মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন কাদের বীর উত্তম



মো.নিজাম উদ্দিন লাভলু

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের দেয়া ঐতিহাসিক স্বাধীনতার বজ্র ঘোষণার ঢেউয়ে সীমান্তবর্তী পার্বত্য মহকুমা রামগড় যখন উত্তাল-উত্তপ্ত, পাক সরকারের বিরুদ্ধে গঠিত আওয়ামী সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে যখন সরকারবিরোধী তীব্র বিক্ষোভ আন্দোলন চলছিল। এমনি এক মুহুর্তে টগবগে সুদর্শন এক যুবকের আগমন ঘটে এ সীমান্ত শহরে। চোখে-মুখে তার কঠোর প্রতিশোধের স্পষ্ট ছাপ। শহরের উপকণ্ঠেজনৈক বিএম খানের চায়ের দোকানে বসে একের পর এক ক্যাপেস্টেন সিগারেট ফুঁকচ্ছেন আর চা পান করছেন। পর্বতসম এক ভাবনায় যেন বিভোর। এ আগন্তুক যুবককে নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা দেখা দেয় এলাকায়। কেএ যুবক? কী তার পরিচয়? এ টালমাতাল অবস্থায় এখানে তার আসার হেতু কী ইত্যাদি প্রশ্নের উদ্রেক হয় সবার মনে।

হঠাৎ একদিন সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটে, এ টগবগে যুবক আর কেউ-ই নন, তিনি বাংলার গর্বিত সন্তান ক্যাপ্টেন আফতাব আল কাদের (ইকবাল)। নিজের পরিচয় প্রকাশ করেই স্থানীয় বাঙালি ইপিআর সদস্য এবং মুক্তিকামী স্থানীয় যুবকদের নিয়ে যুদ্ধ প্রশিক্ষণ কাজে লেগে পড়েন তিনি। যে করেই হোক রামগড়কে সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত রাখতে হবে, এখানে গড়ে তুলতে হবে শত্রুদের মোকাবেলা করার এক শক্তিশালী ঘাঁটি। পাক হানাদারদের উপর ইস্পাত কঠিন আঘাত হানতে হবে তাদের নাস্তানাভূত করে এ দেশকে শত্রুমুক্ত স্বাধীন করতে হবে- এটাই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।

২৫ মার্চের কালোরাতে পাকবাহিনীর নিরস্ত্র-নিরীহ বাঙালি নিধনযজ্ঞের বর্বরতা বাঙালি অগ্নি তরুণ কাদেরের মনে তীব্র প্রতিশোধ স্পৃহার জন্ম দেয়। এ মরণপণ প্রতিশোধের জ্বালা নিয়ে ৪০ ফিল্ড আর্টলারি রেজিমেন্টের অকুতোভয় সেনা অফিসার ক্যাপ্টেন আফতাব আল কাদের ২৭ মার্চ সকালে বেরিয়ে পড়েন ঢাকার ফরিদাবাদের ২১ লালমোহন পোদ্দার লেনের বাসা থেকে। প্রিয় মা, বাবা, ভাই, নববধু, বন্ধু-বান্ধব সবার বন্ধন যেন স্লান হয়ে যায় প্রতিশোধ আর দেশ মুক্তির নেশায়।

পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের হায়দ্রাবাদে ছিল তাঁর কর্মস্থল। ৫ ফেব্রুয়ারি ’৭১-এ ঢাকায় বাড়ি এসেছিলেন ছুটিতে। ১৯ ফেব্রুয়ারি কাউকে না জানিয়েই তিনি কোর্টম্যারেজ করেন ‘জুলিয়া’ কে। দেশ মাতৃকার প্রেমে ব্যাকুল তেজ-দীপ্ত বাংলার বীর সেনানী ক্যাপ্টেন কাদের সব পেছনে ফেলে ব্রতী হলেন দেশমাতৃকাকে মুক্ত করতে। তার নেতৃত্বেই রামগড় হাই স্কুল মাঠে বিরামহীনভাবে চলতে থাকে যুব প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। রামগড়ের একমাত্র সেনা অফিসার কাদের স্থানীয় ইপিআরের সুবেদার মফিজুল বারী, হাবিলদার আবুল কাশেমসহ কয়েকজন ইনস্ট্রাক্টর এবং স্বল্প সংখ্যক অস্ত্র নিয়ে পরিচালনা করেন গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ। রামগড় আসার পর ২ এপ্রিল ক্যাপ্টেন কাদের সর্বপ্রথম অপারেশন পরিচালনা করেন ফেনীর শুভপুর এলাকায়। রণ কৌশলের আবশ্যকীয়তায় ক্যাপ্টেন কাদের পরিকল্পনা নিয়ে ইপিআরের হাবিলদার কাশেমের প্লাটুনসহ মীরসরাইয়ের জোরালগঞ্জে স্থাপন করেন প্রতিরক্ষা ঘাঁটি।

এখানে ধুমঘাট রেলওয়ে ব্রীজ ধ্বংস করার পরিকল্পনা অনুযায়ী একের পর চেষ্টা চালানো হয় তাঁর নেতৃত্বে। তিনদিন চেষ্টার পর ৫ এপ্রিল ব্রিজ উড়িয়ে দেয়ার এ অপারেশন সফল হয়। ১০ এপ্রিল মেজর জিয়ার নেতৃত্বে ৫০ সদস্যের একটি গ্রুপের সাথে ক্যাপ্টেন কাদের রামগড় সেক্টর হেডকোয়ার্টার ত্যাগ করে খাগড়াছড়ি চলে যান। ক্যাপ্টেন কাদের ও ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান মেজর জিয়াকে সঙ্গে নিয়ে খাগড়াছড়ি থেকে চলে যান মহালছড়িতে। এখানে অবস্থানরত মেজর শওকতকে রামগড়ে পশ্চাদাপসরণের নির্দেশ দিয়ে মেজর জিয়া ফিরে আসেন রামগড়ে। মেজর শওকতের নির্দেশ অনুযায়ী ক্যাপ্টেন কাদের তার গ্রুপ নিয়ে চলে যান রাঙামাটিতে। রাঙামাটি শহরে পাকবাহিনীর বড় সমাবেশের খবর পেয়ে তিনি তার গ্রুপ নিয়ে বন্দুক ভাঙ্গা নামক এক দ্বীপের মতো স্থানে অবস্থান নেন।

এখানে ২১ এপ্রিল দুই লঞ্চ বোঝাই পাকসেনাদল হঠাৎ আক্রমণ চালায় মুক্তিযোদ্ধাদের উপর। ক্যাপ্টেন কাদেরের নেতৃত্বে যুদ্ধ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ছাত্র শওকত ও অন্যান্য সদস্যরা শত্রুদের উপর বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষণ করে। প্রায় ঘন্টাব্যাপী চলা এ প্রচ-যুদ্ধে শত্রু পক্ষের বেশ কয়েকজন হতাহত হওয়ার পর তারা পিছু হটে যায়। বন্দুক ভাঙ্গায় দুই দিন অবস্থানের পর মেজর শওকতের নির্দেশ পেয়ে ২৪ এপ্রিল তিনি গ্রুপ নিয়ে রওনা হন মহালছড়ির উদ্দেশ্যে। মহালছড়ি যাওয়ার পথে বুড়িঘাট এলাকায় শত্রুপক্ষের অতর্কিত আক্রমণের শিকার হন তারা। আকস্মিক এ হামলায় তার গ্রুপের সদস্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। ক্যাপ্টেন কাদের ও তার দুই সহযোদ্ধা হাবিলদার সায়ীদ এবং হাবিলদার তাহের তিনজন তিনটি এলএমজি নিয়ে প্রবল আক্রমণ চালায় পাকবাহিনীর উপর।এখানেও শত্রুরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়ে লঞ্চ নিয়ে পালিয়ে যায়।

এভাবে একের পর এক মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচ- হামলার মুখে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পাকবাহিনী তাদের শক্তি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়। তারা মিজোরামের দু’টি বিদ্রোহী গ্রুপের সদস্যদের নিজদলে অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করে। এছাড়া ভারতের নাগাল্যান্ডের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমাদের একটি অংশকে নিয়ে গোপনে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে নতুন-নতুন গ্রুপ গঠন করে। অন্যদিকে স্থল আক্রমণের সাথে সাথে বিমান ও হেলিকপ্টারের সাহায্যেও শুরু করা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের সম্ভাব্য অবস্থান- ঘাঁটির উপর প্রবল হামলা।

এ অবস্থায় পার্বত্য এলাকায় পূর্ব ট্রেনিংবিহীন মুক্তিযোদ্ধারা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। রসদ এবং গোলাবারুদ সংকটও দেখা দেয় তাদের। এই প্রতিকূল ও দুর্বল মুহুর্তে ২৭ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে পাকবাহিনীর দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের এক কোম্পানি সৈন্য (১৩৬ জন) এবং একটি মিজো ব্যাটালিয়নকে (১০০০ জন) সঙ্গে নিয়ে আক্রমণ চালায় মহালছড়িতে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের উপর। মেজর মীর শওকত এবং চন্দ্রঘোনা পেপার মিলের প্রকৌশলী ইসহাকের নেতৃত্বে ঐ সময় শত্রুদের আক্রমণ প্রতিহত করা হচ্ছিল।

এরমধ্যে পাকবাহিনী হেলিকপ্টারযোগে দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের আরও এক কোম্পানি সৈন্য এখানে নামিয়ে দিয়ে যায়। দুই পক্ষের প্রচ- এ যুদ্ধের মধ্যে বেলা তিনটায় ক্যাপ্টেন কাদেরের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপটি মহালছড়ি এসে পৌঁছে। অসীম সাহস আর সুদক্ষ যুদ্ধ কৌশল গ্রহণ করে টগবগে তরুণ সেনা অফিসার কাদের সঙ্গীদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন শত্রু মোকাবিলায়। তাদের এ সম্মিলিত কঠিন প্রতিরোধের মুখে মিজো বাহিনী প্রথম অবস্থায় পিছু হটতে শুরু করে। এতে পাকসেনারা বেপরোয়া হয়ে উঠে। তারা মিজোদের সামনে রেখে একটার পর একটা আক্রমণ চালিয়ে অগ্রসর হতে থাকে।

প্রতিবারই মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা জবাব দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে শত্রুদের। চোখের সামনে সঙ্গীদের মৃত্যু দেখে আতঙ্কিত ভীতসন্ত্রস্ত মিজোরা সামনে এগুতে না চাইলে পাকসেনারা অস্ত্র তাক করে এমন ভাব দেখাতো যে, অগ্রসর না হয়ে পিছু হটতে চাইলে তারা নিজেরাই মিজোদের গুলি করে হত্যা করবে। এ অবস্থায় মিজো ও চাকমা মুজাহিদরা ভয়ঙ্কর মূর্তি ধারণ করে মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে বেপরোয়া গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগিয়ে যায়। তিন চারগুণ অধিক সংখ্যক শত্রু পক্ষ বীভৎস উল্লাস ধ্বনি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় চারপাশ ঘিরে ফেলে। চরম এ বিপজ্জনক অবস্থায় সহযোদ্ধারা পশ্চাদাপসরণের পরামর্শ দেন ক্যাপ্টেন কাদেরকে। কিন্তু অকুতোভয় তেজদীপ্ত বীর সেনানী সহযোদ্ধা ছাত্র শওকত, ফারুক এবং দুই ইপিআর সৈনিককে সঙ্গে নিয়ে তিনটি এলএমজির অবিরাম গুলি বৃষ্টি কোণঠাসা করে ফেলে শত্রুদের।

এই চরম মুহুর্তে হঠাৎ এক সহযোদ্ধার এলএমজির ফায়ারিং বন্ধ হয়ে যায়। শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার জীবনকে শত্রুর হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখার তিনটি এলএমজির একটি অচল হয়ে পড়ায় অস্থির হয়ে পড়েন ক্যাপ্টেন কাদের। মেরামতের জন্য দ্রুত অস্ত্রটি তাঁর কাছে নিয়ে আসার নির্দেশের পরও সহযোদ্ধা শওকতের আসতে খানিক দেরি হওয়ায় যুদ্ধরত কাদের নিজেই ক্রলিংকরে এগিয়ে যেতেই শত্রুর অস্ত্রের কয়েকটি গুলি এসে বিঁধে তার ডান বগলের কয়েক ইঞ্চি নিচে এবং পেটের বাম পাশে। গুলিবৃষ্টির মধ্যেই গুরুতর আহত কাদেরকে বহন করে একটু নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসেন শওকত, ফারুক ও ইপিআরের ড্রাইভার আব্বাস। সেখান থেকে চিকিৎসার জন্য জিপ গাড়িযোগে রামগড় আসার পথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বাংলার এ তরুণ বীরযোদ্ধা। তখনও তাঁর বিয়ের মেহেদীও হাত থেকে মুছে যায়নি।

ঐদিন শেষ বিকেলে সহযোদ্ধা ফারুক, শওকত ও ড্রাইভার আব্বাস বীর শহীদের মরদেহ নিয়ে রামগড় এসে পৌঁছলে এখানে সকলের মাঝে নেমে আসে শোকের ছায়া। সন্ধ্যার প্রাক্কালে রামগড় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ মোস্তফার পরিচালনায় শহীদ কাদেরের জানাজার নামাজ শেষে কেন্দ্রীয় কবরস্তানেপূর্ণ সামরিক ও ধর্মীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।

শহীদ কাদেরের পরনের রক্তমাখা কাপড়চোপড়, হাতের আংটি ও ঘড়ি সংরক্ষণ করেন ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কর্মকর্তারা। রামগড় পতনের পর এসব জিনিসপত্র ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় অবস্থিত মুক্তিবাহিনীর সদরদপ্তরে চিপ অফ মেজর মোহাম্মদ আব্দুর রবের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীতে তিনি রক্তমাখা জামাকাপড়, আংটি ও ঘড়ি ক্যাপ্টেন কাদেরের বড়ভাই সিরাজুল কাদেরের কাছে হস্তান্তর করেন।

ক্যাপ্টেন কাদেরের দুঃসাহসিক অবস্থান ও ভূমিকার কারণে মেজর শওকতের নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনীর কমপক্ষে ৫শ’ সদস্য নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ঐদিন রক্ষা পেয়েছিল। আর ২৭ এপ্রিলের এ যুদ্ধে মিজো ব্যাটালিয়নের ৪শ’ সৈন্য এবং পাকবাহিনীর কমান্ডো কোম্পানির ৪০ জনের মত সৈনিক হতাহত হয় মুক্তিযোদ্ধাদের বজ্র কঠিন আক্রমণে। ঐদিন খাগড়াছড়ি সদরেরও পতন হয় আর এর মাত্র পাঁচদিন পর ২ মে পতন হয় রামগড়ের।
লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জের টিওরী গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও

সাহিত্যিক মরহুম ড. এম আব্দুল কাদের এবং মরহুমা রওশন আরা বেগমের পঞ্চম পুত্র ক্যাপ্টেন কাদের ১৯৪৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর পিতার তৎকালীন কর্মস্থল দিনাজপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে ময়মনসিংহের মৃত্যুঞ্জয় স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৬৬ সালে আনন্দ মোহন কলেজ হতে আইএ পাশ করার পর আফতাব আল কাদের ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে বিএ অনার্সে।

১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ভর্তির ইন্টারভিউ দিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়ার পর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন কোয়েটায়। দুই বছর (লংকোর্স) প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার পর ১৯৬৯ সালে তিনি আর্টিলারি কোরে কমিশন প্রাপ্ত হন। তাঁর অসাধারণ কর্মদক্ষতা ও প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ চাকরিতে যোগাদনের আটমাস পর লেফট্যানেন্ট এবং তারও চার মাস পর ক্যাপ্টেন পদে পদন্নোতি পেয়ে তিনি যোগদান করেন হায়দ্রাবাদের ৪০ ফিল্ড রেজিমেন্টের অফিসার হিসেবে।  মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ ও গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৭৩ সালে সরকার ক্যাপ্টেন আফতাব আল কাদেরকে মরণোত্তর ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে।

শহীদ ক্যাপ্টেন কাদের ছাড়াও তার আরও তিন ভাই সিরাজুল কাদের, রেজাউল কাদের এবং আহসানুল কাদের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তার ছোট ভাই ঢাকা ডেন্টাল কলেজের ছাত্র আহসানুল কাদের মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। স্বাধীনের পর দেশ-বিদেশে বহু খুঁজেও স্বজনরা তাকে পায়নি।

রামগড়ের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জনাব মরহুম সুলতান আহমেদের উদ্যোগে রামগড় কবরস্থানে শহীদ কাদেরের কবরটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় বিডিআর(বর্তমান বিজিবি) কর্তৃপক্ষ এবং খাগড়াছড়ি স্থানীয় সরকার পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যানসমীরণ দেওয়ানের উদ্যোগে সর্বশেষ শহীদের এই কবরটি সুদৃশ্যভাবে উন্নয়ন করা হয়।

২০০০ সালে মহালছড়ির প্রবেশদ্বারে নির্মাণ করা হয় বীর শহীদের স্মরণে একটি স্মৃতি ভাস্কর্য। মহালছড়ি সেনা জোনের তৎকালীন কমান্ডার লে. কর্নেল আবু সায়েদ খানের উদ্যোগে নির্মিত সুদৃশ্য এ ভাস্কর্যটির শিল্পী হচ্ছে চট্টগ্রাম কর্ণফুলী শিশু পার্কের তৎকালীন চিফ ডিজাইনার শামীম আহাম্মদ। এছাড়াও এই বীর শহীদের বীরত্ব গাঁথা গৌরবোজ্জ্বল অবদান ইতিহাস নবপ্রজন্মের কাছে চির স্মরণীয় করে রাখতে শহীদ ক্যাপ্টেন কাদেরের নামে চট্টগ্রাম সেনানীবাসের প্যারেড গ্রাউন্ড, রামগড় ও খাগড়াছড়ি জেলা শহরে একটি করে সড়কের নামকরণসহ রামগড় ও গুইমারায় দুইটি শিশু স্কুলের নামকরণ করা হয়েছে।

তথ্যঋণ: শহীদ ক্যাপ্টেন কাদের এর কয়েকজন সহযোদ্ধা, তাঁর পরিবার ও কাজী সাজ্জাদ আলী জহির সম্পাদিত ‘মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ক্যাপ্টেন আফতাব কাদের বীরউত্তম’ গ্রন্থ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *