প্রভাবশালীদের হাতে জিম্মি পানছড়ির গুচ্ছগ্রামের মানুষ: সরকারী খাদ্যশস্য কালো বাজারে বিক্রি


নিজস্ব প্রতিবেদক, খাগড়াছড়ি:

খাগড়াছড়ির পানছড়ির ১৭টি গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা জিম্মি হয়েছে পড়েছে খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা, প্রকল্প চেয়ারম্যান ও খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী স্থানীয় সরকার দলীয় নেতাদের হাতে। গুচ্ছগ্রামের হতদরিদ্র কার্ডধারীদের কাছ থেকে নানা কৌশলে কম মূল্যে আগাম খাদ্যশস্য ক্রয় করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছে এ প্রভাবশালী মহলটি। এ নিয়ে খাদ্য গুদামে হামলা ও কর্মকর্তাকে লাঞ্চিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তারপরও থামছে না দূর্নীতি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়ি উপজেলার ১২টি বাঙালি গুচ্ছগ্রামে রেশনভোগী কার্ডধারীর সংখ্যা ৪ হাজার ১’শ ২৯ জন। এছাড়াও রয়েছে ৫টি পাহাড়ি গুচ্ছগ্রাম। সরকারিভাবে প্রতিজন কার্ডধারীর জন্য মাসে ৩৫ কেজি চাল ও ৫৫ কেজি গম বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর এসব খাদ্যশস্য বিরতণ করা হয়। মোট বরাদ্দ ১২’শ টন খাদ্য শস্য।

চট্টগ্রাম থেকে খাদ্য শস্য আনা-নেওয়া বাবদ সরকারের পরিবহণ বরাদ্দ প্রতি গাড়ি ৩২ হাজার টাকা। কিন্তু সিংসভাগ খাদ্য শস্যই খাগড়াছড়ি আনা হয় না। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রকল্প চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে কার্ডধারীদের কাছ থেকে আগাম রেশন কিনে রাখে এবং চট্টগ্রামের গুদাম থেকে ছাড় করে নিয়ে যায়। আর গাড়ি প্রতি বরাদ্দকৃত সরকারী ৩২ হাজার টাকা সংশ্লিষ্ট খাদ্য গুদাম কর্মকর্তার সাথে যোগসাজসে ভাগ করে নেয়।

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই পানছড়ির খাদ্যশস্য ব্যবসার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ করে আসছে দুই খাদ্য ব্যবসায়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বাহার মিয়া ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী আশীষ দেব। পানছড়ির সবক’টি গুচ্ছগ্রামের প্রকল্প চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে খোলা বাজারে খাদ্যশস্য বিক্রি পর্যন্ত একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ করছে এ দুই প্রভাবশালী নেতা।

এ নিয়ে দুই প্রভাবশালী খাদ্য ব্যবসায়ীর মধ্যে দ্বন্দ্বও চলছে দীর্ঘ দিন ধরে। এ নিয়ে প্রায়ই ঘটছে অপ্রীতিকর ঘটনা।

সবশেষ গেল বুধবার (৬ জুন) পানছড়িতে গুচ্ছগ্রামের খাদ্যশস্য ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুদামের উপ-সহকারি পরিদর্শক রোকন মিয়াকে লাঞ্ছিত ও সরকারি খাদ্য গুদামে ভাংচুরের অভিযোগ উঠেছে খাদ্যশস্য সিন্ডিকেটের হোতা উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি বাহার মিয়ার বিরুদ্ধে।

জানা গেছে, ওইদিন সন্ধ্যায় বাহার মিয়া ১১ মেট্টিক টন গম দাবি করেন। গুদামে মজুদকৃত গম আরেক খাদ্য ব্যবসায়ী আশীষ দেব নিয়ে গেছেন বলাতে খাদ্য গুদামের উপ-সহকারী পরিদর্শক রোকন মিয়ার ওপর মারধর শুরু করেন বাহার মিয়া ও তার লোকজন। এসময় তারা ক্ষিপ্ত হয়ে গুদামের বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাংচুর করেন।

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে বাহার মিয়া বলেন, পূর্ব দমদমের গুচ্ছগ্রামের প্রকল্প চেয়ারম্যান আবাদ মিয়ার কাছ থেকে ১১ টন গম কিনেছিলাম। সরকারি খাদ্য গুদামে থাকা আবাদ মিয়ার জন্য বরাদ্দকৃত গম চাইতে গেলে উপ পরিদর্শক রোকন মিয়া আমার ক্রয়কৃত গমগুলো আশীষ দেব নিয়ে গেছে বলে জানান। কথাটি শোনার পর মেজাজ চটে গেলে উচ্চবাচ্য হয়েছে বলে স্বীকার করলেও কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত ও ভাংচুরের বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।

বাহার মিয়া উল্টো খাদ্য গুদামের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, পানছড়ির ১৭টি গুচ্ছগ্রামের জন্য ১২’শ টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ থাকে। যা গাড়ী হিসেবে প্রায় ৩ শ’র মতো। খাদ্যশস্য আনা-নেওয়া বাবদ প্রতি গাড়ি ৩২ হাজার টাকা পরিবহণ ব্যয় লুটপাট করছেন খাদ্য পরিদর্শক ও সংশ্লিষ্টরা।

খাদ্য ব্যবসায়ী আশীষ দেব বুধবার সন্ধ্যায় বাহার মিয়া লোকজন নিয়ে গিয়ে খাদ্য গুদামের উপ-সহকারি পরিদর্শক রোকন মিয়া কর্মকর্তাকে মারধর ও ভাংচুর করে।

খাদ্য গুদামের উপ-সহকারি পরিদর্শক রোকন মিয়া বলেন, আওয়ামী লীগের সভাপতি বাহার মিয়া গুচ্ছগ্রামের প্রকল্প চেয়ারম্যান আবাদ মিয়ার নাম বলে ১১ টন গম দাবি করেন। প্রথমে হুমকি-ধামকি দেন। পরে মারধর করতে ঔদ্ধত হন। তার নির্দেশে লোকজন অফিসের আসবাবপত্র ভাংচুর করেছে। ঘটনাটি আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও পুলিশকে জানিয়েছি।

খাদ্য গুদামের পরিদর্শক মঈনুল খায়ের বলেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি বাহার মিয়া নিজে গিয়ে উপসহকারী কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত এবং অফিসে ভাংচুর করেছেন।

পানছড়ি থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, খাদ্য গুদামে অপ্রীতিকর ঘটনায় শুক্রবার (৮ মে) থানায় খাদ্য গুদামের উপ-সহকারি পরিদর্শক রোকন মিয়া জিডি করেছেন। তবে জিডির কথা অস্বীকার করেছেন, রোকন মিয়া।

পানছড়ির ইউএনও মো. আবুল হাশেম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, বাহার মিয়া ক্ষতিগ্রস্ত খাদ্য গুদামের গ্লাস লাগিয়ে দিয়েছে। এ ঘটনায় থানায় জিডি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পানছড়ি খাদ্য গুদামে দীর্ঘ দিন ধরে দূর্নীতি-অনিয়ম চলে আসছে। পানছড়ির জন্য বরাদ্ধকৃত খাদ্যশস্য অর্ধেকও আসে না। তারা খাদ্য পরিবহনের জন্য সরকারী বরাদ্দ আত্মসাৎ করছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জেলা খাদ্য পরিচালন সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রককে বিষয়টি লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের আগে পাহাড়ে বিরাজমান সমস্যা থেকে উত্তরণে মৌলিক অধিকার পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে হতভাগ্য এসব মানুষকে পাহাড়ে পুনার্বসান করে। কিন্তু প্রতিশ্রুত অধিকারসমূহ থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সরকার দলীয় প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের মাধ্যমে গুচ্ছগ্রামগুলো নিয়ন্ত্রণ হওয়ায় তাদের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস করে না কেউ। শুধু পানছড়ি নয়, খাগড়াছড়ি জেলার ৮৬টি গুচ্ছগ্রামে অর্থের বিনিময়ে দলীয় নেতাদের প্রকল্প চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ ও প্রায় ২৬ হাজার রেশন নির্ভর পরিবারে রেশন বিতরনে অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘ দিনের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *