মুঠোফোনের অপব্যবহার ও বিপথগামী তরুণ সমাজ


cell-phones-talking

আশরাফুজ্জমান মিনহাজ

মুঠোফোন আজ আমাদের তরুন সমাজকে বিপথগামী, লজ্জাহীন করে তুলছে। মুঠোফোনের যথেচ্ছ ব্যবহার তরুন সমাজকে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মার্টিন কোপারের আবিষ্কার এই মুঠোফোন ১৯৭০ সালে প্রথমে গাড়িতে ব্যবহারোপযোগী এবং পরে তা আরো আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর করে আজকে মুঠোফোন হিসেবে আমাদের মুঠোয়। নব্বইয়ের দশকে দ্বিতীয় প্রজন্মের (২এ) লাইন্সেস নিয়ে আমাদের দেশে যাত্রা শুরু করে মোবাইল ফোন বা মুঠোফোন যা আজ বাংলাদেশের প্রতি তিনজনের মধ্যে একজনের হাতে শোভা পাচ্ছে অর্থ্যাৎ প্রায় শতকরা ৩৩% ভাগের বেশি মানুষ বর্তমানে বাংলাদেশে মুঠোফোন ব্যবহার করছে। ২০১৩ সাল নাগাদ এ দেশে মুঠোফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা সাড়ে সাত কোটি ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমরাও এগিয়ে যাব সর্বাধুনিক প্রযুক্তিগত সুবিধা নিয়ে এটাই কাম্য। কিন্তু এ কোন জোয়ারে আমরা গা ভাসিয়ে দিচ্ছি? স্রোত না বুঝে যদি শুধু গা ভাসিয়ে দিই তাহলে গন্তব্যে পৌছাঁ সম্ভব নয় বরং মাঝ পথে ডুবে মরার সম্ভাবনা বেশি। এ জন্য স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। আজকাল একটু লক্ষ্য করলে দেখতে পাওয়া যায়-হাতে, কোমরে কিংবা গলায় ঝুলিয়ে মুঠোফোন থাকা যেন এক সামাজিক মর্যাদার ব্যাপার।

আশ্চর্য লাগে যখন দেখি তরুণ সমাজ কিংবা স্কুল কলেজগামী অধিকাংশ ছেলে মেয়েরা মুঠোফোন আসক্ত। আজকের তরুণ সমাজ আগামীতে সুনাগরিক হয়ে দেশের উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভুমিকা রাখবে। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে নিজেকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন করবে, ব্যক্তিগত সফলতার মাধ্যমে নিজের পরিবার তথা সমাজ এবং রাষ্ট্রের কল্যাণ বয়ে আনবে এটাই সবার প্রত্যাশা। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের তরুণ সমাজ বিশেষ করে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্র ছাত্রীরা যেভাবে মুঠোফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে তাতে করে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সুস্থ মস্তিস্কে যদি আমরা সাবলীল ভাবে চিন্তা করি তাহলে বিবেচনা করতে অসুবিধে হবেনা যে, একজন স্কুল কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রীর মুঠোফোন ব্যবহার তেমন জরুরী কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

images (2)(2)(1)

আজকাল পরিবারের ছোট ছেলে- মেয়ে,ভাই-বোন, ভাগিনা-ভাগিনি থেকে শুরু করে প্রায় সবাই বড়দের কাছে প্রথম আবদার রাখে একটা মুঠোফোন, তাও আবার ক্যামেরা ও মেমোরী ব্যবহারের সুবিধা সম্বলিত। আমরা যারা বড় বা কর্তা ব্যক্তি রয়েছি তারাও হিতাহিত বিবেচনা না করে তাদের হাতে তুলে দিচ্ছি চাহিদানুযায়ী মুঠোফোন। ফলে এরা আর এ মুঠোফোনের যথেচ্ছ ব্যবহারে সংকোচ করেনা বা তাদের সে সংকোচ থাকেনা কেননা তারা তো পরিবারের পক্ষ থেকেই এ জিনিস পেয়েছে। আর অভিভাবকও যখন প্রিয় সন্তানের মুঠোফোন বিড়ম্বনা দেখে তখন তা আর বন্ধ করার মতো পথ থাকেনা কেননা ততদিনে তার প্রিয় সন্তানটি এ মুঠোফোনে আসক্ত হয়ে পড়েছে।

একজন ছাত্র যখন মুঠোফোন নিয়ে স্কুলে যায় তখন তার পরিপূর্ণ মনোযোগ কিন্তু আর পড়াশোনায় থাকেনা, মনোযোগ তখন ভাগ হয়ে খেলা করে মুঠোফোনে নিয়ে আসা নতুন কোন ভিডিও ক্লিপ কিংবা সংগ্রহ করা নতুন কোন বিষয়ের প্রতি যা বন্ধুদের সাথে এখনো শেয়ার করা হয়নি। শুধু যে ক্লাস চলাকালীন সময়ে এ অবস্থা তা নয় অন্যান্য সময়ে আরো বেশি। বিশেষ করে গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত সময়টুকু বর্তমান প্রজন্মের তরুণ তরুনীদের কিভাবে কাটে তা শুনলে সত্যিই অবাক হবার কথা। আমাদের দেশের মুঠোফোন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ নৈশ প্যাকেজের বদৌলতে পড়ালেখা আর রাতের বিশ্রাম এখন দখল করে নিয়েছে বিশেষ বিশেষ আলাপ! একজন ছাত্র-ছাত্রী, তরুণ-তরুনীর কিসের এত আলাপ! এসমস্ত আলাপের বিষয় বস্তুই বা কী তা আজ আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। লক্ষ্য করলে দেখা যায় প্রায়ই সব মুঠোফোন কোম্পানীর বিশেষ বিশেষ অপার থাকে গভীর রাত থেকে ভোর পযর্ন্ত।

পরীক্ষায় নকল করতে ধরা পড়েছে দুজন ছাত্র
কখনো কখনো অফার দেয়া হয় পুরো রাত নাম মাত্র চার্জ নিয়ে। জানতে ইচ্ছে করে এসব অফার কাদের উদ্দেশ্যে দেয়া হয়? গভীর রাতে এদেশে কোন অফিস-আদালত কিংবা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান খোলা থাকেনা তাহলে এ বিশেষ প্যাকেজ গুলোর বিশেষায়িত গ্রাহক কারা সহজে অনুমেয়। নির্ঘুম রাত কাটে এলোমেলো কথা বলে, একান্ত আলাপের সব কিছু শেষ হয়ে গেলে শুরু হয় পাশের বাড়ির বিড়ালটি দুধ চুরি করেছে কিনা কিংবা কুকুরটি আজ রাত ঘেউ ঘেউ করেছে কিনা এসমস্ত ফালতু আলাপ। তারপর দেরিতে বিছানা থেকে উঠে মাথা ঝিমঝিম করা, শরীর-মাথা ব্যাথা করা সহ নানা উপসর্গ নিয়ে শারীরিকভাবে দূর্বল হয়ে পড়া এসমস্ত স্কুল কলেজগামী ছেলে মেয়েরা আদৌ কি পড়ায় মন বসাতে পারে? মুঠোফোনগুলোর বিশেষ বিশেষ অফারের সাথে শুরু হয় বিশেষ বিশেষ বিজ্ঞাপন চিত্র যা থেকে সহজেই ফুটে উঠে নৈতিকতার কিভাবে অবক্ষয় হচ্ছে।

একটি বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, একজন তরুণ মুঠোফোনে আলাপরত অবস্থায় হেলে দুলে রাস্তা দিয়ে পথ চলছে আর পথযাত্রীদের সমানে ধাক্কা দিচ্ছে এভাবে একজন বয়স্ক লোককে ধাক্কা দিলে তিনি এক পর্যায়ে বলে ওঠেন এ জন্য বলে-“ব্যবহারে বংশের পরিচয়” আলাপরত তরুনটি যখন বুঝতে পারে তাকে উদ্দেশ্য করে কথাটি বলা হয়েছে তখন খুব আনন্দ আর তাচ্ছিল্যতা নিয়ে উত্তর দেয়-আরে! আমি তো জানি ‘ব্যবহারে বোনাস’। এই হলো আমাদের তরুন সমাজের বর্তমান দর্শন। শুধু তা নয়, রাস্তা ঘাটে কোমলমতি ছেলে মেয়েরা যেভাবে মুঠোফোনে গান বাজনা বাজিয়ে পথ চলে তাতে মনে হয়না এরা কোন স্কুল কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রী।

একটু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রায় স্কুল কলেজের সামনে গড়ে উঠেছে মুঠোফোনের দোকান। যেখানে কোন ফোন বিক্রি হয়না, শুধুমাত্র রিচার্য করা হয় এবং জমাজমাট ব্যবসা চলে আপ/ডাউন লোডের। এ সমস্ত দোকানগুলোতে প্রতিনিয়ত ছাত্র-ছাত্রীরা এসে বিভিন্ন অশ্লীল ভিডিও ক্লিপস, ইংরেজী, হিন্দি উত্তেজক গান আপলোড করে নিয়ে যাচ্ছে। জ্ঞান পিপাসু এ সমস্ত তরুনদের সমস্ত পিপাসা এখন মুঠোফোনকে নিয়ে। আর আমরা যারা অভিভাবক হয়ে তরুণদের হাতে অবিবেচকের মতো মুঠোফোন তুলে দিচ্ছি তারা কি একবারও ভেবেছি এর ভবিষ্যত! আমরা কি ভেবেছি মুঠোফোনের এ অপ্রয়োজনীয়, অনুচিত ব্যবহার আমাদের সন্তানদেরকে ইভটিজিং এর মতো গর্হিত কাজে ধাবিত হওয়ার পথকে প্রশস্ত করছে?

মানব জীবন হচ্ছে সময়ের সমষ্টি আর এ সময় আমরা কিভাবে ব্যয় করছি, আমরা চোখ দিয়ে কি দেখছি, কান দিয়ে কি শুনছি, মুখ দিয়ে কি বলছি সব কিছুর ব্যাপারে আমরা প্রত্যেকে একদিন জিজ্ঞাসিত হব। মহান রবের ঘোষনা-“নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তরকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।” (সুরা বনি ইসরাঈল:৩৬)।

আমরা প্রতিনিয়ত কথা বলছি বা শুনছি, যদি দৈনিক ছয় ঘন্টা বিশ্রামের জন্য এবং আরো দু’ ঘন্টা অন্যান্য কাজের জন্য বাদ দিই তাহলে প্রতিদিন গড়ে আমরা ষোল ঘন্টা কোন না কোন কথা বলছি কিংবা শুনছি। প্রতি মিনিটে যদি একটি শব্দ বলি এবং একটি শব্দ শ্রবণ করি তাহলে প্রতি ঘন্টায় দাড়ায় ৬০টি, প্রতিদিনে ৯৬০টি, মাসে ২৮৮০০, বছরে ৩৪৫৬০০টি শব্দ/কথা আমরা বলছি এবং শুনছি। আমরা কি কখনো ভেবেছি এর মধ্যে কয়টি ভাল কথা বলি বা শুনি। অথচ আমাদের কান যা শুনে এবং জিহবা দ্বারা যা উচ্চারণ করি সব কিছুর জন্য কিন্তু সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে পাহারাদার রয়েছে । ঐশী গ্রন্থ আল কোরআনের ঘোষনা-“কোন কথা উচ্চারণ করার সাথে সাথে পর্যবেক্ষক প্রস্তুত থাকে”-(সূরা ক্কাফ:১৮)।

আর আমরা মনে করছি মুঠোফোনে কথা হচেছ সবকিছুই তো দৃষ্টির অগোচরে, আসলে তা নয়। তাই আমাদের প্রত্যেকটি কথা বলার পূর্বে সর্বোচ্চ ভাবে চিন্তা করা একান্ত জরুরি। নতুবা আমাদের বেফাস কথা-বার্তা একদিন আমাদের সমস্ত সফলতাকে বিপর্যস্ত করতে পারে। এ ব্যাপারে মানবতার পরম হিতৈষী, নৈতিকতার সর্বোত্তম ও সার্বজনীন মডেল প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তাফা (সাঃ) একদিন হযরত মোআজ (রাঃ) কে লক্ষ্য করে বলেন: হে মোআজ! এটাকে সংযত রাখ। তিনি একথা বলে নিজ জিহ্বার দিকে ইঙ্গিত করেন, তখন মোআজ বলেন, হে আল্লাহর রাসুল (সাঃ)! আমরা যে সকল কথা বলি, সেগুলোর ব্যাপারেও আল্লাহ পাকড়াও করবেন? রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন: সর্বনাশ হে মোআজ! জিহ্বার খারাপ ফসল হিসেবেই মানুষকে তার নিজ চেহারার উপর উপুড় করে দোজখে নিক্ষেপ করা হবে।”- (আহমদ, তিরমিজী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ)। অথচ কথা বলা বা শোনার ক্ষেত্রে আমরা যে কত উদাসীন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বর্তমানে মুঠোফোন আমাদের মুখের লজ্জা আর জিহ্বার শাসন কেড়ে নিয়েছে। আর তাই তরুণ সমাজ আজ শুধু ফোনের অপর প্রান্তে বিপরীত লিঙ্গের কন্ঠ শোনার দেরি, সবকিছু ছেড়ে দিয়ে ফোনালাপে মত্ত হয়ে যায়। চিন্তা করেনা কার সাথে কথা বলছে, কি বলছে, কি-ই বা এর পরিসমাপ্তি। দৃষ্টির অন্তরালে কথা হয় বলে সহজেই কুরুচিপূর্ণ কথা বার্তা মুখে চলে আসে যার ফলে ধীরে ধীরে এসব তরুণ-তরুনীরা একধরনের নৈতিকতাহীন, মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে যা সুস্থ ও সভ্য সমাজ বিনির্মানের অন্তরায় হয়ে দাড়াঁতে পারে। মুঠোফোনের এরকম অযাচিত ব্যবহার দেখে অনেক সময় মনে হয় মানব সৃষ্ঠু এ যন্ত্র আজ মানুষকেই নিয়ন্ত্রন করছে! সময় থাকতে আমরা যদি বিপথগামি এ তরুন সমাজকে মুঠোফোনের নেশা থেকে বাচাঁতে না পারি, নৈতিকতার মহান শিক্ষা যদি তাদের অন্তর অন্তরায় গেঁথে দিতে না পারি তাহলে নৈতিকতা বিবর্জিত তরুণ সমাজ কখনো ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের তেমন কল্যান বয়ে আনবে না।

স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা এখন দেদারসে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে। যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে যন্ত্রটি ব্যবহার করা হলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তাদের পড়াশোনার ওপর। ক্লাস চলাকালীন ইনকামিং-আউটগোয়িং কল, ফেসবুক-টুইটারসহ অন্যান্য সামাজিক বন্ধনের বন্ধুত্বে লিপ্ত হয়ে ক্লাসে অমনোযোগী হওয়া, রাতভর কম রেটে কথা বলার সুযোগ পেয়ে বাবা-মার চোখ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি করা, প্যাকেজ রেটে দিনরাত আনলিমিটেড ডাউনলোড করাসহ বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত হচ্ছে ছাত্র সমাজ। ভালোকে দূরে রেখে মন্দের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া, চুল-নখ, শরীরে স্টাইল করে ঘুরে বেড়ানো, মোবাইল ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা ছাড়াও ফেসবুক-টুইটারের নেশায় তারা আসক্ত। নতুন নতুন সফটওয়্যার আপডেট করার মতো ক্ষণে ক্ষণে গেটআপ, মেকআপ, চলন ও মতের পরিবর্তন তাদের মানসিক বিকাশ, স্বকীয়তাবোধ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ছাত্রছাত্রীদের এ প্রবণতায় মোবাইল ফোন অপারেটর, ফাস্টফুডের দোকানদারসহ অন্যরা লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। প্রশংসার নামে এক ঝুড়ি মিথ্যা বলা, মন নামক বস্তুটাকে প্রেমের রশি দিয়ে টানাটানি করা, ভাব-ভালোবাসা, হুমকি, গসিপ ইত্যাদির সূতিকাগার হচ্ছে মোবাইল ফোন। ছাত্রছাত্রীরা আজকাল মেমরিকার্ড সমৃদ্ধ মোবাইল ফোনে বইয়ের পাতার স্টিল পিকচার নিয়ে আসছে পরীক্ষার হলে। সময় দেখার নাম করে মোবাইল ফোনের ইমেজ ভিউয়ার জুম করে দেখে নিচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বা চিত্রগুলো। এক কথায় নকল করার আধুনিক মাধ্যম হিসেবে তারা বেছে নিয়েছে মোবাইল ফোনকে। কোনো প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে টয়লেটে যাওয়ার নাম করে পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে ফেসবুকের ওয়ালে সার্কুলেশন করছে। ছোট স্পিকার কানে লাগিয়ে ওয়্যারলেস কানেকশনে উত্তর জেনে নিচ্ছে বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে। নকল করার অপরাধ থেকে বাঙালি যখন পরিত্রাণের উপায় খুঁজছে, ঠিক তখন মোবাইল ফোনের ওপর ভর করে নকল প্রবণতার বিকাশ ঘটছে মহামারী আকারে।

প্রযুক্তির উৎকর্ষে মোবাইল ফোনের আবিষ্কার জীবনযাত্রার মান যতটা বৃদ্ধি করেছে, ঠিক ততটাই অনাচার, মিথ্যাচার ও অপরাধের প্রসার ঘটিয়েছে। মোবাইল ফোনের ব্যবহার যোগাযোগ প্রক্রিয়াকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি এর অপব্যবহার জনজীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। যে দেশের মানুষ তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পদে পদে হোঁচট খায়, সেদেশে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো বিভিন্ন কৌশলে মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছে মোবাইল ফোন। তারা রক্তচোষা ছারপোকার মতো মানুষের কষ্টার্জিত টাকা চুষে নিচ্ছে। তাদের কষ্টার্জিত উপার্জন মিলিয়ে যাচ্ছে নেটওয়ার্কের অদৃশ্য ফ্রিকোয়েন্সিতে। বাসায় কম্পিউটার না থাকা, কম্পিউটার পরিবহনে অক্ষমতা অথবা কম্পিউটারে মডেম সংযোগ ইত্যাদি জটিলতার কারণে মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করে নেটিজেন হচ্ছে দেশের কিশোর ও যুবসমাজ। তারা মূহুর্তেই ডাউনলোড করে নিচ্ছে আজেবাজে ডকুমেন্টস আর ব্লু-টুথ ডিভাইসে তা ছড়িয়ে দিচ্ছে বন্ধু-বান্ধবীদের মোবাইল ফোনে। ফেসবুক, টুইটার, ম্যাসেনজার ইত্যাদি সামাজিক বন্ধুত্বের সাইটে অডিও কনফারেন্স বা চ্যাট করে অলস সময় নষ্ট করছে।

সম্প্রতি আমাজান জঙ্গলে এক প্রকার প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যারা অমাবস্যার রাতে দলবেঁধে আত্মহত্যা করে। আলোচিত শিক্ষার্থীরা যেন তাদের মতোই। ইন্টারনেট আবিষ্কারের মূল লক্ষ্য ছিল জ্ঞাননির্ভর সমাজ গঠনে সহায়তা করা। অথচ সার্ভার কাউন্ট করলে দেখা যায়, নিষিদ্ধ সাইটগুলোয় উপচেপড়া ভিড়। ভালো শিক্ষণীয় সাইটগুলোয় ক্লায়েন্ট সংখ্যা অতি নগণ্য। শিক্ষার্থীরা পঞ্চ ইন্দ্রিয়, সময় ও অর্থ নষ্ট করে কোন্ দিকে ধাবিত হচ্ছে? অতি সম্প্রতি ফেসবুকে ভিডিও সংযুক্ত হয়ে ভিডিও কনফারেন্সিং সিস্টেম মোবাইল ফোনে চালু হয়েছে। শিক্ষার্থীরা এর পেছনে রাতের পর রাত পার করে দিচ্ছে। সেবা দেয়ার নাম করে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো বাঙালিদের বুকে টেনে নিলেও তাদের নজর থাকে অর্থ উপার্জনের দিকে। দেশের অর্থ পাড়ি জমায় উন্নত কোন রাষ্ট্র, নয়তো বিদেশী কোন ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে।

মোবাইল ফোন যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হলেও শিক্ষার্থীরা এর অপব্যবহারে মগ্ন হয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে। সমাজ থেকে তারা বিছিন্ন হয়ে পড়ছে। তারা যেন আটকে যাচ্ছে ২-৩ ইঞ্চির ছোট্ট একটা মনিটরে। বিধ্বংসী এ স্রোত থামাতে না পারলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।

লেখক: গবেষক, ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *