রোহিঙ্গাদের চাপে স্থানীয়দের দুর্ভোগ


কাফি কামাল, বালুখালী, কক্সবাজার থেকে |
মানবিকতার প্রশ্নে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে অনুপ্রবেশের সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ। নাফ নদী, উঁচুপাহাড় আর বনজঙ্গল পেরিয়ে তারা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের এপারের উখিয়া-টেকনাফে। জীবন বাঁচাতে এক কাপড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা দিন কাটাচ্ছেন নানা দুর্দশায়।

কিন্তু প্রথম থেকেই রোহিঙ্গাদের কষ্টের ভাগিদার হয়েছে বাংলাদেশের মানবিক লোকজন। সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ত্রাণ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে সারা দেশের মানুষ। রোহিঙ্গাদের চিকিৎসায় স্থাপন করা হয়েছে অনেকগুলো মেডিকেল ক্যাম্প। বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কারণে সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে পড়েছেন উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দারা।

নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য, যাতায়াত, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানামুখী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তারা। মানবিকতার স্বার্থে এসব ভোগান্তি সহ্য করলেও এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষ পদক্ষেপ চেয়েছেন স্থানীয়রা।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ত্রাণ তৎপরতা চালাতে প্রতিদিনই উখিয়া-টেকনাফে ভীড় করছেন সারাদেশ থেকে আসা প্রচুর মানুষ। ত্রাণ দেয়ার পাশাপাশি অনেকেই আসছেন তাদের দুঃখ-দুর্দশা নিজের চোখে দেখতে। তাদের বেশিরভাগই কয়েকদিন অবস্থান করছেন সেখানে। বাইরের লোকজনের জন্য কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে দেখা দিয়েছে পরিবহন সংকট। রাস্তায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও যানবাহন মিলছে না স্থানীয়দের।

পরিবহন সংকটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ভাড়া। কক্সবাজার থেকে উখিয়া পর্যন্ত অটোরিক্সা ভাড়া ৭০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১০০ থেকে ১২০টাকা। উখিয়া থেকে কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের যে ভাড়া ১০টাকা ছিল এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০টাকায়। সেই সঙ্গে বেড়েছে বাস ভাড়া। বিগত এক মাস ধরে এভাবেই স্থানীয়দের যাতায়াতে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া।

অন্যদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুর পর দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের ঢাকা যাতায়াতে তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। হিমশিম খেতে হচ্ছে বাসের টিকিট যোগাড়ে। এছাড়া কক্সবাজার থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াতে স্থানীয়দেরও প্রতিটি চেক পোস্টে দেখাতে হচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্র। এ নিয়ে অনেকেই পড়ছেন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে।

অন্যদিকে কক্সবাজার-টেকনাফে সড়কটি এমনিতেই আঁকাবাকা এবং সরু। ত্রাণ তৎপরতায় নিয়োজিত প্রচুর ট্রাক, বাস ও প্রাইভেট গাড়ির কারণে চাপ বেড়ে গেছে এ সড়কে। তার ওপর প্রতিদিনই উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে আসছেন সরকারের মন্ত্রীসহ দেশি-বিদেশী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ। তাদের প্রোটোকলের কারণে সে চাপ আরও বাড়ছে। ফলে যানজট লেগে থাকছে দীর্ঘসময়। নষ্ট হচ্ছে প্রচুর কর্মঘণ্টা।

উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দাদের সংখ্যা চার লাখের কাছাকাছি। বিগত বছরগুলোতে আরাকান থেকে পালিয়ে এসে ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ছিল আানুমানিক সোয়া দুই লাখ। এ পরিমান লোকজনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের যোগান দিতেই হিমশিম খেতো স্থানীয় বাজারগুলো।

২৫শে আগস্ট আরাকানে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের পর গত এক মাসেই জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ রোহিঙ্গা। জাতিসংঘের হিসেবে সংখ্যাটা চার লাখ হলেও বিশ্লেষকদের মতে এ সংখ্যা ৫ লাখের নিচে নয়। এ বিপুল পরিমান লোকের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে পারছে না স্থানীয় বাজারগুলো। ফলে উখিয়া-টেকনাফে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়েছে দুই থেকে তিনগুণ। বিশেষ করে তরিতরকারির দাম বেড়েছে অত্যাধিক হারে।

রোহিঙ্গা সংকটের পর উখিয়া-টেকনাফের শিক্ষাক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে জটিলতা। উখিয়া বিশ^বিদ্যালয় কলেজটি ব্যবহৃত হচ্ছে সেনাবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প হিসেবে। থাইনখালী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বসেছে রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী বস্তি। রোহিঙ্গাদের কারণে বন্ধ রয়েছে ঘুমধুম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, তুমব্রু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাজাবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাইশপারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব-পশ্চিমকূল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কুতুপালং উচ্চ বিদ্যালয়, বালুখালী কাসেমিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, থাইনখালী দাখিল মাদরাসা, বালুখালী দাখিল মাদরাসাসহ বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।

এতে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার ক্ষতির পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে ক্ষোভ। তারা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন।

বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা নারীদের বেশিরভাগই অন্তসত্ত্বা। বিভিন্ন দায়িত্বশীল সংস্থার হিসেবে বাংলাদেশে আসা প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গা নারীই অন্তসত্ত্বা। ফলে প্রতিদিনই জন্ম নিচ্ছে শত শত রোহিঙ্গা নবজাতক। তাদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ডেলিভারী হচ্ছে উখিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র ও স্থানীয় ক্লিনিকে।

সরকার পরিচালিত ৫টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রতিদিনই ভর্তি হচ্ছে আহত ও নানা রোগে আক্রান্ত শত শত রোগী। যাদের কারণে স্থানীয় অসুস্থদের চিকিৎসা ব্যবস্থায় চাপ পড়ছে। উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা প্রকল্প কর্মকর্তা মিজবাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, বিপুল সংখ্যক আহত ও রোগাক্রান্ত রোহিঙ্গাদের চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই চাপ বেড়েছে।

তবে সরকারের বিশেষ পদক্ষেপের মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক রয়েছে। অন্যদিকে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা নবজাতকের জন্ম ও রোহিঙ্গাদের জন্মনিবন্ধন ঠেকাতে আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে উখিয়া ও টেকনাফের জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়া। ফলে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন স্থানীয়রা।

২ হাজার একর জমির মধ্যে রোহিঙ্গাদের পূনর্বাসন করার সরকারি ঘোষণা থাকলেও এখন পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তারা। যেখানে সেখানে রোহিঙ্গাদের ঝুপড়ি তৈরির কারণে একদিকে নষ্ট হচ্ছে সামাজিক বনায়ন অন্যদিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন পতিত জমিতেও বসতি গেড়েছে তারা। ফলে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হচ্ছে মতবিরোধ।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই ক্যাম্প ও অস্থায়ী আশ্রয় নিয়েছেন উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নে। উখিয়ার বালুখালী, জামতলী বাঘঘোনা, তাজনিরমার ঘোনা, হাকিমপাড়াসহ নতুন রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও বস্তিগুলো গড়ে উঠেছে এ ইউনিয়নে। পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা আন্তর্জাতিক সমস্যা এবং মানবিক বিষয়।

কিন্তু মানবিকতার কারণে অনেক ভোগান্তি সহ্য করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আমার ইউনিয়নে স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা যেখানে ৫০ হাজার সেখানে ৮লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান নেয়ার পর কি ধরনের সমস্যাা হতে পারে তা আন্দাজ করতে পারেন। তিনি বলেন, আমার ইউনিয়নের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন বন্ধ। কিছুদিন পরই পিইসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি, দাখিলসহ নানা পাবলিক পরীক্ষা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা ও পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ায় তাদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিয়ে আশংকা তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে কিন্তু রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা এনজিওগুলো স্থানীয়দের বিষয়টি বিবেচনায় রাখছে না। তারা স্থানীয় শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের কাজের সুযোগ দিচ্ছে না। অথচ বাইরে থেকে তারা লোক নিয়োগ করছে। অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অনুপ্রবেশের পর দ্রব্যমূল্য বেড়ে এখন আকাশচুম্বি হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *