক্ষরকারী জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা বলেছেন, সরকার প্রত্যাশা ও বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এনজিও ব্যবসায়রত দুয়েকজন আরও একটু বিপ্লবী কথাবার্তা বলেছেন। একজন বলেছেন, এই সরকারের চুক্তি বাস্তবায়নের কোনো রাজনৈতিক সদিচ্ছা নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামকে উপনিবেশ বানানোর পাঁয়তারা চলছে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে চুক্তির বেশিরভাগ ধারাই বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং বাকি অংশও দ্রুত বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চলছে।

প্রথমপক্ষের কথার মধ্যে উসকানিমূলক উচ্চারণ, অতিরঞ্জন এবং স্পষ্টত বাড়াবাড়ি লক্ষ্য করা যায়। আর সরকার পক্ষের অবাস্তবায়িত অংশের দ্রুত বাস্তবায়নের কথায় কতটুকু আস্থা রাখা যায় সে প্রশ্নটিও স্পষ্টভাবেই মানুষের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। কারণ, মানুষ মনে করে সরকার ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তিসংক্রান্ত আইনের সংশোধন এবং প্রয়োজনীয় বিধিমালা আরও দ্রুত করতে পারত। চুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং ১৫টির আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে বলে তথ্য বিবরণী থেকে জানা যায়।

তবে অসন্তোষের মূল জায়গা অর্থাৎ ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণেই মূলত বিতর্কের সৃষ্টি এবং পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আসছে। ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পূর্বের আইনটি ইতিমধ্যেই সংশোধন করা হয়েছে এবং তা পার্লামেন্টে পাস হয়ে গেছে। সংশোধিত আইনটি অধিকতর গণতান্ত্রিক এবং বাস্তবায়ানুগ হয়েছে বিধায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে বলে জানা গেছে। কিন্তু আইনের বিধিমালা না হওয়ায় ভূমি কমিশন এখনো কার্যক্রম শুরু করতে পারছে না। বিধিমালা দ্রুত প্রণয়ন করে সরকারকে সদিচ্ছার প্রমাণ রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত একটা প্যাগমেটিক ও ইউনিক শান্তিচুক্তি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অন্য কোনো দুরভিসন্ধির কবলে যাতে না পড়ে সে জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

এ কথা সবাই জানেন বাংলাদেশের একটি বড় রাজনৈতিক পক্ষ এই চুক্তির বাস্তবায়ন চায় না। শুধু চায় না বললে কম বলা হবে, তারা অপকৌশলে এই চুক্তি যাতে ব্যর্থ হয় সে প্রচেষ্টাই চালাচ্ছে। তাছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্তিকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি বহু সুবিধাভোগী এনজিও এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছে, যারা নিজেদের এনজিও ব্যবসা অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য চুক্তির বাস্তবায়ন ঝুলন্ত অবস্থায় রাখতে চায়। কারণ, চুক্তি পরিপূর্ণ বাস্তবায়িত হলে অনেকেরই এনজিও ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হবে এবং মোটা অঙ্কের মাসোয়ারা আর পাওয়া যাবে না।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বের ভূরাজনৈতিক দুরভিসন্ধি এখন আর কারও অজানা নয়। পূর্বতিমুর এবং দক্ষিণ সুদানের কথা আমাদের সদা স্মরণে রাখতে হবে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ২১ বছরের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত এবং রক্তক্ষরণের অবসান ঘটে। শুধু তাই নয়, ছোট রাষ্ট্র বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে সব ধরনের হুমকি ও আশঙ্কা থেকে আমরা মুক্ত হই। এটা বাংলাদেশের জন্য বিশাল অর্জন। ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মাত্র দেড় বছরের মাথায় এত বড় একটা জাতীয় প্রাণঘাতী সমস্যার সমাধান, তাও আবার অন্য কোনো তৃতীয়পক্ষের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া, এটা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল উদাহরণ।

তাছাড়া শেখ হাসিনা সবেমাত্র প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার জন্য এটা ছিল বিরাট অগ্নিপরীক্ষা। তবে বাবা বঙ্গবন্ধুর মতো দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসার শক্তির বলেই শেখ হাসিনা এতবড় রাজনৈতিক সাহস দেখাতে পেরেছেন বলে মানুষ মনে করে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দুয়েকটি সশস্ত্র বিদ্রোহের ইতিহাস ও তার পরিণতির দিকে তাকালে বোঝা যায় কী অসাধ্য শেখ হাসিনা সাধন করেছেন। বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সশস্ত্র সংগ্রামেরত বিদ্রোহী সংগঠনের নাম দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার ফার্ক, অর্থাৎ রেভিউলুশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়া।

দীর্ঘ ৬০ বছর পর এই সবেমাত্র ২০১৬ সালে এসে কিউবার মধ্যস্থতায় গত ২৫ আগস্ট প্রথমবার তারা কলম্বিয়ান সরকারের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে। কিন্তু সরকার চুক্তিটিকে গণভোটে দিলে কলম্বিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভোটে তা বাতিল হয়ে যায়। দ্বিতীয়বার পুনরায় গত ২৪ নভেম্বর উভয়পক্ষের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এবার আর গণভোটে না দিয়ে পার্লামেন্ট থেকে অনুমোদন নিয়ে কলম্বিয়ান সরকার সেটি চূড়ান্ত করেছে। চুক্তির বাস্তবায়ন এখনো শুরু হয়নি।

তবে এর স্থায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্লেষকদের যথেষ্ট রিজার্ভেশন রয়েছে। আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কার কথা আমরা জানি। ১৯৭৫ সালে জন্ম হয় এলটিটিই নামের সশস্ত্র সংগঠনের, যার পূর্ণ নাম লিবারেশন অব তামিল টাইগারস ইলাম। শ্রীলঙ্কার উত্তর-পূর্ব তামিল জাতিগত মানুষের অধ্যুষিত অঞ্চলকে স্বাধীন করার উদ্দেশ্যে এলটিটিই পুরাদমে সশস্ত্র অভিযান শুরু করে ১৯৮৩ সালে। বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতায় এলটিটিই এবং শ্রীলঙ্কা সরকারের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা ব্যর্থ হয়, কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব হয় না। তারপর ২০০৯ সালে এসে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী একতরফা সর্বাত্মক সেনা অভিযান চালায়।

তাতে ব্যাপক সংখ্যক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির মধ্য দিয়ে এলটিটিইর পরাজয় ঘটে এবং আপাতত শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের অবসান হয়। কিন্তু বিশ্বের সব অঙ্গন থেকে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের সিরিয়াস অভিযোগ ওঠে এবং সেখানে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করেছে বলে বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থা থেকে দাবি উত্থাপন করা হচ্ছে। তাছাড়া বিদ্রোহ যে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

তাই বিশ্বের অন্যান্য স্থানের সশস্ত্র বিদ্রোহের সমাধান ও মীমাংসার সঙ্গে তুলনা করলে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরের শান্তিচুক্তি বাংলাদেশের জন্য অসাধারণ সাফল্য। এই চুক্তির গুরুত্ব এবং অনন্যতার জন্যই শেখ হাসিনা ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কার পান। চুক্তি যারা বাস্তবায়ন করবেন এবং এ বিষয়ে যারা উচ্চবাচ্য করেন তাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে কোনো চুক্তিই রাষ্ট্রের সব পক্ষকে সন্তুষ্ট করতে পারে না।

১৯৭৮ সালে মিসর-ইসরায়েল ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি স্বাক্ষর করার ফলে মিসর ১১ বছর পর সম্পূর্ণ সিনাই অঞ্চল আবার ফেরত পায়। মিসরের জন্য এটা ছিল বিরাট অর্জন। মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এবং ইসরায়েল প্রধানমন্ত্রী বেগিন ১৯৭৮ সালে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। কিন্তু ১৯৮১ সালে চুক্তিবিরোধী একজন চরমপন্থির গুলিতে আনোয়ার সাদাত নিহত হন। প্রায় একই রকম ঘটনা ঘটে ১৯৯৩ সালে পিএলও এবং ইসরায়েলের মধ্যে অসলো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর। চুক্তি স্বাক্ষরকারী ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরায়েল প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইমন পেয়ারস, তিনজন সম্মিলিতভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।

১৯৯৫ সালে চুক্তিবিরোধী একজন চরমপন্থি ইহুদির গুলিতে আইজ্যাক রবিন নিহত হন। সবাইকে ইতিহাস এবং সমসাময়িক ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। চুক্তির দ্রুত বাস্তবায়ন আবশ্যক। দিন যত যাবে ততই আরও বহুরকম স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সৃষ্টি হবে। চুক্তির ১৯ বছরের মাথায় এসে বলা যায় সমঅধিকার নিশ্চিত করার জন্য এবং পিছিয়ে পড়া জায়গা থেকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে উপরে তোলার জন্য সরকার যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশাসনিক সুবিধা তৃণমূল পর্যন্ত বর্ধিতকরণসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক সুযোগ ও সম্প্রসারণ সম্ভব হয়েছে শান্তিচুক্তির ফলে।

১৯ বছর আগের পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং বর্তমানের পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে পার্থক্য সহজেই সবারই চোখে ধরা পড়ে। তাই ভূমি সমস্যার মতো একটা অত্যাবশ্যকীয় এবং চুক্তির জটিল অংশ বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় সমাধানের পথকে আরও পিচ্ছিল করে দিতে পারে, এমন উসকানিমূলক কথাবার্তা থেকে সবারই বিরত থাকা উচিত। ১৯৭৬ সালে সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এমন অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোকে উল্টিয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনার বাস্তবসম্মত কোনো পথ এখন আর খোলা নেই। কয়েক লাখ বাঙালি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করছে।

প্রথমদিকে এটি যেভাবে ঘটেছে তা সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের পথ পরিক্রমায় এটা এখন কঠিন বাস্তবতা। এই বাঙালিদেরও মানবাধিকার রয়েছে এবং সমঅধিকার পাওয়ার হক আছে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে বাস্তবতা এবং চুক্তির মূল স্পিরিট পাহাড়ি-বাঙালি সবারই সমঅধিকারের বিষয়টিকে প্রধান বিবেচ্য ধরে অ্যাকোমোডেটিভ ও ইনক্লুুসিভ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিতে হবে। কোনো পক্ষকেই একটা খুঁটির ওপর হাত রেখে গো ধরে বসে থাকলে চলবে না।

ভূমির অধিকার প্রশ্নে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী অবশ্যই অগ্রাধিকার পাবেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের উচিত হবে সংশোধিত ভূমি কমিশন আইন অনুসারে দ্রুত বিধিমালা তৈরি করা এবং ভূমি কমিশনকে কার্যকর করা। ভূমি সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে বাকি যা থাকে তাতে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে আর কেউ পানি ঘোলা করতে পারবে না। একটা চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ১৯ বছর অবশ্যই দীর্ঘ সময়। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের বাস্তবতা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশি-বিদেশি চক্রের ষড়যন্ত্রের কথাও ভুলে গেলে চলবে না। সব পক্ষ ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিলে শান্তিচুক্তির আগামী বর্ষপূর্তিতে সব পক্ষ একমঞ্চে বসে তা পালন করতে পারবে।

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

sikder52@gmail.com, নিউ অরলিনস, ইউএসএ

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন