বাঙালীরাই এদেশের আদিবাসী


13620921_300898163589352_2372225373615898346_n

মোয়াজ্জেমুল হক

ভারতীয় উপমহাদেশে নেপাল ছাড়া অন্য কোন দেশে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কোন আদিবাসী নেই। ভারত, পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশে আছে ক্ষুদ্র ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, উপজাতি। এসব ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ও উপজাতীয়দের আদিবাসী ঘোষণার জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি তৎপরতা লক্ষণীয়। এবারও অনুরূপ তৎপরতা প্রতীয়মান। যদিও ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদনকালে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) নিজেদের উপজাতি হিসেবে স্বীকার করেই চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করেছে।

কিন্তু বর্তমান চাকমা সার্কেল চীফ যিনি চাকমা রাজা নামে পরিচিত- দেবাশীষ রায় কয়েক বছর আগে আকস্মিকভাবে চাকমা উপজাতিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সদস্যদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতিদানের দাবি উত্থাপন করেন। এ দাবির সঙ্গে দেশীয় বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ সমর্থন যোগাচ্ছেন। ইতোমধ্যে গঠিত হয়েছে আদিবাসী ফোরাম। শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘আদিবাসী মন্ত্রণালয়’ করার দাবিও তোলা হয়েছে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কয়েকটি সাহায্য সংস্থা উপজাতীয়দের ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রমও পরিচালনা করছে।

কিন্তু সরকার পক্ষে ২০১১ সালের ২১ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আদিবাসী ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে এই বলে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের মূল ভূখ-ের অধিবাসী নয়। বরং বাংলাদেশের ১৫ কোটি (ওই সময়) জনগণের সকলেই বাংলাদেশে আদি এবং প্রাচীন ভূখ-ে শাশ্বতকাল ধরে বসবাস করার সুবাদে এদেশে আদিবাসী। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী আদিবাসী হলে অবশিষ্ট জনগণ বিদেশী হিসেবে পরিগণিত হবে বলে মত ব্যক্ত করা হয়; যা কখনও হতে পারে না।

ওই সভায় বলা হয়, বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী বা উপজাতি কর্তৃক নিজেদের আদিবাসী হিসেবে দাবি করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিতর্কের সৃষ্টি করছে। যাতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আদিবাসী শব্দটির ভুল ব্যবহারের ফলে শব্দটির সমাজতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ভৌগোলিক অখ-তার ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সভায় উল্লেখ করা হয়, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ যে এ ভূখণ্ডে আদিবাসী (ফার্স্ট নেশন) হিসেবে চার হাজার বছর ধরে বসবাস করছে।

অন্যপক্ষে, ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ক্ষুদ্র, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশের ভূখণ্ডে তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে আগমন ঘটেছে ১৭২৭ সাল থেকে। তখন হতে তারা ওই অঞ্চলে অভিবাসী হিসেবে বসবাস করে আসছে। সঙ্গত কারণে তারা আদিবাসী নয়। প্রয়াত বোমাং সার্কেলের চীফ তথা বোমাং রাজা অং শু প্রু চৌধুরী ৯৬ বছর বয়সে স্বীকার করেছেন তারা আদিবাসী নন বরং প্রায় ৩শ’ বছর ধরে এদেশে বসবাস করে আসছেন।

জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট ফোরামসমূহে আদিবাসী (ইনডিজেনাস) ও উপজাতি (ট্রাইবাল) জনগোষ্ঠীর সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ইনডিজেনাস পিপলস হচ্ছে তারাই যারা যুগ যুগ ধরে বর্তমান আবাসভূমিতে বাস করে আসছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ান ও অস্ট্রেলিয়ার এবোরিজিন্স। এ বিবেচনায় জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের পক্ষে এদেশে উপজাতি গোষ্ঠীকে ইনডিজেনাস বা আদিবাসী হিসেবে আখ্যায়িত না করে ট্রাইবাল বা এথনিক মাইনরিটি গ্রুপ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। জাতিসংঘ ফোরামে ভারত, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশও তাদের উপজাতি জনগোষ্ঠীদের কখনও ইনডিজেনাস হিসেবে আখ্যায়িত করে না।

বাংলাদেশে বসবাসকারী অধিকাংশ উপজাতি সম্প্রদায় এখন নিজ নিজ ধর্ম-সংস্কৃতিতে অবস্থান না করে অনেকেই খ্রীস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন। প্রসঙ্গত, প্রায় ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রায় ৪৫টি ক্ষুদ্র উপজাতীয় সম্প্রদায়ের বসবাস। এরমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে রয়েছে ১২টি উপজাতীয় সম্প্রদায়। এগুলো হচ্ছেÑ চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, মুরং, পাংখোয়া, চাক, খুমী, খিয়াং, লুসাই, তংচংগা, বম এবং রিয়াং; সিলেট অঞ্চলে রয়েছে মনিপুরী, খাসিয়া, ত্রিপুরা, পাত্র, হাজং; ময়মনসিংহ অঞ্চলে রয়েছে গারো, কুকি ও রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে রয়েছে সাঁওতালসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও উপজাতীয়রা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ে সক্ষম হলে আন্তর্জাতিক সমাজের সমর্থন নিয়ে সরকারের ওপর ক্রমাগত অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। জাতিসংঘ ইতোমধ্যে আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে এর অবস্থান ঘোষণা করেছে; যা ডিক্লারেশন অন দ্য রাইটস অব ইনডিজেনাস পিপলস হিসেবে ঘোষিত। উপজাতীয়রা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে জাতিসংঘ এবং জাতিসংঘের সমর্থনপুষ্ট বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন নিয়ে এরা কাক্সিক্ষত পথে এগিয়ে যাবে। পাশাপাশি পার্বত্য জেলাগুলো থেকে বাঙালীদের উচ্ছেদ এবং পার্বত্য অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করবে। এরা পরবর্তীতে বিচ্ছিন্নতাবাদের আন্দোলনে যে তৎপর হবে না তা কি নিশ্চিত বলা যায়?

সরকারী মতে, দেশের অধিকাংশ উপজাতীয় সম্প্রদায়ের বিশাল জনগোষ্ঠী ইতোমধ্যে খ্রীস্টান হয়ে গেছে। চাকমাদের মধ্যে খ্রীস্টানদের সংখ্যা কম হলেও মারমাদের অনেকেই এবং গারো, কুকি, লুসাই, পাংখো, মনিপুরী ও সাঁওতালদের বড় একটি অংশ খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন ভারতীয় অংশের অবস্থাও অনুরূপ। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল তথা মিজোরাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী উপজাতিরা খ্রীস্টান ধর্মে দীক্ষা নেয়ায় ইতোমধ্যে তারা তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।

গোয়েন্দা সূত্রে এমন তথ্যও রয়েছে, যেহেতু ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল এবং মিয়ানমারের একাংশ নিয়ে বঙ্গোপসাগরের উত্তরাংশে ভারত-বাংলাদেশের এই পার্বত্যাঞ্চল ভূরাজনৈতিক দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেহেতু বিদেশী নানা চক্র পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীদের আদিবাসী স্বীকৃতি আদায়ের মাধ্যমে ওই অঞ্চলকে ‘খ্রীস্টান রাষ্ট্র’ গঠনে তৎপর রয়েছে বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ান এবোরিজিন, যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ান, নিউজিল্যান্ডের মাউরি, দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা ও মায়া, জাপানের আইনু, রাশিয়ার মেনেড, ফ্রান্স ও স্পেনের বাসকু, আরবের বেদুইন প্রভৃতি জনগোষ্ঠী প্রাচীনকাল থেকে আদিবাসী হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক অতি সাম্প্রতিক সময়ে চালু হয়েছে। ভারতে এ জাতীয় নৃগোষ্ঠী ও উপজাতীদের তফসিলী সম্প্রদায়ভুক্ত জনগোষ্ঠী বলে স্বীকৃতি রয়েছে। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানে তাদের সকল জাতিসত্তাকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

ইনডিজেনাস এ্যান্ড ট্রাইবাল পপুলেশনস কনভেনশন-১৯৫৭ (নং-১০৭) সালে পাস হলেও এ পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২৭ দেশ এটি রেটিফাই করেছে। ১৯৭২ সালের ২২ জুন বাংলাদেশও রেটিফাই করেছিল। পরে কনভেনশন ১৬৯ পাস হওয়ার পর পূর্বোক্ত কনভেনশন ১০৭ তামাদি হয়ে যায়। বাংলাদেশ কনভেনশন ১৬৯ রেটিফাই করেনি। তাই এটি এদেশের জন্য পালনীয় নয়। লক্ষণীয় যে, এরই মধ্যে আটটি দেশ এ কনভেনশনকে নিন্দা করে তা থেকে বেরিয়ে গেছে। অন্যদিকে, ইনডিজেনাস এ্যান্ড ট্রাইবাল পপুলেশনস কনভেনশন-১৯৮৯ (নং-১৬৯) পাস হলেও এখন পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২২টি দেশ এ কনভেনশন রেটিফাই করেছে। এ উপমহাদেশের একমাত্র নেপাল ছাড়া আর কোন দেশ এ কনভেনশন রেটিফাই করেনি।

অন্যদিকে, ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক যে ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয় তাতে ভোটদানের সময় ১৪৩ দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪ দেশ বিপক্ষে, ১১ দেশ বিরত এবং ৩৪ দেশ অনুপস্থিত থাকে। ভোটদানে বিরতদের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল অন্যতম। বিরুদ্ধে ভোট দেয়া দেশগুলো হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র।

বাঙালী ও বাংলা ভাষীরাই এদেশের সত্যিকারের আদিবাসী। এর পেছনে জাতিতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও প্রমাণ রয়েছে। বাংলাদেশের এ অঞ্চলে বাঙালীরা বসবাস করে আসছে ৪ হাজার বছরেরও আগে থেকে। বিক্রমপুর, ওয়ারি-বটেশ্বর, সোনারগাঁ কিংবা মহাস্থানগড় থেকে প্রাপ্ত নৃতাত্ত্বিক প্রমাণাদি বিষয়টি নিশ্চিত করে। নৃতাত্ত্বিক ও জাতিতাত্ত্বিক ইতিহাস বিশ্লেষণে দিবালোকের মতো স্পষ্ট ও প্রতিষ্ঠিত যে, বাংলাদেশে বসবাসরত কোন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এদেশের আদিবাসী নয়। বিশ্বের তাবত শীর্ষস্থানীয় নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষক এ ব্যাপারে একমত।

অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান উপজাতি চাকমাদের আদি বাসস্থান ছিল আরাকান। ত্রিপুরাদের বসবাস ছিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে এবং মারমারাও এসেছে মিয়ানমার (সাবেক বার্মা) থেকে। সে অর্থে তারা কেউ আদিবাসী নয়, বরং অভিবাসী। তারা বিভিন্ন স্থান থেকে দেশান্তরী হয়ে এদেশের নানা স্থানে অভিবাসী হয়ে আনুমানিক সর্বোচ্চ ৫শ’ বছর থেকে এ ভূখণ্ডে বসবাস করে আসছে। তাই কোনক্রমেই এসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, উপজাতি সদস্যরা আদিবাসী হতে পারে না। এর যথাযথ প্রমাণ রয়েছে প্রখ্যাত উপজাতি গবেষক ও নৃতত্ত্ববিদ রবার্ট হেনরি ¯িœড হাচিনসনের বই ‘এ্যান্ড এ্যাকাউন্ট অব চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস (১৯০৬), ক্যাপ্টেন থমাস হার্বাট লেউইন (১৮৬৯) লেখা বই দি চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস এ্যান্ড ডুয়েলার্স দেয়ার ইন (১৮৬৯), অমরেন্দ্র লাল খিসা প্রমুখের লেখা গবেষণাপত্র, থিসিস এবং রিপোর্ট বিশ্লেষণে এর প্রমাণ মেলে যে, বাংলাদেশের উপজাতীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো এদেশের আদিবাসী বা ভূমিপুত্র নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকিজাতি বহির্ভূত অন্য সকল উপজাতীয় গোষ্ঠীই বহু পরে এ অঞ্চলে বসতি স্থাপনকারী। কুকিদের পাশাপাশি অন্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে ম্রো, খিয়াং, পাংখো জনগোষ্ঠীর সদস্য উল্লেখযোগ্য। এরা সর্বোচ্চ ৫শ’ বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বসবাস শুরু করে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর ইতিহাস হচ্ছে এরা সবাই যুদ্ধবিগ্রহ এবং হিংস্র দাঙ্গা-হাঙ্গামার ফলে তাদের পুরনো আবাসস্থল থেকে এ অঞ্চলে পালিয়ে এসেছে। এক জনগোষ্ঠী অন্য জনগোষ্ঠীর পশ্চাদ্ধাবন করে আক্রমণকারী হিসেবে এদেশে প্রবেশ করেছে। বিশিষ্ট চাকমা পণ্ডিত অমরেন্দ্র লাল খিসা ‘অরিজিন অব চাকমা পিপলস অব হিল ট্র্যাক্টস চিটাগং’ বইতে লিখেছেন, চাকমারা এসেছে তৎকালীন বার্মার মংখেমারের আখড়া থেকে। পরবর্তীকালে আরাকান এবং মগদের দ্বারা তাড়িত হয়ে তারা বান্দরবানে প্রবেশ করে। আরও পরবর্তী সময়ে উত্তরদিকে রাঙ্গামাটিসহ সন্নিহিত এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

গবেষকদের মতে, এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদিবাসী আখ্যা না দেয়ার যুক্তিতে রয়েছে, ইস্ট তিমুর, সাউথ সুদান, কাশ্মীর, চেচনিয়া, ফিলিপিন্সের মিননাউসহ পৃথিবীর আরও কয়েকটি স্থানের বিরাজমান পরিস্থিতি। তাদের মতে, ইউনাইটেড নেশন ডিক্লারেশন অন দ্য রাইটস অব ইনডিজেনাস পিপলস বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র ২০০৭ অনুযায়ী তাদেরকে আদিবাসী স্বীকৃতি প্রদান করলে সে অনুযায়ী ওই জনগোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসন, রাজনৈতিক, আইনী, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা প্রদান করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়ে যায়। বিশেষ করে জাতিসংঘ ঘোষণার ধারা ৩০ অনুযায়ী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি কিংবা ভূখণ্ডে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না উপযুক্ত জনস্বার্থের প্রয়োজন যুক্তিগ্রাহ্য হবে। অন্যথায় যদি সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় সম্মতি বা অনুরোধ জ্ঞাপন না করে।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশেষ কোন জনগোষ্ঠীর ভূমি বা ভূখণ্ড ব্যবহারের আগে যথাযথ পদ্ধতি ও বিশেষ করে তাদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিশেষ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা করে অনুমতি গ্রহণ করার বিষয়টি সে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে নিঃসন্দেহে। বাংলাদেশে যেসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে তাদের মতবাদও এক নয়। সবচেয়ে বড় উপজাতি চাকমারা পৃথক পৃথক জেএসএস এবং ইউপিডিএফের মতবাদে বিশ্বাসী।

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের সকল অঞ্চলের আদিবাসী বাঙালী। এদের মধ্যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরাও রয়েছেন। গত কয়েক বছর ধরে এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী বলে দাবিদাররা হঠাৎ করে আদিবাসী স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টার নেপথ্যে রয়েছে ভবিষ্যতে ফায়দা লোটার মূল কৌশল। এ কৌশলের ফাঁদে পা দেয়া ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনক। আদিবাসী স্বীকৃতির বিপরীতে রয়েছে এদেশের ভৌগোলিক অখ-তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি ব্যাপকভাবে জড়িত। যেহেতু বাঙালীরাই এদেশের মূল আদিবাসী এবং উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা মূলত অভিবাসী। সেক্ষেত্রে জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী পার্বত্য উপজাতীয় অধিবাসীরা আদিবাসী নয় এবং তাদের আদিবাসীর স্বীকৃতি আদায়ের অপচেষ্টা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক অখ-তাকে বিপজ্জনক করার একটি অপকৌশল মাত্র।

সূত্র: দৈনিক জনকণ্ঠ

image_pdfimage_print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *