পাহাড়ে অশান্তির আগুন


ন্যাড়া পাহাড়

ফারুক হোসাইন, পার্বত্য অঞ্চল থেকে ফিরে :

শান্তি চুক্তি হয়েছে ১৯ বছর। অথচ অশান্তির আগুনে জ্বলছে পার্বত্য তিন জেলার মানুষ। পাহাড়ে যারা বসবাস করছেন তাদের অধিকাংশের মনে শান্তি নেই। আতঙ্ক উৎকন্ঠায় কাটে তাদের দিন-রজনী। পাহাড়ে যেন এখনো বিভীষিকাময় পরিস্থিতি বিরাজমান। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী যে সব এলাকায় উপস্থিত সেখানে মানুষ নিশ্চিন্ত থাকলেও দুর্গম এলাকায় নাগরিকেরা থাকেন চরম উৎকণ্ঠায়। সূর্য উঠার পর তাদের দিন যায় কিন্তু অস্ত যাওয়ার পর রাতের যেন শেষ হয় না। রাত যত গভীর হয় বাড়ে তত আতঙ্ক।

সন্তু লারমারা শান্তি চুক্তির পর রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা নিলেও পাহাড়ে শান্তি রক্ষার বদলে পর্দার আড়াল থেকে অশান্তি সৃষ্টিতে তৎপর। এ যেন ‘সর্ষের ভিতরে ভুতের’ গল্পের মতোই। পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের সরকার তৎপর হলেও দেশের কিছু ব্যক্তি ও কিছু বিদেশী এনজিও অর্থ খরচ করে অশান্তির আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছে। পার্বত্য তিন জেলা যেন অন্য এক জগৎ।

রাতের অন্ধকারে চিৎকার শুনলেই অজানা আতঙ্কে আঁতকে উঠেন পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী সাধারণ পাহাড়ি-বাঙালিরা। কেউ বুঝি প্রাণ হারালো পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের হাতে। আবারও বুঝি ধর্ষণের শিকার হলো কোন নিরীহ নারী-শিশু। চাঁদা না দেয়ায় হয়তো পুড়ে গেল কোনো পরিবারের কপাল। দিনের আলোয় কিছুটা সাহস জোগালেও সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে অন্ধকারে মিলিয়ে যায় মনের সাহসটুকু।

অন্যমিডিয়া

দেশের ৬১ জেলায় সাধারণ মানুষ তার ঘরে ঘুমালেও পাহাড়ে বসবাসকারীরা (বাঙালি ও নিরীহ পাহাড়িরা) স্বাভাবিক ভাবে ঘুমাতে পারেন না। সারাক্ষণই আতঙ্কে থাকেন কখন সন্ত্রাসীরা তাকে তুলে নিয়ে যায়, দাবি করে মুক্তিপণ, মেয়েরা শঙ্কায় থাকে কখন শিকার হবেন ধর্ষণের, কেউ জানে না কাকে কখন কুপিয়ে-গুলি করে হত্যা করা হবে। এ এক অরাজক পরিস্থিতি। সন্তু লারমার বাহিনীর সঙ্গে সরকারের শান্তি চুক্তি হলেও শান্তি নেই পার্বত্য তিন জেলার মানুষের মনে।

দিন যতই যাচ্ছে ততই যেনো অশান্ত হয়ে উঠছে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল। পর্যটনে বিপুল সম্ভাবনার পাহাড়ে গড়ে উঠছে অবৈধ অস্ত্রের ভা-ার আর সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে অবাধে ঢুকছে এসব অস্ত্র। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দেখেনি এমন অত্যাধুনিক অস্ত্রেরও মজুদ রয়েছে তাদের হাতে।

সন্ত্রাসের মূল লক্ষ্য বাঙালি অধিবাসীরা হলেও ছাড় পাচ্ছে না নিরীহ ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠি এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের নেতারাও (উপজাতি)। সন্ত্রাসী এই কর্মকাণ্ডের মূল অভিযোগ জনসংহতি সমিতি (জেএসএস), জেএসএস সংস্কার ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) বিরুদ্ধে।

অথচ অশান্ত পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি’ করা হয়। পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) সন্তু লারমার সাথে এই চুক্তি করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চুক্তির ১৯ বছরের মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বেশিরভাগ শর্তই পূরণ করা হয়েছে।

কিন্তু বিনিময়ে পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনতে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর পক্ষ থেকে যে অঙ্গীকার পালন করার কথা বলা হয়েছিল তা তো পূরণ করেনি বরং দিনে দিনে পাহাড়কে করে তোলা হয়েছে সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য এবং শান্তি চুক্তির সুযোগ নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বিপুল পরিমান অবৈধ অস্ত্রের ভাণ্ডার।

গত অক্টোবরে খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলায় চাইনিজ সাব মেশিন গান ও জি-৩ রাইফেল, ৩৮ রাউন্ড গুলিসহ যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি আরো একটি এম-১৬ রাইফেলও উদ্ধার করা হয়। এর আগে বিভিন্ন সময় বিদেশী জি-৩ রাইফেল, জি থ্রি রাইফেলের ম্যাগজিন, চাইনিজ সাব মেশিনগান, একে-৪৭, একে-৫৬, লাইট মেশিনগান, চাইনিজ সাব মেশিনগানের ম্যাগজিনের মতো অত্যাধুনিক সব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ত্রাসীদের নির্দেশনা না মানলেই অপহরণের পর করা হচ্ছে হত্যা। মেয়েদের তুলে নিয়ে করা হচ্ছে ধর্ষণ। প্রতিনিয়তই উপজাতি সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন, ধর্ষণসহ কোন না কোন অপরাধের শিকার হচ্ছে নিরীহ বাঙালি ও উপজাতিরা।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসনকে শক্তিশালী করা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান এবং র‌্যাবের কার্যক্রম শুরুর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগিরা।

স্থানীয় সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলেন, আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা খুন, গুম, ধর্ষণ, অপহরণ, নারী নির্যাতন, চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানিসহ এমন কোনো অপরাধ নেই যার সাথে তারা জড়িত নয়। এসব সংগঠনের প্রশিক্ষিত অস্ত্রধারীদের ভয়ে শুধু সাধারণ মানুষই নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও মুখ খুলতে ভয় পান।

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী এই এলাকায় চাকরি করেন, তারা শুধু দিন গণনা করেন কবে এ এলাকা থেকে অন্যত্র বদলি হবেন। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাও সেখানে পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের কাছে অসহায়। বাদ পড়ছেনা সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্যরাও। প্রায়ই তাদেরকে টার্গেট করে হামলা চালায় সন্ত্রাসী গ্রুপের কর্মীরা।

গত মার্চে খাগড়াছড়িতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের উপর হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। একই এলাকায় গতবছর জুন মাসে একই ধরনের হামলা চালানো হয়।

অবৈধ অস্ত্রের ভাণ্ডার:
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, পার্বত্য এলাকায় অবৈধ অস্ত্রের ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে সন্ত্রাসীরা। সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে আসছে অত্যাধুনিক সব অস্ত্র। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে প্রায়ই ধরা পড়ছে এসব অস্ত্র। দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে নেই এমন অত্যাধুনিক মডেলে অস্ত্রও পাওয়া যাচ্ছে সন্ত্রাসীদের কাছে।

নিরাপত্তা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, শুধু রাঙামাটিতে অত্যাধুনিক অবৈধ অস্ত্র রয়েছে ৮শ’ থেকে ৯শ’ এবং খাগড়াছড়িতে এই সংখ্যা সাড়ে ৫শ’ থেকে ৬শ’। সাম্প্রতিক সময়েই চাইনিজ সাব মেশিন গান ও জি-৩ রাইফেল, এম-১৬ রাইফেল, বিদেশী জি-৩ রাইফেল, জি থ্রি রাইফেলের ম্যাগজিন, চাইনিজ সাব মেশিনগান, চাইনিজ সাব মেশিনগানের ম্যাগজিনের মতো অত্যাধুনিক সব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

গত ৯ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি জেলার রামগড়ে নিরাপত্তাবাহিনী অভিযান চালিয়ে দুই রাউন্ড গুলিসহ একটি এলজি উদ্ধার করে। ২৭ অক্টোবর বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির গহীন পাহাড়ে অবস্থানকারী সশস্ত্র উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের অপহরণ কাজে ব্যবহৃত ৪ টি অস্ত্র উদ্ধার করে বিজিবি।

গত বছর ২৫ অক্টোবর মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পাচারের সময় ভারতের মিজোরাম রাজ্যের দুটি গ্রামে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে আসাম রাইফেলস। এসব অস্ত্রের মধ্যে ছিল ১২টি ম্যাগাজিনসহ পাঁচটি একে-৪৭ ও তিনটি একে-৫৬ রাইফেল। এর আগে ২০১৪ সালের মার্চে মিজোরাম পুলিশ বাংলাদেশগামী বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করে।

একই বছর আগস্টে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার বরাদম এলাকায় সেনাবাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে ৫ জন নিহত হয়। এসময় মেশিনগান, সাব মেশিনগান, চাইনিজ রাইফেল, এসএলআরসহ মোট ৮ আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫৩৯ রাউ- বিভিন্ন অস্ত্রের গুলি উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও যৌথবাহিনী ঘটনাস্থল থেকে বিপুল পরিমাণ গুলি ও সামরিক পোশাক ও সামরিক সরঞ্জাম আটক করে। আটক গুলির মধ্যে রয়েছে ২৬ রাউণ্ড মেশিনগানের গুলি, ১২০ রাউ- রাইফেলের গুলি, ৮৪ রাউ- এসএমজি’র গুলি ১৪৫ রাউ- এসএলআরের গুলি, ৯৪ রাউ- পয়েন্ট টু টু বোর রাইফেলের গুলি, ৭ রাউ- পিস্তলের গুলি।

এছাড়াও এসময় বিপুল পরিমাণ সামরিক পোশাক ও সামরিক সরঞ্জামাদি আটক করা হয়েছে। অবৈধ এসব অস্ত্রের মাধ্যমে একদিকে যেমন স্বাধীন জুম্মাল্যান্ড গঠনের জন্য পার্বত্য এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম চলাচ্ছে। অন্যদিকে অপহরণ, খুন, চাঁদাবাজীতে এসব ব্যবহৃত হচ্ছে।

অবৈধ অস্ত্র এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রমে ভীত-তটস্ত বাঙালি ও নিরীহ উপজাতিরা মুখ খুলতে পর্যন্ত পারছে না। এমনকি কারো বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করলে থানায় মামলা করা পর্যন্ত সাহস পান না কেউ।

সন্ত্রাসী ও অবৈধ অস্ত্রের কারণে কিছুদিন আগেই অবিলম্বে রাঙামাটিসহ পার্বত্য এলাকায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান শুরু করা না হলে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা আওয়ামী লীগ, উপজেলা আওয়ামী লীগসহ সকল সহযোগী ও অংগ সংগঠনের নেতাকর্মীরা একযোগে পদত্যাগ করে পদত্যাগপত্র সভানেত্রীর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেন।

পাহাড়ে কোনো অস্ত্রবাজ, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজদের ঠাঁই হবেনা বলে মন্তব্য করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর। তিনি পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে জারালো অভিযান চালানোরও আহ্বান জানান।

পৃথক পতাকা ও সেনাবাহিনী:
স্বাধীন দেশের যেমন পতাকা ও সেনাবাহিনী থাকে তেমনি পার্বত্য অঞ্চলে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোও নিজেদের জন্য আলাদা পতাকা ও সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছে। নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, পার্বত্য অঞ্চলে জেএসএস ও ইউপিডিএফের ১০ হাজারের বেশি সন্ত্রাসী সক্রিয় রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের কাছে রয়েছে একাধিক অত্যাধুনিক অস্ত্র। এরা সবাই নিজ নিজ সংগঠনের বেতনভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী।

একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীতে যেমন পদবী ও পদবিন্যাস থাকে এই সংগঠনগুলোতে কাজ করা সবারই সেরকম পদবী রয়েছে। মেজর-কর্ণেল এমন সব নাম দেয়া হয়েছে তাদের পদের। তাদের জন্য রয়েছে পৃথক বেতন স্কেল ও প্রত্যেকের রয়েছে ঝুঁকি ভাতা। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কেউ যদি নিহত বা আহত হয় তবে তাদের জন্য রয়েছে সংগঠনের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ। শুধু পাহাড়ি সন্ত্রাসীরাই নয়, প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে আগত কিছু সন্ত্রাসীও জেএসএস ও ইউপিডিএফের হয়ে কাজ করছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কোথাও কোথাও জেএসএস আবার কোথাও ইউপিডিএফের আধিপত্য পুরো পাহাড়ে। তবে জেএসএস আর ইউপিডিএফ যে-ই হোক তাদের কর্মকা- সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে চরম আতঙ্কের। বাঙালিদের চেয়েও পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকেরা তাদের কাছে বেশি পণবন্দী। এর কারণ হিসেবে জানা যায়, বাঙালিরা সাধারণত লোকালয়ে বসবাস করে।

শহর কিংবা বাজারের আশপাশে দলবদ্ধ হয়ে এদের বসবাস। আর পাহাড়িরা গহীন অরণ্যে বসবাস করে। অনেক সময় দেখা যায় পাহাড়ের চূড়ায় হয়তো একাকী একটি বাড়িতে বসবাস করছে কোনো পাহাড়ি উপজাতি পরিবার। যে কারণে তাদের সন্ত্রাসীরা সহজেই টার্গেট করতে পারে।

অপহরণ হত্যা ধর্ষণ:
পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষগুলো এখনো স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি। স্বাধীন দেশের ভূ-খণ্ড ও নাগরিক হয়েও এখনো মৃত্যু ভয়ে চলতে হয় সেখানকার বাঙালিদের। সূর্য ডুবে যাওয়ার পর ঘরের বাইরে পা রাখতে ভয় পান সকলেই। জেএসএস ও ইউপিডিএফের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বাধা হয়ে দাঁড়ালে কিংবা কোন নির্দেশনা না মানলেই তাদের অপহরণ, হত্যা আর ধর্ষণ করে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো।

চাঁদা না দিলে ব্যবসা করতে পারে না কেউই। গত ২০ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার আমেরিকান প্রবাসী আবু মো: হোসেন আলী (৬০)। তিনি মানিকছড়ির ভোলাইয়া পাড়া গ্রামে প্রাইভেট কারে করে নিজ বাগান দেখতে গিয়ে ছোট বোন শিউলি ও গাড়ির চালক এরশাদসহ এই হামলার শিকার হন।

গত ১৪ ডিসেম্বর জেএসএস (সংস্কার) এর দুই কর্মীকে বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করে ইউপিডিএফ। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার উত্তর হাগলা ছড়ার নয়ন চাকমা ও যুদ্ধ চন্দ্র চাকমা। হত্যার পরের দিন পুলিশ এসে লাশ নিয়ে গেলেও উইপিডিএফের হুমকীর কারণে পরিবারের সদস্যরা থানায় অভিযোগ কিংবা মামলা করার সাহস পর্যন্ত পাচ্ছে না।

৩০ মে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে জেএসএস কর্মীরা মুকুল কান্তি চাকমা নামে অবসরপ্রাপ্ত এক সেনা সার্জেন্টকে ডেকে নেয়ার পর আজো তার খোঁজ মেলেনি। নিখোঁজ থাকা মুকুল চাকমার মেয়ে থানায় মামলা করলে অব্যাহতভাবে তার ফোনে হত্যার হুমকী দেয়া হচ্ছে। হুমকীর মুখে পরিবারটি এখন আত্মগোপনে আছে।

১৫ এপ্রিল বান্দরবানের লামায় উপজাতি সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হয় তিন বাঙালী গরু ব্যবসায়ী। এ ঘটনায় তিন ত্রিপুরা সন্ত্রাসীকে অস্ত্রসহ আটক করা হয়। ১৩ জুন বোয়াংছড়ি উপজেলায় শাহিনা আক্তার (২০) নামে এক বাঙালী গৃহবধূকে প্রকাশ্যে দিবালোকে অস্ত্র ঠেকিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে এক উপজাতি সন্ত্রাসী।

সন্ত্রাসীদের নিষেধের পরও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করায় আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক ইউপি সদস্য বাবু মংপু মারমাকে গত ১৩ জুন অপহরণ করা হয়। কয়েকমাস পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হলেও শর্ত দেয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের রাজনীতি ছেড়ে দেয়ার। এর আগেও জেএসএসের সন্ত্রাসীরা তাকে তিনবার অপহরণ করে বলে জানা যায়।

কুহালাং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সানুপ্রু মারমা বলেন, তারা শান্তিতে থাকতে চান। কিন্তু সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে তারা অতিষ্ঠ। গত বছর ৩১ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটির সাজেকে এক সেনাকর্মকর্তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে তার গাড়িতে আগুন দেয় উপজাতি সন্ত্রাসীরা।

ভুক্তভোগী সাধারণ পাহাড়ী ও বাঙালীরা বলছেন, জেএসএস-ইউপিডিএফ এর মতো সশস্ত্র সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে বাসায় অক্ষত থাকা একেবারেই অসম্ভব। তাদের শঙ্কা দুর্গম পাহাড়ে প্রশাসনের অনুপস্থিতিতে যে কোন ধরনের ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হতে পারেন তারা। এছাড়াও পর্যাপ্ত লোকবল ও আধুনিক অস্ত্রের অভাবের পাশাপাশি দ্রুত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে অক্ষম পুলিশ প্রশাসন।

তাই এক্ষেত্রে একমাত্র সেনাবাহিনীকেই উপযুক্ত বলে মনে করেন তারা। স্থানীয়রা বলছেন, সারাদেশের ৬১ জেলায় র‌্যাবের কার্যক্রম থাকলে তিন পাবর্ত্য জেলায় কেন থাকবে না। এটাও তো বাংলাদেশেরই একটি অংশ তাহলে এখানে এই বিশেষ বাহিনী কেন মোতায়েন করা হয় না। এখানে র‌্যাব কাজ করলে ৮০ শতাংশ সন্ত্রাস ও অবৈধ অস্ত্র কমে যাবে বলে তারা মনে করেন।

খাগড়াছড়ি জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) আব্দুল মজিদ বলেন, পাবর্ত্য এলাকা দুর্গম এবং সন্ত্রাসীরা সস্বস্ত্র অবস্থায় থাকে। মাঝে মাঝে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয় এবং ধরা পরে। ইউপিডিএফ এর শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ধরেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক দুই শিক্ষার্থী ও ইউপিডিএফের শীর্ষ নেতা মিঠুন চাকমার বিরুদ্ধে অস্ত্র, চাঁদাবাজী, অপহরণ ও হত্যার ১০-১২টি মামলার ওয়ারেন্ট ও বিপুল চাকমার বিরুদ্ধে ১৫টি মামলার ওয়ারেন্ট ছিল তাদেরকে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা ছাড়াই গ্রেফতার করা হয়েছে। সন্ত্রাসীরা অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত থাকে। এই অস্ত্র কোথা থেকে আসে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে তাদের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র আসছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে যেসব অস্ত্র নাই এমন অস্ত্রও তাদের কাছে আছে।

রাঙামাটি জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) সাঈদ তরিকুল হাসান বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে এবং সন্ত্রাসীদের ধরতে প্রায়ই অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে দুর্গম এলাকা হওয়ায় সমস্যায় পড়তে হয়ে। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করলে এই সমস্যার কিছুটা সমাধান হবে বলে তিনি মনে করেন।

পার্বত্য জেলার সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি ফিরোজা বেগম চিনু বলেন, প্রত্যেকটি সেক্টর থেকে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদেরকে চাঁদা দিতে হয়। চাঁদাবাজী এখানে ওপেন সেক্রেট। তাদের ভয়ে কেউ মামলাও করছে না। কথা বললেই হুমকী দেয়া হচ্ছে। তিনি নিজেও হুমকী পেয়েছেন জানিয়ে বলেন, পার্বত্য অঞ্চল থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না করলে জনজীবন স্বাভাবিক হবে না এবং জনগণ তার ভোটাধিকারও পাবে না।

চিনু বলেন, তাদের কাছে এমন কোনো ভারী অস্ত্র নেই যা না আছে। চিরুনী অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধাদের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, যাদের কাছে অস্ত্র পাওয়া যাবে তাকেই গ্রেফতার করতে হবে। এসব সন্ত্রাসী একমাত্র সেনাবাহিনীকে ভয় পায় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ইউপিডিএফের প্রচার ও প্রকাশনা শাখার প্রধান নিরন চাকমা এবং জেএসএসের সহ-প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমার ফোনে যোগাযোগ করলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

সূত্র: দৈনিক ইনকিলাব

image_pdfimage_print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *