বিষমুক্ত শুটকি উৎপাদনের ধুম


কক্সবাজার প্রতিনিধি:

কক্সবাজারের বিশাল শুটকি উৎপাদনের কারখানা নামে খ্যাত পল্লী, শহরের সন্নিকটে নাজিরারটেকসহ বিভিন্ন উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় চলতি শুষ্ক মৌসুমে পুরোদমে চলছে শুটকি উৎপাদনের কাজ। উৎপাদিত এসব শুটকি পর্যটকদের চাহিদা পূরন ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্তসহ বিদেশে রফতানী করা হচ্ছে। কিন্তু শুটকিতে পোকা না পড়ার জন্য বিষ মিশানোসহ প্রচলিত পদ্ধতিতে শুকানো শুটকি নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। তবে এ বছর সম্পূর্ণ বিষ ও কীটনাশক মুক্ত শুটকি উৎপাদন করা হচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এজন্য শুটকি মহালের মালিক ও শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সচেতনতামূলক সভা-সেমিনার করে যাচ্ছেন স্থানীয় মৎস্য বিভাগ।

তবে মৌসুমের শুরুর দিকে ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান চালিয়ে নাজিরারটেক শুটকি পল্লীতে বিষ মেশানোর দায়ে দুই শুটকি মহালের মালিক এবং দুই শ্রমিককে জরিমানা ও সাজা দেয়া হয়েছে।

কক্সবাজার শহরের সন্নিকটে নাজিরারটেক শুটকি পল্লী ঘুরে দেখা যায়, শুটকি উৎপাদনে রাত-দিন ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকেরা। শ্রমিকদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। প্রায় ২৫ প্রজাতির কাঁচা মাছ রোদে শুকিয়ে তৈরি করা হয় শুটকি। এরমধ্যে রূপচাঁন্দা, ছুরি, কোরাল, সুরমা, লইট্ট্যা, পোপা, চিংড়ি, নাইল্ল্যা, ওলুয়া অন্যতম। বাঁশের মাচায় রেখে তা শুকানোর কাজে ব্যস্ত শ্রমিকেরা। বর্ষার ৩ মাস ছাড়া বছরের ৯ মাস শুটকি তৈরি হয় এখানে। তবে সবচেয়ে বেশি শুটকি উৎপাদন হয় শীত মৌসুমে। আর এ শুটকি মহালে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে শত শত শ্রমিক। শ্রমিকদের দৈনিক ও সাপ্তাহিক হারে মজুরী পরিশোধ করেন মহাল মালিকরা। শ্রম বাজারের মজুরী এখানে কাটুনীর চেয়ে অনেক কম বলে মন্তব্য করেন শ্রমিকেরা। সারাদিন-রাত কাজে খাটিয়ে নামে মাত্র বয়স্কদের তিন/চার’শ ও শিশুদের দেড়/দুই’শ করে মজুরী দেয়া হয়। অভাবের তাড়নায় এ অঞ্চলের শ্রমজীবীদের অন্যত্র গিয়ে কাজ করার সামর্থ নেই বললেন অনেকেই।

এবছর শুটকির গুনগতমান ও সুনাম ধরে রাখতে সম্পূর্ণ বিষ ও কীটনাশক মুক্ত পরিবেশে উৎপাদন করা হচ্ছে শুটকি। শুটকি মহালের কর্মকর্তা ও স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তাদের সহায়তায় প্রাকৃতিক উপায়ে কিভাবে শুটকি উৎপাদন করা যায় সে জন্য জেলে, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের মাঝে বিভিন্ন জনসচেতনতামুলক সভা-সেমিনার করে যাচ্ছেন।

এ ব্যাপারে নাজিরারটেক মৎস্য ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড এর সভাপতি মো. আতিক উল্লাহ কোম্পানি জানান, ‘প্রথমে বুঝতে না পেরে শুটকি উৎপাদনের আগে কিটনাশক ব্যবহার করা হত। এ বছর থেকে আমরা সকলে শপথ নিয়ে সম্পুর্ণ বিষ-কিটনাশক মুক্ত ও স্বাস্থ্য সম্মতভাবে শুটকি উৎপাদন করছি’।

দেশের বৃহত্তম এ মহাল থেকে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও শুটকি সরবরাহ ও রপ্তানী করা হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানালেন। পর্যটকদের কাছেও প্রিয় এ শুটকি। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিরাট ভুমিকা রাখছে এ শুটকি পল্লী। শুটকি উৎপাদনে কেউ যাতে কিটনাশক ব্যবহার করতে না পারে সে লক্ষ্যে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এ বছর ১৬টি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ৪’শত জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে বলে জানান, সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন আহমেদ।

গত ৮০ দশকের শুরু থেকে কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক এলাকাসহ কুতুবদিয়া, সোনাদিয়া, শাহপরীরদ্বীপ ও সেন্টমার্টিনে বিপুল পরিমান শুটকি উৎপাদন হচ্ছে। সেই থেকে কক্সবাজারের বিভিন্ন মহালের শুটকি দেশে ব্যাপক প্রচার প্রসার লাভ করে। এরপর মধ্যপ্রাচ্য, সৌদিয়া, দুবাই, হংকং ও কুয়েতসহ বিশ্বের নানা দেশে রপ্তানি প্রক্রিয়া শুরু করে ব্যবসায়ীরা। শুটকী রপ্তানি করে প্রতিবছর ব্যবসায়ীরা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে এবং সরকার এ খাত থেকে পাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *