রোহিঙ্গাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আরও ৪৪ মিলিয়ন ডলার সহায়তা প্রদান


কক্সবাজার প্রতিনিধি:

মিয়ানমারে সহিংসতার কারণে শরণার্থী হওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও এই সঙ্কটে ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি প্রয়োজনে মানবিক সহায়তা হিসেবে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসআইডি) মাধ্যমে অতিরিক্ত ৪৪ মিলিয়ন ডলার প্রদান করছে যুক্তরাষ্ট্র।

এর ফলে ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্ট থেকে সৃষ্ট এই সংকটে মিয়ানমার ও বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার পরিমাণ দাঁড়াল ২০৭ মিলিয়ন ডলারেরও বেশী এবং ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে মিয়ানমারে ও মিয়ানমার থেকে আগত বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য মোট মানবিক সহায়তার পরিমান দাড়িয়েছে ২৯৯ মিলিয়ন ডলারেরও বেশী।

মঙ্গলবার (১৫ মে) ইউএসআইডি প্রশাসক মার্ক গ্রিন কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনকালে এই নতুন অর্থ সহায়তার ঘোষণা দেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া বার্নিকাট।

গত আগস্ট থেকে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যের সহিংসতা থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন, যেখানে আগে থেকেই প্রায় ৩ লাখ শরণার্থী রয়েছেন। এছাড়াও মিয়ানমারে প্রায় ৮.৩ মিলিয়ন মানুষ সঙ্ঘাতপূর্ণ এলাকায় বসবাস করেন। তাঁরা শুধু রাখাইন রাজ্যে নয়, পুরো মিয়ানমার জুড়েই বাস করেন। এই সংঘাত ও এর কারণে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সঙ্কটের জন্ম দিয়েছে।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ মানবিক দাতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের দু’পাশে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে সক্রিয়ভাবে সাড়া দিচ্ছে। এই তহবিল ঘোষণার ফলে গত বছরের আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত এই সঙ্কটে ইউএসআইডি’র মোট সহায়তার পরিমাণ দাঁড়াল ১০০ মিলিয়ন ডলারে। এই নতুন তহবিলের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে যে সহায়তা প্রদান করবে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কক্সবাজার ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বসবাসরত শরণার্থীদের জন্য জরুরি খাদ্য সহায়তা। এই সহায়তার মধ্যে রয়েছে সাধারণ বন্টনের জন্য জরুরি খাদ্য, তীব্র পুষ্টিহীনতারোধে বিশেষায়িত খাবার এবং ভাউচার। যা ব্যবহার করে শরণার্থীরা স্থানীয় বাজার থেকে সুলভে খাদ্যসামগ্রী ক্রয় করতে পারবে।

এই তহবিলের মাধ্যমে মিয়ানমারের রাখাইন, শান ও কাচিন রাজ্যের চলমান সংঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত লক্ষাধিক মানুষের জন্য জরুরি খাদ্য ও পুষ্টি সহায়তা, আশ্রয়, স্বাস্থসেবা এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় সাহায্যও প্রদান করা হবে।

২০১৭ সালের আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্র প্রদত্ত ২০৭ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে, যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দপ্তরের পপুলেশন, রিফিউজিস, এবং মাইগ্রেশন (পিআরএম) ব্যুরো প্রায় ১২৮ মিলিয়ন ডলারের মানবিক সহায়তা প্রদান করেছে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশে তাদের আশ্রয় দেয়া স্থানীয় জনগণের জন্য।

যেসব মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা পিআরএম-এর এই অর্থসহায়তা পেয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউএনএইচসিআর, আইওএম, ইউনিসেফ এবং রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট। সংস্থাগুলো এই অর্থ সহায়তা এই সঙ্কটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা, জরুরী আশ্রয়, নিরাপদ পানি, পরিষ্কার-পরিচ্ছনতা, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে ব্যবহার করছে। এই সহায়তা আসন্ন বর্ষা ও ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুমে জীবনহানি থেকে রক্ষা, আশ্রয়, ও অত্যাবশ্যকীয় সেবা নিশ্চিত করতে শরণার্থীদের প্রস্তুতি গ্রহণে সাহায্য করছে।

মানবিক সহায়তা তহবিল ছাড়াও, যুক্তরাষ্ট্র কৃষি দপ্তরের ম্যাকগভার্ন-ডোল কর্মসূচি (ইন্টার্ন্যাশনাল ফুড ফর এডুকেশন অ্যান্ড চাইল্ড নিউট্রিশন প্রোগ্রামঃ বাংলাদেশ) প্রদত্ত অনুদানের তহবিলে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা প্রদান করছে। এই স্কুল ফিডিং কর্মসূচির অধীন কক্সবাজারে প্রায় ৪৮ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন হাই এনার্জি বিস্কুট প্রদান করা হচ্ছে। এই কর্মসূচির অধীন স্কুল-সংলগ্ন বাগান ও স্থানীয় কমিউনিটিগুলোর জন্য স্বাস্থ্য ও খাদ্যাভ্যাস উন্নয়ন বিষয়ক কর্মকাণ্ডও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেণ্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনসন (সিডিসি) রোহিঙ্গাদের রোগ প্রতিরোধ, সনাক্তকরণ এবং রোগের প্রাদুর্ভাব ও অন্যান্য প্রধান জনস্বাস্থ্য বিষয়ে সরাসরি প্রযুক্তিগত এবং বৈজ্ঞানিক সহায়তাও দিয়ে থাকে। সিডিসি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, ইউনিসেফ, এসিএফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অন্যান্য অংশীদারদের সাথে রোহিঙ্গাদের পুষ্টি এবং প্রতিষেধক বিষয়ে ভালভাবে বুঝে ভবিষ্যত স্বাস্থ্য সংক্রান্ত উদ্যোগের ব্যাপারে তথ্য সরবরাহ করতে কাজ করছে।

এ বছরের শুরুতে সিডিসি পরীক্ষাগারের প্রশিক্ষণ এবং সরঞ্জাম প্রদান করে যার ফলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় রোহিঙ্গা শিবিরে ডিপথেরিয়ার ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়।

মিয়ানমারে সংঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্তের সহায়তা প্রদানে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশে আগত শরণার্থীদের প্রতি দ্রুত ও উদারতার সাথে সাড়া প্রদান করায় দেশটির সরকার ও জনগণকে যুক্তরাষ্ট্র সাধুবাদ জানায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *