স্বামীর অপেক্ষায় সামা প্রু : পাহাড়ের মানুষের দিন কাটে অপহরণ আতঙ্কে


অস্থির পাহাড় দিশেহারা মানুষ (৫)

134926_148

আবু সালেহ আকন, পার্বত্য অঞ্চল থেকে ফিরে

স্বামীর অপেক্ষায় আছেন সামা প্রু মারমা। চোখের পানি ফেলেই তার দিনগুলো কেটে যাচ্ছে। স্বামী মংপ্রু আদৌ বেঁচে আছেন কি না তা নিয়েই কেঁদে কেঁদে দিন কেটে যায় সামার। এর আগে যারা এই এলাকায় অপহরণ হয়েছেন মুক্তিপণ দিয়ে তাদের কেউ কেউ অক্ষত ফিরেছেন, কারো লাশ ফিরেছে, আবার কেউ কেউ আজো ফেরেননি। এমনো অনেকে রয়েছেন যারা একাধিকবার অপহরণের শিকার হয়েছেন। এর বেশির ভাগ ঘটনার সাথে জেএসএস এবং ইউপিডিএফের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

সামার স্বামী বান্দরবান সদর থানার ১ নম্বর রাজবিলা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বর মং প্রু মারমাকে গত ১৩ জুন অস্ত্র ঠেকিয়ে দুর্বৃত্তরা অপহরণ করে নিয়ে গেছে। মং প্রু সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা। সামা প্রু জানান, রাত ১০টার দিকে তার স্বামী প্রতিবেশী ক্রানু মারমার ঘরে বসে টিভি দেখছিলেন। এ সময় দুর্বৃত্তরা এসে বাইরে থেকে তাকে ডাকাডাকি করে। তিনি ঘর থেকে বের হলে অস্ত্র ঠেকিয়ে দুর্বৃত্তরা তাকে নিয়ে যায়। সেই থেকেই নিখোঁজ তিনি।

এই ঘটনায় ১৪ জুন মং প্রুর জামাতা হামংচিং মারমা বাদি হয়ে বান্দরবান সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। এই মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে তারা সন্তু লারমার জেএসএসের সদস্য। এর মধ্যে এক নম্বর আসামি কে এস মং মারমা এবং দুই নম্বর আসামি সাধুরাম ত্রিপুরা মিল্টন আঞ্চলিক জেলা পরিষদ সদস্য।

অন্য আসামিরা হলো- এ এস মং মারমা ওরফে বিপুল চাকমা, ক্যাবা মং মারমা, উছমং, উষাইনু মারমা, সাদোচিং মারমা, শৈখ্যাচিং মারমা, মংহাই প্রু মারমা, অংথোয়াইচিং মারমা, মেহাচিং মারমা, সাচিংনু মারমা, মংপু হেডম্যান, মংম্যাচিং মারমা, বাচমং মারমা, বাসিং মং মারমা, মালেক বম, অমল বিজয় চাকমা, শম্ভু কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, নুমং প্রু মারমা, অং থোয়াইচিং মারমা, নিত্য লাল চাকমা, অজিত চাকমা, বাবলু চাকমা, সুজয় চাকমা, নু মং প্রু মারমা, উচপ্রু মারমা, রেদাসে, আপাই মারমা, সানুমং মারমা, সাঅং প্রু মারমা, মেপ্রু মারমা, জলিমং, ঊশৈনু মারমা, শৈনুচিং মারমা ও শৈথুই প্রুসহ আরো অজ্ঞাত ১৫-২০ জন।

মামলায় বলা হয়েছে আসামিরা জেএসএসের সক্রিয় সদস্য। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মং প্রু আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় দুর্বৃত্তরা নির্বাচনের আগে থেকেই তাকে হুমকি দিয়ে আসছিল। নির্বাচনের পরেও তারা একাধিকবার হুমকি দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাকে অস্ত্র ঠেকিয়ে অপহরণ করা হয়েছে।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ বলেছে, নির্বাচনের আগে জেএসএস ৩৬ জনের একটি তালিকা করে। ওই তালিকায় মংপ্রু ছিলেন ৪ নম্বরে। সামা প্রু বলেন, এখন পরিবারের অন্যদেরও হুমকি দেয়া হচ্ছে। বান্দরবান সদর

থানার ওসি বলেছেন, এই ঘটনায় এজাহার নামীয় দুইজনসহ মোট পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে জেএসএসের সদর উপজেলা সভাপতি উচো সিং মারমাও রয়েছে। ঘটনার ব্যাপারে জানতে জেএসএসের কর্তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি।

পার্বত্য অঞ্চলে অপহরণ এই নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে এভাবে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছেন সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও পর্যটক। এর মধ্যে যেমন বাঙালি রয়েছে, তেমনি উপজাতিও রয়েছে। এমনকি আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর একদল অন্য দলের নেতাকর্মীদের অপহরণ করছে এমনও ঘটনা রয়েছে।

বান্দরবান জেলা যুবলীগের নেতা কিউচিং মারমা জানান, তিনি তিন দফায় অপহৃত হয়েছেন। ২০০৪ সালে অপহরণের পর তাকে ১১ দিন আটকে রাখা হয়। কিউচিং বলেন, আমাকে আর্মির সোর্স বলে তারা অপহরণ করেছিল। এরপর আরো দুইবার তারা অপহরণ করে।

গত ১৫ এপ্রিল বান্দরবানের থানছিতে অপহরণ হয় তিন গরু ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক, নুরুল আফসার ও শাহাবুদ্দিন। চার দিন পরে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়।

২০১৫ সালের ৪ অক্টোবর রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার বড়তলী ইউনিয়নের দুর্গম সেপ্রু পাড়ার নতুন পুকুর পাড় থেকে অস্ত্রের মুখে পর্যটক জাকির হোসেন মুন্না (৩০), আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের (৩২) এবং স্থানীয় গাইড মাংসাই ম্রোকে (২৮) অপহরণ করা হয়। এখনো তাদের কোনো হদিস নেই। এই ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হলেও অপহৃতদের উদ্ধার সম্ভব হয়নি।

– সূত্র- নয়াদিগন্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *