মানবাধিকার কর্মীরা ঝুঁকির মধ্যে আছে, মিথ্যা মামলা দিয়ে ফাঁসানো হচ্ছে- সুলতানা কামাল


স্টাফ রিপোর্টার:

‘আদিবাসীদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসুন’- এই স্লোগানকে সামনে রেখে কাপেং ফাউন্ডেশন আজ ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে দিনব্যাপী ‘আদিবাসী মানবাধিকার সুরক্ষাকর্মীদের সম্মেলন- ২০১৮’ আয়োজন করেছে।

ওই সম্মেলনের উদ্বোধনী ঘোষণা করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান। সম্মেলনের উদ্বোধনী সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এ্যাড. সুলতানা কামাল, ।বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান হাই কমিশনের ডেপুটি হাই কমিশনার মিসপেনী মর্টন, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিব দ্রং। উদ্বোধনী সভাটিসভাপতিত্ব করেন কাপেং ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ও জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথসরেন। সম্মেলনের এ অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন এবং পরিচালনা করেন কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সুলতানা কামাল বলেন দেশে যারা মানবাধিকার নিয়ে কাজ করছে তারা এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তাদেরকে হুমকি ও মিথ্যে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। একদিকে রাষ্টপক্ষ নিজেও মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করছে না, আবার যারা এসব কাজ করছে তাদের পাশে গিয়েও দাঁড়াচ্ছেনা। বরং মানবাধিকার কর্মীদেরকে সরকার মাঝে মাঝে রাষ্ট্রদ্রোহী বলে সম্বোধন করছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, মানবাধিকারকর্মীগণ কিন্তু সংবিধান মেনে নিয়েই মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করে যাচ্ছে তাহলে তারা রাষ্ট্রদ্রোহী হয় কী করে? তিনি বলেন, আমাদের স্বাধীনতার মুক্তিরসনদেও মানুষের মুক্তির কথা বলা আছে। বরং যারা তাদেরকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলে তারাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষে কথা বলছেন।

তিনি আরও বলেন, ‘আমি মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করে আমার নিজেকে রক্ষার অধিকার আমার রয়েছে। সে চেতনাটি আমাদের মানবাধিকারের পক্ষে কাজ করতে ধাবিত করে। এ কাজ করতে গিয়ে আমাদের বিভিন্ন ভাবে মিথ্যে মামলা দিয়ে ফাঁসানো হচ্ছে’।

তিনি আরও বলেন, মানবাধিকার কর্মীদের সবসময় ভয়ে জীবনযাপন করতে হচ্ছে। মানবাধিকারের কাজকে আজ ক্রিমিনালাইজড করা হচ্ছে। তিনি বলেন, উপজাতিরা এদেশে অন্যন্ত খারাপ অবস্থায় রয়েছে। তাদের ভূমি দখল করা হচ্ছে, উপজাতি নারীদের নির্যাতন করা হচ্ছে, তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এখানে রাষ্ট্র তাদের পাশে না দাঁড়িয়ে বরং নির্যাতনকারীদের পাশে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। একটি সুন্দর দেশ গড়ার লক্ষ্যে তিনি উপজাতি ও অ-উপজাতি মানবাধিকার কর্মীদের একসাথে এগিয়ে এসে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধহতে আহ্বান করেন।

উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. মিজানুর রহমান দেশের উপজাতিদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।সামনে জাতীয় নির্বাচনে যেন উপজাতি সংখ্যালঘুরা কোনভাবেই নির্যাতন বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার না হন সেজন্য তিনি সরকারকে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিতে বলেন।

অস্ট্রেলিয়ানহাই কমিশনের ডেপুটি হাই কমিশনার মিস. পেনী মর্টন বলেন, অস্ট্রেলিয়ান সরকার আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠায় খুব তৎপর এবং অস্ট্রেলিয়ায় এবং সারবিশ্বে সে সরকার বিভিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়া সরকার আদিবাসী অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র(ইউএনড্রিপ) সমর্থন করেছে। এদেশেও অস্ট্রেলিয়ান সরকার বাংলাদেশ সরকার ও নানা এনজিওদের সাথে উপজাতিদের অধিকার নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন,আগামী বছর থেকে অস্ট্রেলিয়া এ্যাওয়ার্ড বৃত্তিতে আদিবাসীদের জন্য ১০% কোটা সংরক্ষিত থাকবে।

সঞ্জীব দ্রং বলেন, একটি রাষ্ট্র কতটুকু মানবাধিকারে দিক থেকে উন্নত তা দেশের সংখ্যালঘু আদিবাসীদের মানবাধিকার অবস্থা পর্যালোচনা করলে জানা যায়। আমাদের দেশে উপজাতিরা ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘণের শিকার হন। উপজাতিদের অবস্থা উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি মূল স্রোতধারা বাঙালিমানুষের সমর্থন প্রয়োজন।

রবীন্দ্রনাথ সরেন উদ্বোধনী অধিবেশনের সভাপতির বক্তব্যে বলেন, দেশে উপজাতিদের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।তাদের ওপর বিভিন্ন নির্যাতন-নিপীড়ন, হত্যা-হামলা, ভূমি দখল, উচ্ছেদ ইত্যাদি কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তিনি উপজাতিদের অধিকার আদায়ে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলেন। আগামী নির্বাচনে উপজাতি নির্যাতনকারী ও ভূমি দখলকারী প্রার্থীদের তিনি বয়কট করতে বলেন।

সম্মেলনে বলা হয়, সাম্প্রতিকসময়ে উপজাতি নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কাপেং ফাউন্ডেশন-২০১৭ সালেই এরূপ ৫৭ জন উপজাতি ভিকটিমের ৪৮টিরও অধিক ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছে। এ বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত প্রায় ৪১জন উপজাতি নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণ, গণধর্ষণ, হত্যা, অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

কাপেং ফাউন্ডেশনের মতে, বান্দরবান জেলার আলিকদম-থানচির মধ্যবর্তী পাহাড়িএলাকার কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক উপজাতি নিরাপত্তার অভাবে মায়ানমারে দেশান্তরিত হয়েছেন। উত্তরবঙ্গে কয়েকশত উপজাতি, সাম্প্রদায়িক হুমকি ও আক্রমণের কারণে এবং ভূমিদস্যুদের ভয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থা আরও সংকটজনক।পার্বত্য চট্টগ্রামে অনেক আশা নিয়ে ১৯৯৭ সালে সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিরমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, এ চুক্তির ২০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও মৌলিক বিষয়গুলো এখনও অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে।এসব কিছুর পরও উপজাতি জনগণ তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করে চলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *