প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে একুশে পদক নিলেন মংছেনচীং মংছিন রাখাইন


2016-02-20_8_689648

স্টাফ রিপোর্টার:

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের অধিবাসীদের মধ্যে প্রথম একুশে পদক পেলেন খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ির সাংবাদিক গবেষক মংছেনচীং মংছিন রাখাইন।শনিবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে তিনি এ পুরস্কার গ্রহণ করেন। পুরস্কার প্রাপ্তির প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া  হিসেবে মংছেনচীং মংছিন রাখাইন পার্বত্যনিউজকে বলেন, আমি অভিভূত, আমার জীবন সার্থক মনে হচ্ছে।

শনিবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখায় দেশের ১৬ জন বিশিষ্ট নাগরিককে একুশে পদক প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সভাপতিত্বে এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলমের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব আকতারী মমতাজ। পদকপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তাদের পদকপ্রাপ্তির সাইটেশন পাঠ করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম।

ভাষা আন্দোলনে বিশেষ অবদানের জন্য বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, ডা. সাঈদ হায়দার, ড. জসীম উদ্দিন আহমেদকে পুরস্কার প্রদান করা হয়। এই বিভাগে মরহুম সৈয়দ গোলাম কিবরিয়ার (মরণোত্তর) পুরস্কার গ্রহণ করেন তার জ্যেষ্ঠ সন্তান মিসেস রোকেয়া বেগম।  শিল্পকলায় গৌরবজনক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অভিনেত্রী নাট্যকার ও প্রযোজক বেগম জাহানারা আহমেদ, শাস্ত্রীয় সংগীতে উচ্চাঙ্গ সংগীত শিল্পী পন্ডিত অমরেশ রায় চৌধুরী, সংগীতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী বেগম শাহীন সামাদ, নৃত্যে নৃত্যনাট্যকার আমানুল হককে একুশে পদক প্রদান করা হয়। চিত্রকলায় শিল্পী মরহুম কাজী আনোয়ার হোসেনের (মরণোত্তর) পক্ষে সহধর্মিনী মিসেস সুফিয়া আনোয়ার প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদক গ্রহণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদানের জন্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি মফিদুল হক, সাংবাদিকতায় বিশিষ্ট সাংবাদিক দৈনিক জনকন্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খানকে এ বছর একুশে পদক প্রদান করা হয়। গবেষণায় অধ্যাপক ড. এ বি এম আব্দুল্লাহ এবং লেখক ও নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধি মংছেন চীং মংছিনকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। ভাষা ও সাহিত্যে গৌরবজনক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কথাশিল্পী জ্যোতি প্রকাশ দত্ত, অধ্যাপক ড. হায়াৎ মামুদ এবং কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজীকে এ বছর একুশে পদক প্রদান করা হয়।

পদকপ্রাপ্তদের ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের তৈরি ৩৫ গ্রাম ওজনের একটি পদক, দুই লাখ টাকা, একটি সম্মাননাপত্র এবং একটি রেপ্লিকা প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে আরো সচেতন হওয়ার আহবান জানান।

তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে স্বীকৃত যে ভাষা সেটাকেই পর্যায়ক্রমে গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু আমাদের মাতৃভাষার স্বকীয়তাও রক্ষা করতে হবে।’

মাতৃভাষা শিক্ষা নেয়ার পর অন্য ভাষা শিখলেই প্রকৃত শিক্ষাটা হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কাজেই এ বিষয়ে আমাদের সমাজকে আমি আরো একটু সচেতন হওয়ার আহবান জানাচ্ছি। আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা যেটা এত রক্তের বিনিময়ে পেয়েছি সেটা যেন ধারণ করতে পারি।’

তিনি একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিহাস বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে আহবান জানিয়ে বলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি যে ইতিহাস সেটা আমরা বিশ্বব্যাপী তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছি। এ বিষয়ে আমি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করবো আরো কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করতে।’

প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে অমর একুশে ফেব্রƒয়ারিকে স্বীকৃতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে বলেন, ‘কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম, আবদুস সালামের মত প্রবাসী বাঙালিদের প্রচেষ্টায় এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আন্তরিক উদ্যোগে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ২১ ফেব্রুয়ারি ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।’

তিনি বলেন, ‘কানাডা প্রবাসী রফিক ও সালাম, আপনাদের মনে আছে ভাষা আন্দোলনেও রক্ত দিয়েছিল রফিক ও সালামরা। তারা একটা সংগঠনের মাধ্যমে জাতিসংঘে প্রস্তাব পাঠালে (জাতিসংঘ) আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। …মাত্র ২৪ ঘন্টারও কম সময়ে নিয়মানুযায়ী সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে আমরা প্রস্তাব পাঠাই। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্যারিসের ইউনেস্কো সম্মেলনে ভোটের মাধ্যমে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়।’

একুশে পদকপ্রাপ্তদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আশা করি আপনাদের মাধ্যমে দেশের মর্যাদা আরও বাড়বে। ভবিষ্যত প্রজন্ম উজ্জীবিত হবে।’

তিনি বলেন, দেশে আজ অনেকেই আছেন যাদের আমরা মূল্যায়ন করতে পারছি না। তাদের ও আপনাদের মূল্যায়ন এই পুরস্কারের মধ্যদিয়ে হয় না। তবে, আমরা শুরু করেছি। আমরা চাই আপনাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে যাতে ভবিষ্যত প্রজন্ম সঠিক পথে চলতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘পুরস্কার বড় কিছু না, আপনাদের অর্জন তার চাইতে অনেক বড়।’

এদিকে পুরস্কার গ্রহণের পর মংছেনচীং মংছিন রাখাইন পার্বত্যনিউজকে তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমি বঙ্গবন্ধু কন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞ আমাকে এই সম্মান দেয়ার জন্য। আমার জীবনে আর কোনো চাওয়া পাওয়ার নেই। আমি এখন শান্তিতে মরতে পারবো। আমার পরিবার, স্বজনেরা আমাকে নিয়ে গর্বিত হবে। আমি আমার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তরুণদের কাছে দৃষ্টান্ত রেখে গেলাম। আশা করি এই পুরস্কার তাদেরকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাবে।

এই পুরস্কার তাকে দেশের কাছে, জাতির কাছে আরো দায়বদ্ধ করে দিয়েছে জানিয়ে মংছেনচীং মংছিন রাখাইন বলেন, আমি এখন আরো কাজ করবো, আরো বই লিখবো। এই পুরস্কার আমাকে সেই প্রেরণা দিয়েছে।

উল্লেখ্য মংছেনচীং মংছিন খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলা সদর এলাকার মানিক ডাক্তার পাড়ার বাসিন্দা হলেও জন্ম ১৯৬১ সালের ১৬ জুলাই কক্সবাজারের চাউল বাজার সড়কের ঐতিহ্যবাহী রাখাইন বৌদ্ধ পরিবারে।


মংছেনচীং মংছিনকে নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট পড়ুন এই লিংকে-

♦ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে প্রথম একুশে পদক পেলেন মহালছড়ির মংছেনচীং মংছিন রাখাইন

image_pdfimage_print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *