সাজেক ও নাড়াইছড়ি সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য


pahar 1

বেলায়েত হোসেন, খাগড়াছড়ি থেকে ফিরে :

(সাত)

পার্বত্য জেলার সাজেক এবং নাড়াইছড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরের এ অঞ্চলের অর্ধলক্ষাধিক লোক জিম্মিদশায় রয়েছে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভৌগোলিক ও রণকৌশলগত কারণে সন্ত্রাসীরা সাজেক ইউনিয়নকে  নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছে। এলাকার শান্তিপ্রিয় বাঙালী এবং জাতিগত সংখ্যালঘু নৃ-গোষ্ঠীর ওপর চলছে সশস্ত্র পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের বর্বরোচিত নির্যাতন। চাঁদা না দিয়ে কারো পক্ষেই এলাকায় বসবাস করা অকল্পনীয়। অপহরণ এবং গুপ্তহত্যা আতংকে দিন কাটছে নিরীহ লোকজনের।

sajek

রাঙ্গামাটির দুর্গম ইউনিয়ন সাজেকের আয়তন ৮০৫ বর্গ কিলোমিটার। দেশের যে কোন জেলার চেয়েও বৃহৎ এই এলাকা। সংরক্ষিত রিজার্ভ ফরেষ্ট এলাকাভুক্ত এ ইউনিয়নটি গভীর অরণ্য ও পাহাড়ে ঘেরা। রাঙামাটি জেলা সদর থেকে সাজেক ইউনিয়নের দুরুত্ব প্রায় ১৪০ কিলোমিটার। জেলা সদরের সাথে সরাসরি সড়ক পথ নেই। খাগড়াছড়ি হয়ে এ অঞ্চলের  লোকজন যাতায়াত করেন। রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন কিংবা পুলিশের কর্মকান্ড সে এলাকায় পুরোপুরি সক্রিয় নয়।  আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর সীমিত তৎপরতা এলাকাবাসীর ভরসা।

সাজেক এর আতশী মারমা এবং নাড়াইছড়ির রনজিতা চাকমা জানান, সেনা ক্যাম্প থাকলেও টহল তৎপরতা পর্যাপ্ত নয়। এ সুযোগে বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনের কাছে প্রায় জিম্মী হয়ে আছে পাহাড়ী-বাঙালীরা।
তারা বলেন, সাজেক ইউনিয়নের নাড়াইছড়ি এবং বিওপি’র উত্তরে অনুমানিক প্রায় ৩ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা প্রায় অরক্ষিত। এ বিশাল এলাকা নিরাপত্তা বাহিনীর কোন ক্যাম্প নেই। খাগড়াছড়ি সেনা রিজিয়নের আওতাধীন বাঘাইহাট জোন নিয়ন্ত্রণ করে সাজেক ইউনিয়নের ২ হাজার ১শ বর্গ কিলোমিটার । রাঙ্গামটি রিজিয়নের আওতাধীন মারিশ্যা সেনা জোন নিয়ন্ত্রণ করে সাজেক ইউনিয়নের ১ ও ২ নং ওয়ার্ডে কিছু অংশ । বাকী ৭ শ বর্গ কি.মি.এলাকা । জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের কোন অস্থিত্ব এখানে নেই। সেনা বাহিনীর সদস্যরাই মূলত এ অঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তার  শেষ ভরসাস্থল।

সরেজমিন আলাপকালে এলাকাবাসী জানান, সাজেক ইউনিয়নের উত্তর-পশ্চিমে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের সাথে প্রায় ৭০ কিলোমিটর এবং উত্তর-পূর্বে ত্রিপুরার সাথে প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকায় বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর কোন ক্যাম্প নেই। শুধু সাজেক নয় পানছড়ি উপজেলা থেকে শুরু করে দীঘিনালার নাড়াইছড়ি ও বাঘাইছড়ি উপজেলা পর্যন্ত প্রায় ২শ কিলোমিটার এলাকায় বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর কোন ক্যাম্প নেই।
 জানা গেছে, অরক্ষিত সাজেক ও নাড়াইছড়ি এলাকায় সন্ত্রাসীদের বিপুলসংখ্যক স্থায়ী ও অস্থায়ী ক্যাম্প রয়েছে। ঝুমঘর ও টংঘর বানিয়ে সন্ত্রাসীরা  সেখানে কর্মকান্ড চালাচ্ছে। নাড়াইছড়িতে প্রতিদিন ঘটছে আধিপত্য বিস্তারের জন্য সশস্ত্র গ্রুপগুলোর বন্দুক যুদ্ধের ঘটনা। ইতিপূর্বে সেনা বাহিনী অভিযান চালিয়ে কচুছড়ি, ছলছড়া, কবামার পাড়া ও বলপাইয়া পাড়া অস্থায়ী ক্যাম্পসহ সাজেকে ইউপিডিএফ’র একটি ট্রেনিং একাডেমী ধবংস করে দেয়। এ সময় সন্ত্রাসীদের ব্যাপক গুলি বিনিময়ের ঘটনাও ঘটে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায়  আটক করা হয় দুই সন্ত্রাসী। সাজেক এলাকায় মূলত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস)সংস্কান্থী গ্রুপ ও ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) নিয়ন্ত্রন করছে। এলাকায় সন্ত্রাসীরা জনগণের সাথে মিশে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ার উত্তরে ও মেরুং-এ ইউপিডিএফ’র শক্তঘাতি রয়েছে। অপর দিকে বাবুছড়ার  দক্ষিণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রন করছে জেএসএস(এমএন) গ্রুপ।

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর সন্ত্রাস বিরোধী অভিযান চললে জেএসএস ও ইউপিডিএফ’র সন্ত্রাসীরা আশ্রয় নেয় সাজেক ও নাড়াইছড়ি এলাকায়। এই দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। তাছাড়া সাজেকে নিরাপত্তা বাহিনীর পর্যাপ্ত ক্যাম্প নেই। অপর দিকে পানছড়ি থেকে দীঘিনালা ও বাঘাইছড়ি উপজেলা পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ২শ কি: মি: এলাকায় বিজিবির কোন ক্যাম্প না থাকায় সন্ত্রাসীরা নিবিঘেœ সীমাšেরÍ ওপারে আশ্রয় নিতে পারে।
 সাজেক পরিদর্শনকালে  নতুন বসতি স্থাপনকারী উপজাতীয়রা জানান, সন্ত্রাসীদের অত্যাচার ,সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিতে শান্তিপ্রিয় জনগণের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। তারা জানায়, সেনাসদস্যদের  তাড়া খেয়ে সন্ত্রাসীরা এ এলাকায় আশ্রয় নিয়ে নির্যাতন চালায়। জোরপূর্বক হাঁস-মুরগী ও গুরু-ছাগল  কেড়ে নেয়। প্রতি মাসে চাঁদা দিতে হয়। সন্ত্রাসীদের অবাধ্য হওয়ায় এ সাজেকে কত মানুষ অপহরন ও খুন হয়েছে তার কোন হিসেব নেই। প্রাণ  ভয়ে এলাকাবাসী প্রতিবাদ না করে নিরব থাকে। অপর এক পাহাড়ী জানায়, অধিকাংশ পাহাড়ী বাঙ্গালীদের সাথে সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করতে চায়। গুটিকয়েক সন্ত্রাসীর করণে তা সম্ভব হচ্ছে না।

সাধারন পাহাড়িদের অভিযোগ, সন্ত্রাসীদের হুমকি-ধমকি ও চাপের মুখে সাজেকে বসবাসকারী পাহাড়িরা ২০১০ সাল থেকে ঐতিহ্যবাহী বাঘাইহাট বাজার বর্জন করে আসছে। এতে বাজারের ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সাধারণ পাহাড়িরাও আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মূখীন । সাজেকে বহু বাঙ্গালী পরিবার নিজ বসতভিটা ছেড়ে বছরের পর বছর  বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আশ্রয় কেন্দ্রে মানবেতর জীবন যাপন করছে।

এব্যাপারে বাংলাদেশ বডার গার্ড (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেছেন ,পার্বত্যাঞ্চলের সীমান্ত সুরক্ষা এবং নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার সজাগ রয়েছে। পর্যায়ক্রমে পাহাড়ের অরক্ষিত সীমান্তে আরো বিজিবি’র ক্যাম্প ও বর্ডার আউট পোষ্ট স্থাপন করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *