পাহাড়ের সজীবতায় বাড়ছে মানুষের ভিড়


সাজেক ২

ফজলুল হক, খাগড়াছড়ি থেকে ফিরে:

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি পার্বত্য জেলাগুলোর পাহাড় ও ঝর্না। এ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছর ভিড় জমান হাজারও মানুষ। তবে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ে। সেইসঙ্গে এ সময় শীতের হিমেল পরশে বাড়ে পাহাড়ের সজীবতা। ফলে প্রাকৃতির সাজঘর পাহাড়ে বাড়ছে মানুষের ভিড়। যান্ত্রিক জীবনের কর্মতৎপরতা থেকে বেরিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় ভিড় জমাচ্ছেন ভ্রমণপিঁপাসু মানুষেরা। প্রকৃতি যেন সবটুকু উজাড় করে দিয়ে পেখম মেলে বসে আছে সৌন্দর্য বিকাশে।

সেইসঙ্গে ওই অঞ্চলে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের বেচা-কেনাও হচ্ছে জমজমাট। কিন্তু দুর্গম পাহাড়ে পর্যটকদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবকাঠামোর অপ্রতুলতার কারণে ওই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

তবে সাজেকে দিনে কয়েকবার, সকাল-বিকেল ও দুপুরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রহরায় পর্যটকদের নিয়ে যাওয়া হয় আবার তাদের পরিদর্শন শেষ হলে ফিরিয়ে আনা হয় একই ধরনের নিরাপত্তা বেষ্টনির মধ্য দিয়ে।

মানুষের ভিড় বাড়ার কারণে ওই এলাকার হোটেলগুলোতে এ সময়টায় থাকার জন্য আগেভাগেই কক্ষ বুকিং দেয়া লাগে। তা না হলে কক্ষ পাওয়া কঠিন। এ সম্পর্কে সাজেকের রুইলুই অঞ্চলের ‘বেনজামিন’ হোটেল মালিক জানান, আমার তিনটা আবাসিক হোটেল রয়েছে, তাতে ২১টি কক্ষ আছে। দুই হাজার থেকে ২৫শ ও ৩৫শ টাকা পর্যন্ত প্রতি রাতের ভাড়া। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে নতুন করে কোনো বুকিং দেয়ার সুযোগ নেই। নতুন বুকিং দিতে হলে ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ থেকে দিতে হবে। তিনি জানান, সত্যি বলতে কী ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি মাসটা হলো সাজেকের খুব ব্যবছা (ব্যবসা)।

সাজেক ইউনিয়নের রুইলুই অঞ্চলের মেম্বার (সদস্য) জানান, ‘ত্রিপুরা থেকে এসে আমরা এই পাহাড়ে বসতি করেছি, আমার কোনো আয় রোজগার নেই, এক ছেলে ক্লাস এইটে পড়ে, দুই মেয়ের একজন ক্লাস টু এবং সবার ছোট্ট মেয়ে ক্লাস ওয়ানে। পাহাড়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আসার আগ পর্যন্ত আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ছিলাম, এখন কিছুটা স্বস্তিবোধ করি। আমরা তো লেখা-পড়া কী জানি না। এবার চার মাস হলো মেম্বার হয়েছি। এবার একটা ঘর তৈরি করে ব্যবসা করবো। এখানে মেলা বাবু আসে।’

সাজেক রিসোর্টে

দেখা গেছে- কুয়াশার চাদরে মোড়ানো পাহাড়গুলো দূর থেকে দেখে মনে হয় বড় ধরনের বরফের খণ্ড। চিরসবুজের ছোঁয়া পেতে পার্বত্য জেলাগুলোয় পাহাড়ের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছেন পর্যটকরা। আর ভ্রমণপিপাসু মানুষের আনা-গোনা বেড়ে যাওয়ায় চাঙা হতে যাচ্ছে পাহাড়ের অধিবাসীদের অর্থনীতির চাকাও।

পাহাড়ে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়ানো সেখানকার পাহাড়ি-বাঙালি মানুষের আয়, রুটি-রুজির ব্যবস্থা। শীতের সময় পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে আবাসিক হোটেল, রেস্টুরেন্ট, হস্তশিল্পের তৈরি শোপিজ, তাঁতের কাপড়সহ ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাগুলোর বেচা-কেনাও জমে উঠেছে। পর্যটকবাহী চাদের গাড়িগুলোসহ পরিবহন ব্যবসাও চাঙা হয়ে উঠেছে।

পর্যটকেরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন বান্দরবানের অন্যতম পর্যটন স্পট নীলাচলের কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ে। মেঘলা পর্যটন কেন্দ্র্রের লেকের স্বচ্ছ জলে, ঝুলন্ত সেতু আর ক্যাবলকারে। সাঙ্গু নদীতে ডিঙি নৌকায় চরে। আর মেঘ পাহাড়ের নীলগিরি, জীবননগর, চিম্বুক, ক্যাওক্রাডং চূড়ায়।

অপরদিকে রাঙামাটি জেলার আকর্ষণীয় ঝুলন্ত সেতু, কাপ্তাই লেক, সাজেক ভ্যালি এবং খাগড়াছড়ির আলুটিলা সুরঙ্গর মতো দর্শনীয় স্থানগুলোয়।

হোটেল মালিক সমিতির এক নেতা বলেন, পর্যটনশিল্পের বিকাশে পাহাড়ের মন্দা অর্থনীতি চাঙা হয়ে উঠেছে। আবাসিক হোটেলগুলোর সঙ্গে বান্দরবানে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রেস্টুরেন্ট এবং হস্তশিল্পের তৈরি শোপিজ, তাঁতের কাপড়ের দোকানসহ পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও।

বান্দরবন জেলার প্রায় ৫০টি আবাসিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, গেস্টহাউজ এবং সরকারি রেস্টহাউসগুলোয় সাত থেকে আট হাজার মানুষের ধারণক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া ভ্রাম্যমাণ পর্যটকের সংখ্যাও কম নয়।

খাগড়াছড়ি জেলা হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অনন্ত ত্রিপুরা বলেন, জেলায় ২২টি বেসরকারি হোটেল, রিসোর্ট, গেস্টহাউজ ও কয়েকটি সরকারি রেস্টহাউস রয়েছে। এগুলোতে ধারণক্ষমতা দুই হাজারের মতো। কিন্তু প্রতিদিনই তিন থেকে চার হাজার পর্যটক বেড়াতে আসেন। পর্যটকের আগমন বাড়ছে প্রতিদিনই।

রাঙামাটি আবাসিক হোটেল সমিতির যুগ্ম সম্পাদক নেচার আহমেদ বলেন, রাঙামাটিতে ৪২টি আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট, গেস্টহাউস রয়েছে। এ ছাড়া সরকারি বেশ কয়েকটি রেস্টহাউজ আছে। সবগুলোতে ধারণক্ষমতা সাড়ে ৩ হাজারের মতো। ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত অধিকাংশই বুকিং রয়েছে। প্রতিদিনই ধারণক্ষমতার চার গুণ বেশি পর্যটকের আগমন ঘটে রাঙামাটিতে। এখানকার নিরাপত্তাব্যবস্থাও বর্তমানে পর্যটকবান্ধব।

রেস্টুরেন্ট মালিক সমিতির সভাপতি গিয়াস উদ্দিন বলেন, পর্যটকের ওপর এখানকার রেস্টুরেন্টগুলোও অনেকটা নির্ভরশীল।পর্যটকের আগমন বৃদ্ধি পাওয়ায় রেস্টুরেন্টগুলোতে বেচা-বিক্রি বেড়েছে। পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িত সব ধরনের ব্যবসা চাঙ্গা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছোট্ট বাড় ব্যবসায়ীরা খুশি।

বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক বলেন, পাহাড়ের সম্ভাবনায় শিল্প হচ্ছে পর্যটন। এখানকার অর্থনীতির সঙ্গে পর্যটন শিল্প সম্পৃক্ত রয়েছে। পর্যটকনির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য পাহাড়ে সম্প্রসারিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পর্যটকদের আগমন বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক চাকাও ঘুরতে থাকে। পার্বত্যাঞ্চলসহ সারাদেশেই পর্যটন শিল্পের বিকাশে কাজ করছে সরকার। পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে অর্থনৈতিকভাবে দেশ আরও স্বনির্ভর হয়ে উঠবে।

রাঙ্গামাটি জেলার পুলিশ সুপার সৈয়দ তরিকুল হাসান বলেন, পাবর্ত্য অঞ্চলে তুলনামুলক পর্যটকের আগমন বহুগুণে বেড়েছে। ১৬ ডিসেম্বর থেকে থার্টিফার্স্ট নাইট পর্যন্ত লক্ষাধিক মানুষের আগমন ঘটবে এসব এলাকায়।

image_pdfimage_print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *