পাহাড়ের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে নিয়োজিত এক প্রতিবন্ধির পথচলা


untitled-2-copy

আলীকদম প্রতিনিধি:

নিয়তি তাকে করেছে শারীরিক প্রতিবন্ধী। কিন্তু তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর সৃজনশীল মানসিকতা তাকে করেছে অন্য দশজন থেকে আলাদা। শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও থেমে যাননি তিনি। বন্ধু, স্বজন-পরিজনের বোঝার কারণ হননি। এখন তার হাত ধরেই পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে পাহাড়ি জনপদ আলীকদমের কৃষিতে।

সামসুল হক (২৫)। জন্ম চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায়। জন্ম থেকেই তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী। ২০১০ সালে হাটহাজারী কলেজ থেকে কৃষিতে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। বাড়িতে রয়েছেন বাবা, মা ও স্ত্রী। তিনি এখন ১১ মাস বয়সী একটি কন্যা সন্তানের জনক। সামশুল হক বর্তমানে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাসের আলীকদম খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্প অফিসের মাঠ সহায়ক।   জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। শৈশব-কৈশোরের ধুলিমলিন অতীত পার করে কৃষিতে ডিপ্লোমা পাশ করেন।

সামসুল হক জানান,  কৃষি ডিপ্লোমা পাশ করার পর সরকারী চাকুরী পাওয়ার চেষ্টা করি। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা পদে ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম। লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেও মৌখিক পরীক্ষায় আমাকে নির্বাচিত করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, সরকারি চাকুরী না পেয়ে বেকার জীবন পার করছিলাম। এ অবস্থায় কারিতাস আমাকে পথের দিশা দিয়েছে। আমার বেকারত্ব ঘুচিয়ে কর্মময় জীবনে নিয়ে এসেছে। শুনেছি, কৃষি ডিপ্লোমা পাস করলে প্রতিবন্ধী কোটায় সরকারি চাকুরী পাওয়া যায়। কিন্তু বারবার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা পদে পরীক্ষা দিয়েও আমার চাকুরি হয়নি।

২০১১ সালের ১ জানুয়ারী থেকে তিনি কারিতাস খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পের মাঠ সহায়ক হিসেবে নিয়োগ পান। প্রথম যোগদান খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে। ২০১১ সালের আগস্ট থেকে তার পোস্টিং হয় আলীকদমে। শারীরিক প্রতিবন্ধী এ মানুষটি তার প্রকল্প এলাকার কৃষকদের মাঝেও এখন বেশ জনপ্রিয়। কারিতাসের সহযোগিতা আর তার প্রচেষ্টায় আলীকদমের কয়েকটি এলাকার কৃষকরা এখন আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু করেছেন। রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার বাদ দিয়ে বাড়িতে বাড়িতে জৈব সার তৈরি করছেন।

সামশুল হক জানান, চাকুরীর শুরু থেকে পাহাড়ি এলাকার কৃষকদের কৃষি পরামর্শ, আধুনিক চাষাবাদ, কম্পোস্ট সার তৈরিতে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে জৈব সার তৈরি, পশু পালন, ধান চাষ, নার্সারিসহ নানা বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ ও হাতে-কলমে শিক্ষা দিচ্ছি। কর্মস্থলে সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক সহযোগিতা তাকে মুগ্ধ করে। এখন তিনি বেশ স্বাচ্ছন্দে কাজ করছেন।  কারিতাসের প্রতিবন্ধী এ কর্মচারী আরও জানান, তিনি প্রকল্প এলাকার পাট্টাহাইয়া, সদর ও সিদ্দিক কার্বারী পাড়া এলাকায় কাজ করেন। সেখানকার কৃষকরাও তাকে পছন্দ করেন। প্রকল্প এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কাজ করাটা তিনি দারুণ উপভোগ করেন।

সামশুলের কাজ ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে সন্তুষ্ট খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পের আলীকদম মাঠ কর্মকর্তা মিসেস জেসমিন চাকমা। তিনি বলেন, শারিরীক প্রতিবন্ধীকতাকে জয় করে অন্যদশজনের মতো সমান শ্রম দেন সামশুল। কর্তব্যনিষ্ঠ এ মানুষটি অন্য দশজনের কাছে অনুকরণীয় হতে পারেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কারিতাসের চট্টগ্রাম অঞ্চলিক পরিচালক জেমস গোমেজ বলেন, ‘আমি মনে করি সামশুল কারিতাসের জন্য আশির্বাদ। তার জন্যই অরগনাইজেশন হিসেবে কারিতাস প্রতিবন্ধীদের হয়ে কাজ করতে প্রেরণা লাভ করছে। সে আমাদের জন্য আশীর্বাদ। আমি তার কাজে সন্তুষ্ট, উচ্ছ্বসিত। প্রতিবন্ধীরা আমাদের সমাজের ফুল। কারিতাস প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে সবসময় পাশে থাকবে’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *