পাহাড়ে অপহরণ আতঙ্ক: এখনো উদ্ধার হয়নি লংগদুতে অপহৃত ২ ভাই


Follow Up - Copy

স্টাফ রিপোর্টার, রাঙামাটি:

এখনো উদ্ধার হয়নি রাঙামাটির লংগদু উপজেলায় অপহৃত দু’ভাই। সোমবার মধ্যরাতে জেলার লংগদু উপজেলার আটারক ছড়া ইউনিয়নের বড় উল্টাছড়ি নামক গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে প্রিয়ময় চাকমা ও তার বড় ভাই সুসময় চাকমাকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যায় সশস্ত্র উপজাতি সন্ত্রাসীরা।

 

২দিন পার হয়ে গেলেও কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি অপহৃতদের। কার্বারী (গ্রাম প্রধান) প্রিয়ময় চাকাম ও তার বড় ভাই আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি জেএসএসের নেতা বলে দাবী করেছে সংগঠনটি। তাই চুক্তি বিরোধী সংগঠন জনসংহতি সমিতির বিদ্রোহী গ্রুপ এমএন লারমা (সংষ্কারপন্থী) এ অপহরণের ঘটনার সাথে জরিত বলে জানিয়েছে, জেএসএসের সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা।

তবে জেএসএসের বিদ্রোহী গ্রুপ এমএন লারমা (সংষ্কারপন্থি) তথ্য ও প্রচার সম্পাদক প্রশান্ত চাকমা অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, জেএসএসের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এতে তাদের সংগঠন কোনো ভাবেই জড়িত নয়।

এ ব্যাপারে রাঙামাটি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) হাবিবুর রহমান হাবিব জানায়, অপহৃতদের উদ্ধার তৎপরতা চলছে। বিভিন্ন  পাহাড়ি এলাকায় পুলিশের বিশেষ টিম, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও প্রশাসনের বিভিন্ন বাহিনী উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হবে।

অভিযোগ উঠেছে, সারা দেশেরমত তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়িবান্দরবানে উদ্বেগজনক হারে গুম, হত্যা ও অপহরণ ঘটনা ঘটছে। বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা। পাহাড়ে বিরাজ করছে অপহরণ আতংক। প্রায় প্রতিদিনই পার্বত্যাঞ্চলের আনাচে কানাচে কোথাও না কোথাও ঘটছে এসব অপরাধমুলক কর্মকান্ড।

একাধিক সূত্রের তথ্য মতে, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর এ পর্যন্ত কমপক্ষে দুই হাজারের মতো মানুষ অপহরণের শিকার হয়েছে তিন পার্বত্য জেলায়। খুনের শিকার হয়েছে পাঁচ শতাধিক মানুষ। গুমের ঘটনা ঘটেছে অহরহ। যার কোনো সঠিক তথ্যও নেই।

তথ্য সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১৬ ফেব্রয়ারি জেলার লংগদু এলাকা থেকে একসঙ্গে ৭০ জেএসএস কর্মী ও সমর্থককে অপহরণ করে দুর্বৃত্তরা। পরে সামাজিক সমঝোতার মাধ্যমে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়। ওই ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। তার আগে ২০১২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে অপহৃত হন রাঙামাটি কৃষক লীগের সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অনিল তঞ্চঙ্গ্যা। অপহরণের পর এ পর্যন্ত তার আর কোনো হদিস মেলেনি। সবার ধারণা অপহরণের পর হত্যা করে তার লাশ গুম করেছে দুর্বৃত্তরা। এছাড়াও পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর জানা অজানা অহরহ অপহরণ ঘটনা ঘটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী জেলায় এ বছর মার্চ মাসে ২৭টি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। তন্মধ্যে মামলা হয়েছে খুনের ঘটনায় পাঁচটি, অপহরণ ঘটনায় একটি ও অস্ত্র আইনে একটি। অন্য মামলাগুলো হয়েছে চুরি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে।

রাঙামাটি জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম আজাদ (ডিএসবি) জানান, রাঙামাটি জেলায় গত ২০১৩ সালে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২০টি। অপহরণ ঘটনায় মামলা হয়েছে পাঁচটি। এ পাঁচ মামলায় ছয় আসামির মধ্যে গ্রেফতার হয়েছে মাত্র তিনজন। ২০১৪ সালে এ পর্যন্ত জেলায় খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১১টি। আর অপহরণ ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র দুইটি। এছাড়া ২০১৩ সালে জেলায় অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে চারটি। এসব মামলা মূলে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ১৭টি। ২০১৪ সালে এ পর্যন্ত জেলায় অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে তিনটি। আর মামলা মূলে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে দুইটি।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ, পেশিশক্তির লড়াই, মুক্তিপণ ও চাঁদা আদায়, আধিপত্য বিস্তার, এলাকা দখল, সাম্প্রদায়িক সহিংসতাসহ নানা কারণে খুন, অপহরণ ও গুমের ঘটনাগুলো পাহাড়ে বেশি ঘটছে। কিন্তু তুলনামুলকভাবে এসব অপরাধমুলক ঘটনায় থানায় বা আদালতে মামলা হয় খুব কম। নিরাপত্তা সংকট ও সামাজিক সমঝোতা এর কারণ। যা কারণে অপরাধীরা অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *