parbattanews bangladesh

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেই নিহিত আছে পার্বত্য ভূমিসমস্যার সমাধান

সৈয়দ ইবনে রহমত:
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান সমস্যার মূলে রয়েছে সেখানকার ভূমিবিরোধ বা ভূমি সমস্যা। বিষয়টি সুরাহার লক্ষ্যে সরকার ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তির আলোকে প্রণয়ন করে ‘পার্বত্য ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১’। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের অসহযোগিতা, আপত্তি, বাধা প্রদান এবং হুমকির কারণে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন তেমন কোনো কাজই করতে পারেনি। অবশেষে আঞ্চলিক পরিষদের দাবি মেনে ২০১৬ সালের ১ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের ১৪টি সংশোধনী অনুমোদন করে, যা ৮ আগস্ট ২০১৬ প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর কার্যকর হয়। বিষয়টি নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বৃহত্তর জনগোষ্ঠি বাঙালিদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এতে কিছু শব্দগত ও টেকনিক্যাল পরিবর্তন ছাড়া তেমন কিছুই করা হয়নি। এ সংশোধনীর ফলে কেউ তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ হবে না। তাই কারো ভূমি হারানোর আশঙ্কারও কিছু নেই। কিন্তু আইন সংশোধন হওয়ার পর ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন তার দায়-দায়িত্ব সম্পন্ন করার পূর্বেই পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা এক চিঠিতে তিন পার্বত্য জেলার সার্কেল চিফ, জেলা প্রশাসক, জেলা পরিষদ চেয়াম্যান, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং হেডম্যানদের বিধিবহির্ভূতভাবে বন্দোবস্তকৃত জমির নামজারিসহ খাজনা/কর আদায় স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে পার্বত্য ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তির দিকে না গিয়ে বরং নতুন সংকটের দিকে মোড় নিয়েছে। যা অনেকটা পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ কর্তৃক রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার পর্যায়ে চলে গেছে। আসলে এই ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন, ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১ এবং ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধনী-২০১৬ এগুলোর পেছনে সরকারের আন্তরিকতা ও উদ্দেশ্য পার্বত্য ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি করা হলেও যাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এগুলো করা হয়েছে তাদের উদ্দেশ্য কিন্তু ভিন্ন। বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে গত ৪ আগস্ট ২০১৬ এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে দেওয়া মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীকের বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘১৯৮৭ সালে পার্বত্যাঞ্চলের এসব দেশদ্রোহীরা সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিলো পুরো বাংলাদেশ দু’টি ভাগে ভাগ করার। এক ভাগের নাম বাংলাদেশ যার রাজধানী ঢাকা। আর এক ভাগের নাম হবে জুম্মল্যান্ড যার রাজধানী রাঙাগামাটি। এই দু’টি অংশ মিলে একটি ফেডারেল সরকার হবে। তখন আমরা রাজি হইনি। কিন্তু বর্তমান এই ভূমি আইন বাস্তবায়নের ফলে দেশদ্রোহীদের সেই সপ্ন বাস্তবায়ন হবে।’

এর আগে বিভিন্ন লেখায় আমরাও বলেছি, এসব সংশোধনীর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিদের উচ্ছেদ করার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পেয়ে যাবেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমা। আর কমিশনকে ব্যবহার করে সন্তু লারমা কোনো বাঙালি পরিবারকে পার্বত্য চট্টগ্রামে তার ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করলেও কোনো আইন-আদালত কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিকার করার ক্ষমতা থাকবে না। ভূমি কমিশন আইনের ১৬ নং অনুচ্ছেদেই বলা আছে যে, ‘ধারা ৬(১)-এ বর্ণিত কোন বিষয়ে দাখিলকৃত আবেদনের উপর কমিশন প্রদত্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ানী আদালতের ডিক্রী বলিয়া গণ্য হইবে, তবে উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন আদালত বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষের নিকট আপীল বা রিভিশন দায়ের বা উহার বৈধতা বা যথার্থতা সম্পর্কে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’ এ অবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত লক্ষ লক্ষ বাঙালি পরিবার তাদের ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে। যার আলামত রয়েছে আঞ্চলিক পরিষদ থেকে জমির নামজারিসহ খাজনা/কর আদায় স্থগিত রাখার নির্দেশ জারি করার মধ্যে। পার্বত্যবাসী এটা ভালো করেই জানে যে, এই সিদ্ধান্তটি নতুন নয়, বরং বহু পুরনো। জনসংহতি সমিতির অলিখিত নির্দেশে বহু আগে থেকেই হেডম্যান কারবারিগণ পারতপক্ষে বাঙালিদের জমির খাজনা/কর গ্রহণ করেন না। আইনের সংশোধনীর পর তারা সেটা লিখিতভাবেই করতে সক্ষম হলেন, এটি একটি ভয়ানক ষড়যন্ত্রের ভিন্নরূপে প্রকাশ ঘটল। কিন্তু সেই ষড়যন্ত্রটি কী?


এ সংক্রান্ত আরও কিছু বিশ্লেষণ

ভূমি কমিশন আইন: পার্বত্যাঞ্চল থেকে বাঙালী উচ্ছেদের হাতিয়ার

কি ঘটবে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধন প্রস্তাব কার্যকর হলে?

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ: প্রেক্ষাপট ও শান্তির সম্ভাবনা


পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ৪নং ধারার ২নং উপধারায় বলা হয়েছে, ‘চেয়ারম্যান ও অন্যান্য সদস্যগণ জনসাধারণ কর্তৃক প্রত্যক্ষভাবে এই আইন ও বিধি অনুযায়ী নির্বাচিত হইবেন।’ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ভোটার তালিকা প্রয়োজন। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে সুষ্ঠু ভোটার তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে যাতে জটিলতা সৃষ্টি করা যায়, সম্ভবত সেই উদ্দেশ্যই পার্বত্য চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের ৯নং ধারার ৪নং উপ-ধারায় কোনো ব্যক্তির ভোটার হওয়ার ব্যাপারে একটি বিতর্কিত এবং সংবিধান পরিপন্থী শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই উপধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি তিনি পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হন।’ যা পরে ১৯৯৮ সালে জেলা পরিষদ আইনসমূহ সংশোধন করে ১৭নং ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আবার অ-উপজাতীয়দের ক্ষেত্রে স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার শর্ত জুড়ে দিয়ে পার্বত্য চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের ৩নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা বলিতে- যিনি উপজাতীয় নহেন এবং যাহার পার্বত্য জেলায় বৈধ জায়গা জমি আছে এবং যিনি পার্বত্য জেলায় সুনির্দিষ্ট ঠিকানায় সাধারণত বসবাস করেন তাহাকে বুঝাইবে।’

অর্থাৎ পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসরত বাঙালিদের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে ভোটার হতে হলে বৈধ জমির মালিক হতে হবে। কিন্তু বাঙালিরা যাতে বৈধ জায়গা সম্পত্তির মালিক হতে না পারে সে জন্যও সকল পদক্ষেপ নিয়ে রাখা হয়েছে। আসলে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের উদ্দেশ্য সরকারে নিকট যাই থাকুক উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের কাছে এর উদ্দেশ্য পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসরত বাঙালিদের ভূমিহীন করা। কেননা পার্বত্য বাঙালিদের ভূমিহীন করতে পারলে সংবিধান পরিপন্থীভাবে (পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ক্ষমতা বলে) তাদের ভোটাধিকার হরণ করা যাবে। আর সেটা সম্ভব হলে বাঙালিরা পার্বত্যাঞ্চলে ভূমির অধিকার, ভোটাধিকার হারিয়ে এক সময় হতাশ হতে বাধ্য হবে। আর মৌলিক অধিকার বঞ্চিত এসব মানুষ হয়তো পার্বত্যাঞ্চল ছেড়ে যেতে শুরু করবে। ক্রমান্বয়ে বাঙালির সংখ্যা কমতে থাকলে তারা পার্বত্যাঞ্চলে জাতিসংঘের উপস্থিতিতে পূর্বতিমূরের মতো স্বাধীনতার দাবিতে গণভোটের আয়োজন করবেন। সে ভোটের ফলাফল কোন দিকে যাবে তা-তো আগেই থেকেই নির্ধারণ করা থাকছে। অতএব, পরিণতিটা সহজেই অনুমেয়। ভূমি কমিশন আইন সংশোধন, আদিবাসী স্বীকৃতি আদায়, জেলা পরিষদের মাধ্যমে পুলিশের উপর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের প্রচেষ্টাসহ পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীয় নেতৃবৃন্দ প্রতিটি পদক্ষেপই নিচ্ছেন সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে। ভূমিকমিশন আইন সংশোধনীর প্রতিটি প্রস্তাবই তাদের সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্যই আনা হয়েছিল। সরকারের সংশ্লিষ্টরা এসব বিষয় নিয়ে কী ভাবছেন, সেটা তারাই বলতে পারবেন। সন্তু লারমা চিঠির মাধ্যমে তাদের অভিপ্রায়ের কথা যে স্পষ্ট করেই বুঝিয়ে দিয়েছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে এর সমাধান কী?

সমস্যা যেহেতু আছে, তার সমাধানও আছে। আর সেটা সরকারের সংশ্লিষ্টদেরও অজানা নয়। তারপরও বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য এ প্রসঙ্গে প্রধানন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) থেকে প্রচারিত এক সংবাদ থেকে জানা যায়, চলতি বছরের গত ২১ জানুুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের প্রতি শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘জমি-জমার মালিকানা সেই ব্রিটিশ আমলে করা আইন দিয়ে নয় বরং আমাদের সব জায়গার মানুষ যেন তাদের ভূমির মালিকানাটা পায়, পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ যেন তাদের ভূমির মালিকানাটা সেইভাবে নিতে পারে- সেটাই আমরা নিশ্চিত করতে চাই।’ প্রধানমন্ত্রী রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেল থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দুর্গম পার্বত্য এলাকায় বহুমুখী ব্যবহার উপযোগী চার হাজারতম পাড়াকেন্দ্রের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের ভাষণে এসব কথা বলেন। সবাইকে সব কিছুর ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝাতে হয় না, আশা করি এটাও বোঝাতে হবে না। কেননা, পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনসমূহ, আঞ্চলিক পরিষদ আইন, ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন- এসবই সেই ১৯০০ সালে ব্রিটিশদের প্রণীত আইন থেকে উদ্ভূত। যা আজ আর চলনসই নয়। ফলে এসব সংস্কার বা সংশোধন করে সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার হিসেবে সারাদেশের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি নাগরিক যেন তার ভূমির মালিকানা পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে আঞ্চলিক পরিষদ আইনের ২২, ২৩ ও ২৪ ধারায় যেসব কার্যাবলীর কথা বলা হয়েছে তাতে তিন পার্বত্য জেলায় বন্দোবস্তকৃত জমির নামজারিসহ খাজনা/কর আদায় স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয়ার এখতিয়ার পরিষদের আছে কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। কেননা আইনের উপর্যুক্ত ধারাসমূহে আঞ্চলিক পরিষদকে ‘তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ উহাদের আওতাধীন এবং উহাদের উপর অর্পিত বিষয়দির সার্বিক তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় সাধনের কথা বলা হয়েছে’। পূর্ব থেকে চলমান কোনো ব্যবস্থাকে রহিত করার নির্দেশ প্রদানের ক্ষমতা দেয়া হয়নি। পার্বত্য চুক্তির ‘গ’ খণ্ডের অনুচ্ছেদ ৬ এবং আঞ্চলিক পরিষদ আইনের ১২ ধারা অনুসারে আঞ্চলিক পরিষদের মেয়াদ পাঁচ বছর। অথচ ১৯৯৮ সালের ৬ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের পর ১৯৯৯ সালের ১২ মে সন্তু লারমা প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ গ্রহণ করেন। সেই থেকে অদ্যাবধি একই পদে তিনি বহাল আছেন। এর মধ্যে এই পরিষদের মেয়াদ বৃদ্ধির কোনো প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয়েছে বলেও জানা যায়নি। তাই বর্তমান আঞ্চলিক পরিষদের আইনি বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাছাড়া হাইকোর্ট থেকে আঞ্চলিক পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ আইনকে অবৈধ বলে একটি রায় দেয়া আছে, যা বর্তমানে সুপ্রিমকোর্টের বিবেচনাধীন আছে। সেটির সুরাহা করার প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

sayedibnrahmat@gamil.com