প্রশাসনের বাধায় আরো একবার নিজেদের জমিতে উঠতে ব্যর্থ হলো সোনামিয়া টিলার ৮১২ বাঙালি পরিবার


পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:
আরো একবার বঞ্চিত হলো দিঘীনালার সোনামিয়া টিলার ভূমিহীন ৮১২ বাঙালী পরিবার। দীর্ঘ ৩০ বছর পর নিজেদের কবুলিয়ত ভুক্ত জমিতে ওঠার পরও প্রশাসনের তাড়া খেয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হলো এসব ভূমিহীন বাঙালীরা।

৭০ দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী সেটেলমেন্ট প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে দিঘীনালার বাবুছড়ায় ৮১২ বাঙালী পরিবারকে ৫ একর করে জমি কবুলিয়ত দেয়া হয়। সে সময় সেটেলমেন্ট পাওয়া বাসিন্দা সোনা মিয়ার নামানুসারে স্থানটির নামকরণ করা হয় সোনামিয়া টিলা।

কবুলিয়ত প্রাপ্ত বাঙালীরা সেখানে ঘরবাড়ি ও বাগান সৃজন করে। কিন্তু এরশাদ সরকার নিরপত্তা অজুহাতে পার্বত্য বাঙালীদের তাদের নিজেদের জমি ছেড়ে গুচ্ছগ্রামে নিয়ে আসলে বাবুছড়ার এই ৮১২ পরিবারও ভুমিহীন হয়ে পড়ে। এরপর পাহাড়ীরা বাঙালীদের মালিকানাধীন জমিতে বসত ও ধর্মীয় কিয়াং ঘর নির্মাণ করে সোনা মিয়া টিলার নাম পরিবর্তন করে সাধনা টিলা নামকরণ করে।

স্থানীয় প্রশাসন পাহাড়ীদের অপদখল ঠেকাতে না পারলেও বাঙালীরা যখনই তাদের মালিকানাধীন জমিতে উঠতে গেছে তখনই বাঁধা দিয়েছে। এভাবে ১৯৮৭, ১৯৯০, ১৯৯৮, ২০০৩ ও ২০০৭ সালে বাঙালি পরিবারগুলো তাদের জায়গায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন তাদের আটকে দিয়েছে প্রত্যেকবার। অথচ পাহাড়ীরা বাধাহীনভাবে সেখানে অবৈধভাবে বসবাস করছে। প্রশাসন সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করে না।

এ নিয়ে বাঙালীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবী দাওয়া আন্দোলন করে আসছে। প্রশাসন তাদের কাগজপত্র পরীক্ষা করে তা বৈধ হিসাবে ঘোষণা করলেও বাঙালীদের তাদের নিজ জমিতে তুলে দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। ফলে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে বাঙালীরা ২১মে নিজেরাই নিজেদের জমিতে দখল নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে।

জানা যায়, উপজেলার বাবুছড়ার সোনামিয়া টিলা এলাকায় নিজেদের জায়গা দখল নিতে সকালে উপজেলার বেতছড়ি, রশিকনগর এলাকায় ৩/৪ শত বাঙালী জড়ো হয়। প্রথমে দুই গাড়িতে করে এসময় ৪০ থেকে ৫০ জন লোক সেখানে যায়। লোকজন সোনামিয়া টিলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিছানাপত্র নিয়ে উপস্থিত হলে পাহাড়ীরাও মন্দির এলাকায় অবস্থান নেয়।

এসময় উপজেলা স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিপুল পরিমাণ পুলিশ নিয়ে তাদেরকে তাড়া করে ঘটনাস্থল থেকে ফিরে আসতে বাধ্য করে।

এক বাঙালী নেতা এসময় পার্বত্যনিউজকে বলেন, পুলিশ পাহাড়ীদের অবৈধ দখল দেখে না, অথচ বাঙালীদের বৈধ জমিতে উঠতে দিচ্ছে না।

স্থানীয় বাঙালী নেতা আবদুল মালেক পার্বত্যনিউজকে বলেন, প্রশাসনের দিকে চেয়ে চেয়ে আমাদের বহু বছর কেটেছে। শুধু মৌখিক সান্তনা ছাড়া কিছুই পাইনি। তাই নিজেরাই আজ আমরা আমাদের বৈধ জমিতে ওঠার চেষ্টা করেছি। কিন্তু পুলিশ আমাদের আক্রমণ করেছে। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, কিন্তু স্থানীয় ওসি আমাদের যে ভাষায় গালিগালাজ করেছেন তা ভাষায় প্রকাশ যোগ্য নয়।

তিনি আরো বলেন, পাহাড়ীরা জড়ো হলেও তারা আমাদের উপর কোনো আক্রমণ করেনি। তাদের দেখে মনে হয়েছে তারা কৌতুহল স্বরূপ দেখতে এসেছিল।

এ ব্যাপারে পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক মো. তাহেরুল ইসলাম সোহাগ জানান, বাবুছড়ার সোনামিঞা টিলা এলাকায় বাঙ্গালীদের ৮শত ১২ পরিবারের মধ্যে আমার বাবার নামীয় ৫ একরের জায়গা রয়েছে। আমাদের সবার সেখানে বসতি ছিল। কিন্তু ১৯৮৪ এবং ১৯৮৬ সনে পাহাড়ে বিরাজমান পরিস্থিতির ফলে নিরাপত্তার অযুহাতে সরকার উপজেলার বেতছড়ি, রশিকনগর, মধ্যবোয়ালখালী এবং কবাখালী এলাকায় গুচ্ছগ্রামে বসতি করান । তার পর থেকে আমরা সেখানে অবস্থান করি।

এব্যাপারে বাবুছড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সন্তোষ জীবন চাকমা জানান, সকালে যখন গাড়ি বোঝাই লোকজন বাবুছড়া এলাকায় প্রবেশ করে তখন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে সাথে সাথেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা মহোদয়কে মুঠোফোনে জানাই।

এব্যাপারে দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শেখ শহিদুল ইসলাম জানান, বাবুছড়ায় বিবাদমান জায়গার উপর কেহ যেন দখল করতে না যায় সে ব্যাপারে সকলকে অনুরোধ করা হয়েছে। উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় জানানো হবে। পাশাপাশি ওই এলাকার দুই পক্ষকে শান্ত থাকার আহবান জানানো হয়েছে।

পার্বত্য অধিকার ফোরাম ও বৃহত্তর পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ

এদিকে সোনামিয়া টিলা থেকে জমির মুল মালিক বাঙালীদের তাড়িয়ে দেয়ার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে পার্বত্য অধিকার ফোরাম ও বৃহত্তর পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলেন, আজ ২১-০৫-২০১৮ রোজ সোমবার খাগড়াছড়ি জেলার অন্তর্গত দীঘিনালা উপজেলার বাবু ছড়ার সোনামিয়া টিলা নামক স্থান হতে ১৯৮৬-৮৭ সালে উচ্ছেদকৃত ৮১২ পরিবারের সদস্যরা পূনরায় তাদের নিজ নামে বন্দোবস্তকৃত জায়গায় ঘর নির্মাণ করতে গেলে উপজাতি সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তাদের উপর হামলা চালায়।ইউপিডিএফ ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সন্ত্রাসীরা পূর্ব প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বাঙালিদের হামলা চালাতে সোনামিয়া সরকারী প্রাইমারী স্কুলে জড়ো হয়।

এই ঘটনায় পরে প্রশাসন গিয়ে বাঙালি দের নিরাপত্তা না দিয়ে তাদেরকে লাঠি চার্জ ও মারধর করে সোনামিয়া টিলা হতে বাঙালি পরিবারগুলোকে তাড়িয়ে দেয়। এই ঘটনায় পার্বত্য অধিকার ফোরাম ও বৃহত্তর পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা ও জোর প্রতিবাদ জানাচ্ছি।

উক্ত ঘটনায় উপজাতি সন্ত্রাসীদের ইন্ধনসহ তাদের পক্ষে প্রশাসনের এমন আগ্রাসী ভূমিকার প্রতি তীব্র ও প্রতিবাদ জানিয়ে পার্বত্য অধিকার ফোরামের চেয়ারম্যান মো: মাঈন উদ্দীন বলেন বাবুছড়া সোনামিয়া টিলায় ১৯৭৯-৮০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামকে জুম্মল্যান্ড হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সরকার ৫ একর করে জায়গা দিয়ে ৮১২ টি পরিবারকে সেখানে পূর্নবাসন করা হয়েছিল।

কিন্তু ১৯৮৬-৮৭ সালে উপজাতি সশস্ত্র সন্ত্রাসী সন্তুবাহিনী কর্তৃক বাঙালিদের কিলিং মিশন চলাকালীন তাদের এই স্থান থেকে প্রশাসন পূর্নবহালের আশ্বাসে সরিয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু আজকের পূর্বে ১৯৮৭, ১৯৯০, ১৯৯৮, ২০০৩ ও ২০০৭ সালে বাঙালি পরিবারগুলো তাদের জায়গায় ফিরে গিয়েছিল। তখনও আজকের মত প্রশাসন তাদের সেখান থেকে নিরাপত্তা জনিত কারণ দেখিয়ে তাড়িয়ে দেন।

সরকারী খাসভূমিগুলো তাদের নামে বন্দোবস্ত সহ বরাদ্দ দেওয়ার পর থেকে তারা নিয়মিত সরকারকে খাজনা প্রদান করে যাচ্ছেন। তাহলে কেন তারা তাদের ভূমিতে ফিরতে পারবে না? আজ এই ভূমিহীন পরিবারগুলো তাদের জায়গায় ফেরার পূর্বে প্রশাসনের সুদৃষ্টি ও সহযোগীতার প্রত্যাশায় একাধিকার সরকারে সর্বোচ্ছ পর্যায় পর্যন্ত স্মারকলিপি ও লিখিত অভিযোগ প্রদান করেছে।

সহযোগিতা ও নিরাপত্তার দাবীতে একাধিকবার মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ ও করা হয়েছে। সর্বশেষ ২০০৮ সালে তৎকালীন খাগড়াছড়ির জেলা জেলা প্রশাসক দিঘীনালা উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে একটি লিখিত আদেশের মাধ্যমে এই পরিবার পরিবারগুলোকে তাদের ভূমি ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করার করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু সেটারও কোন কার্যকর ব্যবস্থা কোন এক অদৃশ্য কারণে নেওয়া হয়নি।

তাহলে আজ কোন কারণ ছাড়া সোনা মিয়া টিলার এই আটশত বারটি পরিবারকে তাদের নিজস্ব জায়গায় ফিরতে দেওয়া হচ্ছে না? অন্যতম একটি প্রধান মানবিক মৌলিক অধিকার হওয়া সত্বেও কেন এই ৮১২ পরিবারের প্রায় ১৫০০০ পনের হাজার মানুষ গরু ছাগলের সাথে ঘুমাবে? অবিলম্বে এই নিরীহ ভূমিহীন পরিবারগুলোকে তাদের নিজভূমিতে ফেরত পাঠানোসহ নিম্নলিখিত ৫ দফা উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

অন্যথায় এই নিরীহ ভূমিহীন মানুষগুলোর অধিকার রক্ষায় সকল শ্রেণী পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে আগামীতে কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *