পৃথিবীতে শান্তি নামক অতি কাম্য অবস্থা এখন নেই



কক্সবাজার প্রতিনিধি:
বর্তমান পৃথিবীতে শান্তি নামক অতি কাম্য অবস্থা এখন নেই বললেই চলে। দেশ, জাতি, গোষ্ঠী, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ক্ষুদ্র থেকে বৃহদাকারে অশান্তির দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। চারিদিকে এক ভীতিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নিরাপত্তাহীনতায় মানুষ উদ্বিগ্ন। শক্তিমান দ্বারা দুর্বলরা প্রতিনিয়তই নির্যাতিত-নিষ্পেষিত হচ্ছে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি-স্বস্তির ব্যাপক অভাব প্রকাশিত হচ্ছে। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব হওয়া সত্ত্বেও মানুষের দ্বারাই সুজলা-সুফলা এ ধরণী আজ অশান্ত।

বৃহস্পতিবার (১১ জানুয়ারী) বিকালে কক্সবাজার সাংস্কৃতিককেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ (স.) এর অবদান’ শীর্ষক সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধে কথাগুলো উঠে আসে। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ হাসমত আলী। সেমিনারে প্রধান আলোচক ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্ট্যাডিজ বিভাগের সহযোগি অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন কাদেরী। সীরাতুন্নবী (স.) উদযাপন পরিষদ কক্সবাজার এই সেমিনারটি আয়োজন করে।

প্রবন্ধে বলা হয়েছে, যুদ্ধ, মারামারি, খুন-জখম, হামলা, অবিচার, পাপাচার এর ফলে পৃথিবী আজ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে। সামান্য অজুহাতেই এক দেশ আরেক দেশের উপর হামলা করছে, দখল করে নিচ্ছে। স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হয়ে যাচ্ছে পরাধীন দেশের কাতারে। একদেশ আরেক দেশকে অর্থ-অস্ত্র-বুদ্ধি দিয়ে সাহায্য করছে অন্যদেশকে ঘায়েল করার জন্য।

মুক্তিকামী মানুষের উপর বাহিনী লেলিয়ে দেয়া হচ্ছে দমন নিপীড়নের জন্য। হাজার বছর ধরে বসবাসরত জনগোষ্ঠীকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্ছিত করা হচ্ছে, তাদের ভিটেমাটি কেড়ে নিয়ে দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। বসত-বাড়ি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে সেখানে নিজেদের বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে। সরকার কর্তৃক সেদেশের ভিন্ন মতাবলম্বী নাগরিকদেরকে তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, দমন করা হচ্ছে। দলপ্রীতি-স্বজনপ্রীতি এত প্রসারিত হয়েছে যে সেখানে অন্যদের সুযোগ-সুবিধার কথা, অধিকারের কথা ভাবাই দুরূহ।দুর্নীতি, অপরাধ, অবক্ষয় এর ব্যাপকতা বেড়েই চলছে। পারিবারিক রীতিনীতি ও আচার ব্যবস্থা ভেংগে পড়ছে।দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধুলিস্যাত হতে চলেছে আজকের পরিবার গুলোতে। পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি, স্বামী-স্ত্রী সহ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক দুরত্ব, অবিশ্বাস আর অমিল পারিবারিক সুখ-শান্তিকে বিনষ্ট করে চলেছে।

সদস্যদের মধ্যে দায়িত্বশীলতা, সততা ও নৈতিকতার মাত্রা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে লেগে আছে নিত্য নতুন সমস্যা আর অস্থিরতা। ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে সুখের পারিবারিক সংগঠনগুলো। এর প্রভাব পড়ছে জাতীয় পর্যায়ে। এক কথায় শান্তি অনুপস্থিত।

অশান্ত পরিস্থিতির ফল স্বরুপ সমাজে, রাষ্ট্রে এমনকি পুরো বিশ্বে অস্থিতিশীলতা, সহিংসতা, উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সন্ত্রাসবাদের জন্ম নিয়েছে। মানুষ নিজ হাতে আইন তুলে নিয়ে সুখ খোজার চেষ্টা করছে।বিশ্বব্যাপী যে অস্থিরতা তা মূলতঃ সামগ্রিক অশান্তিরই বহিঃপ্রকাশ।

ইন্সটিটিউট ফর ইকোনোমিক্স অ্যান্ড পীচ এর রেফারেন্স তুলে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, অশান্ত পরিস্থিতির পরিণতি শুধুমাত্র রাজনৈতিক আর সামাজিক ক্ষেত্রে নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এর প্রভাব মারাতœক। অশান্ত দেশে স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ ব্যাপকহারে কমে যায়। মুদ্রাস্ফীতি কিংবা মন্দাজনিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যুদ্ধ কিংবা অস্থিশীলতার কারণে সিরিয়ার জিডিপি ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ৫৩% কমে গেছে।

মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমে যায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পায়।অশান্ত পরিস্থিতির ফলে বিশ্বব্যাপী অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পায়। দেশে ছেড়ে অন্যত্র স্থানান্তরের প্রবণতা বেড়ে যায়।বৈষম্য ব্যাপক হারে বেড়ে যায়, সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।

প্রবন্ধে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অশান্তির পেছনে যেসকল কারণ দায়ী রয়েছে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে এ জন্য অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক সহিংসতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, সন্ত্রাস, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতা, উগ্র জাতীয়তাবাদ, অবিচার, জুলুম ও দুঃশাসন, প্রতিশোধ স্পৃহা, আদর্শনেতৃত্ব সংকট, শান্তি স্থাপনে গৃহীত ব্যবস্থার অসারতাকে দায়ী করা হয়েছে।

প্রবন্ধকার সবশেষে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও মানবতার সুন্দরতম আদর্শ প্রতিষ্ঠায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.)ই সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত জানিয়ে জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা অধ্যাপক এডওয়ার্ড মুনন্ট এর রেফারেন্স টেনে বলেন, “চরিত্র গঠন ও সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে মুহাম্মদ (সাঃ) যে সাফল্য অর্জন করেছেন সেদিক থেকে তাঁকে বিশ্বমানবতার মহান দরদী নেতা বলে প্রতীয়মান হয়।”
প্রিয়নবীর (সাঃ) মহানুভবতার কথা বলতে যেয়ে মক্কা বিজয়কালীন ইতিহাস তুলে ধরে ঐতিহাসিক গীবন বলেন, “হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর পদতলে দুশমনদের পেয়েও একে একে সব দুশমনকে মাফ করে দিয়ে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন অনুরূপ দৃষ্টান্ত পৃথিবীর সুদীর্ঘকালের ইতিহাসে দ্বিতীয়টি আর নেই। সেই ঔদার্য ও ক্ষমাশীলতার দ্বিতীয় কোন দৃষ্টান্ত আর দেখা যায় না।”

সেমিনারের সভাপতি কক্সবাজার ইসলামিয়া মহিলা কামলি (মাস্টার্স) মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ জাফরুল্লাহ নুরীর সভাপতিত্বে প্রধান আলোচক মমতাজ উদ্দিন কাদেরী বলেন, সুখ আর শান্তি এক নয়। সুখ সহজেই মেলে। কিন্তু শান্তি কষ্ট করে পেতে হয়। শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতেই মহান আল্লাহ নবী (স.) কে প্রেরণ করে। শান্তির জন্য অনেক ত্যাগ দরকার।

তিনি বলেন, আমাদের সমাজ আত্মবান্ধব নয়। একারণে চারিদিকে অশান্তি। সমাজে হানাহানি বেড়েছে। সমাজে রাসুল (স.) আদর্শের উপস্থিতি নেই। রাসুলের নসিহত আমরা মেনে চলিনা। রাসুল (স.) সকল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেই দ্বীন কায়েম করেছেন। বর্তমানে অশান্তির জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী। শান্তির জন্য মতভেদ ভুলে সকল মুসলমানকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। রাসুলের নীতি মেনে চলতে হবে।
সেমিনার পরিচালনা করেন আয়োজক সংগঠন সীরাতুন্নবী (স.) উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব অধ্যাপক ফরিদুল আলম। স্বাগত বক্তব্য দেন সমন্বয়ক এএএম সিরাজুল ইসলাম। দেশী সাংস্কৃতিক সংসদের সার্বিক সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে সীরাত উপলক্ষে প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার দেয়া হয়। সন্ধ্যায় অনির্বাণ ও প্রবাল শিল্পীগোষ্ঠি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হামদ/নাত গজল সন্ধ্যা ‘সিরাজাম মুনিরা’ পরিবেশন করে।

image_pdfimage_print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *