২০ এপ্রিল বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফের মৃত্যু দিবস



নিজস্ব প্রতিনিধি:

২০ এপ্রিল বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফের মৃত্যু দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচরে বাংলার এই বীর সন্তান দেশমাতৃকার স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে জীবন দিয়েছিলেন। তবে নিজের জীবন দেয়ার আগে মেশিন গান দিয়ে বিরামহীন গুলি চালিয়ে ২টি লঞ্চ ও ১টি স্পিড বোট ডুবিয়ে দিয়ে খতম করেছিলেন এক প্লাটুন পাকিস্তানি হানাদার সৈন্য। তাঁর আত্মত্যাগের কারণে মুক্তিযোদ্ধার বেঁচে যায় ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির হাত থেকে। জাতি তাঁর আত্মত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব দিয়ে সম্মানিত করেছে।

পাকিস্তানী বাহিনী ১৯৭১ সালের ২০ এপ্রিল বুড়িঘাট-নানিয়ারচর হয়ে মুক্তিবাহিনীর মূল প্রতিরক্ষা কেন্দ্র মহালছড়ির দিকে অগ্রসর হবার চেষ্টা চালায়। এ সময় ৮ম ইস্ট বেঙ্গলের একটা অংশ এবং তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের কতিপয় সদস্য পার্বত্য চট্টগ্রামে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ছিল। ঐদিন ল্যান্স নায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ বুড়িঘাট অঞ্চলের চিংড়ি খালের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত কোম্পানির মেশিন গানার হিসেবে রাঙামাটি-মহালছড়ি নৌপথে পাহারারত ছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনীর ২য় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের সদস্যরা সেদিন মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা এলাকায় ঢুকে পড়ে। মুক্তিবাহিনীকে দেখা মাত্র শত্রু সৈন্যরা ৩ ইঞ্চি মর্টার ও অন্যান্য অস্ত্র দিয়ে গোলাবর্ষণ শুরু করলে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা বিক্ষিপ্ত হয়ে যান।

একমাত্র মুন্সি আব্দুর রউফ তাঁর নিজের অবস্থান থেকে মেশিনগান দিয়ে শত্রুর উপর গোলা বর্ষণ অব্যাহত রাখেন- ফলে শত্রুর ২টি লঞ্চ ও ১টি স্পিড বোট পানিতে ডুবে যায় এবং এক প্লাটুন শত্রু সৈন্য সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। অক্ষত নৌযানগুলোতে অবশিষ্ট শত্রু সৈন্যরা পশ্চাদপসরণ করে। শত্রুর প্রবল গোলাবর্ষণের মুখেও মুন্সি আব্দুর রউফ তাঁর মেশিনগান দিয়ে নিজের অবস্থানে স্থির ছিলেন।

কিন্তু হঠাৎ করেই বিপক্ষের মর্টারের গোলা তাঁর অবস্থানে আঘাত করলে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তার অসীম বীরত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ফলে পাকিস্তানি বাহিনী মহালছড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের মূল প্রতিরক্ষার দিকে অগ্রসর হতে পারেনি। এ কাণেই বেঁচে যায় মুন্সি আব্দুর রউফের সহযোদ্ধারা। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানকে শ্রদ্ধা জানাতে স্বাধীনতার পর তাকে প্রদান করা হয় বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব এবং ১৯৯৭ সালে নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাটে তাঁর সমাধির উপর স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়।

পাকিস্তানী বাহিনী পার্বত্য জেলা সদর রাঙামাটি, মহকুমা সদর রামগড় এবং বান্দরবান দখল করার পর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে ঘাঁটি স্থাপন করে এবং ঘাঁটিসমূহ সুদৃঢ় করে নেয়। তারা বিভিন্ন এলাকায় শাখা কমিটি গঠন করে তাদের মাধ্যমে পার্বত্য এলাকায় রাজাকার বাহিনী ও হিলরাজ বাহিনী গঠন করে এবং বিভিন্ন এলাকায় হানা দিয়ে বর্বর অত্যাচার চালায় ও ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেয়। রামগড়, গুইমারা, মানিকছড়িসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে পাহাড়ী রমণীদের জোরপূর্বক ধরে নিয়ে অমানুষিকভাবে ধর্ষণ করে এবং ক্যাম্পে উলঙ্গ অবস্থায় বন্দী করে রাখে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতের হাফলং-এ অবস্থিত বিএসএফ ট্রেনিং সেন্টার হতে ট্রেনিং প্রাপ্তদের একটি দল মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ কমান্ডার নাজিম উদ্দিনের নেতৃত্বে ৯ ডিসেম্বর কাউখালী উপজেলার অর্ন্তগত বেতবুনিয়া ও বালুখালীতে গেরিলা অপারেশন পরিচালনা করে। এ যুদ্ধে গ্রুপ কমান্ডার নাজিম উদ্দিন এবং মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ জাফর শহীদ হন। ১১ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে বেতবুনিয়াস্থ চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়কে অবস্থিত কালভার্টের উপর অতর্কিতভাবে পাকিস্তানী বাহিনীর জীপ গাড়ির উপর গেরিলা আক্রমণ চালানো হলে ঘটনাস্থলে গাড়ীর ড্রাইভারসহ ২ জন অফিসারের মৃত্যু ঘটে। উক্ত গেরিলা যুদ্ধে গ্রুপ কমান্ডার মাহবুব আলম চৌধুরী বাম পায়ে আঘাত প্রাপ্ত হন।

মুক্তিযুদ্ধকালীন রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়িতে অবস্থিত ফারুয়া ও শুকরছড়ির মোহনায় পাকিস্তানিদের সামরিক ঘাঁটি ছিল। সেখানে পাঞ্জাবী, রাজাকার, আলবদরসহ ২৫০ জন সৈন্য অবস্থান করত। সেখানে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কয়েকটি স্টিমার ও গানবোট ছিল।

আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে পাইলট মান্নানসহ মুক্তি বাহিনীর একটি দল পাহাড়ী এলাকায় পথ হারিয়ে রাতের অন্ধকারে ফারুয়াস্থ পাকিস্তানী বাহিনীর ক্যাম্পের অভ্যন্তরে এসে পড়ে। জানা যায়, ফারুয়া এলাকায় কয়েকশত মুক্তিযোদ্ধা হানাদারদের হাতে ধরা পড়ে নৃশংসভাবে শাহাদাত বরণ করে। ফারুয়ার জালিয়াপাড়া নামক স্থানে সুলতান আহম্মদ কুসুমপুরীর নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনীও পাকিস্তানী বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয় বলে জানা যায়। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে সুবেদার টি.এম. আলী এখানেই শহীদ হন। পরবর্তীতে মিত্র ও মুক্তি বাহিনী ফারুয়াস্থ পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণ চালিয়ে বিনা রক্তপাতে ফারুয়া দখল করে নেয়। সেখানে অবস্থানরত রাজাকার, আলবদররা সাদা পতাকা উত্তোলন করে মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে।

বর্তমান রাঙামাটি জেলার বরকলে পাকিস্তানি বাহিনীর সামরিক অবস্থানের উপর ১৪ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ২টি যুদ্ধ বিমানযোগে আক্রমণ চালায়। সেখানে ৭৫০ জন পাকিস্তানি সেনার সুদৃঢ় অবস্থন ছিল। অন্যদিকে মিত্র ও মুক্তিবাহিনী জৈলানন্দ সিং এবং সুলতান আহমদ কুসুমপুরীর নেতৃত্বে প্রায় ৫০০ মুক্তিযোদ্ধা বরকল অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকে। ঐ দিন ফারুয়ায় অবস্থানরত ছদ্মবেশী পাঞ্জাবীরা জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে টহলদার গানবোট যোগে ফারুয়া থেকে বরকলের দিকে এগোনোর সময় মুক্তিবাহিনী মহিউদ্দিন গ্রুপের উপর আচমকা আক্রমণ করলে এখানে বেশ কিছু সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাত বরণ করেন। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা আক্রমণে পাঞ্জাবীরা পালিয়ে যায়।

১৫ ডিসেম্বর মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা ভোর বেলায় বরকলে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানের উপর আক্রমণ শুরু করে। যৌথবাহিনী রকেট লাঞ্চার ও এলএমজি থেকে অনবরত গুলি চালিয়ে যেতে থাকে। পাঞ্জাবীরাও যৌথ বাহিনীর উপর সেলিং করতে থাকে। সকাল থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ চলে। এতে যৌথবাহিনী ত্রিমুখী আক্রমণ পরিচালনা করে। যৌথবাহিনীর আক্রমণে টিকতে না পেরে পাঞ্জাবীরা রাঙামাটির উদ্দেশ্যে স্টিমারযোগে বরকল ত্যাগ করে। এসময় তারা তাদের অনুসারী রাজাকার, আলবদর ও বেলুচ সৈন্যদের যুদ্ধরত অবস্থায় বরকলে রেখে যায়। পাঞ্জাবী সৈন্যদের পশ্চাৎগমণে যুদ্ধরত সৈন্যরা মনোবল হারিয়ে ফেলে। ফলে ঐ দিন সন্ধ্যার বেশ পূর্বে পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা সাদা পতাকা উত্তোলন করে যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে।

বরকলে পাঞ্জাবীদের শক্তিশালী ঘাঁটি এইভাবে মুক্তিবাহিনীর দখলে চলে আসে। এ যুদ্ধে অনেক পাঞ্জাবী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা পড়ে। জানা যায়, এই ঘাঁটি দখল করতে ভারতীয় মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর অনেক সদস্যও শহিদ হন। এই ঘাঁটি দখলের পর মিত্রবাহিনীর পূর্বাঞ্চল কমান্ডের অধিনায়ক জেনারেল সুজন সিং ওভান বরকল পরিদর্শন করেন। ১৫ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনী রাঙামাটি দখল করে নেয়। সর্বস্তরের রাঙামাটিবাসী মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের প্রাণঢালা অভ্যর্থনা জানায়।

রাঙামাটিতে তারা বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ১৭ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনীর পূর্বাঞ্চল কমান্ডার অধিনায়ক জেনারেল সিং ওভান এবং শেখ ফজলুল হক মনি ভারতীয় হেলিকপ্টারযোগে রাঙামাটির পুরাতন কোর্ট বিল্ডিং মাঠে অবতরণ করেন। এখানে তাঁদের অভ্যর্থনা জানান তৎকালীন ছাত্রনেতা গৌতম দেওয়ান, আব্দুর রশীদ, মো. ফিরোজ আহম্মদ, মনীষ দেওয়ান (পরবর্তীতে কর্নেল)সহ হাজারো ছাত্র-জনতা।

 

সূত্র: পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ, বর্ষ ১, সংখ্যা ৩ ও ৪।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *