পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নীতি-কৌশলের পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ

গত ডিসেম্বর ও চলতি জানুয়ারি মাসে দেশের বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে ধারাবাহিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এ সকল পত্রিকার রিপোর্টার ও সিনিয়র সাংবাদিকগণের সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে লেখা এসব সরেজমিন প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রামের উদ্বেগজনক পরিস্থিতির চিত্র ফুটে উঠেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কিত খবরের নিয়মিত পাঠক হিসাবে বলতে পারি, বাংলাদেশের বেশিরভাগ জাতীয় দৈনিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখালেখির একটি কমন ট্রেন্ড রয়েছে। এই ট্রেন্ডের টার্গেট থাকে পুনর্বাসিত বাঙালি ও সেনাবাহিনী। পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল অশান্তি ও অস্থিরতার জন্য এদেরকে দায়ী করা হয় এবং আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সশস্ত্র শাখার সন্ত্রাসী তৎপরতাকে সযত্মে আড়াল করা হয়। কিন্তু এবারের প্রতিবেদনগুলোতে সেই ট্রেন্ড ছিল না। রিপোর্টারগণ সরেজমিন পরিদর্শন করে খোলা চোখে যা দেখেছেন তাই লিখেছেন। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃত এবং লুকানো বাস্তবতা উঠে এসেছে এই রিপোর্টগুলোতে। এতে সারাদেশের মানুষের মনে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃত চিত্রের উপর কিছুটা হলেও ধারণা তৈরি হয়েছে। এর ইতিবাচক ফলও পাওয়া গেছে।

গত ৯ জানুয়ারি সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ২১তম বৈঠক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তৎপরতা বাড়াতে সুপারিশ করা। একই সাথে সকল রাজনৈতিক শক্তিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে কমিটির পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়। প্রকৃতপক্ষে এটি ইতিবাচক রিপোর্টের সুফল।

স্বাধীন বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের কালপঞ্জীকে আমরা মোটামুটি তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারি। সত্তরের দশকে জেএসএস ও শান্তিবাহিনীর প্রতিষ্ঠা, আশির দশকে বাঙালি পুনর্বাসন এবং ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি।  ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। শুধু রাজনীতি নয়; নিরাপত্তা, উন্নয়নসহ জনজীবনের সকল ক্ষেত্রেই এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ও দিকবদল। শান্তিচুক্তির পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় সন্ত্রাসী ও নিরাপত্তা বাহিনী পরস্পর মুখোমুখি ও শত্রুতাপূর্ণ অবস্থানে ছিল। শান্তিবাহিনী যেখানে পেরেছে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের উপর অতর্কিত বা পরিকল্পিত হামলা পরিচালনা করেছে। নিরাপত্তা বাহিনীগুলোও হামলা চালিয়ে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত শান্তিবাহিনীর আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তাদের আটক করেছে।

শান্তিচুক্তির পর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের একটি অংশ অস্ত্র জমা দিয়ে সাধারণ ক্ষমার আওতায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। শুধু ফিরে আসাই নয়, শান্তিচুক্তির পুনর্বাসনের আওতায় জেএসএস ও শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসীরা অতিদ্রুতই মন্ত্রী-এমপিসহ বিভিন্ন পদমর্যাদায় সরকারি পদে আসীন হয়। ফলে কিছুদিন আগেও যে সন্ত্রাসী হিসাবে রাষ্ট্রের ও সেই সুবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর শত্রু ছিল, চুক্তির বছরখানেকের মধ্যেই তারা একই অফিসের বস বা সহকর্মীদের পরিণত হয়। অনেকেই আবার রাষ্ট্র প্রদত্ত বিভিন্ন সুবিধার আওতায় ব্যবসা বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ভাবে বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়।

তবে একথা সকলেই জানেন যে, পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের একটি বড় অংশ শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করে অস্ত্র সমর্পণ না করে রাষ্ট্রবিরোধী সশস্ত্র তৎপরতায় লিপ্ত থাকে। শান্তিচুক্তির দুই দশক পরেও এই তৎপরতা স্তিমিত না হয়ে ক্রমাগত বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। এদের নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে নিরাপত্তা বাহিনীগুলো নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিগত ২ বছরে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশংসনীয় অর্জন রয়েছে। বিশেষ করে সাজেক, বাঘাইছড়ি, দিঘীনালা, মহালছড়ি, রাঙামাটি ও রুমাতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন পরিচালনা করে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছে। অন্যদিকে আলীকদমে আলোচনার মাধ্যমে অর্ধশতাধিক সন্ত্রাসী শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। সে কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাস মোকাবেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সশস্ত্র অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ নিয়ে অতীতে বিস্তারিত লিখেছি বহুবার।

কিন্তু শান্তিচুক্তির পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে শান্তিবাহিনী ও জেএসএসের যেসকল নেতাকর্মী পূর্বের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যেই কাজ করে যাচ্ছে তাদের মোকাবেলার বিষয়টি আজ অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা, বর্তমান প্রেক্ষাপট গভীরভাবে বিবেচনা করে দেখলে এটা সহজেই প্রতিভাত হয়ে যে, শান্তিবাহিনী সশস্ত্র লড়াই করে যা অর্জন করতে পারেনি, শান্তিবাহিনীর সাবেক ও গুপ্ত সদস্যরা নিরস্ত্র লড়াই চালিয়ে তার চেয়ে ঢের বেশী অর্জন করেছে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সশস্ত্র লড়াইয়ের ঝুঁকি ও কষ্টকর জীবন পার্বত্য চট্টগ্রামের অভিজাত, শিক্ষিত ও নিরীহ উপজাতীয় সমাজে যতটা থাবা বিস্তার করতে পেরেছিল, নিরস্ত্র লড়াই তার থাবা সহজেই অনেক গভীরে বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে অফিস-আদালত, হাটে-মাঠে, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প বাণিজ্য, মিডিয়া প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে শান্তিবাহিনীর নিরস্ত্র অনুসারীরা জালের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। প্রত্যেকটি অবস্থানে থেকে এই নিরস্ত্র অনুসারীরা প্রকাশ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন এবং গোপনে স্বাধীনতার জন্য বা স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার জন্য অভিন্ন লক্ষ্যে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। তাই আজকের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সামনে, বাংলাদেশের ইন্টিলিজেন্স এজেন্সিগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই নিরস্ত্র ও গুপ্ত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মোকাবেলার উপায় বের করা।

আমরা জানি, রাষ্ট্রগঠনের মৌলিক উপাদান হচ্ছে জাতীয়তা বা জাতীয়তাবোধের চেতনা। এই জাতীয়তাবোধের চেতনা থেকেই দেশপ্রেমের জন্ম হয়। এই জাতীয়তাবোধের চেতনা বা দেশপ্রেমের কারণেই ১৯৪৭ সালে এই ভূখ-ের নাগরিকেরা ভারতে যোগ না দিয়ে পাকিস্তান নামে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন হয়েছে। ইতিহাস খুললে দেখতে পাই, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় সামন্ত সমাজের বড় অংশটিই ১৯৪৭ সালে এবং ১৯৭১ সালে এই জাতীয় চেতনার বিরোধিতা করে এ ভূখ-ে ভারত, মিয়ানমার ও পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করেছিল বা সমর্থন দিয়েছিল। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের একটি অংশ এখনো এই জাতীয় চেতনার বিরোধিতা করে চলেছে। তার প্রমাণ ১৯৪৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটি থেকে ভারতীয় পতাকা নামানোর দিনকে উপজাতীয় এ সকল জনগোষ্ঠীর একাংশ কর্তৃক ‘পাকিস্তান আগ্রাসন দিবস’ পালন করা, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনের নেতাদের স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস পালন না করা প্রভৃতি।

শুধু জাতীয় চেতনার সাথে অঙ্গীভূত না হওয়াই নয়, বরং পার্বত্য চট্টগ্রামে এই জাতীয় চেতনার বিরুদ্ধে চরম বিদ্বেষমূলক, প্রতিহিংসামূলক ও ঘৃণাত্মক প্রচারণা চলানো হচ্ছে প্রবলভাবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের নেতারা ও তাদের অনুসারীগণ ক্রমাগত বিভিন্নভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ঘৃণাত্মক, বিদ্বেষমূলক ও প্রতিহিংসাপরায়ণ প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এ অপপ্রচারণায় সরলপ্রাণ, সাধারণ ও নিরীহ পাহাড়ি তরুণরা বিভ্রান্ত হচ্ছে। এতে তাদের মনেও জন্ম নিচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি  ঘৃণা, বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসা। বাংলাদেশ রাষ্ট্র উপজাতীয়দের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান দিয়েছে বিশেষ কোটা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জন্যও দিয়েছে নানা প্রকার আর্থিক বিশেষ সুবিধা। এই কোটা ও আর্থিক সুবিধার আওতায় বড় হয়ে একটি পাহাড়ি তরুণের যেখানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অপার দেশপ্রেম প্রদর্শন করার কথা, বাস্তবে হচ্ছে তার উল্টো।

পাহাড়ি সংগঠনগুলোর হেট্রেইট ক্যাম্পেইনের শিকার হয়ে আজ পাহাড়ের ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি বিদ্বেষী তরুণ প্রজন্ম যাদের আনুগত্য বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি নয়, বরং জুম্মল্যান্ড নামক কল্পিত রাষ্ট্রের প্রতি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে পলাতক (পরে ভারতে আটক) ক্যাপ্টেন উদ্ভাস চাকমা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। উদ্ভাস চাকমা ইনফেন্ট্রি অফিসার হিসাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে গৌরবোজ্জ্বল ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ পেয়েছিল। পরে আর্টিলারি ও কমান্ডো অফিসারের কোর্সও করার সুযোগ পায় সে। এমন উন্নত ভবিষ্যতের হাতছানিও তাকে আটকে রাখতে পারেনি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে কল্পিত জুম্মরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী জুম্ম লিবারেশনর আর্মির প্রশিক্ষক হিসাবে যোগ দেয়ার জন্য ভারতে গমন করে। উদ্ভাস চাকমা শুধু একজন নয়, রাষ্টের বিভিন্ন সেক্টরে এমন অনেক উদ্ভাস চাকমা আছে যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে কল্পিত জুম্ম রাষ্ট্রের জন্য কাজ করে যাচ্ছে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের অপপ্রচারের প্রধান টার্গেট বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুনর্বাসিত বাঙালি। কারণও স্পষ্ট। কল্পিত জুম্ম রাষ্ট্রের পক্ষে এ দুটিই প্রধান বাধা। পাহাড়ি সন্ত্রাসী ও তাদের সমর্থকরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে এ দুটির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অপপ্রচার চালিয়ে আসছে।

এদের জন্য মঞ্চ, মিডিয়া, বই, জার্নাল, গবেষণা, বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থন, আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতা সবই রয়েছে। জাতীয় গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকদের একটি বড় অংশ সজ্ঞানে অথবা বিভ্রান্তির শিকার হয়ে এই রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় সমর্থন জুগিয়ে আসছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কথা অনেকেই জানেন। কাজেই জুম্মরাষ্ট্রের সমর্থকদের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থনের কারণও স্পষ্ট। বাংলাদেশের তথাকথিত নাগরিক সমাজের সমর্থনের কারণও একই। দেখা যায়, নাগরিক সমাজের নেতাকর্মী কোনো না কোনোভাবে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল বিভিন্ন দেশ ও সেসব দেশের এনজিও এবং দাতা সংস্থার সাথে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত বা উপকারভোগী। পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল রাজনীতিবিদদের জন্যও এ কথা সত্য। তবে এদের বেশিরভাগই আবার বামধারার রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সাথে বাম ধারার রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর নানা কারণে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সামগ্রিক এই সমর্থন, পৃষ্ঠপোষকতা, অপপ্রচারের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা গড়ে উঠতে পারেনি। সে কারণে রামপাল নিয়ে জাতীয়ভাবে যে আন্দোলন দেখেছি, পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধনী-২০১৬ এর বিরুদ্ধে তার ছিটেফোঁটাও পরিলক্ষিত হয়নি। অথচ গুরুত্ব বিচার করলে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন বাংলাদেশের এক-দশমাংশ  ভূখণ্ড পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এর জন্য কে দায়ী? দায়ী রাষ্ট্র, দায়ী সরকারসমূহ, দায়ী দেশপ্রেমিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলো। কেননা তারা কখনই পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে জাতীয় দৃষ্টিতে দেখেনি, জাতীয়ভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের গুরুত্ব, সমস্যা ও সম্ভাবনাকে তুলে ধরেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব এবং এ অঞ্চলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের বিষয়ে দেশবাসীকে সচেতন করেনি। সে কারণে সরকারের সাথে সাথে পার্বত্য নীতি পরিবর্তিত হয়েছে, এমনকি অফিসার পরিবর্তনের সাথে সাথেও এ নীতি পরিবর্তিত হতে দেখা যায়। অথচ প্রতিপক্ষ কিন্তু অর্ধ শতাব্দী ধরে একই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে এবং আজ তার সুফল পেতে শুরু করেছে।

একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। সকল ইতিহাস ও যুক্তি উপেক্ষা করে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ও নাগরিক সমাজে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ বলা হয়। এ নিয়ে কথা বলতে গেলে বলা হয়, ‘উপজাতি’ বললে তারা যদি অপমানিত বোধ করে এবং ‘আদিবাসী’ বললে তারা যদি সম্মানিত বোধ করে তাহলে সমস্যা কোথায়? কেউ কেউ এ নসিহতও করেন যে, বড় জাতি বাঙালিদের এতটুকু উদারতা দেখানো উচিত। অদ্ভুত এক সরল চিন্তা। কিন্তু ‘আদিবাসী’ উপমার আড়ালে যে ভয়াবহ রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের আন্তর্জাতিক ব্লু প্রিন্ট লুকায়িত রয়েছে, দেশের বেশিরভাগ মানুষই সে বিষয়ে অজ্ঞাত। কারণ রাষ্ট্র তাদের সচেতন করেনি।

রাষ্ট্র মিডিয়াকে দূষেছে, অথচ মিডিয়াকেও ডেকে, বুঝিয়ে বলা হয়নি, কেন ‘আদিবাসী’ থিওরিটি বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর এবং কতটা ক্ষতিকর। আমাদের পাঠ্যপুস্তকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে শুধু পড়ানো হয়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বছরের পর বছর একই সিলেবাস পড়তে পড়তে শিক্ষার্থীদের ধারণা জন্মে পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন শুধু পাহাড়িদের আবাসস্থল। ফলে বড় হয়ে তাদের ধারণা জন্মে বাঙালিদের ও সেনাবাহিনীকে সেখানে পাঠানো ভুল সিদ্ধান্ত। আমাদের সিলেবাসে ’৭১ সালের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনী ও সংগ্রামের কাহিনী পড়ানো হয় অথচ স্বাধীনতার পর দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পার্বত্য চট্টগ্রামে শত শত সেনাসদস্য অকাতরে প্রাণ দিয়েছে তাদের জীবনী পড়ানো হয় না। ফলে শহীদ লে. মুশফিক, ক্যাপ্টেন জসিমউদ্দীন, মেজর মহসিন রেজাদের আত্মত্যাগ আড়ালেই রয়ে গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ’৭১ শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে জেলায় জেলায়। অথচ স্বাধীনতার পর দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যারা শহীদ হয়েছেন তাদের নাম কোথাও প্রদর্শিত হয়নি। ফলে পর্যটকরা পার্বত্য চট্টগ্রামের সৌন্দর্য দেখে বিমোহিত হয়ে ফিরে আসেন, কিন্তু এই পার্বত্য চট্টগ্রামকে পর্যটনবান্ধব করে আজকের অবস্থায় আনতে যারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন তাদের কথা কেউ জানে না।

হলিউড বলিউডে রাষ্ট্রবিরোধীদের সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন লড়াইয়ের বিভিন্ন কাহিনী নিয়ে সিনেমা, নাটক তৈরি হয় কিন্তু বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর সংগ্রাম নিয়ে কোনো ডকুমেন্টারি ফিল্ম তৈরি হয়নি। বলিউডে কারগিল নিয়ে অনেক সিনেমা হয়েছে, সীমান্তে ফেলানীকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রেখে সিনেমা বানিয়েছে বজরঙ্গি ভাইজান। ওরা নিরাপত্তা বাহিনীর ত্যাগকে জাতীয়ভাবে গৌরবের উপাদান হিসাবে তুলে ধরছে কিন্তু বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম। বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সম্ভাবনা, ভৌগোলিক গুরুত্বের বিষয়টি পড়ানো হয় না। পড়ানো হয় না পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি ও নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থানের গুরুত্ব। ফলে আমরা চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বৈসাবি, কোমর তাঁত, দোচুয়ানী, বাঁশ নৃত্য, বোতল নৃত্য প্রভৃতি উপজাতীয় সম্প্রদায়ের নাম, খাদ্য, পোশাক ও সংস্কৃতির বাইরে আর কিছুই জানতে পারছি না।

দেখা যায়, আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিদর্শন করতে এলে তাকে যে সকল প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য দেয়া হয় তা একটি পক্ষের প্রতি পক্ষপাতদুষ্টু। এমনকি তিনি/তারা যাদের সাথে কথা বলেন, সেই নাগরিক সমাজের ব্যক্তিবর্গও বিশেষ পক্ষের প্রতি সহানুভূতিশীল। ফলে ঐ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি ফিরে গিয়ে যখন রিপোর্ট করেন তাও একদেশদর্শী হয়। এতে করে রাষ্ট্রের ভাবমর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়। রাষ্ট্র তখন ওই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিযোগ করে। কিন্তু বাস্তবতা কী? রাষ্ট্র কি তার কাছে নিরপেক্ষ তথ্য গবেষণা পৌঁছে দিয়েছে? নাকি রাষ্ট্রের এ ধরনের কোন ইন্সট্রুমেন্ট বা থিংক ট্যাংক আছে? বিষয়গুলো ভেবে দেখার দাবি রাখে।

তাই আজ সময় এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে জাতীয় সচেতনতা সৃষ্টির উপায় বের করা। একই সাথে এ অঞ্চল নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে যে বিভ্রান্তিকর, হিংসাত্মক, বিদ্বেষপ্রসূত ও ঘৃণাব্যঞ্জক প্রচারণা চালানো হচ্ছে তা মোকাবেলা করা। এই কাজটি খুব সহজ নয়। কেননা শান্তিচুক্তির আগে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা যখন অস্ত্র নিয়ে জঙ্গলে অবস্থান করছিলো তখন হয়তো তাদের অস্ত্র নিয়ে মোকাবেলা করা যেত। কিন্তু শান্তিবাহিনীর যে সাবেক সদস্য বা তাদের অনুসারী অফিসে, আদালতে, মিডিয়াতে, মঞ্চে, ময়দানে, এনজিওতে, আন্তর্জাতিক ফোরামে বসে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তাকে তো অস্ত্র দিয়ে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। তাকে মোকাবেলার জন্য তার ক্ষেত্রেই উপায় ও ইন্সট্রুমেন্ট তৈরি করতে হবে।

ফেসবুকসহ সামাজিক গণমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে যে ব্যক্তিটি সরকার ও দেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে তাকে আইসিটি অ্যাক্ট দিয়ে মোকাবেলা করে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়, মিথুন চাকমা তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। সামাজিক গণমাধ্যমের অপপ্রচার যেমন সামাজিক গণমাধ্যমেই কাউন্টার করে জবাব দিতে হবে। তেমনি মিডিয়া, বই, পুস্তক, গবেষণা, সেমিনারের জবাব আইন ও শাসন দিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। এগুলোর জবাবও মিডিয়া, বই, পুস্তক, জার্নাল, গবেষণা, তথ্য, উপাত্ত ও সেমিনার করেই দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় আজ নিরাপত্তা টহলের চেয়েও অপপ্রচারের মোকাবেলা (কাউন্টার ক্যাম্পেইনিং) অধিক গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ ফেসবুকের বিরুদ্ধে ফেসবুক, কলমের বিরুদ্ধে কলম, তথ্যের বিরুদ্ধে তথ্য, মিডিয়ার বিরুদ্ধে মিডিয়া, মঞ্চের বিরুদ্ধে মঞ্চ সৃষ্টি করতে হবে।

আগামী দিনের তরুণ ও যুবকেরা যেনো সন্ত্রাসবাদী, রাষ্ট্রবিরোধী ও তাদের অনুসারীদের খপ্পরে পড়ে রাষ্ট্রবিদ্বেষী না হয়ে পড়ে তা দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। তাদের প্রবলভাবে জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত করতে, দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারের উন্নয়ন ও ইতিবাচক পদক্ষেপগুলোর প্রতি পার্বত্যবাসীকে সচেতন ও আন্তরিক করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সাথে ১৬ কোটি মানুষকে দেশের এই এক দশমাংশ ভূখ-ের প্রতি ভালোবাসা, আগ্রহ, অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। এ কাজে কোনো গাফলতি, ধীরগতি কেবল জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অখ-তাকেই হুমকির মুখেই ফেলবে।
email: palash74@gmail.com


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

  1. ♦ বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা

  2.  পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারী সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা কাম্য

  3.  বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে

  4.  আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে সমস্যা কোথায়?

  5.  পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

  6.  একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

  7.  বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

  8.  আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

  9.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

  10.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

  11.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

  12.  শান্তিচুক্তির এক যুগ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

  13.  পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ গোষ্ঠির অতিআগ্রহ বন্ধ করতে হবে

  14.  হঠাৎ উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম: খতিয়ে দেখতে হবে এখনই

  15.  অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান সময়ের দাবী

  16.  পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর কি কাজ

  17.  রোহিঙ্গা ইস্যু : শেখ হাসিনা কি ইন্দিরা গান্ধী হতে পারেন না?




পার্বত্য চট্টগ্রাম তুমি কার?

%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%9a%e0%a6%9f%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ae

জি. মুনীর

পার্বত্য চট্টগ্রাম। দেশের মোট ভূখণ্ডের এক-দশমাংশ এই পার্বত্য চট্টগ্রাম। তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান নিয়ে গঠিত পার্বত্য এলাকা। এ তিন জেলায় ১৬ লাখ লোকের বসবাস। এদের ৫১ শতাংশ পাহাড়ি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও ৪৯ শতাংশ বাঙালি জনগোষ্ঠীর বসবাস এই পার্বত্য চট্টগ্রামে। বরাবরের অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম।

একপর্যায়ে এই অশান্ত পার্বত্য জনপদে শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে পাহাড়িদের শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি’ নামে এই চুক্তি সমধিক পরিচিত। এই চুক্তিতে পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পক্ষে স্বাক্ষর করেন প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ এই পার্বত্য এলাকার স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে বহু বছর ধরে ভারতের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সশস্ত্র আন্দোলন করে আসা জেএসএস তথা জনসংহতি সমিতির নেতা সন্তু লারমা। এ শান্তিচুক্তির ৭২টি দফার ৪৮টি ইতোমধ্যে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর পরও অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের এখন পর্যন্ত শান্তি ফিরে আসেনি, বরং সময়ের সাথে এই অশান্ত পরিবেশ আরো তীব্র আকার ধারণ করছে।

শান্তিচুক্তির সূচনায় অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন, কথিত এই শান্তিচুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। কারণ, দীর্ঘ ২২ বছর আগে করা এই শান্তিচুক্তি শুরুতেই মেনে নেয়নি সেখানকার তিনটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। বলা হয়, এ তিনটি গোষ্ঠীতে এখনো সক্রিয় রয়েছে প্রায় দুই হাজার সশস্ত্র সন্ত্রাসী। এরা সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় প্রতিষ্ঠা করতে চায় জুমল্যান্ড কিংবা স্বায়ত্তশাসিত সরকার। এই গোষ্ঠী তিনটি হচ্ছে- জনসংহতি সমিতি (জেএসএস- সন্তু), জনসংহতি সমিতি (সংস্কারবাদী) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)।

এ কথা সত্য, পার্বত্য চট্টগামে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে ভূমিবিরোধ একটি বড় সমস্যা। ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু করে এমনকি পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশ আমলের এই তিন জেলায় কোনো ভূমি জরিপ হয়নি। অথচ ভূমির মালিকানা নির্ধারণের আগে মোট জমির পরিমাণ নির্ধারণ জরুরি ছিল। তা ছাড়া পাহাড়িরা মনে করে, তারাই এই তিন পার্বত্য জেলার আদিবাসী। অতএব এ এলাকার ভূমির মালিক তারাই। আর বাঙালিরা সেখানে পাহাড়িদের ভূমি জবরদখল করে নিয়েছে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলের বিভিন্ন সরকারের আমলে। কিন্তু পাহাড়িরা সেখানকার আদিবাসী, এ দাবির ঐতিহাসিক সত্যতা নেই। বাংলাদেশের কোনো সরকার পাহাড়িদের এই দাবি স্বীকার করে না।

এ ধরনের দাবির প্রেক্ষাপটে বাঙালিদের পার্বত্য তিন জেলা থেকে উচ্ছেদ করে তাদের জমিজমা পাহাড়িদের মধ্যে বণ্টন করার অযৌক্তিক দাবিও মেনে নেয়নি এবং মেনে নিতে পারে না যথার্থ কারণেই। বরং বাংলাদেশ সরকার চায় এই তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ি-বাঙালি একসাথে মিলেমিশে সেখানে বসবাস করুক। সেই লক্ষ্যেই ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত হয় শান্তিচুক্তি। এই চুক্তির ৪, ৫ ও ৬ ধারা অনুযায়ী ২০০১ সালের ১৭ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন পাস করা হয়। এই আইনের লক্ষ্য পূরণে গঠন করা হয় ‘পার্বত্য জেলাগুলোর ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন’।

আইন মতে, এই কমিশনের চেয়ারম্যান হবেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। কমিশনে থাকবেন আরো চারজন সদস্য : আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারমান অথবা তার পরিষদের মধ্য থেকে মনোনীত কোনো সদস্য, পদাধিকার বলে সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পদাধিকার বলে সংশ্লিষ্ট সার্কেলের সার্কেল চিফ এবং চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার অথবা তার মনোনীত একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার। সে অনুযায়ী একটি কমিশনও গঠন করা হয়। কিন্তু নানা কারণে এই কমিশন ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারেনি। ফলে সরকার নতুন করে গঠন করে এই কমিশন।

২০০৯ সালে সিদ্ধান্ত হয়, পার্বত্য জেলার ভূমি ব্যবস্থাপনা, জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় প্রশাসনে কমিশনের উপস্থাপিত বা দাখিলকৃত তথ্য-উপাত্ত প্রচলিত আইন বিবেচনায় পার্বত্য জেলাধীন পাহাড় ও পানিতে ভাসা জমিসহ সমুদয় ভূমি (প্রযোজ্য আইনের অধীনে অধিগ্রহণকৃত ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পকারখানা এবং সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমি ব্যতীত) মৌজাওয়ারি স্থানীয় জরিপকাজ পরিচালনার। ওই সময় সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে সার্কেল চিফ ও আঞ্চলিক পরিষদ প্রতিনিধি কমিশনের সভা বর্জন করে এবং পাশাপাশি আঞ্চলিক পরিষদ থেকে ২৩ দফা ও পরে সংশোধিত ১৩ দফা প্রস্তাব পাঠানো হয়।

এ দিকে পাহাড়িদের দাবির প্রেক্ষাপটে ২০১৬ সালের ১ জুলাই মন্ত্রিসভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের একটি সংশোধনী গেজেট আকারে পাস হয়ে একই বছরের ৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদে পাস হয়। এই সংশোধনীর ব্যাপারে পাহাড়িরা সন্তুষ্ট হলেও বাঙালিরা এ সংশোধনীতে নাখোশ। এ সংশোধনী অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে কমিশনের চেয়ারম্যান করে সংশ্লিষ্ট সার্কেল চিফ বা তার মনোনীত প্রতিনিধি, আঞ্চলিক পরিষদের চিফ বা তার মনোনীত প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, বিভাগীয় কমিশনার বা অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার নিয়ে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন নতুন করে পুনর্গঠন করা হয়েছে। এতে সার্কেল চিফ বা তার প্রতিনিধি, আঞ্চলিক পরিষদ প্রধান বা তার প্রতিনিধি, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বা তার প্রতিনিধিরা উপজাতীয় সদস্য হবেন। চেয়ারম্যান বা সদস্যসচিব সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে বাঙালি বা পাহাড়ি যে কেউ হতে পারেন।

কিন্তু লক্ষণীয়, যেখানে ভূমি বিরোধের বিষয়টিতে বাঙালিরা একটি পক্ষ, সেখানে এই কমিশনে বাঙালিদের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। এ ছাড়া কমিশনের বিচারিক আইনে উপজাতীয়দের সামাজিক আইনপ্রথা, রীতি ও পদ্ধতিকে নির্ধারণ করায়, তা বাঙালিদের বিরুদ্ধে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের, বিশেষ করে পুনর্বাসিত বাঙালিদের সরকারি খাস জমিতে পুনর্বাসিত করায় সেখানে উপজাতীয় সামাজিক রীতি গণ্য করা হয়নি। এতে বাঙালিদের পক্ষ থেকে সঠিক বিচার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে বাঙালিদের দাবি। অন্য দিকে কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ না থাকায়, এই কমিশনের আওতায় চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাঙালিরাই।

ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনী প্রশ্নে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি নেতাদের বক্তব্য হচ্ছে- সংশোধনীতে ৬(গ) ধারায় ‘ভূমি’র পরিবর্তে ‘যেকোনো ভূমি’ শব্দগুলো জুড়ে দেয়ায় তিন পার্বত্য জেলার যেকোনো ভূমি বা জমি পাহাড়িরা নিজের দাবি করে ভূমি কমিশনে আবেদন করতে পারবে। এর পর কমিশন বৈঠকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবাদে দাবি করা ভূমি উপজাতিদের নামে নামজারি করতে পারবে। এতে এক দিকে যেমন সরকারের এখতিয়ার খর্ব হবে, তেমনি তিন পার্বত্য জেলায় বাঙালিরা ভূমিহীন হতে বাধ্য হবে।

কারণ, কমিশনের গঠন কাঠামো অনুযায়ী ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন বরাবর হবে উপজাতি সংখ্যাগরিষ্ঠ। তা ছাড়া পার্বত্য ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের ‘ঘ’ অনুচ্ছেদের ৪-এ বলা হয়েছে- ‘গঠিত ভূমি কমিশন পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জায়গা-জমির বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তিসহ এযাবৎ যেসব ভূমি ও পাহাড় অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হয়েছে, সেসব পাহাড় ও জমির মালিকানার স্বত্ব বাতিলে পূর্ণ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। এখানে ভারত থেকে প্রত্যাগত ১২ হাজার ২২২টি উপজাতি পরিবারকে পুনর্বাসনের কথা বলা হয়েছে।

এসব প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিনিধিকে বলেন, উপজাতিদের দাবি অনুযায়ী সব দফা বাস্তবায়ন করা হলে পার্বত্যাঞ্চল আর বাংলাদেশের থাকবে না। কারণ, তাদের হাতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও বন বিভাগ চলে যাবে। এখান থেকে সব নিরাপত্তা সংস্থার লোকজন চলে যেতে হবে। এসি ল্যান্ড চলে যাবে। এসব যদি চলে যায়, দেশের এক-দশমাংশের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব থাকবে না। উপজাতি নেতারা সরকারের ওপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করেছেন, যাতে এরা স্বায়ত্তশাসন পায়। কিন্তু ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির কোথাও স্বায়ত্তশাসনের কথাটি উল্লেখ পর্যন্ত নেই। অতএব উপজাতিদের স্বায়ত্তশাসনের দাবি অযৌক্তিক।

বাঙালি নেতারা আরো বলেন, মন্ত্রিসভা যে ছয়টি সংশোধনী প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন দেয়, সে সম্পর্কে পাহাড়ি ও বাঙালি কারো কোনো ধরণা নেই। পাহাড়িদের রীতিনীতি ও উল্লিখিত সংশোধনী মতে কাজ করলে, এই পার্বত্য জেলায় বসবাসকারী বাঙালিরা ভিটেমাটি-ছাড়া হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্য মতে, কার্যত ঘটছেও তাই। পত্রিকাটি জানিয়েছে- মুখের কথায় এখন পার্বত্য চট্টগ্রামে জমির মালিক বনে যাচ্ছে উপজাতিরা। আর সরকারি বরাদ্দ পেয়েও ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে বাঙালিরা। উপজাতিদের জমির মালিকানার স্বীকৃতি দিচ্ছেন সেখানকার কারবারি ও হেডম্যানরা। ফলে সরকারিভাবে বরাদ্দ পাওয়া জমি হারিয়ে ভূমিহীনে পরিণত হচ্ছে সেখানকার বাঙালিরা। নতুন করে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি আইন সংশোধন করে সেখানকার আঞ্চলিক প্রথা ও পদ্ধতি অনুযায়ী সেখানকার ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি করার বিধান করায় এ পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করেছে।

পার্বত্য তিন জেলা সরেজমিন ঘুরে এসে এই দৈনিকটি জানিয়েছে- পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির সিএস সার্ভে হয়নি। ওই এলাকার পুরো জমির মালিকানাই সরকারের। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে আশ্রয় নেয় এসব উপজাতি। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তাদেরকে সেখানে পুনর্বাসন করেন। তখন মুখের কথার মাধ্যমে বিভিন্ন জমি উপজাতিদের বসবাস ও চাষাবাদ করার জন্য দেয়া হয়েছিল।

আজ তাদের সেই জমির মালিকানার পক্ষে প্রমাণপত্রও দিচ্ছে সেখানকার কারবারি বা হেডম্যানরা। অপর দিকে সরকারের বরাদ্দ দেয়া জমি থেকে উচ্ছেদ করেছে উপজাতি সন্ত্রাসীরা। এরা এরই মধ্যে কোনো কোনো এলাকার বাঙালিদের বাড়ি ও জমি দখল করে নিয়েছে। এ ধরনের অনেক বাঙালি পরিবারকে সরকার গুচ্ছগ্রামে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেয়। যাদের জীবনযাপন চলে সরকারের দেয়া রেশনের ওপর নির্ভর করে।

আরেকটি জাতীয় দৈনিক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে- স্থানীয়দের দেয়া তথ্য মতে, ১৯৮১ সালে ৮৩২টি বাঙালি পরিবার পার্বত্য চট্টগ্রামে যায়। সরকারের তরফ থেকে প্রত্যেক পরিবারকে ৫ একর করে জায়গা দেয়া হয়। পরে উপজাতি সন্ত্রাসীদের হামলা ও ভয়ভীতিতে প্রায় সাড়ে ৩০০ পরিবার পালিয়ে যায়। এখন ৫০০ পরিবার বসবাস করছে সে এলাকায়। তারা বলেন, উপজাতিরা এখন যেভাবে প্রতিনিয়ত অত্যাচার করছে, তাতে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।

আরেকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর মতে, সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছে পাহাড়ি জনগণ। চাকরিজীবীদের মূল বেতনের ২ শতাংশ হারে চাঁদা চেয়ে সন্ত্রাসীরা চিঠি দিচ্ছে। প্রমাণস্বরূপ এই চিঠির একটি কপিও পত্রিকাটি প্রকাশ করেছে। সরেজমিন এই প্রতিবেদনে জানানো হয়- বাঙালি কিংবা উপজাতি সবাইকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিতে বাধ্য হয়। এমনকি কলা, মুরগি ও ডিম বিক্রি করলেও সেখান থেকে চাঁদা আদায় করছে সন্ত্রাসীরা। প্রকাশ্যে চিঠি দিয়ে চাকরিজীবীদের কাছ থেকেও চাঁদা আদায় করছে এরা। পুলিশ ও প্রশাসনের লোকজনের কাছে এসব চাঁদাবাজির ঘটনা সুস্পষ্ট হলেও এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না।

২০১৬ সালের ১৩ জুলাই বান্দরবান জেলার আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে ওই জেলার জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক পার্বত্য জেলাগুলোর সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির চিত্র প্রকাশ্যে তুলে ধরে বলেন, ‘এখানে তিনটি গ্রুপ চাঁদা সংগ্রহ করে : জেএসএস (সন্তু), জেএসএস (সংস্কার) ও ইউপিডিএফ। বাসপ্রতি জেএসএসকে (দুই গ্রুপ) বছরে পাঁচ হাজার টাকা ও ইউপিডিএফকে তিন হাজার টাকা করে দিতে হয়। ট্রাকপ্রতি প্রতি গ্রুপকে ছয় হাজার টাকা করে এবং চাঁদের গাড়ি তিন হাজার, দুই হাজার ও দেড় হাজার টাকা হারে, এভাবে প্রতি সেক্টরে এমনকি ক্ষুদ্র মাছ ব্যবসায়ীকেও চাঁদা দিতে হয়।

অপর দিকে গোয়েন্দা সূত্রে যেসব খবর আসছে, তা আরো উদ্বেগজনক। ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে তিন সশস্ত্র গ্রুপ। চলছে অবাধ চাঁদাবাজিও। এদের টার্গেট জুমল্যান্ড বা স্বায়ত্তশাসন। এদের কাছে তিন পার্বত্য জেলার মানুষ এখন রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছে। আর সরকার একের পর এক উপজাতিদের দাবি-দাওয়া মেনে নিচ্ছে। তাতে করে এই পার্বত্য তিন জেলার ওপর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ হারানোর উপক্রম হয়েছে। আমরা যদি এখন থেকে সচেতন পদক্ষেপ না নিই, তবে এক সময় দেশের এই এক-দশমাংশ ভূখণ্ড আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তখন কিছুই করার থাকবে না।

সূত্র: দৈনিক নয়াদিগন্ত




পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি নিয়ে যত কথা

%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%9c%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a7%87%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%b2-%e0%a6%ae%e0%a7%8b%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%a6-%e0%a6%86%e0%a6%b2

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার পিএসসি (অব.)

গত ২ ডিসেম্বর ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির ১৯তম বর্ষপূতি। এদিন রাজধানীতে বেশ কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন অনুষ্ঠানে চুক্তির বাস্তবায়ন সম্পর্কে বক্তাদের কাছ থেকে কিছু মিশ্র, আবার কিছুটা বিপরীতমুখী কথাবার্তা ও মন্তব্য শোনা গেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পক্ষে চুক্তি স্বাক্ষরকারী জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা বলেছেন, সরকার প্রত্যাশা ও বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এনজিও ব্যবসায়রত দুয়েকজন আরও একটু বিপ্লবী কথাবার্তা বলেছেন। একজন বলেছেন, এই সরকারের চুক্তি বাস্তবায়নের কোনো রাজনৈতিক সদিচ্ছা নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামকে উপনিবেশ বানানোর পাঁয়তারা চলছে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে চুক্তির বেশিরভাগ ধারাই বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং বাকি অংশও দ্রুত বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চলছে।

প্রথমপক্ষের কথার মধ্যে উসকানিমূলক উচ্চারণ, অতিরঞ্জন এবং স্পষ্টত বাড়াবাড়ি লক্ষ্য করা যায়। আর সরকার পক্ষের অবাস্তবায়িত অংশের দ্রুত বাস্তবায়নের কথায় কতটুকু আস্থা রাখা যায় সে প্রশ্নটিও স্পষ্টভাবেই মানুষের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। কারণ, মানুষ মনে করে সরকার ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তিসংক্রান্ত আইনের সংশোধন এবং প্রয়োজনীয় বিধিমালা আরও দ্রুত করতে পারত। চুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং ১৫টির আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে বলে তথ্য বিবরণী থেকে জানা যায়।

তবে অসন্তোষের মূল জায়গা অর্থাৎ ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণেই মূলত বিতর্কের সৃষ্টি এবং পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আসছে। ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পূর্বের আইনটি ইতিমধ্যেই সংশোধন করা হয়েছে এবং তা পার্লামেন্টে পাস হয়ে গেছে। সংশোধিত আইনটি অধিকতর গণতান্ত্রিক এবং বাস্তবায়ানুগ হয়েছে বিধায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে বলে জানা গেছে। কিন্তু আইনের বিধিমালা না হওয়ায় ভূমি কমিশন এখনো কার্যক্রম শুরু করতে পারছে না। বিধিমালা দ্রুত প্রণয়ন করে সরকারকে সদিচ্ছার প্রমাণ রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত একটা প্যাগমেটিক ও ইউনিক শান্তিচুক্তি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অন্য কোনো দুরভিসন্ধির কবলে যাতে না পড়ে সে জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

এ কথা সবাই জানেন বাংলাদেশের একটি বড় রাজনৈতিক পক্ষ এই চুক্তির বাস্তবায়ন চায় না। শুধু চায় না বললে কম বলা হবে, তারা অপকৌশলে এই চুক্তি যাতে ব্যর্থ হয় সে প্রচেষ্টাই চালাচ্ছে। তাছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্তিকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি বহু সুবিধাভোগী এনজিও এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছে, যারা নিজেদের এনজিও ব্যবসা অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য চুক্তির বাস্তবায়ন ঝুলন্ত অবস্থায় রাখতে চায়। কারণ, চুক্তি পরিপূর্ণ বাস্তবায়িত হলে অনেকেরই এনজিও ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হবে এবং মোটা অঙ্কের মাসোয়ারা আর পাওয়া যাবে না।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বের ভূরাজনৈতিক দুরভিসন্ধি এখন আর কারও অজানা নয়। পূর্বতিমুর এবং দক্ষিণ সুদানের কথা আমাদের সদা স্মরণে রাখতে হবে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ২১ বছরের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত এবং রক্তক্ষরণের অবসান ঘটে। শুধু তাই নয়, ছোট রাষ্ট্র বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে সব ধরনের হুমকি ও আশঙ্কা থেকে আমরা মুক্ত হই। এটা বাংলাদেশের জন্য বিশাল অর্জন। ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মাত্র দেড় বছরের মাথায় এত বড় একটা জাতীয় প্রাণঘাতী সমস্যার সমাধান, তাও আবার অন্য কোনো তৃতীয়পক্ষের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া, এটা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল উদাহরণ।

তাছাড়া শেখ হাসিনা সবেমাত্র প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার জন্য এটা ছিল বিরাট অগ্নিপরীক্ষা। তবে বাবা বঙ্গবন্ধুর মতো দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসার শক্তির বলেই শেখ হাসিনা এতবড় রাজনৈতিক সাহস দেখাতে পেরেছেন বলে মানুষ মনে করে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের দুয়েকটি সশস্ত্র বিদ্রোহের ইতিহাস ও তার পরিণতির দিকে তাকালে বোঝা যায় কী অসাধ্য শেখ হাসিনা সাধন করেছেন। বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সশস্ত্র সংগ্রামেরত বিদ্রোহী সংগঠনের নাম দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার ফার্ক, অর্থাৎ রেভিউলুশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়া।

দীর্ঘ ৬০ বছর পর এই সবেমাত্র ২০১৬ সালে এসে কিউবার মধ্যস্থতায় গত ২৫ আগস্ট প্রথমবার তারা কলম্বিয়ান সরকারের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে। কিন্তু সরকার চুক্তিটিকে গণভোটে দিলে কলম্বিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভোটে তা বাতিল হয়ে যায়। দ্বিতীয়বার পুনরায় গত ২৪ নভেম্বর উভয়পক্ষের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এবার আর গণভোটে না দিয়ে পার্লামেন্ট থেকে অনুমোদন নিয়ে কলম্বিয়ান সরকার সেটি চূড়ান্ত করেছে। চুক্তির বাস্তবায়ন এখনো শুরু হয়নি।

তবে এর স্থায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্লেষকদের যথেষ্ট রিজার্ভেশন রয়েছে। আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কার কথা আমরা জানি। ১৯৭৫ সালে জন্ম হয় এলটিটিই নামের সশস্ত্র সংগঠনের, যার পূর্ণ নাম লিবারেশন অব তামিল টাইগারস ইলাম। শ্রীলঙ্কার উত্তর-পূর্ব তামিল জাতিগত মানুষের অধ্যুষিত অঞ্চলকে স্বাধীন করার উদ্দেশ্যে এলটিটিই পুরাদমে সশস্ত্র অভিযান শুরু করে ১৯৮৩ সালে। বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতায় এলটিটিই এবং শ্রীলঙ্কা সরকারের মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা ব্যর্থ হয়, কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব হয় না। তারপর ২০০৯ সালে এসে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী একতরফা সর্বাত্মক সেনা অভিযান চালায়।

তাতে ব্যাপক সংখ্যক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির মধ্য দিয়ে এলটিটিইর পরাজয় ঘটে এবং আপাতত শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের অবসান হয়। কিন্তু বিশ্বের সব অঙ্গন থেকে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের সিরিয়াস অভিযোগ ওঠে এবং সেখানে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করেছে বলে বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থা থেকে দাবি উত্থাপন করা হচ্ছে। তাছাড়া বিদ্রোহ যে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

তাই বিশ্বের অন্যান্য স্থানের সশস্ত্র বিদ্রোহের সমাধান ও মীমাংসার সঙ্গে তুলনা করলে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরের শান্তিচুক্তি বাংলাদেশের জন্য অসাধারণ সাফল্য। এই চুক্তির গুরুত্ব এবং অনন্যতার জন্যই শেখ হাসিনা ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কার পান। চুক্তি যারা বাস্তবায়ন করবেন এবং এ বিষয়ে যারা উচ্চবাচ্য করেন তাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে কোনো চুক্তিই রাষ্ট্রের সব পক্ষকে সন্তুষ্ট করতে পারে না।

১৯৭৮ সালে মিসর-ইসরায়েল ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি স্বাক্ষর করার ফলে মিসর ১১ বছর পর সম্পূর্ণ সিনাই অঞ্চল আবার ফেরত পায়। মিসরের জন্য এটা ছিল বিরাট অর্জন। মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এবং ইসরায়েল প্রধানমন্ত্রী বেগিন ১৯৭৮ সালে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। কিন্তু ১৯৮১ সালে চুক্তিবিরোধী একজন চরমপন্থির গুলিতে আনোয়ার সাদাত নিহত হন। প্রায় একই রকম ঘটনা ঘটে ১৯৯৩ সালে পিএলও এবং ইসরায়েলের মধ্যে অসলো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর। চুক্তি স্বাক্ষরকারী ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরায়েল প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইমন পেয়ারস, তিনজন সম্মিলিতভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।

১৯৯৫ সালে চুক্তিবিরোধী একজন চরমপন্থি ইহুদির গুলিতে আইজ্যাক রবিন নিহত হন। সবাইকে ইতিহাস এবং সমসাময়িক ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। চুক্তির দ্রুত বাস্তবায়ন আবশ্যক। দিন যত যাবে ততই আরও বহুরকম স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সৃষ্টি হবে। চুক্তির ১৯ বছরের মাথায় এসে বলা যায় সমঅধিকার নিশ্চিত করার জন্য এবং পিছিয়ে পড়া জায়গা থেকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে উপরে তোলার জন্য সরকার যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশাসনিক সুবিধা তৃণমূল পর্যন্ত বর্ধিতকরণসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক সুযোগ ও সম্প্রসারণ সম্ভব হয়েছে শান্তিচুক্তির ফলে।

১৯ বছর আগের পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং বর্তমানের পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে পার্থক্য সহজেই সবারই চোখে ধরা পড়ে। তাই ভূমি সমস্যার মতো একটা অত্যাবশ্যকীয় এবং চুক্তির জটিল অংশ বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় সমাধানের পথকে আরও পিচ্ছিল করে দিতে পারে, এমন উসকানিমূলক কথাবার্তা থেকে সবারই বিরত থাকা উচিত। ১৯৭৬ সালে সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এমন অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোকে উল্টিয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনার বাস্তবসম্মত কোনো পথ এখন আর খোলা নেই। কয়েক লাখ বাঙালি পরিবার দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করছে।

প্রথমদিকে এটি যেভাবে ঘটেছে তা সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের পথ পরিক্রমায় এটা এখন কঠিন বাস্তবতা। এই বাঙালিদেরও মানবাধিকার রয়েছে এবং সমঅধিকার পাওয়ার হক আছে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে বাস্তবতা এবং চুক্তির মূল স্পিরিট পাহাড়ি-বাঙালি সবারই সমঅধিকারের বিষয়টিকে প্রধান বিবেচ্য ধরে অ্যাকোমোডেটিভ ও ইনক্লুুসিভ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিতে হবে। কোনো পক্ষকেই একটা খুঁটির ওপর হাত রেখে গো ধরে বসে থাকলে চলবে না।

ভূমির অধিকার প্রশ্নে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী অবশ্যই অগ্রাধিকার পাবেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের উচিত হবে সংশোধিত ভূমি কমিশন আইন অনুসারে দ্রুত বিধিমালা তৈরি করা এবং ভূমি কমিশনকে কার্যকর করা। ভূমি সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে বাকি যা থাকে তাতে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে আর কেউ পানি ঘোলা করতে পারবে না। একটা চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ১৯ বছর অবশ্যই দীর্ঘ সময়। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের বাস্তবতা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশি-বিদেশি চক্রের ষড়যন্ত্রের কথাও ভুলে গেলে চলবে না। সব পক্ষ ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিলে শান্তিচুক্তির আগামী বর্ষপূর্তিতে সব পক্ষ একমঞ্চে বসে তা পালন করতে পারবে।

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

sikder52@gmail.com, নিউ অরলিনস, ইউএসএ

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন




রোহিঙ্গা ইস্যু : শেখ হাসিনা কি ইন্দিরা গান্ধী হতে পারেন না?

মেহেদী-হাসান-পলাশ1

মেহেদী হাসান পলাশ :

রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য শাখের করাত। তিন দিকে ভারত পরিবেষ্টিত বাংলাদেশের জন্য শ্বাস নেবার মুক্ত জানালা দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ২৭২ কি.মি. মিয়ানমার সীমান্ত। ভারতীয় আধিপত্যবাদী আগ্রাসী নীতি বিশেষ করে অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদী নীতির তুফানে বাংলাদেশের ‘খড় কুটো’ এই সীমান্ত তা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। ভারতকে এড়িয়ে স্থলপথে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগেরও একমাত্র বিকল্প এই সীমান্ত। অন্যদিকে মিয়ানমারের জন্যও ভারতের মূল ভূখ- হয়ে পশ্চিমি দুনিয়ার স্থল যোগাযোগের সর্বোত্তম মাধ্যম বাংলাদেশ।

এই যখন অবস্থা তখন দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্ক মধুরেনু হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা দাবা খেলায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কে কখনো বসন্ত বাতাসের হিল্লোল পরিলক্ষিত হয়নি। বরং পৌষী-শীতলতা এবং থেমে থেমে কালবৈশাখী ঝঞ্ঝা পরিলক্ষিত হয়েছে। নৈর্ব্যক্তিকভাবে বললে বলতে হয়, এর জন্য বহুলাংশে মিয়ানমারের জাতীয় নীতিই দায়ী। বাংলাদেশ-মিয়ানমার আন্তঃসম্পর্ক বৃদ্ধির প্রধান কাঁটার নাম ‘রোহিঙ্গা সমস্যা’। এটা এমন এক সমস্যা যা বাংলাদেশকে গিলতেও বাধছে, উগড়াতেও।

জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিবেশী দেশের লাখ লাখ শরণার্থী গ্রহণ সম্ভব নয় এ কথা সবাই স্বীকার করবেন। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতি পূর্ণ একটি দেশে বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর অবস্থানের মতো ভূমির অভাব প্রকট। তাছাড়া ইতোপূর্বে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে তারা স্থানীয় পর্যায়ে কিছু সামাজিক সমস্যারও সৃষ্টি করেছে। অফিসিয়ালি যাই বলা হোক, নব্বই দশক থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আগমন কখনো বন্ধ হয়নি। যখন ব্যাপকভাবে এসেছে কেবল তখনই গণমাধ্যমে ব্যাপক  ভাবে আলোচিত হয়েছে।

এর বাইরে প্রতিনিয়ত দুই চার পাঁচ জন করে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে সব সময়। এদের মধ্যে ৫০ হাজারের মতো রোহিঙ্গার শরণার্থী ক্যাম্পে ঠাঁই মিললেও বাকিরা ক্যাম্পের বাইরে অবস্থান নিয়েছে। অনেকে আবার বিভিন্ন সূত্রে সরাসরি সমাজে মিশে গেছে। যারা ক্যাম্পে অবস্থান নিয়েছে তারাও ধীরে ধীরে ক্যাম্প থেকে সরে সমতলে মিশে যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্যাম্পের মধ্যে বসবাসকারীদের আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর দেয়া আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রশিক্ষণ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা কাজের সন্ধানে সমতলে এসে মূল স্রোতের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আগমন ও মূল স্রোত ধারায় মিশে যাওয়া নিয়ে স্থানীয় বাঙালিদের প্রবল বিরোধিতা রয়েছে। স্থানীয় বাঙালিদের অভিযোগ, যত্রতত্র রোহিঙ্গাদের অবস্থানের কারণে পর্যটন শহর কক্সবাজার এবং বিশেষ করে টেকনাফের সৌন্দর্য হারিয়ে নোংরা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মিয়ানমারের চেয়ে বাংলাদেশী টাকার মান বেশী হওয়ায় রোহিঙ্গারা কম পারিশ্রমিকে কাজ করতে রাজি হওয়ায় স্থানীয় বাঙালি শ্রমিকেরা বেকারে পরিণত হচ্ছে। অবস্থাপন্ন গৃহস্থ, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা অল্প মজুরিতে শ্রমিক পাওয়ায় বাঙালি শ্রমিকদের কাজে নিতে চান না। এদিকে সামাজিক নিরাপত্তার কারণে রোহিঙ্গা পিতামাতা তাদের কন্যাদের যে কোনোভাবে বাঙালি পুরুষের সাথে বিয়ে দিতে আগ্রহী হওয়ায় অনেক ঘরে দ্বিতীয়, তৃতীয় স্ত্রী হিসাবে রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের প্রবেশ ঘটছে যা সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টি করছে।

সবচেয়ে বড় কথা, বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে বিভিন্ন স্থানে স্থানীয়রা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা ও কক্সবাজার জেলার উখিয়া, টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে এটা লক্ষ্য করা যায়। এতে স্থানীয়দের মনে ক্ষোভ বাড়ছে। বাংলাদেশে চলে আসা রোহিঙ্গাদের একাংশ মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ আছে। অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশী শ্রম মার্কেট ভাগ বসাচ্ছে। এ ধরনের নানা কারণে স্থানীয় বাঙালিদের মধ্যে রোহিঙ্গা বিরোধী মনোভাব রয়েছে।

প্রশ্ন হলো, তারপরও রোহিঙ্গাদের এই চরম দুর্দিনে বাংলাদেশের পক্ষে কি সম্ভব ‘দরোজা বন্ধ করে’ বা ‘মুখ ফিরিয়ে থাকা’? কিংবা মুখ ফিরিয়ে থাকলেই কি আমরা পার পেয়ে যাবো? বাংলাদেশ তো চেষ্টা করেছে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে।

কিন্তু বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, ইতোমধ্যেই প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। দুর্গম সীমান্ত, দুর্বল নিরাপত্তা প্রহরা এবং দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে অসহায় রোহিঙ্গারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সংবাদপত্রের খবর, যতটা না গোপনে এসেছে, তার চেয়ে বেশী এসেছে স্থানীয় দালাল ও নিরাপত্তা বাহিনীকে ঘুষ দিয়ে। সামাজিক গণমাধ্যমে এসব ঘুষ প্রদানের ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। সামনে আরো আসবে তার আলামতও স্পষ্ট।

তবে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ব্যর্থ হলেও অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা প্রদানে ব্যর্থ হলে চলবে না। কারণ এর সাথে বাংলাদেশের সুনামের প্রশ্ন জড়িত। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আরাকান থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা নারী ও শিশুরা বাংলাদেশে নির্যাতনের শিকার হয়। দালালদের হাতে পড়ে শিশুরা পাচার হয়। কাজের লোভ দেখিয়ে রোহিঙ্গা নারীদের পতিতালয়ে বিক্রি করে দেয়া হয়। অনেক অভিভাবক ভবিষ্যতের শঙ্কা কাটাতে স্থানীয় বৃদ্ধদের সাথেও কিশোরীদের বিবাহ দিতে পর্যন্ত পিছপা হয় না। রোহিঙ্গা শিশু ও নারীরা যেন কোনোভাবেই নির্যাতনের শিকার না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি।

আরাকান শব্দটি এসেছে আরবী আল রুকুন শব্দ থেকে। তবে পি ফ্যায়রের মতে, প্রাচীন রাখাইং গোত্রের নামানুসারে এর নাম হয়েছে আরাকান। স্বাধীন আরাকান রাজ্যের শেষ রাজধানী ছিল ম্রোহাং। ম্রোহাংকে বাংলা কবিরা রোসাঙ্গ বলে অভিহিত করেছেন। এই রোসাঙ্গ থেকেই রোহিঙ্গা নামের উৎপত্তি। আরাকানে রোহিঙ্গাদের রয়েছে প্রাচীন ইতিহাস। প্রাচীনকালে আরাকান স্বাধীন রাজ্য ছিল। এর আয়তন ছিল ২০ হাজার কি.মি.। তবে বর্তমানে এর আয়তন ১৪ হাজার বর্গ কি.মি.।

প্রাচীনকালেই আরাকানে মুসলমানদের আগমন ঘটেছিল। তখন আগমন ঘটেছিল আরব বণিকদের মাধ্যমে, কিছু জলদস্যু আক্রমণের শিকার হয়ে ও জাহাজ ডুবির শিকার হয়ে। পরবর্তীকালে মুসলিম সেনাবাহিনীর সাথে বিপুল পরিমাণ মুসলিম আরাকানে প্রবেশ করে স্থায়ী বসতি গড়ে।

পঞ্চদশ শতাব্দী আরাকানের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ শতাব্দীর শুরুতে আরাকান রাজ মিন সাউ মুন বার্মার উপর আক্রমণ পরিচালনা করে ব্যর্থ হন। ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে বার্মা রাজ তার রাজ্য কেড়ে নিয়ে তাকে বহিষ্কার করলে তিনি বঙ্গদেশে চলে আসেন। বঙ্গরাজার সহায়তায় ১৪৩০ সালে রাজা মিন সাউ মুন কয়েক হাজার মুসলিম সৈন্যের সহায়তায় পুনরায় আরাকান গমন করেন এবং যুদ্ধে বার্মারাজকে পরাজিত করে পুনরায় রাজ্য উদ্ধার করেন। এ সময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করে রাজা সুলাইমান শাহ নাম ধারণ করে রাজ্য পরিচালনা করেন। এ সময় আরাকান অনেকাংশে বঙ্গরাজের সালতানাতের অংশ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

আরাকান রাজসভায় মুসলিম আমাত্যরা উচ্চপদ লাভ করেন। এদের একজন মাগন ঠাকুর। তার পিতা বড় ঠাকুর আল্লাহর কাছে অনেক মানত করে পুত্র লাভ করেন। তাই তার নাম মাগন রাখা হয়। মাগন ঠাকুর ইসলামের প্রথম খালিফা আবু বকরের (রা.) বংশধর। তার মন্ত্রিসভা অনেক বাঙালি কবি ও গুণী ব্যক্তি অলঙ্কৃত করেন। তাদের অন্যতম ছিলেন মহাকবি আলাওল। মাগন ঠাকুরের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় মধ্যযুগের বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। পদ্মাবতী, সতী ময়না লোর চন্দ্রানী, সিকান্দার নামা, সায়ফুল মুলক বদিউজ্জামাল, তোহফা, হপ্ত পয়কর প্রভৃতি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলো এ সময় রচিত হয়।

১৭৮৫ সালে বর্মী রাজ বদা উপ্যা আরাকান দখল করে পুনরায় বার্মার অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৮২৫ সালে ব্রিটিশরা আরাকান দখল করে নেয়। ব্রিটিশ সরকার আরাকানের জমিগুলো চাষযোগ্য করতে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে বহু লোক আরাকানে নিয়ে যায়। ১৯৪২ সালের ২৮ মার্চ, মায়ানমারের মিনবিয়া এবং ম্রোক-ইউ শহরে রাখাইন জাতীয়তাবাদী এবং কারেইনপন্থীরা প্রায় ৫,০০০ মুসলমানকে হত্যা করে। ইতোমধ্যে, রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে প্রায় ২০,০০০ মুসলমানকে হত্যা করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, জাপানীরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনস্হ বার্মায় আক্রমণ করে। ব্রিটিশ শক্তি পরাজিত হয়ে ক্ষমতা ছেড়ে চলে যায়। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে। জাপানীদের আক্রমণের সময় উত্তর আরাকানের ব্রিটিশপন্থী অস্ত্রধারী মুসলমানদের দল বাফার জোন সৃষ্টি করে। রোহিঙ্গারা যুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষকে সমর্থন করেছিল এবং জাপানী শক্তির বিরোধিতা করেছিল। জাপানীরা হাজার হাজার রোহিঙ্গারে নির্যাতন, ধর্ষণ এবং হত্যা করেছিল।

এই সময়ে প্রায় ২২,০০০ রোহিঙ্গা সংঘর্ষ এড়াতে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলায় চলে গিয়েছিল। জাপানী এবং বর্মীদের দ্বারা বারংবার গণহত্যার শিকার হয়ে প্রায় ৪০,০০০ রোহিঙ্গা স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে চলে আসে।

ব্রিটিশ আমলে মিয়ানমারে যখন আদমশুমারি হয় তখন ব্রিটিশ সরকার রোহিঙ্গাদের গণনা করেনি। রোহিঙ্গা সমস্যার শুরু সেখান থেকে। স্বাধীনতার পর মিয়ানমার সরকার জাতীয়তার তিন স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করায়। উইকিপিডিয়ার তথ্যে জানা গেছে জাতীয়, সহযোগী ও আনুগত্যশীল -এই তিন প্রকারের নাগরিকত্বের স্ট্যাটাস ঘোষণা করা হয়। যারা ব্রিটিশ শাসনের আগে এসেছে তাদের জাতীয় নাগরিক বলা হয়।

স্বাধীনতার পর সহযোগী ও আনুগত্যশীল নাগরিকদের আবেদন করতে বলা হলে রোহিঙ্গারা তাতে সাড়া দেয়নি। কারণ তারা আগে থেকেই সেখানে আছে। এই গণনার পরে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে স্ট্যাটাসহীন হয়ে পড়ে।

১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে মিয়ানমারের যাত্রাপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়। সামরিক জান্তা তার বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ধর্মীয়ভাবেও অত্যাচার করা হতে থাকে। নামাজ আদায়ে বাধা দেওয়া হয়। হত্যা-ধর্ষণ হয়ে পড়ে নিয়মিত ঘটনা। সম্পত্তি জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়।

বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হতে থাকে। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেই। বিয়ে করার অনুমতি নেই। সন্তান হলে নিবন্ধন নেই। জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেওয়া হয় না। সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য আরোপিত হয় একের পর এক বিধিনিষেধ।

১৯৭৮ সালে পরিচালিত কিং ড্রাগন অপারেশনে ৫ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে। এদের মধ্যে ৩ লাখ জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে দেশে ফিরে যায়, ২ লাখ সৌদী আরব, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশে চলে যায়। ১৯৯১-৯২ সালে একটি নতুন দাঙ্গায় প্রায় আড়াই লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে।

এদের মধ্যে ২ লাখ রোহিঙ্গা দেশে ফিরে গেলেও মিয়ানমারে প্রত্যাবাসিতদের উপর অত্যাচার করা হচ্ছে এমন অভিযোগে ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে রয়ে যায়। তাদের কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় দুইটি ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। তবে এই ক্যাম্পের বাইরে আরো দুই লাখ রোহিঙ্গা নানাভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবী।

২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর রাতে মংডুর বেশ কয়েকটি বিজিপি ক্যাম্পে সন্ত্রাসীরা হামলা করে ৯ বিজিপি সদস্যকে খুন, ৬৪ আগ্নেয়াস্ত্র ও ১০ হাজার রাউন্ড গুলি লুট করে নিয়ে যায়। মিয়ানমার সরকার এই হামলার জন্য রোহিঙ্গাভিত্তিক স্বাধীনতাকামী সংগঠন আরএসওকে দায়ী করে নতুন করে রোহিঙ্গাদের উপর হামলা শুরু করে। হেলিকপ্টার গানশিপ, মেশিনগানের মতো ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে এই হামলায় ইতোমধ্যে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করেছে।

এ ছাড়াও ১২ শত ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। শিশু ও নারীদের উপর পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়েছে। মিয়ানমারের নতুন গণতান্ত্রিক সরকার এই হামলার খবর শুরুতে অস্বীকার করলেও পরে বিভিন্ন তথ্য উপত্তের মুখে স্বীকার করতে বাধ্য হয়। তবে তাদের মতে, এটা রোহিঙ্গাদের জাতিগত দাঙ্গা।

এদিকে মিয়ানমারের নোবেল বিজয়ী নেত্রী সু চি এই হামলায় একেবারে নীরবতা পালন করায় বহির্বিশ্বে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে ব্যাপকভাবে। আসলে গণতন্ত্র আসলেও মিয়ানমার সরকার এখনো ব্যাপকভাবে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেনাবাহিনীর লে. জে. পদমর্যাদার একজন অফিসার। সেনাবাহিনী সুকৌশলে সু চির আন্তর্জাতিক শান্তিবাদী ভাবমর্যাদা বিনষ্ট করে দিচ্ছে এটা তিনি বুঝতে পারছেন না বা বুঝতে চাইছেন না।

মিয়ানমারের এই রোহিঙ্গা গণহত্যায় আন্তর্জাতিক বিশ্ব রহস্যময় ও বেদনাদায়ক নীরবতা পালন করছে। জাতিসংঘসহ কোনো কোনো সংস্থা মুখ খুললেও যতটা কঠোর হলে মিয়ানমারকে এই হামলা বন্ধে বাধ্য করা যেত তা তারা করছে না।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী ব্যারি গ্রসম্যান আমাকে মিয়ানমার সমস্যা ব্রিটিশের সৃষ্টি বলে দায়ী করে তা বন্ধে তিনটি উপায়ের কথা বলেন। তার মতে, এই মানবিক বিপর্যয় কাটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে তিনটি উপায় অবলম্বন করতে হবে। ১. রোহিঙ্গা সমস্যাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। ২. ইউরাথু ভিক্ষু ও তার ৯৬৯ আন্দোলনকে টেরোরিস্ট ঘোষণা করতে হবে এবং ৩. মিয়ানমারের থেকে সকল প্রকার সহায়তা বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত সকল প্রকার সামরিক সহায়তা বন্ধ করতে হবে।

এদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ওআইসি, আরবলীগসহ প্রভাবশালী মুসলিম দেশ ও সংস্থা সমূহের নীরবতা নীল কষ্টের মতো মেনে নেয়া যায় না।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকেই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ বাংলাদেশ চাইলেই রোহিঙ্গা সমস্যা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারবে না। রোহিঙ্গারা আসছে, অথচ বাংলাদেশ অফিসিয়ালি তা অস্বীকার করে তাদের ফিরিয়ে নেয়ার দাবী করার সুযোগ হারাচ্ছে। শরণার্থীদের প্রতিপালনে আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে। কাজেই অবলিম্বে সরকারীভাবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমণের সত্যতা স্বীকার করে সঠিক পরিসংখ্যান তুলে ধরতে হবে।

রোহিঙ্গাদের আগমন বাংলাদেশের জন্য যতই দুর্ভার হোক মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ তাদের সাগরে ঠেলে দিতে পারে না। বাংলাদেশ বারবার ঘোষণা করেছে, এ দেশের মাটিতে প্রতিবেশী দেশের সন্ত্রাসীদের কোনো প্রশ্রয় দেয়া হবে না। কিন্তু রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসী নয়, মানবিক বিপর্যয়ের শিকার এক জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশই পারে স্বল্প সময়ের জন্য রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে তাদের মানবিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে।

সিরীয় শরণার্থীরা যখন ইউরোপে আশ্রয়ের জন্য এসেছিল তখন আমরা ইইউ রাষ্ট্রগুলোর মানবিকতা প্রদর্শন প্রত্যাশা করেছি। আজ রোহিঙ্গাদের সাথে কেন আমরা একই মানবিকতা প্রদর্শন করবো না? বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। সেদিন ভারত আশ্রয় না দিলে বাংলাদেশীদের পরিণতি কি হতো তা সহজেই অনুমেয়। বাংলাদেশের এই এক কোটি শরণার্থীই সেদিন ইন্দিরা গান্ধীকে বিশ্বমঞ্চে কথা বলা সুযোগ করে দিয়েছিল।

শেখ হাসিনা চাইলেই, বাংলাদেশের জন্য দুর্ভার হয়ে বসা লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রসঙ্গ টেনে ইস্যুটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কথা বলতে পারেন। এই শরণার্থীদের প্রতিপালনে ও ফিরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইতে পারেন। একই সাথে রোহিঙ্গাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে তিনি আন্তর্জাতিক সহায়তা কামনা ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন। এতে বিশ্বনেত্রী হিসাবে তার ভাবমর্যাদা ভিন্ন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি পারেন না মানবিকতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে নিজের ও দেশের জন্য গৌরবের সেই মহান উপলক্ষ হতে?
email: palash74@gmail.com


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

  1. ♦ বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা

  2.  পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারী সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা কাম্য

  3.  বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে

  4.  আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে সমস্যা কোথায়?

  5.  পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

  6.  একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

  7.  বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

  8.  আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

  9.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

  10.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

  11.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

  12.  শান্তিচুক্তির এক যুগ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

  13.  পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ গোষ্ঠির অতিআগ্রহ বন্ধ করতে হবে

  14.  হঠাৎ উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম: খতিয়ে দেখতে হবে এখনই

  15.  অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান সময়ের দাবী

  16.  পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর কি কাজ




পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির ১৯ বছর পূর্তিতে কয়েকটি প্রস্তাব

ইব্রাহীম

মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

ইনসার্জেন্সি নামক শব্দটির হুবহু বাংলা প্রতিশব্দ নেই। অনুরূপ কাউন্টার-ইনসার্জেন্সি শব্দমালারও হুবহু বাংলা প্রতিশব্দ নেই। পৃথিবীর অনেক দেশে ইনসার্জেন্সি শব্দটিকে ব্যবহার না করে, ঐ কর্মযজ্ঞকে, রিভোলিউশনারি ওয়ার-ফেয়ার বলা হয়; এর বিপরীত হবে কাউন্টার রিভোলিউশনারি ওয়ার-ফেয়ার। সার্বিকভাবে এই ধরনের কর্মকা-গুলোকে পৃথিবীর অনেক দেশে লো ইনটেনসিটি ওয়ার-ফেয়ার বলা হয়।

এইরূপ পরিস্থিতিতে, কোনো একটি দেশের বা ভৌগোলিক এলাকায় বসবাসরত জনগোষ্ঠী বা জনগোষ্ঠীর অংশ, রাজনৈতিক ও সশস্ত্র পন্থায় তাদের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে বা সংগ্রাম করে বা যুদ্ধ করে। একই ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত সরকার বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষগুলোও আন্দোলন বা সংগ্রাম বা যুদ্ধকে দমন করার জন্য অথবা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। আন্দোলনকারীদের লক্ষ্যবস্তু অনেক সময় হয়, পূর্ণ স্বাধীনতা; আবার অনেক সময় হয় স্বায়ত্তশাসান।

সম্মানিত পাঠকগণ অনেকগুলো স্থান এবং আন্দোলনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আমি কয়েকটি নাম উল্লেখ করছি। ফিলিপাইনের দক্ষিণে মিন্দানাও প্রদেশে আন্দোলনরত বা সংগ্রামরত মোরো ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট অথবা মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট, প্রথমে স্বাধীনতা চাইলেও পরে স্বায়ত্তশাসনে সন্তুষ্ট ছিলেন এবং আছেন।

ন্যাশনাল স্যোসালিস্ট কাউন্সিল অফ নাগাল্যান্ড নামক দলটি ১৯৫০ এর দশক থেকে সংগ্রাম করছে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে, তাদের স্বাধীনতার জন্য; এখন আন্দোলনটি অতীব ক্ষীণ এবং ম্রিয়মান। নাগাল্যান্ডের একটি জেলা ছিল মিজোরাম; আন্দোলনকারীদের সাফল্য হলো যে মিজোরাম এখন একটি প্রদেশ। ভারতের অন্যতম প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক প্রতিবেশী পশ্চিম সীমান্তে।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে বিখ্যাত পর্যটন জেলা দার্জিলিং; দার্জিলিংকে কেন্দ্র করে ওখানকার গোর্খা অধিবাসীগণ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন গোর্খাল্যান্ড নামক একটি আলাদা স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশের জন্য। আন্দোলনকারীদের সাফল্য হলো, ওখানে আলাদা হিল ডিস্ট্রিক্ট সৃষ্টি হয়েছে এবং একটি হিল ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল আংশিক স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করে।

বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক প্রতিবেশী উত্তরে ভারতের দুইটি প্রদেশ যথা মেঘালয় এবং আসাম। উলফা নামক একটি শব্দ বাংলাদেশের প্রায় সকলেই চেনে। উলফা মানে ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অফ আসাম। উলফার দাবি ছিল আসামকে স্বাধীন রাজ্য করা শুধু আসামিদের জন্য। সেটা সম্ভব হয়নি। উপরের চার-পাঁচটি উদাহরণের সঙ্গে মিল রেখে আমি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের আলোচনায় ফিরে আসছি।

khagrachari-picture1-01-12-2016

পাকিস্তান আমলে ভালোমন্দ সুবিধা-অসুবিধা অনেক কিছুই হয়েছে যার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী পাকিস্তান সরকারের উপরে অসন্তুষ্ট ছিল। তারা চাইলেও ভালো না চাইলেও ভালো, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায় ১৯৭১ সালে।

স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচনার সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিগণ, পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে, তাদের জন্য কিছু সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক বা আইনগত সুযোগ-সুবিধা চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নিকটও গিয়েছিলেন। তারা পাননি। অতএব তাদের অসন্তুষ্টি বেড়ে গিয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে তারা আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল।

একটি রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করেছিল যার নাম পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। সংক্ষেপে পিসিজেএসএস। এই পিসিজেএসএস-এর অঙ্গ সংগঠন ছিল একটি সশস্ত্র উপদল যার নাম শান্তিবাহিনী। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর থেকে পিসিজেএসএস তথা শান্তিবাহিনী বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দেয়। এই যুদ্ধটিকে আমরা ইনসার্জেন্সি শব্দ দ্বারা অভিহিত করতে পারি। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ সরকার কাউন্টার ইনসার্জেন্সিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইনসার্জেন্ট গ্রুপ তথা শান্তিবাহিনী তাদের দাবি-দাওয়া আনুষ্ঠানিকভাবে অনেক দেরিতে উপস্থাপন করে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ, ধরেই নিয়েছিল যে, তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র চায় অথবা বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভারত নামক রাষ্ট্রের অংশ হতে চায়।

১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর মাসের ১৭ তারিখ প্রথমবার, তাদের দাবি-দাওয়া লিখিত আকারে সরকারের হাতে আসে। বিস্তারিত এই ক্ষুদ্র পরিসরের কলামে উল্লেখ করতে পারছি না তবে একটি প্রামাণ্য বই যার নাম “পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ পরিস্থিতির মূল্যায়ন”-এর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। ঢাকা মহানগরের বেইলি রোডে সাগর পাবলিশার্স অথবা শাহবাগে পাঠক সমাবেশ অথবা চট্টগ্রামের প্রেস ক্লাব বিল্ডিং এর নিচের তলায় বাতিঘর নামক দোকানে অথবা অন্যান্য সম্ভ্রান্ত পুস্তক বিক্রেতাদের নিকট অথবা রকমারিডটকম-এ বইটির সন্ধান পাওয়া যাবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যারাই গভীরভাবে চিন্তা করতে চান, তাদের জন্য এই বইটি প্রয়োজনীয়। বেশি না লিখতে পারলেও একবাক্যে বলবো যে, শান্তিবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ হিসেবে দাবি করেছিল এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ফেডারেশন করার প্রস্তাব করেছিল। ঐ প্রস্তাবের অন্তর্নিহিত প্রবণতা ছিল যে, এটি বিচ্ছিন্নতাবাদের দিকে যেতে পারে।

ইনসার্জেন্সি এবং কাউন্টার ইনসার্জেন্সি একটি চলমান প্রক্রিয়া। সংঘাত চলছিল। সরকারের পক্ষ থেকে বিবিধ কল্যাণমুখী পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু সমস্যা সমাধানের গ্যারান্টি দেওয়া বা নিশ্চয়তা দেওয়া প্রক্রিয়া নয়। শান্তি স্থাপন করতে চাইলে, স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক চাহিদা পূরণ করতে চাইলে, সরকার এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে প্রত্যক্ষ আলোচনা অবশ্যই করতে হবে। উভয় পক্ষকেই কোনো কোনো ক্ষেত্রে কৌশলী হতে হবে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্পষ্টবাদী হতে হবে।

khagrachari-picture2-01-12-2016

এই পরিপ্রেক্ষিতেই পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি আলোচনা চলেছিল। একটি পর্যায়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম। পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে যতটুকু আনুষ্ঠানিক শান্তি বিদ্যমান সেটি দুইটি ধাপে অর্জিত হয়েছে। প্রথম ধাপ ছিল ১৯৮৭-৮৮-৮৯ সালের শান্তি প্রক্রিয়া। এই প্রথম ধাপের মাধ্যমে তিনটি পার্বত্য জেলায় আংশিকভাবে স্বায়ত্তশাসিত কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে স্থানীয় সরকার জেলা পরিষদ গঠন হয়েছিল।

দ্বিতীয় ধাপ ছিল ১৯৯৭ সালের শান্তি প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে, তিনটি জেলা পরিষদের উপরে একটি আঞ্চলিক পরিষদ স্থাপিত হয়েছিল। দ্বিতীয় ধাপে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে; সশস্ত্র আন্দোলনকারীগণ আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পন করেছে (বাস্তবে পূর্ণাঙ্গ হোক বা না হোক)। দ্বিতীয় ধাপের চুক্তির ফলশ্রুতিতে, অনেকগুলো কঠিন প্রশ্ন উঠে এসেছে যেগুলো সমাধান না হওয়ার কারণে, পার্বত্য চট্টগ্রামে কাক্সিক্ষত শান্তি এখনও আসেনি।

২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ তারিখ থেকে ২ ডিসেম্বর ২০১৬ হলো ১৯ বছর। ১৯ বছরে, ঐ শান্তি চুক্তির ধারাগুলো কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে বা হয়নি সেটা আনুষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। মূল্যায়ন করার কর্মটি তিনটি আঙ্গিকে বা তিনটি উৎসে বা তিনটি উদ্যোগে করা যেতে পারে।

প্রথম আঙ্গিক বা উৎস হলো বাংলাদেশ সরকার এবং পিসিজেএসএস এর মধ্যে আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা বৈঠক যেটি মিডিয়াতে কাভারেজ পাবে। দ্বিতীয় আঙ্গিক বা উৎস হলো, বাংলাদেশের সুশীল সমাজ। সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের সুশীল সমাজও অবশ্যই শামিল হবেন। তৃতীয় উৎস বা উদ্যোগ হতে পারে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে।

বাংলাদেশের দুইটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল, চারটি মাঝারি রাজনৈতিক দল এবং অনেকগুলো নিবন্ধিত ছোট রাজনৈতিক দল আছে। কোনো না কোনো একটি রাজনৈতিক দলের উদ্যোগে একাধিক দিনব্যাপী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং অ-রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সম্মিলনে এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়।

যতকিছুই আমরা বলি, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাটির অনেকগুলো আঙ্গিক আছে যথা (১) মানবিক বা হিউমেনিটারিয়ান, (২) ডেমোগ্রাফিক বা জনসংখ্যা তাত্ত্বিক, (৩) অর্থনৈতিক, (৪) উন্নয়নমূলক, (৫) জাতিগঠনমূলক, (৬) জননিরাপত্তামূলক এবং (৭) রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তামূলক। এই সকল আঙ্গিককে সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করতে এবং সার্বিক মূল্যায়ন করতে হলে রাজনৈতিক অনুঘটকীয় ভূমিকা অবশ্যই প্রয়োজন।

পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি নিয়ে সমস্যা আছে। অর্থাৎ ভূমির মালিক কে? এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন। পাহাড়ি ভাইয়েরা মনে করেন সম্পূর্ণ ভূমির মালিক তারা। আমরা মনে করি ভূমির আংশিক মালিক তারা, আংশিক মালিক বাংলাদেশ সরকার এবং আংশিক মালিক বাংলাদেশের আইন মোতাবেক অন্যান্য মানুষ।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির কোনো আধুনিক জরিপ হয়নি। সারা বাংলাদেশে তথা সারা দক্ষিণ এশিয়ায় যেই জরিপ প্রক্রিয়াকে ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে বা সিএস বলা হয় সেটি পার্বত্য চট্টগ্রামে হয়নি। গত তিরিশ বছরে, বাংলাদেশ সরকার অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এর গভীরে যাওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে, বাংলাদেশের অন্যান্য সমতল জেলাগুলো থেকে, ভূমিহীন গরিব বাঙালি পরিবারগুলোকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপনের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এই প্রক্রিয়ায়, শান্তি বাহিনী প্রচ- রকমের বিরোধিতা এবং বাধার সৃষ্টি করেছিল। শান্তি বাহিনীর আক্রমণে হাজার হাজার বাঙালি নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

প্রতিক্রিয়ায় উত্তেজিত বাঙালি জনগোষ্ঠীর আক্রমণে হাজার হাজার উপজাতীয় জনগণ আহত বা নিহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কয়েক হাজার উপজাতীয় জনগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামের পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ভারতের ত্রিপুরা প্রদেশের মাটিতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। সেই সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। বাঙালিদের ওপর শান্তি বাহিনীর আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে, অনেক স্থানেই বাঙালি জনগণকে তাদের জায়গা-জমি ও বসতভিটা থেকে দূরে সরিয়ে এনে গুচ্ছগ্রামে স্থান দেওয়া হয়।

ফলে বাঙালিদের জায়গা-জমি ও বসতবাড়িগুলো আংশিকভাবে পরিত্যক্ত হয় ও আংশিকভাবে বে-দখল হয়। এই নিয়ে ভূমি সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। সার্বিকভাবে ভূমি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। ভূমি নিয়ে সৃষ্ট বিরোধগুলো সমাধানের জন্য, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করা হয়েছে। যে প্রক্রিয়ায় এই কমিশন দায়িত্ব পালন করবে, এই প্রক্রিয়াটি বিতর্কিত এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্তত ৪৫ ভাগ জনগণের স্বার্থের প্রতিকূলে বলে প্রবলভাবে বিশ্বাস করা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির মালিকানা বা অন্ততপক্ষে কৃষি জমিগুলোর মালিকানা ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর বসতি স্থাপন পারস্পরিকভাবে সম্পর্কিত। অপরপক্ষে বাঙালি জনগোষ্ঠীর বসতি স্থাপন এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তামূলক কর্মকা- পারস্পরিকভাবে সম্পর্কিত। আবার এটিও সত্য যে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র এবং তার সরকার, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে কীরূপ আচরণ করে সেটির দিকে বহির্বিশ্বের অনেকেই তাকিয়ে থাকে।

অতএব চুক্তি স্বাক্ষরের ১৯তম বছরে ভূমি সমস্যার বিভিন্ন আঙ্গিক এবং বিতর্কগুলোর গভীরে যাওয়া প্রয়োজন। আমার স্থায়ী সুপারিশ, বাঙালিগণ থাকবেই, বাঙালি জনগণ যেন পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নিজে নিজে চলে যায় অথবা তাদেরকে যেন সহজে ভাগিয়ে দেওয়া যায়, ঐজন্য যত প্রকারের পরোক্ষ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ অতীতে নেয়া হয়েছে, বর্তমানে চলমান আছে ও ভবিষ্যতে নেওয়া হতে পারে সেগুলোকে বিশ্লেষণ করতে হবে এবং সংশোধন করতে হবে।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার মাধ্যমে, ব্রিটিশ বাণিজ্যিক শক্তি, রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তৎকালীন বঙ্গ প্রদেশে স্থিত হয়। ঐ ১৭৫৭ সালের জুন মাসের কথা যদি মনে করি, তৎকালীন ভারতবর্ষের আরও কয়েকটি জায়গায় ব্রিটিশরা রাজনৈতিকভাবে স্থিত হয়েছিল। ক্রমান্বয়ে পরবর্তী ১০০ বছর ধরে, ব্রিটিশরা তৎকালীন ভারতের বৃহৎ পরিসরে তাদের দখল ও শাসন কায়েম করে।

১৮৫৭ সালে আনুষ্ঠানিভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিদায় হয় এবং লন্ডনে অবস্থিত ব্রিটিশ রাজ সিংহাসন (ইংরেজি পরিভাষায় ব্রিটিশ ক্রাউন) ভারত শাসনের দায়িত্ব নেয়। ১৮৫৭ সালের পরেও ব্রিটিশদের দখল প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। বিশেষ করে তৎকালীন ভারতের সীমান্তবর্তী বা প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো ক্রমান্বয়ে দখলে নিতে থাকে। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো এবং তাদের মানুষগুলোর সঙ্গে মূল ভারতের মানুষগুলোর সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক মানদ-ে প্রভূত তারতম্য ছিল।

তাই ঐ প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোকে শাসন করার জন্য ব্রিটিশরা ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। ঐরূপ অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলকে তারা এক্সক্লুডেড এরিয়া ঘোষণা করেছিল অর্থাৎ মূল শাসনের বাইরে তারা। পার্বত্য চট্টগ্রামও এক পর্যায়ে এইরূপ এক্সক্লুডেড এরিয়া হয়। ভারতের বিভিন্ন সীমান্তের এক্সক্লুডেড এরিয়াগুলো শাসনের জন্য, একেক এরিয়ার জন্য একেক রকম শাসন পদ্ধতি ব্রিটিশরা চালু করেছিল।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য ১৯০০ সালে তারা একটি শাসন পদ্ধতি চালু করে। যেই আইনের মাধ্যমে চালু হয় সেটিকে বলা হয় চিটাগং হিল ট্রাক্টস রেগুলেশন তথা রেগুলেশন ওয়ান অফ নাইনটিন হানড্রেড। ব্রিটিশ আমলে এবং পাকিস্তান আমলে এটি আইনের মর্যাদায় ছিল। বাংলাদেশ আমলেও ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ আমলে আরও অনেক বিভিন্ন প্রকারের আইন প্রণয়ন হয়েছে যার সঙ্গে ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধির সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়।

অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রাম নামক বাংলাদেশের ভূখণ্ড এবং সেখানকার মানুষগুলো অনেক প্রকারের আইনের আওতায় পড়েছে এবং সেই আইনগুলোর মধ্যে অনেকগুলো ধারা আছে যেগুলো পরস্পরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিষয়টি কোনো কোনো অজুহাতে বা কারণে মহামান্য হাইকোর্ট পর্যন্ত এসেছে। মহামান্য হাইকোর্টের একাধিক বেঞ্চ, ভিন্ন প্রকৃতির রায় দিয়েছেন এবং রায়গুলোর কোনো কোনো অংশ অন্য রায়ের কোনো কোনো অংশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অতএব, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় কোন কোন নিয়মে চলবে বা চলবে না সেটির গভীরে যাওয়া প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, এখন ১৯০০ সাল নয়, এখন মোবাইল ফোনের যুগ, এখন ইন্টারনেট-এর যুগ এবং এখন সামন্তবাদ ম্রিয়মান।

আজকের কলামে আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির মূল্যায়ন প্রসঙ্গে লিখছি। অতি সংক্ষিপ্ত কলাম। তারপরও দু’চারটি ইশারামূলক কথা বললাম। সর্বশেষ কথাটি হচ্ছে, একটি বাংলা শব্দ নিয়ে। বাংলা শব্দটি হলো ‘আদিবাসী’। এটির ইংরেজি হলো ইন্ডিজেনাস।

আমাদের সুপরিচিত একটি দেশের নাম মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ার পুরানো অধিবাসীদেরকে বলা হয় মালয়। মালয়-অধিবাসীগণ মালয়েশিয়ায় অন্যান্য অধিবাসীদের চাপে কোণঠাসা হয়ে পড়লে, মালয়েশিয়া সরকার তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। মালয়গণকে ভূমিপুত্র বলা হয় অর্থাৎ তারা ঐ ভূমিরই সন্তান।

‘আদিবাসী’ শব্দটির বিশ্লেষণ করলে বলা যায় অরিজিনাল ইনহেবিটেন্স বা যারা পুরনো বা শুরুর থেকে বসবাস করছেন তারা। একটি ইংরেজি শব্দ আছে যথা অ্যাবোরিজিনালস। এই অ্যাবোরিজিনালস শব্দটিকে বদলিয়ে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইন্ডিজেনাস শব্দ এনেছেন। যদি শুধু ইংরেজি শব্দ হতো, তাহলে আপত্তি ছিল না।

২০০৭ সালের পর থেকে যদি কোনো দেশের জনগোষ্ঠীর কোনো অংশকে ইন্ডিজেনাস শব্দ দিয়ে আইনগতভাবে অভিহিত করা হয়, তাহলে সেই ইন্ডিজেনাস জনগোষ্ঠীর অনেকগুলো অধিকার জন্মায়। জনগোষ্ঠী যদি অধিকার পায় তাতে কারো আপত্তির কিছু নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত সেই অধিকারগুলো দেশের বা রাষ্ট্রের বা বৃহত্তর জাতির অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়।

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের অ-বাঙালি জনগোষ্ঠীকে অতীতে উপজাতীয় বা ইংরেজিতে ট্রাইবাল বলতাম। তারপরে তাদেরকে শুধু পাহাড়ি বলতাম। তারপর তাদেরকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বলা শুরু করলাম। কিন্তু ঐ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ চাচ্ছেন বাংলাদেশ সরকার তাদেরকে ‘আদিবাসী’ বা ‘ইন্ডিজেনাস’ বিশেষণ দিয়ে অভিহিত করুক এবং স্বীকৃতি দিক। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্য এইরূপ একটি ঘোষণা দেওয়া বা স্বীকৃতি প্রদান করা অনেক জটিল কাজ।

কারণ, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগণকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আদিবাসী’ ঘোষণা দিলে, বাংলাদেশ সরকারের উপরে অনেকগুলো আইনগত সীমাবদ্ধতা আরোপিত হবে। অপরদিকে ঐ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ অনেকগুলো আইনগত সুবিধা পাবে। এই সীমাবদ্ধতা এবং সুবিধা উভয়টি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিভঙ্গিতে বিপদজনক ও ক্ষতিকারক।

জেনেশুনে বাংলাদেশ নিজের বিপদ ডেকে আনা সমীচীন নয়। জেনে হোক বা না জেনে হোক, বাংলাদেশের মিডিয়ার একটি অংশ সুশীল সমাজের একটি অংশ, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করেন। সামর্থ্য থাকলে বা বিপদের সম্ভাবনা না থাকলে অনেকেই ঐরূপ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আদালতে যেতেন। কারণ, যেটি সংবিধান সমর্থন করে না বা রাষ্ট্রীয় আইন সমর্থন করে না সেটি তারা করছেন।

অতএব, শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের ১৯ বছর পূর্তিতে এসে আমাদেরকে এই বিষয়টির গভীরে যাওয়া প্রয়োজন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ বিডিআর, আনসার ইত্যাদি বাহিনীর বহু রক্ত ঝরেছে। হাজার হাজার বাঙালি এবং পাহাড়ি ভাইবোন প্রাণ দিয়েছেন, আহত হয়েছেন নির্যাতিত হয়েছেন শান্তির লক্ষ্যে দেশের নিরাপত্তার লক্ষ্যে।

অতএব, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সর্বপ্রকারের জনগণের মনের কষ্ট দূর করার জন্য সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে, ইতোমধ্যে গৃহীত পদক্ষেপকে শক্তিশালী করতে হবে, ইতোমধ্যে গৃহীত পদক্ষেপের দুর্বলতাগুলোকে দূরীভূত করতে হবে। পৃথিবীতে ঘোষিত শত্রু যেমন থাকে তেমনই বন্ধুবেশে শত্রুও থাকে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে এটি কোনো ব্যতিক্রম নয়। এই কথা খেয়াল রেখে আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতিমালা পর্যালোচনা করতে হবে। আমি ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন বা রিভিশন প্রস্তাব করছি।
লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
mgsmibrahim@gmail.com




শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সকল পক্ষকে অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হবে

%e0%a6%86%e0%a6%b8%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%ac-%e0%a6%89%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%80%e0%a6%a8

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আসহাব উদদীন, এনডিসি, পিএসসি (অব.)

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এক অপার সম্ভাবনাময় অঞ্চল। সুপ্রাচীনকাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক অবস্থানজনিত কারণে বাংলাদেশের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আজ থেকে প্রায় ১৫৬ বছর আগে, ১৮৬০ সালে, ব্রিটিশ-ভারতের সরকার তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলার পূর্ব অংশের পার্বত্য অঞ্চলকে আলাদা একটি প্রশাসনিক ইউনিট তথা একটি নতুন জেলার সৃষ্টি করে এবং নতুন জেলার নাম দেওয়া হয় ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম’।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়, তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাটি পাকিস্তান তথা পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ হয়ে যায়। অতএব, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাও বাংলাদেশের অংশ হিসেবে অব্যাহত থাকে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে দেশ যখন দ্রুত পুনর্গঠনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল জনগণের ঐক্যবদ্ধতা।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর একটি ক্ষুদ্র অংশ এই যুক্তবদ্ধতার সঙ্গে শামিল না হয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী চেতনায় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। উত্থান হয় ‘শান্তিবাহিনী’ নামক এক সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলের। স্বাভাবিকভাবে অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকার শক্তি প্রয়োগে বাধ্য হয়। ১৯৭৬ সাল থেকে শুরু হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের রক্তাক্ত ইতিহাস। ইতিহাসের সেই রক্তাক্ত পথ থেকে শান্তির পথে পার্বত্য চট্টগ্রামকে উত্তরণে বাংলাদেশের সব সরকারই সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে।

অবশেষে ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে রক্তাক্ত অধ্যায়ের সফল অবসান ঘটিয়ে সূচিত হয় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বাস্তবায়ন। শান্তি চুক্তি ও বাস্তবায়ন : ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘পদ্মায়’ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে তৎকালীন চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর সঙ্গে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি শীর্ষ নেতৃবৃন্দের পক্ষে সন্তু লারমা।

as

এখানে উল্লেখ্য, কোনো প্রকার তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই এবং কোনো বিদেশি শক্তিকে যুক্ত না করেই এ শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন হয়েছিল যা বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম। পৃথিবীর যে কোনো দেশে সাধারণত এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায়। শুরু থেকেই এই চুক্তি বাংলাদেশের বহুল আলোচিত-সমালোচিত চুক্তিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে তৎকালীন সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ শান্তি বাহিনীর দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের সংগ্রামের।

ফলশ্রুতিতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও উন্নয়নের নবযাত্রার সূচনা হয়। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা হবে শান্তি ও উন্নয়নের রোল মডেল। শান্তি চুক্তির শর্তানুযায়ী বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে ভারত থেকে প্রত্যাগত ১২,২২৩টি পরিবারের মোট ৬৪,৬১২ জন শরণার্থীকে পুনর্বাসন করেছে। চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণরূপে এবং ১৫টি ধারা আংশিক রূপে বাস্তবায়ন করেছে। এ ছাড়াও ৯টি ধারার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ৩৩টি বিভাগ/বিষয়ের মধ্যে ৩০টি বিভাগ/বিষয় রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে এবং ২৮টি বিভাগ/বিষয় বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এসব বিভাগে লোকবল নিয়োগে চুক্তির শর্তানুযায়ী ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সদস্যদের প্রাধান্য দেওয়ায় স্থানীয়ভাবে তাদের বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত একটি ব্রিগেড এবং ২৩৯টি অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প গুটিয়ে ফেলা হয়েছে।

ভূমি ব্যবস্থাপনা

শান্তি চুক্তির সবচেয়ে জটিল যে বিষয়টি তা হচ্ছে ভূমি ব্যবস্থাপনা। এর জটিলতার প্রধান কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ না হওয়া। সরকার একাধিকবার পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপের উদ্যোগ নিলেও পাহাড়ি সংগঠনগুলোর বিরোধিতা, অপহরণ ও সন্ত্রাসী তত্পরতার কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে ভূমি কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং সেই কমিশন কাজ করছে। ভূমি কমিশনের প্রধান ছাড়া বাকি সব সদস্যই পার্বত্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রতিনিধি। বিষয়টির ব্যাপকতা এবং জটিলতার কারণেই বাস্তবায়নে একটু বেশি সময় লাগছে সমাধান করতে। শান্তি চুক্তি একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি। দুই পক্ষের জন্যই এই চুক্তিতে পালনীয় কিছু শর্ত রয়েছে।

asss

এটা ঠিক যে, শান্তি চুক্তি সম্পাদনের মূল লক্ষ্য— ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রতিষ্ঠা’ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে এখনো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী পাহাড়ি সংগঠন জেএসএসের সদস্যরা শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য তাদের পক্ষ থেকে সব শর্ত পালন করেনি এবং শুরুতেই একটি অংশ ভাগ হয়ে অস্ত্র সমর্পণে সম্মত হয়নি।

পরবর্তীকালে সেই সংখ্যা আরও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা আরও উন্নত অস্ত্র সংগ্রহ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অসহযোগিতা অব্যাহত রাখে এবং ক্ষেত্র বিশেষে বাধার সৃষ্টি করে। সম্প্রতি, নিরাপত্তা বাহিনীর অপারেশনে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে এবং হচ্ছে।

পাহাড়ি শীর্ষ নেতৃবৃন্দ দাবি করে থাকেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশই অবাস্তবায়িত। কিন্তু পরিসংখ্যান এই দাবি সমর্থন করে না। আমরা জানি, কিছু বাস্তবতার কারণে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হয়েছে। শান্তি চুক্তি বিষয়ে দেশের উচ্চ আদালতে একটি মামলা হাইকোর্টের রায়সহ বিচারাধীন রয়েছে। সরকারকে এসব বিষয় নিয়ে আরও দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সীমান্ত এবং সন্ত্রাসবাদ

পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে বাংলাদেশের দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের অভিন্ন সীমান্ত রয়েছে এবং সেসব সীমান্তে নিজ নিজ দেশের ইমারজেন্সি অপারেশন বিদ্যমান। দুর্গমতার কারণে বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত সেই সীমান্তের একটি বিরাট অংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে ২৬২ কিমি অরক্ষিত সীমানা রয়েছে।

ফলে, সে সব অরক্ষিত দুর্গম সীমান্ত দিয়ে ওই সব দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রায়শই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। এতে করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও বন্ধু দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি এবং ঝুঁকির সৃষ্টি হয়। সম্প্রীতি, বান্দরবান ও রাঙামাটির কয়েকটি স্থানে বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে।

এ ছাড়াও, পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের যোগসাজশে বান্দরবান জেলা থেকে পর্যটক অপহরণসহ বিভিন্ন প্রকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। আরও একটি উদ্বেগের বিষয় হলো সম্প্রতি সমতলের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অস্ত্র কেনাবেচা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সম্পৃক্ততা সম্পর্কিত তথ্যাদি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম থেকে জানা গেছে। এসব প্রেক্ষাপটে জাতীয় স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনঃমূল্যায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

শান্তি চুক্তির সাফল্য

শান্তি চুক্তির ফলে পাহাড়ি শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, দলের অন্যান্য সদস্য এবং পাহাড়ের সাধারণ মানুষ যে সুবিধা ভোগ করছে তা ভুলে গেলে চলবে না। শান্তি চুক্তির পর পাহাড়ে উন্নয়ন প্রবলভাবে গতি পেয়েছে। সমতলের জেলাগুলোর মতো বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো সুবিধা গড়ে উঠেছে। সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করে ইতিমধ্যে পাহাড়ের সব উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যন্ত পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলে স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সালে মাত্র ৪৮ কিমি রাস্তা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য অঞ্চলে নির্মাণ করেছে প্রায় ১৫৩৫ কিমি রাস্তা, অসংখ্য ব্রিজ ও কালভার্ট। এ ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি, আধাসরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, কলকারখানাসহ সম্পন্ন হয়েছে অনেক উন্নয়ন কার্যক্রম।

সরকারের প্রচেষ্টায় পার্বত্য চট্টগ্রামে আজ মেডিকেল কলেজ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে এককালের পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রভূত উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে। যেখানে পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠীর শিক্ষার মান উন্নয়নে মেডিকেল কলেজ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ হচ্ছে সেখানেও কতিপয় স্বার্থান্বেষী নেতৃবৃন্দ বাধার সৃষ্টি করছেন। ইতিহাসে উন্নয়নকে পেছনে টেনে নিয়ে যাওয়ার এমন নজির সম্ভবত আর নেই।

১৯৭০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে মাত্র ছয়টি উচ্চবিদ্যালয়/কলেজ ছিল যার বর্তমান সংখ্যা ৪৭৯টি। প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন প্রায় প্রতিটি পাড়ায়। এ ছাড়াও ৫টি স্টেডিয়াম, ২৫টি হাসপাতাল এবং বর্তমানে ১৩৮২টি বিভিন্ন কটেজ ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার হার ১৯৭০ সালে মাত্র ২% শতাংশ ছিল যা বেড়ে এখন ৪৪.৬% হয়েছে। চাকমা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার হার ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে। আমরা এ অবস্থার আরও উন্নতি দেখতে চাই।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানা এবং পর্যটন সহায়ক শিল্প গড়ে তোলার সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন নতুন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামকে এখন আর বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া কোনো জনপদ বলে দাবি করা যায় না।

অন্যদিকে, সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতায় ৩৫ কিমি দীর্ঘ থানচি-আলীকদম সড়ক নির্মাণ, নীলগিরি ও সাজেকের মতো উন্নত পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন আরও অনেক আকর্ষণীয় ও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এ সুবিধা আরও সম্প্রসারিত করা গেলে নেপাল এবং থাইল্যান্ডের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটন শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৪৫টি নয়নাভিরাম পর্যটন স্পট রয়েছে। সেগুলো সঠিকভাবে বিকাশ করতে পারলে প্রতিবছর ১৫-২০ হাজার কোটি টাকা উপার্জন করা সম্ভব। এতে করে রাষ্ট্র যেমন অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে তেমনি পর্যটন বিকাশের ফলে স্থানীয় পাহাড়ি জনসাধারণের একটি বিরাট অংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে চাঁদাবাজি/সন্ত্রাসী কার্যকলাপ অনেকাংশে কমে যাবে বলে সহজেই অনুমেয়।

assss

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের অবস্থান

প্রথমেই একটি কথা বলা প্রয়োজন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি জনগোষ্ঠী কারও তাড়া খেয়ে, যাযাবর হয়ে বা কারও দয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে যায়নি। রাষ্ট্রের প্রয়োজন মেটাতেই বাঙালি কিছু পরিবারকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসন করা হয়েছে। পাহাড়ের জলবায়ু, ভূমিরূপ ও ফুড চেইন তাদের বসবাসের জন্য উপযোগী ছিল না। তা সত্ত্বেও প্রাচীনকাল থেকে সেখানে বাঙালিদের যাতায়াত ও বসবাস ছিল।

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সহায়তায় ১৯৭৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হলে সেখানে যোগাযোগসহ বিভিন্ন সেক্টরে বিপুল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়। কিন্তু পাহাড়িরা এই কাজে অভ্যস্ত বা অভিজ্ঞ ছিল না। ফলে উন্নয়ন কাজ সমাধা করার জন্য বাঙালি প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। শ্রমিকদের পক্ষে গহিন পাহাড়ি অরণ্যে কাজ করে দিনে দিনে ফিরে আসা সম্ভব ছিল না।

ফলে নিকটবর্তী স্থানে তাদের বসতি গড়তে হয়। কোনো পাহাড়ি শ্রমিক উন্নয়নের কাজে সহায়তা করতে চাইলেও শান্তি বাহিনীর হুমকির মুখে তা পারত না। কারণ, সন্ত্রাসীরা সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নবিরোধী ছিল। শান্তি বাহিনী কর্তৃক নিরীহ বাঙালি হত্যা, নির্যাতন প্রক্রিয়া রোধ করতেই গুচ্ছগ্রাম সৃষ্টি করে বাঙাল ও পাহাড়িদের নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসা হয়।

এ প্রক্রিয়ায় বাঙালিদের জন্য ১০৯টি গুচ্ছগ্রামে ৩১ হাজার ৬২০ পরিবারের ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৫৭ ব্যক্তিকে জায়গা-জমি দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়। এতে বাঙালিরা নিরাপত্তা পেলেও সরকার প্রদত্ত বসতভিটা ও চাষের জমি হারাতে হয়। সেই আশির দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বাঙালিরা আর তাদের সেই ভিটা ও আবাদি জমি ফেরত পায়নি। প্রতিবছর খাজনা দিয়ে ডিসি অফিসের খাতায় জমির দখল স্বত্ব বহাল রাখলেও তাতে বসত করা, আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না।

কারণ জমিতে চাষাবাদ করতে গেলেই পাহাড়ি-বাঙালি দাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমনকি বাঙালিদের চাষকৃত জমির বিভিন্ন ফলদ ও বনজ গাছ এবং আনারস গাছ পর্যন্ত পাহাড়িরা কেটে ফেলে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের অবস্থান

পাহাড়িদের মতে, পাহাড়ের সব জমিই তাদের। বাঙালিদের ভূমিহীন করার কৌশল হিসেবে তাদের জমির খাজনা অনেক পাহাড়ি হেডম্যান গ্রহণ করে না, ডিসি অফিসে দিতে হয়। বসতবাড়ি ও ভিটার জমিতে খাজনা দিয়েও তাদের এই মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। পাহাড়িরা সমতলে এসে বসবাস করার সুযোগ পেলেও সমতলের বাঙালিরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি ও বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে জমি ক্রয় করতে পারছে না।

এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বিভিন্ন শিল্প উদ্যোক্তার সৎ উদ্দেশ্য থাকার পরেও তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো প্রকার শিল্পায়নের প্রসার ঘটাতে ব্যর্থ হচ্ছেন, যা পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা সারা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের একটি প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। বাঙালিরা পাহাড়ে নানা বৈষম্যের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সরকারের দৃষ্টিগোচরে এনেছে। এরমধ্যে পাহাড়ে ব্যবসা করতে গেলে বাঙালিদের কর দিতে হয়, উপজাতিদের দিতে হয় না।

উপজাতিদের ব্যাংকের সুদ ৫%, বাঙালিদের কমবেশি ১৬%। দুই লাখ টাকার নিচের ঠিকাদারি ব্যবসা একচেটিয়া পাহাড়িদের, তার উপরের কাজগুলোরও ১০% পাহাড়িদের জন্য নির্ধারিত। বাকি ৯০ ভাগ ওপেন টেন্ডারে করা হয় যাতে পাহাড়িরাও অংশগ্রহণ করে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এসআই পর্যন্ত পুলিশের সব বদলি/নিয়োগ উপজাতীয় সংগঠন নিয়ন্ত্রিত। জাতীয়ভাবেও চাকরিতে ৫% কোটা তাদের জন্য নির্ধারিত। বিসিএসসহ অন্যান্য সরকারি চাকরিতেও এই কোটা রয়েছে।

বাংলাদেশের খ্যাতনামা এনজিও এবং বিদেশি দূতাবাসগুলোতে চাকরির ক্ষেত্রে তাদের রয়েছে অগ্রাধিকার। একজন পার্বত্য বাঙালি ছাত্র ডাবল জিপিএ-৫ পেয়েও উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে না। অন্যদিকে জিপিএ-৫ বা তার নিচের গ্রেড পেয়ে পাহাড়ি ছেলে-মেয়েরা কোটা সুবিধার কারণে বুয়েট/মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। নানা সুবিধায় তাদের জন্য বিদেশে শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ রাষ্ট্র কর্তৃক উন্মোচিত রাখা হয়েছে।

সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার যেমন অঙ্গীকারবদ্ধ তেমনি অন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেও অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। এ জন্য কিছু সময় ও ধৈর্য প্রয়োজন। অযথা উসকানিমূলক বক্তব্য এবং বাগাড়ম্বর হুমকি সবাইকে পরিহার করতে হবে। আশা করা যায় সব পক্ষই সেই ধৈর্য প্রদর্শন করে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের ধারাকে বেগবান করবে।

প্রকৃতপক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন কোনো একক পক্ষের দ্বারা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সরকারসহ ক্ষুদ্র ও বৃহৎ জাতিসত্তার সম্মিলিত ইচ্ছা ও চেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। নেপাল এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশে সরকার এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় নিজ নিজ দেশে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশে পদক্ষেপ গ্রহণ করে সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। ওই সব দেশে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালীন সময়েও সে দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পর্যটকদের অবাধ যাতায়াতে কোনোরূপ বাধার সৃষ্টি করেনি। পর্যটন শিল্পই যে উন্নয়নের চাবিকাঠি তা তারা সবাই অনুধাবন করতে পেরেছে। আমাদের দেশেও অনুরূপভাবে পর্যটন শিল্প উন্নয়নের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

অতএব, “শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন”-এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের পাশাপাশি অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য চট্টগ্রামে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং পর্যটন শিল্পকে সরকার এবং পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালি সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং আমাদের আঞ্চলিক ও জাতীয় অর্থনীতিতে এই পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে। এ ব্যাপারে সবাইকে অবশ্যই আন্তরিক হতে হবে।

আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, “আমি” বা “তুমি” এবং “আমরা” বা “তারা”য় বিভক্ত না হয়ে, সবাই মিলেই পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, সেখানে বসবাসরত সব পাহাড়ি ও বাঙালি-ই এদেশের গর্বিত নাগরিক। পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে তাদের অবদান অপরিসীম ও প্রশংসার দাবী রাখে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তথা নিরাপত্তা বাহিনী নিজ দেশেরই একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষায় নিয়োজিত। তারা সেখানে কোনো বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে বা যুদ্ধজয়ের জন্য নিয়োজিত নয়। তাদের লক্ষ্যই হচ্ছে শান্তি নিশ্চিত করা। পরিশেষে, পার্বত্য এলাকায় শান্তির পরিবেশ আরও সুসংহত হবে এবং সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় সার্বিক উন্নয়ন সাধিত হবে।

♦ লেখক : সাবেক জিওসি, চট্টগ্রাম সেনানিবাস ও প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত



জনগণকে জানাতে চাই : প্রসঙ্গ পার্বত্য চট্টগ্রাম-৪

জেনারেল-ইব্রাহীম
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

(শেষ পর্ব)

আজ যে কলাম সম্মানিত পাঠক পড়ছেন, সেটি হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে আমার শুধু এই সপ্তাহে নিবেদনের চতুর্থ বা শেষ পর্ব। সাত দিন আগে গত বুধবারে প্রথম পর্ব বের হয়েছিল। মাঝখানে আরো দু’টি পর্ব গিয়েছে। ২০১৫ সালের ১১ মার্চ, ১৮ মার্চ, ২৫ মার্চ, ১ এপ্রিল, ৮ এপ্রিল ১৬ এপ্রিল, ২২ এপ্রিল ২০১৫ এবং সর্বশেষ ৫ মে ২০১৫ তারিখেও ধারাবাহিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে এই পত্রিকাতেই কলাম লিখেছি। এই পরিপ্রেক্ষিতে, পত্রিকার কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি এবং যে পাঠকমণ্ডলী কষ্ট করে আগের তিনটি আর আজকের একটিসহ মোট চারটি পর্ব পড়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। যারা সময়ের অভাবে পড়তে পারেননি তাদের জন্য আমার ওয়েবসাইট যথা : www.generalibrahim.com ঠিকানায় আপ করা আছে। এই ওয়েবসাইটটিতে ঢুকলেই, ‘কলাম’ ক্যাপশনটি নজরে আসবে। ওখানে কলামগুলো পাবেন; উপরে-নিচে গেলেই আগের বা পেছনের কলামগুলো দেখা যাবে। অথবা কেউ যদি আমাকে ইমেইল করেন, তাকে আমরা ইমেইলে কপি পাঠিয়ে দেবো।

সংখ্যা থেকেও গুরুত্ব বেশি দায়িত্বের
পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংখ্যার মধ্যে ৬০-৬৫ শতাংশ বা কারো কারো মতে, ৫২-৫৩ শতাংশ হলো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্য (এথিনিক মাইনরিটি); অবশিষ্টরা বাঙালি। গত ছয় দিনের মধ্যে একটি কলামে উল্লেখ করেছি, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী নিজেদের নাম বা সংজ্ঞা পরিবর্তন করছেন। তারা নিজেদের আদিবাসী (ইংরেজি পরিভাষায় : ইনডিজেনাস) বলতে চান। তারা চাচ্ছেন, বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ২০০৭ সালের জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার ঘোষণা অনুস্বাক্ষর (ইংরেজি পরিভাষায় : রেটিফাই) করুক এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগণসহ বাংলাদেশে যত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠী আছে, বা ক্ষুদ্র জাতিসত্তা আছে, তাদের অফিসিয়ালি ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিক। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়; উপজাতীয় জনগণের ভাষায় এটি তাদের অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত; আমার মতে (এবং আমার মতো লাখ লাখ বাঙালির মতে), এটি বাংলাদেশের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার সাথে সম্পর্কিত বিষয়। অতএব, এখানে এই অনুচ্ছেদে আর বেশি কিছু আলোচনা করছি না। এই কলামে আমি শুধু সহজ আলোচনার স্বার্থে, ‘উপজাতি’ শব্দটি ব্যবহার করছি।


এই সিরিজের আগের লেখা পড়ুন নিচের লিংক থেকে


 জনগণের কষ্ট এবং শান্তিবাহিনীর যুদ্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগণ ইতিহাসের পরতে পরতে কষ্ট, নিগ্রহ আর বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। এটা প্রণিধানযোগ্য। ব্রিটিশ আমলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে করে তারা স্বাধীন অস্তিত্ব বা স্বকীয়তা রক্ষা করতে চেয়েছিলেন; পারেননি। ১৯৪৭-এ তাদের নেতারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু পারেননি। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬২- এই সময়টিতে জনগোষ্ঠীর মারাত্মক স্থান পরিবর্তন (ইংরেজি পরিভাষায় : ডেমোগ্রাফিক রি-লোকেশন) ঘটে, কাপ্তাইতে কর্ণফুলী নদীর ওপর বাঁধ দেয়ার কারণে। বাঁধের কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে কিছু মানুষ চলে যায় ভারতের অরুনাচল ও মিজোরাম প্রদেশে; ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বৃহদাংশ যায় বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন স্থানে। অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে তারা নতুন জায়গায় নিজেদের ঠিকানা গড়ে নেয়। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাদের বেশির ভাগ নেতা পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেন; ফলে স্বাধীন বাংলাদেশে তারা কঠোর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি অথবা তাদের সশস্ত্র সংগঠন (শান্তিবাহিনী) সামন্তবাদের বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল। হয়তোবা শান্তিবাহিনীর সামনে যুদ্ধে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো পন্থা বাকি ছিল না; হয়তো শান্তিবাহিনী ধৈর্য ধরতে ব্যর্থ হয়েছিল; হয়তোবা শান্তিবাহিনী যুদ্ধ শুরু করার সময়টি বেছে নিতে ভুল করেছিল; কোনটি সঠিক তা হলফ করে বলতে পারব না। ’৭০-এর দশকে আমি নিজেও তো একজন তরুণ অফিসার ছিলাম। সব মিলিয়ে পুরো জনগোষ্ঠী সঙ্কটে পড়েছিল এবং পড়েছে। সামন্তবাদ উচ্ছেদ হয়নি; বাংলাদেশ সরকার উচ্ছেদ হয়নি। তবে হ্যাঁ, বাংলাদেশ সরকারের কাছে কিছু বিষয় উদ্ভাসিত বা প্রতিভাত হয়েছে।

শান্তি স্থাপন ও শান্তিবাহিনীর চাহিদা : উভয়ের সমন্বয়
পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি স্থাপনের নিমিত্তে, রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের ইতিহাস ১৯৭৭-৭৮ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় সংসদ কর্তৃক চারটি আইন পাস করা হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে; সেগুলোর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্ঘাতপূর্ণ ইতিহাসে নতুন মাইলফলক সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৮৮-৮৯ এর পদক্ষেপগুলোর ওপর ভিত্তি করেই, আরেকটি অতিরিক্ত যোগ করে, ১৯৯৭-এ একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। শান্তি স্থাপনের প্রয়াস এবং শান্তিবাহিনীর চাহিদা, এ দু’টির মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করা কঠিন বৈকি। শান্তিবাহিনী কী চেয়েছিল? তারা চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র বানাতে; পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে গঠিত ক্ষুদ্র প্রদেশটির রাজধানী হবে রাঙামাটি; প্রদেশটির নাম হবে জুম্মল্যান্ড। বড় প্রদেশটির রাজধানী হবে ঢাকা এবং সমগ্র দেশের রাজধানীও হবে ঢাকা। কেন্দ্রের হাতে থাকবে মাত্র চারটি বিষয়; বাকি সব থাকবে প্রদেশের হাতে। এরূপ দাবি ১৯৬৬ সালে (ছয় দফা দাবিনামা) তৎকালীন আওয়ামী লীগ করেছিল তদানীন্তন পাকিস্তানের সরকারের প্রতি। তৎকালীন পাকিস্তানের সরকারগুলো মনে করেছিল, যদি এই ছয় দফা মেনে নেয়া হয় তাহলে আজ হোক কাল হোক, পূর্বপাকিস্তান একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হবে। শান্তিবাহিনী যখন তাদের দাবিনামা আমার হাতে বা আমাদের হাতে দিয়েছিল, আমরাও ঠিক ওই একই আশঙ্কা করেছিলাম। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এসেও, আমি অন্তত নিশ্চিত নই যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নামক রাজনৈতিক দলটি, পার্বত্য চট্টগ্রামকে প্রদেশ করার প্রকাশ্য বা গোপন দাবি থেকে সরে এসেছে। প্রত্যেকটি দেশই তাদের প্রান্তিক অঞ্চল নিয়ে শঙ্কিত থাকে, বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়; ভারত অধিকৃত কাশ্মির (বা ভারতীয় কাশ্মির) এর জ্বলন্ত উদাহরণ।

আমাদের স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন
শান্তিবাহিনী কর্তৃক উপস্থাপিত পাঁচ দফা দাবিনামা নিয়ে আলোচনা না করলেও, বাংলাদেশ সরকার এটি স্বীকার করেছিল এবং আমরা এখনো স্বীকার করি এবং সর্বতোভাবে কামনা করি, বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায়, সংবিধানের সংশ্লিষ্ট আর্টিক্যালগুলোর উদার ব্যাখ্যার মাধ্যমে, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা উপজাতীয় জনগণের ধর্মীয়, ভাষাগত, সাংস্কৃতি, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সুরক্ষা যেন দেয়া হয়। ষোলো কোটি মানুষের দেশে, সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চার থেকে পাঁচ লাখ ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেয়ার অলংঘনীয় দায়িত্ব বাকি পনেরো কোটি পঁচানব্বই লাখ মানুষের। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগণের স্বকীয়তা রক্ষার জন্য অবশ্যই আইনগত বা সাংবিধানিক ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিকভাবে আমরা মূল্যায়ন করেছিলাম যে, স্থানীয় সরকার পদ্ধতির মাধ্যমে, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের করা ক্ষমতায়ন ও আংশিকভাবে নিজস্ব প্রশাসন দেয়া যেতে পারে। এর ভিত্তিতেই ১৯৮৮ সালের অক্টোবরে সমঝোতা হয়েছিল এবং ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে আইন প্রণীত হয়েছিল। যারা এই অনুচ্ছেদের বক্তব্যগুলোর আগের কথা খুঁজছেন, তারা মেহেরবানি করে গত সাত দিনে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট তিনটি কলাম পড়ুন। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলামÑ এমন কোনো বন্দোবস্ত করা যাবে না, এমন কোনো পরিবেশ সৃষ্টি করা যাবে না, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের অখণ্ডতা বা একক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য (ইংরেজি পরিভাষায় : ইউনিটারি ক্যারেক্টার অফ দি স্টেট) হুমকির মুখে পড়ে। ওই সময় (১৯৮৮-৮৯) শান্তিবাহিনী ওই বন্দোবস্তগুলোর বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু ১৯৯৭ সালে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে আলোচনাকালে তারা এগুলোকে মেনে তো অবশ্যই নিয়েছিল, অতিরিক্ত আরো কিছু দাবি করে আদায় করে নিয়েছিল। ১৯৯৭ সালে সরকার যে শান্তিচুক্তি করেছে, সে শান্তিচুক্তি এবং এর থেকে প্রসূত রিজিওনাল কাউন্সিল নামক প্রতিষ্ঠানটি অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের চোখে প্রশ্নবোধক, অনেক সাংবিধানিক বিশ্লেষকের চোখে প্রশ্নবোধক, এমনকি হাইকোর্টের একাধিক রায়েও প্রশ্নবোধক। রিজিওনাল কাউন্সিল কি ওই অঞ্চলের জন্য স্বায়ত্তশাসনের দুয়ার খুলে দিলো? অথবা, প্রাদেশিক মর্যাদা প্রাপ্তির দাবি পুনরুজ্জীবিত করবে? বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক দৃশ্যপট কেমন হতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যুগপৎ আশঙ্কাজনক ও অনিশ্চিত।

বাংলাদেশের সংবিধান ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী
বাংলাদেশের সংবিধান লিখিতভাবে বা প্রকাশ্যভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ কোনো মর্যাদা দেয়নি; যেমন কিনা ব্রিটিশ আমলে এবং পাকিস্তান আমলে দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের সংবিধান কোনো অঞ্চলের কোনো জনগোষ্ঠীকেও ‘পশ্চাৎপদ’ বলে ঘোষণা দেয়নি; এমনকি পশ্চাৎপদতা নির্ণয়ের প্রক্রিয়া বা মাপকাঠি সম্বন্ধেও কোনো বিধান রাখেনি। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩, ২৩ক, ২৪, ২৭, ২৮ এবং ২৯ নম্বর আর্টিক্যালে কিছু বক্তব্য আছে, যেই বক্তব্যগুলো সরকারকে শক্তি জোগায় অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কল্যাণের নিমিত্তে বিবিধ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আইনগত পদক্ষেপ নিতে। এর ওপর ভিত্তি করেই ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আইনগুলো করা হয়েছিল; এবং ১৯৯৮ সালের আইনগুলো করা হয়েছিল। ২০১৬ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে যে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধন করা হলো, সেই অরিজিনাল আইনটিও ’৯৭-এর শান্তিচুক্তি থেকে প্রসূত।

পশ্চাৎপদতা দূর করার উদ্যোগ
আমাদের সাধারণ অনুভূতি মোতাবেক, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী অনগ্রসর ছিল। এই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমল থেকে শুরু করে আজ অবধি বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকার, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীকে পশ্চাৎপদ বলে মনে করে এবং সেই পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে অনেক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ওই সব পদক্ষেপের কারণে, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর বৃহদংশ, সাধারণ জ্ঞান বা সাধারণ অনুভূতি মোতাবেক এখন আর পশ্চাৎপদ নেই। বরং পার্বত্য চট্টগ্রামে গত পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ বছর বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠী এবং বান্দরবান জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসরত উপজাতীয় জনগোষ্ঠী পশ্চাৎপদ রয়ে গেছেন। প্রবাদ বাক্য আছে, রোম মহানগরী একদিনে নির্মিত হয়নি (ইংরেজি পরিভাষায় : রোম ওয়াজ নট বিল্ট ইন অ্যা ডে)। আজকের পৃথিবী যে পার্বত্য চট্টগ্রাম দেখছে সেটিও একদিনে হয়নি; বহু মানুষ, বহু সংগঠন, বহু লেখক, বহু সামরিক ব্যক্তি, বহু রাজনৈতিক ব্যক্তি, বহু সাংবাদিক, বহু সরকারি আমলা, বহু উপজাতীয় নেতা ও মানুষ, সে প্রক্রিয়ায় অবদান রেখেছেন। কিন্তু কাজগুলো করতে গেলেই কোনো না কোনো প্রকারের ত্রুটি বা ব্যত্যয় হতেই পারে। অতএব, উত্তরসূরি প্রজন্মের দায়িত্ব হলো, সেই ত্রুটিগুলোকে সংশোধনের নিমিত্তে উদ্যোগ নেয়া। পার্বত্য চট্টগ্রামেও এরূপ বৃহত্তর মঙ্গলপ্রচেষ্টার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়, অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। যেমনÑ সাদামাটা ভাষায় বলা যায়, শান্তি আলোচনা করাটা অত্যন্ত বৈধ ও প্রয়োজনীয়; শান্তিচুক্তি করাটাও বৈধ ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু চুক্তির ফলে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কিছু করা কাম্য নয়। অপর ভাষায় বলতে গেলে, এই দাঁড়ায়, যা করা হবে তাকে সংবিধানের আওতাতেই রেখে করতে হবে; অথবা সংবিধানকে সংশোধন করতে হবে।

একাধিক আইনের সমন্বয় প্রয়োজন
আমি বা আমার মতো নিশ্চয়ই শত-সহস্র আছেন যারা কায়মনোবাক্যে চাচ্ছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি শান্তিপূর্ণ অঞ্চল হয়ে উঠুক। এরূপ অঞ্চল হওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে, সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হতে হবে, এবং জনগণের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি সৃষ্টি করতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই মুহূর্তের পার্বত্য চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত নয়; সশস্ত্র বিশৃঙ্খলা দৃশ্যমান; চাঁদাবাজি চরম পর্যায়ে আছে এবং গুম খুন ইত্যাদি অপরাধ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে দু’টি প্রধান সম্প্রদায় আছে যথা উপজাতীয় জনগোষ্ঠী এবং বাঙালি জনগোষ্ঠী। উপজাতীয় জনগোষ্ঠী কর্তৃত্বের পর্যায়ে বা সুবিধাজনক পর্যায়ে আছে; বাঙালি জনগোষ্ঠী আতঙ্কজনক অবস্থায় এবং মানসিক অনিশ্চয়তার পর্যায়ে আছে। এর কারণগুলো গত ছয় দিনের তিনটি কলামে আলোচনা করেছি। সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রশাসন নিয়ে। অবশ্যই প্রশাসনে কর্মরত ব্যক্তিদের দিকে ইঙ্গিত করছি না। আমি ইঙ্গিত করছি পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে যে সব আইন বা বিধিবিধান প্রযোজ্য সেগুলোর সমন্বয়হীনতার প্রতি, পারস্পরিক অসামঞ্জস্যতার প্রতি, আইন বা বিধিবিধান প্রণয়নকারী কর্তৃপক্ষের অমনোযোগিতার প্রতি।

প্রযোজ্য আইনের অসংলগ্নতা
ব্রিটিশ আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে শান্তিপূর্ণভাবে শাসন করার জন্য প্রণীত হয়েছিল চিটাগাং হিল ট্রাক্টস রেগুলেশন অব ১৯০০। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ এবং বাংলাদেশ হওয়ার পর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ দেশের প্রয়োজনে আগের আমলের অনেক আইনকে অ্যাডাপ্ট বা চলমান করে নিয়েছেন এবং নতুন নতুন অনেক আইন প্রণয়ন করেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য কিছু আলাদা আইনও প্রণয়ন করা হয়েছে। সারা দেশের জন্য যেসব আইন আছে, ওই আইনগুলোর মধ্যে কিছু কিছু আইন অথবা আইনের অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য অপ্রযোজ্য ঘোষণা করা হয়েছে। সারা দেশের জন্য যেসব আইন আছে, ওই আইনগুলোর মধ্যে কিছু আইনের ভাষায় বা ভাষ্যে এমন কিছু বলা নেই যে, এটা পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রযোজ্য, না কি অপ্রযোজ্য? কোনো কোনো আইনে লেখা আছে, এই আইনটি অতীতের আইনের ওপর অগ্রাধিকার পাবে। কিন্তু কোনো আইনেই অতি সুস্পষ্টভাবে লেখা নেই যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯০০ সালের শাসনবিধি এখনো বলবৎ আছে কি নেই; কেউ বলছেন আছে, কেউ বলছেন নেই; কোনো মহামান্য আদালত বলছেন, বলবৎ আছে; কোনো মহামান্য আদালত বলছেন, বলবৎ নেই। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন প্রয়োজনে বিভিন্ন আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। জটিলতার কারণে বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে, বিরোধের কারণে মামলার পাহাড় গড়ে উঠছে। এখানে সুস্পষ্টভাবে আরো একটি বিষয় তুলে ধরছি।

১৯৯৭ এর পরে সৃষ্ট আইনি প্রশ্ন
বিশেষ করে ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির পর, জেলা পরিষদগুলোর পরিচয় থেকে ‘স্থানীয় সরকার’ শব্দগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে রাঙামাটিতে একটি আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়েছে। কেউ বলছেন ওই আঞ্চলিক পরিষদ বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক, কেউ বলছেন সাংঘর্ষিক নয়। এই নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা হয়েছে। একই প্রকারের মামলার রায়, বিভিন্নমুখী হয়েছে। আমাদের তিনটি বিষয় নির্ধারণ করতেই হবে ০১. পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা পরিষদ বা একমাত্র আঞ্চলিক পরিষদ বাংলাদেশের সংবিধানের সুনির্দিষ্ট কয়েকটি আর্টিক্যালের সাথে বা ইতোপূর্বে প্রদত্ত সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সাথে সাংঘর্ষিক কি না; অথবা সাংঘর্ষিক নয়। ০২. সিএইচটি রেগুলেশন অভ ১৯০০ পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য এখনো কি পূর্ণভাবে প্রযোজ্য, না কি আংশিকভাবে প্রযোজ্য, না কি কোনোমতেই প্রযোজ্য নয়? ০৩. বিশেষত ভূমি প্রশাসন বিষয়ে বা ভূমিসংক্রান্ত সার্বিক বিষয়ে, বাংলাদেশের কোন কোন আইন পার্বত্য চট্টগ্রামে, কতটুকু পরিমাণ প্রযোজ্য বা প্রযোজ্য নয়?

অনেক মামলা ও রায়ের উদাহরণ
এই অনুচ্ছেদে অনেক মামলার উল্লেখ করছি। এই মামলাগুলোতে রায় হয়েছে। কোনোটির রায় পক্ষে কোনোটির রায় বিপক্ষে। এই কলামের সম্মানিত পাঠকদের মধ্যে, যারা আইন বিষয়ে আগ্রহী ও বিজ্ঞ, তারা কষ্ট করে এগুলো নিয়ে একটু চিন্তা করবেন এবং কী করলে সমাধান হয়, তা নিয়ে গবেষণা করবেন বলে আমি আহ্বান জানাচ্ছি। মামলার নামগুলো যদিও ইংরেজিতে থাকে, এখানে বাংলায় লিখে দিচ্ছি। এক. রাঙামাটি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড ভার্সাস কমিশনার অফ কাস্টমস অ্যান্ড আদারস রিপোর্টেড ইন ১০ বিএলসি (২০০৫) ৫২৫। দুই. মুস্তাফা আনসারী ভার্সাস ডিসি সিএইচটি অ্যান্ড অ্যানাদার (৭ ডিএলআর ১৯৬৫, ৫৫৩)। তিন. কালেক্টার অভ সেন্ট্রাল এক্সসাইজ অ্যান্ড ল্যান্ড কাস্টমস ভার্সাস আজিজুদ্দিন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (২৩ ডিএলআর এসসি, ১৯৭১, ৭৩)। চার. স্যুজ হ্লা প্রু টিকে ভার্সাস কমিশনার চিটাগং অ্যান্ড আদার্স (৪৪ ডিএলআর, ১৯৯২, ৫৩৯)। পাঁচ. অং স্যু প্রু চৌধুরী ভার্সাস ক্যয় সাইন প্রু চৌধুরী অ্যান্ড আদার্স (৫০ ডিএলআর, এডি, ১৯৯৮, ৭৩)। ছয়. সম্প্রীতি চাকমা ভার্সাস কমিশনার অভ কাস্টমস অ্যান্ড আদারস (৫ বিএলসসি ২০০১, ৪৩৬)। সাত. বিক্রম কিশোর চাকমা ভার্সাস ল্যান্ড অ্যাপিল বোর্ড (৬ বিএলসি ২০০১, ৪৩৬)। আট. বিএফআইডিসি অ্যান্ড আদার্স ভার্সাস শেখ আব্দুল জাব্বার (৫৪ ডিএলআর ২০০১)। নয়. আবু তাহের ভার্সাস ল্যান্ড আপিল বোর্ড (৮ বিএলসি, ২০০৩, ৪৫৩)। দশ. রাজ কুমারী উনিকা দেবী ভার্সাস বাংলাদেশ অ্যান্ড আদার্স (৯ বিএলসি, এডি, ২০০৪, ১৮১)। এ ছাড়াও যে তিনটি মামলার রায় আমি নিজে পড়েছি, সেগুলোও উল্লেখ করলাম। এগারো. চারটি রিট পিটিশনের একটি সম্মিলিত রায়। রিট পিটিশন নম্বর ১০৫৮, ২৬৫৯, ২৯৬৬ এবং ৪২১২ অভ ১৯৯৭; জিয়াউর রহমান খান এমপি অ্যান্ড আদার্স ভার্সাস গভর্নমেন্ট অব বাংলাদেশ। রায় দেয়ার তারিখ ৫ আগস্ট ১৯৯৭। বারো. দু’টি রিট পিটিশনের একটি সম্মিলিত রায়। রিট পিটিশন নম্বর ২৬৬৯ অভ ২০০০ মোহাম্মদ বদিউজ্জামান ভার্সাস বাংলাদেশ অ্যান্ড আদার্স এবং রিট পিটিশন নম্বর ৬৪৫১ অফ ২০০৭ অ্যাডভোকেট এমডি তাজুল ইসলাম ভার্সাস বাংলাদেশ অ্যান্ড আদার্স। রায় দেয়ার তারিখ ১২ ও ১৩ এপ্রিল ২০১০। তেরো. একটি আপিল মামলার রায়। সিভিল আপিল নম্বর ১৪৭ অভ ২০০৭; ওয়াগ্গা ছড়া টি এস্টেট লিমিটেড ভার্সাস মোহাম্মদ আবু তাহের অ্যান্ড আদার্স; রায় দেয়ার তারিখ ২ ডিসেম্বর ২০১৪।

সময়ের কাজ সময়ে করা
আমাকে কেউ এই কলামগুলো লিখতে বলেনি। নিজের আগ্রহে, নিজের উদ্যোগে লিখলাম। এই পরিশ্রমের ও আগ্রহের উদ্দেশ্য একটিই, সেটি হলো সচেতনতা সৃষ্টি করা। আমার বা আমাদের কাজ জানিয়ে রাখা; কপালে যা আছে তাই হবে। বাংলায় একটি প্রবাদ বাক্য আছে : ‘গরিবের কথা বাসি হলে ফলে’। আমি প্রতীকী অর্থেই নিজেকে গরিব বলছি। বিনয়ের সাথে জানিয়ে রাখছি, আমি ইচ্ছা করলেও সবসময়ই যে আমার দায়িত্ব পালন করতে পারব এমন নিশ্চয়তা নেই। এরূপ একটি অনিশ্চয়তা সব ব্যক্তির জন্যই প্রযোজ্য। কারণ, অসুস্থ থাকতে পারি, সক্ষমতা হারাতে পারি, আগ্রহও হারাতে পারি। তাই সব উপাত্ত ইতিবাচকভাবে বহাল থাকতে থাকতেই আমার কাজটি করলাম। যেহেতু পত্রিকায় আরো কলাম প্রকাশের নিমিত্তে সময় ও অবকাশ খুব সঙ্কীর্ণ, তাই আমি আমার ওয়েবসাইটে, আলাদা একটি কলাম লিখে রাখবো (শুক্রবার ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬)। কলামটিতে আমি বিভিন্ন ক্রোড়পত্র বা অ্যানেক্সার দিয়েছি এবং ওই অ্যানেক্সারগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক রায়ের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বাক্য উদ্ধৃত করেছি। জ্ঞানীগুণী, কিন্তু ব্যস্ত ব্যক্তিদের জন্য এই কাজটি আমি করে রেখেছি। কেউ ইমেইল করলে তাকেও দিতে পারব।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব.); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি




জনগণকে জানাতে চাই : প্রসঙ্গ পার্বত্য চট্টগ্রাম-৩

ইব্রাহীম

♦ সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

বাঙালি বসতির সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট
আমরা আলোচনা করছিলাম, ১৯৭৬-৭৭-৭৮ এইরূপ সময়ের কথা। শান্তিবাহিনীর শুরু করে দেয়া সশস্ত্র বিদ্রোহ বা যুদ্ধ মোকাবেলার জন্য অন্যতম পদক্ষেপ ছিল সেনাবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ ইত্যাদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন। এসব বাহিনীকে একযোগে আমরা নিরাপত্তা বাহিনী (সিকিউরিটি ফোর্সেস) বলতে পারি। নিরাপত্তা বাহিনী, বিশেষত সেনাবাহিনী মোতায়েনের পর দেখা গেল- ওইখানে পরিবেশ একান্তই বৈরী, কোনো কর্মকাণ্ডে কায়িক শ্রম দেয়ার মতোও কেউ নেই। সরকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বা রাস্তাঘাট নির্মাণ করতে গিয়ে দেখল শ্রমিক নেই।

পাঠক বিশ্বাস করুন বা নাই করুন, বাস্তবতা হলো সব সরকারি কর্মকাণ্ডকে শান্তিবাহিনী একবাক্যে উড়িয়ে দিত। বাক্যটি ছিল এরূপ। সরকার এটা করছে বা ওটা করছে জুম্মু জাতির অস্তিত্ব বিলুপ্ত করার জন্য। অতএব কোনো ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পাহাড়ি জনগণ চাইলেও সরকারকে সহযোগিতা করতে পারত না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ প্রয়োজন ছিল। অতএব সরকার দুঃস্থ, গরিব, নদী ভাঙা এ ধরনের বাঙালি পরিবারগুলোকে বিভিন্ন জেলা থেকে এনে পার্বত্য চট্টগ্রামে যথাসম্ভব (কিন্তু নিরাপত্তার গ্যারান্টি ছাড়া) পরিকল্পিতভাবে বসতি স্থাপনের সুযোগ করে দিলো। তিন-চার বছরের মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ হাজার পরিবার তথা দেড় থেকে দুই লাখ বাঙালি জনগণ বসতি স্থাপন করল। তিনটি পার্বত্য জেলার মধ্যে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতেই বেশি ব্যবস্থা হয়। বাংলাদেশ সরকার ১৯৮২ সালের শেষাংশে এইরূপ প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়।


এই সিরিজের আগের লেখা পড়ুন নিচের লিংক থেকে


বসতি নিয়ে দু’টি প্রশ্ন : রাজনৈতিক ও সামাজিক
তখন, অর্থাৎ আশির দশকের শুরুতে বা শেষে যারা যুবক ছিল, আজ তারা প্রৌঢ় অথবা বৃদ্ধ। তখন যারা বৃদ্ধ ছিল, আজ তারা কবরে; মুরুব্বিদের কবরের সাথে ধর্মীয় ও সামাজিক আবেগ জড়িত। তখন যারা শিশু ছিল আজ তারা নিজেরাই পিতা-মাতা বা অল্প বয়সের দাদা-দাদী বা নানা-নানী। বাঙালিদের বসতি স্থাপন, পিসিজেএসএসের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় ছিল। যদি শান্তিবাহিনী সশস্ত্র বিদ্রোহ না করত বা যদি শান্তিবাহিনী ১৯৭৭-৭৮ সালেই সরকারি আহ্বানে সাড়া দিয়ে আলোচনায় আসত, তাহলে বাঙালিদের বসতি স্থাপনের চিন্তা বা পরিকল্পনা কোনো কিছুই সামনে ওঠে আসত না হয়তো। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে করা হয়েছিল। দরিদ্র নিঃস্ব বাঙালিরা পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রের বা সরকারের আহ্বানে। কিন্তু বসতি স্থাপনের সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী ১৫-২০ বা ২৫ বছর, রাষ্ট্র বা সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি মোকাবেলায় যথেষ্ট সতর্ক না থাকায়, হালনাগাদ না থাকায়, যথেষ্ট কৌশলী না হওয়ায়, এইরূপ বসতি স্থাপনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যেমন ইতিবাচক হয়েছে, তেমন নেতিবাচকও হয়েছে।

বাঙালি বসতির প্রতি শান্তিবাহিনীর প্রতিক্রিয়া
বাঙালি বসতিগুলো অচিরেই শান্তিবাহিনীর ব্যাপক আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। বাঙালিদের বসতি স্থাপন করার সময়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিশ্চিতভাবে ভুল করেছেন অনেক ক্ষেত্রেই, ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক। বসতি স্থাপনের সময় বাঙালি জনগণ অনেক জায়গাতেই সরকারের দেয়া জায়গা-জমির বাইরে তাদের দৃষ্টি বা তাদের হাত প্রসারিত করেছিল। বাঙালিদের বসতি স্থাপনের সময়, সবার মধ্যে না হলেও অনেক পাহাড়ি ভাইদের মধ্যে যেমন উত্তপ্ত বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল, তেমনই অনেক বাঙালি ভাইদের মধ্যেও সনাতন সামাজিক প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছিল অর্থাৎ ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করো। বাঙালিদেরকে ক্ষুদ্র খণ্ড জমি দেয়া হয়েছিল বসতভিটার জন্য এবং কিছু জমি দেয়া হয়েছিল চাষাবাদ করে খাওয়ার জন্য। সরকারের মতে, বাঙালিদের দেয়া জমিগুলো খাস জমি। পাহাড়ি ভাইদের বা শান্তিবাহিনীর মতে, পাহাড়িদের জমিকেও খাস জমি বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে জায়গা-জমি নিয়ে গণ্ডগোল প্রায় প্রথম দিন থেকেই শুরু।

বাঙালিরা ছিল নিরস্ত্র, শান্তিবাহিনী ছিল সশস্ত্র। ক্ষেতে-খামারে কাজ করার সময় অথবা পাহাড়ের ঢালুতে বাগান করার সময় অথবা গ্রামে রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় বাঙালিরা শান্তি বাহিনীর আক্রমণের শিকার হতেন। শান্তিবাহিনী আক্রমণ করেই লুকিয়ে যেত। আক্রান্ত বাঙালিরা, উত্তপ্ত বিক্ষুব্ধতায় প্রতিবেশী পাহাড়ি গ্রামের ওপরে আক্রমণ করত। বাঙালিদের আক্রমণের আগে ভয়ে অথবা আক্রমণের পর পাহাড়িরা জঙ্গলে পালিয়ে যেতেন অথবা ভারতে পালিয়ে যেতেন। এটি হয়ে পড়েছিল একটি দুষ্টচক্র তথা ভিসাজ সাইকেল অব ভায়োলেন্স। এর প্রতিকার প্রয়োজন ছিল। ১০ আগস্ট ২০১৬ পার্বত্যনিউজে প্রকাশিত আমার লেখা কলামের নাম ছিল জুম্মুল্যান্ডের অজানা গল্প সেখানেও আমি এই আক্রমণ ও প্রতি-আক্রমণের কথাগুলো তুলে ধরেছি।

গুচ্ছ গ্রামে এলেও, জমির মালিকানা থেকে যায়
১৯৮৮ সালের এপ্রিল-মে মাসে শান্তিবাহিনীর মারাত্মক আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে, বাঙালি জনগণকে নিজ নিজ বসতি থেকে সরিয়ে আনা হয় সুবিধাজনক বা নিরাপদ ভৌগোলিক অবস্থানে। এগুলোর নাম গুচ্ছগ্রাম। গুচ্ছগ্রামে বাঙালিরা নিজ ইচ্ছায় আসেননি। তৎকালীন এরশাদ সরকারের পরিকল্পনায় ও আহ্বানে বাঙালিরা গুচ্ছগ্রামে এসেছিলেন। তৎকালীন সরকারপ্রধান বলেছিলেন, আমাকে তিন বছর সময় দাও, আমি পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ বা সার্ভে করিয়ে নিচ্ছি, অতঃপর বাঙালিদের পুনরায় তাদের বরাদ্দ ভূমিতে বা ভিটাবাড়িতে ফেরত দেবো। যদি অরিজিনাল বসতি স্থাপনের সময় কোনো ভুলভ্রান্তি হয়ে থাকে, তাহলে ভূমি জরিপ বা সার্ভের পরপরই অরিজিনাল ভুলগুলো সংশোধন করা হবে।

কিন্তু বিধি বাম! ১৯৮৮ সালের অক্টোবরে গুচ্ছগ্রাম হলো; পাহাড়ি সামাজিক ও নাগরিক নেতাদের সাথে সমঝোতা হলো। ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে চারটি আইন পাস হলো; ২৫ জুন তারিখে জেলা পরিষদ নির্বাচন হলো। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এরশাদ সাহেবের পতন হলো। তাহলে ভূমি জরিপ কোথায় গেল? আজ প্রায় ২৮ বছর গুচ্ছগ্রামের বাঙালিরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সরকারের অপ্রতুল রেশনে তারা বেঁচে আছেন। সরকার না তাদের ফেলছে, না তাদের তুলছে। গুচ্ছগ্রামে তারা লাফাতে লাফাতে নিজ ইচ্ছায় যাননি। সেই ১৯৭৮-৭৯-৮০-৮১ সালে যেসব জমির মালিকানা কাগজ তাদের দেয়া হয়েছিল সেগুলো তাদের কাছে আছে। যাদের নামে জমি ছিল তাদেরও অনেকে মারা গেছে হয় শান্তিবাহিনীর আক্রমণে অথবা স্বাভাবিক নিয়মে অসুখ-বিসুখে। মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা নিজেদের নামে সহায়-সম্পত্তি প্রক্রিয়া করতে পারছেন না। বাঙালিদের মালিকানাধীন সহায়-সম্পত্তি নিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাহাড়িদের আপত্তি আছে; অর্থাৎ বিরোধ আছে। পাহাড়িদের মধ্যেও পারস্পরিক বিরোধ আছে। বিরোধ থাকলে নিষ্পত্তি করতে হবে। কিন্তু যেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগতভাবে মূল্যবান ভূখণ্ড, সেহেতু সেখানে যা-ই করা হোক না কেন, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিসহ সব কাজ, সেটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সাথে অনুকূল হতে হবে।

পরিবেশ-পরিস্থিতি: ১৯০০ সাল ও ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দ
পার্বত্য চট্টগ্রামের জায়গা-জমির মালিকানা একটি ক্রান্তিকালীন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের আচার-আচরণ সামাজিক কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রের সাথে ইন্টার অ্যাকশন ইত্যাদি সবকিছু একটি ক্রান্তিকালীন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্রিটিশরা ১৯০০ সালে যে আইন করেছিল, সেই আইন এখনো আছে; কেউ বলছে বহাল এবং বৈধ, কেউ বলছেন সুপারসিডেড এবং অপ্রযোজ্য। পার্বত্য চট্টগ্রামের জায়গা-জমির মালিকানা অতীতে বৃহদাংশে ছিল সামষ্টিক; সবাই মিলেমিশে চাষাবাদ করত, সবাই মিলেমিশে চলত। ১৯০০ সালে যত জনগণ ছিল, ২০১৬ সালে সেই সংখ্যা তিন-চার গুণ বেশি স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু ১৯০০ সালে যতটুকু পাহাড়ি ঢালু জমিতে, জঙ্গল পুড়িয়ে পাহাড়িরা চাষ করতে পারত, ২০১৬ সালে প্রাকৃতিক নিয়মেই ওই জমির পরিমাণ অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। ১৯০০ সালে পাহাড়ি তরুণ-তরুণীরা জুমচাষে যেতে আনন্দ পেতেন এবং এটিই প্রধান কর্ম ছিল; ২০১৬ সালে শিক্ষাদীক্ষা এবং সামাজিক চিন্তা চেতনায় পরিবর্তনের কারণে জুমচাষের প্রতি নিবেদন কমে গিয়েছে। উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। অর্থাৎ যেকোনো জনগোষ্ঠী যেমন আর্থ-সামাজিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রগতি করে, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীও ওইরূপ করছে; অতিরিক্ত যোগ হয়েছে রাজনৈতিক কর্মসূচি বা রাজনৈতিক বিবর্তন।

জমির পরিমাণ এবং ভূমি জরিপ
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক আয়তন কতটুকু, সে সম্বন্ধে সবার ধারণা আছে; বাংলাদেশের দশ ভাগের এক ভাগ। সেখানে সংরক্ষিত বনাঞ্চল আছে, উঁচু উঁচু পাহাড়ি এলাকা আছে, লেক আছে, নদী ও ছড়া আছে, বর্ষাকালে ডুবে যায়; কিন্তু শুকনা কালে চাষাবাদযোগ্য হয় এমন জমি আছে। সাধারণ জ্ঞান বা সাধারণ অভিজ্ঞতার আলোকে বলতেই পারি যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমচাষ ছাড়া সমতলীয় কৃষিযোগ্য জমির পরিমাণ সীমিত। সাধারণত পাহাড় শ্রেণীর মাঝখানে উপত্যকায় অথবা নদী ও ছড়াগুলোর উভয় তীরে অঞ্চলগুলোই আবাদযোগ্য কৃষিজমি। অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা পাঠকের সামনে উপস্থাপন করছি।

কথাটি এই যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনোদিনই বৈজ্ঞানিক বা পদ্ধতিগত ভূমি জরিপ হয়নি। জায়গা-জমি ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে জড়িত যারা, অথবা আইনজীবী সম্প্রদায় অথবা গ্রামের মুরুব্বিরা, আমাদের এই দক্ষিণ-এশীয় উপমহাদেশে যেই ভূমি জরিপকে, প্রথম জরিপ হিসেবে জানি, সেটির নাম ক্যাডেস্টাল সার্ভে বা সিএস জরিপ। ওই সিএস জরিপ পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনোদিন হয়নি; গুরুতর কোনো প্রয়োজন দেখা দেয়নি, সে জন্য জরিপও হয়নি। কালের বিবর্তনে, জরিপ করা এখন সময়ের দাবি। যেখানে সিএস জরিপই হয়নি, সেখানে পরের আরএস-বিএস ইত্যাদি হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। বাঙালি জাতি, বাংলাদেশ সরকার ও পাহাড়ি ভাইদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ হবে কি হবে না?

পাহাড়ি ভাইয়েরা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির মালিক আমরা পাহাড়িরাই; অন্য কারো পদচিহ্ন রাখার জায়গা নেই। ব্রিটিশ সরকার, পাকিস্তান সরকার এবং বাংলাদেশ সরকার বলছে যে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জায়গা সেখান আছে। পাহাড়ি ভাইয়েরা বলেন, মালিকানা ঠিক না করলে জরিপ কার নামে হবে? বাঙালি ভাইয়েরা বলেন, জরিপ না করলে মালিকানা কিভাবে ঠিক হবে? এখন থেকে ১০০ বছর আগে যখন সিএস জরিপ শুরু হয় এই দক্ষিণ-এশিয়া উপমহাদেশে, তখন কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল সেটি কি আমাদের কারো মনে নেই? মনে থাকুক বা না থাকুক, আলোচনা করে নিশ্চয়ই সুপন্থা বের করা যায়।

১৯৮০-এর দশকে একাধিকবার, ১৯৯০-এর দশকে একাধিকবার সরকার পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল, পার্বত্য চট্টগ্রাম জরিপ করার জন্য; কিন্তু পিসিজেএসএসের বিরোধিতার কারণে সেটি করা হয়নি। অতএব, সবাইকে সম্পৃক্ত করে, আলোচনার পর জরিপ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন
একটু আগেই লিপিবদ্ধ করেছি যে, ভূমি নিয়ে বিরোধ ছিল এবং আছে। এই বিরোধ নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরের শান্তিচুক্তিতে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করার কথা বলা ছিল এবং গঠন হয়েছিলও। কমিশন কিছুদিন কাজ করেছিল। ভূমি কমিশনের গঠনে বা সদস্যসংখ্যা নিরূপণে এবং কমিশনের কার্যপ্রণালীতে, শান্তিবাহিনীর আপত্তি ছিল। পিসিজেএসএস সরকারের প্রতি ইত্যাদি বিষয় সংশোধনের জন্য প্রস্তাব দেয়।

২০১৬ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধিত হয়েছে। এখন সংশোধিত আইনই কার্যকর। সংশোধনের পর পরিস্থিতি বন্যার পানির মতো, পাহাড়ি ভাইদের অনুকূলে চলে গেছে। কমিশন গঠন এমনভাবে সংশোধন করা হয়েছে এবং কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এমন করা হয়েছে যে, বাঙালিদের পক্ষে কথা বলার, কোনো আপত্তি দেয়ার বা আপত্তি বিবেচনা করার কোনো অর্থবহ পরিবেশ আর থাকছে না। চেয়ারম্যান হবেন একজন অবসরপ্রাপ্ত মাননীয় বিচারপতি। চেয়ারম্যান ছাড়া কমিশনের সদস্য সংখ্যার মধ্যে ৮০ শতাংশ হচ্ছেন পাহাড়ি। অতএব বিরোধ নিষ্পত্তিগুলো পাহাড়ি পক্ষের অনুকূলে হওয়ার সম্ভাবনা অনেক।

এটা তো গত তিন দশক ধরেই দৃশ্যমান যে, পাহাড়িরা ভূমি নিয়ে বিক্ষুব্ধ এবং বাঙালিরা ভূমি নিয়ে উদ্বিগ্ন। আইন মোতাবেক, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন প্রদত্ত সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত; বাংলাদেশের অন্যত্র সব জায়গায় প্রযোজ্য ভূমি আপিল বোর্ড বা মহামান্য হাইকোর্ট ইত্যাদিতে কোথাও যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন প্রদত্ত রায় চূড়ান্ত ও সর্বশেষ।

কমিশনের সম্ভাব্য রায়গুলোর ফলাফল
ইংরেজিতে প্রবাদ বাক্য আছে, ‘হোপ ফর দ্য বেস্ট অ্যান্ড প্রিপেয়ার ফর দ্য ওয়ার্স্ট।’ মানে হলো, সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতির জন্য প্রার্থনা কর বা আশা কর, কিন্তু সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ কর। আমরা একটি পরিস্থিতি কল্পনা করি। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে তিন হাজার বিরোধ নিষ্পত্তি করল। আমরা কল্পনা করি, নিষ্পত্তি হওয়া বিরোধের মধ্যে রায় ৮০ শতাংশই বাঙালিদের বিপক্ষে গেল। অতএব, যারা জায়গা-জমি হারালেন, সেই সব বাঙালি কোন দিকে যাবেন? আমি জানি না। আসলে কী ঘটবে, কী ঘটতে পারে, জানি না। জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা সবাই মিলে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে পারলে ভালো হতো।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর, সেই চুক্তির নেতিবাচক আঙ্গিকগুলোর প্রতিবাদে বা চুক্তির কারণে আগামী দিনের নেতিবাচক পরিস্থিতির প্রতিবাদে, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ঢাকা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামমুখী লংমার্চ হয়েছিল। সেটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় প্রতিবাদ। কিন্তু ২০০১ থেকে ২০০৬ সময়কালে, ওই বিষয়গুলোর প্রতি সরকারি মনোযোগ দেয়া সম্ভব হয়নি, যেকোনো কারণেই হোক।

সরেজমিনে সাংগঠনিক কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবাদ এক জিনিস এবং জ্ঞান-বুদ্ধি খাটিয়ে চিন্তাভাবনা করে সমস্যা থেকে উত্তরণ করার কর্মযজ্ঞ আরেক বিষয়। উভয়টির জন্য ব্যক্তি ইবরাহিম বা তার দল বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি যথেষ্ট সক্ষম নয়। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির শাখা-প্রশাখাও পার্বত্য জেলার কোথাও নেই। সবাই মিলে ইতিবাচকভাবে পরিস্থিতিটির প্রতি মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

বাঙালি জনসংখ্যার গুরুত্ব :১৯৬২ ও ১৯৭১
মনে করি বাঙালি জনগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামে কমে গেল; মনে করি বাঙালি জনসংখ্যা পাঁচ বা দশ শতাংশে চলে এলো। তাহলে কি ডেমোগ্রাফিক্যালি অর্থাৎ সংখ্যা-তাত্ত্বিকভাবে, জনসংখ্যা কি ১৯৭৫-৭৬-৭৭ ইত্যাদি বছরে ফিরে গেল না? পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং মিয়ানমারের সাথে সীমান্ত এলাকায় অথবা পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং ভারতের মিজোরাম প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় অথবা পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং ভারতের ত্রিপুরা প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় যেসব বাঙালি বসতি আছে, সেই বসতিগুলো যদি হালকা হয়ে যায় বা শূন্য হয়ে যায়, তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে?

১৯৬২ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল, ভারত দুর্বল পক্ষ ছিল। বর্তমানে ভারতের সর্ব উত্তর-পূর্বে অবস্থিত অরুণাচল প্রদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে যুদ্ধ হয়েছিল; বাংলাদেশের সিলেটের পাঁচ বা সাত শ’ কিলোমিটার উত্তর-উত্তর পূর্ব দিকে। সেই সময় ওই সব অঞ্চলে ভারতীয় জনগণের বসতি ছিল না। গত চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে ওইসব অঞ্চলে ব্যাপক ভৌত কাঠামো এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা হয়েছে যেন ভারতীয় জনগণ ওই সীমান্তবর্তী অঞ্চলে, আবহাওয়ার উপযোগিতা সাপেক্ষে বসতি স্থাপন করে থাকতে পারেন। কেন? উত্তর দেয়ার জন্য সামরিক বাহিনীর সদস্য বা নিরাপত্তাবিশ্লেষক হওয়ার প্রয়োজন নেই; যেকোনো সাধারণ সচেতন নাগরিক চিন্তা করলেই পাবেন।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের শেষ অংশে, ভারতীয় সেনাবাহিনী যখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে, তখন পথে পথে স্তরে স্তরে বাঙালিরা ভারতীয় বাহিনীকে সহায়তা-সহযোগিতা করেছিল। ভারত ও বাংলাদেশের পরিস্থিতি থেকে উদাহরণ দিয়ে বুঝাতে চাইলাম, ক্রুসিয়াল বা গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর ভৌগোলিক এলাকায়, সরকার ও রাষ্ট্রের প্রতি প্রশ্নাতীতভাবে অনুগত জনগোষ্ঠী অতি প্রয়োজনীয়।

উপজাতি না কি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নাকি আদিবাসী
আমরা এতক্ষণ বাঙালি জনগোষ্ঠী এবং ভূমি সমস্যা নিয়ে আলোচনা করলাম। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির প্রেক্ষাপটে বা শান্তিচুক্তি থেকে উদ্ভূত কিছু কিছু সমস্যার কথা এখনো আলোচনা করা হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৩টি উপজাতির বাস। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তিতে তাদের উপজাতি বলে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতিক তাদের উপজাতি না বলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী (এথিনিক মাইনোরিটি) বলা হচ্ছে। ভালো; আমার ব্যক্তিগত কোনো সমস্যা নেই। তবে এরকম এথিনিক মাইনোরিটি পৃথিবীর বহু দেশে আছে। পৃথিবীর বহু দেশের মেজরিটি জনসংখ্যা, অত্যাচার করে, অন্যায় করে, তাদের দেশের এথিনিক মাইনোরিটিকে প্রায় বিলুপ্ত করে ফেলেছে।

ধ্বংসের কাজ যখন প্রায় শেষ তখন তাদের বিবেক জাগ্রত হয়েছে। এথিনিক মাইনোরিটি জনগোষ্ঠীকে বাঁচানোর জন্য সম্মিলিত চেষ্টা শুরু হয়েছে। উদ্যোগগুলো শুভ। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে বা বাংলাদেশেও অনেক ভুলভ্রান্তি হয়েছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে এথিনিক মাইনোরিটি বিপদগ্রস্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামের এথনিক মাইনোরিটি ভাগ্যবান এই মর্মে যে, তারা অনেকেই একসাথে একটি সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায়। তারপরও তাদের ওপর বিপদ-আপদ আছে।

অপরপক্ষে বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ অঞ্চল সমতল ভূমি। সেই ৯০ শতাংশ সমতল ভূমিতে যারা অএথিনিক মাইনোরিটি ছিল বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো-ছিটানো, তাদের এখন খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সার্বিকভাবে এই প্রেক্ষাপটে, পার্বত্য চট্টগ্রামের এথিনিক মাইনোরিটি নিজেদেরকে আদিবাসী (ইংরেজি পরিভাষায় ইনডিজেনাস) দাবি করছেন এবং আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত কিছু কনভেনশন বা প্রটোকল বা ডিক্লারেশনের আওতায় নিজেদের আশ্রয় চাচ্ছেন। ওই চাওয়া এবং চাওয়া পূরণ না হওয়া, এরও গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিক আছে।

বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক আহ্বান মোতাবেক, আনুষ্ঠানিকভাবে, অ্যাথিনিক মাইনরিটি জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ বা ইনডিজেনাস বলে মেনে নেয়; তাহলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষ থেকে ওই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি কতগুলো আইনি দায়বদ্ধতা এসে যাবে। ওই সব আইনি দায়বদ্ধতা পালন করা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকারক বা হুমকি হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯ শতাংশ। অতএব এই বিষয়টি সামাজিক, রাজনৈতিক, ভূ-কৌশলগত, সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সব জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তির সামনে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

আগামী বুধবার ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ আমার নিয়মিত সাপ্তাহিক কলামে ওই আলোচনাটি থাকবে; আলবৎ শেষ পর্ব।

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
ইমেইল : mgsmibrahim@gmail.com




জনগণকে জানাতে চাই : প্রসঙ্গ পার্বত্য চট্টগ্রাম-২

ইব্রাহীম

♦ সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীরপ্রতীক

এই কলামটি কেন একটি বিশেষ কলাম?
আজকের কলামটি হচ্ছে একটি নাতিদীর্ঘ রচনার অংশ। এর মূল বিষয়বস্তু, বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত তিনটি পার্বত্য জেলার সমন্বয়ে যে ভৌগোলিক এলাকাটিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বলা হয়, সেখানকার দু-একটি সমস্যা। সমস্যাগুলো ওখানকার হলেও, এর তাৎপর্য বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের ভৌগোলিক আয়তনের দশ ভাগের এক ভাগ। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের ষোলো কোটি জনগণের অংশ। রাষ্ট্রের সব জনগণের মতো, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের প্রতিও রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব আছে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের মধ্যে আনুমানিক ৬০ বা ৬৫ শতাংশ হচ্ছেন পাহাড়ি বা উপজাতীয় বা ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠীর অংশ (ইংরেজি পরিভাষায় : এথনিক মাইনরিটি বা স্মল ন্যাশনালিটিজ) এবং বাকিরা হচ্ছে বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশের ষোলো কোটি মানুষের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের ছয়-সাত লাখ মানুষের অনুপাত হচ্ছে, ১০০ ভাগের এক ভাগের মধ্যে, কম-বেশি অর্ধেক (০.৫%)। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান সমস্যাটির গুরুত্ব, ওইরূপ ক্ষুদ্র নয়। সমস্যাটির সাথে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা জড়িত; আজকে একটু কম দেখা গেলেও, সমস্যাটি গভীর। বাংলাদেশের শান্তি-সমৃদ্ধি তো জড়িত আছেই। এ লেখার প্রথম পর্ব যে পর্যায়ে শেষ হয়েছিল, আজ সেখান থেকেই শুরু করছি।

শান্তিবাহিনীর বক্তব্য
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ছিল একটি রাজনৈতিক সংগঠন। কিন্তু তারা একটি সশস্ত্র উপসংগঠন সৃষ্টি করেছিল। এর নাম শান্তিবাহিনী। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর এবং ’৭৫-এর নভেম্বরের উত্তাল সময়টি অতিক্রান্ত হওয়ার পরপরই, শান্তিবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র কর্মকাণ্ড শুরু করে। ওই সশস্ত্র কর্মকাণ্ডগুলো ছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ। বিখ্যাত প্রকাশনী সংস্থা ‘অনন্যা’ (০১৭১১-৫২১১৩৪) থেকে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারির বইমেলায় প্রকাশিত আমার এগারোতম বই ‘মিশ্র কথন’-এ আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে একটি অধ্যায় যোগ করেছি (পৃষ্ঠা নম্বর : ২৪৫-৩১৫)। মিশ্র কথনের সেই অধ্যায়টিতে সাবেক শান্তিবাহিনীর সদস্যদের বরাত দিয়ে, ভারতীয় সহযোগিতার কথা লিখেছি; তা ছাড়া আমি সরেজমিন তো অনেক কিছুই প্রত্যক্ষ করেছি। যা হোক, ওই বিষয়টি এখন ২০১৬ সালে গৌণ। আমরা ডিসেম্বর ১৯৭৫-এ ফিরে যাই। ডিসেম্বর ১৯৭৫-এ সশস্ত্র বিদ্রোহ বা যুদ্ধ শুরু করার আগে, শান্তিবাহিনী লিখিতভাবে বাংলাদেশ সরকারকে কোনো দিনই জানায়নি, তাদের দাবি পূরণ করা না হলে তারা যুদ্ধে যাবে। শান্তিবাহিনী যেহেতু যুদ্ধ শুরু করেই দিয়েছিল; সেহেতু বাংলাদেশ সরকারকে সেটা মোকাবেলা করতেই হতো। অতএব এটি একটি সশস্ত্র সঙ্ঘাতে রূপ নেয়।


এই সিরিজের আগের লেখা পড়ুন নিচের লিংক থেকে

জনগণকে জানাতে চাই : পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গ-১


এক আমলের পরিস্থিতির দায়ভার অন্য আমলে
১৯৭৫-এর আগস্টের পর বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থা অস্থিতিশীল ছিল। ১৯৭৫-এর নভেম্বরের ৭ তারিখের পর, ওই অস্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। ১৯৭৫-এর ডিসেম্বর থেকে শান্তিবাহিনী বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করে, সেই যুদ্ধ শুরু হওয়ার জন্য কিন্তু ১৯৭৫-এর আগস্ট বা নভেম্বরের পরবর্তী সরকার কোনোমতেই দায়ী নয়। ১৯৪০, ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে সৃষ্ট কারণগুলোর কথা অতি সংক্ষেপে এই নাতিদীর্ঘ কলামের প্রথম পর্বে একটি অনুচ্ছেদে উল্লেখ করেছি। ১৯৭১ থেকে ’৭৫-এর বাংলাদেশের পরিবেশ পরিস্থিতি কী ছিল সেটাও আজকের দিনের যেকোনো সচেতন নাগরিক মোটামুটিভাবে জানেন। তাহলে অতীতের কারণে সৃষ্ট অঘোষিত যুদ্ধ মোকাবেলা করতে হয়েছিল ১৯৭৫-এর নভেম্বরের পরবর্তী বাংলাদেশ সরকারকে। মোকাবেলা করতে গিয়ে অনেক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে পরবর্তী ৫, ১০, ১৫ বা ২২ বছরে। এই পদক্ষেপগুলোতেও ভালো এবং মন্দ দিক আছে। এগুলো থেকেই আজ ২০১৬ সালের সঙ্কটের উৎপত্তি। তবে সমস্যা সমাধান করতে গেলে নতুন সমস্যা উৎপত্তি হতেই পারে। কিন্তু এমন কোনো সমস্যাকে স্বাগতম জানানো যায় না বা যাবে না, যেগুলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বা রাষ্ট্রের সংবিধানের ‘কোর’-কে আঘাত করে। কাজটি কঠিন। এক দিকে বিদ্রোহী বা আন্দোলনরত জনগোষ্ঠীর কষ্ট দূর করা বা চাহিদা মেটানো, অপর দিকে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা সংবিধানের সংহতি রক্ষা করা, এই কাজটি কঠিন বৈকি। সে জন্যই সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে অবদান (ইনপুট বা কন্ট্রিবিউশন) প্রয়োজন। সে জন্যই এই লেখা।

সশস্ত্র বিদ্রোহ মোকাবেলার পন্থাগুলো
সশস্ত্র যুদ্ধ বা সশস্ত্র বিপ্লব মোকাবেলা করার দু’টি উন্মুক্ত পন্থা আছে। একটি হলো উভয়পক্ষের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসা এবং যুদ্ধবিরতিতে উপনীত হওয়া। আরেকটি হলো, যুদ্ধের মাধ্যমেই প্রতিপক্ষকে দমন করা। পৃথিবীব্যাপী, প্রথম পন্থাটি বেশি গ্রহণযোগ্য। এর অর্থ এই নয়, যুদ্ধ হচ্ছে না বা যুদ্ধের মাধ্যমে কেউ কাউকে দুর্বল করছে না। কিন্তু সবচেয়ে জ্ঞানী হলেন তারাই, যারা যুদ্ধের কারণগুলো খুঁজে বের করেন এবং ওই কারণগুলো দূর করতে চেষ্টা করেন। যুদ্ধ শুরুর কারণগুলো যদি দূর করা যায়, তাহলে যুদ্ধের যৌক্তিকতা কমে যায়। ব্যক্তিগতভাবে আমি এ রকমই একটি পরিবেশ ও পরিস্থিতির সাথে সরেজমিন সম্পৃক্ত ছিলাম। সেনাবাহিনীর ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে, বিদ্রোহ মোকাবেলার দায়িত্ব পালন করেছি, আবার সরকারের নির্দেশে বা আমার ওপর সরকারের আস্থার কারণে, শান্তি স্থাপনের জন্যও (বিয়ন্ড দি কল অব ডিউটি গমন করে), পরিশ্রম করেছি; জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা ও সুসম্পর্ক সৃষ্টির জন্য পরিশ্রম করেছি। সে জন্য আমি যা বলছি বা লিখছি, সেটা আমার অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ; কোনো মতেই শুধু তাত্ত্বিক নয়। লেখাটির প্রথম পর্বে আমার লেখা সেই বইটির নাম উল্লেখ করেছি, যেখানে এই প্রসঙ্গটি বিস্তারিতভাবেই আছে।

পৃথিবীর অনেক জায়গা থেকে উদাহরণ
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে যেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল এবং সমাধানের যে চেষ্টা করা হয়েছে, পৃথিবীর অন্যান্য দেশ বা স্থান থেকে সেরকম ঘটনার বা কর্মকাণ্ডের অনেক উদাহরণ দিতে পারি; কিন্তু মাত্র কয়েকটি উল্লেখ করছি। প্রথমে দিচ্ছি- ইন্দোনেশিয়ার সর্ব উত্তর-পশ্চিমের দ্বীপ সুমাত্রার সর্ব উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত ‘আচেহ’ প্রদেশ এবং ফিলিপাইনের দক্ষিণে মিন্দানাও প্রদেশের উদাহরণ। তারপর অন্য উদাহরণগুলো। বাংলাদেশের অতি কাছে প্রতিবেশী ভারতের পূর্ব এবং উত্তর-পূর্ব অংশে অবস্থিত প্রদেশগুলোতে (যথা- পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলা, আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, মনিপুর) একই ধরনের পরিস্থিতি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। আসামে উলফা নামক সংগঠনের কথা এবং তার অন্যতম নেতা পরেশ বড়ুয়ার নাম বাংলাদেশের অনেকেই জানেন। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার উত্তর-পশ্চিমাংশে তামিল বিদ্রোহীরা ২৫ বছরের বেশি সময় শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে; এখন থেকে চার-পাঁচ বছর আগে তারা সশস্ত্রভাবে পরাজিত হয়েছে; তাদের নেতা প্রভাকরণের নাম অনেকেই জানেন। মিন্দানাও, মিজোরাম, ত্রিপুরা রাজ্য, মনিপুর, আসাম, নাগাল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ইত্যাদি সব জায়গাতেই সামরিক বাহিনী মোতায়েন হয়েছিল। সব জায়গাতেই শান্তির আলোচনা হয়েছিল; সব জায়গাতেই এক বা একাধিক সমঝোতা বা শান্তিচুক্তি হয়েছিল। সব জায়গাতেই শান্তিচুক্তি ভঙ্গ হয়েছে আংশিকভাবে; পুনরায় শান্তি আলোচনা হয়েছে এবং পুনরায় সমঝোতা বা চুক্তি হয়েছে। সব জায়গাতেই শান্তিচুক্তি অব্যাহতভাবে মূল্যায়নের (কন্টিনিউয়াস ইভ্যালুয়েশন) প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত এবং মূল্যায়নের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। সব জায়গাতেই সমঝোতা বা শান্তিচুক্তির ফলে কিছু সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল। সব জায়গাতেই যারা ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠী তাদের অনুকূলে, বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে বা রাষ্ট্রকে একটু ছাড় দিতে হয়েছে। সব জায়গাতেই ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠী বা তাদের পক্ষে যুদ্ধরত সংগঠনগুলোকে রাষ্ট্রের ও শান্তির অনুকূলে একটু ছাড় দিতে হয়েছে। গত ৩০ আগস্ট ২০১৬ নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ৫ নম্বর পৃষ্ঠায় মুদ্রিত একটি খবর পুরোপুরি উদ্ধৃত করছি পরের অনুচ্ছেদে।

দক্ষিণ আমেরিকার কলোম্বিয়ার উদাহরণ
খবরটি এএফপি এবং রয়টার্স পরিবেশিত। খবরটির শিরোনাম : ‘কলম্বিয়ায় অর্ধ শতাব্দী পর শান্তির সুবাতাস’। কলম্বিয়া হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার একটি দেশ। খবরটি নিম্নরূপ: : ‘বামপন্থী বিদ্রোহী সংগঠন ও সরকারের মধ্যে অস্ত্রবিরতি কার্যকর হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে প্রায় ৫২ বছর ধরে চলা বিদ্রোহের অবসান হতে যাচ্ছে। তবে দুই পক্ষের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি হচ্ছে কি হচ্ছে না, তার জন্য ২ অক্টোবরের গণভোটের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কিউবায়, কলম্বিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘দ্য রেভুলিউশনারি আর্মড ফোর্সেস অফ কলম্বিয়া (ফার্ক)’ ও সরকারের মধ্যে চার বছর ধরে আলোচনার পর স্থানীয় সময় সোমবার মধ্য রাত থেকে এই অস্ত্রবিরতি কার্যকর হয়। দুই পক্ষের মধ্যে চূড়ান্ত অস্ত্রবিরতি চুক্তি আগামী মাসে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। ২৪ আগস্ট কিউবার রাজধানী হাভানায় ৫২ বছর ধরে চলে আসা বিদ্রোহের অবসান ঘটাতে ফার্ক বিদ্রোহী এবং কলম্বিয়া সরকারের মধ্যে শান্তি সমঝোতা হয়। সেই সাথে অস্ত্রবিরতিও ঘোষণা করা হয়। এই সমঝোতা অনুযায়ী, ফার্ক, সশস্ত্র বিদ্রোহের পথ ত্যাগ করে কলম্বিয়ার নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে অংশ নেবে। সেই সাথে বিদ্রোহীদের পুনর্বাসনের জন্য উদ্যোগ নেবে সরকার। চলতি বছর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ফার্ক নেতারা ওই সমঝোতা চুক্তি অনুমোদন নিয়ে বৈঠকে বসবেন। ১৩ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর ফার্কের নিয়ন্ত্রণে থাকা কলম্বিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে ওই কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ২ অক্টোবর শান্তি চুক্তি গ্রহণ করা বা না করার বিষয়ে গণভোটের ডাক দিয়েছে কলম্বিয়া সরকার। ফার্ক নেতা রডরিগো লন্ডনো, গুলিবর্ষণ বন্ধের নির্দেশ দেন।’

উদাহরণ দিতে গিয়ে এই অনুচ্ছেদে এবং তার উপরের অনুচ্ছেদে যতগুলো জায়গার নাম নিয়েছি, সব জায়গার সমস্যা সম্পর্কে সম্মানিত পাঠক বিস্তারিত অবহিত হওয়া কষ্টকর। কিন্তু কলম্বিয়ার সমস্যাটি একটি অনুচ্ছেদে বর্ণনা করেছি; যাতে পাঠক নিজেই অনুমান করতে পারেন যে, এ ধরনের সমস্যার সমাধান করতে গেলে কী কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয় বা কী কী সমস্যা উপস্থাপিত হয়। এই খবরটিতে অনেক রাজনৈতিক ইশারা আছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যায় তিনটি পক্ষ জড়িত, কেন?
উপরের দু’টি অনুচ্ছেদে বিভিন্ন উদাহরণ পর্যবেক্ষণের পর আমরাও বলতে পারি, পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সমস্যা ছিল, সেটিও সমাধানের অযোগ্য কোনো সমস্যা নয়; আমরা বলতে পারি, সেই সমস্যা সমাধানের জন্য সব পক্ষকেই কিছু না কিছু ছাড় দিতে হয়েছে অথবা ভবিষ্যতেও দিতে হতে পারে। এখানে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় তুলে ধরতে চাই। পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র বিদ্রোহমূলক সমস্যায়, ’৭০, ’৮০ ও ’৯০-এর দশকে দু’টি পক্ষ ছিল। পক্ষগুলোর পরিচয় নিম্নরূপভাবে দেয়া যায়। একপক্ষে পাহাড়ি জনগণ বা তাদের (কাঙ্ক্ষিত বা অনাকাঙ্ক্ষিত) প্রতিনিধিত্বে পিসিজেএসএস বা শান্তিবাহিনী এবং অপরপক্ষে বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু ১৯৮৮ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতার পর থেকে শুরু করে এই মুহূর্ত পর্যন্ত, সেখানে তিনটি পক্ষ আছে।

প্রথম পক্ষ হলো- বাংলাদেশের জনগণ তথা বাংলাদেশ সরকার, দ্বিতীয় পক্ষ হলো- পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বা উপজাতীয় জনগণ তথা পিসিজেএসএস (শান্তি বাহিনীসহ)। তৃতীয় পক্ষটি হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠী। যত দিন পর্যন্ত পিসিজেএসএস বা বাংলাদেশ সরকার এই তৃতীয় পক্ষের মর্মবেদনা ও কষ্টগুলো না বুঝবে এবং তাদের শান্তি স্থাপন প্রক্রিয়ায় পক্ষভুক্ত না করবে, তত দিন এই সমস্যার আন্তরিক সমাধান সম্ভব নয়। যারা আজকের এই লেখাটি পড়ছেন, তারা বলতেই পারেন, ষোলো কোটি বাঙালির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আড়াই বা তিন লাখ বাঙালির এমন কী সমস্যা থাকতে পারে যেটা জাতীয় পর্যায়ে ধর্তব্যের মধ্যে নিতে হবে?

বোঝার বিষয়টি ক্রুশিয়াল, সূক্ষ্ম ও স্পর্শকাতর
এটি একটি ক্রুশিয়াল পয়েন্ট, অতি সূক্ষ্ম ও স্পর্শকাতর বিষয়। কাউকে যেমন বুঝতে বাধ্য করা যাবে না, তেমনি আমার প্রকাশভঙ্গির বা প্রকাশ ক্ষমতার দুর্বলতার কারণেও হয়তো অনেকের বুঝতে কষ্ট হতে পারে। সে জন্যই বিনয়ের সাথে আহ্বান জানাচ্ছি, পাঠক যেন কষ্ট করে এই বিষয়টি বুঝে নেন। এই পয়েন্টটি বোঝার সাথে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা জড়িত; বাংলাদেশের সংবিধানের কয়েকটি ধারার ব্যাখ্যা জড়িত; বাংলাদেশের ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাব্য বিপদের দিনে সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য মোতায়েন জড়িত এবং সর্বোপরি, ষোলো কোটি মানুষের মনের শান্তি জড়িত। তাই এই পয়েন্ট সূক্ষ্ম বিষয়টি বোঝা বা এর তাৎপর্য অনুধাবন করা এবং এই তাৎপর্য প্রসঙ্গে উপযুক্ত জায়গাগুলোতে সচেতন নাগরিকেরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করা অত্যন্ত জরুরি।

উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু বাঙালি জনগোষ্ঠী
এই লেখার প্রথম পর্ব গত ৩১ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দু’টি ভিন্ন ভোটার তালিকার প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছি। অতি কৌশলে, পরিস্থিতিগত বা পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করে, বাঙালিদের সংখ্যা কমানোর একটি সুযোগ যে ওখানে আছে সেটি উল্লেখ করেছি। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকার এবং শান্তিবাহিনীর মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তার আগে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। ১৯৮৭-৮৮ সালেও আলোচনা হয়েছে। আমি অন্ততপক্ষে ১৯৮৭-৮৮ সালের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য দিচ্ছি পিসিজেএসএস বা শান্তিবাহিনী দাবি করতে যেন, বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। আমরা তথা সরকারপক্ষ সেই ১৯৮৭-৮৮ সালে, জোরালো কিন্তু ভদ্রভাবে সে দাবি প্রত্যাখ্যান করেছি। আমরা বলেছিলাম, যে বাঙালিরা ইতোমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করছে, তারা থাকবেই। তাদের নিয়েই আগামী দিনের পার্বত্য রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক সংসার গড়ে তুলতে হবে। তাদের বাদ দিয়ে নয়। ১৯৮৮ সালের সমঝোতা মোতাবেক বা ১৯৮৯-এর ফেব্রুয়ারিতে প্রচারিত পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন মোতাবেক, জেলা পরিষদগুলোতে বাঙালি সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেই ১৯৮৮ সালে বাঙালি জনসংখ্যার যে অনুপাত ছিল, জেলা পরিষদে বাঙালি সদস্যের সংখ্যা ওই অনুপাতে হয়নি, কম হয়েছে, কিন্তু সবার জ্ঞাতসারে। উদ্দেশ্য, পাহাড়ি ভাইদের প্রাধান্য যেন নিশ্চিত থাকে। পাহাড়ি ভাইদের স্বকীয় জাতিসত্তাকে নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে। জায়গা-জমি ক্রয়-বিক্রয় সম্বন্ধে, পাহাড়ি ভাইদের নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে এবং সার্বিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমিত কৃষি বা শিল্প জমিকেও নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে।

১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের আগে, দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। নিশ্চিতভাবেই, বাঙালিদের প্রসঙ্গ সেখানে এসেছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী (যিনি বর্তমানেও প্রধানমন্ত্রী) তিনি বা তার হয়ে সরকারি প্রতিনিধিদল শান্তিবাহিনীকে কী উত্তর দিয়েছিলেন বাঙালিদের প্রসঙ্গে, সেটা আমাদের পক্ষে হুবহু জানা সম্ভব নয়। হয়তো, তিনি বলেছেন বাঙালিরা থাকবেই থাকবে, কিন্তু তাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা আলাদা করা হবে। অথবা হয়তো তিনি বলেছিলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে বাঙালিদের, প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে বা চুক্তি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়, এটা রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। তৎকালীন সরকার হয়তো বলে থাকতেও পারেন, বাঙালিরা যেন পরিস্থিতির চাপে পড়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ত্যাগ করে, সেই বন্দোবস্ত করা যাবে। হুবহু কী কথা হয়েছিল সেটা আমরা বলতে পারছি না সে জন্য দুঃখিত; তাই পাঠককে কল্পনা বা অনুমান করতে হবে। এই লেখা পড়তে গিয়ে, পাঠকের মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন এসেছে, বাঙালিদের উপস্থিতিতে, শান্তিবাহিনীর আপত্তি কেন? অথবা, ১৯৮৭-৮৮ সালে বা বর্তমানেও আমরা কেন বলছি যে, বাঙালিরা থাকতেই হবে?

সরকারি সিদ্ধান্তে বাঙালি জনগোষ্ঠী গিয়েছিল
উপরে এক জায়গায় লিখেছি, সশস্ত্র বিদ্রোহ মোকাবেলায় কিছু পন্থা অবলম্বন করতে হয়। কিছু পদক্ষেপ নিতে হয়। পদক্ষেপগুলো কোনো ধর্ম-গ্রন্থের পবিত্র বাণী নয়; যেই দেশে যেই পরিস্থিতি, সেই মোতাবেকই পদক্ষেপ নিতে হয়। কিন্তু সব দেশের পরিস্থিতির মধ্যে ও পন্থাগুলোর মধ্যে অনেক অনেক মিল থাকে। কিছু পদক্ষেপ আছে যেগুলোকে কৌশলগত পদক্ষেপ বলা যেতে পারে। কিছু পদক্ষেপ আছে যেগুলো সরেজমিন প্রয়োজনীয়তা থেকে উদ্ভব হয়। পদক্ষেপগুলোর সাথে সরাসরি সম্পর্ক হচ্ছে বিদ্রোহী কর্মকাণ্ড বা বিদ্রোহীদের চাহিদা।

কল্পনার জগতে একটি সম্মেলন
পাঠক কল্পনা করুন, আপনি ১৯৭৬-৭৭-১৯৭৮ সালের সেনাবাহিনীর একজন মেজর জেনারেল অথবা বাংলাদেশ সরকারে একজন সচিব অথবা বাংলাদেশের গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান। আপনারা, আপনাদেরই মধ্যে কোনো একজনের অফিসে বসে বা সম্মেলন কক্ষে বসে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছেন। শান্তিবাহিনী গত কিছু দিন যাবত কী ধরনের কাজ করছে, কে তাদের সাহায্য করছে, তাদের সমর্থকদের মুখে মুখে কী কথা ঘুরে বেড়াচ্ছে ইত্যাদি কথা সবাই মিলে মূল্যায়ন করলেন। ওই মূল্যায়নের পরিপ্রেক্ষিতে, গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হলো, বিদ্রোহী শান্তিবাহিনী কী চায় বা তাদের চাহিদা কী হতে পারে এবং বাংলাদেশ সরকারের কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত? আমি, তথা আজকের কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান, ওই কল্পনার আলোচনা সভায় ছিলাম না।

আমি আমার সামরিক অভিজ্ঞতার আলোকে এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার আলোকে, আমার বিশ্লেষণ শক্তি ব্যবহার করে, ১৯৭৬-৭৭-৭৮ সালের ঘটনাবলিকে গল্পের আকারে উপস্থাপন করছি। সম্মেলন কক্ষে আলোচনার পর, উপসংহার হলো, শান্তিবাহিনী বিচ্ছিন্নতার পথে যেতে পারে অথবা নিদেনপক্ষে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে যেতে পারে। যে পথেই যাক, জনগণের মতামত তাদের অনুকূলে থাকতে হবে এবং জনগণ তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। শান্তিবাহিনী যে পথেই যাক, তারা সশস্ত্র কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখবে। অতএব, বাংলাদেশ সরকারকেও ওই পরিস্থিতি সশস্ত্রভাবে মোকাবেলা করতে হবে। অতিরিক্ত, বাংলাদেশ সরকারকে গভীর মনোযোগের সাথে সেখানে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করতে হবে বা করাতে হবে। সরকার, সামরিক বাহিনী মোতায়েনের পাশাপাশি এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালু করার পাশাপাশি, ১৯৭৬-৭৭-৭৮ সালে বারবার আহ্বান জানিয়েছিল শান্তিবাহিনীর প্রতি এই মর্মে যে, ভাইয়েরা আপনারা আসেন, আলোচনা করুন, সবাই মিলে সমস্যার সমাধান করি। আলোচনায় আসবে কি আসবে না এই নিয়ে শান্তিবাহিনী দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল এবং প্রায় তিন-চার বছর নিজেদের মধ্যে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত ছিল। যা হোক, এখন মনে হচ্ছে, ১৯৭৮ সালে সরকার শান্তিবাহিনী থেকে সাড়া না পেয়ে সিদ্ধান্ত নিলো, একাধিক কৌশলগত কারণে, বাঙালি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়বে। এ প্রসঙ্গে আলোচনা এবং অন্যান্য আঙ্গিক, ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬ প্রকাশিতব্য, ইনশাআল্লাহ লিখব এবং সম্ভাব্য করণীয় আলোচনা করব।

লেখক : চেয়ারম্যান বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি




জনগণকে জানাতে চাই : প্রসঙ্গ পার্বত্য চট্টগ্রাম-১

জেনারেল-ইব্রাহীম

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক 

পার্বত্য চট্টগ্রাম পর্যটনবান্ধব

২০১৬ সালটি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ঘোষিত ‘পর্যটন বছর’। বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট এবং দেশী পর্যটকদের উৎসাহিত করতে সরকার অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। পর্যটকদের কাছে যেসব আকর্ষণীয় স্থান আছে, তার মধ্যে অন্যতম কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। তার পরই উল্লেখ করার মতো স্থান হচ্ছে পার্বত্য তিন জেলায় রাঙ্গামাটি শহর ও রাঙ্গামাটি লেক (হ্রদ), খাগড়াছড়ি শহর ও আলুটিলা পাহাড়, বান্দরবান শহর ও মেঘলা, চিম্বুক, নীলগিরি ইত্যাদি। বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটনমূল্য বা ট্যুরিজম ভ্যালু বাড়ানোর জন্য অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও নেবে। পর্যটন বাড়লে, পার্বত্য চট্টগ্রাম যেমন আরো বিকশিত হবে তেমনি দেশেরও লাভ হবে; কিন্তু সরকারের উদ্যোগের সাথে সরেজমিন পরিস্থিতি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে (যেটা বর্তমানে আংশিকভাবে নেই বলে মনে করি)।

ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয়

সম্মানিত পাঠক, যদি কষ্ট করে বাংলাদেশের মানচিত্র দেখেন তাহলে বুঝবেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূপ্রকৃতি সমগ্র বাংলাদেশ থেকে ভিন্ন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান হচ্ছে ভূরাজনৈতিক এবং সামরিক আঙ্গিকে (ইংরেজি পরিভাষায় : জিও-স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড মিলিটারি কনসিডারেশন) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো হচ্ছে হিমালয় পর্বতমালার দূরবর্তী ফুট হিলস বা পাদটিলা। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে যারা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর অংশ, তাদেরই মতো নৃতাত্ত্বিক মানুষের (ইংরেজি পরিভাষায় : অফ সেইম এথনিক অরিজিন) বিস্তৃত বসতি, পূর্ব দিকে, উত্তর-পূর্ব দিকে এবং দক্ষিণ-পূর্ব দিকে, সমুদ্র বা মহাসমুদ্র পানির তীর পর্যন্ত। অর্থাৎ চায়না, তিব্বত, মঙ্গোলিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ভারতের উত্তর-পূর্বের সাতটি প্রদেশ ইত্যাদি অঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠী, নৃতাত্ত্বিকভাবে মঙ্গোলয়েড। এই বিশাল নৃগোষ্ঠীর সমপারিবারিক বা সমগোত্রীয় (ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র) অংশ হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৩টি উপজাতি যথা চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তংচঙ্গা, বোম, পাংখু, ম্রো, চাক, গুর্খা ইত্যাদি। তাহলে এটা হালকা মেজাজের ভাষায় বলাই যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম হচ্ছে দু’টি বিশাল জনগোষ্ঠীর মিলনস্থান এবং দু’টি বিশাল ভূপ্রকৃতিরও মিলনস্থান।

আড়াই শ’ বছরের ইতিহাস

মোগল সাম্রাজ্যে, দক্ষিণ-পূর্বে সবচেয়ে দূরবর্তী জেলা ছিল চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রাম মানে আজ ২০১৬ সালের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। ১৭৬০ সালে দুর্বল মোগল সম্রাট চট্টগ্রাম জেলাকে, উদীয়মান শক্তি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে হস্তান্তর করেছিল। ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রাম জেলার পূর্ব অংশে অবস্থিত (ভূপ্রাকৃতিকভাবে পাহাড়ি বা পার্বত্য) অংশকে আলাদা জেলা করে দেয়। সেটার নাম হয়েছিল হিল ট্রাক্টস অব চিটাগং অর্থাৎ চট্টগ্রামের পার্বত্য অংশ। ব্রিটিশ ভারতে এটা একটি প্রান্তিক অঞ্চল এবং এখানকার মানুষ যেমন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ছিল, অনুরূপ ব্রিটিশ ভারতের উত্তর-পশ্চিমে, পশ্চিমে, উত্তর-পূর্বে এবং পূর্ব দিকে এমনই আরো অনেক প্রান্তিক এলাকা ও জনগোষ্ঠী ছিল। এইরূপ প্রান্তিক এলাকা ও জনগোষ্ঠীগুলোর শাসনতান্ত্রিক বা প্রশাসনিক মর্যাদা বৃহত্তর ব্রিটিশ ভারত থেকে একটু ভিন্ন ছিল। ব্রিটিশদের আকাক্সক্ষা ছিল, ওই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী প্রান্তিকই থাকুক; ওদের নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার কোনো প্রয়োজন নেই; ওই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ব্রিটিশদের আনুগত্য মেনে নিয়ে খাজনা দিলেই যথেষ্ট। সময়ের সাথে সাথে ব্রিটিশ ভারতের সাংবিধানিক ও শাসনতান্ত্রিক অবস্থান পরিবর্তিত হয়ে যায়। পৃথিবী ক্রমান্বয়ে উন্নত হচ্ছে; যোগাযোগব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে উন্নত হচ্ছে এবং লেখাপড়ার বিস্তৃতি ঘটছে; ক্রমান্বয়ে মানুষে মানুষে মেলামেশা বৃদ্ধি পাচ্ছে; কিন্তু এরূপ সব ইতিবাচক অগ্রগতির অবশ্যম্ভাবী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় অত্যাচারী লোভী দুর্বৃত্তদের কর্মকাণ্ডও বেড়ে যায়; কিন্তু ওদের আগ্রাসী ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য উপযুক্ত ও যথেষ্ট ব্যবস্থা সমানুপাতে শক্তিশালী হতে পারেনি। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এ রকমই একটি ভৌগোলিক অঞ্চল এবং সেখানকার নৃতাত্ত্বিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী এরূপ একটি আলোচিত বিষয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম : পাকিস্তানে ও বাংলাদেশে

ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক ভাগ্য বিভাজিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রাম তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়েছিল এবং স্বাধীনতার পর থেকে এটি বাংলাদেশের অংশ। পাকিস্তানের ২৩ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হয়েছে কাপ্তাইতে স্থাপিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য। এই প্রকল্পের মারাত্মক নেতিবাচক ফলাফল ও প্রতিক্রিয়াও ছিল। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের সন্ধিলগ্ন হলো ১৯৭১ সাল। ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের ভূমিকা হালকাভাবে ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এবং জোরালোভাবে ও বিশদভাবে ছিল মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে। ৪৫ বছর ধরে বাংলাদেশের সরকারগুলো অনেক ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীর উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য; কোনো কোনো পদক্ষেপ জনগণ সাদরে গ্রহণ করেছে; কোনো কোনো পদক্ষেপ জনগণের পক্ষ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে; কোনো কোনো পদক্ষেপ জন্ম দিয়েছে বিশৃঙ্খলার। প্রান্তিক এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা সেখানকার প্রান্তিক উপজাতীয় জনগোষ্ঠী প্রসঙ্গে বাংলাদেশের যে অভিজ্ঞতা, এরূপ অভিজ্ঞতা বা একই ধরনের পরিবেশ পরিস্থিতিতে কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতা আমাদের আশপাশেই এবং কিছু দূরে আরো অনেক দেশে আছে। সব দেশই ভালো কাজ যেমন করেছে, বিতর্কিত কাজও করেছে। প্রতিটি দেশ বা দেশের সরকার নিজ নিজ দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়েই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। আমাদের দেশের জন্যও এটা সত্য। স্বাধীন বাংলাদেশের ৪৫ বছর মেয়াদের মধ্যে, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৭ (২২ বছর) পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগণ থেকে সৃষ্ট একটি সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিল। পর্যায়ক্রমে বা ধাপে ধাপে সেই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি ও পরিবেশকেও নিরুত্তপ্ত (ইংরেজি পরিভাষায় : মিটিগেট) করা হয়েছে। তারপরও আজ ৪৫ বছরের শেষ মাথায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্কট উত্তরণের নিমিত্তে গৃহীত কিছু পদক্ষেপ সঙ্কটকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে বলে মনে করি; অথবা সঙ্কটকে বাড়িয়ে তোলার আশঙ্কা আছে (ইংরেজি পরিভাষায় : হ্যাজ দি পোটেনশিয়ালিটি টু ইনক্রিজ অর ইনসাইট) বলে আমি মনে করি। বাংলাদেশের সংহতির নিমিত্তে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের বিভিন্ন অংশের বা বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ ও সমন্বিত সহ-অবস্থান ও উন্নতির স্বার্থে এ বিষয়গুলোর প্রতি বাংলাদেশের জ্ঞানীগুণী সচেতন নাগরিকদের মনোযোগ দেয়া আবশ্যক বলে আমরা মনে করি। বাংলাদেশ সরকারের মনোযোগ এসব বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ করা অতি জরুরি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা প্রসঙ্গ

পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি রাজনৈতিক সমস্যা বা আংশিকভাবে জাতিগত সমস্যা বিদ্যমান ছিল, ওই সমস্যা এখনো বিদ্যমান আছে এবং সর্বাত্মক চেষ্টা করলেও সমস্যাটি এক দিনে দূরীভূত হবে না; কিন্তু এ জন্য চেষ্টা করে যেতে হবে। অতীতেও চেষ্টা হয়েছে, বর্তমানেও চেষ্টা চলছে, ভবিষ্যতেও যেন হয় সেটাই দেশবাসীর কামনা। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর (অফিসারসহ) শত শত সদস্য এবং বাংলাদেশের বিডিআর-পুলিশ-আনসার ভিডিপি সদস্য প্রাণ দিয়েছেন বাংলাদেশের পক্ষে, সরকারের হুকুমে দায়িত্ব পালনকালে। পার্বত্য চট্টগ্রামে হাজার হাজার বাঙালি নারী-পুরুষ-শিশু প্রাণ দিয়েছে বাংলাদেশের স্বার্থে। পার্বত্য চট্টগ্রামে হাজার হাজার নিরীহ পাহাড়ি নারী-পুরুষ-শিশু প্রাণ দিয়েছে দুই পক্ষের যুদ্ধের মাঝখানে পড়ে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শত শত পাহাড়ি তরুণ প্রাণ দিয়েছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তথা বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি স্থাপনের জন্য অনেক দিন ধরেই বিভিন্ন পর্যায়ে, বিভিন্ন আঙ্গিকে চেষ্টা করা হয়েছে; কোনো উদ্যোগ আংশিকভাবে সফল হয়েছে; কোনো উদ্যোগ সাফল্যের দ্বারপ্রান্ত পর্যন্ত গিয়েছে। উদ্যোগগুলোর বিস্তারিত বিবরণ এই কলামে স্থানাভাবে দিতে পারছি না, পাঠক কষ্ট করে প্রয়োজনীয় রেফারেন্স বই পড়লে বিস্তারিত জানতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে একটি বইয়ের নাম উল্লেখ করছি। মাওলা ব্রাদার্স কর্তৃক প্রকাশিত বইটির নাম : ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ-পরিস্থিতির মূল্যায়ন’। পার্বত্য চট্টগ্রামে সরেজমিন অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ দিন সম্পৃক্ততার সুবাদে পুস্তকটি আমার নিজেরই লেখা। মাওলা ব্রাদার্সের ঠিকানা : ৩৯, বাংলাবাজার ঢাকা, ফোন নম্বর : ৭১৭৫২২৭ অথবা ৭১১৯৪৬৩; ই-মেইল mowlabrothers@gmail.com; চার শ’ পৃষ্ঠার পুস্তকটিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার উৎপত্তি, সমস্যা সমাধান তথা শান্তি স্থাপনের উদ্যোগ, এই উদ্যোগগুলোর সীমাবদ্ধতা, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভুলত্রুটি, হালনাগাদ অবস্থা ইত্যাদি বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। পুস্তকটি অনেক দোকানে পাওয়া যায়, আবার অনেক দোকানে পাওয়া যাবেও না। কারণ, এর বিষয়বস্তু রসকষবিহীন এবং আনকমন। তবে ঢাকা মহানগরের বেইলি রোডে এবং চট্টগ্রাম মহানগরের প্রেস ক্লাবের বিল্ডিংয়ে সব সময়ই বইটি পাওয়া যায়।

শান্তির উদ্যোগ ১৯৮৭-৮৯; ১৯৯৬-৯৭

পার্বত্য চট্টগ্রামে যারা বিদ্রোহ করেছিলেন তাদের একটি রাজনৈতিক নাম ছিল। তা হলো, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বা ইংরেজিতে PCJSS. এ সংগঠনের সশস্ত্র শাখা ছিল ‘শান্তিবাহিনী’। বাংলাদেশ সরকার এবং পিসিজেএসএসের মধ্যে অনেকবারই শান্তির লক্ষ্যে আলোচনা হয়েছিল। ১৯৮৮-৮৯ সালে প্রেসিডেন্ট এরশাদের আমলে, একটি নিবিড় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল শান্তি স্থাপনের জন্য। বিদ্রোহী শান্তিবাহিনী, বাংলাদেশ সরকারের সাথে আলোচনাটি মাঝপথে ভেঙে দিয়েছিল; অতএব সরকার সাধারণ জনগণের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সাথে আলাপ-আলোচনা করেই সমঝোতায় উপনীত হয়েছিলেন। ওই সমঝোতার ফলে তিনটি পার্বত্য জেলায় স্থানীয় সরকার জেলা পরিষদ স্থাপন করা হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ একটির নাম ছিল রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে উদ্যোগটি ছিল অনবদ্য ও অভূতপূর্ব। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ ও ২৯ ধারার একাধিক উপধারার বক্তব্যে শক্তিমান হয়ে সরকার এই প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলেছিল। এই জেলা পরিষদগুলো নির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা গঠিত। ১৯৮৯ সালের ২৫ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো পরিষদ গঠিত হয়েছিল; কিন্তু পরে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও আর নির্বাচন হয়নি; আজ অবধি হয়নি। ১৯৮৭-৮৯ সালের শান্তি উদ্যোগের ফলে গঠিত পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদগুলো পার্বত্যবাসীকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নিজেদের ওপর শাসন নিজেরাই যেন করতে পারেন, সেই বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল, আংশিকভাবে হলেও। শান্তিবাহিনী এ বন্দোবস্তটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেনি। তারা ঘোষণা দিয়েছিল, তারা জেলা পরিষদ ব্যবস্থা মানে না। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় বিএনপি সরকারের আমলে শান্তিপ্রক্রিয়া অধিকতর বিস্তারিত ও অধিকতর অংশীদারিমূলক করার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল; কিন্তু উদ্যোগগুলো সফল হয়নি। পেছনের দিকে তাকিয়ে যে মূল্যায়ন করছি, সেই মূল্যায়ন মোতাবেক, শান্তিবাহিনী কৌশলে বিএনপি সরকারকে প্রভাবিত করেছিল যেন স্থানীয় সরকার পরিষদের সময়মতো নির্বাচন না হয়। শান্তিবাহিনী কৌশলে এবং দেশের ভেতরে বা বাইরের কৌশলগত সমর্থনে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল, যেন বিএনপি তাদের শান্তি উদ্যোগগুলোতে সফল না হয়। ১৯৯৬ সালের জুন মাসে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। আওয়ামী লীগ সরকার আগে থেকেই বা ইতোমধ্যে চলমান উদ্যোগগুলোতে নতুন জীবন দান করেছিল। ফলে দেড় বছরের মাথাতেই আওয়ামী লীগ সরকার একটি উপসংহারে আসে। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বর মাসের ২ তারিখ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে একজন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির ফলে সশস্ত্র বিদ্রোহের প্রকোপ কমে আসে; যদিও সব অবৈধ অস্ত্র কোনো দিনই সরকারের কাছে জমা হয়নি বলে অনুভব করি। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য হলো, ১৯৯৬-৯৭ সালের শান্তি আলোচনা, ওইরূপ আলোচনার ফলাফল; এর ফলে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি ইত্যাদি সব কিছুর ভিত্তি বা ফাউন্ডেশন হলো অতীতের শান্তি আলোচনা ও অতীতের সমঝোতা এবং অতীতের আইনগুলো; বিশেষ কর ১৯৮৭-৮৯ এর শান্তি আলোচনার ফলে স্থাপিত পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইনগুলো ও জেলা পরিষদ ব্যবস্থা। পিসিজেএসএস তথা শান্তিবাহিনী জেলা পরিষদ ব্যবস্থাকে যদিও ১৯৮৮-৮৯ সালে সশস্ত্রভাবে বিরোধিতা করেছিল, ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে তারা এই ব্যবস্থাকে মেনে নিয়েই বাকি উপসংহারে উপনীত হন। ডিসেম্বর ১৯৯৭-এর শান্তিচুক্তির অনেক ভালো দিক আছে, অনেক মন্দ দিকও আছে। মন্দ দিকগুলোর মধ্যে দু’টি উল্লেখ করছি। প্রথমটি হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার।

বাঙালিদের ভোটাধিকার প্রসঙ্গ

৯৭ সালের চুক্তি দিয়ে এই ভোটাধিকারকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, খণ্ডিত তথা খর্ব করা হয়েছে। বুঝিয়ে বললে এরূপ দাঁড়ায়; পার্বত্য চট্টগ্রামে দু’টি ভিন্ন ভিন্ন ভোটার তালিকা প্রণীত হবে। একটি ভোটার তালিকায় পাহাড়ি-বাঙালি সবার নাম থাকবে নিঃশর্তভাবে, দেশের সব জায়গায় যেমন হয় তেমনভাবে; পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য। আরেকটি ভোটার তালিকাকে আমরা আঞ্চলিক তালিকা বলতে পারি। দ্বিতীয় ভোটার তালিকা তথা আঞ্চলিক তালিকায় সব পাহাড়ির নাম তো থাকবেই; কিন্তু শুধু ওইসব বাঙালির নাম থাকবে, পার্বত্য চট্টগ্রামে যাদের স্থায়ী ঠিকানা আছে। ‘স্থায়ী’ ঠিকানার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে চুক্তিতে এবং তৎপরবর্তী আইনে বলা হলো, যাদের নিজ নামে বৈধ জায়গা-জমি বা ভূসম্পত্তি আছে, তাদেরই স্থায়ী ঠিকানা আছে বলে মনে করা হবে। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টি সহজ ও সরল। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে, চুক্তি স্বাক্ষরকারী দু’পক্ষই ধরে নিয়েছে যে, স্থায়ী ঠিকানা নেই এমন বাঙালি পার্বত্য চট্টগ্রামে অবশ্যই আছে অথবা অনেক বাঙালি পার্বত্য চট্টগ্রামে আছে যাদের স্থায়ী ঠিকানা বিতর্কিত; অথবা প্রশ্নসাপেক্ষ। যদি আঞ্চলিক ভোটার তালিকায় বাঙালি ভোটারদের সংখ্যা কমাতে হয় তাহলে স্থায়ী ঠিকানা আছে এমন বাঙালির সংখ্যা কমাতে হবে। এরূপ সংখ্যা কমানোর জন্য ব্যবহারযোগ্য একটি পন্থা বা অস্ত্র হলো, ভূসম্পদের মালিকানা নিয়ে সন্দেহ বা বিতর্ক সৃষ্টি করা; এবং সন্দেহ বা বিতর্কের একপর্যায়ে মালিকানা বাতিল করে দেয়া হবে। মালিকানা বাতিল করলে সংশ্লিষ্ট বাঙালির স্থায়ী ঠিকানা পার্বত্য চট্টগ্রামে আর থাকবে না; যদি ঠিকানা না হয় তাহলে তিনি আঞ্চলিক নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না; আঞ্চলিক নির্বাচনে ভোট দিতে না পারলে তার মতামত বা সমর্থন প্রতিফলিত হবে না; মতামত বা সমর্থন প্রতিফলিত না হলে তাকে কোনো ভোটপ্রার্থী মূল্যায়ন করবে না ও দাম দেবে না। যদি কোনো নাগরিকের ভোটাধিকার না থাকে তাহলে তার জীবনযাত্রা মার্জিনালাইজড হয়ে যায়। অন্য কথায় বলতে গেলে, ওই নাগরিক দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয়ে যেতে হবে। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কোনো নাগরিক কোনো পরিবেশে বা কোনো স্থানে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে থাকতে চান না। অতএব তখন পরিস্থিতির ওপর ত্যক্তবিরক্ত হয়ে ওই নাগরিক বলতেই পারেন, এই পার্বত্য চট্টগ্রামে থেকে লাভ কী?

স্থায়ী ঠিকানা বা ভোটাধিকার না থাকলে কী হতে পারে?

১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসনিক কার্যক্রম ইত্যাদি অনেক কিছুতেই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য বা অগ্রাধিকার (ইংরেজিতে প্রেফারেন্স বা প্রায়োরিটি) দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বা পরিবেশ এমন যে, বেঁচে থাকার নিমিত্তেই বাঙালি জনগোষ্ঠীকে অনেকাংশেই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর দয়া বা উদারতার ওপর নির্ভর করতে হবে। দয়া ও উদারতার বিপরীত শব্দ হলো যথাক্রমে নির্দয়তা বা নির্মমতা এবং তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য। এই অনুচ্ছেদের এই অংশে আমরা কল্পনা করি যে, কয়েকটি বাঙালি পরিবার একটি গ্রামে থাকে। তাদের নিজের কোনো জায়গাজমি নেই। কারণ বিতর্কিত পন্থা ও পদ্ধতিতে তাদের মালিকানা হরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে বা তাদের ছেলেমেয়েরা চাকরি খুঁজতে গিয়ে বা স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করতে গিয়ে হেনস্তা হচ্ছে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হচ্ছে। স্থায়ী ঠিকানাবিহীন হেনস্তার শিকার এই পরিবারগুলো কী সিদ্ধান্ত নিতে পারে? যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে যে, তারা সিদ্ধান্ত নেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে চলে যাওয়ার। কেউ তো তাদের জোর করে গলাধাক্কা দিয়ে তাদের গ্রাম থেকে তথা পার্বত্য জেলা থেকে বের করে দিচ্ছে না; তারা পরিবেশ পরিস্থিতির শিকার হয়েই চলে যাচ্ছে। সম্মানিত পাঠক, আমরা এমন একটা পরিস্থিতিতে আজ ২০১৬ সালের এই আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে এসে দাঁড়িয়েছি। এ জন্যই বিষয়টির অবতারণা করা হলো। আপনাদের মনে অতি ন্যায়সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, বাঙালিরা ওখানে গেলই বা কখন আর তাদের ওখানে থাকতে দিতেই বা চায় না কারা? অথবা, কেনই বা থাকতে দিতে চায় না; এতে কার কী লাভ বা ক্ষতি? আরেকটু পেছনের দিকে গেলে প্রশ্নটি দাঁড়াবে, ‘শান্তিবাহিনী’ নামের সংগঠন আসলে কেন বিদ্রোহ করেছিল; তারা কী চেয়েছিল, তারা কী চায়, তারা ইতোমধ্যে কী পেয়েছে? তাদের চাওয়া-পাওয়ার সাথে বাঙালিদের ওখানে থাকা বা না থাকার কী সম্পর্ক? এসব ন্যায়সঙ্গত জিজ্ঞাসার উত্তর দেয়া প্রয়োজন। যেহেতু পত্রিকার কলামের পরিসর সীমিত, সেহেতু উত্তর অতি সংক্ষেপেই দিতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সঙ্কটের কারণ

এ প্রসঙ্গে সঠিক ইতিহাস জানতে হলে একাধিক আঙ্গিক থেকে লেখা পুস্তক পড়া উচিত; কিন্তু এটা অনেকের জন্যই বাস্তবসম্মত হয়ে ওঠে না। এই কলামের ওপরের অংশে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ পরিস্থিতি মূল্যায়ন নামক যে পুস্তকটির উল্লেখ করেছি সেটিতে সততার সাথে শান্তিবাহিনী ও তাদের দাবি-দাওয়ার প্রসঙ্গটি আলোচিত হয়েছে। কাপ্তাই লেক সৃষ্টি হওয়ার কারণে হাজার হাজার উপজাতীয় পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যার কারণে একটি সাধারণ বিক্ষুব্ধতা ওই অঞ্চলের মানুষের মনে ছিল। দ্বিতীয় একটি কারণ হলো, মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর ভূমিকার ফলে কিছু নেতিবাচক সামাজিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল; এটিও তাদের মনকে বিক্ষুব্ধ করেছিল। তৃতীয় একটি কারণÑ বাংলাদেশের ১৯৭২-এর সংবিধান, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয়কে অস্বীকার করেছিল; ১৯৭৩ সালে সরকারপ্রধানের মৌখিক ঘোষণায় এই অস্বীকৃতি শক্তিশালী হয়েছিল; এ কারণে তারা বিক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। চতুর্থ আরেকটি কারণ; ১৯৬০-এর দশকে উপজাতীয় জনগণের মধ্যে আধুনিক শিক্ষা বিস্তৃত হয়েছিল; বামপন্থী রাজনীতি তাদের মনকে আক্রান্ত করেছিল এবং পার্বত্য বামপন্থীরা তাদের অঞ্চলের সামন্তবাদী (ইংরেজি পরিভাষায় : ফিউডাল) সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিবর্তন চাচ্ছিলেন। পৃথিবীব্যাপী তখন সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন আনার প্রবণতা ছিল। আশা করি, এ আলোচনাটির পরবর্তী অংশ আগামী কিস্তিতে, শনিবার ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬ পাঠক পড়বেন।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি