পাহাড়ে উপজাতি সন্ত্রাসীদের নৈরাজ্য আর সহিংসতা: একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট- মে ২০১৮


রিফাত আহমেদ রিদম:

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকার এবং শান্তিবাহিনী (তৎকালীন পিসিজেএসএস) এর মধ্যে শান্তিচূক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সবাই আশা করেছিলো যে, শান্তিচুক্তির ফলে পাহাড়ে শান্তির সুবাতাস বইবে। কিন্তু এখনো পত্র-পত্রিকা, সোশ্যাল মিডিয়া এবং টিভি নিউজে যা দেখি তাতে এটা পরিস্কার যে শান্তিচুক্তির পরে উপজাতিরা সন্ত্রাসীরা সন্ত্রাস ত্যাগের কথা বললেও আদতে তারা সেটা করেনি। বরং সেটা চলমান রেখেছে এবং দিন দিন তাদের সহিংস কার্যক্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক হলেও উপজাতিরা সশস্ত্র কার্যক্রম চালিয়ে উল্টো পথে হাঁটছে।

শান্তিচুক্তির সময় পাহাড়ে একটা মাত্র উপজাতি সশস্ত্র সংগঠন ছিলো। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সেটা বেড়ে এখন জেএসএস(সন্তু গ্রুপ), জেএসএস(এমএন লারমা গ্রুপ বা সংস্কার গ্রুপ), ইউপিডিএফ(প্রসীত গ্রুপ) এবং ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) নামে চারটা উপজাতি সশস্ত্র সংগঠন আত্নপ্রকাশ করেছে। এই চারটি উপজাতি সংগঠন বর্তমানে পাহাড়ে ব্যাপক নৈরাজ্য আর সহিংসতা চালিয়ে যাচ্ছে।

উপজাতি এই চারটি সংগঠনের নৈরাজ্য আর সহিংস কার্যক্রমের চিত্র জানার জন্য এই লেখক সরেজমিনে একটি জরিপ চালিয়েছে। ঘুরেছে পাহাড়ের আনাচে কানাচে। স্থানীয় উপজাতি-বাঙালী জনসাধারণ, ব্যবসায়ী, সংবাদকর্মীদের সাথে কথা বলে এর সত্যতার দেখা পেয়েছে। পাঠকের জ্ঞাতার্থে মে ২০১৮ মাসে উপজাতি সন্ত্রাসীদের চালানো তাণ্ডবের একটা চিত্র নীচে তুলে ধরা হলো:

১। গত ২ মে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইউপিডিএফ(প্রসীত) এবং জেএসএস(সংস্কার) এর মধ্যে শতাধিক রাউন্ড গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে। (বিস্তারিত http://goo.gl/3JmdYJ)।

২। ৩ মে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমাকে (৫৮) ইউপিডিএফ(প্রসীত গ্রুপ) এর অস্ত্রধারীরা গুলি করে হত্যা করে। (বিস্তারিত http://goo.gl/SfTDnZ)।

৩। ৪ মে ইউপিডিএফের দুই দলের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে উপজাতি সন্ত্রাসীদের নির্মম বুলেট কেড়ে নেয় ৫টি তাজা প্রাণ। এতে আটজন গুরুতর আহত হয়। (বিস্তারিত http://goo.gl/j95fhm)।

৪। ৪ মে খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ির গহীন অরণ্যে দুই উপজাতীয় সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের বন্দুকযুদ্ধ সংঘটিত হয়। (বিস্তারিত http://goo.gl/m1ECY9)।

৫। ২০ মে খাগড়াছড়িতে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সমাবেশকে ঘিরে খাগড়াছড়ি জেলার ও শহরতলীর পাহাড়ি গ্রামগুলোর সাধারণ লোকজনকে সমাবেশে আসার জন্য অস্ত্রের মুখে ভয়ভীতি দেখায় ইউপিডিএফ(প্রসীত গ্রুপ) সমর্থিত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতাকর্মীরা। (বিস্তারিত http://goo.gl/esKqKS)।

৬। ২০ মে স্থানীয় জনসাধারণের কাছে চাঁদা চেয়ে চাঁদার টাকা না পাওয়ায় খাগড়াছড়ি জেলার ঐতিহ্যবাহী পানছড়ি বাজার বর্জনের ঘোষণা দেয় ইউপিডিএফ(প্রসীত গ্রুপ)। সন্ত্রাসীরা সাধারণ পাহাড়িদের বাজারে আসতে নিষেধ করে। কেউ নির্দেশ অমান্য করলে তাকে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যার হুমকিও দেয়। (বিস্তারিত http://goo.gl/SFpF3h)।

৭। ২১ মে খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলায় ইউপিডিএফ(প্রসীত গ্রুপ)-এর সাবেক সদস্য উজ্জ্বল কান্তি চাকমা ওরফে মার্শাল চাকমা প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন। (বিস্তারিত http://goo.gl/7wRWKp)।

৮। ২২ মে পাহাড়ি সংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তারের জেরে খাগড়াছড়ি জেলা শহরের স্বনির্ভর বাজারে উপজাতি সন্ত্রাসীদের শতাধিক রাউন্ড গুলিবর্ষণ। (বিস্তারিত http://goo.gl/sKp2t1)।

৯। ২৫ মে খাগড়াছড়ি জেলা সদরের গিরিফুল এলাকায় ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ) এর আস্তানায় যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে অর্থ ও বিপুল সরঞ্জামসহ ১ জনকে আটক করে। (বিস্তারিত http://goo.gl/48y6Up)।

১০। ২৫ মে তারিখে রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ৩নং ফারুয়া ইউনিয়নের আ’লীগের সদস্য নিসাইপ্রু মারমার উপর জেএসএস(সন্তু) গ্রুপের একদল দুর্বৃত্ত অতর্কিত হামলা করে। (বিস্তারিত http://goo.gl/q35xu6)।

১১। ২৮ মে রাঙ্গামাটি’র বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নে প্রতিপক্ষের ব্রাশ ফায়ারে ইউপিডিএফ (প্রসিত গ্রুপ)’র তিনজন নেতা-কর্মী নিহত হয়ে এবং এক কর্মী গুরুতর আহত হয়। (বিস্তারিত http://goo.gl/HzH69e)।

১২। ২৮ মে তারিখে রাত ১১টার দিকে খাগড়াছড়ি জেলা সদরের বিজিতলা এলাকা থেকে ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের কাছে হস্তান্তরের প্রাক্কালে চাঁদার ৩৭ লাখ টাকাসহ ৫ জন আটক। (বিস্তারিত http://goo.gl/RGJpYP)।

১৩। ২৮ মে তারিখে ভারতের মিজোরামে বিদেশী অত্যাধুনিক একে-৪৭ রাইফেলসহ খাগড়াছড়ি জেলার জীপু চাকমা ওরফে তন্ময় ও পলাশ ত্রিপুরা নামে দুই উপজাতি যুবক আটক হয়। আটককৃতরা অস্ত্রগুলো রাঙামাটি জেলার সাজেকের দোজর সীমান্ত দিয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছিলো। আটককৃতরা জেএসএস সংস্কারপন্থী দলের সক্রিয় সদস্য। (বিস্তারিত http://goo.gl/baEHx9)।

১৪। ২৯ মে খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে একইসঙ্গে দশম শ্রেণীর তিন মারমা ছাত্রী ৪ জন মারমা ও চাকমা সম্প্রদায়ের যুবক কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয়। (বিস্তারিত http://goo.gl/SWQcLP)।

১৫। ৩০ মে খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার যতীন্দ্র কার্বারী পাড়া থেকে রাঙামাটির নানিয়াচর উপজেলা চেয়ারম্যান এডভোকেট শক্তিমান চাকমা ও ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক তপন জ্যোতি চাকমাসহ ৬ হত্যাকাণ্ডের আসামি ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের শীর্ষ সন্ত্রাসী পুলক চাকমা ও অস্ত্র মামলার পলাতক আসামি অমর বিকাশ চাকমা অস্ত্র, গুলি ও ইয়াবাসহ আটক। (বিস্তারিত http://goo.gl/7MqnJB)।

১৬। ৩১ মে খাগড়াছড়ির পানছড়িতে  ৫ রাউণ্ড গুলিভর্তি বিদেশী পিস্তলসহ অংগজয় মারমা নামে এক ইউপিডিএফ(প্রসীত) কর্মী আটক হয়। (বিস্তারিত http://goo.gl/dHwnv8)।

বর্ণিত এক মাসে এরকম আরো বেশ কিছু ঘটনা আছে যেগুলো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। তবে সরেজমিনে পরিদর্শন করে এর সত্যতা পাওয়া গিয়েছে। তেমন কিছু ঘটনা এখানে তুলে ধরছি:

১। ১০ মে বান্দরবন জেলার রুমা উপজেলায় স্থানীয় জনসাধারণের কাছে  চাঁদা চেয়ে জেএসএস(সন্তু গ্রুপ)’র দাওয়াত কার্ড পাঠায়।

২। ১১ মে বান্দরবন জেলার বাঘমারা নামক স্থানে জমি দখল নিয়ে জেএসএস(সন্তু গ্রুপ)’র সদস্যরা স্থানীয় জনসাধারণকে মারধর করে।

৩। ২৩ মে খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙা উপজেলার সিন্দুকছড়ি হাতিমুড়াতে ইউপিডিএফ(প্রসীত গ্রুপ)’র চারজন চাঁদাবাজ স্থানীয় এক বাঙালী ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা দাবী করে এবং চাঁদা না পেয়ে তাকে মারধর করে মারাত্মকভাবে জখম করে।

৪। ২৪ মে খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলার বদানালা ও কলাবুনিয়া নামক স্থানে ইউপিডিএফ(প্রসীত গ্রুপ) ও জেএসএস(সংস্কার গ্রুপ) এর মধ্যে গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে।

উপরোক্ত ঘটনাপঞ্জী থেকে দেখা যায় মে ২০১৮ মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে মোট খুন হয়েছে ১০ জন, আহত হয়েছে ১০ জন, নানা কারণে আটক হয়েছে ১০ জন, অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ৪টি। একই সময়ে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে ৪ টি, বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে ৫টি,হামলা ঘটনা ৩টি, ভয়ভীতি প্র্রদর্শন ১ টি এবং ধর্ষিতা হয়েছে ৪ জন। এর বাইরেও বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে যাআলোচনায় আসেনি।

বাংলাদেশের মোট ভূ-খণ্ডের এক দশমাংশ নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা- রাঙামাটি, বান্দরবন ও খাগড়াছড়ি। বাংলাদেশের সমতলের অন্যান্য জেলাগুলোর মত এখানকার সন্ত্রাসী কার্যকলাপগুলো আমাদের চোখের আড়ালে রয়ে যায়। তার অন্যতম কারণ হলো:

১। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরের মানুষ এখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানা ও বোঝার চেষ্টা করে না।

২। দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলো কোন এক অজানা কারণে এখানকার সন্ত্রাসীদের কার্যকলাপ খবরে প্রকাশ করা থেকে কৌশলে এড়িয়ে যায়। ফলে দেশের সমতলের সাধারণ মানুষেরা উপজাতি সন্ত্রাসীদের হিংস্র রূপ জানতে পারে না।

৩। তথাকথিত কিছু বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের জ্ঞানপাপীরা টাকার বিনিময়ে উপজাতি সন্ত্রাসীদের পক্ষে সাফাই গেয়ে চলে।

৪। একচোখা ও পক্ষপাত দুষ্ট মানবাধিকার কমিশন তাদের বিভিন্ন রিপোর্টে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের দৈন্যতা তুলে ধরলেও এখানকার সন্ত্রাসীদের কর্তৃক সংঘটিত নৈরাজ্যের চিত্র তাদের রিপোর্টে প্রকাশ করে না।

এই রিপোর্ট তৈরি করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আনাচে কানাচে ঘুরে আর সেখানকার সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে এবং তাদের সাথে মিশে আমার মনে হয়েছে যে সাধারণ পাহাড়িরা অত্যন্ত সহজ সরল এবং বন্ধুভাবাপন্ন। কিন্তু কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য পাহাড়ে অশান্তির পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। সাধারণ পাহাড়িদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অর্জিত উপার্জনের টাকা চাঁদাবাজি করে পকেট ভরানোই এদের মূল উদ্দেশ্য। সে লক্ষ্যে তারা পাহাড়ে অশান্তির নৈরাজ্য সৃষ্টি করে রাখছে। পাহাড়ের মূল সমস্যা এটাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *