পাহাড়ে চলছে টার্গেট কিলিং



কাজী সোহাগ :
তিন পার্বত্য জেলায় চলছে টার্গেট কিলিং। বাঙালি মোটরসাইকেল চালকরা ওই কিলিংয়ের শিকার। পরিকল্পিতভাবে একের পর এক খুন ও গুম করা হচ্ছে তাদের। এতে অশান্ত হয়ে উঠছে পাহাড়। সৃষ্টি হচ্ছে নানা সংঘাতের। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত উপজাতি সন্ত্রাসীরা। তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে এ ধরনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটছে খাগড়াছড়িতে। সেখানে যাত্রীবেশী সন্ত্রাসীদের হাতে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক খুন, অপহরণ, গুম ও হামলা করে মোটরসাইকেল ছিনতাই এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত সাড়ে ৬ বছরে খাগড়াছড়িতে অন্তত ৮ জন মোটরসাইকেল চালক যাত্রীবেশীদের হাতে খুন হয়েছে। গুম হয়েছেন ৮ জন। এদের মধ্যে একজন ছাড়া সকলেই খাগড়াছড়ির বাসিন্দা। অপহরণ হয়েছে অন্তত এক ডজন। এছাড়া অস্ত্রের মুখে মোটরসাইকেল ছিনতাই ও চুরি হয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক।

বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তারা এসব ঘটনাকে টার্গেট কিলিং হিসেবে দেখছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এসব ঘটনার কূলকিনারা পেতে তাদের বেগ পেতে হচ্ছে। সম্প্রতি এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে পার্বত্য জেলাগুলোতে তৎপর একটি গোয়েন্দা সংস্থা। একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, দুটি কারণে পাহাড়ে এ ধরনের টার্গেট কিলিং হচ্ছে। প্রথমত-পার্বত্য জেলাগুলোকে অশান্ত করার পাঁয়তারা। এতে লাভবান হচ্ছে উপজাতি সন্ত্রাসীরা। গণ্ডগোল হলেই তারা চাঁদার হার বাড়িয়ে দেয়। কর্মসূচির নামে সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালিদের কাছ থেকে আদায় করে কোটি কোটি টাকা। দ্বিতীয়ত- মোটরসাইকেল চালকরা খুব সহজে মিশে যেতে পারেন পাহাড়িদের সঙ্গে। পেশাগত কারণে তারা প্রবেশ করে দুর্গম জায়গাগুলোতে। সেখানে উপজাতি সন্ত্রাসীদের তৎপরতা অনেক সময় দেখে ফেলে তারা। এরপরই টার্গেটে পরিণত হতে হয় তাদের। যার শেষ পরিণতি খুন অথবা গুম।

সর্বশেষ ১২ই সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা সিন্দুকছড়ির দুর্গম তৈকর্মা পাড়া এলাকা থেকে দু’হাত পিছমোড়া বাধা অবস্থায় ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক রবিউল ইসলামের (২৫) লাশ উদ্ধার করা হয়। সে গুইমারা উপজেলার হাজিপাড়া গ্রামের আব্দুল মান্নানের ছেলে। গুইমারা থানা পুলিশ জানিয়েছে, রবিউল ১১ই সেপ্টেম্বর দুপুরে খাবার খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর নিখোঁজ হয়।

এদিকে রবিউল ইসলাম নিহত হওয়ায় পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার ফরাজী শাহাদাত হোসেন সাকিব এক বিবৃতিতে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। সংশ্লিষ্টরা জানান, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার যেমন বিচার পায়নি, তেমনি নিখোঁজ ব্যক্তিরা হয়তো ফিরে আসবে সে প্রতীক্ষায় আছে তাদের পরিবার- স্বজনরা। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হারিয়ে অভাব-অনটনে দিন পার করছে তাদের পরিবার।

এ সকল হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে জেলায় দফায় দফায় হরতাল-অবরোধে উত্তাল হয়েছে। এ ছাড়াও মানববন্ধন ও প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান এবং প্রশাসনের কাছ থেকে বিচারের আশ্বাস মিললেও বাস্তবে একটিরও বিচার হয়নি। এদিকে একের পর এক মোটরসাইকেল চালকদের খুন, অপহরণ ও মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহকারীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, খাগড়াছড়িতে যাত্রী পরিবহনের মোটরসাইকেল একটি জনপ্রিয় বাহন। ভূ-প্রকৃতি এই জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ। জেলায় অন্তত দুই হাজার বেকার যুবক ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। কিন্তু একের পর এক যাত্রীবেশী সন্ত্রাসীদের হাতে মোটরসাইকেল চালক খুন, গুম ও অস্ত্রের মুখে মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ঘটনায় এখন চালকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত প্রায় ছয় বছরে ১৬ জন মোটরসাইকেল চালক খুন ও গুম হয়েছে। জেলার মহালছড়ি ছাদিকুল ইসলাম, মাটিরাঙার আজিজুল হাকিম শান্ত, আব্দুর রহিম, গুইমারা নিজাম উদ্দিন সোহাগ, দীঘিনালার শাহ আলম, আব্দুস সাত্তার, চান মিয়া ও সর্বশেষ পার্শ্ববর্তী লংগদু উপজেলার নুরুল ইসলাম নয়ন খুন হন খাগড়াছড়ি জেলা সদরের যৌথ খামার এলাকায়। নয়ন হত্যাকাণ্ডটি দেশব্যাপী আলোচনায় আসলেও অন্য হত্যাকাণ্ডগুলো তেমন কোনো আলোচনায় আসেনি। একই সময় দীঘিনালার মোটরসাইকেল চালক আবুল কাশেম, মো. আলী, পানছড়ির হোসেন আলী, মানিকছড়ির মো. মোরশেদ, রাজিব কান্তি দে, গুইমারার রেজাউল করিম, আল আমীন ও শংকর দীর্ঘ দিন ধরে মোটরসাইকেলসহ নিখোঁজ রয়েছে। এ ছাড়া একই সময়ে খাগড়াছড়িতে অন্তত অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেল ছিনতাই ও চুরির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু উদ্ধার হয়েছে মাত্র কয়েকটি। প্রতিটি খুন, অপহরণ ও ছিনতাইয়ের জন্য দায়ী করা হচ্ছে পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে।

এর আগে গত ১লা  জুন খাগড়াছড়ির যৌথ খামার এলাকায় খুন হন লংগদু উপজেলার যুবলীগের নেতা নুরুল ইসলাম নয়ন। তার এ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে পরের দিন সেখানে প্রায় দুই শতাধিক পাহাড়িদের বাড়ি ঘরে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। গত ১০ই এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক ছাদিকুল ইসলামকে (২৩) দুই উপজাতি মহালছড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে রাঙ্গামাটির ঘিলাছড়ির উদ্দেশ্যে ভাড়া করে নিয়ে যাওয়ার পর ছাদিকুল ইসলাম নিখোঁজ হন। তিনদিন পর ১৩ই এপ্রিল বিকালে রাঙামাটির নানিয়াচর উপজেলার ঘিলাছড়ি এলাকায় ছাদিকুল ইসলামের ক্ষতবিক্ষত লাশ মাটিচাপা দেয়া অবস্থায় পাওয়া যায়। নিখোঁজ হওয়ার চারদিন পর চলতি বছরের ২১শে ফেব্রুয়ারি দুপুরে খাগড়াছড়ি আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের রিছাং ঝর্না এলাকার দুর্গম পাহাড় থেকে উদ্ধার করা হয় মাটিরাঙ্গার মেটরসাইকেল চালক আজিজুল হাকিম শান্ত’র লাশ। নিখোঁজের একদিন পর ২০১৪ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার বেলছড়ি ইউনিয়নের হাজীপাড়া কবরস্থান এলাকার গভীর জঙ্গল থেকে মোটরসাইকেল চালক মো. আবদুর রহিমের (২৫) লাশ উদ্ধার করে মাটিরাঙ্গা থানা পুলিশ। নিহত আবদুর রহিম বেলছড়ির ২নং ওয়ার্ডের চেয়ারম্যানপাড়ার বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর আলম এর ছেলে। একই বছরের ৭ই মে সন্ধ্যায় খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালার ভৈরফা পাড়া এলাকায় শাহ আলম নামে এক মোটরসাইকেল চালককে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে শাহ আলমের লাশ উদ্ধার করে। ২০১৬ সালের ২৭শে জুন নিখোঁজ হন মানিকছড়ির মোটরসাইকেল চালক রাজিব কান্তি দে। স্থানীয় সমীর পালের ছেলে রাজিব দুপুরে যাত্রী নিয়ে যাওয়ার পর আর ফিরেনি।

২০১৪ সালের ২রা জুন খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় মোটরসাইকেল চালককে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে মোটরসাইকেল ছিনতাই করে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা। ঘটনার চার ঘণ্টা পর রাত সাড়ে আটটার দিকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার মোটরসাইকল চালক চরপাড়ার মো. ধনা ময়িার ছেলে মো. খলিলুর রহমান (২৭) কে উদ্ধার করে মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একই বছরের ৩০শে জুলাই খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি থেকে চন্দন ত্রিপুরা (২৪) নামে ভাড়ায় চালিত এক মোটরসাইকেল চালককে অপহরণ করেছে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। উপজেলার গামারীঢালা এলাকা থেকে তাকে অপহরণ করা হয়। ২০১১ সালের ১০ই জুন খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় উপজেলার জালিয়াপাড়ার মাহবুব নগর এলাকায় মোটরসাইকেল চালক নিজাম উদ্দিন সোহাগকে হত্যা করে মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নিয়ে যায়  সন্ত্রাসীরা। এ ছাড়া ২০১১ সালে যাত্রীবেশী সন্ত্রাসীদের হাতে জেলার দীঘিনালার কবাখালীর বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার ও চান মিয়া।

এদিকে চলতি বছরের ৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে দীঘিনালায় মোটরসাইকেল চালক মোহাম্মদ আলী নিখোঁজ রয়েছেন। ২০১০ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হন দীঘিনালার রশিকনগরে বাসিন্দা আবুল কাশেম পিসি। ২০১৬ সালের ২৬শে এপ্রিল থেকে নিখোঁজ আছেন, জেলার পানছড়ি উপজেলার নিখোঁজ মোটরসাইকেল চালক হোসেন আলী। তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি মাটিরাঙ্গা সদর ইউপির ৫নং ওয়ার্ডের ব্রজেন্দ্র কার্বারী পাড়ার নির্জন এলাকা থেকে পুলিশ পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করলেও হোসেন আলীর সন্ধান মেলেনি। ২০১৬ সালের ২৭ জুন যাত্রী নিয়ে যাওয়ার সময় নিখোঁজ হন মানিকছড়ির মোটরসাইকেল চালক রাজিব কান্তি দে। ২০১৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি থেকে নিখোঁজ আছেন মানিকছড়ির মোটরসাইকেল চালক মো. মোরশেদ আলম। ২০১২ সালে গুইমারা উপজেলার রেজাউল করিম, আল-আমীন ও শংকর যাত্রী নিয়ে রামগড় যাওয়ার পর নিখোঁজ হন।

সূত্র : মানব জমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *