পাহাড় ধসে রাঙামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রামে নিহত ৮৬ : সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যহত


স্টাফ রিপোর্টার: 

গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে ৮৬ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রাঙামাটিতে ২ সেনা কর্মকর্তাসহ ৫৪ জন, বান্দরবানে ৯ জন এবং চট্টগ্রামে ২৩ জন মারা গেছেন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ এখনও মাটির নিচে অনেকে চাপা পড়ে আছেন। সোমবার মধ্য রাতে থেকে আজ মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত প্রাণহানির এ ঘটনা ঘটেছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্ট:

রাঙামাটিতে পাহাড় ধসে মৃত ৪৫

রাঙামাটি শহর ও বিভিন্ন উপজেলায় প্রবল বর্ষণের ফলে পাহাড় ধসে কমপক্ষে ৪৫ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রাঙামাটি সদরে দুই সেনা কর্মকর্তা ও দুই সেনা সদস্যসহ ২০ জন, কাপ্তাইয়ে ১১ জন ও কাউখালীতে ২১ জন, বিলাইছড়িতে ২ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাঙামাটি সদর হাসপাতালে আহত ৫৬ জন ভর্তি রয়েছেন।

রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের সিভিল সার্জন ডা. শহীদ তালুকদার জানান, চার সেনা সদস্যসহ সদর হাসপাতালে ২০টি মৃতদেহ আছে। এই সংখ্যা বাড়তে পারে।

সকালে শহরের যুব উন্নয়ন, ভেদভেদী, শিমুলতলি, রাঙাপানিসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পাহাড় ধসের খবর আসতে থাকে। দুপুর ১টা পর্যন্ত রাঙামাটি শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে রাঙামাটি সদর হাসপাতালে ১১ জনের মৃতদেহ এসেছে। এরা সবাই বিভিন্নস্থানে বাড়ীর উপর পাহাড়ধসের ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন।

নিহতরা হলেন- রুমা আক্তার,নুরিয়া আক্তার,হাজেরা বেগম,সোনালি চাকমা,অমিত চাকমা, আইয়ুশ মল্লিক,লিটন মল্লিক, চুমকি দাশ এবং আরো তিনজনের নাম তাৎক্ষনিকভাবে জানা যায়নি।

এদিকে কাপ্তাই উপজেলায় ১১ জন, কাউখালী উপজেলায় ২১ জন মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে এখনো পর্যন্ত কারো নাম জানা যায়নি ।

সূত্রে জানা গেছে, রাঙামাটি শহর থেকে ২ কি. মি দুরে শহরের প্রবেশমুখে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের পাহাড় ধ্বসের কারণে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে আছে এমন খবরের ভিত্তিতে রাঙামাটি সদর জোনের সেনাবাহিনীর ১৬ সদস্যের একটি দল উদ্ধার কাজ চালাতে যায়। দলটি ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। এসময় অকষ্মাৎ নতুন করে পাহাড় ধস শুরু হলে সেনা সদস্যরা ৩০ ফুট নিচে পড়ে মাটি চাপা পড়ে এ দূর্ঘটনা ঘটে।

 রাঙামাটি সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, সকালে রাঙামাটি মানিকছড়ি সেনা ক্যাম্পের সামনে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম প্রধান সড়ক যান চলাচল স্বাভাবিক করতে গিয়ে ক্যাম্পের পাহাড় ধসে চার সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম জানিয়েছেন, রাঙামাটিতে পাহাড় ধসের ঘটনায় কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এখনও তাদের উদ্ধার কাজ চলছে। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে।

নিহত সেনা কর্মকর্তাগণ হলেন, মেজর মাহফুজ (৪৪ লং কোর্স), ক্যাপ্টেন তানভির (৬৪ লং কোর্স)। এবং আহত অপর দুই সেনা সদস্য হলেন কর্পোরাল আজিজ ও সৈনিক শাহীন। মেজর মাহফুজের ৫ বছরের একটি সন্তান রয়েছে এবং ক্যাপ্টেন তানভির সালমান নববিবাহিত।

এ ঘটনায় আরো ১০-১২ জন সেনা সদস্য আহত ও ১ জন নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজ সৈনিকের নাম আজিজ। আশঙ্কাজনক পাঁচ সেনা সদস্য হচ্ছেন সৈনিক আজমল, মামুন, ফিরোজ, মোজাম্মেল ও সেলিম। তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারযোগে ঢাকার সিএমএইচে নেয়া হয়েছে। বাকিরা মানিকছড়ি রিজিয়ন সিএমএইচে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এদিকে কাপ্তাই উপজেলার রাইখালি ইউনিয়নের কারিগরপাড়া এলাকায় মাটিচাপা পড়ে উনু চিং মারমা এবং নিকি মারমা মারমা নামের দুইজন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন রাইখালি ইউপি চেয়ারম্যান ছায়ামং মারমা।

কাপ্তাই উপজেলার নতুন বাজার এলাকায় গাছ চাপা পড়ে আবুল হোসেন (৪৫) নামের এক ব্যক্তি মারা গেছেন এবং ইকবাল নামের এক ব্যক্তি কর্ণফুলি নদীতে নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কাপ্তাই উপজেলা চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন।

এদিকে প্রবল বর্ষণে রাঙামাটি শহরের বিভিন্ন স্থানে মাটিচাপা পড়েছে অসংখ্য মানুষ। ফায়ার সার্ভিসের রাঙামাটি টিমকে সহযোগিতা করতে চট্টগ্রামের হাটহাজারি থেকেও বাড়তি ইউনিট আসছে বলে জানিয়েছেন ফায়ারসার্ভিস কর্মকর্তারা। রাঙামাটি শহরে মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

রাঙামাটির কোতয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ মুহম্মদ রশীদ জানিয়েছেন, এটা একটা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। মৃতের সংখ্যা আরো অনেক বাড়বে। অনেক স্থানেই এখনো মানুষ মাটি চাপা পড়ে আছে।

বান্দরবানে পাহাড় ধ্বসে শিশুসহ ৯ জনের মৃত্যু

আমাদের বান্দরবান প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় মোরা’র ক্ষত শুকাতে না শুকাতে নিম্নচাপে টানা তিন দিনের বর্ষণে ও পাহাড়ী ঢলে বান্দরবানে পাহাড় ধ্বসে মাটি চাপা পড়ে একই পরিবারের তিন শিশুসহ ৯ জন নিহত হয়েছে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বান্দরবানের সাথে সারা দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

দমকল বাহিনী ও স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবার রাতে প্রবল বর্ষণে ৩টার দিকে কালাঘাটার কবরস্থানের পাশে, জেলেপাড়া ও লেমুঝিরি আগাপাড়া পাহাড় ধ্বসের ঘটনা ঘটে। এসময় ঘুমন্ত অবস্থায় তিন শিশুসহ ৬জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছে ৪জন। আহতদের উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

কালাঘাটার কবরস্থানের পাশে পাহাড় ধ্বসে রেবা ত্রিপুরা (১৮) নামের এক কলেজ শিক্ষার্থী মাটি চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। জেলে পাড়ায় মা-মেয়ে কামুরন নাহার ও সুফিয়া বেগম মাটি চাপায় নিখোঁজ রয়েছেন এবং লেমুঝিরি আগাপাড়া এলাকায় পাহাড় ধসে একই পরিবারের তিন শিশু শুভ বড়ুয়া (৮), মিঠু বড়ুয়া (৬), লতা বড়ুয়া (৫) নিহত হয়েছেন। আহতরা হলেন পসান ত্রিপুরা (২২), বীর বাহাদুর ত্রিপুরা (১৬) ও দুজাকিন ত্রিপুরাসহ (২৬) আরও দু’জন।

এছাড়া মঙ্গলবার সকালে কুহালং ইউনিয়নের পূর্ব ধোপাছড়ি এলাকার সম্বুনিয়া পাড়ায় পাহাড় ধসে একই পরিবারের ঘুমন্ত অবস্থায় আরও তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন, মংকাউ খেয়াং (৫৫) মেম্রউ খেয়াং (১৩) ও ক্যসা খিয়াং (৭) বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এসময় চাইহ্লাউ (৩৫) ও সানু খেয়াং (১৮) নামে দু’জন আহত হয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার মো. তারেক জানান, পাহাড় ধ্বসে এ পর্যন্ত ৪জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গভীর মাটির নিচে মা ও মেয়ের লাশ পড়ে থাকায় এবং প্রবল বর্ষণের কারণে উদ্ধার তৎপরতা চালাতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। এ দু’জনের লাশ উদ্ধারে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কুহালং ইউনিয়নের পূর্ব ধোপাছড়ি এলাকার সম্বুনিয়া পাড়ায় পাহাড় ধ্বসে ঘটনা তার জানা নেই।

জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। এছাড়া জেলা সদর ও ছয় উপজেলায় পাহাড় ধ্বসে প্রায় একশ’র উপরে পাহাড় ধ্বসে ঘর বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এদিকে মঙ্গলবার ভোরে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় পাহাড় ধসে একটি শিশুসহ ১৭ জন নিহত হয়েছেন। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন একজন।

টানা বর্ষণে বান্দরবানের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত

রাঙামাটিতে সোমবার থেকে শুরু হওয়া বর্ষণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ধসে পড়ে। ধসে পড়া মাটির নিচে এখনও অনেকে চাপা পড়েছেন। তাদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। তবে বৃষ্টি কারণে উদ্ধার কাজ চালাতে তাদের বেগ পেতে হচ্ছে।

মঙ্গলবার সকালে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম প্রধান সড়ক যান চলাচল স্বাভাবিক করতে গিয়ে ক্যাম্পের পাহাড় ধসে চার সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। তারা হলেন, মেজর মাহফুজ, ক্যাপ্টেন তানভীর, করপোরাল আজিজ, সৈনিক শাহীন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন রাঙামাটি সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক মুখপাত্র। এছাড়া আহত ৫ সেনা সদস্যকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। তারা হচ্ছেন, এরা হচ্ছেন, সৈনিক আজমল, মামুন, ফিরোজ, মোজাম্মেল ও সেলিম।

এদিকে, টানা বর্ষণে বান্দরবানের কালাঘাটা এলাকায় তিনটি স্থানে পাহাড় ধসে পড়েছে। এতে তিন শিশুসহ ৭ জন প্রাণ হারিয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ২ জন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৫ জন। সোমবার রাত ৩টার দিকে প্রবল বর্ষণের সময় কালাঘাটা এলাকার কবরস্থানের পাশে, জেলেপাড়া ও লেমুঝিরি আগাপাড়া এলাকায় পাহাড় ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

পাহাড় ধসের কারণে বিভিন্ন স্থানে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যহত

টানা বর্ষণ ও ভয়াবহ পাহাড় ধসে তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন স্থানে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যহত হয়েছে।নানান স্থানে নতুন করে পাহাড় ধসের ও সড়ক বন্ধের সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় বেসামরিক ব্যক্তিবর্গকে যথাসাধ্য সাহায্য করছে। অতিবৃষ্টিপাত উদ্ধার কার্যক্রম ব্যহত করছে। বিশেষ করে খারাপ মোবাইল নেটওয়ার্কের কারণে সর্বত্র যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।

রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে পাহাড় ধসের কারণে নানান স্থানে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। কাপ্তাই-চট্টগ্রাম সড়ক ভূমিধ্বসে বন্ধ রয়েছে। বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ সড়ক চালুর চেষ্টা করছে, কিন্তু বৃষ্টির কারণে ব্যহত হচ্ছে।

খাগড়াছড়িতে পাহাড় ধসের ঘটনা বা হতাহতের কোনো খবর না পাওয়া গেলেও তবে গুইমারাতে রাস্তা বন্ধের কারণে খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। চট্টগ্রাম-গুইমারা সড়ক গাড়িটানা পয়েন্টে (মানিকছড়ি ক্যাম্প থেকে ৭ কিমি দূরে) বন্ধ রয়েছে। ৩টি গাছ হাই-টেনশন তার আছড়ে পড়ে রাস্তার উপরে পড়ে রয়েছে। পিডিবি ও স্থানীয় প্রশাসন কার্যক্রম শুরু করেছে।

বান্দরবানে বান্দরবান-রুমা সড়ক পাহাড় ধসে কাটা পাহাড় এলাকায় (Y-জংশনের কাছে) বন্ধ রয়েছে।বান্দরবান-রুয়াংছড়ি সড়কে রামজাদি মন্দিরের কাছে ব্রিজ ডুবে যাওয়ায় চলাচল বন্ধ রয়েছে।

এদিকে তিন পার্বত্য জেলার বেশির ভাগ স্থানে গত ৪৮-৭২ ঘন্টা বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক অনেকাংশে অচল হয়ে পড়েছে। ক্ষয়ক্ষতির সংবাদ পেতে ও উদ্ধার তৎপরতা চালাতে নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। সাংবাদিকরা খবর পাঠাতেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।

এদিকে অব্যহত পাহাড় ধসে মৃতের ঘটনায় শোক জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *