বন্দি ভারতীয় নার্সের বর্ণনায় ইরাকের সুন্নী যোদ্ধারা


86497_1

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

কেরালা: নিনু জোসে। বয়স ২৪ বছর। কেরালার ১৫ সেবিকার একজন যারা ইরাকে কাজ করতে গিয়ে সুন্নী যোদ্ধা আইএসআইএসের হাতে বন্দি হয়েছিল। তিনি ৫ জুলাই বাড়ি ফিরে এসেছেন। এনডিটিভি’র ব্লগে জানিয়েছেন নিজের বন্দি জীবনের দিনগুলোর কথা।

আমি ইরাকের উদ্দেশে যাত্রা করি ২০‌১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। দিল্লির এক এজেন্সিকে এক লাখ ৬০ হাজার রুপি দিয়েছিলাম যারা আমাকে ইরাকে একটি চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এজন্য আমি দিল্লিতে ইরাকের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সাক্ষাৎকার দিতে গিয়েছিলাম। এরপর মনোনীত হলে আমাকে বাগদাদে পাঠানো হয়। আমরা ছিলাম ১৫ জন।

সেখানে আমরা ইরাকের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তার সাথে দেখা করি। তিনি আমাদেরকে ভিন্ন ভিন্ন হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। আমাকে পাঠানো হলো তিকরিত প্রশিক্ষণ হাসপাতালে এবং মাসে ৭৫০ ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো। ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল ও মে এই চার মাস সবকিছু ঠিকমতোই চলল কিন্তু আমরা আমাদের বেতন পেলাম না। সরকারি নিয়মানুযায়ী তিন মাস পর আমাদের বেতন পাওয়ার কথা।

আমরা হাসপাতালেই থাকতাম। ১৩ জুন আমরা বসে আছি। এমন সময় আমরা বোমা বিস্ফোরণ এবং বন্দুকের গুলির আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমরা কিছুই দেখতে পেলাম না। ইরাকি স্টাফ যারা ছিল তারা বলল তারা হাসপাতাল ছেড়ে চলে যাবে। প্রায় ৪৬ জন ভারতীয় স্টাফকে রেখে তারা সবাই হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেল।

দুই দিন পর অর্থাৎ ১৫ জুন ৫ জন আইএসআইএস যোদ্ধা হাসপাতালে আসল এবং বললো- আমরা এখন তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন। তারা সবাই মুখোশ পরা এবং সশস্ত্র ছিল। তারা বললো- আমরা চাইলে থেকে যেতে পারি এবং তাদের অধীনে কাজ করতে পারি অথবা দেশে ফিরে যেতে পারি। তারা আমাদেরকে খাবার ও বেতন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিল এবং আমাদের কোন ধরণের ক্ষতি করবে না বলে অভয় দিল। তারা খুব ভদ্র ছিল এবং আমাদেরকে কোন হুমকি-ধমকি দিল না। তারা আমাদের দরজার কড়া নেড়ে জিজ্ঞাসা করত আমাদের কোনো কিছু লাগবে কিনা। যদি আমাদের কোন কিছুর দরকার হয় তাহলে তাদেরকে জানাতে বলে।

আমরা বাগদাদের ভারতীয় দূতাবাসে যোগাযোগ করলাম শুধু এটা বলতে যে, আমাদের কয়েকজন ভারতে ফিরে যেতে চায়। আমিসহ ১৫ জন ভারতে ফিরে যেতে চায়নি। দূতাবাস থেকে আমাদেরকে বলা হলো এরবিল অথবা বাগদাদে আমাদেরকে সরিয়ে নেয়া হবে। কিন্তু রাস্তা নিরাপদ নয়, তাই আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে।

এর পাঁচদিন পর রেড ক্রস আসল এবং আমাদেরকে খাবার ও মোবাইলের রিচার্জ কুপন দিল। আমরা হাসপাতালে ২০ দিন ছিলাম। এখান থেকে ভারী বন্দুকের আওয়াজ এবং বোমা বিস্ফোরণের শব্দত শুনা যেত। আমরা যে ভবনে ছিলাম সেটা প্রায়ই কেঁপে কেপে উঠত। আমাদের দিন কাটতো প্রার্থনা করে।

একদিন ইরাকের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে কে একজন আমাদেরকে ফোন করে বললো যে হাসপাতালের ভেতরে একটা বোমা রয়েছে। আমরা ব্যাপক ভয় পেলাম আর সারারাত রান্নাঘরে প্রার্থনা করে কাটালাম। পরে আবার তারা ফোন করে বলল যে এটা একটা মিথ্যা তথ্য ছিল।

এরপর ২৮ জুন যোদ্ধারা রমজানের রোজা রাখতে শুরু করল। কিন্তু আমাদেরকে খাবার দিত। দুপুরে ভাত আর মাছ এবং রাত্রে ভাতের সাথে সবজি। আমরা আমাদের বাড়িতে ফোন করতে পারতাম। কোনো বারণ ছিল না।

আইএসআইএস যোদ্ধারা কখনোই আমাদের কোন ক্ষতি করেনি। তারা বলতো আমরা তাদের বোনের মতো। এখানে তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হাসপাতাল দখলে রাখা।

৩ জুলাই তারা জানালো যেকোন সময় হাসপাতালে বোমা ফেলা হতে পারে। এজন্য তারা আমাদেরকে মসুলে স্থানান্তর করতে চায়। আমরা আবার দূতাবাসে ফোন করলাম এবং দূতাবাস থেকে আমাদেরকে তাদের সাথে মসুলে না যেতে পরামর্শ দেয়া হলো (কেননা মসুল তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই)। আমরা যোদ্ধাদেরকে জানালাম আমরা তাদের সাথে যেতে চাই না। কিন্তু এবার তারা বেশ দৃঢ় ছিল এবং আমাদেরকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে প্রস্তুত হতে বলল। আমরা তাদেরকে বললাম আমরা মসুল নয় এরবিলে যেতে চাই। তারা বলল, ঠিক আছে তারা আমাদেরকে এরবিলেই নিয়ে যাবে।

এরপর আমাদেরকে ধভয় দেখাতে তারা জানালা এবং দরজায় কয়েকটা গুলি করল এবং ৫ মিনিটের মধ্যে বাসে উঠতে নির্দেশ দিল। আমরা ভীষণ ভয় পেলাম। তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে আমাদের কয়েকজন আহত হলো। আমরা বাসে চড়ার সাথে সাথে যাত্রা শুরু হলো। বাসে আমরা ৪৬ জন স্টাফ ও আমাদের সঙ্গে দুই যোদ্ধা। বাকিরা গাড়িতে করে আমাদের অনুসরণ করে আসছিল।

প্রায় ৩০ মিনিট পর চালক জানালো, আমরা এরবিল নয় মসুল যাচ্ছি। আমরা যেন তড়িতাহত হলাম। আমরা ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের ফোনে একটা ক্ষুদেবার্তা পাঠালাম এবং তিনি উত্তরে আমাদেরকে রাস্তার সাইনবোর্ড দেখে তাকে অনবরত ক্ষুদেবার্তা পাঠাতে বললেন। বাসের পিছন দিকে যারা বসে ছিল তারাই ক্ষুদেবার্তা পাঠাচ্ছিল। কারণ আমরা ভয় পাচ্ছিলাম পাছে যোদ্ধারা আমাদেরকে দেখে ফেলে। এক পর্যায়ে চালক আমাদের সবাইকে ফোন বন্ধ করে দিতে বললো। কিন্তু আমরা ফোন বন্ধ করলাম না। কয়েক মিনিট পরই সে বলল আমাদের পরিবার যদি কান্নাকাটি করে তাহলে আমরা তাদের সঙ্গে দুমিনিট কথা বলতে পারি।

আমরা সাড়ে ১১টায় যাত্রা করেছিলাম আর পৌঁছলাম সন্ধা ৭টা ৪৫ মিনিটে। আমাদেররকে একটি ভবনে নেয়া হলো কিন্তু আমরা কিছুই দেখতে পেলাম না। কারণ ভবনটা খুবই অন্ধকার ছিল। তারা আমাদেরকে একটি কক্ষে তালা দিয়ে রাখলো এবং বললো- তারা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফিরে আসব। ঘরে কোনো আলো ছিল না, ছিল ধুলোবালি। তারা আধাঘণ্টা পরেই ফিরে আসলো এবং আমাদেরকে পানি দিল। এরপর ঘরে আলো ও এয়ার কন্ডিশনার চালিয়ে দিলো। রাত সাড়ে ১১টার দিকে আমদেরকে খাবার দিল।

রাতের খাওয়া শেষ হলে তারা জানালো, তারা আমাদেরকে পরের দিন এরবিলে নিয়ে যাবে যাতে আমরা ভারতে ফিরে যেতে পারি।

সকালে তারা ফিরে আসলো এবং বললো, তারা আমাদের একটা ভিডিও চিত্র নিতে চায় যেখানে আমরা বলবো যে যোদ্ধারা আমাদের সাথে কোনো খারাপ আচরণ করেনি, ক্ষতি করেনি এবং ঠিকমতো খাবার দিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন আমাদের মধ্য থেকে একজন তাদেরকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে গেল।

জুলাইয়ের ৪ তারিখে আমাদেরকে মসুল সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হলো এবং ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হলো। এখান থেকে আমাদেরকে এরবিল বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হলো। ৫ জুলাই আমাদেরকে ভারতে নিয়ে আসা হলো।

আমি ভারতে ফিরে এসেছি। আর কখনো ইরাকে যেতে চাই না। আমি কেরালায় একটা চাকরির চেষ্টা করবো। আমি ঋণ করে বিদেশ যাওয়ার টাকা দিয়েছিলাম। সেই টাকা আমাকে শোধ করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *