শরবত বিক্রেতা থেকে তুরস্কের ‘নতুন সুলতান’


পার্বত্যনিউজ ডেস্ক:

তুরস্কের রাজনীতিতে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এখন এক শক্তিমান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
আধুনিক তুরস্কের জনক হিসেবে পরিচিত মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের পর তুরস্কের রাজনীতিতে এতোটা পরিবর্তন অন্য কোন নেতা আনতে পারেননি।

রোববার (২৪ জুন) অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ২২ শতাংশ ভোট বেশি পেয়ে (৫২ দশমিক ৫৫ শতাংশ) নির্বাচিত হয়েছেন এরদোয়ান। একই দিন অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে একে পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট পিপলস এলায়েন্স অর্ধেকের বেশি আসনে (৩৪২) জয়লাভ করেছে। এর মধ্যে এরদোয়ানের দল একে পার্টি এককভাবেই পেয়েছে ২৯৩টি আসন। তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স পেয়েছে ১৯২টি আসন।

এরদোয়ানের সাফল্যের রাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকরাসহ তুর্কি প্রবাসীরা রাস্তায় নেমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। এসময় তারা একে পার্টি ও তুরস্কের জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে নেচে-গেয়ে বিজয় উদযাপন করেন।

২০০৩ সাল থেকে টানা ক্ষমতায় থাকা এরদোয়ানকে আরও এক মেয়াদের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিলো তুর্কি ভোটাররা। ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ও সে বছর থেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট পদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। রোববারের নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত ৯৮ শতাংশ কেন্দ্রের ফলাফলের মধ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়েছেন এরদোয়ান। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মুহারেম ইঞ্চ পেয়েছেন ৩০ শতাংশের কিছু বেশি ভোট। অন্য চার প্রার্থীর সবার প্রাপ্ত ভোট ৮ শতাংশের নিচে। তবে নির্বাচন কমিশনের এই ঘোষণার অনেক আগেই নিজস্ব সূত্রে প্রান্ত ফলাফলের ভিত্তিতে বিজয় মিছিল শুরু করেছে এরদোগানের সমর্থরা। নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে এরদোয়ানের ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত হয়েছে বলে ধরে নেয়া হচ্ছে।

তুরস্কের নতুন সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে এরদোয়ান একচ্ছত্র আধিপত্য ভোগ করবেন। উল্লেখ্য, এরদোয়ানের একে পার্টি রক্ষণশীল ইসলামী মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত।

তুরস্কের রাজনীতিতে ১৯৬০’র দশক থেকে চারবার সামরিক হস্তক্ষেপ হয়েছে। কিন্তু সর্বশেষ ২০১৬ সালে এরদোয়ান যেভাবে সামরিক অভ্যুত্থান নস্যাৎ করে দিয়েছেন, তাতে ক্ষমতার উপর তাঁর অবস্থান আরও পাকাপোক্ত হয়েছে।

এরদোয়ানের সমর্থকরা মনে করেন, তিনি দেশটির ডুবন্ত অর্থনীতিকে টেনে তুলেছেন। কিন্তু সমালোচকদের দৃষ্টিতে তিনি একজন স্বৈরশাসক যিনি ভিন্ন মতাবলম্বীদের নির্দয়ভাবে দমন করেন।

তুরস্কের একে পার্টি প্রতিষ্ঠিত হবার এক বছর পর ২০০২ সালে ক্ষমতায় এসেছেন এরদোয়ান। ২০১৪ সালে তুরস্কে অনুষ্ঠিত প্রথম সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হবার আগ পর্যন্ত এরদোয়ান ১১ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।
তখন প্রেসিডেন্ট ছিল শুধুই একটি আনুষ্ঠানিক পদ। প্রেসিডেন্টের হাতে তেমন কোন ক্ষমতা ছিল না।

আল জাজিরার খবরে বলা হয়, এরদোয়ানের জন্ম ১৯৫৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। তাঁর বাবা ছিলেন তুরস্ক কোস্ট গার্ডের একজন সদস্য। এরদোয়ানের বয়স যখন ১৩ বছর তখন তাঁর বাবা ইস্তাম্বুলে আসেন। উদ্দেশ্য ছিল পাঁচ সন্তানকে ভালো লেখাপড়া শেখানো। তরুণ বয়সে এরদোয়ান বাড়তি উপার্জনের জন্য লেবুর শরবত এবং বিভিন্ন খাবার বিক্রি করতেন। ইস্তাম্বুলের মারমারা ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পড়াশুনা করেছেন তিনি। এর আগে তিনি একটি ইসলামিক স্কুলে পড়াশুনা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার সময় পেশাদার ফুটবলও খেলেছেন এরদোয়ান।

১৯৭০ -১৯৮০’র দশকে তিনি ইসলামপন্থী একটি রাজনৈতিক দল নেকমেতিন এরবাকানস ওয়েলফেয়ার পার্টর সাথে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৯৪-১৯৯৮ পর্যন্ত ইস্তাম্বুলের মেয়র ছিলেন তিনি। এক পর্যায়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে এবং ওয়েলফেয়ার পার্টিকে নিষিদ্ধ করে।

১৯৯৯ সালে তাঁর চার মাসের কারাদণ্ড হয়। তিনি জনসম্মুখে একটি কবিতা পাঠ করেছিলেন। কবিতাটি ছিল এ রকম, “মসজিদ হচ্ছে আমাদের ব্যারাক, গম্বুজ হচ্ছে আমাদের হ্যালমেট এবং মিনার হচ্ছে আমাদের বেয়নেট।”

২০০১ সালে আগস্ট মাসে তিনি আবদুল্লাহ গুলের সঙ্গে মিলে ইসলামপন্থী একে পার্টি গঠন করেন। ২০০২-২০০৩ সালে সংসদ নির্বাচনে একে পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং এরদোয়ান প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে দেশটিতে অনুষ্ঠিত প্রথম সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হন এরদোয়ান। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে এক সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা নস্যাৎ করে দেন তিনি। ২০১৭’র এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়।

তুরস্কের নতুন ‘সুলতান’
বিবিসির খবরে বলা হয়, তুরস্কের উপর ইসলামিক মূল্যবোধ চাপিয়ে দেবার কথা অস্বীকার করেন এরদোয়ান। নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে মনে করেন তিনি। তবে তুরস্কের লোকজন তাদের ধর্ম বিষয়ে খোলাখুলিভাবে কথা বলতে পারার বিষয়টিকে সমর্থন করেন এরদোয়ান।

তাঁর এ বার্তা গ্রামাঞ্চলে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। এরদোয়ানের কিছু সমর্থক তুরস্কের অটোম্যান সাম্রাজ্যের সাথে তুলনা করে তাঁকে ‘সুলতান’ নামে ডাকে।

চার সন্তানের জনক এরদোয়ান মনে করেন মুসলিমদের জন্মনিয়ন্ত্রণ করা উচিত নয়। তাদের যত সম্ভব সন্তান নেয়া উচিত।

তুরস্কের প্রেসিডেন্টের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করে রাজধানী আঙ্কারায় একটি প্রাসাদ তৈরি করেছেন এরদোয়ান।
সে প্রাসাদের যে নামকরণ করা হয়েছে ইংরেজিতে তার অর্থ ‘হোয়াইট প্যালেস’। এক হাজার কক্ষ আছে সে প্রাসাদটিতে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দপ্তর হোয়াইট হাউজ কিংবা রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের দপ্তর ক্রেমলিনের চেয়ে এটি বড়। এ প্রসাদ তৈরি করতে খরচ হয়েছে ৪৮২ মিলিয়ন ডলারের বেশি।

এরদোয়ানের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে তুরস্কের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। দেশটিকে এখন গড়ে ৪.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এরদোয়ান প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট আছেন। সিরিয়ার যুদ্ধে তিনি প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরোধীদের মদদ দিচ্ছেন।

মিশরে ক্ষমতাচ্যুত মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিও সমর্থন ব্যক্ত করেছেন এরদোয়ান। সুত্র-বিবিসি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *