বাঙ্গালী বসতি স্থাপন ও প্রতিরক্ষা


gussagram 1
আ তি কু র  র হ মা ন:

বাংলাদেশ রাষ্ট্র বাঙ্গালী সংখ্যাগরিষ্ঠতার ফসল। পার্বত্য চট্টগ্রাম তারই ভৌগোলিক অঞ্চল। পার্বত্য চট্টগ্রামের অমুসলিম প্রধান অঞ্চল হওয়া মৌলিক নয়, কৃত্রিম। এ কারণেই ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগকালে এটি ভারতের প্রাপ্য বা স্বতন্ত্র অঞ্চলরূপে স্বীকৃতি লাভ করেনি।

ভারত বিভাগকালে সীমান্তবর্তী অঞ্চলসমূহের ভাগ্যে অনেক ওলট-পালট হয়েছে। পূর্ব পাঞ্জাবের অধীন গুরুদাসপুর জেলা সীমান্তবর্তী মুসলিম প্রধান অঞ্চলরূপে পাকিস্তানের প্রাপ্য ছিলো। কিন্তু কাশ্মীরের পক্ষে ভারতের সাথে যোগদানের সুযোগ বজায় রাখার প্রয়োজনে ভূমি সংযোগরূপে গুরুদাসপুরকে ভারতভুক্ত করে দেয়া হয়। ঠিক একই কারণে আসাম ও ত্রিপুরার সাথে ভারতের ভূমি সংযোগ রক্ষার প্রয়োজনে, পশ্চিম দিনাজপুর ও করিমগঞ্জ অঞ্চলকে ভারতের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এই দুই সংযোগ ঘটান না হলে কাশ্মীর হতো পাকিস্তানের বাধ্য অঞ্চল, এবং আসাম ও ত্রিপুরা হতো বাংলাদেশের দ্বারা বিচ্ছিন্ন বাধ্য এলাকা। পার্বত্য চট্টগ্রামের পক্ষে অনুরূপ ভূমি সংযোগ হওয়ার কোনরূপ ভৌগোলিক ও জাতিগত আনুকুল্য ছিলো না। এর উত্তরে অবস্থিত ত্রিপুরা ও পূর্বে অবস্থিত মিজোরাম দুর্গম পর্বতসংকুল সীমান্ত। এ পথে আসামের সাথে সংযোগ সাধন দুরুহ। জাতিগতভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামবাসী উপজাতীয়রা হলো বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত ও স্বতন্ত্র। স্থল যোগাযোগের দুরুহতা ও জাতিগত ভিন্নতা হেতু, এতদাঞ্চলের ভারতভুক্তি বিচ্ছিন্নতারই সহায়ক হবে বলে বিবেচিত হয়। সুতরাং চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অখন্ডতা, অর্থনৈতিক অভিন্নতা ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে রক্ষার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামকে সঠিকভাবেই বাংলাদেশভুক্ত রাখা হয়, যার কোন বিকল্প ছিলো না।

ভৌগোলিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম, মুল চট্টগ্রামেরই অংশ এবং লোক হিসেবে স্থানীয় উপজাতীয়রা জেলা ভাগের সুযোগে আকস্মিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মাত্র। তারা আদি চট্টগ্রামী মূলের লোক নয়। অভিবাসনের মাধ্যমে তারা হালে স্থানীয় অধিবাসী রূপে স্বীকৃত। মাত্র শত বছর আগে পার্বত্য অঞ্চল শাসন আইন ধারা নং ৫২ তথা পর্বতে অভিবাসন নামক আইন বলে তারা স্থানীয় অধিবাসী। তারা চট্টগ্রামী মৌলিকত্ব সম্পন্ন স্থানীয় আদি ও স্থায়ী অধিবাসীর মর্যাদা সম্পন্ন লোক নয়। এই বিচারে তাদের অগ্রাধিকার, বিশেষাধিকার, স্বায়ত্তশাসন বা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের দাবী অযৌক্তিক। তদুপরি এই প্রশ্নে তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ সংঘটন, একটি অমার্জনীয় রাজনৈতিক বাড়াবাড়ি।

সুতরাং তাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী বিবেচিত হয়। এই ব্যবস্থারই অংশ হলো এতদাঞ্চলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারকরণ ও রাষ্ট্রের স্বপক্ষ জনশক্তি বাঙ্গালীদের সংখ্যাগত প্রাধান্য রচনা। বাঙ্গালী বসতি স্থাপনকে তাই অবাঙ্গালী বিদ্রোহের বিকল্প ভাবাই সঙ্গত। এতে কারো বিরোধিতা ও আপত্তি উত্থাপন যৌক্তিক নয়। স্থানীয়ভাবে সেনাবাহিনীর অবস্থান প্রতিরক্ষামূলক। স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনযাপন তাদের হস্তক্ষেপের বিষয়বস্তু নয়। তাদের হস্তক্ষেপকে ঠেকাতে, সশস্ত্র উপজাতি বিদ্রোহের বিপক্ষে শান্তিস্থাপক সপক্ষীয় জনশক্তির উপস্থিতি প্রয়োজন। বাঙ্গালী বসতি সেই প্রয়োজনেরই সম্পূরক। এটা উপজাতীয় বৈরীতা নয়।

সেনাবাহিনীর দায়িত্বপালন সংক্রান্ত কঠোরতা তাতে হালকা হয়েছে। উপজাতীয় বিদ্রোহ দমাতে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বেসামরিক বাঙ্গালী জনশক্তি মোতায়েন নমনীয় ব্যবস্থা। যখন বাঙ্গালী বসতি স্থাপনের সূচনা হয়নি, বাংলাদেশের সেই শিশুকালে, উপজাতীয় বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়েছে। তখন দেশের অখন্ডতা রক্ষার প্রয়োজনে এতদাঞ্চলে সেনা মোতায়েন ছাড়া উপায় ছিলো না। তৎপর বিদ্রোহী পক্ষের সাথে আপোষ-রফামূলক আলোচনা ও বৈঠক হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। তাই সরকারী পর্যায়েই সিদ্ধান্ত হয় যে, সেনাবাহিনী কেবল সশস্ত্র দুষ্কর্মই ঠেকাবে। বিদ্রোহী জনশক্তির মোকাবেলায় স্বপক্ষ বাঙ্গালী জনশক্তিকে সংখ্যা ও সামর্থে জোরদার করে তুলতে হবে। সুতরাং উপজাতীয় বিদ্রোহেরই ফল সেনা মোতায়েন ও বাঙ্গারী বসতি স্থাপন। এই দুই শক্তির বিরুদ্ধে উপজাতীয় পক্ষের আপত্তি ও আন্দোলন এই প্রেক্ষাপটে যৌক্তিক নয়।

এখনো উপজাতীয় পক্ষ উগ্রতা, হিংসা, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি আর অরাজকতা ত্যাগ করে স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের ধারায় ফিরে এলে সেনাবাহিনীর পক্ষে তার ক্যাম্পে ফিরে যাবার পরিবেশ সৃষ্টি হবে এবং বাঙ্গালী জনস্রোতও থেমে যাবে। বাঙ্গালী পাহাড়ী শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সমঅধিকার নীতি প্রতিষ্ঠিত হলে, এতদাঞ্চলে শান্তি ও উন্নয়নের ধারা অবশ্যই জোরদার হবে। কেবল স্বপক্ষীয় সুযোগ-সুবিধা আর বিপক্ষ বৈরীতা, পার্বত্য অঞ্চলকে সংঘাতমুখর ও বিক্ষুব্ধ করে রেখেছে। বাঙ্গালীরা মুহুর্তে সব উপজাতীয় বৈরীতা ভুলে যেতে প্রস্তুত, যদি উপজাতীয় পক্ষ সকলের সমঅধিকার ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিকে তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্য রূপে গ্রহণ করে। সুতরাং পার্বত্য রাজনীতি খেলার ট্রাম কার্ড তাদের হাতেই নিহিত। অযথা সেনাবাহিনী আর বাঙ্গালী পক্ষকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।

অরাজক ও বিক্ষুব্ধ পার্বত্য অঞ্চল থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহৃত হলে, এতদাঞ্চলের শান্তি-শৃঙ্খলা আর অখন্ডতা রক্ষার দায়িত্ব কে পালন করবে? উপজাতীয় কোন জনসংগঠন সে দায়িত্ব পালনের উপযোগী আস্থা এখনো অর্জন করতে পারেনি। তারা নিজেরাও ঐক্যবদ্ধ নয়। বরং পরস্পর সংঘাত ও বৈরীতায় লিপ্ত। এটা ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের ধারক নয়। উপজাতীয়রা পরস্পর রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত ও সংঘাতে লিপ্ত। তারা গঠনমূলক রাজনীতির কোন উদাহরণ স্থাপন করতে পারেনি। দেশ ও জাতি তাদের প্রতি আস্থাশীল নয়। জাতীয় সন্দেহপ্রবণতাকে কাটাতে তাদের কোন রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মসূচী নেই।

উপজাতীয় দাবিও সংখ্যালঘু স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতেই বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ গৃহীত হয়েছে। এখন তারা তাতে স্থির নেই, বিকল্প জুম্ম জাতীয়তাবাদেই অনড়। তাদের আগ্রহেই উপজাতীয় সুবিধাবাদ গৃহীত হয়েছিলো। কিন্তু এখন তাদের লক্ষ্য জাতিসংঘ ঘোষিত আদিবাসী পরিচয় গ্রহণ। দেশ ও জাতি থেকে তারা কেবল গ্রহণেই অভ্যস্ত, কিছু দিতে নয়। তারা দেশ ও জাতির বিপক্ষে বৈরী শক্তিরূপে প্রতিভাত। এই বৈরী ভাবমূর্তি কাটাবার দায়িত্ব তাদের নিজেদেরই। এমনটা ঘটলেই তাদের পক্ষে জাতীয় আস্থা গড়ে ওঠা সম্ভব। কেবল উত্যক্ত করা, দাবী-দাওয়ার বহর বৃদ্ধি, আর নিজেদের স্বার্থকেই বড় করে দেখা, এই প্রবণতা, জাতীয় আস্থা ও সহানুভুতি গড়ে ওঠার অনুকূল নয়।

পার্বত্য বাঙ্গালীরা ঐ বাঙ্গালীদেরই অংশ, যারা গোটা দেশের শাসক শক্তি এবং তারা সংখ্যায় বাংলাদেশী জাতি সত্তার ৯৯%। সুতরাং পার্বত্য বাঙ্গালীদের সাথে সদ্ভাব সৃষ্টি, গোটা জাতিকে প্রভাবিত করারই সূত্র। এই বোধোদয় না ঘটা, উপজাতীয়দের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। বাঙ্গালীপ্রেমী সাধারণ উপজাতীয় লোক অবশ্যই আছেন, এবং এমন উদার মনোভাব সম্পন্ন সাধারণ উপজাতীয় লোকেরও অভাব নেই, যারা পাহাড়ী বাঙ্গালীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সম্প্রীতিকে গুরুত্ব দেন। কিন্তু এরা সংখ্যালঘু ও দুর্বল। এরা উপজাতীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন না। সমাজে এদের অবস্থান নিরীহ।

দেশ ও জাতি অনির্দিষ্ট দীর্ঘকাল অনুকূল উপজাতীয় বোধোদয়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারে না। ধ্বংসাত্মক উপজাতীয় শক্তিকে নিস্ক্রিয় ও নির্মূল করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। তজ্জন্য গৃহীত রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপকে শিথিল বা পরিত্যাগ করা যথার্থ নয়। সেনাশক্তি ও জনশক্তি মোতায়েনের অতীত নীতিকে পরিহারের কোন অবকাশ নেই। ইতিমধ্যে গৃহীত কোন শৈথিল্য ফলপ্রসু প্রমাণিত হয়নি। নতুবা এতোদিনে উপজাতীয় বিদ্রোহী শক্তি এক ক্ষুদ্র অপশক্তিতে পরিণত হতো, এবং পর্বতাঞ্চলে বাঙ্গালীরাই হয়ে উঠতো সংখ্যাগরিষ্ঠ। এমনটি ঘটানো ছাড়া এতদাঞ্চলে বাংলাদেশ নিরাপদ হবে সে আশা করা যায় না, আর একমাত্র তখনই উপজাতীয়রা হবে দেশ ও জাতির পক্ষে বাধ্য অনুগত। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রয়োজনে এমনটি ঘটান অন্যায় নয়। এমন শক্ত মনোভাব জাতীয় রাজনীতিতে থাকা আবশ্যক। তাই পার্বত্য নীতিতে বাঙ্গালী বসতি স্থাপন ও পূনর্বাসন পুনঃবিবেচিত হওয়া দরকার।

বাঙ্গালী বসতি স্থাপন ও পুনর্বাসন কাজ অসম্পন্ন আছে। তা বাস্তবায়ন না করা ক্ষতিকর। সরকারের এই দায় অপরিত্যজ্য। লক্ষ লক্ষ বাঙ্গালী সরকারী দায়িত্বহীনতার ফলে পর্বতের আনাচে-কানাচে ভূমিহীন, আশ্রয়হীন, বেকার। ভূমি দান ও পুনর্বাসনের অঙ্গীকারে তারা সরকারীভাবে এতদাঞ্চলে আনিত। এই অঙ্গীকার পালন করা সরকারের একটি দায়। নিরূপায় হয়ে ভূমি বঞ্চিত বাঙ্গালীদের অনেকেই সর্বোচ্চ আদালতে মামলা করেছে। কিন্তু ঐ মামলাগুলোর অগ্রগতি নেই। এমনি একটি মামলা হলো রীট নং-৬৩২৯/২০০১, যার শুনানীর দিন ধার্য্য ছিলো ২৫ আগস্ট ২০০৪ সে শুনানী অনুষ্ঠিত হয়নি। এছাড়াও আরো কয়েকটি রীট দায়ের করা আছে যেগুলোর মীমাংসা হচ্ছে না। তবে এই পথ ধরে একদিন বিষয়টির সুরাহা অবশ্যই হবে, সে আশায় নিঃস্ব পার্বত্য বাঙ্গালীরা আশান্বিত দিন যাপন করছে।

রাষ্ট্র কর্তৃক বাঙ্গালী পুনর্বাসন মানে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশী চরিত্র দান, উন্নয়নের অর্থ পশ্চাদপদতার অবসান ঘটান, সেনা নিয়ন্ত্রণের অর্থ অরাজকতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ, আর পার্বত্য চুক্তি হলো বিদ্রোহীদের গৃহবন্দি করার কৌশল। এগুলো রাষ্ট্র প্রবর্তিত কর্মসূচী। উপজাতীয়দের আনুগত্য প্রদর্শন ছাড়া এই কার্যক্রমের কোন ব্যতিক্রম হতে পারে না।

গত ১৬ জুন ২০০৪ তারিখে গৃহীত সরকারী সিদ্ধান্তটি পার্বত্য বাঙ্গালীদের অবশ্যই বিক্ষুব্ধ করবে। তারা সরকার কর্তৃক পুনর্বাসনের অঙ্গীকারে পার্বত্য চট্টগ্রামে আনিত, এবং নিরাপত্তার প্রয়োজনে আবাসত্যাগী ও গুচ্ছগ্রাম সমূহে পুনর্বাসিত। এই আনয়ন ও বসতি বন্ধকরণ ভুল হয়ে থাকলে, তার খেসারত ঐ বাঙ্গালীদের প্রাপ্য নয়। সরকারই নিজ ভুলের দায়িত্ব নিতে ও খেসারত দিতে বাধ্য। গুচ্ছগ্রামবাসী ও ভাসমান অন্যান্য পার্বত্য বাঙ্গালীরা স্বউদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি গড়েনি। তাদের কিছু সরকারীভাবে প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে, কিছু প্রেসিডেন্ট এরশাদের আমলে এবং বাদ বাকিরা বেসরকারীভাবে পাকিস্তান আমলে ও শেখ মুজিবের উৎসাহে বাংলাদেশ আমলের শুরুতে, এতদাঞ্চলে আনিত ও স্বউদ্যোগে বসতি স্থাপন করেছে। এরা রাষ্ট্রের স্বপক্ষীয় জনশক্তি। বিদ্রোহী উপজাতীয়দের বিপক্ষে এই সপক্ষীয় জনশক্তির প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রীয়ভাবে কাম্য।

১৯৮৬ সাল আমলে বিদ্রোহী শান্তিবাহিনীর মদদে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক আকার ধারণ করে। তাতে উপদ্রুত বাঙ্গালীরা মারমুখী হয়ে ওঠে এবং দাঙ্গা উপদ্রুত উপজাতীয়রাও বিপুল সংখ্যায় শরণার্থীরূপে ভারতমুখী হতে শুরু করে। এই বিরূপ পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বাঙ্গালীদের তাদের বাড়ি-ঘর ও জায়গা-জমি থেকে উঠিয়ে এনে সেনাক্যাম্প সমূহের আশপাশে গুচ্ছগ্রাম গড়ে বসবাস করতে দেন। বাড়ি-ঘর, জায়গা-জমি, ফল-ফসল ও রুজি-রোজগারচ্যুত এই গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙ্গালীরা হয়ে পড়ে সরকারী ত্রাণ নির্ভর। ঐ ২৬ হাজার গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙ্গালী পরিবারের দাবী হলো, তাদের পুরাতন বাড়ি-ঘর ও জায়গা-জমি ফেরত লাভ, নতুনভাবে পুনর্বাসন নয়। সরকারের দ্বারা প্রকৃত অবস্থার মূল্যায়ন হয়নি। তারা বাস্তবে আবাসিত ও পুনর্বাসিত পার্বত্য চট্টগ্রামবাসী লোক। তাদের স্থানীয় নাগরিকত্ব প্রশ্নাতীত। এদের প্রবীনরা এখানকার অর্ধ শতাব্দী ও তার আরো বেশি সময়ের বাসিন্দা এবং সন্তান-সন্ততিরা জন্মসূত্রে স্থানীয় অধিবাসী।

পর্বতবাসী এই বাঙ্গালীরা সরকার কর্তৃক বার বার বিভ্রান্ত হচ্ছে। এই বিভ্রান্তি সত্ত্বেও তারা স্বপক্ষীয় ভোট ব্যাংক বলে অনুমিত। তবে হালে তাদের ভুল ভাঙছে। একা বিএনপি নয় আওয়ামী লীগকেও তারা উপযুক্ত মূল্য দিতে এখন প্রস্তুত। তারা ভাবছে আওয়ামী লীগ তাদের চির শত্রু নয়। বহু সংখ্যক বাঙ্গালী মরহুম শেখ মুজিবের উৎসাহে এতদাঞ্চলে এসেছে ও বসতি গড়েছে। বিদ্রোহের বিরুদ্ধে প্রথম সেনা ছাউনীর প্রতিষ্ঠাতা হলেন শেখ মুজিব নিজে। আওয়ামী লীগ সরকার প্রধান শেখ হাসিনা, পার্বত্য চুক্তির বিরুদ্ধে বাঙ্গালীদের হরতাল পালনের দিন ঘোষণা করেছিলেন; একজন বাঙ্গালীকেও পার্বত্য অঞ্চল থেকে বিতাড়ন করা হবে না। তার সরকার সন্ত্রাস উপদ্রুত উদ্বাস্তু পাহাড়ী ও বাঙ্গালীদের সবাইকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছেন।

পুনর্বাসন তালিকায় গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙ্গালীরা অন্তর্ভুক্ত আছে। সরকার কর্তৃক সম্পাদিত পার্বত্য চুক্তিতে সাংবিধানিক ব্যবস্থার পক্ষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ায়, বাঙ্গালীদের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়েছে। সুতরাং পার্বত্য বাঙ্গালীদের একমাত্র মিত্র সংগঠন বিএনপি নয়, আওয়ামী লীগও তাদের মিত্রের মর্যাদা প্রাপ্ত দল।
এটা কৃতজ্ঞতার বিষয় যে, প্রেসিডেন্ট জিয়া, শেখ মুজিব ও এরশাদ বাঙ্গালীদের সরকারীভাবে পার্বত্য অঞ্চলে আবাস দান করেছেন। তবে এটাও প্রশংসনীয় কাজ নয় যে, ঐ সরকারগুলো জায়গা-জমি বন্দোবস্তি ও হস্তান্তর বন্ধ করে দিয়েছেন। তারা পার্বত্য চুক্তির আপত্তিজনক দফাগুলো বাস্তবায়নে আগ্রহী, গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙ্গালীদের সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার দানে নিষ্ক্রিয়, এবং বিদ্রোহী উপজাতীয় পক্ষের তোষামোদে লিপ্ত। এই পরিস্থিতিতে পার্বত্য বাঙ্গালীরা নতুন মিত্র খুঁজতে বাধ্য।

আবার বলি, বাংলাদেশ রাষ্ট্র বাঙ্গালী সংখ্যাগরিষ্ঠতার ফসল। পার্বত্য চট্টগ্রাম তারই ভৌগোলিক অঞ্চল। পার্বত্য চট্টগ্রামের অমুসলিম প্রধান অঞ্চল হওয়া মৌলিক নয়, কৃত্রিম। এ কারণেই ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগকালে এটি ভারতের প্রাপ্য বা স্বতন্ত্র অঞ্চলরূপে স্বীকৃতি লাভ করেনি।

♦ আতিকুর রহমান পার্বত্য বিষয়ক গবেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা এবং উপদেষ্টা, পার্বত্যনিউজ ডটকম।
image_pdfimage_print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *