পাহাড়ে চলছে আধিপত্য বিস্তারের কিলিং মিশন: ৫মাসে খুন-১৬, আহত- ১৫, গুম- ২২: বেরিয়ে আসছে তৃতীয় পক্ষের হাত


নিজস্ব প্রতিনিধি, রাঙামাটি:

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিগত বছর ২০১৭ শেষ হয়েছে একের পর এক হত্যাকাণ্ড দিয়ে। ওই সময় স্থানীয় আ’লীগের নেতাদের উপর হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি (পিসিজেএসএস) এমনটা অভিযোগ আ’লীগের।

এবার ২০১৮ সাল শুরু হয়েছে খুন, গুম এবং হত্যাযজ্ঞ দিয়ে। নতুন বছরের শুরু থেকে শান্ত পাহাড় আবারো অশান্ত হয়ে উঠেছে। বুলেটের আঘাতে পাহাড়ে তরতাজা রক্তের গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে। এ যেন দেখার কেউ নেই। পাহাড়ে প্রতিনিয়ত প্রতিহিংসাও হত্যার উপত্যাকায় পরিণত হয়েছে।

প্রতিদিন একের পর এক পাহাড়ে লাশ পড়ছে। মা হারাচ্ছে তার সন্তাকে, স্ত্রী হারাচ্ছে স্বামীকে, সন্তান হারাচ্ছে তার পিতাকে। অনেকের মরদেহ পাওয়া যাচ্ছে না। যার কোন সঠিক হিসেব নেই।

পার্বত্যঞ্চলের মানুষ আর লাশ চায় না। রক্তির হোলি খেলা বন্ধ করতে চায়। পাহাড়ের কোন নারী আর বিধবা হতে চায় না, সন্তান হতে চাই না পিতৃহারা।

কিন্তু এ যুদ্ধ বন্ধ করবে কে? এটাই এখন পার্বত্যবাসীর কোটি টাকার প্রশ্ন!

পাহাড়ে হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত যেভাবে

পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়া এই সহিংসতার কারণ বিশ্লেষণ করলে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা রিপোর্টে থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে পার্বত্য চুক্তির (শান্তি চুক্তি) ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক না এমন অভিযোগ এনে ‘পাহাড়ে আগুন জ্বলবে’ বলে হুঁশিয়ারি দেন। এরপরই ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর ইউপিডিএফ সমর্থিত অনাধি রঞ্জন চাকমা (৫৫) নামের নানিয়ারচর উপজেলার সাবেক এক ইউপি সদস্যকে হত্যা করার মধ্যে দিয়ে পাহাড়ে হত্যাযজ্ঞের সূত্রপাত ঘটে। এ হত্যার জন্য ইউপিডিএফ প্রসিত গ্রুপ গণতান্ত্রিককে ইউপিডিএফতে দায়ী করে।

একই দিন রাঙামাটির জুরাছড়িতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দ চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আওয়ামী লীগ এ হত্যাকাণ্ডের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে (পিসিজেএসএস) দায়ী করে।

একই দিন বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রাসেল মার্মাকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।

৭ ডিসেম্বর রাঙামাটি শহরের বিহারপুর এলাকায় জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভানেত্রী ঝর্ণা খীসার বাসায় হামলা করে সন্ত্রাসীরা। এসময় তাঁকে হত্যা করতে কুপিয়ে জখম করা হলেও প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

বিলাইছড়ি আ’লীগ নেতাকে কোপানোর অভিযোগে সেখার উপজেলার চেয়ারম্যান ও পিসিজেএসএস উপজেলা শাখার নেতা শুমঙ্গল চাকমাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। এ ঘটনায় চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির নেতা শুভমঙ্গল চাকমাসহ কয়েকজনকে আটকও করা হয়। পরে তারা জামিনে মুক্তি পায়।এসময় প্রাণভয়ে জুড়াছড়ি, বিলাইছড়ি ও বাঘাইছড়ি উপজেলার আওয়ামী লীগ ও তার অংগসংগঠনগুলোর পাহাড়ী নেতাকর্মীরা দলে দলে পদত্যাগ করে উপজেলাগুলো প্রায় শাসকদল শুন্য হয়ে পড়ে। জেএসএসের হুমকির কারণেই এ ঘটনা ঘটে বলে আওয়ামী লীগের অভিযোগ।

১৫ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার বন্দুকভাঙ্গা ইউনিয়নের ধামাইছড়া গ্রামে প্রতিপক্ষের গুলিতে ইউপিডিএফ নেতা অনল বিকাশ চাকমা প্লাটো ওরফে লক্ষী নিহত হয়। ইউপিডিএফ এ হত্যাকাণ্ডের জন্য ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক বার্মা গ্রুপকে দায়ী করেছে।

সর্বশেষ ২১ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটির বন্দুকভাঙ্গা ইউনিয়ন থেকে ৫ ইউপি মেম্বারসহ ২০ জনকে অপহরণ করা হয়। একদিন পর তারা নিজ গ্রামে ফিরে আসে।

এদিকে চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি বিলাইছড়ি উপজেলায় যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিশ্বরায় তঞ্চাঙ্গ্যাকে হত্যার উদ্দেশ্য গুলি করা হলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান। এ ঘটনার জন্য যুবলীগ সন্তু গ্রুপ জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করেছিল।

৩০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী মহাসমাবেশে অংশ নেওয়ায় বিলাইছড়িতে আওয়ামী লীগের তিন কর্মীকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করা হয়। এ ঘটনার জন্য সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করেছিল আওয়ামী লীগ।

১২ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটি শহরে ছাত্রলীগ নেতা সুপায়ন চাকমাকে মারধর করে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কর্মীরা। প্রতিবাদে রাঙামাটিতে হরতাল পালন করে ছাত্রলীগ।

১১ মার্চ বাঘাইছড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফের কর্মী নতুন মনি চাকমাকে। ওই দিন রাতে নিজ বাড়িতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নতুন মনি চাকমাকে হত্যা করা হয়। তাঁর মাথাসহ সারা শরীরে কোপানো হয়। তিনি ইউপিডিএফের প্রসিত বিকাশ খীসা পক্ষের কর্মী ছিলেন।

১৮ মার্চ রাঙামাটির কুতুছড়ি থেকে অপহরণ করা হয় ইউপিডিএফ সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশন নেত্রী মন্টি চাকমা ও দয়াসোনা চাকমাকে। ৩২ দিন পর ১৯ এপ্রিল মুক্তি দেওয়া হয় তাঁদের। এ ঘটনার জন্য ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফকে দায়ী করেছে।

১২ এপ্রিল পাল্টাপাল্টি হামলায় মারা যান তিনজন। রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) এক সদস্যকে গুলি করে হত্যার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিরও (এম এন লারমা) দুই কর্মীকে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন ইউপিডিএফের কর্মী জনি তঞ্চঙ্গ্যা (৪০), জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) কর্মী পঞ্চায়ন চাকমা ওরফে সাধন চাকমা (৩০) ও কালোময় চাকমা (২৯)।

গত ১৭ এপ্রিল রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের মারিশ্যা-দিঘিনালা সড়কের জোড়া ব্রিজ এলাকায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) কর্মী তপন চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সীমান্তবর্তী বাঘাইছড়ি উপজেলার মারিশ্যা-দিঘিনালা সড়কের ৮-৯ কিলো নামক স্থানে ইউপিডিফের আরেক কর্মী বিজয় চাকমাকে (৩২) হত্যা করে প্রতিপক্ষ।

এরপর চলতি বছরের এপ্রিলের ২০ তারিখ থেকে ইউপিডিএফ তাদের আধিপত্য বিস্তারে রাঙামাটির দূর্গম বাঘাইছড়ি উপজেলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সংস্কার’র (জেএসএস এমএন লারমা গ্রুপ) এলাকায় হানা দেওয়া শুরু করে। তাদের তান্ডবে ওইদিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে জনপ্রতিনিধিসহ ৫০পরিবার পালিয়ে এসে উপজেলা শহরে এসে আশ্রয় নেয়।

অপরদিকে চলতি মাসের ২ মে সকালে একই উপজেলার রূপকারী ইউনিয়নের নালকাটা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ এবং জেএসএস সংস্কার বন্দুক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। তবে উভয়পক্ষের মধ্যে কেউ হতাহত হয়নি।

৩ মে নানিয়ারচর উপজেলায় নিজ কার্যালয়ের সামনের সময় গুলি করে হত্যা করা হয় নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) অন্যতম শীর্ষ নেতা শক্তিমান চাকমাকে। এই সময় তাঁর সঙ্গে থাকা সংগঠনটির আরেক নেতা রূপম চাকমা গুলিবিদ্ধ হন।

এর এক দিন পরই ৪ মে শক্তিমান চাকমার দাহক্রিয়ায় অংশ নিয়ে চলে যাওয়ার সময় সশস্ত্র হামলায় নিহত হন ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিকের শীর্ষ নেতা তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) নেতা সুজন চাকমা, সেতুলাল চাকমা, তনয় চাকমা। এ সময় আহত হয় আরো নয়জন।

কেন এই হত্যাকাণ্ড?

তবে এ ধরণের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণ হিসেবে অনুসন্ধান করে জানা গেছে- পাহাড়ে চাদাঁ আদায় এবং নিজেদের শক্তি জানান দিতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হচ্ছে পাহাড়ের এসব সশস্ত্র গ্রুপগুলো ।

এই আধিপত্য বিস্তারের বহুমুখী ডাইমেনশন রয়েছে। যার একটি চাঁদাবাজির মাধ্যমে অর্থ আদায়- যা দিয়ে আধিপত্য বিস্তার এবং অস্ত্র ক্রয় করা হয়ে থাকে।

অন্যটি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বর্তমান প্রেক্ষাপটে। সেটি হচ্ছে আগামী নির্বাচন। আগামী নির্বাচনে রাঙামাটিতে জেএসএস সংস্কার নেতা শক্তিমান চাকমা সম্ভাব্য প্রার্থি ছিলেন। অন্যদিকে খাগড়াছড়িতে শাসক দলের একাংশ চাইছিলো ইউপিডিএফকে ঠেকাতে ও ইউপিডিএফের ভোট কাটতে বর্মাকে খাগড়াছড়িতে প্রার্থি করতে। বর্মা প্রার্থি না হলেও জেএসএস সংস্কার খাগড়াছড়িতে প্রার্থি হলে বর্মা তাকে সাপোর্ট করতো। কেননা জেএসএস সংস্কার ও ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের মধ্যে সমঝোতা রয়েছে।

উভয় ক্ষেত্রে রাঙামাটিতে জেএসএস ও খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ প্রার্থি প্রবল সমস্যার মুখোমুখি হতো। যেহেতু জেএসএস মূল ও ইউপিডিএফ মূলের মধ্যে নির্বাচনী সমঝোতা রয়েছে। সেক্ষেত্রে এই হত্যাকাণ্ডে জেএসএস ও ইউপিডিএফ উভয়ই লাভবান হয়েছে। এই আঙ্গিকে বিচার করলে নানিয়ারচরের আলোচিত দুই হত্যাকাণ্ডে পেছনে মূল রহস্য সমাধানে একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। নানিয়ারচরের সাম্প্রতিক দুই হত্যাকাণ্ডের পরপরই জেএসএস সংস্কার ও ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের পক্ষ থেকে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপকে দায়ী করা হয়। কিন্তু সময় যতোই গড়াচ্ছে স্থানীয়দের মাঝে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে তৃতীয় শক্তির ইন্ধনের কথা উঠে আসছে।

রবিবার এ জাতীয় ইংরেজি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে রাঙামাটির এসপি আলমগীর কবিরও সেকথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ‍‌‌”The Rangamati police super, Alamgir Kabir, said PCJSS leaders were responsible for the killing of five people on Friday. “They (PCJSS) want to establish supremacy in Rangamati. So, a section of the local party influenced an armed group to commit the murders,” he added.”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *