শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে উপজাতিরা কতটুকু আন্তরিক?



সন্তোষ বড়ুয়া:
২ ডিসেম্বর ২০১৮ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের ২১তম বছর পূর্তি। প্রতি বছর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর দিবসে পার্বত্য চট্টগ্রামের কতিপয় উপজাতি নেতৃবৃন্দ শান্তিচুক্তির পূর্ণাংগ বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে সরকারের প্রতি অংগুলি প্রদর্শন করে একতরফাভাবে দোষারোপ করে থাকেন। কিন্তু ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পর থেকে বিগত ২১ বছরে এর বাস্তবায়নে সরকার বেশ আন্তরিকতার পরিচয় দিলেও চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমাদের পক্ষ হতে আন্তরিকতার লেশমাত্র পাওয়া যায়নি। শান্তিচুক্তির পূর্ণাংগ বাস্তবায়ন কি সরকারের একার দায়িত্ব?

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যে দেখা যায় যে, চুক্তির অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়েছে। এ পর্যন্ত শান্তিচুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টির পূর্ণ বাস্তবায়ন, ১৫টির আংশিক বাস্তবায়ন এবং ৯টি ধারার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় হস্তান্তরযোগ্য ৩৩টি বিষয়/বিভাগের মধ্যে এ পর্যন্ত রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে ২৮টি বিষয়/দফতর হস্তান্তর করা হয়েছে।

শান্তিচুক্তির অবশিষ্ট অংশ বাস্তবায়িত না হওয়ার পিছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হলো শান্তিচুক্তির বেশ কিছু ধারা বাংলাদেশ সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। এছাড়া আদালতে শান্তিচুক্তির বেশ কিছু ধারা চ্যালেঞ্জ করে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ সমস্ত বিষয়সহ শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পথে যে সমস্ত অন্তরায় রয়েছে সেগুলোর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত শান্তিচুক্তির পূর্ণাংগ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তবে বর্তমান সরকার চুক্তির যে ধারাগুলো বাস্তবায়িত হয়নি সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে।

অপরপক্ষে, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন না করা নিয়ে উপজাতি বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ এবং সংগঠন শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সরকারকে সহযোগীতা না করে উল্টো সরকারকে দোষারোপ করে দেশে-বিদেশে নানা ধরনের নেতিবাচক কর্মসূচি পালন করে আসছে। এমনকি তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানানো শুরু করেছে। এ নিয়ে তারা নানা রকম অপতৎপরতাও চালাচ্ছে।

গত বছর (২০১৭ সালে) “পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে স্বার্থান্বেষী উপজাতি সংগঠনগুলো” শিরোনামে আমার লেখাতে সরকার কর্তৃক শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিকতা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে গৃহিত নানামূখী উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের চিত্র তুলে ধরেছিলাম। আমার আজকের লেখাতে শান্তিচুক্তির পূর্ণাংগ বাস্তবায়নে উপজাতি বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ এবং সংগঠনগুলো কতটুকু আন্তরিক তা তুলে ধরার চেষ্টা করবো। লেখাটি নাতিদীর্ঘ করার লক্ষ্যে আমি শুধুমাত্র শান্তিচুক্তির শুরুর অংশ তুলে ধরে আলোচনা করবো।

শান্তিচুক্তির শুরু হয়েছে যে বক্তব্য দিয়ে তা হলোঃ “বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব-স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তরফ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নিম্নে বর্ণিত চারি খন্ড (ক, খ, গ, ঘ) সম্বলিত চুক্তিতে উপনীত হইলেন।”

এখন প্রশ্ন হলো উপজাতিরা কি শান্তিচুক্তির শুরুর এই অংশ অনুযায়ী কাজ করছে? তারা কি বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী চলছে? বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখছে? এর উত্তরে নানা জনে নানা মত ব্যক্ত করবেন। তবে আমার সোজা সাপ্টা উত্তর হলো—না। উপজাতিরা শান্তিচুক্তির শুরুর এই অংশ অনুযায়ী কাজ করছে না। তারা বাংলাদেশের সংবিধান মান্য করছে না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্যও রাখছে না। কারণঃ

ক। সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ হতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) এর নেতা সন্তু লারমা শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। কিন্তু পিসিজেএসএস’র একটা অংশ প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে শান্তিচুক্তির বিরোধীতা করে ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবী করে সশস্ত্র আন্দোলনের পথ বেছে নেয়। অথচ সন্তু লারমার পক্ষ হতে ঐ সশস্ত্র দলকে বিপথ থেকে সুপথে আনার কোন প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়নি। এ থেকে কি অনুমিত হয় না যে সন্তু লারমার নির্দেশেই প্রসীত বিকাশ খীসা ঐ সশস্ত্র দল গঠন করেছে? সরকারকে চাপে রাখতে এবং নিজেদের গোপন অভিলাষ চরিতার্থ করার জন্যই কি তাহলে সন্তু লারমা এই সশস্ত্র শাখার সৃষ্টি করেছে?

খ। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের তিন মাসের মাথায় শান্তিচুক্তির বিরোধীতা করে ইউপিডিএফ নামে সশস্ত্র শাখার সৃষ্টিই কি প্রমাণ করে না যে উপজাতিরা শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন চায় না?

গ। পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র ‘জুম্মল্যান্ড’ গঠনের দাবী করে উপজাতি নেতা আর সংগঠনগুলো কি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রেখেছে? ইতোমধ্যে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ‘স্বাধীন জুম্মল্যান্ড’ গঠনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ‘স্বাধীন জুম্মল্যান্ড’-এর পতাকা, মানচিত্র, মুদ্রা, পরিচয়পত্র, জাতীয় সংগীত, রেডিও চ্যানেল প্রকাশ করে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছে।

শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমা কোনদিন ভুলেও তো এর বিরোধীতা করেনি। তার মানে কি এই নয় যে- সন্তু লারমা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখছে না?

ঘ। বাংলাদেশের মত একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও সন্তু লারমা এখনো জাতীয় পরিচয়পত্র গ্রহণ করেননি। এটাই কি তার রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ?

ঙ। বাংলাদেশ সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদ এবং শান্তিচুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই; বরং মূল বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিপরীতে এই অ-বাঙালি জনসমষ্টিকে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী নামে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরকারী স্বয়ং সেই সন্তু লারমা এবং উপজাতি বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ ও সংগঠন ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশের সংবিধান এবং শান্তিচুক্তি অমান্য করে নিজেদেরকে হঠাৎ করে ‘আদিবাসী’ দাবী করা শুরু করেছে। এর মাধমে কি উপজাতিরা শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করলো না?

চ। শান্তিচুক্তির শুরুর অংশে বলা হয়েছে- পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব-স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা হবে। যদি তাই হয় তাহলে রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ, রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পর্যটন কেন্দ্র, রাস্তাঘাট ইত্যাদি নির্মানে কেন উপজাতিরা বাঁধা দিচ্ছে? কেন উপজাতি জনসাধারণকে মূলধারার রাজনীতি করলে অপহরণ বা খুন করা হচ্ছে? কেন পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিদের প্রতি তাদের এত হিংসা-ক্ষোভ?

আসলে উপজাতিরা নিজেরাই শান্তিচুক্তির পূর্ণাংগ বাস্তবায়ন চায় না। যদি চাইতো তাহলে তারা সত্যিই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখতো। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সরকারকে সহযোগিতা করতো। পার্বত্য চট্টগ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সেখানকার পাহাড়ি-বাঙ্গালি উভয় জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন চাইতো।

উপজাতিদের কাছে শান্তিচুক্তি আসলে অনেকটা সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁসের মতো। নিজেরাই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে আগ্রহ না দেখিয়ে উল্টো বাঁধার সৃষ্টি করছে এবং দেশে-বিদেশে প্রচার করছে যে সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করছে না। এভাবে তারা তাদের অনুকূলে দেশি-বিদেশি মহলের সহানুভূতি আদায় করে চলেছে আর নিজেদেরকে অবহেলিত ও অনগ্রসর প্রমাণ করে বিভিন্ন এনজিও এবং সংস্থা থেকে বিশাল অংকের ত্রাণ ও অনুদান সংগ্রহ করছে। এর সাথে পাহাড়ে তাদের চাঁদাবাজির বিশাল নেটওয়ার্কও সচল রেখেছে। যার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ উপজাতি-বাঙালিরা উপজাতি তিন সশস্ত্র দলের ক্রমাগত নির্যাতন সহ্য করে যাচ্ছে আর মাঝখান থেকে আর্থিকভাবে হৃষ্টপুষ্ট হচ্ছে কতিপয় স্বার্থান্বেষী উপজাতি নেতারা।

  • লেখক: রাঙামাটি থেকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *