বান্দরবানে ‘ম্রো’ সম্প্রদায়ের বর্ষবরণ চাংক্রান


নিজস্ব প্রতিবেদক, বান্দরবান:

বৈশাখ বাংলা বছরের প্রথম মাস। নতুন বছর বরণে পহেলা বৈশাখ বাঙালির ঘরে ঘরে চলে বর্ণিল উৎসব। বাংলা নববর্ষ এবং মারমা জনগোষ্ঠীর সাংগ্রাইং, চাকমাদের বিজু, ত্রিপুরাদের বৈসু, তঞ্চঙ্গাদের বিষু এবং ম্রো, চাক, খেয়াং ও খুমি জনজাতির চাংক্রান উৎসবকে ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকাগুলো এখন উৎসবের আমেজে ভরপুর।

বুধবার (১১এপ্রিল) ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বান্দরবান-থানচি সড়কের চিম্বুক পাহাড় সংলগ্ন ভাইট্টাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ম্রো জনজাতির ‘চাংক্রান’ উৎসব বা বর্ষবরণ উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও গো-হত্যা নৃত্য অনুষ্ঠান করা হয়েছে।

বর্ষবিদায় বর্ষবরণ ঘিরে রয়েছে নানা আয়োজন। বৈসাবী কেনাকাটার ধুম পড়েছে মার্কেটগুলোতে।

সারাদেশের মতো ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ উৎসবের পাশাপাশি পাহাড়ে বসবাসকারি ১১টি জনগোষ্ঠীর বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ কেন্দ্রিক বর্ণিল ও ঐতিহ্যবাহী আয়োজন করে থাকে।

পাহাড়ে বসবাসকারি ১১টি জাতিসত্তার মধ্যে খিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার কারণে বম, পাংখো ও লুসাই খ্রিস্টাব্দ নববর্ষ উদযাপনের বাইরে নিজস্ব কোনো কর্মসূচি রাখে না।

তবে অন্যদের বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ আয়োজনে তারাও অংশ নেয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে। অন্য আটটি জাতিসত্তার মধ্যে বর্ষবরণ উৎসব আয়োজনে কিছুটা ভিন্নতা পাওয়া যায়। বিশেষ করে চাকমা, ত্রিপুরা, ম্রো ও তঞ্চঙ্গ্যা জনজাতি বঙ্গাব্দ পঞ্জিকা অনুসরণে তাদের কর্মসূচি সাজায়। মারমা জনজাতি মিয়ানমারে ব্যবহূত সাক্রয় পঞ্জিকা অনুসরণ করে। একই পঞ্জিকা অনুসরণের কারণে মারমাদের সাংগ্রাই উৎসবের সঙ্গে ম্রোদের চাংক্রান, খেয়াংদের সাংলান, খুমিদের সাংক্রাইন, চাকদের সাংক্রান অনুষ্ঠানে খুব একটা পার্থক্য নেই।

বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট বর্ষবরণ উপলক্ষে টানা ১০দিন উৎসবের আয়োজন করেছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর এমপি। এসময় জেলা প্রশাসক মো. আসলাম হোসেন, পুলিশ সুপার জাকির হোসেন মজুমদার, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক মং নু চিংসহ গন্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

ম্রোরা নববর্ষকে তাদের ভাষায় চাংক্রান বলে। বাঁশির সুরের মূর্চনায় ঢাকঢোল ও খাসার তালে তালে দল বেঁধে লোকনৃত্য মাতিয়ে তোলে ম্রো তরুণ-তরুণীসহ নারী-পুরুষেরা।
লোকনৃত্য, কোমর তাঁত বুনন, পুতির মালা গাঁথা ও পিঠা তৈরির প্রতিযোগিতার আয়োজন চলে। ম্রোদের ঐতিয্যবাহী লাঠি খেলা প্রতিযোগীতায় অংশ নিতে জেলার বিভিন্ন পাড়া থেকে দল বেধে শত শত যুবক-যুবতী নারী-পুরুষ ভাইট্টাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে উৎসবে মেতে উঠে। শক্তি ও কৌশল খাটিয়ে বাঁশ নিয়ে এক পাড়ার সাথে অন্য পাড়ার যুবক ও বিবহিতদের চলে ক্রীড়া প্রতিযোগীতা। এ উৎসব পরিণত হয়েছে ম্রো সম্প্রদায়ের মিলন মেলা।

ম্রো যুবকরা তাদের ঐতিয্যবাহী সাজ-পোশাকে পরিহিত করে মুখে ঠোঠে টকটকে লাল রং লাগিয়ে আর খোপায় ও কানে পাহাড়ী ফুল গুজিয়ে উৎসবে আসে। আর যুবতীরা হাতে রুপার কাঁকন, পায়ে বালা ও গলায় রংবেরং এর পুতির মালা ও রুপার তৈরী গলা থেকে কোমর পর্যন্ত চেইন পরিধান করে চুলের খোপায় রংবেরং এর ফুল গুজিয়ে মুখে বিভিন্ন ধরনের প্রসাদনি লাগিয়ে রংবেরং পোশাকে উৎসব পালনে জড়ো হয়। অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী টাকেট খেলা অনুষ্ঠিত হয়। উৎসবের প্রধান আকর্শন গো-হত্যা নৃত্য।

বান্দরবান উৎসব উদযাপন পরিষদের সাথে যৌথ উদ্যোগে কেএসআই বর্ষবরণ উৎসবের আয়োজন করেছে। এর আগের বছরগুলোতে কেএসআইর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে আয়োজন করলেও তঞ্চঙ্গ্যা জনজাতি এবার নিজেদের একক উদ্যোগে বর্ষবরণ উৎসবের প্রস্তুুতি নিয়েছে।
১২ এপ্রিল সন্ধ্যায় শহরের বালাঘাটা বিলকিস বেগম উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তঞ্চঙ্গ্যা জনজাতির ঐতিহ্যবাহী ঘিলাখেলা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।

‘তঞ্চঙ্গ্যা জাতীয় গোল্ডকাপ ঘিলাখেলা টুর্নামেন্ট’ নামের এ প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করবেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উ শৈ সিং এমপি। উৎসব উদযাপন পরিষদের যুগ্ম সচিব উজ্জ্বল তঞ্চঙ্গ্যা জানান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় বসবাসকারী তঞ্চঙ্গ্যা নাগরিকরাও এই উৎসবে অংশ নেবেন।

কেএসআই এবং উৎসব উদযাপন পরিষদের যৌথ উদ্যোগে ১৩ এপ্রিল সকাল ৮টায় বান্দরবান শহরের রাজার মাঠ থেকে মারমা জনগোষ্ঠীর বর্ষবরণ উৎসব ‘সাংগ্রাইং পোয়েঃ’ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হবে। কেএসআই পরিচালক মং নু চিং জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর এমপি শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেবেন।

কর্মসূচি অনুযায়ী বাঙলা নববর্ষ উপলক্ষে ১৪ এপ্রিল সকাল ৭টায় রাজার মাঠ থেকে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হবে। বাঙালি ছাড়াও পাহাড়ে বসবাসকারী মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, খুমি, খেয়াং, চাক, বম, পাংখো এবং লুসাই জনজাতির সংস্কৃতিকর্মীরা নিজ নিজ ঐতিহ্যবাহী পোশাক নিয়ে সর্বজনীন এই মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেবেন।

মারমা জনগোষ্ঠীর বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব ‘মৈত্রী পানি বর্ষণ’ ও লোকজ খেলাধুলা অনুষ্ঠিত হবে ১৫ এপ্রিল বিকেল ৩টায় রাজার মাঠে। পরের দিন ১৬ এপ্রিল বিকেল ৩টা রাজার মাঠে ‘মৈত্রী পানি বর্ষণ’ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হবে।

১৬ এপ্রিল সকাল ৯টায় রোয়াংছড়ি উপজেলার সাংকিং পাড়ায় খুমি জনজাতির ‘সাংক্রাইং’ উৎসব, ১৮ এপ্রিল সকাল ৯টায় সদর উপজেলার রাজবিলা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে মারমা বর্ষপঞ্জি ‘সাক্রয়-১৩৮০’ বর্ষবরণ উৎসব এবং ১৯ এপ্রিল সকাল ১০টায় রোয়াংছড়ি উপজেলার আন্তাহা ত্রিপুরা পাড়ায় ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’ উৎসব আয়োজন করেছে কেএসআই।

এতে ত্রিপুরা বৈসু উপলক্ষে বহু প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী গড়াইয়া নৃত্য পরিবেশনের পাশাপাশি বিভিন্ন লোকনৃত্য প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়েছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *