পাহাড়ে ফের সংঘাতের আশংকা


নির্বাচনের আগে মাঠ দখলে তৎপর জেএসএস-ইউপিডিএফ
তরুণ ভট্টাচার্য, খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
পার্বত্য চট্টগামের দুই আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (সন্তু লারমা গ্রুপ, পিসিজেএসএস) ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা গ্রুপ) মধ্যে ফের সহিংসতার আশংকা দেখা দিয়েছে। জুম্মজাতির অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ব্যাপারে সন্তু লারমার প্রতি ইউপিডিএফের আহবান, পক্ষান্তরে ইউপিডিএফকে নির্মূল করার ব্যাপারে সন্তু লারমার ঘোষণার জের ধরে উভয় দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সশস্ত্র হামলা-পাল্টা হামলা, খুন-পাল্টা খুন, অপহরণ-পাল্টা অপহরণের যে রাজনীতি পাহাড়ে শুরু হয়েছে, তা নিয়ে রীতিমতো উদ্বিগ্ন এ অঞ্চলের মানুষ। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে সন্তু লারমার নেতৃত্বে অস্ত্র জমাদানের প্রতিবাদের মধ্য দিয়েই মূলত আত্মপ্রকাশ ঘটে ইউপিডিএফ নামক সংগঠনের। সেই থেকে উপজাতীয়রা চুক্তির পক্ষ-বিপক্ষ দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বিগত দেড় দশকে তিন পার্বত্য জেলায় এই দুই সংগঠনের পরস্পর বিরোধী সশস্ত্র তত্পরতায় উভয়পক্ষের অন্তত সাড়ে ৪শ নেতা-কর্মী প্রাণ হারিয়েছে।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জেএসএস ও ইউপিডিএফ মাঠ দখলে নামায় ফের সংঘাতময় পরিস্থিতির আশংকা করছেন প্রবীণ রাজনীতিকরা। ইউপিডিএফ জনগণের মৌলিক ইস্যুগুলোকে তুলে ধরে নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।। অপরদিকে জেএসএস দেশের গণতান্ত্রিক অসামপ্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়ার পরিকল্পনা করছে বলে দলীয় সূত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে। ইউপিডিএফের ঐক্যের প্রস্তাবের ব্যাপারে জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেছেন, ইউপিডিএফ একটি চুক্তি বিরোধী, সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন। জেএসএসের নেতা- কর্মীদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে তাদের সশস্ত্র কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। তাদের নির্মূল করার প্রশ্নে আমাদের পার্টি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছে। তাদের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্ট করা অথবা সমঝোতায় যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। তবে স্থানীয় রাজনীতিকদের মতে, এ দুটি দল যতই পরস্পরবিরোধী তত্পরতায় লিপ্ত থাকুক, তাদের আল্টিমেট টার্গেট আওয়ামী লীগকে কোণঠাসা করা এবং তাদের প্রার্থীর বিজয় ঠেকানো। আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের টার্গেট হচ্ছে পাহাড়িদের একচেটিয়া ভোটে হলেও আসন তিনটির বিজয় নিশ্চিত করা । এদিকে পাহাড়ের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি এবার পার্বত্য তিন আসনে তিনজন গ্রহণযোগ্য উপজাতীয় প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে ভোটযুদ্ধ মোকাবেলা করলে তিনটি আসনই বিএনপির ঘরে যেতে পারে এমন ধারণা সংশ্লিষ্ট দলের শীর্ষ নেতাদের ।

অপরদিকে পার্বত্য তিন জেলায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী হলেও পাহাড়িদের একটি বৃহত্ অংশের কাছে তারা ক্রমশঃ আস্থা হারাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন প্রশ্নে বর্তমান মহাজোট সরকারের নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ধীরে চলো নীতি অবলম্বনের কারণে পাহাড়িদের একটি বিশাল অংশ এখন ক্ষুব্ধ। নির্বাচন এলে প্রার্থী যোগ্য কি অযোগ্য তা বিবেচনা না করে বেশির ভাগ পাহাড়ি বরাবরই ভোট দেন নৌকা মার্কায়। পাহাড়িরা মূলত বিএনপি বিরোধী সেই ১৯৭৯ সাল থেকে, যখন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা তত্কালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের সমতল জেলা থেকে হাজার হাজার ছিন্নমূল বাঙালি পরিবারকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বন্দোবস্ত ও নগদ অর্থ দিয়ে পুনর্বাসন করেন। পাহাড়িরা সেই থেকে আজ অবধি ভূমির অধিকার ফিরে না পাওয়া, হত্যা নির্যাতন, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগসহ নানান বিষয়ে চরম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে বলে দাবি করে থাকেন।

এদিকে পার্বত্য তিন সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য যথাক্রমে দীপংকর তালুকদার, বীর বাহাদুর ও যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকেটে নির্বাচিত হলেও এবার আর এ তিনটি আসন তারা ধরে রাখতে পারবেন না বলে মনে করেন জেএসএসের নেতারা। জেএসএস (সন্তু লারমা গ্রুপ) এ তিন সংসদ সদস্যকে অবশ্য অনেক আগে থেকেই আদিবাসী ইস্যুতে জাতীয় সংসদে কথা না বলার অভিযোগে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে। পক্ষান্তরে ইউপিডিএফ নেতারা মনে করছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান প্রশ্নে পাহাড়ে ইউপিডিএফের নেতৃত্বের বিকল্প নেই। ইউপিডিএফ এবার পাহাড়ের তিন আসনে বিজয় নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে সাংগঠনিকভাবে কাজ করছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিবদমান তিন পাহাড়ি সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (সন্তু লারমা গ্রুপ ও এম এন লারমা গ্রুপ) ও ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) দ্বন্দ্ব সংঘাতে পাহাড় বারে বারে অশান্ত হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও বন্দুকযুদ্ধসহ হত্যা, অপহরণ ও গুমের ঘটনা ঘটছে। এমন কোন উন্নয়ন কাজ বা প্রকল্প নেই যেখানে ৪/৫ গ্রুপের নিকট চাঁদা দিতে না হয়। অতীতের তুলনায় দ্বিগুণ চাঁদার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না সাধারণ ব্যবসায়ী, এনজিও এবং পরিবহন ব্যবসায়ীরা। কৃষিজ উত্পাদনের উপর একাধিক গ্রুপের মাত্রাতিরিক্ত চাঁদার বোঝা বহন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে জুমিয়াদের পাশাপাশি প্রান্তিক ও বর্গাচাষীরাও। এখানে সংগঠনগুলো আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে অস্ত্র ও অর্থ সংগ্রহের জন্যই সকল ক্ষেত্রে চাঁদার হার বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সময় থাকতেই সরকার ব্যবস্থা না নিলে নির্বাচনে এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

সৌজন্যে: ইত্তেফাক ১৯-৪-২০১৩

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *