সর্বোচ্চ পাহাড় চূড়ার দেশ রুমা



শৈহ্লাচিং মারমা:

১৯১৭ সালে রাঙ্গামাটি জেলা এবং বান্দরবান মহকুমার অধীনে বর্তমান রুমা উপজেলা থানা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৮৩ সালে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ফলে রুমা উপজেলায় রূপান্তরিত হয়।বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি পাহাড়-পর্বত এবং বৈচিত্র্যময় অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমাহার সমৃদ্ধ রুমা উপজেলা। যোগাযোগ দুর্গমতা ও আবাসন সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের সাধারণ জনগোষ্ঠির জন্য রুমার সর্বত্র বিচরণ এখনো কষ্টসাধ্য। তারপরেও অনেকেই ছুটে যান বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ তাজিংডং ও সর্বোচ্চ পর্বতমালা কেওক্রাডং,জাদিফাই ঝরনা, বগালেক এবং রিজুক জলপ্রপাত দেখতে।এছাড়াও এ উপজেলায় ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির মানুষের জীবনধারাও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

রিজুক ঝরনা

রিজুক ঝরনাটি রুমা উপজেলা সদরে অবস্থিত। এটিকে মারমা ভাষায় ‘নিস্বংসং’ বলা হয়। এনিয়ে মারমাদের একটি লোককাহিনী প্রচলিত আছে। তবে এই ঝরনার অপূর্ব দৃশ্য যে কোনো পর্যটকের মন আকর্ষণ করবেই। পাহাড়ের গাঁ বেয়ে অবিরল ধারায় সাঙ্গু নদীর বুকে ঝরে পড়া এ জলপ্রপাতটি বান্দরবান শহর থেকে ৬৪ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। এর আশেপাশের জায়গাগুলোওমনকাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। সাংগু নদীর কিনারায় পতিত হওয়া এ রিজুকের উত্তর পূর্ব দিকে মারমা ও বমদের গ্রাম রয়েছে। রিজুক দেখতে গিয়ে নৌকা ভ্রমণের আনন্দ আর ঝরনার অপরূপ সৌন্দর্য দু’টোই উপভোগ করতে পারবেন। ঝরনার শীতল জলের ধারায় গা জুড়িয়ে নিতে চাইলে এটি-ই উপযুক্ত স্থান। শীত মৌসুমে সকালে সূর্য উকিঁ দিলে দেখা মিলবে সাত-চম্পা রংধনু।

বগালেক

সুউচ্চ পাহাড় চূড়ায় প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এক রহস্যময় জলাশয় বগালেক সৃষ্টির পেছনে রয়েছে নানা কাহিনী। পাহাড়িরা এটির নাম দিয়েছে দেবতার লেক। রুমা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ে ১৫ একর জায়গা জুড়ে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বগালেক। এটির পানি যেমন নীল তেমনি স্বচ্ছ। দেখলে মনে হবে চারিদিকে পাহাড়ের বেষ্টনি দিয়ে গড়েছেন সয়ং সৃষ্টিকর্তা। পাহাড়ি এলাকা তাই বর্ষায় যাওয়া একটু কষ্টকর। শুষ্ক মৌমুমে বেড়ানোর উপযুক্ত সময়। জিপ গাড়ি বা মোটর সাইকেলে অনায়াসে যাওয়া যায়। জেলা পরিষদের রেস্ট হাউজে বা স্থানীয় গেস্ট হাউজে রাত্রিযাপনের ব্যাবস্থা রয়েছে। খাবার স্থানীয়দের অর্ডার দিলে তৈরি করে দেয়। রাতে সোলার বিদ্যুতে আলোকিত হয় পুরো এলাকা। নিরাপত্তার কোন সমস্যা নেই, পাশেই রয়েছে নিরাপত্তাবাহিনীর ক্যাম্প।

কেওক্রাডং আর তাজিংডং

বগালেক দেখার পর যাত্রা করতে পারেন কেওক্রাডং দেখার উদ্দেশে। কেওক্রাডং দেখে রওনা হতে পারেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড়চূড়া তাজিংডং সামিট করার জন্য। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,৩০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই পাহাড়ে হাজার হাজার পর্যটক বেড়াতে এসে থাকেন। এখানে তাজিংডং ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির মানুষের বসবাস। যাদের সংস্কৃতি এবং জীবন বৈচিত্র্য প্রকৃতির সাথে সম্পৃক্ত। তাজিংডং-এ পৌঁছানোর পথে হাঁটার অনন্য অভিজ্ঞতা আপনার মনে থাকবে বহুদিন।তাজিংডং বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলার রেমাক্রী পাংশা ইউনিয়নে অবস্থিত। রুমা উপজেলা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পর্বতের অবস্থান। রুমা উপজেলা সদর থেকে চান্দের গাড়িতে করে কেওক্রাডং-এর কাছাকাছি যাওয়া যায়। যাত্রার জন্য বগালেক থেকে খুব ভোরে যাত্রা করতে হবে সেক্ষেত্রে আসা যাওয়াসহ ৮-১০ ঘণ্টা হাঁটার অভ্যাস থাকতে হবে। তাজিংডং ভ্রমনণকারীদের অবশ্যই ভ্রমণের সময় শুকনো খাবার, খাবার পানি, জরুরি ওষুধপত্র সঙ্গে নিতে হবে।যাত্রাপথ দুর্গম ও কষ্টসাধ্য বিধায় মহিলা ও শিশুদের নিয়ে এ পথে যাত্রা করা উচিত নয়।

জাদিফাই ঝরনা

জাদিকইং। এটি মারমা ভাষার একটি শব্দ। জাদি অর্থ প্যাগোডা। কইং অর্থ মাঠ। এ দু’টি শব্দ মিলেই হয়- জাদিকইং। এক সময় মারমা সম্প্রদায়ের বাসস্থান ছিল এটি। কিন্তু১৯৮৬ সালের পূর্বের বছরগুলোয় মিজো সশস্ত্র বাহিনীর তৎপরতারকারণে মারমারা অন্যত্র চলে যায়। পরে বম জাতির লোকজনের বসবাস শুরু হয়। কালের বিবর্তনে জাদিকইং থেকে বম ভাষায় জাদিফাই হয়েছে। জাদিফাইয়ে চারকোণা দেয়াল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ার মতো অপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়বে এখানে। গাছপালার ফাঁকে রোদ উঁকি দিলে সুন্দর রঙধনুর দেখাও মিলবে এখানে।

কেওক্রাডংয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেখতে যেতে পারেন জাদিফাই ঝরনা।কেওক্রাডংয়ের পর প্রথমেই পড়বে পাসিং পাড়া, এরপর জাদিফাই পাড়া। কেওক্রাডং থেকে যেতে সময় লাগবে প্রায় দুই ঘণ্টা।তবে যাবার রাস্তা মোটামুটি বিপদজনক। তাই সতর্কভাবে পথ চলা ভালো। জাদিফাই পাড়ায় খাবার-দাবার মিলবে। হালকা খাবার ও পানীয় সাথেই নিয়ে যেতে পারেন। জাদিপাই পাড়ায় স্থানীয়দের একটি কটেজ রয়েছে। চাইলে সেখানেই থাকতে পারেন।

তিনাপ সাইতার

ভ্রমণপিপাসুদেরজন্য একটি উপভোগ্য পর্যটনের স্থান বান্দবানের রুমায় ‘তিনাপ সাইতার’।এটি এখনো পর্যটকদের কাছে তেমন পরিচিতি হয়ে ওঠেনি। তবে খুবই উপভোগ্য পর্যটনের স্পট। পাহাড়ের অরণ্যে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট অন্যান্য পর্যটন স্থান থেকে এই ঝরনার বৈশিষ্ট্য একেবারেই আলাদা। সব মৌসুমে স্বচ্ছ জলে ঠান্ডা-গরম সমানে সমান। দেখা মিলবে রংধনু। তাই সুযোগ পেলেই সেখানে সময় কাটিয়ে আসেন স্থানীয়রা। সময় নিয়ে তিনাপ সাইতারে ঘুরে আসতে পারেন আপনিও। তিনাপ সাইতার ঝরনাটি রুমা উপজেলায় পাইন্দু ইউনিয়নের পাইন্দুখালের শুরুরদিকে অবস্থিত।পাহাড়ি রাস্তা। সবসময় গাড়ি পাওয়া যায়না।এর জন্য আগেই ঠিক করে রাখতে হবে চান্দের গাড়ি। সেখানে পৌছঁলেই সব কষ্টের কথা ভুলে যাবেন অনায়াসে।

যেভাবে যাবেন:

রুমার বিভিন্ন পর্যটন স্পটগুলো দেখতে যেতে হলে বান্দরবান থেকে রুমা উপজেলা সদর পর্যন্ত বাসে যাওয়া যাবে। প্রতিজনে বাসের টিকেট ভাড়া ১১০ টাকা। জিপ, মাইক্রোবাস রিজার্ভ করে গেলে লাগবে ৪ হাজার টাকা। তারপর রুমা থেকে গাইড নিয়ে যেতে পারেন পছন্দের যে কোন এক বা একাধিক স্পটে। থাকা-খাওয়ার ব্যাপারে সেখানে আধুনিক কোন ব্যবস্থা নেই। তবে বিভিন্ন পাড়ায় থাকতে পারবেন অনায়াসে। কোন কোন স্থানে স্থানীয়দের অর্ডার দিলে খাবার পাবেন, আবার কোথাও খেতে হবে নিজেদের ব্যবস্থাপনায়। তাই যাওয়ার আগে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে যেতে হবে।

 

সূত্র: পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ, বর্ষ ১, সংখ্যা ২ ও ৩।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *