লেখক ও উদ্ভাবক আলীকদম থানার ওসি রফিক উল্লাহ’র কীর্তিগাঁথা


আলীকদম প্রতিনিধি:

রফিক উল্লাহ্। একজন পুলিশ কর্মকর্তা। যিনি মাঠ পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কঠিন কাজে ব্যস্ত সময় পার করেও গড়ে তুলেছেন মননশীলতার আলাদা এক ভূবন। তিনি একাধারে একজন লেখক এবং উদ্ভাবক। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৫টি। সম্প্রতি তিনি উদ্ভাবন করেছেন আধুনিক ‘ডাব কাটার যন্ত্র’।

লেখক রফিক উল্লাহ কর্মজীবনে দায়িত্বশীলতার পাশাপাশি লেখনী শৈলীতে তার গভীর ধীশক্তি ও অনুসন্ধিৎসু মনের স্ফূরণ ঘটিয়েছেন। নানা বিষয়কে বৈচিত্র্যময় রূপকল্পে এঁকেছেন কলমের আঁচড়ে। লেখনীর পাশাপাশি মনের ভাবকে তিনি অনায়াসে প্রকাশ করতে পারেন বক্তৃতার মাধ্যমেও। নানান বিষয়ের ওপর বক্তব্যে তিনি যুক্তি ও উপমার ব্যবহার করেন সাবলীল ভাবেই। বর্তমানে রফিক উল্লাহ বান্দরবানের আলীকদম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

জানা গেছে, ১৯৯৩ সালে ক্যাডেট সাব ইন্সপেক্টর হিসেবে রফিক উল্লাহ বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ পান। ১৯৯৫ সালে তিনি শিক্ষানবিশ সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে ঝিনাইদহ জেলায় যোগ দেন। এর আগে তিনি সারদা পুলিশ একাডেমিতে এক বছরের মৌলিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। চাকুরী জীবনের শুরু থেকেই মেধাবী এ পুলিশ কর্মকর্তা তার কর্ম পরিধির মধ্যে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ২০০৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তিনি ‘পুলিশ পরিদর্শক’ হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন।

ওসি রফিক উল্লাহ সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সমাজ ও দেশ মাতৃকার কল্যাণধর্মী লেখনীতে আত্মনিয়োগ করেছেন। ২০১২ সাল থেকে চলতি বছরে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৫টি। ২০১২ সালে তার প্রথম প্রকাশিত বই ‘ম্যানারিজম’। বইটিতে ২৫টি অনুচ্ছেদে ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ-সভ্যতার মৌলিক কিছু বিষয় তিনি আলোকপাত করেছেন সাবলীল বর্ণনায়।

এ বইয়ের শেষ কথায় তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন, ‘পরিবেশকে সুন্দর, স্বাভাবিক ও নান্দনিক রাখার জন্য মনের ইচ্ছা শক্তি থাকা চাই। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য নিজেই সচেষ্ট হতে হবে। পরিবেশ সুন্দর হলে মনে আনন্দময় অনুভূতি জাগে’।

২০১৩ সালে প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় বই ‘কর্মমুখী শিক্ষা’। বইটিতে ২৩ অনুচ্ছেদে কর্মমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্বপূর্ণ নানান তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেছেন মেধাবী এ পুলিশ কর্মকর্তা।

বইটির মুখবন্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান লিখেছেন- ‘তাঁর এ পুস্তিকাটি চলমান শিক্ষা কার্যক্রমের সাথে সমন্বিত করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলে দেশ কর্মমুখী শিক্ষায় আলোকিত হবে। একই সাথে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে ও অপরাধ প্রবরণতা হ্রাস পাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এ প্রেক্ষিতে প্রকাশিত পুস্তাকটি নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধি চিন্তার পরিচায়ক।’

২০১৬ সালে ওসি রফিক উল্লাহ প্রকাশ করেন কক্সবাজার ভ্রমণগাইড ‘কুদুম গুহা’। এ গাইড বইয়ে পর্যটন নগরী কক্সবাজার জেলার নানান দর্শনীয় স্থান সমূহের বৈচিত্র্যময় বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে এক নজরে কক্সবাজারের নানা তথ্য-উপাত্ত।

২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় তার মৌলিক রচনা সম্ভার নিয়ে ‘চলমান অপরাধ প্রক্রিয়া’। বইটিতে ৬৮টি বিষয়ের ওপর দেশে চলমান অপরাধের ধরণ নিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। লেখক তার লেখনশৈলীতে অপরাধের শ্রেণি বিন্যাস, অপরাধ সম্পর্কে পাঠকদের সচেতন করতে সিদ্ধহস্ত হয়েছেন। তার কর্মজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে তিনি কলমের আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন অপূর্ব দ্যোতনায়।

বইটির প্রসঙ্গ কথায় লেখক অভিমত ব্যক্ত করেন, ‘অপরাধ প্রবণতা মানব সৃষ্টির পর হতে শুরু হয়েছে। মানবজাতি যতদিন থাকবে ততদিন এ অপরাধ জগৎও থাকবে। পেশাদার, অপেশাদার অপরাধীদের কবল হতে মুক্ত থাকার জন্য সমাজে সংগঠিত সকল অপরাধ সম্পর্কে আমাদের ধারণা থাকা প্রয়োজন। আইনের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে প্রকৃত অপরাধীদের সাজা প্রদানের মাধ্যমে দেশ ও জাতীকে অপরাধ মুক্ত করা অপরিহার্য। আইন প্রয়োগকারীদের সর্বস্তরে সমান ভাবে আইনের চোখে সবাই সমান সে লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। অপরাধের ধরণ ও প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে সাম্প্রতিকালে আধুনিক অপরাধ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ বই লেখা হয়েছে’।

নিভৃতিচারি এ লেখক প্রতিবছর একটি করে বই প্রকাশ করে তার মেধা ও মননকে উঁচু মার্গে নিয়ে যাচ্ছেন। এ ধারাবাহিকতায় মহান একুশে বইমেলা ২০১৮-এ প্রকাশিত হয় তার পঞ্চম বই ‘ব্যবসায় সফলতা’। বইটিতে তিনি বৈধ উপায়ে ব্যবসার বিভিন্ন নিয়ম-নীতি প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণনা করেছেন। একজন চাকুরিজীবী হয়েও তিনি ব্যবসায়িক পিতার সফলতার কাহিনীকে নিজের অভিজ্ঞতায় বর্ণনা দিয়েছেন মর্মে বইটির প্রসঙ্গ কথায় উল্লেখ করেছেন।

লেখকের মতে, এ বইটিতে ব্যবসায় সফলতা লাভের কৌশল, আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে। সনাতনি ব্যবসার পরিবর্তে আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর ব্যবসায় উৎসাহ ও কৌশল শেখাতে পাঠকদের অনুপ্রাণিত করবে।

ওসি রফিক উল্লাহ লেখালেখির পাশাপাশি উদ্ভাবনী সক্ষমতা দেখিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি নিজস্ব ধারণায় স্থানীয় ওয়াক্সশপ থেকে তৈরি করেছেন ডাব কাটার একটি যন্ত্র।

যন্ত্রটি আবিস্কারের পর ওসি রফিক উল্লাহ বলেন, ‘ডাব সুস্বাদু এবং স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি। ডাব কাটার জন্য বাংলাদেশে ভালো কোনো যন্ত্র নেই। এর জন্য আমি ডাব কাটার এ যন্ত্রটি আবিস্কার করেছি।’

লেখক রফিক উল্লাহ’র জন্ম কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার শামলাপুর গ্রামে। তার পিতার নাম হাজী সিরাজুল হক ও মাতার নাম আমেনা খাতুন। কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশের পর চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি ও চট্টগ্রাম কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন লাভ করেন।

আলীকদম প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেন, গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে পুলিশ পরিদর্শক রফিক উল্লাহ নিজের মেধা ও মননের একটি অনন্য জগৎ গড়ে তুলেছেন। তার প্রকাশিত বই গুলোতে বিষয়ভিত্তিক লেখনীতে তিনি তীক্ষ্ণ ধীশক্তির পরিচয় দিয়েছেন। তার প্রকাশিত বই গুলো সাধারণ পাঠক ছাড়াও স্কুলের পাঠ্যসূচির আওতায় আনলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে বলে আমার বিশ্বাস।

বৃহস্পতিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত একুশে বইমেলায় ওসি রফিক উল্লাহ’র ৫ম বই ‘ব্যবসায় সফলতা’ এর মোড়ক উন্মোচন করেন বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা।

কর্মমুখী শিক্ষা বিস্তার এবং কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম সফল ভাবে বাস্তবায়ন করায় তিনি ইতোমধ্যে এসএম আহসান মেমোরিয়াল এ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত হয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *