পাহাড়ে অস্থায়ী ক্যাম্পগুলো পুণরায় চালু করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে


ইমরান চৌধুরী

বেশ অনেকটা দিন তুলনামূলক শান্ত থাকার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম ফের আলোচনায় এসেছে। এই অঞ্চলে নতুন করে অরাজকতা ছড়িয়ে না পড়লেও বিভিন্ন সন্দেহজনক ঘটনাকে পুঁজি করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে পাহাড়ে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টির পথ সুগম করার জোর প্রচেষ্টা চলছে। আমি মনে করি, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

শান্তিচুক্তির ২০ বছর পরও পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার একটি বড় অংশ যে এখনো সামরিক রয়ে গেছে, তার জাজ্বল্যমান প্রমাণ এগুলো। আমার বিশ্বাস, পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করার পেছনে কোন না কোন মিলিটারি ব্রেন কাজ করছে। এটা নেহায়েত স্থানীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাজ নয়।

প্রশ্ন হতে পারে, কেন এখন পার্বত্য চট্টগ্রামে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে একটা বিস্ফোরক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে? যেহেতু, এখনো সামরিক প্রচেষ্টা সংবরণ হয়নি, সেহেতু বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ছত্রধররা সাধারণ একটি সামরিক সূত্রে কাজ করেছে বলে আমার ধারণা।

বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীতে ব্যাপক সম্প্রসারণ চলছে। দুটি আনকোরা পদাতিক ডিভিশন ও কতিপয় সহায়ক ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। সাধারণভাবে ধারণা করা যায় যে, এসব নতুন ইউনিট ফরমেশন গঠিত হয়েছে বিদ্যমান ফরমেশনগুলো থেকে কাঁটাছেঁড়া করে ইউনিট কেটে নিতে।

যেমন, নবগঠিত ১০ পদাতিক ডিভিশন গঠনে চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশন থেকে ইউনিট নেয়া হয়েছে। সাধারণ ধারণা মোতাবেক, একটি পদাতিক ডিভিশন পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় নেয়। অর্থাৎ এখনো যেসব পুরানো ডিভিশন থেকে ইউনিট নিয়ে নতুন ফরমেশন স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো এখনো ঘাটতি পুষিয়ে উঠতে পারেনি।

শত্রুরা এরই সুযোগ নিয়েছে। কারণ, দূরবর্তী অস্থায়ী সেনা ফাঁড়িগুলো থেকে সেনা প্রত্যাহার ও রামু ডিভিশনের জন্য ইউনিটের যোগান দিতে গিয়ে চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশনে প্রয়োজনীয় লোকবলের কিছুটা হলেও ঘাটতি আছে।

যদিও পাহাড়ে থাকা চার সেক্টর বিজিবি সেই ঘাটতি পুষিয়ে নিতে যথেষ্ট, তথাপি বিশেষত সেখানকার সাধারণ মানুষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে আতংকিত করতে এখন পাহাড়ে সহিংসতা নতুন অবয়ব ধারণ করা শুরু করেছে।

কারণ, যতোই সামরিক সক্ষমতায় বিজিবি ও সেনাবাহিনীর মধ্যে পার্থক্য কেবল উর্দি আর সাংগঠনিক কাঠামোয় সীমিত থাকুক না কেন, পাহাড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী যতোটা ডিটারেন্স ধারণ করে, ততোটা বিজিবি করে না।

ফলে দেখা যাচ্ছে, পাহাড়ে আবার অস্থায়ী ক্যাম্পগুলো চালু করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। আবার পূর্বতন ক্যাম্পগুলো সক্রিয় হলে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি তো হবেই, পাশাপাশি পাহাড়ের প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ আহরণ ও ধ্বংস একটা নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে চলে আসবে।

তবে যেহেতু, পাহাড়ে মোতায়েনের মতো নতুন ইউনিট গঠন সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, সেহেতু আমাদের বিদ্যমান লোকবল দিয়েই কাজ চালাতে হবে। তবে এক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সহায়ক শক্তি তৈরি করতে হবে।

পাহাড়ে যুদ্ধকালীন সময়ে সেনাবাহিনীর সহায়ক হিসেবে আনসার বাহিনী নাকি দুর্দান্ত কাজ দেখিয়েছিল। এমনকি তাদের বিভিন্ন তীব্র কমব্যাট জোনে মোতায়েন করে সুফল পাওয়া গেছিলো। সেক্ষেত্রে, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির ১৭ নম্বর দফা অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকল্পে ও পাহাড়ে শান্তি নিশ্চিতকরণে বেসামরিক প্রশাসনের আহবানে পরিত্যক্ত সেনা ফাঁড়ীগুলো পুনরায় চালু করা যেতে পারে। এসব ফাঁড়ীতে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি আনসার থেকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক লোকবল নিয়োগ করা যেতে পারে।

এছাড়া, পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিতকল্পে সেখানকার শান্তিপ্রিয় ও দেশপ্রেমিক গ্রামবাসীদের নিয়ে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, তথা ভিডিপি পুনর্গঠন করা যেতে পারে, যাদের অনুন্য এক মাসের সামরিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উপযুক্ত পারিতোষিকের মাধ্যমে নিযুক্ত রাখা যেতে পারে।

এক্ষেত্রে কেবল পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙ্গালী নাগরিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না। পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের মধ্যে যারা সন্ত্রাসীদের তৎপরতায় সংক্ষুব্ধ, তাদেরও শামিল করতে হবে। অতীতে একবার কুকি, ম্রো সম্প্রদায়ের মধ্যে এমন সহায়ক বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিয়েও পরে তা আর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়নি। সেবারের ভুল থেকে এবার শিক্ষা নিতে হবে।

আমি আশা করি, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে উপরিউক্ত পন্থায় অগ্রসর হলে ইনশা আল্লাহুল আজিজ, আর লংগদুতে নয়ন মরবে না, বাড়িঘরে আগুন লাগানো, এমনকি বন ও পাহাড় ধ্বংস তো কমবেই, রমেল চাকমারাও কমই মারা পড়বে…!

লেখক: জনপ্রিয় অনলাইন এক্টিভিস্ট

image_pdfimage_print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *