বিয়ের নামে চীনের পতিতালয়ে বিক্রি হচ্ছে বাংলাদেশের পাহাড়ি মেয়েরা


পার্বত্যনিউজ ডেস্ক:

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি রাঙ্গামাটিতে গত মাসে ভ্রমণে আসেন এক চীনা তরুণ। এক সপ্তাহের মধ্যে পাহাড়ি সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে সখ্যতা করেন পাহাড়ি বাঙালিদের সঙ্গে। বন্ধুত্ব করেন পাহাড়ি অল্প শিক্ষিত তরুণীদের সঙ্গে। হঠাৎ এক তরুণীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেন তিনি। বিয়ে করে চীনে নিয়ে যাবে- এমন প্রস্তাবে রাজি হয় তরুণীর পরিবার। উন্নত জীবনের আশায় বিয়ে করেন ওই তরুণী। বিয়ের কিছুদিনের মধ্যে চীনে চলে যান তারা। এরপর পরিণতি ভয়ঙ্কর!

এভাবে গত ৬ মাসে পার্বত্য জেলার রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের কমপক্ষে ১৭ জন পাহাড়ি তরুণীকে বিয়ে করেছে বেড়াতে আসা চীনা নাগরিকরা। এরপর তাদের নিয়ে গেছে চীনে। এসব তরুণীদের সবাই অল্প শিক্ষিত। ৯ম শ্রেণি থেকে এসএসসি পাস। সহজ-সরল এসব দরিদ্র পাহাড়ি মেয়েদের এভাবে বিয়ের ফাঁদে ফেলে পাচার করা হচ্ছে চীনে। চীনে নিয়ে ৩-৪ মাস সংসার করার পর পতিতালয়ে বিক্রি করা হচ্ছে তাদের। অনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে পাহাড়ি মেয়েদের।

সম্প্রতি সুবর্ণ চাকমা নামের এক পাহাড়ি তরুণীকে পাচার করার সময় উদ্ধার করে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। সঙ্গে গ্রেফতার করে এক চীনা নাগরিকসহ ৩ জনকে। সেই সূত্র ধরে বিয়ে করে চীনে যাওয়া মেয়েদের খোঁজ নেয়া শুরু করে তারা। তদন্ত উঠে এসেছে, ‘পাচার হয়েছে পাহাড়ি মেয়েরা।’

সুবর্ণ পাচারের শিকার হচ্ছে বুঝতে পেরে থানায় একটি মামলা করে তার পরিবার। মামলা নিয়ে ডিবি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরে ডিবি অভিযান চালিয়ে উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টরের ১৫ নম্বর রোডের ৬৮ নম্বর বাসার ৬ তলা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় গ্রেফতারকৃতরা জানায়, তারা এভাবে মারশী চাকমা, ইলা চাকমা ও হেলেনা চাকমাসহ বেশ কয়েকজন নারীকে চীনে পাঠিয়েছে।

ভুক্তভোগী সুবর্ণা চাকমা বলেন, দরিদ্রতার কারণে চাকরি খুঁজছিলাম। এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে আছাফুন নাহার লিপির সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি আমাকে চীনে ভালো চাকরি দেয়ার কথা বলে উত্তরার একটি ম্যারেজ মিডিয়াতে নিয়ে আসে। পরে বুঝতে পেরে বিষয়টি পরিবারকে জানালে ডিবি আমাকে উদ্ধার করে।

তদন্ত ভিত মজবুত করতে বাংলাদেশ থেকে চীনে যাওয়া দুই পাহাড়ি তরুণীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিবি। দিনে কয়েক দফা তরুণীর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইমো’তে ভিডিও কল করে। তদন্তের কৌশল হিসেবে ডিবির একজন কর্মকর্তা তাদের সঙ্গে সকালে, দুপুরে, রাতে এবং মধ্য রাতে কথা বলেন।

ডিবির ওই কর্মকর্তা বলেন, তারা (দুই পাহাড়ি তরুণী) ফোনে বলেছে ভালো আছে। তবে আমাদের কাছে একটা বিষয় অবাক লেগেছে। যখনই সেই তরুণীদের ভিডিও কল দেয়া হয় তখনই তাদের পেছনে স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়িকে ক্যামেরায় দেখা যায়। এমন মনে হয় তারা আমাদের দেখানোর জন্য ভিডিও কলের সময় তরুণীদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে।

অভিনব এই মানবপাচারের কৌশল নিয়ে তদন্ত করছেন ডিবির পরিদর্শক মো. আরমান আলী। তিনি বলেন, ‘অধিকতর তদন্তের জন্য চীনে যাওয়া প্রয়োজন। ইতোমধ্যে মামলাটি তদন্তে চীনে যাওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে।’

বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় তদন্ত করে ডিবি জানতে পারে, বাংলাদেশের ম্যারেজ মিডিয়াগুলো পাহাড়ি মেয়েদের তথ্য সংগ্রহ করে চীনা মিডিয়াগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে। সেখান থেকে তথ্য নিয়ে চীনা পুরুষরা বাংলাদেশে এসে বাংলাদেশি ম্যারেজ মিডিয়ার মাধ্যমে ওই সব মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের বিয়ে করে। এছাড়া পাহাড়িরা কম শিক্ষিত, সহজ-সরল এবং নিম্ন আয়ের। তারা অতি অল্পতে মানুষকে বিশ্বাস করে, বিশ্বাস করতে ভালবাসে। তাই চীনা যুবকদের বিয়ে করতে অত কষ্ট হয় না। বিয়ের পর তারা চীনা দূতাবাসে গিয়ে অনুমতি নিয়ে তাদের চীনে নিয়ে যায়।

এই কাজের সঙ্গে উত্তরার এম এন্টারপ্রাইজসহ ১০টি ম্যারেজ মিডিয়ার সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে ডিবি। সম্প্রতি হাতেম নামে একটি ম্যারেজ মিডিয়ার মালিককে গ্রেফতার করেছিল ডিবি। জিজ্ঞাসাবাদে হাতেম ডিবিকে জানায়, চাইনিজদের সঙ্গে বাংলাদেশি পাহাড়ি মেয়েদের বিয়েতে তারা ৩০ হাজার টাকা করে আয় করে।

যে কারণে পাহাড়ি তরুণী পছন্দ চীনাদের

কয়েকজন চীনা নাগরিকের সঙ্গে কথা বলে ডিবি জানতে পারে, সে দেশের পতিতালয়ে অধিকাংশ নারী নেপাল এবং মিয়ানমারের। তবে চীনা পুরুষরা একরাতের সঙ্গী হিসেবে চীনা মুখ বেশি পছন্দ করে। বাংলাদেশের পাহাড়ি মেয়েদের সঙ্গে চীনের মেয়েদের চেহারা মিলে যাওয়ায় তাদের চাহিদা বেশি।

২-৩ বছর আগেও চাইনিজ ও দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকরা বিয়ের জন্য লাউস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে যেতেন। সেখানকার অনেক নারী প্রতারণা ও পাচারের শিকার হওয়ায় সে দেশের সরকার বিদেশিদের বিয়ে করায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তাই চাইনিজ নাগরিকরা বিয়ের জন্য বাংলাদেশে আসছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য মতে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে পাচার হয়েছে ৬০ নারী ও শিশু। তাদের মধ্যে ৩৫ জন নারীকে পতিতালয়ে বিক্রি করে দিয়েছে পাচারকারী চক্রের সদস্যরা। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, ২০১৭ সালে বিভিন্ন দেশে গিয়ে যৌন হয়রানির শিকার ৯ জন নারীকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার শেখ নাজমুল আলম বলেন, চীনে নারী পাচার চলছে অভিনব কায়দায়। একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র প্রলোভন দেখিয়ে পাচারের কাজ করছে। এ ধরনের অপরাধ বন্ধে দু’দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছে, প্রাথমিক যোগাযোগের পর চীনা নাগরিকরা বাংলাদেশে এসে বিয়ের পর চীনে নিয়ে যাওয়ার কয়েক মাস পরই তাদেরকে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে অন্ধকার জগতে বিক্রি করে দিচ্ছে। উন্নত জীবনের আশায় মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে পার্বত্য জেলার মেয়েরা পাচারের শিকার হচ্ছেন। সম্প্রতি খাগড়াছড়ির সুর্বণা চাকমা (২৩) নামের এক মেয়েকে পাচারকালে চীন নাগরিকসহ তিনজনকে ডিবি পুলিশের গ্রেফতারের পর এই চাঞ্চল্যকর তথ্য বের হয়ে আসে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার শেখ নাজমুল আলম বলেন, অভিনব কায়দায় চীনে নারী পাচার করছে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। দেশের কয়েকটি ম্যারেজ মিডিয়া এ জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত। অপরাধ বন্ধে দু’দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কাজের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়িদের সরলতা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থাকে পুঁজি করে এভাবে নারী পাচার করছে সংঘবদ্ধ চক্র। পাচার বন্ধে তারা সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে ও দু’দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে একসঙ্গে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

নারী পাচারের সঙ্গে রাজধানী উত্তরার এম এন্টারপ্রাইজ, লাইফ মিডিয়াসহ অন্তত ১০টি ম্যারেজ মিডিয়ার সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঢাকার এই ম্যারেজ মিডিয়াগুলো মূলত পাহাড়ি মেয়েদের তথ্য সংগ্রহ করে চীনা মিডিয়াগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে। চীনা ম্যারেজ মিডিয়া থেকে তথ্য নিয়ে চীনা পুরুষরা ঢাকায় ছুটে এসে বাংলাদেশের ম্যারেজ মিডিয়ার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের বিয়ে করছে। চেহারা ও ধর্মের মিল থাকায় বিয়েতে তেমন জটিলতা হয় না। কোর্টের মাধ্যমে বিয়ে করে চীনা দূতাবাসে নিয়ে যাওয়া হয় এসব মেয়েকে।

পরে দূতাবাসের অনুমতি নিয়েই নববধূ হিসেবে পাহাড়ি মেয়েদের নিয়ে যাওয়া হয়। পাচারের অভিযোগে গত বছরের ৮ নভেম্বর উত্তরা থেকে ২য় ম্যারেজ মিডিয়ার মালিক হাতেমকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে হাতেম ডিবিকে চীনে নারী পাচারের নতুন রুট ও সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য দেয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, এ ধরনের প্রতি বিয়েতে তারা ৩০ হাজার টাকা করে পান। তবে চীন থেকে বাংলাদেশে আসা, থাকা-খাওয়া, বিয়ে করা, বিয়ে করে নিয়ে যাওয়া, ম্যারেজ মিডিয়ার কমিশন মিলে মোট ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা খরচ হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলছেন, চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সুসম্পর্ক রয়েছে। চীনের অনেক নাগরিক এ দেশে বিনিয়োগ করছে। এ ধরনের অপরাধের ফলে দুই দেশের সম্পর্কে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই শুরুতেই এ ধরনের অপরাধ বন্ধে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, পাচারের শিকার হচ্ছে বুঝতে পেরে সুবর্ণ চাকমা নামের এক পাহাড়ি মেয়ের পরিবার ডিবি পুলিশকে খবর দেয়।

পরে অভিযান চালিয়ে উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টরের ১৫ নম্বর রোডের ৬৮ নম্বর বাড়ির ৬ তলা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় জড়িত চীনা নাগরিকসহ ম্যারেজ মিডিয়ার দু’জনসহ চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। এরা হচ্ছেন আছাফুন নাহার লিপি, ঢাকার উত্তরায় বসবাসরত চীনা নাগরিক জু-হান ও ম্যারেজ মিডিয়ার জামান ও রশিদ। জিজ্ঞাসাবাদে জামান ও রশিদ তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জানায়, তারা এভাবে মারশী চাকমা, ইলা চাকমা, হেলেনা চাকমাসহ বেশ কয়েকজন নারীকে চীনে পাঠিয়েছে।

One thought on “বিয়ের নামে চীনের পতিতালয়ে বিক্রি হচ্ছে বাংলাদেশের পাহাড়ি মেয়েরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *