পাহাড়ি দুই সংগঠনের চার গ্রুপের বেপরোয়া চাঁদাবাজি


পার্বত্যনিউজ ডেস্ক:

পাহাড়ে নজিরবিহীন চাঁদাবাজির অপতৎপরতায় আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে চাঁদাবাজ গ্রুপের সদস্যদের নবতর সংযোজন ঘটেছে, যা শান্তিপ্রিয় অগণন পাহাড়ী-বাঙালী তথা পাহাড়বাসীর মাঝে ভয়ানক আতঙ্ক এবং উদ্বেগ উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। বছরের পর বছর এসব চাঁদাবাজ ক্যাডারদের কাছে জিম্মি হয়ে আছে পাহাড়ের বিভিন্ন শ্রেণী পেশা ও ব্যবসা বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতরা। এখন সময় এসেছে বেআইনী তৎপরতায় লিপ্ত শান্তি বিনষ্টকারী ওইসব চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীদের কঠোরহস্তে দমন করার। নচেত আগামীতে পাহাড় হয়ে উঠতে পারে চাঁদাবাজদের স্বর্গরাজ্য, এ অভিমত শান্তিপ্রিয় পাহাড়ী-বাঙালী জনগোষ্ঠীর।

পাহাড়ে রাজনীতির ব্যানারে সক্রিয় রয়েছে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। আগেই দ্বিখ-িত হয় জেএসএস। জেএসএস থেকে বেরিয়ে আসা একটি গ্রুপ করেছে জেএসএস-সংস্কার নামের আরেকটি সংগঠন। অপরদিকে, ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি সম্পাদন ও তৎকালীন শান্তি বাহিনীর সশস্ত্র আত্মসমর্পণের দিন প্রকাশ্যে কালো পতাকা প্রদর্শন করে বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয় জেএসএসের একটি অংশ।

প্রসিত খীসার নেতৃত্বে পরে বিরোধী ওই অংশ ইউপিডিএফ বা ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট নামে আত্মপ্রকাশ করে। পাহাড়ে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, নিজেদের জম্ম জাতি নামে অভিহিত করে জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠা, আদিবাসী হিসাবে স্বীকৃতি আদায়ের দাবির ক্ষেত্রে এদের উপস্থাপিত বক্তব্য এক হলেও অভ্যন্তর পর্যায়ে রয়েছে চাঁদাবাজি, অপহরণ করে অর্থ আদায়, পাহাড়ী-বাঙালীদের মধ্যে শান্তি বিনষ্টসহ নানা ধরনের অপকর্মের তা-বলীলা। বছরের পর বছর জেএসএস ও ইউপিডিএফের অন্তর্বিরোধ ও চাঁদাবাজির রাজ্যে আধিপত্য বিস্তারের জের হিসেবে অকালে ঝরে গেছে বহু প্রাণ। অস্ত্রের ঝনঝনানি হয়ে আছে নিত্যনৈমিত্তিক। পাহাড় জুড়ে অঞ্চলভিত্তিক জেএসএস ও ইউপিডিএফ ক্যাডারদের আধিপত্যের বিস্তৃতি নিয়েও নিজেদের মধ্যে লড়াই নিরন্তর।

পুঁজিবিহীন এবং নানামুখী বলপ্রয়োগে অবৈধ চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ প্রাপ্তির এ অপপ্রক্রিয়ায় এখন সেই ইউপিডিএফও দ্বিখ-িত হয়েছে। সংগঠনের ক্যাডার বাহিনীর সদস্যদের একটি অংশ গেল সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়ে ইউপিডিএফ-সংস্কার নামে আত্মপ্রকাশ করেছে। যার নেতৃত্বে রয়েছে তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা। যিনি মূল ইউপিডিএফের রাঙ্গামাটির নাজিরছড়া অঞ্চলের সমন্বয়কের পদে ছিল। এ তপন এখন তার সক্রিয় নেতা ও ক্যাডার বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, লংগদু, নানিয়ারচর এবং বাঘাইছড়ি এলাকার চাঁদাবাজির নেতৃত্বে রয়েছে।

এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি বিরোধী পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফের বিভক্তিতে তাদের অন্তঃ রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটল। যা কিনা পাহাড়বাসীর ঘাড়ে নতুন আতঙ্কের ঘটনা হিসাবে হাজির হয়েছে। পাহাড়ীদের স্বার্থের তকমা লাগিয়ে বছরের পর বছর কখনও প্রকাশ্যে কখনও নীরবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জুড়ে চলছে বিপুল অঙ্কের অর্থের চাঁদাবাজি। প্রাণ ভয়ে এদের ধার্যকৃত চাঁদা পরিশোধে সংশ্লিষ্ট সকলেই রীতিমত বাধ্য। নচেত হত্যা ও অপহরণ এড়ানোর উপায় নেই।

ঢাকাকেন্দ্রিক একটি বাণিজ্যিক গ্রুপের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের এক ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, গেল বছর তাদের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে ইউপিডিএফ। এ নিয়ে কোন সুরাহা না হওয়ায় টানা তিন মাস দুই উপজেলায় পণ্য সরবরাহ বন্ধ রাখে তাদের প্রতিষ্ঠান। শেষ পর্যন্ত চাঁদা না দেয়ায়, পণ্যবাহী গাড়িতে আগুন ও গুলি চালিয়েছে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা। এতে কোম্পানি নিযুক্ত একজন গাড়ি চালকের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটে।

এদিকে, পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল মজিদ জনকণ্ঠকে জানান, ইউপিডিএফ’র এই বিভক্তির ফলে চাঁদাবাজিতে নতুন একটি নাম যোগ হলো। আগে তিন গ্রুপকে চাঁদা দিতে হতো, এখন গ্রুপ হলো চারটি। এছাড়া নিজেদের মধ্যকার সংঘাত পার্বত্য চট্টগ্রামকে প্রতিনিয়ত অস্থির করে রাখে। নতুন এই বিভক্তিতে সেই সংঘাত আরও বাড়বে বলে তার নিশ্চিত ধারণা।

সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজ প্রতিরোধ কমিটির খাগড়াছড়ি জেলা শাখার আহ্বায়ক পৌর মেয়র রফিকুল আলম জনকণ্ঠকে জানান, ‘বেকার, কর্মহীন মানুষদের নিয়ে সংগঠন গড়ে তুলছে পাহাড়ী আঞ্চলিক দলগুলো। স্বাধিকার আন্দোলনের কথা বলে পার্বত্য চট্টগ্রামে ওরা চাঁদাবাজির মহোৎসবে মেতে রয়েছে। আর ইউপিডিএফ’র সংস্কার গ্রুপ তাতে নতুনমাত্রা যোগ করবে।’

অপরদিকে, চাঁদাবাজির কোন চিন্তা ভাবনা নেই বলে দাবি করেছেন ‘ইউপিডিএফ সংস্কার’ গ্রুপের মিডিয়া সমন্বয়কারী রিপন চাকমা। তিনি মুঠোফোনে জানান, সংগঠন পরিচালনার জন্য প্রচুর অর্থের দরকার হয়। তবে প্রসিত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফের মতো কাউকে নির্যাতন, অত্যাচার করে চাঁদা আদায় করবে না নতুন এই সংগঠন।’

এর আগে গেল বুধবার সকালে খাগড়াছড়ি জেলা সদরের খাগড়াপুর কমিউনিটি সেন্টারে লিখিত বক্তব্যে ‘ইউপিডিএফ সংস্কার’ এর আহ্বায়ক তপন জ্যোতি চাকমা অভিযোগ করেন, ইউপিডিএফর গঠনতন্ত্রে গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক, বলপ্রয়োগের রাজনীতি, চাঁদাবাজি, গুম, খুন ও অপহরণের রাজনীতি করছে প্রসিত খীসা। ইউপিডিএফ’র অনেক নেতা চাঁদার টাকায় এখন পকেট ভারি নেতা হিসেবে পরিচিত।

নব গঠিত এ দলটির পক্ষে ওই সংবাদ সম্মেলন অভিযোগ করা হয়, বর্তমানে ইউপিডিএফ’র আন্দোলন পরিচালনার কৌশল ও পদ্ধতি সঠিক না হওয়ার কারণে ইউপিডিএফ’র কেন্দ্রীয় নেতা সঞ্জয় চাকমা ও দীপ্তি শংকরসহ অনেকে দল ত্যাগ করেছেন। এছাড়া দল ত্যাগ করার অপরাধে অনেক নেতাকর্মীকে খুন করেছে প্রসিত খীসার সন্ত্রাসী বাহিনী।

এদিকে বরাবরই আঞ্চলিক সংগঠনের নেতারা চাঁদা আদায়ের কথা অস্বীকার করে আসছে এবং একপক্ষ অন্যপক্ষকে দোষারোপ করে সহজেই দায় এড়িয়ে নিচ্ছে। চাঁদাবাজির প্রসঙ্গে ইউপিডিএফ নেতারা সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বরাবরই বলেন, শুধুমাত্র জুম্মজাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে অংশগ্রহণমূলক সহযোগিতা নিয়ে থাকে তারা। জুম্ম জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার আদায়ের সংগ্রামের তহবিলে সেই টাকা যোগ করা হয়।

জেএসএসের হামলা ॥ রবিবার খাগড়াছড়ির দীঘিনালা ডিগ্রী কলেজে প্রতিপক্ষের হামলায় জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) সমর্থিত পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) ৬ নেতাকর্মী আহত হয়েছে। ঘটনার জন্য ইউপিডিএফ (প্রসিত খীসা) সমর্থিত পাহাড়ী ছাত্র পরিষদকে দায়ী করা হয়েছে। কলেজে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এই হামলার ঘটনা ঘটে।

 

সূত্র: জনকন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *