মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা হত্যার বিচার দাবী উচ্চকিত নয় কেন?

পারভেজ হায়দার

১০ নভেম্বর ২০১৭ পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সন্তু লারমার ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের পরিক্রমা পরিবর্তনে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ওরফে এমএন লারমা একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র । উপজাতীদের একাংশ তাকে জুম্ম জাতির পিতার ন্যায় শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছে, অপর অংশ এমএন লারমা সংক্রান্ত বিষয়দি সব সময়ে এড়িয়ে যেতে চায় । এমএন লারমাকে উপজাতিদের বড় অংশ সব সময়ে আলোচনার বাহিরে রাখতে পারলেই প্রশান্তি বোধ করে, আর এটাও ঠিক বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এমএন লারমার হাত ধরেই “পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি” দলটি গড়ে উঠেছিল, আবার এমএন লারমার হাত ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংগঠন “শান্তি বাহিনী” গড়ে উঠেছিল ।

ব্যক্তি জীবনে এমএন লারমা উপজাতীদের অধিকার আদায়ে একজন প্রথম সারির নেতা ছিলেন, তিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন । তিনি কেন বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশ পূনর্গঠনে ব্যস্ত তৎকালীন সরকারকে তাদের দাবি দাওয়া সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট সময় না দিয়ে, সম্পূর্ণ অনিয়মতান্ত্রিক পথ অর্থাৎ সশস্ত্র দল গঠন করে স্বাধীন দেশের স্বাধীন সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী ও সাধারণ জনগনের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের সূচনা করেছিলেন সে বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্ত পরিস্থিতি সৃষ্টির পিছনে এমএন লারমার বির্তকিত ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনার আগে তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নেওয়া যাক । তার জন্ম ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে রাঙ্গামাটি’র চাকমা উপজাতির একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে । তিনি ১৯৫৬ সালে রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন । পরবর্তীতে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৬৩ সালে একই কলেজ থেকে তিনি বিএ পাশ করেন । তিনি ১৯৬৮ সালে কুমিল্লা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে থেকে বিএড ডিগ্রী অর্জন করেন ।

পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম আইন কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রী অর্জন করেন এবং চট্টগ্রাম জেলা বার এর একজন সদস্য আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন ।

পড়াশুনার পাশাপাশি ছাত্রজীবন থেকেই এমএন লারমা উপজাতিদের বিভিন্ন অধিকার সুরক্ষাজনিত আন্দোলনে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতেন । তিনি ১৯৫৬ সালে “জুমিয়া স্টুডেন্ট মুভমেন্ট” গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং পরবর্তিতে ১৯৬২ সালে পার্বত্য অঞ্চলের যুবকদের নিয়ে একটি সংগঠন “পাহাড়ি ছাত্র সমিতি” গঠন করেন ।

১৯৬০ সালে কাপ্তাই হাইড্রো ইলেকট্রিক প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হবার পর এমএন লারমার পরিবার রাঙ্গামাটি থেকে খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়িতে স্থানান্তরিত হয় । তাকে ১৯৬৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী তারিখে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তার বিতর্কিত ভূমিকার কারণে গ্রেফতার করে ।

পরবর্তীতে দুই বছর পর তিনি ৮ মার্চ ১৯৬৫ সালে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে উপজাতিদের অধিকার সমুন্নত রাখার আন্দোলনে রাজনৈতিকভাবে তার অনুসারীদের এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থানরত বিভিন্ন উপজাতি সম্প্রদায়কে একত্রিত করতে সচেষ্ট হন। নিয়মতান্ত্রিকভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে এমএন লারমা’র জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে । ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে তিনি নির্বাচনে জয়লাভ করেন ।

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে চাকমা সম্প্রদায়ের বিতর্কিত ভূমিকা সর্বজনবিদিত । তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে রাজাকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন । তিনি চাকমা সম্প্রদায়ের অধিবাসীদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।

সে প্রেক্ষিতে এমএন লারমা চাকমা জনগোষ্ঠীর একজন সদস্য হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে জানা যায়। এমনকি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চাকমা এলাকাগুলোতে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলিত হতে থাকে । পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের জানুয়ারীতে মুক্তিযোদ্ধাগণ সেখানে গিয়ে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে, বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিলেন ।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ১০ জানুয়ারী ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসেন । দেশে ফেরার পর যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে জনগনকে উদ্বুদ্ধ করে একযোগে কাজ করা শুরু করেন । পুরো জাতি যখন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনগঠনে ব্যস্ত তখন এমএন লারমা ১৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৭২ সালে “পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি” দল গঠন করেন ।

নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির এই পরিক্রমায় হঠাৎ করেই এমএন লারমা ১৯৭৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির একটি সশস্ত্র শাখা “শান্তিবাহিনী” গঠন করেন । বিষয়টি নিয়ে একটি জনশ্রুতি ছিল যে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক গঠিত পিস কমিটির কমিটির চিন্তাধারা থেকেই এর বাংলা প্রতিশব্দ “শান্তিবাহিনী” নামটির উৎপত্তি হতে পারে । “শান্তিবাহিনী” নামকরণের পিছনে অন্যান্য গ্রহণযোগ্য বেশকিছু মতামত রয়েছে । কোন কোন গবেষক মনে করেন এটি এমএন লারমার ছোট ভাই সন্তু লারমা’র নামের প্রথম অংশ ‘সন্তু’ তথা শান্তি থেকে এ নামকরণ করা হয়েছে । কবি ও লেখক আহমদ ছফা’র মতে “শান্তিবাহিনী” অনেকটা তৎকালীন চরমপন্থী তথা “সর্বহারা পার্টি” দ্বারা প্রভাবিত ।

তখন চীনাপন্থী বিভিন্ন চরমপন্থী দলের নেতাকর্মী পার্বত্য অঞ্চলে আত্মগোপন করে থাকতেন । পার্বত্য জনগোষ্ঠীর নেতারা তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন । সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ শিকদার তার “জনযুদ্ধের পটভূমি” নামক কবিতার বই এ পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসিদের গেরিলা সংগ্রামে নিয়ে আসার কথা উল্লেখ করেছিলেন ।

এমএন লারমা গোপনে “শান্তিবাহিনীর” সশস্ত্র দলের প্রস্তুতির পাশাপাশি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিও  চালিয়ে যাচ্ছিলেন । ১৯৭৩ সালে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এমনকি ১৯৭৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান কর্তৃক বাকশাল গঠন করা হলে এমএন লারমা বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন । অর্থাৎ তিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পাশাপাশি দেশ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন ।

এমএন লারমা চীনাপন্থী কমিউনিজমে বিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু তার সহযোদ্ধা ও অনুসারীরা সকলেই একই নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না । তাই ১৯৭৬ সালেই শান্তিবাহিনীর মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয় ।

শান্তিবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা প্রীতি কুমার চাকমা চীনাপন্থী কমিউনিজম এর সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন । ১৯৭৬ সালে সৃষ্ট শান্তিবাহিনীর মধ্যে বিভক্তি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ১৯৮১ সালের মধ্যে শান্তিবাহিনীর বিভক্তি চরম আকার ধারণ করে । সেপ্টেম্বর ১৯৮১, আগস্ট ১৯৮২, এবং জুলাই ১৯৮৩ সালে এমএন লারমা গ্রুপ এবং প্রীতি গ্রুপের মধ্যে বেশ কয়েকবার বড় ধরণের সংঘর্ষ হয় । ঐ সংঘর্ষসমূহে শতাধিক শান্তিবাহিনী সদস্য নিহত হয়েছিলেন ।

এরই মধ্যে  ১০ ডিসেম্বর ১৯৮৩ সালে সীমান্তের ওপারে ইমারা গ্রামের বাঘমারা নামক স্থানে শান্তিবাহিনীর কল্যাণপুর ক্যাম্পে প্রীতি গ্রুপের সদস্যদের হামলায় এমএন লারমা নিহত হন । এমএন লারমার সাথে সে সময়ে তার বড় ভাইয়ের শ্যালক মনি চাকমা, খাগড়াছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক অর্পণা চরণ চাকমা, কল্যাণময় চাকমা এবং লে. রিপনসহ শান্তিবাহিনীর ৮জন সদস্য ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান । একই সময়ে শান্তিবাহিনীর কেন্দ্রীয় পর্যায়ের ৬-৭ জন কেন্দ্রীয় নেতাও এ হামলায় আহত হয়েছিলেন ।

কল্যাণপুর ক্যাম্পের অপারেশন এর ঘটনা সম্পর্কে যতদূর জানা যায়, প্রীতি গ্রুপের ক্যাপ্টেন এলিন এর নেতৃত্বে ৮-১০ জনের একটি সশস্ত্র দল লারমা গ্রুপের ক্যাম্পে অতর্কিত সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে উক্ত ঘটনা ঘটায় । ঐ সময়কার ঘটনাবলী সম্পর্কে আরও জানা যায়, একই দিনে মতিবান পুলিশ ক্যাম্প হতে ১ মাইল পূর্বে প্রীতি গ্রুপ এমএন লারমার মামার বাড়িতে অবস্থানরত শান্তিবাহিনীর সদস্যদের উপরও আক্রমণ চালায়, যদিও এ আক্রমণে কেউ হতাহত হয়নি ।

এমএন লারমা হত্যাকাণ্ডে পর তার অনুজ সন্তু লারমা জন সংহতি সমিতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন । তবে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে আজ অবধি কোথাও কোন মামলা হয়নি অথবা লারমা গ্রুপ থেকেও উল্লেখযোগ্য কোন প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি । এমএন লারমাকে হত্যা করার বিষয়টির সত্যতা থাকার পরও এ বিষয়ে কোন আন্দোলন অথবা প্রতিবাদের ঘটনা ঘটেনি ।

অন্যদিকে কল্পনা চাকমার বিষয়টির প্রচারিত গল্পের কোন সত্যতা বা ভিত্তি না থাকলেও বিষয়টিকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর কল্পনা চাকমা অপহরণ দিবস ও বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচী পালন করা হচ্ছে যা উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর স্ববিরোধী ভূমিকারই বহিঃপ্রকাশ ।

তবে কি এমএন লারমার বিষয়ে উপজাতি নেতৃবৃন্দ তাদের নেতৃত্বের আন্তঃকলহকে দায়ী করছেন? নাকি এমএন লারমা’র হত্যার পর যেসকল উপজাতি ব্যক্তিবর্গ উচ্চ নেতৃত্বের স্বাদ পেয়েছেন, তাদেরও কিছুটা পরোক্ষ ইন্ধন ছিল? এ প্রশ্নের উত্তর পরবর্তী সময়ই বলে দিবে ।

এভাবেই এমএন লারমার মত একজন প্রতিভাবান উপজাতি নেতা হত্যাকাণ্ডের সাথে সাথে একটি বিতর্কিত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে । তবে তার মাধ্যমে সৃষ্ট শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র কার্যক্রম এবং এর ফলশ্রুতিতে অসংখ্য জীবনহানির ঘটনা ইতিহাসের কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত থাকবে ।

যে সময়টাতে এমএন লারমা “শান্তিবাহিনী” গঠন করে সশস্ত্র কার্যক্রম শুরু করেছিলেন সে সময়ে পার্বত্য অঞ্চলে তাদের ভাষায় তথাকথিত সেটেলার বাংগালীগণ অবস্থান করতে শুরু করেনি । “শান্তিবাহিনী”র ব্যনারে গেরিলা সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার পূর্বে এমএন লারমা এবং তার অনুসারীদের উচিত ছিলো নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের দাবি দাওয়া তুলে ধরা।

এমএন লারমা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের স্বার্থ বিরোধী কাজ করেলেও তিনি যেহেতু একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন, তার উচিত ছিলো সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের সরকারকে সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া । কিন্তু তিনি তা না করে, বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে নিজেকে সম্পৃক্ত করে নিজ দেশের জনগণ ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শুরু করেছিলেন যা তাকে “গ্রেট লিডার” বলাতো দুরের কথা তাকে ইতিহাসের একজন “খল নায়ক” হিসেবে পরিগণিত করাই সমীচীন হবে ।

উপজাতী ব্যক্তিবর্গের মধ্যেও তার মৃত্যু দিবস পালনে যথেষ্ট বিতর্ক ও বিভক্তি রয়েছে । তার আপন ভাই পার্বত্য জনসংহতি সমিতি এর সভাপতি সন্তু লারমাসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ এবং ইউপিডিএফ নেতৃবৃন্দদের মধ্যে কাউকে তার হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়া এবং তার সম্পর্কে আলোচনা করতে খুব একটা দেখা যায় না । শুধুমাত্র জেএসএস (সংস্কার) দলটি জেএসএস (এমএন লারমা) হিসাবে নিজেদের পরিচিত করে “এমএন লারমার” নামের ব্যানার ব্যবহার করে বিভিন্ন দিবসে কর্মসূচি দিয়ে থাকে এবং এ দিবস পালনের নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক চাঁদাবাজি করে থাকে।

এমএন লারমার জীবনের সার্বিক বিষয় মূল্যায়নে বলা যায় তিনি একজন বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব যিনি দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে একটি সশস্ত্র সংগ্রামের জন্ম দিয়েছেন, যার প্রতিফল হিসাবে ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশকে চরমভাবে মূল্য দিতে হয়েছে এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সৃষ্টিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে ।




রোহিঙ্গাবিহীন রাখাইন এবং বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রাম


সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

(গত সপ্তাহ থেকে ধারাবাহিকতা)
বুধবার ৪ অক্টোবর ২০১৭ তারিখের কলামে (অর্থাৎ গত সপ্তাহে) আমরা আলোচনাটি শুরু করেছিলাম কিন্তু শেষ করতে পারিনি। রাখাইন এবং রোহিঙ্গা নিয়ে কিছুটা আলোচনা করেছি। আরো কিছু আলোচনা বাকি আছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে মাত্র দশ-বিশটা লাইন লিখেছি; এটা নিয়ে আরো একটু লিখতে হবে। গত সপ্তাহে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যতটুকু লিখেছিলাম, তা আসলেই অতি সংক্ষিপ্ত। সেটা হুবহু এখানে উদ্ধৃত করলাম। অর্থাৎ পরের অনুচ্ছেদটি পুরোটাই উদ্ধৃতি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গ (৪ অক্টোবর ২০১৭)
ছলে-বলে-কৌশলে, সময় নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিদের বহিষ্কার করা হবে বলে আশঙ্কা বিশদভাবে ও বিস্তৃতভাবে বদ্ধমূল হয়েছে। বিশেষত ওই বাঙালি যারা ১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। তবে এই প্রসঙ্গে ভালো-মন্দ আলোচনা আজকে করব না। একটু আগেই প্রসিদ্ধ বাংলা শব্দগুলো লিখেছি ছল-বল-কৌশল। এরূপ ছল-বল ও কৌশল অবলম্বন ও প্রয়োগ করছে বাংলাদেশ সরকার, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং বাংলাদেশের কিছু এনজিও, বুদ্ধিজীবী এবং বাংলাদেশের মিডিয়ার একটি অংশ। এরূপ ছল-বল ও কৌশল প্রয়োগের অনেক উদাহরণের মধ্যে একটি উদাহরণ হলো ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন। আলোচনাটি আগামী সপ্তাহে থাকবে। উদ্ধৃতি শেষ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের অবস্থান বা উপস্থিতি কেন?
এ প্রসঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা অতীতে অনেকবার করেছি, অনেক কলাম লিখেছি। একাধিক লেখকের বই পাবেন পড়ার জন্য। আমি আজকে দু’টি বইয়ের রেফারেন্স উল্লেখ করছি।

এক. বইয়ের নাম : ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিপ্রক্রিয়া ও পরিবেশ পরিস্থিতির মূল্যায়ন’। বইয়ের লেখক : মেজর জেনারেল অব: সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক। বইয়ের প্রকাশক মওলা ব্রাদার্স, ফোন নম্বর : ৭১৭৫২২৭ অথবা ৭১১৯৪৬৩। বইটির প্রাপ্তিস্থান : যেকোনো বড় বই বিক্রয়ের দোকানে অথবা চট্টগ্রাম মহানগর প্রেসক্লাব বিল্ডিংয়ে বাতিঘর অথবা ঢাকা মহানগর বেইলী রোডে সাগর পাবলিশার্স অথবা প্রকাশকের স্টক থেকে অথবা রকমারিডটকম নামক অনলাইন বই বিক্রেতা।

দুই. বইয়ের নাম : ‘চাকমা জাতির ইতিহাস বিচার : অখণ্ড সংস্করণ’। বইয়ের লেখক : অশোক কুমার দেওয়ান। প্রকাশক শিকড়। ফোন নম্বর : ৪৭১১৬০৫৪। এই বইগুলোতে বাঙালি এবং চাকমা প্রসঙ্গ বিস্তারিতভাবে আলোচিত। তারপরেও কিছু উল্লেখ করছি। ঠিক পরবর্তী অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য।


লেখাটির প্রথম পর্ব পড়ুন নিম্নের লিংক থেকে

রোহিঙ্গাবিহীন রাখাইন এবং বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রাম : ভয়ঙ্কর এক খেলা


শান্তিবাহিনীর বিদ্রোহের কারণেই বাঙালি বসতি স্থাপন
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নামক গোপন রাজনৈতিক দলটির জন্ম হয় ১৯৭২ সালে। এই দলটির গোপন সশস্ত্র শাখা সৃষ্টি হয় ১৯৭৩ সালে; যদিও প্রশিক্ষণের জন্য প্রথম ব্যাচ ভারতে গিয়েছিল ১৯৭২ সালের শেষে। এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর নাম ছিল শান্তিবাহিনী। এরা বিদ্রোহ শুরু করে ১৯৭৫-এর ডিসেম্বর থেকে। ডেপুটি চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে একাধিকবার পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করেন ও উপজাতীয় জনগণের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপ করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নপ্রক্রিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে তদারকি ও উৎসাহ দেয়ার জন্য, সবার পরামর্শ নিয়েই তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বিদ্রোহীগোষ্ঠীর সঙ্গে সংলাপের জন্য বিভিন্ন মাধ্যম সন্ধান করেন ও সক্রিয় করেন। কোনো চেষ্টাতেই কিছু হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। কারণ শান্তিবাহিনী বা জনসংহতি সমিতি ছিল চরম বামপন্থী সংগঠন। তাদের লক্ষ্যবস্তু ছিল দীর্ঘমেয়াদি গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমাজব্যবস্থা থেকে সামন্ততন্ত্র বা ফিউডালিজম তথা রাজা-দেওয়ান-খিসা-তালুকদার-হেডম্যান ইত্যাদির শাসন থেকে উপজাতীয় সমাজকে মুক্ত করা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা।

ওইরূপ একটি গোষ্ঠী, বিদ্রোহ শুরু করার দু-তিন বছর বা তিন-চার বছরের মাথাতেই বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসবে, এরূপ আশা করাটাই অস্বাভাবিক। কারণ আলোচনার টেবিলে বসলে সমাধানের আলো দেখা যায়। কিন্তু বামপন্থী গেরিলা গোষ্ঠীগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আগ্রহী নয়, তারা তাদের মনমতো সমাধানে আগ্রহী, যার মানে হলো সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে সমাধান অর্জন করা।

সম্মানিত পাঠক, মেহেরবানি করে খেয়াল করুন, আমরা আলোচনা করছি ১৯৭০-এর দশকের কথা, যেই সময় দক্ষিণ এশিয়াতেই অন্তত ১৬টি এইরূপ বিদ্রোহ সচল ছিল এবং পৃথিবীব্যাপী অন্তত অর্ধশত এরূপ বিদ্রোহ সচল ছিল। কোনো মতেই ২০১৭ সালের বাস্তবতা দিয়ে ১৯৭৭ বা ১৯৭৯কে বিচার করলে চলবে না। সেই সময় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং পরে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অনেকবার স্পষ্ট করেই আওয়াজ দেন, আহ্বান জানান যেন শান্তিবাহিনী আলোচনার টেবিলে আসে। এইরূপ আহ্বানের অন্যতম মাধ্যম ছিল তৎকালীন অন্যতম ব্রিগেড কমান্ডার, ব্রিগেডিয়ার এ এস এম হান্নান শাহ (এক বছর আগে মরহুম)। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এটা জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, যদি শান্তিবাহিনী আলোচনার টেবিলে না আসে সমাধানের প্রয়োজনে, তাহলে সরকার একতরফাভাবেই বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে থাকবে। অর্থাৎ তিন-চার বছর পুরনো শান্তিবাহিনীকে অঘোষিত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে দেয়া হবে না।

তিনটি কথা
এই স্থানে আমি সুস্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই তিনটি কথা। প্রথম কথা এই যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী ১৯৭৫-এর ডিসেম্বরে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করেছিল এবং যে কারণেই সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করুক না কেন, সেই কারণগুলো অবশ্যই ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরের আগেকার সময়ের বা আগের বছরগুলোর। এ রকমও বলা যায় যে, ১৯৪৭ থেকে শুরু করে ১৯৭৫ পর্যন্ত সময়ে, পার্বত্য জনগোষ্ঠীর ওপর যেসব অবিচার বা অন্যায় করা হয়েছিল, সেগুলোর প্রতিক্রিয়ায় বা সেগুলোর প্রতিবাদে, নিজের উদ্যোগে বা প্রতিবেশীর উৎসাহে বা উভয়ের মিশ্রিত প্রভাবে, শান্তিবাহিনী বিদ্রোহ শুরু করেছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে।

দ্বিতীয় কথা এই যে, শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র বিদ্রোহের প্রস্তুতি ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর থেকে পেছন দিকে অন্ততপক্ষে তিন বছর ধরেই নেয়া হচ্ছিল, ভারতের মাটিতে এবং বাংলাদেশের মাটিতে। তৃতীয় এবং শেষ কথা এই যে, সশস্ত্র বিদ্রোহীরা যেমন বিভিন্ন কৌশল ও পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাদের উদ্দেশ্য সফল করার জন্য, তেমনি বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোও নিজ নিজ দেশে বিদ্রোহ দমনের জন্য বিভিন্ন কৌশল ও পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে, সরকারের উদ্দেশ্য সফল করার জন্য।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৯৭৬-৭৭-৭৮ সালের কথা বলছি। ওই সময় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আগ্রহে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভৌত কাঠামো উন্নয়নের জন্য ইনটেনসিভ বা নিবিড় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এসব করতে গেলে অনেক কনস্ট্রাকশন বা নির্মাণকাজের প্রয়োজন পড়ে যেমন রাস্তা নির্মাণ, বিল্ডিং নির্মাণ ইত্যাদি। ওই সময় পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের অভ্যাসই ছিল না এই ধরনের কায়িক শ্রম করার। ফলে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য শ্রমিক প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

যখন বিভিন্ন নির্মাণকাজ ও ভৌত কাঠামো কাজ চালু করা হলো, তখন শান্তিবাহিনী কন্ট্রাক্টরের মানুষগুলোকে এবং যৎকিঞ্চিৎ প্রাপ্ত পাহাড়ি শ্রমিকদের আক্রমণ করে হত্যা করা শুরু করল। শ্রমিকদের আবাসিক শেড বা বেড়ার ঘরগুলোতে আগুন দিয়ে মেরে ফেলা হলো। শান্তিবাহিনী প্রচার করল যে, এসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করা হচ্ছে জুম্মু জাতিকে ধ্বংস করার জন্য।

একই সাথে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধি পেল। সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডে লজিস্টিকস সহযোগিতার জন্য স্থানীয় পাহাড়ি জনসাধারণ এগিয়ে আসতে চাইলেও, শান্তিবাহিনীর আক্রমণের কারণে আসতে পারত না। ফলে অন্য প্রকৃতির জনসাধারণ বা জনগোষ্ঠী বা জনবসতি প্রয়োজন আবশ্যক হয়ে পড়ল। এই হলো অতি সংক্ষেপে, পুনশ্চ অতি সংক্ষেপে, বাঙালিদেরকে বসতি স্থাপনের জন্য অনুমতি প্রদানের প্রেক্ষাপট।

বাঙালিরা সেখানে যাওয়ার পর অনেক অনাবাদি জায়গা আবাদ করার উদ্যোগ হলো, ধানচাষ বৃদ্ধি পেল, সবজিচাষ বৃদ্ধি পেল, অর্গানাইজড মার্কেটিং শুরু হলো, নির্মাণকাজের জন্য শ্রমিক পাওয়া গেল।

বাঙালিরা বসতি স্থাপন শুরু করার পর নতুন নতুন সমস্যারও উদ্ভব হলো যেমন সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে। বসতি স্থাপনের সময় তদারকি ও পরিকল্পনায় দুর্বলতা ছিল; অভিজ্ঞতার অভাবে এটাও সত্য।

যা হোক, সার্বিকভাবে পুরনো সমস্যার কিছুটা সমাধান আবার নতুন সমস্যার নতুন সমাধান হয়ে উঠল দৈনন্দিন কাজ; ইংরেজি পরিভাষায় অর্ডার অব দি ডে। বাঙালিদেরকে বসতি স্থাপন করতে দেয়ার প্রতিবাদে বা প্রতিক্রিয়ায়, উত্তেজিত হয়ে, শান্তিবাহিনী বাঙালি বসতিগুলোতে আক্রমণ করতেই থাকল এবং হাজারে হাজার বাঙালি মরতেই থাকল। বাঙালি মরার সাথে সাথে, বাঙালিরা পাহাড়িদের গ্রামে আক্রমণ করতে শুরু করল, আক্রমণের ফলে পাহাড়িরা মারা গেল এবং পাহাড়িরা শরণার্থী হয়ে ভারতে গেল। বহু বছর এই প্রক্রিয়া বা এই সাইকেল বা আক্রমণাত্মক চক্র চলেছে। একপর্যায়ে কৌশলগুলো পুরনো হয়ে আসে।

বাঙালি বহিষ্কারের চিন্তা
অতএব বাঙালিদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বহিষ্কার করার নতুন নতুন পন্থা বা ধান্ধা সন্ধান শুরু হলো। ১৯৮২-৮৩, ১৯৮৭-৮৮ বা ১৯৯২-৯৩ বা ১৯৯৬-৯৭ সালে শান্তিবাহিনী অবশ্যই সরকারের কাছে আবেদন করেছে, দাবি দিয়েছে বাঙালিদেরকে প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য। উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের কিছু সরকার এবং এনজিও এই দাবি দিয়েছে। উত্তর হয়েছে: না, প্রত্যাহার হবে না।

কিন্তু ১৯৯৭-এর ডিসেম্বরের শান্তিচুক্তির মাধ্যমে এমন একটি ছদ্মবেশী বন্দোবস্ত করা হয়েছে যেন ক্রমান্বয়ে বাঙালিরা ফেরত আসতে বাধ্য হবে। শান্তিচুক্তির মাধ্যমে, পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য দু’টি ভোটার তালিকার কথা তৎকালীন ও বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার স্বীকার করে নিয়েছে।

তৎকালীন ও বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার স্বীকার করে নিয়েছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রশাসনে ও নেতৃত্বে বাঙালিরা থাকবে না। বাঙালিরা এর প্রতিবাদ করেছে, আমরাও প্রতিবাদ করছি। ভূমি নিষ্পত্তি কমিশনের মাধ্যমে, মিষ্টি প্রলেপ দিয়ে তিতা ট্যাবলেট খাওয়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বৃহত্তর বাংলাদেশের জনগণ, বৃহত্তর বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী, পার্বত্য চট্টগ্রামে জান-প্রাণ, রক্ত ঘাম দিয়েছেন এমন ব্যক্তিরা যেহেতু বিষয়টিতে মনোযোগ দেয়ার সময় পান না সেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা এতিমের মতো লড়াই করে যাচ্ছেন; বেঁচে থাকার লড়াই।

অসাধারণদের অসাধারণ চেষ্টা
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে কিছু মামলার এমন রায় দিয়েছেন, যেই রায়গুলোর কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল; যেই রায়গুলোর কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল; যেই রায়গুলোর কারণে আইনি প্রক্রিয়ার দুয়ার চার ভাগের তিন ভাগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অতএব, অশান্তি আনার রাস্তা খুলে দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের শ্রদ্ধেয় চিন্তাশীল আইনজীবীরা স্বপ্রণোদিত হয়ে এ বিষয়ে মনোযোগ দেবেন এরূপ বিনীত আশা করি। পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় থাকা সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি নিষ্পত্তি কার্যকলাপের তদারকিতে তথা ভূমি নিষ্পত্তি কমিশনের বিরোধিতাকারীদের মোকাবেলা করার কাজে, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা জড়িত হওয়ার বিষয়টিও রহস্যজনক। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভেতরে এই মুহূর্তে বিরাজমান সমস্যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা।

মানচিত্র থাকলে বিষয়টি বুঝতে সুবিধা
এই কলামের সচেতন জ্ঞানী-গুণী পাঠকের সমীপে আমার বিনীত নিবেদন তথা আবেদন, আপনারা মেহেরবানি করে উত্তর-পূর্ব ভারত, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশ এবং এতদসংলগ্ন মিয়ানমার দেখা যায় এই রকম একটি মানচিত্র সামনে নিয়ে, আলোচ্য বিষয়গুলোকে নিয়ে চিন্তা করুন। আরাকান নামক প্রদেশকে রাখাইন প্রদেশ বানানো হয়েছে। আকিয়াব নামক বন্দরনগরীকে সিতুওয়ে বানানো হয়েছে। আরাকান থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করা হচ্ছে।

অতএব আরাকানের পাহাড়ি ভূমিতে ও জঙ্গলে যদি বাংলাদেশের কোনো বিদ্রোহী সশস্ত্রগোষ্ঠী বা ভারতের মনিপুর নাগাল্যান্ড ইত্যাদির বিদ্রোহীগোষ্ঠী আশ্রয় নিতে চায়, তাহলে তারা নিতেই পারে। ভারতের বিরুদ্ধে মিয়ানমার কাউকে আশ্রয় দেবে না। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কাউকে আশ্রয় দিতেও পারে। বিপরীত বক্তব্যটিও প্রণিধানযোগ্য।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ও জঙ্গলের ভেতরে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিদ্রোহীগোষ্ঠী তাদের আশ্রয়স্থল বা ক্যাম্প বানাতেও পারে। আমরা এই ধরনের সব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে। আমরা সচেতন থাকতে চাই। আরাকানের মাটির নিচে গ্যাস ও খনিজসম্পদ আছে এবং আরাকানের পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের পানির নিচে গ্যাস ও তেল আছে। মিয়ানমার সরকার সেগুলো উত্তোলনের বন্দোবস্ত করছে।

তা ছাড়া আরাকানের সমুদ্রতটে চীনের ব্যবহারের জন্য এবং ভারতের ব্যবহারের জন্য বন্দর নির্মিত হচ্ছে; ওইসব বন্দর থেকে তেল গ্যাস ও মালামাল চীন ও ভারতে যাওয়ার জন্য আলাদা পাইপলাইন ও আলাদা সড়ক নির্মিত হচ্ছে। এরূপ পরিস্থিতিতে মিয়ানমার সরকার চায় আরাকানে যেন কোনো অশান্ত পরিবেশ না থাকে। যদি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আরাকানে থাকে এবং যদি কোনো দিন রোহিঙ্গারা সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয় তাহলে তারা স্থানীয়দের কাছ থেকে সহায়তা পেতে পারে।

এরূপ সহায়তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নির্মূল করার জন্য মিয়ানমার যাবতীয় বন্দোবস্ত গ্রহণ করছে। আমরা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে চাই না। মিয়ানমার তাদের জনগোষ্ঠীকে আমাদের দেশে পাঠিয়ে আমাদের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করছে। মিয়ানমারকে এই কাজ করতে দেয়া যায় না। আমরা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে স্বাগত জানিয়েছি এবং জানাতেই থাকব।

কিন্তু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আমরা চিরদিনের জন্য বাংলাদেশে রাখতে পারব না। জাতিসঙ্ঘ অথবা বহুজাতিক সংস্থার তত্ত্বাবধানে ও সংশ্লিষ্টতায় মিয়ানমারকে বাধ্য করতে হবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসন করতে সসম্মানে ও নাগরিক অধিকারসহ। এটা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য অতি প্রয়োজন।

বাঙালিরা না থাকলে কী হতে পারে?
যদি পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা না থাকে তাহলে, কৌশলগতভাবে সেখানে বাংলাদেশ সরকারের বা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষার বা বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিশদ ক্ষতি হতেই পারে এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রামে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রগুলো থেকে বসতি স্থাপন করার জন্য অন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বা উপজাতীয় গোষ্ঠীর মানুষ যে আসবে না তার কোনো গ্যারান্টি নেই।

বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রামে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সরকারগুলোর বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ বা ইনসার্জেন্সিতে লিপ্ত গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় বা সংগঠনগুলো যে প্রশিক্ষণের জন্য ক্যাম্প বানাবে না বা আশ্রয় নেবে না তার কোনো গ্যারান্টি নেই। বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রামে, সাবেক শান্তিবাহিনী বা তাদের নতুন কোনো রূপের বা নতুন কোনো আকারের সংগঠন যে নতুন করে তৎপরতা শুরু করবে না তার কোনো গ্যারান্টি নেই। বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রামে, যেকোনো প্রয়োজনে সামরিকবাহিনী চলাচলের সময় লজিস্টিক সহযোগিতা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভীষণ শূন্যতার সৃষ্টি হবে না তার কোনো গ্যারান্টি নেই। বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রামে মিয়ানমারের আগ্রাসী ছদ্মবেশী সরকার যে সন্ত্রাসী তৎপরতায় উসকানি দেবে না তার কোনো গ্যারান্টি নেই।

বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯৭১ সালের শেষের দিকের মতো, ওই আমলের ভারতীয় মেজর জেনারেল এস এস উবানের মতো অন্য কোনো জেনারেলের নেতৃত্বে যে একটি গেরিলা সামরিকবাহিনী গঠিত হয়ে চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করার তৎপরতা সৃষ্টি করবে না বা নিদেনপক্ষে চট্টগ্রাম বন্দরকে অচল করার চেষ্টা করবে না তার কোনো গ্যারান্টি নেই।

১৯৭১ সালে উবানের কৌশলগত যুদ্ধ ছিল তৎকালীন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে, কিন্তু মাটিটা ছিল চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশের। এখন মাটি চট্টগ্রামের ও বাংলাদেশের, বন্দর চট্টগ্রামের ও বাংলাদেশের কিন্তু নতুন উবান সাহেব বাংলাদেশের বন্ধু হবে তার কোনো গ্যারান্টি আছে কি? বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসীরা যে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে হুমকির সামনে রাখবে না তার কোনো গ্যারান্টি নেই। কাপ্তাই বাঁধের ষোলোটি পানি নিষ্কাশন গেট যদি কোনো সময় একসঙ্গে ছেড়ে দেয় তাহলে কর্ণফুলী নদীর দুই তীরের উভয় দিকে আট থেকে দশ মাইলব্যাপী এলাকা প্লাবিত হয় এবং চট্টগ্রাম বন্দর সাময়িকভাবে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। (দ্রষ্টব্য: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে, বিশেষত মুক্তিযুদ্ধের শেষাংশে নভেম্বর ও ডিসেম্বরে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামে, বাংলাদেশী গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা সম্বন্ধে এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল উবানের নেতৃত্বাধীন ‘ফ্যানটম’ বাহিনীর তৎপরতা সম্বন্ধে যেসব পাঠকের সম্যক ধারণা নেই, তাদের জন্য, এই অনুচ্ছেদের শেষাংশ বোঝা একটু কষ্টকর হতেই পারে। তার জন্য আমি দুঃখিত)।

রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির সফর
আজ বুধবার ১১ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে আপনারা এই কলাম পড়ছেন। চার দিন আগে, ৭ অক্টোবর তারিখে ভোরে কক্সবাজার জেলায় গেলাম এবং ৮ অক্টোবর তারিখ রাত পর্যন্ত ছিলাম। দু’দিন এবং এক রাত এই সময়টি ব্যয় করেছি সরেজমিনে সীমান্তের নিকটবর্তী দু-একটি জায়গা দেখা, দু-একটি ক্যাম্প দেখা এবং ব্যাপকভাবে সংশ্লিষ্ট মানুষের সঙ্গে কথা বলা। এ প্রসঙ্গে আগামী বুধবার ১৮ অক্টোবর তারিখ ইনশাআল্লাহ আপনারা পড়বেন। আজকে এই অনুচ্ছেদে আমি গত সপ্তাহের কলাম এবং আজকের কলামের উসংহার টানছি।
সাবধানতা অবলম্বনের আহ্বান

রোহিঙ্গা (মুসলমান)বিহীন রাখাইন প্রদেশ সৃষ্টির প্রক্রিয়া অনেক দূর অগ্রগতি হয়েছে। এই বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষকে আর ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝাতে হবে না। কিন্তু বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রাম আগামীকাল বৃহস্পতিবারই সৃষ্টি হবে, আগামী নভেম্বরেই সৃষ্টি হবে বা আগামী ২০১৮ সালেই সৃষ্টি হবে আমি এমনটি কোনো মতেই বলছি না। আমি বলতে চাচ্ছি, এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সচেতন জনগণের পক্ষ থেকে, বুদ্ধিবৃত্তির জগতে, রাজনীতির জগতে, নিরাপত্তার জগতে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।

প্রয়োজনীয়তা :

বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে। আমরা অবশ্যই চাই, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিপূর্ণ থাকুক। আমরা অবশ্যই চাই বাংলাদেশের সংবিধান মোতাবেক, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী বা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী শান্তিপূর্ণ ও গতিশীল জীবনযাপন করুক। বাংলাদেশ যেমন আমার, তেমনি বাংলাদেশ আপনারও, সবার। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর আবাল-বৃদ্ধ মানুষের জন্মভূমি ও মাতৃভূমি এই বাংলাদেশ। সুতরাং বাঙালি এবং পাহাড়ি সবাই মিলেমিশে পাহাড়ে থাকবেন এটাই লক্ষ্য।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
mgsmibrahim@gmail.com




রোহিঙ্গাবিহীন রাখাইন এবং বাঙালিবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রাম : ভয়ঙ্কর এক খেলা

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

কলাম লিখি বহু দিন; কিন্তু কলাম প্রকাশের দিন এবং আমার জন্মদিন একই সাথে মেলেনি কোনো দিন; আজই কিভাবে যেন মিলে গেল! গতকাল পর্যন্ত ৬৮টি বছর শেষ হলো; আজ বুধবার ৪ অক্টোবর ২০১৭ তারিখ থেকে আমার ৬৯তম বছর শুরু হলো। ছোট-বড় সবার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা নিবেদন করছি; ছোট-বড় সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি। মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া তথা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি সব কিছুর জন্যÑ পিতা-মাতার দীর্ঘ হায়াত দিয়েছেন, ভাইবোনে ভরপুর সংসার পেয়েছি, স্ত্রী-পুত্র-পুত্রবধূ-জামাতা-কন্যা-নাতি সবাইকে নিয়ে ভরপুর সংসার পেয়েছি, মহান মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনে থাকতে পেরেছি, সফল পেশাগত জীবন পেয়েছি, কর্মব্যস্ত অবসর জীবনযাপন করছি এবং এখনো নিজ সম্মানটুকু ধরে রাখতে পেরেছি।

সব কিছুই সম্ভব হয়েছে মহান আল্লাহ তায়ালার দয়ার কারণে। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দেশ ও জাতির খেদমতে যেন সহজ ও সরল পথে থাকতে পারি, এটাই কামনা। পাশাপাশি, আমার নাতিদীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে, অন্য যা কিছু সম্ভব তাই যেন জাতির খেদমতে নিবেদন করতে পারি; সেটাও একটি কামনা। এই প্রেক্ষাপটেই কলাম লিখছি ২০ বছর ধরে এবং টেলিভিশনে বক্তব্য রাখছি ১৬ বছর ধরে। গত চার-পাঁচ সপ্তাহ যাবত নির্বাচন কমিশন ও রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ নিয়েই লেখালেখি করেছি। রোহিঙ্গা সমস্যার আলোচনা চলতেই থাকবে আরো কিছু দিন। তবে আজকের আলোচনাটির ফোকাস ব্যতিক্রমী। ৪ অক্টোবর জন্মদিনটি রাজনৈতিকভাবে পালন করছি। দিনটি উৎসর্গ করেছি দেশের ও দেশের মানুষের নিরাপত্তার প্রতি। এ দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত রোহিঙ্গা সমস্যা। মানুষের নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক হচ্ছে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মহাসচিবের অপহরণ। মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান অপহৃত হয়েছেন ২৭ আগস্ট রাত ১০টার পর; আজ ৩৮তম দিন।

রোহিঙ্গা সমস্যার আঙ্গিকগুলো
রোহিঙ্গা সমস্যার যে আঙ্গিকগুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, সেগুলো হলোÑ এক. রোহিঙ্গাদেরকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আশ্রয় দেয়া; দুই. আশ্রয় দেয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণতৎপরতায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা; তিন. মিয়ানমারের অমানবিক হিংস্র কর্মকাণ্ড তথা মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোর প্রতিবাদ করা; চার. নিজস্ব তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে সসম্মানে ফেরত পাঠানো, পাঁচ. বাংলাদেশের কূটনীতির অনানুষ্ঠানিক সমীক্ষা তথা ব্যর্থতার কারণগুলো অনুসন্ধান করা, ছয়. ভারত নামের বহুলঘোষিত বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের ভূ-কৌশলগত অবন্ধুপ্রতিম কূটনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা, সাত. মিয়ানমার কর্তৃক বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে সীমালঙ্ঘনের সমালোচনা করা ইত্যাদি। যে আঙ্গিকগুলোর আলোচনা এখনো গতি পায়নি, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই সমস্যার কী প্রভাব পড়তে পারে? অন্য কথায় বলতে গেলে, রোহিঙ্গা সমস্যার মানবিক দিক বাদ দিয়ে, সমস্যা থেকে উদ্ভূত নিরাপত্তার দিকটি নিয়ে আলোচনা।

জাতীয় নিরাপত্তার কয়েকটি আঙ্গিকের উদাহরণ
‘জাতীয় নিরাপত্তা’ বলতে অনেক কিছুই বোঝায়। জাতীয় নিরাপত্তা মানে কোনো মতেই যুদ্ধ করা বা না করা নয়। কয়েকটি উদাহরণ দিই।

এক. সুন্দরবন থেকে ১০ বা ২০ কিলোমিটার উত্তরে রামপাল নামক স্থানে, ভারতের সাথে যৌথ উদ্যোগে, বাংলাদেশের খরচে, কয়লা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কারণে, সুন্দরবনের কী ক্ষতি হতে পারে এবং সুন্দরবনের ক্ষতি হলে বাংলাদেশের কী ক্ষতি হতে পারে, এটা জাতীয় নিরাপত্তার একটি আঙ্গিক।

দুই. পৃথিবীব্যাপী আলাপ-আলোচনা চলছে জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে, ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণাংশে বেশ কিছু ভূখণ্ড ডুবে যাবে, ডুবে গেলে অনেক জনপদ ও বসতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে- এটাও জাতীয় নিরাপত্তার একটি আঙ্গিক।

তিন. বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে কক্সবাজার জেলার সমুদ্রসীমা থেকে পশ্চিম দিকে অল্প দূরত্বে ছোট্ট একটি দ্বীপ আছে, নাম সোনাদিয়া। সোনাদিয়া দ্বীপকে কেন্দ্র করে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করার আলোচনা অনেক দিন ধরে চলেছে। বৃহৎ একটি অর্থনৈতিক শক্তিসম্পন্ন দেশ বা জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্যের অন্যতম একটি দেশ যার নাম চীন, এই সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর বানানোর কাজে বাংলাদেশকে ব্যাপক সাহায্য করতে প্রস্তাব দিলো। চীনের এই প্রস্তাব গ্রহণ করা বা না করা বাংলাদেশের এখতিয়ার। বাংলাদেশে সরকার নিজের বুদ্ধিতে অথবা বন্ধুদের বুদ্ধিতে, চীনের প্রস্তাব গ্রহণ করল না। এ ধরনের প্রস্তাব গ্রহণ করা বা না করা, জাতীয় নিরাপত্তার একটি আঙ্গিক।

চার. মাত্র দুটি দেশ বাংলাদেশের সীমান্তের সঙ্গে লাগোয়াÑ ভারত ও মিয়ানমার। ভারতের সঙ্গে যাবতীয় তৎপরতা ঘঁষা-মাজা, গলাগলি, ওঠা-বসা, লেনদেন, লুকোচুরি ইত্যাদি চলছে, কিন্তু মিয়ানমারের সঙ্গে বলতে গেলে কিছুই চলেনি। বাংলাদেশে সরকার, তৎপরতা চালালে বা না চালালে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কী হতে পারে বা কী হতে পারে না, এ নিয়ে সচেতন থাকার বিষয়টিও জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম আঙ্গিক।

পাঁচ. বাংলাদেশের সীমান্ত যদি কেউ লঙ্ঘন করে বা এ দেশের ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব যদি কেউ লঙ্ঘন করে, সেই লঙ্ঘনকারীকে কীরকম জবাব দেয়া উচিত ওই আলোচনা বা সচেতনতা, জাতীয় নিরাপত্তার একটি আঙ্গিক।

ছয়. মুসলিম বিশ্বের অঘোষিত নেতা বা নেতৃস্থানীয় দেশ সৌদি আরব। তার নেতৃত্বে অনেকগুলো দেশের একটি সামরিক জোট হয়েছে ছয় মাস বা নয় মাস বা এক বছর আগে। বলা হচ্ছে, এটা সন্ত্রাসবিরোধী জোট। বলা হচ্ছে, এটার সামরিক অধিনায়ক সৌদি আরব থেকে নিযুক্ত হবেন না; বলা হচ্ছে এই কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য জোটের সব সদস্যই বাস্তবে সশরীরে সামরিক অবদান রাখবেন। এই বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে কি হবে না, এই সচেতনতা বা এই আলোচনা জাতীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিক।

সাত. প্রতিবেশী ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিট ফ্যাসিলিটি চাইল এবং বাংলাদেশ সরকার পানির দামে সেটা দিয়ে দিলো। এভাবে ট্রানজিট দেয়ার কাজটি ভালো কি মন্দ, এরূপ ট্রানজিট দেয়ার কাজটি বাংলাদেশের শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বা বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্যের জন্য বা বাংলাদেশের সামরিক প্রস্তুতির জন্য বা আঞ্চলিক সামরিক সঙ্কটে বাংলাদেশের ভূমিকার জন্য উপকারী হবে না অপকারী হবে, এই সচেতনতা বা আলোচনা জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম আঙ্গিক।

আট. পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্রোহী সশস্ত্রগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে, আলোচনা চালানো একটি অভিনন্দনযোগ্য কাজ। তবে আলোচনার পর বা আলোচনার মাধ্যমে বিদ্রোহীগোষ্ঠীকে কতটুকু ছাড় দেয়া হবে বা কতটুকু ছাড় দেয়া হবে না কিংবা কোন কোন বিষয়ে ছাড় দেয়া হবে এই সচেতনতা বা আলোচনা অবশ্যই, অবশ্যই জাতীয় নিরাপত্তার অলঙ্ঘনীয় আঙ্গিক। নয়. আরো অনেক উদাহরণ প্রদানযোগ্য। কলামের কলেবর সীমিত রাখার স্বার্থে আর উদাহরণ না দিয়ে আলোচনার পরবর্তী ধাপে যাচ্ছি।

জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা কয়েকটি দেশে
১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল তথা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। আমেরিকান সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার) তথা জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ (ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল) পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে, তাদের প্রেসিডেন্টের (রিচার্ড নিক্সন) কাছে সুপারিশ করেছিলেন পাকিস্তানের পক্ষে এবং বাংলাদেশের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার জন্য। ২০১৭ সালেও আমেরিকা সরকারের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল যেরূপ সুপারিশ করছে, মার্কিন সরকার ওইরূপ আচরণ করছে। আমেরিকান সরকারের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল অবশ্যই তাদের মাতৃভূমির, তাৎক্ষণিক স্বার্থ, অদূরভবিষ্যতের স্বার্থ এবং দূরবর্তী স্বার্থ বিবেচনা করেই এরূপ সুপারিশ করছে। বাংলাদেশের অন্যতম বড় প্রতিবেশী, একটি আঞ্চলিক শক্তি যার নাম ভারত, একটি উদীয়মান সামরিক শক্তি যার নাম ভারত, তাদের দেশেও একটি নিরাপত্তা পরিষদ ব্যবস্থা কার্যকর রেখেছে। নরেন্দ্র মোদির আমলে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হচ্ছেন অজিত দোভাল। তিনি পেশাগতভাবেই গোয়েন্দা বাহিনীর লোক। অজিত দোভাল পেশাগত দায়িত্ব পালনে জীবনে একনাগাড়ে অনেক বছর ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশী, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ছদ্মবেশে একজন দেশপ্রেমিক পাকিস্তানি নাগরিক হিসেবে অবস্থান করে ভারতের গোয়েন্দা তৎপরতায় অবদান রেখেছেন বা জোগান দিয়েছেন। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের একজন নিরাপত্তা উপদেষ্টা আছেন এবং একটি নিরাপত্তা পরিষদ আছে।

এমনকি, যাবতীয় উপদ্রব সৃষ্টিকারী আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারেও একজন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা আছেন, যার নাম উ থাং টুন। পৃথিবীর বেশির ভাগ অগ্রগামী বা উন্নত দেশে এরূপ ব্যবস্থা আছে। বাংলাদেশে নেই। কেন নেই, সেই আলোচনা করতে গেলে অনেক কথা বলতে হবে; অনেকে অসন্তুষ্ট হবেন। এই মুহূর্তে এই কলামে সে আলোচনায় না যাওয়ার কারণ এই নয় যে, কে অসন্তুষ্ট হবেন বা হবেন না; বরং কারণ হলো আজকের কলামের ফোকাস অন্য।

বাংলাদেশে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা যদি থাকতেন!
তবে কলামের এই অংশ থেকে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার আগে দৈনিক প্রথম আলোর গত ১৭ সেপ্টেম্বর সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠার একটি শিরোনামের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। শিরোনামটি ছিল ‘রোহিঙ্গা-ঢলের আগাম তথ্য ছিল না : প্রস্তুতি নিতে পারেনি সরকার’। যদি বাংলাদেশে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ থাকত, যদি একজন নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাকতেন, তাহলে সম্ভাবনা ছিল যে, সেই নিরাপত্তা পরিষদ অবশ্যই বাংলাদেশ সরকারকে বা সরকারপ্রধানকে একাধিক বিষয়ে সজাগ রাখতেনÑ এক. মিয়ানমারের সঙ্গে শীতল সম্পর্কের বিষয়ে। দুই. মিয়ানমার সরকার কর্তৃক রাখাইন প্রদেশে বিভিন্ন তৎপরতা প্রসঙ্গে। তিন. বাংলাদেশে দুর্যোগ তথা বন্যা হয়েছে; তাই খাদ্য ঘাটতি হতে পারে, অতএব বিশ্বের খাদ্য উদ্ধৃত্ত দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ দ্রুত করার ব্যাপারে। চার. মিয়ানমার সীমান্তে সম্ভাব্য সশস্ত্র গোলযোগের প্রেক্ষাপটে বা গোলযোগের প্রতি উত্তর দেয়ার জন্য বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিজিবি বা বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর প্রস্তুতির ব্যাপারে।

কলামের শিরোনামে ফিরে যাচ্ছি। পাঠকের সামনে যদি এমন কোনো মানচিত্র থাকে যেখানে উত্তর-পূর্ব ভারতের ত্রিপুরা-মিজোরাম-মনিপুর-নাগাল্যান্ড প্রদেশগুলো এবং মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ এবং বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামকে একসঙ্গে দেখা যায়, তাহলে এই কলামের বক্তব্যটি বুঝতে সুবিধা হবে। রাখাইন প্রদেশের আগের নাম আরাকান। এই প্রদেশের ভূমি যেমন সমতল ও পার্বত্য এলাকার মিশ্রণ, তেমনি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও একটু ওপরে উল্লিখিত ভারতীয় প্রদেশগুলোর ভূমিও এইরূপ সমতল ও পার্বত্য এলাকার মিশ্রণ। প্রত্যেকটি এলাকায় তাদের দেশের সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড বিদ্যমান। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, ১৯৪৭ সালে ভারতের সঙ্গে যেতে চেয়েছিল; যেতে পারেনি। মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশ (বর্তমান নাম রাখাইন প্রদেশ) ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে থাকতে চেয়েছিল; থাকতে পারেনি। উত্তর-পূর্ব ভারতের দক্ষিণাংশের প্রদেশগুলো ভারতের সঙ্গেই থাকতে চায়নি, স্বাধীনতা চেয়েছিল; সম্ভব হয়নি। এই পুরো অঞ্চলটি অশান্ত এবং উপদ্রুত। ছোঁয়াচে রোগের মতো, এক এলাকার ঘটনা অন্য এলাকার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এখন থেকে ৮০-৯০ বছর আগে ব্রিটিশ-ভারতের শাসনকর্তারা এবং লন্ডনে অবস্থিত নীতিনির্ধারকেরা এ সম্বন্ধে অবহিত ছিলেন। ইংরেজি ভাষায় লিখিত একটি পুস্তকের নাম লিখছিÑ ‘দি ফিউচার অব ইন্ডিয়া’; ১৯৪৩ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত। লেখকের নাম স্যার রেজিনাল্ড কুপল্যান্ড। ইংরেজি ভাষায় লিখিত আরেকটি পুস্তকের নাম দিচ্ছিÑ ‘দি নর্থ ইস্ট: রুটস অব ইনসার্জেন্সি’; কলকাতা মহানগরী থেকে ‘ফার্মা কেএলএম প্রাইভেট লিমিটেড’ কর্তৃক ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত; লেখকের নাম: প্রফুল্ল চৌধুরী। এই দুটি বইয়ের মধ্যে একটি বিষয়ে আলোচনা আছে।

তা হলো ‘কুপল্যান্ড প্ল্যান’ বা ক্রাউন কলোনি প্ল্যান। ১৯৩০-এর দশকে আসাম প্রদেশের গভর্নর স্যার রবার্ট রিড এবং স্যার রেজিনাল্ড কুপল্যান্ড কর্তৃক যৌথভাবে একটি প্ল্যান দেয়া হয়েছিল- ব্রিটিশ কর্তৃক ভারত ত্যাগের সময়, ভারতকে চারটি মূল অঞ্চলে ভাগ করা হোক। অঞ্চলগুলো নিম্নরূপ: এক. সিন্ধু নদীর উপত্যকা বা দি ইনডাজ ভ্যালি; দুই. গঙ্গা নদীর উপত্যকা বা দি গেঞ্জেস ভ্যালি; তিন. দাক্ষিণাত্য বা দি ডেকান এবং চার উত্তর-পূর্ব ভারত নামে পরিচিত পার্বত্য এলাকা। কুপল্যান্ড এবং রিড উভয়ের যৌথ মত ছিল, যেহেতু এই পার্বত্য এলাকাটি আদতেই ভারতের না এবং বার্মারও না, তাই তাদেরকে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়ে লন্ডনের ব্রিটিশ ক্রাউনের অধীনে রাখা হোক; তার নাম হবে ক্রাউন কলোনি। এই কলোনির দক্ষিণে থাকত তৎকালীন আরাকান ও তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং উত্তরে থাকত বর্তমানের ত্রিপুরা মনিপুর মিজোরাম নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল। উত্তর সীমান্ত হতো তৎকালীন ভারত ও চীনের সীমান্তরেখা। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমের সীমান্ত হতো বঙ্গোপসাগরের নীল পানি। যা হোক, যেকোনো কারণেই হোক রেজিনাল কুপল্যান্ড এবং রবার্ট রিড এর পরিকল্পনা বা প্রস্তাব গুরুত্ব পায়নি; অতএব বাস্তবায়নও সম্ভব হয়নি। গুরুত্ব না পেলেও, এলাকার ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব কোনো মতেই কমেনি বরং দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে।

রাখাইনের গুরুত্ব ও রোহিঙ্গা
মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশটি খুব ছোট নয়। এই প্রদেশের মাঝামাঝি এলাকায় এবং উত্তরাংশে রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠী বসবাস করে। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে রাখাইন প্রদেশ থেকে বের করে দিচ্ছে। গত ২ অক্টোবর মিয়ানমার থেকে আগত একজন মন্ত্রী এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে রাষ্ট্রীয়পর্যায়ে রোহিঙ্গা সঙ্কট প্রসঙ্গে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই কলাম লেখা শেষ করছি সোমবার ২ অক্টোবর রাত ৮টায় এবং পাঠক পড়ছেন ৪ অক্টোবর ২০১৭ তারিখের প্রথম মুহূর্ত থেকে নিয়ে অনলাইনে এবং সূর্যোদয়ের পর থেকে মুদ্রিত কপিতে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের পারস্পরিক আলাপের সারমর্ম হলো, মিয়ানমার সম্মত হয়েছে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে; উভয় সরকার একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করবে। বিস্তারিত দ্রুতই জানা যাবে। পাঁচ লাখের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে ছয় সপ্তাহের কম সময়ে এবং এখনো আসছে। যত দিন রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের গণহত্যা চলবে; তত দিন রোহিঙ্গারা আসবে। তাদেরকে ফেরত নেয়ার বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের মন্ত্রী কর্তৃক প্রদত্ত ওয়াদা আংশিক সন্দেহ এবং আংশিক স্বচ্ছতা নিয়ে গ্রহণ করছি। সন্দেহ এই যে, মিয়ানমার সরকার বিশ্ববাসীকে এবং বাংলাদেশ সরকারকে আপাতত ঠাণ্ডা করার জন্য এই পদক্ষেপ নিয়েছে। এরূপ একটি ওয়াদা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সরকারের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ব্যর্থতাকে পাতলা প্রলেপ দেবে এবং সাফল্যের আভা ছড়াবে। এর পাশাপাশি আশা করব, নির্দিষ্ট কিছু ইতিবাচক শর্তসাপেক্ষে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মিয়ানমারে ফেরত যাবে; মিয়ানমার তাদের ফেরত নেবে। বাংলাদেশের মাটিতে অনেক বছরের মেয়াদে বা দীর্ঘ মেয়াদে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে রাখার প্রসঙ্গটি জাতীয় নিরাপত্তার আঙ্গিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হবে। মানবিক সহায়তা এবং বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে সমন্বয় করতেই হবে।

আত্মসন্তুষ্টি লাভের কিছু নেই
কোনো মতেই কোনো অবস্থাতেই, আত্মসন্তুষ্টি লাভের কিছুই নেই। গত চার-পাঁচ সপ্তাহের বিভিন্ন পত্রিকার সংবাদ এবং কলাম যদি কেউ পড়ে থাকেন তাহলে তিনি নিশ্চয়ই রাখাইন অঞ্চলে চীন ও ভারতের, আলাদা আলাদা, আর্থিক ও কৌশলগত বিনিয়োগ সম্বন্ধে অবগত হয়েছেন। চীন ও ভারত কোনো অবস্থাতেই এমন একটি রাখাইন প্রদেশ চাইবে না, যেটা তাদের বিনিয়োগের প্রতি ও তাদের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ। হুমকিবিহীন ‘শান্তশিষ্ট’ রাখাইন মানেই হলো, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীবিহীন রাখাইন প্রদেশ। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীবিহীন করতে হলে তিনটি পদক্ষেপ নিতে হবেÑ এক. রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মেরে ফেলতে হবে; দুই. তাদের বিতাড়িত করে অন্য দেশে পাঠিয়ে দিতে হবে এবং তিন. তাদের মনের মধ্যে এমন ভয় ঢুকাতে হবে, তারা যেন ফেরত আসতে না চায় এবং চাইলেও ফেরত এসে যেন দেহ ও মনে বৌদ্ধমনা হয়ে যায়। একই সঙ্গে, মিয়ানমার রাষ্ট্র রাখাইন প্রদেশে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইনদের এবং অন্য মানুষগুলোকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেবে, তাদের গ্রামগুলোকে দুর্গের মতো করে সাজাবে, তাদের রাস্তাঘাটগুলোকে সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহারের উপযোগী করবে এবং চীন, ভারত ও মিয়ানমারের যৌথ হোক বা স্বতন্ত্র হোক, ভূ-কৌশলগত ও রণকৌশলগত ব্যবহারের জন্য উপযোগী করে তুলবে। যত পরিবর্তনই হোক না কেন, পাহাড়ের জায়গায় পাহাড় থাকবে এবং জঙ্গলের জায়গায় জঙ্গল থাকবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গ
ছলে-বলে-কৌশলে, সময় নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিদেরকে বহিষ্কার করা হবে বলে আশঙ্কা
বিস্তৃতভাবে বদ্ধমূল হয়েছে। বিশেষত ওই বাঙালি যারা ১৯৭৮ সাল থেকে নিয়ে ১৯৮২ পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছে। তবে এই প্রসঙ্গে ভালো-মন্দ আলোচনা আজকে করব না। একটু আগেই সুপরিচিত শব্দগুলো লিখেছি- ছল-বল-কৌশল। এইরূপ ছল-বল ও কৌশল অবলম্বন ও প্রয়োগ করছে বাংলাদেশ সরকার, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং বাংলাদেশের কিছু এনজিও, বুদ্ধিজীবী এবং বাংলাদেশের মিডিয়ার একটি অংশ। এইরূপ ছল-বল ও কৌশল প্রয়োগের অনেক উদাহরণের মধ্যে একটি উদাহরণ হলো ভূমিবিরোধ নিষ্পন্ন কমিশন। আলোচনাটি আগামী সপ্তাহে থাকবে।

আগামী সপ্তাহের কলামে
বাংলাদেশে জাতীয় নিরাপত্তায় রোহিঙ্গা সমস্যার প্রভাব এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের নিয়ে আলোচনা আজকের কলামে, অসম্পূর্ণ থাকতে বাধ্য। অতএব পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা না থাকলে কী হতে পারে বা না পারে সেটা আগামী সপ্তাহে ইনশাআল্লাহ আলোচনা করব। পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী যথা: চাকমা, মারমা, তংচৈঙ্গা, ত্রিপুরা, চাক, বোম, পাংখু, ম্রো, মুরং ইত্যাদি জনগোষ্ঠীও অবশ্যই বাংলাদেশের সংবিধানের পূর্ণ ইতিবাচক আলোকে বসবাস করতে পারে- সেটাও ধর্তব্যের মধ্যে রাখতেই হবে। সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা সঙ্কটটিকে যদি আমরা ২৫ আগস্ট ২০১৭ থেকে শুরু হয়েছে ধরে নিই, তাহলে এই সঙ্কটের প্রথম দু-তিন সপ্তাহে মিয়ানমার কর্তৃক অনেক উসকানিমূলক সামরিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের আবেগ এবং এর বহিঃপ্রকাশ একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। বাংলাদেশের সচেতন মহলকে অবশ্যই সেই আবেগ এবং আবেগের বহিঃপ্রকাশকে ধর্তব্যের মধ্যে নিতে হবে। অতএব এই প্রসঙ্গেও আলোচনা ইনশাআল্লাহ আগামী সপ্তাহে করব।হ

লেখক : মেজর জেনারেল (অব.); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি 
ই-মেইল : mgsmibrahim@gmail.com

সূত্র: নয়াদিগন্ত




জনগনের আপদে বিপদে সেনাবাহিনী কতটুকু পাশে আছে?


পারভেজ হায়দার

ছোটবেলা থেকেই আর্মির প্রতি ছিল দূর্নিবার আকর্ষণ। আর্মির পোষাক, ঢা-ঢা গুলির আওয়াজ আমাকে আকর্ষণ করতো । সেই সময়ে টুকটাক ইতিহাসের বিভিন্ন বই যখন পড়তাম, বিশ্বের নামকরা নেতাদের সাথে কোন না কোনভাবে আর্মি যোগসূত্র খুঁজে পেতাম । মনে হতো, একজন নেতা হতে হলে আমাকে আর্মি হতে হবে । কিন্তু আমার এই স্বপ্ন দু—দু’বার হোঁচট খেয়েছে । শুনেছিলাম ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হলে নাকি সহজে আর্মি হওয়া যায় । ক্যাডেট কলেজের ক্লাশ সেভেন থেকে ইউনিফর্ম পরা সুশৃঙ্খল জীবনের শুরু হয়, যা পরবর্তীতে একজন সফল আর্মি হতে অনেক কাজে লাগে ।

কিন্তু ক্লাশ সেভেনে ক্যাডেট কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় কেন যেন উতরে যেতে পারলাম না । স্বপ্ন যাত্রার এই ক্ষণে হোঁচট খেয়ে অনেকটা দুঃখ নিয়েই লেখাপড়া চালিয়ে গেলাম, আর এক সময়ে কলেজের গণ্ডি পার হলাম । রেজাল্টও নেহায়েত খারাপ করলাম না । আমার সহপাঠী বন্ধুরা যখন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার আশায় মেডিকেল কলেজ আর বুয়েটে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আমার ছোটবেলার সেই স্বপ্ন পূরণে দ্বিতীয়বারের মত চেষ্টা করলাম । আমি মেডিকেল কলেজ বা বুয়েটে ভর্তির চেষ্টা বাদ দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসার হওয়ার জন্য প্রস্তুতি শুরু করলাম, কিন্তু এবারও আমাকে হোঁচট খেতে হলো । ওরা যে কি চায়, তা আমি আজও বুঝিনা । আমার মনে হয়েছিল আমার পরীক্ষা যথেষ্ট ভালো হয়েছে, আমার শারিরীক গঠনও ভালো, আর আমি ভালো দৌঁড়াতেও পারি, তারপরও কেন যেন ওদের পাশ নম্বরের মাপকাঠিতে আমি পৌঁছাতে পারলাম না ।

ছেলেবেলা থেকেই আর্মি হওয়ার স্বপ্ন এভাবে ভেঙ্গে যাওয়ার পর, ওদের উপর আমার একপ্রকার ঘৃণা কাজ করতো । এরপর একটু দেরিতে হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পছন্দের সাবজেক্টে ভর্তি হয়ে জীবনটাকে নতুন করে গুছিয়ে নিতে শুরু করলাম । বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে আমাদের শিক্ষক, ছাত্রনেতা এমনকি সাধারণ ছাত্রদের মাঝে সেনাবাহিনীর প্রতি এক প্রকার অপছন্দ, বিরক্তি আবার কোন কোন ক্ষেত্রে ঘৃণা আমার চোখে পড়েছে । আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম তখন একটা শ্লোগান প্রায় ছাত্রনেতাদের মুখে শুনেছি, “সামরিক খাতে ব্যয় কমাও, শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াও”।

আর্মি হবার স্বপ্ন ধুলিস্মাত হবার পর ওদের (আর্মিদের) প্রতি আমার পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, তৎকালীন আমার শিক্ষক, ছাত্রনেতা আর বন্ধুদের মনোভাব আর মন্তব্যের সাথে মনের অজান্তেই একমত পোষণ করতে অনুপ্রাণিত হতাম । ওদের মতো আমিও ভাবতাম সেনাবাহিনীর লোকজন খুব আরাম-আয়েশে দিন কাটায়, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কোন ভূমিকা রাখে না, এদেশে কখনো যুদ্ধ হবে নাকি ! এত বড় সেনাবাহিনী পুষে লাভ কি, বাজেটের বড় অংশই সেনাবাহিনীর পিছনে খরচ হয়, একটা গরিব দেশের জন্য এই সেনাবাহিনী কি আদৌ দরকার আছে ! সেনাবাহিনীর লোকজন সবাই ফ্রি খায়, দেশের গরীব লোকজন খেতে পায় না ! ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট শহরের অর্ধেক জায়গা দখল করে আছে, ক্যান্টনমেন্টগুলোতে ঢুকতে হলে প্রশ্নবানে জর্জরিত হতে হয়, ঢাকা শহরে যানজট ক্যান্টনমেন্টের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে এমনি আরও অনেক মন্তব্য ও বক্তব্যের সাথে আমি সহমত প্রকাশ করতাম ।

ছাত্র জীবনের সে সময়গুলোতে আমার পড়াশুনার বিষয়ভিত্তিক বই ছাড়া, গবেষণামূলক কোন বিষয়ে সময় নিয়ে পড়াশুনা করার সময় পেতাম না, তাই সেনাবাহিনীর প্রতি আমাদের শিক্ষকদের মনোভাব, ছাত্রনেতাদের বক্তব্য, টেলিভিশন আর পত্র পত্রিকায় সুশীল সমাজের কর্তা ব্যক্তিদের লেখনী এবং সর্বোপরী সেনাবাহিনীর প্রতি আমার দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ সব মিলিয়ে সেনাবাহিনীকে আমার কাছে এক প্রকার প্রতিপক্ষ হিসেবে মতো হতো ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যখন কর্মজীবনে এলাম, তখন আমার কর্মস্থলের কর্তা ব্যক্তিদের দেশ স্বার্থ বিরোধী সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড, আমাকে সার্বিক বিষয় নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখার জন্য প্ররোচিত করলো । সবচেয়ে আমাকে হতাশ করেছিল স্বার্থান্বেষী সুশিল সমাজের কর্তা ব্যক্তিদের ভূমিকা । এছাড়া দেশের স্বার্থ পরিপন্থি বিষয়গুলোতে প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার আশানুরূপ গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা দেখে আমি ব্যথিত হতে শুরু করলাম । কোন কোন ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থে সরকার সুচিন্তিত কোন সিদ্ধান্ত নিলে তথাকথিত সুশীল সমাজের বিপক্ষে অবস্থানগ্রহণ আমাকে আশ্চার্যাণ্বিত করে তুলতো ।

সরকার ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেশের স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীদের তাদের ২০০৭ সাল থেকে নতুন দাবী অনুযায়ী “আদিবাসী” না বলে‚ “ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠী” বলে ডাকার জন্য সার্কুলার জারী করেছে । যদি ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে আসলেই তারা হতো তাহলে কোন আপত্তি ছিল না । কিন্তু প্রকৃত পক্ষে তারা “আদিবাসী” নন, বিষয়টি ধ্রুব সত্য । তারা ২০০৭ সাল থেকে হঠাৎ করেই “আদিবাসী” হতে চাইছেন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে । বাংলাদেশের সুশীল সমাজ বিষয়টি অনুধাবন করতে পারেন না তা নয়, তারা তাদের ব্যক্তিগত মুনাফা বিবেচনায় দেশের স্বার্থ বিরোধী জেনেও উপজাতিদের “আদিবাসী” বলে ডাকেন ।

এক্ষেত্রে তারা দেশের প্রচলিত আইনের বিধি নিষেধ এর কোন তোয়াক্কা করেন না । এমনিভাবে অনেক বিষয়ে ক্রমান্বয়ে তাদের বক্তব্যের সাথে যখন বাস্তবের অমিল খুঁজে পেলাম তখন আমাকে একটু নড়েচড়ে বসতেই হলো । এরই মধ্যে অবসর সময়ে বিভিন্ন প্রকার বই, প্রবন্ধ, দেশ বিদেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের লিখিত ইতিহাস ইত্যাদি অধ্যয়নের পর আস্তে আস্তে আমার উপলব্ধির পরিবর্তন হচ্ছে বলে মনে হলো ।

এখন কোন বিষয় সামনে আসলে, বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচারিত তথ্যের সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশুনা করে সত্য জানার জন্য অভ্যাস গড়ে তুললাম । ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক শিক্ষা আমাকে সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকতে সব সময়ে উৎসাহিত করতো । ছাত্র জীবন আর দীর্ঘ কর্ম জীবনের এই পর্যায়ে আমার ছোট্ট উপলব্ধি হচ্ছে, কোন প্রতিষ্ঠানের শক্ত মেরুদণ্ডের ভিত্তি হচ্ছে “সততা” । আমার মনে হয়েছে, কাজের ক্ষেত্রে সংস্থার কেউ কেউ ভুল ভ্রান্তি করতেই পারে, তবে ঐকান্তিক ইচ্ছা আর সততার সাথে যদি দেশপ্রেম থাকে তাহলে সেই সংস্থার সাফল্য মোটামুটি সু-নিশ্চিত ।

লেখার মত অনেক বিষয়ই আছে, তবে আজ আমি আমার ছোটবেলার পছন্দের সেনাবাহিনী যাদের পরবর্তীতে আমি ঘৃণা করতে শুরু করেছিলাম তাদের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে কলম ধরতে ইচ্ছে হলো । সেনাবহিনী নিয়ে আমার বর্তমান এই ভাবান্তর গত ১১ জুন ২০১৭ তারিখে রাঙামাটিতে পাহাড় ধসের পর দুইজন সেনা অফিসার আর দুইজন সৈনিক পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে শাহাদাতবরণের খবরটি শুনবার পর থেকে।


চিত্র-১: রাঙামাটিতে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছে সেনাসদস্যরা ।

সেনাবাহিনীতে আমি কাজ করার সুযোগ না পেলেও আমার অনেক বন্ধু-বান্ধব সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদবীতে কাজ করছে । তাদের বিভিন্ন ফেসবুক স্ট্যাটাস এর মাধ্যমে পাহাড় ধসে মর্মান্তিকভাবে নিহত হন ৪ জন (শহীদ মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল হক, শহীদ ক্যাপ্টেন মো. তানভীর সালাম, শহীদ কর্পোরাল মো. আজিজুল হক এবং শহীদ সৈনিক মো. শাহিন আলম) এবং আহত ১০ জন সেনাসদস্য সম্পর্কে জানতে পারলাম । এদের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন এবং দেশ নিয়ে চিন্তা ভাবনা সবকিছু আমাকে সেনাবাহিনীর প্রতি মনের ভিতর পুষে রাখা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যেন ক্রমান্বয়ে আমার পুষে রাখা পুরোনো উপলব্ধি পরিবর্তনে পুনরায় ভাবার জন্য তাগাদা দিচ্ছিল । শহীদ মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল হক এবং তার অধিনস্ত সৈনিকগণ সেদিন কারও অনুরোধের জন্য অপেক্ষা করেননি, তারা পাহাড় ধসে বিপদগ্রস্ত মানুষদের উদ্ধারে নিঃস্বার্থভাবে ঝাপিয়ে পড়েছিল । পাহাড় ধসে উদ্ধারের বিষয়ে হয়তো তাদের কোন প্রশিক্ষণ ছিল না, কিন্তু দেশের মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোকে নিজেদের কর্তব্য মনে করেই ওরা সেদিন এগিয়ে গিয়েছিল ।


চিত্র-২: কমান্ডো সেনাসদস্যদের হলি আর্টিজানে অভিযান পরিচালনার দৃশ্য ।

গত ১ জুলাই ২০১৭ তারিখে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচাইতে নৃশংস জঙ্গি আক্রমণের একবছর পূর্তি হলো । যতদূর মনে পড়ে সেদিন হলি আর্টিজান বেকারির ভিতরে জঙ্গি নৃশংসতার বলি হয় দেশী-বিদেশী মোট ২০ জন নাগরিক । এদের মধ্যে ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপনী, ১ জন ভারতীয়, ১ জন বাংলাদেশী/আমেরিকান এবং ২ জন বাংলাদেশী নাগরিক ছিল । প্রাথমিকভাবে এই ধরনের জঙ্গি হামলা মোকাবেলায় পুলিশের আভিযানিক প্রস্তুতি ও যথেষ্ট সক্ষমতা না থাকায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমান্ডো দলকে ঐ অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় ।

সেনাবাহিনী তাদের কমান্ডো অভিযানে দেশী-বিদেশী মোট ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয় । হলি আর্টিজান বেকারির জঙ্গি হামলার এক বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বিভিন্ন মিডিয়া ও প্রকাশনায় পুলিশের সাফল্যকে ফলাও করে প্রচার করা হলেও মূলত গত বছরের ঐ দিনে সেনাবাহিনীর কমান্ডো দলের প্রয়োজন ছিল বিধায় তাদেরকে অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল । তবে একটি বিষয় অনস্বীকার্য যে পুলিশের দুইজন সদস্য তাদের অভিযানের শুরুতেই জঙ্গিদের নিক্ষেপকৃত গ্রেনেডের আঘাতে নিহত হয়েছিল । তাই পুলিশ বা সেনাবাহিনীর সাফল্যের মাপকাঠিতে কার ভূমিকা কত বেশি সেই বিতর্কে না গিয়ে, যার যার অবস্থান থেকে তাদের ভূমিকার জন্য যথাযথ স্বীকৃতি অবশ্যই দিতে হবে ।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চৌকশ কমান্ডো দল নিজেদের কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই অতি অল্প সময়ে জঙ্গিদের নির্মূল করতে যে পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে, সারা বিশ্বের কাছে তা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে । আমরা যারা নিয়মিত একটু খোঁজ খবর রাখি তারা নিশ্চয়ই সহজে অনুধাবন করতে পারবো যে, উন্নত বিশ্বে অর্থাৎ ইউরোপ বা আমেরিকায় এ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া জঙ্গি হামলা মোকাবেলার সাফল্যের তুলনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমান্ডো দলের মত এমন ঈর্ষণীয় সাফল্য খুব কম ক্ষেত্রেই হয়েছে ।

                                                        চিত্র-৩: সিলেটের শিববাড়ী এলাকায় আতিয়া মহলে জঙ্গি নির্মূল অভিযান পরিচালনার দৃশ্য ।

গত মার্চ ২০১৭’তে সিলেটের শিববাড়ী এলাকার আতিয়া মহলে জঙ্গি হামলা দমনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমান্ডো দল “অপারেশন টোয়াইলাইট” এ সাফল্য জনকভাবে অংশগ্রহণ করে নিজস্ব কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই জঙ্গিদের সমূলে নির্মূলসহ আতিয়া মহলে অবস্থানরত ৭৮ জন নিরীহ পুরুষ, মহিলা এবং শিশুদের সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয় । আতিয়া মহলের মত বিশাল আকারের ভবনের মধ্যে থেকে জঙ্গিদের নির্মূল শেষে বিপুল সংখ্যক বেসামরিক ব্যক্তিবর্গকে উদ্ধারের বিষয়টি নিঃসন্দেহে তাদের উন্নত পেশাদারিত্বের পরিচয় বহন করে ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টি একটি নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। খাগড়াছড়ি জেলার দূর্গম সাজেক এলাকায়, বান্দরবানের দূর্গম থানচি এলাকায় ক্ষুধার্ত, খাদ্যাভাব পীড়িত সাধারণ উপজাতিদের কাছে হেলিকপ্টারে করে অথবা নিজেরা পায়ে হেটে দূর্গম পাহাড় ডিঙ্গিয়ে খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার ঘটনা তো প্রায় প্রতি বছরই ঘটছে । গত বছর কোন একটি পত্রিকায় পড়েছিলাম সাজেকের দূর্গম এলাকায় মহামারি আকারে ডায়রিয়া আর অন্যান্য পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে । ঐ সময়ে ৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অতি দ্রুত সেখানে ছুটে গিয়ে দূর্গম পাহাড়ের মধ্যে অস্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণ করে সেখানে ৩৫০-৪০০ মহামারী আক্রান্ত রোগীদের পরম যত্নের সাথে চিকিৎসা সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলে । যত দূর মনে পড়ে দূর্গম ঐ এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা নিজেদের আহার বিশ্রামের বিষয়ে গুরুত্ব না দিয়ে, ১০ দিন যাবৎ বিভিন্ন প্রকার চিকিৎসা সেবা এবং জনস্বার্থমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল ।


চিত্র-৫: সেনাবাহিনীর অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্রে অসুস্থদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে।

গত মাসে রাঙামাটিতে পাহাড় ধসে সেনাবাহিনীর কয়েকজে সদস্য শহীদ হবার পর থেকে আমার যখন বোধদ্বয় শুরু হলো, আস্তে আস্তে সেনাবাহিনীর কার্যক্রমের বিষয়ে জানার চেষ্টা করলাম । মুক্তযুদ্ধকালীন সময় থেকে এ পর্যন্ত প্রতিনিয়ত সবসময়ে বাংলাদেশের মানুষ যখন কোন আপদে/বিপদে পড়েছে সেনাবাহিনীর সদস্যদেরকে কোন না কোনভাবে নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে যেতে দেখা গেছে, এমন ঘটনা অসংখ্যবার ঘটেছে। যেসকল ঘটনা আর ইতিহাস এই সীমিত পরিসরে বলে শেষ করা যাবে না।

তবে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, বিগত ২৪ এপ্রিল ২০১৩ সালের বহুল আলোচিত ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর যে মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল সেই পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রায় ২৫০০ আহত নারী-পুরুষকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল । পরবর্তীতে রানা প্লাজার ধসে যাওয়া ভবনের ধ্বংসস্তুপ অপসারণের কাজটি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরাই করেছিল । বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ যেকোনো প্রকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বড় ধরণের দূর্যোগে সেনাবাহিনীকে সবার আগে ডাক পড়ে। অথবা অগতির গতি হিসাবেও সেনাবাহিনীর ডাক পড়ে।

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবনে সেনাবাহিনী সম্পর্কে যে সকল নেতিবাচক বক্তব্য শুনেছি তার মধ্যে বহুল আলোচিত একটি হলো সেনাবাহিনী বাংলাদেশের বাজেটের বড় একটি অংশ খেয়ে ফেলছে । কিছুদিন আগে পর্যন্ত আমি নিজে সেই বিশ্বাস ধারন করে ছিলাম । কিন্তু পরবর্তীতে সেনাবাহিনী সম্পর্কে কিছুটা খোঁজখবর করতে গিয়ে জানতে পারলাম সেনাবাহিনীর জন্য বাজেট, দেশের বাজেটের সব খাতগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে তো নয়ই বরং অনেক পিছনে অবস্থান করছে । আর বরাদ্দকৃত এই বাজেটের বড় অংশই চলে যায় সেনাবাহিনী সদস্যদের বেতন ও ভাতা সংকুলানে।

তবে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন জাগতে পারে সেনানিবাসগুলো এত পরিপাটি আর সুন্দর থাকে কি করে? অনেকের মধ্যেই এমন মনে হতে পারে ক্যান্টনমেন্টগুলো সেনাবাহিনীর বিপুল অংকের বরাদ্দ ব্যবহার করে সৌন্দর্য রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় । আসলে বিষয়টি তা’ নয়, সেনাবাহিনীর মধ্যে চমৎকার শৃঙ্খলা এবং সততা এখনো টিকে আছে বিধায় স্বল্প বরাদ্দকৃত অর্থের মাধ্যমেই সেনাবাহিনী নিজেদের সুন্দরভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারে । উন্নত বিশ্বের সেনাবাহিনীর মত অত্যাধুনিক সরঞ্জামাদি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে না থাকলেও, সীমিত সম্পদের সঠিক ব্যবহারের কারণে সেনাবাহিনীর মধ্যে ক্রমান্বয়ে আধুনিকরণ সম্ভব হচ্ছে । বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা আর ইন্টারনেট সূত্রের মাধ্যমে জেনেছি, সেনাবাহিনীর প্রতিটি বিভাগেই আধুনিকায়নের জন্য জোর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে ।

নতুন প্রজন্মের বড় অংশের বিশ্বাস চিন্তাধারা আর তাদের পথ প্রদর্শনকারী শিক্ষক সমাজের মনস্তাত্ত্বিক ভাবনা সব কিছুতেই সেনাবাহিনী সম্পর্কে একটা নেতিবাচক মনোভাব আর প্রচারণা দৃশ্যমান । বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা আমাদের সমাজ থেকেই যোগদান করে । সেক্ষেত্রে সেনাবাহিনীও আমাদের সমাজেরই অংশ। দেশের মানুষের আপদে বিপদে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা যেভাবে নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে যায়, তাতে মনে হয় ওরা তাদের সামাজিক এই দায়বদ্ধতা ভালোভাবেই পালন করছে ।

কালের পরিক্রমায় অনেক কাজের ভিড়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভুলভ্রান্তি হওয়া অস্বাভাবিক নয়, হয়তো তাদের কিছু কিছু কার্যক্রম সাধারণ মানুষকে কষ্ট দিয়েছে, হয়তো তাদের কিছু বিপথগামী সদস্য কিছু ভুলভ্রান্তি করেছে, তবে সার্বিক বিষয় বিশ্লেষণ করে নেতিবাচক ঐ বিষয়গুলোকে আমি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই দেখতে চাই ।

সেনাবাহিনীর মত বড় এই সংগঠন, যারা শৃঙ্খলা আর সততার সাথে কাজ করছে, জাতিসংঘ মিশনসহ বিভিন্ন বৈদেশিক দায়িত্ব পালনে উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে উঁচু মানের পেশাদারিত্বের পরিচয় দিচ্ছে, সেই সেনাবাহিনীর প্রতি অসন্তুষ্টি নয় বরং মনস্তাত্ত্বিকভাবে তাদের উৎসাহ দিয়ে সাধারণ মানুষের বিপদে এবং দেশ মাতৃকার বিভিন্ন উন্নয়নে তাদের অধিক সম্পৃক্ত করতে পারাই দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গল ।

স্বপ্নের এই সেনাবাহিনীতে আমি যোগদান করার সুযোগ না পেলেও আমার সমাজের ভাইয়েরাই তো ওখানে আছেন । ওনাদের ভালো কাজে অর্জিত গর্বে আমরাও অংশীদার হতে পারি । বর্হিঃবিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ক্রিকেট, এ দেশের গার্মেন্টস ছাড়া আর যে বিষয়টি এ দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে তা হচ্ছে, জাতিসংঘে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ সংখ্যক অংশগ্রহণ । এই দেশ আমাদের সকলের । গর্বের যতসামান্য বিষয়গুলো নিয়ে অহেতুক বির্তকে না জড়িয়ে, ইতিবাচক গ্রহণযোগ্যতার মনোভাব নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের আপন করে নিয়ে একসাথে কাজ করাই শ্রেয় ।


উৎসর্গঃ এই প্রবন্ধটি গত ১১ জুন ২০১৭ তারিখে রাংগামাটির পাহাড় ধসে দুর্গতদের উদ্ধারে এগিয়ে যাওয়া শহীদ মেজর মোহাম্মদ মাহফুজুল হক, শহীদ ক্যাপ্টেন মোঃ তানভীর সালাম, শহীদ কর্পোরাল মোঃ আজিজুল হক এবং শহীদ সৈনিক মোঃ শাহিন আলম এর আত্মত্যাগের স্মৃতি স্বরূপ ।




বাংলাদেশের উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রথাগত আইনে নারীর অধিকার বিশ্লেষণ

পারভেজ হায়দার

বাংলাদেশের সমতল এবং তিন পার্বত্য জেলায় ৫৪টি উপজাতি জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী বাংলাদেশে বসবাসরত ১৫,৮৭,০০০ জন উপজাতি জনগণের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১.০৮%। উপজাতি এই জনগোষ্ঠীর অর্ধেক হলেন নারী। উপজাতি জনগোষ্ঠীসমূহের অধিকাংশই তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসরত। সমতলের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নারীরা পিতা বা স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার, বিবাহ সংক্রান্ত প্রমাণপত্র এবং অন্যান্য সামাজিক অধিকার যথাযথভাবে পেলেও উপজাতি নারীরা তাদের এ জাতীয় অধিকার হতে বঞ্চিত রয়েছে। এ সকল জনগোষ্ঠীর বসবাস বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডে হলেও তারা নারীদের অধিকারের বিষয়ে বাংলাদেশের সংবিধান, আইনের শাসন ইত্যাদি অনুসরণ না করে নিজেদের প্রথাগত রীতিনীতি এবং পদ্ধতিগত ঐতিহ্য অনুসরণ করেন।

গারো সম্প্রদায় ব্যতীত অন্যান্য উপজাতি সম্প্রদায় পিতৃতান্ত্রিক বিধায় তাদের রীতিনীতি অনুযায়ী পিতার সম্পত্তির উপর নারীদের অধিকার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুরক্ষিত নয়। অধিকাংশ উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রথা অনুযায়ী নারীদের পিতা-মাতা ও স্বামীর সম্পদের মালিকানায় উত্তরাধিকারের কোন পদ্ধতি নেই বিধায় উপজাতি নারীরা সম্পত্তির অধিকার হতে বঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমানে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের সংশোধনী পাশ হওয়ায় উপজাতি নারীরা আদৌ তার সুফল ভোগ করতে পারবে কিনা সে বিষযে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। পার্বত্য জেলাসমূহে উপজাতি নারীরা কায়িক পরিশ্রম ছাড়াও গৃহস্থলী কাজের পাশাপাশি জঙ্গল/বনে কাঠ আহরণ, খাদ্য অন্বেষণ ও জুম চাষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ভূমি কমিশন আইন পাশ হওয়ার পর পার্বত্য জেলাসমূহে উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দিয়ে সরকার ভূমি কমিশন আইন বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিষয়টি উপজাতিদের ভূমি অধিকার আদায়ের পথকে আরও সু-প্রসারিত করলেও, উপজাতিদের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী ভূমির অধিকারের বিষয়ে নারীদের একেবারেই প্রাধান্য না থাকায় তারা ভূমি অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।

প্রায় সকল উপজাতি সম্প্রদায়ের বিবাহ বন্ধনের ক্ষেত্রে নারীদের মতামতকে প্রাধান্য না দিয়ে শুধুমাত্র অভিভাবকদের মতামতের ভিত্তিতে পাত্রস্থ করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে পরিবারের অভিভাবকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্য সম্প্রদায়ের যুবকের সাথে কোন মেয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে তাকে পরিবার ও সমাজচ্যুত করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে প্রেম বা অবৈধ সম্পর্কের বিষয়টি ধরা পড়লে সমাজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি শুকর/বন্য অথবা এর মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ জরিমানা করে, ছেলে এবং মেয়েকে জুতার মালা পরিয়ে জনসম্মুখে ঘোরানো হয় যা বর্তমানে প্রেক্ষাপটে সচেতন সমাজে কোন ক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়।

কোনো কোনো সমাজে ধর্ষণের অপরাধে প্রথাগত আইনে পুরুষকে একটি শুকর জরিমানা করা হয়। পরে সেই শুকর জবাই করে সমাজপতিরা উৎসব করে খায় এবং শুকরের রক্ত ছড়িয়ে দিয়ে পাড়া পবিত্র করা হয়। এতে যেসব যুবকের অধিক সম্পদ আছে তারা এই অপরাধের জন্য শুকর দিয়ে পার পেয়ে গেলেও মেয়েটি কিছুই পায় না।

বিবাহের নিবন্ধন না থাকায় বর্তমান শিক্ষিত উপজাতি যুব সমাজের মধ্যে একাধিক বিবাহ করার প্রবণতার পাশাপাশি পূর্বের স্ত্রীকে অস্বীকার ও ভরণ পোষণ সঠিকভাবে প্রদান না করার ঘটনা ঘটছে। উপজাতি নারীরা চরমভাবে অবমূল্যায়িত হলেও বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের আশ্রয় নিতে তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাহস পান না। সমাজ তাদের একেবারেই সহযোগিতা তো করেই না বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তাই বাধ্য হয়ে তাদেরকে সাম্প্রদায়িক প্রথা এবং সামাজিক রীতিনীতি অনুযায়ী স্থানীয় হেডম্যান ও কারবারীর করা বিচারের রায় অমানবিক হলেও মাথা পেতে মেনে নিতে হয়।

আবার কোন কোন ক্ষেত্রে আঞ্চলিক উপজাতি সংগঠন এর চাপে উপজাতি মেয়েরা সঠিক বিচার পাওয়া তো দূরের কথা বরং তাকে অপমানজনক নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়, এমনকি বিষয়টি যাতে চাপা থাকে সেজন্য মেয়ে এবং মেয়ের পরিবারের সদস্যদের নানাভাবে হুমকি প্রদর্শনও করা হয়। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, বাংলাদেশের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমতা, ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণী নির্বিশেষে সকলের সম অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র ও নারীর প্রতি সকল ধরণের বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডো) স্বাক্ষর করেছে।

ইতিমধ্যে সরকার নারী-পুরুষের সম অধিকার, নারীর সুরক্ষা ও নারীর উন্নয়নে বেশ কিছু নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নারীর সুরক্ষায় প্রচলিত আইনের পাশাপাশি যৌতুক নিরোধ আইন-১৯৮০ মত বিশেষ আইন প্রণীত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে অন্যান্য এলাকার স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নারী সদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও উপজাতি জনগোষ্ঠীর সমাজ ব্যবস্থা এবং তাদের রীতিনীতি অনুযায়ী পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়াজাল ডিঙিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীরা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। তাই পার্বত্য অঞ্চলের নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার পাশাপাশি ভূমির অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত রয়েছেন।

২০১১ সালের ডিসেম্বর হতে ২০১৫ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত রাংগামাটি পার্বত্য জেলায় অবস্থিত ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, মোট ২২০ জন নারী ও শিশু ভিকটিম সেবা গ্রহণ করেছেন। এদের মধ্যে ৪৪ জনের যৌন নিপীড়নজনিত অভিযোগের পাশাপাশি পারিবারিক সহিংসতার শিকার। সেবা গ্রহণকারীর সংখ্যা ৭১ জন, যারা উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রথাগত রীতিনীতির শিকার।

পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে কোন প্রাতিষ্ঠানিক জরিপ না হলেও নির্যাতনের মাত্রা মোটেও কম নয়, কোন কোন উপজাতি পরিবারের পুরুষগণের মদ খেয়ে তাদের স্ত্রীদের উপর নির্যাতন যেন নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার, তা যেন তাদের সমাজ ব্যবস্থার একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের সংশোধনীতে নারীদের বিষয়টি আলাদাভাবে উল্লেখ না থাকায়, পার্বত্য এলাকার ভূমি উপজাতি জনগোষ্ঠীর সামাজিক ব্যবস্থায় ভোগ ও দখলের অধিকারের ক্ষেত্রে উপজাতি নারীগণ পুনরায় বঞ্চিত ও অবহেলিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান – সার্কেল চীফ, হেডম্যান, কারবারী যাদের উপর পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত উপজাতিদের সামাজিক বিচার, মৌজা সার্কেলের ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনাসহ খাজনা আদায়ের দায়িত্ব অর্পিত, এ প্রতিষ্ঠানগুলো পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোর অন্তর্ভূক্ত। আমাদের একটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে অনুধাবন করতে হবে যে, বর্তমান বিশ্বে নারীদের অধিকারের বিষয়টি সকল ক্ষেত্রে আলোচিত বিষয় হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশের নারীরাও জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

উপজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে বর্তমানে শিক্ষা এবং আধুনিকতার প্রভাব বিস্তার করায় যুব সম্প্রদায়ের পাশাপাশি উপজাতি যুবতীরাও তাদের প্রথাগত রীতিনীতি ও সমাজ ব্যবস্থার অনেক কিছুই পরিহার করে আধুনিকতার মানসিকতা নিয়ে জীবনযাপন করতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করছেন। উপজাতি নারীরাও বর্হিবিশ্ব এবং বাংলাদেশের সমতলের নারীদের ন্যায় তাদের অধিকার আদায়ে বিভিন্ন কর্মসূচী পালনে সচেষ্ট রয়েছেন।

উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রথাগত রীতি এবং সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের অধিকার যথাযথভাবে না থাকায় সার্কেল চিফগণ বিষয়টি উপলব্ধি করে সাম্প্রতিক সময়ে নারীদের অধিকার সু-রক্ষায় কিছু কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, যার অংশ হিসাবে বিগত কয়েক বছরে চাকমা সার্কেল চীফ কর্তৃক ১২০ জনের অধিক নারীকে কারবারী পদে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে, যা নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং নারী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে নানা কর্মসূচী গ্রহন করছে।

বিগত কয়েক বছর ধরে উইমেন রিসোর্স নেটওয়ার্ক, কাপেং ফাউন্ডেশন, মালেয়া ফাউন্ডেশন, হিল উইমেন ফেডারেশন, কেএমকেএস, অন্যান্য নারী কল্যাণ সংস্থা, বলিপাড়া নারী কল্যাণ সংস্থা, জাবারাং কল্যাণ সমিতি, প্রগেসিভ, বাংলাদেশ উপজাতি (আদিবাসী) নারী নেটওয়ার্ক, খাগড়াপুর মাহিলা সমিতি, গর্জনতলী নারী কল্যাণ সমিতিসহ বিভিন্ন সংস্থা নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ এবং অধিকার আদায়ে নানা কর্মসূচী চালিয়ে যাচ্ছে।

তবে সমতলে এনজিওগুলো নারী অধিকার নিয়ে সোচ্চার হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্যাতিত কোনো নারী যখন উপজাতীয় রীতি বা প্রথার নামে বঞ্চিত ও নিপীড়িত হয় তখন এসকল এনজিওগুলো চুপ করে থাকে। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, সম্পত্তির উত্তরাধিকার, বিবাহ-বিচ্ছেদ, সন্তানের অভিভাবকত্ব, ভরণ-পোষণ প্রভৃতির ক্ষেত্রে বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য উপজাতি ভিত্তিক নারী সংগঠনগুলো ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়ে উঠছে।

উপজাতি জনগোষ্ঠীসমূহের মধ্যে বিভিন্ন সম্প্রদায় ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম পালন করে থাকেন। যেমন, চাকমা-বৌদ্ধ ধর্ম, মারমা-বৌদ্ধ ধর্ম, ত্রিপুরা-সনাতন হিন্দু ধর্ম, বম-খ্রীষ্টান ধর্ম, সাওতাল-সনাতন ধর্ম, ম্রো-বৌদ্ধ ধর্ম ইত্যাদি ধর্ম পালন করেন। উপজাতি সম্প্রদায়গুলো তাদের নিজ নিজ ধর্মের নিয়ম কানুন অনুসরণ করলেও তাদের ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী নারীদের অধিকার এবং নারীদের মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে তা অনুসরন করেন না, বরং তারা তাদের নিজ নিজ সম্প্রদায়ের প্রথা অনুসরণ করে থাকেন। ফলে ধর্মীয় ভাবে উপজাতি নারীরা ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক জীবন, বৈবাহিক জীবন এবং পিতা বা স্বামীর সম্পদের উত্তরাধিকারের বিষয়ে গুরুত্ব পাবার কথা থাকলেও সাম্প্রদায়িক প্রথার কারণে তারা ব্যাপক ভাবে অবমূল্যয়িত হন।

উপজাতি সম্প্রদায়ের প্রথাগত উত্তরাধিকার আইন এবং বিবাহ বন্ধনের ক্ষেত্রে প্রচলিত ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত কিছু তথ্য এখানে আলোচনা করা যেতে পারে।

 চাকমা 
চাকমা প্রথা মতে কোন ব্যক্তির মৃত্যুর পর শুধুমাত্র তার পুত্র বা পুত্র সন্তানরাই একমাত্র উত্তরাধিকারী হন। কন্যা সন্তান কোন প্রকার সম্পদের উত্তরাধিকারী হতে পারেন না। কন্যা সন্তান পরিবারের অমতে বিয়ে করলে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ বিচারের ব্যবস্থা করা হয়। বিচারে সাধারণত ১ অথবা ২ মুষ্ঠিতে ধরা যায় এমন শুকর সমাজের সকলকে খাওয়ানোর আদেশ দেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে অপমানজনকভাবে সকলের সামনে তাদের জুতার মালা পরানো হয়। তারপর তাদের বিয়ের অনুমতি দেয়া হয়। চাকমা নারীরা তাদের স্বামীর সম্পদেরও কোন অংশ পান না।

 মারমা
মারমা সম্প্রদায়ের প্রচলিত প্রথা কয়েক ধরনের হয়ে থাকে। মারমা সম্প্রদায়ের বার্মিজ প্রথা অনুসরণকারী উপজাতিগণ বিশেষ করে বান্দরবানে বসবাসরত মারমা সম্প্রদায়ের মেয়েরা পিতা-মাতার সম্পত্তি ছেলেদের ন্যায় সমানভাবে উত্তরাধিকারী হয়ে থাকেন। তবে যে সন্তান পিতা-মাতার ভরণ পোষণ বহন করবে তাকে একভাগ বেশি সম্পত্তি দেওয়া হয়ে থাকে। পরিবারের অমতে নারীগণ বিবাহ করলে সমাজ তাকে ত্যাজ্য ঘোষণা না করা পর্যন্ত তারা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়ে থাকেন।

তবে খাগড়াছড়ি জেলায় বসবাসরত মারমা সম্প্রদায়ের নারীগণ পিতা-মাতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন না। মারমা সমাজে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করলে ঐ ব্যক্তির সকল অস্থাবর সম্পত্তিসহ ঘরবাড়ী প্রথম স্ত্রীকে দিতে হয়। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্ত্রী কোন সম্পত্তি পান না, তবে তার (দ্বিতীয় স্ত্রীর) সন্তানেরা পিতার স্থাবর সম্পত্তির তিন ভাগের এক ভাগ পেয়ে থাকেন।

মারমা সমাজে আরও একটি অদ্ভুত প্রথা প্রচলিত আছে, যা নারীদের জন্য চরমভাবে অপমানজনক। কোন মারমা ছেলে কোন মারমা মেয়েকে পছন্দ হবার পর যদি জোর করে ধরে নিয়ে আসে এবং সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিয়ে বাড়ীর মত আপ্যায়ন করে, তবে সমাজ বিষয়টি মেনে নেয়। এ ক্ষেত্রে উক্ত নারীর ব্যক্তিগত পছন্দের অথবা মতামতের কোন মূল্য দেওয়া হয় না।

 ত্রিপুরা 
ত্রিপুরা মাহিলারা অন্যান্য উপজাতিদের ন্যায় পিতার এবং স্বামীর সম্পদের উত্তরাধিকারী হন না। কোন বিবাহিত ত্রিপুরা মাহিলার অনৈতিক কার্মকাণ্ডের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সামাজিক আদালতে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে স্ত্রীর চরিত্রের সংশোধনের জন্যে ১৫ দিন অন্তর অন্তর তিনবার সুযোগ দেয়া হয়ে থাকে। তিনবার সুযোগ দেবার পরও স্ত্রী চরিত্র সংশোধনে ব্যর্থ হলে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের অনুমতি দেওয়া হয়।

অন্যান্য উপজাতি সম্প্রদায়ের ন্যায় ত্রিপুরা নারীদের অভিভাবকের মতামতের ভিত্তিতে মেয়েদেরকে বিবাহ দেওয়া হয়, বিবাহের সময়ে বর পক্ষকে কণের মায়ের দুধের ঋণ শোধ বাবদ রূপার পাঁচ টাকা, দুই জোড়া নারিকেল এবং এক বোতল মদ প্রদান করতে হয়। ত্রিপুরাদের মধ্যে ‘‘নাইত”, ‘‘দেনদা” সহ বিভিন্ন গোষ্ঠী থাকায় এক গোষ্ঠীর ছেলের সাথে অন্য গোষ্ঠীর মেয়ের বিবাহ বা প্রণয় ঘটিত বিষয়গুলো সহজে মেনে নেওয়া হয় না।

তঞ্চঙ্গ্যা
তঞ্চঙ্গ্যা উপজাতিটি চাকমাদের একটি উপদল। তাদের প্রথাও অনেকটা চাকমাদের মতই, যেখানে নারীর অধিকারকে চরমভাবে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। তঞ্চঙ্গ্যা প্রথা মতে, কোন ব্যক্তি মৃত্যুর পর শুধুমাত্র তার পুত্র বা পুত্র সন্তানরাই মৃত ব্যক্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী হন। কন্যা সন্তান কোন প্রকার সম্পদের উত্তরাধিকারী হতে পারেন না। কন্যা সন্তান পরিবারের অমতে বিয়ে করলে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ বিচার এর ব্যবস্থা করা হয়। বিচারে সাধারণত ১ অথবা ২ মুষ্ঠিতে ধরা যায় এমন শুকর সমাজের সকলকে খাওয়ানোর আদেশ দেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে অপমানজনকভাবে সকলের সামনে তাদের জুতার মালা পরানো হয়। তারপর তাদের বিয়ের অনুমতি দেয়া হয়। তঞ্চঙ্গ্যা নারীরাও তাদের স্বামীর সম্পদের কোন অংশ পান না।

চাক 
চাক সম্প্রদায়ে পিতার সম্পদের উত্তরাধিকারী হিসাবে শুধুমাত্র পুত্র সন্তানগণই সম্পদ পেয়ে থাকেন। মেয়ে বা স্ত্রী কেউ কোন সম্পত্তি পান না। সন্তান শুধুমাত্র মেয়ে হলে ঐ ব্যক্তি সম্পত্তি তার ভাই অথবা ভাই এর ছেলেরা পেয়ে থাকে। এই সম্প্রদায়ের নারীরা পিতা-মাতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন না, এক্ষেত্রে এই সম্প্রদায়ের মহিলারা দেশের প্রচলিত আইনের আশ্রয় গ্রহণ করলেও সমাজ তা গ্রহণ করে না। বৈধ বিবাহ ব্যতিরেকে কোন নারী গর্ভবতী হলে সামাজিক আদালতে গর্ভবতী মহিলার প্রমাণ সাপেক্ষ্যে ভূমিষ্ঠ সন্তানের পিতৃত্ব স্বীকৃত হলেও ঐ সন্তান পিতার সম্পত্তির আইনগত উত্তরাধিকারী হয় না। পরিবারের অমতে নারীরা বিবাহ করলে তাকে পরিবার ও সমাজচ্যূত করা প্রচলন রয়েছে।

খিয়াং 
এ সম্প্রদায়ে বিবাহের ক্ষেত্রে পুরুষদেরকে পণ দিয়ে নারীদের বিবাহ করতে হয়। সাধারনত রুপার দশ টাকা প্রদান করার প্রচলন রয়েছে। খিয়াং জনগোষ্ঠীর প্রচলিত রীতি অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির পুত্র ও কন্যা সন্তানগণ সম্পদের উত্তরাধিকার হয়ে থাকেন। মৃত পিতার নামীয় সম্পত্তি থেকে পুত্রগণ তিনভাগের দুই ভাগ এবং কন্যাগণ একভাগ সম্পদের উত্তরাধিকারী সূত্রে পেয়ে থাকেন। দত্তক সন্তান চারভাগের একভাগ সম্পদ পেয়ে থাকেন। পুত্রের অবর্তমানে কন্যা সন্তানগণ পিতার সম্পূর্ণ সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়ে থাকেন।

 ম্রো/মুরং
এ সম্প্রদায়ে বিবাহের সময়ে মাহিলাদেরকে পণ দিয়ে ঘরে তুলতে হয় বিধায়, বিবাহ বিচ্ছেদ হলে স্বামীর সম্পত্তিতে তাদের কোন অধিকার থাকে না, বরং পণের টাকা সমুদয় ফেরত দিতে হয়। এক্ষেত্রে দরিদ্র পরিবারের নারীরা পিতার পরিবারে ফেরত যেতে চাইলেও তাদের পক্ষে পণের টাকা ফেরত দেয়া সম্ভব হয় না বিধায় তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্যাতন ও কষ্টের স্বীকার হয়ে থাকেন। এই জনগোষ্ঠীর সমাজ ব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক বিধায় এখানে শুধুমাত্র পুরুষদের কর্তৃত্ব বজায় থাকে যেমন, যেকোন সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব, পূজা পার্বণ ইত্যাদি পারিবারিক যেকোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পুরুষদের একক ভূমিকা থাকে।

 লুসাই

লুসাই নরীরা স্বামী কিংবা বাবার সম্পত্তি থেকে কোন অংশ গ্রহণ করতে পারেন না।

পাংখোয়া 
পাংখোয়া নারীরা পিতা বা স্বামীর সম্পদের উত্তরাধিকারী হন না। এই সম্প্রদায়ের নারীগণ বিবাহের পূর্বে যে পারিবারিক পদবী বা সামাজিক মর্যাদার অধিকারী হন না কেন, বিবাহের পর তিনি স্বামীর পরিবারের পদবী ও মর্যাদার অধিকারী হয়ে থাকেন। তবে ‘‘লাল” উপাধী বা কারবারী হিসাবে নিজেকে পরিচয় দিতে পারেন না।

 বম 
বম সম্প্রদায়ে নারীদের বিবাহের ক্ষেত্রে পুরুষদেরকে মেয়ের পরিবারকে পণ দিতে হয়। সমাজের রীতি অনুযায়ী স্বামীর কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ হলে স্ত্রীকে অর্থ দিতে হয় যা, স্বামীর উত্তরাধিকারের ৫০ শতাংশ। আর যদি স্ত্রীর কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে তাহলে বিবাহের সময় স্বামী কর্তৃক প্রদত্ত পণ এর সমুদয় অর্থ ফেরত দিতে হয়। এ সম্প্রদায়ের নারীরা পিতার অস্থাবর সম্পত্তির চার ভাগের এক ভাগ পেয়ে থাকেন, কোন মেয়ে পালিয়ে অন্য সম্প্রদায়ের ছেলেদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে তাকে সমাজ চ্যূত করা হয়।

খুমী 
স্বামীর মৃত্যুর পর খুমী নারীরা মৃত স্বামীর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হতে পারেন না । স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা নারীর ভরণ পোষণের সকল দায়িত্ব তার ভাইদের বহন করতে হয়। খুমী নারীরা তার পিতা অথবা স্বামীর কোন প্রকার সম্পদের অংশ বিশেষও পান না।

উপজাতি নারীদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে যে অনবদ্য অবদান রয়েছে তা সাধারণত সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। নারীর প্রতি মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিবারের পাশাপাশি সমাজের সকল প্রতিষ্ঠানে জেন্ডার সংবেদনশীলতা নিশ্চিত করা জরুরী হয়ে পড়েছে। এজন্য সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নারী পুরুষের সম অধিকারে বিশ্বাসী ও বাস্তব জীবনে বিশ্বাসী সম্মান ও মর্যাদা প্রদানকারী ব্যক্তিদের নেতৃত্বে নিয়ে আসার জন্য আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার।

ত্রিপুরা সম্প্রদায়ে পুরুষদের একাধিক বিবাহ করার প্রচলন থাকায় সাম্প্রতিক সময়ে নারীদের সম্পত্তির অধিকার আদায়ে সামাজিক সংগঠনগুলো নারীদের মামলা করা বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। খাগড়াছড়ি জেলার একটি নারী সংগঠনের উদ্যোগে ‘‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি” পদ্ধতি হিসাবে নারীদের আদালতে মামলার জটিলতা থেকে রেহাই পাওয়ার স্বার্থে জেলা যুগ্ন জজ এর উপস্থিতিতে উভয় পরিবারের অভিভাবক, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, আইনজীবী এবং বাদী-বিবাদী এর সমন্বয়ে সমঝোতা মূলকভাবে মীমাংসা করে দেবার প্রচলন শুরু হয়েছে।

উপজাতি নারীগণ ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচীতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখলেও পুরুষতান্ত্রিক ও প্রথাগত ব্যবস্থার কারণে তাদের সে অবদান সেইভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। উদাহরণ স্বরূপ, হাজংদের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, টংক আন্দোলন, তেভাগা আনোদালন, হাতিখেদা আন্দোলন, চাকমা বিদ্রোহ, খাসী বিদ্রোহ, মুন্ডা বিদ্রোহ, মণিপুরীদের ভানুবিল আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন, নানকার বিদ্রোহ, চা শ্রমিক আন্দোলন, ইকো পার্ক বিরোধী আন্দোলন এবং ফুলবাড়ি কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলন প্রভৃতি ক্ষেত্রে উপজাতি নারীদের ভূমিকার বিষয়ে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।

এখানে আরো উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৮৮৫ সালে সাঁওতাল বিদ্রোহে ফুলমণি মুর্মু এবং জান মুর্মুরা পুরুষদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন, কিন্তু উক্ত বিদ্রোহে নারীদের অবদানের কথা এড়িয়ে গিয়ে ‘‘সিধু-কানু” দিবস হিসাবে ইতিহাসে প্রচারণা রয়েছে। ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত নেত্রকোনার দূর্গাপুর এলাকায় হাজং কৃষকদের অধিকার রক্ষায় জমিদার এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে রাশিমণি হাজং, দিস্তামণি হাজং, বাসন্তি হাজংসহ অনেক নারী মৃত্যু জীবন দিয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখলেও তাদের সে আত্নত্যাগের বিষয়টি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।

সম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশসহ বর্হিবিশ্বের সাথে উপজাতি নারীদের মধ্যে বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রভাব এবং নারী অধিকারের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের প্রথাগত সমাজ ব্যবস্থায় জীবন যাপন করতে অধিকাংশ নারীই স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন না। তদুপরি বিবাহ সংক্রান্ত কোন দলিল না থাকায় পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে শ্বশুরালয়ে এবং পিতার পরিবারে নানা নির্যাতন ও হয়রানির স্বীকার হওয়ায় উপজাতি নারীদের মধ্যে তাদের অধিকারের বিষয়ে বোধদয় সৃষ্টি হচ্ছে।

বিষয়টি সমাধানে বিভিন্ন নারী সংগঠন সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি নারী অধিকার রক্ষা ও আদায়ে সচেতন নারী মহল পাড়া, মহল্লা, উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে নানা সচেতনতা মূলক কর্মসূচী পরিচালনাসহ এনজিও সংগঠনের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম অব্যহত রেখেছে। কিছুদিন আগে রাঙামাটি জেলায় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত আইন সংস্কার ও উপজাতি নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার দাবীতে সংবাদ সম্মেলনে উপজাতি ভিত্তিক নারী সংগঠন বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ, প্রোগ্রেসিভ এনজিও এবং আশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র এর প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করেন।

উক্ত সম্মেলনে বিবাহের সনদ না থাকায় স্ত্রীকে অস্বীকার করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও স্বামীর ঔরসজাত সন্তানের ভরণ পোষণ না করা, সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া, নারী নেতৃত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে নারী হেডম্যান কারবারী নিয়োগে সার্কেল চীফদের আরও মনোযোগী হওয়া, নারী বিষয়ে উপজাতিদের প্রথাগত বৈষম্য ও অনৈতিক শাস্তির বিধান রহিত করাসহ লিখিতরূপে প্রথাগত বিধান সংরক্ষণের পরামর্শ প্রদান ও দাবী জানানো হয়।

তবু সার্বিক বিষয় বিশ্লেষণে একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আঞ্চলিক উপজাতি দলগুলোর আহবানে সরকার পার্বত্য এলাকার ভূমি সমস্যা সমাধানে ভূমি কমিশন আইন পাশ করেছে। এই আইন অনুযায়ী পার্বত্য এলাকার ভূমির বন্টন উপজাতিদের রীতি,, নীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী করা হবে। প্রশ্ন হচ্ছে উপজাতিদের রীতি, নীতি এবং প্রথা নারীদের অধিকার কতটুকু নিশ্চিত করেছে।

পৃথিবীতে প্রচলিত বিভিন্ন বৃহৎ ধর্ম এবং বাংলাদেশের সংবিধান নারীদের যতটুকু সংরক্ষিত করেছে, উপজাতিদের প্রথা নারীদের আরো পিছিয়ে দিয়েছে। সকল ক্ষেত্রে নারীদের বঞ্চিত করা হয়েছে। নারীদের ব্যক্তিগত জীবন, বৈবাহিক জীবন, সম্পত্তির উত্তরাধিকার কোন ক্ষেত্রেই সার্বিকভাবে তাদের মূল্যায়ন করা হয়নি।

কোন কোন উপজাতিদের প্রথা নারীদের অনেকটা পণ্য হিসাবে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অর্ধেক সংখ্যক নারী রয়েছে। এই অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে কোন প্রথাই কার্যকর হতে পারে না।

পৃথিবীতে যুগে যুগে মানুষ সামনে এগিয়ে যাবার সংগ্রাম করছে। কোন গোত্র বা জনগোষ্ঠীর সকল নিয়ম কানুন বা প্রথা সর্বগ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে, তাই যুগে যুগে মানুষ ভাল ব্যবস্থাপনাকেই গ্রহণ করেছে, অপছন্দনীয় বিষয়গুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে, নারী কিংবা পুরুষ সকলকে মানুষ হিসাবে সমভাবে মূল্যায়ন করে সামনে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করেছে। উপজাতি নেতৃবৃন্দ এবং আঞ্চলিক দলসমূহ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় আনবে, তা’ সকলের প্রত্যাশা।

পারভেজ হায়দার- পার্বত্য গবেষক।




বাংলাদেশে আদিবাসী দিবস কেন?

মিল্টন বিশ্বাস :

বাংলাদেশে ৯ আগস্ট ‘বিশ্ব আদিবাসী দিবস’ জাতীয়ভাবে পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রতিবছর ‘আদিবাসী ফোরাম’ নামক সংগঠনের ব্যানারে সন্তু লারমা এবং ঢাকার কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি সেই দাবি জানিয়ে থাকেন। প্রতিনিয়ত সংবাদ সম্মেলন করে পার্বত্য ইস্যুতে অনেক কথা বলা হচ্ছে। নিজেদের অধিকার আদায়ে দেশে একটি গণমুখী সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য আদিবাসীদের ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করতে হবে বলে মন্তব্য করেন জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) চেয়ারম্যান সন্তু লারমা। তিনি সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির পাশাপাশি সংসদের উত্থাপিত তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ বিল-২০১৪ প্রত্যাহার এবং পাস হওয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০১৪ বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছিলেন। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে পার্বত্য এলাকায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের বিরোধিতা করেন তিনি। পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নসহ বেশ কয়েকটি দাবিতে রাজধানীর এক হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বলেন, ‘পার্বত্যবাসী এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য এখনও প্রস্তুত নয়। এগুলো বহিরাগত অনুপ্রবেশের দ্বারে পরিণত হবে। তাই চুক্তি বাস্তবায়ন পর্যন্ত এসব প্রকল্প স্থগিত রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।’ উপরন্তু দেশের অন্য স্থানে অবস্থিত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজসহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাহাড়ী ছাত্রছাত্রীদের অধিকসংখ্যক কোটা সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়েছিলেন সন্তু লারমা। তাঁর কথার সূত্র ধরে বলা দরকার, পার্বত্য এলাকার অধিকাংশ উপজাতি জনগোষ্ঠী কোটা সুবিধা গ্রহণ করে কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয় অনেক সরকারী অফিসে উচ্চপদে আসীন এ কারণে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সমতলের বাঙালীদের দ্বারা এই কোটা সুবিধা বাতিলের কিংবা কমানোর দাবিটাও যৌক্তিক। আশ্চর্য হলো পাহাড়ী জনজীবনে প্রভূত উন্নতি সত্ত্বেও বর্তমান সরকার উপজাতীয় কোটা সংরক্ষণ করছেন।

২০১৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটি সফরের সময় জনসমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের ঘোষণা দেন। তারপর থেকেই এর পক্ষে-বিপক্ষে স্থানীয়দের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক চলে। অথচ পার্বত্য এলাকার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতার কোন অভাব নেই। ৫ জানুয়ারি (২০১৪) নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের ‘সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, অনুন্নত সম্প্রদায় ও পার্বত্য চট্টগ্রাম’ শীর্ষক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদে পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনী পাস করে আওয়ামী লীগ ’৭২-এর সংবিধানের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি পুনর্প্রতিষ্ঠিত করেছে। সকল ধর্মের সমান অধিকার এবং দেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-জাতিগোষ্ঠী ও উপজাতিদের অধিকার ও মর্যাদার সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়ার ফলে ধর্মীয় ও নৃ-জাতিসত্তাগত সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান এবং তাদের জীবন, সম্পদ, উপাসনালয়, জীবনধারা ও সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য রক্ষার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা দৃঢ়ভাবে সমুন্নত থাকবে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের জমি, বসতভিটা, বনাঞ্চল, জলাভূমি ও অন্য সম্পদের সুরক্ষা করা হবে। সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জমি, জলাধার ও বন এলাকায় অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি কমিশনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। অনগ্রসর ও অনুন্নত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, দলিত ও চা-বাগান শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে বিশেষ কোটা এবং সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত থাকবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির অবশিষ্ট অঙ্গীকার ও ধারাসমূহ বাস্তবায়িত করা হবে। পার্বত্য জেলাগুলোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা হবে এবং তিন পার্বত্য জেলার ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখা, বনাঞ্চল, নদী-জলাশয়, প্রাণিসম্পদ এবং গিরিশৃঙ্গগুলোর সৌন্দর্য সংরক্ষণ করে তোলা হবে। এই তিন জেলায় পর্যটন শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পের বিকাশে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।’ অর্থাৎ বর্তমান সরকারের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাই রয়েছে সন্তু লারমাসহ সকল উপজাতি জনগোষ্ঠীর জানমাল ও সম্পদ সুরক্ষার বিষয়ে। ওয়াদা করা হয়েছে অনগ্রসর ও অনুন্নত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, দলিত ও চা-বাগানের শ্রমিকদের জন্য কোটা ও সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখার। আর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন ও সে অঞ্চলের উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছে। গত মহাজোট সরকারের শাসনামলে তিন পার্বত্য এলাকার উন্নয়নে শেখ হাসিনার সরকার ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। যে দুর্গম এলাকা মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে ছিল সে স্থানসমূহ তথ্য-প্রযুক্তির আওতায় আনা হয়েছে। যেখানে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও বাজারের সঙ্কট ছিল সেসব জায়গা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বেঁচে থাকার উপায় হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এ সত্ত্বেও যদি হুমকি দেয়া হয় তাহলে আমাদের মতো সাধারণ জনতার মনে আশঙ্কা এবং প্রশ্ন জাগ্রত হওয়াটাই স্বাভাবিক যে পার্বত্য এলাকা আসলেই সন্তু লারমার পৈত্রিক ভিটা কিনা?

উপজাতীয় কোটা সম্পর্কে আগেই বলা হয়েছে। সংবিধানে স্বীকৃত রয়েছে সেই কোটা ব্যবস্থা। বাংলাদেশ সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে বর্ণিত দেশের ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’-এর জন্য সরকারী, আধাসরকারী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরির ক্ষেত্রে এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য কোটা সুবিধার কথা রয়েছে। অথচ এসব সুবিধাভোগীরা প্রতিবছর ‘আদিবাসী ফোরাম’ নামের সংগঠন থেকে ৯ আগস্ট ‘বিশ্ব আদিবাসী দিবস’ পালনের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে। পক্ষান্তরে কয়েক বছর ধরে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আদিবাসী শব্দটি না থাকায় বিভিন্ন জেলা প্রশাসকের কাছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো চিঠিতে বিশ্ব আদিবাসী দিবস উদযাপনে সরকারের কোন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত না হওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সংবিধানের ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ শব্দগুলোর পরিবর্তে আদিবাসী ফোরামের দাবি এখানে ‘আদিবাসী জাতিসমূহ’ সংযুক্ত করা হোক। বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন এবং তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট আছেন। অথচ জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা আগের বছরগুলোর মতো এবারও নানা বক্তব্য ও মন্তব্যে অসহযোগিতার মনোভাব প্রকাশ করেছেন। সন্তু লারমা সম্ভবত আইএলও কনভেনশন-১০৭ এর অনুচ্ছেদ ১ এর উপ-অনুচ্ছেদ ১(খ) বর্ণিত ‘আদিবাসী’ সংজ্ঞাটি মনোযোগসহকারে পাঠ করেননি। সেখানে বলা হয়েছে- ‘স্বাধীন দেশসমূহের আদিবাসী এবং ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর সদস্যদের ক্ষেত্রে রাজ্য বিজয় কিংবা উপনিবেশ স্থাপনকালে এই দেশে কিংবা যে ভৌগোলিক ভূখ-ে দেশটি অবস্থিত সেখানে বসবাসকারী আদিবাসীদের উত্তরাধিকারী হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ‘আদিবাসী’ বলে পরিগণিত এবং যারা, তাদের আইনসঙ্গত মর্যাদা নির্বিশেষ নিজেদের জাতীয় আচার ও কৃষ্টির পরিবর্তে ওই সময়কার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আচার ব্যবহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপন করে।’ অন্যদিকে ‘উপজাতি’ সম্পর্কে আইএলও কনভেনশন-১০৭ এর অনুচ্ছেদ ১ এর উপ-অনুচ্ছেদ ১(ক) অংশে বলা হয়েছে- ‘স্বাধীন দেশসমূহের আদিবাসী এবং ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর সদস্যদের বেলায়, যাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা জাতীয় জনসমষ্টির অন্যান্য অংশের চেয়ে কম অগ্রসর এবং যাদের মর্যাদা সম্পূর্ণ কিংবা আংশিকভাবে তাদের নিজস্ব প্রথা কিংবা রীতিনীতি অথবা বিশেষ আইন বা প্রবিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।’ অর্থাৎ ‘আদিবাসী’ হলো ‘সন অব দি সয়েল।’ আর ‘উপজাতি’ হলো প্রধান জাতির অন্তর্ভুক্ত ক্ষুদ্র জাতি।

‘আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র ২০০৭’ অনুসারে তাদের ৪৬টি অধিকারের কথা লিপিবদ্ধ হয়েছে। এই ঘোষণাপত্রে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়নি বা সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত হয়নি। তাছাড়া ঘোষণাপত্রের ওপর সব সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে সর্বসম্মত সমর্থন নেই। এ কারণে বাংলাদেশ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্রের ওপর ভোটগ্রহণের সময় তারা ভোটদানে বিরত ছিল। তবে যে কোন অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীর অধিকারের প্রতি সমর্থন রয়েছে সরকারের। সংবিধান অনুসারে সরকারপ্রধান প্রধান মানবাধিকার চুক্তির প্রতি অনুগত এবং উপজাতিদের অধিকার সমর্থন করে আসছে। উল্লেখ্য, ‘আদিবাসী’ শব্দটি সংবিধানে সংযোজিত হলে ২০০৭ সালের ‘আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র’ মেনে নিতে হবে; যা হবে বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী। কারণ ঘোষণাপত্রের অনুচ্ছেদ-৪-এ আছে : ‘আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার চর্চার বেলায়, তাদের অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ের ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন এবং স্বশাসিত সরকারের অধিকার রয়েছে ও তাদের স্বশাসনের কার্যাবলীর জন্য অর্থায়নের পন্থা এবং উৎসের ক্ষেত্রেও অনুরূপ অধিকার রয়েছে।’ অর্থাৎ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করলে ও পার্বত্য অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের অনুমতি ছাড়া বাংলাদেশ সরকার খাগড়াছড়ির গ্যাস উত্তোলন করে অন্য জেলায় আনতে পারত না। কারণ সেখানকার স্বশাসিত আদিবাসী শাসক নিজেদের অর্থায়নের উৎস হিসেবে সেই খনিজ, বনজ ও অন্যান্য সম্পদ নিজেদের বলে চিন্তা করত। আবার অনুচ্ছেদ-৩৬-এ আছে, ‘আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর, বিশেষত যারা আন্তর্জাতিক সীমানা দ্বারা বিভক্ত হয়েছে, তাদের অন্য প্রান্তের নিজস্ব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক কার্যক্রমসহ যোগাযোগ সম্পর্ক ও সহযোগিতা বজায় রাখার এবং উন্নয়নের অধিকার রয়েছে।’ রাষ্ট্র এই অধিকার কার্যকর সহযোগিতা প্রদান ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে। ঘোষণাপত্রের এই নির্দেশ কোন সরকারই মেনে নিতে পারবে না। কারণ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক কার্যক্রম অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হবে। তাছাড়া বাংলাদেশে পার্বত্য অঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকায় জঙ্গী তৎপরতা বৃদ্ধি পাবে; যা ক্রমেই সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে জাতীয় উন্নয়ন ব্যাহত করবে। জাতিসংঘের এই ঘোষণাপত্রের শেষ অনুচ্ছেদ-৪৬-এ সবার মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানোর কথা বলা হয়েছে এবং এই কাজটি গত মহাজোট সরকার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সম্পন্ন করেছে। এর আগে ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি’ অনুসারে ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, সমতা, বৈষম্যহীনতা, সুশাসন এবং সরল বিশ্বাসের মূলনীতি অনুসরণ করা হয়েছে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী তথা উপজাতিগুলোর উন্নয়নে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে ১৯৭২ সালের ২২ জুন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ওখঙ) প্রণীত ‘ইন্ডিজেনাস এ্যান্ড ট্রাইবাল পপুলেশনস কনভেনশন, ১৯৫৭’ (কনভেনশন নম্বর ১০৭)-এ অনুস্বাক্ষর করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী এবং ট্রাইবাল জাতিগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়সহ তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার জন্য জাতিসংঘের এই সংস্থাটি আবার সংশোধিত ‘ইন্ডিজেনাস এ্যান্ড ট্রাইবাল পপুলেশনস কনভেনশন ১৯৮৯’ (কনভেনশন নম্বর ১৬৯) গ্রহণ করে। এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইনী দলিল জাতীয় পর্যায়ে উপজাতিদের অধিকারকে প্রতিষ্ঠা ও কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয়। এখানে ট্রাইবাল বা সেমি-ট্রাইবাল বলতে ওই গোষ্ঠী ও ব্যক্তিদের বোঝানো হয়েছে, যারা তাদের ট্রাইবাল বৈশিষ্ট্য হারানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং এখনও জাতীয় জনসমষ্টির সঙ্গে একীভূত হয়নি। বঙ্গবন্ধুর অনুসৃত পথে অগ্রসর হয়ে বর্তমান সরকার পার্বত্য শান্তি চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ী অধিবাসীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র : দৈনিক জনকণ্ঠ, ৯ আগস্ট ২০১৭




পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিরা জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী আদিবাসী হবার পূর্বশর্তসমুহ পূরণ করে না

 পারভেজ হায়দার

নিজ মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা, দেশের স্বার্থে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকাই দেশপ্রেম । পুঁথিগতভাবে দেশপ্রেমের সংজ্ঞায় ভিন্নতা থাকলেও মৌলিক কয়েকটি বিষয় অনেকটাই সমার্থক । দেশপ্রেমের সাথে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের প্রতি ভালোবাসা জড়িত, এই ভালোবাসা শর্তহীন ভালবাসা । দেশপ্রেমিক মানুষ নিজস্ব ভূখণ্ড রক্ষার সংগ্রাম, ভূ-খণ্ডের রক্ষণাবেক্ষণ অথবা পুনরুদ্ধারে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকে ।

একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বিভিন্ন শ্রেণীর জাতি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের অধিবাসীরা বসবাস করতেই পারে, থাকতে পারে এদের ধর্মের ভিন্নতা, কিন্তু নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী একটি দেশের ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে দেশের মঙ্গলের জন্য কাজ করবে এবং প্রয়োজনে যেকোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকবে, এটাই স্বাভাবিক ।

একটি দেশের অধিবাসীদের মধ্যে বিভিন্ন সম্প্রদায়, ধর্ম ও গোষ্ঠীর বসবাস থাকলেও প্রায় প্রতিটি সম্প্রদায়ের মধ্যেই ব্যক্তিগত অথবা দলীয় অথবা ধর্মীয় মতাদর্শ ভিত্তিক ভিন্নতা থাকতে পারে । মতাদর্শগত এই ভিন্নতা সামগ্রিকভাবে দেশের মঙ্গলের জন্য পরিপূরক হওয়াই বাঞ্ছনীয় । কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতে দেশ স্বার্থ বিষয়ে স্ববিরোধীতা দৃশ্যমান ।

এ দেশের কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবী ব্যক্তিবর্গ দেশের স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত মতাদর্শকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন । তবে যেকোন মতাদর্শের মধ্যে যদিও একটি আদর্শিক বিষয় জড়িত তথাপি মতাদর্শের এই ভিন্নতা দেশের স্বার্থবিরোধী হলে তা ধরে রাখা একেবারেই কাম্য নয় । সমস্যাটি তখনই প্রকটাকারে দেখা দেয় যখন ভিন্ন মতাদর্শিক এই স্বার্থান্বেষী মহল অন্য দেশের স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে ব্যক্তিগত তথাকথিত মতাদর্শের পক্ষে তাদের ভাষায় ইতিবাচক ব্যাখ্যা দাড় করিয়ে ফেলেন ।

আগামী ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস । বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই । তবে সাম্প্রদায়িক রীতিনীতির ভিন্নতার কারণে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী থাকায় সরকার ঐ জনগোষ্ঠী গুলোকে ‚ক্ষুদ্র ও নৃ গোষ্ঠী” হিসাবে পরিগণিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন । সরকার এই সিদ্ধান্ত দেশের ঐতিহাসিক পটভূমি বিবেচনায় এবং বাংলাদেশে বসবাসরত ঐ ছোট ছোট জনগোষ্ঠী সমূহের উৎস ও প্রাথমিক আগমনের বিষয় আমলে নিয়ে ঐ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ।

কিন্তু বাংলাদেশের কিছু স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবী তাদের মনগড়া মতাদর্শ সরকারের সিদ্ধান্তের উপর চাপিয়ে দিতে চান । তাদের এই দাবির পিছনে ঐতিহাসিক কোন ভিত্তি নেই । যেহেতু তারা বুদ্ধিজীবী, তাই আশা করা যায়, তারা বিষয়টি বোঝেন, কিন্তু নিজেদের অহংকারপ্রসুত অথবা অন্য কোন স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে ব্যক্তিগত লাভের আশায় তারা তাদের ভ্রান্ত মতাদর্শ দেশের উপর চাপিয়ে দিতে চান । তাদের এই দাবি এবং কার্যক্রম চরমভাবে দেশ স্বার্থ বিরোধী হতে পারে এ বিষয়টি তারা ইচ্ছাকৃতভাবে একেবারেই বুঝতে চান না।

বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসরত ‚ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠীর” অধিবাসীগণ এবং তাদের সমর্থনপুষ্ট স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবীদের ‚আদিবাসী” সংক্রান্ত দাবী একেবারেই নতুন । ইতিপূর্বে ‚ক্ষুদ্র ও নৃ-গোষ্ঠীর” অধিবাসীগণ নিজেদের ‚উপজাতী” হিসেবে পরিচয় দিতে সম্মানিত বোধ করতো । এমনকি ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তিতেও ক্ষুদ্র ও নৃ গোষ্ঠীর এই অধিবাসীদের ‚উপজাতী” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ।

২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ অধিবেশনে The Nation Declaration on the Rights of Indigenous Peoples (UNDRIP) বিল পাশ হয় । ১৪৪ টি দেশ ঐ বিলের স্বপক্ষে, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশসমুহ ঐ বিলের বিপক্ষে এবং বাংলাদেশসহ আরও ১১টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে । পরবর্তীতে ২০১৬ সালের মে মাসে কানাডা UNDRIP থেকে তাদের আপত্তি প্রত্যাহার করে নেয়। বাংলাদেশ UNDRIP তে ভোটদানে বিরত থাকলেও জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক শর্তানুযায়ী বাংলাদেশে ‚আদিবাসীদের” উপস্থিতি সম্পর্কে যথেষ্ট গবেষণা করে সরকার ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর এই সম্প্রদায় সমুহকে ‚ক্ষুদ্র ও নৃ গোষ্ঠী” নামে অভিহিত করে আইন পাশ করেছে ।

তবে একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পালন করতেই হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই । ২০০৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে UNDRIP তে আদিবাসীদের কয়েকটি নির্দিষ্ট অধিকারের বিষয়ে নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে । আদিবাসীদের ভূমি অধিকার, জীবন ও নিরাপত্তা অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় স্বীকৃতি, শিক্ষা ও তথ্যের অধিকার এবং চাকুরী, দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার, আদিবাসী অধ্যুষিত ভূমিতে খনিজ সম্পদসহ অন্যান্য সম্পদের অধিকার, জ্ঞানের অধিকার, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রশাসন পরিচালনা করার অধিকার ইত্যাদি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে ।

অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে কোন নিদিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ‚আদিবাসী” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে ঐ ভূখণ্ডের উপর স্বাধীন সার্বভৌম দেশের সরকারের কর্তৃত্ব খর্ব হবে । এমনকি ঐ ভূখণ্ডে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদের বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে হলে ‚আদিবাসী” ঐ জনগোষ্ঠীর সাথে সরকারকে পরামর্শ করতে হবে । ঐতিহাসিকভাবে সত্য না হলেও সুযোগের সদ্ব্যবহার এবং বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে চাকমা সার্কেল প্রধান ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়সহ উপজাতিদের সমমনা বুদ্ধিজীবীগণ বাংলাদেশে বসবাসরত ছোট ছোট জনগোষ্ঠীর জাতিসত্ত্বাসমূহকে ‚আদিবাসী” হিসেবে পরিগণিত করার দাবী তুলেছেন ।

এখানে মনে রাখতে হবে, একটি দেশের বসবাসরত অধিবাসীদের মধ্যে ‚Minorities” এবং ‚আদিবাসী” বিষয়টি এক নয়। তবে কিছু কিছু দেশে স্বীকৃত আদিবাসীগণ ‚Minorities” নয়। যেমন, গুয়েতেমালা, বলিভিয়া ইত্যাদি । বাংলাদেশে বসবাসরত ছোট ছোট জাতি জাতিসত্ত্বার আদিবাসীগণকে ‚Minorities” হিসেবে পরিগণিত করা অধিক যুক্তিযুক্ত ।

জাতিসংঘ কমিশনের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার হোসে মার্টিনেজ কোবে যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তাতে বলা হয়েছে, কোন ভূখণ্ডের আদিবাসী সম্প্রদায়, জাতিগোষ্ঠী বা জাতি বলতে তাদের বোঝায়, যাদের ঐ ভূখণ্ডে প্রাক-আগ্রাসন এবং প্রাক-উপনিবেশকাল থেকে বিকশিত সামাজিক ধারাসহ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রয়েছে, যারা নিজেদেরকে ঐ ভূখণ্ডে বা ভূখণ্ডের কিয়দাংশে বিদ্যমান অন্যান্য সামাজিক জনগোষ্ঠী থেকে নিজেদের স্বতন্ত্র মনে করে । সেই সাথে তারা নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও আইন ব্যবস্থার ভিত্তিতে পূর্বপুরুষের ভূখণ্ড ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ভবিষ্যৎ বংশধরদের হাতে তুলে দেয়ার ইচ্ছাপোষণ করে ।

জাতিসংঘ এখানে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে । যারা কোন উপনিবেশ স্থাপনের আগে থেকেই ওই ভূখণ্ডে বাস করছিল, যারা ভূখণ্ডের নিজস্ব জাতিসত্ত্বার সংস্কৃতি ধরে রেখেছে ও তা ভবিষ্যৎ বংশধরদের হাতে তুলে দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করে, এবং যারা নিজেদের স্বতন্ত্র মনে করে ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতিদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী ‚আদিবাসী” হবার জন্য পূর্বশর্তসমুহ পূরণ করে না । তারা মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে চট্টগ্রাম তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে ১৭শ খ্রিস্টাব্দ ও ১৮শ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ের দিকে অবস্থান নিয়েছিল ।

আদিবাসীদেরকে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়, যেমন: অষ্ট্রেলিয়াতে ‚Aboriginal Peoples”, ফ্রান্সে ‚Autochthonous Peoples”, কানাডাতে ‚First Nations”, যুক্তরাষ্ট্রে ‚Indians” ইত্যাদি নামে ডাকা হয় । ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আদিবাসীগণ প্রকৃতির উপর নির্ভর করতে গিয়ে চরম দারিদ্রতার মধ্যে দৈনন্দিন জীবন অতিবাহিত করেছে । তারা সাধারণত সভ্য সমাজের অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের মত করে চলতে পছন্দ করে ।

আদিবাসীদের অধিকারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিগোচরে আনার জন্য ১৯৬৫ সালে জাতিসংঘে ‚International Convention To Eliminate All Forms Of Racial Discrimination” (ICERD) বিষয়ে সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয় । ২০০৭ সালে জাতিসংঘের অধিবেশনে পাশকৃত UNDRIP তে আদিবাসীদের জন্য কয়েকটি মৌলিক অধিকারের বিষয়ে সমুন্নত রাখা হয়েছে ।

তার মধ্যে Convention ১৬৯ অনুযায়ী আদিবাসীগণ যে দেশের ভূখণ্ডে অবস্থান করছে সেই দেশের সরকার বিভিন্ন আইনগত বিষয়ে যা আদিবাসীদের সরাসরিভাবে প্রভাবিত করবে সে বিষয়ে তাদের সাথে আলোচনা করতে বাধ্য থাকবে। উদাহরণ স্বরূপ : আদিবাসীদের বসবাসরত ভূখণ্ডে সরকার কোন বাঁধ (Dam) তৈরীর প্রয়োজনবোধ করলে অথবা কোন খনিজ সম্পদ আহরণ করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডে অবস্থানরত আদিবাসীদের সাথে সরকারকে আলোচনা করে নিতে হবে ।

Convention ১৬৯ এ আরো উল্লেখ আছে সরকার আদিবাসীদের সাথে আলোচনার সময় সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব নিয়ে আলোচনা করবে । ২০০৭ সালের জাতিসংঘ অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ে পাশকৃত ইস্যুটিতে তিনটি মৌলিক বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, প্রথমত তাদের ভূখণ্ডে সম্পদের অধিকার, দ্বিতীয়ত নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার অধিকার এবং তৃতীয়ত রাজনৈতিক অধিকার অর্থাৎ নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ও পদ্ধতিতে প্রশাসন ব্যবস্থাপনা ।

বাংলাদেশ সরকার জনগনের মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে বদ্ধপরিকর । ২০০৭ সালের জাতিসংঘের অধিবেশনে পাশকৃত UNDRIP তে আদিবাসীদের যেসকল অধিকার দেওয়া হয়েছে তা অনেকটা ঐ নির্দিষ্ট ভূখন্ডে স্বায়ত্বশাসন এরই নামান্তর । তথাপি বাংলাদেশ সরকার এদেশে বসবাসরত ছোট ছোট জাতি স্বত্ত্বার জনগোষ্ঠী যদি আসলেই ‚আদিবাসী” হবার পূর্বশর্তসমুহ পূরণ করতো তাহলে তাদের দাবী অনুযায়ী সরকার নিশ্চয়ই বিষয়টি নিয়ে দৃঢ়ভাবে বিবেচনা করতো ।

কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবীগণ এবং ক্ষুদ্র ও নৃ গোষ্ঠীর সুযোগ সন্ধানী কিছু নেতৃবৃন্দ তাদের সুদূরপ্রসারী দেশ বিরোধী স্বার্থের কারণে ২০০৭ সালের পর থেকে হঠাৎ করেই ‚আদিবাসী” বিষয় দাবী তুলেছেন । ভ্রান্ত এই দাবীটি দেশের স্বার্থ বিরোধী এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই । তথাপি দেশের কতিপয় স্বার্থান্বেষী নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, পাহাড়ে বসবাসরত শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ, এমনকি সাংবাদিকরাও ইদানিং ছোট ছোট ক্ষুদ্র বিভিন্ন সম্প্রদায়গুলোকে সরকার নির্দেশিত ‚ক্ষুদ্র ও নৃ-গোষ্ঠী” না বলে ‚আদিবাসী” হিসেবে অভিহিত করছেন । সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও সতর্কতা সত্ত্বেও ‚আদিবাসী” শব্দের ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, জাতীয় ঐতিহাসিক স্থানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করা হচ্ছে ।

উপজাতীদের ‚আদিবাসী” হিসেবে উল্লেখ না করার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও স্বার্থান্বেষী মহল খুব সচেতনভাবেই তা অমান্য করছেন । ২০১৫ সালের ১৬ আগস্ট গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-৩ অধিশাখা থেকে ‚বাংলাদেশে আদিবাসী নামক অসাংবিধানিক দাবি বাস্তবায়নের অপকৌশল রোধে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান ব্যবহারের অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন” সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় ।

দেশের প্রত্যেক মানুষেরই আলাদা আলাদা মতাদর্শ থাকতে পারে । এই মতাদর্শ যেন দেশপ্রেমের সাথে সাংঘর্ষিক না হয় সে বিষয়টি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে হবে । ব্যক্তিগত মতাদর্শের বিষয়টি দুই ধরণের হতে পারে- প্রথমত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মনেপ্রাণে ঐ মতাদর্শকে বিশ্বাস ও ধারণ করেন আবার দ্বিতীয়ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নির্দিষ্ট একটি মতাদর্শ মনে প্রাণে ধারণ না করলেও স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় দেশের স্বার্থ বিরোধী হলেও উক্ত বিতর্কিত মতাদর্শে স্থির থাকেন ।

সরকারের সুনিদিষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও যেহেতু বাংলাদেশের স্বার্থানেষী কিছু বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশের উপজাতীদের ‚আদিবাসী” হিসেবে সম্বোধন করছেন সেহেতু তারাও সুদূর প্রসারী কোন ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে করছেন, তা অনুমান করা যায় । তারা তাদের ব্যক্তিগত মতাদর্শের আবরণে উপজাতীদের ‚আদিবাসী” আন্দোলনকে আরও উৎসাহিত করছেন । তবে যদি আদিবাসী দাবীটির পিছনে সত্যতা থাকতো তাহলে বিষয়টি নিয়ে হয়তো বিতর্কের সুযোগ ছিলো।

কিন্তু একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত বিষয়ে কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী বুদ্ধিজীবী কেন ক্রমাগত প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তা’ তারা নিজেরাই ভালো বলতে পারবেন । দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা, অখণ্ডতা রক্ষা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি  অর্জনের মত মৌলিক বিষয়ে কোন বিতর্ক সৃষ্টি কাঙ্ক্ষিত নয় । মৌলিক বিষয়সমূহে আমাদের মতাদর্শগত ভিন্নতা দেশপ্রেমের গভীরতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ।

অপ্রয়োজনীয় এবং অগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করে মেধাবী জনগোষ্ঠীর যেমন সময় নষ্ট হয় তেমনি দেশের স্বার্থের প্রয়োজনে ঐ মেধাসমুহ ঐ সময়গুলোতে কোন ভূমিকা রাখতে পারে না । দেশের মৌলিক বিষয় সমুহে ব্যক্তিগত মতাদর্শগত ভিন্নতা যেনো অহেতুক অহংকারে বা কোন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর স্বার্থের কারণে প্রভাবিত না হয় সেবিষয়ে দৃষ্টি দেয়া আবশ্যক ।

পারভেজ হায়দার- পার্বত্য গবেষক




পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ধস, অযাচিতভাবে প্রশ্নের তীর বাঙালিদের দিকে


পারভেজ হায়দার ::
গত ১১-১৩ জুন ভারি বর্ষণের সময় বৃহত্তর চট্টগ্রাম, অর্থাৎ চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং কক্সবাজারে দেড় শতাধিক মানুষের প্রাণহানী ঘটেছে। বৃহত্তর চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের করণে প্রাণহানির ঘটনা একবারে নতুন না হলেও এ বছরের পাহাড়ধসজনিত বিপর্যয় ইতিপূর্বের সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। বৃহত্তর চট্টগ্রামের মধ্যে নিঃসন্দেহে রাঙ্গামাটিতে এ বছর প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। মর্মান্তিক মানবিক বিপর্যয়ের এই বিষয়টি সামনে রেখে বর্তমানে বেসরকারি টেলিভিশনে টক-শোসমূহে বক্তাদের বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বার্থান্বেষী মহলের অযাচিত মন্তব্য এবং বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টগুলোতে আপাত দৃষ্টিতে সাম্প্রতিক পাহাড়ধসের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী করা হচ্ছে। গত ১৬ জুন ২০১৭ প্রথম আলো পত্রিকায় ‘ছয় বছরে নিহতদের ৬৪ ভাগ বাঙালি’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, বন ও পাহাড় কেটে যত্রতত্র বাঙালি পুনর্বাসন করা হয়েছে। অধ্যাপক আখতার পার্বত্য অঞ্চলের এই বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে যথেষ্ট গবেষণা করে উপরোল্লেখিত মন্তব্য করেছেন কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি একেবারে সরলীকরন করে পক্ষপাতমূলকভাবে কোন একটি জনগোষ্ঠীর উপর দোষ চাপিয়ে দেয়া সম্পূর্ণ অবিবেচনাপ্রসূত।

সাম্প্রতিক বছরগুলোর কথা যদি বিবেচনায় আনা হয়, তাহলে দেখা যায়, ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামের ৭টি স্থানে পাহাড় ধসের কারণে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়, ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামের লালখান বাজার মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড় ধসে ৪টি পরিবারের ১২ জনের মৃত্যু হয়, ২০১১ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রামের টাইগারপাস এলাকার বাটালি হিলের ঢালে পাহাড় ও প্রতিরক্ষা দেওয়াল ধসে ১৭ জনের মৃত্যু হয়, ২০১২ সালের ২৬-২৭ জুন চট্টগ্রাম, বান্দরবান, কক্সবাজার ও সিলেটে ৯৪ জন মৃত্যুবরণ করে। এছাড়া ২০১৫ সালের ২৬-২৭ জুন টানা বর্ষণ, ধস আর পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারে ১৯ জনের মৃত্যুর বিষয়ও এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর পাহাড়ধসজনিত এই প্রাণহানির বিষয় বিশ্লেষণে অনুমান করা যায় যে, পাহাড় ধসের ভৌগোলিক বিপর্যয় শুধুমাত্র পার্বত্য জেলাগুলোতে নয়, পাহাড় পরিবেষ্টিত বৃহত্তর চট্টগ্রামের অধিকাংশ স্থানেই ঘটছে। বৃহত্তর চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় ভৌগোলিক দিক দিয়ে কিছুটা ভিন্ন। এখানে সমতল ভূমির পাশাপাশি উঁচু-নিচু, ছোট-বড় অনেক পাহাড় বা টিলা রয়েছে। বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো সাধারণত মাটি এবং বালু মিশ্রিত, এসকল পাহাড়ের মাটি এটেল মাটির মত আঠালো নয়। এ অঞ্চলের পাহাড়গুলো সাধারণত পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের পাহাড়গুলোর মতো পাথর পরিবেষ্টিত নয়। এই পাহাড়গুলোর মাটি কোন নির্দিষ্ট শক্ত অবলম্বনের অনুপস্থিতিতে ভারি বর্ষণের ফলে সহজে ধসে পড়ে। এখানে সহায়ক অবলম্বন বলতে ব্যাপক বনায়নই গ্রহণযোগ্য সমাধান। কিন্তু যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিকতার ছোঁয়া পার্বত্য চট্টগ্রামেও পড়েছে। অনেক বছর আগে সাধারণত পাহাড়ের গ্রাম অঞ্চলে ‘সনাতনী উপজাতী বন ও কৃষি সভ্যতার’ ঐতিহ্যবাহী লোকজ শিক্ষা থেকে Watershed Management ও পরিবেশ সংরক্ষণের কলাকৌশল অনুসরন করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তাদের ঘরবাড়ি তৈরী করত। এবিষয় অনস্বীকার্য যে এ ধরনের লোকজ জ্ঞানকেই ১৯৯২ সালে প্রথম বিশ্ব ধরিত্রী সম্মেলনে Traditional Scientific Knowledge হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। অনেক আগের সেই সময়গুলোতে এই সনাতনী ধারা অবলম্বন করেই পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীরা পাহাড়ের মাটি না কেটে খুঁটির ওপর ‘টং ঘর’ তৈরি করা হতো। এছাড়া তাদের ধর্মীয় একটি সংস্কারও ছিল সেই সময়গুলোতে। প্রয়াত বিশিষ্ট উপজাতী গবেষক ও লেখক অমরেন্দ্র লাল খীসার গবেষণা পত্র থেকে জানা যায়, অধিকাংশ গোত্রের উপজাতীরা ‘ধরিত্রীকে আঘাত করে মাটি কর্ষণ করাকে পাপ মনে করতো’। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপজাতীদের জীবনে আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষা, বাসস্থান ও পোষাক পরিচ্ছেদে আমূল পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকাতেও উপজাতী যুবক-যুবতীদের জিন্স, টি-শার্টেই স্বাচ্ছন্দবোধ করতে দেখা যায়। এখানে আরো একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে পার্বত্য এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। অনেক আগে দুর্গম পাহাড় এবং প্রত্যন্ত এলাকায় যখন কোন রাস্তা-ঘাট ছিল না, পাহাড়িরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ভালো মূল্য পেত না। সাম্প্রতিক কয়েক দশকের ক্রম উন্নয়নের অন্যতম হচ্ছে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় রাস্তাঘাট তৈরি। বর্তমান সময়ে প্রত্যন্ত এলাকায় পাহাড়িদের উৎপাদিত পণ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যপক উন্নয়নের ফলে শহর এলাকায় পরিবহন সহজেই সম্ভব হয়। পাহাড়িরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ভালো দাম পাচ্ছেন এবং নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনেও ক্রমান্বয়ে আধুনিকতার সাথে মানিয়ে নিতে আগ্রহবোধ করেন। তার অর্থ হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন অর্থাৎ পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করা ছিল সময়ের দাবী।

প্রশ্ন হচ্ছে, যারা এই রাস্তাগুলো তৈরি করেছেন তারা কি যথেষ্ঠ নিরাপদভাবে রাস্তা তৈরি করতে পেরেছেন কি না? এর উত্তর হ্যাঁও হতে পারে আবার নাও হতে পারে। যেকোন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের সাথে আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নির্ভরশীল। বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাগুলো তৈরি করতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিবেচনায় পাহাড়ের পাদদেশসমূহ কেটে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। সাধারণ জ্ঞানে পাহাড়ি এলাকায় রাস্তার দীর্ঘস্থায়ীত্ব নিশ্চিত করতে পানি সঞ্চালনের সু-ব্যবস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়। যতটুকু জানা যায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরির ক্ষেত্রে পানি সঞ্চালনের জন্য উপযুক্ত কার্যকর ড্রেন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য নিরাপত্তার বিষয়টি ভালভাবে নিশ্চিত করেছেন। এছাড়াও সময়ে সময়ে প্রতিনিয়ত রাস্তাগুলোর রক্ষণাবেক্ষনের ব্যবস্থা তারা ভালোভাবেই করছেন। তাই, পাহাড় ধসের মূল কারণ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় আধুনিকতার অন্যতম নিয়ামক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, আধুনিক বাসস্থান তৈরি, পর্যটনের উন্নয়ন ইত্যাদি একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়। চট্টগ্রাম মহানগরীতে ২০০৭ সালের ভূমিধসের পর গঠিত তদন্ত কমিটি পাহাড় ধসের কারণ হিসেবে যে সমস্ত সমস্যা চিহ্নিত করেছিল তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভারি বর্ষণ, পাহাড়ের মাটিতে বালির ভাগ বেশি থাকা, উপরিভাগে গাছ না থাকা, গাছ কেটে ভারসাম্য নষ্ট করা, পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস, পাহাড় থেকে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না রাখা, বনায়নের পদক্ষেপের অভাব, বর্ষণে পাহাড় থেকে নেমে আসা বালি এবং মাটি অপসারনের দুর্বলতা ইত্যাদি। এখানে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে, অতি বৃষ্টিপাতও বালি/মাটি মিশ্রিত পাহাড়ধসের অন্যতম ‘কারণ’ হিসাবে চিহ্নিত। নাসার তথ্যমতে, গত ১২-১৪ জুন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ৫১০ মিলি অর্থাৎ ২০ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হয়েছে (ডেইলি স্টার, ১৭ জুন ২০১৭)। শুধুমাত্র ১৩ জুন সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত, একদিনে রাঙ্গামাটিতে ৫২৪ মিলি বৃষ্টিপাত হয় (ইন্ডিপেন্ডেন্ট, ১৪ জুন ২০১৭)। পূর্ববর্তী বছরগুলোতে দৃষ্টিপাত পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, রাঙ্গামাটির জুন মাসের গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হলো, ৪৫৩.১ মিলি (২০১৬), ৩৯৭.৩ মিলি (২০১৫), ৩৩৬.৭ মিলি (২০১৪), ৩১৬.৯ মিলি (২০১৩), ৩৩৫.৪ মিলি (২০১২)। অর্থাৎ পাহাড়ধস জনিত মানবিক বিপর্যয়ের ওই দিনগুলোতে একদিনের গড় বৃষ্টিপাত অন্যান্য বছরের জুন মাসের গড় বৃষ্টিপাতের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ বৃহত্তর চট্টগ্রামের পূর্বের অভিজ্ঞতার বিবেচনায় বর্তমান বছরের পাহাড়ধসের কারণ হিসাবে শুধুমাত্র একটি জাতিগোষ্ঠী, অর্থাৎ বাঙালিদের দায়ী করা নিতান্তই অবিবেচনা প্রসূত, অপরিপক্ক চিন্তা-ভাবনা বলে প্রতীয়মান হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে গত শতকের ৭০ এবং ৮০ দশকে তৎকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যে সকল বাঙালিকে পুনর্বাসন করা হয়েছিল, তাদের পরিবার প্রতি পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন খাস জমি থেকে সমতল ভূমি হলে ২.৫ একর আবার পাহাড় এবং সমতল মিশ্র ভূমি হলে ৪ একর ও সম্পূর্ণ পাহাড়ি ভূমি হলে ৫ একর করে জমির বন্দোবস্তি দেওয়া হয়েছিল। এ প্রসংগে উল্লেখ করা যেতে পারে, খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি এলাকার ৩টি মৌজায় ১৮,৮৬৪ একর, বাবুছড়া এলাকার ৬টি মৌজায় ১৭,৬৭৩ একর, বড় মেরুং এলাকার ২টি মৌজায় ১১,৮৯৩ একর, ছোট মেরুং এলাকার ১টি মৌজায় ১০,৪৮১ একর, খাগড়াছড়ি সদর এলাকার গোলাবাড়ী মৌজায় ১৯,৬১৬ একর, মহালছড়ি এলাকার ৭টি মৌজায় ২৬,৬২৫ একর, রামগড় এলাকার ২টি মৌজায় ২৬,৬৭৪ একর, আলুটিলা এলাকার ৯টি মৌজায় ২৯,৩৪৭ একর, মানিকছড়ি এলাকার ৭টি মৌজায় ২২,৫৪৪ একর, লক্ষীছড়ির ৫টি মৌজায় ১৩,১৬৫ একর, কাপ্তাই এলাকার ২টি মৌজায় ১৭,৮৭৯ একর, রাঙ্গামাটি সদর এলাকার ৪টি মৌজায় ৭,২১৬ একর, বুড়িঘাট এলাকার ৬টি মৌজায় ১০,৫৯৪ একর, জুরাছড়ি এলাকার ৪টি মৌজায় ৯,৩০০ একর, ভূষণছড়া এলাকার ৬টি মৌজায় ২৬,৭১৭ একর, সুভলং এলাকার ২টি মৌজায় ১০,৯০৫ একর, লংগদু এলাকার ২টি মৌজায় ৮,৬৯৭ একর, কাচালং এলাকার ১টি মৌজায় ১৪,০০০ একর এবং আটারকছাড়া এলাকার ১টি মৌজায় ২,৬৩৩ একর জমি বাঙালিদের বন্দোবস্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন সময়ে শান্তিবাহিনীর আক্রমণ এবং নিরাপত্তা জনিত কারণে অধিকাংশ বাঙালি পরিবারকে সরকার তাদের বন্দবস্তিকৃত জমিগুলোতে স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ পায়নি। ১৯৮৬ সাল পরবর্তী সময়ে তাদের নিরাপত্তা বিবেচনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার গুচ্ছগ্রামে স্থানান্তর করা হয়। তবে সরকারি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অনেক বাঙালি অবৈধভাবে রাস্তা সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশে ঘরবাড়ি তৈরি করে থাকছে। একই সাথে উপজাতীয়দের অনেকেও বাঙালিদের মতো পাহাড়ের পাদদেশে ঘরবাড়ি তৈরি করে বসবাস করছে। এ ক্ষেত্রে, উভয় সম্প্রদায়ই সনাতন উপজাতীয়দের বহুল প্রচলিত লোকজ প্রথা অর্থাৎ Watershed Management অনুসরণ করে, অর্থাৎ পাহাড়ের মাটি না কেটে খুটির উপর ‘টং ঘর’ জাতীয় ঘরে বসবাস করছে না। বাঙালি/পাহাড়ি উভয় সম্প্রদায় পাহাড় কেটে অনিরাপদভাবে তাদের বসতবাড়ি নির্মাণ করে অবস্থান করছে। প্রথম আলোর ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় পাথুরে না হলেও, গাছের আচ্ছাদন এ পাহাড়কে ধস থেকে রক্ষা করে, কিন্তু পাহাড় দিন দিন ন্যাড়া হয়েছে’। প্রকৃতপক্ষে, এই পাহাড় ন্যাড়া হওয়ার পিছনে উপজাতীয়দের বহুল প্রচলিত জুম চাষই দায়ী। জুম চাষের জন্য একটি পাহাড়কে উপযোগী করার জন্য পাহাড়ের সমস্ত গাছ পুড়িয়ে ফেলা হয়। তারপর ওই জমিতে ক্রমান্বয়ে জুম চাষ করা হয়। পূর্বে পার্বত্য এলাকায় যখন জনসংখ্যা কম ছিল, পাহাড়িরা এক বছরে একটি পাহাড় পুড়িয়ে জুম চাষ করার পর পরের বছরে অন্য একটি পাহড়ে জুম চাষ করতো। এভাবে প্রতি বছর পাহাড় পরিবর্তন করে প্রথম পাহাড়ে ফিরে আসতে তাদের ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগতো। তাই একটি পাহাড় জুম চাষের ফলে প্রথম বছর ভূমি ধসের ‘কারণ’ তৈরি করলেও ১৫ থেকে ২০ বছর পর ঐ জমিতে ফিরে আসার কারণে মধ্যবর্তী বছরগুলোতে নতুন করে প্রাকৃতিকভাবেই বনাঞ্চল তৈরি হয়ে যেত। কিন্তু বর্তমানে উপজাতীয়দের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবার কারণে ২ থেকে ৩ বছর পর পর একই পাহাড়ে পুনরায় জুম চাষ করার ফলে সেখানে প্রাকৃতিকভাবে নতুন বনাঞ্চল তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকছে না। তাই একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম এর পাহাড় ধসের পিছনে জুম চাষ প্রথা অন্যতমভাবে দায়ী।

এখানে উল্লেখ্য, জুম চাষ শুধুমাত্র উপজাতীয়রাই জনগোষ্ঠীরা করে থাকে, বাঙালিরা জুম চাষে অভ্যস্ত নয়। গত ১১-১৩ জুন রাঙ্গামাটির বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত পাহাড়ধসের বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পাহাড়ের পাদদেশে অবৈধভাবে বাঙালি ও পাহাড়িদের অনিরাপদভাবে তৈরিকৃত বাসস্থান এলাকায় পাহাড়ধসের পাশাপাশি, জনবসতিহীন অনেক পাহাড়েও ব্যাপক ভূমিধস হয়েছে। তাই এ বিষয় নিশ্চিত করে বলা যায়, পাহাড়ের পাদদেশে অবৈধভাবে বাঙালি বা পাহাড়িদের বসতি স্থাপনই ভূমিধসের অন্যতম কারণ নয়, যদি তাই হতো তাহলে যে সকল পাহাড়ে বসতি স্থাপিত হয়নি, সেই পাহাড়গুলোতে ভূমি ধস হতো না।

উপর্যুক্ত আলোচনায় এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং টক-শোগুলোতে লেখক এবং বক্তাগণ প্রকৃত গবেষণাপ্রসূত বক্তব্য উপস্থাপন না করে অবিবেচনা প্রসূত ও অপরিপক্ক বক্তব্য দিচ্ছেন। এতে করে পাহাড়ধসের প্রকৃত কারণ অপ্রকাশিত থেকে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পাহাড়ধসের কারণ হিসেবে ‘শুধুমাত্র পাহাড়ি’ অথবা ‘শুধুমাত্র বাঙালিরা’ দায়ী একথা ঢালাওভাবে বলা যাবে না। সময়ের প্রয়োজনে যুগের সাথে সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে পরিবর্তন আসা খুবই স্বাভাবিক। আধুনিকতার এ পরিবর্তন ছিল সময়ের দাবি, যা বাঙালি বা পাহাড়ি কারো পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

২০০৭ সালে চট্টগ্রাম মহানগরীতে ভূমিধসের পর গঠিত তদন্ত কমিটি কর্তৃক পাহাড়ের ৫ কি. মি. এর মধ্যে আবাসিক প্রকল্প গড়ে না তোলা, পাহাড়ে জরুরি ভিত্তিতে বনায়ন, ঢালু পাহাড়ে গাইড ওয়াল নির্মাণ, পানি নিষ্কাশনের ড্রেন ও মজবুত সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, পাহাড়ের পানি ও বালি অপসারনের ব্যবস্থা করা, যত্রতত্র পাহাড়ি বালি উত্তোলন নিষিদ্ধ করা, পাহাড়ি এলাকার ১০ কি. মি. এর মধ্যে ইটের ভাটা নিষিদ্ধ করা, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসতি স্থাপন নিষিদ্ধ করা, পাহাড় কাটার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। যতটুকু জানা গেছে, এবারও পাহাড়ধসের সমস্যা চিহ্নিত ও করণীয় নির্ধারনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সত্যব্রত সাহা’কে প্রধান করে ২১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি নিশ্চয়ই পাহাড়ধসের সঠিক কারণ চিহ্নিত করতে এবং পরবর্তী কর্মপন্থা সম্পর্কে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের মতামতের আলোকে সুপারিশ করবেন। এর মধ্যে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে মনগড়া বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা করা সমীচীন নয়। বর্তমানে পাহাড়ধসে পাহাড়ি বাঙালি উভয় সম্প্রদায় তীব্র মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে আছেন। সরকার প্রাকৃতিক এই বিপর্যয় থেকে উত্তোরণে এবং ক্ষতিগ্রস্থ মানুষগুলোকে স্বাভাবিক জীবন ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছেন। আমাদের সকলেরই উচিত সংঘটিত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতিকে ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করে নিজস্ব স্বার্থান্বেষী আচরণ পরিহার করা। এই দেশ আমাদের সকলের। পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠী এই স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের গর্বিত নাগরিক। পার্বত্য এলাকায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের এই সন্ধিক্ষণে ব্যক্তিগত পছন্দ ও মতামতকে ঊর্ধ্বে রেখে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ একসাথে কাজ করবে, এটাই কাম্য।

লেখক : পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক    




পাহাড়ে আর্মি পাহাড়ীদের চক্ষুশুল কেন?

মেজর জেনারেল আ. ল. ম. ফজলুর রহমান

সেই ১৯৭৫ সাল থেকে আর্মি পার্বত্য চট্টগ্রামে অভিযানে নিয়োজিত । ১৯৭৭ সালে প্রথম শান্তিবাহিনী বাংলাদেশ আর্মি কনভয়ের উপরে আক্রমণ চালায়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ( এম এন লারমা ) নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতি ( পিসিজেএসএস ) গঠিত হয়। ১৯৭২ সালেই এম এন লারমা পিসিজেএস এর সশস্ত্র শাখা হিসাবে ষ্টাফ ব্যাটলারস ( এস বি ) গঠন করেন যা পরে শান্তিবাহিনী নাম পায়।

সাধারণ্যে প্রচলিত ধারণা, বংগবন্ধু পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ীদের বাঙালী হতে বলেন এবং পাহাড়ীদের স্বায়ত্ব শাসনের দাবী না মানার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম আজও অশান্ত হয়ে আছে। আমি এই ধারণার সাথে একমত নই।

বঙ্গবন্ধু পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ীদের বাঙালী হতে বললেন আর পাহাড়ীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে যুদ্ধ শুরু করে দিলো- এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। রাঙামাটির বর্তমান রাজা ব্যারিস্টার দেবাষিশ রায়ের পিতা রাজা ত্রিদিব রায় ’৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে পাকিস্তানীদের সহায়তা প্রদান করেন। তখন থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ বিরোধী একটি গোষ্ঠি সক্রিয় থেকে যায়। যার পুর্ণ সুযোগ প্রতিবেশী দেশ গ্রহণ করে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে দুর্বল করে সুবিধা আদায়ের সব পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এরই ফলশ্রুতিতে গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ( পিসিজেএসএস ) এবং শান্তিবাহিনী।

প্রশ্ন হলো, প্রতিবেশী দেশ এম এন লারমা এবং তার ভাই সন্তু লারমাকে দিয়ে পিসিজেএসএস এবং শান্তিবাহিনী গঠনে সর্বপ্রকার সহায়তা কেন দিয়েছিলো? এর জবাব পেতে হলে একটু পিছনে ফিরে যেতে হবে।

১৯৪৭ এ স্বাধীনতা লাভের পরে ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। কাশ্মীর নিয়ে উভয় দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৫ তে ভারত-পাকিস্তান আর একদফা যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ভারত-পাকিস্তান একে অপরের ক্ষতি করতে উঠে পড়ে লাগে।

তারই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান ভারতের সাত বোন খ্যাত রাজ্যসমুহের অশান্ত গেরিলা যোদ্ধাদের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের গহীন জংগলে সামরিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প খুলে তাদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করে এবং অন্যান্য সহায়তাও অব্যাহত রাখে। ফলে মিজোরামের গেরিলা নেতা লালডেঙ্গা এবং নাগাল্যান্ডের ড. ফিজো অপ্রতিরোধ্য হয় ওঠে ফলে প্রতিবেশী দেশের পক্ষে সাত রাজ্যের গেরিলাদের দমন করা অসম্ভব হয় পড়ে।

বাংলাদেশ স্বাধীনের পরে প্রতিবেশী দেশের জন্য সাত রাজ্যের গেরিলা যোদ্ধাদের পরাজিত করার একটা চমৎকার সুযোগের সৃষ্টি হয়। প্রতিবেশী দেশ রাজা ত্রিদিব রায়ের সংক্ষুব্ধ অনুসারীদের দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তোলে তিনটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেঃ

১। পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত করে প্রতিবেশী দেশের গেরিলা যোদ্ধাদের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিপদসঙ্কুল করে তোলা।

২। প্রতিবেশী দেশ পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনীর সৃষ্টি করে তাদের এক্সটেন্ডেড সিকিউরিটি হ্যান্ড হিসাবে যাতে শান্তিবাহিনীর সাহায্যে প্রতিবেশী দেশের সাত রাজ্যের গেরিলাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় এবং জংগল থেকে তাদের ঝেটিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। এতে প্রতিবেশী দেশ কৃতকার্য হয় এবং সাত রাজ্যের গেরিলাদের দমনে সক্ষম হয়।

এর ফলশ্রুতিতে লালডেঙ্গা এবং নাগাল্যান্ডের ড. ফিজো প্রতিবেশী দেশের সাথে শান্তি স্হাপনে বাধ্য হয়। আজও প্রতিবেশী দেশের সাত রাজ্যে গেরিলা যুদ্ধ পুনরায় মাথাচাড়া দিতে সক্ষম হয় নাই। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে পিসিজেএসএস এবং শান্তিবাহিনীর প্রতিবেশী দেশবান্ধব তৎপরতা।

৩। পার্বত্য চট্টগ্রামে পিসিজেএসএস এবং শান্তিবাহিনী সৃষ্টি করে বাংলাদেশের বুক চিরে রক্তক্ষরণ নিশ্চিত করা যাতে বাংলাদেশে অশান্তির আগুন প্রজ্বলিত রেখে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে রাখা সম্ভব হয় । কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। পার্বত্য চট্টগ্রামের লাইফ ব্যাটেল গ্রাউন্ডে প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতায় সিক্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু যে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছে তানয় জাতিসংঘের হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত এখন বাংলাদেশের গর্ব বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

প্রশ্ন হতে পারে পার্বত্য চট্টগ্রামে কি শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়েছে? পিসিজেএসএস সরকারের সাথে শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ হতে বাধ্য হয়েছে এর কৃতিত্ব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর। আমার দৃঢ় ধারণা শান্তিবাহিনীর একটি অংশ ইউপিডিএফ নামে পিসিজেএসএস এর সাথে সমঝোতার মাধ্যমে পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায় ইউপিডিএফ এর এখন বড় কাজ হচ্ছে পাহাড়ে চাঁদা আদায় করা এবং প্রতিবেশী দেশের প্ররোচনায় পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির চেষ্টা করা। এরও অবসান কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমি বলবো পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সরকারের বিজয় অর্জিত হয়েছে যার মুল কুশীলব বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এই বিজয় প্রতিবেশী কোনো দেশের পক্ষে তাদের দেশের গেরিলা যুদ্ধের উপরে অর্জন করা সম্ভব হয়নি যা বাংলাদেশ করেছে।

১৯৭৮- ৮০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংগালীদের পুনর্বাসন হয়। এটা নতুন কোনো বিষয় নয়। গেরিলা যুদ্ধ সংকুল সব স্হানে সব দেশ স্ব-স্বদেশের নাগরিকদের পুনর্বাসন করেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংগালীদের পুনর্বাসনের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। বাংগালীদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পাহাড়ীদের মাঝে নবউন্নয়নের ধারণার সূচনা হয়েছে।

এখন না হলেও ভবিষ্যতে পাহাড়ী বাংগালী মিলে পুর্ণ শান্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে একে অপরের সম্পূরক হিসাবে নিজেদের নিয়োজিত করবে। একটা জাতির উত্তরণ ঘটাতে হলে অভিজ্ঞতার অন্ত আদান প্রদানের কোনো বিকল্প নাই।

পাহাড়ে বাংগালীরা পাহাড়ীদের জন্য সেই কাজটাই করছে। আজ পাহাড়ীদের অনেকে জুম চাষ বাদ দিয়ে অন্য জীবিকার চিন্তা করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক স্হান এখন পর্যটন এবং হর্টিকালচারের হাব হিসাবে গড়ে উঠছে। আমি নিজে আশির দশকে তিনবার পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি পদাতিক ব্যটালিয়নের অধিনায়কের দায়িত্ব পালনের সময় দেখেছি কিভাবে পাহাড়ের পর পাহাড় ধ্বংস হয়েছে জ্যুম চাষের ফলে।

একটি পাহাড়ে পর পর কয়েকবার জুম চাষ করলে তা বন্ধা বা রাইন্যা হয়ে যায়। ঐ পাহাড়ে কোনো প্রকার গাছপালা জন্মে না। সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এভাবেই পার্বত্য চট্টগ্রামের জীববৈচিত্র ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছে।

আশির দশকে যখন পার্বত্য চট্টগ্রামে সবখানে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প ছিলো তখন পাহাড়ের প্রাকৃতিক সম্পদের উপরে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছিলো। পাহাড়ী বাংগালী নির্বিশেষে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত ছিলো। ’৯৭ তে শান্তি চুক্তির পরে অস্হায়ী সেনা ক্যাম্প উঠে যাবার পরে উজাড় হচ্ছে যেমন পাহাড়ী বন তেমনি পাহাড়ময় ছড়িয়ে পড়ছে সন্ত্রাস। এখন কারো নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। এটাই পাহাড়ে সন্ত্রাস যারা চায় তাদের মুল লক্ষ্য।

পাহাড়ী এবং কিছু বাংগালী বুদ্ধিজীবী তারস্বরে চিৎকার করে সেনা শাসনের অবসানের কথা বলে। তারা চায় বাংগালীরা পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সমতলে চলে আসুক। কিন্তু তারা নিজেরা জানে না, সেনা শাসন বলতে কি বুঝায়? পার্বত্য চট্টগ্রামে সিভিল প্রশাসন আছে তারা তা পরিচালিত করে। পাহাড়ে সেনাবাহিনীর কাজ হলোঃ

১। সন্ত্রাস দমন করা।

২। পাহাড়ী-বাংগালী নির্বিশেষে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

৩। শান্তকরণ ( পেসিফিকেশন ) কার্যক্রম পরিচালিত করা।

এখানে সেনা শাসনের প্রশ্ন কি করে আসে? পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, স্থিতিশীলতা, প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র রক্ষা করতে হলে প্রত্যেকটি অস্হায়ী সেনা ক্যাম্প পুনর্জীবিত করে সত্ত্বর সেখানে সেনাবাহিনী প্রেরণের ব্যবস্থা অনতিবিলম্বে সরকারকে গ্রহণ করার জন্য আমরা অনুরোধ করছি। যদি তা করা না হয় তবে পরিস্থিতির চরম অবনতি হলে পাহাড়ে নতুন করে সন্ত্রাসের উম্মেষ ঘটার সম্ভাবনা প্রকট হবে যা যা পাহাড়ী, বাংগালী কারুর জন্য কাম্য হবে না।

লেখক: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ রাইফেলস ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা।




রাষ্ট্র, নাগরিক ও ‘সেটলার’

কাকন রেজা :

অনেকের অনেক লেখাতেই দেখি ‘সেটেলার’ শব্দটি। বিশেষ করে দেশের পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী বাংলাভাষীদের বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। অনেকে ‘সেটেলার’ এর পরিভাষা হিসাবে বোঝান ‘শরণার্থী’ শব্দটিকে, অর্থাৎ অন্য দেশ বা স্থান হতে আসা ‘আশ্রয়প্রার্থী’। ‘শরণার্থী’ বা ‘আশ্রয়প্রার্থী’ দুটিরই ইংরেজি `Refugee’, যার আরেকটি বাংলা প্রতিশব্দ ‘উদ্বাস্তু’। কিন্তু মজার বিষয় অভিধান খুঁজলে কিন্তু আলোচিত ‘সেটেলার’ শব্দটির দেখা মেলে না। যে শব্দটির দেখা মেলে সেটি হলো ‘সেটলার’। শব্দটি ভাঙলে দেখায় অনেকটা “সেট্ল(র)” এরূপ আর কী। যার অর্থ হলো, ‘ঔপনিবেশিক’। ব্যাখ্যা হলো, ‘নতুন উন্নয়নশীল দেশে বাস করতে আসা বিদেশী বসতকার’। ইংরেজিতে ‘সেটলার’ বিষয়টি বোঝানোর জন্য `The settlers had come to America to look for land’ এই বাক্যটিই সাধারণত ব্যবহার করা হয়। ক্যামব্রিজ অভিধান ‘সেটলার’ শব্দটিকে সুনির্দিষ্টি করতে বলেছে, ‘a person who arrivesespecially from another country’। আমাদের দেশে  ‘সেটলার’ কে ‘সেটেলার’ বানাতে গিয়ে শব্দটির মতো পুরো বিষয়টিতেই বিভ্রান্তি ঘটানো হয়েছে।

বিষদ বলার আগে রাষ্ট্র বিষয়ে বলি। সোজা ভাষায়, ‘একটি সুনির্দিষ্ট ভূখন্ডকে ঘিরে, রাষ্ট্রিক পরিচয়ে পরিচিত মানবগোষ্ঠীর স্বাধীন সত্ত্বাই হলো রাষ্ট্র’। যা আমরা ১৯৭১-এ একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করেছিলাম। এই মানবগোষ্ঠীর বিপরীতে ‘সেটলার’ শব্দটি কী যায়? যদি যায় তাহলে রাষ্ট্র মানে কী? এ পর্যায়ে নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব সাথে নাগরিক অধিকারের কথায় আসি এবং যথারীতি সহজ ভাষায়। যে অধিকার প্রশ্নে মাঝেমধ্যেই অনেকের ঘুম হারাম হয়ে যায় তারমধ্যে প্রধানতম হলো খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান। একজন নাগরিকের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের সংস্থান করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। আমাদের স্বাধীন সীমানার যে কোন স্থানে যে কোন নাগরিককে পুনর্বাসন করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের। একজন ভূমিহীন নাগরিকের বাসস্থান এবং খাদ্যের যোগানদানের অধিকার রাষ্ট্র সংরক্ষণ করে, যেহেতু এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এর বিরোধিতা করা নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের কমিটমেন্টের বিরোধিতা করা। মানবাধিকারের প্রশ্নে যা সবচেয়ে বড় মানবাধিকার বিরোধী কাজ।

সবাই মিলে যদি আমরা দেশটা স্বাধীন করে থাকি, তাহলে পুরো দেশটাই আমাদের। এখানে সম্প্রদায়, গোত্র বা ধর্মের প্রশ্নে আলাদা করে কিছু থাকার কথা নয়। থাকার কথা নয় সংখ্যাধিক্যেও। সুতরাং কোন যুক্তিতেই দেশের কোন অঞ্চল বা জায়গা সম্প্রদায়, ধর্ম বা অন্যকোন ভিত্তিতেই আলাদা করে বন্টনের প্রশ্ন উঠতে পারে না। দেশের একটি অঞ্চলকে কারো জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়ার প্রচেষ্টা মানেই দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে দ্বৈততার সৃষ্টি করা, বিরোধ সৃষ্টি করা। এমন হলে আঞ্চলিকতার ভিত্তিতে, সম্প্রদায়গত কারণে সারাদেশ বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে পড়বে। উদাহরণ হিসাবে সিলেটের কথাই বলি। সিলেটের ভাষাকে অনেকেই বাংলার চেয়ে আলাদা বলেন। সিলেটের আলাদা বর্ণমালার কথাও ওঠে। তাহলে কী সিলেটকে শুধু সিলেটের মানুষের জন্য আলাদা করা দেয়ার কথা তুলতে হবে? বলতে হবে এখানে অন্যরা ‘সেটলার’, ‘ঔপনিবেশিক’? এমন কথা তোলা কী অন্যায়, রাষ্ট্র পরিপন্থী সর্বোপরি ৭১’এর অর্জন বিরোধী নয়?

অনেকেই পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে মেতেছেন। দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী বাংলাভাষীদের ‘সেটেলার’ তথা ‘সেটলার’ বলে আখ্যায়িত করছেন তারা। খুব ‘সহজিয়া’ প্রশ্ন করা যায়, তবে কী বাংলাভাষীরা ‘ঔপনিবেশিক’? তারা কী?

‘a person who arrivesespecially from another country’? তাদের ক্ষেত্রে কী `The Bangladeshi settlers had come to Hill to look for land’ এই উদাহরণ ব্যবহার করা হবে? এর কী জবাব আমি জানি না। তবে একটা বিষয় জানি, আবেগ দিয়ে কোন কিছু ব্যাখ্যার আগে বাস্তবতাটা চিন্তা করে নেয়া দরকার। চিন্তা করা দরকার যে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা এই স্বাধীন ভূখন্ড অর্জন করেছিলাম, তা সম্প্রদায়, গোত্র, ভাষা, ধর্ম বা অন্যকোনে পরিচয়ে বিভক্ত করা জন্য নয়। এই দেশ অর্জিত হয়েছিল পুরো ভূখন্ডটিই নিজের ‘মাটি’ ভাবার জন্য, ‘মা’ ভাবার জন্য; খালা বা মাসি ভাবার জন্য নয়।

অন্যের জমি যদি কেড়ে নেয়া হয় তাহলে অন্যায়, কিন্তু একজন ভূমিহীনকে রাষ্ট্র যদি তার জায়গা বসবাসের জন্য দেয় তা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাও কী উচিত? সেক্ষেত্রে ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়গত পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ‍তোলা তো আরো বেশী অনুচিতের মধ্যে পড়ে। অসাম্প্রদায়িকতার কথা যারা বলেন, তারা বলুন তো এরচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িকতা আর কী আছে? এটা রাষ্ট্রের কোন দয়ার দান নয়, একজন নাগরিকের প্রতি দেয়া রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি। একজন নাগরিক যিনি ভূমিহীন, তিনি সেই রাষ্ট্রেরই অংশ। জানি এর বিপরীতে অনেক কথা আসবে। আসবে রাষ্ট্র ও ‘সেটলার’ কর্তৃক নিপীড়নের কথা। আসবে ‘বাহিনী’ বিষয়ক কথকতা। এর বিপরীতেও যুক্তি আছে যা খন্ডন করা খুব আয়াসসাধ্য নয়। তবে যুক্তি যখন মার খায় তখন কৌশলীরা আবেগের আশ্রয় নেন, মানুষের সহানুভূতির জায়গায় খোঁচা দেন। যুক্তি ও বাস্তবতার বিপরীতে আবেগ একটি অপকৌশল, এটা যারা নেন তারাও বোঝেন।

সম্প্রতি রোমেল বা রমেল চাকমা নামে একজন পাহাড়ের অধিবাসী যুবকের প্রশ্নবোধক মৃত্যু নিয়ে কথা হচ্ছে। বিনা বিচারে একজন মানুষের মৃত্যু বিনা প্রশ্নে মেনে নেয় যারা তাদের মধ্যে ন্যায়বোধ সঠিক ভাবে বিকশিত হয়নি। কিন্তু এখানেও কথা আছে, এক যাত্রায় দুই ফল বিষয়ে। আমি যখন একটি বিচারবিহীন মৃত্যু নিয়ে সোচ্চার হবো, আরেকটির বিষয়ে চোখ বুঝে থাকবো তখন বুঝতে হবে আমার এই চাওয়ার মধ্যে ‘ইনটেনশন’ আছে। যে কোন বিচার বহির্ভূত মৃত্যুই সমর্থনযোগ্য নয়।

সুতরাং ‘ন্যায়বোধে’র বিষয়টি প্রমাণ করতে হলে সব বিচার বহির্ভূত মৃত্যুর ব্যাপারেই বলতে হবে, সেটি যদি শত্রুপক্ষেরও হয়। এটাই ‘ন্যায়বোধ’। আর মানুষের সাধারণ ‘ন্যায়বোধ’ থেকেই কিন্তু সৃষ্টি আইনের। জানি, এরপরেও এ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, ব্যাখ্যা আসবে, আসবে ‘কী’ ও ‘কেনো’ সহযোগে প্রশ্নমালা। তবে এসব ‘কী’ ও ‘কেনো’র উত্তর খুঁজতে হলে যেতে হবে ইতিহাসের পথে অনেকদূর। ইতিহাস আর যুক্তির পথে অত দূরভ্রমন সবার জন্য আনন্দময় নাও হতে পারে।

ফুটনোট : আমি সাধারণত খুব সহজভাবে সব কিছু বলতে পছন্দ করি। কারণ অহেতুক তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে যারা যান তাদের সেই পথেও হেটে দেখেছি, মঞ্জিল কিন্তু একটাই। তাই সহজ করে বলাটাই সবচেয়ে ভালো। পান করাই যখন লক্ষ্য কী দরকার পানি ঘোলা করে। তাতে শুধু পানির বিশুদ্ধতাই নষ্ট হবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট