সেনাবাহিনী কেন চক্ষুশূল?


আবু উবাইদা::

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বিশ্বজোরা যাদের সুনাম, সুখ্যাতির অন্ত নেই। অথচ নিজ দেশের ভূখন্ড পার্বত্য চট্টগ্রামে তারা কেমন যেন চক্ষুশূল। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার প্রচার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থানরত বিশেষ এক গোষ্ঠীর বচনে পার্বত্য সেনাবাহিনীর মতো স্বৈরাচার হয়তো পৃথিবীর বুকে অন্য কোন রাষ্ট্রে নেই। খোদ এদেশের সুশীল সমাজ যাদেরকে রাষ্ট্রের মেধাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাদের একশ্রেণির দৃষ্টিতেও সেনাবাহিনী পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসীতুল্য। কিন্তু আসলেই পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী কি দোষী? নাকি তাদের দোষী হিসেবে উপস্থাপন করার চক্রান্ত হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আমি সম্প্রতি সেনা সম্পর্কিত কিছু পার্বত্য ঘটনা প্রবাহ আপনাদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরতে চাই।

গত ৫ এপ্রিল, ২০১৭ তারিখে রাঙ্গামাটি জেলাধীন নানিয়ারচর উপজেলা হতে সশস্ত্র পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের চাঁদা কালেক্টর রোমেল চাকমাকে চাঁদা আদায়কালে আটক করে যৌথবাহিনী। আটক করার পূর্বে রোমেলকে যখন সেনাবাহিনী ধাওয়া করে তখন সে পাহাড় হতে পড়ে মারাত্মক আঘাত পায়। আঘাত প্রাপ্ত রোমেলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসারত অবস্থায় ১৯ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে তার মৃত্যু হয়। অথচ আমরা দেখেছি এই ঘটনা নিয়ে সেনাবাহিনী বিরোধী নানা অপপ্রচার। সেনাবাহিনীই নাকি রোমেল চাকমাকে হত্যা করেছে? ঘটনা শেষে শত চেষ্টায় প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি যে সেনাবাহিনী রমেল চাকমার হত্যাকারী।

চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তারিখের একটি ঘটনা। প্রকৃত ঘটনা উন্মোচিত হওয়ার পূর্বে বিভিন্ন পত্র পত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল ছিলো সেনা বিরোধী এই ঘটনা। রাঙ্গামাটি জেলাধীন বিলাইছড়ি উপজেলার ঘটনাটিতে আনা হয়েছিলো সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে দুই মারমা তরুণী ধর্ষণের অভিযোগ। যে অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমরা দেখেছি চাকমা সার্কেল চীফ, চাকমা রাণী য়েন য়েন এবং মানবাধিকার কর্মীদের ব্যর্থ প্রচেষ্টার বাস্তব উদাহরণ। অথচ, ধর্ষণে অভিযুক্ত দুই মারমা তরুণীকে ডাক্তারী পরীক্ষা করে পাওয়া যায়নি ধর্ষণের আলামত।

চলতি বছরের ২২ আগস্ট বান্দরবান জেলাধীন লামা উপজেলার ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের ঘটনাটি ছিলো এরূপ যা ২৪ আগস্ট তারিখে “প্রথম আলো” পত্রিকায় উঠেছিলো তাহলো “বিজিবি ক্যাম্পের তিন সদস্য বুধবার রাত ১০টার দিকে অস্ত্রসহ ত্রিপুরাপাড়ায় যান। তাঁরা পাড়ার এক গৃহিণীর মাধ্যমে দুই কিশোরীকে পাড়া থেকে কিছু দূরে জঙ্গলে ডেকে নেন। সেখানে তিন বিজিবি সদস্যের একজন পাহারায় থাকেন। আর দুজন অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে দুই কিশোরীকে ধর্ষণ করেন।” পরবর্তীতে এই ঘটনায় ভিক্টিম দুই ত্রিপুরা কিশোরী থানায় তিন বিজিবি সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।

অবশেষে পুলিশের তদন্ত এবং মেডিকেল রিপোর্টে ঘটনাটি সম্পূর্ণ মিথ্যে হিসেবে প্রমাণিত হয়। ডাক্তারী পরিক্ষায় দুই কিশোরীকে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এদিকে যে গৃহিণীর মারফত ডেকে নিয়ে বিজিবি সদস্যগণের বিরুদ্ধে কিশোরী ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয় সেই উপজাতি গৃহিণী তা সম্পূর্ণ মিথ্যে বলে থানায় জবানবন্দি প্রদান করেন। এমনকি যে তিনজন বিজিবি সদস্যের নামে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে ঐ নামে স্থানীয় বিজিবি ক্যাম্পে কোনো সদস্যই ছিলেন না। অর্থাৎ এটি একটি মিথ্যাচার।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া উল্লেখিত তিনটি ঘটনায় প্রশাসনকে কোনভাবে দোষী হিসেবে প্রমাণ করতে পারেনি কুচক্রী মহল। শুধুমাত্র এই তিনটি ঘটনা নয়, ১৯৯৬ সালে আলোচিত কল্পনা চাকমা অপহরণ হতে শুরু করে অসংখ্য প্রশাসন বিরোধী মিথ্যাচার রয়েছে পাহাড়ে। হলুদ মিডিয়ার কারণে এই মিথ্যাচারকে সমতলের মানুষ এখনো সত্য হিসেবে মনে করছে। অথচ খেয়াল করুন, প্রায় দুই যুগ অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে কিন্তু কল্পনা চাকমা অপহরণে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা এখনো প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি। একটু চিন্তা করুনতো, পাহাড়ে এতো এতো সাধারণ সুন্দরী উপজাতি রমণী থাকতে নারী নেত্রী কল্পনা চাকমাকে কেন সেনাবাহিনী অপহরণ করবে? এখানে সেনাবাহিনীর স্বার্থ কী? অথচ আলোচিত কল্পনা চাকমা অপহরণকে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে সচেতন মহল উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনের সেনা বিরোধী নাটক হিসেবে মনে করেন। কারণ, কল্পনা চাকমা ছিলেন উইমেন ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক। সে ’৯৬ এর নির্বাচনে তাদের সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে ক্যাম্পেইন না করে আওমীলীগ সমর্থিত প্রার্থী বাবু দীপংকর তালুকদারের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিল। আর এইটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। কল্পনা চাকমার কর্মকান্ড পাহাড়ি ছাত্র
পরিষদ ও শান্তি বাহিনী (জেএসএস) নীতি পরিপন্থি হওয়ায় তারাই তাকে অপহরণ বা হত্যা যা ইচ্ছেমত তা করেছে। জেএসএস নির্বাচনে তাদের ভরাডুবির কথা আঁচ করতে পেরেই উদ্দেশ্যপ্রোণোদিতভাবে এই নাটক রচনা করেছিল বলে অনেকের অভিমত।

শুধু কল্পনা চাকমা নয়, সেই সময়ে তারা আরও ৩৫ জন আওয়ালীগ পন্থী উপজাতিকে
অপহরণ করে চরম নির্যাতন করেছিলো। যাদের বিনিময়ে পরে জেএসএস বিশাল অংকের মুক্তিপণ আদায় করেছিল।

সুতরাং পাহাড়ে প্রশাসন বিরোধী অপপ্রচার পূর্ব হতেই চলে আসছে। এটা নতুন কিছু নয়। অতীতের ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ করলে কখনোই প্রশাসনের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের তথ্য প্রমাণ ও তার সত্যতা পাওয়া যায়নি। সদ্য ঘটে যাওয়া গুইমারা উপজেলার কুকিছড়ায় বৌদ্ধ মূর্তি ভাংচুর ঘটনাটিও তার ব্যতিক্রম নয়। অর্থাৎ নিঃসন্দেহে বলা চলে, এই সমস্ত অপপ্রচার উদ্দেশ্যপ্রোণোদিত। কিন্তু, কেন এই অপপ্রচার? এবার আসুন সেই প্রশ্নের দিকে —

সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম যদি হয় একটি পুকুর তবে সমগ্র পুকুর জুড়ে রয়েছে রাষ্ট্র বিরোধী ষড়যন্ত্রের জাল। শুধু দেশীয় ষড়যন্ত্র নয়, এখানে জড়িত রয়েছে আন্তর্জাতিক মহলও। এই ষড়যন্ত্রের পথে প্রধান প্রতিবন্ধক হলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী যতোদিন পাহাড়ে থাকবে ততোদিন তাদের কোনো চক্রান্ত কাম্য ফলাফল অর্জন করতে পারবে না। প্রথমত সেনাবাহিনী বিরোধী অপপ্রচারের প্রধান কারণ এটিই।

বর্তমানে পাহাড় সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। পার্বত্য জনপদ উপজাতীয় আঞ্চলিক সসস্ত্র সংগঠনের হাতে বন্দি। যেখানে সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি করছে। কিন্তু, এই চাঁদাবাজির পথে প্রতিবন্ধক হলো সেনাবাহিনী। পাহাড়ে যদি সেনাবাহিনী না থাকে তবে সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র কার্যক্রম বিনা বাধায় পরিচালনা করা সম্ভব হবে। সেনাবাহিনী বিরোধী অপপ্রচারে দ্বিতীয় কারণ এটি।

পাহাড়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হতে চুক্তি অনুযায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। সেনাক্যাম্পের ঐ সমস্ত জমিগুলো বর্তমানে পরিত্যক্ত। এদিকে ক্রমশ পাহাড়ের পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে। সশস্ত্র শক্তিধর উপজাতীয় আঞ্চলিক দলগুলো যে কোনো সময়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করতে পারে। যদি সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয় তবে জননিরাপত্তার স্বার্থে প্রত্যাহার হওয়া সামরিক ক্যাম্পসমূহও পুনস্থাপিত হতে পারে। সেই আশঙ্কায় পাহাড়ে পরিত্যক্ত সেনাক্যাম্পের সরকারি খাস জমি দখলে নিতে ব্যস্ত আঞ্চলিক দলগুলো। ভূমি দখলের কৌশল হিসেবেই তারা বেছে নিয়েছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন।

উল্লেখ্য যে, গেলো সপ্তাহে খাগড়াছড়ি জেলাধীন গুইমারার কুকিছড়ায় বৌদ্ধ মূর্তি ভাংচুরের দায় দেওয়া হচ্ছে সেনাবাহিনীর উপর। সেনাবাহিনী এটা করেছে কি করেনি সেটা আমি বলছি না। আমি বলছি কুকিছড়া বৌদ্ধ মন্দির এবং নির্মাণাধীন মূর্তিটি কি বৌদ্ধ মন্দিরের নিজস্ব জায়গায়? সেনাবাহিনীকে দায়ী করার পূর্বে একটিবারের জন্যে কাউকে দেখিনি এই প্রশ্নটি তুলতে।

এটি শুধু সরকারি খাস জমি নয়, বৌদ্ধ মন্দির এবং মূর্তিটি নির্মাণ করা হচ্ছে সেনাবাহিনীর পরিত্যক্ত ক্যাম্পের জায়গায়। প্রশাসনের একটি পরিত্যক্ত জমিতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্দেশ্য কি সেটা যদি চিন্তা নাও করেন, তারপরও প্রশ্ন উঠবে যে, সরকারি কোন জমিতে সরকারের অনুমতি কিংবা বন্দোবস্তি না নিয়ে এভাবে মন্দির স্থাপন কি রাষ্ট্রের আইন বিরোধী কাজ নয়?

সুতরাং বুঝতে হবে জমি দখলে নিতে বৌদ্ধ মন্দির স্থাপন যেমন একটি বাহানা, ঠিক সেনাবাহিনীর উপর দায় চাপাতে বৌদ্ধ মূর্তি ভাংচুর আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সেনাবাহিনী বিরোধী অন্যতম একটি নাটক। যে নাটকে খুব সহজে সরকারি ভূমি দখল এবং সেনাবাহিনী বিরোধী সেন্টিমেন্ট তৈরি করা সম্ভব। অর্থাৎ যাকে বলে এক ঢিলে দুই পাখি শিকার। কারণ, ধর্মীয় ইস্যু সবচেয়ে বড় স্পর্ষকাতর ইস্যু। উপজাতীয় আঞ্চলিক দলগুলো সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এই ধর্মীয় ইস্যু তৈরি করে পাহাড়ে সেনাবাহিনীর অবস্থানকে বিতর্কিত করে সরকারি খাস ভূমি দখল করতে চাইছে।

সবচেয়ে গুরুত্ব্যপূর্ণ বিষয় হলো, একটি আন্তর্জাতিক মহল চাইছে বাংলাদেশের একদশমাংশ এড়িয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একটা আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে। এই টার্গেট বাস্তবায়নে প্রধান প্রতিবন্ধক পার্বত্য বাঙ্গালী। পাহাড়ে যতোদিন পার্বত্য বাঙ্গালী থাকবে ততোদিন এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। আর পাহাড় হতে পার্বত্য বাঙ্গালীদের বিতাড়িত করতে প্রধান বাধা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর কারণেই বাঙ্গালীদের উপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে তাদের বিতাড়ন করা হচ্ছে না। মোটকথা পাহাড়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থাকার কারণে চক্রান্তকারীদের রাষ্ট্র বিরোধী সকল ষড়যন্ত্র ভেস্তে যাচ্ছে।

আর এসব কারণেই পাহাড়ে সেনাবাহিনী বিশেষ গোষ্ঠীর কাছে চক্ষুশূল। তাই তারা অত্যন্ত সুকৌশলে পাহাড়ে সেনাবাহিনীর অবস্থানকে বিতর্কিত করতে এসব ইস্যু তৈরি করছে। অর্থাৎ উদ্দেশ্যপ্রোণোদিতভাবে সেনাবিরোধী নাটক রচনা করা হচ্ছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *