বৈসাবির স্পেশাল রান্না


বৈসাবি উপলক্ষে অতিথি আপ্যায়নে রান্না করা হয় বিশেষ বিশেষ খাবার আইটেম। ঐতিহ্যবাহী খাবার আইটেমের পাশাপাশি আজকাল যোগ হচ্ছে আধুনিক নানা রকম খাবার। বাঙালির নববর্ষেও তার কমতি থাকে না। পার্বত্যনিউজ পাঠকদের জন্য বৈসাবি ও নববর্ষের জন্য স্পেশাল কিছু রান্নার রেসিপি পাঠিয়েছেন- জয়ী চাকমা

বৈসাবির মূল খাবার পাঁচন
উপকরণ: কাঁঠাল, তারা, তুলা ফুল, শুকনা মুলা, বাঁশ, আলু, শিম, করলা, বেগুনসহ ৩৩ প্রকারের প্রকারের শাক-সবজি ২ কেজি (বেশি হলে অসুবিধে নেই), মিক্স শুঁটকি (ছুঁড়ি, চিংড়ি, লইট্যা, ফাইস্যা, কেউ চাইলে হাঙ্গর ও শামুকেরও দিতে পারেন ) ২ কাপ, তেল ৪ টেবিল চামচ, জিরা ও ধনে ১ চা চামচ, আদা ১ চা চামচ, রসুন ১ চা চামচ, পেঁয়াজ বাটা ১ চা চামচ, পেঁয়াজ কুচি ১ কাপ, মরিচ ২ টে. চামচ, লবণ ও পানি পরিমাণ মতো।

প্রণালি-১: কাঁঠাল, শুকানো তুলা ফুল, মূলা ও বাঁশ সিদ্ধ করে নিতে হবে।

প্রণালি-২: প্রথমে একটি হাঁড়িতে তেল গরম করে নিতে হবে। তেল গরম হয়ে এলে পেঁয়াজ কুচি ভেঁজে নিতে হবে। পেঁয়াজ ভাঁজা হয়ে এলে জিরা, মরিচ, ধনে, আদা, রসুন ও পেঁয়াজ বাটা দিয়ে হালকা পানি দিয়ে কষাতে হবে। মশলা পানি শুকিয়ে এলে সব শুটকি দিয়ে হালকা ভেঁজে নিতে হবে। এরপর সবজি দিয়ে কষিয়ে পরিমাণ মতো পানি দিতে হবে। সবজি সেদ্ধ হয়ে ঝোল মাখামাখা হয়ে এলে নামিয়ে নিয়ে পরিবেশন করতে হবে।

ব্যাম্বো চিকেন
উপকরণ: মুরগী ১ কেজি, আদা বাটা ১ টে. চামচ, রসুন বাটা ১ টে. চামচ, পেঁয়াজ কুচি ১ কাপ, পেঁয়াজ বাটা ১ টে. চামচ, গরম মশলা ১ চা চামচ, তেল ২ টে. চামচ, কাঁচা মরিচ বাটা ২ চা চামচ, লবণ ও হলুদ পরিমাণ মতো।

প্রণালি: সব উপকরণ এক সাথে মিক্স করে ১৫ মিনিট রেখে দিতে হবে। এবার একটি বাঁশের মধ্যে মিশানো মাংস আস্তে আস্তে ঢুকাতে হবে। মাংস ঢুকানোর পর বাঁশের মুখ কলাপাতা কিংবা পলিথিন দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দিয়ে চুলায় কয়লার আগুনের আঁচের উপর বসাতে হবে। একটু পর পর বাঁশ কয়লার চারপাশে ঘুরিয়ে বা নাড়িয়ে দিতে হবে। কয়লার আগুনের তাপের উপর নির্ভর করে সিদ্ধ হওয়ার সময়। খেলায় রাখতে হবে বাঁশ যেন পুড়ে না যায় এবং চুলায় কয়লা যাতে পরিমাণ মতো থাকে।

এবার নির্দিষ্ট সময়ের পর যখন বয়েলিং পয়েন্টে আসবে তখন চোঙাটি থেকে বাস্প বেরিয়ে এলে আরো ১০-১৫ মিনিট পর চোঙাটি নামিয়ে ফেলুন। তারপর চোঙাটি মাঝ খান বারাবর কেটে ডিস সাজিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

বিন্নি চালের ভাত
উপকরণ: বিন্নি চাল ১ কেজি, নারকেল কোড়ানো ২ কাপ, লবণ পরিমাণ মতো।

প্রণালি-১: ফোগুন (এমন একটি পাত্র যে পাত্রের নিচে ছোট ছোট ছিদ্র আছে) ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। এবার ফোগুনের ভিতর ছিদ্রের উপরে একটি বাঁেশর চাঁটাই কিংবা নেট বসাতে হবে যাতে ছিদ্র দিয়ে চাল পরে না যায়।

প্রণালি-২: বিন্নি চাল, কোড়ানো নারকেল ও লবণ একটি পাত্রে নিয়ে মিক্স করে নিতে হবে। এবার মিক্স বিন্নি চালগুলো ফোগুনের ভিতরে হাত দিয়ে আস্তে আস্তে ঢেলে দিতে হবে। একটি বড় মুখের একটি পাত্র তিন ভাগের দুই ভাগ পানি দিয়ে চুলায় বসাতে হবে। এবার পাত্রের উপর বিন্নি চালের ফোগুন বসাতে হবে। ফোগুনের উপর একটি ঢাকনা দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন বাতাস বের না হয়। পানির ভাপে আধা ঘণ্টার মধ্যে বিন্নি চাল সিদ্ধ হয়ে যাবে।
গরম গরম বিন্নি ভাত পরিবেশন করুন শুটকি ভর্তা কিংবা পাঁচন তরকারী দিয়ে।

মুরগী গুদিয়ে বা গুদাইয়ে
উপকরণ: মুরগী ১ কেজি, আদা কুচি ১ টে. চামচ, রসুন কুচি ১ টে. চামচ, পেঁয়াজ কুচি ৩ কাপ, গরম মশলা ১ চা চামচ, তেল ৩ টে. চামচ, কাঁচা মরিচ ২ কাপ, লবণ ও হলুদ পরিমাণ মতো।
প্রণালি: সব উপকরণ এক সাথে মেখে একটি পাত্রে নিয়ে চুলায় বসাতে হবে। কষানো মাংসের পানি শুকিয়ে এলে দুই কাপ পানি দিতে হবে। সব পানি শুকিয়ে তেল উপরে এলে নামিয়ে নিতে হবে। এবার একটি হামান দিস্তার সাহায্যে সব উপকরণ ছেঁচে নিতে হবে। এরপর গুদিয়ে শাক সিদ্ধ দিয়ে পরিবেশন করুন ভাতের সাথে।

আম-ডালের অম্ল
উপকরণ: মটর ডাল আধা কাপ, মসুর ডাল আধা কাপ, কাঁচা মরিচ ৪টি, হলুদগুঁড়া ১ চা-চামচ, লবণ পরিমাণমতো, সরিষা সিকি চা-চামচ, পেঁয়াজকুচি ২ টেবিল-চামচ, তেল ২ টেবিল-চামচ, তেজপাতা ২টি, কাঁচা আম ২টি, কারি পাউডার ১ চা-চামচ, শুকনা মরিচ ২ টেবিল-চামচ।
প্রণালি: ডাল ১ টেবিল-চামচ, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, তেজপাতা, লবণ, পানিসহ অল্প আঁচে ১০ মিনিট রেখে নামাতে হবে। আম ছিলে টুকরা করে আধা কাপ পানি, সামান্য লবণ ও হলুদ দিয়ে আধা সেদ্ধ করে ডালের সঙ্গে মেশাতে হবে। তেল গরম করে শুকনা মরিচ ও সরিষা ফোড়ন দিয়ে রসুনকুচি ও পেঁয়াজকুচি দিয়ে বাদামি রং করতে হবে। পরে ডাল ঢেলে কাঁচা মরিচ ও কারি পাউডার দিয়ে কিছুক্ষণ রেখে নামাতে হবে। একটু গাঢ় করার জন্য ১ চা-চামচ চিনি দিয়ে সামান্য নেড়েচেড়ে পরিবেশন করতে হবে।

চাল ও তিলের মোয়া
উপকরণ: চালের ক্ষুদ দেড় কাপ, খেজুরের ঝোলা গুড় ১ কাপ, আদা কুচি ১ চা চামচ, মৌরি ১ চা চামচ, লবণ সামান্য।
প্রণালি: খেজুরের ঝোলা গুড় সামান্য পানি দিয়ে চুলায় বসান। আদা কুচি ও মৌরি দিন। সিরা ঘন হলে বুঝবেন সিরা তৈরি। অন্যদিকে চালের ক্ষুদ সামান্য লবণ ও একটু পানির ছিটা দিয়ে মেখে নিন। শুকনা তাওয়ায় লাল করে ভাজুন। সিরায় দিয়ে নাড়ুন। সিরা চুলার উপরেই রাখবেন। এক মিনিট পর নামিয়ে প্লেটে ঢালুন। অল্প গরম থাকতেই হাতে পানি মাখিয়ে পছন্দমতো শেপে মোয়া বানিয়ে নিন। বাংলা নববর্ষে এই মোয়া দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করতে পারেন।

আম কাসুন্দি
উপকরণ: কাঁচা আম ৪টি, কাসুন্দি আধা কাপ, ভাজা শুকনা মরিচের গুঁড়া ২ চা-চামচ বা ইচ্ছেমতো, লবণ পরিমাণমতো, চিনি আমের টক বুঝে সামান্য, সরিষার তেল ১ চা-চামচ।
প্রণালি: আমের খোসা ছিলে আঁটি বাদ দিয়ে টুকরো করে সবজি কুড়ানি দিয়ে ঝুরি করে নিন। সব উপকরণ দিয়ে মাখিয়ে কিছুক্ষণ রেখে পরিবেশন করুন।

লাউ ও গাজরের পায়েস

উপকরণ: লাউ মিহি কুচি গ্রেট করা ২ কাপ, গাজর মিহি কুচি গ্রেট করা ১ কাপ, নারিকেল কোড়ানো ১ কাপ, দুধ ২ লিটার, কনডেন্সড দুধ ১ কৌটা, এলাচ গুঁড়ো আধা চা চামচ, ঘি ৩ টেবিল চামচ, পেস্তা বাদাম কিসমিস সাজানোর
জন্য পরিমাণমতো।

প্রণালি: লাউ ও গাজর পানিতে আধা সেদ্ধ করে কাপড়ে চিপে শুকিয়ে নিতে হবে। ঘিয়ে লাউ ও গাজর ভুনে নিতে হবে। ২ লিটার দুধ ঘন করে নিয়ে লাউ ও গাজর নারিকেল দিয়ে ভাল করে নেড়ে নেড়ে ঘন হয়ে এলে এলাচ গুঁড়ো দিয়ে নামাতে হবে। পেস্তা বাদাম কিসমিস দিয়ে সাজিয়ে ঠান্ডা ঠান্ডা পরিবেশন করতে হবে।

কুমড়ো ফুলের বড়া
উপকরণ: কুমড়ো ফুল ১২টা, বেসন অর্ধেক কাপ, চ্যাপা শুঁটকির ভর্তা ৪ টেবিল চামচ, লবণ স্বাদমতো, তেল ভাজার জন্য, হলুদ গুঁড়া অর্ধেক চা চামচ, মরিচ গুঁড়া অর্ধেক চা চামচ, খাবার সোডা সামান্য।

প্রণালি: বেসন, লবণ, খাবার সোডা, হলুদ-মরিচ গুঁড়া ও পানি একসঙ্গে মিশিয়ে একটি গোলা বানান। মাঝারি ঘনত্বের গোলা হবে। কুমড়োর ফুল ধুয়ে মাঝখান থেকে চিরে ভিতরে শুঁটকি মাছের ভর্তা ভরে ফুলটা মুড়িয়ে নেন। এবার বেসনের গোলায় চুবিয়ে ডুবো তেলে মচমচে করে ভেজে পরিবেশন করুন খিচুড়ি বা ভাতের সঙ্গে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *